আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ কুতুব শহীদ   
Tuesday, 03 August 2010
আর্টিকেল সূচি
ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনে বাণীবাহক দল
মক্কী যুগের মৌলিক কুরবানী শিক্ষা
ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য ও সমাজ গঠনের উপায়
আল্লাহর পথে জিহাদ
ইসলামী জীবন বিধান
বিশ্বজনীন জীবনাদর্শ
ইসলামই সত্যিকার সভ্যতা
ইসলাম ও কৃষ্টি
মুসলমানদের জাতীয়তা
সুদূর প্রসারী পরিবর্তন প্রয়োজন
ঈমানের শ্রেষ্ঠত্ব
রক্তে রঞ্জিত পথ

                    ষষ্ঠ অধ্যায়

                  বিশ্বজনীন জীবনাদর্শ

ইসলাম আল্লাহর সমীপে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের উপরই মানুষের আকীদা-বিশ্বাস এ জীবন যাত্রার ভিত্তি স্থাপন করে। তার মৌলিক চিন্তাধারা, বন্দেগীর অনুষ্ঠানাদি এবং জীবন যাপনের জন্যে রচিত সকল নিয়ম-কানুনের মধ্যে সমতা রক্ষা করেই আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পণের রূপ প্রকাশ পায়। কালেমায়ে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ র বাস্তব রূপ মানুষের বান্দা সুলভ চাল-চলনের ভিতর দিয়েই ফুটে উঠে। দ্বিতীয়ত, জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিস্তারিত আইন-কানুন প্রণয়নের জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) –এর প্রদর্শিত পন্থা অনুসলণ করতে হয়।
    কালেমার এ উভয় অংশ সম্মিলিত হয়ে ইসলামী জীবনাদর্শের ভিত্তিতে রচিত সমাজ কাঠামোর রূপরেখা ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই এ সমাজ কাঠামো মানব রচিত সকল সমাজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের এক অতুলনীয় সমাজের জন্ম দান করে। ইসলাম প্রবর্তিত এ নতুন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজ মানব দেহসহ সমগ্র বিশ্বে বিরাজমান প্রাকৃতিক বিধানের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে যায়।
    ইসলামী দৃষ্টিভংগী অনুসারে সমগ্র বিশ্ব-জগত আল্লাহরই সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা বিশ্ব সৃষ্টির ইচ্ছা করেন এবং তার ফলে বিশাল জগত অস্তিত্ব লাভ করে। তারপর তিনি সৃষ্টি জগতের জন্যে কতিপয় আইন-কানুন জারী করেন যা তারা মেনে চলতে শুরু করে। লক্ষ্যণীয় যে, সৃষ্ট জগতের বিভিন্ন অংশে প্রাকৃতিক আইন নামে পরিচিত যেসব বিধান জারী রয়েছে, সেগুলো পরস্পর সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল ও সঙ্গতিপূর্ণ।

---------------------------------------------------------
“যখন আমরা কোন কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করি তখন শুধু বলি হও — আর তা হয়ে যায়।” — আন নাহল: ৪০
------------------------------------------------------  
“তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রত্যেকের জন্যে ঠিক ঠিক স্থান নির্দেশ করে দিয়েছেন।” — আল ফুরকান:

    একটি অদৃশ্য ইচ্ছা সৃষ্টি জগতকে নিয়ন্ত্রণ করছে। একটি বিশাল শক্তি সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণুকে পরিচালিত করছে। একটি সুদৃঢ় আইন এ সুপ্রশস্ত জগতকে শৃংখলার বাঁধনে বেঁধে রেখেছে। এ শক্তিই সৃষ্টির বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমতা রক্ষা এবং চলমান বিশ্বের গতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ জন্যই সৃষ্টির বিভিন্ন অংশের মধ্যে কখনো সংঘর্ষ হয় না। কোথাও বিশৃংখলা দেখা দেয় না, কখনো তার স্বাভাবিক গতি হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায় না। এবং বিশ্ব –জগতে বিরাজমান শক্তিগুলো পরস্পর থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। স্রষ্টা যতদিন তাদেরকে এভাবে চালাবেন ততদিন তারা তাঁরই ইচ্ছা মাফিক চলবে। সমগ্র সৃষ্টি জগত স্রষ্টার অনুগত। তাঁর রচিত আইন লংঘন ও তাঁর অবাধ্যাচরণ করার কোন ক্ষমতা সৃষ্ট জগতের নেই। স্রষ্টার প্রতি অবিচল আনুগত্য ও তাঁর সমীপে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের ফলেই সমগ্র সৃষ্ট জগত ভালোভাবে টিকে রয়েছে এবং কোথাও বিন্দুমাত্র বিশৃংখলা ব্যতীতই অব্যাহত গতিতে নিজ নিজ কর্তব্য পালন করে যাচ্ছে।
------------------------------------------------------------------------------------------
 
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতিপালক যিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তারপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি দিনকে রাত্রির আঁধারে ঢেকে দেন এবং দিনের পেছনে রাত্রিকে আবর্তিত করান। তিনিই সূর্য, চন্দ্র ও তারকা সৃষ্টি করেছেন। সকলেই তাঁর আদেশের অনুগামী। মনে রেখো, সৃষ্টি তাঁর, সুতরাং এ সৃষ্টি তাঁরই নির্দেশে চলবে। তিনি অত্যন্ত মহান সমগ্র বিশ্বের অধিপতি ও প্রতিপালক।”

মানবদেহের জৈবিক অংশ


    মানুষ এ মহান বিশ্বেরই একটি অংশ। সৃষ্ট জগত যেসব আইন-কানুন মেনে চলে, মানবদেহের জৈবিক অংশও তাই মেনে চলে। আল্লাহ তাআলাই বিশ্ব-জগত ও মানুষের স্রষ্টা। মাটি থেকেই মানুষের দেহ সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানুষকে কতক বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যার ফলে মানুষ তার সৃষ্টির মৌল উপাদান মাটির তুলনায় অনেক উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু তার দেহের জৈবিক অংশ মানুষ অন্যান্য জীবের মতই সৃষ্ট জগতের আইন-কানুন মেনে চলে। মানুষ আল্লাহর ইচ্ছায় জন্মগ্রহণ করে, মাতা-পিতার ইচ্ছায় নয়। মাতা-পিতা পরস্পর মিলিত হতে পারে। কিন্তু একবিন্দু শুক্রু থেকে মানুষের অবয়ব সৃষ্টি করার কোন ক্ষমতাই তাদের নেই। মাতৃগর্ভে মানব জীবনের সূচনা, মাতৃগর্ভে অবস্থানের মেয়াদ, ভুমিষ্ঠ হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহ যে আইন-কানুন বেঁধে দিয়েছেন তা পালন করার ভিতর দিয়েই মানুষ জন্মগ্রহণ করে। সে আল্লাহর সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলে তাঁর নির্ধারিত পদ্ধতি ও পরিমান অনুসারে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। তার অনুভুতি ও বোধশক্তি লাভ, তার ব্যাথা-বেদনা ও ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভুতি এবং পানাহার ইত্যাদি সকল বিষয়েই সে আল্লাহর বির্ধারিত আইন মেনে চলতে বাধ্য। এদিক থেকে মানুষ অন্যান্য প্রাণী ও অপ্রাণী বাচক সৃষ্টির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সকলেই আল্লাহর ইচ্ছা ও বিধানের নিকট বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেছে।

    যে মহান আল্লাহ তাআলা বিশাল বিশ্ব ও মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং যিনি মানুষের জৈবিক দেহকে প্রাকৃতিক বিধানের অধীন কর সৃষ্টি করেছেন তিনিই মানুষের ব্যবহারিক জীবনের জন্য একটি শরীয়াত রচনা করে দিয়েছেন। মানুষ যদি এ শরীয়াত মেনে চলে তাহলে তার ব্যবহারিক জীবন তার দৈহিক প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বুঝা যায় যে, ইসলামী শরীয়াত বিশ্বজনীন প্রাকৃতিক বিধানেরই একটি অংশ এবং এ প্রাকৃতিক বিধান মানুষের দেহ ও জৈবিক সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আল্লাহর প্রতিটি কথা তা আদেশ হোক বা নিষেধ, সুসংবাদ অথবা সতর্কবাণী, আইন-কানুন হোক অথবা উপদেশ, সবকিছুই বিশ্বজনীন আল্লাহর বিধানের বিভিন্ন অংশ মাত্র। এসব আইন বিধান প্রাকৃতিক আইন নামে পরিচিত এবং ঐ সদা-সক্রিয় আইন সর্বদা নিখুঁত ও কার্যকরী। সৃষ্টির সূচনা থেকে সমগ্র জগতে আমরা যে অটল ও সর্বকালোপযোগী বিধানের প্রাধান্য লক্ষ্য করে থাকি, তারই অংশ হিসেবে মানব জীবনের জন্য রচিত শরীয়াতাও সমানভাবেই অটল ও কার্যোপযোগী। সৃষ্ট জগতে বিরাজমান সাধারণ প্রাকৃতিক বিধানের সাথে পূর্ণ সঙ্গতি রক্ষা করে মানব জীবনকে সংগঠিত করাই আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়াতের লক্ষ্য।
    তাই আল্লাহর শরীয়াত মেনে চলা মানুষের জন্যে অপরিহার্য।কারণ এ শরীয়াত মেনে চলার ভিতর দিয়েই মানুষের জীবনযাত্রা সৃষ্ট জগতের গতিধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। শুধু তাই নয় বরং আল্লাহর শরীয়াতই মানুষের দেহে কার্যকর প্রাকৃতিক ও জৈবিক বিধানের সাথে তার ব্যবহারিক জীবেনর নৈতিক বিধানকে সঙ্গতিশীল করে দিতে পারে। মানুষের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ব্যক্তিসত্তা শুধুমাত্র এ উপায়েই সুসংহত হতে পারে।
    সৃষ্টির সকল আইন-কানুনের যথার্থতা উপলব্ধি করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এসব আইন-কানুনের ঐক্যসূত্রও তার বোধগম্য নয়। মানুষের দেহে যেসব প্রাকৃতিক বিধান কার্যকর রয়েছে এবং মানুষ এক মুহুর্তের জন্যেও যেসব জৈবিক বিধান লংঘন করতে পারেনা, সেসব আইন-বিধানের অন্তনির্হিত উদ্দেশ্যও তো সকল সময় সে বুঝে উঠতে পারে না।তাই সৃষ্ট জগতের সাতে সামঞ্জস্য রক্ষা করে নিজেদের জন্যে জীবন বিধান রচনা করার সাধ্য মানুষের নেই। সে তো নিজের দেহের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রয়োজনের উপযোগী সুসামঞ্জস্য বিধান রচনা করতেও অক্ষম। এ কাজ তো সর্বোতভাবেই মানুষ ও বিশ্ব-জগতের স্রষ্টারই আয়ত্বধীন। তিনি শুধু প্রাকৃতিক জগতেরই নয়, মানুষের ব্যবহারিক জীবনের সকল বিষয়ও নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিজের ইচ্ছা মুতাবিক সকলের জন্য নিরপেক্ষ ও দোষমুক্ত আইন-বিধান রচনা ও জারী করে থাকেন।
    তাই জীবেনর বিভিন্ন দিক ও বিভাগের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এবং ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করার জন্যে শরীয়াতের অধীন হওয়া অত্যন্ত জরুরী। কারণ হযরত মুহাম্মাদ (সা) –এর প্রদর্শিত পন্থায় আল্লাহ তাআলার সমীপে পূর্ণ আত্মসমর্পণ ব্যতীত সতি্কার মুসলিম হওয়া সম্ভব নয়। অন্য কথায় ইসলামের প্রথম স্তম্ভ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অংশদ্বয় মানুষের বাস্তব জীবনে রূপায়িত না হলে ব্যক্তিগত অথবা সমষ্টিগত জীবনের কোন একটি ক্ষেত্রও ইসলামী আলোকে উজ্জ্বলণ হয়ে ঊঠে না।
    মানব জীবন ও প্রাকৃতিক বিধানের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন মানুষের জন্য খু্‌বই কল্যাণকর। মানব জীবনকে ভাঙ্গন ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য এ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরী। নিজের সত্তায় শান্তিলাভ ও প্রাকৃতিক জগতের সাথে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান জনিত সুখ-সুবিধা অর্জন করার জন্য প্রাকৃতিক জগতের সাথে সুসামঞ্জস্য বিধান রচনা অপরিহার্য। এ একই উপায়ে মানুষ নিজের মনেও সুখ-শান্তি অনুভব করবে। কারণ তার জীবনযাত্রা, দেহের প্রকৃতিক দাবী পূরণ করতে সক্ষম হবে। তখন দেহের জৈবিক চাহিদা ও মানুষের জীবন বিধান পরস্পর বিপরীতমুখী হবে না।
    আল্লাহ তাআলার শরীয়াত মানুষের বাহ্যিক আচার-ব্যবহার ও আভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে অতি সহজেই সংগতি স্থাপন করে। মানুষ যখন প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য ও সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপনে সফল হয়, তখন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জীবনের সাধারণ সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সহযোগিতা ও পরিপূরক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কারণ মানুষ প্রাকৃতিক জগতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হলে মানুষের জীবনযাত্রা ও প্রকৃতিক নিয়ম –কানুন বিশ্ব-জগতের সামগ্রিক পরিচালনা ব্যবস্থার অধীন হয়ে যায়। ফলে মানব জীবনের সমষ্টিগত দিক থেকে সামঞ্জস্যহীনতা ও পারস্পরিক বৈপরিত্য দূর হয়ে এক সুষ্ঠ ও নিখুঁত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠে। মানবতা কল্যাণ ও সুখ-শান্তি লাভ করে।
    এ ব্যবস্থার ফলে প্রাকৃতিক জগতের গুপ্ত রহস্য মানুষের নিকট প্রকাশ হয়ে যায়। সম্প্রসারণশীল জগতের অসংখ্য গুপ্ত শক্তি এ সম্পদ তার করায়ত্ব হয়। আল্লাহর বান্দাগণ প্রকৃতির এসব শক্তি ও সম্পদকে আল্লাহর শরীয়াতের নির্দেশানুসারে মানবজাতির কল্যাণে নিয়েগ করে। কোথাও কোন সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় না। মানুষ ও প্রাকৃতিক জগতের মধ্যে কেন বৈপরিত্য থাকে না। মানুষের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা আল্লাহর শরীয়াতের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে ঊঠতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন —

------------------------------------------------------------------------------------------

    “যদি মহাসত্য তাদের নফসের খাহেস পূর্ণ করার কাজে নিয়োজিত হতো, আকাশে, পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সকল সৃষ্টির শৃংখলা ভেঙ্গে দিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি হতো।” — মু’ মিনুন: ৭১
     মহাসত্য অবিভাজ্য — উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল যে, মহাসত্য একটি পূর্ণ একক। দ্বীনের ভিত্তি এরই উপর স্থাপিত। আকাশ ও পৃথিবীর সকল ব্যবস্থাপনা মহাসত্যের ভিত্তিতেই রচিত। ইহলোক ও পরলোকের সকল বিষয়াদি মহাসত্যের নিরিখেই মীমাংসিত হবে এবং মানুষকে এ মহা সত্য সম্পর্কেই আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। সীমালংঘনকারীকে আল্লাহ তাআলা মহাসত্যের ন্যায়দণ্ডেই শাস্তি দিবেন এবং তিনি মহাসত্যের মানদণ্ডেই মানুষের কার্যকলাপ বিচার করে দেখবেন। বিশাল বিশ্বজগত যে আইনের বন্ধনে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত, সেই আইনেরই অপর নাম মহাসত্য। সৃষ্ট জগত ও তার মধ্যে প্রাণীবাচক বা বস্তুবাচক যা কিছু আছে, সকলেই এ মহাসত্যের নিকট আত্মসমর্পণ করেছে এবং সমগ্র সৃষ্টি মহাসত্যের কঠোর বন্ধনে আবদ্ধ।

------------------------------------------------------------------------------------------

“আমরা তোমাদের নিকট যে কিতাব প্রেরণ করেছি তার মধ্যে তোমাদেরই বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তোমরা কি তা বুঝে দেখছ না? কত অত্যাচারী জনপদকে আমরা ধ্বংস করে দিলাম। তারপর অন্য জাতিকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করলাম। আমাদের পক্ষ থেকে আযাব যখন নেমে এসেছিল, তখন তারা ছুটে পালাতে শুরু করেছিল। (তাদের বলা হয়েছিল) পালিয়ে যেও না। নিজেদের বাড়ী ও চিত্তবিনোদনের স্থানগুলোতে ফিরে যাও। তোমাদের কৃতকর্মের হিসেব সেখানেই হবে।  তারা বলল, ‘হায় ! আমাদের সুর্ভাগ্য ! অবশ্যই আমরা অপরাধী।’ তারা এভাবে কাতর ভাষায় চীৎকার করে যাচ্ছিল, যতক্ষণ না আমরা তাদের ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ণ করে দিয়েছিলাম। আকাশ, পৃথিবী ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী বিষয়গুলোকে আমরা ছেলেখেলার জন্যে সৃষ্টি করিনি। যদি খেলনা তৈরী করাই আমাদের উদ্দেশ্য হতো, তাহলে (অন্যবিধ উপায়) খেলার সরঞ্জাম সৃষ্টি করতাম। কিন্তু আমরা মহাসত্যের আঘাত হেনে বাতিলের মস্তক চুর্ণ করে দেই। তারপর বাতিল নিশ্চিহ্ণ হয়ে যায় এবং তোমরা যেসব মনগড়া কথা বলে থাক সেগুলোর মধ্যেই রয়েছে তোমাদের ধ্বংসের উপকরণ। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে, সবকিছুই আল্লাহর। আর তাঁর নিকট যেসব ফেরেশতা রয়েছে, তারা অহংকারের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর বন্দেগী থেকে কখনো বিরত হয় না এবং কখনো হীনতার শিকারে পরিণত হয় না। রাতদিন তারা তাসবীহ পড়ে এবং কখনো বিন্দুমাত্র এদিক-ওদিক করে না।” — আন্বিয়া: ১০-১২
    

সৃষ্টজগত সহাসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত

    মানবে প্রকৃতির গভীর অন্তস্থলে মহাসত্যের পূর্ণ অনুভুতি বিদ্যমান। মানুষের দেহ-সৌষ্ঠব ও গঠন প্রকৃতি এবং তার চারপাশে বিরাজমান বিশাল সৃষ্টি জগতের সৃষ্টি নৈপূণ্য ও উপরণাদি তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাজগত মহাসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। মহাসত্যই তার মূল উপাদান এবং তা একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় আইনের রূপ ধারণ করে সৃষ্টিকে স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তা দান করে। এ জন্যেই সৃষ্ট জগতের কোথাও বিশৃংখলা দেখা দেয় না। এর এক অংশ অপর অংশের সাথে সংঘর্ষ বাঁধায় না। কোথাও উদ্দেশ্যহীন কোন কিছু ঘটতে দেখা যায় না। সমগ্র সৃষ্টিতে নিছক দুর্ঘটনার ফল মনে করারও কোন সঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। সৃষ্টির কোন কিছুই পরিকল্পনাবিহীন নয়। অথবা এখানে বিকারেগ্রস্থ মানুষের উদ্ভট কার্যকলাপের চিহ্ণমাত্র পরিদৃষ্ট হয় না। বরং সৃষ্ট জগতকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতার সাথে সুনিদিষ্ট পথে অত্যন্ত স্বচ্ছন্দে পরিচালিত হতে দেখা যায়। মানুষ যখন তার অন্তরের গভীরতম প্রদেশে লুকায়িত মহাসত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেরই প্রকৃতির বিপরীত মুখে চলতে শুরু করে এবং স্বেচ্ছাচারী প্রবৃত্তির চাপে আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে নিজের মতামতকেই প্রাধান্য দেয়, তখনই বিপর্যয়ের সূচনা হয়। সমগ্র সৃষ্ট জগতের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে বিশ্বের প্রতিপালকের সমীপে আত্মসমর্পণ করার পরিবর্তে মানুষ বিদ্রোহ ঘোষণা করে ; তখনই সর্বত্র অশান্তি দেখা দেয়।

মহাসত্য থেকে বিচ্যুতির কুফল

    মানুষ ও তার নিজের প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক জগতের মধ্যে বৈপরিত্য ও সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেলে তা ক্রমে বিস্তার লাভ করে এবং ব্যক্তি, বিভিন্ন ব্যক্তি সমষ্টি বা দল ভিন্ন ভিন্ন জাতি এবং গোত্রের মধ্যে বিচ্ছেদ ও বিরোধ সৃষ্টি করে দেয়। ফলে মহাজগতের সকল শক্তি ও সম্পদ মানুষের উন্নতি ও কল্যাণে নিয়োজিত না হয়ে মানবজাতির ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
    উপরের আলোচনা থেকে জানা যায় যে, দুনিয়াতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য শুধু আখেরাতের কল্যাণ নয়। দুনিয়া ও আখেরাত দু’টি পৃথক পৃথক বস্তু নয় বরং পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত শরীয়াতে এ উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করে এবং মানব জীবনকে মহাবিশ্বে বিরাজমান সুদৃঢ় আইন-বিধানের সাথে সংযুক্ত করে দেয়। মহাবিশ্বে বিরাজমান আইন বিধানের সাথে মানব জীবনের সামঞ্জস্য স্থাপিত হবার ফলে মানুষ অপরিমিত সৌভাগ্য ও কল্যাণ লাভের যোগ্যতা অর্জন করে এবং এ সুফল শুধু আখরাতের জন্যে মুলতবী থাকে না। বরং দুনিয়ার জীবনেও তার সুফল প্রকাশ পায়। অবশ্য ইসলামী জীবনাদর্শের সুফল প্রাপ্তি আখরাতেই পূর্ণতা লাভ করবে।
    সৃষ্ট জগত ও জগতের একটি অংশ হিসেবে মানুষ সম্পর্কে ইসলামী ধারণার মৌলিক কথা উপরে আলোচিত হলো। এ ধারণা দুনিয়ায় প্রচলিত সকল ধারণা –বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ জন্যই সৃষ্টজগত ও মানুষ সম্পর্কিত ইসলামী ধারণা মানুষের প্রতি কতিপয় দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপ করে না। ইসলামী ধারণা অনুসারে মানব জীবন ও সৃষ্টি জগতের মধ্যে এবং মানুষের প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বিশ্বে বিরাজমান আইন-কানুনের মধ্যে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য থাকা দরকার। আর আল্লাহর বান্দা হয়ে জীবন যাপনে সক্ষম হবে এবং কোন মানুষই অন্য কারো উপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে সচেষ্ট হবে না।
    আমরা উপরে যে বিষয় আলোচনা করেছি তা মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আ) ও নমরুদের কথোপকথন থেকে পরিস্কারভাবে বুঝা যায়। নমরুদ ছিল একজন অত্যাচারী শাসক। সে খোদায়ী দাবী করতো। কিন্তু সে প্রাকৃতিক জগত, মহাশূন্য, গ্রহ ও নক্ষত্রাদির উপর খোদায়ী দাবী করেনি। তার সামনে হযরত ইবরাহীম (আ) যুক্তি পেশ করেন যে, প্রাকৃতিক জগতের উপর যার নিরংকুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, মানব জীবনে শুধু তাঁরই সার্বভৌমত্ব চলতে পার, অন্য কারো নয়। নমরুদ এ যুক্তির কোনই জবাব দিতে পারেনি।
    পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘটনাটি নিম্নর ভাষায় বর্ণনা করেছেন —
-------------------------------------------------------------------------------------------
 “তুমি কি সে ব্যক্তির বিষয়টি ভেবে দেখেছ যে, ইবরাহীম (আ) –এর সাথে তার ‘রব’ সম্পর্কে এ জন্যে বিতর্ক লিপ্ত হয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে একটি রাজ্য দান করেছিলেন। ইবরাহীম (আ) যখন বলেন, “যার হাতে জীবন মৃত্যু তিনিই আমার রব” ; তখন সে ব্যক্তি বলল, “আমিই জীবন ও মৃত্যুর মালিক” ইবরাহীম (আ) তখন বললেন, “আচ্ছা আল্লাহ প্রতিদিন পূর্বদিক থেকে সূর্য উদিত করেন, তুমি পশ্চিম দিকে সূর্যোদয় করে দেখাও তো।” সত্য অস্বীকারকারী ব্যক্তি তখন নিরুত্তর হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা যালিমদেরকে সহজ-সরল পথ দেখান না।”
আল্লাহ তাআলা পুনরায় যথার্থ রূপেই বলেছেন—

-------------------------------------------------------------------------------------------
“তারা কি আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ছেড়ে অন্য কোন পথ অবলন্বন করতে চায়? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছুই স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় তাঁর আনুগত্য করে চলেছে। আর পরিণামে সকলকে তাঁর নিকট ফিরে যেতে হবে।” — আলে ইমরান: ৮৩

                ____________________




সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )