আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান</h1>
প্রশ্ন : রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খণ্ডে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করা চলে, তাই তা সুতি হোক কিংবা পশমি হোক রামপুর (ভারত) থেকে প্রকাশিত মাসিক যিন্দেগীর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, সুতি হোক, পশমি হোক, পাতলা মোজার উপর মসেহ করা চলবেনা। কেননা পবিত্র কুরআন ও উৎকৃষ্ট মানের সহীহ হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত বিধিকে দুর্বল হাদিসের ভিত্তিতে শিথিল করা যায়না। হযরত মুগীরা ইবনে শুবার যে হাদিসটি বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে এবং যা অত্যন্ত সহীহ হাদিস, তাতে একমাত্র চামড়ার মোজার উপরে মসেহ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর অপর যে হাদিসটিতে জাওরাইন (সুতি ও পশমি মোজা) শব্দটি সংযোজিত হয়েছে, হাদিস শাস্ত্রের ইমামগণ তাকে দুর্বল বলে রায় দিয়েছেন।

বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে এরূপ যুক্তিও উত্থাপন করা হয়েছে যে, 'জওরাব' ও চামড়ার তৈরি হয়ে থাকে বিধায় 'জওরাব' ও এক ধরনের খুফ্‌ (চামড়ার মোজা) সুতরাং হয় চামড়ার মোজার উপরই মসেহ জায়েয মেনে নিতে হবে, নচেত জাওরাব যদি চামড়ার না হয়, তবে তাকে এমন শর্ত আরোপ করতে হবে যাতে তা খুফ্‌ তথা চামড়ার মোজার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। অন্যথায় চামড়ার মোজা ছাড়া আর কোনো মোজার উপর মসেহ করা জায়েয হবে না।

যিন্দেগীর উক্ত সংখ্যায় যে বিতর্ক, প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তরজমানুল কুরআনে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা আসা জরুরী হয়ে পড়েছে। যে কোনো মোজার উপর যে মসেহ করা চলে, সে সম্পর্কে প্রাচীন ইমামদের কোনো উক্তি থাকলে সেটাও তুলে দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

জবাব : চামড়ার মোজার উপর মসেহ জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সুন্নি ইমামরা প্রায় সকলেই একমত। তবে জাওরাব তথা চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপর মসেহ করার জন্য ফেকাহবিদগণ কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যেমন তা মোটা হওয়া চাই, গাঢ় ও পুরু হওয়া চাই, পানি নিরোধক হওয়া চাই এবং তাতে জুতার সমপরিমাণ চামড়াযুক্ত থাকা চাই। তবে প্রাচীন ফেকাহবিদদের কেউ কেউ আবার সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করাকে জায়েয মনে করেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম এবং ইবনে হাজ্‌ম এই মতেরই প্রবক্তা। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ফতোয়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে সুতি হোক, পশমি হোক, চামড়াযুক্ত হোক বা না হোক- যে কোনো মোজার উপর মসেহ জায়েয বলে একটি ফতোয়া লিপিবদ্ধ রয়েছে। রসূল সা. চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপরও মসেহ করতেন এই মর্মে যেসব হাদিস বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বলেন :

এই হাদিসগুলোর বক্তব্য হাদিসবেত্তাদের মানদণ্ডে সহীহ প্রমাণিত না হলেও স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধির দৃষ্টিতে এই বক্তব্য সঠিক। মাসাহের প্রয়োজন উভয় ক্ষেত্রেই সমান। উভয় ক্ষেত্রেই মাসাহের প্রয়োজন ও যৌক্তিকতা একই রকম। কাজেই এ দুটোর মধ্যে বৈষম্য করা সমমানের জিনিসকে অসম বলারই নামান্তর এবং সুবিচারের পরিপন্থী।

অনুরূপভাবে, চামড়া বেশি টেকসই হয়ে থাকে এবং তাতে পানি ঢোকে না এ যুক্তিও তাঁর মতে গুরুত্ববহ নয়। তিনি বরঞ্চ মনে করেন, সুতি বা পশমি মোজায় পানি শোষণ ও ভেতরে পানি প্রবেশ করা পবিত্রতার প্রয়োজনে অধিকতর অগ্রগণ্য এবং কর্তব্য। এসব মোজার পাতলা বা ঢিলে হওয়া অথবা বাঁধার প্রয়োজন না হওয়ায় তাঁর মতে অসুবিধার কিছু নেই।

আবু দাউদ শরিফের ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থে মসেহ  সংক্রান্ত হাদিসের পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে কাইয়েমও এই অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। এসব হাদিসের সনদ যে নির্ভরযোগ্য নয়, সেকথা তিনি স্বীকার করেছেন। তবে তার বিভিন্ন জবাবও দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, সুতি ও পশমি মোজায় মসেহ বৈধ হওয়ার ব্যাপারটা শুধুমাত্র রসূল স.-এর প্রত্যক্ষ বক্তব্য বা আচরণ সম্বলিত হাদিসের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ১৩ জন সাহাবির কার্যধারা থেকেও তা সমর্থিত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল র. এই হাদিসগুলোকে দুর্বল আখ্যায়িত করা সত্বেও সুতি ও পশমি কাপড়ের মোজার উপর মসেহকে বৈধ বলে রায় দিয়ে সুবিচার ও ইনসাফের পরিচয় দিয়েছেন। সাহাবাদের কার্যধারা ও সুস্পষ্ট যৌক্তিকতার আলোকেই তিনি এরূপ রায় দিয়েছেন। আসলে 'জাওরাবাইন' তথা সুতি ও পশমি মোজা এবং 'খুফ্‌ফাইন' তথা চামড়ার মোজার এমন কোনো কার্যকর পার্থক্য নেই, যা শরিয়তের বিধানে পার্থক্য সুচিত করতে পারে। ইবনে কায়েম অনেক দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এতে তিনি সুতি ও পশমি মোজার উপর মাসাহের শর্তাবলীর সমালোচনা করেছেন এবং এ জাতীয় মোজার উপর মাসাহের বৈধতা সম্বলিত হাদিসগুলোতে সনদ ও যুক্তির বিচারে যে খুঁত ধরা হয়েছে, তা খণ্ডন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি পরিহাসচ্ছলে একটা তীর্যক মন্তব্যও ছুড়ে দিয়েছেন যে, কোনো কোনো ফেকাহ শাস্ত্রবিদদের কাছে চামড়ার মোজার সাথে সুতি ও পশমির মোজাকেও মসেহযোগ্য ধরা গ্রহণযোগ্য হয়নি। অথচ এ ধরনের কোনো সংযোজন যখন তাদের ফেকাহ শাস্ত্রীয় মতামতের পক্ষে যায়, তখন সেটাকে তারা নি:সংকোচে গ্রহণ করেন।
            ----------------------------------------------------------------
"ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের দাবি এই যে, আপনি নিজের পণ্য যে পাল্লা দিয়ে মাপেন, আপনার বিরুদ্ধবাদীর পণ্যও সেই পাল্লা দিয়েই মাপবেন। নেয়া ও দোয়ার পাল্লা আলাদা রাখবেন না।"

ইবনে হাজমও তদীয় গ্রন্থ মুহাল্লাতে বিশদ আলোচনা করে ও সকল হাদিস উদ্ধৃত করে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, পায়ে  চামড়া, সুমি, পশমি, বা অন্য কোনো কাপড়ের তৈরি যাই পরা হোক না কেন, তাতে মসেহ চলবে। এতো সব ইতিবাচক মতামত ও বক্তব্য বর্তমান থাকা অবস্থায় কেউ যদি পূর্ববর্ণিত ফকীহদের উল্লেখিত শর্তাবলী সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ ও সর্বপ্রকারের মোজার উপর মসেহ করাকে বৈধ মনে করে, তবে তার বক্তব্য সহজে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এরপর আরো কয়েকটি কথা বলা সমীচীন মনে করছি। প্রথম কথা হলো, সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ জায়েয এই মর্মে মুগীরা ইবনে শুবা রা. বর্ণিত হাদিসটি ইমাম তিরমিযী সহীহ ও উত্তম বলেছেন। এই হাদিসটিকে একই সাহাবি বর্ণিত চামড়ার মোজায় মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের বিপরীত বলে অগ্রাহ্য করা যায়না। এতোটুকু বৈপরিত্য মেনে নেয়া যেতো যদি মাসাহের ঘটনা একআধবার ঘটতো। ওযু করা ও পবিত্রতা অর্জন করা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। তাই উভয় ধরনের মোজায় মসেহ করার প্রয়োজনীয়তা স্বভাবতই একাধিকবার দেখা দেয়ার কথা। তাছাড়া হযরত মুগীরা দীর্ঘদিন যাবত রসূল সা.-এর সাথে থেকেছেন। তাই তার এই দু'ধরণের বর্ণনায় রসূল সা.-এর বিভিন্ন সময়কার কার্যধারার প্রতিফলন ঘটেছে ধরে নিতে অসুবিধে কোথায়? সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ সম্পর্কে রসূল সা. -এর আরো বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো বিশেষ ধরনের মোজা নয় বরং যে কোনো ধরনের মোজার উপরই মসেহ জায়েয। তাই মসেহকে শুধুমাত্র চামড়ার মোজার সাথে নির্দিষ্ট করা এবং সুতি বা পশমির মোজা হলে তাকেও চামড়ার মোজা সদৃশ্য ঘন ও পুরু ইত্যাদি হওয়ার শর্তযুক্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই।

কথাটা আরো একটু সহজবোধ্য করার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। সোনা ও রূপার যাকাতের সর্বনিম্ন পরিমাণ আলাদা আলাদা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তন্মোধ্যে রূপার নিসাব সম্বলিত হাদিস সবচেয়ে বিশুদ্ধ। কিন্তু সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিস সনদের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। ছয়টি সহীহ হাদিস গ্রন্থের মধ্যে কেবলমাত্র আবু দাউদ শরিফে সোনার নিসাব ২০ দিনার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই হাদিসের বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা বিতর্কিত। তা সত্ত্বেও দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমান সোনা ও রূপার আলাদা আলাদা নিসাবই মেনে চলে। নিসাব সংক্রান্ত এই হাদিসকে গ্রহণ করলে নিসাবের চেয়ে কম পরিমাণে যাকাত থেকে অব্যাহতি মেলে, ঠিক যেমন মাসাহের হাদিস গ্রহণ করলে মসেহ করে পা ধোয়ার হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। নিসাবের প্রশ্নটা যাকাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত সম্পাদনের সাথে জড়িত। এখন সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিসটি যদি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তাহলে কুরআনের কঠোর সতর্কবাণী অনুযায়ী যাকাত না দিয়ে স্বর্ণের একটা তারও রাখা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। আর যদি (একই কারণে অর্থাৎ হাদিসটি দুর্বল হলে অগ্রাহ্য করার কারণে) সোনাকে রূপার সমপর্যায়ের ধাতু ধরে নিয়ে সোনার নিসাব ও রূপার নিসাবের সমান মনে করা হয়, (যেমন সুতি ও পশমি মোজাকে চামড়ার মোজার সমপর্যায়ের ধরা হয়) তাহলে একতোলা সোনার উপরও যাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু চামড়ার মোজা ও কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করার অনুমতিকে যদি পৃথক পৃথক অনুমতি মেনে নেয়া হয় এবং একটির সাথে অন্যটিকে জড়িয়ে ফেলা না হয়, তাহলে মোজা মোটা বা পাতলা যাই হোক, বিধি অপরিবর্তিতই থাকবে। কোনো জিনিসের পুরু বা পাতলা হওয়াটা আপিক্ষিক গুণ বা অবস্থা মাত্র, মূল জিনিসের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মোটা বা পাতলা যাই হোক চামড়া চামড়াই এবং পশম পশমই। আজকাল যে ধরনের পাতলা ও কোমল চামড়ার পায়তাবা পরে কেউ কেউ মসেহ করে থাকেন, সে মসেহ জায়েয হলে সুতি পশমি ও নাইলনের মোজায় মসেহ করা নাজায়েয কেন হবে?

আরবিতে খুফ্‌ ও (জাওরাব) বলতে যে মোজা বুঝায়, সেই উভয় মোজাই চামড়ার হয়ে থাকে- এ কথা ঠিক নয়। প্রচলিত আরবিতে খুফ্‌ বলতে চামড়ার মোজা এবং জাওরাব বলতে চামড়া ছাড়া অন্যান্য মোজা বুঝায়। তবে লিসানুল আরব, কামুস ও তাজুল আরুসে এই দুটো শব্দের আভিধানিক অর্থ বলা হয়েছে 'পায়ের পোশাক।' চামড়ার তৈরি না অন্য কিছুর তৈরি, এই দু'টি শব্দের আসল আভিধানিকদের কাছে কোনো ধরাবাধা ব্যাপার নয়। তাজুল আরুস এবং লিসানুল আরবে এ কথাও বলা হয়েছে যে, জাওরাব আসলে ফার্সী শব্দ 'গোরব'-এর আরবি রূপ। আর ফার্সী আভিধানে গোরব অর্থ হলো পশম বা সুতার মোজা। আরবি ভাষায় খুফ্‌ শব্দ দ্বারা জাওরাব এবং জাওরাব দ্বারা খুফ্‌ বুঝানোও বিচিত্র নয়। ইমাম দুলাবী স্বীয় গ্রন্থ 'আসমা ও কুনাতে' হযরত আনাস সম্পর্কে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যে, তিনি স্বীয় পশমি মোজায় মসেহ করে বললেন : ------------------------------ 'এ দুটো হচ্ছে পশমের তৈরি খুফ্‌।'

এ থেকে বুঝা গেলো যে, পশমি মোজাকে হযরত আনাস একশ্রেণীর খুফই বলেছেন। তিনি এ কথা বলেননি যে, এটা খুফ তো নয়, তবে অত্যাধিক মোটা ও পুরু বলে এটা খুফেরই পর্যায়ভুক্ত এবং এ কারণেই তার উপর মসেহ বৈধ। [তরজমানুল কুরআন, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮]

[ ২ ]
করাচি থেকে প্রকাশিত মাসিক 'আল বালাগ' এর জমাদিউল উলা ১৩৯৭ হি. সংখ্যায় 'প্রচলিত মোজার উপর মসেহ' শিরোনামে জনাব মুহাম্মদ তক্বী সাহেবের একটি ফতোয়া ছাপা হয়। শুভানুধ্যায়ীদের কেউ কেউ ঐ ফতোয়ার প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। ফতোয়াটিতে 'রাসায়েল ও মাসায়েল' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে প্রকাশিত মাওলানা মওদূদীর একটি জবাবের যেরূপ সমালোচনা করা হয়েছে ও কটুক্তিপূর্ণ আক্রমণ চালানো হয়েছে, তার পর্যালোচনা করার জন্যও তাঁরা আমাকে অনুরোধ করেন। তাই তরজমানুল কুরআনের মাধ্যমে উক্ত 'ফতোয়া'র নিম্নরূপ পর্যালোচনা করা হলো।

'প্রচলিত মোজার উপর মসেহ' বিষয়ে 'আল বালাগ' সম্পাদক যে লেখাটি ছেপে দিয়েছেন, তাতে তিনি যদি সোজাসুজি বলে দিতেন যে, হানাফি মাযহাব বা অন্য কোনো বিশেষ মাযহাব অনুসারে ঢালাওভাবে সব ধরনের মোজার উপর মসেহ জায়েয নেই এবং জায়েয হওয়ার পক্ষে যেসব মতামত রয়েছে তা খণ্ডন করার জন্য তিনি নিজের গবেষণা কিংবা হানাফি আলেমদের উক্তি উদ্ধৃত করে ক্ষান্ত থাকতেন, তাহলে তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়ে যেতো এবং আমাদেরও তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার হতোনা। কিন্তু জনাব মুহাম্মদ তক্বী উসমানী সাহেব শুধু অতোটুকু করে ক্ষান্ত হননি। উপরন্তু এ কথাও প্রমাণ করা আবশ্যক মনে করেছেন যে, "এ বিষয়ে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী সাহেব সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অনুসৃত নীতি থেকে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছেন।" সেই সাথে তিনি এ অভিযোগও আরোপ করেছেন যে, "বহু সংখ্যক মাসয়ালাতে মাওলানা মওদূদী সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছেন এবং আলোচ্য ব্যাপারটা তারই একটি। যদিও আল্লামা ইবনে হাজম, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাইয়েমের মতামতও মাওলানা মওদূদীর মতোই, তথাপি এটা তার একটা নিদারুণ ধৃষ্টতা।"

পাঠককে বিষয়টির প্রকৃত তাৎপর্য যথাযথভাবে বুঝানোর উদ্দেশ্যে উসমানী সাহেব সর্বপ্রথমে একটা ফেকাহ শাস্ত্রীয় মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। সেটি হলো, কোনো মুতাওয়াতের (সর্বাপেক্ষা বহুল প্রচলিত) হাদিস ব্যতীত কুরআনের কোনো আদেশকে কোনোভাবে সীমিত বা শর্তযুক্ত করা যায়না। খবরে ওয়াহেদ (একজন সাহাবি কর্তৃক বর্ণিত হাদিস) দ্বারা কুরআনের কোনো হুকুমকে রহিত করা, সীমিত করা বা তাতে কোনো কিছু  সংযোজন করা জায়েয নেই। উসমানী সাহেব যে সুতি বা পশমি মোজার উপর মসেহ অবৈধ এই মতটিকে যেভাবে মুসলিম উম্মাহর সর্ববাদী সম্মত রায় বলে উল্লেখ করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে উল্লেখিত ফেকাহ শাস্ত্রীয় মূলনীতিটিও এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যেনো এটা কুরআন ও সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট উক্তি অথবা ওটাও মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। অথচ আসল ব্যাপার হলো, এই মূলনীতিটি শুধুমাত্র হানাফি মাযহাবের গৃহীত মূলনীতি। আর হানাফি ইমামগণও মূলনীতিটি যতো কড়াকড়িভাবে নিজেদের 'উসূলে ফেকাহ' (ফেকাহ শাস্ত্রের মূলনীতি) গ্রন্থাবলীতে লিপিবদ্ধ করেছেন, নিজেদের ইজতিহাদে ও ফিকাহ শাস্ত্রীয় খুঁটিনাটি বিধি রচনার ক্ষেত্রে ততোটা কড়াকড়িভাবে ঐ মূলনীতি অনুসরণ করেননি। এমন বহু খুটিঁনাটি বিধি পাওয়া যায়, যা রচনা করতে গিয়ে হানাফি ফেকাহবেত্তাগণ খবরে ওয়াহেদ (সনদের দিক থেকে বলিষ্ঠ, স্বল্প বলিষ্ঠ কিংবা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও) ও সাহাবির উক্তিকে স্বাচ্ছন্দ্যে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সেই সব বিধি দেখলে কারো পক্ষে একথা বলা বিচিত্র নয় যে, এ দ্বারাও কুরআনের অমুক ব্যাপক আদেশকে সীমিত বা শর্তযুক্ত করা হয়েছে। তবে অন্যান্য মাযহাবের ফেকাহবেত্তাগণ ও হাদিস বিশেষজ্ঞগণ হানাফিদের উক্ত মূলনীতিকে সর্বোতভাবে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মনে করেননা এবং এটিকে হাদিস গ্রহণ বর্জনের মানদণ্ড হিসেবেও গ্রহণ করেননা। এ মূলনীতির সাথে শাফেয়ী মাযহাবের আলেমগণ যে একমত নন, সে কথা স্বয়ং হানাফি আলেমগণ মূলনীতিটি বর্ণনা করার সাথে সাথেই বলে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, শরিয়তের কোনো বিধি রহিতকরণ সংক্রান্ত মূলনীতির আলোচনা প্রসঙ্গে 'নুরুল আনোয়ার' গ্রন্থে বলা হয়েছে :

"কুরআনে বর্ণিত কোনো সাধারণ ও সর্বব্যাপী বিধিকে যখন কোনো হাদিস দ্বারা সীমিত ও শর্তযুক্ত করা হয়, অথবা কুরআন বর্ণিত বিধির উপর হাদিস দ্বারা কিছু সংযোজিত হয়, তখন আমরা (হানাফিরা) এই উভয় কাজকে 'রহিতকরণ' নামে অভিহিত করি। আর ইমাম শাফেয়ী প্রথমটিকে 'নির্দিষ্টকরণ' এবং দ্বিতীয়টিকে 'বিশ্লেষণ ও সম্প্রসারণ' নামে আখ্যায়িত করেন। আমাদের মতে এ উভয় প্রকারের পরিবর্তন কেবলমাত্র 'মুতাওয়াতির' (সর্বজনবিদিত)' মাশহুর (বহুল প্রচলিত) হাদিসের ভিত্তিতেও বৈধ। কিন্তু ইমাম শাফেয়ীর মতে, এটি একজন সাহাবির বর্ণিত হাদিসের (খবরে ওয়াহিদ) ভিত্তিতেও বৈধ।" (নুরুল আনোয়ার মোস্তফাই প্রকাশনা কর্তৃক ১৩০৫ হিজরীরে মুদ্রিত, পৃ. ২১০)

ইমাম শাফেয়ী স্বীয় ফেকাহ শাস্ত্রের মূলনীতি সম্বলিত গ্রন্থ 'আররিসালাহ'তে নাসেখ ও মানসুখ' (রহিতকারি ও রহিত) সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন এবং এতে 'খবরে ওয়াহেদ' দ্বারা কুরআন বর্ণিত বিধির ব্যাপকভাবে সীমিত ও সংকচিত করার বহু উদাহরণ দিয়েছেন। অথচ একজন মাত্র সাহাবির বর্ণিত এইসব হাদিসের সনদেরও ধারাবাহিকতা নেই এবং তার কোনো কোনো বর্ণনাকারীর জীবনবৃত্তান্তও অজ্ঞাত। উদাহরণস্বরূপ ----------------- (যে ব্যক্তি উত্তরাধিকারী সূত্রে সম্পত্তির অংশীদার-তার জন্য ওসীয়ত দ্বারা কোনো সম্পত্তি বরাদ্দ করা জায়েয নেই।) তবে হাদিসটির সনদ লক্ষ্য করুন :
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
অন্যান্য মাযহাবের ইমামগণের ন্যায় হানাফি মাযহাবের ইমামগণও উত্তরাধিকারীর পক্ষে ওসীয়ত না হওয়ার বিধি রচনায় এই হাদিসকে উৎস ও দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধা করেননি। আর শুধু এটা কেন, নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ থেকে হত্যাকারীর বঞ্চিত হওয়া, সোনার যাকাতের নিসাব ২০ মিসকল (সাড়ে সাত ভরি) হওয়া, সন্তান হত্যার দায়ে পিতামাতার মৃত্যুদণ্ড না হওয়া মোটকথা এ ধরনের  একাধিক বিধি এমন রয়েছে যার উৎপত্তি হয়েছে 'খবরে ওয়াহেদ' থেকে এবং হাদিস বিশেষজ্ঞদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসারে তার সনদও সবল বা নির্ভরযোগ্য নয়। তথাপি হানাফিসহ সকল মাযহাবের ফেকাহ শাস্ত্রকার ও হাদিস বিশারদগণ এ ধরণের হাদিসকে নিজস্ব দুষ্টিভঙ্গি অনুসারে শরিয়তের বিধি রচনার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অথচ ঐসব বিধি রচনা করতে গিয়ে কার্যত কুরআনের সাধারণ ও সর্বব্যাপী নির্দেশকে সীমিত ও শর্তযুক্ত করা হয়ে গেছে যা  হানাফি মূলনীতির আলোকে হওয়ার কথা নয়। এই হাদিসগুলোকে উৎস হিসেবে গ্রহণ করার রেওয়াজ চালু হয়ে যাওয়ার পর এ প্রশ্ন অনেকটা অবান্তর হয়ে যায় যে, ফেকাহ শাস্ত্রকারগণ এসব হাদিসের উপর কোন কারণে এতো নির্ভরশীল ও আস্থাশীল হয়ে পড়লেন? তাঁরা এর বিভিন্ন কারণ দর্শিয়ে থাকেন। কখনো বলা হয় যে, এসব হাদিস দ্বারা যে বিধিসমূহ রচিত, তা আসলে কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য থেকে যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রমাণিত। কখনো একথাও বলা হয় যে, এসব হাদিস 'খবরে ওয়াহেদ' হলেও পরবর্তীকালে তা বহুল প্রচলিত হাদিসে পরিণত হয়েছে, যা মুসলিম উম্মাহ কর্তৃক সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই এখন এগুলো থেকে কুরআন বর্ণিত বিধিসমূহের পরিবর্তন পরিবর্ধন ও শরিয়তের অন্যান্য বিধি রচনায় আর কোনো বাধা নেই। কিন্তু এতদসত্বেও প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যে সময় ফেকাহ শাস্ত্রীয় বিভিন্ন মাযহাবের উৎপত্তি হয়নি এবং এই সব বিচ্ছিন্ন, বিরল ও অসম্পূর্ণ সনদযুক্ত হাদিস ব্যাপক প্রচলন ও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, তখনও কি এসব হাদিসের ভিত্তিতে শরিয়তের বিধি প্রণয়ন মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো? তা যদি থাকতো, তবে এসব হাদিস মুসলিম জগতের আলেমের সমাজে এতো জনপ্রিয় হলো কিভাবে?

হানাফি মাযহাব হাদিস দ্বারা কুরআনের বিধির পরিবর্তন পরিবর্ধন ও সংকোচনের বিরুদ্ধে নিজস্ব মতবাদ নীতিগতভাবে ঘোষণা করেছে বটে, তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এ নীতি পদে পদে কঠোরভাবে অনুসরণ করেনি। তাছাড়া হানাফিদের এই মূলনীতির সাথে যে শাফেয়ী ও অন্যান্য মাযহাবের ইমামদের মতভেদ রয়েছে, সে কথাও স্বীকার করা হয়েছে। মুসাল্লামুস সুবুত গ্রন্থের টীকায় পরিবর্তন ও সংকোচনের  ব্যাপারে আলোচনা প্রসঙ্গে মাওলানা মুহিবুল্লাহ সাহেব বলেন :

একক সাহাবি বর্ণিত হাদিস দ্বারা কুরআনী বিধির আওতা সীমিতকরণকে হানাফিরা জায়েয মনে করেন না। অনুরূপভাবে মুতাওয়াতির তথা সর্বজনবিদিত হাদিসের আওতা সংকোচনও জায়েয নয়, যদি না ইতিপূর্বে অপর কোনো অকাট্য আয়াত বা হাদিস দ্বারা তার সমর্থন পাওয়া যায়। অত:পর তিনি বলেন :

"ফেকাহ শাস্ত্রীয় মূলনীতির (উসুলে ফেকাহ) অন্যান্য বিশেষজ্ঞগণ একক সাহাবি বর্ণিত হাদিস দ্বারা কুরাআনী বিধির আওতা সংকোচন বা নির্দিষ্টকরণকে বৈধ বলে রায় দিয়েছেন- চাই তা ইতিপূর্বে অপর কোনো অকাট্য দলিল দ্বারা সংকচিত হয়ে থাক বা না থাক (পৃ. ৩৪৯)।"

কেউ যদি উসুলে ফেকাহ (ফেকাহ শাস্ত্রীয় মূলনীতি) বিষয়ে কোনো গ্রন্থ রচনা করতে চান, তবে তিনি সে ক্ষেত্রে যতো খুশি গবেষণা চালাতে পারেন এবং হানাফি আলেমদের এই একক মূলনীতির ব্যাখ্যা এ সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু নিছক মোজার উপর মসেহ সম্পর্কে কোনো ব্যক্তিবিশেষের রায় খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে এতো লম্বা চওড়া ভূমিকা রচনা করা এবং একথা বলা যে, 'চামড়ার মোজার উপর মসেহ করার সপক্ষে দু'তিনটি হাদিস যদি থাকতো তবু তার ভিত্তিতে কুরআনের হুকুমকে সীমিত করা বৈধ হতোনা, কারণ খবরে ওয়াহেদ দ্বারা কুরআনের আদেশ রহিতকরণ, পরিবর্তন বা পরিবর্ধন জায়েয নয়- ইসলামি বিধানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের কোনো সঠিক পদ্ধতি নয়। আরবি মাদরাসাসমূহের শিক্ষার্থীরা এ আলোচনা দ্বারা উপকৃত ও আনন্দিত হতে পারে। কিন্তু একজন সাধারণ পাঠক এ বক্তব্য পড়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাবে এবং হতোবুদ্ধি হয়ে যাবে যে, দু'তিনটি হাদিস দ্বারা তো কুরআনের বিধির পরিবর্তন করা যায়না। কিন্তু অনেকগুলো হাদিস পাওয়া গেলে তার দ্বারা  এই পরিবর্তন সাধন করা যায়। 'খবরে ওয়াহেদ' প্রভৃতি পরিভাষাও সকলের বোধগম্য নয়, আর স্বয়ং তক্বী উসমানী সাহেব সে সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করেন তাও বলেননি। খবরে মুতাওয়াতির নয় এমন হাদিস মাত্রই খবরে ওয়াহেদ পদবাচ্য, চাই তার সনদ বিশুদ্ধ হোক এবং দু'তিনটি সূত্রে নয় বরং বহুসংখ্যক সূত্রে তা বর্ণিত হোক তাতে কিছু যায় আসেনা। আর যে হাদিস প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক স্তরে এতো বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, তরি মিথ্যা বা ভুল হাদিস বর্ণনা করার জন্য জোটবদ্ধ হয়েছিল বলে ধারণা করা স্বভাবতই অসম্ভব, সেই হাদিসকে বলা হয় 'খবরে মুতাওয়াতির'। তাছাড়া হাদিসের বক্তব্য, দৃষ্টি, শ্রবণ ও অনুভবযোগ্য ব্যাপার সম্পর্কিত হওয়াও মুতাওয়াতির হওয়ার জন্য জরুরি। এদিক থেকে বিবেচনা করলে ছয়খানা সহীহ হাদিস গ্রন্থসমূহ তো দুরে থাক, খোদ বুখারি ও মুসলিম এই দু'খানা সর্বোচ্চ মানের বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থেরও শরিয়তের বিধান এবং ইবাদত ও বৈষয়িক লেনদেনের খুঁটিনাটি সংক্রান্ত অধিকাংশ হাদিস খবরে ওয়াহেদেরই পর্যায়ভুক্ত, খবরে মুতাওয়াতির নয়। সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কার্যকলাপ, গ্রহণ ও বর্জন এসব হাদিস দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত এবং কুরআনের উপর পরিবর্ধন, রহিতকরণ এবং নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। এর প্রতিটি হাদিসেই কুরআনের বক্তব্যের কিছুনা কিছু রদবদল বা সংযোজনমূলক কথা বলা হয়েছে, চাই তা নিছক ব্যাখ্যাসম্বলিত হোক, কোনো বিধির আওতা নির্দিষ্ট বা সংকুচিত করার লক্ষ্যে উচ্চারিত হোক অথবা উসুলে ফেকাহ বিশারদদের ভাষায় তা অন্য কোনো বিশেষ নামে পরিচিত হোক আর না হোক, এ কথা সত্য যে, হাদিসে হুবুহু কুরআনের আয়াত পুনরুচ্চারিত হয়নি। এতো সব হাদিসের অনুসরণে কাজ করা যদি জায়েয না হয়, তাহলে আমাদের হাতে আর কয়টা মুতাওয়াতির হাদিস অবশিষ্ট থাকবে, যার অনুকরণ ও অনুসরণ জায়েয হবে বা বাধ্যতামূলক হবে?

মোটকথা, দু'তিনটি হাদিস নয়, মোজা বা জারাবের উপর মসেহ করার বৈধতা নিরুপণকারী হাদিস যদি মাত্র একটা করেও থাকে এবং তা সনদের দিক থেকে নির্ভুল হয়, আর এই মসেহকে নিষিদ্ধকারী অপর কোনো হাদিস না থাকে. তা হলেও আমার মতে চামড়ার মোজার মতো কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করাও জায়েয হবে।

'আল বালাগ' সম্পাদক লিখেছেন, কাপড়ের মোজার উপর মসেহ বৈধ অভিহিতকারী হাদিস মাত্র তিনটি এবং তিনটিই যয়ীফ। এর একটি হযরত বিলাল থেকে, একটি হযরত আবু মূসা থেকে এবং একটি হযরত মুগীরা থেকে বর্ণিত। হযরত বিলাল এবং হযরত আবু মূসা আশয়ারী থেকে বর্ণিত হাদিস দুটো সম্পর্কে উসমানী সাহেবও বলেন, হাফেয জায়লায়ী হাদিসকে সনদের দিক থেকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। এখন দেখা যাক, ইমাম জায়লায়ী স্বীয় গ্রন্থ 'নাসকুর রায়া'তে কি বলেছেন। তিনি লিখেছেন:

বুঝা গেলো বিলাল থেকে দু'টি সনদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল সা. চামড়ার মোজার উপরও মসেহ করতেন, কাপড়ের মোজার উপরও মসেহ করতেন। এখানে 'খুফ' এবং 'জাওরাব' শব্দ দু'টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা যে শর্তহীন ও কোনো গুণ বা অবস্থার ভেদাভেদ করা হয়নি তাও পরিস্ফুট। এর পরিষ্কার অর্থ হলো, চামড়ার কিংবা সুতি পশমি কাপড়ের তৈরি সব রকমের মোজার উপর মসেহ করা যায়। এই দুটি হাদিসের মধ্যে প্রথমটির সনদ নিয়ে হাফেয জায়লায়ী কোনো উচ্চবাক্য করেননি। শুধুমাত্র দ্বিতীয় হাদিসের দু'জন বর্ণনাকারী বা রাবী সম্পর্কে লিখেছেন :

"ইয়াযীদ ইবনে আবু জিয়াদ ও ইবনে লায়লাকে দুর্বল মনে করা হয়। তবে তাদের সম্পর্কে সত্যবাদী হওয়ার ধারণাই প্রবল। অর্থাৎ তারা মিথ্যা বা ভুল বর্ণনাকারী ছিলেন না।"

ইয়াযীদ ইবনে আবু জিয়াদ নামে একাধিক রাবী রয়েছেন। কাজেই তাদের সম্পর্কে ঝটপট কিছু বলা কঠিন। তবে আব্দুর রহমান ইবনে আবি লায়লাকে হাদিস শাস্ত্রবিদদের অধিকাংশ বিশ্বস্ত বলে রায় দিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজারও তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। স্বয়ং জায়লায়ী উভয় রাবী সম্পর্কে সতর্কতার সাথে মন্তব্য করেছেন এবং সাথে সাথে একথাও বলেছেন যে, তাদেরকে সত্যভাষী মনে করা হয়। সুতরাং হযরত বিলাল বর্ণিত হাদিসকে একেবারেই দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলে রায় দেয়া উসমানী সাহেবের সম্পূর্ণ ভুল।

এরপর হযরত আবু মূসা আশয়ারীর বর্ণিত হাদিসটির প্রসঙ্গে আসা যাক। এ সম্পর্কেও 'আল বালাগ' সম্পাদক শুধু একথা লিখেই দায় সেরে ফেলেছেন যে, হাফেয জায়লায়ী এ হাদিসের সনদকে দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন এবং ইমাম আবু দাউদও বলেছেন যে, এর সনদ ধারাবাহিক নয় এবং দুর্বল। কিন্তু কি কারণে এ হাদিসের সনদ ধারাবাহিক এবং সবল নয়, তা ইমাম আবু দাউদ বিশদভাবে বলেননি। অবশ্য অন্যান্য হাদিসবেত্তাগণ এর কারণ দেখিয়েছেন এই যে, এর সনদে দিহাক নামে এক বর্ণনাকারী (রাবী) রয়েছে যিনি সাহাবি হযরত আবু মূসা আশয়ারী থেকে সরাসরি এই হাদিস শুনেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়না। আর অপর রাবী ঈসা বিন সিনান দুর্বল। কিন্তু এই দুটো কথাই তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। হাফেয ইবনে হাজারের মতে দিহাক সরাসরি হযরত আবু মূসা থেকে হাদিসটি শুনেছেন বলে প্রমাণ রয়েছে। স্বীয় গ্রন্থ 'তাহজীবুত তাজীবে' তিনি মিহাক বিন আব্দুর রহমান সম্পর্কে বলেন :
"দিহাক নিজের পিতা এবং হযরত আবু মূসা আশয়ারী থেকে হাদিস বর্ণনা  করেছেন এবং তিনি একজন নির্ভরযোগ্য তাবেয়ী।"

খ্যাতনামা হানাফি মনীষী হাফেয আলাউদ্দীন মারদিনী স্বীয় গ্রন্থ 'আল জাওয়ারুন্নাকী'তে মোজার উপর মসেহ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এতে তিনি এই হাদিসের বর্ণনাকারী যাহহাক যে হযরত আবু মূসা  থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন, তা প্রমাণ করার জন্য হাফেয আবুল কামালের  নিম্নোক্ত উক্তি উদ্ধৃত করেন :
"যাহহাক হযরত আবু মূসা থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন।"

দ্বিতীয় রাবী ঈসা বিন সিনানকে যদিও কোনো কোনো হাদিসবেত্তা অমিতভাষী বলে অভিহিত করেছেন কিন্তু তাকে তারা সত্যভাষী ও বলেছেন। ইবনে হাব্বান তাঁকে বিশ্বস্ত রাবীদের অন্যতম বলে অভিহিত করেছেন। সহীহ বুখারিতে তাঁর বর্ণিত হাদিস গৃহীত হয়েছে। ইমাম মারদিনীও উল্লেখিত ক্ষেত্রে হযরত আবু মূসা আশয়ারী থেকে তার হাদিস শ্রবণ প্রত্যয়ন করেছেন। ইমাম যাহাবী স্বীয় গ্রন্থ আলমীযানে বলেন যে, কেউ কেউ তাকে বিশ্বস্ত রাবী হিসেবে গণ্য করেছেন। তাছাড়া হযরত আবু মূসাই শুধু নন, হযরত মুগীরা থেকেও একই বক্তব্য সম্বলিত হাদিস আবু দাউদ শরিফে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং ইমাম আবু দাউদ এতে কোনো খুঁত ধরেননি। হযরত আবু মূসা থেকে বর্ণিত হয়ে এ হাদিস ইবনে মাজা, মুজামে তাবরানী, এবং ইমাম তাহাবীর শরহে আসার গ্রন্থেও শোভা পেয়েছে। কাজেই এ হাদিস কোনোমতেই মধ্যম ধরণের বিশুদ্ধ হাদিসের চেয়ে নিম্নমানের নয়। একাধিক হাদিস বিশারদের মতে এটিকে দুর্বল মনে করার কোনো কারণ নেই।

হযরত বিলাল ও আবু মূসা আশয়ারী থেকে বর্ণিত হাদিসকে প্রত্যাখ্যান ও অগ্রহণযোগ্য আখ্যায়িত করার পর উসমানী সাহেব লিখেছেন : "এখন শুধু হযরত মুগীরা বিন শু'বার হাদিসটিই অবশিষ্ট থাকছে। এর অবস্থা এই যে, ইমাম তিরমিযী এ হাদিসকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ত বললেও অন্যান্য বড় বড় হাদিস বিশারদগণ ইমাম তিরমিযীর উক্তির কঠোর সমালোচনা করেছেন।" কাপড়ের মোজার উপর মসেহ বৈধ প্রতিপন্নকারী হাদিস একটাই অবশিষ্ট রইলো, না আরো হাদিস রয়েছে, সে সম্পর্কে ইনশাআল্লাহ পরে আলোচনা করবো। তবে যদি ধরেও নিই যে, আর কোনো হাদিস এমন নেই তাহলেও উসমানী সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গি বড়ই বিস্ময়কর লাগে। কেননা আবু দাউদ শরিফে কাপড়ের মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত অধ্যায়ে সর্বপ্রথম হযরত মুগীরার যে হাদিসটি নিয়মমাফিক উদ্ধৃত করা হয়েছে, সেটি সম্পর্কে যে ইমাম আবু দাউদ নিজে কোনোই আপত্তি তোলেননি, বরঞ্চ আরো নয় জন সাহাবি কর্তৃক কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করার তথ্য তুলে ধরেছেন, উসমানী সাহেব সে সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। আবু দাউদের বর্ণনা এরূপ :
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
"ইমাম আবু দাউদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, উপরোক্ত নয় জন সাহাবি কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করেছেন । অথচ এ বিবরণটা উসমানী সাহেব একেবারেই এড়িয়ে গেলেন। তবে কেবল আবু দাউদের এই উক্তি তুলে ধরলেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী এ হাদিস বর্ণনা করতেন না। কারণ হযরত মুগীরা থেকে বর্ণিত যেসব হাদিস সমধিক পরিচিত, তা চামড়ার মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত। প্রশ্ন এই যে,  ইবনে মাহদী যদি কোনো হাদিস বর্ণনা করতে দ্বিধান্বিত হয়ে থাকেন, তাহলে শুধু এই কারণে সে হাদিস অন্য সবার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয় কিভাবে? অন্যান্য হাদিস বিশারদগণ ও নির্ভরযোগ্য রাবীগণ তো কাপড়ের মোজার উপর মসেহ বৈধ প্রতিপন্নকারী একাধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন।"

সমগ্র হাদিস ভাণ্ডারে একটি হাদিসও এমন নেই, যাতে রসূল সা, শুধুমাত্র চামড়ার মোজার উপরই মসেহ করেছেন এবং চামড়া ছাড়া আর কোনো মোজার উপরে কখনো মসেহ করেননি বলা হয়েছে। এমন হাদিসও নেই, যাতে রসূল সা. ঘোষণা করেছেন যে, শুধুমাত্র চামড়ার মোজার উপর মসেহ করা জায়েয, কাপড়ের বা অন্য কোনো জিনিসের তৈরি মোজার উপর জায়েয নয়, অথবা অমুক অমুক শর্ত সাপেক্ষে বা অমুক অমুক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মোজার উপর মসেহ করা চলবে, যা কিনা অমুক গুণবৈশিষ্ট্যের দরুন চামড়ার মোজার সমপর্যায়ে পৌঁছে যায়। হযরত মুগীরা থেকে যদি উক্ত সংখ্যক হাদিসও চামড়ার মোজার উপর মাসাহের সপক্ষে বর্ণিত হয়ে থাকে, তাহলেও উভয় প্রকারের হাদিসের মধ্যে বিরোধ ও বৈপরিত্য অনিবার্য হয়ে উঠে না। যদি একই সফর ও একই নামাযের ব্যাপারে দুই ধরণের হাদিস বর্ণিত হতো, যার একটিতে চামড়ার মোজা এবং অপরটিতে কাপড়ের মোজার উল্লেখ থাকতো, তাহলেই বিরোধ ও বৈপরিত্য দেখা দিতে পারতো। একথা সবার জানা যে, চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণের নামাযের নিয়মবিধি, দোয়া, রুকু ও সিজদা ইত্যাদির খুঁটিনাটি নিয়ে বিভিন্ন হাদিস বিভিন্ন রকমের বিবরণ এসেছে এবং সেগুলোকে পরস্পর বিরোধী মনে করা হয়নি, বরং এক এক সময় এক এক রকমের প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে। তেমনিভাবে হযরত মুগীরা ও অন্যান্য সাহাবি থেকে চামড়ার মোজা ও সুতি পশমি মোজার উপর মসেহ সম্পর্কে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকেও আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না, তার কি কারণ থাকতে পারে? সফরে মোজার উপর মাসাহের ঘটনার চেয়ে সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্র গ্রহণের ঘটনা তো অনেক বেশি বিরল।

উসমানী সাহেব সুতি পশমি কাপড়ের মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত হযরত মুগীরার হাদিস সম্পর্কে লিখেছেন :
 "এই হাদিসের সনদে আবু কায়েস ও হোযায়েল বিন শুরাহবীল নামক দু'জন বর্ণনাকারী থাকার কারণে একাধিক হাদিসবেত্তা এটিকে দুর্বল হাদিস বলে আখ্যায়িত করেছেন।" উসমানী সাহেবের এ বক্তব্যের পরিপূর্ণ সন্তোষজনক ও নির্ভুল জবাব হাফেয আলাউদ্দিন মারদিনী স্বীয় গ্রন্থ আল জাউহারুন্নাক্কী'তে দিয়েছেন। সুবিজ্ঞ এই হানাফি ফকীহ মুহাদ্দিসের পরিচয় ইতিপূর্বেই তুলে ধরা হয়েছে। কাপড়ের মোজার উপর মাসাহের বৈধতার পক্ষে হযরত মুগীরার বর্ণিত হাদিস সম্পর্কে তিনি বলেন :

"ইমাম আবু দাউদ এ হাদিসটি সংগ্রহ করেছেন এবং এতে তিনি কোনো আপত্তি তোলেননি। ইবনে হাম্বানের মতে এ হাদিস বিশুদ্ধ এবং তিরমিযীর মতে মোটামুটি ভালো। এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে আবু কায়েস আব্দুর রহমান বিন মারওয়ানকে প্রখ্যাত হাদিস বিশেষজ্ঞ ইবনে মুঈন নির্ভরযোগ্য রাবী বলে আখ্যায়িত করেছেন। আজালীও এই মত সমর্থন করেছেন। তিনি হুযায়েলকেও নির্ভরযোগ্য বলে রায় দিয়েছেন। ইমাম বুখারিও এই উভয় রাবী থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। এঁরা দু'জন এমন কোনো হাদিস বর্ণনা করেননি, যা অন্যান্য রাবীর বর্ণনার বিরোধী বা বিপরীত। তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন সনদের মাধ্যমে কিছু বাড়তি বক্তব্য সম্বলিত হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা অন্য কোনো হাদিসের বিপরীত নয়। বস্তুত চামড়ার মোজা ও কাপড়ের মোজা সংক্রান্ত হাদিস দু'টোকে পৃথক পৃথক হাদিস হিসেবে গণ্য করতে হবে। কাজেই জাওরাব তথা কাপড়ের মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত হাদিসটি সম্পূর্ণ শুদ্ধ তথা সহীহ ও প্রামাণ্য হাদিস। ইতিপূর্বেও আমরা এ কথা একবার বলে এসেছি।"

হাফেয ইবনে হাজর, আবু কায়েস, আব্দুর রহমান মারওয়ানকে সত্যবাদী এবং হুযায়েল ইবনে শুরাহবীলকে নির্ভরযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। 'তাহজীবুত তাহজীব' গ্রন্থে হুযায়েল সম্পর্কে যতো জন হাদিস বিশেষজ্ঞের মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, তারা সকলে হুযায়েলকে সর্বোতভাবে বিশ্বস্ত বলে অভিহিত করেছেন এবং কেউ সামান্যতম খুঁতও ধরেননি। এর পরে উসমানী সাহেবের এ কথা বলা যে, এই রাবী দুর্বল, একথা কতোখানি গুরুত্ব রাখে, তা যে কেউ বুঝে নিতে পারে। উসমানী সাহেব 'নাসবুর রায়া' গ্রন্থে নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যতোটুকু পেয়েছেন সেটুকু তো উদ্ধৃত করে দিয়েছেন, কিন্তু গ্রন্থকার ইমাম জায়লায়ী নিজের শিক্ষক শেখ তাক্বিউদ্দীন ইসকান্দারীর যে অভিমত উপসংহারে উদ্ধৃত করেছেন, সেটা এড়িয়ে গেছেন। সেই অভিমতটি হলো :

"শেখ তাক্বিউদ্দীন বলেন : যে সকল মনীষী হযরত মুগীরা থেকে বর্ণিত কাপড়ের মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত হাদিসকে বিশুদ্ধ বলে রায় দিয়েছেন, তারা বিশ্বাস করেন যে, প্রথমত আবু কায়েস একজন সত্যনিষ্ঠ বর্ণনাকারী, তাছাড়া আবু কায়েসের বর্ণিত হাদিসের বক্তব্যে অন্যদের বর্ণিত হাদিসের বক্তব্যের সাথে যে বিভিন্নতা পাওয়া যায়, সেটা বিরোধ ও বৈপরিত্যের পর্যায়ের নয়, বরং আবু কায়েসের বর্ণনায় অন্যদের বর্ণনার চেয়ে একটা অতিরিক্ত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষত হযরত মুগীরা থেকে হুযায়েল যে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তার সনদ যখন স্বতন্ত্র এবং অন্যান্য সুপরিচিত হাদিসের সনদের সাথে তা যুক্ত হয়নি, (তখন তো এটিকে অন্যান্য হাদিসের সাথে তুলনা করারই প্রশ্ন ওঠেনা)।" [নসবুর রায়া : ১ম খণ্ড : মজলিসু ইলমী পরিচ্ছেদ : পৃ. ১৮০]

এ থেকে বুঝা গেলো, হযরত মুগীরা বর্ণিত কাপড়ের মোজা তথা 'জারাবের' উপর মসেহ করা সংক্রান্ত হাদিসটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি বিশুদ্ধ হাদিস এবং চামড়ার মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের সাথে তা বিরোধপূর্ণ নয়। মিশকাত শরিফের টীকা মিরকাতে মুগীরা রা. বর্ণিত কাপড়ের মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের উপর আলোচনা প্রসঙ্গে গ্রন্থকার মোল্লা আলী ক্বারী বলেন :

"প্রাচীন মনীষীদের একটি দল কাপড়ের মোজার উপর মসেহ বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। আর ইমাম সুফিয়ান সওরী, ইমাম আহমদ, ইমাম ইসহাক বিন রাহওইয়াসহ শহরঞ্চলীয় ফেকাহবিদদের একাংশও এই মত সমর্থন করেন। তবে ইমাম মালেক, ইমাম আওযায়ী ও ইমাম শাফেয়ি এ কাজ বৈধ মনে করেননা। হযরত মুগীরা বর্ণিত এ হাদিস মুনসাদে আহমদ ও তিরমিযী শরিফে লিপিবদ্ধ আছে। ইমাম তিরমিযির মতে এ হাদিস বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। তিরমিযির অভিমতকে কেউ কেউ এই বলে খণ্ডন করেছেন যে, মুগীরা কর্তৃক বর্ণিত চামড়ার মোজার উপর মসেহ সংক্রান্ত হাদিসটিই সমধিত পরিচিত। তবে এর জবাবে বলা হয়েছে, মুগীরা তাঁর হাদিস বর্ণনায় উভয় শব্দই (জাওরাবইন ও খুফফাইন অর্থাৎ কাপড়ের মোজা ও চামড়ার মোজা) প্রয়োগ করে থাকতে পারেন। এমনটি যে তিনি করতে পারেননা, তেমন কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া কাপড়ের মোজায় মসেহ করার বৈধতার পক্ষে সহাবায়ে কিরামের বাস্তব অনুশীলন থেকেও সমর্থন পাওয়া যায়। ইমাম আবু দাউদ বলেছেন, হযরত আলী এবং ইবনে মাসউদ, আবু উমামা, সাহল বিন সা'দ, আমর বিন হুরায়েস, হযরত ওমর এবং ইবনে আব্বাস কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করেছেন। এই বৈধতা এমন কোনো শর্তসাপেক্ষও নয় যে, ঐ কাপড়ের মোজার উপরে ও নিচে, অথবা শুধু নিচে চামড়া মোড়ানো থাকতে হবে, কিংবা তা পায়ের গোড়ার সাথে লেপ্টে থাকার মতো মোটা হতে হবে। অবশ্য ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে এই শর্ত প্রযোজ্য। ইমাম আবু হানিফার সর্বশেষ রায়ও এই শর্ত আরোপের পক্ষে এবং তদনুসারেই ফতোয়া চালু হয়েছে।" [মিরকাত দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৪৮, এম দাদিয়া প্রকাশনী, মুলতান]।

এটা ইমাম আলী ক্বারীর সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার নিদর্শন হলো, তিনি স্বীয়  অনুসৃত হানাফি মতামতের মধ্যে যে মতটি ফতোয়ার আকারে বাস্তবে চালু রয়েছে, তাও অকপটে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে তার আগে এ কথাও স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, এ বিষয়টি প্রাচীন ইমামগণ ও মুসলিম ফেকাহবিদদের মধ্যে বিতর্কিত। উভয় মতের সপক্ষে হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করার জন্য হানাফি ইমামগণ যে শর্ত ও কড়াকড়ি আরোপ করেছেন, হাদিস ও সাহাবাদের দৃষ্টান্তে তার কোনো উল্লেখ নেই, বরঞ্চ হাদিস ও সাহাবাদের দৃষ্টান্তে শর্তহীন বৈধতার প্রমাণ করে। পক্ষান্তরে আল বালাগ সম্পাদকের বক্তব্য এই যে, হাদিস ও সাহাবাদের দৃষ্টান্ত পাতলা মোজার কথা বলা হয়নি। অথচ সেখানে পাতলা বা মোটা কোনোটার কথাই বলা হয়নি। অনেকে কাপড়ের মোজার উপর চামড়ার পাতলা পায়তাবা তৈরি করে পরে থাকেন এবং তার উপর মসেহ করে থাকেন। এদের মধ্যে শরিয়তের অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ উভয় শ্রেণীর লোকই রয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এই পাতলা চামড়ার উপর মসেহ করা গেলে সরাসরি কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করা যাবে না কেন? চামড়া পাতলা হোক বা মোটা হোক তা চামড়াই। তদ্রুপ কাপড়ের মোজা পাতলা হোক বা মোটা হোক তা কাপড়ের মোজা ছাড়া আর কিছু নয়। উভয়ের উদ্দেশ্য একটাই এবং তা হলো পা ঢাকা। উভয়ের মধ্যে কোনো কার্যকর পার্থক্য নেই। [তরজমানুল কুরআন, জুন ১৯৭৭]



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )