আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা</h1>
প্রশ্ন : সূরা আন্‌ নাজমের নিম্নের আয়াত দু'টির প্রতি দু'টি আকর্ষণ করছি :
            ---------------------------------------------------------------
"অত:পর সে নিকটে এলো এবং ঝুঁকে পড়লো, এমনকি দুই ধনুকের সমান কিংবা তার চেয়েও কিছু কম দুরত্ব থেকে গেলো।" (সূরা আন্‌ নাজম, আয়াত : ৮-৯)

এখানে ------------- নিকটে এলো এবং উপরে ঝুলে রইলো এই ক্রিয়া দু'টির কর্তা জিবরাঈল, এই ধারণাই সাধারণভাবে প্রচলিত। অথচ বুখারি শরিফের মিরাজ সংক্রান্ত হাদিসে বলা হয়েছে :
---------------------------------------------------------------------------------
"অবশেষে রসূল সা, 'সিদরাতুল মুনতাহা'তে গিয়ে পৌঁছলেন। তখন মহাপরাক্রান্ত প্রভু রসূল সা,-এর কাছে এগিয়ে এলেন, অত:পর এরা ঘনিষ্ঠ হলেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ রসূল সা.-এর দুই ধনুক পরিমাণ বা তার চেয়েও নিকটবর্তী হলেন।"

এ হাদিসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা আইনী ও আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, রসূল সা. পবিত্র চেহারা চর্মচক্ষু দিয়েই দেখেছেন। রসূল সা. বলেছেন:
                    ---------------------------------------------------
"আমি আমার প্রভুকে সর্বোত্তম আকৃতিতে দেখেছি।"
এর পরবর্তী আয়াতে বলা রয়েছে:---------------------------------
"অত:পর তিনি স্বীয় বান্দার নিকট যা ওহী করার ছিলো করলেন।" (সূরা আন্‌ নাজম, আয়াত : ১০)

এর দ্বারা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, নিকটে আসা, ঝুলে থাকা, দুই ধনুক বা তার চেয়ে নিকটে আসা-এসব ক্রিয়ার কর্তার জিবরাঈল নয় বরং আল্লাহ তায়ালা। নচেত রসূল সা, জিবরাঈলের বান্দাহ সাব্যস্ত হন (নাউযুবিল্লাহ)।

আমার বুঝে আসেনা, বুখারি এই বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্ট হাদিস থাকা সত্ত্বেও এরূপ ব্যাখ্যা করা কিভাবে সঙ্গত হতে পারে, যাতে আল্লাহর পরিবর্তে জিবরাঈলের সাথে সাক্ষাত ও জিবরাঈলের ঘনিষ্ঠ হওয়া বুঝায়? রসূল সা. যে চর্মচক্ষু দিয়েই আল্লাহর সত্তাকে দেখেছেন এবং অতি নিকট থেকেই দেখেছেন, সে কথা অস্বীকার করার কি যুক্তি থাকতে পারে?

জবাব : সূরা আন্‌ নাজম, বিশেষত তার প্রথম রুকু কুরআনের জটির স্থানসমূহের অন্যতম। এর বেশির ভাগ আয়াত 'মুতাশাবিহাত' (রূপক অর্থবোধক) এর অন্তর্ভুক্ত, যার সঠিক মর্ম একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। তথাপি সুদক্ষ আলেমগণ নিজ নিজ প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে সাধ্যমত তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

এ সূরাটি সম্পর্কে সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন জাগে তা হলো, এটি কখন নাযিল হয় এবং এতে যে গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর ঘটনাবলীর বিবরণ রয়েছে, রসূল সা.-এর জীবনের কোন্‌ পর্যায়ে সংঘটিত হয়? সূরা আন নাজমের সাধারণত মক্কী জীবনের প্রাথমিক যুগের সূরা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং অন্য কয়েকজন সাহাবি থেকে বুখারি ও অন্যান্য সহীহ হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত বহু সংখ্যক হাদিস থেকে জানা যায় যে, সূরা নাজমই সেই প্রথম সূরা, যার শেষ আয়াত থেকে তেলাওয়াত সিজদার সূচনা হয়। এখন সমগ্র সূরাটি যদি মক্কী যুগের প্রথম দিকে নাযিল হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রথম রুকু সূরা বনী ইসরাইলে বর্ণিত মিরাজের ঘটনার সাথে কিভাবে সংশ্লিষ্ট হতে পারে? মি'রাজ তো প্রামান্যতম হাদিস অনুসারে হিজরতের মাত্র এক বা দেড় বছর আগের ঘটনা।

এই জটিলতা নিরসনের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন কেউ কেউ বলেছেন, মিরাজের ঘটনা একাধিকবার সংঘটিত হয়েছে। আবার কারো কারো মতে, এ সূরার প্রথমাংশ মক্কী যুগের প্রথম দিকে এবং পরবর্তী অংশ মক্কী যুগের শেষ ভাগে নাযিল হয়েছে। অন্য কথায় বলা যায় :
              ---------------------------------------------------
'তখন সে ঊর্ধ্ব দিগন্তে; অত:পর সে এগিয়ে এলো এবং ঘনিষ্ঠতর হলো।' এ আয়াতে যে ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, সেটা মি'রাজের আগের ঘটনা। আর --------------------- 'নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরো একবার দেখেছেন।' এবং এর পরবর্তী আয়াতগুলোতে যা বর্ণিত হয়েছে তা মি'রাজ রজনীর ঘটনা। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি হাদিস থেকেও এরূপ তথ্য পেশ করা হয় যে, মি'রাজের আগেও হেরা গুহায়, আবতাহ উপত্যকায় বা অন্য কোনো স্থানে রসূল সা. কর্তৃক জিবরাঈলের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের ঘটনা ঘটেছিলো যা --------------------- বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু মি'রাজের চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাথে সূরা নাজমের কোনো একটি অংশ জুড়ে দিলে যে জটিলতার উদ্ভব হয়, এসব মতামত ও ব্যাখ্যা দ্বারা তা পুরোপুরি নিরসন হয়না। সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ভুল অভিমত সম্ভবত এই যে, এই সূরার কোনো অংশকেই মি'রাজের সাথে জড়িত করা ঠিক নয়। এর প্রথম রুকুতে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তাকে নবুওয়াতের সূচনাকালে রসূল সা. -কে যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে, তারই কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে গণ্য করতে হবে। রসূল সা.-এর মধ্যে ওহীর গুরুভার গ্রহণ ও বহনের ক্ষমতা এবং জিবরাঈল ও ফেরেশতা জগতের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও একাত্মতার মানসিকতা গড়ে তোলাই এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিলো। কুরআন ও হাদিসে এ সম্পর্কে আরো কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এখানে সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার অবকাশ নেই।

তথাপি যদি নাযিলের পটভূমির ব্যাপারটা বাদ দিয়ে এ সূরার সম্পর্ক মি'রাজের সাথে মেনেও নেয়া হয়, তাহলেও আরেকটা প্রশ্ন মাথা তুলে দাড়ায়। সেটি হলো, এর প্রথম আয়াত কয়টির নিগুঢ় মর্ম কি? 'শক্তিধর শিক্ষক' কে ছিলেন, ঊর্ধ্ব দিগন্তে বিরাজমান সত্তাটির পরিচয় কি, কে কার কাছে ঘনিষ্ঠ হলো, কে ঝুঁকে পড়লো, কে ওহী করলো এবং কে কাকে পুনরায় সিদরাতুল মুন্তাহাতে আবির্ভূত হতে দেখলো? প্রাচীন ইমামদের কেউ কেউ বলেন, পুরো ঘটনাটিই স্বয়ং আল্লাহ ও রসূল সা.-এর মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো, উর্ধ্ব দিগন্তে স্বয়ং আল্লাহই বিরাজিত হয়েছিলেন, আল্লাহই স্বীয় নবীর অথবা নবী আল্লাহর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলেন। এই ঘনিষ্ঠতা ও নৈকট্য তাঁদের মতে স্থানভিত্তিক ব্যাপার ছিলনা। ওটা ছিলো আত্মিক নৈকট্য। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুসারে :
                   --------------------------------------------------------
"তিনি চক্ষু দিয়ে যা দেখেছেন, তাঁর অন্ত:করণ তা অস্বীকার করেনি তিনি তাঁকে সিদরাতুল মুন্তাহাতে আরো একবার দেখেছেন।"

এসব উক্তিতে যে দর্শকের কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা রসূল সা. কর্তৃক আল্লাহকে সরাসরিভাবে দশনের সৌভাগ্য অর্জন বুঝানো হয়েছে। তবে এই দর্শন চর্মচক্ষুর দর্শন, না অন্তর দিয়ে দর্শন এবং স্বয়ং আল্লাহর সত্তার দর্শন, না শুধু তাঁর জ্যোতি দর্শন, সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।

এ মতের সপক্ষে যেসব প্রমাণ দর্শানো হয়, বুখারি শরিফের আলোচ্য হাদিসটি তার অন্যতম। কিন্তু এ হাদিস থেকে প্রমাণ দর্শানো জটিলতা থেকে মুক্ত নয়। এ প্রসঙ্গে সূরা আন নাজমের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর ব্যাখ্যার জন্য আলোচ্য হাদিসটির উপর নির্ভর করাও সঙ্গত নয়। প্রথমত, এ হাদিসে 'মহা পরাক্রান্ত মহিমান্বিত প্রভু এগিয়ে এলেন এবং এতো ঘনিষ্ঠ হলেন যে, তাঁর (রসূলের) কাছ থেকে তার ব্যবধান দুই ধনুকের সমান বা তার চেয়েও কম রইলো' এ কথাগুলো রয়েছে। ইমাম বুখারি এটি কিতাবুত তাওহীদে 'হযরত মূসার সাথে আল্লাহর প্রত্যক্ষ কথোপকথন' শীর্ষক অধ্যায়ের বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। হাদিসটির সূত্র পরম্পরা হযরত আনাস পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। বুখারির অন্য কয়েকটি অধ্যায়ে মি'রাজ সম্পর্কে একাধিক 'মারফু' (অর্থাৎ যা উপরোক্ত হাদিসের ন্যায় কোনো সাহাবি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়নি বরং তার সূত্র পরম্পরা খোদ রসূলুল্লাহ সা. পর্যন্ত উপনীত হয়েছে। এরূপ হাদিস উপরোক্ত হাদিসের চেয়ে উন্নতমানের ও বিশ্বস্ততর অনুবাদক) হাদিস রয়েছে, যা হযরত আনাস ও অন্যান্য সাহাবি কর্তৃক সরাসরি রসূল সা. থেকে বর্ণিত। সে সব হাদিসে সূরা আন নাজমের এ শব্দগুলো এরূপ ব্যাখ্যা সমেত বর্ণিত হয়নি। বরঞ্চ এ হাদিসটি একাধিক দিক দিয়ে ঐসব মারফু হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক।

আলোচ্য হাদিসটি সম্পর্কে দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য কথা হলো, এর সনদ বা বর্ণনাসূত্র এবং মূল হাদিসের ভাষা সম্পর্কে হাদিস বিশেষজ্ঞগণ তত্ত্ব ও তথ্যগতভাবে একাধিক আপত্তি তুলেছেন। এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে শরিক বিন আব্দুল্লাহ নামে এক বিতর্কিত ব্যক্তি বিদ্যমান। বুখারি শরিফের একাধিক টীকাগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো কোনো মুহাদ্দিস এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অত্যন্ত ক্ষুরধার সমালোচনা চালিয়েছেন। সম্ভবত এ কারণেই ইমাম মুসলিম স্বীয় গ্রন্থে কিতাবুল ঈমানের মি'রাজ অধ্যায়ে শরিকের এই রেওয়ায়েতটি সনদ বর্ণনা করার পর মূল হাদিসের একটিমাত্র অংশ উল্লেখ করেই ক্ষান্ত থেকেছেন। অত:পর এই বর্ণনাকারীর সমালোচনা ও তার সম্পর্কে পাঠককে সতর্ক করার লক্ষ্যে নিজস্ব মন্তব্য হিসেবে নিম্নোক্ত বাক্যটি লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন।
                 ---------------------------------------------------
"এই ব্যক্তি এ হাদিসটির কিছু বক্তব্যকে আগ-পাছ করে দিয়েছেন। এবং কিছু কম বেশিও করেছেন।"
বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থের তাফসির সংক্রান্ত অংশে (কিতাবুত তাফসির) এ হাদিসে বর্ণনা করা হয়নি।

উল্লেখিত হাদিসটির ভাষা, বক্তব্য ও বিষয়ের উপর তত্ত্বগতভাবেও বহু বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। ইমাম খাত্তাবিও যে ভাষায় সমালোচনা করেছেন, তা ফাতহুল বারী ও উমদাতুল ক্কারী উভয় গ্রন্থে লক্ষণীয়। ---------------------------- "মহাপরাক্রান্ত মহিমান্বিত প্রভু কাছে এগিয়ে গেলেন এবং ঘনিষ্ঠতর হলেন", (বা ঝুঁকে পড়লেন) এই ব্যাখ্যাসূচক বক্তব্যে সম্ভাব্য আপত্তি ও তার জবাব খোদ ইমাম খাত্তাবীর ভাষায় আল্লামা ইবনে হাজর বর্ণনা করেছেন। ইমাম খাত্তাবি এবং স্বয়ং ইবনে হাজর এ আপত্তি নিরসনের উদ্দেশ্যে এরূপ ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, আসলে এটা ছিলো একটা স্বপ্ন। কেউ যদি স্বপ্নযোগে দেখতে পায় যে আল্লাহ তার কাছে এগিয়ে গেলেন, ঘনিষ্ঠতর হলেন অথবা কোনো বিশেষ জায়গায় হঠাৎ আবির্ভূত বা অবতীর্ণ হলেন তাহলে সেটা তেমন আপত্তিকরণ বা অভাবনীয় ব্যাপার নয়। তথাপি উল্লেখিত বাচনভঙ্গির আলোকে অর্থাৎ ------------------------ (মহাপরাক্রান্ত মহিমান্বিত প্রভু এগিয়ে গেলেন ও ঘনিষ্ঠতর হলেন) সমগ্র আয়াত সমষ্টির যে ব্যাখ্যা দাঁড়ায় এবং মহান স্রষ্টা আল্লাহর সত্তার যে ভাবমূর্তি ও চিত্রকল্প প্রকাশ পায় তা কোনো অতি প্রাকৃতিক জগতে বা স্বপ্নে সংঘটিত হওয়াও আপত্তিজনক অযৌক্তিক।

আসলে শরীকের বর্ণিত এই হাদিসটিতে আরো বহু আপত্তির বিষয় রয়েছে। সে সবের বিশত বিবরণ দেয়া এখানে নিস্প্রয়োজন এবং তাতে অযথা আলোচনার কলেরব বৃদ্ধি পাবে। হাফেয ইবনে হাজর (বুখারির ব্যাখ্যা ফাতহুল বারীর রচয়িতা) স্বয়ং এগারোটা বা তার চেয়েও বেশি আপত্তির উল্লেখ করেছেন এবং তা নিরসনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কয়েকটি জবাব পুরোপুরি সন্তোষজনক হয়নি। উদাহরণস্বরপ আলোচ্য হাদিসটির সূচনা এভাবে হয়েছে :
-------------------------------------------------------------------------------------------------------
"এক রজনীতে রসূর সা.-কে কা'বা শরিফ সংলগ্ন মসজিদ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর নিকট ওহী আসার আগে তাঁর কাছে তিনজন আগন্তুক এসেছিলো।"

এখানে উল্লেখিত রাত্রিকালীন ভ্রমণ দৃশ্যত ওহী শুরুর আগেকার ঘটনা। আর এর অব্যবহিত পরেই হাদিসের মূল ভাষ্যে যে বিবরণ তা থেকে মনে হয়, তিনি মসজিদে হারামে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তিনজন ফেরেশতা আসেন। তাদের একজন বলেন : এই তিনজনের মধ্যে মুহাম্মদ সা.-কে? দ্বিতীয়জন তাঁকে দেখিয়ে দিলে তৃতীয়জন বললেন : তাঁকে নিয়ে চলো। ঐ রাতে আর কোনো ঘটনা ঘটেনি। এমনকি রসূল সা. আগন্তুক ফেরেশতাদেরকেও দেখেননি। হাদিসের পরবর্তী অংশে অন্য ঘটনাবলীর বিবরণ রয়েছে, তা অন্য কোনো রাতে সংঘটিত হয়েছে। এখন মাত্র তিনজন ফেরেশতার আগমনকে 'ইসরা' (রাত্রিকালীন ভ্রমণ, নামে আখ্যায়িত করা উপরন্তু তাকে প্রাক্‌-ওহীর ঘটনা বলে অভিহিত করা একটা জটিল ধাঁধা ছাড়া কিছু নয়।) এই জট খোলার জন্য ইমাম ইবনে হাজর বলেন
              -------------------------------------------------------------------
"হাদিসটির বর্ণনাকারী হয়তো বলতে চেয়েছেন, এটা ওহীর পরের ঘটনা কিন্তু বলে ফেলেছেন ওহীর আগের ঘটনা।"

যাই হোক, একদিকে রয়েছে এই হাদিস। অপরদিকে বুখারি ও মুসলিমের অন্যান্য অধ্যায়ে, বিশেষত বুখারির কিতাবুত তাফসিরের সূরা আন নাজমে বর্ণিত একাধিক হাদিস থেকে জানা যায় যে, সূরা আন নাজমে সাক্ষাত ও সান্নিধ্য লাভের যে বিবরণ রয়েছে, তা মুহাম্মদ সা. ও জিবরাঈলের মধ্যে সংঘটিত হয়। ইমাম বুখারি যে সূরা আন নাজমের তাফসিরে এই শেষোক্ত হাদিসসমূহের উল্লেখ করলেন এবং শরিকের বর্ণিত হাদিসের উল্লেখ করলেননা, তা থেকেই বুঝা যায় যে, তার ব্যক্তিগত মতে এই সূরায় বর্ণিত ঘটনাবলীতে দ্বিতীয়পক্ষ আল্লাহ নন, জিবরাঈল।
যেমন 'দুই ধনুকের সমান ব্যবধান বা তার চেয়েও কম' এই কথাটির তাফসির সংক্রান্ত অধ্যায়ে তিনি হযরত ইবনে মাসউদের বর্ণিত এ হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন :
                      --------------------------------------------------
"রসূল সা. ছয়শো ডানা বিশিষ্ট জিবরাঈলকে দেখতে পেলেন।" মুসলিম শরিফেও কিতাবুল ঈমানে "তিনি তাকে আরো একবার সিদরাতুল মুনতাহার নিকট আবির্ভুত হতে দেখেছেন" এ আয়াতের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত অধ্যায়ে ইবনে মাসউদের এই হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে। একই অধ্যায়ে আরো কিছু পরে মাসরুক কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা বলেন : 'তিনটি জিনিস এমন রয়েছে, যার একটিও কেউ বললে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপকারী হিসেবে গণ্য হবে।' বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলেন: সেই তিনটি জিনিস কি কি? হযরত আয়েশা বললেন: যে ব্যক্তি বলবে যে মুহাম্মদ সা.স্বীয় প্রভুকে দেখেছেন, সে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপকারী। বর্ণনাকারী বলেন : এই সময় আমি হেলান দিয়ে বসেছিলাম। তৎক্ষণাৎ উঠে সোজা হয়ে বসলামঠ। বললাম: "উম্মুল মুমিনীন! একটু থামুন। তাড়াহুড়া করবেননা।"
               ---------------------------------------
"নিশ্চয় তিনি তাঁকে দেখেছেন মুক্ত দিগন্তে।"
              ---------------------------------------
"নিশ্চয় তিনি তাকে আরো একবার দেখেছেন।"

এ কথা দু্টো কি আল্লাহ বলেননি? হযরত আয়েশা বললেন : এই উম্মতের মধ্যে আমিই প্রথম এ দুটো আয়াত সম্পর্কে রসূল সা. -কে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেছেন : "সে তো জিবরাঈল আমি তাকে তার আসল আকৃতিতে ঐ দুবার দেখেছি।" অত:পর হযরত আয়েশা রা. বললেন : তুমি আল্লাহর এ উক্তি শোনোনি?
               -------------------------------------------------
"আল্লাহকে চোখ দিয়ে দেখা যায়না, অথচ সকল চোখ তার দৃষ্টির আওতাধীন।"(সূরা আল আনয়াম, আয়াতাংশ : ১০৩) এবং
---------------------------------------------------------------------------------
"কোনো মানুষ আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারেনা পর্দার অন্তরালে থেকে ব্যতীত অথবা তিনি নিজে যে প্রতিনিধি পাঠান তার মাধ্যমে ব্যতীত।" (সূরা আল শূরা, আয়াতাংশ : ৫১)

উল্লেখিত হাদিসে হযরত আয়েশা রা. নিজের পক্ষ থেকে যা কিছু বলেছেন তা নিয়ে কোনো দ্বিমতের অবকাশ থাক বা না থাক, তিনি রসূল সা.-এর যে উক্তি উদ্ধৃত করেছেন তা মারফু (প্রত্যক্ষভাবে রসূল সা. থেকে শ্রুত) হাদিসের মর্যাদা রাখে। তাই এই ব্যাপারে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। এ হাদিস থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, সূরা আন নাজমের আয়াতগুলোতে রসূল সা. ছাড়া দ্বিতীয় যে সত্তার উল্লেখ রয়েছে, তিনি জিবরাঈল ছাড়া আর কেউ নন।

বুখারির ব্যাখ্যাতা হাফেয ইবনে হাজর বা আল্লামা আইনীর এমন কোনো উক্তি আমি তাদের প্রণীত গ্রন্থ দু'টির কোথাও দেখিনি যে, রসূল সা. মি'রাজের সময় বা অন্য কোনো সময় চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে দেখেছেন। বরঞ্চ এর বিপরীত উক্তি অনেক রয়েছে। বুখারির কিতাবুত তাফসিরের সূরা আন নাজমের আয়াত ------------------------- এর তাফসির সম্বলিত অধ্যায়ে টীকাকার ইবনে হাজর বলেন: রসূলুল্লাহ সা. যাকে দেখেছেন তিনি যে জিবরাঈল, আয়াতগুলো থেকে সেটাই অধিকতর স্পষ্ট। কিতাবুত তাওহীদেও তিনি ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, নশ্বর জগতে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। ---------------------------------- "আমার প্রভুকে আমি সুন্দরতম আকৃতিতে দেখেছি" এ উক্তি সম্বলিত হাদিসের মূল ভাষ্যটি থেকে সামগ্রিকভাবে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, এখানে স্বপ্নযোগে দেখার কথা বলা হয়েছে। কাজেই এ হাদিস থেকে চাক্ষুস দর্শন বুঝা ঠিক নয়। এ হাদিসটি আহমাদ এ তিরমিযির বরাত দিয়ে মিশকাতের নামায ও নামাযের স্থান সংক্রান্ত অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। অন্য কয়েকটি হাদিসেও আল্লাহর দর্শন লাভের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু সেগুলোতেও চাক্ষুস দর্শনের স্পষ্টোক্তি নেই।

সর্বশেষে যে আপত্তিটি মীমাংসার অপেক্ষায়, তাহলো এই যে : ------------------  (তিনি দুই ধনুকের সমান বা তার চেয়েও কম ব্যবধানে রইলেন) এ আয়াতে ক্রিয়ার কর্তা যদি আল্লাহ না হয়ে জিবরাঈল হন, তা হলে এর ঠিক পরবর্তী আয়াতে শব্দটির সর্বনাম দ্বারা যাকে বুঝানো হবে, পূর্ববর্তী বাক্যে তার উল্লেখ থাকা চাই। পক্ষান্তরে সর্বনাম দ্বারা জিবরাঈলকে বুঝালে মুহাম্মদ সা. -কে জিবরাঈলকে বান্দাহ ধরা হয় -অনুবাদক। এ আপত্তিটা খুব গুরুতর নয়। কারণ সর্বনামের অভিষ্ট ব্যক্তির নাম পূর্ববর্তী বাক্যেই থাকা সব সময় জরুরি নয়। কুরআন এবং প্রচলিত আরব বাকরীতিতে তা পরবর্তী বা দুরবর্তী কোনো বাক্যে বিদ্যমান থাকা বা উহ্য থাকার দৃষ্টান্ত থাকে। যে সকল আলেম ও তাফসিরকারের মতে সূরা আন নাজমের আলোচ্য আয়াতগুলোকে বর্ণিত দ্বিতীয় পক্ষ হচ্ছেন জিবরাঈল, তারা সকলেই ---------- শব্দের সর্বনামের অর্থ আল্লাহ বলেই স্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য এই যে, ----------- এবং ------------ শব্দ দুটির উপস্থিতিই এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য। [তরজমানুল কুরআন, মে ১৯৬৬]



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )