আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
সিয়াম: রোযাদারের ঢাল স্বরূপ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ আহমাদ কারীম   
Sunday, 21 September 2008
আর্টিকেল সূচি
সিয়াম: রোযাদারের ঢাল স্বরূপ
সিয়াম সংক্রান্ত কিছু মাসলা- মাসায়েল

সিয়াম সংক্রান্ত কিছু মাসলা- মাসায়েল:

ক. রোযা ভঙ্গের কারণ সমূহ:
রোযা ভঙ্গকারী বিষয় হচ্ছে আটটি,আর তা হলো নিম্নরূপ:
১. স্ত্রী সহবাস করা,যদি রোযাদারের পক্ষ থেকে রমাদানের দিনের বেলায় সহবাস সংঘটিত হয় তাহলে তার উপর রোযার কাযা সহ চুড়ান্ত কাফ্ফারা আদায় করা ওয়াজিব। চুড়ান্ত কাফফারা হচ্ছে; একজন গোলাম আযাদ করা,তা না পেলে দু'মাস একাধারে রোযা রাখা, আর এতে যদি সক্ষম না হয় তা হলে ষাটজন মিসকিনকে একবেলা খানা খাওয়ানো।
২. জাগ্রত অবস্থায় হস্তমৈথুন,সহবাস, চুম্বন,আলিঙ্গন অথবা এ জাতীয় কোন কাজের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটানো।
৩. পানাহার করা, চাই তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হোক বা ক্ষতিকর যেমন:ধুমপান।
৪. খাদ্য সরবরাহকারী এমন ইনজেকশন দেয়া যা ক্ষুধা নিবারন করে। কেননা এ ধরনের ইনজেকশন পানাহারের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তের যে সমস্ত ইনজেকশান খাদ্য সরবরাহ করে না তা রোযা নষ্ট করে না যদিও তা মাংসে অথবা রগে ব্যবহার করা হোক না কেন। কন্ঠনালীতে অথবা গলদেশে তার স্বাদ পাওয়া যাক অথবা পাওয়া না যাক এতে কোন অসুবিধা নেই।
৫. সুঁইয়ের মাধ্যমে রক্ত প্রদান করা যেমন; রোযাদারের যদি রক্তক্ষরণ হয় তার এ রক্তক্ষরণ মিটানোর জন্য ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্ত প্রদান করা।
৬. হায়েয ও নিফাসের রক্ত বের হওয়া।
৭. শিঙ্গা অথবা এ জাতীয় কোন কিছুর মাধ্যমে রক্ত বের করা তবে এমনিতে রক্ত বের হলে যেমন:নাক থেকে রক্ত বের হওয়া, অথবা দাত উঠানোর কারণে রক্ত বের হওয়া অনুরূপ কিছু রোযা নষ্ট করে না। কেননা এ ধরনের রক্ত বের হওয়া হুকুমের দিক থেকে শিঙ্গার মত নয় এবং শিঙ্গার পর্যায়ভুক্তও নয়।
৮. ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা। যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি করে তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে না।
হায়েয ও নেফাসের রক্ত বের হওয়া ব্যতীত বাকী রোযা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহের ব্যাপারে ৩ টি শর্ত রয়েছে:
১. ইচ্ছাকৃতভাবে করা, ভুলবশত: না করা
২. জোরপূর্বক বাধ্য হয়ে না করা
৩. বিধান সম্পর্কে জেনে- বুঝে করা।
সুতরাং রোযাদার যদি ভুলবশত: অথবা না জেনে আথবা জোরপূর্বক বাধ্য হয়ে রোযা ভঙ্গকারী কোন কিছু করে থাকে তাহলে রোযাদারের রোযা ভঙ্গ হবে না। এর প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহতা'লার বাণী:
رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
"হে আমাদের রব! আমরা যদি বিস্মিত হই অথবা ভুলবশত: কোন কিছু করি তাহলে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করোনা। "[সুরা আল বাক্বারাহ-২৮৬]
এবং তার বাণী:
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْأِيمَانِ
আর সে ব্যতীত যাকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়েছে অথচ তার অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ।" [সুরাতুন নাহাল-১০৬]
এবং তার বাণী:
وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ
আর যে ক্ষেত্রে তোমরা ভুল করে থাক সে ক্ষেত্রে তোমাদের কোন দোষ নেই, কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে তা অপরাধ হবে। [সুরা আল আহযাব-৫]
সুতরাং রোযাদার যদি ভুলবশত: কোন কিছু খায় অথবা পান করে তার রোযা নষ্ট হবে না; কেননা সে বিস্মৃত হয়েছে।
যদি সে কোন কিছু খায় অথবা পান করে এ বিশ্বাসে যে সূর্যাস্ত গিয়েছে অথবা ফজর এখনো উদিত হয়নি এতে তার রোযা নষ্ট হবে না; কেননা এ ব্যপারে সে অজ্ঞ বা মূর্খ।
রোযাদার যদি কুলি করে, এতে পানি তার গলদেশে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রবেশ করে যায় তাহলে তার রোযা বিনষ্ট হবে না; কেননা সে ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটি করেনি।
যদি রোযাদারের ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হয়ে যায় তাহলে তার রোযা নষ্ট হবে না; কেননা সে এ ব্যাপারে ইচ্ছাধীন ছিল না।

বিশেষ জ্ঞাতব্য বিষয়সমূহ:
১.অপবিত্র অবস্থায় রোযাদারের জন্য রোযার নিয়্যত করা বৈধ। অত:পর ফজর উদিত হওয়ার পর সে গোসল সেরে নিতে পারবে।
২.যদি কোন মহিলা রামাদান মাসে হায়েয অথবা নিফাস হতে ফজর উদিত হওয়ার পূর্বে পবিত্রতা লাভ করলে তাহলে ঐ দিনের রোযা রাখা তার উপর ওয়াজিব, যদিও সে ফজর উদিত হওয়ার পর গোসল করে থাকে।
৩.রোযাদারের জন্য দাঁত উঠানো, ঘাতে ঔষধ ব্যবহার করা, চোখে অথবা কানে ড্রপ দেয়া জায়েয, এতে রোযা ভঙ্গ হবে না যদিও কন্ঠনালীতে ড্রপের স্বাদানুভব করা যায়।
৪.রোযাদারের জন্য দিনের সকল সময় মেসওয়াক করা জায়েয,এটা তার জন্য সুন্নাত যেমনিভাবে রোযাদার ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের জন্য মেসওয়াক করা সুন্নাত।
৫. রোযাদারের জন্য প্রচন্ড গরম ও পিপাসা লাঘব করে এমন কাজ করা জায়েয। যেমন: পানি ব্যবহার করে ঠান্ডা হওয়া এবং এয়ারকন্ডিশনের নিচে অবস্থান করা, ভেজা কাপড় দিয়ে মাথা ঠান্ডা করা।
৬. রোযাদারের জন্য রক্তচাপ বা অন্য কারণে সৃষ্ট শ্বাস কষ্ট লাঘব করার জন্য মুখে স্প্রে ব্যবহার করা জায়েয।
৭.রোযাদারের জন্য দু'ঠোঁট শুকিয়ে গেলে তা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নেয়া এবং মুখ শুকিয়ে গেলে গরগরা করা ব্যতীত শুধুমাত্র কুলি করা জায়েয।
১০. রোযাদার তার উপর ওয়াজিব বা অপরিহার্য কাজসমূহ সংরক্ষণ করে চলবে, হারাম বা নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে দূরে সরে থাকবে। রোযাদার পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময়মত জামাআতের সাথে যথাযথভাবে আদায় করবে-যদি সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় যাদের জন্য জামাআত প্রযোজ্য।
রোযাদার মিথ্যা, পরনিন্দা, ধোকা, সূদি লেনদেনসহ সকল হারাম কাজ ও কথা পরিত্যাগ করে চলবে। কেননা নবী এরশাদ করেছেন:
من لم يدع قول الزور والعمل به و الجهل فليس لله حاجة في أن يدع طعامه و شرابه.
যে মিথ্যা কথা, সে অনুযায়ী কাজ ও মূর্খতা ত্যাগ করেনি আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই সে তার পানাহার বর্জন করুক।
১১. মুসাফিরের জন্য সর্বাবস্থায় রোযা ভঙ্গ করা বৈধ, যদিও সফরে তার কোন প্রকার কষ্ট না হয়। এমনকি রোযা রাখতে শারিরিক কোন ধরনের সমস্যা না হয়।
১২. যদি কোন ব্যক্তি রোযা রেখে মারাত্মক ক্ষুধার্ত অথবা কঠিন পিপাসার্ত হয়ে পড়ে, যাতে সে তার মৃত্যু কিংবা কোন অঙ্গ হানির আশংকা করে থাকে তাহলে তার জন্য রোযা ভঙ্গ করা বৈধ।
১৩. ইস্তেহাযার (নিয়মিত হায়েযের রক্ত নয় এমন রক্তস্রাব) রক্তস্রাব রোযা নষ্ট করে না, এ ধরনের রক্তস্রাবে আক্রান্ত মহিলার উপর রোযা রাখা ওয়াজিব, তার জন্য রোযা ভঙ্গ করা জায়েয নেই।
১৪. রোযাদার টুথ ব্রাশ ও টুথ পেস্ট ব্যবহার করতে পারবে, এতে তার রোযা নষ্ট হবে না।
১৫. যে ব্যক্তির রোযা ভঙ্গের কারণ স্পষ্ট যেমন: অসুস্থতা; তার জন্য প্রকাশ্যে পানাহার করা বৈধ এবং কোন অসুবিধা নেই। এতে রামাদানের অথবা রোযার মর্যাদা হানি হবে না। পক্ষান্তরে যার রোযা ভঙ্গের কারণ অপ্রকাশ্য যেমন: হায়েযের রক্তস্রাব; তার জন্য উত্তম হচ্ছে গোপনে পানাহার করা। যাতে রোযা নষ্ট করার তোহমত হতে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।

খ. যেসব কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না, কিন্তু আমাদের কাছে এসব বিষয় অস্পষ্ট:
কিছু কিছু বিষয় রয়েছে যা রোযা ভঙ্গের কারণ নয়, কিন্তু আমরা অনেকেই এগুলোকে রোযা ভঙ্গের কারণ মনে করে মানুষের মাঝে সংশয় সৃষ্টি করে থাকি। এ ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার। তাই নিম্নে এসব সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।
১. ভুলক্রমে পানাহার করা।
২. ভুলবশতঃ স্ত্রী সহবাস করা
৩. কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অথবা অসৎ খেয়াল করে বীর্যপাত ঘটানো, তবে প্রবৃত্তির তাড়না সৃষ্টিকারী বারবার দৃষ্টি রোযা নষ্ট করবে।
৪.শরীরে এমনকি নাকে মুখে তৈল ব্যবহার করা।
৫. সুরমা ব্যবহার করা যদিও সুরমার স্বাদ উপলব্ধি হয়।
৬. অনিচ্ছাকৃত কন্ঠনালীতে ধোয়া অথবা ধূলা-বালি প্রবেশ করা।
৭. জুনুব বা অপবিত্র অবস্থায় সকাল করা, এমনকি তাতে সারদিন গড়িয়ে গেলেও রোযা নষ্ট হবে না।
৮. রোযা অবস্থায় মেসওয়াক করা, যদিও তা দিনের শেষ অংশে হয়। দিনের শেষ অংশে মেসওয়াক করাকে কেউ কেউ মাকরূহ বললেও এ বক্তব্য সঠিক নয়।
৯. রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হওয়া। যেহেতু এ ব্যাপার রোযাদারের ইচ্ছাধীন নয়।
১০.সূর্য ডুবে গেছে অথবা ফজর এখনো হয়নি এ ধারণা করে পনাহার করা।
১১. এমন ইনজেকশন নেয়া যা খাবারের সহায়ক নয়, যেমন: গুহ্যদ্বারে অথবা রগে ইনজেকশন নেয়া বা ডুশ ব্যবহার করা।
১২. কিডনি ডায়লোসিস করা।
১৩.চোখে অথবা কানে ড্রপ ব্যবহার করা। তবে সম্ভব হলে পরিহার করা উত্তম।
১৪. গরগরা করার ঔষধ ব্যবহার করা, তবে এ শর্তে তা ব্যবহার করবে, যেন ভিতরে প্রবেশ না করে।
১৫. পরীক্ষার জন্য রক্ত প্রদান করা।
১৬. কুলি করার সময় অনিচ্ছাকৃত মুখে পানি ঢুকে যাওয়া।
১৭. স্ত্রীর সাথে কোলাকুলি, চুম্বন, স্পর্শ ও মেলামেশা করা, তবে শর্ত হচ্ছে এ ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।
১৮. ডায়াবেটিস রুগী ইনসুলিন ব্যবহার করা।
১৯. অসুস্থতার কারণে বিভিন্ন প্রকার স্প্রে ব্যবহার করা।
২০. রোযা রেখে খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা বা টেস্ট করা।

গ. রোযার আদব ও সুন্নাতসমূহ:
১. সাহরী করা, এবং ফজরের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত সাহরী খাওয়াকে বিলম্ব করা।
২. সূর্যাস্তের সাথে সাথে কোন প্রকার বিলম্ব না করে ইফতার করা।
৩. রোযাদার রোতাব (কাঁচা-পাকা খেজুর) দিয়ে ইফতার করবে, যদি তা না পায় তাহলে পাকা খেজুর খেয়ে, আর যদি তাও না পায় পানি পান করে, আর যদি তাও না পায় তাহলে হালাল খাদ্য দিয়ে ইফতার করবে, যদি রোযাদার তাও না পায় তাহলে অন্তরে অন্তরে ইফতারীর নিয়্যত করবে কোন কিছু পাওয়া পর্যন্ত।
৪. এ সময় নিজেকে বেশী বেশী দো'আ ও ইসেতেগফারে মশগুল রাখা।
৫. রোযাদারের জন্য সুন্নাত হচ্ছে বেশী বেশী নেক আমল করা এবং সকল প্রকার নিষিদ্ধ- হারাম কাজ হতে বিরত থাকা।
৬. সকল প্রকার অশ্লীল কথা ও কাজ হতে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা।
৭. নানা প্রকারের খানা অধিক পরিমাণে ভক্ষণ না করা।
৮. সাধ্যানুযায়ী বেশী পরিমাণে সকল ধরনের বদান্যতা ও দান- খায়রাত করা।
৯. ইফতারের পর এ দো'আ পড়া:
ذهب الظمأ و ابتلت العروق و ثبت الأجر إن شاء الله.

ঘ. রোযাদারের জন্য যা করা শরীয়তসম্মত নয়, বরং বিদ'আত:
১. ইফতারে নির্দিষ্ট সময় পরিমাণ ৫/১০ মিনিট সতর্কতা মনে করে দেরী করা। অনুরূপভাবে সাহরীতেও সতর্কতার নামে ২০/২৫ মিনিট আগে পানাহার ত্যাগ করা ।
২. রোযাদার রোযা রাখার কারণে সম্পূর্ণরূপে কথা-বার্তা থেকে বিরত থাকা।
৩. نويت أن أصوم غداً এ জাতীয় নিয়ত মুখে পড়ে রোযা শুরু করা।

-:সমাপ্ত:-



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )