কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Tuesday, 28 April 2009

কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ


আপনারা জানেন, মানুষ একটি কালেমা পাঠ করে ইসলামের সীমার মধ্যে প্রবেশ করে থাকে। সেই কালেমাটি খুব লম্বা -চওড়া কিছু নয় কয়েকটি শব্দ মাত্র। (*) এই কয়টি শব্দ মুখে উচ্চারণ করলেই মানুষ একবারে বদলে যায়। একজন কাফের যদি এটা পড়ে, তবে সে মুসলমান হয়ে যায়। ফলে পূর্বে সে নাপাক ছিল, এখন সে পাক হয়ে গেল। পূর্বে তার ওপর আল্লাহর গযব আসতে পারতো; কিন্তুএখন সে আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হয়ে গেল। প্রথমে সে জাহান্নামে যাবার যোগ্য ছিল• এখন জান্নাতের দুয়ার তার জন্য খুলে গেল। শুধু এটুকুই নয়, এই ‘কালেমা’র দরুন মানুষে মানুষেও বড় পার্থক্য হয়ে পড়ে। এ ‘কালেমা’ যারা পড়ে তারা এক উম্মাত আর যারা এটা অস্বীকার করে তারা হয় আলাদা এক জাতি। পিতা যদি ‘কালেমা’ পড়ে আর পুত্র যদি তা অস্বীকার করে তবে পিতা আর পিতা থাকবে না, পুত্র আর পুত্র বলে গণ্য হবেনা। পিতার সম্পত্তি হতে সেই পুত্র কোন অংশই পাবে না, তার নিজের মা ও বোন পর্যন্ত তাকে দেখা দিতে ঘৃণা করবে। পক্ষান্তরে একজন বিধর্মী যদি কালেমা পড়ে,আর ঐ ঘরের মেয়ে বিয়ে করে তবে সে এবং তার সন্তান ঐ ঘর হতে মীরাস পাবে। কিন্তু নিজ ঔরস জাত সন্তান শুধু এই ‘কালেমাকে’ অস্বীকার করার কারণেই  একেবারে পর হয়ে যাবে। এটা দ্বারা বুঝতে পারা যায় যে এই ‘কালেমা’ এমন জিনিস যা পর লোককে আপন করে একত্রে মিলিয়ে দেয়। আর আপন লোককে পর করে পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন করে।
একটু ভেবে দেখুন মানুষে মানুষে এতবড় পার্থক্য হওয়ার প্রকৃত কারণ কি? ‘কালেমা’তে কয়েকটা অক্ষর ছাড়া কি-ই বা রয়েছে? কাফ, লাম, মীম, আলিফ, সীন আর এ রকমেরই কয়েকটা অক্ষর ছাড়া আর তো কিছুই নয়। এ অক্ষরগুলো যুক্ত করে মুখে উচ্চারণ করলে। কোন যাদুর স্পর্শে মানুষ এতখানি বদলে যায়! শুধু এতটুকু কথা দ্বারা কি মানুষের পরস্পরের মধ্যে এত আকাশ-পাতাল পার্থক্য হতে পারে? •••••••••• একটু চিন্তা করলে।  আপনারা বুঝতে পারবেন আপনাদের বিবেক বুদ্ধি বলে ওঠবে যে কয়েকটা অক্ষর মিলিয়ে মুখে উচ্চারণ করলেই এতবড় ক্রিয়া কিছুতেই হতে পারে না। মূর্তিপূজক মুশরিকগন অবশ্য মনে করে যে একটা মন্ত্র পড়লেই পাহাড় টলে যাবে; যমীন ফেটে যাবে এবং তা হতে পানি উথলে ওঠবে !•••••••••••••••••••••••মন্ত্রের কোন অর্থ কেউ অবগত হোক বা না-ই হোক, তাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নেই। কারণ অক্ষরের মধ্যেই যাবতীয় শক্তি নিহিত আছে বলে তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। কাজেই তা মুখে উচ্চারিত হলেই সকল রহস্যের দুয়ার খুলে যাবে। কিন্তু ইসলামে এরূপ ধারণার কোনই মূল্য নেই। এখানে আসল জিনিস হচ্ছে অর্থ; শব্দের মধ্যে যা কিছু ক্রিয়া বা তা’ছীর আছে, তা অর্থের দরুনই হয়ে তাকে। শব্দের কোন অর্থ না  হলে তা মনের মূলের সাথে গেঁথে না গেলে এবং তার ফলে মানুষের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, চরিত্র ও তার কাজ -কর্মে পরিবর্তন না ঘটলে, শুধু শব্দের উচ্চরণ করলেই কোন লাভ নেই।

 

একথাটি সহজ  উদাহরণ দ্বারা আপনাদেরকে বুঝাতে চাই। যেমন ধরুন, আপনার ভয়ানক শীত লাগছে। এখন আপনি যদি মুখে  ‘লেপ -তোষক’ বলে চিৎকার করতে শুরু করেন• তবে শীত লাগা কিছুমাত্র কমবে না। সারা রাত বসে ‘লেপ-তোষক’ বলে হাজার তাসবীহ পড়লেও কোন ফল ফলবে না। অবশ্য আপনি লেপ -তোষক যোগাড় করে যদি গায়ে দিতে পারেন তবে শীত লাগা নিশ্চয় বন্ধ হয়ে যাবে। এরূপে মনে করুন, আপনার তৃষ্ণা লেগেছে। এখন যদি আপনি সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘পানি’ ‘পানি ’করে চিৎকার করতে থাকেন •তবে তাতে পিপাসা মিটবে না। কিন্তু এক গ্লাস পানি যদি পান করেন তবে আপনার কলিজা অবশ্যই ঠান্ডা হবে। মনে করুন, আপনার অসুখ হয়েছে এখন যদি আপনি ‘ওষুধ’ ‘ওষুধ’ করে তাসবীহ পাঠ শুরু করেন, আপনার রোগ তাতে দূর হবে না। হাঁ যদি ঠিক ওষুধ খরিদ করে তা সেবন করেন, তবে আপনার রোগ সেরে যাবে। ‘কালেমা’র অবস্থাও ঠিক এটাই। শুধু ছয়-সাতটি শব্দ মুখে বলে দিলে এত বড় পার্থক্য হতে পারে না, যে মানুষ কাফের ছিল সে এর দরুন একেবারে মুসলমান হয়ে যাবে, নাপাক হতে পাক  হবে, দুশমন লোক  একেবারে বন্ধু হয়ে যাবে, জাহান্নামী ব্যক্তি একেবারে জান্নাতী হয়ে যাবে। মানুষে মানুষে এরূপ পার্থক্য হয়ে যাওয়ার একটি মাত্র উপায় আছে। তা এই যে, প্রথমে এই শব্দগুলোর অর্থ বুঝে নিতে হবে, সেই অর্থ যাতে মানুষের মনের মূলে শিকড় গাড়তে পারে, সেই জন্যে চেষ্টা করতে হবে। এভাবে অর্থ জেনে ও বুঝে যখন এটা মুখে উচ্চারণ করবেন, তখনই আপনারা বুঝতে পারবেন যে এই কালেমা পড়ে আপনারা আপনাদের আল্লাহর সামনে কত বড় কথা স্বীকার করেছেন, আর এর  দরুন আপনাদের ওপর কত বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে। এসব কথা বুঝে শুনে যখন আপনারা ‘কালেমা’ পড়বেন তখন আপনাদের চিন্তা এবং আপনার সমস্ত জীবনের ওপর এ‘কালেমা’র পূর্ণ আধিপত্য স্থাপিত হবে। এর পর এ ‘কালেমা’র বিরোধী কোন কথা আপনাদের মন ও মগজে একটু স্থান পেতে পারে না। চিরকালের তরে আপনাদের একথাই মনে করতে হবে যে এই কালেমার বিপরীত যা তা মিথ্যা -এ কালেমাই একমাত্র সত্য। আপনাদের জীবনে সমস্ত কাজ কারবারে এ ’কালেমা’ই হবে একমাত্র হুকুম দাতা। এ ‘কালেমা’ পড়ার পরে কাফেরদের  মত স্বাধীনভাবে যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন না। তখন এ ‘কালেমা’ই হুকুম পালন করে চলতে হবে, এটা যে কাজ করতে বলবে তাই করতে হবে এবং যে কাজের নিষেধ করবে তা হতে ফিরে থাকতে হবে। এভাবে‘কালেমা’ পড়লেই মানুষে মানুষে পূর্বোল্লেখিতরূপে পার্থক্য হতে পারে।

এখন  কালেমার অর্থ কি, তা পড়ে মানুষ কি কথা স্বীকার করে, আর তা স্বীকার করলেই মানুষ কোন বিধান মত চলতে বাধ্য হয় প্রভৃতি বিষয় আলোচন করবো।


কালেমার অর্থঃ

 “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, হযরত মুহাম্মাদ (সা•) আল্লাহ তা’আলার রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ।” কালেমার মধ্যে যে ‘ইলাহ্’ শব্দটি রয়েছে এর অর্থ হচ্ছে মালিক, সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্যে বিধান রচনাকারী, মানুষের  দোয়া যিনি শোনেন এবং গ্রহন করেন-তিনিই উপাসনা পাবার একমাত্র উপযুক্ত। এখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পড়লে তার অর্থ এই হবে যে আপনি প্রথম স্বীকার করলেনঃ এ দুনিয়া আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টি হতে পারেনি, এর সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই বর্তমান আছেন, আর সেই সৃষ্টিকর্তা বহু নয়-- মাত্র একজন। তিনি ছাড়া আর কারও খোদায়ী বা প্রভুত্ব কোথাও নেই; দ্বিতীয়ত কালেমা পড়ে আপনি স্বীকার করলেন যে সেই এক আল্লাহ ই মানুষের ও সারে জাহানের মালিক। আপনি ও আপনার প্রত্যকটি জিনিস এবং দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুই তাঁর। সৃষ্টিকর্তা তিনি, রিযিক দাতা তিনি, জীবন ও মৃত্যু তাঁরই হুকম মত হয়ে থাকে। সুখ ও বিপদ তাঁরই তরফ হতে আসে। মানুষ যা কিছু পায়, তারঁই কাছ থেকে পায়--সকল কিছুর দাতা প্রকৃত পক্ষে তিনি। আর মানুষ যা হারায় তা প্রকৃত  পক্ষে তিনিই কেড়ে নেন। শুধু তাঁকেই ভয় করা উচিত, শুধু তারই কাছে প্রার্থনা করা উচিত, তারই সামনে মাথা নত করা উচিত। কেবল মাত্র তারই ইবাদাত ও বন্দেগী করা কর্তব্য। তিনি ছাড়া আমাদের মনিব, মালিক ও আইন রচনাকারী আর কেউই নাই। একমাত্র তারই হুকুম মেনে চলা এবং কেবল তারই আইন অনুসারে কাজ করা আমাদের আসল ও একমাত্র কর্তব্য।

‘কালেমা’ *** পড়ে আপনি আল্লাহর কাছে এই ওয়াদাই করে থাকেন আর সারা দুনিয়া এ মৌলিক অঙ্গীকারের সাক্ষী হয়ে থাকে। বিপরীত কাজ করলে আপনার জিহ্বা,আপনার হাত-পা, আপনার প্রতিটি পশম এবং আকাশ ও পৃথিবীর এক একটি অনূ -পরমানু যাদের সামনে আপনি এ ওয়াদা করেছিলেন আপনার বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে সাক্ষ্য দেবে। আপনি সেখানে একেবারে অসহায় হয়ে পড়বেন। আপনার সাফাই প্রমান করার জন্য একটি সাক্ষী কোথাও পাবেন না। কোন উকিল কিংবা ব্যারিস্টার আপনার পক্ষ সমর্থন করার জন্য সেখানে থাকবে না। বরং স্বয়ং উকিল সাহেব কংবা ব্যারিস্টার সাহেব দুনিয়ার আদালতে যারা আইনের মারপ্যাচ খেলে থাকে,তারা সকলেই সেখানে আপনারই মত নিতান্ত অসহায় অবস্থায় পড়ে যাবে। সেই আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে, জাল দলীল দেখিয়ে এবং উকিলের দ্বারা মিথ্যা ওকালতী করিয়ে আপনারা রক্ষা পেতে পারবেন না। দুনিয়ার পুলিশের চোখ হতে আপনারা নিজেদের অপরাধ লুকাতে পারেন, কিন্তু আল্লাহর পুলিশের চোখ হতে তা গোপন করা সম্ভব নয়। দুনিয়ার পুলিশ ঘুষ খেতে পারে, আল্লাহর পুলিশ কখনও ঘুষ খায়না। দুনিয়ার সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে, আল্লাহর সাক্ষী সকলেই সত্যবাদী --তারা মিথ্যা বলে না। দুনিয়ার বিচারকেরা অবিচার করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা অবিচারক নন। তারপর আল্লাহ যে জেলখানায় পাপীদেরকে বন্দী করবেন, সেখান হতে পলায়ন করা কোন মতেই সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহর সাথে মিথ্যা ওয়াদা করা বড় আহাম্মকি এবং সবচেয়ে বেওকুফী সন্দেহ নেই। যখন আল্লাহর সামনে ওয়াদা করছেন, তখন খুব ভাল কর বুঝে শুনে করুন এবং তা পালন করার চেষ্টা করুন, নতুবা শুধু মুখে ওয়াদা করতে আপনাকে কেউ জবরদস্তি করছে না। কারণ মুখে শুধু স্বীকার করার কোন মূল্যই নেই।

‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলার পর বলতে হয় ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। এর অর্থ এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মধ্যস্থতায়ই আল্লাহ তাআলা তার আইন মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন একথা আপনারা স্বীকার করছেন। আল্লাহকে নিজেদের মনিব, মালিক ও বাদশাহ স্বীকার করার পর একথা অবগত হওয়া একান্ত দরকার ছিল যে, সেই বাদশাহে দো-আলমের আইন ও হুকুম কি? আমরা কোন কাজ করলে তিনি খুশী হবেন, আর কোন কাজ করলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন? কোন আইন অণুসরণ করলে তিনি আমাদের ক্ষমা করবেন আর কোন আইনের বিরোধিতা করলে তিনি আমাদেরকে শাস্তি দেবেন? এসব জানার জন্যে আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ(সা)-কে তাঁর দূত নির্দিষ্ট করেছেন। তার মধ্যস্থতায় তিনি আমাদের প্রতি তার কিতাব পাঠিয়েছেন এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা•) আল্লাহর হুকুম মত কিরূপে জীবনযাপন করতে হয়, তা বাস্তব ক্ষেত্রে দেখিয় গিয়েছেন।
কাজেই আপনারা যখন বলেন, ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ তখন এর দ্বারা আপনারা একথাই স্বীকার করে থাকেন যে, যে আইন এবং যে নিয়ম হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন, আপনারা তা অনুসরণ করে চলবেন। আর যে আইন এর বিপরীত হবে তাকে পদদলিত করবেন। এ ওয়াদা করার পর যদি আপনারা হযরত মুহাম্মাদ (সা•)-এর প্রচার আইনকেই ছেড়ে দেন, আর দুনিয়ার আইন অনুসরণ করে চলেন তবে আপনাদের চেয়ে বড় মিথ্যাবদী ও বেঈমান আর কেউ নেই। কারণ হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর প্রচারিত আইনকে একমাত্র সত্য আইন মেনে এবং তার অনুসরণ করে চলার অঙ্গীকার করেই আপনারা ইসলামের সীমার মধ্যে এসেছেন।  একথা স্বীকার করেই আপনারা মুসলামানদের ভাই হয়েছেন, এরই দরুন আপনারা মুসলমান পিতার উত্তরাধিকারী হতে পেরেছেন। এরই বদৌলতে আপনারা মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করেছেন। এরই কারণে আপনাদের সন্তান ন্যায়ত সন্তান হতে পেরেছে। এরই দরুন মুসলমানগণ আপনাদেরকে সাহায্য করেছে আপনাদেরকে যাকাত দিয়েছে, আপনাদের জান-মাল ও মান -সম্মানে হেফাযত করার দায়িত্ব নিয়েছে।  এতসব হওয়া সত্ত্বেও যদি আপনারা নিজেদের ওয়াদা ভঙ্গ করেন, তবে এটা অপেক্ষা বড় বেঈমানী দুনিয়ায় আর কি হতে পারে? আপনারা যদি (***) এর অর্থ জানেন এবং জেনে -বুঝেই এটা স্বীকার করেন, তাহলে সকল অবস্থাতেই আল্লাহর আইন মেনে চলা আপনাদের কর্তব্য। আল্লাহর আইন জারি হয়ে না থাকলেও আপনাদের এটা জারি করা উচিত। যে ব্যক্তি মনে করে আল্লাহর পুলিশ, সৈন্য, আদালত এবং জেলখানা কোথাও মওজুদ নেই, কাজেই তাঁর আইন লংঘন করা সহজ আর গর্ভমেন্টের পুলিশ ফোজ, আদালাত এবং জেলখানা চারদিকে বর্তমান আছে, কাজেই তার আইন ভঙ্গ করা বড়ই মুশকিল --তবে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আমি পরিস্কার ভাষায়ই বলে দিচ্ছি যে (***) কালেমা সে মিথ্যাই পড়েছে। সে এটা দ্বারা তার আল্লাহকে, সারে জাহানকে, সমস্ত মুসলকমানকে এং স্বয়ং নিজের মনকে ধোঁকা দিচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ইতিপূর্বে কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ আমি বলেছি। এখন সেই বিষয়ে অন্য আর একদিক দিয়ে ভেবে দেখতে বলছি।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের এবং প্রত্যেক জিনিসেরই মালিক একথা আপনারা স্বীকার করছেন। কিন্তু এর অর্থ কি? এর অর্থ এই যে আপনাদের জান মাল আপনাদের নিজের দেহ আল্লাহর। আপনাদের হাত, কান এবং আপনাদের দেহের কোন একটা অঙ্গও আপনাদের নিজের নয়। যে জমি আপনারা চাষবাদ করেন যেসব পশু দ্বারা আপনারা কাজ করান যেসব জিনিস-পত্র আপনারা সবসময় ব্যবহার করছেন, এদের কোনটাই আপনাদের নিজের নয়। সবকিছুই  আল্লাহ  তাআলার মালিকানা এবং আল্লাহর দান হিসেবেই এগুলো আপনারা পেয়েছেন। একথা স্বীকার করার পর আপনাদের একথা বলার কি অধিকার থাকতে পারে যে জান --প্রাণ আমার শরীর আমার মাল আমার ,অমুক জিনিস আমার আর অমুক জিনিসটি আমার। অন্য একজনকে কোন জিনিসের মালিক বলে ঘোষণা করার পর তার জিনিসকে আবার নিজের বলে দাবী করা সম্পূর্ণ অথহীন। যদি বাস্তবিকই আল্লাহকে দুনিয়ার সমস্ত জিনিসের মালিক মনে করেন। তবে তা হতে আপনা আপনি দু’টি জিনিস আপনাদের ওপরে এসে পড়ে। প্রথম এই যে, আল্লাহ ই যখন মালিক আর তিনি তাঁর মালিকানার জিনিস আমানত স্বরূপ আপনাদেরকে দিয়েছেন, তখন সেই মালিকের হুকুম মতই আপনাদের সেই জিনিসগুলো ব্যবহার করতে হবে। তাঁর মর্জির উল্টা কাজ যদি এর দ্বারা করেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনারা আমানতের খেয়ানত করছেন। আপনাদের হাত-পা পর্যন্ত সেই মালিকের মর্জির বিপরীত কাজে ব্যবহার করার কোন অধিকার আপনাদের নেই। আপনাদের চোখ দ্বারাও তার নিষিদ্ধ জিনিস দেখতে পারেন না। যা তাঁর মর্জির বিপরীত। আপনাদের এই জমি -জায়গাকে মালিকের বিধানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আপনাদের কোনই অধিকার নেই। আপনাদের যে স্ত্রী এবং  সন্তানকে নিজেদের বলে দাবী করেন, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে দান করেছেন বলেই তারা আপনাদের আপন হয়েছে, কাজেই তাদের সাথে আপনাদের ইচ্ছামত নয়-মালিকরই হকুম মত ব্যবহার করা কর্তব্য। তার মতের উল্টো যদি ব্যবহার করেন তবে আপনারা ডাকাত নামে অভিহিত হবার যোগ্য। পরের জিনিস হরণ করলে পরের জায়গা শক্তির বলে দখল করলে আপনারা তাকে বলেন, বেঈমান; সেরূপ  আল্লাহর দেয়া জিনিসকে নিজের মনে করে নিজের ইচ্ছা কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ও মর্জিমত যদি ব্যবহার করেন• তবে সেই বেঈমানীর অপরাধে আপনারাও অপরাধী হবেন। মালিকের মর্জি অনুসারে কাজ করলে যদিও আপনাদের কোন ক্ষতি হয় হোক, জান চলে যায় যাক, হাত-পা ভেঙ্গে যায় যাক, সন্তানের লোকসান হয় হোক, মাল ও জমি -জায়গা বরবাদ হযে যায় যাক, আপনারা সেই জন্য কোন পরোয়া করবেন না। জিনিসের মালিকই যদি এর ক্ষয় বা ক্ষতি পসন্দ করেন, তবে তা করার তাঁর অধিকার আছে। তবে হাঁ,মালিকের মর্জির খেলাপ যদি আপনারা করেন, আর তাতে যদি কোন জিনিসের ক্ষতি হয়ে পড়ে, তবে সে জন্য আপনারাই অপরাধী হবেন, সন্দেহ নেই। কারণ পরের জিনিস আপনারা নষ্ট করেছেন। আপনারা আপনাদের জানকেও পর্যন্ত নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারেন না। মালিকের মর্জি অনুসারে জান কুরবান করলে মালিকেরই হক আদায় হবে, তাঁর মতের উল্টা কাজে প্রাণ দিলে মস্তবড় বেঈমানী করা হবে।
      দ্বিতীয় কথা এইযে, মালিক যে জিনিসই আপনাকে দান করেছেন, তা যদি সেই মালিকের কাজেই ব্যবহার করেন• তবে তার দ্বারা কারোও প্রতি কোন অনুগ্রহ হতে পারে না-মালিকের প্রতিও নয়। এ পথে যদি আপনারা কিছু দান করেলেন, কোন খেদমত করলেন, কিংবা আপনাদের প্রিয়বস্তু প্রাণকে কুরবান করলেন• তবে তা কারোও প্রতি আপনাদের একবিন্দু অনুগ্রহ নয়। আপনাদের প্রতি মালিকের যে হক ছিল এর দ্বারা শুধু তাই আদায় করলেন মাত্র। এতে গৌরব বা অহংকার করার মত কিংবা তারীফ বা প্রশংসা পাবার মত কিছু নেই। মনে রাখবেন, মুসলমান ব্যক্তি মালিকের পথে কিছু খরচ করে কিংবা তার কিছু কাজ করে কিছুমাত্র গৌরব বোধ করে না, বরং সে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করে; গৌরব বা অহংকার ভাল কাজকে বরবাদ করে দেয়। যে ব্যাক্তি প্রশংসা পাবার আশা করে এবং শুধু সে উদ্দেশ্যেই ভাল কাজ করে কারণ সে তার কাজের প্রতিফল এ দুনিয়াতেই পেতে চাচ্ছে, আর তাই সে পেয়েছে নিখিল দুনিয়ার মালিক আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ দেখুন, তিনি তাঁর নিজের জিনিস আপনাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেন, আর বলেন যে এ জিনিস তোমাদের কাছ থেকে আমি ক্রয় করলাম এবং তার মূল্য ও তোমাদেরকে দেব। আল্লাহু আকবার। আল্লাহর দান ও অনুগ্রহের কি কোন সীমা-পরিসীমা আছে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ**

 “আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল খরিদ করেছেন এবং তার বিনিময়ে তাদের জন্য জান্নাত নির্দিষ্ট করে রেখেছেন”। (সূরা আত তাওবাঃ ১১১)

    আপনাদের সাথে মালিকের এরূপ ব্যবহার ! কিন্তু আপনি তার সাথে কিরূপ ব্যবহার করছেন, তা একবার বিচার করে দেখুন।  মালিক যে বস্তু আপনাদেরকে দিয়েছেন, তারপর সেই মালিক সে জিনিস মূল্য দিয়ে আপনাদের কাছ থেকে ক্রয় করেছেন, সে জিনিসকে আপনারা অন্যের কাছে বিক্রি করছেন, আর খুবই সামান্য ও নিকৃষ্ট মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করছেন। যার কাছে বিক্রি করছেন সে মালিকের মর্জির উল্টা কাজে আপনাদের সেসব জিনিসকে ব্যবহার করে  আর আপনারা তাদেরকে আপাদের রেযেকদাতা মনে করেই তাদের কাজ করে থাকেন। মূলত আপনাদের দেহের শক্তিগুলো এমনভাবে বিক্রি করার কোন অধিকার আপনাদের নেই। আল্লাহ দ্রোহী শক্তি যা কিছু কিনতে চায়, আপনারা তাই তাদের কাছে বিক্রি করেন, তা অপেক্ষা বড় দুর্নীতি আর কি হতে পারে? একবার বিক্রি করা জিনিসকে পুনরায় অন্যের কাছে বিক্রি করা আইনত  এবং নীতগতভাবে অপরাধ। দুনিয়ায় এ জন্য আপনার বিরুদ্ধে প্রবঞ্চনার মামলা চলতে পারে। আপনারা কি মনে করেন আল্লাহর আদালতে এ বিষয়ে মামলা চলবে না?

 

পাক কালেমা ও নাপাক কালেমা


কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ ইতিপূর্বে বলেছিঃ এখানে সেই সম্পর্কেই আর একটু ব্যাখ্যা করে আপনাদেরকে বুঝাতে চাই। কারণ এ কালেমাই ইসলামের মূল ভিত্তি, এরই সাহায্যে মানুষ ইসলামে দাখিল হয়, আর এ কালেমাকেই ভাল করে না বুঝে এবং সে অনুসারে নিজের জীবনকে গঠন না করে কোন মানুষ মুসলমান থাকতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে এ কালেমার পরিচয়  এভাবে দিয়েছেঃ
“কালেমায়ে তাইয়্যেবার উদাহরণ যেমন কোন ভাল জাতের গাছ, এর শিকড় মাটির নীচে মজবুত হয়ে গেঁথে রয়েছে। এর শাখা-প্রশাখাগুলো আকাশের শূণ্যলোকে বিস্তৃত -- আল্লাহর হুকুমে তা অনবরত ফলের পর ফলদান করছে। আল্লাহ এরূপ দৃষ্টান্ত মানুষের উপদেশ গ্রহণের জন্য দিয়েছেন। এর বিপরীত হচ্ছে কালেমায়ে খাবিসাহ অর্থাৎ খারাপ আকিদা ও মিথ্যা কথা। এর উদাহরণ যেমন বন-জঙ্গলের ছোট ছোট আগাছা -পরগাছা। মাটির একেবারে উপরিভাগে তা- জন্মে•সামান্য এক টানেই তা উৎপাটিত হয়ে যায়; কারণ এর শিকড় মাটিতে খুব মজবুত হয়ে গাঁথতে পারে না। আল্লাহ সেই পাকা কথার দরুন মুমিনেদেরকে ইহকালে ও পরকালে সুদৃঢ় রাখেন এবং যালেমদেরকে বিভ্রান্ত করে থাকেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন।” (সূরা ইব্‌রাহীমঃ ২৪-২৭)
আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা এমন একটা অতুলীয় উদাহরণ দিয়েছেন যে,আপনারা একটু চিন্তা করলেই এটা হতে খুব বড় শিক্ষা পেতে পারেন। দেখুন একটি আম গাছের শিকড় মাটির কত নীচে ঘেঁথে রয়েছে, ওপরের দিকে কতখানি উচ্চ হয়ে ওঠেছে, তার কত ডাল -পালা চারদিকে বিস্তৃত হয়েছে, আর তাতে প্রতি বছর কত ভাল ভাল ফল ফলছে। কিন্তু এটা কেমন করে হলো? এর বীজ খুব শক্তিশালী ছিল বলে। এত বড় একটা গাছ হবার তার পূর্ণ হক ছিল। আর সেই   হক এত সত্য ছিল যে যখন এটা নিজের হক এর দাবী করলো তখন মাটি পানি, বায়ু, দিনের গরম, রাতের ঠান্ডা সব জিনিসই তার দাবী মেনে নিয়েছে।  আমের সেই বীচি যার কাছে যা চেয়েছে তার প্রত্যেকেই তাকে তা দিয়েছে। এভাবে সে নিজের অধিকারের জোরে এত বড় একটা গাছ হয়ে ওঠতে পেরেছে। পরে সে মিষ্টি মিষ্টি ফল দিয়ে একথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে বাস্তবিকই এমন একটা গাছ হওয়ার তার অধিকার ছিল। আকাশ ও পৃথিবীর সকল শক্তি একত্র হয়েও যদি তার সাহয্যে করে থাকে, তবে তা কিছুমাত্র অন্যায় করেনি, বরং এদের এরূপ করাই উচিত ছিল। কারণ জমি, পানি, বায়ু এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জিনিসের মধ্যে গাছ -পালার খোরাক যোগাবার ও এদের বড় করে তোলার শক্তি এ জন্য নিহিত আছে যে, তা দ্বারা ভালে জাতের গাছ গুলোরঅনেক উপকার হবে।
   এ ছড়া বন -জঙ্গলে ছোট ছোট এমন কত গাছ আছে - যা নিজে- নিজেই হয়েছে। এদের মধ্যে কি শক্তি আছে? ছোট একটু শিকড় একটা ছোট ছেলে তা টেনে উপড়ে ফেলতে পারে। কিংবা তা এতই নরম ও দুর্বল যে একটু দমকা তাওয়া  লাগলেই তা নত হয়ে পড়ে। তা কাঁটায় ভরা, স্পর্শ করলেই কাঁটা বিদ্ধ হয়। তা মুখে দিলে মুখ নষ্ট করে দেয়।  রোজ রোজ কত জন্ম হয়, কত যে উপড়িয়ে ফেলা হয়, তার হিসেব আল্লাহই জানেন। এগুলোর এরূপ অবস্থা কেন? কারণ এগুলোর মধ্যে আম গাছের মত অতখানি জোর নেই। জমিতে যখন ভাল জাতের গাছ হয়না, তখন জমি বেকার পড়ে থেকে একেবারে হতাশ হয়ে যায়। কাজেই সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসব আগাছা পরগাছাকে তার বুকে স্থান দেয়। পানি কিছু সাহায্য করে, বাযু তার কিছু শক্তি দান করে; কিন্তু আকাশ ও পৃথিবীর কোন জিনিসই এসব পরগাছার কোন স্বত্ব স্বীকার করতে চায়না। এজন্য জমি তার বুকের মধ্যে এদের শিকড় বিস্তৃত হতে দেয় না। পানি ওর খুব বেশী সাহায্য করে না। আর বায়ু ওকে প্রাণ খুলে বাতাস দান করে না। এভাবে টানাটানানির পর যখন ওটা একটু মাথা জাগায়, তখন তা এত তিক্ত ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে যাতে প্রমান হয়ে যায় যে, আকাশ ও পৃথিবীর  শক্তি সমুহ মূলত এ আগাছা জন্মাবার জন্য নয়। আগাছাগুলো প্রকৃতির বুক হতে সামান্য কিছু শক্তি যে পেয়েছে এদের পক্ষে এটাই মস্ত ভাগ্যের কথা।
এ দুটি উদাহরণ সামনে রাখুন, তারপর কালেমায়ে তাইয়্যেবা ও কালেমায়ে খাবীসার পার্থক্য সম্পর্কে ভাল করে চিন্তা করুন।


 কালেমায়ে তাইয়্যেবা কি?

•••••••••• একটা সত্য কথা, এমন সত্য কথা যে, এ দুনিয়ায় তা অপেক্ষা অধিক সত্য কথা এর একটিও নেই। এক আল্লাহই সারেজাহানের ইলাহ, আকাশ ও পৃথিবীর  প্রত্যেকটি জিনিসই একথার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। মানুষ, জানোয়ার, গাছ, পাথর, বালুকণা, প্রবাহমান ঝর্ণা, উজ্জ্বল সূর্য চারদিকে বিস্তৃত  এই সমস্ত জিনিস -- এর কোনটাকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেননি?  আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কি এ গুলোকে সৃষ্টি করেছেন? তাঁর দয়া ও মেহেরবানী ছাড়া অন্য কারো অনুগ্রহে কি এগুলো বেচেঁ আছে? এদের মধ্যে কোন একটিকে ও কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জীবন বা মৃত্যু  দান করতে পারে? এই সারেজাহান যখন আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি তাঁরই দয়ায়  যখন এসবকিছু বর্তমান আছে এবং তিনিই যখন এসবের একমাত্র মালিক ও হুকুমদাতা, তখন যে সময়েই আপনি বলবেন এ পৃথিবীতে সে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোও প্রভুত্ব বা খোদায়ী নেই, তৎক্ষনাৎই আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটা জিনিসই বলে ওঠবেঃ তুমি সত্য কথা বলেছো, আমরা সকলেই তোমার কথার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছি।  সেই আল্লাহর সামনে যখন আপনি মাথা নত করবেন, বিশ্বভুবনের প্রত্যেকটি জিনিসই আপনার সাথে তারই সামনে ঝুকেঁ পড়বে। কারণ, ••••••••••• এই সমস্ত জিনিসও একমাত্র তারঁই ইবাদত করে। আপনি যখন তাঁরই হুকুম পালন করে বলবেন,তখন আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই আপনার সাক্ষী হবে। কারণ এসবই যে একমাত্র তাঁরই অনুগত। আপনি যখন তাঁর পথে চলতে শুরু করবেন, তখন আপনি একাকী হবেন না, এ নিখিল জাহানের অগণিত ‘সৈন্য’ আপনার সাথে চলতে আরম্ভ করবে। কারণ, আকাশের সূর্য হতে শুরু করে পৃথিবীর ক্ষদ্রতম বস্তুকণা পর্যন্ত সর্বদা তাঁরই নির্ধারিত পথে চলছে। আপনি যখন সেই এক আল্লাহর ওপর নির্ভর করবেন, তখন সামান্য শক্তির ওপর নির্ভর করা হবে না-আপনার ভরসা করা হবে এমন এক বিরাট শক্তির ওপর,যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত শক্তি ও ধন -সম্পদের একমাত্র মালিক। মোটকথা, এই নিগুড় তত্ত্ব যদিও আপনি বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে চলেন• তবে আপনি ভাল করেই জানতে পারবেন যে কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান এনে যে ব্যাক্তি  নিজের জীবনকে সেই আদর্শ অণুসারে গঠন করে নেবে, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় শক্তিই তার সাহায্য কাজে নিযুক্ত হবে। দুনিয়ার জীবন হতে পরকাল পর্যন্ত সে কেবল উন্নতি করতে থাকবে। তার কোন চেষ্টাই ব্যর্থ হবে না। কোন উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থাকতে পারবেনা। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা একথাই বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ এই কালেমা এমন একটা গাছ, যার শিকড় গভীর মাটির তলে মজবুত হয়ে গেঁথে রয়েছে এবং শাখা প্রশাখা আকাশের মহাশূন্য বিস্তৃত হয়ে আছে। আর সব সময়ই তারা আল্লাহর হুকুমে ফলদান করে থাকে।
‘কালেমায়ে খাবীসাহ’এর সম্পূর্ন বিপরীত মতবাদ উপস্থিত করে। ‘কালেমায়ে খাবীসাহ’ অর্থঃ এ দুনিয়ার ইলাহ বা সৃষ্টিকর্তা কেউ নেই, কিংবা এ দুনিয়ায় একাধিক ইলাহ রয়েছে। একটু চিন্তা করে দেখলেই বুঝতে পারবেন যে তা অপেক্ষা বড় মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন কথা আর কিছুই হতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই বলে ওঠে, তুমি মিথ্যাবাদী, নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন। আমাদেরকে আর তোমাদেরকে সেই আল্লাহই তো সৃষ্টি করেছেন। আর সে আল্লাহই তোমাকে ঐ জিহ্বা দিয়েছেন  যার দ্বারা তুমি এতবড় একটা মিথ্যা কথা বলছো। মুশরিক বলে যে,আল্লাহ এক নয়, তাঁর সাথে আরও অনেক দেবদেবী রয়েছে। তারাও রেযেক দেয়, তারাও তোমাদের মালিক তারাও তোমাদের ভাগ্য গড়তে ও ভাঙতে পারে। উপকার করা কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদেরও আছে তোমাদের  দোয়া তারাও শুনতে পারে। তারাও তোমাদের মকসুদ পূর্ণ করতে পারে, তাদেরকে ভয় করে চলা উচিত। তাদের ওপর ভরসা করা যেতে পারে। দুনিয়া পরিচালনার ব্যাপারে তাদেরও হুকুম চলে। আল্লাহ ছাড়া তাদেরও হুকুম পালন করে চলা কর্তব্য ।  এসবই কালেমায়ে খাবীসাহ। এসব কথার উত্তরে আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিস বলে ওঠেঃ তুমি মিথ্যাবাদী  তোমার প্রত্যেকটা কথাই সত্যের বিলকুল খেলাপ। এখন ভেবে দেখুন এ কালেমা যে ব্যক্তি কবুল করবে এবং সে অণুসারে নিজের জীবনকে গঠন করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে সে কেমন করে উন্নতি লাভ করতে পারে? আল্লাহ অণুগ্রহ করে এসব লোককে অবসর ও অবকাশ দিয়ে রেখেছেন এবং রেযেক দেবারও ওয়াদা করেছেন। কাজেই আকাশ ও পৃথিবীর শক্তিগুলো কিছু না কিছু পরিমাণে তাদেরকে প্রতিপালন করবে- যেমন বন--  জঙ্গলে আগাছা পরগাছাগুলোকে করছে। কিন্তু পৃথিবীর কোন একটা জিনিসও আগ্রহ করে তাদেরকে সাহায্য করবেনা। এবং পূর্ণশক্তি দিয়ে তাদের সহায়তা করবে না। তারা ঠিক জঙ্গলের আগাছার মতই কিছুদিন মাত্র বেঁচে থাকতে পারবে তার-  বেশী নয়।

উক্তরূপ পার্থক্য এ কালেমাদ্বয়ের পরিণাম ফলের ব্যাপারে ও বর্তমান রয়েছে। ‘কালেমায়ে তাইয়্যেবা’ যখন ফল দান করবে, তখন তা খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদুই হবে। দুনিয়ার বুকে তা দ্বারা শান্তি স্থাপিত হবে। চারদিকে সত্য ও পূর্ণ সুবিচার কায়েম হবে। কিন্তু কালেমায়ে খাবীসাহ যতই বৃদ্ধি পাবে, কেবল কাঁটায় ভরা ডাল-- পালাই তা হতে বের হবে। তিক্ত ও বিষাক্ত ফল তাতে ফলবে। এর শিরায় শিরায় বিষ ভরা থাকবে। নিজেদের চোখ দিয়েই আপনারা তা দেখে নিতে পারেন। দুনিয়ার যেখানেই কুফরি শিরক এবং নাস্তিকতার জোর বেশী, সেখানে কী হচ্ছে? সেখানে মানুষ মানুষের রক্ত পান করছে। দেশের পর দেশ গ্রামের পর গ্রামে ধ্বংস করার আয়োজন খুব জোরের সাথেই চলছে। বিষাক্ত গ্যাস তৈরী হচ্ছে। এক জাতি অন্য জাতিকে সমূলে ধবংস করার জন্যে ওঠেপড়ে লেগেছে। শক্তিমান দুর্বল ব্যক্তিগণকে নিজের গোলাম বানিয়ে রেখেছে --তার ভাগের রুটি কেড়ে নেবার জন্য শুধু দুর্বল মানুষকে সেখানে সৈন্য, পুলিশ, জেল ও ফাঁসির ভয় দেখিয়ে অবনমিত করে রাখার এবং শক্তিশালী জাতির যুলুম নীরবে সহ্য করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া এসব জাতির ভিতরের অবস্থা আরও ভয়ানক খারাপ। তাদের নৈতিক চরিত্র এতই কদর্য যে, স্বয়ং শয়তানও তা দেখে লজ্জাপায়। মানুষ সেখানে জন্তু -জানোয়ার অপেক্ষাও হীনতর কাজ করছে। মায়েরা সেখানে নিজেদের হাতেই নিজেদের সন্তানকে হত্যা করছে- যেন এ সন্তান সুখ-সম্ভোগের পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে। স্বামীরা সেখানে নিজেদের স্ত্রীদেরকে অন্যের কোলে ঠেলে দিচ্ছে শুধু পরের  স্ত্রীকে নিজের বুকে পাবার  উদ্দেশ্যে। উলংগদের ক্লাব ঘর তৈরী করা হয়েছে, সেখানে নারী --পুরুষ পশুর মত উলংগ হয়ে চলাফেরা করছে। ধনী ব্যক্তি সুদ গ্রহণ করে গরীবদের প্রতি কেনা গোলামের ন্যায় ব্যবহার করছে মনে হয়। কেবল তারেই খেদমত করার জন্য দুনিয়ায় এদের জন্ম হয়েছে। মোটকথা এই কালেমায়ে খাবীসার দরুন সেখানে কাঁটায় চারদিকে ভরে গেছে; আর যে ফলই তাতে ফলছে তা হয়েছে ভয়ানক তিক্ত ও বিষাক্ত।
  আল্লাহ তাআলা এ দুটি উদাহরণ বিশ্লেষণ করার পর বলেছেন, কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি যারা ঈমান আনবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে একটি মজবুত বাণীর সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন--তারা অটল ও অক্ষয় হবে। আর তার মোকাবিলায় কালেমায়ে খাবীসাতে যারা বিশ্বাস করবে, আল্লাহ তাআলা তাদের সকল আয়োজন ও চেষ্টাকেই ব্যর্থ করে দেবন। তারা কখনই কোন সহজ কাজ করতে পারবে না। তা দ্বারা দুনিয়ায় কিংবা আখেরাতে তাদের কিছুমাত্র কল্যাণ ও সাধিত হতে পারে না। কালেমায়ে তাইয়্যেবা ও কালেমায়ে খাবীসার পার্থক্য ও উভয়ের ফলাফল আপনারা শুনলেন। এখন আপনারা অবশ্যই জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, আমরাও কালেমায়ে তাইয়্যেবাকে মানি; কিন্তু তবু কোন কারণে আমাদের উন্নতি হয় না?  আর যে কাফেরগণ কালেমায়ে খাবিসাকে বিশ্বাস করে  তারাই বা কোন কারণে এত শক্তিমান ও উন্নত হচ্ছে।
এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার ভার আমার ওপর। আমি এর জবার দেব, কিন্তু পূর্বেই বলেছি, আমার জবাব শুনে কেউ রাগ করতে পারবেন না। আমার জবাব ঠিক কি না আপনারা শুধু তাই বিচার করে দেখবেন।
    আপনারা কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান এনেছেন বলে দাবী করেন এবং তবুও আপনাদের উন্নতি হচ্ছে না, প্রথম এ কথাটাই সত্য। কারণ কেবল মুখে মুখে কালেমায়ে তাইয়্যেবা পড়লেই কোন  কাজ হয়না তা মন দিয়ে পড়তে হবে। মন দিয়ে পড়ার অর্থ বিশ্বাস ও মতবাদের পরিবর্তন করা। এর বিরোধী কোন বাদ বা মতবাদ যেন কালেমা বিশ্বাসী ব্যক্তির মনে স্থান না পায় এবং কালেমার নির্দেশের বিপরীত কোন কাজও যেন সে কখনও না করে। কিন্তুবলুন, আপনাদের প্রকৃত অবস্থা কি এরূপ? আপনাদের মধ্যে কি কালেমায়ে তাইয়্যেবার বিপরীত হাজারও কুফরি ও মুশরিকী ধারণা বর্তমান নেই? মুসলমানের মাথা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোও সামনে নত হয় না? মুসলমান আল্লাহ ছাড়া অন্য লোককে কি ভয় করে না?  অন্যের সাহায্যের ওপর কি ভরসা করে না? আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কি তারা রেযেকদাতা বলে বিশ্বাস করে না? আল্লাহর  আইনকে ছেড়ে দিয়ে তারা খুশী হয়েই কি অন্যের আইন অনুসরণ করে চলেনা? মুসলমান হবার দাবীদার লোকেরা আদালতে গিয়ে পরিস্কার ভাবে বলে না যে, আমরা শরীয়াতের বিচার চাই না? আমরা দেশের প্রচলিত প্রথামত বিচার চাই? আপনাদের মধ্যে এমন কোন লোক কি নেই, যারা দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ লাভের জন্য আল্লাহর আইন লংঘন করতে একটু পরোয়া করে না? আপনাদের মধ্যে এমন লোক কি নেই, যারা কাফেরদের ক্রোধের ভয়ে ভীত; কিন্তু আল্লাহর গযবকে মোটেই ভয় করে না? এমন লোক কি আপনাদের মধ্যে নেই যারা কাফেরদের কৃপাদৃষ্টি লাভ করার জন্য সবকিছুই করতে প্রস্তুত, কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ দৃষ্টি লাভ করার জন্য কিছুই করতে রাজী নয়? এমন  লোকও কি নেই, যারা কাফেরদের রাজত্বকে রাজত্ব বলে মনে করে, কিন্তু আল্লাহর রাজত্ব যে কোথাও বর্তমান আছে, সেই কথা তাদের একবারেই মনে পড়ে না?  সত্য করে বলুন, এসব কথা কি সত্য নয়? যদি বাস্তবিকই সত্য হয়ে থাকে, তবে আপনারা কালেমায়ে তাইয়্যেবাকে স্বীকার করেন এবং তা সত্বেও আপনাদের উন্নতি হয়না একথা কোন মুখে বলতে পারেন? প্রথমে খাঁটি মনে ঈমান আনুন এবং কালেমায়ে তাইয়্যেবা অনুসারে জীবনকে গঠণ করুন। তারপর যদি গভীর মাটির তলে মজবুত শিকড় ও শুন্য আকাশে বিস্তৃত শাখার সেই মহান গাছের জন্ম না হয়। তখন বলতে পারবেন যে আল্লাহ মিথ্যা ওয়াদা করেছেন (নাউযুবিল্লাহ )। পরন্তু কালেমায়ে খাবীসাহ বিশ্বাসী লোক দুনিয়ায় খুবই উন্নতি লাভ করছে বলে মনে করাও সর্ম্পূণরূপে ভুল। কারণ কালেমায়ে খাবীসাকে যারা মানবে তারা উন্নতি লাভ করতে পারে না; অতীতে কখনও পারেনি আর এখনও পারছে না। তাদের ধন-দৌলত,সুখ-- শান্তি  ও স্ফুর্তির জীবন, বিলাসিতা ও আনন্দের সাজ-- সরঞ্জাম এবং বাহ্যিক শান-শওকত দেখে আপনারা হয়ত মনে করেছেন যে, তারা আসলে বুঝি খুবই উন্নতি করছে। কিন্তু আপনারা তাদের মনের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তাদের মধ্যে কতজন লোক বাস্তবিকই শান্তিতে আছে? বিলাসিতা ও সুখের সরঞ্জাম তাদের প্রচুর আছে; কিন্তু মনের মধ্যে আগুনের উল্কাপিন্ড সবসময় দাউ দাউ করে জ্বলছে। এ জন্যই তারা এক আল্লাহকে পেতে পারে না। আল্লাহর আইনের অমান্য করার কারণে তাদের প্রত্যেকটি পরিবারে জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডে পরিণত হচ্ছে। খবরের কাগজ খুলে দেখুন, ইউরোপ ও আমেরিকায় আত্নহত্যার হিড়িক পড়ে গেছে। কত অসংখ্য তালাক দিন রাত সংঘটিত হচ্ছে। সেই দেশের  সন্তান কিভাবে নষ্ট করা হচ্ছে এবং ওষুধ ব্যবহার করে জন্মের হার কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। নানা প্রকার দূষিত রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কিভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে খাদ্য নিয়ে কিভাবে টানাটানি ও কাড়াকাড়ি চলছে। হিংসা -দ্বেষ এবং শত্রুতা একজাতীয় মানুষের মধ্যে কিভাবে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। বিলাসিতার চাকচিক্যময় শহরে দূর হতে দেখে যাকে আপনারা স্বর্গের সমান মনে করেন -- লক্ষ লক্ষ লোক কি দঃখের জীবন যাপন করছে,তা ভাবলেও শরীর শিউরে ওঠে।•••••••••এটাকে কি কখনও উন্নতি বলে মনে করা যায়? এ স্বর্গ পাবার জন্যই কি আপনারা লালায়িত?
মনে রাখবেন, আল্লাহর বাণী কখনও মিথ্যে হতে পারেনা। বাস্তবিকই কালেমায়ে তাইয্যেবা ছাড়া আর কোন কালেমা এমন নেই, যা অনুসরণ করে মানুষ দুনিয়ায় সুখ এবং পরকালে মহাশান্তি লাভ করতে পারে। যেদিকে ইচ্ছে আপনারা চোখ খলে দেখুন, এ সত্যের বিপরীত আপনারা কোথাও দেখতে পারেন না।


কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্য


     পূর্বেই দুটি প্রবন্ধে কালেমায়ে তাইয়্যেবার বিশদ অর্থ আপনাদের সামনে ব্যক্ত করেছি। বর্তমান প্রবন্ধে আমি কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান আনার আবশ্যকতা  এবং তার উপকারিতা ব্যক্ত করতে চেষ্টা করবো।
        আপনারা সকলে জানেন যে, মানুষ দুনিয়ায় যে কাজই করুক না কেন, তার মূলে একটা উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই বর্তমান থাকে এবং কিছু না কিছু উপকার পাবার জন্যই মানুষ সে কাজ করে থাকে। বিনা উদ্দেশ্যে, বিনা গরজে এবং বিনা উপকারিতায় কোন কাজ কেউই করে না। আপনারা পানি পান করেন কেন?  পান করেন এ জন্য যে, তাতে আপনাদের পিপাসা নিবারণ হয়। কিন্তু পানি পান করার পরও যদি আনপাদের পিপাসা না মিটত তবে আপনারা কিছুতেই পানি পান করতেন না। কারণ এ পানি পান করায় কোন ফল নেই। আপনারা খাদ্যদ্রব্য কেন আহার করেন? এ উদ্দেশ্যে যে তাতে আপনাদের ক্ষুধার নিবৃত্তি হবে এবং আপনাদের জীবনীশক্তি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু আহার ও অনাহার উভয়েরই ফল যদি একরূপ হয়। তবে খাদ্য ভক্ষণের কাজটাকে আপনারা একটা বাজে কাজ বলে মনে করতেন। রোগ হলে আপনারা ওষুধ সেবন করেন এ জন্যে যে তাতে রোগ দূর হয়ে যাবে এবং আপনারা পূর্ণ স্বাস্থ্যবান হবেন; কিন্তু ওষুধ সেবন করার পরও যদি রোগ দূর না হয় বরং পূর্বের মতই অবস্থা বর্তমান থাকে তাহলে আপনি অবশ্যই বলবেন, এ ওষুধ সেবন করা সম্পূর্ণ নিষ্ফল। কৃষি কাজে আনপারা এত পরিশ্রম করেন কেন? করেন এ জন্য যে আপনারা এর দ্বারা শস্য ফল ও নানা রকমের তরিতকারী পেতে পারেন। কিন্তু বীজ বপন করার পরও যদি জমিতে কোন শস্য না হয় তবে আপনারা হাল-- চাষ, বীজ বোনা এবং তাতে পানি দেয়ার জন্য এতদূর  কষ্ট কিছুতেই স্বীকার করতেন না। মোটকথা দুনিয়ায় আপনারা যে কাজই কারেননা কেন, তাতে উদ্দেশ্য সফল হলে কাজ ঠিকমত হয়েছে বলে মনে করা হয়। আর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে আপনারা বলেন যে কাজ ঠিকমত করা হয়নি।
  এ নিগূঢ় কথাটি মনে রাখুন তারপর আপনারা আমার এক একটা প্রশ্নের জবাব দিতে থাকুন। প্রথম প্রশ্ন এই যে কালেমা পড়া হয় কেন? এ প্রশ্নের জবাবে  আপনি এছাড়া আর কিছুই বলতে পারেন না যে কালেমা পড়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে এর দ্বারা কাফের ও মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা। কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করতে চাইযে, কাফের ও মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য কি?  এর অর্থ কি এই যে কাফেরের দুটি চোখ,কাজেই মুসলমান কালেমা পড়লে তার চারটি চোখ হবে? অথবা কাফেরের মাথা একটি কাজেই মুসলমানের মাথা দু’টো হবে? আপনি নিশ্চয়ই বলবেন যে না এখানে দৈহিক পার্থক্যের কথা বলা হচ্ছে না। পার্থক্য হওয়ার আসল অর্থ এই যে কাফেরের পরিণাম ও মুসলমানের পরিণাম পার্থক্য হবে। কাফেরের পরিণাম এই যে পরকালে সে আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হবে এবং তার জীবনের উদ্দেশ্য বিফল হয়ে যাবে। আর মুসলমানের পরিণাম এইযে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে এবং পরকালে সে সফল হবে-মহাসুখে কাল যাপন করবে।
আপনাদের এ জবাব শুনে আমি বলবো যে আপনারা ঠিক জবাবই দিয়েছেন। কিন্তু আপনারা আমাকে বলুন পরকাল কাকে বলে? পরকাল বিফল ও সার্থক হওয়ার অর্থ কি?  আর সেখানে সফলতা ও কামিয়াবী লাভের তাৎপর্যই বা কি?  এ কথাগুলো ভাল করে বুঝে নিতে না পারলে পরবর্তী আলোচনা শুরু করা যায় না।
এ প্রশ্নের জবাব আপনাকে দিতে হবে না। পূর্বেই এর জবাব দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ **** “ইহকাল পরকালের কৃষি ক্ষেত”।
    দুনিয়া ও আখেরাত দুটি ভিন্ন জিনিস নয়। উভয়ই মানুষের একই পথের দু’টি মনজিল। দুনিয়া এ পথের প্রথম মনজিল,আর আখেরাত সর্বশেষ মনজিল। জমি চাষ করা এবং তা হতে ফসল পাওয়ার মধ্যে যে সম্পর্ক এ দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে ঠিক সে সম্পর্কই বিদ্যমান। আপনারা জমিতে হাল চাষ করেন, তার পরে বীজ বপন করেন, দরকার হলে তাতে পানি দেন, তার পরে ফসল পেতে পারেন। আপনি  জমিতে যে জিনিসেরই চাষ করবেন, ফলও তারই পাবেন। ধান বপন করলে ধান পাবেন, পাট বপন করলে পাট পাবেন, গম বপন করলে গমেরই ফসল পাবেন,কাঁটার গাছ যদি বপন করেন, তবে কাঁটার গাছই আপনার ক্ষেতে জন্মাবে। আর যদি কিছুই বপন  না করন, তবে আপনার ক্ষেতে  কিছুই জন্মাবে না। তারপর হাল-চাষ করতে, বীজ বপন করতে, তাতে দরকার মত পানি দিতে এবং ক্ষেতের দেখাশুনা করতে যে ভুল ত্রুটি আপনার দ্বারা হয় তার মন্দ ফল আপনার ফসল কাটার সময় জানতে পারেন। আর এসব কাজ যদি আপনি খুব ভালভাবে করে থাকেন, তবে ফসল কাটার সময়ই আপনি এর বাস্তব ফল দেখতে পাবেন। দুণিয়া ও আখেরাতের অবস্থাও ঠিক এরূপ। দুনিয়াকে মনে করেন একটা ক্ষেত। এখানে নিজের পরিশ্র্রম ও চেষ্টার দ্বারা নিজের জন্যে ফসল উৎপন্ন করার উদ্দেশ্যে মানুষকে পাঠানো হয়েছে। জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে চাষাবাদের জন্য সময় দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে মানুষ যে ফসলেই চাষ করে, সেই ফসলেই সে মৃত্যুর পরে পরকালের জীবনে পেতে পারবে,আর যে ফসলই সেখানে পাবে তারই পরকালীন জীবন একমাত্র তারই ওপর নির্ভর করবে। যদি কেউ দুনিয়ায় জীবন ভরে ভাল ফসলের চাষ করে, তাতে দরকার মত পানি দেয় এবং তার দেখাশুনাও যদি খুব ভালভাবে করে, তবে পরকালের জীবনে সে যখনই পা রাখবে, তখনই তার পরিশ্রমের ফলস্বরূপ একটি ফলে-- ফুলে ভরা শ্যামল বাগিচা দেখতে পাবেন। তাকে এ পরকালের জীবনে আর কোন পরিশ্রম করতে  হবে না। বরং দুনিয়ার জীবন সুখে ও স্বাচ্ছন্দ্যে অতিবাহিত হবে। এ জিনিসেরই নাম হচ্ছে জান্নাত। এটা লাভ করতে পারলেই বুঝতে হবে যে পরকালে সে সফল ও কামিয়াব হয়েছে।
কিন্তু যে ব্যক্তি তার দুনিয়ার জীবনে কেবল কাঁটা, তিক্ত ও  বিষাক্ত ফলের বীজ বপন করে, পরকালের জীবনে শুধু তারই ফসল পাবে  সেখানে খারাপ ফসল নষ্ট করে দিয়ে ভাল ফসল তৈরী করার এবং নিজের এ নির্বুদ্ধিতার পরিবর্তে বুদ্ধিমানের মত কাজ করার কোন সুয়োগ বা সময় সে আর পাবেনা। সেই খারাপ ফসলের দ্বারাই পরকালের সমস্ত জীবন কাটাতে হবে, কারণ দুনিয়ায় সে শুধু এরই চাষ করেছে। যে কাঁটা সে রোপণ করেছিল, পরকালে তাকে সেই কাঁটার শয্যায়ই শায়িত করা হবে। আর যে তিক্ত ও বিষাক্ত ফলের চাষ করে ছিল, সেখানে তাঁকে তাই ভোগ করতে হবে। পরকালে ব্যর্থ ও বিফল হওয়ার অর্থ এটাই।
    আখেরাতের ব্যাখ্যা এইমাত্র আমি করলাম, কুরআন ও হাদীস হতেও এটাই প্রমাণিত হয়। এ ব্যাখ্যা হতে নিঃসন্দেহে জানা গেল যে, পরকালের জীবনে মানুষের বিফল কিংবা সফল হওয়া এবং তার পরিণাম ভাল কিংবা মন্দ হওয়া প্রকৃত পক্ষে তার এ দুনিয়ার জীবনের ইলম ও আমল, জ্ঞানও কাজের ভাল কিয়ভা মন্দ হওয়ারই একমাত্র ফল  এতে কোন সন্দেহ নেই।
এ কথাটি বুঝে নেয়ার সাথে সাথে এ কথাটিও অতি সহজেই বুঝতে পারবেন যে, মুসলমান ও কাফেরের পরিণাম ফলের পার্থক্য বিনা কারণে হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে পরিণামের পার্থক্য প্রথম সূচনার পার্থক্যের ফলমাত্র। দুনিয়ায় যদি মুসলমান এবং কাফেরের জ্ঞান ও কাজের পার্থক্য  না হয়। তবে পরাকালেও তাদের পরিণামের দিক দিয়ে কোনই পার্থক্য হতে পারে না। দুনিয়ায় এক ব্যক্তির জ্ঞান ও কাজ ঠিক একজন কাফেরের জ্ঞান ও কাজের মতই হবে অথচ পরকালে কাফেরের দুঃখময় পরিণাম হতে সে বেঁচে যাবে, এটা কিছুতেই হতে পারেনা।
এখন আবার সেই গোড়ার প্রশ্ন জেগে ওঠে যে, কালেমা পড়ার উদ্দেশ্য কি? প্রথমে আপনি এ প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, কাফেরের পরিণাম ও মুসরমানের পরিণামে পার্থক্য হওয়াই কালেমা পড়ার একমাত্র উদ্দেশ্য। তারপরে ও আপনি পরিণাম ও পরকালের যে ব্যাখ্যা শুনিয়েছেন, সেই অনুসারে আপনার প্রদত্ত  জবাব সম্পর্কে আপনাকে আবার একটু ভেবে দেখতে হবে এবং আপনাকে এখন এ কথাই বলতে হবে যে কালোমা পড়ার উদ্দেশ্য দুনিয়ার মানুষের ইলম বা জ্ঞান ও কাজকে ঠিক এমনভাবে  করা -যেন পরকালে তার পরিণাম ভাল হয়। পরকাল মানুষকে এ দুনিয়ায় সেই ফলের বাগান তৈরির কাজ শিক্ষা দেয়। মানুষ যদি এ কালেমা কেই স্বীকার না করে তবে সেই বাগানই বা তৈরি করবে কি করে, আর পরকালে সে কিসের ফল ভোগ করবে?  মানুষ যদি কেবল মুখে মুখেই এ কালেমা পড়ে; কিন্তু তার জ্ঞান যদি কালেমা না পড়া ব্যক্তির মত হয় এবং তার কাজ- কর্ম যদি একজন কাফেরের মত হয়, তাহলে তার বিবেক বলে ওঠবে যে, এভাবে কালেমা পড়ায় কোনই লাভ নেই। এমন ব্যক্তির পরিণাম একজন কাফেরের পরিণামের চেয়ে ভাল হবার কোন কারণ থাকতে পারে না। শুধু মুখ দিয়ে কালেমা পড়ে আল্লাহর ওপর সে কোন অনুগ্রহ করেনি। কজেই বাগান বানাবার নিয়ম না শিখে বাগান তৈরি না করে এবং সারা জীবন কেবল কাঁটার চাষ করে কোন মানুষই পরকালের সবুজ শ্যামল ও ফুলে -ফলে ভরা বাগান লাভ করতে পারে না। এরূপ ধারণা করাও আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। পূর্বে কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে প্রকাশ করেছি, যে কাজ করা এবং না করা উভয়েরই ফল এক রকম, সেই  কাজের কোন দাম নেই তা  একেবারেই অর্থহীন। যে ওষুধ সেবন করার পরও রুগীর অবস্থা ঠিক সেই রকমই থাকে যেমন ছিল ওষুধ পান করার পূর্বে,তা আসলে ওষুধ নয়। ঠিক এ রকমই কালেমা পড়া মানুষের জ্ঞান এবং কাজ যদি ঠিক কালেমা না পড়া লোকদের মতই  থাকে তবে এমন কালেমা পড়া একেবারেই অর্থহীন। দুনিয়ায়ই যখন কাফের ও মুসলমানের বাস্তব জীবনধারায় কোনরূপ পার্থক্য হলোনা তখন পরকালে তাদের পরিণাম ফল ভিন্ন ভিন্ন হবে কেন?
এখন কালেমায়ে তাইয়্যেবা মানুষকে কোন ধরনের জ্ঞান শিক্ষা দেয় এবং সেই জ্ঞান শেখার পর মুসলমান ও কাফেরের  দৈনন্দিন কাজে কোন ধরনের পার্থক্য হওয়া বাঞ্ছনীয় তারই আলোচনা করবো।
   দেখুন, এ কালেমা হতে আপনি সর্বপ্রথম জানতে পারেন যে, আপনি আল্লাহর বান্দাহ, আর কারো বান্দাহ আপনি নন। একথা যখন আপনি জানতে পরলেন তখন আপনা আপনি এ কথাও আপনার জানা হয়ে গেল যে আপনি যার বান্দাহ দুনিয়ায় তাঁরই মর্জিমত আপনাকে কাজ করতে হবে। কারণ তাঁর মর্জির খেলাপ যদি আপনি চলেন বা কাজ করেন, তবে আপনার মালিকের বিরুদ্ধে আপনার বিদ্রোহ করা হবে।
  অতএব এ কালেমা আপনাকে শিক্ষা দেয় যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল। একথা জেনে নেয়ার সাথে সাথে একথাও আপনি জানতে পারলেন যে,আল্লাহর রাসূল দনিয়ার ক্ষেতে কাঁটা ও বিষাক্ত ফলের চাষ করার পরিবর্তে ফুল এবং মিষ্ট ফলের বাগান রচনা করার যে নিয়ম দেখিয়ে দিয়েছেন, আপনাকেও ঠিক সেই নিয়মেই কাজ করতে হবে। আপনি যদি সেই নিয়ম অনুসরণ করেন, তাহলেই পরকালে আপনি ভাল ফসল পেতে পারবেন। আর যদি তার বিপরীত পন্থায় কাজ করেন, তবে দুনিয়ায় আপনার কাঁটা চাষ করা হবে এবং পরকালে ঠিক কাঁটাই আপনি ফলস্বরূপ পাবেন, অন্য কিছু নয়।
এ জ্ঞান লাভের পর আপনার দৈনন্দিন জীবনধারাকেও সেইঅনুসারে গঠন করতে হবে। আপনি যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, আপনাকে একদিন মরতে হবে, মরার পরে একদিন এক ভিন্ন রকমের জীবন যাপন করতে হবে এবং সেই জীবনে আপনাকে এ দুনিয়ায় অর্জিত ফসলের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে, তাহলে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর উপস্থাপিত নিয়ম ও বিধান অনুসরণ না করে অন্য কোন পন্থা অনুযায়ী চলা আপনার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। দুনিয়ায় আপনি চাষাবাদ করেন কেন?  করেন  এ জন্য যে চাষ না করলে ফসল পাওয়া যাবে না। আর ফসল না হলে না খেয়ে মরতে হবে--   এ কথার প্রতি আপনার খুবই বিশ্বাস আছে। আপনি যদি এ কথা বিশ্বাস না করতেন এবং যদি মনে করতেন যে চাষ না করলেও ফসল ফলবে কিংবা ফসল ছাড়াও আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন, তাহলে আপনি চাষাবাদের জন্য এত পরিশ্রম কিছুতেই করতেন না। এখন আপনি নিজের সম্বন্ধে চিন্তা করুন। যে ব্যক্তি আল্লাহকে নিজের প্রভু ও মুহাম্মাদ (সা)-কে আল্লাহর রাসূল মুখে মুখে স্বীকার করে এবং আখেরাতের ওপর বিশ্বাস আছে বলে দাবী করে কিন্তু তার দৈনন্দিন জীবনে কাজ-- কর্ম আল্লাহর কুরআন ও রাসূল (সা) এর হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় চলে, তার সম্বন্ধে জেনে রাখুন যে তার ঈমান  প্রকৃতপক্ষে অতিশয় দুর্বল। সে নিজের ক্ষেতের কাজ না করার মন্দ পরিণাম যেরূপ নিশ্চতার সাথে বিশ্বাস করে, যদি ততটুকু নিশ্চয়তার সাথে আখেরাতের জন্য ফসল তৈরি না করার দুঃখময় পরিণাম বিশ্বাস করতো তবে কখনই সে পরকালের কাজে এরূপ অবহেলা প্রদর্শন করতে পারতো না। কেউ জেনে শুনে নিজের ভবিষ্যতের জন্য কাঁটা বীজের চাষ করে না। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে না যে,কাঁটা রোপণ করলে তা হতে কাঁটাই জন্মাবে, আর সে কাঁটাই তাকে কষ্ট দেবে একমাত্র সেই ব্যক্তিই কাঁটা চাষ করতে পারে অন্য কেউ  নয়। আপনি জেনে শুনে আপনার হাতে জলন্ত অংগার কখনই নিতে পারেন না। কারণ আপনি নিশ্চিত জানেন যে, এতে হাত পুড়ে যাবে। কিন্তু একটি অবুঝ শিশু আগুনে হাত দেয়, কেননা তার পরিণাম যে কত কষ্টদায়ক তা সে আদৌ জানে না।

সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )