আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী   
Saturday, 06 June 2009
আর্টিকেল সূচি
মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি
বিগত ইতিহাসের পর্যালোচনা
পাশ্চাত্য সভ্যতার বুনিয়াদ
আমাদের প্রতিক্রিয়া
আমরা কি চাই

আমরা কি চাই

আমাদের অতীত ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থার এ হলো বিস্তারিত পর্যালোচনা। এ পর্যালোচনা কাউকে ভৎসনা করার জন্যে করা হয়নি, বরং এ জন্যে করা হয়েছে যাতে করে আপনারা বর্তমান পরিস্থিতি ও তার ঐতিহাসিক কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারেন এবং এ অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের সংস্কারের জন্যে আল্লাহর উপর ভরসা করে যে কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করেছি তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন। কারণ এ কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করেছি ইসলামী রেনেসাঁর পতাকাবাহী হিসাবে।

আমার এসব কথায় আপনারা জানতে পেরেছেন যে, অনিষ্ট-অনাচারের পরিধি কত প্রশস্ত এবং তা আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি বিভাগে বিস্তার লাভ করে আছে। আমার এ বক্তৃতায় আপনারা এটাও জানতে পেরেছেন যে, যেসব অনাচার এখন দেখা যাচ্ছে, তার প্রতিটি কি কি কারণে বিকাশ লাভ করে ক্রমশ এ অবস্থায় পৌঁছেছে এবং তার শিকড় আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির কতো গভীরে প্রোথিত রয়েছে এবং বিভিন্ন বিভাগের এ সব অনাচার কিভাবে একটি অপরটির সহায়ক হয়েছে। এর পরে আংশিক কোনো সংস্কারের কাজ যে ফলপ্রসূ হবে না, আমি মনে করি না যে, কোনো দূরদর্শী ব্যক্তি এ কথা বুঝতে কোনো ইতস্তত করবেন। আপনারা দ্বীনি মাদ্রাসা খুলে কালেমা ও নামাযের তাবলীগ করে, অনাচার-পাপাচারের বিরুদ্ধে ওয়ায-নসীহত করে অথবা পথভ্রষ্ট দলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বড়জোর যা করতে পারেন, তা এতোটুকু যে, দ্বীন যে গতিতে অধঃপতনের দিকে ছুটছে, সে গতিতে কিছুটা শিথিল করে দিতে পারেন এবং দ্বীনি জীবনের শ্বাস গ্রহণে কিছু অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু এসব পন্থা অবলম্বনে আপনারা আশা করতে পারেন না যে, আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হয়ে যাবে এবং তার মুকাবিলায় জাহেলিয়াতের কালেমা দমিত হয়ে থাকবে। কারণ এ যাবত যে সব উপায়-উপকরণ আল্লাহর কালেমাকে দমিত এবং জাহেলিয়াতের কালেমা সমুন্নত করে আসছে, তা যথাযথ বিদ্যমান আছে। এভাবে যদি আপনারা চান যে, বর্তমান ব্যবস্থা তো ঐসব বুনিয়াদের উপরই কায়েম থাক, কিন্তু নৈতিকতা, সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, আইন-শৃংখলা অথবা রাজনীতির বর্তমান অনাচারগুলোর মধ্যে কোনটার সংস্কার হয়ে থাক, তাহলে এটাও কোনো ক্রমে সম্ভব হবে না। কারণ এর প্রতিটি বর্তমান জীবন ব্যবস্থার বুনিয়াদী অনাচার কর্তৃক সৃষ্ট ও লালিত-পালিত এবং প্রতিটি অনাচার অন্যটির সহায়তা লাভ করে। এমন অবস্থায় একটি সার্বিক অনাচার নির্মূল করার জন্যে একটি সার্বিক কর্মসূচি অপরিহার্য যা মূল থেকে শুরু করে শাখা-প্রশাখা পর্যন্ত পরিপূর্ণ ভারসাম্যসহ সংস্কারের কাজ অব্যাহত রাখবে।

সে কর্মসূচি কি হবে? আমাদের নিকটেই বা তা কি? এর উপরেই আমি কিছু আলোচনা করতে চাই। এ আলোচনার পূর্বে একটি প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন। প্রশ্ন এই যে, আপনারা চান কী? সঠিকভাবে বলতে গেলে আপনাদের মধ্যে কে কী চান?

একাগ্রতার প্রয়োজন

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমরা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছি যে, ক্রমাগত অভিজ্ঞতায় একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের এ যৌগিক পদার্থ, যা এখন পর্যন্ত আমাদের জীবন ব্যবস্থা হয়ে রয়েছে বেশি দিন চলতে পারে না। যদি চলতে থাকে, তাহলে দুনিয়াতেও তা পরিপূর্ণ ধ্বংসের কারণ এবং আখেরাতেও। এ কারণে আমরা এ অবস্থায় রয়েছি।

“ঈমান বুঝে রুকে হ্যায় তো খেঁচে হ্যায় মুঝে কুফর”। অর্থাৎ ঈমান আমাকে বাধা দিচ্ছে তো কুফর আমাকে টানছে।

না আমরা আমেরিকা, রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো একাগ্রচিত্তে দুনিয়া বানাতে পারি, কারণ যে ঈমান ও ইসলামের সাথে আমাদের সম্পর্ক, তা এ পথে গড্ডলিকা প্রবাহে চলতে দেয় না, আর না আমরা সত্যিকার মুসলমান জাতির মতো নিজেদের আখেরাত বানাতে পারি, কারণ জাহেলিয়াত আমাদেরকে এ কাজ করতে দেয় না যার অগণিত ফেৎনা আমরা আমাদের মধ্যে পোষণ করে রেখেছি। এ দু’মনা হওয়ার কারণে কোনটাই আমরা যথাযথ করতে পারছি না। না দুনিয়া-পরস্তির কাজ আর না খোদাপরস্তির কাজ। এ কারণে আমাদের প্রতিটি কাজ পার্থিব হোক অথবা পারলৌকিক হোক, দু’বিপরীতমুখী চিন্তা ও প্রবণতার রণক্ষেত্র হয়ে থাকে। তার প্রত্যেকটি অপরটির প্রতিরোধ করে এবং কোনো চিন্তা ও প্রবণতার দাবি পূরণ হয় না। এ অবস্থার শীঘ্রই অবসান হওয়া দরকার। আমরা যদি আমাদের নিজেদেরই দুশমন না হয়ে থাকি, তাহলে আমাদেরকে একাগ্রচিত্ত হতে হবে।

এ একাগ্রতা দুটো পন্থাই সম্ভব। এখন আমাদের কে কোনটা পছন্দ করেন, তাই দেখতে হবে। একটি পন্থা এই যে, আমাদের পূর্ববর্তী শাসকগণ এবং তাদের বিজয়ী সভ্যতা যে পথে এ দেশকে এনে ফেলেছিল, তাই অবলম্বন করতে হবে এবং তারপর আল্লাহ, আখেরাত, দ্বীন, দ্বীনি তাহযীব ও নৈতিকতা পরিহার করে এক একটি খাঁটি জড়বাদী সভ্যতার উন্নতি সাধন করতে হবে যাতে করে এ দেশটিও একটি দ্বিতীয় রাশিয়া অথবা আমেরিকা হতে পারে। এ পথ ভ্রান্ত, সত্যের পরিপন্থী এবং ধ্বংসাত্মক এবং আমি বলব যে, পাকিস্তানে সাফল্যের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ জন্যে যে, এখানকার মনস্তত্ত্ব ও ঐতিহ্যে ইসলামের জন্যে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা এতো গভীরে প্রোথিত যে, তার উৎপাটন করা মানুষের সাধ্যের অতীত। তথাপি যারা এ পথে চলতে চায়, তারা আমার এ ভাষণের দ্বিতীয় পুরুষ নয়। তাদের সামনে আমরা আমাদের কর্মসূচি নয়, সংগ্রামের চরমপত্রই (ultimatum) পেশ করতে চাই।

একাগ্রতার দ্বিতীয় পথ এই যে, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সেই পথ বেছে নেবো, যা কুরআন ও নবীর সুন্নত আমাদেরকে দেখিয়েছে। এটাই আমরা চাই এবং আমরা মনে করি দেশের লোকসংখ্যা হাজারের মধ্যে ৯৯৯ জন তাই চায়। আল্লাহ ও রসূলকে যারা মানে এবং মুতৃøর পরবর্তী জীবনের প্রতি যারা বিশ্বাস রাখে, তাদের প্রত্যেকের এটাই চাওয়া উচিত। কিন্তু যাঁরাই এ পথ পছন্দ করেন, তাঁদের ভালো করে উপলব্ধি করা উচিত যে, যে অবস্থার ভেতর দিয়ে আমরা চলে আসছি এবং বর্তমানে যে অবস্থার আমরা সম্মুখীন সে অবস্থায় একমাত্র ইসলাম এবং বিশুদ্ধ ইসলামকে পাকিস্তানের জীবনদর্শন ও বিজয়ী জীবন-বিধানরূপে প্রতিষ্ঠিত করা কোনো সহজ কাজ নয়। এর জন্যে প্রয়োজন কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য ইসলাম ও জাহেলিয়াতের রক্ষণশীলতার যে ভেজাল তৈরি করে তাকে সুদৃঢ় করে রেখেছে তার বিশ্লেষণ করা এবং রক্ষণশীলতার উপাদানগুলোকে আলাদা করে বিশুদ্ধ ইসলামের সেই মূল উপাদান বা সারাংশ গ্রহণ করা, যা কুরআন ও সুন্নাহর কষ্টিপাথরে ইসলামের সারবস্তু হিসাবে প্রমাণিত হয়। এটা সুষ্পষ্ট যে, এ কাজ আমাদের ঐ শ্রেণীর কঠিন প্রতিবন্ধকতা ব্যতিরেকে হতে পারে না, যারা রক্ষণশীলতার কোনো না কোনো অংশের সাথে গভীরভাবে সংশ্ল্লিষ্ট।

এর জন্যে এটাও প্রয়োজন যে, আমরা পাশ্চাত্যের প্রকৃত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি-অগ্রগতিকে তার জীবনদর্শন এবং চিন্তা, নৈতিকতা ও সমাজ ব্যবস্থার গোমরাহী থেকে মুক্ত করবো। প্রথমটিকে গ্রহণ করবো এবং দ্বিতীয়টিকে আমাদের চিন্তা-চেতনা থেকে একেবারে দূর করে দেবো। একথা সুস্পষ্ট যে, এটাকে সেই শ্রেণী বরদাশত করবে না, যারা বিশুদ্ধ পাশ্চাত্য চিন্তাধারাকে অথবা ইসলামের কোনো না কোনো পাশ্চাত্য সংস্করণকে নিজেদের দ্বীন বানিয়ে রেখেছে।

এ কাজের জন্যে এমন লোকেরও প্রয়োজন, যারা ইসলামী মন মানসিকতাসহ গঠনমূলক কাজের যোগ্যতাসম্পন্ন মজবুত স্বভাব-প্রকৃতি, নিষ্কলুষ চরিত্র, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী এবং সংগঠিত ও সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করবে। এটা ঠিক যে, এ ধরনের লোক আমাদের এখানে এমনিতেই কম। তারপর এমন দুর্দান্ত সাহসী লোক সহজে পাওয়া যায় না, যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আঘাত সহ্য করবে, ফতোয়ার গোলাবর্ষণও বরদাশত করবে এবং মিথ্যা অপবাদের চতুর্মুখী হামলারও মুকাবিলা করতে থাকবে অসীম ধৈর্য সহকারে।

এ সব শর্ত ছাড়াও প্রয়োজন এই যে, ইসলামকে একটি বিজয়ী শক্তিতে পরিণত করার আন্দোলন এক সার্বিক প্ল্লাবনের মতো চলতে থাকবে যেভাবে এ দেশে পাশ্চাত্য সভ্যতা প্ল্লাবনের আকারে এসেছিল এবং জীবনের প্রতিটি বিভাগের উপর বিস্তার লাভ করেছিল। এ সার্বিকতা এবং প্ল্লাবনের গতিধারা ব্যতীত এটা সম্ভব নয় যে, পাশ্চাত্য সভ্যতাকে তার প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব থেকে অপসারিত করা যাবে, আর না এটা সম্ভব যে, শিক্ষা ব্যবস্থা, আইন ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বিশুদ্ধ ইসলামের বুনিয়াদের উপর একটি দ্বিতীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলা যাবে।

আমরা তো এ সবই চাই। এ উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রাচীন জাতীয় সভ্যতার পুনর্জীবন নয়, ইসলামী পুনর্জীবনই আমাদের লক্ষ্য। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তার দ্বারা যে উন্নতি-অগ্রগতি হয়েছে, আমরা তার বিরোধী নই। কিন্তু আমরা ঐ সভ্যতা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করছি, যা পাশ্চাত্য জীবন-দর্শন ও নৈতিক-দর্শন থেকে জন্মলাভ করেছে। আমরা দু’চার আনার চাঁদার সদস্য সংখ্যাবৃদ্ধি করে কোনো রাজনৈতিক খেলা খেলতে চাই না বরং জাতির মধ্য থেকে বেছে বেছে এমন সব লোককে সংগঠিত করতে চাই, যারা জরাজীর্ণ রক্ষণশীলতা ও নতুনত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে প্রস্তুত। আমরা জীবনের কোনো একটি অংশ অথবা কিছু অংশে কিছু ইসলামী রঙের প্রলেপ দেয়ার পক্ষপাতী নই। বরং আমাদের সংগ্রাম এ জন্যে যে, সমগ্র জীবনের উপর ইসলামের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক। ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্রে, পারিবারিক জীবন পদ্ধতিতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে, আইন-আদালতে, রাজনীতি ও পার্লামেন্টে আইন-শৃঙ্খলা বিভাগে এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বণ্টন নীতিতে ইসলামের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক। ইসলামের এ সার্বিক শাসন-কর্তৃত্বের দ্বারাই এ সম্ভব হতে পারে যে, পাকিস্তান একাগ্রচিত্ত ও একমুখী হয়ে ঐসব আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে, যা রাব্বুল আলামীন প্রদত্ত হেদায়াতের উপর চলার অনিবার্য ও স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। অতঃপর এর থেকেই আশা করা যায় যে, এ দেশটি সমগ্র মুসলিম দেশগুলোর জন্যে কল্যাণের দিকে আহ্বানের এবং সমগ্র দুনিয়ার জন্যে হেদায়াতের কেন্দ্র হয়ে পড়বে।

আমাদের কর্মসূচি

আমাদের এ উদ্দেশ্য উপলব্ধি করার পর আমাদের কর্মসূচি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এর চারটি বড়ো বড়ো অংশ রয়েছে, যা আমি পৃথক পৃথক আলোচনা করতে চাই।

১। এর প্রথম অংশ চিন্তার পরিশুদ্ধি ও চিন্তার গঠন। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ চিন্তার পরিশুদ্ধি ও গঠন এ উদ্দেশ্যে করতে হবে যাতে করে একদিকে জাহেলিয়াতের জরাজীর্ণ চিন্তাধারার আবর্জনা পরিষ্কার করে মূল ও প্রকৃত ইসলামের সরল সঠিক রাজপথ দৃশ্যমান করে তোলা যায় এবং অপরদিকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলাদি এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির সমালোচনা পর্যালোচনা করে বলে দেয়া যায় যে, এর মধ্যে কি কি ভ্রান্ত ও পরিত্যাজ্য বিষয় রয়েছে এবং কি কি গ্রহণযোগ্য। অতঃপর সুস্পষ্ট করে দেখিয়ে দিতে হবে যে, ইসলামের মূলনীতি বর্তমান যুগের সমস্যাদির সাথে সুসামঞ্জস্য করে কিভাবে একটি সত্যনিষ্ঠ সংস্কৃতি গঠন করা যায় এবং এতে জীবনের একটি বিভাগের চিত্র কি হবে। এভাবে চিন্তাধারার পরিবর্তন হবে এবং তার পরিবর্তনের ফলে জীবনের এক নতুন দিক শুরু হবে এবং পুনর্গঠনের কাজে মন চিন্তার খোরাক লাভ করবে।

২। কর্মসূচির দ্বিতীয় অংশ হলো সৎ লোকের সন্ধান, সংগঠন ও তারবিয়াত। এর জন্যে প্রয়োজন যে, জনপদগুলো থেকে ঐসব নারী-পুরুষকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে, যারা প্রাচীন ও নতুন অনাচার থেকে মুক্ত অথবা এখন মুক্ত হওয়ার জন্যে প্রস্তুত এবং যাদের মধ্যে সংশোধনের প্রেরণা বিদ্যমান। যারা সত্যকে সত্য বলে স্বীকার করে সময়, অর্থ ও শ্রম কুরবাণী করতে প্রস্তুত। তাঁরা আধুনিক অথবা প্রাচীন শিক্ষায় শিক্ষিত হোন, সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে হোন অথবা বিশিষ্ট শ্রেণীভুক্ত, দরিদ্র হোন, ধনী হোন অথবা মধ্যবিত্ত, তাতে কিছু যায় আসে না। এ ধরনের লোক যেখানেই পাওয়া যাবে, তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে বের করে সংগ্রাম ক্ষেত্রে আনতে হবে। এভাবে আমাদের সমাজে যে কিছু সৎলোক রয়ে গেছে কিন্তু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত থাকার কারণে অথবা আংশিক সংস্কার-সংশোধনের ইতস্তত চেষ্টা-চরিত্রের কারণে কোনো সুবিধাজনক ফল লাভ করতে পারছে না, তারা একটি কেন্দ্রে একত্র হবে এবং একটি বিজ্ঞতাপূর্ণ কর্মসূচি অনুযায়ী সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র চালাবে।

অতঃপর এ ধরনের একটি দল গঠনই যথেষ্ট হবে না। বরং সাথে সাথে তাদের মানসিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের কাজ করতে হবে যাতে করে তাদের চিন্তাধারা অধিকতর পরিশুদ্ধ হয়। তাদের চরিত্র অধিকতর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন মজবুত এবং নির্ভরযোগ্য হয়। এ সত্য আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা শুধু কাগজের নক্‌শা এবং মৌখিক দাবির উপরে কায়েম করা যায় না। তার প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন নির্ভর করে এ বিষয়ের উপর যে তার পেছনে গঠনমূলক যোগ্যতা এবং সৎ ব্যক্তিচরিত্র বিদ্যমান আছে কি না। কাগজের নকশায় কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে আল্লাহর সাহায্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় তা সব সময়ই দূর করতে পারে। কিন্তু যোগ্যতা ও সততার অভাব থাকলে কোনো অট্টালিকা নির্মিতই হতে পারে না এবং নির্মিত হলেও তা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।

৩। এর তৃতীয় অংশ হচ্ছে সমাজ সংস্কার। সমাজের সকল শ্রেণীর তাদের অবস্থার দিক দিয়ে সংস্কার এ অংশের অন্তর্ভুক্ত। এ কাজ যারা করবে, তাদের উপায়-উপকরণ যতো বেশি হবে এ কাজের পরিধি ততো বিস্তৃত হবে। এ উদ্দেশ্যে কর্মীবৃন্দকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বণ্টন করে দেয়া উচিত। তাদের মধ্যে কেউ শহরবাসীর মধ্যে কাজ করবে, কেউ গ্রামবাসীর মধ্যে। কারো কাজ হবে কৃষকদের মধ্যে, কারো শ্রমিকদের মধ্যে। কেউ দাওয়াতী কাজ করবে উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে, কেউ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। কেউ চাকুরিজীবীদের সংস্কারের জন্যে কাজ করবে, কেউ ব্যবসায়ী ও শিল্পকারখানায় কর্মচারীদের সংস্কারের চেষ্টা করবে। কেউ মনোযোগ দেবে প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে এবং কেউ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। কেউ স্থবিরতার দুর্গ ধ্বংস করার কাজে লেগে যাবে। কেউ নাস্তিকতার প্ল্লাবন প্রতিরোধ করার কাজে। কেউ কাজ করবে কবিতা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে, কেউ গবেষণার ক্ষেত্রে। যদিও এ সবের কর্মক্ষেত্র পৃথক পৃথক, কিন্তু তাদের সকলের সামনে একই উদ্দেশ্য ও স্কীম থাকবে, যার দিকে জাতির সকল শ্রেণীকে পরিবেষ্টন করে আনার চেষ্টা করবে। তাদের লক্ষ্য হবে মানসিক, নৈতিক ও বাস্তব নৈরাজ্য নির্মূল করা, যা প্রাচীন রক্ষণশীল ও নতুন সক্রিয় প্রবণতার কারণে সমগ্র জাতির মধ্যে প্রসার লাভ করেছে। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সঠিক ইসলামী চিন্তাধারা ইসলামী আচার-আচরণ এবং সত্যিকার মুসলমানের মতো বাস্তব জীবন গঠন করাও তাদের লক্ষ্য হবে। এসব কাজ শুধু ওয়ায-নসীহত, প্রচার- প্রোপাগান্ডা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনার দ্বারাই হওয়া উচিত নয়। বরং বিভিন্ন দিকে রীতিমতো গঠনমূলক কর্মসূচি তৈরি করে সামনে অগ্রসর হতে হবে। যেমন ধরুন, এ কাজের কর্মীগণ যেখানেই কিছু লোককে দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে সমমনা বানাতে সক্ষম হবে, সেখানে তারা সকলকে মিলিয়ে একটা স্থায়ী সংগঠন কায়েম করবে। অতঃপর তাদের সাহায্যে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। সে কর্মসূচির মধ্যে থাকবেঃ

বস্তির মসজিদের সংস্কার, সাধারণ লোকদেরকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দান করা, বয়স্কদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। অন্তত একটি পাঠাগার কায়েম করা, জুলুম-নিপীড়ন থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যে সম্মিলিত প্রচেষ্টা, বাসিন্দাদের সাহায্য-সহযোগিতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষার কাজ করা। বস্তির এতিম, বিধবা, অকর্মণ্য ও দরিদ্র ছাত্রদের তালিকা তৈরি করা এবং যেভাবে সম্ভব তাদের সাহায্য করা, সম্ভব হলে কোনো প্রাইমারী স্কুল, হাইস্কুল অথবা দ্বীনি ইলম শিক্ষাদানের জন্যে এমন মাদ্রাসা কায়েম করা, যেখানে শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনেরও ব্যবস্থা থাকবে।

ঠিক এমনিভাবে যারা শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করবে, তারা তাদেরকে সমাজতন্ত্রের হলাহল থেকে রক্ষা করার জন্যে শুধু প্রচার-প্রচারণাতেই সন্তুষ্ট থাকবে না। বরং কার্যত তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও করবে। তাদের এমন শ্রমিক সংগঠন কায়েম করাও উচিত, যাদের উদ্দেশ্য হবে সুবিচার কায়েম করা, উৎপাদনের উপায়-উপকরণ জাতীয় মালিকানাভুক্ত করা নয়। শ্রেণী সংগ্রামের পরিবর্তে তাদের কাজ হবে বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করা। ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপের পরিবর্তে তাদের কর্মপন্থা হবে নৈতিকতার ভিত্তিতে এবং আইনসম্মত। তাদের লক্ষ্য শুধু আপন অধিকার আদায় নয়, দায়িত্ব পালনও। যে সব শ্রমিক অথবা কর্মী তাদের মধ্যে সামিল হবে, তাদের উপর এ শর্ত আরোপিত হওয়া উচিত যে, তারা ঈমানদারী সহকারে নিজের অংশের করণীয় কাজ অবশ্যই করবে। তারপর তাদের কর্মের পরিধি শুধু আপন শ্রেণীর স্বার্থেই সীমিত থাকা উচিত হবে না, বরং যে শ্রেণীর সাথেই এ সংগঠন সংশ্ল্লিষ্ট থাকবে তার নৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্যেও চেষ্টা করতে হবে। এ সাধারণ সংস্কার-সংশোধনের কর্মসূচির মূলনীতি এই যে, যে ব্যক্তি যে মহলে ও শ্রেণীর মধ্যে কাজ করবে সেখানে ক্রমাগত এবং সংগঠিত উপায়ে করবে এবং আপন চেষ্টা-চরিত্র ফলবতী না হওয়া পর্যন্ত কাজ ছেড়ে দেবে না। আমাদের কর্মপন্থা এ হওয়া উচিত নয় যে, আকাশের পাখি এবং ঝড়-তুফানের মতো বীজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেতে থাকবে। পক্ষান্তরে আমাদেরকে ঐ কৃষকের মতো কাজ করতে হবে, যে কিছু ভূমিখণ্ড নির্দিষ্ট করে নেয় তারপর জমি তৈরি করা থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত ক্রমাগত কাজের দ্বারা নিজের শ্রমকে সাফল্যমণ্ডিত করে ক্ষান্ত হয়। প্রথম পন্থা অবলম্বন করলে জমিতে জঙ্গল ও আগাছা জন্মায় এবং দ্বিতীয় পন্থায় রীতিমত ফসল তৈরি হয়।

৪। এ কর্মসূচির চতুর্থ অংশ শাসন ব্যবস্থার সংস্কার। আমরা মনে করি জীবনের বর্তমান অধঃপতন দূর করার কোনো চেষ্টা-তদবীরই সফল হতে পারে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত সংস্কারের অন্যান্য চেষ্টার সাথে শাসন ব্যবস্থা সংস্কারের চেষ্টা করা না হয়েছে। এ জন্যে যে শিক্ষা, আইন-আদালত, আইন-শৃঙ্খলা এবং জীবিকা বণ্টন প্রভৃতি শক্তির মাধ্যমে যে অনাচার-নৈরাজ্য জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তার মুকাবিলায় শুধু ওয়াজ-নসীহত ও তাবলীগের মাধ্যমে কোনো গঠনমূলক কাজ সম্ভব নয়। অতএব, প্রকৃতপক্ষেই যদি আমরা আমাদের দেশের জীবন ব্যবস্থাকে পাপাচার ও পথ-ভ্রষ্টতার পথ থেকে সরিয়ে দীনে হকের, সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর চালাতে চাই, তাহলে ক্ষমতার মসনদকে পাপাচারমুক্ত করে তথায় সততা, গঠনমূলক উপাদান ও ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা আমাদের জন্যে অপরিহার্য হবে। এ কথা ঠিক যে, কল্যাণকামী ও সংস্কারধর্মী লোক ক্ষমতা লাভ করলে, শিক্ষা, আইন-কানুন এবং আইন-শৃঙ্খলার পলিসির আমূল পরিবর্তন করে মাত্র কয়েক বছরেই তারা এমন কিছু করে ফেলতে পারবেন, যা অরাজনৈতিক চেষ্টা-তদবীরে এক শতাব্দীতে করাও সম্ভব হবে না।

এ পরিবর্তন কিভাবে হতে পারে? একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার একটি মাত্র পথ রয়েছে এবং তা নির্বাচনের পথ। জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে, জনগণের নির্বাচনের মান বদলাতে হবে, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে। অতঃপর এমন সব সৎ লোককে ক্ষমতায় বসাতে হবে, যারা দেশকে খাঁটি ইসলামী বুনিয়াদের উপর দেশের শাসন ব্যবস্থা গঠনের ইচ্ছা ও যোগ্যতা রাখে।

আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অনিষ্টের মূল কারণ হলো নির্বাচন পদ্ধতির দোষত্রুটি। নির্বাচনের মওসুম যখন আসে, পদমর্যাদার অভিলাষী লোক তখন নির্বাচনের জন্যে উঠে পড়ে লেগে যায়। কোনো দলের মনোনয়ন লাভ করে অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাজ করা শুরু করে। এ কাজে তারা না কোনো নৈতিক চরিত্রের আর না কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে। মিথ্যা, প্রতারণা, চক্রান্ত, বলপ্রয়োগ এবং অতি জঘণ্য ও অবৈধ কাজ করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। প্রলোভনের মাধ্যমে কারো ভোট পাওয়া সম্ভব হলে তারা ভোটারকে প্রলুদ্ধ করে এবং ভয় প্রদর্শন ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করেও ভোট সংগ্রহ করা হয়। ধোঁকা-প্রবঞ্চনার মাধ্যমে ভোট সংগ্রহ করা গেলে সে পন্থাই অবলম্বন করা হয়। কাউকে কোনো কুসংস্কার অথবা গোঁড়ামির ভিত্তিতে আকৃষ্ট করা সম্ভব হলে সেভাবেই তার ভোট প্রার্থনা করা হয়। এ নোংরা খেলার ময়দানে সমাজের কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি প্রথমে তো নামতেই চান না। আর কখনো ভুল করে অথবা অজ্ঞতাবশত যদি নেমেও পড়েন, তবে প্রথম পদক্ষেপের পরই ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যান। তারপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু তাদের মধ্যেই হয় যাদের না আল্লাহর ভয় আছে, না কোনো লজ্জা-শরম, আর না কোনো নিকৃষ্ট ধরনের খেলা খেলতে কোনো ভয়। অতঃপর তাদের মধ্যে বিজয়ী সে ব্যক্তিই হয়, যে সব মিথ্যাকে মিথ্যার দ্বারা এবং সকল জালিয়াতিকে জালিয়াতির দ্বারা পরাজিত করে। যাদের ভোটে এ সব লোক জয়ী হয়, তারা না কোনো নীতি-নৈতিকতা, আর না কোনো কর্মসূচি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে। তারা স্বভাব-চরিত্র এবং যোগ্যতাও দেখে না। তাদের থেকে জালিয়াতি করে যে যতো ভোট নিতে পারবে, সেই বাজিমাত করবে। এখন তো প্রকৃত ভোটের সংখ্যাধিক্যেরও কোনো মূল্য নেই। ভাড়াটিয়া জাল ভোটার এবং অসৎ ও অসাধু পোলিং অফিসার আপন হাতের কৃতিত্বে ঐসব লোককে হারিয়ে দেয়, যাদের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রকৃত ভোটারদের আস্থা থাকে। অনেক সময় নির্বাচনের কোনো সুযোগই আসে না। কখনো একজন বিবেকহীন ম্যাজিস্ট্রেট ব্যক্তিগত স্বার্থে অথবা কারো ইঙ্গিতে একজন ব্যতীত সকল নির্বাচনপ্রার্থীকে এক কলমের খোঁচায় নির্বাচনের ময়দান থেকে সরিয়ে রাখে অর্থাৎ তাদের নমিনেশন পেপার নাকচ করে দেয়। ফলে আনুকূল্যপ্রাপ্ত প্রিয় ব্যক্তিটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গোটা নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি হয়ে যায় সে প্রকৃত প্রতিনিধি হোক বা না হোক। যে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি এ অবস্থা থেকে অনুমান করতে পারেন যে, যতোদিন এ নির্বাচন পদ্ধতি প্রচলিত আছে, ততোদিন জাতির কোনো সম্ভ্রান্ত, সৎ ও ঈমানদার ব্যক্তির জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ নির্বাচন পদ্ধতির স্বভাব-প্রকৃতিই এই যে, জাতির নিকৃষ্টতম ব্যক্তিই নির্বাচিত হতে এবং যে ধরনের চরিত্রহীনতার মাধ্যমে সে নির্বাচনে জয়লাভ করে, তার ভিত্তিতেই সে দেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে।

এ নির্বাচন পদ্ধতি একেবারে পরিবর্তন করতে হবে। তার স্থলে কি পদ্ধতি হতে পারে যার মাধ্যমে উৎকৃষ্ট মানের লোক নির্বাচিত হতে পারে? তার এক সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা আমি আপনাদের সামনে পেশ করছি। তারপর আপনারা বিবেচনা করে দেখুন যে, এ পদ্ধতিতে শাসন ব্যবস্থার সংস্কার-সংশোধন আশা করা যায় কিনা।

প্রথম কথা, এই নির্বাচন হবে নীতিভিত্তিক ব্যক্তি, অঞ্চল অথবা গোত্রীয় স্বার্থে হবে না।

দ্বিতীয়ত, মানুষকে এ তারবিয়ত দিতে হবে যাতে করে তারা একথা বুঝার যোগ্য হয় যে, একটি সংস্কারমূলক কর্মসূচি কার্যকর করতে হলে কোন্‌ ধরনের লোক উপযোগী হতে পারে এবং তাদের মধ্যে কি কি নৈতিক গুণাবলী ও মানসিক যোগ্যতা থাকা উচিত।

তৃতীয়ত, স্বয়ং প্রার্থী হওয়া এবং অর্থ ব্যয় করে ভোট সংগ্রহ করার পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে। কারণ এভাবে শুধু স্বার্থপর ব্যক্তিই নির্বাচিত হয়ে আসবে। তার পরিবর্তে এমন কোনো পদ্ধতি হওয়া উচিত, যার দ্বারা প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় সম্ভ্রান্ত ও বিবেকসম্পন্ন লোক একত্রে সমবেত হয়ে কোনো উপযুক্ত লোকের সন্ধান করবে। অতঃপর তাকে তাদের প্রতিনিধি হওয়ার জন্যে আবেদন জানানো হবে। তারপর নিজেরা চেষ্টা-চরিত্র করে, অর্থ ব্যয় করে তাকে বিজয়ী করার চেষ্টা করবে। এভাবে যারা নির্বাচিত হবে, তারাই নিঃস্বার্থভাবে দেশের কল্যাণের জন্যে কাজ করবে।

চতুর্থত, এভাবে কোনো পঞ্চায়েত তাদের এলাকার প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে যার নাম প্রস্তাব করবে, তার কাছ থেকে জনসাধারণের সামনে এ শপথ নিতে হবে যে, সে পঞ্চায়েত কর্তৃক গৃহীত ঘোষণাপত্র (মেনিফেস্টো) মেনে চলবে; সংসদে গিয়ে ঐসব লোকের সাথে মিলে-মিশে কাজ করবে, যারা ঐ মেনিফেস্টো কার্যকর করার জন্যে ঐ একই পন্থায় অন্য এলাকা থেকে বিজয়ী হয়ে সংসদে এসেছে। আর যখনই পঞ্চায়েত তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করবে, তখন সে সদস্য পদে ইস্তফা দান করবে।

পঞ্চমত, এবং শেষ কথা এই যে, যেসব কর্মী সে ব্যক্তিকে বিজয়ী করার জন্যে চেষ্টা করবে, তাদের কাছ থেকে এ শপথ নিতে হবে যে, তারা নৈতিকতা এবং নির্বাচন-বিধি পুরোপুরি মেনে চলবে। কোনো কুসংস্কার বা গোঁড়ামির নাম করে ভোটের জন্যে আবেদন জানাবে না। কারো জবাবে মিথ্যা, অপবাদ এবং জালিয়াতির আশ্রয় নেবে না। কারো ভোট পয়সা দিয়ে খরিদ করতে অথবা চাপ সৃষ্টি করে হাসিলের চেষ্টা করবে না। কোনো জাল ভোট রেকর্ড করাবে না, জয় হোক বা পরাজয় হোক। মোট কথা, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা নির্বাচনী যুদ্ধ সততা এবং বিশ্বস্ততার সাথে একেবারে নীতিসম্মত উপায়ে পরিচালনা করবে।

আমার ধারণা এই যে, যদি এদেশের নির্বাচনে পাঁচটি পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাহলে গণতন্ত্রকে প্রায় পরিচ্ছন্ন করা যাবে। প্রথম প্রচেষ্টায় যে এর সুফল পাওয়া যাবে, তা জরুরি নয়। তবে একবার নির্বাচন যদি এ পথে পরিচালনা করা যায়, তাহলে গণতন্ত্রের স্বভাব-প্রকৃতি একেবারে পরিবর্তন করে দেয়া যেতে পারে। হয়তো এ পদ্ধতিতে শাসন ব্যবস্থার সত্যিকার পরিবর্তন সাধনে পঁচিশ-ত্রিশ বছর লাগবে অথবা তার বেশি। কিন্তু আমি মনে করি, পরিবর্তনের এটাই সুদৃঢ়পন্থা হবে।

বন্ধুগণ! আমি আমার এ ভাষণে রোগ ও রোগের কারণ ব্যাখ্যা করে আপনাদের সামনে পেশ করছি। এর প্রতিকারও বয়ান করেছি। সেই সাথে সেই উদ্দেশ্যও পেশ করেছি, যার জন্যে আমরা প্রতিকারের এ চেষ্টা করছি। এখানে আমার মতামত কতোটা গ্রহণযোগ্য, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আপনাদের কাজ।

সমাপ্ত



সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 08 November 2009 )