আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কি করবেন? প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী   
Wednesday, 20 August 2008

কবর বলতে কি বুঝায়?
কবর সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে, মৃত্যুর পর মানুষের রুহ বা আত্মা কোথায় যায় এবং কোথায় অবস্থান করে। কিয়ামত সংঘটিত হবার পরে বিচার শেষে মানুষ জান্নাত বা জাহান্নামে অবস্থান করবে। কিন্তু এর পূর্বে সুদীর্ঘকাল মানুষের আত্মা কোথায় অবস্থান করবে? কোরআন-হাদীসে এর স্পষ্ট জবাব রয়েছে। মৃত্যুর পরের সময়টিকে যদিও পরকালের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে, তবুও কোরআন-হাদীস মৃত্যু ও বিচার দিনের মধ্যবর্তী সময়কে আলমে বরযখ নামে অভিহিত করেছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এবং তাদের পেছনে রয়েছে বরযখ- যার সময়কাল হচ্ছে সেদিন পর্যন্ত যেদিন তাদেরকে পুনর্জীবিত ও পুনরুত্থিত করা হবে। (সূরা মুমিনুন-১০০)

এই আয়াতে যে বরযখ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, এর অর্থ হলো যবনিকা পর্দা। অর্থাৎ পর্দায় আবৃত একটি জগৎ-  যেখানে মৃত্যুর পর থেকে আখিরাতের পূর্ব পর্যন্ত মানুষের রুহ্‌ অবস্থান করবে। ইসলাম পাঁচটি জগতের ধারণা মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে। প্রথম জগৎ হলো, রুহ্‌ বা আত্মার জগৎ-  যাকে আলমে আরওয়াহ্‌ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় জগৎ হলো মাতৃগর্ভ বা আলমে রেহেম। তৃতীয় জগৎ হলো আলমে আজসাম বা বস্তুজগৎ-  অর্থাৎ এই পৃথিবী। চতুর্থ জগৎ হলো আলমে বরযাখ বা মৃত্যুর পর থেকে আখিরাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যে সুক্ষ্ম জগৎ রয়েছে, যেখানে মানুষের আত্মা অবস্থান করছে। পঞ্চম জগৎ হলো আলমে আখিরাত বা পুনরুত্থানের পরে অনন্তকালের জগৎ।
এ কথা স্পষ্ট মনে রাখতে হবে যে, রুহ বা আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর পর এই পৃথিবী থেকে আত্মা আলমে বরযখে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ আত্মা দেহ ত্যাগ করে মাত্র, তার মৃত্যু হয় না। আলমে বরযখের বিশেষভাবে নির্দিষ্ট যে অংশে আত্মা অবস্থান করে সে বিশেষ অংশের নামই হলো কবর।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে কবর একটি মাটির গর্ত মাত্র যার মধ্যে মৃতদেহ সমাহিত করা হয়। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই দেহ পচে গলে যায়। মাটি এই দেহ খেয়ে নিঃশেষ করে দেয়। কিন্তু প্রকৃত কবর এক অদৃশ্য সুক্ষ্ম জগৎ। যা মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও কল্পনারও অতীত। প্রকৃত ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পর মানুষ কবরস্থ হোক, চিতায় জ্বালিয়ে দেয়া হোক, বন্য জন্তুর পেটে যাক অথবা পানিতে ডুবে মাছ বা পানির অন্য কোনো প্রাণীর পেটে যাক, সেটা ধর্তব্য বিষয় নয়। মানুষের দেহচ্যুত আত্মাকে যে স্থানে রাখা হবে সেটাই তার কবর। অর্থাৎ মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে আখিরাতের পূর্ব পর্যন্ত যে অদৃশ্য জগৎ রয়েছে, সেই জগতকেই আলমে বরযখ বলা হয় এবং আলমে বরযখের নির্দিষ্ট অংশ, যেখানে মানুষের আত্মাকে রাখা হয়- সেটাকেই কবর বলা হয়। মাটির গর্ত কবর নয়-  আলমে বরযখে দুটো স্থানে মানুষের আত্মাকে রাখা হবে। একটি স্থানের নাম হলো ইল্লিউন আর আরেকটি স্থানের নাম হলো সিজ্জীন। ইল্লিউন হলো মেহমানখানা, অর্থাৎ পৃথিবীতে যারা মহান আল্লাহর বিধান অনুসারে নিজেদের জীবন পরিচালিত করেছে, তারাই কেবল ঐ মেহমানখানাই স্থান পাবে। আর যারা পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান অমান্য করেছে, নিজের খেয়াল-খুশী অনুসারে চলেছে, মানুষের বানানো আইন-কানুন অনুসারে জীবন চালিয়েছে, তারা স্থান পাবে সিজ্জীনে। সিজ্জীন হলো কারাগার। আল্লাহর কাছে যারা আসামী হিসেবে পরিগণিত হবে, তারা কারাগারে অবস্থান করবে।
কোরআন-হাদীস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কবরে ভোগ-বিলাস অথবা ভয়ঙ্কর আযাবের ব্যবস্থা থাকবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের যে কেউ মৃত্যুবরণ করে, তাকে তার অন্তিম বাসস্থান সকাল-সন্ধ্যায় দেখানো হয়। সে জান্নাতী হোক বা জাহান্নামী হোক। তাকে বলা হয়, এটাই সেই বাসস্থান যেখানে তুমি তখন প্রবেশ করবে যখন আল্লাহ তা’য়ালা কিয়ামতের দিনে দ্বিতীয়বার জীবনদান করে তাঁর কাছে তোমাকে উপস্থিত করবেন। (বোখারী, মুসলিম)
ইন্তেকালের পরপরই কবরে বা আলযে বরযখে গোনাহ্‌গারদের শাস্তি ও আল্লাহর বিধান অনুসরণকারী বান্দাদের সুখ-শান্তির বিষয়টি মহাগ্রন্থ আল কোরআন এভাবে ঘোষণা করেছে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যদি তোমরা সে অবস্থা দেখতে যখন ফেরেশ্‌তাগণ কাফিরদের আত্মা হরণ করছিলো এবং তাদের মুখমন্ডলে ও পার্শ্বদেশে আঘাত করছিলো এবং বলছিলো, নাও, এখন আগুনে প্রজ্জ্বলিত হওয়ার স্বাদ গ্রহণ করো। (সূরা আনফাল-৫০)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের আরেক আয়াতে বলেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
ঐসব আল্লাহভীরু লোকদের রুহ্‌ পবিত্র অবস্থায় যখন ফেরেশ্‌তাগণ বের করেন তখন তাদেরকে বলেন, আস্‌সালামু আলাইকুম। আপনারা যে সৎ কাজ করেছেন এর বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করুন। (সূরা নহল-৩২)
বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, আলমে বরযখে বা কবরে মানুষকে শ্রেণী অনুসারে জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশের কথা শুনানো হয়। আখিরাতে বিচার শেষে জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশের পূর্বে আলমে বরযখে বা কবরে আযাবের মধ্যে সময় অতিবাহিত করবে আল্লাহর বিধান অমান্যকারী লোকজন এবং যারা কোরআনের বিধান অনুসারে চলেছে তারা পরম শান্তির পরিবেশে সময় অতিবাহিত করবে। সুতরাং মৃত্যুর পরে মানুষের দেহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক, এটা কোনো বিষয় নয়, যা কিছু ঘটবে তা আত্মার ওপর ঘটবে অথবা আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছে করলে ঐ দেহ তৎক্ষণাত প্রস্তুত করতেও সক্ষম। কবর ভেঙ্গে যাক বা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাক এটা ধর্তব্য বিষয় নয়। কবরে শান্তি বা আযাবের বিষয়টি অবধারিত সত্য, কোরআন-হাদীসে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কথা বলা হয়েছে।
পরকালীন জগৎ কাল্পনিক কোনো জগৎ নয়
এ কথা স্পষ্ট মনে রাখতে হবে যে, এই পৃথিবীর জীবন হলো একজন মুসাফীরের অনুরূপ। এই জীবন মাকড়সার জালের ন্যায় অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। যে কোনো মুহূর্তে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর এই জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এই দৃশ্য আমরা সময়ের প্রত্যেক মুহূর্তে অবলোকন করছি। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার ক্ষমতা কারো নেই। বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এবং পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি পর্যন্ত কেউ-ই মৃত্যুর অমোঘ ছোবল থেকে সুরক্ষিত কোনোকালে থাকেনি। মহান আল্লাহর চিরন্তন বিধানে প্রাণীজগতের সকল প্রাণীকেই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, হতে হচ্ছে এবং আগামীতেও হতে হবে। গতকাল সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় সমাসীন ব্যক্তি আজ কফিনে আবৃত হয়ে নিরব-নিস্তব্ধ অবস্থায় পরকালের অনন্ত জগতে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, মাতৃগর্ভে অবস্থানকালে অবোধ শিশুটি এই পৃথিবীর বিশালত্ব সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা লাভ করেনি, তাই বলে এই চলমান পৃথিবীর ক্রিয়াকলাপ অস্তিত্বহীন ছিলো না। অনুরূপভাবে বুঝতে হবে, মানুষ এই পৃথিবীতে অবস্থানকালে পরকালীন জগৎ সম্পর্কে কোনো কিছু অনুভব করতে সক্ষম না হলেও পরকালীন জগৎ কাল্পনিক কোনো জগৎ নয়। মৃত্যুর পরের জগৎ একটি অটল বাস্তবতা, একটি কঠিন সত্য এবং অনঢ় অবিচল বাস্তব সত্য। পৃথিবীর যাবতীয় কর্মকান্ডের পুক্মখানুপুক্মখ হিসাব দিতে হবে এবং হিসাবের পরে কেউ সৎকর্মের পুরস্কার হিসাবে জান্নাত লাভ করবে আবার কেউ অসৎ কর্মের শাস্তি হিসাবে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এসব বিষয় কোনো উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা নয়, অবশ্যই পরকাল ঘটবে এবং মহান আল্লাহর সামনে সমস্ত মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। এ জন্য পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের ওপর পরকালীন জীবনকে প্রাধান্য দিতে হবে। দুনিয়ার জীবনে পরকালীন জীবনকে প্রাধান্য দিতে সক্ষম না হলে কোরআন সুন্নাহর বিধি-বিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। আর পরকালীন জীবনকে প্রাধান্য দিতে না পারলে তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত। পরকালীন জীবনে সফলতা অর্জন করতে হলে এই পৃথিবী থেকেই মুক্তির যাবতীয় উপায়-উপকরণ সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য দুনিয়ার এই স্বল্পকালীন জীবনকে মুক্তির সম্বল হিসাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেক ব্যক্তির অপরিহার্য কর্তব্য হলো, সে যেনো পরকালের জন্য পূর্বেই কি সম্বল সংগ্রহ করেছে তা ভেবে জীবন পথে অগ্রসর হওয়া। (আবার শোন) তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই তোমরা যা করছো আল্লাহ তা’য়ালা তার সবটাই জানেন। তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী যা করছো তাও তিনি দেখেন ও জানেন। (কোরআন)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অসন্তুষ্ট হতে পারেন, এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড তোমাদের দ্বারা সংঘটিত হলে সেটাও তিনি পরিপূর্ণরূপে দেখেন ও জানেন। পৃথিবীর জীবনে অন্যায় ও অপরাধমূলক কর্মের সমুদ্রেও যদি তোমরা নিমজ্জিত হও, তাহলে পরকালের জীবনে আল্লাহ তা’য়ালাকে বিচার এড়িয়ে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে না। কারণ তিনি তোমাদের আদি-অন্ত, প্রকাশ্য-গোপন, ন্যায়-অন্যায় ও ইনসাফ-জুলুম সমস্ত কিছুই জানেন ও দেখেন। সুতরাং সাবধান! আমার সাথে হঠকারিতা করো না। অনন্ত অসীম পরকালের জীবনে চিরস্থায়ী শান্তির স্থান জান্নাত লাভ ও মহান আল্লাহ তা’য়ালার দর্শন লাভের সম্বল সংগ্রহের স্থান এই পৃথিবীর জীবনকে অবহেলায় কাটিয়ে দিও না। পৃথিবীর জীবনের সদ্ব্যবহার করো তাহলে তোমরা আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাত লাভ করতে পারবে। পৃথিবীর জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্ত পরকালের জীবনে মুক্তির পথে ব্যয় করবে।
পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে
তিরমিযী হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
পাঁচটি অবস্থার পূর্বে পাঁচটি অবস্থাকে গনীমত বলে গণ্য করবে। (১) বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে। (২) অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে। (৩) অভাবের পূর্বে স্বচ্ছলতাকে। (৪) অধিক ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে। (৫) মৃত্যুর পূর্বে হায়াতকে।
অর্থাৎ সৎকাজে অলসতা করো না, গোনাহের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তোমার জীবন আর কতক্ষণ অবশিষ্ট রয়েছে, তুমি কতক্ষণ সুস্থ থাকবে আর অবসর পাবে কিনা তুমি জানো না। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করো। আল্লাহর অসন্তুষ্টির কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের দুই পা কোনো দিকে নড়াতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে। (১) পৃথিবীতে তাকে যে হায়াত দেয়া হয়েছিলো, সে হায়াত কোন্‌ পথে ব্যয় করা হয়েছে। (২) সে তার যৌবনকে কোন্‌ পথে ব্যয় করেছে। (৩) সম্পদ কোন্‌ পথে উপার্জন করেছে। (৪) সম্পদ কোন্‌ পথে ব্যয় করেছে। (৫) যে জ্ঞান তাকে দেয়া হয়েছিলো, তা কোন্‌ কাজে লাগিয়েছে। (তিরমিযী)
এই পাঁচটি প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব না দেয়া পর্যন্ত আখিরাতের ময়দানে কোনো মানুষের পক্ষে এক কদমও এদিক-ওদিক যাওয়া সম্ভব হবে না। আর যে পাঁচটি প্রশ্ন করা হবে, এই প্রশ্নের জবাবের মধ্যে একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গোটা জীবনকালের পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট দেখা যাবে। প্রথম প্রশ্ন করা হবে, পৃথিবীতে তাকে যে হায়াত বা জীবনকাল দেয়া হয়েছিলো, এই জীবনকাল সে কিভাবে কোন্‌ পদ্ধতি অনুযায়ী বা কোন্‌ বিধান অনুসারে পরিচালিত করেছে? পৃথিবীতে একজন মানুষও কোনো ধরনের আইন-কানুন ও বিধান ব্যতীত নিজের জীবন পরিচালনা করতে পারে না। সন্তান যখন মাতৃগর্ভে আগমন করে, তখন সেই মা’কে পারিবারিক বা সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত কারণে কিছু না কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। সন্তান যখন মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়, তখনও কোনো না কোনো নিয়ম-কানুন মা’কে পালন করতে হয়। এরপর সেই সন্তানের প্রতিপালন ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। এসব নিয়ম অনুসরণ করা ব্যতীত মানুষ চলতে পারে না।
এরপর সেই মানুষকে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের অধীনে বাস করতে হয়। এখানেও তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত আইন-কানুন মেনে চলতে হয়। সেই মানুষ যদি রাজনীতি করে, তাহলে তাকে একটি রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ করতে হয়। সে যদি কোনো দল করে, তাহলে সেই দলের আদর্শ তাকে মেনে চলতে হবে অথবা সমর্থন দিতে হবে। সে যদি সক্রিয়ভাবে কোনো দল না-ও করে, তাহলে দেশের নাগরিক হিসেবে তাকে অন্তত ভোট দেয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয়। ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তাকে একটি নিয়ম অনুসরণ করতে হয় এবং বিশেষ কোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে হয়। পৃথিবীতে জীবিকা অর্জনের ব্যাপারে মানুষকে কোনো কোনো পেশা অবশ্যই গ্রহণ করতে হয় এবং সেই পেশাও কোনো না কোনো নিয়মের অধীন। সেই নিয়ম অনুসরণ করেই তাকে জীবিকা অর্জন করতে হয়। কোনো কারণবশতঃ কোনো মানুষকে যদি আইন-আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়, তাহলে সেখানে তাকে আইনের সিদ্ধান্ত মেনে নিতেই হবে। এভাবে করে প্রত্যেকটি মানুষকে পৃথিবীতে বিশেষ আইন-কানুন, বিধান, নিয়ম-পদ্ধতি মেনে নিয়েই জীবন পরিচালনা করতে হয়। আখিরাতের ময়দানে প্রথম প্রশ্ন এটাই হবে যে, সে যেসব নিয়ম-পদ্ধতি বা বিধানের অধীনে পৃথিবীতে জীবনকাল অতিবাহিত করেছে, সেই জীবনকাল কি সে মহান আল্লাহর বিধানের অধীনে অতিবাহিত করেছে-  না মানুষের বানানো বিধানের অধীনে অতিবাহিত করেছে?
প্রশ্নের জবাব যদি এটা হয় যে, পৃথিবীতে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে যে জীবনকাল দিয়েছিলেন, সে জীবনকাল আল্লাহর বিধানের অধীনে অতিবাহিত করেছে অথবা এমন দেশে সে বাস করতে বাধ্য হতো, যেখানে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়িত ছিল না, কিন্তু সে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করার জন্য আমরণ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। তাহলে আশা করা যায়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা সেই ব্যক্তির আমলনামা অনুসারে মুক্তির ফয়সালা গ্রহণ করবেন। আর যদি দেখা যায় যে, পৃথিবীর জীবনকাল সে অন্য মানুষের বানানো বিধান অনুসারে অতিবাহিত করেছে, আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানার চেষ্টাও করেনি, এই বিধান বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রামও করেনি এবং যারা করেছে, তাদের প্রতি সমর্থনও দেয়নি। বরং অন্য মানুষের বানানো মতবাদ-মতাদর্শ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তার জীবনকাল অতিবাহিত করেছে। তাহলে আল্লাহ তা’য়ালা সেই ব্যক্তির আমলনামা অনুসারে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
প্রথম প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পাওয়া গেলে পরবর্তী চারটি প্রশ্নের আর প্রয়োজনীয়তা থাকে না। কিন্তু অন্য চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে প্রত্যেকটি মানুষের দুর্বল দিক তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন থাকবে যৌবন কাল সম্পর্কে। জানতে চাওয়া হবে, সে তার যৌবনকাল কোন্‌ পথে ব্যয় করেছে। কারণ যৌবনকাল মানব জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাল তথা স্বর্ণালী সময়। এ সময়ই মানুষের জীবন পরিপূর্ণ হয়, দৈহিক যাবতীয় বৃত্তিনিচয় বিকশিত হয়, স্বভাবগত কামনা-বাসনা অদম্য হয়ে ওঠে, উৎসাহ, উদ্দীপনা শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়, ক্লান্তিহীন কর্ম ক্ষমতা দেহ যন্ত্রকে সচল রাখে এবং যাবতীয় বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করার দুর্বার সাহস পূর্ণ অবয়বে বিকশিত হয়। এই যৌবনকালকে মানুষ আল্লাহর বিধানের অধীনে ব্যবহার করেছে না মনের অদম্য কামনা-বাসনা অনুসারে অথবা আল্লাহদ্রোহী নেতা নেত্রীদের নির্দেশ অনুসারে পরিচালিত করেছে, এর জবাব জানতে চাওয়া হবে।
এরপর প্রশ্ন করা হবে, পৃথিবীতে সম্পদ সে কোন্‌ পথে উপার্জন করেছে? পৃথিবীতে জীবন ধারনের জন্য অর্থ সম্পদ একান্ত প্রয়োজন এবং এসব উপার্জন করাও মানুষের স্বভাবগত চাহিদা। জানতে চাওয়া হবে, এই অর্থ-সম্পদ সে কিভাবে, কোন্‌ পথে উপার্জন করেছে। অর্থ-সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে আদালতে আখিরাতে জবাবদিহির অনুভূতি তার মধ্যে ছিলো কিনা। কাউকে ঠকিয়ে, সমাজ ও দেশের ক্ষতি করে সে অর্থ-সম্পদ উপার্জন করেছে কিনা। সুদ-ঘুষ বা অবৈধ কোনো ব্যবসার মাধ্যমে অথবা অন্যকে শোষণ করে উপার্জন করেছে কিনা। এসব বিষয়ে মানুষকে চুলচেরা হিসাব দিতে হবে।
এরপরে আসবে ব্যয়ের প্রশ্ন। যে অর্থ সম্পদ সে উপার্জন করেছিলো, তা সে কোন্‌ পথে ব্যয় করেছে? তার অর্জিত ধন-সম্পদে নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী ও অভাবীদের যে অধিকার ছিলো, তা সে আদায় করেছে কিনা। আল্লাহ তা’য়ালা যে জীবন ব্যবস্থা দিয়েছেন, তা প্রতিষ্ঠিত করার কাজে সম্পদের কতটুকু অংশ সে ব্যয় করেছে? অথবা আল্লাহর দেয়া এই অর্থ-সম্পদ সে আল্লাহর বিধানের বিপরীত বিধান প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করেছে কিনা। এই সম্পদ সে নিছক ভোগ-বিলাস বা পাপাচারের পথে ব্যয় করেছে কিনা। এই সম্পদ সে প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা অর্জনের কাজে বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করেছে কিনা। এসব অর্থ-সম্পদ মানুষের চরিত্র বিনষ্ট করার কাজে সে ব্যবহার করেছে কিনা, এসব প্রশ্নের জবাব পুক্মখানুপুক্মখরূপে দিতে হবে।
সর্বশেষ প্রশ্ন থাকবে, যে জ্ঞান তাকে দেয়া হয়েছিলো, তা কোন্‌ কাজে লাগিয়েছে। মানুষের পৃথিবীর জীবনকালে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একান্ত অনুগ্রহ করে যে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তাকে দিয়েছিলেন, যতটুকু জ্ঞান-বিবেক, বুদ্ধি তাকে দিয়েছিলেন, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের যে সুযোগ তাকে দিয়েছিলেন, সেই জ্ঞান, শিক্ষা, বিবেক-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা সে কোন্‌ কাজে ব্যবহার করেছে? এসব কিছু সে পৃথিবীতে মহান আল্লাহর বিধানের বিপরীত পথে ব্যবহার করেছে-  না আল্লাহ তা’য়ালার সন্তোষ অর্জনের পথে ব্যবহার করেছে?
এই পাঁচটি প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে হবে এবং সন্তোষজনক জবাবের ওপর নির্ভর করবে মানুষের মুক্তি ও পুরস্কার। আর যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হলে, তাকে ভোগ করতে হবে অবর্ণনীয় শাস্তি এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এই পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষকেই উল্লেখিত প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে, কারণ প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সে যাকিছু পৃথিবীতে করছে, এর দায়-দায়িত্ব একান্তভাবেই তার নিজের ওপর বর্তাবে এবং তাকে জবাবদিহি করতে হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
ভালো করে জেনে রাখো, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যে ব্যক্তি তার রব-এর মহাবিচারের সম্মুখে উপস্থিতিকে ভয় করলো এবং নিজের সত্তাকে কু-প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বিরত রাখলো তার ঠিকানা হলো জান্নাত।
পক্ষান্তরে যারা মৃত্যুর পরের জীবনকে অবিশ্বাস, অবহেলা ও অবজ্ঞা করে পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনকে একমাত্র জীবন বলে ভোগ-বিলাসে মেতে থাকবে, ন্যায় অন্যায়বোধ বিসর্জন দেবে, ইনসাফকে উপেক্ষা করে চলবে, আল্লাহর দাসত্ব ত্যাগ করে শিরক্‌-এ লিপ্ত হবে, হারাম-হালালবোধ বিস্মৃত হয়ে অন্যের অধিকার হরণ করে সম্পদের স্তুপ গড়বে, মানুষের সম্মান-মর্যাদাবোধের প্রতি আঘাত হানবে, জুলুম-অত্যাচার করবে তথা পরকালীন জীবনের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিবে, তারা অবশ্যই মৃত্যুর পরের জীবনে এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখিন হবে। এসব লোকদেরকে আখিরাতের ময়দানে মহান আল্লাহ শুনিয়ে দেবেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
তোমাদের (জন্য বরাদ্দকৃত) নে’মাতসমূহ তোমরা দুনিয়ার জীবনে শেষ করে এসেছো, আর সবকিছু তোমাদের ইচ্ছা মতোই ভোগ করেছো। আজ তোমরা অপমানকর শাস্তি পাচ্ছো এ জন্য যে, তোমরা দুনিয়ার যমীনে অহঙ্কার করতে আর এ জন্য যে, তোমরা অপরাধ করছিলে। (কোরআন)
প্রথমে মুসলমান হতে হবে
আখিরাতের ময়দানে মানুষকে যে পাঁচটি প্রশ্ন করা হবে এবং এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাবের ওপর নির্ভর করবে মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ-  এ সম্পর্কে আমি কোরআন-হাদীস থেকে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। আখিরাতের ময়দানে উল্লেখিত পাঁচটি প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব কেবলমাত্র তারাই দিতে সক্ষম হবে, যারা কোরআন-হাদীসের মানদন্ডে মুসলমান হিসেবে পৃথিবীতে জীবন-যাপন করবে। বর্তমানে মুসলিম হিসেবে পরিচিত পিতা-মাতার মাধ্যমে পৃথিবীতে আগমন করলেই মুসলিম পরিচিতি লাভ করা যায়। কোরআন-হাদীস অনুযায়ী মুসলিম দাবীদার ব্যক্তি আদৌ মুসলিম কিনা-  তা যাচাই করে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয় না। বর্তমানে মুসলিম নামে পরিচিত সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ এই ধারণার জন্ম দেয়া হয়েছে যে, মুসলিম নামে পরিচিত পিতামাতার ঘরে জন্ম গ্রহণ করলেই মুসলমান হওয়া যায়। মুসলমান হওয়ার জন্য কোরআন-হাদীস তথা ইসলামী নীতিমালা অনুসরণের প্রয়োজন নেই এবং খান, সর্দার, চৌধুরী, ভূঁইয়া, প্রামাণিক, দেওয়ান, শিকদার, সরকার ইত্যাদি পদবিধারী ব্যক্তির সন্তান যেমন স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখিত পদবি ব্যবহার করতে পারে, তেমনি মুসলিম হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির সন্তানও নিজেকে মুসলিম হিসেবেই দাবী করতে পারে।

এ কথা বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে যে, চিকিৎসকের সন্তান যেমন চিকিৎসা বিদ্যা অর্জন না করে চিকিৎসক হতে পারে না, প্রকৌশলীর সন্তান যেমন প্রকৌশল বিদ্যা অর্জন না করে প্রকৌশলী হতে পারে না, আইনজ্ঞের সন্তান যেমন আইন শাস্ত্রে ডিগ্রী অর্জন না করে আইনজ্ঞ হতে পারে না অনুরূপভাবে মুসলমানের ঘরে জন্ম গ্রহণ করলেই মুসলমান হওয়া যায় না। নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবী করতে হলে প্রথমে ইসলাম সম্পর্কে ততটুকু জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যেটুকু জ্ঞান অর্জন করলে ইসলাম ও কুফরের পার্থক্য বুঝা যায়। মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য কি-  তা বুঝার মতো জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মুসলিম হতে হলে তার দায়িত্ব-কর্তব্য কি এবং কি কি কাজ করলে মুসলমান থাকা যাবে এবং কোন্‌ কাজ করলে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করা যাবে না, সেটুকু জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
মুসলমানের ঘরে জন্ম গ্রহণ করলে বা কালেমা পাঠ করলেই মুসলমান হওয়া যায় না। যে কালেমা পাঠ করা হলো, সেই কালেমার অর্থ, গুরুত্ব, তাৎপর্য, এই কালেমার দাবী কি-  তা জানতে হবে এবং কালেমার দাবী অনুসারে জীবন পরিচালনা করতে হবে, তাহলেই নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেয়া যাবে। আর এই মুসলমানরাই আখিরাতের ময়দানে উল্লেখিত পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে।
ইসলাম ও মুসলিম শব্দের অর্থও যে বুঝে না, মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য কি এবং কোন্‌ কারণে পার্থক্য রেখা টানা হয়েছে, এ সম্পর্কে যার নূন্যতম ধারণাও নেই, কোরআন-হাদীস কি-  এ সম্পর্কে যার ভাসাভাসা জ্ঞানও নেই, আল্লাহ, রাসূল, ফেরেশ্‌তা, আখিরাত এসব বিষয় সম্পর্কে যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ অন্ধকারে, সে ব্যক্তিও মুসলমানের ঘরে জন্ম গ্রহণ করার কারণে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করছে এবং মৃত্যুর পর তাকে কবরস্থ করা হচ্ছে ইসলাম প্রদর্শিত পন্থা অনুসারে। তার মৃতদেহ কবরে নামানোর সময় বলা হচ্ছে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আল্লাহর নামের ওপরে এবং রাসূলের দলের ওপরে।
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আল্লাহর নামের ওপরে এবং রাসূলের সুন্নাতের ওপরে।
জীবিতকালে যে ব্যক্তির সাথে কোরআনের পরিচয় ঘটেনি, সেই ব্যক্তির কবরে যখন মাটি দেয়া হচ্ছে তখন কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হচ্ছে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
এই মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরই মধ্যে আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো এবং এই মাটি থেকেই পুনরায় তোমাদেরকে বের করবো। (সূরা ত্বা-হা-৫৫)
কবরে নামানোর সময় কি বলা হচ্ছে?
কবর বলতে কি বুঝায়-  এ ব্যাপারে আমি ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। কবর হলো পৃথিবীর জীবনের শেষ মঞ্জিল আর আখিরাতের জীবনের প্রথম মঞ্জিল। এই কবরের জগতে যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর পাঠানো ফেরেশ্‌তাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারবে, সেই ব্যক্তি আখিরাতের জীবনে মুক্তি লাভ করবে। আর কবরের জগতে যে ব্যক্তি ফেরেশ্‌তাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারবে না, আখিরাতের জীবনে সে গ্রেফতার হয়ে জাহান্নামে যেতে বাধ্য হবে। কবরের জগতে কেবলমাত্র ঐ ব্যক্তিই ফেরেশ্‌তাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে সক্ষম হবে, যে ব্যক্তি পৃথিবীতে জীবনকালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসারে জীবন-যাপন করেছে। এ বিষয়টি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে, ঐ ব্যক্তিকেই মুসলমান বলা হয়, যে ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসারে জীবন-যাপন করে। এ জন্যই মৃত্যুর পরে একজন মুসলমানের মৃতদেহকে কবরে নামানোর সময় বলা হয়-  ‘তোমাকে মহান আল্লাহর নামে এবং রাসূলের আদর্শের ওপরে এখানে রাখা হচ্ছে।’
একজন মুসলমানের মৃতদেহ কবরে নামানো হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে যে, ‘তোমাকে মহান আল্লাহর নামে এবং রাসূলের আদর্শের ওপরে এখানে রাখা হচ্ছে।’ পৃথিবীতে জীবনকালে যে ব্যক্তি রাসূলের আদর্শ অনুসারে জীবন-যাপন করেছে, মৃত্যুর পরও সেই রাসূলের আদর্শের ওপরেই তাকে দুনিয়ার শেষ মঞ্জিলে ও আখিরাতের প্রথম মঞ্জিলে প্রেরণ করা হলো। যে কথা বলে একজন মুসলমানের মৃতদেহ কবরে রাখা হলো, সেই কথাটি শুধুমাত্র একজন মুসলমানের জন্যই প্রযোজ্য এবং একজন মুসলমানের জন্যই সামঞ্জস্যশীল। একজন মুসলমানের জীবন-যাপন পদ্ধতির সাথে কবরে নামানোর সময় বলা কথাটির কোনো ধরনের স্ববিরোধিতা নেই। বরং সত্য সঠিক কথা বলেই তাকে কবরে নামানো হলো।
এরপর কবরে যখন মাটি দেয়া হচ্ছে তখন বলা হচ্ছে, ‘এই মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরই মধ্যে আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো এবং এই মাটি থেকেই পুনরায় তোমাদেরকে বের করবো।’ যে মুসলমানের কবরে মাটি দেয়ার সময় পবিত্র কোরআনের এই আয়াত তাকে শোনানো হচ্ছে, সেই মুসলমানের কাছে এই কথাটি মোটেও নতুন নয়। কারণ সে তার জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আল কোরআনে অনেকবার পড়েছে, তার আল্লাহ তাকে বলছেন-  বান্দা! তোমাকে আমি এই মাটির সার-নির্যাস থেকেই সৃষ্টি করেছি। পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাকে হায়াত দেয়া হয়েছে, এই হায়াত শেষ হলে পুনরায় তুমি এই মাটির মধ্যেই মিশে যাবে। এখানেই তুমি শেষ হয়ে যাবে না, পৃথিবীর জীবনকাল তুমি কিভাবে কোন বিধান অনুসারে পরিচালিত করেছো এবং তোমার জীবনের যাবতীয় কাজের চুলচেরা হিসাব আদালতে আখিরাতে দেয়ার জন্য তোমাকে এই মাটি থেকেই উঠানো হবে। অর্থাৎ তোমার পুনরুত্থান ঘটবে।
উল্লেখিত এই কথাগুলো একজন মুসলমান সময়ের প্রত্যেক মুহূর্তে স্মরণে রাখতো বলেই সে পৃথিবীতে কখনো কোনো অন্যায় কাজে নিজেকে জড়িত করেনি। কোনো ব্যাপারে সামান্যতম মিথ্যের আশ্রয় গ্রহণ করেনি। অপরের স্বার্থে আঘাত করেনি, কারো সম্মান-মর্যাদা ক্ষুন্ন করেনি। সত্য-সঠিক পথে জীবন-যাপন করেছে। কারণ তার মধ্যে এই অনুভূতি ক্রিয়াশীল ছিলো যে, তার জীবনের সকল কর্মের হিসাব আদালতে আখিরাতে তাকে দিতে হবে-  যখন তাকে পুনরায় এই মাটি থেকেই উঠানো হবে। এই বিশ্বাসই তাকে পৃথিবীতে সৎ ও চরিত্রবান রেখেছে।
আর যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিয়েছে অথচ মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য কি জানতো না, কোরআন-হাদীসের সাথে জীবনে কখনো পরিচয় ঘটেনি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে চিনতো না, সেই ব্যক্তির কাছে উল্লেখিত কথাগুলো সম্পূর্ণ নতুন মনে হবে। পৃথিবীতে সে ব্যক্তি যেভাবে জীবন-যাপন করেছে, আর মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ কবরে নামানোর সময় যে কথাগুলো বলা হলো, এই কথাগুলোর সাথে তার জীবন-যাপন পদ্ধতির কোনো সাদৃশ্য ছিলো না। পৃথিবীতে জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করেনি এবং রাসূলের আদর্শের সাথে পরিচয়ই ছিলো না। অথচ তারই মৃতদেহ কবরে নামানোর সময় বলা হচ্ছে ‘তোমাকে আল্লাহর নামে এবং রাসূলের আদর্শের ওপরে রাখা হলো।’ এর থেকে বড় মিথ্যে কথা আর কি হতে পারে?
যে ব্যক্তি জীবনের কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করেনি যে, সে এই পৃথিবীতে যা কিছু করছে, এর প্রত্যেকটি কাজের হিসাব আখিরাতের ময়দানে দিতে হবে, তাকে এই মাটি থেকেই উঠানো হবে। আদালাতে আখিরাতকে সে অবিশ্বাস করেছে। আখিরাতের বিষয় নিয়ে সে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছে, পুনরুত্থানকে অসম্ভব বলেছে। আর সেই ব্যক্তির কবরে মাটি দেয়ার সময় বলা হচ্ছে-  তোমার জীবনকালের যাবতীয় হিসাব দেয়ার জন্য তোমাকে এই মাটি থেকেই পুনরায় উঠানো হবে। এই কথাটি পরকালের প্রতি অবিশ্বাসী এই ব্যক্তির জীবন-যাপন পদ্ধতির সাথে সম্পূর্ণ স্ববিরোধী এবং অসামঞ্জস্যশীল।
আপনি একজন ছাত্র
আপনি একজন ছাত্র হিসাবে লেখাপড়া করছেন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার আশায়। দেশে বা বিদেশে একটি সম্মানজনক চাকরী পাবেন, প্রভূত অর্থ উপার্জন করবেন, সম্মান-মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করবেন, বাড়ি-গাড়ির মালিক হবেন এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবন-যাপন করবেন, এই আশায় আপনি আপনার শারীরিক ও মানসিক শক্তি, মেধা-মননশীলতা সবকিছু লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় করছেন। আপনি যে সনদপত্র লাভ করবেন, সেখানে নিজের পরিচয় উল্লেখ করবেন একজন মুসলিম হিসেবে, সমাজে পরিচয়ও দিবেন মুসলিম হিসেবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্রেও নিজেকে মুসলিম হিসেবেই উল্লেখ করবেন।
কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, মুসলিম বলতে কি বুঝায়, একজন মুসলমানের দায়িত্ব-কর্তব্য কি, কোন্‌ কোন্‌ কাজ করলে মুসলিম হওয়া যায় এবং কোন্‌ কোন্‌ কাজ করলে মুসলিম হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়া যায় না? একজন মুসলিম আর অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য কি-  এ কথা কি কখনো আপনি ভেবে দেখেছেন? আপনি কি কখনো আপনার নিজের স্রষ্টা এবং এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, প্রতিপালক, নিয়ন্ত্রক, পরিচালক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পরিচয় জানার চেষ্টা করেছেন? যে রাসূলের মাধ্যমে আপনার-আমার সকলের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’য়ালা জীবন বিধান আল কোরআন প্রেরণ করেছেন, আপনি কি সেই রাসূলকে জানার চেষ্টা করেছেন? আপনার মনে কি কখনো আপনার-আমার তথা মানব জাতির জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আল কোরআনকে বুঝার জন্য আগ্রহ জেগেছে?
আপনি একজন ছাত্র হিসেবে দেখছেন, পৃথিবীর অন্যান্য সম্প্রদায়ের পৃথক পৃথক সভ্যতা-সংস্কৃতি রয়েছে এবং তারা তা অনুসরণ করছে। আপনি নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে থাকেন, কিন্তু আপনি কি কখনো মুসলমানদের সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন?
আপনি ছাত্র হিসেবে কারো না কারো আবিষ্কৃত শিক্ষানীতি অবশ্যই অনুসরণ করছেন এবং বিভিন্ন জনের আবিষ্কৃত মতবাদ বা চিন্তাধারা পড়ছেন। আপনার মনে কি কখনো এই প্রশ্ন জেগেছে, যে আল্লাহ তা’য়ালা কোনো শিক্ষানীতি দিয়েছেন কিনা? অথবা বিষয়ভিত্তিক যেসব মতবাদ বা চিন্তাধারা পড়ছেন, এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা এবং তাঁর রাসূল কি বলেছেন?
মনে করুন উল্লেখিত বিষয় সম্পর্কে আপনার মনে কখনো কোনো প্রশ্ন সৃষ্টি হলো না, যাদের মনে উল্লেখিত ব্যাপারে প্রশ্ন সৃষ্টি হলো এবং তারা কোরআন-হাদীস পড়ে প্রকৃত সত্য জেনে তা অনুসরণ করার শপথ গ্রহণ করলো, আপনি তাদের বিরোধিতা করলেন। কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্র হিসেবে আপনি আপনার যৌবনকালকে মানুষের বানানো মতবাদ-মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যয় করছেন, নিজেকে কতক মরা ও জীবিত নেতার আদর্শের সৈনিক হিসেবে বক্তৃতায়, পোষ্টারে ও দেয়াল লিখনে প্রচার করছেন, অথচ মুসলমান কেবলমাত্র মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সৈনিক ব্যতীত আর কারো সৈনিক হতে পারে না। কেউ যদি অন্য কারো সৈনিক হিসেবে নিজেকে দাবী করে, তাহলে সে আর মুসলমান থাকে না। এ অবস্থায় আকস্মিকভাবে আপনি মৃত্যুবরণ করলেন। আপনার মরদেহ গোছল করিয়ে কাফন পরিয়ে কবরে নামানো হচ্ছে আর বলা হচ্ছে, ‘তোমাকে আল্লাহর নামে রাসূলের আদর্শের ওপরে রাখা হচ্ছে।’
বলুন তো, কবরে নামানোর সময় বলা কথাটি কি আপনার জন্য প্রযোজ্য? ঐ সময় যদি আপনার বাকশক্তি থাকতো, তাহলে আপনি আপনার কবরের আশেপাশে উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতেন-  তোমরা মিথ্যা কথা বলছো, আমি আমার জীবনকালে কখনো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে জানার চেষ্টা করিনি এবং রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করা দূরে থাক, যারা রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করেছে, আমি তাদের বিরোধিতা করেছি। আমি রাসূলকে অনুসরণ না করে নেতা-নেত্রীকে অনুসরণ করেছি এবং তাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিছিল-মিটিং করেছি, দেয়ালে দেয়ালে লিখেছি, পোষ্টার লাগিয়েছি। হরতাল-ধর্মঘট করেছি এবং প্রয়োজনে মারামারি করেছি।’

এরপর যখন আপনার কবরে মাটি দেয়ার সময় বলা হবে, তোমার জীবনের সকল কাজের হিসাব দেয়ার জন্য আদালতে আখিরাতে এই মাটি থেকেই তোমাকে উঠানো হবে। তখন যদি আপনার বাকশক্তি থাকতো, আপনি প্রতিবাদ করে বলতেন, আমি কখনো পরকালকে বিশ্বাসই করিনি। বরং এমন শিক্ষানীতিতে বিশ্বাসী ছিলাম, যে শিক্ষানীতি আমাকে শিখিয়েছে, পরকাল বলে কিছু নেই, এই পৃথিবীই সবকিছু এবং পৃথিবীর জীবনকে পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার জন্য যেসব উপকরণ প্রয়োজন, তা যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও অর্জন করতে হবে। যৌন অনাচারের মাধ্যমে যদি প্রভূত অর্থ আমদানী করা যায়, তাহলে তা করতে কোন দ্বিধা করা যাবে না। সুদের প্রচলন ঘটিয়ে, অশ্লীলতার প্রসার ঘটিয়ে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে, মিথ্যা-শঠতা, প্রতারণা-প্রবঞ্চনা ইত্যাদির মাধ্যমে যদি নিজের স্বার্থ অর্জিত হয়, তাহলে অবশ্যই তা করতে হবে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটিই- জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করো। এই জীবন একবার হারালে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, সুতরাং জীবিত থাকাবস্থায় ভোগের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হবে। খাও দাও আর ফূর্তি করো- (ঋর্ট, ঊরধভপ টভঢ ঈণ ুটণররহ) এটার নামই হলো জীবন। কেননা আমাদের মহান কবি বলেছেন-
এই বেলা ভাই মদ পান করে নাও কাল নিশিতের ভরসা কই
চাঁদনী জাগিবে যুগ যুগ ধরি আমরা তো রবনা সই।
নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাঁকির খাতায় শূন্য থাক
কি লাভ শুনে দূরের বাদ্য মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।
সকালের স্নিগ্ধ রোদ, এই মায়াবী চাঁদ, দক্ষিণা মলয় সমিরণ, সবুজের সমারোহ, পাখির কুহুতান, নদীর কুলকুল রব, তারাভরা আকাশ যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে, কিন্তু আমরা থাকবো না। সুতরাং জীবনকে ভোগ করে নাও। পরকালের বিষয়টি বাঁকী। হতেও পারে না-ও হতে পারে। পৃথিবীর সমস্ত কিছুই তো নগদ, এসব যেভাবে পারো ভোগ করো। বহু দূরের বাজনা শোনায় তৃপ্তি নেই, কারণ ঐ বাজনা আর তোমার অবস্থান-  এর মাঝে অনেক দূরত্ব। পরকাল আর তোমার জীবনের মধ্যে অনেক দূরত্ব। অতএব পরকালের আশায় দুনিয়ার জীবন বরবাদ করো না।
আপনি একজন ব্যবসায়ী
আপনি নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন এবং পেশায় একজন ব্যবসায়ী। মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং তাঁর রাসূল ব্যবসা সম্পর্কে কোন্‌ নীতিমালা আপনাকে অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন, তা জানার চেষ্টা আপনি কখনো করেননি এবং জানা থাকলেও অনুসরণ করেননি। অধিক লাভের আশায় ব্যবসার পণ্যে ভেজাল দিয়েছেন, অবৈধভাবে নিষিদ্ধ পণ্য আমদানী করেছেন, আমাদানীর ক্ষেত্রে ট্যা ফাঁকি দিয়েছেন। ব্যাংক ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। সুদভিত্তিক ঋণ নিয়েছেন। মাদকদ্রব্য বা নেশা জাতিয় দ্রব্যের ব্যবসা করেছেন, অশ্লীল-নগ্ন ছায়া-ছবি নির্মাণ করছেন, সিনেমা হল বানিয়ে অশালীন ছবি প্রদর্শন করছেন, এভাবে করে জাতিয় চরিত্র ধ্বংস করছেন।
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য মওজুদ করে বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে অধিক মুনাফা লুটছেন, ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য সরবরাহ করছেন এবং সাধারণ মানুষ সে খাদ্য গ্রহণ করে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছে, নিম্ন মানের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি ও অধিক বিক্রি করার লক্ষ্যে প্রচার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। এভাবে করে ব্যবসায়ী হিসেবে আপনি যাবতীয় নীতি-নৈতিকতাকে পদদলিত করে অর্থ উপার্জন করছেন। ব্যবসার কোনো একটি ক্ষেত্রেও আপনি আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর রাসূলের দেয়া নীতিমালা অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।
কিন্তু মৃত্যু যখন আপনার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিলো, তখন আপনার মৃতদেহ কবরের নামানোর সময় বলা হলো, তোমাকে আল্লাহর নামে ও রাসূলের আদর্শের ওপরে রাখা হচ্ছে।
আপনি চিন্তা করে দেখুন তো, কবরে নামানোর সময় আপনার মৃতদেহকে লক্ষ্য করে যে কথাগুলো বলা হবে, সেই কথাগুলোর ব্যাপারেই যদি ফেরেশ্‌তারা আপনাকে প্রশ্ন করে-  আল্লাহর বান্দা! তোমার আত্মীয়-স্বজন ও সাথিরা যে কথা বলে কবরে তোমার লাশ দাফন করলো, তুমি কি জীবিতকালে সেই রাসূলের আদর্শ অনুসরণ করেছো?
আপনি ফেরেশ্‌তাদের প্রশ্নের কি জবাব দেবেন? কবরের জগতে ফেরেশ্‌তারা যদি আপনাকে বলে-  ওহে আল্লাহর বান্দা! তোমার মৃতদেহ ঢেকে দেয়ার উদ্দেশ্যে তোমার সন্তান, নিকটাত্মীয় ও সাথিরা আল্লাহর কোরআন থেকে বলে গেলো-  তুমি জীবনে যা কিছু করেছো, তার হিসাব দেয়ার জন্য তোমাকে এই মাটি থেকেই আদালতে আখিরাতে উঠানো হবে। তুমি আল্লাহর এই কথার প্রতি বিশ্বাসী ছিলে না। যদি আল্লাহর এই কথার ওপর তোমার বিশ্বাস থাকতো, তাহলে তো তুমি অসৎ পথে ব্যবসা করতে পারতে না।’
চিন্তা করে দেখুন তো, আপনি আল্লাহর ফেরেশ্‌তাদের কথার কি জবাব দেবেন?
মৃত্যুর পরে পর্দার প্রয়োজন নেই
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই পৃথিবীতে আপনাকে একজন নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার এটা সৌভাগ্য যে, আল্লাহ তা’য়ালা একান্ত অনুগ্রহ করে আপনাকে মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু মুসলিম নারী হিসেবে আপনার দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে জানার কোনো চেষ্টাই আপনি করেননি। আল্লাহ তা’য়ালা আপনার প্রতি পর্দা বাধ্যতামূলক করেছেন। কিন্তু আপনি পর্দা করেননি এমনকি যেসব মুসলিম নারী পর্দা করেছে, আপনি তাদেরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। পর্দার কথা যারা বলেছে, তাদেরকে আপনি প্রগতির শত্রু মনে করেছেন।
বিউটি পার্লার থেকে মেকআপ করে আপনি রাস্তায় আবেদনময়ী ভঙ্গিতে চলাফেরা করেছেন, এমন পোষাক আপনি পরিধান করছেন যে, আপনার দেহ সৌষ্ঠব সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। একশ্রেণীর কামার্ত পুরুষ আপনার প্রতি কামনা তাড়িত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে। আপনার কারণে অসংখ্য পুরুষ চরিত্রহারা হয়েছে। লজ্জা হলো নারীর ভূষণ, আপনি সেই লজ্জার বাঁধন ছিন্ন করে নিজেকে আধুনিকা প্রমাণ করার জন্য অনাবৃতা হয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা একমাত্র পুরুষের জন্য যেসব কাজ নির্বাচিত করেছেন, আপনি সমঅধিকারের নামে নিজেকে সেসব কাজে জড়িত করে নিজের মূল্যমান হ্রাস করেছেন।
মুহূর্ত কালের জন্য আপনি পরকালের কথা চিন্তা করেননি এবং মৃত্যু যে কোনো মুহূর্তে আপনার দিকে ছোবল দিতে পারে, এ চিন্তাও আপনি করেননি। এভাবে প্রগতির নামে গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে চলছেন, হঠাৎ করে আপনি মৃত্যু মুখে পতিত হলেন। এ অবস্থায় চিন্তা করে দেখুন তো, আপনার আত্মীয়-স্বজন আপনার লাশ নিয়ে কি করবেন?
আপনার নামের পূর্বে ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকার কারণে আপনাকে শেষ গোছল দেয়ার জন্য যে স্থান নির্বাচন করা হবে, সে স্থানটি পর্দায় আবৃত করা হবে। কোনো পরপুরুষকে আপনার লাশ দেখতে দেয়া হবে না। এরপর আপনাকে কাফন পরানো থেকে কবরে নামানো পর্যন্ত পর্দার ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ একজন মুসলিম নারীর জন্য জীবিতকালে যে পর্দার বিধান ছিলো, এখন আপনার মৃত্যুর পরে সেই বিধান অনুসরণ করা হবে।
এবার আপনি চিন্তা করে দেখুন তো, আপনি জীবিতকালে মুহূর্তের জন্য পর্দা করেননি, যারা পর্দা করতো তাদেরকে বিদ্রুপ করেছেন, প্রগতির শত্রু, সেকেলে, আনকার্লচার্ড ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। এখন মৃত্যুর পরে আপনার মরা লাশের জন্য কি পর্দার প্রয়োজন আছে? যখন আপনার প্রতি আকর্ষণ অনুভব হতো, তখন আপনি পর্দা করলেন না, এখন আপনার মৃতদেহের প্রতি কি কোনো পুরুষ আকর্ষণ অনুভব করবে? আপনি যত সুন্দরীই হন না কেনো, আপনার মৃত্যুর পরে আপনার লাশ প্রহরা দেয়ার জন্য কোনো যুবক কি একই ঘরে একা থাকতে রাজি হবে?
এরপর আপনাকে যখন কবরে নামানো হবে তখন বলা হবে, তোমাকে আল্লাহর নামে এবং রাসূলের দলের ওপর রাখা হলো।
আপনি চিন্তা করে দেখুন তো, আপনাকে যারা কবরে নামাবে এবং উক্ত কথাগুলো বলবে, তাদের বলা কথার সাথে আপনার জীবন-যাপন পদ্ধতির কি কোনো সাদৃশ্য ছিল?
কারণ আল্লাহর রাসূলের দলে তো ঐসব নারীরাই স্থান পাবে, যারা পৃথিবীতে কোরআন-হাদীসের বিধান অনুসরণ করেছে।
উল্লেখিত প্রশ্নগুলো আপনি জীবিতকালেই আপনার বিবেককে করুন। আপনার বিবেক যদি আপনাকে নেতিবাচক জবাব দেয়, তাহলে এখনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন, আপনি এখন থেকে কোরআন-হাদীসের বিধান অনুসরণ করবেন। আর যদি আল্লাহ, রাসূল ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস না থাকে, তাহলে মৃত্যুর পরে আপনার লাশ নিয়ে প্রহসন না করার জন্য নিজের আত্মীয়-স্বজনদের ওসিয়ত করে যাবেন যেন, আপনার মৃত্যুর পরে ইসলামী পদ্ধতিতে আপনাকে কাফন-দাফন করা না হয়।
আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কি করবেন?
একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিষয়টি সহজবোধ্য করা যাক। মনে করুন, একজন ব্যক্তি তার বুদ্ধির বিকাশ ঘটার পর থেকেই রাজনৈতিক দল হিসেবে ঙ দলকে পছন্দ করে এবং ঙ  দলের পক্ষে কাজ করছে। তার তারুণ্য ও যৌবনকালকে ঙ দলের একজন একনিষ্ঠ নেতা-কর্মী হিসেবে ব্যয় করেছে। এ অবস্থায় সেই ব্যক্তি চরম বার্ধক্যে উপনীত হলো। রোগ-জ্বরা, ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে সে অথর্ব হয়ে পড়লো। দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেললো, হাঁটার শক্তি নেই, হাত নাড়ানোর ক্ষমতা নেই, কথা বলতে গেলেও জড়িয়ে আসে। এমন একজন ব্যক্তি, তা তিনি জাতিয়ভাবে যতই পরিচিত ডাকসাইটে নেতাই হোন না কেনো, তিনি যদি জীবনের এই শেষ মুহূর্তে ঙ দল ত্যাগ করে চ দলে যোগ দিতে চান, তখন চ দলের লোকজন কি তাকে গ্রহণ করবে?
সবাই তো তখন এই কথাই বলবে যে, যখন তোমার দেহে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা ছিলো, মস্তিষ্ক উর্বর ছিলো, মেধা শক্তি ছিলো তীক্ষ্ন, অনলবর্ষী বক্তা ছিলে, দুর্বার গতিতে মিছিল-মিটিং করার ক্ষমতা ছিলো, তখন তুমি তোমার যাবতীয় শক্তি ব্যয় করেছো ঙ দলের পক্ষে। আর এখন তো তুমি মৃত লাশের মতো। তোমাকে দিয়ে এখন চ দলের কি উপকার হবে?
আপনারাই বলুন, চ দল কেনো-  দেশের কোনো একটি রাজনৈতিক দলও কি এই অথর্ব-অক্ষম লোকটিকে নিজের দলে গ্রহণ করবে? কেউ করবে না। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যদি এই কথা সত্য হয়, তাহলে যে ব্যক্তি তার জীবনকালে মহান আল্লাহর বিধান অনুসরণ করেনি, মৃত্যুর পরে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যতই বলা হোক না কোনো, তোমাকে আল্লাহর নামে আর রাসূলের আদর্শের ওপর রাখা হলো, আল্লাহ তা’য়ালা অবশ্যই ঐ ব্যক্তিকে গ্রহণ করবেন না। মৃতদেহ নিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা কি করবেন? কৈশোর, তারুণ্য-যৌবনকাল তথা জীবনের সবটুকু সময় সে দিয়েছে শয়তানকে, আর মৃত্যুর পরে মরাদেহ দিচ্ছে আল্লাহকে-  ইসলামের বিধানের সাথে এর থেকে বড় প্রহসন আর কি হতে পারে?
বর্তমান পৃথিবীতে মৃতদেহের ব্যাপারে এক নতুন সংস্কৃতি চালু হয়েছে। দেশের কোনো কর্তা ব্যক্তি মারা গেলে বা যুদ্ধে কোনো দেশের সৈন্য নিহত হলে অথবা বন্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা মারা গেলে তার কফিন দেশের বা দলীয় পতাকায় আবৃত করা হয়। মনে করুন, ঙ দলের কোনো নেতা মারা গেলো, প্রচলিত বস্তুবাদী সংস্কৃতি অনুসারে স্বাভাবিকভাবেই তার কফিন ঙ দলের পতাকায় আবৃত করা হবে। এখন ঙ দলের নেতার কফিন তার দলীয় পতাকায় আবৃত না করে যদি চ  দলের পতাকায় আবৃত করা হয়, তাহলে বিষয়টি কি ঙ দলের লোকজন মেনে নেবে?
সাধারণ মানুষ যদি এই বিপরীত বিষয়টি মেনে না নেয়, তাহলে মহাজ্ঞানী ও শক্তিধর আল্লাহ তা’য়ালা কি করে এ ধরনের বিপরীত বিষয় মেনে নেবেন?

হতে পারেন আপনি একজন শ্রমজীবি, চাকরীজীবি, কৃষিজীবি, শিল্পী, গায়ক, শিল্পপতি, চিকিৎসক, মাওলানা-পীর, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি-সাহিত্যিক, ওয়ায়েজীন-বক্তা, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, গবেষক বা অন্য কিছু। আপনি জীবিতকালে যা কিছুই করলেন, তা এই দুনিয়ার জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য। আপনার যাবতীয় কর্ম তৎপরতা পরিচালিত হলো মহান আল্লাহর বিধানের বিপরীত পন্থায়। আর মৃত্যুর পরে আপনার মৃতদেহ তুলে দেয়া হলো আল্লাহর রাসূলের দলে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কি আপনাকে রাসূলের দলে শামিল করবেন?
আপনার শ্রম, চাকরী, শিল্পকর্ম, গান, শিল্প, চিকিৎসা, ফতোয়া, পীর-মুরিদী, রাজনীতি, বিবেক-বুদ্ধি, লেখা, কবিতা-সাহিত্য, বক্তৃতা, অর্থনৈতিক নীতিমালা, আবিষ্কার বা গবেষণা কোনো কাজই মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথে তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেননি। জীবনের কোনো একটি দিকেও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করেননি। কিন্তু আপনার মৃত্যুর পরে কাফন-দাফনের সময় বলা হলো, তোমাকে আল্লাহর নামে ও রাসূলের দলে তুলে দেয়া হলো।
জেনে বুঝে আপনার মৃতদেহকে কেন্দ্র করে যারা এ কথাগুলো বললো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা সম্পর্কে তাদের ধারণা মোটেই সুবিবেচনা প্রসূত নয়। তাদের মনে যদি আখিরাতে জবাবদিহির অনুভূতি থাকতো যে, ‘যার মৃতদেহকে কেন্দ্র করে আমরা এই কথাগুলো বলছি, এই ব্যক্তি জীবিতকালে রাসূলের দল করেছে না শয়তানের দল করেছে, তা মহান আল্লাহ অবশ্যই দেখেছেন। আখিরাতের ময়দানে এই মিথ্যা কথা বলার জন্য আল্লাহর আদালতে গ্রেফতার হতে হবে।’ তাহলে তারা অবশ্যই আপনার মৃতদেহকে কেন্দ্র করে ঐ কথাগুলো বলতো না।
আপনি একজন রাজনীতিবিদ, ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত আপনি বস্তুবাদী দর্শনভিত্তিক রাজনীতি করলেন, মানুষের বানানো মতবাদ-মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম, হরতাল-ধর্মঘট, মিটিং-মিছিল করলেন। যারা দেশের বুকে মহান আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন করছে, তাদের বিরোধিতা করলেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তৃতা, বিবৃতি দিলেন। আপনার মেধা-মননশীলতা, শিক্ষা, জ্ঞান, বিবেক বুদ্ধি তথা যাবতীয় যোগ্যতা ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানুষের বানানো ভোগবাদী গনতন্ত্রের পক্ষে ব্যয় করলেন। অর্থাৎ আপনি চেষ্টা-সংগ্রাম করলেন আল্লাহর বিধানের বিপরীত বিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তথা শয়তানের পথে। মহান আল্লাহর ভাষায়-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যারা কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে, তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করে তাগুতের পথে। (সূরা আন নিসা-৭৬)
এভাবে কুফরীর পথে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে করতে সময়ের ব্যবধানে বার্ধক্য আপনার দেহকে অবসাদ গ্রস্থ করে দিলো। বয়সের ভারে দেহ নুব্জ হয়ে পড়লো। আপনার যৌবনের জৌলুস হারিয়ে গেলো। অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে আপনার সুখ্যাতি ছিলো, এখন আপনার কথা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। রোগ-ব্যধি আপনাকে গ্রাস করেছে। ক্রমশঃ আপনি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেলেন।
মহান আল্লাহর বিধানের বিপরীত বিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন যুগিয়েছে, পবিত্র কোরআনের ভাষায় তারা হলো শয়তানের দল। আপনি সারা জীবন শয়তানের দল করলেন, এরপর আপনার মৃত্যুর পরে আপনাকে কবরে নামানোর সময় বলা হলো, তোমাকে রাসূলের দলে তুলে দেয়া হলো।
আপনি আপনার কৈশোর, তারুণ্য এবং যৌবন তথা জীবনের সোনালী বেলা কাটিয়ে দিলেন শয়তানের দলে, আর মৃত্যুর পরে মূল্যহীন দেহটি তুলে দিচ্ছেন রাসূলের দলে। আপনার এই মৃতদেহ কি মহান আল্লাহর কোনো প্রয়োজনে আসবে? এই মৃতদেহ নিয়ে তিনি কি করবেন?
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বার বার ডেকে বলেছেন, ‘তোমরা মহান আল্লাহর সাহায্যকারী হও।’ আল্লাহর সাহায্যকারী হওয়া বলতে বুঝায় আল্লাহর যমীনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জান্‌-মাল দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করা। আপনি আপনার জীবনকালে একটি বারের জন্যও কোরআনের আহ্বানে সাড়া দেননি। মৌলবাদ আর সম্প্রদায়িকতার নামে আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করেছেন এবং শয়তানের দল করেছেন। আপনার মৃত্যুর পরে কবর দেয়ার সময় যতই বলা হোক না কেনো, ‘তোমাকে রাসূলের দলে তুলে দেয়া হলো।’ এসব কথা কোনো কাজে আসবে না। আপনার এবং আপনার মতো যারা, তাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহর সিদ্ধান্ত শুনুন- 
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
নিশ্চিত জেনে রেখো, যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে অস্বীকার করেছে এবং এর মোকাবেলায় বিদ্রোহের নীতি গ্রহণ করেছে, তাদের জন্য আকাশ জগতের দুয়ার কখনই খোলা হবে না। তাদের জান্নাতে প্রবেশ ততখানি অসম্ভব, যতখানি অসম্ভব সূচের ছিদ্রপথে উষ্ট্রের গমন। (সূরা আল আ’রাফ-৪০)
অর্থাৎ যারা আল্লাহর বিধান মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং এই বিধানের বিপরীত বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছে, মৃত্যুর পরে তাদের জন্য আকাশের দরজা খোলা হবে না। সূচের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব এই লোকগুলোর জান্নাতে প্রবেশ করা।
আখিরাত ভিত্তিক চরিত্র গড়ুন
প্রত্যেক নবী-রাসূলই পরকালে আদালতে আখিরাতে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা বলেছেন এবং মানুষের মনে পরকালের ভীতি সঞ্চার করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী-রাসূলদের প্রতি যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, তার সিংহভাগ জুড়ে থেকেছে পরকাল সম্পর্কিত আলোচনা। সর্বশেষে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মানব জাতির জন্য যে সর্বশেষ জীবন বিধান- আল কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, এর মধ্যেও পরকালের বিষয়টিই সর্বাধিক আলোচিত হয়েছে।
গোটা ত্রিশপারা কোরআনে পরকাল সম্পর্কিত যে আলোচনা এসেছে, তা একত্রিত করলে প্রায় দশ পারার সমান হবে। পরকালে জবাবদিহির ভীতি ব্যতীত কোনক্রমেই মানুষের মন-মস্তিষ্ক অপরাধের চেতনা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। সর্বাধিক কঠোর আইন প্রয়োগ করেও মানুষকে অপরাধ মুক্ত সৎ জীবনের অধিকারী বানানো যায় না। কারণ অপরাধীর প্রতি শাস্তির দন্ড প্রয়োগ করতে হলে প্রয়োজন হবে সাক্ষ্য প্রমাণের। পক্ষান্তরে যে অপরাধী কোন ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ না রেখে অপরাধমূলক কর্ম সম্পাদন করে, সে থাকে আইনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে এবং তার প্রতি পৃথিবীতে দন্ডও প্রয়োগ করা যায় না।
সুতরাং পৃথিবীতে এমন কোন আইন-কানুনের অস্তিত্ব নেই, যে আইন মানুষকে নির্জনে লোক চক্ষুর অন্তরালে একাকী অপরাধ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম। এই অবস্থায় মানুষকে অপরাধ থেকে মুক্ত রাখতে পারে কেবল পরকাল ভীতি তথা আদালতে আখিরাতে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির অনুভূতি। এ কারণেই মানব মন্ডলীর জন্য প্রেরিত সর্বশেষ জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আল কোরআনে পরকালের বিষয়টি সর্বাধিক আলোচিত হয়েছে।
অপরদিকে প্রত্যেক যুগেই একশ্রেণীর মানুষ পরকালের প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করেছে এবং পরকালের স্বপক্ষে যারা কথা বলেছে, তাদের বিরোধিতা করেছে। এই শ্রেণীর লোকগুলো কিছুতেই এ কথা বিশ্বাস করতে চায়নি যে, মৃত্যুর পরে মানুষ পুনরায় পুনর্জীবন লাভ করবে এবং আল্লাহর আদালতে যাবতীয় কর্মকান্ডের জবাবদিহি করতে হবে। এই শ্রেণীর মানুষদের একজন স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস থাকলেও তাঁর গুণাবলী ও পরিচয় সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল ভ্রান্ত ও নিকৃষ্ট।
এ জন্য তারা কোনভাবেই মৃত্যুর পরে পরকালীন জীবনকে বিশ্বাস করতে চায়নি। মৃত্যুর পরে মানুষের দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অস্থি, চর্ম, গোস্ত এবং প্রতিটি অণু-পরমাণু ধ্বংস ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পৃথিবীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মাটি সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে। এরপরে কিভাবে পূর্বের ক্ষয়প্রাপ্ত দেহ জীবন লাভ করবে? এই বিষয়টি হলো পরকাল সম্পর্কে সংশয়িত লোকদের চিন্তা-চেতনার অতীত।
আখিরাত বিশ্বাসীদের অপরাধ কি?
প্রত্যেক নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীরা যখন পরকালের কথা বলে মানুষের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করেছেন এবং মানুষের ভেতরে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন, তখন পরকাল সম্পর্কে সন্দেহ পোষণকারী লোকগুলো নবী-রাসূলদেরকে পাগল হিসাবে চিহ্নিত করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। পরকাল সম্পর্কে কোন মতবাদ তারা গ্রহণ করতে চায়নি বরং পরকাল বিশ্বাসীদেরকে নানাভাবে নির্যাতিত করেছে। এখানে প্রশ্ন ওঠে, যারা পরকালে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির কথা বলেছে, তাদের প্রতি একশ্রেণীর মানুষ কেন মারমুখী আচরণ করেছে এবং কেনই বা তাদেরকে নির্যাতন করেছে? পরকাল বিরোধিদের এমন কি ক্ষতি হচ্ছিলো যে, তারা পরকাল বিশ্বাসীদেরকে বরদাশ্‌ত করেনি?
আসলে পরকাল বিরোধিতার পেছনে এক মনস্তাত্বিক কারণ বিদ্যমান রয়েছে। সেই কারণ হলো, যেসব লোক পরকালে আল্লাহর আদালতে জবাবদিহি করতে হবে- এ কথা বিশ্বাস করে, তাদের চরিত্র, আচার-আচরণ, মননশীলতা ও রুচি, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড এবং সভ্যতা-সংস্কৃতি হয় এক ধরনের। আর পরকাল অবিশ্বাসীদের উল্লেখিত যাবতীয় বিষয় হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের, এ কথা আবহমান কাল থেকে পৃথিবীতে সত্য বলেই প্রমাণিত হয়ে আসছে।
যে ব্যক্তি পরকাল বিশ্বাস করে, তার এমন এক মন-মানসিকতা গড়ে ওঠে যে, সে প্রতিটি মুহূর্তে অন্তরে এই অনুভূতি জাগ্রত রাখে যে, তার প্রতিটি গোপন ও প্রকাশ্য কর্মকান্ড রেকর্ড হচ্ছে এবং মৃত্যুর পরের জগতে এ সম্পর্কে তাকে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। মহান স্রষ্টা তার ওপরে যে প্রহরী নিযুক্ত করেছেন, তার দৃষ্টি থেকে কোন কিছুই গোপন করা যাবে না। সে যদি কোন অপরাধমূলক কর্ম করে থাকে তাহলে এর জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে- এ বিশ্বাস তার ভেতরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে বলেই সে যে কোন ধরনের অপরাধমূলক কর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে।
আর যারা পরকাল অবিশ্বাস করে অথবা পরকালের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে, তাদের চরিত্র হয় পরকাল বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, পরকাল বলে কিছুই নেই সুতরাং তাদের কোন কর্মের ব্যাপারে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। পৃথিবীর জীবনে তারা যদি অবৈধভাবে জীবন-যৌবনকে ভোগ করে, অপরের অধিকার খর্ব করে অর্থ-সম্পদের স্তুপ গড়ে, দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থ অর্জনের জন্য দেশ ও জাতির ক্ষতি করে, জাতীয় সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার করে, ক্ষমতার বলে অধীনস্থদের অপরাধমূলক কর্মে জড়িত হতে বাধ্য করে, স্বৈরাচারী নীতি প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে দেশের জনগণের কন্ঠরোধ করে, সাধারণ মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে তাদেরকে মানবেতর জীবন-যাপনে বাধ্য করে- তবুও তারা ভয়ের কোন কারণ অনুভব করে না। কারণ তারা এ বিশ্বাসে অটল যে, মৃত্যুর পরে তাদের এসব হীন কর্মের জন্য কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না।
কারণ পরকাল বিশ্বাস করলেই নিজের প্রবৃত্তির মুখে লাগাম দিতে হবে, যে কোন ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা ও উচ্ছৃংখলতা বন্ধ করতে হবে, অন্যায় ও অবৈধ পথে নিজের জীবন-যৌবনকে ভোগ করা যাবে না, অন্যায় পথে অর্থ-সম্পদের স্তুপ গড়া যাবে না, ক্ষমতার মসনদে বসে দেশ ও জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, নিজের জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত ও সুশৃংখল করতে হবে, নির্দিষ্ট একটি গন্ডির ভেতরে নিজেকে পরিচালিত করতে হবে। আর এসব করলে তো জীবনের পরিপূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করা যাবে না। পরকালের প্রতি অবিশ্বাস ও সন্দেহ পোষণের পেছনে এটাই হলো মনস্তাত্বিক কারণ।

এই ধরনের চিন্তা-চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গী ও মন-মানসিকতা গঠিত হয় পরকাল অবিশ্বাস করার কারণে। নৈতিকতা, ন্যায়-পরায়ণতা, সুবিচার, দুর্বল, নির্যাতিত-নিপীড়িত ও উৎপীড়িতের প্রতি সহানুভূতি, দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন ইত্যাদি সৎ গুণাবলীতে তারা বিশ্বাসী নয়। অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, অনাচার, হত্যা-সন্ত্রাস, অঙ্গীকার ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা এদের কাছে কোন অপরাধ বা নৈতিকতার লংঘন বলে বিবেচিত হয় না। নিজের যৌন কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করার লক্ষ্যে নারী জাতিকে এরা ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করে। ব্যক্তি স্বার্থ, জাতিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য একটি মানুষকেই শুধু নয়, গোটা একটি দেশ বা জাতিকে নিজেদের গোলামে পরিণত করতে বা ধ্বংস করে দিতেও এরা কুন্ঠাবোধ করে না। পৃথিবীর অতীত ও বর্তমান ইতিহাস সাক্ষী, এই পৃথিবীর বুকে এমন বহু জাতি উন্নতি ও সমৃদ্ধির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করার পরও পরকালে জবাবদিহির অনুভূতি না থাকার কারণে তারা নিমজ্জিত হয়েছে নৈতিক অধঃপতনের অতল তলদেশে।
পরকাল অবিশ্বাসের কারণে তারা নৈতিক অধঃপতনের অন্ধকার বিবরে প্রবেশ করে ন্যায়ের শেষ সীমা যখন অতিক্রম করেছে, তখনই তারা আল্লাহ তা’য়ালার গযবে নিপতিত হয়ে এই পৃথিবী থেকে এমনভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে যে, তাদের নাম-নিশানা পর্যন্ত মুছে গিয়েছে। অধিকাংশ মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হবার এটাই হলো মূল কারণ যে, তাদের অন্তরে পরকালের প্রতি বিশ্বাস নেই। পরকাল বিশ্বাস অন্যায়কারীর কন্ঠে জিঞ্জির পরিয়ে দেয়, ফলে সে অন্যায় পথে অগ্রসর হতে পারে না বিধায় তারা নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীদেরকে করেছে অপমানিত, লাঞ্ছিত, অপদস্ত এবং আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করেছে। দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে, নাগরিকত্ব বাতিল করে দিয়েছে, ফাঁসির রশি তাদের কন্ঠে পরিয়ে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন প্রচার প্রপাগান্ডা চালিয়েছে এবং বর্তমানেও তাদের উত্তরসূরিদের আচরণে কোন পরিবর্তন ঘটেনি।
এই শ্রেণীর লোক পরকালের প্রতি বিশ্বাসস্থাপন করে তাদের জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রিত, সুশৃংখল এবং উদগ্র কামনা-বাসনাকে দমন করতে অতীতে যেমন রাজী ছিল না বর্তমানেও রাজী নয়। নিজ দেশের জনগণ বা ভিন্ন দেশের জনগণকে নিজেদের গোলামে পরিণত করে তাদের ওপরে প্রভুত্ব করার কলুষিত কামনাকে এরা নিবৃত্ত করতে আগ্রহী নয়।
নিজেকে ক্ষতিগ্রস্থ করবেন না
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও পরকালের প্রতি যথার্থ বিশ্বাসের অনুপস্থিতিই হলো মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হবার মূল কারণ। এদের সম্পর্কেই মহান আল্লাহ বলেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
প্রকৃত বিষয় এই যে, যারা আমার সাথে আখিরাতে মিলিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখতে পায় না এবং পৃথিবীর জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনগুলোর প্রতি উদাসীন থাকে, তাদের শেষ আবাসস্থল হবে জাহান্নাম, ঐসব কৃতকার্যের বিনিময়ে যা তারা তাদের ভ্রান্ত মতবাদ ও ভ্রান্ত কর্মপদ্ধতি অনুসারে করেছে। (সূরা ইউনুস-৭-৮)
এসব লোক পৃথিবীর জীবন নিয়েই নিশ্চিন্ত থেকেছে এবং কখনো এ চিন্তা তাদের মনে উদয় হয়নি যে, তাদের একজন স্রষ্টা এবং প্রতিপালক রয়েছেন, যিনি তাদেরকে শুধু সৃষ্টিই করেননি বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিপালন করছেন এবং যাবতীয় উপায়-উপকরণ সরবরাহ করে যাচ্ছেন। সেই আল্লাহ তা’য়ালা যে তাদের যাবতীয় কর্মকান্ড দেখছেন এবং তাঁর কাছে সমস্ত কিছুর হিসাব দিতে হবে, এই বিশ্বাস তাদের নেই। এ কথা তারা বিশ্বাস করে না যে, এমন একটি সময় আসবে, সে সময়ে তাদের নিজেদের দেহের চামড়া, চোখ, কান, হাত-পা ইত্যাদি স্বয়ং তারই বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দেবে। এই বিশ্বাস না থাকার কারণেই তারা পৃথিবীতে যা খুশী করছে এবং মারাত্মক ক্ষতির দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়েছে। আখিরাতের দিন এসব ক্ষতিগ্রস্ত লোকদেরকে বলা হবে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
পৃথিবীতে অপরাধ করার সময় যখন তোমরা গোপন করতে তখন তোমরা চিন্তাও করোনি যে, তোমাদের নিজেদের কান, তোমাদের চোখ এবং তোমাদের দেহের চামড়া কোন সময় তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তোমরা তো বরং মনে করেছিলে, তোমাদের বহু সংখ্যক কাজকর্মের সংবাদ আল্লাহও রাখেন না। তোমাদের এই ধারণা- যা তোমরা তোমাদের রব সম্পর্কে করেছিলে- তোমাদের সর্বনাশ করেছে এবং এর বিনিময়েই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছো। (সূরা হা-মীম সাজ্‌দাহ্‌-২২-২৩)
পরকালের প্রতি সন্দেহ পোষণকারী ও অবিশ্বাসী লোকগুলো এই পৃথিবীতে আপাদ-মস্তক নোংরামীতে নিমজ্জিত থেকেছে, নিজের দেহের যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অন্যায় কাজে ব্যবহার করেছে কিন্তু নিজের অজান্তেও এ কথা তারা কল্পনা করেনি যে, তার দেহের যে অঙ্গগুলোর প্রতি সে এত যত্নশীল এবং এসব অঙ্গের শোভাবর্ধন করার লক্ষ্যে সে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, এসব অঙ্গ-ই একদিন তার বিরুদ্ধে তারই অন্যায় কাজের সাক্ষী দেবে। এসব লোক বিশ্বাস করেছে স্রষ্টা বলে কেউ নেই এবং কোন কর্মের হিসাবও কারো কাছে দিতে হবে না, তাদের এই বিশ্বাসই তাদেরকে মহাক্ষতির সম্মুখীন করবে হাশরের ময়দানে।
ভ্রান্ত এই বিশ্বাস অনুসারে এসব লোক পৃথিবীতে নিজের জীবন পরিচালিত করেছে এবং নিজের পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, প্রভাবাধীন আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় লোকজন এবং নিজের অধীনস্থদের পরিচালিত করে তাদেরকেও মহাক্ষতির দিকে নিক্ষেপ করেছে। আখিরাতের দিন এসব লোকদেরকে যখন গ্রেফতার করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন পরকালের প্রতি বিশ্বাসী লোকগুলো ঐ লোকগুলো সম্পর্কে বলবে-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
যারা ঈমান এনেছিলো সেই সময় তারা বলবে, প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা আজ কিয়ামতের দিন নিজেরাই নিজেদেরকে এবং নিজেদের সংশ্লিষ্টদেরকে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। (সূরা শূরা-৪৫)
ঐ শ্রেণীর মানুষগুলোই সবথেকে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে পৃথিবীতে যাদের যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টা নিয়োজিত ছিল নিজেকে একজন সফল মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এবং এরা মনে করতো, তারা যা করছে তা সঠিক কাজই করছে। এরা লেখাপড়া, বিদ্যা অর্জন, সমাজ কল্যাণমূলক কাজ, রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-মিটিং ধর্মঘটসহ যা কিছুই করেছে, তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথে না করে নিজেদের খেয়াল-খুশী অনুসারে করেছে। কারণ এরা ভেবেছে এই পৃথিবীর জীবনই আসল জীবন, মৃত্যুর পরে কোন জীবন নেই। সুতরাং কারো কাছে নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে না। এসব লোক পৃথিবীর জীবনে সাফল্য ও সচ্ছলতাকেই নিজের জীবনের উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে।
এই শ্রেণীর লোকগুলো মহান আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলেও সেই আল্লাহ কোন্‌ কাজে সন্তুষ্ট হবেন এবং কোন্‌ কাজে অসন্তুষ্ট হবেন, তাঁর সামনে গিয়ে একদিন উপস্থিত হতে হবে এবং নিজেদের যাবতীয় কর্মকান্ডের চুলচেরা হিসাব দিতে হবে, এ চিন্তা তারা কখনো করেনি। পক্ষান্তরে এসব লোকগুলো পৃথিবীতে নিজেদেরকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান মনে করতো। তারা ধারণা করতো, তারা যা করছে- তা অবশ্যই সঠিক পথেই পরিচালিত হচ্ছে। দেশ ও জনগণের কল্যাণের দোহাই দিয়ে আন্দোলন মিছিল-মিটিং, হরতাল করছে, সন্ত্রাস করে দেশ ও জনগণের জান্‌-মালের ব্যাপক ক্ষতি করছে, দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করছে, তবুও এরা জোর গলায় প্রচার করছে, তারা যা কিছুই করছে তা দেশের মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যেই করছে। এসব লোকদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
আরবী হবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,
হে রাসূল! এদেরকে বলো, আমি কি তোমাদের বলবো নিজেদের কর্মের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত কারা? তারাই-  যাদের পৃথিবীর জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম সবসময় সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত থাকতো এবং যারা মনে করতো যে, তারা সবকিছু সঠিক পথেই করে যাচ্ছে। (সূরা কাহ্‌ফ-১০৩-১০৪)


@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@@

আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কি করবেন?
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
গ্লোবাল পাবলিশিং নেটওয়ার্ক
৬৬ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার-ঢাকা- ১১০০
ফোনঃ ৮৩১৪৫৪১, মোবাইলঃ ০১৭১২৭৬৪৭৯
আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কি করবেন?
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
সহযোগিতায়ঃ মাওলানা রাফীক বিন সাঈদী
অনুলেখকঃ আব্দুস সালাম মিতুল
প্রকাশকঃ গ্লোবাল পাবলিশিং নেটওয়ার্ক
৬৬ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার-ঢাকা- ১১০০
ফোনঃ ৮৩১৪৫৪১, মোবাইলঃ ০১৭১২৭৬৪৭৯
প্রথম প্রকাশঃ জুলাই ২০০৪
প্রচ্ছদঃ শিল্পকোণ
৪২৩ বড়মগবাজার, ওয়্যারলেস রেলগেট, ঢাকা-  ১২১৭
কম্পিউটার কম্পোজঃ শাকিল কম্পিউটার
৫৩/২ সোনালী বাগ, বড়মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
মুদ্রণেঃ আল আকাবা প্রিন্টার্স
৩৬ শিরিস দাস লেন, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০
শুভেচ্ছা বিনিময়ঃ ২০ টাকা মাত্র।

Allah Mrito Deho Neeye Kee Korben?
Moulana Delawar Hossain Sayedee
Co-operated by Moulana Rafeeq bin Sayedee
Copyist : Abdus Salam Mitul
Published by Global Publishing network
66 Paridas Road, Bangla Bazer Dhaka-1100
Phone : 8314541, Mobile : 0171276479
First Edition 2004, July
Price : 20 Taka Only

 

সূচীপত্র
কবর বলতে কি বুঝায়?
পরকালীন জগৎ কাল্পনিক কোনো জগৎ নয়
পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে
প্রথমে মুসলমান হতে হবে
কবরে নামানোর সময় কি বলা হচ্ছে?
আপনি একজন ছাত্র
আপনি একজন ব্যবসায়ী
মৃত্যুর পরে পর্দার প্রয়োজন নেই
আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কি করবেন?
আখিরাত ভিত্তিক চরিত্র গড়ুন
আখিরাত বিশ্বাসীদের অপরাধ কি?
নিজেকে ক্ষতিগ্রস্থ করবেন না

 

সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 20 December 2009 )