আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়</h1>
প্রশ্ন : আমি কাপড়ের ব্যবসা করি। বিগত কয়েক মাস ধরে এ ব্যবসায়ে  এক নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে। এই নতুন ধারা সম্পর্কে আমার বিবেক শুধু দ্বিধাগ্রস্তই নয়, বরং আমার অনেকটা নিশ্চিত বিশ্বাস যে, ওটা হারাম। অনুগ্রহপূর্বক আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন।

বিষয়টি হলো, বর্তমান সরকার সংবাদপত্র মালিকদের প্রবল দাবির মুখে তাদেরকে নিউজপ্রিন্ট কাগজ আমদানি করার অবাধ অনুমতি দিয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনের মাত্রার তারতম্য ছাড়াই প্রত্যেক ছোট বড় পত্রপত্রিকা ইত্যাদিকে এককথায় যে কোনো ডিক্লারেশনের অধিকারীকে অবাধ অনুমতি দেয়া হয়েছে যাতে সে যতো খুশি নিউজপ্রিন্ট আমদানি করতে পারে। এ ব্যাপারে যে নির্দেশ জারি হয়েছে, দৃশ্যত তার উদ্দেশ্য হলো, নিউজপ্রিন্ট খরিদ্দাররা যেনো সস্তা দামে কাগজ পায় এবং তার পরিমাণের দিক দিয়েও তারা যেনো বিগত আমলের ন্যায় সরকারের মুখাপেক্ষী না থাকে।

কিন্তু যেভাবে লাইসেন্স দেয়া চলছে তাতে মনে হয়, সংশ্লিষ্ট মহল যাতে নিজ প্রয়োজনের অজুহাতে কাগজ আমদানি করে বাজারে প্রচলিত মূল্যে বিক্রি করে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের সুযোগ পায়, তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে, এখন যার কাছেই পত্রিকার ডিক্লারেশন আছে, সে লাইসেন্সের জন্য দরখাস্ত দিয়ে মোটা অংকের লাইসেন্স বাগিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু সেই লাইসেন্স দিয়ে কাগজ আমদানি করার পরিবর্তে বাজারে শতকরা ১০ ভাগ , ১২ ভাগ অথবা প্রচলিত হারে কেবল লাইসেন্সটাই বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। লাইসেন্সধারী লাইসেন্স বিক্রেতাকে এই মর্মে একটি মুক্তারনামা দিয়ে দেয় যে, অমুক ব্যক্তি অত্র লাইসেন্সের ব্যাংক ও কাস্টম সংক্রান্ত সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে। এ ক্ষেত্রে বাহ্যত এটাই প্রকাশ পায় যে, যার নামে লাইসেন্স রয়েছে, লেটার অব ক্রেডিটও তার নামেই, এবং দৃশ্যত মালও সেই আমদানি করে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো, লাইসেন্সধারী কেবল লাইসেন্সের দামটা হস্তগত করেই সেটকে পড়ে। এরপর কার্যত লাইসেন্সের ভিত্তিতে মাল আমদানি করা, তা বিক্রি করা এবং লাভ, লোকসানের যাবতীয় দায়দায়িত্ব লাইসেন্স ক্রেতার ঘাড়ে চাপে।

যেসব কারণে আমি এই ক্রয় বিক্রয়ের গোটা কার্যক্রমকে (প্রথমত লাইসেন্স কেনাবেচা এবং তারপর সেই খরিদ করা লাইসেন্সের ভিত্তিতে মাল আমদানি করা) নাজায়েয বা হারাম মনে করি তা নিম্নরূপ :

১. এতে কোনো সুনির্দিষ্ট বস্তুর বেচাকেনা হয়না, বরং মৌলিকভাবে ও প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র লাইসেন্সই বিক্রি হয়। (এমনকি এই ।লাইসেন্সের ভিত্তিতে কি কি দ্রব্য আমদানি করা হবে, কোথা থেকে কি পরিমাণে ও কি দরে আমদানি করা হবে ইত্যাদি বিষয়ের কোনোটাই উল্লেখ করা হয়না।) যে বেচাকেনায় কোনো সুনির্দিষ্ট বস্তুর লেনদেন হয় না, বহুসংখ্যক হাদিস সে বেচকেনাকে দ্ব্যর্থহীবভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

২. যে ব্যক্তির নামে লাইসেন্স ইস্যু হয়, সে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ যেমন লাইসেন্সের মূল্যের শতকরা দশ ভাগ বা যে পরিমাণ ধার্য হয়, নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। এরপর লাইসেন্স ক্রেতা মাল আমদানি করে। লাভ লোকসানের যাবতীয় দায় তার ঘাড়েই চাপে। এভাবে এই কারবারে সুদ ও জুয়ার সাদৃশ্য নজরে পড়ে।

৩. কাঁচা ফসল কিংবা কাঁচা ফলসমূহসহ বৃক্ষের বাগান বিক্রির নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত বেশকিছু হাদিস রয়েছে। যদিও মুজতাহিদগণ এ ব্যাপারে বেশকিছু ব্যকিক্রমধর্মী সুযোগসুবিধা উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে নিরেট কাগুজে লাইসেন্স সেই সুযোগ সুবিধার আওতায় পড়েনা। কাগুজে লাইসেন্স কাঁচা ফসলের পর্যায়ে পড়েনা। কারণ বিক্রয়ের প্রাক্কালে এই লাইসেন্সের ফলের কুঁড়িও জন্মেনা। (উপরে ১ নম্বরে আমি বলেছি যে লাইসেন্স আমদানিযোগ্য জিনিসের কোনো বিবরণই থাকেনা। কিন্তু কোনো কোনো কারবারি লোক বলেন, পত্রপত্রিকার মালিকদেরকে এই সুযোগ এ জন্যই দেয়া হয় যেনো তারা এর দ্বারা বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করতে পারে। কাজেই  সরকারের উদ্দেশ্যই যদি এরূপ থাকে, তাহলে এ ধরনের লাইসেন্স ক্রয় করে তার দ্বারা মাল আমদানি করাতে দোষের কিছু নেই। এ যুক্তিও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়না। সরকারের উদ্দেশ্য যদি এরূপ ধরেও নেয়া হয়, তথাপি নিছক কাগুজে লাইসেন্স কেনাবেচা করা এবং এই কেনা লাইসেন্সের ভিত্তিতে কাগুজে মাল আমদানি করা জায়েয হতে পারে না। অবশ্য মূল লাইসেন্সধারীরা যদি নিজ উদ্যোগে মাল আমদানি করার পর বিক্রি করে, তবে সেটা বিক্রির সংজ্ঞায় আওতায় পড়ে। কিন্তু লাইসেন্স বেচাকেনা বৈধ কারবার বলে গণ্য হতে পারেনা।

আপনার কাছে অনুরোধ, আপনি নিজের গবেষেণা ও বিচার বিবেচনার আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করবেন। অধিকন্তু জবাবে যদি দলিল প্রমাণের বরাতও উল্লেখ করেন তাহলে আরো ভালো হয়। উপরে যে তিনটি যুক্তি উল্লেখ হলো, তাছাড়া আরো যুক্তি প্রমাণ যদি এ কারবারটির বৈধতা বা অবৈধতা প্রতিপন্ন করার মতো থাকে, তবে তাও উল্লেখ করবেন। অনুগ্রহপূর্বক পূণাঙ্গ ও বিস্তারিত জবাব দেবেন।

জবাব : আপনার এ অভিমত শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ সঠিক বলে মনে হয় যে, সরকার কতিপয় দ্রব্য আমদানি করার জন্য যে ছাড়পত্র, লাইসেন্স বা পারমিট দেয় এবং যা কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে দেয়া হয়, সেই সব ছাড়পত্র ক্রয় বিক্রয় করা বা কোনো আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা জায়েয নয়। ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ ক্রয় বিক্রয়ের যে সাধারণ নীতিগত সংজ্ঞা দিয়েছেন তা হলো, দ্রব্যের বদলে দ্রব্যের বিনিময় হওয়া চাই। দ্রব্যের বিনিময়ে যদি এমন মুদ্রা দেয়া হয়, যা প্রচলিত অর্থে মূল্য বলে বিবেচিত হয়, তবে সেটাও বৈধ কারবার বলে গণ্য হবে। কিন্তু পারমিট বা লাইসেন্স প্রচলিত অর্থে কিংবা সত্যিকার অর্থে মূল্যমান ধারণ করেনা। তাই তাকে দ্রব্য নামেও আখ্যায়িত করা যায়না, আর তার বিপণন তথা কেনাবেচাও বৈধ হতে পারেনা। লাইসেন্স বা পারমিট আসলে দ্রব্য অর্জনের একটা প্রতিশ্রুতি বা অনুমতি মাত্র। সেই দ্রব্য যতোক্ষণ প্রথম পক্ষের হাতে না আসে, ততোক্ষণ সে এমন একটা জিনিস কিভাবে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারে, যার কোনো অস্তিত্ব নেই কিংবা যা এখনো তার দখলে আসেনি। এ ব্যাপার রসূল সা.-এর নির্দেশাবলী এবং সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব দৃষ্টান্তসমূহ সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। এর কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা যাচ্ছে।

মুসলিম শরিফের কিতাবুল বুয়ু (ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত  অধ্যায়)-এর 'দ্রব্য হস্তগত হওয়ার আগে তা বেচাকেনা অবৈধ' শীর্ষক হাদিসগুচ্ছের একটি হাদিস নিম্নরূপ :
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
"হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, রসূল সা. বলেছেন : যে ব্যক্তি কোনো খাদ্যদ্রব্য খরিদ করে, সে যেনো তা হস্তগত না করা পর্যন্ত বিক্রি না করে।" হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, আমি প্রত্যেক দ্রব্যকেই খাদ্যদ্রব্য মনে করি। পরবর্তীতে মুসলিম শরিফে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর হযরত ওমর হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আরো কয়েকটি হাদিসেও অনুরূপ বক্তব্য রয়েছে। অত:পর অবিবল আমাদের আলোচ্য বিষয়ের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ হাদিস আমাদের চোখে পড়ে। হাদিসটি নিম্নরূপ :
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
"হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেছেন, তিনি মারওয়ানকে বললেন, তোমরা কি সুদকে হালাল করে নিলে? মারওয়ান বললো : আমরা কি করলাম। (অথবা, আমরা তো এমন কিছু করিনি)। হযরত আবু হুরায়রা রা. বললেন : তোমরা কাগজে দলিলপত্র বেচাকেনাকে জায়েয করে নিয়েছ। অথচ রসূল সা. কোনো ক্রয় করা জিনিস পুরোপুরি দখলে নেয়া ও হস্তগত করার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। বর্ণনাকারী সুলায়মান বলেন : এরপর আমি দেখলাম, প্রহরীরা লোকজনের হাত থেকে উক্ত কাগজপত্র ফেরত নিচ্ছে।"

অন্য একটি হাদিস থেকে এ হাদিসটির পুরো ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়। হাদিসটি মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেকের ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত অধ্যায়ে এভাবে উল্লেখিত হয়েছে : "ইমাম মালেক বর্ণনা করেন, মারওয়ানের শাসনামলে (সমুদ্র তীরবর্তী স্থান) জারে অবস্থিত খাদ্যদ্রব্য ক্রয়ের জন্য জনসাধারণের মধ্যে পরোয়ানা বা অনুমতিপত্র বন্টন করা হয়। লোকেরা ঐ শস্য হস্তগত হওয়ার আগেই ঐ সব লিখিত অনুমতিপত্র বেচাকেনা শুরু করে দেয়। হযরত যায়েদ বিন সাবেত ও অপর একজন সাহাবি মারওয়ানের কাছে আসেন এবং বলেন : হে মারওয়ানা তুমি কি সুদভিত্তিক লেনদেন হালাল করে দিয়েছ? মারওয়ান বললো : আল্লাহর পানাহ চাই। কেনো কি হয়েছে? উভয় সাহাবি বললেন : লোকেরা সরকারের কাছ থেকে এই অনুমতিপত্র কিনেছে। অতপর তার ভিত্তিতে খাদ্যশস্য সংগ্রহ না করেই তা বেচে দিয়েছে। এরপর মারওয়ান পুলিশ পাঠিয়ে দেয়। যাদের জন্য পরিচয়পত্র বন্টন করা হয়েছিল, পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে এবং তাদের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নিতে থাকে।"

এসব হাদিসের বক্তব্য ও পূর্বাপর প্রেক্ষাপট নিয়ে চিন্তা করলে কয়েকটি নিগুঢ় তথ্য অনুধাবন করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, এখান থেকে এই মৌলিক তত্ত্বটি ফুটে উঠে যে, কোনো শাসকের আমলে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটুক বা যে কোনো প্রথা প্রচলিত হোক তার দায় সরাসরি ঐ শাসকের উপরেই বর্তে, চাই সেটা তার কোনো নির্দিষ্ট আদেশের ভিত্তিতে সংঘটিত হোক বা না হোক। কোনো অনাচার বা অনৈসলামিক ক্রিয়াকলাপ যদি প্রকাশ্যে কোনো প্রশাসকের কার্যকলাপে সংঘটিত হয় এবং প্রশাসক তা রোধ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ঐ অনাচারের জন্য তাকেই দায়ি করা হবে। মারওয়ান মদিনাতে হযরত মুয়াবিয়ার গভর্ণর ছিলেন। তিনি নিজে এই সব পারমিট কেনাবেচা করার অনুমতি দেননি। এমনকি হয়তো এটা তার জানাও ছিলনা। নচেত তিনি এভাবে নিজের সাফাই দিতেননা এবং সান্ত্রী সিপাই পাঠিয়ে লোকজনের কাছ থেকে পারমিট ফেরত আনাতেননা। তা সত্ত্বেও সাহাবিগণ এ কাজটির জন্য তাকেই দায়ি করেন এবং জবাবে তিনিও নিজের দায় স্বীকার করেন। ইবনে আব্দুল বাকী যারকানী এই হাদিসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন যে, কোনো কাজ বর্জন (Omission) করাও একটা কাজ (Commission) বলে গণ্য।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে তা হলো, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত আবু হুরায়রা এবং হযরত যায়েদ বিন সাবেত রা. নিষেধাজ্ঞাটিকে শুধুমাত্র খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করেননি। বরং অন্যান্য জিনিসকেও তার আওতাভুক্ত মনে করেছেন। এমনকি এই সব অনুমতিপত্রের বেচাকেনাও ততোক্ষণ পর্যন্ত জায়েয সাব্যস্ত করেননি, যতোক্ষণ না কোনো দ্রব্য বিক্রেতার দখলে আসে এবং সে তা ক্রেতার দখলে সমর্পণ করে। অন্যান্য সহীহ হাদিসেও এই মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে। তাছাড়া প্রকাশ্য জনসমাবেশে এই ঘটনাটির প্রতিবাদ উচ্চারিত হওয়া এবং তার সিদ্ধান্তে অন্য কোনো সাহাবির ভিন্নমত ব্যক্ত না করা থেকে প্রমাণিত হয় যে, অনুমতিপত্রগুলোর কেনাবেচাকে সুদী কারবারের  শামিল বলে যে রায় দেয়া হয়েছিল, তা সাহাবায়ে কেরাম ও মদিনাবাসির সর্বসম্মত রায় (ইজমা) ছিলো। মুয়াত্তায় বর্ণিত পরবর্তী হাদিস থেকে এই সর্বসম্মত রায় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। হাদিসটি নিম্নে উদ্ধৃত হলো :

"ইমাম মালেক রহ. ইয়াহিয়া বিন সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি শুনতে পেলেন যে, জামিল বিন আবদুর রহমান সাঈদ বিন মুসাইয়ারকে বলছে : জার নামক স্থানে যে খাদ্যশস্য জনগণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে, তার অংশবিশেষ আমি খরিদ করি। এখন আমার ইচ্ছে, যে পরিমাণ খাদ্য ক্রয়ের জন্য আমাকে অনুমতি ও নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, তা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য অন্যের কাছে বিক্রি করে দেই। হযরত সাঈদ জিজ্ঞেস করলেন : যে খাদ্য তুমি কিনেছ (কিন্তু এখনো হস্তগত করনি) তা তুমি অন্যদের কাছে বেচে দিতে চাও? সে বললো : হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব এরূপ করতে তাকে নিষেধ করলেন।"

কেউ কেউ যুক্তি দেখান, দখল হস্তগত করার প্রশ্ন শুধুমাত্র অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রেই উঠে, কিন্তু অধিকার ও প্রত্যাশিত মুনাফার ক্ষেত্রে সে প্রশ্ন উঠেনা। যে ব্যক্তি এসবের অধিকারি সে যখন যেভাবে চায়, অন্যের নিকট তা হস্তান্তর করতে পারে এবং তার উপযুক্ত বিনিময়ও সে গ্রহণ করতে পারে। এ যুক্তির জবাবে আপাতত এতোটুকু বলাই যথেষ্ট যে, প্রদত্ত ঋণ বাবদ কিংবা দেনমোহর বা উত্তরাধিকার সূত্রে যে অর্থ বা সম্পদ পাওনা থাকে, তা যেমন স্বীকৃত ও নিশ্চিত অধিকার নয়। পারমিট প্রকৃতপক্ষে কোনো অধিকার নয়, তার নিতান্ত একটা অনুমতি বা সুযোগ বা তার প্রতিশ্রুতি মাত্র। এর নাম থেকেও ব্যাপারটা সুস্পষ্ট। পারমিট দাতা ইচ্ছে করলে তাকে দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে। এটা তার মর্জির উপর নির্ভরশীল। যে কোনো সময় সে তা বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারে। এ ধরনের শর্তসাপেক্ষ ও অসম্পূর্ন অধিকার, কিংবা সঠিকভাবে বলতে গেলে, অনুমতি বা প্রতিশ্রুতি যতোক্ষণ না সুনির্দিষ্ট সম্পদের আকারে হস্তগত হবে, ততোক্ষণ তা হস্তান্তরযোগ্য বা ভোগদ্রব্য নয়। কোনো কোনো ফেকাহ শাস্ত্রবিদও এই মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, এ ধরনের নিরেট, অনিশ্চিত ও অবাস্তব অধিকার হাতছাড়া করার জন্য কোনো বিনিময় গ্রহণ করে জায়েয নেই। 'দুররে মুখতার' গ্রন্থে ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত অধ্যায়ে 'আল আশবাহ' গ্রন্থের বরাত দিয়ে এই মূলনীতি লিপিবদ্ধ হয়েছে যে, 'শুফয়ার অধিকার' (সন্নিহিত ভূসম্পত্তি ক্রয়ে অগ্রাধিকার) এর ন্যায় অনিশ্চিত ও অবাস্তব অধিকা বিনিময়যোগ্য নয়।

অর্থাৎ "কোনো বিক্রিত জমিতে যদি অগ্রাধিকারী কোনো ব্যক্তির অগ্রাধিকার প্রমাণিত হয়, তবে তার পক্ষে এটা বৈধ নয় যে, সে নিজে তা ক্রয়ের দাবি না জানিয়েই নিজের অধিকারের বিনিময়ে খরিদ্দার বা অন্য কোনো অগ্রাধিকারীর কাছ থেকে কোনো কোনো আর্থিক বিনিময় গ্রহণের চেষ্টা চালাবে।" 'রদ্দুল মুখতার' গ্রন্থে 'আল আশবাহে'র বরাত দিয়ে এই কথাই ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। গ্রন্থকার ইবনে আবেদীন শামী বলেন : "এ ধরণের অনিশ্চিত অধিকারের বেলায় সংশ্লিষ্ট অধিকারের দাবিদার যদি কোনো সম্পদের বিনিময়ে আপোস করে, তবে সেই আপোস বাতিল হবে এবং তা প্রত্যাহার করতে হবে।"

ইবনে আবেদীন প্রায় একই বিধি ভিন্নতর ভাষায় 'আল বাদায়ে' গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করেছেন : "এ ধরণের অনিশ্চিত অধিকারের মালিকানা অন্য কারো নিকট হস্তান্তর করা যায়না এবং তা ছেড়ে দেয়ার জন্য কারো সাথে আপোস করাও বৈধ নয়।"

আলোচনার উপসংহারে দেওবন্দের মুফতিয়ে আযম মাওলানা আযিযুর রহমান সাহেবের একটি ফতোয়া উদ্ধৃত করা সমীচীন মনে হচ্ছে। কেননা ফতোয়াটির বক্তব্য একই বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। মুফতি মুহাম্মদ শফী সাহেব সংকলিত 'ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ' গ্রন্থের ৭ম ও ৮ম খণ্ডে ফতোয়াটি নিম্নরূপ উদ্ধৃত হয়েছে :
"সম্ভাব্য মুনাফা বিক্রি করা জায়েয নয়"

প্রশ্ন : একটি গ্রাম আছে। গ্রামটির বর্তমান জমিদার অর্থাৎ জমির মালিক আমর। এই জমির খাজনা বা রাজস্ব, যা সমসাময়িক শাসক ঐ জমিদারের কাছ থেকে আদায় করে থাকে, প্রচলিত আইন অনুসারে আমরের প্রাপ্য হয়ে যায়। এখন আমর যদি তার প্রাপ্য অধিকারকে বকরের নিকট বিক্রি করে দেয় বা বন্ধক রাখে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুসারে ঐ  খাজনা বা রাজস্ব বকর আদায় করতে পারবে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এই প্রাপ্য অধিকার খাজনা বিক্রি করা বা বন্ধক রাখা কি জায়েয?

জবাব : ----------------------------------------------
অর্থাৎ দুররে মুখতার বলা হয়েছে, যে জিনিস অর্জিত সম্পদ নয় তার বেচাকেনা অবৈধ। শামী গ্রন্থে বলা হয়েছে :
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
অর্থাৎ আমি ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত অধ্যায়ের ভূমিকায় 'মাল' (সম্পদ) এর সংজ্ঞা উল্লেখ করেছি। যে জিনিসের দিকে মানুষ স্বভাবতই আকৃষ্ট হয় এবং প্রয়োজনের সময়ের জন্য সঞ্চয় করে রাখা যায়, তাকেই 'মাল' (সম্পদ) বলা হয়। সঞ্চয়ের শর্ত দ্বারা বুঝা যায় যে, কোনো জিনিসের মুনাফা মালের সংজ্ঞা বহির্ভূত। কেননা তার মালিক হওয়া যায় কিন্তু তা মাল বা সম্পদ নয়।
উল্লেখিত উদ্ধৃতিসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে অবহিত হওয়া যায় যে, এ ধরনের সম্ভাব্য অধিকার ও মুনাফা বিক্রি করা ও বন্ধক রাখা শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ ও বাতিল। [তরজমানুল কুরআন, ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯]



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )