আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলাম ও জাহেলিয়াত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Thursday, 04 June 2009
আর্টিকেল সূচি
ইসলাম ও জাহেলিয়াত
মানব জীবনের মৌলিক সমস্যা
খালেছ জাহেলিয়াত বা নিরেট অন্ধতা
শির্ক
বৈরাগ্যবাদ
সর্বেশ্বরবাদ
ইসলাম
মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে নবীদের মত
ইসলামী মতবাদ

সর্বেশ্বরবাদ

অবাস্তব আন্দায-অনুমানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের ফলে তৃতীয় যে মতটির সৃষ্টি হচ্ছে, তা হচ্ছে সর্বেশ্বরবাদ (pantheism)। অর্থাৎ মানুষ ও বিশ্বজগতের সমগ্র জিনিসই মূলত অপ্রকৃত। এদের আদৌ কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই। বস্তুত একটি সত্তাই এ সমগ্র বস্তুজগতকে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমরূপে গ্রহণ করেছে মাত্র এবং তাই এ সকলের মধ্যে স্বতস্ফূর্তভাবে প্রকাশমান। বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করলে এ মতাদর্শের অসংখ্য রূপ প্রকাশিত হয়। সমগ্র সৃষ্টিজগত, বস্তুজগত একটি মাত্র সত্তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। মূলত সেই সত্তাই বর্তমান, অন্যান্য যা কিছু পরিদৃষ্ট হয় আসলে তা কিছুই নয় এই একটি মাত্র সত্তাই হচ্ছে এর সারকথা।

এ মতাদর্শের ফলে মানুষের মনে সৃষ্টি হয় সংশয়বাদ। তার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেই তার মনে জেগে উঠে সন্দেহের নিরন্ধ্র তমিস্রা। ফলে তার দ্বারা বাস্তব দুনিয়ার কোনো কাজই যে স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে সম্পন্ন হতে পারে না, তা বলাই বাহুল্য। সে নিজেকে একটি কাষ্ঠ নির্মিত পুত্তলিকা মনে করতে শুরু করে, যাকে অন্য কেউ অন্তরালে থেকে নাচাচ্ছে, অথবা অন্য কেউ তার মধ্যে থেকে নৃত্য করছে। সে তার এই অমূলক কল্পনার গভীর পংকে আত্মনিয়োগ হয়ে পড়ে। তার নিজের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যই থাকতে পারে না, কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপথও নয়। সে মনে করে আমি নিজে তো কিছুই নই আমার করারও কিছু নেই। আর আমার করার কিছু থাকতেও পারে না। মূলত সেই সার্বিক সত্তা যা আমার মধ্যে ও সমস্ত সৃষ্টিজগতের পরতে পরতে বিকাশমান যা অজ্ঞাত আদি হতে অনন্তকাল পর্যন্ত চলে আসছে, সকল কাজ তারই, সকল কর্ম সে-ই সম্পন্ন করে। সত্তা যদি পরিপুর্ণ হয়ে থাকে, তবে আমিও পরিপূর্ণ, অতএব আমার চেষ্টা-সাধনা করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর সেই সত্তাই যদি নিজের পূর্ণতা বিধানের জন্য চেষ্টিত হয়ে থাকে, তাহলে যে বিশ্বব্যাপক গতি সহকারে সে নিজের পূর্ণতা লাভের দিকে অব্যাহতভাবে ছুটে চলেছে। একটি অংশ হিসেবে এর দিকে আবর্তনে পড়ে আমিও সে দিকে পৌঁছতে পারবো। আসলে আমি একটি অংশবিশেষ, সার্বিক সত্তা কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় যেতে চাচ্ছে, তা আমি কিছুই জানি না। এরূপ চিন্তা পদ্ধতির বাস্তব ফল বৈরাগ্যবাদী জীবন দর্শনের অনুরূপই হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমত গ্রহণকারীদের কর্মনীতির সাথে খালেছ জাহেলিয়াতের অনুসারীদের কর্মনীতির সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়। কারণ এদের সকলেই নিজেদের সমগ্র জীবনকে নিজেদের প্রবৃত্তি ও অন্ধ লালসার দাসানুদাসে পরিণত করে। ফলে তাদের প্রবৃত্তি তাদেরকে যে দিকে নিয়ে যায়, তারা নির্বিচারে ও নির্বিকার চিত্তে সে পথেই ছুটতে থাকে। তারা মনে করে যে, তারা নিজেরা মোটেই চলছে না, যা ঘটছে তা সার্বিক সত্তাই করছে।

বস্তুত শেষোক্ত তিনটি মতাদর্শও প্রথমোল্লিখিত মতের ন্যায় জাহেলিয়াতের বিষাক্ত ভাবধারায় ভরপুর। ফলে এ মতের অনুসারীদের সমগ্র জীবন জাহেলিয়াতের বিষক্রিয়ায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। কারণ প্রথম কথা এই যে, এসব মতাদর্শের কোনো একটিরও কোনো বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, নিছক কল্পনা ও আন্দায-অনুমানের উপর একান্তভাবে নির্ভর করেই বিভিন্ন প্রকার মত রচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এসব মতাদর্শ প্রকৃত ও বাস্তব অবস্থার যে সম্পূর্ণ বিপরীত, তা বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে প্রমাণিত হয়। এসবের মধ্যে একটি মতও যদি প্রকৃত অবস্থার অনুরূপ হতো তবে তদনুযায়ী কাজ করলে খারাপ ফল হওয়ার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। একটি জিনিস ভক্ষণ করলেই যখন নিশ্চিতরূপে মানুষের পেটে ব্যথার সৃষ্টি হতে দেখা যায় তখন আমরা সকলেই একথা নির্ভুল বলে বুঝতে পারি যে, পাকস্থলীর গঠন প্রকৃতি এবং এর হজম-শক্তির সাথে এই জিনিসটির বস্তুতই কোনো সামঞ্জস্য নেই। অনুরূপভাবে শির্‌ক, বৈরাগ্যবাদ এবং সর্বেশ্বরবাদের মতাদর্শ গ্রহণ করলে সমগ্র মানবতা যখন নিশ্চিতরূপে বিপর্যস্ত ও সর্বতোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর এই ব্যাপারে যখন আর কোনো সন্দেহ নেই, তখন সংশ্লিষ্ট মতাদর্শের কোনো একটিও যে বাস্তব অবস্থা ও প্রকৃত সত্যের অনুরূপ নয়, তাতেও বিন্দুমাত্র সংশয় থাকতে পারে না।



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )