আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
আখিরাতের জীবন চিত্র প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী   
Tuesday, 05 August 2008
আর্টিকেল সূচি
আখিরাতের জীবন চিত্র
আখিরাতের জীবন পূর্ব নির্ধারিত
মানুষ কর্মফল অনুসারে তিন দলে বিভক্ত হবে
জাহান্নামের ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর


মানুষ কর্মফল অনুসারে তিন দলে বিভক্ত হবে



হাশরের ময়দানে বিচারের দিনে মানুষের কর্মফল অনুযায়ী তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। আল্লাহর আদালতের সামনে থাকবে একটি দল। ডান পাশে থাকবে একটি দল। বাম পাশে থাকবে একটি দল। পবিত্র কোরআন শরীফে এর একটা সুন্দর চিত্র দেখানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন তোমরা তিনটি দলে বিভক্ত হবে। ডান পাশের দল। এ দলটির কথা কি বলবো? “বাম পাশের আরেকটি দল। এ দলটির দূর্ভাগ্যের কথা কি বলা যায় ? আরেকটি দল হলো অগ্রবর্তী (বা সামনের) দল। এটা হলো সেই দল, যাদের মর্যাদা সর্বোচ্চে। তারাই তো সান্নিধ্যশালী লোক। তারা নেয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে অবস্থান ও বসবাস করবে। পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে বেশী সংখ্যক হবে। আর পরবর্তী লোকদের মধ্যে কম সংখ্যক হবে। (সূরা ওয়াকেয়া ৭-১৪)
সামনের দলে তাঁরাই অবস্থান করবে যারা পৃথিবীতে আল্লাহও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় যাবতীয় বিপদ মুসিবত হাসি মুখে বরণ করেছেন। ইসলামী বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে যারা সবচেয়ে বেশী যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ডাকে যারা সবার আগে সাড়া দিয়েছেন।
সত্য বলার ক্ষেত্রে, দানের ক্ষেত্রে, মানুষের সেবা করার ক্ষেত্রে, অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ক্ষেত্রে, ইসলামী বিধি বিধান সমাজে-দেশে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম করার ক্ষেত্রে, ইসলামী আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে যারা সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছে, তাঁরাই আল্লাহর আদালতের সামনের আসনে স্থান পাবে। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা হতে একটি হাদিস বর্ণিত আছে যে, একদিন আল্লাহর নবী তাঁর সাহাবাগণকে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জানো কারা কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আল্লাহর (কুদরতের) ছায়ায় স্থান গ্রহণ করবে? সাহাবাগণ বললেন, তারা ওই সমস্ত লোক, যারা কোন প্রশ্ন ছাড়াই মহাসত্যকে গ্রহণ (অর্থাৎ ইসলামকে গ্রহণ করে তা মান্য করে চলে) করে। তারা নিজেদের জন্যে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অন্যের ক্ষেত্রেও সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পবিত্র কোরআনে সূরা ওয়াকিয়ায় এই অগ্রবর্তী দল সম্পর্কে সূরা ওয়াকেয়ায় বলা হয়েছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তারা বালিশে হেলান দিয়ে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে মহামূল্যবান সিংহাসনে বসবে তাদের আশে পাশে চির কিশোরের দল ঘুরে ফিরে আনন্দ পরিবেশন করবে তাদের হাতে থাকবে পানীয় পাত্র। পান পাত্র ও ঝর্ণা থেকে আনা পরিশুদ্ধ সূরা ভরা পেয়ালা। এ সুরা পান করে না  মাথা ঘুরবে না জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাবে। এবং চির কিশোরেরা তাদের সামনে পরিবেশন করবে বিভিন্ন উপাদেয় ফলমূল, যেন তার মধ্যে যা মন চায় তা তারা গ্রহণ করতে পারে। উপরন্তু তাদের কাছে পরিবেশন করা হবে বিভিন্ন পাখীর সুস্বাদু গোশ্‌ত। ইচ্ছা অনুযায়ী তারা তা খাবে। তাদের জন্যে নির্ধারিত থাকবে সুন্দর চক্ষু বিশিষ্ট অপরূপ অপসরী। তাদের সৌন্দর্য হবে সযত্নে রক্ষিত মণি-মুক্তার ন্যায়। পূণ্যফল হিসেবে তারা তা লাভ করবে সে সব সৎকাজের বিনিময়ে যা তারা পৃথিবীতে করেছে। সেখানে তারা শুনতে পাবে না কোন অনর্থক বাজে গালগল্প। অথবা কোন পাপ চর্চা অসদালাপ। তাদের কথাবার্তা আলাপ আলোচনা হবে শালীনতাপূর্ণ। থাকবেনা তার মধ্যে কোন প্রগলভতা। তাদেরকে শুধু, এই বলে সম্মোধন করা হবে, আপনাদের প্রতি সালাম। (সূরা ওয়াকিয়া)
এই সূরায় যে অল্প বয়স্ক বালক বা চির কিশোরদের কথা বলা হয়েছে তারা অনন্তকাল ধরে এমনি কিশোরই থাকবে। তারা কোন দিনই যৌবন লাভ করবেনা বা বৃদ্ধ হবে না। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ও হযরত হাসান বসরী (রাহঃ) বলেন যে, এরা ওই সমস্ত বালক যারা সাবালক হবার পূবেই ইন্তেকাল করেছিল। এদের কোন পাপ-পূণ্য ছিল না। এরা কোন শাস্তিও পাবেনা।
এসব চির কিশোররা এমন সব লোকের সন্তান হবে যারা জান্নাতে যাবার যোগ্যতা অর্জন করেনি। কেননা জান্নাতবাসীদের নি্‌ৗ৬৩৭৪৩;াপ সন্তান সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন- তাদের সন্তানদেরকে তাদের সঙ্গে জান্নাতে মিলিত করবেন। জান্নাতবাসীদের নি্‌ৗ৬৩৭৪৩;াপ সন্তানগণই শুধু নয়-  তাদের বয়ষ্ক সন্তানদের মধ্যে যারা জান্নাতে যাবে তাদেরকেও মাতা-পিতার সঙ্গে জান্নাতে একত্রে বসবাসের সুযোগ দেয়া হবে। (সূরা তুর-২১)
হাশরের ময়দানে আল্লাহর আদালতের ডান পাশের দল সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ঘোষণা করছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এরা লাভ করবে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছায়াযুক্ত কন্টকহীন কুল ও ফলবাগান আর সর্বদা প্রবাহিত পানির ঝর্ণাধারা ও অফুরন্ত ফলমূল। এ সকল ফলমূল সকল মৌসুমেই পর্যাপ্ত পরিমানে পাওয়া যাবে এবং তা লাভ করবে ও তার স্বাদ লাভ করতে কোন বাধা বিপত্তি থাকবে না। তারা উচ্চ আসনে সমাসীন থাকবে। তাদের স্ত্রীদেরকে নতুন করে গঠন করা হবে। তাদেরকে কুমারী বানিয়ে দেয়া হবে। তারা হবে প্রেমদায়িনী। তাদের বয়স হবে সৌন্দর্য পরিষ্ফুটিত হবার বয়স। এ সবকিছু ডান পাশের মানুষের জন্যে। (সূরা ওয়াকেয়া, ২৭-৩৮)

সেদিন আল্লাহই মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন

মাহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনএ গোটা বিশ্বজগতের স্রষ্টা। এই বিশ্বে বা এর বাইরেও যা কিছু রয়েছে, সেসব কিছুরই একমাত্র মালিক তিনি। আখিরাতের ময়দানেরও মহান মালিক তিনিই। পরকালে কার ব্যাপারে তিনি কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন-সে ক্ষমতা শুধু তারই। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন (কিয়ামতের দিন) একচ্ছত্র ক্ষমতা শুধু মহান আল্লাহর। তিনিই মানুষের ভবিষ্যত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। (সূরা হজ্ব-৫৬)
অর্থাৎ হাশরের ময়দানে শতশত কোটি মানুষের বিচার কার্য পরিচালনার জন্যে, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্যে, কারো কোন সাহায্য বা কারো কোন পরামর্শের প্রয়োজন আল্লাহর নেই। তিনি নিজেই স্বয়ং সম্পূর্ণ এবং সর্বজ্ঞ। প্রতিটি মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন কর্মকান্ড সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন তদুপরি ন্যায় ও ইনছাফ প্রদর্শনের জন্য মানুষের প্রতিটি প্রকাশ্য ও গোপন কর্ম পুংখানুপুংখরূপে তাঁর নি্‌ৗ৬৩৭৪৩;াপ ফেরেশতাগণ সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে আমলনামায় রেকর্ড বানিয়ে রেখেছেন।
এ আমলনামা ফেরেশ্‌তাগণ লেখেন। তাদের কোন ভুল হয় না। ভুল-ভ্রান্তি ও পাপ করার প্রবণতা তাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাই বলে মহান আল্লাহ ফেরেশতা কর্তৃক লিখিত আমলনামার উপরে নির্ভরশীল নন। কারণ ফেরেশতাগণ অদৃশ্যে কি ঘটছে, মানুষ কি চিন্তা করে, ইশারা ইঙ্গিতে পরস্পরে কি বলে, এসব তারা জানতে পারেন না। মানুষ ভবিষ্যতে কি করবে, সে সম্পর্কে ফেরেশতাদের জ্ঞান নেই। কিন্তু আল্লাহর নিকট বর্তমান, ভবিষ্যত ও অতীত বলে কিছু নেই। মানুষ ভবিষ্যতে কি করবে তার বর্তমানরূপ তার সামনে উপস্থিত থাকে।
সুতরাং, ফেরেশ্‌তাদের লিখিত আমলনামা ছাড়াই তিনি তার সঠিক জ্ঞান দ্বারা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম। কিন্তু ন্যায় ও ইনছাফের দৃষ্টিতে এবং  মানুষের বিশ্বাসের জন্যে আমলনামা লেখার ব্যবস্থা তিনি করেছেন। অন্য আল্লাহর উপর প্রভাব বিস্তার করবে, সুপারিশ করে আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পারবে এ ধরনের বিশ্বাস যারা মনে স্থান দেবে তারা আর যা-ই হোক অবশ্যই মুসলমান নয়। সুতরাং বিচারের দিনে কোন পীর, ওলী, মাওলানার পরামর্শ বা সুপারিশ গ্রহণ করার কোন প্রয়োজন আল্লাহর নেই।

সেদিন কারো সুপারিশ করার অধিকার থাকবে না

মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন (হাশরের দিন) আসার পূর্বে-যেদিন না লেন-দেন হবে, না বন্ধুত্ব উপকারে আসবে, আর না চলবে কোন সুপারিশ। (সূরা বাক্কারাহ্‌-২৫৪)
সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
কে এমন আছে যে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তাঁর দরবারে সুপারিশ করতে পারে? (সূরা বাকারা)
কিন্তু পৃথিবীতে কিছু সংখ্যক মানুষের ধারণা এবং বিশ্বাস যে, এমন কিছু পীর, মাওলানা, ওলী আছেন যাঁরা হাশরের ময়াদানে তাদের জন্যে আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের সুপারিশ অনুযায়ী তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতে পাঠাবেন। যারা বিশ্বাস করে অমুক ‘বাবা’ অমুক ‘পীর’ অমুক ‘ওলী’ কিয়ামতের ময়দানে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে, তারা আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করার চেয়ে তথাকথিত ‘সুপারিশ কারীদের’ কাছে বেশী ধর্না দেয়। কারণ তারা মনে করে ওই ব্যক্তি আল্লাহর খুব কাছের, আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি, আল্লাহর উপর ওই ব্যক্তির সাংঘাতিক প্রভাব। এই ধরণের বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে এক শ্রেণীর মানুষ নিজের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে পৃথিবীর ভোগ-বিলাস থেকে দূরে সরে আল্লাহর আইন মেনে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পরিবর্তে- ওই সমস্ত মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্যে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে, যাদেরকে তারা সুপারিশকারী হিসেবে বিশ্বাস করে। তাদের সন্তুষ্টির জন্যে নযর নিয়ায দান করা, তাদের নামে গরু, খাসী, মুরগী, নগদ টাকা মানত করা, তাদের কবরে ফুল, মিষ্টি, গোলাপ পানি, মোমবাতি, আগরবাতি, কবরে শায়িত ব্যক্তির নামে ওরশ করা-নিজেরা এগুলো অতি উৎসাহের সাথে করে এবং অপরকেও করতে উঃসাহ দান করে। তাদের বিশ্বাস এসব করলে তিনি হাশরের মাঠে তার জন্য সুপারিশ করবেন।
আল্লাহর দেয়া বিধান ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও দৃঢ় বিশ্বাসের অভাবেই এক শ্রেণীর মানুষ ওই ধরণের ভুল করে থাকে। কিছু মানুষের ধারণা মৃত্যুর পরে যদি সত্যই কোন জীবন থেকেই থাকে, তাহলে সে জীবনে সহজে মুক্তি পাবার উপায় কি? এ প্রশ্ন যখন তাদের মনে জাগে তখন শয়তান এসে কুমন্ত্রণা দেয়, ‘অমুক মাজারে গিয়ে সেজদা দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করো। তিনি পরকালে তোমার জন্যে সুপারিশ বা শাফায়াত করবেন।’
শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুযায়ী তারা দল বেঁধে আল্লাহর ওলীদের মাজারে গিয়ে এমন ভক্তি শ্রদ্ধা ও আবেদন নিবেদন জানায়, যে আবেদন নিবেদন জানানো উচিত ছিল মহান আল্লাহর দরবারে। ওই হতভাগা মানুষগুলো একথা বুঝতে চায় না, তাদের আবেদন-নিবেদন কবরের ওই মানুষটি শুনতে পারছে না। শুধু তাই নয় কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ যখন তার ওলীদের জানিয়ে দেবেন, ‘তোমাদের মাযারকে কেন্দ্র করে ওই মানুষগুলো এই এই কাজ করেছে।’ তখন ওলীগণ ওই হতভাগাদের আচরণের কারণে চরম অসন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহকে বাদ দিয়ে যারা জীবিত অথবা মৃত মানুষকে নিজের প্রভু বানিয়ে নেয় অথবা তাদেরকে আল্লাহর শরীক বানায় তাদের জন্যে অভিশাপ ছাড়া কোন বুজুর্গ-ওলীর পক্ষ থেকে দোয়া বা সুপারিশের আশা করা সম্পুর্ণ অসম্ভব।
বর্তমান পৃথিবীতে কিছু মানুষ তাদের দরবারে যাতায়াত করে তাদের মধ্যে ওই শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই বেশী- সমাজে যারা অসৎ হিসেবে চিহ্নিত। এই অসৎ দুষ্কৃতিকারী মানুষগুলো প্রকৃত ইসলামের অনুসারী না হয়ে ছুটে যায় এক শ্রেণীর পীরদের দরবারে বা মাজারে। তাদের বিশ্বাস পরকালে তার পীর সাহেব আল্লাহর দরবারে তাদের জন্যে সুপারিশ করে তাদের নাজাতের ব্যবস্থা করে দেবেন। এ আশায় তারা তাদের পীর সাহেবকে নানা ধরণের মূল্যবান উপহার দিয়ে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে। একথা অবশ্যই সত্য যে, কিয়ামতের ময়দানে মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে যে সমস্ত ব্যক্তিগণকে শাফায়াত বা সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন-তারা অবশ্যই ও সমস্ত মানুষ, পৃথিবীতে জীবিত থাকতে যারা নবী এবং তার সাহাবাগণের ন্যায় জীবন-যাপন করেছেন- এরা আল্লাহর ওয়াদা অনুসারে জান্নাতি হবেন। পক্ষান্তরে কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তির নিজেরই মুক্তির কোন আশা নেই, সেই ব্যক্তি আরেকজনের জন্যে সুপরিশ করার সৌভাগ্য লাভ করবে কি করে? সত্যিকারের যারা পীর, যারা ওলী তাদের জীবন-যাপনের ধরণ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাহাবাগণের ন্যায়। তারা সর্বদা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন। সত্যিকারের পীর-ওলী জেল-জুলুম পরোয়া করেন না। কোন দৃষ্কৃতিকারী, সূদখোর, ঘুষখোর, কালোবাজারি, জ্বেনাকার মদ্যপ পীর-ওলীদের বন্ধু হতে পারে না। কিয়ামতের দিন দুষ্কৃতিকারী অসৎ লোকদের কোন বন্ধুও থাকবে না, কোন সুপারিশকারীও থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
অন্যায় আচরণকারীদের জন্যে (হাশরের দিন) কোন অন্তরঙ্গ বন্ধুও থাকবে না এবং থাকবেনা কোন সুপারিশকারী যার কথা শুনা যাবে। (সূরা মুমিন-১৮)
বর্তমানে কিছু সংখ্যক নামধারী তথাকথিত পীর-ওলীদের দরবারে ওই সমস্ত দুষ্কৃতিকারীদের দেখা যায়-যারা প্রচুর কালোটাকার মালিক। এই তথাকথিত পীরগণ ওই দুষ্কৃতিকারীগণের চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা না করে তাদের কাছ থেকে শুধু নয়রানাই গ্রহণ করে। এদের নিজেদের নাজাত তো মিলবেইনা বরং অপরাধী ও দুষ্কৃতিকারীদের প্রশ্রয় দেয়ার কারণে পরকালে শাস্তিরযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই ধরণের ভন্ড অর্থলোভী পীর, মাওলানাদের সম্পর্কে সূরা বাকারার ১৬৬-১৬৭ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
(কিয়ামতের দিন) ওই সব ব্যক্তি পৃথিবীতে যাদেরকে অনুসরণ করা হতো, (তারা) তাদের অনুসারীদের সাথে কোন সম্পর্ক নেই বলে ঘোষণা করবে কিন্তু তারা অবশ্যই শাস্তি পাবে এবং তাদের মধ্যকার সব ধরণের সম্পর্ক ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পৃথিবীতে যারা এসব ব্যক্তিদের অনুসরণ করেছিল তারা বলবে হায়রে, যদি পৃথিবীতে আমাদেরকে একটিবার সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে আজ যেভাবে এরা আমাদের প্রতি তাদের অসন্তোষ ও বিরক্তি প্রকাশ করছে, আমরাও তাদের প্রতি আমাদের  বিরক্তি দেখিয়ে দিতাম। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে তাদের কৃত কর্মকান্ড এভাবে উপস্থিত করবেন যে, তারা দুঃখ ও অনুশোচনায় কাতর হয়ে পড়বে। কিন্তু জাহান্নামের আগুন থেকে তারা বের হবার পথ পাবে না। (সূরা বাকারা)
পূর্ববর্তী উম্মতের ধর্মীয় নেতাগণ অর্থ উপার্জনের লোভে মানুষকে ধর্মের নামে আল্লাহ-রাসূলের পথ থেকে বহু দূরে নিয়ে যেত। তারা নিজেদের মুরীদদেরকে সত্যিকারের মুক্তির পথ না দেখিয়ে মুরীদদের কাছ থেকে নয়র-নেয়াজ গ্রহণ করে নিজেদের মনগড়া পথে পরিচালিত করতো। সূরা তওবায় এ ধরনের পীর, দরবেশ আলেমদের সম্পর্কে সূরা তওবার ৩৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
(আহলে কিতাবদের) অধিকাংশ আলেম, পীর, দরবেশ-অবৈধ উপায়ে মানুষের অর্থ-সম্পদ ভক্ষণ করে এবং তাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে রাখে। (সূরা তাওবা)
এসব অর্থলোভী পথভ্রষ্ট পীর, আলেম নামধারী যালেমগণ তাদের ধর্মীয় সিংহাসনে বসে ফতোয়া বিক্রি করে। তারা সত্যিকারের দ্বিনদার, পহেজগার আলেম, ওলামা, পীর, মাশায়েখদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়। এদেরই কারণে সত্যিকারের পীরগণ সমাজে মর্যাদা পায় না। কিয়ামতের ময়দানে সুপারিশ বা শাফায়াত সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা দূর করে কোরআন ও হাদীস প্রকৃত ঘটনা মানুষের সামনে পেশ করেছে। সেদিন সবচেয়ে বড় সুপারিশকারী হবেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব, মানুষের মুক্তির দিশারী, নবী সম্রাট, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি জনাবে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেও কিছু নেক মানুষ অন্যের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি লাভ করবে। এই সুপারিশ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। যারা সুপারিশ করার অনুমতি লাভ করবে- তারা হলো ওই সমস্ত ব্যক্তি, যারা পৃথিবীতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির জন্যে চরম কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণা, সহ্য করেও ইসলামের আদেশ-নিষেধ পালনে সদাসর্বদা তৎপর ছিলেন। তারা আল্লাহর নিকট কোন অন্যায় আবদার করবেন না। কোন দুষ্কৃতিকারীর জন্যে তারা সুপরিশ করবেন না। সুপারিশ তাদের জন্যেই করবেন- পৃথিবীতে যারা ইসলামের আদেশ-নিষেধ পালন করে চলেছে বটে কিন্তু সামান্য ভুল ভ্রান্তিও করেছেন। তবুও শাফায়াতের পুরো ব্যাপারটা মহান আল্লাহর মর্জি মোতাবেক হবে।

শাফায়াতের সমগ্র ব্যাপারটি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকবে

পবিত্র কোরআনে সূরা যুমার-এর ৪৪ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
(হে রাসূল) বলে দিন, শাফায়াতের সমগ্র ব্যাপারটি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। (সূরা যুমার)
মহান আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কারো জন্য শাফায়াত করতে পারবে না। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তাঁর অনুমতি ব্যতিত কে তাঁর নিকট শাফায়াত করবে? (সূরা বাক্কারাহ-২৫৫)
যে ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ অন্য কাউকে শাফায়াত করার অনুমতি প্রদান করবেন, সে ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি নিজ ইচ্ছে মতো শাফায়াত করা দূরে থাক- আল্লাহর সামনে মুখ খুলতেই পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যাদের উপর আল্লাহ খুশী হয়েছেন  তারা ব্যতিত আর কারো জন্যে শাফায়াত করা যাবে না। (সূরা আম্বিয়া-২৮)
সুপারিশকারী যা সুপারিশ করবে তা হবে সকল বিচারে সত্য ও ন্যায় সঙ্গত। সূরা আন্‌ নাবা-এর ৩৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
করুণাময় আল্লাহ রব্বুল আলামীন যাদেরকে অনুমতি দিবেন তারা ব্যতিত আর কেউ কোন কথা বলতে পারবেনা এবং তারা যা কিছু বলবে তা ঠিক ঠিক বলবে। (সূরা নাবা)
যারা সুপারিশ করার অনুমতি লাভ করবে তারা নির্দিষ্ট শর্ত অর্থাৎ সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে একটা সীমারেখার ভেতরে সুপারিশ করবে। আর এই সুপারিশের ধরণ সাধারণ কোন সুপারিশের মতো হবে না। আল্লাহর নিকট সুপারিশের ধরনও হবে ইবাদত ও বন্দেগীর ন্যায়। মানুষ আল্লাহর কাছে যে পদ্ধতিতে নিজের পাপের ক্ষমা চায় অর্থাৎ কান্নাকাটি, অনুনয়-বিনয় এবং অত্যন্ত দীনহীন ভঙ্গিতে-তেমনি ভঙ্গিতে শাফায়াতকারী শাফায়াত করবে। তবে শাফায়াতের এই ধরণ আল্লাহর রাসূলের জন্য প্রজোয্য নয়। কারণ তার মর্যাদা আল্লাহর নিকট সবেচেয়ে বেশী। তিনি কি ভঙ্গীতে আল্লাহর দরবারে উম্মতের জন্য শাফায়াত করবেন সেটা আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় বন্ধু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যেকার ব্যাপার। যিনি সুপারিশ করবেন তার মনে কখনো এ ধারণা জন্মাবেনা যে, তাঁর সুপারিশের কারণে আল্লাহ তার নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। পরম মেহেরবান আল্লাহর অনুগ্রহসূচক অনুমতি পাবার পরে সুপারিশকারী অত্যন্ত দীনতা, হীনতা ও বিনয় সহকারে অনুনয় করে বলবে, ‘হে দুনিয়া ও আখিয়াতের মহান মালিক আল্লাহ! তুমি তোমার অমুক বান্দাহর গুনাহ ও ভুল ক্রুটি-বিচূতি ক্ষমা করে দাও। তাকে তোমার অনুগ্রহ ও রহমত দান করে ধন্য করো।’
সুতরাং সুপারিশ করার অনুমতিদানকারী যেমন আল্লাহ তেমনি তা কবুলকারীও আল্লাহ। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত তাদের জন্যে না আর কেউ ওলী বা অভিভাবক আছে, আর না কেউ শাফায়াতকারী। (সূরা আনয়াম-৫১)
শাফায়াতকারী তারাই হবেন যারা আল্লাহর অতি প্রিয়। আর যাদের জন্যে শাফায়াত করা হবে তাদের পাপের অবস্থা এই যে, পাপ ও নেকীর ক্ষেত্রে তাদের পাপ সামান্য বেশী। অর্থাৎ ক্ষমা পেয়েও যেন ক্ষমা না পাওয়ার অবস্থা, ক্ষমার যোগ্যতা লাভে সামান্য অভাব। এই অভাবটুকু পুরণের জন্যেই মহান মালিক আল্লাহর রাব্বুল আলামীন অনুগ্রহ করে তাদের জন্যে শাফায়াত করার অনুমতি দান করবেন। সুতরাং একথা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, কারো ইচ্ছে অনুযায়ী কেউ কারো পক্ষে সুপারিশ করতে পারবে না। যাদের জন্য সুপারিশ করা হবে তাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে ক্ষমা করে দেয়ার উদ্দেশ্যেই কাউকে সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করবেন। এখানে একটা প্রশ্ন জাগে, সুপারিশ করার অনুমতিদান করবেন আল্লাহ, আবার তা কবুলও করবেন তিনি। তাহলে সুপারিশকারী নিয়োগ করার যুক্তিটা কী? এর জবাব অত্যন্ত স্পষ্ট। কিয়ামতের ময়দানে সেই মুসিবতের দিনে, যে মুসবিতের মহাবিভিষীকা দেখে সাধারণ মানুষের অবস্থা যে কি হবে তা কল্পনারও বাইরে-স্বয়ং কোন কোন নবীগণও ভয়ে কাঁপতে থাকবেন এবং আল্লাহর সামনে কোন কথা বলার সাহস পাবেন না। সেই অবস্থায় আল্লাহ তার কিছু প্রিয় বান্দাহদেরকে শাফায়াত করার অনুমতি প্রদান করে তাদের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করবেন। এই মর্যাদার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্থান পাবার অধিকারী হবেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তবে এ কথাও সত্য-মানুষ আল্লাহর বিধান মেনে চললেই যে, সে কিয়ামতের ময়দানে জান্নাত পাবে এ ধারণা করা উচিত নয়। বরং মনের আকাংখা এটাই হওয়া উচিত, ‘জান্নাতের লোভ নেই জাহান্নামেরও ভয় নেই-চাই শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি।’ সুতরাং, আল্লাহর রহমত ছাড়া মুক্তি পাওয়া যাবে না। সূরা নাবা-এর ৩৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন সকল আত্মা ও ফেরেশতাগণ কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়াবে কেউ কোন  কথা বলবেনা সে  ব্যতীত, যাকে পরম করুণাময় অনুমতি দিবেন। এবং যথাযথ ও সঠিক কথা সে বলবে। (সূরা নাবা)

বিচার দিবস হিসাব গ্রহণ ও প্রতিফল লাভের দিন

কিভাবে সেই বিচার দিবস সংঘটিত হবে এবং তোমরা তখন কি বলবে শোন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
শুধুমাত্র একটি বিকট ধমক দেয়া হবে এবং সহসাই এরা নিজের চোখে (পরকালের ঘটনাসমূহ) দেখতে থাকবে। সে সময় এরা বলবে, হায় ! আমাদের দুর্ভাগ্য, এতো প্রতিফল দিবস- ‘এটা সে ফায়সালার দিন যাকে তোমরা মিথ্যা বলতে’। (আস্‌ সা-ফ্‌ফাত-১৯-২১)
পৃথিবীতে মানুষ যেভাবে ঘুমিয়ে থাকে, মৃত মানুষগুলো সেই অবস্থাতেই থাকবে। মহান আল্লাহর আদেশে এমন ধরনের ভয়াবহ শব্দ করা হবে যে, সমস্ত মানুষগুলো একযোগে উত্থিত হবে। সমস্ত ঘটনাবলী তারা নিজেদের চোখে যখন দেখবে, তখন আর সন্দেহ থাকবে না যে, এটাই সেই দিন, যেদিনের কথা নবী-রাসূল, আলেম-ওলামা পৃথিবীতে বলেছে। তখন তারা পরস্পরে বলবে অথবা নিজেদেরকেই শোনাবে, এই দিনটি সম্পর্কে তোমরা মিথ্যা ধারণা পোষণ করতে। কত বড় হতভাগা তোমরা, যে পূঁজি থাকলে আজকের এই দিনে মুক্তিলাভ করা যেতো, সে পূঁজি তো আমাদের নেই।
উল্লেখিত আয়াতেও ‘ইয়াও মুদ্দিন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং যার অর্থ প্রতিফল দিবস। ইবলিস শয়তান যখন আল্লাহর আদেশ পালন না করে বিতর্ক করেছিল, তখন আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বলেছিলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
প্রতিদান দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি আমার অভিশাপ। (সূরা সা-দ- ৭৮)
এ আয়াতেও ইয়াও মিদ্দীন শব্দ ব্যবহার করে প্রতিদান দিবসকেই বুঝানো হয়েছে। সূরা ইনফিতারে তিনটি আয়াতে ঐ একই শব্দ ব্যবহার করে বিচার দিবস তথা প্রতিফল দিবসকে বুঝানো হয়েছে। বিচার দিবসে বিদ্রোহীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং সেখান থেকে তারা মুহূর্ত কালের জন্যও বের হতে পারবে না। ঐ দিনটির গুরুত্ব বুঝানোর জন্য আল্লাহ তা’য়ালা প্রশ্নাকারে বলেছেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
বিচারের দিন তারা তাতে (জাহান্নামে) প্রবেশ করবে এবং জাহান্নাম থেকে কক্ষণই অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। আর তুমি কি জানো, সেই বিচারের দিনটি কি? আবার (প্রশ্ন করি) তুমি কি জানো সেই বিচারের দিনটি কি? সেটা ঐ দিন, যখন কারো জন্য কিছু করার সাধ্য কারো থাকবে না। সেদিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই ইখতিয়ারে থাকবে। (সূরা ইনফিতার-১৫-১৯)

সবাই সেদিন কৃতকর্মের বিনিময় লাভ করবে

পৃথিবীতে মানুষের অবস্থা হলো, এদের মধ্যে অনেকে গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করে। অর্থ, ক্ষমতা আর প্রভাব-প্রতিপত্তির ফলে অপরাধ করেও সমাজে সম্মান ও মর্যাদার আসন দখল করে বসে থাকে। বিচার পর্বের কাজে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে। ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে সুপারিশ করিয়ে জেল-জরিমানা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু বিচার দিবসে কেউ কারো পক্ষে সুপারিশ করার চিন্তাও করতে পারবে না। পরিস্থিতি এমনই ভয়াবহ আকার ধারণ করবে যে, প্রতিটি মানুষ নিজের চিন্তায় উন্মাদের মতই হয়ে পড়বে। ঘটনার আকস্মিকতা আর আসন্ন বিপদের গুরুত্ব অনুধাবন করে মানুষ মাতালের মতই হয়ে পড়বে। পৃথিবীতে যে একান্ত আপনজন ছিল, যাকে এক মুহূর্ত না দেখে থাকা যায়নি, তার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও সে অনুভব করবে না। নিজে পৃথিবীতে যা করেছিল, তার কি ধরনের প্রতিফল সে লাভ করতে যাচ্ছে, এ চিন্তাতেই সে বিভোর হয়ে থাকবে আর মনে মনে বলতে থাকবে, আজকের এদিনটি যদি কখনো না হতো- তাহলে কতই না ভালো হতো। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন নিশ্চয়ই আসবে, যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের কৃতকর্মের বিনিময় লাভ করবে, সে ভালো কাজই করুক আর মন্দ কাজই করুক। সেদিন প্রত্যেকেই এই কামনা করবে যে, এই দিনটি যদি তার কাছ থেকে বহুদূরে অবস্থান করতো, তাহলে কতই না ভালো হতো। (সূরা আল ইমরাণ-৩০)
অবিশ্বাসীরা বিচার দিবস সম্পর্কে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে। এরা বলে বিচার দিবস হবে কি হবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং সন্দেহপূর্ণ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নিজেকে বঞ্চিত করো না। সামনে যেভাবে যা আসছে, যা পাচ্ছো, তা ভোগ করে নাও। বিচার দিবসে এদেরকে যখন উঠানো হবে এবং যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, সে সম্পর্কে এরা কোনদিন কল্পনাও করেনি। অকল্পিত বিষয় যখন বাস্তবে দেখতে পাবে, তখন এরা নিজেদের নিকৃষ্ট পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করে তা থেকে মুক্তি লাভের আশায় কি করবে, এ সম্পর্কে সূরা যুমার-এ মহান আল্লাহ বলছেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এসব জালিমদের কাছে যদি পৃথিবীর সমস্ত সম্পদরাজি এবং তাছাড়াও আরো অতটা সম্পদ থাকে তাহলে কিয়ামতের ভীষণ আযাব থেকে বাঁচার জন্য তারা মুক্তিপণ হিসাবে সমস্ত সম্পদ দিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। সেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু তাদের সামনে আসবে যা তারা কোনদিন অনুমানও করেনি। সেখানে তাদের সামনে নিজেদের কৃতকর্মের সমস্ত মন্দ ফলাফল প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর যে জিনিস সম্পর্কে তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতো তা-ই তাদের ওপরে চেপে  বসবে। (সূরা যুমার)
বিচার দিবসের অপরিহার্যতা সম্পর্কে আল্লাহর কোরআন অসংখ্য যুক্তি উপস্থাপন করেছে। এমন একটি সময় অবশ্যই আসা উচিত যখন জালিমদেরকে তাদের জুলুমের এবং সৎ কর্মশীলদেরকে তাদের সৎকাজের প্রতিদান দেয়া হবে। যে সৎকাজ করবে সে পুরস্কার লাভ করবে এবং যে অসৎকাজ করবে সে শাস্তি লাভ করবে। সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি এটা চায় এবং এটা ইনসাফেরও দাবি। এখন যদি মানুষ দেখে, বর্তমান জীবনে প্রত্যেকটি অসৎলোক তার অসৎকাজের পরিপূর্ণ সাজা পাচ্ছে না এবং প্রত্যেকটি সৎলোক তার সৎকাজের যথার্থ পুরস্কার লাভ করছে না বরং অনেক সময় অসৎকাজ ও সৎকাজের উল্‌টো ফলাফল পাওয়া যায়, তাহলে মানুষকে স্বীকার করে নিতে হবে যে, যুক্তি, বিবেক-বুদ্ধি ও ইনসাফের এ অপরিহার্য দাবি একদিন অবশই পূর্ণ হতে হবে। সেদিনের নামই হচ্ছে বিচার দিবস বা আখিরাত। বরং আখিরাত সংঘটিত না হওয়াই বিবেক ও ইনসাফের বিরোধী। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আর এ কিয়ামত এ জন্য আসবে যে, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে তাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করবেন, তাদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত ও সম্মানজনক রিয্‌ক। আর যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা সাবা-৪-৫)

সেদিন মানুষকে এককভাবে জবাবদিহি করবে

বিচার দিবসে প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহর আদালতে জবাবদিহি করতে হবে। পৃথিবীতে মানুষের কত আপনজন থাকে, শুভাকাংখী থাকে, অসংখ্য পরিচিতজন ও বন্ধু থাকে। একজন বিপদাপন্ন হলে আরেকজন তাকে সাহায্য করতে দৌড়ে আসে। আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে যামিন নিতে গেলে বা হাজিরা দিতে গেলে তার সাথে কেউ না কেউ যায়। কিন্তু আল্লাহর আদালতে সে কাউকে সঙ্গী হিসাবে পাবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকে একাকী জবাবদিহি করতে হবে। তার কৃতকর্মের সাফাই আরেকজন গাইবে, এমনটি সেখানে হবে না। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
(বিচার দিবসের দিন আদালতে আল্লাহ বলবেন) নাও, এখন তোমরা ঠিক তেমনিভাবে একাকীই আমার সামনে উপস্থিত হয়েছো, যেমন আমি তোমাদেরকে প্রথমবার একাকী সৃষ্টি করেছিলাম। তোমাদেরকে আমি পৃথিবীতে যা কিছু দান করেছিলাম, তা সবই তোমরা পিছনে রেখে এসেছো। এখন আমি তোমাদের সাথে সেসব পরামর্শ দাতাগণকেও তো দেখি না, যাদের সম্পর্কে তোমরা ধারণা করেছিলে যে, তোমাদের কার্যোদ্ধারের ব্যাপারে তাদেরও অংশ রয়েছে। তোমাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছে এবং তোমরা যা কিছু ধারণা করতে, তা সবই আজ তোমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছে। (সূরা  আন’আম-৯৪)
পৃথিবীতে মানুষ অসংখ্য সঙ্গী-সাথী জুটিয়ে নেয়। বৈধ-অবৈধ পথে সে সম্পদের পাহাড় রচিত করে তবুও সম্পদ আহরোণের নেশা যায় না। এসব ত্যাগ করে যেতে হবে, সেদিন এসব কোনই কাজে আসবে না। যারা সৎকাজ করেছে অর্থাৎ আল্লাহর বিধান অনুসারে পৃথিবীতে জীবন পরিচালনা করেছে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহকেই রব্ব হিসাবে অনুসরণ করেছে, কেবলমাত্র তাদেরই সঙ্গী হবে তাদের কৃত সৎকাজসমূহ। কোন বিপদ দেখা দিলে বা কোন কামনা-বাসনা পূরণের আশায় মানুষ পীর-দরবেশ-মাজার-ফকিরের কাছে ধর্ণা দিয়ে মনে করতো, এরা তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে, তার মনের কামনা পূরণ করতে পারে, তাকে ধনবান বানিয়ে দিতে সক্ষম, বিচার দিবসে সুপারিশ করতে সক্ষম, সেদিন তারা কেউ কোন সাহায্য করতে পারবে না।
আল্লাহর বিধান থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে যেসব নেতা-নেত্রীরা মানুষকে ভাতের অধিকার, ভোটের অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তির অধিকারের লোভ দেখিয়ে পরামর্শ দিতো যে, তাদেরকে সহযোগিতা করা হোক, যারা এসব প্রতারণামূলক কথাবার্তায় আকৃষ্ট হয়ে ঐসব নেতা-নেত্রীদের পেছনে ছুটেছে, তাদেরকে যখন আল্লাহর আদালতে উপস্থিত করা হবে, তখন আল্লাহ প্রশ্ন করবেন- তোমাদেরকে যারা পরামর্শ দিতো, তাদেরকে তো আজ দেখা যাচ্ছে না। তারা সবাই আজ সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
মানুষ হিসাবে প্রত্যেক ব্যক্তির একটি স্বতন্ত্র নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত পর্যায়ে আল্লাহর সামনে এ জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এ ব্যক্তিগত দায়িত্বের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি তার সাথে অংশীদার নেই। পৃথিবীতে যতই অধিক সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ, বিপুল সংখ্যক জাতি, দল ও গোষ্ঠী বা বিপুল সংখ্যক সংগঠন একটি কাজে বা একটি কর্মপদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করুক না কেন, বিচার দিবসে আল্লাহর আদালতে তাদের এ সমন্বিত কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায়িত্ব পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং তার যা কিছু শাস্তি বা পুরস্কার সে লাভ করবে তা হবে তার সেই কর্মের প্রতিদান- যা করার জন্য সে নিজে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়ী বলে প্রমাণিত হবে। এ ইনসাফের মানদন্ডে অপরের গর্হিত কর্মের বোঝা একজনের ওপর এবং তার গোনাহের বোঝা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোনই সম্ভাবনা থাকবে না। সুতরাং মানুষের জন্য জ্ঞান-বিবেক ও বুদ্ধির পরিচয় হলো এটাই যে, আরেকজন কি করছে সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে নিজের কর্ম কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তার দিকে দৃষ্টি দেয়া। যদি তার মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত দায়িত্বের সঠিক অনুভূতি থাকে, তাহলে অন্যেরা যাই করুকনা কেন, সে নিজের সাফল্যের সাথে আল্লাহর সামনে যে কর্মধারার জবাবদিহি করতে পারবে তার ওপরই অটলভাবে দন্ডায়মান থাকা। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করে, তার সৎপথ অবলম্বন তার নিজের জন্যই কল্যাণকর হয়। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়, তার পথভ্রষ্টতার ধ্বংসকারিতা তার ওপরেই বর্তায়। কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। (সূরা বনী ইসরাঈল- ১৫)
ময়দানে ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এমন কিছু সংখ্যক লোক রয়েছে, যারা মনে করে- ‘আমরা ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত কবুল করে ইসলামের দল ভারী করলাম। কারণ সমাজে আমাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে, লোকজন আমাদেরকে গুরুত্ব দেয়, সম্মান করে, মর্যাদা দেয়।’ এদের মনোভাব এ ধরনের যে, তারা ইসলামী আন্দোলনে শামিল হয়ে যেন ইসলামের প্রতি করুণা করেছে। এরা আন্দোলনে শামিল না হলে, ইসলাম কোনদিনই প্রতিষ্ঠা লাভ করবে না। এ ধরনের চিন্তা-চেতনা নিয়ে যারা ইসলামী আন্দোলনে শামিল হয়, তাদের অনুধাবন করা উচিত- কেউ আল্লাহর রবুবিয়াত কবুল করে ইসলামী আন্দোলনে শামিল হলে, এতে তার নিজেরই কল্যাণ হবে। অন্য কেউ তার কল্যাণে অংশ নিতে পারবে না। সে সৎপথ লাভ করলো, এ জন্য আল্লাহর দরবারে বার বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। কেননা আদালতে আখিরাতে তার ব্যাপারে তাকে একাই জবাবদিহি করতে হবে, অন্য কেউ তার অবস্থা পরিবর্তন করে দিতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন তোমাদের জন্য কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না এবং তোমাদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য চেষ্টাকারীও কেউ থাকবে না। (সূরা আশ শূরা-৪৭)

সেদিন কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হবে না

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যা করছে এবং বলছে, তার সবকিছুই তিনি দেখছেন এবং শুনছেন। তিনি কোন কিছুই ভুলে যাবেন না। হযরত আদম আলাইহিস্‌ সালাম থেকে শুরু করে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত শেষ যে মানুষটি জন্ম নেবে, অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত মানুষের বলা কথা ও কর্ম সম্পর্কে তিনি অবগত থাকবেন। তাঁর জানার ভিত্তিতে তিনি সমস্ত মানুষের বিচার করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। কিন্তু তিনি তা করবেন না- মানুষ যেন নিজের কর্মের রেকর্ড ও চলমান ছবি দেখতে পায়, এ জন্য আল্লাহ তা’য়ালা যখনই কোন মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন, তখন তার সাথে দু’জন ফেরেশ্‌তা নিয়োগ করেন। তাঁরা সেই মানুষের কথা ও কর্মসমূহ রেকর্ড করেন। আল্লাহর প্রতি কোন মানুষ যেন এই অভিযোগ আরোপ না করে যে, তিনি আমার প্রতি জুলুম করেছেন। কারণ মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ- এরা নিজেদের অপকর্মের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় আর দোষ চাপিয়ে দেয় আল্লাহর ওপরে। বিপদ দেখলে আল্লাহকে ডাকতে থাকে আর বিপদ থেকে মুক্তি লাভ করেই তাঁকে ভুলে যায়। এ জন্য মানুষ পৃথিবীর জীবনে যা কিছু করছে তার চলমান ছবি রাখা হচ্ছে, রেকর্ড রাখা হচ্ছে এবং কন্ঠ শব্দও রেকর্ড করা হচ্ছে। বিচার দিবসে চলমান ছবিতে যে যখন দেখতে পাবে, কোথায় কোন অবস্থায় নির্জনে একাকী সে কি ঘটিয়ে ছিল, কবে কোনদিন কাকে কি কথা বলেছিল- তখন তার পক্ষে কোন কিছুই অস্বীকার করা সম্ভব হবে না। সেদিন কি অবস্থার সৃষ্টি হবে মহান আল্লাহ সূরা কাহ্‌ফ-এ তা শোনাচ্ছেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিনের কথা চিন্তা করা প্রয়োজন যেদিন আমি পাহাড়গুলোকে চালিত করবো এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে সম্পূর্ণ অনাবৃত আর আমি সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে এমনভাবে ঘিরে এনে একত্র করবো যে, (পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মধ্য থেকে) একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। এবং সবাইকে তোমার রব-এর সামনে কাতারবন্দী করে পেশ করা হবে। (তখন বিচার দিবসের প্রতি অবিশ্বাসীদেরকে বলা হবে) নাও দেখে  নাও, তোমরা এসে গেছো তো আমার সামনে ঠিক তেমনিভাবে যেমনটি আমি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম! তোমরা তো মনে করেছিলে আমি তোমাদের জন্য কোন প্রতিশ্রুত ক্ষণ নির্ধারিতই করিনি। আর সেদিন আমলনামা সামনে রেখে দেয়া হবে। সে সময় তোমরা দেখবে অপরাধীরা নিজেদের জীবন খাতায় যা লেখা আছে সে জন্য ভীত হচ্ছে এবং তারা বলছে, হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য, এটা কেমন খাতা, আমাদের ছোট বড় এমন কোন কিছুই এখানে লেখা থেকে বাদ পড়েনি। তাদের যে যা কিছু করেছিল সবই নিজের সামনে উপস্থিত পাবে এবং তোমার রব কারো প্রতি জুলুম করবেন না। (সূরা  কাহ্‌ফ-৪৭-৪৯)
হযরত আদম আলাইহিস্‌ সালাম থেকে নিয়ে কিয়ামতের পূর্বে শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত যেসব মানুষ পৃথিবীতে আগমন করবে, তারা মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীর আলো-বাতাসে মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস গ্রহণ করলেও তাদের প্রত্যেককে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে এবং সবাইকে একই সাথে একত্রিত করা হবে। কোথাও কেউ বাদ পড়বে না। পৃথিবীতে পঞ্চাশ বা একশজন মানুষকে একত্রে আসামী করে মামলা দায়ের করা হলে কোর্টে যখন তারা হাজিরা দেয়, তখন অনেক আসামীই উপস্থিত না থেকে অন্য কাউকে আদালতে পাঠিয়ে দেয়। মূল আসামীর পক্ষে আরেকজন হাজিরা দিয়ে আসে। বিচারক প্রত্যেক আসামীর চেহারা চিনে রাখতে পারে না। এ জন্য আসামী এ ধরনের কৌশল করে থাকে। আসামীর নাম ধরে ডাকার সময় মূল আসামীর পরিবর্তে অন্য লোক তার উপস্থিতি জানিয়ে দেয়। মাত্র দশজন বিশজন পঞ্চাশ জন আসামীর হাজিরার ক্ষেত্রে পৃথিবীর মানুষ বিচারককে এভাবে ধোকা দেয়া যায়, কিন্তু বিচার দিবসে আল্লাহর আদালতে এভাবে ধোকা দেয়া যাবে না। সেদিন কত শতকোটি মানুষ যে আল্লাহর আদালতে একত্রে দাঁড়াবে, তা কল্পনাও করা যায় না। কোন একজন মানুষও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে সমর্থ হবে না।
সবাইকে আপন রব আল্লাহ তা’য়ালার সামনে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াতে হবে। পৃথিবীতে যারা বিচার দিবসের প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে সেদিন সম্পর্কে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতো, মৃত্যুর পরে পুনরায় সৃষ্টি করা অসম্ভব বলে ধারণা করতো, তাদেরকে বলা হবে, ‘তোমরা যে বিষয়টির প্রতি অবিশ্বাস করতে, এখন তো দেখলে কিভাবে তা বাস্তবায়িত হলো ! যে বিচার দিবস সম্পর্কে তোমরা তামাশা করতে, তোমাদের সেই তামাশাই আজ রূঢ় বাস্তবে পরিণত হয়েছে সেটা নিজের চোখে দেখে নাও।’

সেদিন আমলনামা প্রদর্শন করা হবে

এরপর ঐসব অবিশ্বাসীদের সামনে সেই কিতাব রাখা হবে, যে কিতাবে তাদের পৃথিবীর জীবনের যাবতীয় ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কোথায় কোনদিন চার দেয়ালের মধ্যে নিভৃত কক্ষে নিজ দলীয় বা বিরোধী দলীয় প্রতিপক্ষকে হত্যা করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিল, কোনদিন কোন মুহূর্তে কোন নারীকে ধর্ষন করেছিল, কি অবস্থায় কোন ব্রান্ডের মদ পান করেছিল, কোন ফাইলে কলমের এক খোঁচা দিয়ে জাতিয় অর্থ আত্মসাৎ করেছিল, নির্দোষ প্রতিপক্ষকে আসামী বানানোর জন্য কোথায় কিভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল, কোন টেবিলে বসে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা রিপোর্ট তৈরী করে পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, এ ধরনের অসংখ্য অপরাধের কোনকিছুই বাদ পড়েনি।
অসংখ্য ক্রাইম রিপোর্ট সম্বলিত নিজের জীবনলিপি দেখে অপরাধীরা আযাব থেকে বাঁচার জন্য সমস্ত কিছু অস্বীকার করে বলবে, এসব কাজ আমরা একটিও করিনি। অপরাধীরা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলবে। তারা তাদের অপরাধ মেনে নিতে অস্বীকার করবে। সাক্ষীদেরকে মিথ্যা বলবে এবং ক্রাইম রিপোর্ট সম্বলিত নিজের জীবনলিপির নির্ভুলতাও মেনে নেবে না। ফেরেশ্‌তাদেরকে দোষারোপ করে বলবে, তারা মনগড়া রিপোর্ট রচিত করেছে, এসবের কোন কিছুই আমাদের দ্বারা ঘটেনি। তারপর সেই চলমান ছবি তাদের সামনে উত্থাপন করা হবে। অপরাধীরা দেখতে থাকবে পৃথিবীতে কোথায় তারা কি করেছিল এবং নিজের কন্ঠ শুনতে থাকবে, কবে কোনদিন কি বলেছিল। এরপর আল্লাহ আদেশ দেবেন, তোমাদের এসব মিথ্যা কথা বন্ধ করো এবং এখন দেখো তোমাদের নিজেদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তোমাদের কৃতকর্মের কি বর্ণনা দেয়।

সেদিন যাবতীয় কর্মকান্ড প্রকাশ করে দেয়া হবে

আল্লাহদ্রোহীদের সমস্ত কার্যকলাপ রেকর্ড করা হচ্ছিলো আর এই রেকর্ড সেদিন তাদেরকে প্রদর্শন করা হবে এবং বলা হবে, এখন মজাটা অনুভব করো। আজ আমি তোমাদের জন্য শাস্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করবো না। মহান আল্লাহ কিয়ামতের পরে বিচারের দিন সম্পর্কে বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
বিচারের দিন তারা সেখানে প্রবেশ করবে এবং সেখান হতে কখনো অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। আর তুমি কি জানো, সেই বিচারের দিনটি কি? পুনরায় বলছি, তুমি কি জানো সেই বিচারের দিনটি কি? এটা সেই দিন, যখন কারো জন্যে কিছু করার সাধ্য থাকবে না। সেদিন ফায়সালার চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ারেই থাকবে। (ইনফিতার-  ১৫-১৯)
পবিত্র কোরআনের সূরা তারিকে বলা হয়েছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন গোপন অজানা তত্ত্ব ও রহস্য সমূহের যাচাই পরখ করা হবে। তখন মানুষের কাছে না নিজের কোন শক্তি থাকবে না কোন সাহায্যকারী তার জন্য আসবে। (আত-তারিক-  ৯-১০)
গোপন অজানা তত্ত্ব বলতে মানুষের কর্মসমূহকে বুঝানো হয়েছে। পৃথিবীতে মানুষের কর্মসমূহ এক গোপন অজানা ব্যাপার। মানুষ প্রকাশ্যে যা করে, তা সবারই দৃষ্টি গোচর হয়। কিন্তু এই মানুষই অন্য মানুষের দৃষ্টির আড়ালে যা করে, সেসব তো কোন মানুষের চোখে পড়ে না। আবার মানুষ প্রাকাশ্যেও এমন অনেক কাজ করে যা দেখে অন্য মানুষ প্রশংসা করে। কিন্তু যে ব্যক্তি ওই প্রশংসামূলক কাজ করলো, ওই কাজের পিছনে যে তার কি উদ্দেশ্য মনোভাব ও নিয়ত গোপন থাকে, যে প্রবণতা, মতলব ও কামনা -বাসনা কাজ করতে থাকে, তার যে গোপন কার্যকারণ নিহিত প্রচ্ছন্ন থাকে, তা অন্য মানুষের নিকট অজানাই রয়ে যায়।
কিন্তু বিচারের দিনে তা সব কিছুই প্রকাশ করে দেয়া হবে। পৃথিবীতে কোন ব্যক্তি কি কাজ করেছে, কিয়ামতের দিন শুধু সেসব কাজের হিসাব ও বিচারই হবে না বরং কি উদ্দেশ্যে, কি স্বার্থে করেছে, কি ইচ্ছা ও মানসিকতা নিয়ে করেছে তারও অত্যন্ত সুক্ষ্ম বিচার ও যাচাই করা হবে। মানুষ পৃথিবীতে এমন অনেক কাজ করে, যে কাজের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া অন্য মানুষের উপর পড়ে, অনেক দূর পর্যন্ত সে কাজের প্রভাব বিস্তার করে, অনেকদিন পর্যন্ত সে প্রভাব বজায় থাকে, তা বহু মানুষের অজানা থাকে এবং স্বয়ং যে ব্যক্তি কাজ করেছে তারও অজানা থেকে যায়। এই অজানা রহস্যও সেদিন সর্বসম্মুখে প্রকাশ করে তা সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্মভাবে যাচাই করা হবে।
একটা উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা স্পষ্ট করা যাক, ধরা যাক এক লেখক এমন একটি অশ্লীল নগ্ন বই লেখে প্রকাশ করলো, যে বইটি পড়ে বহু মানুষ চরিত্র হারালো, বইটা বহু দেশের লোক পড়লো এবং তাদের মধ্যে অনেকেই চরিত্র হারালো। এখন যে  লেখক ওই ধরনের নোংরা বই লিখলো, সে সঠিকভাবে জানতেও পারলো না তার লেখা বই পড়ে কত মানুষ চরিত্র বরবাদ করেছে। কত দূর পর্যন্ত তার ওই নিকৃষ্ট বইয়ের প্রভাব পড়েছে। কত কাল পর্যন্ত ওই জঘন্য বইয়ের কারণে কত মানুষ চরিত্র হারাতে থাকবে। সে কথা লেখকের অজানা রয়ে যায়।
আবার যার যুবক সন্তান ওই নোংরা বই পড়ে চরিত্র হারালো সেই পিতা-মাতাও জানতে পারলো না, কি কারণে তার সন্তান চরিত্র হারালো। কিন্তু বিচারের দিন সমস্ত কিছু প্রকাশ করে দিয়ে তার চুলচেরা বিচার করে উপযুক্ত দন্ড প্রদান করা হবে।

আমলনামা দেখে অপরাধীগণ ভীত সম্ভ্রস্ত হয়ে উঠবে

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা কাহ্‌ফ-এর ৪৯ নং আয়াতে বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আর যখন আমল নামা সম্মুখে রেখে দেয়া হবে, তখন তোমরা দেখবে অপরাধীগণ ভীত সম্ভ্রস্ত হয়ে উঠেছে। আর বলছে, হায়রে আমাদের দুর্ভাগ্য! এটা কেমন বই, আমাদের ছোট বড় এমন কোন কাজ বাদ যায়নি (যা এই বইতে) লেখা হয়নি। তারা যে যা কিছু করেছিল তা সমস্তই নিজের সামনে (লেখা ও ছবিসহ) উপস্থিত দেখতে পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি কোন জুলুম করবেন না। (সূরা কাহ্‌ফ)
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আজ প্রত্যেকটি প্রাণীকেই তার (পৃথিবীতে জীবিত থাকতে) উপার্জনের প্রতিফল দেয়া হবে। আজ কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। আর আল্লাহ অত্যন্ত দ্রুত হিসাব গ্রহণ করবেন। (আল-মু’মিন-  ১৭)
আল্লাহর কোরআনে সূরা যুমারের ৬৯ নং আয়াতে এসেছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
(প্রত্যেকের) আমলনামা (কর্মলিপি) সামনে উপস্থিত করা হবে। নবী রাসূল ও সকল সাক্ষীদেরকে উপস্থিত করা হবে। মানুষদের মধ্যে যথাযথভাবে (সত্য সহকারে) ফয়সালা করে দেয়া হবে। কারো উপর কোন জুলুম করা হবে না। (সূরা যুমার)
এই আয়াতে সাক্ষী বলতে যারা মানুষের মধ্যে নানাভাবে ইসলামের বিধান প্রচার ও প্রসার করেছে তাদেরকে ও সেসব সাক্ষী ও যারা মানুষের কর্মের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবে। এ সমস্ত সাক্ষী শুধু মাত্র মানুষই হবে না, ফেরেশ্‌তা, জ্বিন, অন্যান্য প্রাণীসমূহ, মানুষের নিজের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তথা পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু সাক্ষী প্রদান করবে কিয়ামতের দিন। পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের সেবা করার জন্যে-  আর মানুষের প্রতি নির্দেশদান করা হয়েছে, আমার নেয়ামত ভোগ করো এবং আমার দাসত্ব করো। কিন্তু কোন কিছুকেই মহান আল্লাহ মানুষের দাস করে সৃষ্টি করেননি। এমনকি মানুষের নিজ দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও নয়। হাদিস শরীফে এসেছে প্রতিদিন সূর্য উদয়ের পূর্বে মানুষের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মানুষের আত্মার কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে অনুরোধ করে বলে-  দেখো, আমাকে তুমি ব্যবহার করতে পারো, সে স্বাধীনতা তোমার আছে। কিন্তু অনুরোধ, আমাদেরকে ইসলাম বিরোধী কোন কাজে ব্যবহার করো না। যদি করো, তাহলে কিয়ামতের দিন তোমার বিরুদ্ধে আমরা সাক্ষী দিতে বাধ্য হবো। কারণ আমরা তোমার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হলেও আমরা ওই মহান আল্লাহর দাস।

সেদিন হাত-পা সাক্ষী দেবে

পবিত্র কোরআনের সূরা ইয়াছিনের ৬৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আজ আমি এদের মুখ বন্ধ করে দিচ্ছি, এদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং এদের পা সাক্ষ্য দেবে এরা পৃথিবীতে কি উপার্জন করে এসেছে। (সুরা ইয়াছিন)
শুধু যে হাত ও পা-ই সাক্ষ্য দেবে তাই নয়- যে কন্ঠ দিয়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে, তাঁর দেয়া বিধানের বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে কথা বলেছে, শ্লোগান দিয়েছে, সেই কন্ঠও তারই বিরুদ্ধে আল্লাহর আদেশে বিচারের দিনে সাক্ষ্য দিবে। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তারা যেন সেদিনের কথা ভুলে না যায় যেদিন তাদের নিজেদের কন্ঠ এবং তাদের নিজেদের হাত-পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। সেদিন তারা যে প্রতিদানের যোগ্য হবে, তা আল্লাহ তাদেরকে পুরোপুরি দেবেন এবং তারা জানবে, আল্লাহই সত্য এবং সত্যকে সত্য হিসাবে প্রকাশকারী। (সূরা নূর-২৪-২৫)
এ সম্পর্কে বেশ কয়েকটি হাদীসে বলা হয়েছে, যেসব অপরাধী আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েও নিজের অপরাধের স্বীকৃতি দিবে না, তখন শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে সাক্ষ্য দেবে যে, ঐগুলোর সাহায্যে কোথায় কি অবস্থায় কোন কাজের আঞ্জাম দেয়া হয়েছে। আখিরাতের জগত কোন আত্মিক জগৎ হবে না। বরং মানুষকে সেখানে দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে পুনরায় ঠিক তেমনি জীবিত করা হবে যেমনটি বর্তমানে তারা এই পৃথিবীতে জীবিত রয়েছে। যেসব উপাদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং অণু-পরমাণুর সমন্বয়ে এই পৃথিবীতে তাদের দেহ গঠিত, কিয়ামতের দিন সেগুলোই একত্রিত করে দেয়া হবে এবং যে দেহে অবস্থান করে সে পৃথিবীতে কাজ করেছিল পূর্বের সেই দেহ দিয়েই তাকে উঠানো হবে।

সেদিন চোখ, কান ও দেহের চামড়াও সাক্ষী দেবে

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
পরে যখন সবাই সেখানে পৌঁছে যাবে তখন তাদের কান, তাদের চোখ এবং তাদের দেহের চামড়া তারা পৃথিবীতে কি করতো সে সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তারা তাদের শরীরের চামড়াসমূহকে বলবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে কেন ? (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও চামড়া) জবাব দেবে, সেই আল্লাহই আমাদের বাকশক্তি দান করেছেন যিনি প্রতিটি বস্তুকে বাকশক্তি দান করেছেন। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন। আর এখন তোমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। (সূরা হামীম সাজ্‌দাহ্‌-২০-২১)
পৃথিবীতে আল্লাহর বিধানের মোকাবিলায় যারা বিদ্রোহীর ভূমিকা পালন করেছে, এরা বিচার দিবসেও নিজেদের অপরাধ ঢাকা দেয়ার জন্য মিথ্যা কথা বলবে। অনিবার্য শাস্তি ও তার ভয়াবহতা দেখে তা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য যখন তারা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করবে, তখন তাদের পক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও অবিচার করার অভিযোগও তোলা মোটেও অসম্ভব নয়। এ জন্য পৃথিবীতে মানুষের জীবনলিপি-কন্ঠস্বর রেকর্ড ও চলমান ছবি সংরক্ষণের ব্যবস্থাই শুধু করা হয়নি, পক্ষপাতহীন বিচারের লক্ষ্যে এমন এক ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, মানুষ অপরাধ সংঘটনের সময় তার দেহের যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করেছিল, সেসব কিছুই যেন তার কৃতকর্মের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করে। মহান আল্লাহ এমনিতেই মানুষের অসংখ্য অপরাধ ক্ষমা করে দেন। তারপরেও বান্দা যেন শাস্তিভোগ না করে, এ জন্য তিনি অত্যন্ত সুক্ষ্ম বিচার করবেন। সেদিন কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না। যারা পৃথিবীতে সৎকাজ করেছে, তাদের সৎকাজের প্রতিদান দশগুণ বৃদ্ধি করা হবে। আর যারা অসৎ কাজ করেছে, সেই অসৎ কাজের পরিমাণ অনুযায়ীই শাস্তি প্রদান করা হবে, এর জন্য কোন বর্ধিত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে না। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি (আল্লাহর দরবারে) সৎকাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, তার জন্য দশগুণ বেশী পুরস্কার রয়েছে। যে পাপের কাজ নিয়ে আসবে তাকে ততটুকুই প্রতিফল দেয়া হবে, যতটুকু সে অপরাধ করেছে। আর কারো ওপরে জুলুম করা হবে না। (সূরা আন’আম-১৬০)

সেদিন সুবিচারের মানদন্ড স্থাপন করা হবে

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা আম্বিয়া-এর ৪৭ নং আয়াতে বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
কিয়ামতের দিন আমি যথাযথ ওজন করার দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবো। ফলে কোন ব্যক্তির প্রতি সামান্যতম জুলুম হবে না। যার তিল পরিমাণও কোন কর্ম থাকবে তাও আমি সামনে আনবো এবং হিসাব করার জন্য আমি যথেষ্ট। (সূরা আম্বিয়া)
সেদিন আল্লাহর সুবিচারের মানদন্ডে ওজন ও সত্য উভয়ই সমার্থবোধক হবে। সত্য ব্যতীত সেদিন অন্য কোন জিনিসেই ওজন পরিপূর্ণ হবে না এবং ওজন ছাড়া কোন জিনিসই সত্য বলে বিবেচিত হবে না। যার কাছে যত সত্য থাকবে, সে ততটা ওজনদার হবে এবং সিদ্ধান্ত যা-ই হবে তা ওজন হিসাবে ও ওজনের দৃষ্টিতেই হবে। অপর কোন জিনিসের বিন্দুমাত্র মূল্য স্বীকার করা হবে না। ইসলাম বিরোধিদের জীবন পৃথিবীতে যত দীর্ঘ হোক না কেন, যত শানশওকতপূর্ণ ও বাহ্যিক কীর্তিপকলাপে পরিপূর্ণ হোক না কেন, আল্লাহর পরিমাপকযন্ত্রে তার কোন ওজনই হবে না। মৃত্যুর পরে তার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে মহাআড়ম্বরে শোক প্রকাশ- প্রচার মাধ্যমে তার কীর্তিগাঁথা প্রচার, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে রাখা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন, তোপধ্বনীর মাধ্যমে কবরে অবতরণ,এসবের কোন মূল্যই আল্লাহ দিবেন না।
যে ব্যক্তি পৃথিবীতে কুলি-মজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছে, বাঘের বা সাপের কবলে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তারপর তার লাশ বাঘের পেটে হজম হয়ে গিয়েছে, সে যদি আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে থাকে, আল্লাহর কাছে তার ওজন হবে অপরিসীম এবং তার মর্যাদা হবে বিরাট। পৃথিবীতে জাঁকজমকের সাথে চলাফেরা করেছে অথচ আল্লাহর বিধান অনুসরণ করেনি, বিচার দিবসে সে ওজনদার হবে না। সেদিন শুধু তারাই ওজনদার হবে, পৃথিবীতে যারা আল্লাহর বিধান অনুসরণ করেছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আর ওজন ও পরিমাপ সেদিন নিশ্চিতই সত্য-সঠিক হবে। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই কল্যাণ লাভ করবে আর যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারা নিজেদেরকে মহাক্ষতির সম্মুখীন করবে। কারণ তারা আমার আয়াতের সাথে জালিমের ন্যায় আচরণ করছিল। ( সূরা আল আ’রাফ-৯)
আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধও অন্তরে নেই, নামাজ-রোজা আদায় করার কোন প্রয়োজন অনুভব করে না। কেউ কেউ হজ্জ আদায় করে এ জন্য যে, নির্বাচন এলে নামের পূর্বে ‘আল হাজ্জ’ শব্দটি ব্যবহার করে ধর্মভীরু মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার জন্য। এদের মধ্যে অনেকে বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছে। অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে এরা দেশের বিশিষ্ট নাগরিকে পরিণত হয়েছে। সাধারণ লোকজন এদেরকে মূল্য দিয়ে থাকে, সম্মান-মর্যাদা দেয়। মহান আল্লাহর আদালতে বিচার দিবসে এদের কোনই মূল্য নেই। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
হে রাসূল! এদেরকে বলো, আমি কি তোমাদের বলবো নিজেদের কর্মের ব্যাপারে বেশী ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্থ কারা ? সে লোকগুলো তারা, যারা পৃথিবীর জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম সব সময় সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত থাকতো এবং যারা মনে করতো যে, তারা সব কিছু সঠিক করে যাচ্ছে। এরা এমন সব লোক যারা নিজেদের রব-এর নিদর্শনাবলী মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং তাঁর সামনে উপস্থিত হবার ব্যাপারটি বিশ্বাস করেনি। তাই তাদের সমস্ত কর্ম নষ্ট হয়ে গিয়েছে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে কোন গুরুত্ব দেয়া হবে না। (কাহ্‌ফ- ১০৩-১০৫)
অর্থাৎ যাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও সাধনা পৃথিবীর জীবনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। তারা যা কিছুই করেছে আল্লাহর প্রতি সম্পর্কহীন হয়ে ও আখিরাতের চিন্তা বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীতে অর্থ-বিত্ত, ঐশ্বর্য, সম্মান, মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের জন্যই করেছে। পৃথিবীর জীবনকেই তারা একমাত্র জীবন মনে করেছে। পৃথিবীর জীবনে সফলতাকেই তারা নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্যে পরিণত করেছিল। এরা আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলেও তাঁর সন্তুষ্টি কোন কর্মের মধ্যে নিহিত এবং তাঁর সামনে বিচার দিবসে দাঁড়াতে হবে, সমস্ত কাজের হিসাব দিতে হবে, এ কথা তারা মনে স্থান দেয়নি। তারা নিজেদেরকে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, সম্মান ও মর্যাদা লাভের যোগ্য একজন মনে করতো। এরা পৃথিবীর চারণ ভূমি থেকে একমাত্র নিজেদের স্বার্থোদ্ধার ব্যতীত অন্য কোন কাজ করতো না।
বিচার দিবসের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুণাবলীর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। যে ব্যক্তি কোন জুলুমের বোঝা বহন করে নিয়ে যাবে, সে আল্লাহর অধিকারের বিরুদ্ধে জুলুম করুক বা আল্লাহর বান্দাদের অধিকারের বিরুদ্ধে অথবা নিজের নফ্‌সের বিরুদ্ধে জুলুম করুক না কেন, যে কোন অবস্থায়ই সেসব কর্ম তাকে নিকৃষ্ট পরিণতি থেকে মুক্তি দিতে পারবে না। বিচার দিবসের দিনে সমস্ত মানুষ যখন মহান আল্লাহর মহাপ্রতাপ দেখবে, তখন তাদের মাথা আপনা আপনিই ঝুঁকে পড়বে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
লোকদের মাথা চিরঞ্জীব ও চির প্রতিষ্ঠিত সত্তার সামনে ঝুঁকে পড়বে, সে সময় যে জুলুমের গোনাহের ভার বহন করবে সে ব্যর্থ হবে। আর যে ব্যক্তি সৎকাজ করবে এবং সেই সাথে সে মুমিনও হবে তার প্রতি কোন জুলুম বা অধিকার হরণের আশঙ্কা নেই। ( ত্বা-হা-১১১-১১২)
অনেক মানুষ প্রশ্ন তোলে, পৃথিবীতে অমুসলিমগণ যে সৎকর্মসমূহ করে অর্থাৎ তাদের অনেকে অসংখ্য জনকল্যাণমূলক কর্ম করে, দান করে, তাদের দ্বারা অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয় এদেরকে বিচার দিবসের দিনে কি ধরনের প্রতিফল দেয়া হবে ? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অবশ্যই তাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন। তিনি রাহ্‌মান ও রাহীম। তিনি কারো সৎকর্ম বৃথা যেতে দেন না। সৃষ্টিজগৎ ব্যাপী এবং এই পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে তিনি রাহ্‌মত বর্ষণ করছেন, এগুলো তো শুধুমাত্র ঈমানদারগণই ভোগ করছে না, তারাও এগুলো ভোগ করছে। শুধু তাই নয়, এই পৃথিবীতে তাদের কর্মের বিনিময়ে আল্লাহ তা’য়ালা তাদেরকে এমন অসংখ্য দুর্লভ নিয়ামত ভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা তিনি ঈমানদারকে দেননি। আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে না, স্বীকার করলেও শির্‌ক করে, তাদের সৎকাজের বিনিময়ে এই পৃথিবীতে আল্লাহ তা’য়ালা তাদেরকে বাড়ি, গাড়ি, অঢেল সম্পদ, সম্মান-মর্যাদা, যশ-খ্যাতি দান করেছেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিয়ামতসমূহ ভোগ করার সুযোগ প্রদান করেছেন, তাদের মৃত্যুর পরেও তাদের কাউকে কাউকে পরম শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছেন, এসব তো তারা তাদের সৎকাজের বিনিময় হিসাবে লাভ করেছে। একটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে যে, যে কোন সৎকাজ কবুলের ও আখিরাতে তার বিনিময় লাভের পূর্ব শর্ত হলো, ঈমানদার হতে হবে। ঈমানহীন কোন সৎকাজের বিনিময় বিচার দিবসে পাওয়া যাবে না- এই পৃথিবীতেই তার বিনিময় দিয়ে দেয়া হবে।
এদের বিপরীতে অধিকাংশ ঈমানদারদের জীবনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায়, মানুষকে আল্লাহর পথের দিকে আহ্বান জানাতে গিয়ে এদেরকে অবর্ণনীয় অত্যাচার সহ্য করতে হয়, জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে আবদ্ধ থাকতে হয়, সহায়-সম্পদ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অর্ধাহারে-অনাহারে জীবন কাটাতে হয়, জীবন-যাপনের তেমন কোন উপকরণ থাকে না, মনের একান্ত বাসনা আল্লাহর ঘরে গিয়ে আল্লাহকে সেজ্‌দা দিবে, অর্থাভাবে সে অদম্য কামনা বুকে নিয়েই কবরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির জন্য উত্তম পোষাক, উৎকৃষ্ট খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারে না, নিজের মেধাবী পুত্র বা কন্যাকে অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা দিতে পারে না। মাথা গোঁজার জন্য এক টুকরো যমীন কিনতে পারে না, রোগাক্রান্ত হলে তেমন চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারে না।
এরপরেও তারা সমস্ত পরিস্থিতি হাসিমুখে মোকাবেলা করে আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করে। নিজেকে অপরাধী মনে করে সেজ্‌দায় পড়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে। পৃথিবীতে ধন-সম্পদ না চেয়ে আল্লাহর দরবারে পরকালের কল্যাণ কামনা করে। আল্লাহ তা’য়ালা ঈমানদারকে কিয়ামতের ময়দানে তাদের কর্মের সর্বোত্তম বিনিময় দান করবেন, সেদিন কারো প্রতি সামান্য অবিচার করা হবে না। সবাই যার যার অধিকার বুঝে পাবে।
প্রতিদান ও সুবিচারের বেশ কয়েকটি রূপ হতে পারে। প্রতিদান লাভের অধিকারী ব্যক্তিকে প্রতিদান না দেয়াও অবিচার এবং জুলূম। প্রতিদান লাভকারী যতটা প্রতিদান লাভের উপযুক্ত তার থেকে কম দেয়াও অবিচার ও জুলুম। যে ব্যক্তি শাস্তি লাভের যোগ্য নয়, তাকে শাস্তি দেয়াও অবিচার এবং জুলুম। আবার যে শাস্তি লাভের যোগ্য তাকে শাস্তি না দেয়া এবং যে কম শাস্তি লাভের যোগ্য, তাকে অধিক শাস্তি দেয়াও জুলুম ও অবিচার।
জালিম শাস্তি পাচ্ছে না, নির্দোষ অবস্থায় খালাস পাচ্ছে আর মজলুম তা অসহায়ের মতো নীরবে চেয়ে চেয়ে দেখছে, এটাও অবিচার ও জুলূম। একজনের অপরাধের কারণে অন্যজন শাস্তি লাভ করছে, একের অপরাধ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, এসবই জুলুম আর অবিচারের কারণে হয়ে থাকে। বিচার দিবসে এসবের কোনকিছুই ঘটবে না। মহান আল্লাহ কারো প্রতি কোন ধরনের জুলুম করবেন না। বিচার দিবসের দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে ভাষণে বলা হবে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আজ কারো প্রতি তিলমাত্র জুলুম করা হবে না এবং যেমন কাজ তোমরা করে এসেছো ঠিক তারই প্রতিদান তোমাদের দেয়া হবে। (সূরা ইয়াছিন-৫৪)

অপরাধীদেরকে প্রাপ্য শাস্তির অধিক দেয়া হবে না

যারা জান্নাত লাভ করবেন, তাঁরা তাঁদের কর্মের বিনিময় যতটুকু ততটুকুই লাভ করবেন না, বরং করুণাময় আল্লাহ বহুগুণ বেশী দান করবেন। আর যারা জাহান্নামে গমন করবে, তারা তাদের কর্মের বিনিময় হিসাবে যতটুকু শাস্তি লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে, ততটুকুই ভোগ করবে, সামান্য বেশী কম হবে না। আল্লাহর কোরআন বলছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যারা ভালো কাজের নীতি অবলম্বন করেছে, তারা ভাল ফল লাভ করবে আর অধিক অনুগ্রহও। কলঙ্ক কালিমা ও লাঞ্ছনা তাদের মুখমন্ডলকে মলিন করবে না। তারাই জান্নাত লাভের অধিকারী; সেখানে তারা চিরদিন অবস্থান করবে। আর যারা মন্দ কাজ করেছে, তারা তাদের পাপ অনুপাতেই প্রতিফল লাভ করবে। লাঞ্ছনা তাদের ললাট লিখন হয়ে থাকবে। আল্লাহর এই আযাব থেকে তাদের রক্ষাকারী কেউ নেই। তাদের মুখমন্ডলে এমন অন্ধকার সমাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে যেমন রাতের কালো পর্দা তাদের ওপরে পড়ে রয়েছে। তারাই জাহান্নামে যাবার যোগ্য, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। (সূরা ইউনুস-২৬-২৭)
অর্থাৎ ভালো কাজের বিনিময়ে যতটুকু প্রতিফল পাওয়ার যোগ্য হবে, তার থেকে কয়েকগুণ বেশী দেয়া হবে, আর মন্দ কাজের বিনিময়ে অতিরিক্ত কোন শাস্তি দেয়া হবে না। যতটুকু প্রাপ্য ততটুকুই দেয়া হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যে ব্যক্তি সৎকাজ নিয়ে আসবে সে তার চেয়ে বেশী ভালো প্রতিদান পাবে এবং এ ধরনের লোকেরা সেদিনের ভীতি-বিহ্বলতা থেকে নিরাপদ থাকবে। আর যারা অসৎকাজ নিয়ে আসবে, তাদের সবাইকে অধোমুখে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা কি যেমন কর্ম তেমন ফল ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান পেতে পারো। (সূরা আন নামল-৮৯-৯০)
একই কথা সূরা আল কাসাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যে কেউ ভাল কাজ নিয়ে আসবে তার জন্য রয়েছে তার চেয়ে ভাল ফল এবং যে কেউ খারাপ কাজ নিয়ে আসে তার জানা উচিৎ যে, অসৎ কর্মশীলরা যেমন কাজ করতো ঠিক তেমনিই প্রতিদান পাবে। (সূরা কাসাস-৮৪)

হাশরের ময়দানে অপরাধীগণ সময় সম্পর্কে বিভ্রান্তিতে পড়বে

মানুষের ইতিহাসে আল্লাহর ফায়সালা মানুষেরই সময় নির্ধারক ও পঞ্জিকার হিসাব অনুসারে হয় না। যেমন আজকে একটি ভুল বা সঠিক নীতি অবলম্বন করা হলো এবং কালই তার মন্দ বা ভালো ফলাফল প্রকাশ হয়ে গেলো, বিষয়টি এমন নয়। কোন জাতিকে যদি বলা হয় যে, অমুক কর্মপদ্ধতি অবলম্বনের কারণে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। এ কথার জবাবে সেই জাতি যদি এই যুক্তি পেশ করে যে, এই কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করার পর আমাদের জীবন কাল থেকে দশ, বিশ বা পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল, এখনো তো তোমার কথা অনুসারে আমরা ধ্বংস হয়নি। এ কথা যে জাতি বলবে তারা নির্বুদ্ধিতারই পরিচয় দিবে। কেননা, ঐতিহাসিক ফলাফলের জন্য দিন, মাস বা বছর তো সামান্য বিষয়, শতাব্দীকাল তেমন কোন বিষয় নয়। যেমন পবিত্র কোরআনের সূরা মাআ’রিজে বলা হয়েছে, মানুষের কাছে যা পঞ্চাশ হাজার বছরের পথ, আল্লাহর ফেরেশতাগণ তা মাত্র একদিন অতিক্রম করে থাকে। সুতরাং আল্লাহর কাছের আর মানুষের কাছের সময়ের পার্থক্য কখনোই সমান নয়।
মানুষের হিসাব অনুসারে মৃত্যুর পরে কত শত কোটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাবে। তারপরেও অপরাধীরা আদালতে আখিরাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে সময় সম্পর্কে কি বলবে, তা আল্লাহ শোনাচ্ছেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন যখন শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে এবং আমি অপরাধীদেরকে এমনভাবে ঘেরাও করে আনবো যে, তাদের চোখ ভয়ে আতঙ্কে দৃষ্টিহীন হয়ে যাবে। তারা পরস্পর চুপিচুপি বলাবলি করবে, পৃথিবীতে খুব বেশী হলে তোমরা মাত্র দশটা দিন অতিবাহিত করেছো। (সূরা ত্বা-হা- ১০২-১০৩)
সূরা ইয়াছিনসহ অন্যান্য সূরাতেও মৃত্যুর পরে আদালতে আখিরাতে ওঠার সময় সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলা হয়েছে। সূরা মুমিনূন-এ মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা পৃথিবীতে কত বছর ছিলে? জবাব দেবে, একদিন বা দিনের এক অংশ থেকেছি, গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞেস করে নিন। (সূরা মুমিনুন)
সময় সম্পর্কে সেদিন অপরাধীরা শপথ করে বলতে থাকবে। আল্লাহ কোরআনে বলছেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আর যেদিন কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে তখন অপরাধীরা শপথ করে করে বলবে, আমরা মৃত অবস্থায় এক ঘন্টার বেশী সময় পড়ে থাকিনি। (সূরা রূম-৫৫)
মানুষ যতদিন এই পৃথিবীতে কাল ও স্থানের সীমার মধ্যে দৈহিকভাবে জীবন-যাপন করছে, শুধুমাত্র ততদিন পর্যন্তই তাদের সময়ের চেতনা ও অনুভূতি থাকতে পারে। মৃত্যুর পরবর্তীতে যখন শুধুমাত্র রূহ্‌ই অবশিষ্ট থাকবে তখন সময় ও কালের কোন চেতনাই মানুষের মধ্যে অবশিষ্ট থাকবে না। আদালতে আখিরাতে মানুষ যখন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে, তখন তাদের মনে হবে এই মাত্র কেউ যেন তাদেরকে গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়েছে। তারা যে হাজার হাজার বছর মৃত থাকার পর পুনরায় জীবিত হয়েছে, এই চেতনা আদৌ তাদের থাকবে না।

সেদিন মানুষ আপন কর্মের রেকর্ড দেখতে পাবে

সূরার নাবার শেষের আয়াতে বলা হয়েছে, যেদিন মানুষ প্রত্যক্ষ করবে সমস্ত কিছু, যা  তার হাত পূর্বেই পাঠিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ মানুষ তার নিজের কর্মসমূহ দেখতে পাবে। পৃথিবীতে মানুষের যাবতীয় কৃতকর্মের ফলাফলকে পবিত্র কোরআনে ‘কিতাব’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই আমলনামা বা কিতাব কিয়ামতের দিন কিসের উপরে লিখিত থাকবে এবং কিসের মাধ্যমেই বা দেয়া হবে, তা জানা মানুষের জন্যে অসম্ভব ব্যাপার। আর কোরআন হাদিসেও এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। মানুষকে জানানো যদি প্রয়োজন হতো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা জানাতেন। আল্লাহ তার বান্দাহদের প্রতিটি কথা, তার প্রতিটি গতিবিধি, তার প্রতি মুহূর্তের কার্যকলাপের ছোট ছোট অংশকে, তার মনোভাব ও ইচ্ছা-আকাংখাকে, মনের গহীনের চিন্তা কল্পনাকে, তার ইশারা-ইঙ্গিতকে কিভাবে সংরক্ষণ করছেন, কিভাবে তার সমস্ত খতিয়ান বান্দার সামনে তুলে ধরবেন- এ ব্যাপারে সমস্ত জ্ঞান আল্লাহরই আয়ত্বে। মানুষ কোরআন-হাদিস অধ্যায়ন করে শুধু এতটুকুই বুঝতে পারে, এগুলোকে কিয়ামতের দিন অবশ্যই একটা আকার আকৃতি দেয় হবে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
প্রত্যেক দলকেই সেদিন বলা হবে- এসো, তোমাদের আমলনামা বা রেকর্ড নিয়ে যাও। আজ তোমাদেরকে সে সব আমলের বিনিময়ে দেয়া হবে, যা তোমরা করেছো। এটা আমাদের তৈরী করা আমলনামা। তোমাদের ব্যাপারে সঠিক ও যথাযথ সাক্ষ্য দেবে। তোমরা (পৃথিবীতে) যা কিছু করছিলে তা সঠিকভাবে লিখে রাখা হতো। (আল-জাসিয়া-  ২৮-২৯)
আল্লাহর কোরআনের সূরা মুজাদালায় বলা হয়েছে- সেদিন আল্লাহ সবাইকে পুনরায় জীবিত করে উঠাবেন। তারা (পৃথিবীতে) যা কিছু করে এসেছে তা তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। তারা (তাদের কর্মসমূহ) ভুলে গিয়েছে। কিন্তু আল্লাহ যাবতীয় কর্মসমূহ গুনে গুনে সংরক্ষিত করে রেখেছেন। (আল-মুজাদালা-  ৫)

অণু পরিমাণ আমলও মানুষ দেখতে পাবে

পবিত্র কোরআনে সূরা যিলযালে মহান আল্লাহ বলেছেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন প্রতিটি মানুষ (দলবল ছেড়ে) বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফিরে আসবে, যেন তাদের আমল তাদেরকে দেখানো যায়। এরপর যে ব্যক্তি অনু পরিমানও নেক আমল করবে তা দেখতে পাবে এবং যে ব্যক্তি অনু পরিমানও পাপ আমল করবে তা-ও দেখতে পাবে। (যিলযাল- ৬-৮)

সেদিন নিজের আমল নামা নিজেকেই পড়তে হবে

সেদিন নিজের আমল নামা নিজেকেই পড়তে হবে। মহান আল্লাহ জানিয়ে তাঁর নাজিল করা কিতাব পবিত্র কোরআনে জানিয়ে দিয়েছেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আর কিয়ামতের দিন আমরা তাদের ‘আমলনামা’ রেকর্ড প্রকাশ করবো, যাতে সমস্ত কিছু প্রকাশ থাকবে। (বলা হবে) পড়ো, নিজের ‘আমলনামা’ রেকর্ড। আজ নিজের হিসাব নেয়ার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট। (বনী-ইসরাঈল-  ১৩-১৪)
পৃথিবীতে যারা ইসলামী বিধান অনুযায়ী চলেনি তারা বাম হাতে আমলনামা পাওয়ার সাথে সাথে বলবে, এই মুহূর্তে যদি আমার মৃত্যু হতো,  তাহলে আযাব থেকে বেঁচে যেতাম! কিন্তু যারা পৃথিবীতে ইসলামের পথে চলেছে, তারা ডান হাতে আমলনামা পেয়ে অত্যন্ত খুশী হবে- কৃতজ্ঞতা জানাবে মহান আল্লাহর দরবারে। পরিশেষে তারা জান্নাত লাভ করবে। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এরপর যার ‘আমল নামা’ ডান হাতে দেয়া হবে তার হিসাব সহজভাবে গ্রহণ করা হবে এবং সে আনন্দ চিত্তে আপনজনের নিকট ফিরে যাবে। আর ‘আমলনামা’ যার পিছন দিক হতে দেয়া হবে সে মৃত্যুকে ডাকবে। (অবশেষে) সে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হবে। (ইনশিকাক-  ৭-১২)

যার কাছে হিসাব চাওয়া হবে সেই বিপদে পড়বে

কোরআন এবং হাদিস অধ্যায়ন করে যতদূর জানা যায়, তাহলো হাশরের ময়দানে যে ব্যক্তির হিসাব হবে, সে ব্যক্তির পক্ষে জান্নাতে যাওয়া অসম্ভব। কারণ আল্লাহ যদি সেদিন একটি মাত্র প্রশ্নই করেন, পৃথিবীতে তুমি কতটুকু পানি পান করেছো? তাহলে তো কোন মানুষই এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। অতএব যারা জান্নাতি হবে, তারা হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।
কোরআন শরীফে ঈমানদারদের হিসাব সহজভাবে গ্রহণ করা হবে বলতে বুঝানো হয়েছে, ঈমানদারদের হিসাব গ্রহনে কড়া-কড়ি ও কঠোরতা অবলম্বন করা হবে না। তাকে প্রশ্ন করা হবে না, অমুক অমুক কাজ তুমি কেন করেছিলে- আজ তার কৈফিয়ত দাও!
নবী-রাসূল ব্যতীত পৃথিবীতে কোন মানুষই ভুল-ভ্রান্তির উর্ধ্বে নয়। সুতরাং ঈমানদারদের আমল নামাতেও গোনাহ থাকবে। কিন্তু সে গোনাহ তার সৎ আমলের তুলনায় বেশি হবে না। সে কারণে তার গোনাহ মহান আল্লাহ এমনিতেই মাফ করে দেবেন। আল্লাহ কোরআনে ওয়াদা করেছেন, পৃথিবীতে যারা ইসলামের বিধান মেনে চলবে, তাদের সামান্য পাপ-গোনাহ তিনি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেবেন।
মানুষ সাধারণত দু’ভাবে গোনাহ করে। ইচ্ছাকৃতভাবে ও অনিচ্ছাকৃতভাবে। ঈমানদারদের আমলনামায় যে সমস্ত গোনাহ থাকবে, সে সমস্ত গোনাহ হলো অনিচ্ছাকৃত গোনাহ, আর পৃথিবীতে ঈমানদারগন যখনই বুঝতো সে গোনাহ করে ফেলেছে, তখন ঈমানদারের স্বভাব অনুযায়ী সাথে সাথে সে সেজদায় পড়ে চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতো। এ সমস্ত কারণেই ঈমানদার ছাড়া পেয়ে যাবে।
আর যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অহংকারের সাথে ইসলামের আইন অমান্য করে উচ্চস্বরে বলে, আমি মদ খাওয়া ছাড়বো না। এই ধরণের ব্যক্তি ক্ষমার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই ধরনের মানুষদের কাছ হতে হিসাব গ্রহণে যে কড়া-কড়ি অবলম্বন করা হবে তা বুঝাবার জন্যে পবিত্র কোরআনে ‘ছুউল হিছাব’ শব্দ সূরা রা’দের ১৮ নং আয়াতে ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ হলো অত্যন্ত খারাপভাবে হিসাব গ্রহণ করা। হিসাব গ্রহণের সময় অত্যন্ত কড়া-কড়ি আরোপ করা। তারা ক্ষমা ও সকল প্রকার সাহায্য সহানুভূতির যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। ঈমানদারদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন- এরা এমন মানুষ যে, তাদের ভালো ও নেক আমলসমূহ আমরা গ্রহণ করবো এবং তাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবো। (সূরা আল-কাহাফ)
বোখারী শরীফে এসেছে কোরআনের উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল বলেন, যার কাছ থেকে হিসাব নেয়া হবে, সে-ই বিপদে পড়বে। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা জানতে চাইলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা কি বলেননি যে, যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে তার কাছ হতে সহজভাবে হিসাব গ্রহণ করা হবে? আল্লাহর রাসূল বললেন- এটা হচ্ছে শুধুমাত্র আমলনামা পেশ করা সংক্রান্ত (অর্থাৎ আমলনামা ঈমানদারদেরকে দেয়া হবে বটে কিন্তু সহানুভূতির সাথে) কিন্তু যাকে কোন প্রশ্ন করা হবে, সেই ধরা পড়বে। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা  বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার নামাজে এই দোয়া করতে শুনেছি- হে আল্লাহ! আমার হিসাব হাল্কাভাবে গ্রহণ করো।
তিনি যখন সালাম ফিরলেন তখন আমি এর তাৎপর্য জানতে চাইলাম। জবাবে আল্লাহর রাসূল বললেন- হাল্কাভাবে হিসেব গ্রহণের অর্থ এই যে, বান্দার আমলনামা দেখা হবে এবং তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। হে আয়েশা, সেদিন যার কাছ থেকে হিসাব চাওয়া হবে সেই ধরা পড়বে।
কিয়ামতের দিন আমলনামা হাতে পেয়ে ঈমানদারগন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবে, সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে। আর অবিশ্বাসীগণ আমলনামা বাম হতে পেয়ে আফসোস করে বলবে- এখন যদি আামাদের মৃত্যু হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো!

যার কাছে হিসাব চাওয়া হবে সেই মৃত্যু কামনা করবে

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে (সন্তুষ্ট হয়ে অন্যদেরকে) বলবে- দেখো, পড়ো আমার আমলনামা! আমি ধারণা করেছিলাম আমার নিকট হতে হিসাব গ্রহণ করা হবে) ফলে তারা আকাংখিত সুখ সম্ভোগে লিপ্ত হবে। আর যার আমলনামা বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে-  হায় আমার আমলনামা যদি না-ই দেয়া হতো! আর আমার হিসাব কি, তা যদি আমি না-ই জানতে পারতাম! হায় মৃত্যুই যদি আমার চূড়ান্ত হতো! (অর্থাৎ মৃত্যুই যদি সবশেষ করে দিত, তাহলে আজ এই হিসাব দিতে হতো না) (আল-হাক্কাহ-  ১৯-২৭)

সেদিন ভয়ংকর সেতু অতিক্রম করতে হবে

জাহান্নামের ওপর দিয়ে সেতু বা ব্রিজ থাকবে। সে সেতু হাশরের ময়দান হতে জান্নাত পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। সেতুটি হবে চুলের চেয়েও সরু এবং তরবারীর চেয়েও ধারালো। প্রতিটি মানুষকে-ই ওই ভয়ংকর সেতু অতিক্রম করতে হবে। সেদিন জান্নাতে পৌঁছানোর ওটাই হবে একমাত্র পথ। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তার উপর আরোহণ করবে না। এটা তো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকৃত কথা। তা পুরো করা তোমার রবের দায়িত্ব। (মরিয়ম-৭১)
এই পৃথিবীতে যারা কোরআন-হাদিসের আইন ও বিধান অনুসারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে জীবন পরিচালনা করেছে, তারা ওই ভয়ংকর সেতু বা পুলছিরাত অতিক্রম করে জান্নাতে পৌঁছাবে। পুলছিরাতের পথ হবে অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন। চুলের চেয়ে চিকন ও তরবারীর চেয়েও ধারালো এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি ভয়াবহ পথ অতিক্রম করতে অবশ্যই আলো প্রয়োজন। ঈমানদারগণ চারপাশে আলো পাবে। তাদের সৎ আমল সমূহ সেদিন আলো হয়ে তাদেরকে ঘিরে রাখবে। আর যতই আলো থাক এবং মানুষ সতর্কতার সাথে পা ফেলুক না কেন- ওই ধরনের অনতিক্রমনীয় পথ কোন মানুষের পক্ষেই অতিক্রম করা অসম্ভব। আল্লাহর রহমত ব্যতীত কেউ তা অতিক্রম করতে পারবে না। ঈমানদারদের উপরে আল্লাহর রহমত থাকবে। ফলে তারা পুলছিরাত পার হয়ে জান্নাতে পৌঁছতে পারবে।
কিন্তু পাপীগণ কোন ক্রমেই পূলছিরাত অতিক্রম করতে পারবে না। তারা একে একে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। পুলছিরাতে তারা কোন সাহায্য পাবে না। ঈমানদারগণ যখন পুলছিরাত পার হবে, সে সময়ের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
সেদিন যখন তোমরা মুমিন পুরুষ ও স্ত্রী লোকদেরকে দেখবে যে, তাদের নূর তাদের সামনে, তাদের ডান দিকে ছুটতে থাকবে। (হাদীদ-১২)
পথ অন্ধকার দেখে  অপরাধী পাপীগণ ঈমানদারদের নিকট হতে সাহায্য চাইবে- আমাদেরকে আলো দিয়ে সাহায্য করো, আলো দিয়ে সাহায্য করো।’ তখন আল্লাহ তায়ালা পাপীদেরকে প্রচন্ড ধমক দিয়ে বলবেন, যাও, আজ দূরে সরে যাও। (হাদীদ-১৩)
পৃথিবীর বুকে ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন ও আন্তর্জাতিক জীবন সুন্দর সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যে কেবল মাত্র একটি পথই সরল-সোজা, সুখ-শান্তির আলোয় আলোকিত পথ আছে- সে পথটি হলো ইসলামের পথ। এই পথে যারা না চলে অন্ধের মতো অন্ধকার পথে চলছে- হাশরের ময়দানেও তারা অন্ধের মতোই মুক্তির পথ হাতড়াবে। অবশেষে জাহান্নামে তাদেরকে নিক্ষেপ করা হবে।
যে ব্যক্তি যত বেশী ইসলামের পথে চলবে সে ব্যক্তি পুলছিরাত পার হবার সময় তত বেশী আলো পাবে। সে কারণে সৎ আমলের কম বেশী হবার দরুণ কারো আলো কয়েক মাইল ব্যাপী হবে, আবার কারো আলো কয়েক গজ ব্যাপী হবে আবার কারো আলো শুধু পায়ের পাতা পর্যন্ত থাকবে। পুলছিরাত পার হবার গতিও সবার এক রকম হবে না। আল্লাহর বিধান পালনে কম-বেশী হবার দরুণ সেদিন এক একজন মানুষ এক একরকম গতি পাবে। কেউ নিমিষে পার হবে আবার কেউ পার হবে অত্যন্ত ধীরে ধীরে। গতি কম-বেশী হবার একমাত্র কারণ হলো সৎ আমলের কম বেশী করা।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সেদিন কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ বা ঘোড়ার গতিতে, কেউ আরোহীর গতিতে, কেউ দৌড়িয়ে, আবার কেউ হাঁটার গতিতে (পুলছিরাত) অতিক্রম করবে। (তিরমিজি)
অপর একটি হাদীসে আছে আল্লাহর নবী বলেন, জাহান্নামের উপর একটি রাস্তা হবে। সমস্ত নবী ও রাসূলগণের পূর্বে আমি উম্মতসহ তা অতিক্রম করবো। এ সময় নবীগণ ‘হে আল্লাহ! নিরাপদ রাখো’ বলতে থাকবেন কিন্তু আর কেউ কোন কথা বলতে পারবে না। (বুখারী ও মুসলিম)

জাহান্নাম একটি ঘাঁটি বিশেষ

সূরা নাবায় বলা হয়েছে, জাহান্নাম একটি ঘাঁটি বিশেষ এবং এই স্থানটি তাদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, যারা পৃথিবীর বুকে আল্লাহর দ্বীনের বিরোধিতা করে আল্লাহদ্রোহী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে এবং তারা সেখানে যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে। সেখানে তারা পানের উপযোগী কোন পানীয় লাভ করবে না, যা কিছু পান করবে তাহলো উত্তপ্ত পানি এবং ক্ষতের ক্ষরণ। এটা তাদের কর্মফল। বিচার দিবসের প্রতি তাদের কোন বিশ্বাস ছিল না এবং তারা আল্লাহর নিদর্শনকে মিথ্যা মনে করতো।
শিকার ধরার জন্য নির্মিত কোন বিশেষ স্থানকেই ঘাঁটি বলা হয়। আরবী ‘রাছাদ’ শব্দ থেকে ‘মিরছাদ’ শব্দ এসেছে এবং এর অর্থ হলো ঘাঁটি। প্রশ্ন হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহান্নামকে ঘাঁটি কেন বলেছেন?
জাহান্নামকে এ জন্যই ঘাঁটি বলা হয়েছে যে, তা শিকার ধরার জন্য ওঁৎ পেতে রয়েছে এবং জাহান্নামের শিকার হবে তারাই যারা এই পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান নিজেরাও অনুসরণ করেনি এবং অন্যকেও অনুসরণ করতে বাধার সৃষ্টি করেছে। পরিবার, সমাজ ও দেশে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যার ফলে সাধারণ মানুষ ইচ্ছে থাকার পরও আল্লাহর বিধান অনুসরণ করতে পারেনি। বিপুল সংখ্যক অনুসারী লাভ করেছে কিন্তু অনুসারীদেরকে কখনো আল্লাহর বিধান অনুসারে পরিচালিত করেনি। পরিবার, সমাজ ও দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়েও অধীনস্থদেরকে কখনো আল্লাহর পথের দিকে আহ্বান করেনি। যারা আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে জান-মাল দিয়ে সংগ্রাম করেছে, তাদেরকে মিথ্যা অজুহাতে কারারুদ্ধ করেছে। তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে। জাতির সামনে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে নানা ধরনের কূটজাল বিস্তার করেছে।
পরকালে অবিশ্বাসী এসব দাম্ভিক লোকজন আল্লাহ বিরোধী কর্মকান্ডের মাধ্যমে ক্রমশঃ জাহান্নাম নামক সেই ঘাঁটির দিকেই এগিয়ে যেতে থাকে। আল্লাহর ক্রোধ উদ্রেককারী কর্মকান্ড এরা করতে থাকে আর এসব কর্মের কারণে শয়তান প্রকৃতির এক শ্রেণীর লোকজন এদের প্রশংসা করে। এসব অর্বাচীনরা আরো প্রশংসা এবং অর্থের লালসায় আল্লাহ বিরোধী কর্মকান্ডে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়তে থাকে। তাদের মনের গহীনে কখনো এ চিন্তার উদ্রেক হয় না যে, এসব কর্ম আল্লাহর ক্রোধ সৃষ্টি করছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে- বর্তমান পৃথিবীতে যারা চলচ্চিত্রে নগ্ন ভূমিকায় অভিনয় করছে তাদের নোংরামি দেখে শয়তান প্রকৃতির লোকজন ভূয়সী প্রশংসা করে থাকে এবং তারা এ ক্ষেত্রে প্রভূত অর্থও লাভ করে থাকে। এই অর্থ আর প্রশংসা এসব অভিনেতা আর অভিনেত্রীদেরকে নগ্নতার শেষ স্তরে পৌঁছে দেয় অর্থাৎ জাহান্নামের নিকটতর করে দেয়।
এরা অনুভবও করতে পারে না, তারা জাহান্নামের কতটা কাছে এসে পৌঁছেছে। এভাবে আল্লাহদ্রোহী লোকজন একটু একটু করে নিজ কর্মের মাধ্যমে সেই ভয়ঙ্কর ঘাঁটি- জাহান্নামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তারপর পৃথিবীর জীবনকাল শেষ হবার পরে তাদের আবাসস্থল হয় জাহান্নাম এবং তারা হঠাৎ করেই সেই ঘাঁটিতে ধরা পড়ে যায়, যে ঘাঁটি সম্পর্কে পৃথিবীর জীবনে তারা উদাসীন ছিল। এখানে তারা কতদিন অবস্থান করবে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে ‘ফিহা আহ্‌কাবা’ অর্থাৎ জাহান্নামের ভেতরে একটার পরে আরেকটা যুগ শেষ হতে থাকবে এবং সেটা এমন যুগ, যা কখনো শেষ হবে না।

জাহান্নাম থেকে কেউ বের হতে পারবে না

আল্লাহর কোরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
ভালো করে জেনে রাখো, যারা কুফরী নীতি অবলম্বন করেছে, গোটা পৃথিবীর ধন-সম্পদও যদি তাদের করায়ত্ত হয় এবং তার সাথে সম পরিমাণ সম্পদ আরো একত্র করে দেয়া হয় আর তারা যদি তা ফিদিয়া হিসাবে দিয়ে কিয়ামত দিনের আযাব থেকে রক্ষা পেতে চায়, তবুও তা তাদের কাছ থেকে কবুল করা হবে না, তারা তীব্র যন্ত্রণাদায়ক আযাব ভোগ করতে বাধ্য। তারা জাহান্নামের অগ্নি-গহ্বর থেকে বের হতে চাইবে কিন্তু তা থেকে তারা বের হতে পারবে না। তাদের জন্য স্থায়ী আযাব নির্দিষ্ট করা হবে। (সূরা মায়িদা-৩৬-৩৭)
আল্লাহদ্রোহী হিসাবে যারা পরিচিতি লাভ করেছে, তারা কখনোই জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে না। জান্নাতীরা জান্নাতে যেমন চিরকাল অবস্থান করবে, আল্লাহবিদ্রোহীরা তেমনি জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। জাহান্নামে একটি যুগ অতিবাহিত হতে না হতেই আরেকটি নতুন যুগের সূচনা হবে। এভাবে একের পর এক চলতেই থাকবে। আল্লাহর কোরআনে এই বিষয়টিকে বুঝানোর জন্য কোথাও আহ্‌কাব শব্দ, কোথাও খুলুদ শব্দ আবার কোথাও আবাদা শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর অর্থ হলো চিরকাল। জাহান্নাম নামক সেই ভয়ংকর স্থানটা হচ্ছে বিচিত্র রকমের অসহনীয় যন্ত্রণার বিশাল বিভিষীকাময় অগ্নিদীপ্ত কারাগার। এর মধ্যেকার আযাবের কারণে দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এমনকি মানবদেহের মধ্যে অবস্থিত হৃদপিন্ড, নাড়ীভূড়ি, শিরা-উপশিরা, অস্থিমজ্জা ইত্যাদীর বিকৃতি ঘটবে। সেখান হতে মুক্তি পাবার বা পালিয়ে যাওয়ার কোন পথ নেই। ওই জাহান্নামে আযাবের কারণে কোনদিন মৃত্যু হবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আর তুমি কি জানো, জাহান্নাম কি? তা শান্তিতেও থাকতে দেয়না আবার ছেড়েও দেয় না। চামড়া ঝলসিয়ে দেয়। (সূরা মুদ্দাচ্ছির- ২৭)

জাহান্নামে কারো মৃত্যু হবে না

পৃথিবীতে মানুষ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। জাহান্নামেও আল্লাহর বিধান অমান্যকারীগণ বর্ণনাতীত কষ্ট পাবে। কিন্তু সেখানে তাদের কারো মৃত্যু হবে না। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
জাহান্নামে মৃত্যু বলে কিছু থাকবে না। কোরআন বলছে, (জাহান্নামে) সে মরবেও না আবার জীবিতও থাকবে না। (আ’লা- ১৩)
সেদিন জাহান্নাম প্রচন্ড ক্রোধে যেন ফেটে পড়তে চাইবে। মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তারা (অপরাধীগণ) যখন সেখানে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন (জাহান্নামের) ক্ষিপ্রতার তর্জন-গর্জন শুনতে পাবে। এবং (জাহান্নামের আগুন) উথাল-পাতাল করতে থাকবে, ক্রোধ আক্রোশে এমন অবস্থা ধারণ করবে যে মনে হবে প্রচন্ড ক্রোধে তা ফেটে পড়বে। (সূরায়ে মুলক- ৭-৮)

জাহান্নাম প্রচন্ড আক্রোশে গর্জন করতে থাকবে

হাশরের ময়দানে অপরাধীদেরকে দেখে জাহান্নাম প্রচন্ড আক্রোশে গর্জন করতে থাকবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
জাহান্নাম যখন দূর হতে তাদেরকে (অপরাধীদেরকে) দেখতে পাবে তখন তারা (পাপীগণ) তার (জাহান্নামের) ক্রোধ ও তেজস্বী গর্জন শুনতে পাবে। আর যখন তাদেরকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা সেখানে কেবল মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। (ফুরকান-  ১২-১৩)

জাহান্নাম অপরাধীদের যন্ত্রণাময় বাসস্থান

জাহান্নাম অপরাধীদের যন্ত্রণাময় বাসস্থান। কিন্তু এরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কোরআন বলছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
জাহান্নামের সাতটি দরোজা (স্তর) আছে। প্রত্যেকটি দরোজার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দল নির্ধারিত আছে। (সূরায়ে হিজর-৪৪)
অকল্পনীয় যন্ত্রণাদায়ক একটি বিশাল এলাকা নিয়ে জাহান্নাম গঠিত। যেখানে অপরাধের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের শাস্তির জন্যে ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ বা এলাকা নির্ধারিত আছে। এ সমস্ত এলাকা সাত ভাগে বিভক্ত। যথা-(এক) হাবিয়া (দুই) জাহীম (তিন) সাকার (চার) লাযা (পাঁচ) সাঈর (ছয়) হুতামাহ্‌ (সাত) জাহান্নাম।
পৃথিবীতে পাপীদের শ্রেনী বিভাগ রয়েছে। সবার পাপ এক ধরনের নয়। চুরির দায়ে কেউ খুনের আসামীর প্রাপ্য শাস্তি পেতে পারে না। মিথ্যা কথা বলার দায়ে কেই মদ পানকারীর প্রাপ্য শাস্তি পেতে পারে না। সেহেতু জাহান্নামের সাতটি স্তরে পাপীদের পাপের ধরণ অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।
এই সাতটি স্তরের মধ্যে আবার প্রত্যেকটি স্তরেও অনেকগুলো বিভাগ আছে। যেমন- গাছ্‌ছাকঃ এই গাছ্‌ছাক হলো একটি বিশাল আকৃতির পুকুর বা হ্রদ। এখানে জাহান্নামীদের রক্ত, ঘাম ও পুঁজ জমা হবার স্থান। এসব কিছু প্রবাহিত হয়ে গাছ্‌ছাকে জমা হবে। গিছলিনঃ এই গিছলিন হচ্ছে জাহান্নামীদের মল-মূত্র জমা হওয়ার স্থান। জাহান্নামীগণ যখন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় চিৎকার করে খাদ্য-পানিয় চাইবে তখন গাছ্‌ছাক ও গিছলিন থেকে ওই সমস্ত মল-মূত্র, রক্ত, পূঁজ, ক্ষরণ ইত্যাদী এনে তাদেরকে খেতে দেয়া হবে। এসব খেয়ে আযাব বৃদ্ধিই পাবে। তীনাতুল খবলঃ এই তীনাতুল খবলও এমন একটি স্থান যেখানে তীনাতুল খবল নামক বিষাক্ত পদার্থ ও পূঁজে পরিপূর্ণ একটি কুপ বিশেষ। সাউদঃ সাউদ হলো তীনাতুল খবলের কিনারে অবস্থিত একটি বিশাল আকৃতির পাহাড়। এক শ্রেণীর অপরাধীদেরকে উক্ত পাহাড়ে উঠিয়ে সাজোরে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়া হবে। অপরাধীদের দেহ থেত্‌লে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আবার তাকে পূর্বের ন্যায় গঠন করে পাহাড়ে উঠিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলা হবে। অনন্তকাল ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।
যব্বুল হজনঃ এই যব্বুল হজনে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে, যারা অহংকার প্রকাশ করতো এং মানুষের সামনে রিয়া প্রকাশ করতো। রিয়া অর্থ হলো প্রদর্শন করা। যেমন, ‘দেখো, আমি একজন নামাজী, আমি রোজাদার।’ যামহারীরঃ এই যামহারীর হলো প্রচন্ড শীতের স্থান। যেখানে তাপমাত্রা হলো শুন্য ডিগ্রীর চেয়েও কয়েক শত ডিগ্রীর নিচে। পৃথিবীতে সবচেয়ে ঠান্ডার স্থান হলো এন্টারটিকা। যেখানে শুধু বরফ আর বরফ। নিশ্বাস ফেললেও তা বরফ হয়ে যায়। কিন্তু সে ঠান্ডার মধ্যেও প্রাণী বাস করে। এন্টারটিকায় যে প্রাণীগুলো দেখতে পাওয়া যায়, সে সমস্ত প্রাণীকে মহান আল্লাহ ঠান্ডায় বাস করার মতো উপকরণ এবং দৈহিক শক্তি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। ভাল্লুক, শিয়াল, হাঁস, মুরগী, কুকুর, ইঁদুর, শীলসহ অনেক প্রাণীকে দেখা যায় তারা এন্টারটিকায় বরফের মধ্যে বাস করছে। মানুষও সেখানে বেঁচে থাকার উপরকণ নিয়ে যায়।
কিন্তু হাশরের ময়দানে জাহান্নামের যামহারীর বিভাগে যে কি পরিমাণ ঠান্ডা বিরাজ করছে তা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। গাইঃ এই গাই হলো গোটা জাহান্নামের মধ্যে সব চেয়ে ভয়ংকর স্থান। এই গাই প্রতি মুহূর্তে ভীতিজনক হুংকার ছাড়ছে। গাইয়ের হুংকার শুনে জাহান্নামের অন্যান্য এলাকা প্রতিদিন চারশত বার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলছে, হে আল্লাহ! গাই হতে আমাদেরকে রক্ষা করো!

অস্বীকারকারীদের জন্যই জাহান্নাম

যে কোন পাপীর জন্যই জাহান্নামের শাস্তি নয়- মূলত পৃথিবীতে যারা আল্লাহর বিধানের সাথে বিরোধিতা করেছে, ইসলামী আন্দোলনের সাথে শত্রুতা পোষণ করেছে, তাদের জন্যই জাহান্নাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
প্রত্যেক অস্বীকারকারীকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো, যে সত্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী, সৎপথের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী, সীমালংঘনকারী এবং দ্বীনের প্রতি সন্দেহ পোষণকারী। (সূরায়ে কাফ- ২৪-২৫)
যে সমস্ত কারণে এক শ্রেণীর মানুষকে জাহান্নামে পাঠিয়ে কঠোর আযাব দেয়া হবে, কোরআন ও হাদিস মনোযোগ দিয়ে অধ্যায়ন করলে তার প্রধান প্রধান কারণ জানা যায়। অর্থাৎ জাহান্নামীদের প্র্রধান প্রধান অপরাধ সম্পর্কে জানা যায়। যেমন- (এক) আল্লাহ যে সমস্ত নবী ও রাসূলকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থাসহ পাঠিয়েছিলেন, সেই জীবন ব্যবস্থাকে গ্রহন করতে অস্বীকার করা, তাদের সাথে শত্রুতা করা। (দুই) নবী ও রাসূলদের অবর্তমানে যারা অন্যদেরকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার দিকে ডাকে, তাদের সাথে বিদ্বেষ পোষণও শত্রুতা করা। (তিন) প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর অনুগ্রহে জীবিত থেকে তাঁর দেয়া নিয়ামত ভোগ করেও তাঁর শুকরিয়া আদায় না করে অকৃতজ্ঞ হওয়া। (চার) ইসলামী জীবন ব্যবস্থা নিজে গ্রহণ না করে অপরকে গ্রহণ করতে না দেয়া, অপরকে পথভ্রষ্ট করা, ইসলামী আইন যাতে চালু হতে না পারে সেই চেষ্টা করা। (পাঁচ) আল্লাহ যে ধন সম্পদ দান করেছেন, তা থেকে আল্লাহর পথে খরচ না করা ও মানুষের হক আদায় না করা।
(ছয়) জীবনে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমালংঘন করা অর্থাৎ আল্লাহর আই মেনে না চলা। (সাত) অন্যের প্রতি অন্যায় অবিচার ও অত্যাচার করা। (আট) ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রতি সন্দেহ পোষণ করা। (নয়) অন্যের মনে ইসলামের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করা। (দশ) আল্লাহর সাথে শরীক করা। (এগার) যা দেয়ার ক্ষমতা শুধু মাত্র আল্লাহর, তা আল্লাহর কাছে  না চেয়ে অন্যের কাছে চাওয়া। (বার) ইসলামের নামে ভন্ডামী করা। (তের) অন্যায় কাজে সাহায্য করা। (চৌদ্দ) আল্লাহকে বেশী ভয় না করে মানুষকে বেশী ভয় করা। (পনের) সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্বেও সমাজে দেশে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা না করা। (ষোল) নিজের সুবিধা অনুযায়ী ইসলামের কিছু আইন মেনে চলা ও কিছু আইন না মানা।

জাহান্নামের দ্বাররক্ষী প্রশ্ন করবে

সেদিন অপরাধীদেরকে যখন জাহান্নামের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে তখন জাহান্নামের দ্বার রক্ষী প্রশ্ন করবে। সূরা যুমার-এ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
অবিশ্বাসী কাফেরদের দলে দলে জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। জাহান্নামের রক্ষক দ্বার খুলে দিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে- তোমাদের নিকট কি আল্লাহর রসূলগণ তাঁদের প্রভূর আয়াত সমূহ পাঠ করে শুনাননি? তোমরা যে এদিনের সম্মুখীন হবে সে সম্পর্কে তারা কি তোমাদেরকে সর্তক করে দেননি? অপরাধীগণ উত্তরে বলবে- হ্যাঁ, তাঁরা সবই তো করেছেন। কিন্তু কাফেরদের জন্যে শাস্তির যে ওয়াদা করা হয়েছিল, সেদিন তা পূর্ণ করা হবে। তারপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করো। অহংকারী কাফেরদের জন্য ভয়ানক গর্হিত স্থান এ জাহান্নাম। আর এখানেই তাদেরকে থাকতে হবে চিরকাল।

অমান্যকারীদের জন্যই জাহান্নাম

মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ঘোষণা করছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যে সব লোক তাদের অস্বীকার ও অমান্য করেছে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। তা মুলতঃ অত্যন্ত ভয়ংকর আবাসস্থল। (মুলক- ৬)
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যারা কুফুরী করেছে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে, তাদের উপরে আল্লাহর অভিশাপ, ফেরেশ্‌তাদের ও সমস্ত মানুষের অভিশাপ। এ অবস্থায় তারা (জাহান্নামে) অনন্তকাল অবস্থান করবে। তাদের শাস্তি কমানোও হবে না অথবা অন্য কোন অবকাশও দেয়া হবে না। (বাকারা-  ১৬১-১৬২)
আল্লাহর নাজিল করা কিতাব পবিত্র কোরআনের সূরা দাহ্‌রে বলা হয়েছে-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আমরা কাফেরদের জন্যে শিকল, কন্ঠ কড়া, ও দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা দাহর- ৪)
সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে ধারণা প্রচলিত আছে, যারা ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম অনুসরণ করে তারাই কাফের। অবশ্যই মানুষের এ ধারণা সত্য। কিন্তু এর পরেও কথা রয়ে যায়। কাফের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে হলে মুসলিম সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। মুসলিম আরবী শব্দ। যার অর্থ আত্মসমর্পণ করা। অর্থাৎ যে বা যারা স্বইচ্ছায় আল্লাহর আইন-কানুন যা তাঁর নবীর মাধ্যমে মানুষের কাছে এসেছে, তাঁর প্রতি অন্তরের বিশ্বাস পোষণ ও মান্য করে এক কথায় তারাই মুসলিম। মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করলেই কেউ মুসলিম হতে পারে না। মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণ করে যদি কেউ ইসলামের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে, তারা অবশ্যই কাফের।
কুফুর শব্দের অর্থ গোপন করা, লুকানো। যেমন ঈমান অর্থ মেনে নেয়া, কবুল করা, স্বীকার করা, এর বিপরীতে কুফুর শব্দের অর্থ না মানা, প্রত্যাখ্যান করা, অস্বীকার করা। কোরআন ও হাদিসের বর্ণনার প্রেক্ষিতে কুফুরীর মনোভাব ও আচার আচরণ বিভিন্ন প্রকার। (১) আল্লাহকে বা তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করা। অথবা তাঁর সার্বভৌমত্ব কতৃêত্ব ও ক্ষমতা স্বীকার না করা এবং তাকে নিজের ও সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক, প্রভু, উপাস্য ও মাবুদ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করা। অথবা তাকে একমাত্র মালিক বলে না মানা। (২) আল্লাহকে মেনে নিয়েও মানুষ কাফের হয়। এই ধরনের কাফেরের সংখ্যা বর্তমান মুসলমান নামে পরিচিত বা দাবীদারদের মধ্যে বেশী। অর্থাৎ মুখে আল্লাহকে স্বীকৃতি দেয় বটে কিন্তু তাঁর বিধান ও হেদায়েত সমূহকে জ্ঞান ও আইনের একমাত্র উৎস হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করা। (৩) নীতিগতভাবে একথা মেনে নেয়া যে, তাকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলতে হবে কিন্তু আল্লাহ তাঁর বিধান ও বানীসমূহ যেসব নবী রাসুলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন তাদেরকে অস্বীকার করা। (৪) নবীদের মধ্যে পার্থক্য করা এবং নিজেদের পছন্দ ও মানসিক প্রবণতা বা গোত্রীয় ও দলীয় প্রীতির কারণে তাদের মধ্যে হতে কাউকে মেনে নেয়া এবং কাউকে না মানা। (৫) নবী ও রাসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে আকীদাহ্‌ বিশ্বাস নৈতিক-চরিত্র ও জীবন-যাপনের বিধান সম্বলিত যে সব শিক্ষা মানুষের কাছে পেশ করেছেন, এসব শিক্ষার কিছু অংশ গ্রহণ ও কিছু অংশ বর্জন করা। (৬) আল্লাহর বিধান মেনে নেয়ার পরও জেনে বুঝে পার্থিব কোন স্বার্থের কারণে আল্লাহর বিধানের সাথে নাফরমানি করা। নিজে খুবই ধর্মভীরু এমনভাব দেখিয়ে মানুষকে ধোকা দেয়া।
উল্লেখিত সমস্ত চিন্তা, বিশ্বাস ও কাজ আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করার শামিল। উল্লেখিত চিন্তা, বিশ্বাস ও কাজকে কোরআনে কুফুরি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও কোরআনের কোন কোন আয়াতে ‘কুফর’ শব্দটি আল্লাহর দান, অনুগ্রহ, নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে অমুসলিমগণ সরাসরি বা প্রকাশ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে তেমন একটা কিছু করে না কিন্তু তারাই সবকিছু করাচ্ছে। যাদের মাধ্যমে অমুসলিম শক্তি ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে তারা সবাই মুসলিম নামেই পরিচিত। এই তথা কথিত মুসলমান নামের দাবীদারগণ কোন কোন ক্ষেত্রে ইসলামী লেবাছ পরে ইসলামের সাথে দুশমনি করছে।
মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়ে, মুসলিম নাম ধারণ করে, ইসলামী লেবাছ ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে নেতার আসনে বসে একশ্রেনীর মানুষ পার্থিব স্বার্থের কারণে ইসলামের সাথে শত্রুতা করছে। মুলতঃ এরা অমুসলিম শক্তির হাতের পুতুল মাত্র। মহান আল্লাহ তা’য়ালা সূরা আ’রাফে বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যারা আমার আয়াতগুলোকে মিথ্যা মনে করে অস্বীকার করেছে এবং বিদ্রোহীর ভূমিকা অবলম্বন করেছে, তাদের জন্যে আসমানের দরোজা কখনো খোলা হবে না। তাদের জান্নাতে প্রবেশ ততোখানি অসম্ভব যতোখানি অসম্ভব সুঁইয়ের ছিদ্র পথে উটের প্রবেশ। অপরাধীদের জন্য প্রতিফল এমনই হওয়া উচিত। তাদের জন্য আগুনের শয্যা ও চাদর নির্দিষ্ট আছে। আমরা জালেমদেরকে এরকম প্রতিফলই দিয়ে থাকি? (সূরা আল আ’রাফ)
পৃথিবীতে যারা ইসলামের সাথে বিরোধীতা করছে, ইসলামকে শুধু মসজিদ মাদ্রাসা, খানকায় বন্দী করার চক্রান্ত করছে, তাদের জন্যে আকাশের দরোজা খোলা হবে না। মুখে তারা যতেই ইসলামের কথা বলুক না কেন, তাদের ভন্ডামী আল্লাহ ভালোই বোঝেন। তাদের পক্ষে জান্নাতে প্রবেশ অসম্ভব। সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে যেমন কখনো উট প্রবেশ করতে পারবে না, তেমনি ওই সমস্ত লোকের পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব হবে না। এরা যতই নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবী করুক না কেন-আসলে এরা অবশ্যই জাহান্নামী হবে।
মহান আল্লাহ কোরআনে এক শ্রেণীর মানুষের কথা উল্লেখ করে তাদেরকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট তখা শুকর ও কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে  বর্ণনা  করেছেন। এরা হলো ওই সমস্ত মানুষ, যারা পৃথিবীতে পার্থিব যোগ্যতার ভিত্তিতে কেউ বুদ্ধিজীবী, কেউ কবি, কেউ সাহিত্যিক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ প্রফেসর-প্রিন্সিপাল, কেউ অভিনেতা সেজে বসেছে। পার্থিব ক্ষেত্রে এরা যথেষ্ট জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী। কিন্তু ইসলামের ব্যাপারে এরা একেবারে গন্ড মূর্খের ন্যায়। এদের মাথায় ঘিলু আছে, তা দিয়ে পৃথিবীতে কি করে উন্নতি করা যায় শুধু সেই চিন্তাই করে। আল্লাহ, রাসূল, কোরআন-হাদীস সম্পর্কে এরা মুহূর্ত কাল ভেবে দেখেনা। এদের চোখ আছে, তা দিয়ে পৃথিবীর রঙ্গ-রস তারা দেখে কিন্তু আল্লাহর বিধান মানুষের কাছে কি দাবী করে, তা ওরা দেখে না। এদের কান আছে, সে কান দিয়ে পৃথিবীতে সব কথা শুনতে পারে কিন্তু আল্লাহ-রাসুলের কথা শুনে না। এরাই হলো জাহান্নামী। এদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
আরবী,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আমরা জাহান্নামের জন্য বহু জ্বীন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি, তাদের কাছে অন্তর আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে চিন্তা ভাবনা করে না। তাদের চোখ আছ তবুও তারা দেখেনা। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তার শুনেনা। তারা জন্তু জানোয়ারের মতো বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট, এরাই গাফেলদের অন্তর্ভূক্ত। (সূরায়ে আরাফ- ১৭৯)



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 28 August 2010 )