আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী   
Saturday, 06 June 2009
আর্টিকেল সূচি
মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি
বিগত ইতিহাসের পর্যালোচনা
পাশ্চাত্য সভ্যতার বুনিয়াদ
আমাদের প্রতিক্রিয়া
আমরা কি চাই

পাশ্চাত্য সভ্যতার বুনিয়াদ

এখন আমাদের দেখা উচিত যে, যে পাশ্চাত্য জাতির দ্বারা পরাজিত ও পরাভূত হয়ে আমরা গোলামীর শিকল পরলাম, তারা কী সাথে করে এনেছিল। তাদের মতবাদ, ধর্ম ও দর্শন কী ছিলো? তাদের নীতি-নৈতিকতা কী ছিলো? তাদের সভ্যতার রূপ কী ছিলো? তাদের নীতির বুনিয়াদ কী ছিলো? তাদের এসব কিছু কিভাবে এবং কতোটা আমাদেরকে প্রভাবিত করেছিল।

ধর্ম

যে সব শতাব্দীতে আমরা ক্রমাগত অধঃপতনের দিকে ছুটেছিলাম, ঠিক ঐ শতাব্দীগুলোতেই ইউরোপ নতুন রেনেসাঁ আন্দোলনের মাধ্যমে পুনরুত্থান লাভ করছিল। এ আন্দোলনের সূচনাকালেই মধ্যযুগীয় খ্রিষ্টধর্মের সাথে তার সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সংঘর্ষ এমন এক দুঃখজনক পরিণাম ডেকে আনে যা শুধু ইউরোপের জন্যেই নয়, বরং সারা দুনিয়ার জন্যে মারাত্মক প্রমাণিত হয়। প্রাচীন খ্রিষ্টীয় দার্শনিকগণ তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের এবং সৃষ্টিজগত ও মানুষ সম্পর্কে বাইবেলের ধারণার গোটা প্রাসাদ নির্মাণ করে রেখেছিল গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের মতবাদ, দলীল-প্রমাণ ও তথ্যাদির উপর। তাদের ধারণা এই ছিলো যে, এ বুনিয়াদগুলোর যে কোনো একটির উপর সামান্য আঘাত লাগলেই গোটা প্রাসাদ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আর সেই সাথে ধর্মও শেষ হয়ে যাবে। সে জন্যে তাঁরা এমন কোনো সমালোচনা-গবেষণা সহ্য করতে তৈরি ছিলেন না, যা গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের সর্বস্বীকৃত বিষয়গুলোর প্রতি সন্দেহ আরোপ করে। এমন কোনো দার্শনিক চিন্তাধারাও তাঁরা বরদাশত করতে পারতেন না, যা ঐ সর্বস্বীকৃত মতবাদের পরিপন্থী যার কারণে গির্জা কর্তৃপক্ষকে তাদের যুক্তি-প্রমাণ পুনর্বিবেচনা করতে হতো। তাঁরা এমন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণার অনুমতিও দিতে পারতেন না, যার ফলে বিশ্বজগত ও মানুষ সম্পর্কে বাইবেল প্রদত্ত ও দার্শনিকগণ কর্তৃক গৃহীত মতবাদের কোনো অংশ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। এ ধরনের প্রতিটি বিষয়কে তাঁরা ধর্মের জন্যে এবং ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত তামাদ্দুনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্যে আশঙ্কাজনক মনে করতেন। পক্ষান্তরে যাঁরা নতুন রেনেসাঁ আন্দোলনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমালোচনা, গবেষণা এবং তথ্যানুসন্ধানের কাজ করছিলেন, তাঁরা পদে পদে ঐ দর্শন ও বিজ্ঞানের দুর্বলতা উপলব্ধি করছিলেন, যার উপর নির্ভর করে ধর্মীয় বিশ্বাস ও যুক্তি-প্রমাণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাঁরা যতোই সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন গির্জা কর্তৃপক্ষ ততোই তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে। নীতি-নৈতিকতা কী ছিলো? তাদের সভ্যতার রূপ কী ছিলো? তারা দিন দিন অধিকতর কঠোরতার সাথে তাঁদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিলেন। সর্বস্বীকৃত তথ্য ও তত্ত্বের বিপরীত বহু কিছু নজরে পড়ছিল। তথাপি গির্জা কর্তৃপক্ষদের জিদ ছিলো এই যে, ঐসব সর্বস্বীকৃত তথ্য ও তত্ত্ব পুনর্বিবেচনা করে দেখার পরিবর্তে সমালোচকদের চক্ষুই উৎপাটিত করা হোক। ঐসব মতবাদের মধ্যে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি নজরে পড়ছিল, যাকে পূর্বে কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের অকাট্য দলীল-প্রমাণ মনে করা হয়েছিল। কিন্তু গির্জা কর্তৃপক্ষ বলেন যে, ঐ সব যুক্তি-প্রমাণ বারবার চিন্তাভাবনা করার পরিবর্তে যারা এমন চিন্তা করে, তাদের মত-মস্তিষ্কই চূর্ণ করে দেয়া উচিত।

এ দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের প্রথম পরিণাম ফল এই হলো যে, নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জাগরণের সূচনা থেকেই ধর্ম ও ধার্মিকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ-প্রতিহিংসা সৃষ্টি হলো। অতঃপর যতোই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ কঠোরতা প্রদর্শন করতে থাকে, ততোই এ বিদ্বেষ-প্রতিহিংসা বাড়তে ও প্রসার লাভ করতে থাকে। এ প্রতিহিংসা শুধু খ্রিষ্টবাদ ও গির্জা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রইলো না, বরং স্বয়ং ধর্মই তার শিকারে পরিণত হলো। নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নতুন সভ্যতার পতাকাবাহীগণ উপলব্ধি করলেন যে, ধর্ম একটি প্রতারণা মাত্র। কোনো যুক্তিবাদিতার পরীক্ষায় তা টিকে থাকতে পারে না। এর বিশ্বাস কোনো যুক্তিতর্কের উপর নয়, বরং অন্ধ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। ধার্মিকদের ভয় ছিলো এই যে, জ্ঞানের আলো বিস্তার লাভ করলে তাদের গুমর ফাঁক হয়ে যাবে। অতঃপর জ্ঞান-বিজ্ঞানের অঙ্গন থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে এ সংঘাত-সংঘর্ষ যখন রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়লো এবং গির্জা কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর নতুন সভ্যতার পতাকাবাহীদের নেতৃত্বে এক নতুন জীবন ব্যবস্থার প্রাসাদ গড়ে উঠলো, তখন তার আরও দু’টি পরিণাম ফল দেখা গেলো, যা ভবিষ্যতের সমগ্র মানব ইতিহাসের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করলো।

প্রথমতঃ নতুন জীবন ব্যবস্থার প্রতিটি বিভাগ থেকে ধর্মকে কার্যতঃ উৎখাত করা হলো এবং তার পরিসীমা ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও কাজ পর্যন্ত সীমিত করে রাখা হলো। এ কথা নতুন সভ্যতার মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত করা হলো যে, রাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিকতা, আইন-কানুন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলা মোটকথা সামাজিক জীবনের কোনো বিভাগেই ধর্মের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। তা নিছক মানুষের এক ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ তার ব্যক্তিগত জীবনে খোদা ও নবীকে মানতে চাইলে মানবে এবং তাদের নির্দেশ মেনে চলতে চাইলে চলবে। কিন্তু সামাজিক জীবনে সমুদয় স্কীম রচিত ও কার্যকর করা হবে এ কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করেই যে, ধর্ম এ বিষয়কে কি নির্দেশনা দান করে এবং কি করে না।

দ্বিতীয়তঃ এ নতুন সভ্যতার শিরা-উপশিরায় খোদাবিমুখতা ও ধর্মহীনতার মানসিকতা সন্নিবিষ্ট হয়ে গেলো। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের যা কিছু সমৃদ্ধি হলো, তার মূলে সেই বিদ্বেষই সর্বদা বিদ্যমান ছিলো, যা বৈজ্ঞানিক জাগরণের সূচনায় ধর্ম এবং তৎসংশ্ল্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ের বিরুদ্ধে সৃষ্টি হয়েছিল। এ চিন্তাধারা প্রসূত সভ্যতা যেখানেই পৌঁছলো, সেখানে এ ধারণা সৃষ্টি করলো যে, ধর্ম যা কিছু পেশ করে, তা খোদা, আখেরাত এবং ওহীর প্রতি বিশ্বাস হোক অথবা কোনো নৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতি, তা সর্বাবস্থায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার সত্যতার প্রমাণ পেশ করা উচিত। নতুবা তা অস্বীকার করতে হবে। পক্ষান্তরে পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানের পণ্ডিতবর্গ যা উপস্থাপিত করবেন, তাই গ্রহণযোগ্য যতোক্ষণ না তা ভ্রান্ত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ধারণা-পদ্ধতি পাশ্চাত্যের গোটা চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল। তা শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যকেই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বিবর্জিত করেনি। বরঞ্চ সে চিন্তাধারার ভিত্তিতে রচিত সমাজ দর্শন ও সমাজ ব্যবস্থা খোদা ও আখেরাতের ধারণারও পরিপন্থী ছিলো।

জীবনদর্শন

এ তো ছিলো ধর্ম সম্পর্কে বহিরাগত বিজয়ী সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি। এখন দেখুন যে, তার জীবনদর্শন কি ছিলো। যা সে ধর্মকে অস্বীকার করে অবলম্বন করেছিল।

এ একেবারে একটি জড়বাদী দর্শন। পাশ্চাত্যের চিন্তানায়কগণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যের অতীত কোনো অদৃশ্য সত্যকে বিশ্বাস করতে না প্রস্তুত ছিলো আর না যে ওহী ও ইসলামকে তারা অস্বীকার করতো, তা ব্যতীত অদৃশ্য সত্যগুলো জানবার এবং তা উপলব্ধি করার জন্য অন্য কোনো উপায় ছিলো। অতঃপর বৈজ্ঞানিক মেজাজ-প্রকৃতিও এ কথা মানতে রাজি ছিলো না যে, নিছক অনুমানের ভিত্তিতে অদৃশ্য সত্যাবলী সম্পর্কে কোনো ধারণা-মতবাদের প্রাসাদ তৈরি করা হোক। এর চেষ্টা যদিও করা হয়েছিল, তথাপি বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনার মুকাবিলায় তা টিকে থাকতে পারেনি। অতএব, অদৃশ্য সম্পর্কে যখন তারা সন্দেহ ও অনুপলব্ধির স্থান অতিক্রম করতে পারলো না, তখন এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় রইলো না যে, দুনিয়া এবং জীবন সম্পর্কে যে অভিমতই তারা কায়েম করবে, তা শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিশ্বাসের ভিত্তিতেই করবে। ফলে, তাদের গোটা জীবনদর্শন বস্তুতান্ত্রিক হয়ে পড়ে। তারা মনে করে যে, মানুষ এক প্রকারের পশু, যা এ পৃথিবীতে পাওয়া যায়। সে না কারো অধীন আর না কারো কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তার জীবন বিধান রচনার জন্যে উপর থেকে কোনো হেদায়াতও সে লাভ করে না। এ হেদায়াত বা পথ-নির্দেশনা নিজের থেকে গ্রহণ করতে হবে। এ হেদায়াতের কোনো উৎস থাকলে তা হচ্ছে প্রাকৃতিক আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতি, জীব জগতের তথ্যাবলী অথবা মানবের অতীত ইতিহাসের অভিজ্ঞতা। তারা মনে করেছিল, এ দুনিয়ার জীবনই একমাত্র জীবন। তার সাফল্য ও স্বাচ্ছন্দ্যই কাম্য। তার ভালো ও মন্দের পরিণামই একমাত্র বিচার্য। তারা মনে করেছিল, মেজাজ-প্রকৃতির দাবি পূরণ এবং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা চরিতার্থ ব্যতীত জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তারা মনে করেছিল, পরিমাপযোগ্য বস্তুই একমাত্র সত্য এবং তারই মূল্য ও গুরুত্ব আছে। তা ছাড়া আর যা কিছু তা অবাস্তব ও মূল্যহীন। তার পেছনে লেগে থাকা সময়ের অপচয় মাত্র। আমি এখানে ঐসব দর্শনভিত্তিক জীবন ব্যবস্থার উল্ল্লেখ করছি না, যা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে রচিত হয়েছিল, যা বই-পুস্তকে লিখিত হয়েছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়া হতো ও পড়ানো হতো। বরং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিশ্ব প্রকৃতি, মানুষ ও পার্থিব জীবন সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে আছে এবং সাধারণ মানুষের মনে যা বদ্ধমূল হয়ে আছে, তাই আমি এখানে উল্লেখ করছি। তার সারাংশ তাই, যা আমি আপনাদের সামনে পেশ করছি।

এ সব ছাড়াও তিনটি এমন বড়ো বড়ো দার্শনিক মতবাদ রয়েছে যা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে আত্মপ্রকাশ করে, যখন আমরা পাশ্চাত্যের অধীন গোলামীর জীবন যাপন করছিলাম। তা খুঁটিনাটি বিষয়াদি ছাড়াই শুধু মূল ভাবধারার দিক দিয়ে গোটা সভ্যতার উপর বিস্তার লাভ করে। মানব জীবনের উপর এর এমন এক সার্বিক প্রভাব পড়ে, যা সম্ভবতঃ অন্য কিছুর পড়েনি। তাই এখানে বিশেষ করে এসবের উপরে কিছু আলোকপাত করবো।

হেগেলের ঐতিহাসিক দর্শন

এ সবের মধ্যে প্রথম মতবাদটি হচ্ছে হেগেলের, যা তিনি মানব ইতিহাসের বিশ্ল্লেষণ প্রসঙ্গে উপস্থাপিত করেন। তার সারমর্ম এই যে, ইতিহাসের এক অধ্যায়ে মানবীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির যে ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে, তা তার যাবতীয় বিভাগ ও কাঠামোসহ কিছু বিশেষ চিন্তাধারার উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকে। তার ফলেই একটা সভ্য যুগের সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার যুগটি যখন পাকাপোক্ত হয়ে যায়, তখন তার দুর্বলতা প্রকাশ হতে থাকে এবং তার মুকাবিলায় কিছু নতুন চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটতে থাকে, যা বিরাজমান সভ্যতার সাথে দ্বন্দ্ব-সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এ সংঘাত-সংঘর্ষের ফলে এক নতুন সভ্যতা যুগের সূত্রপাত হয়। এর মধ্যে পূর্ববর্তী সভ্যতা যুগের সদগুণাবলী রয়ে যায় এবং কিছু নতুন গুণাবলীও ঐসব চিন্তাধারার ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করে যার আকস্মিক আক্রমণে পরাজিত হয়ে পূর্ববর্তী যুগের বিজয়ী চিন্তাধারা শেষ পর্যন্ত আপোস করতে বাধ্য হয়। অতঃপর এ সভ্যতার যুগও পরিপক্কতা লাভ করার পর তার গর্ভ থেকেই কিছু বিপরীতমুখী চিন্তাধারার জন্ম নেয়। অতঃপর আবার দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয় এবং উভয়ের মধ্যে এক সমঝোতার ভিত্তিতে এক তৃতীয় যুগের সূচনা হয়। এতে পূর্ববর্তী যুগের গুণাবলী নিজেদের মধ্যে ধারণ করে এবং সেই সাথে নতুন চিন্তাধারার আমদানীকৃত গুণাবলীও তার মধ্যে অভিনিবিষ্ট করা হয়। এভাবে হেগেল মানবীয় সভ্যতার যে ক্রমবিকাশের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সাধারণতঃ তার দ্বারা মনের মধ্যে এ প্রভাব বদ্ধমূল হয় যে, অতীতে প্রতিটি সভ্যতার যুগ আপন আপন সময়ে নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতার কারণে শেষ হয়েছে এবং নিজেদের গুণাবলী প্রতিটি পরবর্তী যুগের জন্য ছেড়ে গেছে। অন্য কথায়, যে সভ্যতার যুগ আমরা অতিক্রম করছি তা যেন ঐসব উত্তম অংশাবলীর সারবস্তু, যা অতীত সভ্যতা যুগের মধ্যেও পাওয়া যেতো। ভবিষ্যত উন্নতির কোনো সম্ভাবনা থাকলে তা রয়েছে ঐসব নতুন চিন্তাধারায়, যা বর্তমান সভ্যতা যুগের বুনিয়াদী চিন্তাধারার সাথে দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের জন্যেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অতীত যুগগুলোর মধ্যে এমন কিছু নেই, যার থেকে কোনো দিক-নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে, যার জন্যে পেছনে ফিরে দেখার কোনো প্রয়োজন আছে। কারণ তাদের যেসব অংশাবলী পরবর্তী যুগে সংশ্ল্লিষ্ট করা হয়নি, সেগুলো পরীক্ষা করার পর ত্রুটিপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় পূর্বাহ্নেই তা পরিত্যক্ত হয়েছে। আমাদের ঐতিহাসিক রুচি-মানসিকতা তাদের কোনো জিনিসের যদি মর্যাদা দিতে চায় তাহলে এদিক দিয়ে দিতে পারে যে, তা আপন যুগে এক মর্যাদার বস্তু ছিলো এবং মানবীয় সভ্যতার ক্রমবিকাশে সে তার স্বীয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমান যুগে তা কোনো মর্যাদার যোগ্য নয় এবং ভ্রূক্ষেপযোগ্যও নয়। কারণ ইতিহাস তার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করে ফেলেছে।

এখন একটু চিন্তা করে দেখুন যে, এ প্রকৃতপক্ষে কোন্‌ ধরনের বিপজ্জনক দর্শন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এ ধারণা যার মনের মধ্যে বদ্ধমূল হবে, আপনি কি আশা করতে পারেন যে, তার মনে এসব সভ্যতা যুগের প্রতি কোনো প্রকার শ্রদ্ধা বাকি থাকতে পারে, যেসব যুগে ইবরাহীম (আ), মুসা (আ) এবং মুহাম্মদ (সা) তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছেন? সে কি কখনো নবী-যুগ এবং খেলাফতে রাশেদার শরণাপন্ন হবে কোনো হেদায়াত ও পথ-নির্দেশনার জন্যে? আসলে এ এমন এক যুক্তিপূর্ণ ও সুসংহত দার্শনিক মতবাদ, যা একবার মানসপটে আঘাত হানলে সেখান থেকে দ্বীন সম্পর্কিত চিন্তাধারার মূল উৎপাটিত হয়ে যাবে। (টিকা: এখানে এ ইতিহাসের দর্শন খণ্ডন করার কোনো সুযোগ নেই। এর ত্রুটি-বিচ্যুতি যদি কেউ উপলব্ধি করতে চান, তাহলে তাফহীমাত ২য় খণ্ড এবং তাফহীমুল কুরআনের সূরা মায়েদার ৩৫ নং টীকা পড়ে দেখতে পারেন।)

ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদ

উনবিংশ শতকে যে দার্শনিক মতবাদ মানুষের মন-মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, তা ছিলো ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদ দর্শন। এখানে তার তাত্ত্বিক জীববিদ্যা সম্পর্কিত (biological) দিক আলোচনার বিষয় নয়। ডারউইনের যুক্তি-পদ্ধতি এবং তার পরিণামস্বরূপ যে সবং দার্শনিক চিন্তা-চেতনা বৃহত্তর সামাজিক চিন্তাধারার রূপ পরিগ্রহ করেছে, আমি শুধুমাত্র সেই দার্শনিক প্রভাব সম্পর্কেই কিছু আলোচনা করবো। সাধারণ মানুষের মন ডারউইনের বিবরণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে তা ছিলো এই যে, এ বিশ্বজগত একটি সংগ্রামক্ষেত্র। জীবনের স্থিতিশীলতার জন্যে এখানে প্রতি মুহূর্তে চারদিকে এক চিরন্তন সংগ্রাম বিদ্যমান।

বিশ্ব-প্রকৃতির ব্যবস্থাটাই এমন এক ধরনের যে, এখানে কেউ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে তাকে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও প্রতিরোধ করতে হবে। এখানে বেঁচে থাকার জন্যে শক্তি ও ক্ষমতার প্রমাণ যে দিতে পারবে বাঁচার একমাত্র অধিকার তারই এটাই প্রকৃতির মেজাজ-প্রকৃতি হয়ে পড়েছে। এ নির্মম প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অধীনে যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, সে এই জন্যে ধ্বংস হয় যে, সে দুর্বল এবং তার ধ্বংস হওয়াই উচিত। যে টিকে থাকে, সে এ জন্যে টিকে থাকে যে, সে শক্তিমান এবং তার টিকে থাকাই উচিত। যমীন, তার পরিবেশ এবং তার জীবন যাপনের উপায়-উপাদান মোট কথা সব কিছুই শক্তিমানের অধিকারভুক্ত, যে জীবিত থাকার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। এ সবের উপর দুর্বলের কোনো অধিকার নেই। শক্তিমানের জন্যে তাকে স্থান করে দিতে হবে। শক্তিমান যদি দুর্বলকে সরিয়ে অথবা নির্মূল করে তার স্থান দখল করে, তাহলে সে সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত বলতে হবে।

চিন্তা করুন, বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে এরূপ ধারণা যদি হৃদয়ে বদ্ধমূল হয় এবং প্রকৃতির ব্যবস্থাকে যদি সে দৃষ্টিতেই দেখা হতে থাকে, তাহলে মানুষ মানুষের জন্যে কতো ভয়াবহ হয়ে পড়বে। এ জীবনদর্শনে সহানুভূতি, ভালোবাসা অনুগ্রহ, অনুকম্পা, ত্যাগ এবং এ ধরনের অন্যান্য মহান মানবীয় ভাবধারার কোনো স্থান হতে পারে কি? এতে ইনসাফ ও সুবিচার, বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসপরায়নতা, সততা ও সত্যবাদিতার কোনো অবকাশ থাকতে পারে কি? এখানে অধিকার বলতে তা বুঝায় না, যা একজন দুর্বল লাভ করতে পারে। এখানে জুলুম এ অর্থে ব্যবহৃত হয় না, যার জন্যে কখনো শক্তিধরকে অপরাধী ঠাওরানো যেতে পারে। লড়াই-ঝগড়া মানুষ অতীতেও করেছে। কিন্তু তাকে ফেৎনা-ফাসাদ মনে করা হতো। কিন্তু এখন এ একেবারে প্রকৃতির দাবিতে পরিণত হয়েছে। কারণ বিশ্ব-প্রকৃতি তো একটি রণক্ষত্র বৈ কিছু নয়। জুলুম অতীতেও দুনিয়ায় হতো। কিন্তু পূর্বে তা জুলুমই ছিলো। কিন্তু এখন তার জন্যে এ যুক্তি পাওয়া গেছে যে, এ হচ্ছে শক্তিমানের অধিকার। এ দর্শনের ফলে ইউরোপ অন্যান্য জাতির উপর যে সব জুলুম করেছে, তার জন্যে তারা এক মজবুত যুক্তি পেয়ে গেছে। তারা যদি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার আদিম অধিবাসীদের নির্মূল করে থাকে এবং দুর্বল জাতিগুলোকে তাদের গোলাম বানিয়ে থাকে, তাহলে এ যেন তাদের অধিকার ছিলো, যা তারা প্রকৃতির আইন অনুযায়ীই লাভ করেছে। যারা নির্মূল হয়েছে তারা নির্মূল হওয়ারই যোগ্য ছিলো এবং তাদের স্থান যারা অধিকার করেছে, তাদের এটা করারই অধিকার ছিলো। এ সম্পর্কে পাশ্চাত্যবাসীর মনে এ যাবত যদি কোনো দ্বিধা-সংকোচ থেকেও থাকে, ডারউইনের দর্শনের অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ তা দূর করে দিয়েছে। বিজ্ঞানে এ মতবাদটির মর্যাদা যাই হোক না কেন (টিকা: এর বুদ্ধিবৃত্তিক দিকটির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে আমার তাফ্‌হীমাত গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে-গ্রন্থকার।) সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির অঙ্গনে এ মানুষকে মানুষের জন্যে হিংস্র পশুতে পরিণত করেছে।

মার্কসের বস্তুবাদী ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা

ডারউইনের সমকালে তাঁর দর্শনের অনুরূপ আর একটি দর্শন জন্মলাভ করে মার্কসের বস্তুবাদী ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার গর্ভ থেকে। তার খুঁটিনাটি বিবরণ ও যুক্তিতর্কের আলোচনা আমি এখানে করতে চাই না। (টিকা: এ দর্শনের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা করা হয়েছে আমার তাফ্‌হীমাত গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে-গ্রন্থকার।) তার বুদ্ধিবৃত্তিক দিকেরও সমালোচনা করতে চাই না। আমি এখানে শুধু এতোটুকু বলতে চাই যে, মার্কস মানুষের মনে দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে সে ধারণাই সৃষ্টি করেছেন, যা ইতঃপূর্বে হেগেল এবং ডারউইন করেছেন। হেগেল চিন্তার জগতকে একটি রণক্ষেত্র বলে পেশ করেন। ডারউইন বিশ্বজগত ও প্রকৃতির ব্যবস্থাকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে দিয়েছেন। মার্কস স্বয়ং মানব সমাজেরই সে চিত্র বানিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এ দৃশ্যপটে আমরা মানুষকে আবহমানকাল থেকে সংগ্রামরত দেখতে পাই। তার স্বভাব-প্রকৃতির দাবিই এই যে, সে তার আপন সুযোগ সুবিধা ও স্বার্থের জন্যেই স্বজাতির সাথে সংগ্রাম করবে। মানুষ শুধু ব্যক্তি স্বার্থের জন্যেই বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শুধু আপন স্বার্থের জন্যেই এ সব শ্রেণীর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ চলে আসছে। মানব ইতিহাসের যাবতীয় ক্রমবিকাশ এ স্বার্থ ভিত্তিক শ্রেণী সংগ্রামের বদৌলতেই হয়েছে। জাতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ তো দূরের কথা, একই জাতির বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতের যে চিত্র আমরা পাই, তা প্রকৃতির দাবি বলেই দেখতে পাওয়া যায়। আমরা দেখতে পাই যে, মানুষের যদি কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে, তাহলে সে সম্পর্ক স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা ভোগের ঐক্য ব্যতীত আর কিছুই নয়। যাদের দ্বারা অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটবে, স্বার্থের ভিত্তিতে সমস্বার্থের লোকদের সাথে মিলিত ও একমত হয়ে তাদের সাথে লড়াই করা একেবারে ন্যায়সংগত তারা হোক না স্বজাতীয় অথবা স্বধর্মীয়। এ লড়াই করা নয়, বরঞ্চ না করাটাই প্রকৃতির পরিপন্থী।

চরিত্র

এটাই হলো সে দর্শন, আকীদা বিশ্বাস ও চিন্তাধারা, যা বিজয়ী সভ্যতার সাথে এসে আমাদের উপরে চেপে বসেছে। এখন দেখুন বহিরাগতদের সাথে নৈতিক চরিত্রের ব্যাপারে কোন্‌ ধরনের মতবাদ ও কর্ম পদ্ধতি আমাদের দেশে এসেছে। আল্লাহ ও আখেরাতকে উপেক্ষা করার পর নৈতিকতার জন্যে বৈষয়িক ও পার্থিব মূল্যবোধ ব্যতীত কোনো মূল্যবোধ এবং পরীক্ষামূলক বুনিয়াদ ব্যতীত কোনো বুনিয়াদ আর বাকি থাকে না। এ ব্যাপারে যদি কেউ মনে করে যে, ধর্ম যে নৈতিক মূল্যবোধ দান করেছে, তা ধর্ম ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর ভিত্তিতে কায়েম থাকবে এবং আম্বিয়া (আঃ) থেকে যে চারিত্রিক মূলনীতি মানুষ শিক্ষা লাভ করেছে তা ঈমান ব্যতিরেকে অন্য কিছুকে অবলম্বন করে মানব জীবনে চলতে থাকবে, তাহলে তা কিছুতেই সম্ভব হবে না। এ জন্যে পাশ্চাত্যবাসীদের মধ্যে যিনিই এ চেষ্টা করেছেন, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। ধর্মহীনতা ও আখেরাতের প্রতি অবিশ্বাসজনিত পরিবেশে বাস্তবে যে নৈতিক দর্শন বিকাশ লাভ করেছে এবং কার্যতঃ পাশ্চাত্যবাসীদের জীবনে যা প্রচলিত হয়েছে, তা হচ্ছে উপযোগবাদ দর্শন (utilitarianism) তার সাথে মিশ্রিত হয়েছে ভোগবাদের (epicureanism) সরল বস্তুবাদী ভাবধারা। এর উপরেই পাশ্চাত্যের গোটা তামাদ্দুন এবং জীবনের সমগ্র কর্মকাণ্ডের ভিত্তি রচনা করা হয়েছে। বই পুস্তকে উপযোগবাদ ও ভোগবাদের যে ব্যাখ্যা বিশ্ল্লেষণ করা হয়েছে, তা যাই হোক না কেন, পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং স্বভাব চরিত্রে তার যে সারমর্ম প্রতিফলিত হয়েছে তা এই যে, যে জিনিসের দ্বারা আমার নিজের কোনো উপকার ও সুযোগ সুবিধা লাভ হবে, তাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ অথবা আমার ব্যক্তিসত্তার ধারণাকে প্রসারিত করলেই সে সুযোগ সুবিধা আমার জাতির হবে। এখানে সুযোগ সুবিধা বলতে তা পার্থিব সুযোগ সুবিধা কোনো আরাম আয়েশ, কোনো ভোগ সম্ভোগ অথবা কোনো বৈষয়িক উপকারিতা। যে বস্তুর সাহায্যে এ ধরনের কোনো সুযোগ সুবিধা আমার হোক অথবা আমার জাতির, তা পুণ্য কাজ, মর্যাদার যোগ্য, বাঞ্ছিত ও অভীষ্ট। তার জন্যেই সকল চেষ্টা চরিত্র নিয়োজিত করা যেতে পারে। এমনটি যা নয়, যার থেকে এ দুনিয়ায় আমার জন্যে অথবা আমার জাতির জন্যে অনুভূত ও পরিমাপযোগ্য কোনো উপকার বা মঙ্গলকারিতা লাভ করা যায় না, তা ভ্রুক্ষেপযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে যা কিছু পার্থিব দিক দিয়ে ক্ষতিকর, অথবা যা পার্থিব সুযোগ-সুবিধা ও ভোগ-সম্ভোগ থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে, তাই অসৎ কাজ ও পাপ। তার থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। এ নৈতিক দর্শনে ভালো ও মন্দের কোনো স্থায়ী মানদণ্ড নেই। স্বভাব-চরিত্র ও আচার-আচরণের সৌন্দর্য ও কদর্যতার কোনো স্থায়ী মূলনীতি নেই। প্রতিটি বস্তু আপেক্ষিক, অস্থায়ী ও সাময়িক। ব্যক্তিগত ও জাতীয় স্বার্থের জন্যে যে কোনো মূলনীতি প্রণয়ন করা যায় এবং ভঙ্গ করা যায়। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে নিকৃষ্টতম পন্থা অবলম্বন করা যায়। সুযোগ-সুবিধা ও ভোগ-সম্ভোগের জন্যে যে কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায়। আজ যা কিছু ভালো আগামীকাল তা মন্দ হতে পারে। সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড এক এক জনের জন্যে এক এক ধরনের। হালাল ও হারামের মধ্যে যে চিরন্তন পার্থক্য, যা মেনে চলা দরকার এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে যে স্থায়ী পার্থক্য, যার কোনো পরিবর্তন হয় না, এসব এমন ধারণা যা সেকেলে এবং অপ্রচলিত (out-dated)। উন্নতির অগ্রযাত্রা তাকে বহু পশ্চাতে ফেলে এসেছে।

রাজনীতি

যে নীতি-নৈতিকতার ধারণাসহ বিজয়ী সভ্যতা তার পরাক্রম সহকারে এদেশে আগমন করে আমাদের শাসক হয়ে বসলো, তা উল্লেখ করা হলো। এখন সে রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলবো, যা এখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং পাশ্চাত্যের প্রভুদের নির্দেশে যার উন্নতি ও বিকাশ লাভ ঘটে। তিনটি মূলনীতির উপর তার বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ তথা ধর্মহীনতা, জাতীয়তাবাদ তথা জাতিপূজা এবং গণতন্ত্র তথা জনগণের সার্বভৌমত্ব। প্রথম মূলনীতির মর্ম এই যে, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়াকর্মের সাথে ধর্ম, খোদা ও তার শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। দুনিয়াবাসী দুনিয়ার বিষয়াদি স্বয়ং নিজের বিবেক-বিবেচনা অনুযায়ী পরিচালনা করার অধিকারী। যেভাবে খুশি তা পরিচালনা করবে এবং তার জন্যে যে মুলনীতি, আইন, মতবাদ ও পদ্ধতি ভালো মনে করবে, তা বানাবে। খোদার এসব ব্যাপারে না বলার কোনো অধিকার আছে আর না আমাদের তাঁকে একথা জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজন আছে যে, তিনি কি পছন্দ করেন এবং কি পছন্দ করে না। অবশ্যি কোনো বিরাট বিপদের পাহাড় যদি আমাদের উপর ভেঙে পড়ে, তাহলে এটা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী হবে না বিপদের সময় সাহায্যের জন্যে তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করায়। এ অবস্থায় আমাদের সাহায্য করা আল্লাহর কর্তব্য হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় মূলনীতির মর্ম এই যে, যে স্থান থেকে খোদাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সেখানে জাতিকে সমাসীন করা। জাতিকেই দেবতার আসনে বসানো হয়। জাতির স্বার্থই হয়ে পড়ে ভালো ও মন্দের মানদণ্ড। জাতিরই উন্নতি এবং তার মর্যাদা ও অপরের উপরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই হয়ে পড়ে বাঞ্ছিত ও অভীষ্ট। জাতির জন্যে জনগোষ্ঠীর ত্যাগ ও কুরবানী ন্যায়সঙ্গত হয় এবং অপরিহার্যও হয়। সেই সাথে বহিরাগত প্রভুগণ জাতীয়তাবাদের যে ধারণা আমদানি করেছেন, তা ধর্মহীন ও দেশভিত্তিক জাতীয়তার ধারণা। তার সাথে মিশ্রিত হয়ে জাতীয়তাবাদ তথা জাতি-পূজার ধারণা অন্তত আমাদের জন্যে তো একবারে হলাহল স্বরূপ হয়ে পড়েছে। কারণ যে দেশের অধিবাসীর তিন-চতুর্থাংশ অমুসলিম, সেখানে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদের সুস্পষ্ট দু’টি অর্থ হতে পারে। হয় আমরা সহজভাবে নয়, বরঞ্চ এক ভাবাবেগে অমুসলমান হয়ে যাব, অথবা জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিতে কাফের তথা দেশদ্রোহী বলে অভিহিত হবো। তৃতীয় মূলনীতির মর্ম এই যে, জাতীয় রাষ্ট্রে যে স্থান থেকে ধর্মকে বেদখল করা হয়েছে, সেখানে জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতকে তার স্থানভিত্তিক বানানো হবে। ধর্মকে পাশ কাটিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ যাকে সত্য বলবে, তাই সত্য এবং যাকে মিথ্যা বলবে, তাই মিথ্যা হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠের তৈরি মূলনীতি, আইন ও নিয়ম-পদ্ধতি জাতির দ্বীন তথা জীবন ব্যবস্থা হয়ে পড়বে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠই শুধু এ জীবন ব্যবস্থার রদবদল করতে পারবে।

বিজয়ী সভ্যতার প্রভাব

উপরে বর্ণিত এ ছিলো রাজনীতি-নৈতিকতা, দর্শন এবং ধর্ম সম্পর্কে ধারণা, যা আমাদের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় পর্যায়ে বাইরে থেকে আমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। সে সময়ে আমরা যে সব দুর্বলতার শিকার হয়ে পড়েছিলাম, তা আপনারা ইতঃপূর্বে শুনেছেন। এসব লোক যে সভ্যতা আমদানী করেছিল তার চিত্রও আপনাদের সামনে পেশ করেছি। এ কথা পরিষ্কার যে, মুষ্টিমেয় ভ্রমণকারী অথবা পর্যটক এ সভ্যতা এখানে নিয়ে আসেনি। এ সভ্যতা ছিলো তাদের, যারা এখানে শাসকের বেশে এসেছিল। এদেশের সামগ্রিক জীবনের উপর তাদের এমন প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা ইতঃপূর্বে কোনো শাসকের হয়নি। এদেশের অধিবাসীদের উপর তাদের যতোটা মানসিক ও বৈষয়িক প্রভাব পড়েছিল, ততোটা আর কারো পড়েনি। প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারের প্রচুর উপায়-উপাদান তাদের হাতে ছিলো। আইন-আদালতের মজবুত হাতিয়ারও তাদের হাতে ছিলো। সেই সাথে জীবিকার্জনের সকল চাবিকাঠিও তাদের শাসন-কর্তৃত্বের অধীন ছিলো। এসব কারণে তাদের সভ্যতা আমাদের উপর সার্বিক প্রভাব বিস্তার করেছিল, যার থেকে আমাদের জীবনের কোনো একটি বিভাগও মুক্ত থাকতে পারেনি।

শিক্ষার প্রভাব

তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল এবং জীবিকা অর্জনের চাবিকাঠি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দরজায় লটকিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার অর্থ এই যে, এখন জীবিকা তারাই পাবে, যারা এ শিক্ষালাভ করবে। এই চাপে পড়ে আমাদের প্রতিটি বংশধর পূর্বাপেক্ষা অধিকতর উৎসাহ-উদ্যম সহকারে এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এখানে তারা ঐ সব মতবাদ ও কর্মকাণ্ড শিক্ষা লাভ করে, যার মূল ভাবধারা ও বাহ্যিক কাঠামো আমাদের সভ্যতার একেবারে বিপরীত। যদিও তারা আমাদের লাখের মধ্যে একজনকেও প্রকাশ্যভাবে কাফের বানাতে পারেনি, কিন্তু চিন্তা, মতবাদ, রুচি ও মননশীলতা, স্বভাব-চরিত্র ও আচার-আচরণে সম্ভবত শতকরা দু’জনকেও সত্যিকার মুসলমান থাকতে দেয়নি। এ ছিলো সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি, যা তারা আমাদের করেছে। কারণ, তারা আমাদের মন-মস্তিষ্কে আমাদের সভ্যতার শিকড় বিনষ্ট করে তথায় এক বিপরীত সভ্যতার শিকড় লাগিয়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাব

তারা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাদের অর্থনৈতিক দর্শন ও মতবাদসহ আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে জীবন-জীবিকার দুয়ার তাদের জন্যেই উন্মুক্ত হয়েছে, যারা এ অর্থব্যবস্থার মূলনীতি মেনে নিয়েছে। এ ব্যবস্থা প্রথমে আমাদেরকে হারামখোর বানিয়েছে। অতঃপর ক্রমশ আমাদের মন থেকে হালাল ও হারামের পার্থক্য মিটিয়ে দিয়েছে। তারপর অবস্থার এতোটা অবনতি ঘটিয়েছে যে, যে ইসলামের শিক্ষা পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কর্তৃক ঘোষিত হালালকে হারাম বলে, আমাদের মধ্যে থেকে বিপুল সংখ্যক লোক সে শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

আইনের প্রভাব

তারা তাদের আইন আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। এর দ্বারা তারা আমাদের তামাদ্দুনিক ও সামাজিক ব্যবস্থার রূপ-কাঠামোই শুধু পরিবর্তন করে দেয়নি, বরং আমাদের সামাজিক ধারণা, মতবাদ এবং আইন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি বহুলাংশে পরিবর্তন করে দিয়েছে। আইন সম্পর্কে যিনি কিছুটা জ্ঞান রাখেন তিনি জানেন যে, চরিত্র ও সমাজের সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ যখন কোনো আইন রচনা করে, তার পশ্চাতে চরিত্র, সমাজ ও সংস্কৃতির এক বিশেষ রূপরেখা থাকে যার উপর সে মানব জীবনকে ঢেলে সাজাতে চায়। এভাবে যখন সে কোনো আইন বাতিল করে, তখন তার অর্থ এই হয় যে, সে সেই নৈতিক মতবাদ ও তামাদ্দুনিক দর্শনকেই বাতিল করে দেয়, যার উপর তার পূবের্র আইন রচিত হয়েছিল। অতএব, আমাদের ইংরেজ শাসকগণ এখানে এসে যখন এদেশের প্রচলিত সকল শরীয়তের আইন রহিত করে, সে স্থলে নিজেদের আইন প্রবর্তন করে, তখন তার অর্থ শুধু এ ছিলো না যে, একটি আইনের স্থলে অন্য আইন প্রবর্তিত হলো, বরং তার অর্থ এই যে, একটি নৈতিক ও তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা রহিত করে সে জায়গায় অন্য একটি নৈতিক ও তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলো। এ পরিবর্তনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে তারা এখানকার আইন কলেজগুলোতে নিজস্ব আইন শিক্ষা চালু করলো। এ শিক্ষা মনের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি করলো যে, পূর্ববর্তী আইন ছিলো সেকেলে, জরাজীর্ণ এবং আধুনিক যুগ-সমাজের জন্যে মোটেই উপযোগী নয়। এ নতুন আইন-পদ্ধতি প্রণয়ন তার মূলনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে অধিকতর সঠিক এবং অধিকতর উন্নত। শুধু তাই নয়, বরং আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র যে আল্লাহ তা’লার আমাদের এ বুনিয়াদী আকীদাহ-বিশ্বাসকেও তারা ভেঙে দিয়েছে। তারা লোকের মনে এ কথা বদ্ধমূল করে দেয় যে, আল্লাহর এ ব্যাপারে করার কিছু নেই এ কাজ আইনসভার। সে যাকে খুশি ফরয, ওয়াজেব অথবা হালাল নির্ধারিত করবে, এবং যাকে খুশি তাকে অপরাধ অথবা হারাম গণ্য করবে। অতঃপর এসব আইন আমাদের চরিত্র ও তামাদ্দুনের উপর যে কতোটা প্রভাব বিস্তার করেছে, তা অনুমান করতে এতোটুকুই যথেষ্ট হবে যে, এসব আইনই ব্যভিচার, জুয়া, মদ এবং অনেক অবৈধ জিনিসকে হালাল করে দিয়েছে। এসব আইনের ছত্রছায়ায় আমাদের এখানে বিভিন্ন ধরনের অশ্ল্লীল ক্রিয়া-কর্ম ও পাপাচার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আইনের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে বহু সৎগুণাবলী নির্মূল হতে থাকে, যা পতনযুগ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিকে এতোটা নিস্তেজ করে ফেলেছে যে, আমাদের বড়ো বড়ো ধার্মিক ও খোদাভীরু লোক পর্যন্ত এ আইন ব্যবস্থার অধীন ওকালতি করা এবং বিচারকের পদে চাকুরী করাকে দূষণীয় মনে করেন না। বরং অবস্থা এই হয়েছে যে, যারা এ সব আইনের মুকাবিলায় হুকুম-শাসন একমাত্র আল্লাহর এ মূলনীতি পুনর্জীবিত করতে চাইলো, তাদেরকে ‘খারেজী’ নামে অভিহিত করা হলো।

চরিত্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রভাব

শাসকগণ তাদের চারিত্রিক দোষত্রুটি এবং সামাজিক রীতি-পদ্ধতি আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়। এভাবে চাপিয়ে দেয় যে, চরিত্র ও সামাজিকতার ক্ষেত্রে তাদের সমমনা যারা ছিলো, তারাই তাদের নৈকট্য লাভের ও সম্মান-শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে পড়লো। এটাই তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, আর্থিক সাচ্ছল্য এবং বৈষয়িক উন্নতির নিশ্চয়তা দান করলো। এজন্যে ক্রমশ আমাদের উচ্চশ্রেণী এবং তারপর মধ্যবিত্ত শ্রেণী শাসকদের রঙে নিজেদেরকে রঞ্জিত করতে লাগলো। অবশেষে ছায়াছবি, সিনেমা, রেডিও এবং নেতৃস্থানীয় লোকদের জীবন্ত দৃষ্টান্ত মারাত্মক ব্যাধির আকারে জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে থাকলো। এরই পরিণামে এক শতাব্দীর মধ্যেই আমাদের এতোখানি অধঃপতন হলো যে, এখন সহশিক্ষার প্রচলন মেনে নেয়া হচ্ছে, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা নাচ, গান ও মদ্যপানে লিপ্ত হচ্ছে, চিত্র-তারকা ও অভিনেত্রী সেজে এমন নির্লজ্জতা প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা আমাদের দেশের বারাঙ্গনারা করতেও লজ্জা পেতো। হাজার হাজার লোকের সমাবেশে নিজেদের ভগ্নি ও মেয়েদের প্যারেড করতে দেখে তাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়। সে অবস্থা বেশি দূরে নয়, যখন আমাদের মধ্য থেকে পাশ্চাত্যবাসীদের মতো এ প্রশ্ন উত্থাপিত হবে যে, কুমারী মাতা এবং অবৈধ সন্তানে দোষটা কোথায়? সমাজে কেন তাদেরকে বিবাহিতা মাতার এবং বৈধ সন্তানের মর্যাদা দেয়া যাবে না? পাশ্চাত্যবাসীও একদিনে অধঃপতনের এ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল না। যেসব পর্যায় অতিক্রম করে আমরা চলছি তারাও তাই চলছিল।

রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাব

তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতবাদ ও প্রতিষ্ঠান আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়, যা আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ার জন্যে অন্যান্য বিষয় থেকে কম মারাত্মক প্রমাণিত হয়নি। তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আমাদের দ্বীন সম্পর্কিত ধারণার শিকড় বিনষ্ট করে দিয়েছে। তাদের জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্র ক্রমাগত এক শতাব্দী যাবত আমাদেরকে এতোটা নিষ্পেষিত করেছে যে, শেষ পর্যন্ত আমাদের জাতির অধীনের নিয়মে লক্ষ লক্ষ জীবন কুরবানী করে এবং অগণিত নারীর সম্ভ্রম-সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে তাদের স্বৈরশাসনের যাঁতাকল থেকে জাতির শুধু অর্ধাংশকে রক্ষা করার জন্যে আমাদেরকে তৈরি হতে হয়েছে। এ সব নির্মম নির্বোধেরা এক মুহূর্তের জন্যেও একথা চিন্তা করে দেখেনি যে, ভারতের মুসলমান, হিন্দু, শিখ ও অছ্যুৎ মিলে নতুন রাজনৈতিক অর্থে কি করে এক জাতি হতে পারে। যার মধ্যে গণতন্ত্রের এ মূলনীতি কার্যকর হতে পারে যে, জাতির সংখ্যাগুরু আইন প্রণেতাও শাসক হবে এবং সংখ্যালঘু জনমত গঠন করে সংখ্যাগুরু হবার চেষ্টা করবে। তারা কখনো একথা বুঝবার চেষ্টা করেনি যে, এখানকার সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু প্রকৃতপক্ষে জাতীয় সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু, নিছক রাজনৈতিক নয়। তাদের উপর পঁয়ত্রিশ কোটি মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব অর্পিত হলো। কিন্তু তারা একথা উপলব্ধি করার জন্যে এক মুহূর্তও ব্যয় করেনি যে এ সব বিভিন্ন জাতির সমষ্টিকে এক জাতি মনে করে এখানে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র কায়েমের অর্থ এ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না যে, তাদের মধ্যে একটি বিপুল সংখ্যাগুরু জাতি অন্যান্য জাতির ধর্ম, সভ্যতা ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্য বলপূর্বক নির্মূল করে দেবে। তারা চোখ বন্ধ করে তাদের নিজস্ব মূলনীতি, মতবাদ ও বাস্তব কর্ম-পদ্ধতি একটি সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশে চাপিয়ে দিতে থাকে। ভারতের প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জ যুগ যুগ ধরে মজলুমের খুন এবং লোমহর্ষক সংঘাত-সংঘর্ষের জন্যে বিলাপ করে করে একথাই বলছিল যে, এ একেবারে একটি ভ্রান্ত ব্যবস্থা, যা এখানকার অধিবাসীদের মেজাজ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর প্রতি কোনো কর্ণপাত কেউ করেনি। একই প্রাচীরের দু’পাশের প্রতিবেশী একে অপরের রক্ত-পিপাসু হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা তাদের পলিসি পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনবোধ করেনি। অবশেষে অবস্থা যখন এই দাঁড়ালো যে, দেশ বিভক্তি ব্যতীত অন্য কোনো উপায় নেই, তখন তারা এমন পদ্ধতিতে বিভক্ত করে বিদায় গ্রহণ করলো, যার ফলে খুনের দরিয়া এবং মৃত লাশের পাহাড় ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তের রূপ ধারণ করলো। এ বিভাগের অতীতের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসা হওয়ার পরিবর্তে নতুন নতুন বিবাদের ভিত্তি রচিত হলো। জানি না, এসব বিবাদ কতোকাল এ উপমহাদেশের লোকদেরকে পারস্পরিক শত্রুতা ও সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত রাখবে।

অবশ্যি আমি স্বীকার করি যে, এ বহিরাগত শাসকগণ কিছু ভালো কাজও করেছেন। তাদের বদৌলতে এখানে যে বৈষয়িক উন্নতি সাধিত হয়েছে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের কল্যাণকর দিকগুলো থেকে আমরা যে উপকৃত হয়েছি, তার গুরুত্ব আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু তাদের শাসন-কর্তৃত্বের দরুন আমাদের যে অগণিত নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক ক্ষতি হয়েছে, তার সাথে ওসব কল্যাণের কোনো তুলনা হয় কি?



সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 08 November 2009 )