আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামের দন্ডবিধি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ড. আব্দুলহামিদ আহমদ আবুসোলাইমান   
Thursday, 19 June 2008
আর্টিকেল সূচি
ইসলামের দন্ডবিধি
ইসলামের স্হায়ী ও পরিবর্তনশীল বিধানের সমকালীন সংস্কার : ইসলামের দন্ডবিধি-একটি নমুনা
পদ্ধতিগত সমস্যা
ইসলামী দন্ডবিধির ক্ষেত্রে ছাত্রাবাস কক্ষে ছাত্র সংখ্যা নির্ধারণের সমস্যার সমাধানে আধুনিক দৃস্টিভঙ্গি
চারজন সাক্ষীর সামাজিক প্রমাণ
ইসলামিক দন্ডবিধির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠাকরণ
শাস্তি প্রয়োগের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধ দমন, প্রতিশোধ গ্রহণ নয়
কারিকুলামগত আলোচনা

ইসলামিক দন্ডবিধির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠাকরণ

উপরের সমাধানমূলক আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, ইসলামী শরীয়তে শাস্তি বিধানের হেকমত ও রহস্য হচ্ছে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিস্ঠা করা এবং সার্বিকভাবে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে ফিৎনা ফাসাদ, অশ্লীলতা, বেহায়পনা, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি ও অন্যায়ভাবে মানুষের জান-মালের উপর যুলুম ও অত্যাচার থেকে রক্ষা করা।

সুতরাং মানুষ তার স্বভাবগতভাবে মানুবিক দুর্বলতার কারণে যৈবিক তাড়নায় যে সকল অন্যায় ও পাপ কাজ করে থাকে, তার উপর ইসলামী শরীয়ত যে শাস্তির নির্দেশ দিয়েছে তা শুধু ঐ অন্যায় ও পাপ কাজের জন্যই দেয় নি। বরং তার ঐ পাপ কাজটি সমাজে প্রকাশ্যভাবে করে সমাজে অশ্লীলতা বেহায়পনার প্রসার ও ফিৎনা ফাসাদ সৃস্টি করার কারণে ইসলামী শরীয়ত এ ধরণের কঠোর শর্তের মাধ্যমে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করেছে যাতে সমাজে অশ্লীলতার প্রসার, ফিৎনা ফাসাদের সৃস্টি না হয়। কারণ কোন মানুষই তার দীর্ঘ জীবন ও যৌবনে এ ধরণের কাজ থেকে নিশ্চিতভাবে বিরত থাকার সিকিউরিটি দিতে পারে না। আবার কোন মানুষই সন্তস্টচিত্তে সেচ্ছায় এ ধরণের নিষিদ্ধ ও গর্হিত কাজ কতেও পারে না।

এ জন্যই একজন মানুষ যখন নির্দিধায় প্রকাশ্যভাবে এ ধরণের কাজ লোক চক্ষের সামনে করতে পারল তখন তাকে শুধুমাত্র একজন অপরাধী হিসেবে বা পাপকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না। বরং তাকে সমাজে ফিৎনা ফাসাদ সৃস্টিকারী এবং অশ্লীল ও গর্হিত কাজের প্রসারের মাধ্যমে সমাজের মানুষের আখলাক-চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংসকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে তার উপর ইসলামী শরীয়তের সে কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে।

উপর্যুক্ত সমাধানমূলক আলোচনার দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, একজন মুসলমান তথা মুসলমান জাতিকে বুঝতে হবে যে, ইসলামী দন্ডবিধি মানুষের ভয়ভীতি ও আতঙ্ক সৃস্টি করার জন্য আসেনি, বরং ইসলামী বিধান আসবে সমাজে শাস্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য।

আর যখন একজন মুসলিম বা কোন একটি আদিবাসী সমাজ ইসলামিক বিধান বিশেষভাবে মানুষের স্বভাব ও মানুবিক দুর্বলতাবশত যৈবিক তাড়নার কৃত অপরাধের শাস্তির হেকমত ও রহস্য (অর্থাৎ সমাজে অশ্লীলতা প্রসারকারী এবং ফেৎনা ফাসাদকারীকে প্রতিহত করা এবং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বিশেষ করে নিউ জেনারেশনের আখলাক, চরিত্র হেফাজত করা) সম্পর্কে অনুধাবন করতে পাবে। তখন সে বুঝতে পারবে যে, ইসলামী শরীয়তের বিধানসমূহ বিশেষ করে শাস্তি/দন্ডবিধি সমূহ শুধুমাত্র অপরাধীকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য আসেনি। সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষের মাঝে শান্তির আভা ফিরিয়ে আনা এবং তাদের জান মাল ইজ্জত সন্মান আখলাক-চরিত্র ইত্যাদির যথাযথ হেফাজত করা।

উপর্যুক্ত আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রকাশ্যভাবে দিন দুপুর জনসম্মুখে এ ধরণের অশ্লীল ও গর্হিত কাজের কঠোর শাস্তি প্রয়োগের কারণ হচ্ছে কল্যাণের ভিত্তিতে সাধারণ জনগণ ও বিশেষভাবে প্রত্যক্ষদর্শীদের ইজ্জত সন্মান, মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা। আর তাদের কৃত কাজের উপর এ ধরণের কঠোর শাস্তির প্রয়োগই হচ্ছে তাদের এ ধরণের কাজ ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের উপর নিকৃস্টতম প্রভাবকারী জঘন্যতম অপরাধের দলিল। সুতরাং মানুষের সন্মান মর্যাদা ধ্বংসকারী ও মৌলিক অধিকার হরণকারী এবং বিশেষ ভাবে সমাজের দুর্বল শ্রেনী নারী সমাজ ও বালক-বালিকাদের আখলাক চরিত্র বিধ্বংসকারী জঘন্যতম অপরাধ তার চেয়ে নিকৃস্ট ও জঘন্য আর কি হতে পারে। এমন কি অনেক সময় এ ধরণের অপমানজনক অপরাধ সমাজে হিংসা, হানাহানি, বিদ্বেষ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিভিন্ন ধরণের অপরাধের কারণ হতে পারে। এজন্যই আল্লাহ কুরআনে এরশাদ করেন, ׂআর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়োনা। নিশ্চয় এটি অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ׃ (সূরা আল ইমরান: ৩২)। আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, ব্যভিচারকারী নারী এবং পুরুষ তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করলে তাদের প্রতি তোমাদের মনে যেন দয়ার উদেদ্ধগ না হয়। যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখ׃ (সূরা আন নূরঃ ২)।

ইসলামী শরীয়ত এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার গুরזত্বপূর্ণ একটি বৈশিস্ট্য হচ্ছে মানুষের মানবিক স্বাধীনাতার অর্থ ও তাৎপর্য এবং তার পরিধি সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান। আর ইসলামের এ দিক নির্দেশনা বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থার মত নয়। কারণ বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের মানবিক স্বাধীনতার সঠিক অর্থ ও পরিধি এবং সামাজিক নিয়ম নীতি ও ব্যবস্থাপনার সঠিক তাৎপর্য স্হান পায়নি। যার কারণে বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থা মানুষের মানবিক সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে মানুষের সমাজ ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যার বাস্তব চিত্র আমরা অতীতের অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে দেখতে পাই। অথচ প্রাকৃতিক জগত, প্রাণি জগত, জড়জগত ও মানবজগত তথা সৃস্টিজগতের সবকিছুই কিছু মূলনীতি ও সিস্টেমের উপর প্রতিস্ঠিত। আর এ মূলনীতি ও সিস্টেমের রয়েছে কিছু তাৎপর্য, বিধি-বিধান ও তার সীমা-পরিধি সেই সিস্টেম ও মুলনীতি বহির্ভূত নতুন কিছু নয় অতএব সমাজের প্রতিটি মানুষের উচিৎ সমাজের সেই পরিধির আওতায় থেকে সামাজিক নিয়ম নীতি ও বিধি বিধানকে মান্য করে জীবন যাপন করা। অন্যথায় সেই সমাজ অবশ্যই ধ্বংস ও অধঃপতনে পতিত হবে। যার বাস্তব উদাহরণ আমরা মানবিক ও আত্মিক মূল্যহীন বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থার উপর পরিচালিত অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে দেখতে পাই। যেকানে ব্যক্তি পরিবার এবং সমাজে নৈতিক অবয়ের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। যেভাবে ধ্বংস হয়েছে পূর্ববর্তী অনেক জাতি ও সমাজ।

অপরদিকে আমরা দেখতে পাই যে, যে সকল অপরাধ মানুষের মাল-সম্পদ এবং হত্যাকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত যেমন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যাকান্ড ইত্যাদি অপরাধের শাস্তি, মানুষের মানবিক দুর্বলতা ও যৈবিক তাড়নায় কৃত অপরাধের শাস্তির চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। আর তার কারণ হচ্ছে চুরি, ডাকাতি ও হত্যা ইত্যাদি অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ করে সরাসরি অপরাধীকে ঐ ধরণের শাস্তযোগ্য অপরাধ থেকে বিরত রাখা এবং মানুষের জান মালের হেফাজতের জন্য। সমাজে অশ্লীলতা আর গোপনীয়তা প্রকাশ করার জন্য নয়। এ জন্যই চুরি, ডাকাতি ও হত্যাজনিত অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ সাধারণ সরল সোজা মানুষের মনে ভীতি সঞ্ঝা করে না। কারণ সাধারণ সরল সোজা মানুষের অন্তরে কখনও চুরি, ডাকাতি ও অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা এবং নিস্পাপ মানুষকে হত্যা করার ইচ্ছা ও কল্পনা থাকে না। কিন্তু সাধারণ সরল সোজা মানুষের মনে সাধারণত: এ ভয় ও আতঙ্ক সবসময়ই থাকে যে, যেকোন সময় তার মাল-সম্পদ চুরি বা ডাকাতি হয়ে যেতে পারে এবং যেকোন সময় তার উপর কেউ আক্রমন করে বসতে পারে। এ জন্যই যখন চুরি, ডাকাতি বা ইত্যাদির শাস্তি প্রয়োগ করা হয় তখন সে তার পক্ষে সাড়া দেয়। কারণ তাতে মানুষের জান-মাল ও সম্পদের নিরাত্তা হয় এবং সমাজে শান্তি প্রতিস্ঠা হয়।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )