মহিলাদের প্রাকৃতিক রক্তস্রাব প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন   
Thursday, 11 June 2009
الدماء الطبيعية للنساء

মহিলাদের প্রাকৃতিক রক্তস্রাব

মূলঃ

শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন

অনুবাদেঃ

মীযানুর রহমান আবুল হুসাইন ফেণী

অনুবাদকের আরয

আরবী পুস্তিকা الدماء الطبيعية للنساء এর বাংলা অনুবাদ ‘মহিলাদের প্রাকৃতিক রক্তস্রাব’ মুদ্রিত হওয়াতে আমি আল্লাহর সার্বিক প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। মূল আরবী বইটির লেখক হলেন মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন। বইটির অনুবাদে পূর্ণ সহায়তার জন্য বন্ধুবর হাফেয মওলানা মঞ্জুরুল ইসলামকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। আরো স্মরণ করি শায়খ মুহাম্মদ রকীবুদ্দীন সাহেবকে যিনি পান্ডু লিপির আগা-গোড়া পরীক্ষা ও সম্পাদনার মাধ্যমে বেশকিছু খুঁত দূর করে বইটিকে সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক করে তোলেছেন। আল্লাহ পাক তাদেরকে উত্তম প্রতিফল দান করুন।

অত্র পুস্তিকাখানা দ্বারা যদি সাধারণ মুসলিম ভাই-বোনদের পক্ষে রক্তস্রাব সম্পর্কিত মাসলা-মাসায়েল বুঝতে সহায়ক হয় তাহলে নিজ শ্রমকে স্বার্থক মনে করব।

বইটিকে মূল আরবী থেকে বাংলায় অনুবাদ ও মুদ্রণে সর্বাঙ্গীন ত্রুটিমুক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। তবুও যদি কোন ভুল-ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে সূধী ও সম্মানিত পাঠকবৃন্দের সৎ পরামর্শ ও মূল্যবান অভিমত সাদরে গ্রহণ করা হবে এবং পরবর্তী সংস্করণে তা কার্যকরী হবে ইন্‌শা আল্লাহ।

মীযানুর রহমান ফেনী

مقدمة

ভূমিকা

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره, ونتوب إليه, ونعوذ بالله من شرور أنفسنا, ومن سيئات أعمالنا, من يهده الله فلا مضل له, ومن يضلل فلا هادي له, وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له, وأشهد أن محمدا عبده ورسوله, صلى الله عليه وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين, وسلم تسليما.

নারী জাতি তিন প্রকার রক্তস্রাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে। যথাঃ

(১) হায়েয (মাসিক রক্তস্রাব)।

(২) ইস্তেহাযাহ (নারীর ঋতুকাল ও নেফাসের দিন উত্তীর্ণ হওয়ার পর যে রক্তস্রাব হয়)।

(৩) নেফাস (প্রসবোত্তর রক্তস্রাব)।

উপরোক্ত তিন প্রকার রক্তস্রাব এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত যার হুকুম-আহকাম তথা বিধি-বিধানের বর্ণনা অতীব প্রয়োজন এবং এ প্রসঙ্গে ওলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মতামতের মধ্যে ভুল-শুদ্ধ পার্থক্য নিরূপন করে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে যা সঠিক ও নির্ভুল তা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। কেননা, প্রথমতঃ মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে এবাদতের যে সকল হুকুম-আহকাম দিয়েছেন কুরআন ও সুন্নাহই হচ্ছে সেগুলোর মূল ভিত্তি এবং উৎস।

দ্বিতীয়তঃ কুরআন ও হাদীসের উপর আস্থা স্থাপন পূর্বক তদানুযায়ী আমল করলে আত্মীক প্রশান্তি, মানসিক স্থিরতা, মনের আনন্দ এবং অল্লাহর প্রদত্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি অর্জিত হয়।

তৃতীয়তঃ কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুই শরীয়তের আইন-কানুন ও বিধি বিধানের দলীল হতে পারে না। শরীয়তের সমুদয় আইন-কানুন তথা হুকুম-আহকামের একমাত্র মানদন্ড হলো কুরআন ও হাদীস। তবে অভিজ্ঞ সাহাবীগণের অভিমতও কোন কোন ক্ষেত্রে দলীল ও প্রমাণ হতে পারে। এর জন্য শর্ত হচ্ছে সাহাবীর অভিমত ও কুরআন-সুন্নাহর মাঝে কোন সংঘাত ও বৈপরিত্য না থাকা, এমনিভাবে অন্য কোন সাহাবীর মত এবং সিদ্ধান্তের পরিপন্থীও না হওয়া। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, যদি কখনো কোন সাহাবীর অভিমত এবং কুরআন-হাদীসের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তখন কুরআন ও সুন্নাহর সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও বরণ করা ওয়াজিব হবে। আর দুই সাহাবীর মত ও সিদ্ধান্তে বৈপরিত্য দেখা দিলে দু‘টোর শক্তিশালীটিকেই গ্রহণ করতে হবে। কেননা পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালা ইরশাদ করেছেনঃ

﴿فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً﴾ (59) سورة النساء

অর্থঃ “যদি তোমরা পরস্পর কোন ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড় তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যাবর্তন কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম।” [সূরা আন-নিসাঃ ৫৯]

এই পুস্তিকাখানা নারী জাতির উপরোক্ত তিন প্রকার রক্তস্রাব ও তার হুকুম-আহকাম সম্পর্কীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর উপর সংক্ষিপ্তাকারে রচিত এবং উহা সাত অধ্যায়ে বিভক্ত।

পরিচ্ছেদগুলো হচ্ছেঃ

১ম পরিচ্ছেদঃ হায়েযের অর্থ এবং উহার রহস্য।

২য় পরিচ্ছেদঃ হায়েযের বয়স এবং সময়-সীমা সম্পর্কে।

৩য় পরিচ্ছেদঃ হায়েয সংক্রান্ত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী।

৪র্থ পরিচ্ছেদঃ হায়েযের বিধি-বিধান।

৫ম পরিচ্ছেদঃ ইস্তেহাযাহ ও তার হুকুম।

৬ষ্ট পরিচ্ছেদঃ নেফাস ও তার হুকুম সম্পর্কে।

৭ম পরিচ্ছেদঃ হায়েয প্রতিরোধকারী অথবা আনয়নকারী এবং জন্মনিয়ন্ত্রণকারী অথবা গর্ভপাতকারী ঔষধের ব্যবহার।

 

প্রথম পরিচ্ছেদ

হায়েযের অর্থ ও উহার রহস্য

হায়েযের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কোন বস্তু নির্গত ও প্রবাহিত হওয়া এবং শরীয়তে ঐ প্রাকৃতিক রক্তকে হায়েয বলা হয় যা বিনা কারণে নির্দিষ্ট সময় অনুসারে মেয়েলোকের লজ্জা স্থান দিয়ে নির্গত হয়।

হায়েয প্রাকৃতিক রক্ত। অসুস্থতা, আঘাত পাওয়া, পড়ে যাওয়া এবং প্রসবের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এই প্রাকৃতিক রক্ত মেয়েলোকের অবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে এবং এ কারণেই ঋতুস্রাবের দিক থেকে মহিলাদের মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখা যায়।

বিস্ময়কর রহস্যঃ

পৃথিবীতে বিচরণশীল প্রতিটি মানুষ ও প্রাণী আহার্য্য সংগ্রহ করে থাকে, বিভিন্ন রকম খাদ্যদ্রব্য খেয়ে জীবন যাপন করে, কিন্তু মেয়ের গর্ভে অবস্থানরত বাচ্চার পক্ষে সে ধরনের খাদ্য বা আহার্য্য গ্রহণ করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয় এবং কোন দয়া পরবশ মানুষের পক্ষেও গর্ভস্থ বাচ্চার নিকট খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়। ঠিক এমনি মুহুর্তে মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা‘য়ালা নারী জাতির মাঝে রক্ত প্রবাহের এমন এক আশ্চর্য ধারা স্থাপন করেছেন, যার দ্বারা মায়ের গর্ভে অবস্থানরত বাচ্চা মুখ দিয়ে খাওয়া এবং হজম করা ছাড়াই আহার্য্য গ্রহণ করে থাকে। উক্ত রক্ত নাভির রাস্তা দিয়ে বাচ্চার শরীরে প্রবাহিত হয়ে শিরাসমূহে অনুপ্রবেশ করে এবং বাচ্চা এর মাধ্যমে আহার্য্য গ্রহণ করে। নিপুনতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়। এটাই হায়েয সৃষ্টির মূল রহস্য এবং এ কারণেই যখন কোন মেয়েলোক গর্ভবতী হয় তখন তার হায়েয বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কদাচিৎ এর ব্যতিক্রম হয়ে হায়েয দেখা দেয় যা ধর্তব্য নয়। তেমনিভাবে খুব কম ধাত্রীর হায়েয হয়ে থাকে, বিশেষ করে প্রসবের প্রাথমিক অবস্থায়।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

রক্তস্রাবের বয়স ও উহার সময়-সীমা

এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় দুটিঃ

১ম বিষয়ঃ কত বছর বয়স থেকে কত বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েলোকের রক্তস্রাব হয়।

২য় বিষয়ঃ রক্তস্রাবের সময়-সীমা।

প্রথম বিষয়ঃ সাধারণত ১২ বছর বয়স থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েলোকের রক্তস্রাব হয়ে থাকে, আবার কখনো অবস্থা, আবহাওয়া এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে উপরোক্ত বয়সের পূর্বে এবং পরেও রক্তস্রাব হতে পারে।

ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন যে, রক্তস্রাব হওয়ার জন্য মেয়েলোকের বয়সের এমন কোন নির্দিষ্ট সীমা-রেখা আছে কি না যার আগে বা পরে রক্তস্রাব হয় না। আর যদিও বা হয়ে থাকে তাহলে সেটা অসুস্থতা হিসেবে পরিগণিত হবে, না রক্তস্রাব হিসেবে? এ প্রসঙ্গে ইমাম দারমী রাহেমাহুল্লাহ সকল মতামতগুলো উল্লেখ করে বলেছেন যে, ‘আমার নিকট এর কোনটাই ঠিক নয়। কেননা রক্তস্রাবের জন্য বয়স নির্দিষ্ট করা বা বয়সের সীমা- রেখা নির্ণয় করা নির্ভর করে রক্তস্রাব দেখা দেওয়ার উপর। সুতরাং যে কোন বয়স এবং যে কোন সময়ে মেয়েলোকের লজ্জাস্থানে কোন প্রকার রক্ত দেখা দিলে সেটাকে রক্তস্রাব বা হায়েয হিসেবে গণ্য করা ওয়াজেব।’ আল্লাহ তা‘য়ালাই সর্বজ্ঞ। [আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহায্‌যাবঃ ১/৩৮৬]

আমার নিকট (গ্রন্থকার) ইমাম দারমীর এই অভিমত হচ্ছে সঠিক অভিমত। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহেমাহুল্লাহও এই অভিমতটি গ্রহণ করেছেন। অতএব মেয়েলোক যখনই তার লজ্জাস্থানে হায়েয দেখবে তখনই সে ঋতুবতী হিসেবে প্রমাণিত হবে। যদিও সে ঋতুস্রাব ৯ বছর বয়সের পূর্বে অথবা ৫০ বছর বয়সের পরে দেখা দিয়ে থাকে। কেননা রক্তস্রাবের সমুদয় হুকুম-আহকামকে মহান আল্লাহ এবং রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রক্তস্রাব দেখা দেওয়ার সাথে সম্পৃক্ত করে রেখেছেন এবং এর জন্য বয়সের কোন সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। সুতরাং যে ঋতুস্রাবকে হুকুম-আহকামের সাথে সম্পৃক্ত করে রাখা হয়েছে সেটা দেখা দিলেই তার (নির্ধারিত বিধান) পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, ঋতুস্রাবকে কোন নির্দিষ্ট বয়সের সাথে সম্পৃক্ত করতে হলে কুরআন ও সুন্নাত ভিত্তিক কোন একটি প্রমাণের নিশ্চয়ই প্রয়োজন রয়েছে, অথচ এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে কোনই প্রমাণ নেই।

দ্বিতীয় বিষয়ঃ ঋতুস্রাবের সময়-সীমা অর্থাৎ ঋতুস্রাব কতদিন থাকতে পারে? এ ব্যাপারেও ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে, এমনকি এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের ছয় অথবা সাতটি অভিমত পাওয়া যায়। ইবনুল মুনযির এবং ফিকহবিদগণের একটি দল বলেছেন যে, হায়েয বা ঋতুস্রাব কমপক্ষে এবং বেশীর পক্ষে কতদিন থাকতে পারে এর কোন সীমা-রেখা নেই। আমার (গ্রন্থকার) অভিমত ইমাম দারমীর উপরোল্লিখিত অভিমতের মতই যা শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহেমাহুল্লাহও গ্রহণ করেছেন। এবং এটাই সঠিক, কেননা কুরআন, সুন্নাত ও কিয়াস দ্বারা তাই প্রমাণিত হয়।

১ম দলীলঃ আল্লাহ পাক কুরআন মজীদে এরশাদ করেনঃ

﴿وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُواْ النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلاَ تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىَ يَطْهُرْنَ﴾ (222) سورة البقرة

অর্থঃ “তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তুমি বলে দাও যে, এটা কষ্টদায়ক বস্তু, কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাক এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকট যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পবিত্র না হয়।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২২২]

উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ হায়েয থেকে পবিত্রতা অর্জন করাকে স্ত্রী সঙ্গমের নিষেধাজ্ঞার শেষ সীমা নির্ধারণ করেছেন। এক দিন, এক রাত, তিন দিন, তিন রাত অথবা পনের দিন পনের রাতকে নিষেধাজ্ঞার শেষ সীমা হিসেবে নির্ধারণ করেননি। এ থেকে বুঝা যায় যে, ঋতুস্রাব দেখা দেওয়া না দেওয়ার উপরই তার হুকুম-আহকামের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ যখনই ঋতুস্রাব দেখা দিবে তখনই তার বিধি-বিধান কার্যকরী হবে এবং যখনই বন্ধ হবে বা পবিত্রতা অর্জন করবে তখনই বিধি-বিধানের কার্যকরিতা শেষ হয়ে যাবে। বুঝা গেল, ঋতুস্রাব কতদিন থাকতে পারে এর সর্বোচ্চ এবং সর্ব নিম্ন কোন সীমা-রেখা নির্দিষ্ট নেই।

দ্বিতীয় দলীলঃ যা সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছেঃ

أنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالََ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا وَقَدْ حَاضَتْ وَهِيَ مُحْرِمَةٌ بِالْعُمْرَةِ: ’’افْعَلِيْ مَا يَفْعَلُ الْحَاجُّ غَيْرَ أنْ لاَ تَطُوْفِيْ بَالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِيْ,, قَالَتْ: فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ النَّحْرِ طَهُرْتُ. الحديث.

অর্থঃ ((উমরার ইহরাম অবস্থায় আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার যখন রক্তস্রাব দেখা দিয়েছিল, তখন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন যে, ((তুমি ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত কা‘বা শরীফের তওয়াফ ছাড়া উমরার অন্যান্য কাজগুলো করে যাও, যেভাবে হাজীরা করে যাচ্ছে।)) (অর্থাৎ ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হলে তখন তওয়াফ করবে।) আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ যখন কুরবানীর দিন আসলো তখন আমি পবিত্র হলাম। [মুসলিম শরীফ ৪/৩০] সহীহ বুখারী শরীফ তৃতীয় খন্ডের ৬১০ পৃষ্ঠায় উক্ত হাদীসখানা এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ

أنَّ النَّبِيَّ  قَالَ: ’’انْتَظِرِيْ فَإذَا طَهُرْتِ فَاخْرُجِيْ إلَى التَّنْعِيْمِ,,

অর্থাৎ নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেনঃ ((তুমি পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর, পবিত্রতা অর্জন করার পর (উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে এহরাম বাঁধার জন্য) তানয়ীমের দিকে বের হও।)) তানয়ীম হারামের বাইরে মক্কা মুকার্রামার উত্তর পাশে নিকটবর্তী একটি স্থান। নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানেও আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেননি। এত্থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রক্তস্রাব দেখা দেওয়া না দেওয়ার সাথেই তার হুকুম-আহকামের সম্পর্ক। নির্দিষ্ট কোন সময়ের সাথে নয়।

তৃতীয় দলীলঃ ফিকহবিদগণের হায়েয সংক্রান্ত এসব বিস্তারিত আলোচনা ও অনুমান-ধারণা কুরআন ও সুন্নাতে বিদ্যমান না থাকা সত্বেও প্রয়োজনের খাতিরে বর্ণনা করা যরূরী। যদি এ সমস্ত বিস্তারিত আলোচনাকে হৃদয়ঙ্গম করা এবং এগুলোর দ্বারা আল্লাহ তা‘য়ালার বন্দেগী ও উপাসনা করা বান্দার জন্য অত্যাবশ্যকীয় হয়ে থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেকের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতেন। কেননা এগুলোর সাথে মেয়েলোকের নামায, রোযা, বিবাহ, তালাক এবং মীরাসের মাসআলা সমূহ সম্পৃক্ত। যেমনিভাবে আল্লাহ তা‘য়ালা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের সংখ্যা, নামায পড়ার নির্দিষ্ট সময়, নামাযের রুকূ‘, সেজদাহ, যাকাতের মাল, মালের নিসাব ও পরিমাণ, যাকাত বিতরণ করার নির্দিষ্ট স্থান, রোযার সময়-সীমা এবং হজ্জসহ অন্যান্য বিষয়াবলী স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। এমনকি খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম-নীতি, ঘুম যাওয়ার আদব, স্ত্রী সহবাস, উঠা-বসা, গৃহে প্রবেশ, গৃহ থেকে বের হওয়া, পায়খানা ও প্রস্রাবের নিয়ম-নীতিও বর্ণনা করেছেন। শুধু তাই নয় বরং পায়খানা ও প্রস্রাব করার ব্যবহৃত ঢিলার সংখ্যা নির্ধারণ করাসহ জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়াদির বিবরণও বিশ্ব মানবের সামনে তুলে ধরেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর মনোনীত ধর্মকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং মু‘মিন বান্দাদের উপর নিজের নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সূরা নাহ্‌লের ৮৯ নম্বর আয়াতে নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মোধন করে এরশাদ করেনঃ

﴿وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ﴾ (89) سورة النحل

অর্থঃ “আমি প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়ে তোমার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছি।” [সূরা আন-নাহ্‌লঃ ৮৯] এমনিভাবে কুরআন শরীফে সূরা ইউসুফের ১১১ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে তিনি আরো ইরশাদ করেনঃ

﴿مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ﴾ (111) سورة يوسف

অর্থঃ “এটা কোন মনগড়া কথা নয়, বরং বিশ্বাস স্থাপনকারীদের জন্য পূর্ববর্তী গ্রন্থের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ।” [সূরা ইউসুফঃ ১১১]

এখন বুঝতে হবে যেহেতু এ সবের বিস্তারিত আলোচনা কুরআন ও হাদীসে নেই সেহেতু এ সবের উপর পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ারও প্রয়োজন নেই। নির্ভতার প্রয়োজন শুধু হায়েয দেখা দেওয়া না দেওয়ার উপর। কুরআন ও সুন্নাতে এ সমস্ত বিষয়াদি না থাকাটাই প্রমাণ করে যে, এগুলোর কোন ধর্তব্য নেই। হায়েয বা ঋতুস্রাব সম্পর্কীয় মাসআলা সহ অন্যান্য সকল মাসআলাসমূহে কুরআন ও সুন্নাতই আপনাকে সাহায্য করবে। কেননা শরীয়তের সকল বিধি-বিধান কুরআন, সুন্নাত, ইজমা‘ অথবা বিশুদ্ধ কিয়াস দ্বারাই প্রমাণিত হয়েছে, অন্য কোন কিছুর মাধ্যমে নয়। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া একটি নিয়ম বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ ‘কুরআন ও সুন্নাতে আল্লাহ তা‘য়ালা রক্তস্রাবের সাথে বেশ কিছু হুকুম-আহকাম সম্পৃক্ত করেছেন, কিন্তু রক্তস্রাব কতদিন থাকতে পারে এর সর্ব নিম্ন এবং সর্বোচ্চ কোন সময়-সীমা নির্ধারণ করেননি। এমনকি উম্মতের জন্য অত্যাধিক প্রয়োজনীয় এবং জটিল বিষয় হওয়া সত্বেও আল্লাহ তা‘য়ালা দুই পবিত্রতার মধ্যবর্তী সময়ের সীমা-রেখা নির্দিষ্ট করেননি। আরবী অভিধানও এর কোন সময়-সূচী নির্ধারণ করেনি। সুতরাং হায়েয বা রক্তস্রাবের জন্য যে ব্যক্তি কোন সময়-সীমা নির্দিষ্ট করবে সে সরাসরি কুরআন ও হাদীসের বিরুদ্ধাচরণ করবে।’

চতুর্থ দলীলঃ যা বিশুদ্ধ কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তা‘য়ালা রক্তস্রাবকে নোংরা বা ময়লা বস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছেন, কাজেই যখনই রক্তস্রাব দেখা দিবে তখনই সেটাকে ময়লা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে রক্তস্রাবের প্রথম এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ, ১৫তম এবং ১৬তম ও ১৭তম এবং ১৮তম দিনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ময়লা ময়লাই। সুতরাং ময়লা যেহেতু উভয় দিনেই বিদ্যমান সেহেতু উক্ত দুই দিনের মধ্যে হুকুমের দিক থেকে পার্থক্য করা কিভাবে সঠিক হতে পারে? এটা কি বিশুদ্ধ কিয়াসের পরিপন্থী নয়? বিশুদ্ধ কিয়াস কি উভয় দিনকে হুকুমের দিক থেকে সমান গণ্য করে না?

পঞ্চম দলীলঃ রক্তস্রাবের জন্য সময়-সীমা নির্ধারণকারীদের পারস্পরিক মতভেদ ও সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। এবং এ ধরনের পারস্পরিক মতভেদই প্রমাণ করে যে, এ বিষয়ে এমন কোন সমাধান নেই, যেটাকে গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয়। তা ছাড়া এ সকল মতামত হচ্ছে এজতেহাদী যা ভুল-শুদ্ধ দুটোরই সম্ভাবনা রাখে। এমতাবস্থায় সমাধানের জন্য বা সঠিক নির্দেশনা পাওয়ার জন্য কুরআন ও সুন্নাতের দিকেই দৃষ্টি দিতে হবে।

উপরোল্লিখিত বিস্তারিত আলোচনা দ্বারা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ঋতুস্রাবের সর্ব নিম্ন এবং সর্বোচ্চ কোন সময়-সীমা নির্দিষ্ট নেই, এবং এটাই গ্রহণযোগ্য। সুতরাং মেয়েলোকের লজ্জাস্থানে রক্ত দেখা দিলে যা আঘাত বা অন্য কোন কারণে প্রবাহিত না হয়; ধরে নিতে হবে এটা হায়েযের রক্ত হিসেবেই প্রবাহিত হচ্ছে এবং এর জন্য কোন বয়স ও সময় নির্দিষ্ট নেই। তবে হ্যাঁ, এ রক্ত যদি মেয়েলোকের বিরতিহীনভাবে প্রবাহিত হতে থাকে যে, আর বন্ধই হচ্ছে না অথবা অত্যন্ত স্বল্প সময় পর্যন্ত যেমন মাসে মাত্র এক-দুই দিন প্রবাহিত হয়ে থাকে তাহলে সেটাকে ইস্তেহাযাহ্‌ হিসেবে গণ্য করতে হবে যার বিস্তারিত বিবরণ শীঘ্রই সম্মানিত পাঠকবৃন্দের সামনে আসছে।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহেমাহুল্লাহ হায়েয সম্পর্কে বলেন যে, ‘মেয়েলোকের রেহেম (গর্ভাশয়) থেকে যা কিছু বের হবে তাই হায়েয হিসেবেই গণ্য হবে যতক্ষণ না ইস্তেহাযার রক্ত হিসেবে অকাট্য কোন প্রমাণ পাওয়া যায়।’ তিনি আরো বলেনঃ ‘মেয়েলোকের লজ্জাস্থান থেকে যখন কোন প্রকার রক্ত বের হবে তখন যদি জানা না থাকে যে, এটা কি রগ থেকে বের হয়ে আসা রক্ত না কোন আঘাত জনিত রক্ত? তাহলে সে রক্তকে হায়েয হিসেবেই গণ্য করতে হবে।’ শায়খুল ইসলাম রাহেমাহুল্লাহর এই অভিমত সময়-সীমা নির্ধারণকারীদের অভিমতের চেয়ে দলীল-প্রমাণের দিক থেকে যেমন শক্তিশালী, ঠিক তেমনই অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করার পক্ষে এবং আমল ও বাস্তবায়নের দিক দিয়ে অতি সহজ। এমনকি উক্ত গুণাবলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে কোন মতকে দ্বীন ও ইসলামের সার্বজনীন নীতির প্রতি লক্ষ্য রেখে গ্রহণ করাই উত্তম। কেননা এটা সহজসাধ্য ও সরল। (যেন তা পালন করা কারো পক্ষে কষ্টকর না হয়।) আল্লাহ পাক এরশাদ করেনঃ

﴿وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ﴾ (78) سورة الحـج

অর্থঃ “আমি ধর্মের মধ্যে তোমাদের জন্য কোন সংকীর্ণতা রাখিনি।” [সূরা আল-হাজ্জঃ ৭৮] এবং নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ

’’إنَّ الدِّيْنَ يُسْرٌ, وَلَنْ يُشَادَّ الدِّيْنَ أحَدٌ إلاَّ غَلَبَهُ, فَسَدِّدُوْا وَقَارِبُوْا وَأبْشِرُوْا,,

অর্থঃ ((নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। কেউ দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করে জিততে পারে না। কাজেই তোমরা মধ্য পথ অবলম্বন কর, (দ্বীনের) নিকটবর্তী থাক এবং (অল্প কিন্তু স্থিতিশীল আমলের প্রতিদানের) সুসংবাদ দাও।)) [বুখারী]

নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, যতক্ষণ পর্যন্ত গুনাহ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কোন বিষয়ের দুটি দিকের মধ্যে সহজ দিকটাই তিনি গ্রহণ করতেন।

গর্ভবতী মহিলার রক্তস্রাব

সাধারণত মেয়েলোক যখন গর্ভবতী হয় তখন রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। ইমাম আহমদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ ‘রক্তস্রাব বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে গর্ভবতী বলে প্রমাণিত হয়। সন্তান সম্ভাবা মহিলা যদি প্রসবের অল্প সময় পূর্বে যেমন মাত্র দুই দিন অথবা তিন দিন পর্যন্ত রক্তস্রাব দেখে এবং সাথে যদি প্রসব বেদনা থাকে তাহলে উহাকে নেফাস (প্রসবোত্তর কালীন রক্তস্রাব) হিসেবে গণ্য করা হবে। আর যদি প্রসবের অনেক পূর্বে রক্ত প্রবাহিত হয়ে থাকে তাহলে উক্ত রক্ত নেফাস হিসেবে গণ্য হবে না। এমতাবস্থায় প্রবাহিত রক্তকে কি হায়েয হিসেবে গণ্য করে তার উপর হায়েযের বিধি-বিধান কার্যকরী করা হবে? না অসুস্থতার রক্ত গণ্য করা হবে? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক সমাধান হচ্ছে এই যে, সন্তান সম্ভাবা মহিলার যদি পূর্বের অভ্যাস অনুযায়ী রক্ত দেখা দেয় তাহলে সেটাকে হায়েয হিসেবে গণ্য করতে হবে। কেননা মেয়েলোকের লজ্জাস্থান থেকে যে রক্ত বের হয় তা হায়েয হওয়াটাই হচ্ছে প্রকৃত নিয়ম। হ্যাঁ, উক্ত রক্ত হায়েয নয় এর পিছনে যদি কোন রকম প্রমাণ থাকে তাহলে সেটা পৃথক কথা। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাতের কোথাও এমন কোন প্রমাণ নেই যে, গর্ভবতী মহিলার হায়েয হতে পারে না। ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ী রাহেমাহুমাল্লাহর এই মত। ইবনে তাইমিয়া রাহেমাহুল্লাহও এই মত গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর লিখিত ইখতিয়ারাত গ্রন্থের ৩০ পৃষ্ঠায় ইমাম বাইহাকীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন যে, ইমাম আহমদের এই জাতীয় একটি অভিমত রয়েছে। বরং তিনি উল্লেখ করেছেন যে ইমাম আহমদ রাহেমাহুল্লাহ ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ী রাহেমাহুমাল্লাহর উক্ত মতামতের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এখন প্রতীয়মান হলো যে, সাধারণ মহিলার হায়েযের যে হুকুম গর্ভবতী মহিলারও ঠিক সেই হুকুম। তবে নিম্নোক্ত দু‘টি মাসআলায় এর ব্যতিক্রম রয়েছেঃ

(১) তালাকঃ সন্তান অন্তঃসত্তা নয় এমন মহিলার ঋতুস্রাবের অবস্থায় ইদ্দত পূরণ করা হলে তাকে তালাক দেওয়া হারাম। পক্ষান্তরে সন্তান সম্ভাবা মহিলার ঋতুস্রাবের অবস্থায় ইদ্দত পূরণ করা যরূরী হলেও তাকে তালাক দেওয়া হারাম নয়। কেননা কুরআন মজীদে বলা হয়েছে যে,

﴿فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ﴾ (1) سورة الطلاق

অর্থঃ “তোমরা তাদেরকে তালাক দিও তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে।” [সূরা আত-তালাকঃ ১]

সন্তান সম্ভাবা নয় এমন মহিলাকে রক্তস্রাবের অবস্থায় তালাক দেওয়া কুরআন শরীফের উক্ত আয়াতের বিরোধী। কিন্তু সন্তান সম্ভাবা স্ত্রীকে হায়েযের অবস্থায় তালাক দেওয়া কুরআন শরীফের ঘোষণা বিরোধী নয়। কেননা যে ব্যক্তি গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দিবে সে তো তার ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখেই দিবে, স্ত্রী হায়েযের অবস্থায় থাকুক বা পবিত্র অবস্থায় থাকুক। কারণ গর্ভধারণ দিয়েই তার ইদ্দত পরিগণিত হবে। আর এ কারণেই সঙ্গমের পরে তাকে তালাক দেওয়া হারাম নয় বরং জায়েয। পক্ষান্তরে গর্ভবতী নয় এমন মহিলাকে সঙ্গমের পর তালাক দেওয়া হারাম।

(২) গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে নারীর ঋতুবতী হওয়া না হওয়া সমান। প্রমাণ হিসেবে পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা তালাকের ৪নং আয়াত পেশ করা হচ্ছে। আল্লাহ তা‘য়ালা এরশাদ করেনঃ

﴿وَأُوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ﴾ (4) سورة الطلاق

অর্থঃ “গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত।” [সূরা আত-তালাকঃ ৪]

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

হায়েযের অবস্থায় আপতিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী

হায়েয অবস্থায় আপতিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহ কয়েক প্রকারঃ

১ম বিষয়ঃ রক্তস্রাব নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কম অথবা বেশী হওয়া। যেমন কোন মেয়েলোকের প্রতি মাসে ছয় দিন করে ঋতুস্রাবের অভ্যাস ছিল কিন্তু এক মাসে ৭ দিন পর্যন্ত ঋতুস্রাব অব্যাহত থাকে অথবা কোন মেয়েলোকের ৭ দিন করে ঋতুস্রাব হয়ে থাকে সেখানে ৬ দিন থাকার পর বন্ধ হয়ে গেল।

২য় বিষয়ঃ নিয়মিত অভ্যাসের আগে-পরে হায়েয আরম্ভ হওয়া। যেমন যেখানে মাসের শেষের দিকে হায়েয আসে সেখানে মাসের ১ম দিকে আসলো অথবা মাসের প্রথম দিকে আসার পরিবর্তে শেষের দিকে আসলো।

উপরোক্ত বিষয় দু‘টির হুকুম কি? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক সমাধান হচ্ছে এই যে, মেয়েলোক যখনই ঋতুস্রাব দেখবে তখনই সে ঋতুস্রাব হিসেবে গণ্য হবে এবং যখনই তা বন্ধ হবে তখনই পবিত্র হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে পূর্বের অভ্যাসের চেয়ে কম-বেশী হওয়া এবং আগে-পরে হওয়া সমান কথা যার প্রমাণাদি পূর্বের অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। সার-সংক্ষেপ এই যে, রক্তস্রাব দেখা দেওয়া না দেওয়ার উপরই তার হুকুম-আহকাম নির্ভর করে। এটাই ইমাম শাফেয়ী রাহেমাহুল্লাহর অভিমত। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহেমাহুল্লাহও এ সমাধানকে গ্রহণ করেছেন। মুগনী গ্রন্থের লেখক উক্ত অভিমতের ঘোর সমর্থন করে বলেছেন যে, ‘উপরোল্লিখিত অবস্থায় যদি মেয়েলোকের নিয়মিত বা পূর্বের অভ্যাস ধর্তব্য হতো তাহলে নিশ্চয়ই নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের কাছে তা বর্ণনা করতেন, বিলম্ব করার কোন প্রশ্নই উঠে না। কেননা যেহেতু নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র স্ত্রীগণ সহ সকল নারী জাতির জন্য সর্ব সময়ে মাসআলাটির বিবরণ প্রয়োজনীয় ছিল, সেহেতু বর্ণনা করতে বিলম্ব করা জায়েয নয়। সুতরাং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে অসতর্ক ছিলেন না, বরং সতর্কই ছিলেন। তাই মুস্তাহাযাহ্‌ নারী ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে পূর্বের অভ্যাস ধর্তব্য বলে প্রিয় নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন আলোচনার সূত্রপাত হয়নি।’ [মুগনীঃ ১/৩৫৩]

তৃতীয় বিষয়ঃ হলুদ অথবা মাটি বর্ণের রক্ত প্রসঙ্গঃ

কোন মহিলা যদি তার লজ্জাস্থানে জখমের পানির মত হলুদ বর্ণের অথবা হলুদ এবং কাল রং এর মধ্যবর্তী বর্ণের রক্ত দেখে তাহলে সে রক্ত ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে অথবা ঋতুস্রাবের পর পরই পবিত্র হওয়ার পূর্বেই প্রবাহিত হলে ঋতুস্রাব হিসেবে গণ্য হবে এবং এর উপর ঋতুস্রাবের বিধি-বিধান কার্যকরী হবে। পক্ষান্তরে যদি সে রক্ত পবিত্রতা অর্জনের পরে প্রবাহিত হয়ে থাকে তাহলে সেটা ঋতুস্রাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা উম্মে আতিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

’’كُنَّا لاَ نَعُدُّ الصُّفْرَةَ وَالْكُدْرَةَ بَعْدَ الطُّهْرِ شَيْئًا,,

অর্থঃ ((আমরা পবিত্রতা অর্জন করার পর হলুদ অথবা মাটিবর্ণের রক্তকে কিছুই মনে করতাম না।)) [হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ রাহেমাহুল্লাহ বিশুদ্ধ সনদ দ্বারা উল্লেখ করেছেন। এবং ইমাম বুখারীও বর্ণনা করেছেন তবে ‘পবিত্রতা অর্জন করার পর’ কথাটি তিনি উল্লেখ না করলেও শিরোনাম দাঁড় করিয়েছেন এভাবে {রক্তস্রাব বিহীন দিনগুলিতে হলুদ অথবা মাটিবর্ণের রক্ত প্রবাহিত হওয়ার অধ্যায়}।] বুখারী শরীফের শার্‌হ (ব্যাখ্যা) ফত্‌হুল বারীতে বলা হয়েছে যে, এই শিরোনাম দ্বারা ইমাম বুখারী আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার হাদীস

’’لاَ تَعْجَلْنَ حَتَّى تَرَيْنَ الْقَصَّةَ الْبَيْضَاءَ,,

অর্থাৎ ((সাদা পানি না দেখা পর্যন্ত তাড়াহুড়া করো না।)) এবং উম্মে আতিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহার উপরোল্লিখিত হাদীসের মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করতে চেয়েছেন যে, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার উদ্দেশ্য হচ্ছে ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে যদি হলুদ অথবা মাটিবর্ণের রক্ত দেখে তাহলে সেটা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে। এবং উম্মে আতিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহার হাদীসের অর্থ হচ্ছে যে, ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে পবিত্রতা অর্জন করার পর হলুদ অথবা মাটিবর্ণের কোন রক্ত দেখা দিলে তা ধর্তব্য নয়।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার যে হাদীসটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তার প্রকৃত বিষয়বস্তু এই যে, তখনকার মেয়েলোকেরা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার খিদমতে দারাজাহ্‌ (এমন জিনিষ যা দ্বারা মেয়েলোক তার লজ্জাস্থান আবৃত করে রাখে) পাঠাতেন, যেন তারা বুঝতে পারে যে, সেখানে ঋতুস্রাবের কোন চিহ্ন বাকী আছে কি না? সে দারাজাহতে হায়েযের নেকড়া বা তুলা ছিল এবং উক্ত নেকড়ায় হলুদ রং দেখে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেনঃ ((তোমরা সাদা পানি না দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।)) প্রকাশ থাকে যে, হাদীসে বর্ণিত ‘আল-কাস্‌সাতুল বাইযা’ বলা হয় সেই সাদা পানিকে যা হায়েয বন্ধ হওয়ার সময় মহিলার গর্ভাশয় থেকে বের হয়।

৪র্থ বিষয়ঃ হায়েয থেমে থেমে প্রবাহিত হওয়া যেমন একদিন প্রবাহিত হয় আর একদিন বন্ধ থাকে। এমতাবস্থায় দেখতে হবে এ ধরনের ব্যতিক্রম সব সময়ই হয় না মাঝে মধ্যে হয়। যদি সব সময়ই হয়ে থাকে তাহলে সেটাকে ইস্তেহাযাহ হিসেবে গণ্য করে তার বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। আর যদি সব সময় এমন না হয়, বরং মাঝে মধ্যে এ ধরনের ব্যতিক্রম দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে তাহলে যে সময়টুকুতে বা যে দিনটিতে ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে সেটাকে পবিত্রতার মধ্যে গণ্য করা হবে? না ঋতুস্রাবের অন্তর্ভুক্ত করা হবে? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিয়ী রাহেমাহুল্লাহর দুই অভিমতের বিশুদ্ধ অভিমত হচ্ছে যে, এ ক্ষেত্রে হায়েয বিহীন মধ্যবর্তী ঐ সময়টুকুও হায়েযের মধ্যেই গণ্য করা হবে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ এবং ‘আল-ফায়েক’ নামক গ্রন্থের লেখক উক্ত অভিমত গ্রহণ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রাহেমাহুল্লাহর অভিমতও তাই। কেননা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, সাদা পানি বের না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অথচ মধ্যবর্তী সেই সময়ে সাদা পানি দেখা যায়নি। তাছাড়া যদি হায়েয বিহীন মধ্যবর্তী সেই সময়টাকে পবিত্রতার মধ্যে গণ্য করা হয় তাহলে নিশ্চয়ই তার আগের এবং পরের সময়টাকে হায়েযের মধ্যে গণ্য করতে হবে অথচ এমন কথা কেউই বলেনি। আর যদি মধ্যবর্তী ঐ সময়টুকুকে পবিত্রতার হিসেবে মেনে নেওয়া হয় তাহলে তালাক প্রাপ্তা এবং বিধবা স্ত্রীদের ইদ্দতকাল ৫ দিনেই শেষ হয়ে যাবে। এমনিভাবে প্রতি দুই দিনে গোসল করা ইত্যাদি। ফলে নারী জাতির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে অথচ ইসলামী শরীয়তে - আলহামদু লিল্লাহ- কষ্টকর বলতে কোন কিছুই নেই।

হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে যে, বর্ণিত অবস্থায় রক্ত দেখা দিলে তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে এবং পরিচ্ছন্নতা দেখা দিলে তা পবিত্রতা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু রক্ত এবং পরিচ্ছন্নতার সমষ্টি যদি নিয়মিত হায়েযের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে তাহলে অতিক্রমকারী রক্ত ইস্তেহাযাহ হিসেবে গণ্য হবে।

মুগনী গ্রন্থের ১ম খন্ডের ৩৫৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে যে, ‘লক্ষ্য রাখতে হবে রক্ত যদি এক দিনের চেয়ে কম সময় বন্ধ থাকে তাহলে ঐ সময়টাকে পবিত্রতার মধ্যে গণ্য করা হবে না, ঐ হাদীসের উপর ভিত্তি করে যা নেফাসের অধ্যায়ে উল্লিখিত হয়েছে। যার সার-সংক্ষেপ হচ্ছে এই যে, এক দিনর চেয়ে কম সময়ের দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ করবে না। এবং এটাই সঠিক সমাধান। কেননা রক্ত একবার প্রবাহিত হবে, একবার বন্ধ হবে, তাহলে এক ঘন্টা পর পর পবিত্রতা অর্জনকারীনী মহিলার পক্ষে গোসল করা চরম কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। অথচ শরীয়তের হুকুম-আহকাম তথা বিধি-বিধানে কষ্টের কোন স্থান নেই। যেমন মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা আল-হাজ্জের ৭৮ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে,

﴿وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ﴾ (78) سورة الحـج

অর্থঃ “ধর্মে তোমাদের উপর কোন সংকীর্ণতা রাখা হয়নি।” [সূরা আল-হাজ্জঃ ৭৮] আল-মুগনী গ্রন্থের লেখক বলেনঃ সুতরাং এক দিনের কম সময় যদি রক্ত বন্ধ থাকে তাহলে তা পবিত্রতার অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে পবিত্রতার উপর কোন প্রমাণ থাকলে সেটা পৃথক কথা। যেমন একজন মেয়েলোকের নিয়মিত অভ্যাসের শেষ প্রান্তে এসে হায়েয বন্ধ হলো অথবা হায়েয বন্ধ হওয়ার পর মহিলা লজ্জাস্থানে ‘কাস্‌সায়ে বায়যা’ অর্থাৎ সাদা পানির রেখা দেখল তাহলে এমতাবস্থায় তা পবিত্রতার অন্তর্ভুক্ত হবে।’ আল-মুগনী গ্রন্থের এই অভিমত উপরোক্ত দুই সমাধানের মধ্যবর্তী এক উত্তম অভিমত। আল্লাহই সর্বজ্ঞানী।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

রক্তস্রাবের হুকুম-আহকাম

বিশটির বেশী রক্তস্রাবের হুকুম রয়েছে, তন্মধ্যে যেগুলো অধিক প্রয়োজনীয় সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।

(১) নামাযঃ

ঋতুবতী মহিলার জন্য ফরয হোক আর নফল হোক সকল প্রকার নামায পড়া নিষিদ্ধ। যদি পড়া হয় তাহলে সে নামায শুদ্ধ হবে না। এমনিভাবে ঋতুবতী মহিলার জন্য নামায ওয়াজিব নয়। কিন্তু পবিত্র হওয়ার পর অথবা ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পূর্বে কোন ওয়াক্তের পূর্ণ এক রাক‘আত পড়তে পারে এতটুকু সময় যদি পেয়ে যায় তাহলে উক্ত ওয়াক্তের নামায কাযা করা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে সে সময়টুকু ওয়াক্তের প্রথম দিক হোক অথবা শেষ দিক হোক, কোন পার্থক্য নেই।

ওয়াক্তের প্রথম দিকে এক রাক‘আত পরিমাণ সময় পাওয়ার দৃষ্টান্তঃ একজন নারী সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর এক রাক‘আত পড়তে পারে এতটুকু সময় পাওয়ার পর সেই যদি ঋতুবতী হয় তাহলে হায়েয বন্ধ হওয়ার পর মাগরিবের নামায কাযা করা তার উপর ওয়াজিব। কেননা মেয়েটি ঋতুবতী হওয়ার পূর্বে মাগরিবের ওয়াক্ত থেকে এক রাক‘আত সম পরিমাণ সময় পেয়েছে।

ওয়াক্তের শেষ দিকে এক রাক‘আতের সময় পাওয়ার দৃষ্টান্তঃ একজন মহিলা সূর্যোদয়ের পূর্বে ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়েছে এবং তখনও ফজরের এক রাক‘আত আদায় করতে পারে এতটুকু সময় বাকী রয়েছে তাহলে পবিত্র হওয়ার পর সেই ফজরের নামায কাযা করা তার উপর ওয়াজিব। কেননা ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর সে ফজরের ওয়াক্ত থেকে এক রাক‘আতের সম পরিমাণ সময় পেয়েছে। পক্ষান্তরে ঋতুবতী মহিলা যদি নামাযের ওয়াক্ত থেকে এতটুকু সময় না পায় যার মধ্যে এক রাক‘আত নামায পড়া যেতে পারে, যেমন প্রথম দৃষ্টান্তে সূর্যাস্তের পর যদি এক মিনিটের মধ্যেই মহিলা ঋতুবতী হয় অথবা ২য় দৃষ্টান্তে সূর্যোদয়ের পূর্বে মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই যদি মহিলা ঋতু থেকে পবিত্র হয়ে যায় তাহলে উক্ত মহিলার উপর সেই ওয়াক্তের কাযা নামায পড়া ওয়াজিব হবে না। কেননা নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

’’مَنْ أدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الصَّلاَةِ فَقَدْ أدْرَكَ الصَّلاَةَ,,

অর্থঃ ((যে ব্যক্তি নামাযের এক রাক‘আত পেয়েছে সে পুরো নামাযই পেয়েছে বলে মনে করতে হবে।)) [বুখারী ও মুসলিম]

এর মর্মার্থ হলো, যদি কোন ব্যক্তি নামাযের এক রাক‘আতের চেয়েও কম অংশ পায় তাহলে পুরো নামায পেয়েছে বলে মনে করা যাবে না।

কোন ঋতুবতী মহিলা যদি আসরের সময় থেকে এক রাক‘আতের সম পরিমাণ সময় পেয়ে যায় তাহলে তার উপর আসরের সাথে যোহরের নামাযেরও কি কাযা করা ওয়াজিব? এমনিভাবে এশার ওয়াক্ত থেকে এক রাক‘আত পড়তে পারে এতটুকু সময় কোন ঋতুবতী মহিলা যদি পেয়ে যায় তাহলে তার জন্য কি এশার নামাযের সাথে মাগরিবের নামাযেরও কাযা করা যরূরী? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক অভিমত হচ্ছে শুধুমাত্র যে ওয়াক্তের এক রাক‘আত পরিমাণ সময় পাওয়া যাবে সে ওয়াক্তেরই নামাযের কাযা ওয়াজিব। আর তা হচ্ছে শুধু আসর এবং এশা, কেননা নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ((যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের এক রাক‘আত নামায পেয়েছে সে আসরকে পেয়েছে।)) [বুখারী ও মুসলিম]

এখানে নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেননি যে, সে যোহর এবং আসর পেয়েছে। একথাও উল্লেখ করেননি যে, তার উপর যোহরের নামাযের কাযা ওয়াজিব। মূলকথা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া। এটা ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেকের রাহেমাহুমাল্লাহর মাযহাব। [শারহুল মুহায্‌যাবঃ ৩/৭০]

ঋতুবতী মহিলার যিকর করা, তাকবীর বলা, তাসবীহ পাঠ করা, আল্লাহর প্রশংসা করা, খাওয়া-দাওয়াসহ যে কোন কাজে বিসমিল্লাহ বলা, হাদীস পাঠ করা, দু‘আ করা, দু‘আয় আমীন বলা এবং কুরআন শরীফ শ্রবণ করা ইত্যাদি কোনটাই হারাম নয়। কেননা বুখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত আছে,

أنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَتَّكِئُ فِيْ حِجْرِ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا وَهِيَ حَائِضٌ فَيَقْرَأُ الْقُرْآنَ.

অর্থঃ ((নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার রক্তস্রাব চলাকালীন তার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতেন।))

বুখারী ও মুসলিম শরীফে উম্মে আতিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছি, ((স্বাধিন নারী, পর্দানশীন ও ঋতুবতী মহিলারা দুই ঈদের নামাযের জন্য ঈদগাহে যেতে পারবে এবং তার ধর্মীয় আলোচনা ও মু‘মিনগণের দু‘আয় উপস্থিত হতে পারবে। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাযের স্থান থেকে দূরে থাকবে।))

ঋতুবতী মহিলার স্বয়ং কুরআন করীম পাঠ করার হুকুমঃ

বেশীরভাগ ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, ঋতুবতী মহিলার স্বয়ং উচ্চারণ করে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা নাজায়েয এবং নিষিদ্ধ। তবে যদি শুধু চোখ দিয়ে দেখে অথবা মুখ দিয়ে উচ্চারণ ব্যতীত শুধু মনে মনে পড়ে তাহলে কোন অসুবিধা নেই। যেমন, কুরআন শরীফ চোখের সামনে আছে অথবা কুরআন মজীদের আয়াত সম্বলিত কোন বোর্ড সামনে আছে। এমতাবস্থায় ঋতুবতী নারী যদি আয়াতগুলির দিকে তাকায় এবং মনে মনে পড়ে তাহলে এটা জায়েয হওয়ার পিছনে কারো কোন দ্বিমত নেই বলে ইমাম নওয়াবী শারহুল মুহায্‌যাব ২য় খন্ডের ৩৭২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন।

ইমাম বুখারী, ইবনে জারীর তাবারী এবং ইবনুল মুনযির বলেছেন যে, এটা জায়েয। ফাতহুল বারী ১ম খন্ডের ৩০৮ পৃষ্ঠায় ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ীর (পুরাতন অভিমতের) উদ্ধৃতি দিয়ে এবং বুখারী শরীফে ইব্রাহীম নাখয়ীর উদ্ধৃতি পেশ করে বলা হয়েছে যে, ঋতুবতী নারীর কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করার মধ্যে কোন অসুবিধা নেই।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহেমাহুল্লাহ ফাতাওয়া গ্রন্থে (মাজমূআ ইবনে কাসেম ২৬তম খন্ডের ১৯১ পৃষ্ঠায়) বলেনঃ ‘ঋতুবতী নারীর জন্য কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা নিষিদ্ধ, এ ব্যাপারে কোনই প্রমাণ নেই। কেননা ((ঋতুবতী মেয়েলোক এবং অপবিত্র ব্যক্তি কুরআন শরীফ থেকে কিছুই পড়তে পারবে না।)) বলে যে হাদীসটি রয়েছে তা হাদীস বিশেষজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুর্বল। নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগেও নারীদের রক্তস্রাব আসতো। এখন যদি এই রক্তস্রাবের কারণে নামাযের মত কুরআন শরীফের তেলাওয়াতও মেয়েদের জন্য হারাম হয়ে থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের বৃহত্তর স্বার্থে তা বর্ণনা করতেন এবং তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণকে এ ব্যাপারে শিক্ষা দিতেন এবং কেউ না কেউ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ ব্যাপারে হাদীস বর্ণনা করতেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ঋতুবতী নারীর কুরআন তেলাওয়াত হারাম প্রসঙ্গে কেউই কোন কিছু বর্ণনা করেননি। সুতরাং কোন নিষেধাজ্ঞা নাই যেখানে সে ক্ষেত্রে হায়েয অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াতকে হারাম হিসেবে গণ্য করা জায়েয হবে না। আর যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে নারীদের অনেক হায়েয হওয়া সত্বেও ঋতুবতী মহিলাকে কুরআন তেলাওয়াত করতে নিষেধ করেননি। সেহেতু সাব্যস্ত হলো যে, আসলে তা হারাম নয়।’

এতক্ষণ পর্যন্ত ওলামায়ে কেরামের তর্ক-বিতর্ক সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর এখন এটাই বলা উচিত হবে যে, ঋতুবতী নারীর পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া উচ্চারণ করে কুরআন মজীদ তেলাওয়াত না করাই উত্তম। তবে বিশেষ প্রয়োজন হলে যেমন, শিক্ষিকা নারীকে ছাত্রীদেরকে শিখানোর উদ্দেশ্যে মুখে উচ্চারণ করে কুরআন শরীফ পড়তেই হবে। এমনিভাবে পরীক্ষার্থীনী পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে হায়েযের অবস্থায়ও কুরআন শরীফ পড়তে পারবে।

(২) রোযাঃ

ঋতুবতী নারীর পক্ষে ফরয-নফল সর্ব প্রকার রোযা রাখা হারাম এবং রোযা রাখা তার জন্য জায়েয হবে না। কিন্তু ফরয রোযার কাযা তার উপর ওয়াজিব। কেননা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ

’’كَانَ يُصِيْبُنَا ذَلِكَ, تَعْنِيْ الْحَيْضَ فَنُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ وَلاَ نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلاَةِ,,

অর্থঃ ((আমাদের যখন রক্তস্রাব হতো তখন আমাদেরকে শুধু রোযার কাযা করার আদেশ দেয়া হতো। কিন্তু নামাযের কাযা করার আদেশ দেওয়া হতো না।)) [বুখারী ও মুসলিম] রোযার অবস্থায় যদি রক্তস্রাব আসে তাহলে রোযা নষ্ট হয়ে যায়। যদিও রক্তস্রাব সূর্যাস্তের সামান্য পূর্বে এসে থাকে। তবে ঐ রোযাটি ফরয হয়ে থাকলে তার কাযা ওয়াজিব। কিন্তু রোযাদার মহিলা যদি রোযার অবস্থায় সূর্যাস্তের পূর্বে লজ্জাস্থানের বেদনা অনুভব করে এবং প্রকৃত পক্ষে রক্তস্রাব সূর্যাস্তের পরেই আরম্ভ হয়ে থাকে তাহলে উক্ত নারীর রোযা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং বিশুদ্ধ অভিমত অনুসারে রোযা নষ্ট হবে না। কারণ পেটের অভ্যন্তরে রক্তের কোন হুকুম নেই। এর প্রমাণ, পুরুষের মত স্বপ্নদোষ হয় এমন একজন মহিলা সম্পর্কে যখন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলো যে, তার উপর কি গোসল করা ওয়াজিব? উত্তরে নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ((হ্যাঁ, যদি সে বীর্য দেখে থাকে।)) উক্ত হাদীসে গোসল ওয়াজিব হবে কি না এ হুকুমটা নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বীর্য না দেখার সঙ্গে সম্পর্কিত করে রেখেছেন। এমনিভাবে বের না হওয়া পর্যন্ত বা দেখা না দেওয়া পর্যন্ত হায়েযেরও বিধি-বিধান কার্যকরী হবে না। বরং কার্যকরী তখনই হবে যখন রক্তস্রাব দেখা দিবে।

হায়েযের অবস্থায় ফজরের সময় শুরু হলে ঐ দিনের রোযা রাখা জায়েয নয়। যদিও ফজরের সামান্য সময় পরে পবিত্র হয়ে থাকে। আর যদি ফজরের একটু আগে রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে যায় এবং বন্ধ হওয়ার পর যদি রোযা রাখে তাহলে তা জায়েয আছে। এমতাবস্থায় গোসল ফজরের পরে করলেও কোন দোষ নেই। যেমন বীর্যস্খলন হেতু শরীর অপবিত্র হওয়ার পর কোন ব্যক্তি যদি অপবিত্রাবস্থায় রোযার নিয়্যত করে এবং গোসল ফজরের পরে করে তাতে কোন দোষ নেই। তার রোযা শুদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক বর্ণিত স্পষ্ট হাদীস রয়েছেঃ

’’كَانَ النَّبِيُّ  يُصْبِحُ جُنُبًا مِنْ جِمَاعٍ غَيْرِ احْتِلاَمٍ ثُمَّ يَصُوْمُ فِيْ رَمَضَانَ,,

অর্থঃ ((নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নদোষ ব্যতীত স্ত্রী সহবাসের কারণে অপবিত্র অবস্থায় ভোরে উঠে রমাযানের রোযা রাখতেন।)) [বুখারী ও মুসলিম]

(৩) কা‘বা শরীফের তওয়াফঃ

ঋতুবতী নারীর জন্য কা‘বা শরীফের ফরয ও নফল তওয়াফ করা হারাম। যদি করা হয় তাহলে তা শুদ্ধ হবে না। এর প্রমাণ হচ্ছে, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার রক্তস্রাব আরম্ভ হওয়ার পর রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছিলেনঃ

’’افْعَلِيْ مَا يَفْعَلُ الْحَاجُّ غَيْرَ أنْ لاَّ تَطُوْفِيْ بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِيْ,,

অর্থঃ ((পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তুমি কা‘বা শরীফের তওয়াফ ছাড়া হজ্জের অন্যান্য কাজগুলো করে যাও।)) এ হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হায়েয চলাকালীন অবস্থায় আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে তওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন। বুঝা গেল, রক্তস্রাবের অবস্থায় কা‘বা শরীফের তওয়াফ করা হারাম। তবে হজ্জ ও উমরার অন্যান্য কাজ যেমন সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়ানো, আরাফার ময়দানে অবস্থান করা, মুযদালিফা ও মিনায় রাত্রি যাপন করা এবং জামরায় পাথর নিক্ষেপ করা ইত্যাদি ঋতুবতী নারীর জন্য হারাম নয়। এ থেকে আরো পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যদি কোন মহিলা পবিত্রাবস্থায় তওয়াফ করে এবং তওয়াফ শেষ হওয়া মাত্রই হায়েয আসলো অথবা সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝে দৌড়ানোর সময় হায়েয দেখা দিল তাহলে তাতে কোন অসুবিধা নেই।

(৪) ঋতুবতী নারীর জন্য বিদায়ী তওয়াফ জরুরী নয়ঃ

হজ্জ ও উমরার করণীয় কাজগুলো শেষ করে নিজের দেশের দিকে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে যদি কোন মহিলার রক্তস্রাব আরম্ভ হয়ে যায় এবং রওয়ানা হওয়া পর্যন্ত তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে বিদায়ী তওয়াফ করা থেকে উক্ত মহিলা মুক্তি পেয়ে যাবে (অর্থাৎ বিদায়ী তওয়াফ আর করা লাগবে না) কেননা এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা-এর হাদীস রয়েছে। তিনি বলেনঃ

’’أُمِرَ النَّاسُ أنْ يَكُوْنَ آخِرَ عَهْدِهِمْ بِالْبَيْتِ, إلاَّ أنَّهُ خُفِّفَ عَنِ الْمَرْأةِ الْحَائِضِ,,

অর্থঃ ((সকলকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাদের শেষ কাজ যেন কা‘বা শরীফের তওয়াফ দিয়েই হয়। কিন্তু ঋতুবতী নারীর জন্য এই আদেশ তুলে নেওয়া হয়েছে।)) অর্থাৎ তাদের সেই বিদায়ী তওয়াফ করা লাগবে না। হাদীসখানা সম্পর্কে ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম একমত।

প্রকাশ থাকে যে, ঋতুবতী নারীর জন্য বিদায়ের প্রাক্কালে মসজিদে হারামের দরজার দিকে গিয়ে মুনাজাত বা প্রার্থনা করা উচিত নয়। কেননা নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ ব্যাপারে কোন কিছু বর্ণিত হয়নি। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়ার উপরই সমস্ত ইবাদতের মূল ভিত্তি। শুধু তাই নয় বরং নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীস এই হুকুমের বিরোধিতা করে। যেমনটি সাফিইয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহার ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত। সাফিইয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহার তাওয়াফে এফাযার পর যখন ঋতুস্রাব দেখা দিল তখন প্রিয় নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেনঃ ((এখন তাহলে মদীনার দিকে বের হয়ে পড়।)) এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের দরজার দিকে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাঁকে আদেশ দেননি। যদি বিষয়টি শরীয়ত সম্মত হতো তাহলে নিশ্চয়ই নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বর্ণনা করতেন। তবে হজ্জ ও উমরার তওয়াফ থেকে ঋতুবতী নারী অব্যাহতি পাবে না। বরং পবিত্রতা অর্জন করার পর তাকে তওয়াফ করতেই হবে।

(৫) মসজিদে ঋতুবতী নারীর অবস্থানঃ

ঋতুবতী নারীর মসজিদে এমনকি ঈদগাহে নামাযের স্থানে অবস্থান করা হারাম। এ প্রসঙ্গে উম্মে আতিইয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসটিকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা যায়। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ

’’لِيَخْرُجِ الْعَوَاتِقُ وَذَوَاتُ الْخُدُوْرِ وَالْحُيَّضُ,, وفِيه: ’’يَعْتَزِلُ الْحُيَّضُ الْمُصَلَّى,,

অর্থঃ ((স্বাধীন, পর্দানশীন ও ঋতুবতী নারীরা ঈদের নামাযের জন্য ঈদগাহের দিকে যেতে পারবে।)) হাদীসে এও উল্লেখ আছেঃ ((ঋতুবতী নারীরা ঈদগাহ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখবে।))

(৬) স্ত্রী সহবাসঃ

রক্তস্রাব চলাকালীন অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা স্বামীর জন্য যেমন হারাম ঠিক তেমনি ঐ অবস্থায় স্বামীকে মিলনের সুযোগ দেওয়াও স্ত্রীর জন্য হারাম। এ হুকুমটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেনঃ

﴿﴿وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُواْ النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلاَ تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىَ يَطْهُرْنَ﴾ (222) سورة البقرة

অর্থঃ “তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তুমি বলে দাও যে, এটা কষ্টদায়ক বস্তু, কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাক এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকট যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পবিত্র না হয়।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২২২]

উক্ত আয়াতে (মাহীয) শব্দ দ্বারা হায়েযের সময় এবং লজ্জাস্থানকে বুঝানো হয়েছে। এভাবে হাদীস দ্বারাও বিষয়টি প্রমাণিত। প্রিয় নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ((স্ত্রী সহবাস ছাড়া বাকী সব কিছু করতে পার। [মুসলিম]

সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা! আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে, রক্তস্রাব অবস্থায় স্ত্রী সহবাস হারাম হওয়ার ব্যাপারে সমস্ত মুসলমান একমত। এখানে কারো কোন রকম দ্বিমত নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘য়ালা এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার জন্য এমন একটি অসৎ কাজে লিপ্ত হওয়া কখনও বৈধ হবে না, যার উপর কুরআন, সুন্নাত এবং মুসলমানদের সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর পরও যারা অবৈধ কাজে লিপ্ত হবে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণ কারীদের অন্তর্ভুক্ত এবং মু‘মিনদের মতাদর্শের পরিপন্থী পথের অনুসারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে। আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহায্‌যাব ২য় খন্ডের ৩৭ নং পৃষ্ঠায় ইমাম শাফেয়ী রাহেমাহুল্লাহর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ঋতুস্রাব চলাকালে যে ব্যক্তি স্ত্রী সঙ্গমে লিপ্ত হবে তার কবীরা গুনাহ হবে। আমাদের ওলামায়ে কেরাম যেমন ইমাম নববী রাহেমাহুল্লাহ বলেছেনঃ যে হায়েযের অবস্থায় স্ত্রী মিলনকে হালাল বা বৈধ মনে করবে সে কাফের হয়ে যাবে বলে হুকুম দেওয়া হয়েছে।

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘য়ালার যিনি পুরুষের জন্য ঋতুস্রাব চলাকালীন সঙ্গম ছাড়া স্ত্রীর সাথে এমন কিছু করাকে জায়েয করে দিয়েছেন যার মাধ্যমে স্বামী আপন কামোত্তেজনা নির্বাপিত করতে পারে। যেমন চুমা দেওয়া, একে অপরকে জড়িয়ে ধরা এবং লজ্জাস্থান ছাড়া অন্যান্য অঙ্গে মেলামেশা করা। তবে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশে মেলামেশা না করাই উত্তম। কাপড় বা পর্দার উপর দিয়ে করলে তাতে কোন অসুবিধা নেই। কেননা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ ((নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋতুস্রাব চলাকালীন আমাকে আদেশ করলে আমি ইযার পরতাম। তখন তিনি আমার সঙ্গে আলিঙ্গন করতেন।))

(৭) তালাকঃ

রক্তস্রাব অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়া স্বামীর জন্য হারাম। কেননা মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা তালাকের ১ম আয়াতে ইরশাদ করেনঃ

﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاء فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ﴾ (1) سورة الطلاق

অর্থঃ “হে নাবী! তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও তখন তাদেরকে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দাও।” [সূরা আত-তালাকঃ ১] অর্থাৎ এমন সময়ে তালাক দিবে যার মাধ্যমে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী যেন তালাকের পর থেকে নির্দিষ্ট ইদ্দত গণনা করতে পারে। আর এটা গর্ভবতী অবস্থায় অথবা সঙ্গমবিহীন পবিত্রতার সময়ে তালাক দেওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ রক্তস্রাবের অবস্থায় তালাক দেওয়া হলে স্ত্রী ইদ্দত গণনা করতে পারবে না বরং অসুবিধার সম্মুখীন হবে। কেননা যে হায়েযের অবস্থায় তাকে তালাক দেওয়া হয়েছে সেটা তো ইদ্দতের মধ্যে গণ্য হবে না। এমনিভাবে যদি পবিত্রতার অবস্থায় সঙ্গমের পর তালাক দেওয়া হয় তখনও ইদ্দতকাল নির্দিষ্ট করা সম্ভব হবে না। কেননা এই সঙ্গমের দ্বারা স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টা সম্পূর্ণ অজানা থাকবে। যদি গর্ভবতী না হয়ে থাকে তাহলে হায়েযের মাধ্যমে ইদ্দত গণনা করবে। এমতাবস্থায় যেহেতু ইদ্দতের প্রকার সম্পর্কে কোন কিছু নিশ্চিত জানা নেই সেহেতু বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তালাক দেওয়া হারাম।

উপরোক্ত আয়াত দ্বারা স্ত্রীকে ঋতুস্রাবের অবস্থায় তালাক দেওয়া হারাম প্রমাণিত হয়েছে এবং বুখারী ও মুসলিম সহ হাদীসের অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হাদীস দ্বারাও তাই প্রতীয়মান হয়। যেমন ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে। একদা তিনি স্বীয় স্ত্রীকে ঋতুস্রাবের অবস্থায় তালাক দিলে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সে বিষয়ে অবগত করেন। নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হয়ে বললেনঃ

’’مُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا ثُمَّ لِيُمْسِكْهَا حَتَّى تَطْهُرَ, ثُمَّ تَحِيْضَ, ثُمَّ تَطْهُرَ, ثُمَّ إنْ شَاءَ أمْسَكَ بَعْدُ, وَإنْ شَاءَ طَلَّقَ قَبْلَ أنْ يَمُسَّ, فَتِلْكَ الْعِدَّةُ الَّتِيْ أمَرَ اللهُ أنْ تُطَلَّقَ لَهَا النِّسَاءُ,,

অর্থঃ ((তুমি তোমার ছেলেকে আদেশ কর সে যেন তালাক প্রত্যাহার করে স্ত্রীকে নিয়ে আসে এবং পবিত্র হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখে। অতঃপর পুনরায় যখন ঋতুস্রাব দেখা দিবে এবং সেই ঋতুস্রাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে তখন নিজের নিকট রাখতে চাইলে রাখবে এবং তালাক দিতে চাইলে সঙ্গমের পূর্বেই তালাক দিয়ে দিবে। আর এটাই হচ্ছে সেই ইদ্দত যার প্রতি লক্ষ্য রেখে আল্লাহ পাক তালাক দেওয়ার জন্য নির্দেশ করেছেন।))

যদি কোন স্বামী ঋতুস্রাবের অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয় তাহলে সে গুনাহগার হবে এবং এর জন্য আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট তওবা করতঃ স্ত্রীকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে যাতে পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘য়ালা ও তাঁর রাসূলের হুকুম মোতাবেক তালাক দিতে পারে। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার পর যে হায়েযের অবস্থায় তালাক দেওয়া হয়েছে সে হায়েয থেকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত নিজের কাছেই রাখবে। অতঃপর পুনরায় যখন রক্তস্রাব দেখা দিবে এবং তা থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে তখন চাইলে তাকে স্ত্রী হিসেবে নিজের কাছে রেখেও দিতে পারবে আর তালাক দিতে চাইলে সঙ্গমের পূর্বেই তালাক দিতে হবে। প্রকাশ থাকে যে, রক্তস্রাব অবস্থায় তালাক দেওয়া হারাম কিন্তু তিনটি ক্ষেত্রে তা জায়েয আছে।

১মঃ বিবাহের পর স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে নির্জন স্থানে একাকীভাবে একত্রিত হওয়ার পূর্বেই অথবা বিবাহের পর সহবাসের পূর্বেই রক্তস্রাবের অবস্থায় তালাক দেয় তাহলে তা হারাম নয়। কেননা এমতাবস্থায় স্ত্রীর উপর কোন ইদ্দত পালন ওয়াজিব নয়। সুতরাং এই ক্ষেত্রে তালাক প্রদান করা আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থী হবে না।

২য়ঃ রক্তস্রাব যদি গর্ভবতী অবস্থায় দেখা দেয় তাহলে তালাক প্রদান করা হারাম নয়।

৩য়ঃ তালাক যদি কোন কিছুর বিনিময়ে দেওয়া হয় তাহলে হায়েযের অবস্থায়ও তালাক দেওয়া জায়েয। যেমন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া-বিবাদ এবং খারাপ সম্পর্ক বিরাজ করলে স্বামী বিনিময় নিয়ে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, যদিও স্ত্রী রক্তস্রাবের অবস্থায় থাকে। প্রমাণ স্বরূপ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস পেশ করা যায়ঃ

أَنَّ امْرَأَةَ ثَابِتِ بْنِ قَيْسٍ رضي الله عنه أَتَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! ثَابِتُ بْنُ قَيْسٍ مَا أَعْتِبُ عَلَيْهِ فِي خُلُقٍ وَلَا دِينٍ وَلَكِنْ أَكْرَهُ الْكُفْرَ فِي الْإِسْلَامِ, فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ’’أَتَرُدِّينَ عَلَيْهِ حَدِيقَتَهُ؟,, قَالَتْ: نَعَمْ, قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ’’اقْبَلْ الْحَدِيقَةَ وَطَلِّقْهَا تَطْلِيقَةً,,

অর্থঃ ((একদা সাবেত ইবনে কায়েস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর স্ত্রী রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাহূল! আমার স্বামীর চরিত্র এবং ধর্ম সম্পর্কে আমি কোন রকম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছি না। তবে ইসলামের মধ্যে কুফুরীকে আমি অপছন্দ করি। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ((তুমি কি তার বাগানটাকে ফিরিয়ে দেবে?)) উত্তরে মহিলা বললেনঃ জি হ্যাঁ। এরপর নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবেত ইবনে কায়েস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-কে বললেনঃ ((তুমি বাগানটি নিয়ে তাকে তালাাক দিয়ে দাও।)) [হাদীসটি ইমাম বুখারী রাহেমাহুল্লাহ তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন] স্ত্রী রক্তস্রাবের অবস্থায় আছে না পবিত্র অবস্থায় আছে? নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। সুতরাং বুঝা গেল যে, বিনিময় নিয়ে তালাক দেওয়া জায়েয আছে যদিও স্ত্রী হায়েযের অবস্থায় থাকে।

দ্বিতীয়তঃ এই তালাক তো অর্থের বিনিময়ে স্বামী থেকে স্ত্রীর বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটা পথ মাত্র। সুতরাং যে কোন সময়ে এবং যে কোন অবস্থাতে প্রয়োজন দেখা দিলে এ ধরনের তালাক দেওয়া জায়েয।

মুগনী গ্রন্থের ৭ম খন্ডে ৫২ পৃষ্ঠায় ‘খোলা’ অর্থাৎ ঋতুস্রাব স্ত্রীর পক্ষে অর্থ দিয়ে স্বামী থেকে তালাক নেওয়া জায়েয হওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এমন ক্ষতি থেকে স্ত্রীকে রক্ষা করার জন্যই হায়েয চলাকালে তালাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে যে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে তাকে ইদ্দতকাল দীর্ঘ হলে। আর অর্থ নিয়ে তালাক নেওয়ার বিধানিটিও ক্ষতির সম্মুখীন না হওয়ার উদ্দেশ্যেই শরীয়ত কর্তৃক প্রণীত হয়েছে। ক্ষতি বলতে যেমন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, মনোমালিন্য তথা খারাপ সম্পর্ক বিরাজ করা অথবা স্ত্রীর স্বামীকে অপছন্দ করা এবং ঘৃণা ও অনীহা প্রকাশ করা। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এ অবস্থার সৃষ্টি হলে মূলতঃ এটা স্ত্রীর জন্য ইদ্দতকাল দীর্ঘ হওয়ার চেয়ে আরো বড় ধরনের সমস্যা। সুতরাং সামান্য ক্ষতি হলেও বড় ধরনের ক্ষতির থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রক্তস্রাবের অবস্থায়ও বিনিময় দিয়ে তালাক নেওয়া জায়েয ও বৈধ। এবং এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থের বিনিময়ে তালাক গ্রহণকারী উক্ত মহিলার অবস্থা সম্পর্কে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করেননি।

হায়েয অবস্থায় মেয়েলোকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয। এতে কোন অসুবিধা নেই। কেননা প্রতিটি জিনিষের হালাল হওয়াটাই হচ্ছে প্রকৃত নিয়ম এবং শরীয়তের দিক দিয়ে এটা নিষিদ্ধ হওয়ার কোন প্রমাণও নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, হায়েযের অবস্থায় স্বামীকে স্ত্রীর নিকট যেতে দেওয়া যাবে কি না? উত্তরে বলতে হবে, যদি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে স্বামী সঙ্গম থেকে বিরত থাকবে তাহলে কোন অসুবিধা নেই। অন্যথায় সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার ভয় ও আশঙ্কা থাকলে স্বামীকে স্ত্রীর নিকট পাঠানো যাবে না বা যেতে দেওয়া হবে না।

(৮) হায়েযের মাধ্যমে তালাকের ইদ্দত গণনা করাঃ

কোন পুরুষ যদি স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করার পর অথবা নির্জন স্থানে একত্রিত হওয়ার পর তাকে তালাক দেয় তাহলে পূর্ণ তিন হায়েযের মাধ্যমে ইদ্দতকাল গণনা করা তালাক প্রাপ্তা নারীর উপর ওয়াজিব। তবে শর্ত হচ্ছে উক্ত স্ত্রীকে ঋতুবতী মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে এবং সন্তান সম্ভাবা হবে না। প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহ তা‘য়ালার ঘোষণাঃ

﴿َالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلاَثَةَ قُرُوَءٍ﴾ (228) سورة البقرة

অর্থঃ “তালাক প্রাপ্তা নারী তিন হায়েয পর্যন্ত নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২২৮]

আর যদি তালাক প্রাপ্তা নারী সন্তান সম্ভাবা হয়ে থাকে তাহলে তার ইদ্দতকাল হবে প্রসব পর্যন্ত। কেননা আল্লাহ তা‘য়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেনঃ

﴿وَأُوْلَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ﴾ (4) سورة الطلاق

অর্থঃ “গর্ভবতী নারীদের ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত।” [সূরা আত-তালাকঃ ৪]

আর যদি তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী ঋতুবতী নারীদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, যেমন কম বয়স্কা মেয়েলোক, যার রক্তস্রাব এখনো আরম্ভ হয়নি বা বয়স্কা নারী যার বয়োঃবৃদ্ধির কারণে হায়েয আসার সম্ভাবনা নেই অথবা অস্ত্রোপচার জনিত কারণে গর্ভাশয় নষ্ট হওয়ায় হায়েয আসছে না ইত্যাদি কারণে যে সকল মহিলার রক্তস্রাবের সম্ভাবনা নেই তাদের ইদ্দতকাল পূর্ণ তিন মাস। প্রমাণ হচ্ছে পবিত্র কুরআনের বাণীঃ

﴿وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ﴾ (4) سورة الطلاق

অর্থঃ “তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ঋতুবতী হওয়ার আশা নেই তাদেরকে নিয়ে সন্দেহ হলে (হায়েয দ্বারা ইদ্দত গণনা সম্ভব না হলে) তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস। এমনিভাবে যারা এখনো ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও অনুরূপ হবে।” [সূরা আত-তালাকঃ ৪]

ঋতুবতী নারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্বেও যে সমস্ত মহিলার নির্দিষ্ট কোন কারণে যেমন অসুস্থতা বা দুগ্ধ পান করানোর ফলে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত হায়েয আসে না তারা ইদ্দতের মধ্যেই পড়ে থাকবে। যদিও ইদ্দতকাল দীর্ঘ হয়ে যায়। অতঃপর যখন রক্তস্রাব আরম্ভ হবে তখন ইদ্দত গণনা শুরু করবে। আর যদি নির্দিষ্ট কারণটি শেষ হওয়ার পরেও রক্তস্রাব না আসে যেমন রোগ থেকে মুক্তি লাভ করেছে অথবা দুধ পান করানো শেষ হয়ে গিয়েছে অথচ হায়েয বন্ধই রয়েছে তাহলে কারণটি শেষ হওয়ার পর থেকে পূর্ণ এক বছর ইদ্দত পালন করবে এবং এটাই বিশুদ্ধ অভিমত, যা শরীয়তের বিধান অনুসারে কার্যকরী হয়ে থাকে। কেননা নির্দিষ্ট কারণ শেষ হওয়ার পরেও হায়েয না আসা বিনা কারণে হায়েয বন্ধ থাকার মতই। আর কোন নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া হায়েয বা রক্তস্রাব বন্ধ থাকলে পূর্ণ এক বছর ইদ্দত পালন করতে হয়। তন্মধ্যে ৯ মাস গর্ভের কারণে সতর্কতাবশতঃ, আর তিন মাস ইদ্দতের কারণে।

যদি বিবাহের পর স্পর্শ করার অথবা স্বামী-স্ত্রী কোন নির্জন স্থানে একাকীভাবে একত্রিত হওয়ার পূর্বেই তালাক দেওয়া হয় তাহলে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে আদৌ ইদ্দত পালন করতে হবে না, না হায়েযের মাধ্যমে না অন্য কোন পন্থায়। কারণ মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মু‘মিন বান্দাদেরকে সম্মোধন করে ইরশাদ করেনঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِن قَبْلِ أَن تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا﴾ (49) سورة الأحزاب

অর্থঃ “হে মু‘মিনরা! তোমরা মু‘মিনা নারীদেরকে বিয়ে করার পরে এবং স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিলে তোমাদের জন্যে তাদের পালনীয় কোন ইদ্দত নেই যা তোমরা গণনা করবে।” [সূরা আল-আহযাবঃ ৪৯]

(৯) হায়েযের মাধ্যমে গর্ভাশয় সন্তানমুক্ত সম্পর্কিত হুকুমঃ

গর্ভে ভ্রূণশূন্যতার সাথে শরীয়তের কয়েকটি হুকুম সম্পৃক্ত। তন্মধ্যে যদি গর্ভাবস্থায় স্বামী মারা যায় তখন ঐ গর্ভজাত সন্তান তার উত্তরসূরী হবে। উক্ত মহিলাকে যদি পুনঃ বিবাহ দেওয়া হয় স্বামী মহিলাটির ঋতুস্রাব অথবা গর্ভে সন্তান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত তার সাথে সহবাস করবে না। এখন যদি সে অন্তঃসত্ত্বা হয় তাহলে মৃত ব্যক্তির সাথে সেই সন্তানটির ওয়ারিশের হুকুম দেওয়া হবে। কেননা তার মৃত্যুর সময় সন্তানের অস্তিত্ব গর্ভাশয়ে ছিল। আর যদি মহিলাটির ঋতুস্রাব হয় তখন পূর্ব স্বামীর ওয়ারিশ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কেননা ঋতুস্রাব দ্বারা গর্ভাশয় ভ্রূণমুক্ত থাকাই সর্ব সম্মত।

(১০) গোসল করা ওয়াজিব প্রসঙ্গঃ

ঋতুবতী মহিলার যখন ঋতুস্রাব বন্ধ হবে তখন গোসলের মাধ্যমে পুরো শরীরের পবিত্রতা অর্জন করা ওয়াজিব। এ প্রসঙ্গে নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা বিনতে হুবাইশকে বলেছিলেনঃ

’’فَإذَا أقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلاَةَ, وَإذَا أدْبَرَتْ فَاغْتَسِلِيْ وَصَلِّيْ,,

অর্থঃ ((যখন তোমার রক্তস্রাব আরম্ভ হয় তখন তুমি নামায ছেড়ে দাও। আর যখন বন্ধ হয় তখন গোসল করে নামায পড়।)) [বুখারী]

গোসলের ওয়াজিবের সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে পুরো দেহটাকে চুলের গোড়া পর্যন্ত গোসলের মধ্যে শামিল করে নেওয়া। আর উত্তম হচ্ছে হাদীস শরীফে বর্ণিত পন্থায় গোসল করা। একদা আসমা বিনতে শাকাল নামের একজন মহিলা নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঋতুবতী মহিলার গোসল সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি ইরশাদ করেনঃ

’’تَأْخُذُ إحْدَاكُنَّ مَاءَهَا وَسِدْرَتَهَا فَتَطَهَّرُ فَتُحْسِنَ الطُّهُوْرَ, ثُمَّ تَصُبُّ عَلَى رَأسِهَا فَتَدْلُكَهُ دَلْكًا شَدِيْدًا, حَتَّى تَبْلُغَ شُئُوْنَ رَأسِهَا, ثُمَّ تَصُبُّ عَلَيْهَا الْمَاءَ, ثُمَّ تَأخُذُ فِرْصَةً مُمَسَّكَةً أيْ قِطْعَةَ قُمَاشٍ فِيْهَا مِسْكٌ فَتَطَهَّرُ بِهَا,, فَقَالَتْ أسْمَاءُ: كَيْفَ تَطَهَّرُ بِهَا؟ فَقَالَ: ’’سُبْحَانَ اللهِ! تَطَهَّرِيْنَ بِهَا,, فَقَالَتْ عَائِشَةُ: كَأنَّهَا تُخْفِيْ ذَلِكَ, تَتَّبِعيْنَ أثَرَ الدَّمِ.

অর্থঃ ((তোমরা কুলপাতা মিশ্রিত পানি দিয়ে উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করবে। অতঃপর মাথায় পানি ঢালবে এবং উত্তমরূপে ঘষে ঘষে চুলের গোড়ায় গোড়ায় পানি পৌঁছাবে এবং সারা শরীরে পানি ঢেলে দিবে। পরে কস্তুরী মাখানো এক টুকরা কাপড় দ্বারা পবিত্রতা হাসিল করবে।)) একথা শুনে আসমা বললেনঃ কস্তুরী মাখানো বস্ত্র দ্বারা কিরূপে পবিত্রতা হাসিল করবো? তখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ((সুবহানাল্লাহ! তুমি তা দিয়েই পবিত্রতা হাসিল করবে।)) আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা চুপিসারে তাকে বললেনঃ রক্ত চিহ্নিত স্থানে উক্ত (কস্তুরী মিশ্রিত) কাপড় দ্বারা ঘষে মুছে ফেল। [বুখারী]

গোসলের সময় মেয়েলোকের মাথায় চুল বাঁধা থাকলে তা খোলা যরূরী নয়। তবে যদি এমন শক্তভাবে বাঁধা থাকে যে, চুলের গোড়ায় পানি না পৌঁছার সম্ভাবনা ও আশঙ্কা থাকে তাহলে তখন খোলা ওয়াজিব। সহীহ মুসলিম শরীফে উম্মে সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত এক হাদীস দ্বারা তাই প্রমাণিত হয়। একদা তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করেছিলেন যে আমি আমার মাথার চুল বেঁধে রাখি। এখন পবিত্রতার জন্য গোসলের সময় (অন্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী) অপবিত্রতা ও হায়েযের গোসলের সময় আমি কি তা খুলে দিব? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ

’’لاَ, إنَّمَا يَكْفِيْكِ أنْ تَحْثِي عَلَى رَأسِكِ ثَلاَثَ حَثَيَاتٍ ثُمَّ تُفِيْضِيْنَ عَلَيْكِ الْمَاءَ فَتَطْهُرِينَ,,

অর্থঃ ((না, বরং তোমার জন্য এ-ই যথেষ্টে যে, তুমি মাথার ওপর তিন আঁজলা পানি ঢেলে দিবে। অতঃপর সারা শরীরে পানি ঢেলে পবিত্রতা অর্জন করবে।))

নামাযের ওয়াক্ত চলাকালে ঋতুস্রাব বন্ধ হলে ঋতুবতী মহিলার উপর তাড়াতাড়ি গোসল করা ওয়াজিব, যাতে উক্ত নামাযকে তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করতে পারে। তবে ঋতুবতী মহিলা যদি সফরের অবস্থায় থাকে এবং সঙ্গে পানি না থাকে অথবা সাথে পানি আছে কিন্তু ব্যবহার করলে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে অথবা অসুস্থতা জনিত কারণে ব্যবহার করলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে তাহলে এমতাবস্থায় গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করে নিবে।

কিছু কিছু মহিলা এমনও আছেন যারা নামাযের ওয়াক্তের মধ্যেই রক্তস্রাব বন্ধ হওয়া সত্বেও গোসল করতে বিলম্ব করেন এবং এই বলে কারণ দেখিয়ে থাকেন যে এই সময়ে পূর্ণাঙ্গরূপে পবিত্র হওয়া সম্ভব নয়। মূলতঃ এটা কোন দলীল বা ওজর হতে পারে না। কেননা ওয়াজিবের সর্ব নিম্ন স্তর অনুসারে কোন রকম গোসল সেরে ওয়াক্তের মধ্যে নামায আদায় করা সম্পূর্ণ সম্ভব, অসম্ভবের কিছু নেই। অতঃপর দীর্ঘ সময় পাওয়ার পর পূর্ণাঙ্গরূপে পবিত্রতা অর্জন করে নিতে পারে।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

ইস্তেহাযাহ ও উহার আহকাম

ইস্তেহাযার সংজ্ঞাঃ কোন মেয়েলোকের যদি অনবরত এমনভাবে রক্ত প্রবাহিত হয় যে কোন সময়েই বন্ধ হয় না, অথবা খুব অল্প সময় যেমন মাসে এক দিন বা দুই দিন পর্যন্ত বন্ধ থাকে তাহলে উক্ত প্রবাহমান রক্তকে ইস্তেহাযাহ বলা হয়। এক সাথে এমনভাবে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার দৃষ্টান্ত সহীহ বুখারী শরীফে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেনঃ

قَالَتْ فَاطِمَةُ بِنْتِ أبِيْ حُبَيْشٍ لِرَسُوْلِ اللهِ : يَا رَسُوْلَ اللهِ! إنِّيْ لاَ أطْهُرُ. وَفِيْ رِوَايَةٍ: أسْتَحَاضُ فَلاَ أطْهُرُ.

অর্থঃ একদা আবু হুবাইশের কন্যা ফাতেমা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি পবিত্র হতে পারছি না। অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছেঃ আমার অবিরাম রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে যার ফলে আমি পবিত্রতা অর্জন করতে পারছি না।

খুব অল্প সময়ের জন্য বন্ধ হওয়ার প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত হামনাহ বিনতে জাহ্‌শ রাযিয়াল্লাহু আনহার হাদীসে রয়েছে। তিনি এক সময় নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে আরয করেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনেক দীর্ঘ সময় ধরে আমার রক্তস্রাব হয়। এই হাদীসখানা ইমাম আহমদ, ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম তিরমিযী রাহেমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন এবং বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইমাম আহমদ রাহেমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং ইমাম বুখারী রাহেমাহুল্লাহ হাসান হিসেবে মত পোষণ করেছেন বলে বর্ণিত আছে।

মুস্তাহাযাহ (অস্বাভাবিক রক্তস্রাবওয়ালী) মেয়েলোকের বিভিন্ন অবস্থা

অনবরত রক্ত প্রবাহিত হয় এমন মেয়েলোকের অবস্থা তিন প্রকারঃ

(১ম) ইস্তেহাযাহ অর্থাৎ অনবরত রক্ত প্রবাহ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে মেয়েলোকটির প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঋতুস্রাবের অভ্যাস রয়েছে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে পূর্ব নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্রবাহমান রক্তকে হায়েয হিসেবেই গণ্য করা হবে এবং এর উপর হায়েযের বিধি-বিধানই কার্যকরী হবে। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া বাকীটাকে ইস্তেহাযাহ গণ্য করে তার নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। যেমন, একজন মেয়েলোকের প্রতি মাসের ১ম দিকে ছয় দিন করে রক্তস্রাব হয়ে থাকে। এখন হঠাৎ করে দেখা গেল যে, ঐ মেয়েলোকটির অবিরাম রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তাহলে তখন প্রতি মাসের প্রথম ছয় দিন প্রবাহিত রক্তকে হায়েয হিসেবে গণ্য করে বাকীটাকে ইস্তেহাযাহ হিসেবে ধরে নিতে হবে। কেননা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার হাদীস দ্বারা তাই প্রমাণিত হয়। হাদীসটি হচ্ছেঃ

أنَّ فَاطِمَةَ بِنْتِ أبِيْ حُبَيْشٍ قَالَتْ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! إنِّيْ أسْتَحَاضُ فَلاَ أطْهُرُ أفَأدَعُ الصَّلاَةَ؟ قَالَ: ’’لاَ, إنَّ ذَلِكَ عِرْقٌ, وَلَكِنْ دَعِيْ الصَّلاَةَ قَدْرَ الْأيَّامِ الَّتِيْ كُنْتِ تَحِيْضِيْنَ فِيْهَا ثُمَّ اغْتَسِلِيْ وَصَلِّيْ,,

অর্থঃ ফাতেমা বিনতে আবী হুবাইশ রাযিয়াল্লাহু আনহা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার অবিরাম রক্তস্রাব হচ্ছে যার কারণে আমি পবিত্র হতে পারছি না। এমতাবস্থায় আমি কি নামায ছেড়ে দেব? উত্তরে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ((না, ইহা রগ থেকে বের হয়ে আসা রক্ত। তবে হ্যাঁ, সাধারণতঃ অন্যান্য মাসে যতদিন তুমি ঋতুবতী থাক ততদিন নামায থেকে বিরত থাক তারপর গোসল করে নামায আদায় কর।)) [বুখারী] এবং সহীহ মুসলিম শরীফে আছেঃ

أنَّ النَّبِيَّ  قَالَ لِأمِّ حَبِيْبَةَ بِنْتِ : ’’امْكُثِيْ قَدرَ مَا كَانَتْ تَحْبِسُكِ حَيْضَتُكِ ثُمَّ اغْتَسِلِيْ وَصَلِّيْ,,

অর্থঃ নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হাবীবা বিনতে জাহ্‌শ রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছিলেনঃ ((তুমি ঐ পরিমাণ সময় অপেক্ষা কর যে পরিমাণ সময় সাধারণতঃ তুমি ঋতুস্রাবে আক্রান্ত থাক। অতঃপর গোসল করে নামায আদায় কর।)) এ থেকে বুঝা গেল যে, মুস্তাহাযাহ অর্থাৎ এক সাথে অবিরাম রক্তস্রাব হয় এমন নারী ঐ পরিমাণ সময় অপেক্ষা করবে এবং নামায থেকে বিরত থাকবে যে পরিমাণ সময় সে সাধারণতঃ ঋতুস্রাবে আক্রান্ত থাকে। তারপর গোসল করে নামায আদায় করতে থাকবে এবং রক্তের কারণে নামায আদায়ে মনে কোন রকম দ্বিধা রাখবে না।

(২য়) ইস্তেহাযাহ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে মেয়েলোকটির ঋতুস্রাবের কোন নির্দিষ্ট সময়-সীমা নেই। অর্থাৎ জীবনে এটাই তার প্রথম রক্তস্রাব। এমতাবস্থায় যতক্ষণ পর্যন্ত প্রবাহিত রক্তে কালো বর্ণ অথবা গাঢ়তা অথবা কোন গন্ধ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত হায়েযের বিধি-বিধান কার্যকরী হবে। অন্যথায় ইস্তেহাযাহ হিসেবে গণ্য করে তার নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। যেমন, একজন মেয়েলোক জীবনে প্রথম লজ্জাস্থানে রক্ত দেখলো এবং সে রক্তকে দশদিন পর্যন্ত কালো দেখেছে এবং মাসের অবশিষ্ট দিনগুলিতে লাল দেখেছে। অথবা দশদিন পর্যন্ত তা গাঢ় ও ঘন ছিল এবং মাসের অবশিষ্ট দিনগুলিতে পাতলা ছিল। অথবা দশদিন পর্যন্ত তার মধ্যে হায়েযের গন্ধ ছিল এবং তার পরে কোন গন্ধই থাকে নাই, তাহলে এমতাবস্থায় প্রথম দৃষ্টান্তে প্রবাহমান রক্তে কালো বর্ণ থাকা পর্যন্ত, দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে গাঢ়তা থাকা পর্যন্ত এবং তৃতীয় দৃষ্টান্তে হায়েযের গন্ধ থাকা পর্যন্ত তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে এবং এর পর তা ইস্তেহাযাহ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ হাদীসে বর্ণিত আছে নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা বিনতে আবী হুবাইশ রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছেনঃ

’’إذَا كَانَ دَمُ الْحَيْضَةِ فَإنَّهُ أسْوَدُ يُعْرَفُ, فَإذَا كَانَ ذَلِكَ فَأمْسِكِيْ عَنِ الصَّلاَةِ, فَإذَا كَانَ الْآخَرُ فَتَوَضَّئِيْ وَصَلِّيْ فَإنَّمَا هُوَ عِرْقٌ,,

অর্থঃ ((যখন হায়েযের রক্ত দেখা দিবে তখন তা কালো বর্ণের হবে। সুতরাং কালো বর্ণের দেখা দিলে নামায থেকে বিরত থাক। আর কালো ছাড়া অন্য কোন বর্ণ দেখা দিলে ওযু করে নামায আদায় কর। কেননা তা রগ থেকে বের হয়ে আসা রক্ত। [উক্ত হাদীসখানাকে ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম নাসায়ী বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে হিব্বান ও হাকেম বিশুদ্ধ বলেছেন।] প্রকাশ থাকে যে, উক্ত হাদীসের সনদ ও মূল উদ্ধৃতিতে কিছু অসুবিধা থাকলেও ওলামায়ে কেরাম এর উপর আমল করেছেন। এবং অধিকাংশ নারী জাতির নিয়মিত অভ্যাসের দিকে লক্ষ্য না করে হাদীসখানার উপর আমল করাই উত্তম।

(৩য়) মুস্তাহাযাহ নারীর পূর্বে ঋতুস্রাবের না কোন নির্দিষ্ট সময়-সীমা আছে না ইস্তেহাযাহ ও হায়েযের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী কোন চিহ্ন আছে। অর্থাৎ জীবনে এটাই তার প্রথম রক্তস্রাব এবং রক্ত একাধারে অবিরাম বের হচ্ছে। প্রবাহমান রক্ত পুরোটাই এক ধরনের অথবা বিভিন্ন রকমের যেটাকে হায়েয হিসেবে গণ্য করা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় অধিকাংশ মেয়েলোকের ঋতুস্রাবের সময়-সীমা অনুযায়ী আমল করতে হবে। অর্থাৎ অবিরাম রক্তস্রাব আরম্ভ হওয়ার পর থেকে প্রতি মাসে ছয় অথবা সাত দিন হায়েযের নিয়ম-নীতি কার্যকরী হবে। তারপর ইস্তেহাযার হুকুম পালন করতে হবে। যেমন, একজন মেয়ের মাসের ৫ তারিখে রক্ত প্রবাহ আরম্ভ হয়েছে এবং জীবনে এটাই তার প্রথম। রক্ত বিরতহীনভাবে বের হচ্ছে এতে হায়েযের কোন চিহ্ন বা প্রমাণ নেই। রং ও গন্ধ ইত্যাদি দিয়ে পার্থক্য করারও কোন অবকাশ নেই। এমতাবস্থায় প্রতি মাসের ৫ তারিখ থেকে ছয় অথবা সাত দিন হায়েযের হুকুম পালন করতে হবে। কারণ হামনাহ বিনতে জাহ্‌শ রাযিয়াল্লাহু আনহা এ ব্যাপারে প্রিয় নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরণাপন্ন হয়ে বলেছিলেনঃ

يَا رَسُوْلَ اللهِ! إنِّيْ أسْتَحَاضُ حَيْضَةً كَبِيْرَةً شَدِيْدَةً فَمَا تَرَى فِيْهَا؟ قَدْ مَنَعَتْنِيْ الصَّلاَةَ وَالصِّيَامَ, فَقَالَ: أنْعَتُ لَكِ (أصِفُ لَكِ اسْتِعْمَالَ) الْكُرْسُفَ (وَهُوَ الْقُطْن) تَضَعِيْنَهُ عَلَى الْفَرْجِ, فَإنَّهُ يُذْهِبُ الدَّمَ, قَالَتْ: هُوَ أكْثَرُ مِنْ ذَلِكَ. وَفِيْهِ قَالَ: ’’إنَّمَا هَذَا رَكْضَةٌ مِنْ رَكَضَاتِ الشَّيْطَانِ فَتَحِيْضِيْ سِتَّةَ أيَّامٍ أوْ سَبْعَةً فِيْ عِلْمِ اللهِ تَعَالَى, ثُمَّ اغْتَسِلِيْ حَتَّى إذَا رَأَيْتِ أنَّكِ قَدْ طَهُرْتِ وَاسْتَيْقَنْتِ فَصَلِّيْ أرْبَعًا وَعِشْرِيْنَ أوْ ثَلاَثًا وَعِشْرِيْنَ لَيْلَةً وَأيَّامَهَا وَصُوْمِيْ,,

অর্থঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার তো অনেক দীর্ঘ সময় ধরে পরিমাণে খুব বেশী রক্তস্রাব হচ্ছে। এ অবস্থায় আপনার মতামত কি? এটা তো আমার নামায ও রোযা আদায়ের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ((আমি তোমাকে যোনীতে তুলা ব্যবহার করার পর পরামর্শ দিচ্ছি, তুলা রক্তটাকে টেনে নেবে।)) মহিলাটি পাল্টা প্রশ্ন করলেন যে আমার প্রবাহিত রক্ত তার চেয়েও বেশী। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেনঃ ((এটা শয়তানের একটা ধাক্কা মাত্র। আপাততঃ তুমি ছয় অথবা সাত দিন হায়েযের হুকুম পালন করে চল। তারপর ভাল করে গোসল কর। যখন তুমি মনে করবে যে, তুমি পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন করেছ তখন ২৪ দিন অথবা ২৩ দিন নামায ও রোযা আদায় করতে থাক।)) [হাদীসখানা ইমাম আহমদ, ইমাম আবু দাউদ সহীহ বলেছেন এবং ইমাম বুখারী থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি হাসান বলেছেন।]

স্মরণ রাখতে হবে যে, উল্লিখিত হাদীসে ছয় অথবা সাত দিনের কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, এটাকে ইচ্ছামত গ্রহণ করবে। মূলতঃ একটা সমাধান দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ইজতেহাদ করে এরকম বলা হয়েছে। সুতরাং রক্তস্রাবে আক্রান্ত নারীর অবস্থা ও বয়স ইত্যাদির সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য ও সংগতি রেখে হায়েযের সময় নির্দিষ্ট করবে তা যদি ছয় দিন হয় তাহলে ছয় দিন এবং সাত দিন হলে সাতই ধার্য্য করবে।

মুস্তাহাযার সদৃশ নারীর অবস্থার বিবরণঃ

জরায়ূতে অথবা জরায়ূর আশে-পাশে অপারেশন করার কারণে যদি লজ্জাস্থান দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয় তাহলে তখন দুই অবস্থায় দুই প্রকার হুকুম পালন করতে হবে।

(১) এ ব্যাপারে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, অস্ত্রোপচারের পর আর কোন ঋতুস্রাবের সম্ভাবনা নেই, অথবা অপারেশনের মাধ্যমে এমনভাবে গর্ভাশয়ের পথকে বন্ধ করা হয়েছে যে, আর কোন প্রকার রক্ত সেখান থেকে বের হবে না, তাহলে এই মেয়েলোকটির ক্ষেত্রে মুস্তাহাযার হুকুম প্রযোজ্য হবে না। এবং তার হুকুম ঐ মহিলার হুকুমের মতো হবে যে ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার পর পুনরায় লজ্জাস্থানে হলুদ অথবা মাটি বর্ণের রক্ত অথবা স্যাঁতসেঁতে কিছু দেখে। সুতরাং এমতাবস্থায় নামায-রোযা ছেড়ে দেবে না, সহবাসও নিষিদ্ধ নয় এবং এ রক্তের কারণে গোসল করাও ওয়াজিব নয়। তবে নামাযের সময় রক্তটাকে পরিষ্কার করা এবং কাপড়ের কোন টুকরা দিয়ে লজ্জাস্থানে পট্টি বাঁধা যরূরী যেন রক্ত বের হতে না পারে। অতঃপর নামাযের ওযু করবে।

স্মরণ রাখতে হবে যে, উল্লিখিত অবস্থায় পাঁচ ওয়াক্ত নামায সমূহের ওয়াক্ত বা সময় আরম্ভ হওয়ার পরেই ওযু করবে, আর নফল নামায সমূহের বেলায় নামাযের ইচ্ছা করার সময় ওযু করবে।

(২) অস্ত্রোপচারের পর আর ঋতুস্রাব আসবে না এ ব্যাপারে যদি নিশ্চয়তা না থাকে বরং আসারই সম্ভাবনা থাকে তাহলে মুস্তাহাযাহ নারীর মতো হুকুম পালন করতে হবে। কারণ নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা বিনতে আবী হুবাইশকে বলেছিলেনঃ

’’إنَّمَا ذَلِكَ عِِِِِِِِِِرْقٌ وَلَيْسَ بِالْحَيْضَةِ, فَإذَا أقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَاتْرُكِيْ الصَّلاَةَ,,

অর্থঃ ((এটা হায়েয নয় বরং একটি শিরা নিসৃত রক্ত। সুতরাং যখন হায়েয আসবে তখন নামায থেকে বিরত থাক।)) এ থেকে সাব্যস্ত হলো যে, মুস্তাহাযাহ নারীর হুকুম কেবল মাত্র সেই মহিলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে যার ঋতুস্রাব হওয়ার বা বন্ধ হওয়ার উভয় সম্ভাবনা রয়েছে। পক্ষান্তরে যে সকল মহিলার ঋতুস্রাবের সম্ভাবনা নেই তাদের লজ্জাস্থান থেকে প্রবাহিত রক্ত রগের রক্ত হিসেবে পরিগণিত হবে।

ইস্তেহাযার বিধি-বিধান

সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা! উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা এ পর্যন্ত আমরা জানতে পারলাম যে, মেয়েলোকের লজ্জাস্থান থেকে প্রবাহিত রক্ত কখনো কখনো হায়েয হিসেবে এবং কখনো ইস্তেহাযাহ হিসেবে পরিগণিত হয়। যখন হায়েয হিসেবে গণ্য হবে তখন হায়েযের বিধি-বিধান কার্যকরী হবে। আর যখন ইস্তেহাযাহ হিসেবে গণ্য হবে তখন ইস্তেহাযার নিয়ম-নীতি পালন করতে হবে।

ইতিপূর্বে হায়েযের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এখন ইস্তেহাযার বিধি-বিধান তুলে ধরা যাক।

মূলতঃ ইস্তেহাযার হুকুম আর পবিত্রতার হুকুম একই। মুস্তাহাযাহ নারী এবং পবিত্র নারীর মধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয় ছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই।

(১) মুস্তাহাযাহ নারীর উপর প্রতি নামাযে ওযু করা ওয়াজেব। প্রমাণ হচ্ছে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা বিনতে আবী হুবাইশকে বলেছেনঃ

’’ثُمَّ تَوَضَّئِيْ لِكُلِّ صَلاَةٍ,,

অর্থঃ ((তুমি প্রত্যেক নামাযের জন্য ওযু কর।)) [ইমাম বুখারী রাহেমাহুল্লাহ হাদীসটিকে ‘গুস্‌লুদ্দাম’ অর্থাৎ রক্ত ধৌত করার অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন।] হাদীসখানার ব্যাখ্যা হচ্ছেঃ তুমি ইস্তেহাযার অবস্থায় ফরয অর্থাৎ ওয়াক্তি নামাযের জন্য নামাযের সময় আরম্ভ হওয়ার পরেই ওযু করবে। আর নফল নামাযের ক্ষেত্রে যখন নামায পড়ার ইচ্ছা করবে তখন করলেই চলবে।

(২) মুস্তাহাযাহ নারী যখন ওযু করার ইচ্ছা করবে তখন রক্তের দাগ চিহ্ন ধৌত করে যোনীতে তুলা দিয়ে পট্টি বেঁধে নেবে, যেন উক্ত তুলা রক্তটাকে আঁকড়ে ধরে। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামনাহ রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছেনঃ

’’أنْعَتُ لَكِ الْكُرْسُفَ, فَإنَّهُ يُذْهِبُ الدَّمَ,, قَالَتْ: فَإنَّهُ أكْثَرُ مِنْ ذَلِكَ, قَالَ: ’’فَاتَّخِذِيْ ثَوْبًا,, قَالَتْ: هُوَ أكْثَرُ مِنْ ذَلِكَ, قَالَ: ’’فَتَلَجَّمِيْ,,

অর্থঃ ((আমি তোমাকে লজ্জাস্থানে নেকড়া তুলা ব্যবহার করার উপদেশ দিচ্ছি। কেননা নেকড়া বা তুলা রক্তটাকে টেনে নেবে।)) জবাবে হামনাহ বললেনঃ আমার প্রবাহমান রক্তের পরিমাণ তদপেক্ষাও বেশী। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ((তাহলে তুমি লজ্জাস্থানে কাপড় ব্যবহার কর।)) হামনাহ বললেনঃ প্রবাহমান রক্তের পরিমাণ তার চেয়ে আরো বেশী। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুকুম দিলেন যে, ((তুমি তাহলে যোনীর মুখে লাগাম বেঁধে নাও।))

রক্তের দাগ চিহ্ন পরিষ্কার করে যোনীতে তুলা দিয়ে পট্টি বাঁধার পরেও যদি রক্ত প্রবাহিত হয় তাহলে এতে কোন অসুবিধা নেই। কেননা এ প্রসঙ্গে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস রয়েছে যে তিনি ফাতেমা বিনতে আবী হুবাইশ রাযিয়াল্লাহু আনহাকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ

’’اجْتَنِبِيْ الصَّلاَةَ أيَّامَ حَيْضَتِكَ ثُمَّ اغْتَسِلِيْ وَتَوَضَّئِيْ لِكُلِّ صَلاَةٍ, ثُمَّ صَلِّيْ, وَإنْ قَطَرَ الدَّمُ عَلَى الْحَصِيْرِ,,

অর্থঃ ((যে কয়দিন তুমি ঋতুস্রাবে আক্রান্ত থাকবে সে কয়দিন নামায থেকে বিরত থাক। তারপর গোসল করে প্রতি নামাযের জন্য ওযু কর এবং নামায আদায় কর, যদিও রক্ত প্রবাহিত হয়ে চাটাইর উপর পরে তাতেও কোন অসুবিধা নেই।)) [আহমদ ও ইবনে মাজাহ]

(৩) সহবাস প্রসঙ্গঃ সহবাস বর্জন করলে যদি কোন বৈরিতার আশঙ্কা থাকে তাহলে ওলামায়ে কেরামের মাঝে এর বৈধতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক অভিমত হচ্ছে যে, ইস্তেহাযার অবস্থায় স্ত্রী সঙ্গম জায়েয। কেননা নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ১০ অথবা ১০ এর অধিক সংখ্যক মহিলা ইস্তেহাযাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অথচ আল্লাহ তা‘য়ালা ও তাঁর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সঙ্গে সহবাস করতে নিষেধ করেননি বরং কুরআন শরীফে বলা হয়েছেঃ

﴿فَاعْتَزِلُواْ النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ﴾ (222) سورة البقرة

অর্থঃ “তোমরা হায়েযের অবস্থায় স্ত্রী সঙ্গম থেকে বিরত থাক।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২২২] এ আয়াত প্রমাণ করে যে হায়েয ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় স্ত্রী মিলন থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব নয়। দ্বিতীয়তঃ মুস্তাহাযাহ নারীর নামায যেহেতু জায়েয সেহেতু সঙ্গমও জায়েয। কেননা সঙ্গম তো নামাযের চেয়ে আরো সহজ। মুস্তাহাযাহ নারীর সাথে সহবাস করাটাকে ঋতুবতী মহিলার সঙ্গে সহবাস করার সাথে বিচার-বিবেচনা করলে চলবে না। কারণ এ দুটো কখনো এক হতে পারে না। এমনকি মুস্তাহাযাহ নারীর সাথে সঙ্গম করাকে যারা হারাম মনে করেন তাদের কাছেও দুটো এক নয়। সুতরাং উভয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকায় একটাকে অপরটার উপর কিয়াস করা শুদ্ধ হবে না।

ষষ্ট পরিচ্ছেদ

নেফাস ও তার হুকুম সম্পর্কে

নেফাসের সংজ্ঞাঃ প্রসবের কারণে জরায়ূ থেকে প্রবাহিত রক্তকে নেফাস বলা হয়। চাই সে রক্ত প্রসবের সাথেই প্রবাহিত হোক অথবা প্রসবের দুই বা তিন দিন পূর্ব থেকেই প্রসব বেদনার সাথে প্রবাহিত হোক।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহেমাহুল্লাহ বলেছেনঃ ‘প্রসব ব্যাথা আরম্ভ হলে মহিলা তার লজ্জাস্থানে যে রক্ত দেখতে পায় সেটাই হচ্ছে নেফাস।’ এখানে তিনি দুই অথবা তিন দিনের সাথে নির্দিষ্ট করেননি। তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন ব্যথা যার পরিণতিতে প্রসব হবেই। অন্যথায় তা নেফাস হিসেবে পরিগণিত হবে না।

নেফাসের সর্ব নিম্ন ও সর্বোচ্চ কোন সময়-সীমা আছে কি না? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মতভেদ রয়েছে। শায়খ তাকীউদ্দীন তাঁর লিখিত ‘শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কিত নামসমূহ’ পুস্তিকার ৩৭ নং পৃষ্ঠায় বলেছেনঃ নেফাসের সর্ব নিম্ন এবং সর্বোচ্চ কোন সীমা-রেখা নেই। সুতরাং যদি কোন মেয়েলোকের ৪০ দিন অথবা ৬০ দিন অথবা ৭০ দিনেরও বেশী সময় ধরে রক্ত প্রবাহিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সেটাও নেফাস হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু বন্ধ না হয়ে যদি বিরতিহীনভাবে প্রবাহিত হতে থাকে তাহলে সেটাকে অসুস্থতা বলে রক্ত গণ্য করা হবে। এবং তখন নির্দিষ্ট সময়-সীমা ৪০ দিনই ধার্য্য করতে হবে। কেননা অধিকাংশ মেয়েলোকের নেফাসের সর্বোচ্চ সময় ৪০ দিনই হয়ে থাকে বলে একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে।’

উপরোক্ত অভিমতের ভিত্তিতে আমি (গ্রন্থকার) মনে করি যে প্রসবত্তোর রক্তস্রাব ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরেও যদি অব্যাহত থাকে এবং ৪০ দিনের পর বন্ধ হওয়ার পূর্ব অভ্যাস যদি মহিলার থাকে বা ৪০ দিনের পর বন্ধ হওয়ার কোন লক্ষণ যদি দেখা যায় তাহলে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। আর তা না হলে ৪০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর গোসল করবে। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সময় ৪০ দিনই হয়ে থাকে। তবে ৪০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর যদি আবার মাসিক রক্তস্রাব অর্থাৎ হায়েযের সময় এসে যায় তাহলে হায়েযের সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। তারপর বন্ধ হলে মনে করতে হবে যে, এটা মহিলার অভ্যাস অনুসারেই হয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতেও কোন সময় এ রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে সে হিসেবে আমল করবে। আর যদি হায়েযের সময় শেষ হওয়ার পরেও রক্তস্রাব অব্যাহত থাকে তাহলে তখন ইস্তেহাযাহ গণ্য করে তার হুকুম পালন করবে।

প্রকাশ থাকে যে, প্রসবোত্তর রক্তস্রাব বন্ধ হলেই মহিলা পবিত্র হয়ে যাবে। এমনকি ৪০ দিনের পূর্বেই যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলেও পবিত্র হবে, সুতরাং গোসল করে নামায-রোযা আদায় করতে থাকবে এবং স্বামী-স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হতে পারবে। কিন্তু এক দিনের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তার কোন হুকুম নেই। [মুগনী গ্রন্থে তাই বলা হয়েছে।]

স্মরণ রাখতে হবে যে, এমন কিছু প্রসব করলেই কেবল নেফাস প্রমাণিত হবে যাতে মানুষের আকৃতি (প্রকৃতি) স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। পক্ষান্তরে যদি মহিলা গর্ভপাতের মাধ্যমে এমন ক্ষুদ্র ও অসম্পূর্ণ ভ্রূণ প্রসব করে যাতে মানুষের আকৃতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় না তাহলে প্রবাহিত রক্তকে নেফাস হিসেবে গণ্য করা যাবে না। বরং রগের রক্ত হিসেবে গণ্য করে ইস্তেহাযার নিয়ম-নীতি পালন করতে হবে। মানুষের আকৃতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাওয়ার সর্ব নিম্ন সময়-সীমা হচ্ছে গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে ৮০ দিন, আর সর্বোচ্চ সময় হচ্ছে ৯০ দিন। এ প্রসঙ্গে মাজ্‌দ ইবনে তাইমিয়াহ রাহেমাহুল্লাহ বলেছেনঃ ‘সর্ব নিম্ন সময় অথবা গর্ভপাত হওয়ার পর থেকে ৮০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই যদি প্রসব বেদনার সাথে রক্ত দেখা যায় তাহলে সে দিকে কোন ভ্রুক্ষেপই করা হবে না। আর যদি ৮০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর রক্ত দেখে তাহলে প্রসব পর্যন্ত নামায-রোযা থেকে বিরত থাকবে। প্রসবের পর যদি দেখা যায় যে, প্রসূত সন্তান বা ভ্রূণের মধ্যে মানুষের কোন আকৃতিই নেই তাহলে গর্ভবতী মহিলা তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে এবং ক্ষতিপূরণ করবে অর্থাৎ নামায-রোযার কাযা করবে। আর যদি বিষয়টি স্পষ্ট না হয় তাহলে বাহ্যিক হুকুমই মেনে চলবে অর্থাৎ নামায-রোযা থেকে বিরত থাকবে এবং কাযা করা লাগবে না। [শারহুল ইক্‌না নামক গ্রন্থে এভাবে বর্ণিত হয়েছে।]

নেফাসের হুকুম

নিম্নে বর্ণিত কয়েকটি বিষয় ছাড়া হায়েয ও নেফাসের হুকুম প্রায় একই। যথাঃ

(১) ইদ্দত প্রসঙ্গঃ ইদ্দতকাল নির্ণয় করতে হবে তালাকের দিকে লক্ষ্য করে, নেফাসের দিকে লক্ষ্য রেখে নয়। কেননা তালাক যদি প্রসবের পূর্বে দেওয়া হয় তাহলে প্রসবের সাথে সাথে ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে, নেফাসের মাধ্যমে নয়। পক্ষান্তরে যদি তালাক প্রসবের পরে হয় তাহলে হায়েযের অপেক্ষা করতে হবে। এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।

(২) ‘ঈলা’র মেয়াদঃ হায়েযের সময় অন্তর্ভুক্ত হবে, তবে নেফাসের সময়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

‘ঈলা’র সংজ্ঞাঃ কোন পুরুষের এই মর্মে শপথ করাকে ঈলা বলা হয় যে, সে তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হবে না বা সেজন্য এমন সময়-সীমা নির্ধারণ করে শপথ করে যা চার মাসের উপরে। এ ধরনের শপথ করার পর স্ত্রী যখন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার জন্য স্বামীর নিকট দাবী উত্থাপন করবে, তখন উক্ত পুরুষের জন্য শপথের পর চার মাস মেয়াদ ধার্য্য করা হবে। চার মাসের এই মেয়াদ শেষ হলে স্ত্রীর দাবী মেনে নেওয়ার জন্য স্বামীকে বাধ্য করা হবে। স্ত্রী যদি তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতে চায় তাহলে স্বামীকে স্ত্রী মিলনে অথবা স্ত্রী যদি তার কাছ থেকে পৃথক হতে চায় তাহলে পৃথক করতে বাধ্য করা হবে। এখানে বুঝার বিষয় হচ্ছে ঈলার হুকুম হিসেবে উল্লিখিত চার মাসের মেয়াদ চলাকালীন যদি স্ত্রীর নেফাস অর্থাৎ প্রসব জনিত কারণে রক্তস্রাব দেখা দেয় তাহলে স্বামী স্ত্রীর নেফাসের দিনগুলিকে চার মাসের মধ্যে যোগ করে হিসাব করতে পারবে না। বরং নেফাসের এই দিনগুলিকে হিসাবের আওতায় না এনে চার মাসের মেয়াদ পূর্ণ করতে হবে। পক্ষান্তরে চার মাসের সুনির্দিষ্ট মেয়াদ চলাকালে স্ত্রীর যদি হায়েয দেখা দেয় তাহলে হায়েযের দিনগুলিকে চার মাসের মধ্যে যোগ করতে হবে।

(৩) হায়েযের মাধ্যমে মেয়েলোক প্রাপ্তবয়স্কা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। তবে নেফাসের মাধ্যমে নয়। কেননা বীর্যস্খলন ছাড়া মেয়েলোক গর্ভবতী হতেই পারে না। সুতরাং গর্ভধারণের জন্য যে বীর্যস্খলন হয় তা দ্বারাই মেয়েলোকের প্রাপ্তবয়স্কা হওয়াটা প্রমাণিত হয়।

(৪) হায়েয ও নেফাসের মধ্যে চতুর্থ পার্থক্য এই যে, হায়েযের রক্ত বন্ধ হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই যদি পুনরায় আরম্ভ হয় তাহলে সেটাকে নিঃসন্দেহে হায়েয হিসেবে গণ্য করতে হবে।

দৃষ্টান্তঃ একজন মেয়েলোকের সাধারণতঃ প্রতি মাসে ৮ দিন করে রক্তস্রাব হয়ে থাকে। এক মাসে দেখা গেল যে, রক্তস্রাব চার দিন থেকে বন্ধ হয়ে গেছে এবং দুই দিন বন্ধ থাকার পর সপ্তম ও অষ্টম দিনে প্রবাহিত রক্তকে অবশ্যই হায়েয বলে গণ্য করতে হবে এবং তাকে হায়েযেরই নিয়ম-নীতি পালন করতে হবে। পক্ষান্তরে নেফাসের ব্যাপারটা এমন নয় অর্থাৎ নেফাস যদি ৪০ দিন পূর্ণ হওয়ার পূর্বে বন্ধ হয়ে আবারো চালু হয় তাহলে এ ক্ষেত্রে বিষয়টি সন্দেহযুক্ত থাকবে। এমতাবস্থায় মহিলাকে নির্দিষ্ট সময়ে ফরয নামায ও ফরয রোযা আদায় করতে হবে। মাসিক ঋতুবতী মহিলার জন্য ওয়াজিব ব্যতীত যা হারাম তার ক্ষেত্রেও তা হারাম হবে এবং এ অবস্থায় যে ফরয নামায ও ফরয রোযা আদায় করা হয়েছে পবিত্র হওয়ার পর সেগুলোর কাযা করবে। অর্থাৎ ঋতুবতী মহিলাদের জন্য যেমন কাযা করা ওয়াজিব তেমনি নেফাসওয়ালীর জন্যও ওয়াজিব। হাম্বলী ফিক্‌হবিদগণের নিকট এটাই প্রসিদ্ধ। তবে সঠিক অভিমত হচ্ছে যে,বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এমন সময়ের মধ্যেই যদি পুনরায় চালু হয় যখন প্রবাহিত রক্তকে নেফাস গণ্য করা সম্ভব, তাহলে নেফাস হিসেবেই গণ্য করা হবে, নতুবা হায়েয হিসেবে। আবার একাধারে বিরতহীনভাবে প্রবাহিত হতে থাকলে ইস্তেহাযাহ গণ্য করা হবে। মুগনী গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, ‘উল্লিখিত সমাধানটি ইমাম মালেক রাহেমাহুল্লাহর অভিমতের কাছাকাছি।’ ইমাম মালেক রাহেমাহুল্লাহ বলেছেন যে, ‘রক্ত বন্ধ হওয়ার পর দুই অথবা তিন দিনের মধ্যেই যদি পুনরায় রক্ত দেখা দেয় তাহলে নেফাস নতুবা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে।’ শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহেমাহুল্লাহর অভিমতও এক্ষেত্রে একই রকম বলে বুঝা যায়। অথচ বাস্তবতার ভিত্তিতে রক্তের মধ্যে সন্দেহযুক্ত বলতে কিছুই নেই। কিন্তু সন্দেহ এমন একটা বিষয় যার মধ্যে মানুষ তাদের ইল্‌ম ও বোধশক্তি অনুপাতে মতভেদ করে থাকে। আর কুরআন ও সুন্নাত কোনটা সঠিক কোনটা সঠিক নয় এর পূর্ণ সমাধান প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিয়েছে।

প্রকাশ থাকে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকেই দুইবার রোযা রাখার এবং দুইবার তওয়াফ করার নির্দেশ দেননি, যেমনটি একটু পূর্বে বলা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, প্রথমবার আদায় করতে গিয়ে যদি এমন কোন ত্রুটি হয়ে থাকে যা কাযা না করে সেই ত্রুটির ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়।

সুতরাং বান্দাকে যে কাজের আদেশ করা হয়েছে সাধ্যানুসারে সে কাজ করলে বান্দাহ তখন দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা‘য়ালা বলেনঃ

﴿لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا﴾ (286) سورة البقرة

অর্থঃ “আল্লাহ কাউকেই তার সাধ্যের বাইরে কোন কাজের নির্দেশ দেন না।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৮৬] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছেঃ

﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾ (16) سورة التغابن

অর্থঃ “তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর।” [সূরা আত-তাগাবুনঃ ১৬]

(৫) হায়েয যদি পূর্ব অভ্যাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই বন্ধ হয়ে যায় তাহলে স্বামী উক্ত স্ত্রীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতে পারবে। এতে কোন রকম অসুবিধা নেই। পক্ষান্তরে নেফাসের রক্ত যদি ৪০ দিনের পূর্বে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে প্রসিদ্ধ মাযহাব অনুসারে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া স্বামীর জন্য মাকরূহ। তবে সঠিক সমাধান এটাই যে মাকরূহ নয়। অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের অভিমতও তাই। কেননা কোন কাজকে মাকরূহ বলতে হলে শরীয়ত ভিত্তিক প্রমাণ লাগবে। অথচ এক্ষেত্রে ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত হাদীস ছাড়া অন্য কোন প্রমাণ নেই। ইমাম আহমদ রাহেমাহুল্লাহ উসমান ইবনে আবিল আস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর স্ত্রী নেফাসের ৪০ দিন পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তাঁর কাছে আসলে তিনি বলতেনঃ তুমি আমার নিকটবর্তী হয়ো না। এটা দ্বারা কোন মাকরূহর হুকুম প্রমাণিত হয় না। কেননা স্ত্রীর পবিত্র হওয়া নিশ্চিত নয় বলে সাবধানতা অবলম্বনের উদ্দেশ্যে অথবা সঙ্গমে লিপ্ত হলে পুনরায় রক্ত প্রবাহ শুরু হতে পারে এই আশঙ্কায় অথবা অন্য কোন কারণে তিনি নিষেধ করেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

রক্তস্রাব প্রতিরোধকারী অথবা আনয়নকারী এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ অথবা গর্ভপাতের ঔষধ ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা

দু‘টি শর্ত সাপেক্ষে হায়েয প্রতিরোধ করে এমন ঔষধ ব্যবহার করা জায়েযঃ

১ম শর্তঃ ঔষধ ব্যবহারে কোন রকম ক্ষতির আশঙ্কা না থাকা। যদি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে তাহলে ব্যবহার করা জায়েয হবে না। কেননা পবিত্র কুরআন শরীফে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ

﴿وَلاَ تُلْقُواْ بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ﴾ (195) سورة البقرة

অর্থঃ “তোমরা নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংস করো না।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৯৫] এমনিভাবে আল্লাহ পাক অন্যত্র ইরশাদ করেছেনঃ

﴿وَلاَ تَقْتُلُواْ أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا﴾ (29) سورة النساء

অর্থঃ “তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘য়ালা তেমাদের প্রতি দয়ালু।” [সূরা আন-নিসাঃ ২৯]

২য় শর্তঃ হায়েয বা রক্তস্রাবের সাথে স্বামীর যদি কোন ব্যাপার সম্পৃক্ত থাকে তাহলে অবশ্যই তার অনুমতি নিয়েই ঔষধ ব্যবহার করতে হবে। যেমন স্ত্রী তালাক প্রাপ্তা হওয়ার পর ইদ্দতের অবস্থায় আছে বা ইদ্দত পালন করে চলছে এবং ইদ্দত পালনকালে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব। এমতাবস্থায় ইদ্দতকাল দীর্ঘ করে ভরণ-পোষণ বেশী পাওয়ার উদ্দেশ্যে যদি স্ত্রী হায়েয প্রতিরোধ করার জন্য ঔষধ ব্যবহার করতে চায় তাহলে এক্ষেত্রে অবশ্যই স্বমীর অনুমতি নিতে হবে। স্বামী অনুমতি দিলে করতে পারবে, অন্যথায় পারবে না।

এমনিভাবে যখন প্রমাণিত হবে যে, হায়েয রোধ করলে স্ত্রীর গর্ভ ধারণ করা সম্ভব নয় তাহলে তখনও ঔষধ ব্যবহারে স্বামীর অনুমতি নিতে হবে।

উপরোক্ত দু‘টি শর্ত মোতাবেক হায়েয প্রতিরোধক ঔষধ ব্যবহার করা জায়েয। মনে রাখতে হবে, জায়েয হওয়ার পরেও বিশেষ প্রয়োজন ব্যতিরেকে ব্যবহার না করাই উত্তম এবং শ্রেয়। কেননা প্রাকৃতিক বিষয়কে তার স্বগতিতে ছেড়ে দেওয়া শারীরিক সুস্থতার জন্য ভাল।

হায়েয আনয়নের জন্য ঔষধের ব্যবহারও দু‘টি শর্ত মোতাবেক জায়েযঃ

১ম শর্তঃ কোন ফরয বা ওয়াজিব কাজ থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ঔষধ ব্যবহার না করা। যদি এমনটি হয়ে থাকে অর্থাৎ কোন ফরয বা ওয়াজিব পালন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য যদি ঔষধ ব্যবহার করতে চায় তাহলে তা নাজায়েয হবে। যেমন রমাযান মাস আরম্ভ হওয়ার পূর্বে হায়েয আনয়নের জন্য ঔষধ ব্যবহার করা, যেন নামায এবং রোযা আদায় করা থেকে বেঁচে যায়, তাহলে তা কখনোই জায়েয হবে না।

২য় শর্তঃ স্বামীর অনুমতিক্রমে ব্যবহার করতে হবে। কেননা হায়েয আসলে স্বামী পূর্ণাঙ্গরূপে স্ত্রী থেকে উপকৃত হতে পারে না বা নিজের কামভাব চরিতার্থ করতে পারে না। সুতরাং স্বামীর অনুমতি ছাড়া এমন কিছু ব্যবহার করা স্ত্রীর জন্য জায়েয হবে না যার কারণে স্বামী নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। যদিও স্ত্রী তালাক প্রাপ্তা হয়ে থাকে তারপরেও স্বামীর অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করতে পারবে না। কেননা স্বামীর যদি তালাক প্রত্যাহার করার ইচ্ছা থাকে তাহলে স্ত্রী এ ধরনের ঔষধ ব্যবহার করে হায়েয নিয়ে আসলে স্বামীর অধিকার দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

গর্ভরোধকারী ঔষধের ব্যবহার দুই প্রকারঃ

১ম প্রকারঃ ঔষধের ব্যবহার দ্বারা যদি স্থায়ীভাবে গর্ভধারণকে প্রতিরোধ করা হয়, তাহলে তা ব্যবহার করা জায়েয হবে না। কেননা গর্ভধারণের প্রক্রিয়াকে চিরতরে বন্ধ করলে বংশবৃদ্ধি ও সন্তানাদি কমে যাবে যা শরীয়তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ উম্মতে ইসলামিয়ার সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়াই শরীয়তের উদ্দেশ্য যা গর্ভধারণ প্রক্রিয়াকে বন্ধ করার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ব্যাহত হবে। এতদ্ব্যতীত উপস্থিত সন্তানাদি মারা না যাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই। মারা গেলে পরে নারী সন্তানহীন হয়ে থাকার আশঙ্কা থেকে যায়।

২য় প্রকারঃ সাময়িকভাবে গর্ভরোধ করার জন্য ঔষধ ব্যবহার করা। যেমন কোন মেয়েলোক খুব বেশী গর্ভবতী হচ্ছে এবং এর কারণে শারীরিকভাবে সে ক্ষীন হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় উক্ত মেয়েলোক দুই বছর অন্তর অন্তর সন্তান নিতে আগ্রহী হলে এরূপ করা জায়েয আছে, তবে এ ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতি নিতে হবে এবং এ ধরনের ঔষধ ব্যবহারে কোন রকম ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নাবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম ‘আয্‌ল’ পদ্ধতি অবলম্বন করে স্ত্রী সঙ্গমে লিপ্ত হতেন, যাতে করে তাঁদের স্ত্রীগণ গর্ভবতী না হয়। কিন্তু এ পদ্ধতি অবলম্বন থেকে তাঁদেরকে তখন নিষেধ করা হয়নি। প্রকাশ থাকে যে, স্ত্রী সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার পর বীর্যস্খলনের সময় ঘনিয়ে আসলে পুরুষাঙ্গ স্ত্রী যোনী থেকে বের করে বাইরে বীর্যপাত করাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘আয্‌ল’ বলা হয়।

গর্ভপাতকারী ঔষধের ব্যবহারও দুই প্রকারঃ

১ম প্রকারঃ গর্ভপাতকারী ঔষধ গ্রহণ গর্ভস্থ সন্তানকে ধ্বংস বা বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে হওয়া। এমতাবস্থায় এই ঔষধের ব্যবহার যদি গর্ভস্থ বাচ্চার মাঝে প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার পর হয়ে থাকে তাহলে তা সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং এতে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা এটা নিষিদ্ধকৃত আত্মাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার নামান্তর। কুরআন ও হাদীস এবং মুসলমানদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিষিদ্ধকৃত আত্মাকে হত্যা করা হারাম।

আর যদি প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার পূর্বে গর্ভপাতের জন্য ঔষধ ব্যবহার করতে চায় তাহলে ওলামায়ে কেরামের মাঝে এর বৈধতার প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ জায়েয বলেছেন, কেউ কেউ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, আবার কেউ বলেছেন যে গর্ভ ধারণের পর থেকে আরম্ভ করে যতক্ষণ পর্যন্ত গর্ভস্থ বস্তু জমাট রক্তের রূপ না নিবে অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত ৪০ দিন অতিবাহিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত গর্ভপাতের জন্য এ ধরনের ঔষধ ব্যবহার করা জায়েয। ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কেউ আবার এমনও বলেছেন যে, মানুষের আকৃতি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত গর্ভপাতের ঔষধ ব্যবহার করতে পারবে। তবে খুব বেশী সাবধানতা অবলম্বনের উদ্দেশ্যে গর্ভপাতের জন্য ঔষধের ব্যবহার থেকে বিরত থাকাই উত্তম। তবে বিশেষ প্রয়োজন ও অপারগতার সম্মুখীন হলে এ ধরনের ঔষধ ব্যবহার করতে পারবে। প্রয়োজনীয়তা বলতে যেমন মা এমন অসুস্থ যে গর্ভধারণে অক্ষম ইত্যাদি ইত্যাদি। এমতাবস্থায় গর্ভপাত করা জায়েয আছে। কিন্তু গর্ভ ধারণের পর থেকে যদি এই পরিমাণ সময় অতিবাহিত হয়ে যায় যে সময়ের মধ্যে গর্ভস্থ বাচ্চার মধ্যে মানুষের আকৃতি প্রকাশ পেয়ে থাকে তাহলে ব্যবহার করা হারাম। আল্লাহ তা‘য়ালাই সর্বজ্ঞ।

২য় প্রকারঃ গর্ভপাতের ঔষধ গ্রহণে গর্ভস্থ আত্মাকে ধ্বংস করা উদ্দেশ্য নয় বরং গর্ভের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রসব আসন্ন এমন সময়ে যদি গর্ভপাতের ঔষধ ব্যবহার করতে চায় তাহলে তা জায়েয আছে। তবে শর্ত হচ্ছে এ ধরনের ঔষধ ব্যবহারের ফলে মা ও বাচ্চার যেন ক্ষতি না হয় এবং ঔষধ ব্যবহার করার কারণে যেন অপারেশন বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা দেখা না দেয়।

যদি ঔষধ ব্যবহারের কারণে অপারেশন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে তাহলে এর চার অবস্থা, যা নিম্নে বর্ণিত হলোঃ

(১) মা এবং গর্ভস্থ বাচ্চা উভয়েই জীবিত। এমতাবস্থায় প্রয়োজন ছাড়া অস্ত্রোপচার করা জায়েয নেই, যেমন প্রসব অত্যন্ত কষ্টকর এবং ঝুকিপূর্ণ, তাহলে অস্ত্রোপচার করতে হবে। মনে রাখতে হবে একজনের শরীর অপর জনের নিকট আমানত স্বরূপ। সুতরাং বৃহত্তর কোন কল্যাণ সাধন এমন কোন হস্তক্ষেপ করবে না যা দ্বারা ক্ষতির সম্ভাবনা ও আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া বর্তমান যুগে অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনের পূর্বে মনে করা হয়ে থাকে যে, কোন রকম ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, অথচ অপারেশনের পর ক্ষতি প্রকাশ পেয়ে যায়।

(২) মা ও গর্ভস্থ বাচ্চা উভয়ই মৃত। এমতাবস্থায় বাচ্চাকে বের করার জন্য অস্ত্রোপচার করা জায়েয নয়। কেননা বের করার মধ্যে কোন রকম লাভ নেই।

(৩) মা জীবিত কিন্তু গর্ভস্থ বাচ্চা মৃত। তাহলে অস্ত্রোপচার করে বের করা জায়েয আছে। তবে মায়ের কোন ক্ষতির যেন আশঙ্কা না থাকে। কেননা বাহ্যিক অবস্থার প্রেক্ষিতে গর্ভস্থ সন্তানকে তো অপারেশন ছাড়া বের করা সম্ভব নয় এবং বাচ্চাকে যদি ভিতরে রেখে দেওয়া হয় তাহলে প্রথমতঃ ভবিষ্যতে পেটে সন্তান ধারণ করা সম্ভব হবে না। দ্বিতীযতঃ এভাবে রেখে দিলে মায়ের জন্য অত্যন্ত কষ্ট ও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া অনেক সময় স্ত্রীকে স্বামীহীনা বিধবা হয়ে থাকতে হয় যখন মহিলা পূর্ব স্বামী ইদ্দতের অবস্থায় থাকে। এসব কারণে অপারেশনের মাধ্যমে গর্ভস্থ মৃত বাচ্চাকে বের করা জায়েয আছে।

(৪) মা মৃত এবং গর্ভস্থ বাচ্চা জীবিত। এমতাবস্থায় গর্ভস্থ সন্তানকে বাঁচানোর সম্ভাবনা যদি না থাকে তাহলে অপারেশন করা জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যদি গর্ভস্থ সন্তানটি বাঁচবে এমন আশা ও সম্ভাবনা থাকে, সেই অবস্থায় কিছু অংশ যদি বের হয়ে থাকে তাহলে মৃত মার পেট কেটে বাচ্চার বাকী অংশ বের করতে পারবে। আর যদি বাচ্চার কিছুই বের না হয় তাহলে এক্ষেত্রে আমাদের ওলামায়ে কেরাম বলেছেন যে, গর্ভস্থ শিশুকে বের করার জন্য মায়ের পেট কাটবে না। কেননা এটা নাক-কান কেটে বিকৃত করার অন্তর্ভুক্ত। তবে সার্বিক সমাধান হচ্ছে এই যে, অপারেশন ছাড়া যদি বের করা সম্ভব না হয় তাহলে অপারেশন করতে পারবে। এ সমাধানটি ইবনে হুবাইরা গ্রহণ করেছেন। তিনি ‘ইনসাফ’ গ্রন্থের ২য় খন্ডের ৫৫৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন যে, এক্ষেত্রে পেট কেটে বাচ্চা বের করাই উত্তম।

বর্তমান কালে এ অবস্থায় অস্ত্রোপচার করা ‘মুসলা’ অর্থাৎ নাক-কান কেটে শাস্তি দেওয়া হিসেবে পরিগণিত হবে না। কারণ প্রথমতঃ পেট কেটে পরে আবার সেলাই করে দেওয়া হবে। দ্বিতীয়তঃ একটা জীবিত সন্তানের ইজ্জত একজন মৃত ব্যক্তির চেয়ে অনেক বেশী। তৃতীয়তঃ একটা নিষ্পাপ শিশুকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। সুতরাং যেহেতু গর্ভস্থ বাচ্চা জীবিত এবং নিষ্পাপ ইনসান সেহেতু অপারেশনের মাধ্যমে তাকে বের করা ওয়াজিব। আল্লাহ তা‘য়ালাই সর্বজ্ঞ।

সতর্কীকরণঃ

উপরোল্লিখিত যে সকল অবস্থায় গর্ভপাত করা জায়েয সে সকল অবস্থায় গর্ভপাত করতে চাইলে অবশ্যই গর্ভের মালিক যেমন স্বামীর অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।

সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা!

এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আপনাদের কাছে যা উপস্থাপন করার ইচ্ছা পোষণ করে লিখার সূচনা করেছিলাম তা এখানেই শেষ। এই পুস্তিকাখানিতে আমি শুধুমাত্র মৌলিক মাসআলা সমূহ এবং তার নিয়ম-কানুন বর্ণনা করেছি। অন্যথায় বর্ণিত মাসআলা সমূহের শাখা-প্রশাখা, আনুসঙ্গিক বিষয়াদি এবং হায়েয, নেফাস ও ইস্তেহাযার কারণে নারী জাতির বহুমুখী অবস্থার পূর্ণ বিবরণ কিনারাবিহীন সমুদ্রের মত। তবে বিচক্ষণ ব্যক্তি মূল বিষয় ও তার নিয়ম-কানুনের উপর ভিত্তি করে কোন সমস্যার আবির্ভাব ঘটলে তার সমাধান দিতে পারবে এবং এক বিষয়কে সমপর্যায়ের অন্য মাসআলার উপর অনুমান করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে।

একজন মুফতীর একথা স্মরণ থাকা উচিত যে, তিনি রাসূলগণের আনীত দ্বীন, শরীয়ত ও মতাদর্শ প্রচার এবং প্রসারের জন্য আল্লাহ তা‘য়ালা ও মানব জাতির মাঝে একজন মধ্যস্থতাকারীর সমতুল্য। কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত নিয়ম-নীতি ও বিধি-বিধানের আলোকে কোন প্রশ্নের সমাধান দেওয়া তাঁরই দায়িত্ব। কেননা কুরআন ও সুন্নাত এমন দুটি মূল উৎস যে দুটিকে বুঝে তার উপর আমল করার জন্য সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং যে কথা, যে অভিমত এবং যে সমাধান কুরআন ও সুন্নাত পরিপন্থী হবে তা ভুল বলে প্রমাণিত হবে, যা গ্রহণ করা জায়েয হবে না বরং প্রত্যাখ্যান করা ওয়াজিব। যদি ভুল সমাধানদাতা মুজতাহিদ অপারগ হয়ে থাকে তাহলে তাকে তার ইজতেহাদের কারণে প্রতিদান দেওয়া হবে কিন্তু যে ব্যক্তি তার এ ভুল সম্পর্কে অবগত হবে তার জন্য তা গ্রহণ করা জায়েয হবে না।

একজন মুফতীর জন্য একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়্যত করা, নতুন কোন বিষয় সামনে আসলে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তার কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য সাহায্য ও তওফীক কামনা করা অত্যাবশ্যক। যে কোন বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাতের ভিত্তিতে আলোচনা ও চিন্তা-ভাবনা করা উচিত অথবা এমন কিছুর ভিত্তিতে আলোচনা ও চিন্তা-ভাবনা করা উচিত যা কুরআন ও হাদীস বুঝার জন্য সহায়ক হয়।

অনেক সময় দেখা যায় যে, একটা মাসআলা সামনে আসলে ওলামায়ে কেরামের অভিমত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা হয়। ফলে মাসআলাটির সুনিশ্চিত কোন সমাধান পাওয়া যায় না। এবং সুনির্দিষ্ট কোন তথ্যও প্রকাশিত হয় না। কিন্তু পরক্ষণে যখন কুরআন ও হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন করা হয় তখন মাসআলার সমাধান ও হুকুম স্পষ্ট হয়ে যায়। আর এমনটি ইখলাস, ইল্‌ম ও সঠিক অনুভুতির ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। কোন প্রকার মাসআলার সম্মুখীন হলে বিলম্বে উত্তর দেওয়া একজন মুফতীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাড়াতাড়ি করা মোটেই উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি উত্তর দেওয়ার পর আবার গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে তা ভুল বলে প্রমাণিত হয়, যার ফলে উত্তরদাতাকে লজ্জিত হতে হয় এবং এ ভুলের ক্ষতিপূরণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না।

কোন মুফতীর মধ্যে অত্যন্ত চিন্তা-ভাবনা করে ধীর গতিতে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মানসিকতা থাকলে এবং তার মধ্যে দৃঢ়তা লক্ষ্য করা গেলে তাঁর কথার প্রতি মানুষের বিশ্বাস আসবে। এবং জন সাধারণ তাড়াতাড়ি উত্তর দেওয়ার অভ্যাস লক্ষ্য করলে তার প্রতি মানুষের কোন বিশ্বাস থাকবে না। কেননা যে কোন কাজ তাড়াতাড়ি করলে ভুল হয়েই থাকে আর এ ধরনের দ্রুতগামীতা ও ভুলের কারণে তার জ্ঞান প্রদীপের আলো থেকে সে নিজে বঞ্চিত হবে এবং অপরকেও বঞ্চিত করবে।

সর্বশেষে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে সরল ও সঠিক পথের সন্ধান দেন, অনুগ্রহ করে আমাদের তত্ত্বাবধান গ্রহণ করে নেন এবং পদস্খলন থেকে আমাদের হেফাযত করেন। তিনিই অসীম দাতা এবং পরম দয়ালু।

সমাপ্ত

الدماء الطبيعية للنساء

মহিলাদের প্রাকৃতিক রক্তস্রাব

মূলঃ

শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন

অনুবাদেঃ

মীযানুর রহমান আবুল হুসাইন ফেণী

কম্পোজিং, সম্পাদনা ও প্রকাশনাঃ

রাবওয়া ইসলামী দা‘ওয়া সেন্টার, রিয়াদ

ফোন নং ৪৯১৬০৬৫ ফ্যা নং ৪৯৭০১২৬

সূচীপত্র

বিষয় পৃষ্ঠা

ভূমিকা-------------------------------------------------- ৫

প্রথম পরিচ্ছেদ

হায়েযের অর্থ এবং উহার রহস্য---------------------------- ৮

বিস্ময়কর রহস্য------------------------------------------ ৮

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

রক্তস্রাবের বয়স ও উহার সময়-সীমা------------------------ ৯

গর্ভবতী মহিলার রক্তস্রাব---------------------------------- ১৬

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

হায়েযের অবস্থায় আপতিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী-------------- ১৮

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

রক্তস্রাবের হুকুম-আহকাম---------------------------------- ২৩

ঋতুবতী মহিলার স্বয়ং কুরআন করীম পাঠ করার হুকুম-------- ২৫

রোযা---------------------------------------------------- ২৬

কা‘বা শরীফ তওয়াফ------------------------------------- ২৭

ঋতুবতী নারীর বিদায়ী তওয়াফ----------------------------- ২৮

মসজিদে ঋতুবতী নারীর অবস্থান--------------------------- ২৯

স্ত্রী সহবাস----------------------------------------------- ২৯

তালাক-------------------------------------------------- ৩১

হায়েযের মাধ্যমে তালাকের ইদ্দত গণনা করা----------------- ৩৪

হায়েযের মাধ্যমে গর্ভাশয় সন্তানমুক্ত হওয়ার হুকুম------------ ৩৬

গোসল করা ওয়াজিব প্রসঙ্গ-------------------------------- ৩৭

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

ইস্তেহাযাহ ও উহার আহকাম------------------------------- ৩৯

মুস্তাহাযাহ মেয়েলোকের বিভিন্ন অবস্থা----------------------- ৪০

অনবরত রক্ত প্রবাহিত হয় এমন মেয়েলোকের অবস্থা---------- ৪০

মুস্তাহাযার সদৃশ নারীর অবস্থার বিবরণ---------------------- ৪৩

ইস্তেহাযার বিধি-বিধান------------------------------------ ৪৫

ষষ্ট পরিচ্ছেদ

নেফাস ও তার হুকুম সম্পর্কে------------------------------ ৪৮

নেফাসের হুকুম------------------------------------------- ৫০

সপ্তম পরিচ্ছেদ

রক্তস্রাব প্রতিরোধকারী অথবা আনয়নকারী এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ অথবা গর্ভপাতের ঔষধ ব্যবহার সম্পর্কে- ৫৪

হায়েয আনয়নের জন্য ঔষধ ব্যবহার------------------------ ৫৫

গর্ভরোধকারী ঔষধের ব্যবহার------------------------------ ৫৫

গর্ভপাতকারী ঔষধের ব্যবহার------------------------------ ৫৬

সতর্কীকরণ---------------------------------------------- ৫৯