আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলাম ও জাহেলিয়াত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Thursday, 04 June 2009
আর্টিকেল সূচি
ইসলাম ও জাহেলিয়াত
মানব জীবনের মৌলিক সমস্যা
খালেছ জাহেলিয়াত বা নিরেট অন্ধতা
শির্ক
বৈরাগ্যবাদ
সর্বেশ্বরবাদ
ইসলাম
মানুষ ও বিশ্ব সম্পর্কে নবীদের মত
ইসলামী মতবাদ

ইসলামী মতবাদ

মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে নবীদের উপস্থাপিত এ মতাদর্শ একটি পরিপূর্ণ মতবাদ। এর সমগ্র দিক ও বিভাগ পরস্পর জড়িত পরস্পরের মধ্যে যুক্তিসম্মত নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। এর একটি অংশ অপরটির বিপরীত বা বিরোধী নয়। এর ভিত্তিতে বিশ্বের সকল প্রকার ঘটনাবলীর পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ এবং বিশ্ব প্রকৃতির নিদর্শনসমূহের পূর্ণ ব্যাখ্যা দান অত্যন্ত সহজ। এ মতের বিশ্লেষণ করা যায় না। এমন কোনো জিনিসই কোথাও পরিলক্ষিত হয় না। অতএব এটা একটি বৈজ্ঞানিক মত (scientific theory) এবং এর যে সংজ্ঞাই দেয়া হোক না কেন, এ মত সম্পর্কে তা নিঃসন্দেহে প্রযোজ্য হবে।

পরন্তু কোনো গবেষণা, প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ বা বাস্তব অভিজ্ঞতাই এ মতকে আজ পর্যন্ত ‘ভ্রান্ত’ প্রমাণ করতে পারেনি। বস্তুত এটা বাস্তবে পরিণত সত্য, এর সত্যতা চিরস্থায়ী। প্রমাণিত ভ্রান্ত মতবাদসমূহের মধ্যে এটাকে কোনো মতেই গণ্য করা যায় না। (টিকা: কোনো বিশেষ যুগের বৈজ্ঞানিক মত এর বিপরীত হলেই এর ভ্রান্তি প্রমাণিত হয় না। বৈজ্ঞানিক মতে বাস্তব সত্যই (Facts) এটাকে চুর্ণ করতে পারে নিছক মতবাদ নয়। অতএব মানুষ ও বিশ্ব প্রকৃতি সম্পর্কে নবীদের উপস্থাপিত ধারণাকে যতোক্ষণ পর্যন্ত না কোনো বাস্তব ও সপ্রমাণিত ঘটনাই ভুল প্রমাণিত করবে ততোক্ষণ এটাকে ‘অতীত কালের মতবাদসমূহের’ মধ্যে গণ্য করা শুধু মারাত্মক ভুল ও অবৈজ্ঞানিকতাই নয়, তা হিংসা-বিদ্বেষমূলক কাজের পরিণামও বটে।) বিশ্বপ্রকৃতির যে নিয়ম আমরা দেখতে পাচ্ছি, সে দিক দিয়েও এ মত খুবই সত্য বলে মনে হয়। বিশ্বপ্রকৃতির অন্তর্নিহিত বিরাট ও ব্যাপক নিয়ম-শৃংখলা এবং এর সুসংবদ্ধতা দেখে স্বতই মনে হয় প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিরই মনে হবে যে, নিশ্চয়ই এর কোনো ‘ব্যবস্থাপক’ রয়েছেন ; এরূপ মনে না করার মূলে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। অনুরূপভাবে এ সুসংবদ্ধ নিয়ম-শৃংখলা এটাকে একটি ‘কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থা’ এবং এই ব্যবস্থায় একজন স্বাধীন ও স্বেচ্ছাধিকারী পরিচালক থাকার জন্য বিশ্বাস করাই বুদ্ধিসম্মত মনে হয়, এটাকে বিকেন্দ্রীক মনে করা এবং এর অসংখ্য পরিচালকের অধীন চলার কথা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশ্বপ্রকৃতির এই বিস্ময়কর ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, যৌক্তিকতা এবং নির্ভুল বুদ্ধির যে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তদ্ধৃষ্টে এটাকে একটি সুষ্ঠু বৈজ্ঞানিক ও উদ্দেশ্যমূলক ব্যবস্থা মনে করাই অধিকতর যুক্তিসংগত, এটাকে উদ্দেশ্যহীন এবং শিশুর খেলনা মনে করার মুলে কোনোই যুক্তি থাকতে পারে না।

এতদ্ব্যতীত এ বিশ্বপ্রকৃতির ব্যবস্থাকে আমরা যদি একটি বাস্তব রাজ্য এবং মানুষকে এই বিরাট ও সুসংবদ্ধ ব্যবস্থার একটি অংশ বলে মনে করি, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, এই নিয়ম-শৃংখলা ব্যবস্থার অধীন মানুষের স্বেচ্ছাচারিতার ও স্বাধীনতার কোনোই অবকাশ থাকতে পারেনা। এই পৃথিবীতে প্রজা হওয়াই মানুষের সঠিক মর্যাদা। এ দিক দিয়েও উল্লিখিত মতটি অত্যন্ত যুক্তিসংগত (most reasonable) বলে মনে হয়।

বাস্তব কার্যকারিতা সম্পর্কে বিচার করলেও এটা একটি বাস্তব কর্মোপযোগী (practicable) মত বলেই প্রতিপন্ন হয়। এ মতের ভিত্তিতে মানব জীবনের একটি পূর্ণাংগ ও ব্যাপক কর্মসূচী এর খুঁটিনাটিসহ খুব সহজেই রচিত হতে পারে। দর্শন, নৈতিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্প, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, যুদ্ধ-সন্ধি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্বন্ধ এক কথায় জীবনের সকল দিক ও বিভাগ এবং সকল প্রয়োজন ও সমস্যার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও স্থায়ী ব্যবস্থা এরই ভিত্তিতে লাভ করা সম্ভব। ফলে মানব জীবনের কোনো বিভাগেই কর্মনীতি নির্ধারণের জন্য এ মতাদর্শের বাইরে যাওয়ার কোনো দিনই প্রয়োজন দেখা দেবে না।

পক্ষান্তরে, এ মতাদর্শের ভিত্তিতে মানুষের এ পার্থিব জীবন কিরূপে গঠিত হয় এবং এর ফলাফলই বা কিরূপ এখন তাই আমাদের বিচার্য। এ মতবাদ ব্যক্তিগত জীবনকে অন্যান্য জাহেলি মতবাদসমূহের সম্পূর্ণ বিপরীত। অতীত দায়িত্ব জ্ঞান-সম্পন্ন এবং খুবই সুসংবদ্ধ ও শৃংখলাপূর্ণ (well diciplined) করে তোলে। এ মতাদর্শের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ এই যে, মানুষ তার দেহ তার যাবতীয় শক্তি-সামর্থ এ পৃথিবী এবং পৃথিবীর কোনো একটি বস্তুকেও নিজের মালিকানা সম্পদ মনে করে তার সাথে স্বাধীনভাবে আচরণ করবে না, বরং আল্লাহর মালিকানা মনে করে তাঁরই আইন ও বিধানের ভিত্তিতে এর ব্যবহার করবে। তার লব্ধ প্রত্যেকটি জিনিসকেই আল্লাহর আমানত মনে করবে এবং এ আমানতের হিসেব তাঁর নিকট দিতে হবে যার নিকট কোনো কাজ, মনের কোনো গোপন ইচ্ছাও অজ্ঞাত নয় এবং একথা মনে করেই এটাকে ব্যবহারে আনবে। এরূপ সচেতন মানুষ যে সকল সময় এবং সকল অবস্থায়ই একটি আদর্শের নিষ্ঠাবান অনুসারী হবে তাতে সন্দেহ নেই। এরূপ ব্যক্তি কখনই বল্‌গাহারা ও প্রবৃত্তির দাস হতে পারে না। অত্যাচার ও বিশ্বাসঘাতক হতে পারে না। এমন ব্যক্তির উপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করা সম্ভব। শৃংখলা রক্ষা ও নিয়মতন্ত্র অনুসরণের ব্যাপারে কোনো বাহ্যিক চাপের (pressure) প্রয়োজনীয়তা সে বোধ করবে না। সেজন্য একটি বিরাট শক্তিসম্পন্ন নৈতিক বাঁধন ও সংযম অনুভূতি জেগে উঠে। ফলে, যেসব অবস্থায় কোনো পার্থিব শক্তির নিকট জবাবদিহি করার কোনোই আতংক থাকে না, তখনও এ শক্তি তাকে সততা, ন্যায় ও সত্যের পথে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। বস্তুত সমাজের লোকদের সর্বাধিক বিশ্বাসভাজন করে তোলার জন্য আল্লাহর ভয় ও আমানতদারীর অনুভূতি অপেক্ষা উত্তম ও কার্যকরী উপায় অন্য কিছু হতে পারে না। অধিকন্তু এ মত মানুষকে কেবল সংগ্রামী ও অবিশ্রান্ত চেষ্টানুবর্তী করে তোলে না; এর যাবতীয় চেষ্টা-সাধনাকে স্বার্থপরতা, আত্মপূজা অথবা জাতিপূজার পংকিলতা হতে পবিত্র করে সততা ও সত্যবাদিতা এবং উচ্চতর নৈতিক আদর্শের লক্ষ্য পথে নিয়ন্ত্রিত করে। যে ব্যক্তি মনে করে যে এ দুনিয়ায় তার আগমণ উদ্দেশ্যহীন নয়, কোনো বিরাট কাজ সম্পাদনের জন্যই এখানে তাকে প্রেরণ করা হয়েছে, তার জীবন কেবল নিজের জন্যই কিংবা তার অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের জন্যই নয় বরং তার জীবন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর সন্তোষমূলক কাজে একান্তভাবে নিয়োজিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ, তাকে বিনা হিসেবে রেহাই দেয়া হবে না, তার সময় ও ক্ষমতার কতখানি কোন্‌ কাজে ব্যয় হয়েছে তার হিসেব নেয়া হবে। একথা যার মনে সর্বদা জাগ্রত থাকবে, তার তুলনায় অধিক পরিশ্রমী ফলপ্রসু, সুষ্ঠ ও নির্ভুল চেষ্টানুবর্তী ব্যক্তি আর কেউ হতে পারে না। কাজেই এ মতাদর্শ যতোদুর উত্তম ও আদর্শ ব্যক্তি গঠন করে, তদপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি চরিত্রের ধারণা করা যায় না।

সামগ্রিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও এর পরীক্ষা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। সর্বপ্রথম কথা এই যে, মতাদর্শ মানব সমাজের ভিত্তিমূলকেই সম্পূর্ণরূপে বদলিয়া দেয়। এ মত অনুযায়ী সমগ্র মানুষ আল্লাহর প্রজা এবং এ দুনিয়ার ক্ষেত্রে সকলের মর্যাদা, সকলের অধিকার এবং সুযোগ সুবিধা লাভের সম্ভাবনা সকলের পক্ষেই সমান। কোনো ব্যক্তি কোনো পরিবার কোনো শ্রেণী, কোনো জাতি, কোনো বংশের জন্য অন্যান্য মানুষের উপর কোনোরূপ শ্রেষ্ঠত্ব, আভিজাত্য নেই, নেই কোনো বৈষম্যমূলক অধিকার। এভাবে মানুষের প্রভুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের মুলোচ্ছেদ করা হয়। এবং রাজতন্ত্র, জায়গীরদারী, সামন্তবাদ, অভিজাততন্ত্র (aristocracy) ব্রাক্ষণ্যবাদ ও পোপতন্ত্র প্রভৃতি জাহেলি মতাদর্শ হতে যেসব মারাত্মক দোষত্রুটি ও ব্যাধি সৃষ্টি হয় ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ গঠন করলে তারা চিরতরে বিলুপ্ত হয়।

এটা বংশীয়, গোত্রীয়, ভৌগলিক, আঞ্চলিক এবং বর্ণ ভিত্তিক বৈষম্য বিদ্বেষেরও মূলোৎপাটন করে। কারণ এসব মারাত্মক ব্যাধিই মানব সমাজে আবহমানকাল যাবত রক্তপাত ও যুদ্ধ সংগ্রামের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ইসলামী মতাদর্শের দৃষ্টিতে সমগ্র পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, সমগ্র মানুষ এক আদমের সন্তান এবং আল্লাহর বান্দাহ। এ সমাজে গোত্র, ধন-সম্পত্তি কিংবা বর্ণের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বৈষম্য করা হয় না ; নৈতিক চরিত্রের পবিত্রতা এবং আল্লাহর ভয় থাকা না থাকার ভিত্তিতে এ পার্থক্য হতে পারে। আল্লাহভীতি যার মধ্যে সর্বাধিক, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা, সত্যের জন্য সংগ্রামশীলতার দিক দিয়ে তিনিই শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হবেন। ইসলামী সমাজে কেবল তাঁরই শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য স্বীকৃত হবে।

এরূপে মানুষের পরস্পরের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক সম্বন্ধ কিংবা পার্থক্য বৈষম্যের ভিত্তি ও দৃষ্টিতে আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। সমাজক্ষেত্রে মিলন বিচ্ছেদের যে মান বা কারণ মানুষ নিজেরা আবিষ্কার করেছে তা বিশ্ব মানবতাকে অসংখ্য খণ্ডে বিভক্ত করে ; এ খণ্ডসমূহের মধ্যে দূর্লংঘ্য প্রাচীরও খাড়া করে দেয়। যেহেতু বংশ, স্বদেশ, জাতীয়তা কিংবা বর্ণ প্রভৃতির পরিবর্তন করা মানুষের সাধ্যাতীত এদের মধ্যে একটির অন্তর্ভূক্ত মানুষ কোনোক্রমেই অন্যটির মধ্যে গণ্য হতে পারে না। পক্ষান্তরে ইসলামী মতাদর্শে মানুষের মধ্যে মিলন বিচ্ছেদের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার এবং তাঁর বিধান পালনের উপরে। কাজেই সৃষ্টির দাসত্ব পরিত্যাগ করে যারা স্রষ্টার বন্দেগী শুরু করবে এবং মানুষের রচিত আইনে পদাঘাত করে আল্লাহ প্রদত্ত বিধানকে জীবনের একমাত্র আইন হিসেবে গ্রহণ করবে, তারা সকলেই একটি জামায়াতের মধ্যে গণ্য হবে। আর যারা এরূপ করবে না তারা ভিন্ন দলভুক্ত হবে এভাবে মানব সমাজের সকল প্রকার পার্থক্য-বৈষম্য বিলুপ্ত হয়ে একটি মাত্র পার্থক্যই থেকে যায় আর এই পার্থক্য সকলেই লংঘন করতে পারে। কারণ আকীদা বিশ্বাস ও জীবন যাপনের রীতিনীতি পরিবর্তন করে একটি দল হতে অপর দলের মধ্যে শামিল হওয়া প্রত্যেকের পক্ষেই সহজ।

এসব সংশোধন-সংস্কারের পর মতাদর্শের ভিত্তিতে যে সমাজ গড়ে উঠে, তার মনোবৃত্তি মানসিকতা ভাবধারা ও সমাজের গঠন অবয়ব (social structure) আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায়। এর রাষ্ট্র মানব প্রভুত্বের ভিত্তিতে নয় আল্লাহর সার্বভৌম প্রভুত্বের বুনিয়াদেই স্থাপিত হয়। (টিকা: গ্রন্থকার রচিত ‘ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ’ দ্রষ্টব্য।) এখানে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই শাসন কায়েম হয়, আল্লাহরই আইন জারী এবং কার্যকরী হয়। মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করতে থাকে। এর ফলে প্রথমত মানুষের হুকুমাত এবং মানুষের আইন রচনার অধিকারজনিত সমস্ত দোষ-ত্রুটি নিমিষেই দূর হয়।

দ্বিতীয়ত এই মতাদর্শের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র স্থাপিত হওয়ার ফলে আর একটি বিরাট পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। তা এই যে, রাষ্ট্রের সমগ্র ব্যবস্থাই ইবাদত ও তাকওয়ার পূত ভাবধারায় পরিপ্লুত হয়। রাষ্ট্রনেতা ও জনগণ সকলেই সমানভাবে অনুভব করতে থাকে যে, তারা আল্লাহর হুকুমাতের অধীন জীবন যাপন করছে এবং গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু সম্পর্কে অবহিত আল্লাহর সংগেই তাদের প্রত্যেকটি ব্যাপার প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। করদাতা আল্লাহকেই কর দিচ্ছে মনে করে তা আদায় করে এবং তার গ্রহণকারী ও খরচকারী উভয়েই নিজেদেরকে এর আমানতদার মাত্র মনে করে। একজন সিপাহী হতে বিচারপতি ও গভর্ণর পর্যন্ত প্রত্যেক কর্মচারীই ঠিক সেই মানসিকতার সাথে কর্তব্য পালন করে, যেরূপ মনোভাব নিয়ে তারা সালাত আদায় করে ; তাদের পক্ষে এই উভয় প্রকার কাজ সমানভাবে ইবাদত এবং উভয় ক্ষেত্রে একই প্রকার আল্লাহভীরুতা এবং সে জন্য শংকাপূর্ণ মনোভাবের প্রয়োজন। গণপ্রতিনিধি নির্বাচনের সময়ে তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে সন্ধান করা হয় আল্লাহর ভয়, আমানতদারী, বিশ্বাস পরায়ণতা, সততা ও সত্যবাদিতা প্রভৃতি মহৎ গুণাবলী। এর পরিণামে সমাজের সর্বাধিক উন্নতি ও উত্তম নৈতিক চরিত্র সম্পন্ন ব্যক্তিগণই নেতৃত্ব ও দায়িত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হন রাষ্ট্র ক্ষমতা তাদেরই হাতে অর্পণ করা হয়।

সমাজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এ মতাদর্শ অনুরূপ আল্লাহভীরুতা ও নৈতিক পবিত্রতার স্বতস্ফূর্ত ভাবধারা প্রবাহিত হয়। আত্মপূজার পরিবর্তে আল্লানুগত্যের প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের পরস্পরের মধ্যে এক আল্লাহর সম্পর্কই ভিত্তিগত মর্যাদা লাভ করে, আল্লাহর আইনই পারস্পরিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রিত, সুসংবদ্ধ ও সুশৃংখলাপূর্ণ করে। এই আইন যেহেতু সেই মহান সত্তাই রচনা করেছের, যিনি সকল প্রকার স্বার্থপরতা ও নফসের খাহেশের পংকিলতা হতে পবিত্র, সর্বজ্ঞ, পরম বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিমান, তাই তাঁর রচিত আইনে অশান্তি ও উচ্ছৃংখলতা যুলুম-পীড়ন ও ভাঙন-বিপর্যয়মূলক কোনো ব্যবস্থাই বিন্দুমাত্র স্থান পায়নি। উপরন্তু মানব প্রকৃতির সকল দিক এবং মানুষের সকল জৈবিক প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখেই এটা রচিত হয়েছে।

এ মতাদর্শের ভিত্তিতে যে বিরাট সমাজ ও সামগ্রিক জীবন গড়ে উঠে, এখানে তার পূর্ণ চিত্র পেশ সম্ভব নয়। কিন্তু উপরে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তা দ্বারা মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে পয়গাম্বরদের উপস্থাপিত ধারণার ভিত্তিতেই যে ধরনের জীবনধারা গঠিত হয় এবং বাস্তব ফলাফল প্রকাশিত হয় বা হতে পারে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা পাঠকের পক্ষে সহজ হবে বলে মনে করি। উপরন্তু এটা কেবলমাত্র অসম্ভব কল্পনার সুখরাজ্য (utopia) নয়। বিশ্ব ইতিহাসের এক অধ্যায়ে এ মতাদর্শের ভিত্তিতে একটি সমাজ, একটি সমষ্টিগত জীবন একটি উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করে বিশ্বমানবের সম্মুখে তার বাস্তবতার স্পষ্ট নিদর্শন স্থাপন করা হয়েছে। আর ইতিহাসও এ কথার সাক্ষ্য দিবে যে, এ আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত ব্যক্তিদের তুলনায় উত্তম লোক মানব সমাজে আর কখনও পরিদৃষ্ট হয়নি এবং এর ভিত্তিতে স্থাপিত রাষ্ট্র অপেক্ষা কোনো রাষ্ট্রই আজ পর্যন্ত নির্বিশেষে সমগ্র মানুষের পক্ষে কল্যাণকর প্রমাণিত হয়নি। এ রাষ্ট্রের প্রজা সাধারণের মধ্যে নৈতিক দায়িত্ববোধ অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছিল। প্রমাণ স্বরূপ একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। এক বেদুঈন নারী ব্যভিচারের দরুন অন্তসত্তা হয়েছিল, ইসলামী শরীয়াতে এ পাপের দণ্ড যে সংগেসার প্রস্তর খণ্ডের আঘাত দ্বারা মৃতুদণ্ড দান এর ন্যায় ভয়াবহ তা সে ভালো করেই জানতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে নিজেই রসূল (সজ্ঝ) এর দরবারে হাজির হয় এবং অপরাধের দণ্ড দানের জন্য অনুরোধ করে। তাকে সন্তান প্রসবের পরে আসার জন্য বলে দেয়া হয় এবং কোনো মুচলেকা বা জামানত ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরে সন্তান প্রসবের পর সে পুণরায় উপস্থিত হয় এবং উপযুক্ত দণ্ডদানের জন্য দাবি জানায়। কিন্তু এবারেও তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং সন্তানকে স্তনদান ও লালন পালন করার পর পুনরায় আসার নির্দেশ দেয়া হয়। ফলে আবার সে মরুভুমির দিকে প্রত্যাবর্তন করে, কিন্তু কোনো পুলিশ পাহারার প্রয়োজন বোধ হয়নি। স্তন দানের নির্দিষ্ট সময় অতীত হওয়ার পর মরুবাসিনী আবার ফিরে আসে এবং কৃত অপরাধের দণ্ডদানে তাকে পবিত্র করে দেবার প্রার্থনা জানায়। অতপর তাকে ‘সংগেসার’ পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এভাবে যখন তার মৃত্যু ঘটে তখন তার জন্য আল্লাহর নিকট ‘রহমতের দোয়া করা হয়’। এ সময় এক ব্যক্তি সহসা বলে উঠে মেয়েলোকটি বড় নির্লজ্জ ছিলো। তখন উত্তরে নবী করীম (সা) বললেন, “আল্লাহর শপথ এই নারী যেভাবে তওবা করেছে, অনুরূপ তওবা যদি সকল দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিই করত, তবে তাদেরকেও ক্ষমা করা হত।”

বস্তুত ইসলামী সমাজে নাগরিকদের এটাই ছিলো বৈশিষ্ট্য। আর রাষ্ট্র ও সরকারের বৈশিষ্ট্য ছিলো আরও বিরাট। কোটি কোটি টাকার আয় সম্পন্ন এবং ইরান, সিরিয়া ও মিসরের ন্যায় বিপুল ধন-ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ রাজ্যের বায়তুলমালের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তার রাষ্ট্রপ্রধান মাসিক বেতনস্বরূপ মাত্র দেড়শত টাকা গ্রহণ করতেন ; আর নাগরিকদের মধ্যে ভিক্ষা গ্রহণের যোগ্য একজন লোক খুঁজেও পাওয়া যেতো না।

এই বিরাট বাস্তব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা লাভের পরেও যদি নবীদের স্থাপিত বিশ্ব-ব্যবস্থার নিগূঢ়তত্ত্ব এবং তাতে মানুষের অবস্থা ও মর্যাদা সম্পর্কীয় মতাদর্শের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া কারও পক্ষে সম্ভব না হয়, তবে এ বিষয়ে তাকে পরিতৃপ্ত করার অন্য কোনো উপায় নেই। কারণ আল্লাহ ফিরিশতা এবং পারলৌকিক জীবনের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ এ দুনিয়ায় কোনক্রমেই সম্ভব নয়। আর যেখানে তা সম্ভব নয় তথায় বিভিন্ন কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন সত্যাসত্য নির্ধারণে অন্য মানদণ্ড আদৌ হতে পারে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, রোগীর দেহাভ্যন্তরের কোথায় কোন জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হয়েছে শত চেষ্টা করেও যদি তার প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করা সম্ভব না হয় তাহলে চিকিৎসক বিভিন্ন প্রকার ঔষধ প্রয়োগ করে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন এবং যে ঔষধটি এ অজ্ঞাত রোগ নির্ধারণে সাহায্য করে তাই রোগের প্রকৃত ঔষধ বলে বিবেচিত হয়। ঐ ঔষধে রোগ দূর হওয়ার ফলে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় ঐ ঔষধে দেহাভ্যন্তরস্থ রোগ চিকিৎসার সম্পূর্ণ অনুকূল ইহা অনস্বীকার্য। অনুরূপভাবে মানব জীবনের জটিল যন্ত্র অন্য কোনো মতাদর্শ অনুযায়ী যখন সঠিকভাবে চলতে পারে না। পক্ষান্তরে কেবল নবীদের উপস্থাপিত মতের ভিত্তিতেই যখন তা সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে, তখন এটাই এ মতাদর্শই প্রকৃত অবস্থার অনুকূল হওয়ার জন্য অনস্বীকার্য প্রমাণ। বস্তুত এই নিখিল বিশ্বপ্রকৃতি আল্লাহ তায়ালার একটি রাজ্য। এ জীবনের পর আরো একটি জীবন বাস্তবিকই রয়েছে এবং সেই পারলৌকিক জীবনে সমস্ত মানুষকেই ইহ-জীবনের সকল কাজ-কর্মেরই পুংখানুপুংখরূপে হিসেব দিতে হবে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।

সমাপ্ত



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )