আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা</h1>
প্রশ্ন : উশর (ফসলের যাকাত হিসেবে দেয় দশভাগের একভাগ) ও খারাজ (ইসলামি বিধান অনুসারে ভূমিকর) সংক্রান্ত কয়েকটি সমস্যার সমাধান প্রয়োজন, বিস্তারিত জানিয়ে উদ্বেগ নিরসনের অনুরোধ জানাচ্ছি।

আমার মতে উপমহাদেশের ভূমি উশরযোগ্য নয় বরং খারাজযোগ্য। বর্তমান সরকার আমাদের কাছ থেকে যে রাজস্ব আদায় করে থাকে তা খারাজের পর্যায়ে পড়ে। ইতিহাসের গ্রন্থাবলী থেকেও তারই আভাস পাওয়া যায়। ইবনে আসীর আল কামিল গ্রন্থের ২০৫ পৃষ্ঠায় মুহাম্মদ বিন কাসেমের সিন্ধু বিজয় সম্পর্কে বলেছেন, বিজিত এলাকার অধিবাসীদের জানমাল ও ভূ-সম্পত্তি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। কেবল ভূমির উপর শরিয়তের বিধান মোতাবেক খারাজ আরোপ করা হয়েছিল। অত:পর ৩৯২ হি. সনে জয়পাল সুলতান মাহমুদের কাছে গিয়ে বলে : "আমার অপরাধ ক্ষমা করুন এবং আমাকে ছেড়ে দিন। এখন থেকে আমি যত দিন বেঁচে থাকবো আর কখনো আনুগত্য থেকে বিচ্যুত হবোনা এবং বার্ষিক খারাজ নিয়মিতভাবে দিতে থাকবো। এতে কোনো রকম ওজর আপত্তি ও টালবাহানা করবোনা।" বস্তুত এই খারাজই সকল মুসলিম শাসনামলে চালু ছিলো। আইনে আকবরি গ্রন্থের সাক্ষ্য এই যে, মোগল শাসনামলেও এই রীতি প্রচলিত ছিলো। আমাদের এতোদঞ্চলের ভূমিতে কখনো উশর চালু ছিলো বলে কোনো ইতিহাস গ্রন্থেই তথ্য পাওয়া যায়না। সুতরাং আমাদের দেশের ভূমির বাবদে উশরের বদলে খারাজ প্রদানই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। আর সেই খারাজও প্রচলিত খাজনার আকারেই আদায় হয়ে যাচ্ছে। কেননা শরিয়তের সর্বস্বীকৃত বিধান হলো, মুসলমানদের উপর একই সাথে খারাজ ও উশর দুটোই আরোপিত হতে পারেনা। ----------------------------------------
(আল কামিল, ইবনে আদী কর্তৃক বর্ণিত, ফাতহুল কাদীর ৪র্থ খণ্ড)

পক্ষান্তরে আমাদের জমি যদি উশরযোগ্য হয়, তাহলে যেসব জমিকে নদীর পানি দ্বারা সিঞ্চিত করা হয়, তার উপর সরকার দু'ধরণের কর আরোপ করে থাকে। একটি হচ্ছে সেচ কর, অন্যটি খাজনা। এ ধরণের জমিতে এক দশমাংশ দিতে হবে, না এক বিংশতি অংশ? আর সেটা খাজনা বাদে, না খাজনা সমেত?

অধিকাংশ ভূমি মালিক বর্গাচাষীদের দ্বারা চাষ করিয়ে থাকেন, যাদের সাথে ফসলের অর্ধাংশ দেয়ার চুক্তি নির্ধারিত থাকে। কোনো কোনো ভূমি মালিক কৃষি শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। তাদের নির্ধারিত মজুরি ঐ জমির উৎপন্ন ফসল থেকে ফসল কিংবা নগদ টাকার আকারে দেয়া হয়। কোনো কোনো ভূমি মালিক আবার নিজেও চাষ করে থাকে। এখন উশর কি উভয়ের উপর আরোপিত হবে, না শুধু ভূমি মালিকের উপর? যদি উভয়ের উপর হয়, তবে ফসল ভাগ বাটোয়ারা হওয়ার পর, না আগে? আর এতে পাঁচ ওয়াসাক ন্যূনতম নিসাব নির্ধারিত, না যে কোনো পরিমাণের উপর উশর ধার্য হবে?

ফসল ছাড়া যে পশুখাদ্য উৎপন্ন হয়,  তার বেশিরভাগ কৃষিকাজে ব্যবহৃত পশুই খেয়ে ফেলে। একটা অংশ বিক্রি হয়। এই অংশের উপর উশর দিতে হবে কিনা?

জবাব : উপমহাদেশীয় ভূমি উশরযোগ্য, না খারাজযোগ্য, তা নিয়ে অনেক আলোচনা ও বাদানুবাদ চলে আসছে। তবে এতদঞ্চলের হানাফি ও আহলে হাদিসসহ সকল মাযহাবের মান্যগণ্য আলেমদের ফতোয়া অনুসারে মুসলমানদের মালিকানাধীন জমিতে উশর দেয়াই সঠিক ও সাবধানী পন্থা। নিজ ভূমি থেকে ফসল অর্জনকারী মুসলমান মাত্রই কুরআনের নির্দেশ ----------------------- "ফসল ঘরে তোলার দিন ফসলের প্রাপ্য পরিশোধ কের দাও" অনুসারে উশর দিতে সর্বাবস্থায় বাধ্য। আপনি যে কয়টি উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা এ ব্যাপারে কোনো সঠিক ও কার্যকর দিক নির্দেশনা দিতে সক্ষম নয়।

প্রথমত, প্রত্যেক মুসলমান সরকার যে কোনো ভূমি রাজস্ব আদায় করলেই তাকে খারাজ বা উশর নামে অভিহিত করা যায়না। শরিয়তে খারাজ ও উশরের জন্য যে উদ্দেশ্য ও নিয়মবিধি নির্ধারিত রয়েছে, ঠিক সেই উদ্দেশ্যে ও সেই নিয়মবিধি অনুসারে একটি ইসলামি সরকারের অধীনে যে ভূমি রাজস্ব লেনদেন করা হয়, তাকেই খারাজ বা উশর নামে আখ্যায়িত করা যায়। জমির আজকাল যে কর ধার্য করা হয়ে থাকে, তার পেছনে খারাজ বা উশরের চেতনা বিন্দুমাত্রও কার্যকরি নেই। এই করকে উশর বা খারাজ নাম দিয়ে কোনো ভূ-স্বামী যদি উশর দিতে অস্বীকার করতে পারে, তাহলে একই পন্থায় একজন পুঁজিপতি এবং শিল্পপতিও বলতে পারে যে, আমি আমার পুঁজি বা সম্পদের উপর যে বিভিন্ন ধরণের কর দিয়ে থাকি, তাতেই আমার যাকাত আদায় হয়ে যায়। এর ফল দাঁড়াবে এই যে, সরকারের প্রাপ্য সরকার ঠিকই পেয়ে যাবে, কেবল আল্লাহর প্রাপ্যটাই বাকি থেকে যাবে।

"কোনো মুসলমানের উপর একই সাথে খারাজ ও উশর দুটোই আরোপিত হয়না।" -এই মর্মে যে রেওয়ায়েতটি আপনি উদ্ধৃত করেছেন, তা সূত্রের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। ইমাম ইবনে হুমামও এ কথা স্বীকার করেছেন। দেরায়া নামক গ্রন্থে ইবনে হাজার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, এর একাধিক বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা বিতর্কিত। ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ ও বর্ণনাকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যায়িত করে মুসলিম ভূ-স্বামীর খারাজযোগ্য জমিতেও উশর দিতে হবে বলে রায় দিয়েছেন। তথাপি এই রেওয়ায়েত যদি সঠিক ও গ্রহণযোগ্য ধরে নেয়াও হয়, তবু হানাফি ফেকাহবেত্তাগণ এ রেওয়ায়েত থেকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি যে, কোনো জমি থেকে খারাজ ও উশরের একটি আদায় হয়ে গেলে তা থেকে অপরটি আদায় করা যাবেনা। বরঞ্চ তারা বলেন, জমি যদি মূলত উশরযোগ্য হয়ে থাকে, তবে তা থেকে খারাজ আদায় হওয়ার পরও উশর দিতে হবে। তবে জমি যদি সনিশ্চিতভাবে খারাজযোগ্য হয়, তবে তা থেকে খারাজ বা উশরের যে কোনো একটি আদায় হয়ে গেলে অপরটি আর দিতে হবেনা। এখন আমাদের ভূমিগুলোকে বিতর্কিত ধরে নিলেও আসলে তা যদি উশরযোগ্য হয়ে থাকে, তবে হানাফি মতানুসারে ঐসব জমিতে উশর পাওনা থেকে যাবে, চাই তা থেকে খারাজ আদায় করা হোক বা না হোক। তাই সতর্কতা ও খোদাভীতির দাবি হলো, আল্লাহর কাছে জবাবদিহির হাত থেকে অব্যাহতি লাভের খাতিরে ফসলি জমির মালিক মুসলমান মাত্রই যেনো উশর দিয়ে দেয়।

সেচ করের ব্যাপারে বলা চলে যে, এটাও উশরের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেনা। তবে এর কারণে উশর অর্ধেকে নেমে আসবে। (অর্থাৎ এক দশমাংশের পরিবর্তে এক বিংশতি অংশ দিতে হবে।) অবশ্য হিসাব করার সময় মোট উৎপন্ন ফসল থেকে সেচ কর বাদ দেয়া যাবেনা। কারণ কৃত্রিম সেচের কায়িক ও আর্থিক ব্যয়ের ব্যাপারটা বিবেচনা করে শরিয়ত নিজেই উশরের অর্ধেক রেয়াত দিয়েছে। এখন একদিকে উশরও অর্ধেক দেয়া হবে। আবার উশর হিসাব করতে গিয়ে সেচ করও বাদ দেয়া হবে, এটা ঠিক নয়। তবে উশর দেয়ার আগে খাজনা কর্তন করা যেতে পারে।

হানাফি মতে উশর হিসাব করার সময় উৎপন্ন ফসল থেকে কৃষিব্যয় কর্তন করা যায়না। স্বাভাবিক অবস্থায় এই বিধি অনুসরণ করা কর্তব্য। ভাগ বাটোয়ারার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকে নিজ নিজ প্রাপ্য অংশ থেকে উশর দিতে হবে। হানাফি মাযহাবের ফতোয়া হলো, উশরে কোনো নিসাব তথা নূন্যতম পরিমাণ নির্ধারিত নেই। তবে একাধিক সহীহ হাদিস থেকে জানা যায়, মোট ফসলের নূন্যতম পরিমাণ পাঁচ ওয়াসাক অর্থাৎ প্রায় ১৯ মণ হওয়া চাই। ইমাম আবু হানিফার প্রবীণতম দুই শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ এ কথা মেনে নিয়েছেন। তাই কোনো অস্বচ্ছল কৃষক যদি উক্ত নিসাবের চেয়ে কম ফসল পেয়ে উশর না দেয় তা হলে ক্ষতি নেই।

ভূমিতে উৎপন্ন পশুখাদ্য- যা কেটে বিক্রিও করা যায়. সঞ্চিত করেও রাখা যায়, তারও এক দশমাংশ পরিমাণ উশর দেয়া উচিত। হানাফি মাযহাব অনুসারে প্রত্যেক কৃষিজাত দ্রব্যের উপর উশর দিতে হয়। তবে যেসব জিনিস ইচ্ছা করে বোনা বা রোপণ করা হয়না। কিংবা যার কোনোই মূল্য নেই, যেমন বিভিন্ন রকমের আত্মজ ঘাস, লতাপাতা ইত্যাদি এসবের উপর কোনো উশর নেই। [তরজমানুল কুরআন, জানুয়ারি ১৯৬৭]

[ ২ ]
প্রশ্ন : তরজমানুল কুরআন জানুয়ারি, ১৯৬৭ সংখ্যায় 'উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা' শীর্ষক প্রশ্নোত্তর পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারলাম না। জবাবে এক জায়গায় বলা হয়েছে, "উপমহাদেশে জমি উশরযোগ্য না খারাজযোগ্য তা নিয়ে বাদানুবাদ চলে আসছে। তবে হানাফি ও আহলে হাদিস সমেত সকল মাযহাবের মান্যগণ্য আলেমগণের ফতোয়া হলো, মুলসমানদের জমি থেকে উশর আদায় করাই অধিকতর নির্ভুল ও সাবধানী পন্থা।"

উপরোক্ত বক্তব্যটি সম্পূর্ণ অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। কোনো সুনির্দিষ্ট আলেমের ফতোয়া উদ্ধৃত করা হয়নি। দেশ বিভাগের পর সমগ্র উপমহাদেশের জমিগুলোকে জমির মালিকানা ও ভোগদখলের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণরূপে পাল্টে গেছে। তাই পরিস্থিতি সংক্রান্ত মতবাদকে উপেক্ষা করা যায়না।

দ্বিতীয়ত: আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে বলেই আপনার মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। একটা সুস্পষ্ট ও তৃপ্তিকর জবাব প্রত্যাশা করা হয়েছে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধি বিশ্লেষণে খানিকটা স্ববিরোধিতাও পাওয়া যায়, যা নিরসন করা একান্ত আবশ্যক। এক জায়গায় বলা হয়েছে, "প্রত্যেক মুসলমান সরকারের আদায়কৃত যে কোনো ভূমি রাজস্বকে শরিয়তের দৃষ্টিতে উশর বা খারাজ নামে আখ্যায়িত করা যায় না। শরিয়তে উশর ও খারাজের জন্য যে উদ্দেশ্য ও নিয়মবিধি নির্ধারিত রয়েছে সেই উদ্দেশ্যে ও নিয়মবিধি অনুসারে একটি ইসলামি সরকারের অধীন যে কর লেনদেন করা হয়, তাকেই উশর বা খারাজ নামে অভিহিত করা যায়। বর্তমানে জমির উপর যে খাজনা আদায় করা হয় তার পেছনে উশর বা খারাজের চেতনা বিন্দুমাত্রও কার্যকর নেই।"

একই আলোচনায় অন্যত্র উশর আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে "তবে উশর দেয়ার আগে মোট উৎপন্ন ফসল থেকে খাজনা কর্তন করা যেতে পারে।" সেই সাথে হানাফি মাযহাবের অনুসৃত নীতি অনুসারে উশর দেয়ার সময় কৃষিব্যয়কে মোট কৃষি উৎপাদন থেকে বাদ না দেয়ারও পরামর্শ দেয়া যায়, তাহলে কৃষি ব্যয় বাদ দেয়া যাবেনা কেন?
এক জায়গায় খোদাভীতি ও সাবধানতার স্বার্থে মুসলমান চাষীর পক্ষে সর্বাবস্থায় উশর দেয়া কর্তব্য বলা হয়েছে।
আশা করি এ বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করে সঠিক পথনির্দেশনা দান করবেন।

জবাব : আপনি তরজমানুল কুরআনে প্রকাশিত জবাবে, কয়টি স্ববিরোধিতা চিহ্নিত করেছেন, সে সম্পর্কে নিম্নে আমার বক্তব্য উপস্থাপিত করছি :
আপনি লিখেছেন, দেশ বিভাগের পর উভয় অংশের জমিকে এক পর্যায়ে দাঁড় করিয়ে আলোচনা করা ঠিক নয়। কেননা উভয় অংশের প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে। তবে বিভাগোত্তর কালে মুসলমানরা যেসব জমির মালিক হয়েছে, তাতে উশরের বিধি পাল্টে যাওয়ার কারণ হতে পারে এমন কি পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, সেটা আপনি উল্লেখ করেননি। আমি উপমহাদেশ শব্দটা শুধু এ জন্যই ব্যবহার করেছি যে,  দেশ বিভাগের আগে এটা অবশ্যই একদেশ ছিলো এবং সেই সব সমস্যার শরিয়তসম্মত সমাধানের জন্য তারা সাধারণত সমগ্র উপমহাদেশে মান্যগণ্য ও নির্ভরযোগ্য এমন আলেমদেরই শরাণাপন্ন হতো। দেশ বিভাগের পরেও এ ধরণের আলেমদের মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে, যদি তা এমন সমস্যা সংক্রান্ত না হয় যার প্রকৃতি ও ধরণ এখন মৌলিকভাবেই পাল্টে গেছে।  পাকিস্তান হওয়ার পর যেসব জমি মুসলমানদের মালিকানাভুক্ত হয়েছে, আমার মতে তাতে উশরের অপরিহার্যতা আগের চেয়েও সন্দেহতীত। কেননা কোনো অঞলে একটা স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেখানকার মুসলিম মালিকানাভুক্ত জমিতে উশর অবশ্যই ওয়াজিব হয়ে যায়।

মুসলমানদের কৃষি জমিতে উশর সম্পর্কে যে বিতর্ক ও মত বিরোধের উল্লেখ আমি করেছি, তা থেকে এ কথা বুঝা যায়না এবং আমিও বুঝাইনি যে, যার ইচ্ছে উশর দিতে পারবে, আর যার ইচ্ছে মতভেদের ওজুহাত দিয়ে উশর দিতে অস্বীকার করতে পারবে। একটু-আধটু মতভেদ সব ব্যাপারেই হতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত মত প্রতিষ্ঠার বেলায় সব সময়ই নির্ভরযোগ্য আলেমদের অধিকাংশের অভিমত কি এবং কোন পক্ষের যুক্তি প্রমাণ অধিকতর বলিষ্ঠ ও অগ্রগণ্য, সেটাই অগ্রগণ্য, সেটাই বিবেচনা করতে হয়। আমার পূর্ববর্তী জবাবে সংক্ষিপ্তভাবে হলেও এসব তথ্য সন্নিবেশিত হওয়া থেকে বাদ পড়েনি। তথাপি আপনি সুনির্দিষ্ট মতামত জানতে চাওয়ায় আমি কয়েকজন বিশিষ্ট আলেমের অভিমত তুলে ধরছি।

মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী সাহেবের 'ইসলাম কা নিযামে আরাযী' (ইসলামের ভূমি ব্যবস্থা) নামক একখানা গ্রন্থ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এর ১৬৩ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন :
"পাকিস্তান সরকার অমুসলিমদের পরিত্যক্ত যেসব জমি মুসলিম মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করেছে, সেগুলো সব উশরযোগ্য জমি। পাকিস্তান হওয়ার আগে এসব জমির অবস্থা যে রকমই থাক না কেন, তাতে কিছু আসে যায়না। কেননা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও উভয় দেশের সরকারের ভূসম্পত্তি বিনিময় সংক্রান্ত চুক্তির ফলে এসব জমি প্রথমত, বায়তুলমালের আওতাভুক্ত হয়েছে। অত:পর সরকার কর্তৃক ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে তা মুসলমানদের প্রাথমিক মালিকানাভুক্ত জমিতেই পরিণত হয়েছে আর মুসলমানদের জমিতে তো উশরই আরোপ করতে হয়। কাজেই এগুলো সব উশরযোগ্য জমি। অনুরূপভাবে যে সব জমি পাকিস্তান হওয়ার আগে অনাবাদী ছিলো, কারো ব্যক্তিগত মালিকানার অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অত:পর সরকার তাতে সেচের ব্যবস্থা করে আবাদযোগ্য করেছে এবং মুসলমানদের মধ্যে মূল্যের বিনিময়ে কিংবা বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। সেসব জমিও যেহেতু মুসলমানদেরই প্রাথমিক মালিকানাভুক্ত বলে বিবেচিত হবে, কাজেই তা উশরযোগ্যই সাব্যস্ত হবে।"

আবার ১৬৯ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন :
"কোনো অঞ্চলে যেসব জমি পুরুষানুক্রমিকভাবে মুসলিম ভূ-স্বামীদের মালিকানাভুক্ত চলে আসছে, সেসব জমির মালিকানা সম্পর্কে এই বলে সন্দেহ সৃষ্টি করা যাবেনা যে,  ঐ অঞ্চল যখন প্রথম বিজিত হয়, তখন অমুসলিম মালিকদের মালিকানা স্বত্ব যথাযথ বহাল রাখা হয়েছিল।"

১৭০ পৃষ্ঠায় দেওবন্দের প্রধান মুফতি হযরত মাওলানা আযীযুর রহমান সাহেবের দুটি ফতোয়া উদ্ধৃত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো :
"ভারতে যেসব জমি মুসলমানদের মালিকানায় রয়েছে, তা উশরযোগ্য। কেননা মুসলিম ভূ-সম্পত্তিতে উশরই মূল কথা। কোনো সন্দেহ দেখা দিলেও উশর দেয়াই নিরাপদ।"

দ্বিতীয় ফতোয়াটি এরূপ :
"ভারতের সকল জমিতে একই বিধি প্রযোজ্য নয়। তবে যে জমি মুসলিম মালিকানাভুক্ত, তাতে উশর দিতে হবে। মুসলমানদের উশর দেয়া উচিত।"

এরপর ১৮২ পৃষ্ঠায় মুফতি মুহাম্মদ শফী সাহেব "সরকারি রাজস্ব প্রদানে উশর আদায় হবেনা।" শিরোনামের অধীন লিখেছেন :
"সরকার যদি মুসলিম জনগণের কাছ থেকে যাকাত ও উশর ঠিক যাকাত ও উশরের নামেই এবং যাকাত ও উশর সংক্রান্ত ইসলামি বিধান অনুসারেই আদায় করে আর সেই অনুসারেই তা ব্যয় করার সংকল্প ঘোষণা করে তাহলে ইসলামি সরকারকে প্রদত্ত এই যাকাত ও উশর শরিয়ত অনুযায়ী যাকাত ও উশর বলেই গণ্য হবে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এখন পর্যন্ত যে আয়কর আদায় করে থাকে, তা যাকাতের নামেও আদায় করা হয়না, যাকাতের বিধান অনুসারেও নেয়া হয়না। যাকাতের নির্ধারিত খাতসমূহে ব্যয় করার অঙ্গীকারও সরকার দেয়না। অনুরূপভাবে সরকার যে ভূমি রাজস্ব আদায় করে থাকে, তাও উশর ও খারাজের শরিয়তি বিধি অনুসারে আদায় করেনা। ওটাকে নির্ধারিত খাতে ব্যয় করার জন্যও সরকার কোনো অঙ্গীকার ঘোষণা করেনা। তাই মুসলিম সরকারের আরোপিত আয়কর  অথবা সরকারি ভূমি রাজস্ব দিলেও যাকাত ও উশরের ফরয থেকে অব্যাহতি লাভ করা যায়না।"

এরপর মাওলানা আশরাফ আলী থানবী র. এরও একটা ফতোয়া উদ্ধৃত করা হয়েছে। মাওলানা থানবীকে জানানো হয়েছিল যে, কোনো কোনো আলেম সরকারি খাজনা দিলে উশর আদায় হয়ে যায় বলে অভিমত দিয়েছেন। অত:পর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়,  আপনার দৃষ্টিতে সঠিক মত কোনটি? মাওলানা থানবী র. জবাবে বলেন : আমিতো এটাই জানি যে, এতে আদায় হয়না, যেমন আয়কর দিয়ে যাকাত আদায় হয়না। উক্ত আলেমগণ কিসের ভিত্তিতে এ কথা বলেছেন আমার জানা নেই। এই  গ্রন্থের পরবর্তী এক স্থানে মুফতি আযীযুর রহমানেরও একই অভিমত তুলে ধরা হয়েছে।

'ইলমুল ফিকাহ' নামক গ্রন্থের  চতুর্থ খণ্ডের ৩৯ পৃষ্ঠায় গ্রন্থকার মাওলানা আব্দুশ শাকুর লাখনবী বলেন :
সরকারি ভূমি রাজস্ব বাবদ যা দেয়া হয় তা উশর বলে গণ্য হতে পারেনা। কেননা তা উশরের নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়না। কাজেই এটা দিলে উশর থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে না।
মাওলানা মুহাম্মদ আমজাদ আলী কাদেরী স্বীয় গ্রন্থ 'বাহারে শরিয়ত' পঞ্চম খণ্ডে ৪০ পৃষ্ঠায় বলেন :
"জমি তিন রকমের : (১) উশরযোগ্য (২) খারাজযোগ্য (৩) উশরযোগ্য ও নয়, খারাজযোগ্য নয়। প্রথম ও তৃতীয় প্রকারের জমিতে উশর দিতে হবে। উপমহাদেশের মুসলমানদের জমি খারাজযোগ্য সাব্যস্ত হবেনা। যতোক্ষণ না কোনো সুনির্দিষ্ট জমির খারাজযোগ্য হওয়া শরিয়তসম্মত দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়।" অত:পর ৫৪ পৃষ্ঠায় বলেন :
"সরকারকে যে খাজনা দেয়া হয়, তা দ্বারা শরিয়ত আরোপিত খারাজ আদায় হয়না। বরং এটা ভূ-স্বামীর দায় হিসেবে থেকে যাবে এবং তাকে খারাজ দিতে হবে।"

সর্বশেষ মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ নাযীর হোসাইন দেহলভীর গ্রন্থ 'ফাতোওয়ায়ে নাযীরিয়া' প্রথম খণ্ডের ৪৯৪ পৃষ্ঠা থেকে একটা উক্তি উদ্ধৃত করবো। ইনি আহলে হাদিস গোষ্ঠির কাছে সবচেয়ে বড় আলেম গণ্য হয়ে থাকেন। উক্তিটি হলো :

"উল্লেখ থাকে যে, প্রত্যেক জমির উৎপন্ন ফসলে উশর কিংবা অর্ধ উশর (ক্ষেত্র বিশেষে) দেয়অ বাধ্যতামূলক যদি মালিক মুসলমান হয় এবং উৎপন্ন ফসল নিসাব পরিমাণ হয়। জমি খারাজযোগ্য হোক বা উশরযোগ্য হোক এবং জমি ফসলের মালিকের মালিকানাভুক্ত হোক বা না হোক, সর্বাবস্থায় উশর অথবা অর্থ উশর বাধ্যতামূলক। কারণ উশর বাধ্যতামূলক হওয়ার পক্ষে শরিয়তের যেসব দলিল রয়েছে তা উল্লেখিত সর্ব প্রকারের জমির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।" [লেখক : মুহাম্মদ আব্দুর রহমান মুবারকপুরী]

আপনি আমার আলোচনায় স্ববিরোধিতার যে অভিযোগ তুলেছেন, তা আমার কাছে পুরোপুরি বোধগম্য হয়নি। খাজনা বা ভূমিকর সম্পর্কে আমি এ কথাই বলেছি যে, তা খারাজ বা উশরের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেনা। খাজনা বা ভূমিকর দিয়ে কেউ বলতে পারেনা যে, আমি খাজনা বা ভূমিকরের মাধ্যমে উশর বা খারাজ পরিশোধ করে দিয়েছি। হানাফি ফেকাহবেত্তাদের এ অভিমত আমি বর্ণনা করেছি যে, তারা উশর প্রদানের আগে ফসল থেকে কৃষি ব্যয় কর্তন করা সঠিক মনে করেননা। তবে খাজনা বা ভূমিকরের ব্যাপারটা কৃষি ব্যয় থেকে ভিন্ন। কারণ এটা সেই আমলে বিদ্যমান ছিলনা যখন ফকীহগণ কৃষি ব্যয় কর্তন না করার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। তাছাড়া এক হিসেবে খাজনা বা ভূমিকর কৃষি ব্যয়ের পরিবর্তে একটা কৃষিকর বিশেষ। কেননা কৃষি ব্যয় বলতে ভূমি উন্নয়ন ও ফসল উৎপাদন বাবদ যে ব্যয় হয় তাকেই বুঝায়। তাই উশর হিসেব করার আগে যদি কেউ ফসলের মূল্য থেকে খাজনা ও ভূমিকর দিয়ে দেয়, তাতে দোষের কিছু নেই। এটা আমার একার মত নয়, আলেম সমাজও এরূপ ফতোয়া দিয়েছেন। তবুও আপনি ইচ্ছে করলে এ বক্তব্য অগ্রাহ্য করতে পারেন এবং সমগ্র ফসলের উপর খাজনা ও ভূমিকর কর্তন না করেই উশর দেয়া উত্তম। এতে গরিবদের উপকার আরো বেশি হবে এবং শরিয়তের বিধানের ব্যাপারে যতো বেশি সাবধানতা অবলম্বন করা যায় ততোই ভালো। [তরজমানুল কুরআন, আগস্ট ১৯৬৭]

[ ৩ ]
প্রশ্ন : আগস্ট সংখ্যা তরজমানুল কুরআনে আপনার  জবাব পড়ে মোটামুটি আশ্বস্ত হয়েছি। আমি বিগত বছরের উপার্জন হিসেব করে অর্থ উশর আলাদা করে ফেলেছি। তবে একটি বিষয় এখনো বিশ্লেষণের অপেক্ষায় রয়েছি। এ ব্যাপারে যদি আরো একটু পথনির্দেশনা পাই, তাহলে অধিকতর মানসিক তৃপ্তি পাবো এবং সংশয় ও বিভ্রান্তির পুরোপুরি অবসান ঘটবে। আমি লিখেছিলাম, "উপমহাদেশে বিভাগোত্তরকালে জমির মালিকানার পরিস্থিতি একেবারেই পাল্টে যাবে।" এ কথা দ্বারা আমি বুঝাতে চেয়েছিলাম, পাকিস্তানে ভূমি মালিকানা তিন প্রকারের (১) যে জমি পাকিস্তান হবার আগেও মুসলমানদের ছিলো, এখনো তাদেরই অধিকারেই রয়েছে। (২) যে জমি পাকিস্তান হবার আগে অমুসলিমদের দখলে ছিলো, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে সরকারের দখলে এসেছে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে। এসব জমি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সেলামি কিংবা খারাজের বিনিময়ে মুহাজিরদেরকে দেয়া হয়েছে। সেলামি সরকারি বিধি মোতাবেক প্রত্যেক জিনিসের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণে নির্দিষ্ট রয়েছে। (আখের জন্য  এক রকম, গমের জন্য এক রকম, ঘাসের জন্য এক রকম, ধানের জন্য এক রকম ইত্যাদি ইত্যাদি।) এই বিধিতে সরকার প্রয়োজন মোতাবেক রদবদল ঘটিয়ে থাকে। কতিপয় জিনিসের ক্ষেত্রে এই সেলামি বা খারাজ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তাছাড়াও জমি বরাদ্দের সময় এ কথা জানা থাকে যে,  এর মালিকানা কি প্রত্যেক ছয় মাস অন্তর সেলামি বা খারাজের আকারে দিতে হবে? (৩) যে জমি সরকারের মালিকানাভুক্ত ছিলো, বর্তমান সরকার সাবেক সরকারের উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে এবং কতিপয় ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে পুরস্কার কিংবা কৃতিত্বের প্রতিদান হিসেবে দেয়া হয়েছে। এর বাবদেও নির্দিষ্ট নিয়মে সেলামি বা খারাজ দিতে হয়। স্মরণযোগ্য, বিজিত দেশসমূহে ইসলামি কৃতিত্বের প্রতিদান হিসেবে এ জাতীয় পুরস্কারাদি দেয়ার রেওয়াজ ছিলো এবং এ ধরণের ভূমি সম্ভবত খারাজযোগ্য গণ্য হতো। এ থেকে এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে যে, যেসব পরিত্যক্ত জমির বাবদে সরকার ভূমিকরের আকারে খারাজ পেয়ে থাকে, সেই কর সরকারি কোষাগারে জমা হয় এবং সরকারি কোষাগারে থেকে জনহিতকর কাজে ব্যয় হয়, তাকে খারাজযোগ্য জমিরূপে গণ্য করা চলে।

দেশ বিভাগের আগে ইংরেজ সরকার সমগ্র ভারতবর্ষ জয় করে জমির সর্বোচ্চ মালিক হয়ে বসেছিল। এখন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই রাষ্ট্রের মুসলিম সরকার জমির সর্বোচ্চ মালিক। সরকার সব সময় এই ক্ষমতার অধিকারি যে, জনকল্যাণের স্বার্থে যে কোনো প্রয়োজনে যে কোনো জমি হুকুম দখল করতে পারে কিংবা মূল্য দিয়ে করায়ত্ত করতে পারে। এ ধরণের ক্ষমতা অবশ্যই খারাজযোগ্য জমিতেই হয়ে থাকে।

হযরত ওমরের রা. ইরান প্রভৃতি দেশের যেসব জমি মুসলমানদের অধিকারে এসেছিল, তা যদি ইতোপূর্বে অমুসলিমদের অধিকারে থাকাকালে প্রাচীন নদনদী, খাল, নালা বা জলাশয় থেকে সিঞ্চিত হয়ে থাকতো, তা হলে তার উপর খারাজ আরোপ করা হতো। এ ধরণের কিছু জমি কোনো কোনো সাহাবির দখলে ছিলো এবং তাদের কাছ থেকে খারাজ নেয়া হতো। যদি স্বয়ং মুসলমানরা নতুন খাল বা পুস্করনী খনন করে সেচকার্য চালাতো তাহলে তাদের উপর খারাজ আরোপ করা হতো। (দেখুন: আল ফারুখ, রচনা-শিবলী নুমানী, রাজস্ব অধ্যায়, পৃ. ১৭৪ -১৭৫) উল্লেখ্য, তৎকালে খারাজের তুলনায় উশর অনেক কম আদায় হতো এবং অপেক্ষাকৃত রেয়াত দেয়া হতো। ইরাকে কোথাও কোথাও জমির উৎপাদন ক্ষমতা রাজস্বের হারে পার্থক্যও হতো। [আল ফারুক, ২য় খণ্ড, রাজস্ব অধ্যায়, পৃ. ১৬৮]

প্রসঙ্গত, এ কথাও বিবেচনার দাবি রাখে যে, প্রথম প্রথম যখন মুসলিম সরকার এ ধরণের রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করতো, তখন আদায়কারিদের ব্যয় এই রাজস্ব থেকেই নির্বাহ করা হতো। এখন যেহেতু জমির ফসল একত্রিত করে উশর দেয়ার দায়িত্ব ফসলের মালিকের উপর বর্তেছে, সেহেতু তার যাবতীয় ব্যয় উশর থেকে কর্তন করা ন্যায়সঙ্গত হবে।

জবাব : আপনি আমার জবাবের উপর  যে সব নতুন প্রশ্ন তুলেছেন, তা নিয়ে যদি বিস্তারিত আলোচনা করি, তাহলে একটা নিবদ্ধ লিখতে হবে। আপাতত: আমি সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েই ক্ষান্ত থাকছি :
প্রথমত: আমি প্রথম জবাবেই বলেছি যে, উশর ও খারাজ দুটোই একই জমিতে আরোপিত না হওয়া শুধুমাত্র হানাফি মাযহাবের নীতি। অন্যথায় অন্যান্য ইমামদের মতে, মুসলমানেরা যে জমি থেকেই ফসল পাক, তা থেকে তাকে উশর দিতে হবে। হানাফিদের নীতি যে হাদিসের ভিত্তিতে প্রণীত, হাদিসবেত্তাদের নিকট তার সনদ দুর্বল। এমন কি বিশিষ্ট হানাফি ইমাম আল্লামা মুহাম্মদ তাহির স্বীয় গ্রন্থ 'তাযকিরাতুল মাউযুয়াত' (মনগড়া হাদিসের বিবরণ)-এ ঐ হাদিসকে বাতিল বলে আখ্যায়িত করেছেন। খুলাফায়ে রাশেদিন যেসব জমিকে খারাজযোগ্য ঘোষণা করে তাতে খারাজ আরোপ করেছিলেন, সেগুলো সম্পর্কেও রসূল স. বা কোনো সাহাবির এমন কোনো উক্তি চোখে পড়েনা যে, এসব খারাজযোগ্য জমি মুসলমানদের মালিকানাভুক্ত হলে তাতে উশর দিতে মুসলমানদের উপর তা ইবাদাত হিসেবে ফরজ করা হয়েছে। কুরআনের নির্দেশ ------------------------ (যাকাত দাও) এবং ---------------
(ফসল ঘরে তোলার পর তার প্রাপ্য দিয়ে দাও।) সকল ভূমির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সহীহ হাদিসসমূহে উশরের যে নির্দেশ এসেছে, তাও সকল জমির উপরই প্রযোজ্য। উশর সংক্রান্ত বিশ্বস্ততম হাদিসগুলো কোথাও খারাজযোগ্য জমিকে উশর বহির্ভূত করা হয়নি।  এ জন্য অন্যান্য ফেকাহবেত্তাগণ এ কথাই বুঝেছেন যে, খুলাফায়ে রাশেদীন কেবল মালিকানা স্বত্ত্ব ভোগদখলের অধিকারের বিনিময় হিসেবেই খারাজ আরোপ করতেন। উশরের পরিবর্তে নয়। এটা উশরের স্থলাভিষিক্তও ছিলোনা, উশর থেকে অব্যহতি পাওয়ার ছাড়পত্রও ছিলোনা। এ জন্য হানাফি মাযহাবও স্বীকার করেছে যে, কোনো জমি যদি প্রকৃতপক্ষে উশরযোগ্য হয়ে থাকে এবং ভুলক্রমে তাকে খারাজযোগ্য মনে করে খারাজ আরোপ করা হয়ে থাকে তবে তা সত্বেও উশর দেয়া বাধ্যতামূলক থাকবে। যে জমি সরকারের মালিকানায়  থাকে এবং তা প্রথমবারের মতো কোনো মুসলমানের ভোগদখল দেয়া হয় তবে তা সর্বসম্মতভাবে উশরযোগ্য-চাই মুসলমানের মালিকানা বা ভোগদখল যে ধরণেরই হোকনা কেন।

এ বিধিটাও কোনো চিরস্বীকৃত ও সার্বজনীন বিধি নয় যে, ইসলামি সরকারের করায়ত্ত হওয়ার সময় যে জমি কোনো অমুসলিমের ছিলো, তা চিরকাল খারাজযোগ্যই থাকবে- কখনো তাতে উশর আরোপিত হবেনা। কা'বা শরিফ ও মসজিদে নববীর আশপাশ একাধিক জমি এরূপ ছিলো, যা যাকাত ও উশরের হুকুম নাযিল হবার পর মক্কা বিজয়ের সময় অমুসলিমদের সম্পত্তি ছিলো। কিন্তু রসূল সা. তাকে খারাজযোগ্য বলেননি। এসব জমি মুসলমানদের অধিকারে আসার পর তাদের কাছ থেকে উশর আদায় করা হয়।

অমুসলিমদের পরিত্যক্ত যেসব জমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলমানদেরকে দেয়া হয়েছে, তার সেলামি প্রভৃতির যে বিবরণ আপনি দিয়েছেন, তা আমার কাছে আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত মনে হয়না। যেসব মুহাজিব এখন এসব জমির মালিক হয়ে গেছে,  সরকারি রাজস্বের ব্যাপারে তাদের ও স্থানীয় লোকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য বা বৈষম্য রয়েছে কিনা আমার জানা নেই। যদি থেকেও থাকে, তবে আমি আগেই বলেছি, ভূমির মালিক ফসল থেকে খাজনা, সেলামি ইত্যাদি কেটে রেখে বাদবাকী ফসলের উপর উশর দিতে পারে। কিন্তু এই সব সেলামি ইত্যাদিকে খারাজ আখ্যায়িত করে তাকে উশরের স্থলাভিষিক্ত করার যুক্তিকে আমি মোটিই সঠিক মনে করিনা। এবং এর ভিত্তিতে উশর না দেয়াকে বৈধ বলে স্বীকার করিনা।

আপনার এ যুক্তিটাও অদ্ভুত যে, প্রাথমিক যুগের মুসলিম সরকার রাজস্ব আদয়ের যাবতীয় খরচ নিজেই বহন করতো, কিন্তু এখন উশরের দায়িত্ব ফসল মালিকের উপর বর্তানোর কারণে তার পক্ষে উশর থেকে কৃষি ব্যয় কর্তন করা সঙ্গত হবে। মুসলিম সরকার যাকাত, উশর ও খারাজ আদায়কারিদের উপর যা ব্যয় করতো, তা এই সব রাজস্বের একটা নগণ্য অংশ ছিলো। আসল রাজস্ব অনেক বেশি আদায় হতো এবং কর্মচারীদের মজুরি দেয়ার পর তা অন্যান্য খাতে ব্যয় হতো। আজকের যুগে একজন ভূ-স্বামী ব্যক্তিগতভাবে যে উশর দেয়, তা দিতে তার বাড়িতে কি খরচ বহন করতে হয় এবং তাকে কিভাবে আপনি আদায়কারি ও কর্মচারীদের মজুরি স্থলাভিষিক্ত করে উশরের মধ্যে গণ্য করতে চান, তা আমার বুঝে আসেনা। আর যদি এই খরচ দ্বারা আপনি কৃষি খরচ, ফসল রক্ষণাবেক্ষণ, ফসল কাটা ইত্যাদির খরচ বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে কর্মচারীদের মজুরির সাথে এর কোনো সাদৃশ্য নেই। এসব ব্যয়কে কর্মচারীদের ব্যয়ের নাম দিয়ে উশর থেকে কর্তন করা কিভাবে জায়েয হবে?

অনারব দেশগুলোতে বিজিত ভূমি এবং ইংরেজ শাসনের অবসান ইত্যাদির ভিত্তিতে আপনি যে যুক্তি দাঁড় করেছেন, তাও আমার কাছে দুর্বোধ্য। কোনো বহিরাগত ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত করার প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান হয়নি বা ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটেনি। বরং যেসব এলাকার মুসলমানরা পরাধীন অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো। সেসব এলাকার স্বাধীনতা লাভ এবং কিছু অমুসলিমদের বহিষ্কারের মাধ্যমেই এটা হয়েছে। এ জন্য আমার মতে শরিয়তের বিধানের কার্যকারিতার কোনো পরিবর্তন যদি এসেই থাকে তবে সেটা হলো, মুসলমানদের দখলে আসা অমুসলিমদের পরিত্যক্ত ভূমিগুলোও উশরযোগ্য হয়ে গেছে। [তরজমানুল কুরআন, নভেম্বর ১৯৬৭]



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )