আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?</h1>
প্রশ্ন : উশরের যেসব বিধিতে হানাফি মাযহাব ও অন্যান্য মাযহাবের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো উশরযোগ্য ফসল বা ফলমূল কি কি সেই সংক্রান্ত। কিছু কিছু ফসল রয়েছে, যা পাকতে দেয়া হয়না, বরং কাঁচা বা তরতাজা অবস্থায় বিক্রি করা হয়। শাক সবজির  অবস্থাও তাই। এই সব ফসল দ্বারা প্রচুর অর্থ উপার্জিত হয়। কোনো কোনো আহলে হাদিস আলেম বলেন, রসূল সা.-এর আমলে শুধু গম, যব, খেজুর ও কিসমিস প্রভৃতির বাবদে উশর নেয়া হতো। শাক সবজির বাবদে উশর নেয়া হতোনা। ইমাম মালেক রহ. ও ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে যেসব খাদ্যদ্রব্য শুকিয়ে গুদামজাত করে রাখা যায়, কেবল সেগুলোই উশরযোগ্য। এ কারণে ইক্ষু, সবজি তরকারি ইত্যাদিতে উশর আরোপিত হবেনা।

অনুরূপভাবে কৃষি খরচ, কৃত্রিম সার প্রয়োগ, টিউবওয়েল ইত্যাদির বাবদে যে অর্থ ব্যয় হয়, অথবা সরকার যে খাজনা বা সেচ কর আদায় করে, তা উশর দেয়ার আগে ফমল থেকে কর্তন করার ব্যাপারে সঠিক মত কি? কোনো কোনো আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও উপকরণ প্রয়োগে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। ক্ষেত্র বিশেষে তা গোটা কৃষি উৎপাদনের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি হয়ে যায়। উশর হিসেব করার সময় এসব ব্যয় হিসেবে ধরা যাবে কি?

এসব বিষয়ের কুরআন হাদিস ও ফেকাহ শাস্ত্রীয় মতামতের আলোকে আলোচনা করে যে মতটি আপনার বিচার বিবেচনার অগ্রগণ্য মনে হয়, তা জানলে ও তরজমানুল কুরআনে ছেপে দিলে আমাদের বন্ধু মহল ও সাধারণ পাঠক উপকৃত ও দুশ্চিন্তামুক্ত হবে।

জবাব : ইমাম আবু হানিফার মতে ইচ্ছাকৃতভাবে উৎপাদন করা হয় এবং একেবারেই মূল্যহীন ও বেচাকেনার অযোগ্য নয় এমন যে কোনো কৃষিজাত দ্রব্যের উপর উশর দিতে হয়। অন্য কতিপয় ফকীহ ও মুহাদ্দিস কয়েকটি নির্দিষ্ট কৃষিজাত দ্রব্যের উপর বিশেষ বিশেষ শর্ত ও গুণাগুণ সাপেক্ষে উশর দেয়া বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন। যেমন, তা খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া চাই এবং শুকিয়ে গুদামজাত করা যায় এমন হওয়া চাই। কেউ কেউ এর সংখ্যা চার বা ততোধিক নির্দিষ্ট করে তার নামের তালিকাও লিপিবদ্ধ করেছেন। আমি গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়ে যতোদুর জানতে পেরেছি, তাতে ইমাম আবু হানিফার মতামতই অগ্রগণ্য এর পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর বলিষ্ঠ দলিল প্রমাণ বিদ্যমান। আধুনিক ও প্রাচীন অনেক হানাফি আলেমও এ অভিমত সমর্থন করেছেন। দলিল প্রমাণগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।
১. পবিত্র কুরআন কৃষি উৎপাদন থেকে আল্লাহর নামে ব্যয় করার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তার ভাষা সর্বব্যাপী ও সর্বাত্মক। যেমন :
---------------------------------------------------------------------------------
"হে ঈমানদারগণ! যে সম্পদ তোমরা উপার্জন করেছো এবং যে সম্পদ আমি তোমাদের জন্য মাটি থেকে উদগত করেছি, তার মধ্যে  থেকে উত্তম অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় কর।" [সূরা আল বাকারা, আয়াত : ২৬৭]
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
"তিনিই  সৃষ্টি করেছেন নানা রকমের লতা ও বৃক্ষের বাগান, খেজুরের বাগান, রকমারি খাদ্য ফসলের ক্ষেত, যাইতুন ও ডালিমের গাছ -যা দেখতে এক রকম ও স্বাদে বিভিন্ন রকমের। এসব ফসল যখন উৎপন্ন হয় তখন তা খাও এবং ঘরে তোলার সময় তার প্রাপ্য দিয়ে দাও।" [সূরা আল আনয়াম, আয়াত : ১৪১]

এ সব আয়াতে যে ভাষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা সর্বব্যাপী। উপরন্তু এখানে সুস্পষ্টভাবে কৃষিজাত দ্রব্য, বাগান, ফসল, আঙ্গুর, যাইতুন ও ডালিমের উল্লেখ করা হয়েছে। এ কথা নি:সন্দেহে সত্য যে, এমন কোনো সহীহ হাদিস যদি থাকতো, যা এই সর্বব্যাপী নির্দেশকে বিশেষ কয়েকটি জিনিসের ভেতর সীমাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট করে দিতো, তাহলে সেই হাদিস অনুসারেই এর প্রয়োগ হতো। কিন্তু তেমন কোনো হাদিস বিদ্যমান নেই। যা আছে তা সনদের দিক থেকে দুর্বল। হাফেজ ইবনে হাজার স্বীয় গ্রন্থ 'আততালখীসুল জাবীরে' প্রথমে হযরত মায়াযের বর্ণিত একটি হাদিস দারকুতনী, হাকেম এ বায়হাকী থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এই হাদিসে বলা হয়েছে যে, রসূল সা, কাকুড়, তরমুজ, ডালিম তরিতরকারিতে উশর রহিত করেছেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি এ হাদিসের সনদ ধারাবাহিক নয় এবং দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। অত:পর তরিতরকারি ও বিভিন্ন ফসলে উশর রহিত হওয়া সংক্রান্ত অন্য একটি  হাদিস তিরমিযী থেকে উদ্ধৃত করার পর ইবনে হাজর স্বয়ং ইমাম তিরমিযীর নিম্নোক্ত মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
"শাক সবজি ও তরিতরকারি সম্পর্কে কোনো বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়নি।"
সূরা আল বাকারার উপরোক্ত ২৬৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইমাম রাজী বলেন :

এ আয়াতের সুস্পষ্ট শাব্দিক অর্থ থেকে প্রতীয়মান হয়, মাটি থেকে উদগত যে কোনো ফসলেরই যাকাত দিতে হয়। ইমাম আবু হানিফার বক্তব্যও তাই। এ আয়াত থেকে তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সাবলীলভাবেই তার বক্তব্য প্রতিপন্ন করেন। কিন্তু 'তরিতরকারি ও শাকসবজিতে যাকাত নেই' এই বক্তব্য সম্বলিত একটি হাদিসের ভিত্তিতে ইমাম আবু হানিফার বিরোধীরা বলেন, শাক সবজি ও তরিতরকারি বাদে আর যতো ফসল আছে কেবল সেগুলোতেই যাকাত দিতে হবে।

আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভী স্বীয় গ্রন্থ 'ফিকহুয যাকাতে'র ইসলামের যাকাত বিধান' প্রথম খণ্ডের ৩৫৫ পৃষ্ঠায় ইমাম রাযীর তফসির থেকে উপরোক্ত অংশ উদ্ধৃত করার পর এর সর্বশেষ বক্তব্যের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন :

"কিন্তু শাক সবজি ও তরিতরকারি সংক্রান্ত এই হাদিসটি বিশুদ্ধতার মানের দিক দিয়ে এমন নয় যে, আয়াতে যেখানে সর্বব্যাপী ফসলে যাকাত আরোপ করা হয়েছে সেখানে এর ভিত্তিতে কতিপয় শ্রেণীকে বাদ দেয়া যেতে পারে। তাই ইমাম রাযীর ন্যায় আমার মতেও আবু হানিফার যুক্তি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সাবলীল।"

ফিকহুয যাকাতের এই জায়গায় আল্লামা কারজাভী বিভিন্ন মাযহাবের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে বলেন :

"উশর সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফার নীতিই সবচেয়ে উত্তম ও অগ্রগণ্য। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীর র. মুজাহিদ র. হাম্মাদ র. দাউদ জাহেরী র. এবং ইবরাহীম নাখয়ীর অভিমতও এই যে, মাটি থেকে উদগত যে কোনো ফসলেই উশর দিতে হবে। কুরআন ও সুন্নাহর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারিত সর্বব্যাপী উক্তি এ বক্তব্যেরই সমর্থন করে  এবং যাকাতের সামগ্রিক বিধানের সাথেও তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। গম ও যব উৎপাদনকারির উপর উশর আরোপিত হবে, আর আম ও আপেলের বাগানে উশর আরোপিত হবেনা- এটা আমর মতে ইসলামি বিধান প্রণয়নের পেছনে যে গভীর প্রজ্ঞা ও মহৎ উদ্দেশ্য সক্রিয়, তার পরিপন্থী। যেসব হাদিসে চারটি খাদ্য ফসলের মধ্যে উশরকে সীমিত করা হয়েছে। কোনো একটি হাদিস নিখুঁত নয়। কোনোটির সনদ  দুর্বল কিংবা বিচ্ছিন্ন। আবার কোনোটির সনদ রসূল সা, পর্যন্ত না পৌঁছে সাহাবি পর্যন্ত গিয়ে থেমে রয়েছে। (দেখুন, 'আর রুয়াতু আলাল্‌ মিশকাত') আর এগুলোকে নির্ভুল ও নিখুঁত মেনে নিলেও ইবনুল মালিক র. ও অন্যান্য আলেমগণ এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, রসূল সা.-এর আমলে আরবে এই চারটি ফসলই উৎপন্ন হতো। তাই এ চারটির মধ্যে সীমিত রাখাটা নিতান্তই কাকতালীয় ও আপেক্ষিক, প্রকৃত অর্থে সীমিত রাখা নয়।" [মিশকাত দ্রষ্টব্য]

মালেকি ফেকাহ বিশারদ ইবনুল আরাবী রহ. স্বীয় গ্রন্থ 'আহকামুল কুরআনে' ইমাম আবু হানিফার মাযহাব সমর্থন করেছেন। নিজের রচিত তিরমিযি শরিফের টীকাগ্রন্থ আরিযাতুল আহওয়ামী শরহে সুনানুত তিরমিযীতে তিনি বলেন :

"উশর বিধানের ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফার অভিমত যুক্তি প্রমাণের দিক দিয়েও সবচেয়ে বলিষ্ঠ,  দরিদ্র লোকদের অধিকারের দিক দিয়েও সর্বোত্তম। তাছাড়া কুরআন ও হাদিসের সর্বব্যাপী নির্দেশাবলি থেকেও সেটাই প্রতীয়মান হয়।"

ইবনুল আরবি র. পরবর্তি পর্যায়ে সূরা আল আনয়ামের ১৪১ আয়াত প্রসঙ্গে ইমাম আবু হানিফার মতের সপক্ষে বিশদ আলোচনা করেছেন এবং অন্যান্য মাযহাবের মতামত খণ্ডন  করেছেন। এর একটি সংক্ষিপ্ত অংশ নিম্নে তুলে ধরছি :

আবু হানিফা এ আয়াতটি দর্পণের মতো সামনে রেখেছেন এবং সত্যদর্শিতার চেতনা নিয়ে  প্রতিটি কৃষি উৎপাদনে উশর বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন- চাই তা খাদ্য জাতীয় হোক বা না হোক এবং গুদামজাত করার যোগ্য হোক বা না হোক। রসূল সা. নিজেও স্বীয় সর্বব্যাপী উক্তিতে এ কথাই বলেছেন যে,
                                   --------------------------------------
"অর্থাৎ বর্ষণসিক্ত ভূমির ফসলে উশর এবং জলাশয় সিঞ্চিত ভূমির ফসলে অর্ধ উশর দিতে হবে।" আল্লামা ইবনুল আরাবীর মূল গ্রন্থ সমগ্র আলোচনাটি পড়ে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।
অত:পর ফিকহুয্‌ যাকাতের লেখক বলেন : ইবনুল হুমাম ফাতহুল ক্কাদীর গ্রন্থে, আল হাইসামী মাজমায়ুজ জাওয়ায়েদ গ্রন্থে এবং তাবরানী মু'জামুল আউসাত গ্রন্থে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, শাক সবজি ও তরিতরকারিতে উশর দিতে হবেনা- এই বক্তব্য সম্বলিত হাদিসটি দুর্বল। এ হাদিস  কোনোভাবেই আইন প্রণয়নের উৎস হতে পারেনা, এর ভিত্তিতে কুরআনের আয়াত বা সহীহ হাদিসের  বক্তব্যকে সীমিত করা বা নির্দিষ্ট করা তো দুরের কথা। এছাড়া হানাফি ফেকাহবেত্তাদের মতে এসব হাদিসের ভিন্ন রকমের ব্যাখ্যারও অবকাশ রয়েছে। যেমন এ কথা বলার অবকাশ রয়েছে যে, শাক-সবজি ও তরিতরকারি মাপজোখ করে উশর আদায় করা যাকাত কর্মীদের পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা তার আগেই এগুলো নষ্ট হয়ে বা পচে যাবে।
অন্য কথায় বলা যায়, আল্লামা কারযাভী হয়তো বলতে চান যে, এসব দ্রব্যের পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হলে যাকাত কর্মীদের মাধ্যমে তার উশর আদায় করতে হবে। কেননা, পরবর্তীতে এই আলোচনা প্রসঙ্গেই তিনি ইয়াহিয়া বিন আদম র.-এর গ্রন্থ কিতাবুল খারাজ ও অন্যান্য সূত্রের বরাত দিয়ে ইমাম জুহরি, আতা আল্‌ খুরাসানী, ইমাম শায়বী এবং আরো কয়েকজনের এই অভিমত উদ্ধৃত করেছেন যে, এ ধরনের পচনশীল তরকারি ও ফলমূলের মূল্য নির্ণয় করতে হবে এবং যাকাত আদায় করতে হবে। এগুলোর যদি বেচাকেনা চলে তবে বানিজ্য পণ্য ধরে নিয়ে তাতে শতকরা আড়াই ভাগ যাকাতও ধার্য করা যেতে পারে। কিতাবুল খারাজে উদ্ধৃত বহুসংখ্যক মতামত থেকে এ রকমই মনে হয়। তবে আল্লামা ইউসুফ কারযাভীর অভিমত হলো, এগুলো কৃষিজাত ও খামারজাত দ্রব্য বিধায় এতে উশর কিংবা অর্ধ উশর ধার্য হওয়াই সঙ্গত। এই অভিমতের সপক্ষে তিনি প্রাচীন ইমামদের কিছু কিছু উক্তিও উদ্ধৃত করেছেন। আমিও এই শেষোক্ত অভিমতটিই সমর্থন করি। তবে আমার মতে এ অভিমতকে আরো একটু বিস্তারিত রূপ দিতে গেলে সেটা এ রকম দাঁড়াবে যে, যে ব্যক্তি খামার বা বাগানের মালিক অথবা বর্গা চাষ প্রভৃতি নিয়মে কৃষি উৎপাদনে অংশীদার, সে যদি ফসল বা ফল বিক্রি করে তবে নিজের উৎপন্ন ফসলে উশর ১০ ভাগের এক ভাগ অথবা অর্ধ উশর ২০ ভাগের ১ ভাগ প্রদান করবে। যে ব্যক্তি খামার বা বাগান বন্ধক নিয়েছে, সে বন্ধকের টাকা কেটে রেখে বাদবাকি ফসলে উশর কিংবা অর্ধ উশর দিবে। আর জমির মালিক যে অর্থ বন্ধক রাখার বাবদে পেয়েছে, তার উশর মালিক নিজে দিবে। কিন্তু জমির ফসল বা বাগানের ফলমূল একবার বিক্রি হওয়ার পর তা যখন বাজারে পণ্য হিসেবে পুনরায় বিক্রি হবে, তখন শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত আরোপিত হবে।

আমাদের দেশের আহলে হাদিস গোষ্ঠিভুক্ত কোনো কোনো আলেমও গম, যব, আঙ্গুর ও খেজুর এই চারটি প্রধান জিনিস বাদে অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্য যেমন আখ, ছোলা ইত্যাদিতেও উশর বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন। কেউ কেউ ফলমূল, সবজি ও তরকারিকেও উশরযোগ্য বলেছেন। ফতোয়ায়ে সানাইয়া প্রথম খণ্ডের যাকাত অধ্যায়ে এ ধরণের একাধিক ফতোয়া বর্ণিত হয়েছে। মাওলানা উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী আখ, কলাই, বুট ইত্যাদিতেও উশর বাধ্যতামূলক বলে মত দিয়েছেন। মাওলানা আবুল কালাম বেনারসীর ফতোয়া এই যে, আখে উশর কিংবা অর্ধ উশর দিতে হবে। মাওলানা সানাউল্লাহ সাহেবও এই ফতোয়ার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। মাওলানা আব্দুল্লাহ রোপড়ীর মতে উশর উক্ত চারটি জিনিসে সীমিত নয়। কেননা আবু দাউদ শরিফে ইয়ামনের ভূমি সংক্রান্ত অধ্যায়ে তুলাতেও উশর আদায় করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে ধান, ভুট্টা, বুট, আখ ইত্যাদিতেও তার মতে উশর দিতে হবে।

মাওলানা শামছুল হক আযিমাবাদী এবং মাওলানা আব্দুর রউফও এই ফতোয়ায় একমত হয়েছেন। মাওলানা শারফুদ্দীনের এক পৃথক ফতোয়া অনুসারে যাবতীয় ফসল ও যাবতীয় ফলমূল যথা-আম, ডালিম, আপেল ইত্যাদিতেও উশর অথবা অর্ধ উশর দিতে হবে। বিস্তারিত আলোচনার পর উপসংহারে তিনি বলেন :

"সুতরাং প্রমাণিত হয়েছে যে,  প্রামাণ্য দলিল অনুসারে প্রত্যেক কৃষি দ্রব্যেই উশর অথবা অর্ধ উশর দিতে হবে। শাক সবজি ও তরিতরকারি উশরযোগ্য নয়। এই মর্মে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে তার কোনোটাই সঠিক নয়। এটা কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের বিপরীত বটে। কাজেই ঐ সব মত অনুসারে কাজ করা চলবেনা। যদি ধরেও নেয়া হয় যে, ওগুলো সঠিক, তবে ঐ শাক-সবজি ও তরিতরকারি অর্থ হলো নিজেদের খাওয়ার জন্য যে সব শাক, পাতা লাউ ইত্যাদি স্বল্প পরিসরে ফলানো হয়। খামারের পর খামার ও একরের পর একর জুড়ে হাজার হাজার টাকার যে ফসল ফলানো হয়, তা কখনো উশর থেকে বাদ পড়তে পারেনা। এটা কুরআন ও হাদিস ও সাধারণ বিবেক বুদ্ধি উভয়েরই পরিপন্থী। মূলা, গাজর, শালগম, আলু, আখ, তরমুজ, খিরাই ইত্যাদি থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জিত হয়ে থাকে।" [ফতোয়ায়ে সানাইয়া, প্রথম খণ্ড, পৃ, ৫৪-৭৪]

মাওলানা আতাউল্লা হানিফ সাহেব নাসায়ী শরিফের টীকায় যে আলোচনা করেছেন, তাতে এই অভিমতের প্রতি সমর্থনের দিকটাই প্রবল বলে মনে হয়।

ক্ষেত খামার এবং বাগানের পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষন, চাষাবাদ, সার প্রয়োগ, ফসল কাটা ইত্যাদির খরচের ব্যাপারে হানাফি মাযহাবের সাধারণ ফতোয়া এই যে, মোট কৃষি উৎপাদন বা তার মূল্য থেকে এটা বাদ দিয়ে অবশিষ্টের উপর উশর দেয়া জায়েয নয়, বরং গোটা ফসলের উপর উশর দিতে হবে। এ বিধান অধিকাংশ হানাফি গ্রন্থে লেখা আছে, বরাত দেয়ার প্রয়োজন নেই। 'আল ফিকহু আলাল মাযাহিবিল আরবায়া' (চারি মাযহাবের ফেকাহ নামক গ্রন্থের বক্তব্য থেকে মনে হয়, শাফেয়ী মাযহাবের নীতেও এটাই।) প্রথম খণ্ডের ৬১৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে :
"নির্ভরযোগ্য মতানুসারে যাকাত দেয়ার আগে ফসল কাটার খরচ বের করা নাজায়েয।"

'আল মুহাল্লা' ৫ম খণ্ডের ২৫৮ পৃষ্ঠায় ইবনে হাজম বলেন, ফসল উৎপাদন, কাটা ও মাড়াই, মাটি খনন, সার প্রয়োগ এবং এ জাতীয় অন্যান্য ব্যয় উশর দেয়ার আগে বাদ দেয়া জায়েয নয়। তাঁর মতে, ইমাম মালেক,শাফেয়ী, আবু হানিফা এবং জাহেরিয়া মাযহাবের ইমামদের অভিমতও তাই।

আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি তথা ট্রাক্টর, থ্রাসার, টিউবওয়েল ইত্যাদির বিধানও তদ্রুপ। এগুলোর মূল্য বা ভাড়ার টাকা মোট উৎপন্ন ফসল থেকে বাদ দেয়া যাবেনা। অন্যথায়, সাধারণ কৃষকের হালের বলদ ও কূয়া খননের খরচও বাদ না দেয়ার কোনো কারণ থাকতে পারেনা।  টিউবওয়েল বা কূয়ার কিংবা খাল-নালা সিঞ্চিত জমির সেচকর উশর দেয়ার আগে কর্তন করা অবৈধ এ কারণে যে, এ ধরনের কৃত্রিম ও শ্রমসাপেক্ষ সেচের জন্য প্রথমেই উশরে রেয়াত দিয়ে অর্ধ উশর করে দেয়া হয়েছে। অনেকে বলেন, আমরা টিউবওয়েল ও ট্রাক্টরে পঞ্চাশ হাজার বা লাখ টাকা ব্যয় করেছি। এসব ব্যয় না পুষিয়ে উশর দেয়া কিভাবে সম্ভব? এ কথার যৌক্তিকতা মেনে নিলে তো এ কথাও উঠবে যে, আমি এক লাখ বা দু'লাখ টাকায় জমি কিনেছি। জমির এই দাম না উঠা পর্যন্ত উশর নেয়া কেন? এ ধরনের টালবাহানা একজন ব্যবসায়ীও করতে পারে যে, আমি দোকান বা কারখানা স্থাপনে এতো টাকা ব্যয় করেছি। কাজেই আমার বাণিজ্যিক পণ্যে আপাতত যাকাত ধার্য না হওয়া বাঞ্ছনীয়। এভাবে ধনীরা নিরাপদ আর গরিবেরা বঞ্চিত হতে থাকবে।

একজন বৃহৎ জমিদার যেমন যান্ত্রিক উপকরণ ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করে একদিকে সময় ও শ্রমের সাশ্রয় এবং অপরদিকে বিপুল বাড়তি ফসল উৎপাদন করে, তেমনি একজন ক্ষুদ্র কৃষক নিজের হাত, পা ও গবাদিপশু ব্যবহার করে। উভয়ের মধ্যে বৈষম্য করার কোনো যৌক্তিকতা বা শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই। তবে সরকারি খাজনা তথা ভূমিকর (সেচকর নয়) উশরের আগে পরিশোধ করা নতুন ও প্রাচীন বহু ফেকাহবিদই অনুমোদন করেছেন। এর সপক্ষে তাদের প্রমাণ হলো, খাজনা  সরাসরি ভূমি উন্নয়ন, অধিক ফসল ফলানো বা কৃষি ব্যয়ের সাথে জড়িত নয়। তাই উশরের হিসাব করার আগে এটিকে উৎপাদন থেকে বাদ দেয়াতে কোনো আপত্তি নেই। [তরজমানুল কুরআন, সেপ্টেম্বর ১৯৭৮]



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )