আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলাম ও জাহেলিয়াত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Thursday, 04 June 2009
আর্টিকেল সূচি
ইসলাম ও জাহেলিয়াত
মানব জীবনের মৌলিক সমস্যা
খালেছ জাহেলিয়াত বা নিরেট অন্ধতা
শির্ক
বৈরাগ্যবাদ
সর্বেশ্বরবাদ
ইসলাম
মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে নবীদের মত
ইসলামী মতবাদ

শির্ক

একটি মত হচ্ছে এই যে, বিশ্ব প্রকৃতির এই বিরাট ব্যবস্থা যদিও কোনো ‘রব’ ব্যতীত চালু হওয়া সম্ভব হয়নি, কিন্তু এর খোদা (ইলাহ ও রব) একজন মাত্র নয়, তারা অসংখ্য বহু। বিশ্বজগতের বিভিন্ন শক্তির গোড়ার সূত্র বিভিন্ন খোদার হাতে নিবদ্ধ ; মানুষের সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্য, সাফল্য, ব্যর্থতা, লাভ-লোকসান ইত্যাদি অসংখ্য ঐশ্বরিক সত্তার অনুগ্রহ ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। এ মতাদর্শ অবলম্বনকারীগণ আন্দায-অনুমানের সাহায্যে উক্ত খোদাসূলভ শক্তিসমূহের উৎস ও অবস্থান নির্ধারণের জন্য বিশেষ চেষ্টা করছে। ফলে এই অনুসন্ধান ব্যাপদেশে যে যে শক্তির উপরই তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, তাদেরকেই এরা ‘খোদা’ মনে করেছে। এ মত গ্রহণ করার পর মানবজীবনে যেরূপ আচরণ স্বতঃই কার্যকরী হয়, তার পরিচয় নিম্নরূপঃ

প্রথমঃ এর ফলে মানুষের সমগ্র জীবন অবাস্তব আন্দায-অনুমানের পাদপীঠে পর্যবসিত হয়। মানুষ তখন বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিসম্মত পন্থা ছাড়া নিছক আন্দায-অনুমানের সাহায্যে অসংখ্য বস্তুকে অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন বলে মনে করতে শুরু করে, তারা অলৌকিক ও অতি প্রাকৃতিক পন্থায় মানুষের ভাগ্যের উপর ভালো কিংবা মন্দ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম বলে মনে করে। এ জন্য মানুষ উক্ত মতের বিশ্বাসী ব্যক্তি ভালো প্রভাবের অবাস্তব আশায় এবং মন্দ প্রভাবের অবান্তর ভয়ে নিমজ্জিত হয়ে নিজের বিপুল শক্তি অর্থহীনভাবে অপচয় করে। কোথাও কোনো সমাধির প্রতি আশা পোষণ করতে শুরু করে যে, এটা তার অসাধ্য কাজ সুসম্পন্ন করে দিবে ; কোথাও কোনো দেবতার উপর ভরসা করা হয় এবং সে মানুষের ভাগ্য ভালো করে দিবে বলে আশা করা হয়। এরূপ কাল্পনিক উপাস্য ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিকে খুশি করার জন্য এসব মানুষ চেষ্টা করে। কোথাও এতোটুকু কু-লক্ষণ দেখতে পেলে এদের মন ভেঙ্গে পড়ে হতাশায় কাতর হয়। আবার কোথাও ভালো লক্ষণের উপর আশা ভরসার কাল্পনিক প্রাসাদ রচনা করে বসে। এই জিনিসই তার মতবাদ, চিন্তাধারা এবং তার চেষ্টা-সাধনাকে স্বাভাবিক পন্থা হতে বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত করে এক সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক পথে পরিচালিত করে।

দ্বিতীয়ঃ এ মতের কারণেই পূজা পাঠ, মানত, উপহার, অর্ঘ্য এবং অন্যান্য অসংখ্য প্রকার আচার-অনুষ্ঠানের এক দীর্ঘ কর্মতালিকা রচিত হয়ে পড়ে। আর তাতে জড়িত হওয়ার কারণে মানুষের কর্ম প্রচেষ্টার একটি বিরাট অংশ অর্থহীন কার্যকলাপে ব্যয়িত হয়।

তৃতীয়ঃ এই মুশরেকী কল্পনা-পূজার কুসংস্কারে তারা নিমজ্জিত হয়, ধূর্ত ও শঠ ব্যক্তিগণ তাদেরকে নিজেদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে অর্থ লুণ্ঠন করার বিরাট সুযোগ লাভ করতে পারে। ফলে কেউ রাজা বা বাদশাহ হয়ে বসে এবং সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য দেবতার সাথে নিজের বংশের সম্পর্ক দেখিয়ে লোকদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাতে চেষ্টা করে যে, তারাও অন্যতম খোদা ; আর তোমরা তাদের দাস। কেউ পুরোহিত সেজে বসে এবং বলে যে, যাদের হাতে তোমাদের লাভ-ক্ষতির মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের নিকট সম্পর্ক বিদ্যমান ; কাজেই তোমরা আমাদের মাধ্যমে তাদের নিকট পর্যন্ত পোঁছাতে পার। কেহ পণ্ডিত, ব্রহ্মণ ও পীর হয়ে বসে, তাবীজ-তুমার, ঝাড়-ফুঁক, মন্ত্র-তন্ত্র এবং সাধনা বা ‘হাসিলিয়াতের’ জাল বিস্তার করে, আর লোকদের মনে এই দৃঢ় প্রত্যয় জন্মাতে চায় যে, আমাদের এসব জিনিস অলৌকিক ও অতি প্রাকৃতিক উপায়ে তোমাদের সকল প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারে দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে পারে, ব্যথা-বেদনা প্রশমিত করতে পারে। এরপর এসব চতুর লোকের পরবর্তী বংশ একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র মর্যাদা সম্পন্ন পরিবার বা শ্রেণীতে পরিণত হয়। ফলে তাদের অধিকার, মর্যাদা, স্বাতন্ত্র এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি কালের অগ্রগতির সংগে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত, সম্প্রসারিত ও গভীরতর ভিত্তিতে সুদৃঢ় হতে শুরু করে। এর দরুন এরূপ বিশ্বাস-মতবাদের দৌলতে জনসাধারণের মাথার উপর রাজ পরিবার, ধর্মীয় পদাধিকার ও আধ্যাত্মিক নেতাদের খোদায়ী মজবুতভাবে স্থাপিত হয়। এবং কৃত্রিম খোদা লোকদেরকে একান্ত দাসানুদাসে পরিণত করে মনে হয় যেন এরা তাদের জন্য দুগ্ধ দান, ভারবহন ও যানবাহনের কাজ করার জন্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।

চতুর্থঃ এই মতাদর্শ যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য এবং পুর্ণাঙ্গ সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতির জন্য কোনো স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ভিত্তি উপস্থিত করতে পারে না, অনুরূপভাবে এহেন কাল্পনিক ‘খোদা’দের নিকট হতে মানুষ অনুসরণযোগ্য কোনো প্রকার জীবন ব্যবস্থাও লাভ করতে পারে না। মানুষ এই কাল্পনিক ‘খোদাদের’ অনুগ্রহ ও সাহায্য লাভের আশায় পূজা-উপাসনা ও কয়েকটি নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান যথারীতি পালন করতে থাকবে এই খোদাদের সাথে সম্পর্ক এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। মানব জীবনের বৃহত্তর ও বিশালতর ক্ষেত্রে জীবনের বাস্তব কাজ-কর্মের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন রচনা করা ও কর্মনীতি নির্ধারণ করা মানুষের নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধিকারমূলক কাজ হবে মাত্র। এভাবে ‘মুশরিক’ শির্‌ক ভিত্তিক সমাজ কার্যত নিরেট অন্ধতার খালেছ জাহেলিয়াতের পূর্ববর্ণিত পথেই চলতে বাধ্য হয়। নৈতিক চরিত্র, বাস্তব কাজ-কর্ম, সামাজিক ধরণ-পদ্ধতি, রাজনীতি, অর্থব্যবস্থা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য সকল ক্ষেত্রেই শির্‌ক ভিত্তিক জীবন-দর্শন উদ্‌ভূত আচরণ খালেছ জাহেলিয়াতের আচরণেরই অনুরূপ, নীতিগতভাবে এদের মধ্যে কোনোই পার্থক্য হয় না।



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )