আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী   
Saturday, 06 June 2009
আর্টিকেল সূচি
মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি
বিগত ইতিহাসের পর্যালোচনা
পাশ্চাত্য সভ্যতার বুনিয়াদ
আমাদের প্রতিক্রিয়া
আমরা কি চাই

বিগত ইতিহাসের পর্যালোচনা

এ বিশ্লেষণের পর আমি প্রয়োজন বোধ করছি যে, যেভাবে আমাদের জাতির অনাচার ও দোষ-ত্রুটির পর্যালোচনা করা হলো, সেভাবে আমাদের অতীত ইতিহাসেরও পর্যালোচনা করে দেখা যাক যাতে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে, এ সব দোষ-ত্রুটি কি হঠাৎ আকস্মিকভাবে আমাদের সমাজে আত্মপ্রকাশ করলো, না তার গভীরে কোনো মূল কারণ এবং তার পশ্চাতে কার্যকারণের কোনো দীর্ঘ ধারাবাহিকতা আছে। এ দিক দিয়ে ব্যাপারটি কোন্‌ ধরনের তা ভালোভাবে বুঝতে পারা না গেলে বর্তমান দোষ-ত্রুটির ভীষণতা, ব্যাপকতা ও গভীরতা সুস্পষ্টরূপে ধরাও পড়বে না এবং সংস্কার সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও পুরোপুরি অনুভূত হবে না। আর এ কথাও বুঝতে পারা যাবে না যে, আমরা এখানে আংশিক সংস্কারের প্রচেষ্টাকে কেন অর্থহীন মনে করি এবং কিসের ভিত্তিতে আমরা এ অভিমত পোষণ করি যে, অক্লান্ত প্রচেষ্টা, একটি সার্বিক সংস্কারমূলক কর্মসূচি এবং একটি সৎ ও সুসংহত জামায়াতের মাধ্যমে যতোক্ষণ পর্যন্ত এখানে জীবন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন সূচিত করা না যাবে, ততোক্ষণ কোনো সুফল ছোট-খাটো চেষ্টা-তদবীরের দ্বারা লাভ করা যাবে না।

আমাদের ইতিহাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্তকর ঘটনা এই যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে অর্থাৎ বিগত শতাব্দীতে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আগত একটি অমুসলিম জাতি আমাদের দেশের উপর চেপে বসেছিল এবং মাত্র তিন-চার বছর পূর্বে তাদের গোলামী থেকে আমরা পরিত্রাণ লাভ করেছি। এ ঘটনাটি আমাদের নিকটে কয়েক দিক দিয়ে প্রণিধানযোগ্য। প্রথম কথা এই যে, আমাদের অনুসন্ধান করে দেখতে হবে যে, এ ঘটনা কেন ঘটলো। এ কি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিলো যে এমনি বিনা কারণে তা আমাদের উপর এসে পড়লো? বিনা দোষে প্রকৃতির পক্ষ থেকে কি আমাদের উপর জুলুম করা হয়েছে? আমরা কি সঠিক পথেই চলছিলাম, কোনো দুর্বলতা, কোনো দোষ-ত্রুটি কি আমাদের ছিলো না? অথবা প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের মধ্যে বহুকাল যাবত কিছু দুর্বলতা এবং কিছু দোষ-ত্রুটি লালন-পালন করছিলাম যার শাস্তিস্বরূপ আমাদেরকে অবশেষে একটি বিদেশি জাতির গোলামীর শিকল পরিয়ে দেয়া হলো? প্রকৃত ঘটনা যদি এই হয় যে, আমাদের মধ্যে কিছু দুর্বলতা ও কিছু দোষ-ত্রুটি ছিলো, যা আমাদের অধঃপতনের কারণ, তা হলে তা কি ছিলো? আর সে সব কি এখন আমাদের মধ্য থেকে দূরীভূত হয়েছে, না তার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন আছে?

দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, বাইরে থেকে যে বিপদটি আমাদের উপর এসে পড়েছিল, তা কি শুধু একটি গোলামীর বিপদই ছিলো না নৈতিকতা, চিন্তাধারা, সভ্যতা সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতির অন্যান্য বহু বিপদও সাথে করে এনেছিল? কোন্‌ কোন্‌ দিক দিয়ে সেগুলো আমাদেরকে কতোটা প্রভাবিত করেছিল? আর তাদের বিদায় গ্রহণের পর আজ তাদের কোন্‌ কোন্‌ প্রভাব আমাদের মধ্যে বিদ্যমান?

তৃতীয় প্রশ্ন এই যে, এ সব বিপদের মুকাবিলায় আমাদের প্রতিক্রিয়া কি ছিলো? একই প্রতিক্রিয়া ছিলো, না বিভিন্ন দলের প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন ছিলো? যদি বিভিন্ন থেকে থাকে, তাহলে সে সবের মধ্যে প্রত্যেকের কি কি ভালো এবং মন্দ প্রভাব আমাদের জাতীয় জীবনে দেখতে পাওয়া যায়?

আমি এ তিনটি প্রশ্নের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করবো যাতে করে আমাদের বর্তমান দোষ-ত্রুটিগুলোর মূল উৎস আপনারা জানতে পারেন। আপনারা আরও জানতে পারেন যে, প্রতিটি দোষ-ত্রুটিগুলোর মূল কারণ কি, তার শিকড় কতোদূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে এবং কোন্‌ কোন্‌ উপকরণ থেকে পুষ্টিলাভ করছে। তারপরই আপনারা সেই গোটা স্কীম উপলব্ধি করতে পারবেন, যা প্রতিকার ও সংস্কারের জন্যে আমাদের সামনে রয়েছে।

আমাদের গোলামীর কারণসমূহ

বিগত শতাব্দীতে যে গোলামী আমাদের উপর চেপে বসেছিল, তা ছিলো প্রকৃতপক্ষে আমাদের কয়েক শতাব্দীর ক্রমাগত ধর্মীয়, নৈতিক ও মানসিক অধঃপতনেরই পরিণাম ফল। বিভিন্ন দিক দিয়ে আমরা দিন দিন অধঃপতনের দিকে ছুটে চলেছিলাম। আমরা অধঃপতনের এমন এক চরম সীমায় পৌঁছেছিলাম, যেখানে আপন শক্তিবলে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের জন্যে সম্ভব ছিলো না। এমন অবস্থায় কোনো না কোনো প্রকারের বিপদ আমাদের উপর পতিত হওয়ারই কথা এবং প্রকৃতির বিধান অনুযায়ী সে বিপদ আমাদের উপর এসে পড়ে।

দ্বীনি অবস্থা

এ অবস্থা জানতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের তৎকালীন দ্বীনি অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। কারণ আমাদের জন্যে আমাদের দীনের গুরুত্ব সর্বাধিক। এ দ্বীনই আমাদের জীবনের প্রাণশক্তি। এটিই আমাদেরকে একটি জাতি ও মিল্লাতে পরিণত করেছে। তার বলেই আমরা দুনিয়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি এবং দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।

আমাদের অতীত ইতিহাস এ কথার সাক্ষী যে, এদেশে ইসলাম কোনো সংগঠিত প্রচেষ্টার ফলে প্রসার লাভ করেনি। সিন্ধু প্রদেশে ইসলামের প্রাথমিক বিজয় ও তার পরের একটি শতাব্দী আলোচনা বহির্ভূত রাখা যেতে পারে। এছাড়া পরবর্তী কালের কোনো যুগেই এমন কোনো সংগঠিত শক্তি ছিলো না, যা এখানে এক দিকে ইসলামের প্রসার ঘটাতো এবং যেখানে যেখানে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে সেখানে তাকে সুসংহত ও সুদৃঢ় করার চেষ্টা সাথে সাথে চালাতো। একেবারে অসংগঠিত পন্থায় কোথাও কোনো ইসলামী জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি এসে পড়লেন এবং তাঁর প্রভাবে কিছু লোক মুসলমান হয়ে গেলো কোথাও কোনো ব্যবসায়ী এলেন এবং তাঁর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের কারণে কিছু লোক কালেমা পড়ে ফেললো। কোথাও কোনো নেক ব্যক্তি ও আল্লাহ প্রেরিত বুযুর্গ আগমন করলেন এবং তাঁর উন্নত চরিত্র ও পূত-পবিত্র জীবন দেখে অনেকেই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলো। কিন্তু এ সব বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে এমন কোনো উপায়-উপাদান ছিলো না যে, যাদেরকে তাঁরা ইসলামে দীক্ষিত করছিলেন, সাথে সাথে তাদের শিক্ষা-দীক্ষারও ব্যবস্থা করতে থাকবেন। আর না সমসাময়িক শাসন কর্তৃপক্ষের মনে এ ধরনের কোনো চিন্তা ছিলো যে, আল্লাহর অন্যান্য বান্দাহদের প্রচেষ্টায় যেখানে ইসলাম প্রসার লাভ করছিল, সেখানে নও মুসলিমদের শিক্ষা-দীক্ষার কোনো ব্যবস্থাপনা তারা করে দেবেন।

এ অবহেলার কারণে আমাদের জনসাধারণ সূচনা থেকেই অজ্ঞতা ও জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত রইলো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উপকৃত হয়ে থাকলে হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী অথবা উচ্চ শ্রেণী। জনসাধারণ ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে ছিলো বেখবর এবং তার সংস্কারমূলক সুফল থেকে বহুল পরিমাণে বঞ্চিত। তার পরিণাম আমরা এই দেখতে পাই যে, অমুসলিম জাতির মধ্য থেকে গোত্রের পর গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের মধ্যে জাহেলিয়াতের বহু প্রথাই বিদ্যমান রয়েছে, যা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাদের মধ্যে প্রচলিত দেখা যেতো। শুধু তাই নয়, বরঞ্চ তাদের চিন্তাধারা পর্যন্ত পুরোপুরি বদলে যায়নি। তাদের মধ্যে আজও বহু মুশরেকী আকীদাহ-বিশ্বাস ও মুশরেকী কুসংস্কার বিদ্যমান, যা তাদের অমুসলিম পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। মুসলমান হওয়ার পর পার্থক্য বড়োজোর এই হয়েছিল যে, তাদের পুরাতন দেব-দেবীর স্থানে কিছু নতুন দেবতা স্বয়ং ইসলামের ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করেছে এবং প্রাচীন মুশরেকী কর্মকাণ্ডের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী পরিভাষার মধ্য থেকে কিছু নতুন নাম অবলম্বন করেছে। আমল যেমন তেমনই রয়ে গেছে। শুধুমাত্র বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন হয়েছে।

এর প্রমাণ যদি আপনারা চান, তাহলে কোনো অঞ্চলে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখুন, সেখানকার জনগণের ধর্মীয় অবস্থাটা কি। তারপর ইতিহাসে তালাশ করে দেখুন, ইসলাম আগমনের পূর্বে ঐ অঞ্চলে কোন্‌ ধর্ম প্রচলিত ছিলো। আপনারা দেখতে পাবেন আজও সেখানে সেই পূর্ববর্তী ধর্মের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আকীদাহ-বিশ্বাস ও আমল অন্য এক রূপে প্রচলিত আছে। যেমন ধরুন, যেখানে পূর্বে বৌদ্ধ ধর্ম ছিলো, সেখানে কোনো এক সময় বৌদ্ধের নির্দশনাবলীর পূজা করা হতো। কোথাও তাঁর দাঁত সংরক্ষিত রাখা হতো, কোথাও তাঁর কোনো অস্থি রাখা হতো, কোথাও তাঁর অন্যান্য পবিত্র স্মৃতিগুলোকে আকর্ষণের কেন্দ্রস্থল করে রাখা হতো। আজ আপনারা দেখতে পাবেন সে অঞ্চলে ঐ একই আচরণ চলছে নবী করীমের (সঃ) কেশ মুবারক ও পদচিহ্নের সাথে এবং অন্যান্য বুযুর্গানে দীনের স্মরণীয় নিদর্শনাদির সাথে। এভাবে আপনারা প্রাচীন মুসলিম গোত্রগুলোর বর্তমান রসম রেওয়াজের পর্যালোচনা করে দেখুন। তারপর অনুসন্ধান করে দেখুন, এ সব গোত্রের অমুসলিম শাখাগুলোর মধ্যে কি কি রেওয়াজ প্রচলিত আছে। উভয়ের মধ্যে (কয়েক যুগের নওমুসলিম গোত্রগুলো এবং তাদেরই গোত্রীয় অমুসলিমগণ) আপনারা খুব কম পার্থক্যই দেখতে পাবেন। এটা এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, বিগত শতাব্দীগুলোতে যারা মুসলমানদের সামগ্রিক ব্যাপারে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তারা সাধারণত আপন দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করেছেন। তাঁরা ইসলাম প্রচারকারী বুযুর্গানের সাথে কোনো প্রকার সহযোগিতা করেননি। অসংখ্য অগণিত মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কিন্তু যাঁরা ছিলেন ইসলামগৃহের ব্যবস্থাপক ও মুতাওয়াল্লী, তাঁরা এ আল্লাহর বান্দাহদের শিক্ষা-দীক্ষা, মানসিক সংস্কার-সংশোধন এবং জীবন পরিশুদ্ধ করার কোনোই ব্যবস্থা করেননি। এ কারণেই এ জাতি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের বরকত এবং তাওহীদের নিয়ামত থেকে সুফল লাভ করতে পারেনি। ফলে শিরক ও জাহেলিয়াতের অনিবার্য পরিণাম থেকে বাঁচতে পারেনি।

আবার দেখুন যে, এ বিগত শতাব্দীগুলোতে আমাদের আলেমদের কি অবস্থা ছিলো। কতিপয় মহান বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব প্রকৃতপক্ষে এ দীনের অসাধারণ খেদমত করেছেন যার প্রভাব আগেও লাভজনক ছিলো এবং এখনও লাভজনক প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু সাধারণভাবে ওলামায়ে দ্বীন যেসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন তা হচ্ছে এই যে, ছোটো-খাটো বিষয় নিয়ে তারা কলহ-বিগ্রহ করেছেন। তাঁরা তিলকে তাল করেছেন এবং বড়ো বড়ো গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়গুলো মুসলমানদের অগোচরে রেখেছেন। মতবিরোধকে দল-উপদল সৃষ্টির স্থায়ী বুনিয়াদ বানিয়েছেন এবং দল-উপদল গঠনকে ঝগড়া-লড়াইয়ের মল্ল্লভূমিতে পরিণত করেছেন। তর্কশাস্ত্র শিক্ষাদানের কাজে সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কুরআন-হাদিসের প্রতি না নিজেদের কোনো অভিরুচি ছিলো আর না লোকের মধ্যে তা সৃষ্টি করেছেন। ফেকাহ শাস্ত্রে কোনো অনুরাগ প্রদর্শন করে থাকলে ছোটো-খাটো বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খু বিতর্কই করেছেন। দ্বীন সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞা (تفقه فى الدين) সৃষ্টি করার প্রতি কোনো মনোযোগ দেননি। তাঁদের প্রভাব যেখানেই বিস্তার লাভ করেছে, সেখানে মানুষের চক্ষু ‘অনুবীক্ষণ’ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে বটে, কিন্তু ‘দূরদর্শী’, ‘বিশ্বদর্শী’ হতে পারেনি। বংশানুক্রমিক সূত্রে প্রাপ্ত এ (ঝগড়া-বিবাদের) উত্তরাধিকার ঝগড়া-বিবাদ, তর্ক-বিতর্ক, দলাদলি এবং ক্রমবর্ধমান ফেৎনার (কোন্দল-কোলাহলের) বাড়ন্ত ফসলস্বরূপ আমাদের বংশে এসেছে।

তাসাওউফ পন্থীদের অবস্থা পর্যালোচনা করলে আপনারা জানতে পারবেন যে, কয়েকজন পুণ্যপূত ব্যক্তিত্ব অবশ্যি ইসলামের সত্যিকার তাসাওউফ স্বয়ং অনুশীলন করেছেন এবং অপরকেও তা শিক্ষা দিয়েছেন। অবশিষ্ট সকলে এমন এক তাসাওউফের শিক্ষক ও প্রচারক ছিলেন যার মধ্যে প্রাচ্য, বেদান্ত, যরথুষ্ট্র প্রভৃতি দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এ তাসাওউফের মধ্যে যোগী-ঋষি, বৈরাগ্যবাদ ও প্লেটো দর্শনের ক্রিয়াকলাপের এমন সমাবেশ ঘটেছিল যে, ইসলামের মূল আকীদাহ-বিশ্বাস ও ক্রিয়াকলাপের সাথে তার খুব কমই সামঞ্জস্য রয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর পথ লাভ করার জন্যে মানুষ সেদিকে ধাবিত হতো এবং তাঁরা তাদেরকে অন্য পথ দেখাতেন। তারপর পরবর্তীগণ যখন পূর্ববর্তীগণের সাজ্জাদানশীন বা স্থলাভিষিক্ত হলেন, তখন তাঁরা উত্তরাধিকারের অন্যান্য সম্পদের সাথে তাদের পীর সাহেবানের মুরীদবর্গও লাভ করলেন। অতঃপর পীর-মুরীদের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার পরিবর্তে নযর-নিয়াযের সম্পর্কই শুধু অবশিষ্ট রইলো। এসব মহলের সকল প্রচেষ্টা আগেও এই ছিলো এবং এখনও এই রয়েছে যে, যেখানেই তাদের পীরী-মুরীদীর প্রভাব পৌঁছেছে, সেখানে দীনের সঠিক জ্ঞান কিছুতেই পৌঁছেনি। কারণ তাঁরা ভালোভাবে জানতেন যে, জনগণের উপর তাঁদের খোদায়ীর জাদু ততোক্ষণ পর্যন্তই কায়েম থাকতে পারে, যতোক্ষণ তাঁরা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে।

নৈতিক অবস্থা

এ ছিলো আমাদের ধর্মীয় অবস্থা, যা আমাদেরকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে গোলামীর তিলক পরিয়ে দিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে এবং এ স্বাধীনতার সূচনা প্রভাতে সেই অবস্থাই তার দোষ-ত্রুটিসহ আমাদের সামনে রয়েছে।

এখন নৈতিক দিক দিয়ে পর্যালোচনা করলে আপনারা জানতে পারবেন সে, সাধারণত যে সময়ে জাতির মেরুদণ্ড আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমাগত নৈতিক অধঃপতনের কারণে ভাড়াটিয়া হয়ে রইলো। তাদের নীতি এই ছিলো যে, যেই আসুক সে তাদের কাছ থেকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ নেবে এবং যে কাজে খুশি সে কাজে লাগাবে। আমাদের লক্ষ লক্ষ লোক ভাড়াটিয়া সিপাহী হওয়ার জন্যে তৈরি ছিলো, যাদের প্রত্যেককে মনিব-চাকর হিসাবে যাদের বিরুদ্ধে চাইতো যুদ্ধ করাতে পারতো। এমন লোকও ছিলো, যাদেরকে পারিশ্রমিক দিয়ে প্রত্যেক বিজয়ী তার আইন-শৃঙ্খলার কাজ চালিয়ে নিতে পারতো। এমন কি তার রাজনৈতিক চালবাজীতেও ব্যবহার করতে পারতো। আমাদের এ নৈতিক দুর্বলতার সুযোগ আমাদের প্রত্যেক দুশমন গ্রহণ করেছে তা সে মারাঠা হোক, শিখ হোক, ফরাসী হোক বা ওলন্দাজ হোক। অবশেষে ইংরেজ এসে স্বয়ং আমাদের সিপাহীদের তরবারি দ্বারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়েছে এবং আমাদের হস্ত ও মস্তিষ্কের সাহায্যে আমাদের উপর শাসন চালিয়েছে। আমাদের নৈতিক অনুভূতি এতোটা ভোঁতা হয়ে পড়েছিল যে, এ গর্হিত কাজ উপলব্ধি করা তো দূরের কথা, উল্টো এর জন্যে তারা গর্ববোধ করতো। আমাদের কবি এটাকে এভাবে বংশীয় গৌরব বলে গণ্য করতো।

“বিগত একশ’ পুরুষ থেকে যুদ্ধ করাই আমাদের পেশা।” পেশাদার সিপাহী হওয়া এবং এ বিষয়ে কোনো সম্পর্ক রাখা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই লজ্জাকর ব্যাপার, গৌরবের ব্যাপার নয়। সেই বা কোন্‌ ধরনের মানুষ, যার মধ্যে হক ও বাতিল এবং আপন ও পরের পার্থক্য বোধ নেই। পেটের আহার এবং পরনের কাপড় কেউ দিলেই সে তার জন্যে শিকারে নামতে প্রস্তুত হয়। সে মোটেই দেখে না যে, কার উপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এ নৈতিক অবস্থা যাদের ছিলো, তাদের কারো মধ্যে বিশ্বস্ততা, আমানতদারী, কোনো স্থায়ী আনুগত্য ও নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য পাওয়া বড়ো দূরের কথা। তারা যখন আপন জাতির দুশমনের কাছে নিজেকে বিক্রি করতে পারে, তখন তাদের মধ্যে কোনো পূত-পবিত্র ও শক্তিশালী বিবেকের অস্তিত্ব থাকতেই পারে না। এ জন্যেই তারা ঘুষ ও আত্মসাৎকে, ‘গায়েবী মদদ ও খোদার ফযল’ নামে আখ্যায়িত করতো। তারা সুবিধাবাদী ও শক্তিপূজারী হয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্যে এ গুণ সৃষ্টি হয়েছিল যে, যার কাছ থেকে তারা বেতন লাভ করতো, তার জন্যে নিজের ঈমান ও বিবেকের বিরুদ্ধে সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলো। এর থেকে আপনারা আন্দাজ করতে পারেন যে, আমাদের চাকুরিজীবী শ্রেণীর অধিকাংশ আজকাল যেসব গুণপনা প্রদর্শন করছে, তা কোনো আকস্মিক দুর্বলতা নয় যে, তা হঠাৎ তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। বরঞ্চ তার শিকড় আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের গভীরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। দুঃখ শুধু এতোটুকু যে, আমাদের দুশমন তাদেরকে অবৈধভাবে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতো, আর আজ তাদেরকে আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের হওয়া উচিত ছিলো জাতির ব্যাধির চিকিৎসক, তাদের রোগের সুযোগ গ্রহণ করা উচিত ছিলো না।

আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এসব দুর্বলতায় আমাদের আলেমগণও অংশীদার ছিলেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে যেমন মুষ্টিমেয় সংখ্যক মহান ও সুদৃঢ় চরিত্রের লোক ছিলেন, তেমনি আলেমদের মধ্যেও কতিপয় এমন মহান ব্যক্তিত্বও ছিলেন, যাঁরা তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন এবং জীবনের বাজি রেখে তা পালন করেন। দুনিয়ার কোনো সম্পদ তাঁদেরকে খরিদ করতে পারেনি। কিন্তু সাধারণত যে নৈতিক অবস্থা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছিলো, তা আলেমদেরও ছিলো। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বেতনভুক্ত। কোনো না কোনো বাদশাহ, আমীর অথবা পরিষদের সাথে তাঁরা সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়তেন। তার বেতন ভোগ করে তার ইচ্ছামত দ্বীন ও দ্বীনি আইন-কানুনের ব্যাখ্যা-বিশ্ল্লেষণ করা, আপন স্বার্থকে দীনের দাবির উপর অগ্রাধিকার দেয়া, আপন প্রভুর খাতিরে সত্যনিষ্ঠ আলেমদেরকে দাবিয়ে রাখার জন্যে ধর্মের অস্ত্র ব্যবহার করা ছিলো তাদের অভ্যাস। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতেন অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করে চলতেন। প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন ও দরিদ্র লোকদের ব্যাপারে তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতি এতো প্রখর ছিলো যে, মুস্তাহাব, মাকরূহ্‌ এবং ছোটখাটো বিষয়েও তারা মার্জনার যোগ্য ছিলো না। আর এসব বিষয় নিয়ে তাঁরা বিরাট ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করতেন। কিন্তু তারা সম্পদশালী ও শাসন কর্তৃপক্ষের বেলায়, তারা মুসলমান হোক অথবা কাফের একেবারে আপোসকামী ছিলেন এবং ছোটখাটো ব্যাপার কেন, একেবারে মৌলিক বিষয়েও তাদেরকে প্রশ্রয় দিতেন।

এখন রইলেন আমাদের আমীর-ওমরা। দু’টি জিনিসের প্রতিই তাঁদের আগ্রহ-অনুরাগ কেন্দ্রীভূত ছিলো। একটি উদরপূজা ও অপরটি কামরিপু চরিতার্থকরণ। এ দু’টি বস্তু ব্যতীত তাঁদের দৃষ্টিতে অন্য কোনো কিছুর গুরুত্ব ছিলো না। সকল চেষ্টা-চরিত্র ও শ্রম-সাধনা ঐ দু’টির খেদমতের জন্যেই নিবেদিত ছিলো। এ দু’টির পরিপোষণের লক্ষ্যে জাতীয় সম্পদ দ্বারা এ পেশা ও শিল্পের উৎকর্ষ সাধন করা হতো। এ পেশা পরিত্যাগ করে কোনো আমীর যদি তার ধন-দৌলত ও শক্তিসামর্থ কোনো মহান উদ্দেশ্যে ব্যয় করতো, তাহলে অন্যান্য সকল আমীর মিলিত হয়ে থাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতো এবং তার বিরুদ্ধে আপন জাতির দুশমনদের সাথে চক্রান্ত করতেও দ্বিধাবোধ করতো না।

মানসিক অবস্থা

এরপর যখন আমরা মানসিক চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের পর্যালোচনা করি, তখন জানতে পারি যে, কয়েক শতাব্দী যাবত আমাদের এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা ও তত্ত্বানুসন্ধানের কাজ প্রায় বন্ধ ছিলো। আমাদের যাবতীয় শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদান প্রাথমিক জ্ঞানচর্চা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ ধারণা বদ্ধমূল ছিলো যে, অতীত মনীষীগণ যে কাজ করে গেছেন, তা জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার চূড়ান্ত ফল ছিলো। তার অতিরিক্ত কিছু করা যেতে পারে না। জ্ঞানানুশীলন বড়জোর এতোটুকু হতে পারে যে, পূর্ববর্তীগণের লিখিত গ্রন্থাবলীর ব্যাখ্যা ও টিকা লেখা যেতে পারে। এসব লেখার কাজে আমাদের গ্রন্থকারগণ এবং তা পড়াবার কাজে আমাদের শিক্ষকগণ নিমগ্ন আছেন। কোনো নতুন চিন্তা, কোনো নতুন গবেষণা এবং কোনো নতুন আবিষ্কার সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে আমাদের নজরে পড়ে না। এ কারণে এক পরিপূর্ণ স্থবিরতা আমাদের মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনার অঙ্গনে বিরাজ করছে। এ কথা সত্য যে, যে জাতির এ দুরবস্থা হয়, সে বেশি দিন তার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না। তাকে অনিবার্যরূপে এমন এক জাতির দ্বারা পরাভূত হতে হয়, যারা কর্মতৎপর, গতিশীল ও অগ্রগামী; যারা জনসাধারণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে। যাদের লোকজনের মধ্যে দায়িত্ববোধ পাওয়া যায়, যা কিছুই তারা দায়িত্ব বলে মনে করুক না কেন; যারা জ্ঞানীগুণী ও সুধী ব্যক্তিগণ গবেষণায় নিয়োজিত এবং নতুন নতুন শক্তির উদ্‌ভাবক, যার যোগ্য ব্যবস্থাপকগণ নতুন উদ্‌ভাবিত শক্তিগুলোকে জীবনের বিভিন্ন কাজে প্রয়োগ করে এবং যে জাতি সভ্যতা-সংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগে ও দিকে ক্রমাগতভাবে উন্নতির সাথে অগ্রসর হয়। এ ধরনের কোনো জাতির মুকাবিলায় একটি স্থবির, দুর্বল চরিত্র এবং অজ্ঞ ও পশ্চাৎপদ জাতি কতোদিন টিকে থাকতে পারে? অতএব, এ কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিলো না, বরং প্রকৃতির দাবিই এই ছিলো যে, আমরা পাশ্চাত্যের জাতিসমূহের কোনো একটি গোলামে পরিণত হই।



সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 08 November 2009 )