আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলাম ও জাহেলিয়াত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Thursday, 04 June 2009
আর্টিকেল সূচি
ইসলাম ও জাহেলিয়াত
মানব জীবনের মৌলিক সমস্যা
খালেছ জাহেলিয়াত বা নিরেট অন্ধতা
শির্ক
বৈরাগ্যবাদ
সর্বেশ্বরবাদ
ইসলাম
মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে নবীদের মত
ইসলামী মতবাদ

খালেছ জাহেলিয়াত বা নিরেট অন্ধতা

নিছক বাহ্যেন্দ্রিয়ের উপর একান্তভাবে নির্ভর করে মানুষ যখন উল্লিখিত প্রশ্নসমূহের উত্তর লাভ করতে চেষ্টা করে এবং এই উপায়ে কোনো মত নির্দিষ্ট করে নেয়, তখন এ চিন্তাপদ্ধতির অতি স্বাভাবিক পরিণতি ক্রমেই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয় তা এই যে, সৃষ্টিজগতের এই বিরাট ও বিস্ময়কার ব্যবস্থা নিছক একটি আকস্মিক ঘটনার বাস্তব প্রকাশ মাত্র। এর পশ্চাতে কোনো সদিচ্ছা বা মহৎ উদ্দেশ্য বর্তমান নেই, ইহা স্বতস্ফূর্তভাবেই অস্তিত্ব লাভ করেছে, নিজস্ব শক্তির সাহায্যে এর কার্যক্রম চলছে এবং শেষ পর্যন্ত নিজে নিজেই চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। এই বিরাট বিশ্ব প্রকৃতির কোনো স্বত্বাধিকারী কোথাও বর্তমান নেই। আর তা থাকলেও মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষকে এক প্রকার ‘জন্তু’ বলেই মনে করা হয় এবং সম্ভবত এক দূর্ঘটনার ফলেই এই পৃথিবীতে জন্মলাভ করেছে বলে ধারণা করা হয়। তাকে কেউ সৃষ্টি করেছে, না নিজেই তার সত্তা লাভ করেছে, তা সকলেরই অজ্ঞাত। আর মূলত এই প্রশ্ন এখানে অবান্তর। মানুষকে এই পৃথিবীতে জীবন্ত ও বিচরণশীল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে নানাবিধ ইচ্ছা, বাসনা ও লালসা রয়েছে, তার প্রকৃতি নিহিত শক্তি এর চরিতার্থ করার জন্য অহর্নিশ প্রবলভাবে উত্তেজনা দেয়। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অস্ত্র-সরঞ্জাম রয়েছে ; সে সবের সাহায্যে তার অন্তর্নিহিত লালসা-বাসনা চরিতার্থ করা যেতে পারে। মানুষের চতুষ্পার্শ্বের এই বিশাল বিস্তৃত ভূমির বুকে সীমা-সংখ্যাহীন উপাদান-উপকরণ বিদ্যমান রয়েছে, এ সবের উপর মানুষ নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অস্ত্র-শস্ত্র প্রয়োগ করে নিজের বাসনা পূর্ণ করতে পারেঃ

অতএব তার অন্তর্নিহিত যাবতীয় শক্তি ও ক্ষমতার সাহায্যে নিজস্ব লালসা-বাসনা পূর্ণরূপে চরিতার্থ করা ভিন্ন এর ব্যবহার ক্ষেত্র আর কিছু নেই এবং সমগ্র দুনিয়া অফুরন্ত দ্রব্য-সামগ্রীর একটি ভান্ডার ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ তার উপর হস্ত প্রসারিত করবে এবং নিজের ইচ্ছামত দ্রব্য-সামগ্রী হস্তগত করবে পৃথিবীর এটাই একমাত্র কাজ। এর উপর এমন কোনো শক্তিসম্পন্ন ও কর্তৃত্বশীল সত্তা নেই, যার নিকট মানুষ জবাবদিহি করতে বাধ্য হতে পারে। মানুষের জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য অপরিহার্য আইন-বিধান লাভ হতে পারে সত্যজ্ঞান ও পথনির্দেশ লাভের এমন কোনো উৎস কোথাও নেই। ফলত মানুষ স্বাধীন, দায়িত্বহীন ও স্বাধিকার সমন্বিত এক সত্তা।

নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-বিধান রচনা, তার অন্তর্নিহিত শক্তিসমূহের ব্যবহার ক্ষেত্র নির্ধারণ করা এবং পৃথিবীতে বর্তমান সকল প্রকার জীব-জন্তু ও বস্তুর সাথে নিজের সম্পর্ক ও কর্মনীতি নির্ধারণ করা তাদের নিজেদেরই কাজ। এ ব্যাপারে কোনোরূপ পথনির্দেশ লাভ করতে হলে জন্তু-জানোয়ারের জীবনে, প্রস্তর-পর্বতের ইতিকাহিনীতে এবং স্বয়ং মানুষেরই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান সম্ভারের উপর নির্ভর করতে হবে। মানুষ কারো নিকট দায়ী নয়, কারো নিকট তাকে যদি একান্তই জবাবদিহি করতে হয় তবে তা তার নিজের নিকট ; অথবা জনগণের মধ্য হতে উদ্ভুত ও সমাজের ব্যক্তিদের উপর প্রভাবশীল রাষ্ট্রশক্তির নিকটই তাকে জবাবদিহি করতে হবে অন্য কারো নিকট নয়। পরন্তু মানুষের ইহকালীন জীবনই একমাত্র ও চূড়ান্ত জীবন, সকল প্রকার কাজের প্রতিফল এই জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও সমাপ্তব্য। কাজেই কেবল এ দুনিয়াতে প্রকাশিত কর্মফলের ভিত্তিতেই কোনো নীতির শুদ্ধ-অশুদ্ধ, ভুল-নির্ভুল, উপকারী-ক্ষতিকর, গ্রহণযোগ্য-বর্জনীয় ইত্যাদি সবকিছুই নির্ধারিত করতে হবে।

বস্তুত এটা একটি পরিপূর্ণ জীবন-দর্শন, এতে মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণের সাহায্যে মানব জীবনের সকল প্রকার মৌলিক প্রশ্নের জবাব দান সকল প্রকার সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছে। এই জবাবের প্রত্যেকটি অংশই অন্যান্য অংশের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, একটির সাথে অন্যটির স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগত সামঞ্জস্য এবং সাদৃশ্য বিদ্যমান। এ জন্যই এ জীবন দর্শন গ্রহণকারী মানুষ দুনিয়াতে সংগতি ও সামঞ্জস্য পূর্ণ জীবনধারা গ্রহণ করতে পারে। এই উত্তর এবং তদোদ্‌ভূত আচরণ ও জীবনধারা মূলত শুদ্ধ না ত্রুটিপূর্ণ সে প্রশ্ন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

মানব জীবনের মৌলিক প্রশ্নসমূহের উক্ত জবাবের ভিত্তিতে মানুষ এই দুনিয়ার বাস্তব জীবনক্ষেত্রে যে নীতি ও ভূমিকা গ্রহণ করে, অতপর তাই আলোচনা করে দেখতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে উক্তরূপ দৃষ্টিভংগি ও জীবন দর্শন গ্রহণ করার ফলে মানুষ প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত পুরাপুরি স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বহীন কর্মপন্থা গ্রহণ করে সে নিজেকে নিজের, নিজ দেহ ও দৈহিক শক্তিসমূহের একচ্ছত্র মালিক মনে করতে শুরু করে, নিজের ইচ্ছামতই এর প্রয়োগ ও ব্যবহার করে। পৃথিবীর যে বস্তুই তার করায়ত্ব হবে, যে লোকদের উপর তার কর্তৃত্ব স্থাপিত হবে, এই বুæবাদী ব্যক্তি তার সাথে তার মালিক হিসেবেই ব্যবহার করবে। নিছক প্রাকৃতিক নিয়মে ও সমাজ জীবনের সংঘবদ্ধ জীবনধারা ভিন্ন আর কোনো শক্তিই তার ক্ষমতা ও স্বাধীন অধিকারকে কিছুমাত্র ক্ষুন্ন বা সীমাবদ্ধ করতে পারে না। তার নিজের হৃদয়-মনে কোনো নৈতিক অনুভূতি-দায়িত্বজ্ঞান ও জবাবদিহি করার ভয় হবে না, যা তার বল্‌গাহারা জীবনধারা কিছুমাত্র ব্যাহত করতে পারে। যেখানে বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা কিছুই নেই, কিংবা তা থাকা সত্ত্বেও একে উপেক্ষা করে নিজ ইচ্ছামতো কাজ করা সম্ভব। সেখানে এই মত ও জীবন দর্শনের অনিবার্য ফলে সে অত্যাচারী-বিশ্বাসঘাতক, দুর্নীতিপরায়ণ, দুষ্প্র্রবৃত্তিশীল জন্মপাপী ও ধ্বংসকারী অবশ্যই হবে। স্বভাবতই সে হবে স্বার্থপর, জড়বাদী ও সুবিধাবাদী (opportunist)। তার নিজের প্রবৃত্তির লালসা-বাসনা ও পাশবিক প্রয়োজন পূর্ণ করা এবং একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাওয়া ভিন্ন তার জন্ম ও জীবনের আর কোনো লক্ষ্যই থাকে না এবং যেসব জিনিস তার এই জীবন উদ্দেশ্যের আনুকূল্য করবে, কেবলমাত্র তাই তার দৃষ্টিতে মূল্যবান ও গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীত হবে। বস্তুত ব্যক্তিগতভাবে লোকদের মধ্যে এরূপ মনোভাব ও স্বভাব-প্রকৃতির উদ্‌ভব হওয়া আলোচ্য মতের স্বাভাবিক ফল, এ ধরনের লোক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক কারণে সহানুভূতিশীল হতে পারে, স্বার্থত্যাগ ও আত্মদানের ভাবধারা তার মধ্যে থাকতে পারে, তখন এক কথায় সমগ্র জীবনে একপ্রকার দায়িত্বপূর্ণ নৈতিক অনুভূতির পরিচয় সে দিতে পারে এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তার বাস্তব কাজ-কর্ম ও আচরণের বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বুঝতে পারা যাবে যে, মূলত এটা তার স্বার্থপরতা ও আত্মম্ভরিতারই সম্প্রসারিত রূপ মাত্র। বস্তুত সে নিজে দেশের ও জাতির কল্যাণ এবং উন্নতিতে নিজেরাই উন্নতি এবং কল্যাণ দেখতে পায় আর এ জন্যই সে তার দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে। এ ধরনের মানুষ খুব বেশি কিছু হলে একজন জাতীয়তাবাদীই হতে পারে, অন্য কিছু নয়।

এতদ্ব্যতীত, এ ধরণের মনোবৃত্তিসম্পন্ন লোকদের সমন্বয়ে যে সমাজ গঠিত হবে তার বিভিন্ন দিকের অবস্থা নিম্নরূপ হবেঃ এর রাজনীতি মানব প্রভুত্বের উপর স্থাপিত হবে। তা এক ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারেরও হতে পারে অথবা বিশেষ কোনো শ্রেণীর বা জনগণের প্রভুত্বও হতে পারে। আর সর্বাপেক্ষা উন্নত যে সংঘ কায়েম করা যেতে পারে, তা হবে রাষ্ট্রসংঘ। কিন্তু সকল অবস্থায়ই আসল আইন প্রণয়নকারী হবে মানুষ। আর নিছক ইচ্ছা, লালসা, বাসনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সকল প্রকার আইন রচনা এবং এর রদবদল করা হবে। সুযোগ-সন্ধানী ও সুবিধাবাদী দৃষ্টিতে সকল কাজের নীতি নির্ধারণও পরিবর্তন করা হবে। সর্বাপেক্ষা অধিক ধূর্ত, শঠ, শক্তিশালী, কপট, প্রতারক, মিথ্যাবাদী, পাষাণমনা এবং পাপিষ্ঠ আত্মার লোকই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্র আধিপত্য লাভ করতে পারবে এদের উপর অর্পিত হবে সমাজের নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা ও অধিকার। তাদের বিধানগ্রন্থে শক্তিরই নাম হবে সত্য, আর দুর্বল বাতিল বলে অভিহিত হবে।

এমতাবস্থায় সমাজ ও সভ্যতার সমগ্র ব্যবস্থায়ই আত্মপূজার ভিত্তিতে স্থাপিত হবে। সকল প্রকার স্বাদ-আস্বাদন, নৈতিক বিধি-বন্ধন হতে মুক্ত হলে যেরূপ নৈতিক মানদণ্ড স্থাপিত হবে এর ফলে উদগ্র লালসার চরিতার্থতায় খুব বেশি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতে পারবে না।

শিল্প-সাহিত্য ও অনুরূপ মানসিকতায় প্রভাবান্বিত হবে, নগ্নতা ও পাশবিকতার ভাবধারা উত্তরোত্তর তীব্র হতেও তীব্রতর হয়ে দেখা দিবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কখনো সামন্তবাদ ও জায়গীরদারী প্রথার বিস্তার ঘটবে, কখনও পুঁজিবাদ ও ধনতন্ত্র এর স্থানে এসে দাঁড়াবে, আবার কখনো মজুর-শ্রমিকগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে বিপ্লব সৃষ্টি করে তাদের নিজেদের নিরংকুশ একনায়কত্ব (dictatorship) কায়েম করবে। সেখানে কোনো সুবিচারপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কোনো মতেই সম্ভব হবে না। কারণ পৃথিবী এবং এর ধন-দৌলত সম্পর্কে এহেন সমাজে প্রত্যেকটি ব্যক্তির মৌলিক আচরণ সম্পূর্ণরূপে বস্তুবাদী হবে এবং প্রত্যেকেরই ধারণা হবে যে, এই পৃথিবী একটি লুণ্ঠনক্ষেত্র সময় সুযোগ দেখে এবং ইচ্ছামতো ‘হাত সাপাই’ করে যতোদূর ইচ্ছা সম্পদ আত্মসাৎ করতে কোনোরূপ বাধা নেই। এই সমাজে ব্যক্তি-চরিত্র গঠনের জন্য শিক্ষা-দীক্ষার যে ব্যবস্থা চালু হবে, তার স্বভাব-প্রকৃতিও এই জীবন দর্শন এবং এই আচরণেরই অনুরূপ হবে। এই সমাজের প্রত্যেকটি নবোদ্‌ভূত বংশ ও অধস্তন পুরুষের মন-মগযে পৃথিবী, মানুষ এবং পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে পূর্ববর্ণিত রূপ-ধারণাই বদ্ধমুল করে দেয়া হবে। সকল প্রকার তথ্য ও জ্ঞানকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে শাখা সম্পর্কে হোক না কেন এমনভাবে সজ্জিত ও গঠিত করা হবে যেন জীবন সম্পর্কে এই ধারণা স্বতঃই তাদের মন ও মস্তিষ্কে বদ্ধমূল হয়ে যায়। উপরন্তু বর্তমান জীবনেই উক্তরূপ আচরণ গ্রহণ করা এবং অনুরূপ সমাজে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের সাথে স্থান লাভ করার উপযোগী করে তুলার জন্যই তাদেরকে তৈয়ার করা হবে। এরূপ শিক্ষা-দীক্ষার পরিচয় সম্পর্কে আপনাদের নিকট কিছু বলতে হবে বলে মনে করি না এর বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্তমান সমাজ হতেই লাভ করা যায়। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এদেশের লোকজন শিক্ষালাভ করছে তা সবই এ মতাদর্শের ভিত্তিতেই স্থাপিত হয়েছে, যদিও এর নাম রাখা হয়েছে ‘ইসলামিয়া কলেজ’ ও ‘মুসলিম ইউনিভার্সিটি’।

বস্তুত যেরূপ আচরণের বিশ্লেষণ এখানে করা হলো, এটা খালেছ ‘জাহেলিয়াতের’ আচরণ, এটা সেই শিশুর আচরণেরই অনুরূপ যে শুধু বাহ্যেন্দ্রীয়ের সাহায্যে স্থুল পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে আগুনকে একটি সুন্দর খেলনা বলে মনে করতে থাকে। তবে এতোটুকু পার্থক্য আছে যে, শিশুর পর্যবেক্ষণের ভুল সঙ্গে সঙ্গেই এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মারফতেই ধরা পড়ে যায়। কারণ, যে আগুনকে শিশু খেলনা মনে করে একে স্পর্শ করার আচরণ গ্রহণ করেছে, তা ভস্মকারী আগুন ; স্পর্শমাত্রই প্রমাণ করে দেয় যে, এটা খেলনা নয় আগুন। পক্ষান্তরে সমাজ জীবনের এই পর্যবেক্ষণ নীতির ভ্রান্তি বহু বিলম্বেই প্রমাণিত হয়, অনেকের নিকট হয়তো সারা জীবনেও তা কখনো ধরা পড়ে না। কারণ, এরা যে ‘আগুনে’ হস্তক্ষেপ করে এর আঁচ ইষদুষ্ণ, সহসাই এবং স্পর্শমাত্রই এর তাপ দুঃসহভাবে অনুভূত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তা শতাব্দীকাল পর্যন্ত উত্তপ্ত করতে থাকে। এতদসত্ত্বেও এ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করার কারো ইচ্ছা হলে তারও যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এ মতাদর্শের বদৌলতে জনগণের বেঈমানী, শাসকদের যুলুম-পীড়ন, বিচারকদের অবিচার, ধনীদের স্বার্থপরতা ও শোষণ এবং সাধারণ লোকদের অসচ্চরিত্রতা ও দুর্নীতিপরায়ণতার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ হয় এবং এ মতাদর্শের ফলে জাতি-পূজা, জাতি-প্রীতি, সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম দেশ জয় ও জাতি হত্যার যে অগ্নিস্ফুলিংগ নির্গত হয় তা প্রত্যক্ষ করে অতি সহজেই ধরে নেয়া যেতে পারে যে, এটা নিরেট অন্ধতা ও খালেছ জাহেলিয়াতেরই আচরণ, তাতে সন্দেহ নেই। বস্তুত এটা কোনো বৈজ্ঞানিক আচরণ নয়, বুদ্ধিভিত্তিক ও চিন্তামূলক আচরণও এটা নয়। কারণ নিজের এবং বিশ্ব-চরাচরের ব্যবস্থা সম্পর্কে যে ধারণা নির্দিষ্ট করে মানুষ উক্তরূপ আচরণ অবলম্বন করেছে তা প্রকৃত অবস্থা ও সত্যিকার ঘটনার অনুরূপ নয়। তাহলে এর পরিণতি যে এরূপ খারাপ হতে পারতনা, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

অতপর জ্ঞান লাভের অন্যান্য প্রচলিত পন্থারও যাচাই করে দেখা আবশ্যক। মানব জীবনের মৌলিক সমস্যার সমাধান, মৌলিক প্রশ্নের জবাব দান করার দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে নিছক ধারণা ও আন্দায-অনুমানের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করা এবং জীবনের উক্ত বিষয় সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মত নির্দিষ্ট করা। এ পন্থা হতে তিনটি বিভিন্ন মত কায়েম করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি মত হতেই একটি বিশেষ ধরনের আচরণ উদ্ভুত হয়েছে।



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )