আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি</h1>
প্রশ্ন : এরূপ আকিদা প্রচলিত আছে যে, হযরত মুহাম্মদ সা. আল্লাহর কাছ থেকে দুই ধরণের ওহি লাভ করতেন। এর একটি হলো ফেরেশতা জিবরীলের মাধ্যমে প্রাপ্ত ওহি। এই ওহির প্রতিটি শব্দ আল্লাহর কাছ থেকেই আসতো। এভাবে নাযিলকৃত সকল ওহির সমাহার হলো কুরআন। এ ধরনের ওহি ঠিক যে শব্দাবলীতে নাযিল হয়েছে, অবিকল সেই শব্দাবলীতেই তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে রসূল সা. আদিষ্ট ছিলেন। একে প্রকাশ্য ওহি বলা হয়। যেহেতু এ ধরনের ওহির সংকলন (কুরআন) কে নিয়মিত তিলাওয়াত বা পাঠ করা হয় এবং রসূল সা.-এর যুগেও পাঠ করা হতো, তাই একে 'ওহিয়ে মাতলু' (পঠিত বা পাঠ্য ওহি) বলা হয়। আবার এ ধরনের ওহিকে সঙ্গে সঙ্গে লিখে নেয়া হতো বলে এর  তৃতীয় নাম ওহিয়ে মাকতুব (লিখিত ওহি) হয়েছে।

দ্বিতীয় শ্রেণীর ওহি কেবলমাত্র রসূল সা.-এর পথনির্দেশিনার জন্য আসতো এবং তা জিবরীলের মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি পাওয়া যেতো। এ জাতীয় ওহির শব্দ আল্লাহর কাছ থেকে আসতোনা, এর তিলাওয়াতও প্রথম শ্রেণীর ওহির মতো করা হতোনা এবং তা সঙ্গে সঙ্গে লিখে রাখারও ব্যবস্থা করা হতোনা। এ ধরণের ওহি রসূল সা.-এর কথাবার্তা ও তৎপরতার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে যেতো। এই ওহিকে 'গুপ্ত ওহি', 'অপঠিত ওহি' বা 'অলিখিত ওহি' বলা হয়।

এবার আসুন, কুরআন এ সম্পর্কে কি বলে দেখা যাক।
আল্লাহ তায়ালা কোন্‌ কোন্‌ পন্থায় মানুষের সাথে কথা বলেন, সূরা শূরাতে তার বিবরণ দিয়েছেন :
---------------------------------------------------------------------------------
"কোনো মানুষ এরূপ মর্যাদার অধিকারী নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন। তাঁর কথা হয় ওহির আকারে, অথবা পর্দার আড়াল থেকে অথবা তিনি কোনো বার্তাবাহক পাঠান এবং সে আল্লাহর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ওহি করে। তিনি মহান ও বিচক্ষণ।" [সূরা আশ শূরা, আয়াত: ৫১]

উল্লেখ্য, আয়াতটির উপরোক্ত  অনুবাদ মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদীর অনুবাদ।  এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো মানুষের উপর আদেশ ও বিধান নাযিল হওয়ার তিনটি পন্থা নির্দেশ করা হয়েছে। একটি হলো প্রত্যক্ষ ওহি। অর্থাৎ বক্তব্য বিষয়টি অন্তরে ঢুকিয়ে দেয়া বা উদগত করা। আরবিতে এ প্রক্রিয়াকে ইলকা বা ইলহাম বলে। দ্বিতীয় : পর্দার আড়াল থেকে কথা বলা। তৃতীয় : আল্লাহর বার্তাবাহক (ফেরেশতা) এর মাধ্যমে ওহি প্রেরণ। পবিত্র কুরআনে যে ওহির সমাবেশ ঘটেছে, তা শুধু তৃতীয় প্রকারের ওহি। পবিত্র কুরআনের ২নং সূরা ১৮,৯৭ এবং ২৬ নং সূরার ১৯১ ও ১৯৪ আয়াতে আল্লাহ এ কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। এ থেকে জানা গেলো যে, রসূল সা.-এর ঐশী নির্দেশ প্রাপ্তির আর যে দু'টি পন্থার উল্লেখ উপরোক্ত আয়াতে (৪৫/৫১) করা হয়েছে, তা কুরআন বহির্ভূত। বক্তব্যের পক্ষে আরো পাকাপোক্ত সমর্থন লাভের জন্য কুরআনের আরো কয়েকটি আয়াত পেশ করা হয়ে থাকে। এভাবে যারা গুপ্ত ওহিকে বিশ্বাস করেন, তারা এ ধরনের ওহির  অস্তিত্ব প্রমাণের কাজটি খোদ কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণাবলী দ্বারা পাকাপাকিভাবেই সম্পন্ন করেন।

কিন্তু উপরোক্ত ৪২/৫১ নং আয়াতটির তফসির যে সার সংক্ষেপে আমি উপরে উল্লেখ করেছি, তাতে কয়েকটি মৌলিক ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পন্ন ভুলত্রুটি রয়েছে :
১. প্রথম ত্রুটি এই যে, এই আয়াতে 'রসূল' বা বার্তাসহ শব্দটির মর্ম 'বার্তাবাহী ফেরেশতা' গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ এর দ্বারা 'বার্তাসহ মানুষ' বুঝানো হয়েছে।
২. দ্বিতীয় ত্রুটি এই যে, এরূপ ধরে নেয়া হয়েছে যে, এ আয়াতে আল্লাহ শুধু নবী রসূলের সাথে নিজের কথা বলার বিভিন্ন পন্থা বর্ণনা করেছেন এবং এতে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলার কোনো উল্লেখ নেই। অথচ প্রকৃতপক্ষে এখানে সকল মানুষের সাথে আল্লাহর কথা বলার পন্থাবলী আলোচিত হয়েছে।
৩. তৃতীয় ত্রুটি এই যে, আয়াতের যে অংশে তৃতীয় পন্থাটির উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে অর্থাৎ ------------------------- তে --------- ক্রিয়াটির কর্তা উক্ত বার্তাবাহক বলে ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ  আসলে এই ক্রিয়ার কর্তা আল্লাহ, বার্তাবাহক নয়। প্রশ্ন কর্তার এই ব্যাকরণগত ভিন্ন মতের ফলে এই অংশটির অনুবাদ দাঁড়ায় : "অথবা তিনি কোনো বার্তাবাহক পাঠান, অত:পর আল্লাহ নিজেরই অনুমতিক্রমে নিজে যা চান তা ওহি করেন।" এতে অনুবাদটি কেমন হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায় তা সহজেই বোধগম্য। (অনুবাদক)

পবিত্র কুরআনকে আল্লাহ 'কিতাবুমমুবীন' তথা 'স্ববিশ্লেষিত গ্রন্থ' বলেছেন। কুরআন নিজেই বলে দিয়েছে, কোথায় সে রসূল শব্দ দ্বারা 'বার্তাবাহক ফেরেশতা' এবং কোথায় 'বার্তাবাহী মানুষ' বুঝিয়েছে। কুরআনের একটি সাধারণ নীতি এবং বাচনভঙ্গি এই যে, বার্তাবাহী ফেরেশতাদেরকে সে 'নাযিল' করে এবং 'বার্তাবাহী মানুষ'কে 'প্রেরণ' করে। 'নুযুলে মালায়িকা' (ফেরেশতাদের নাযিল হওয়া) এবং 'ইরসালে রুসূল' (মনুষ্য রসূল প্রেরণ) কুরআনের নির্দিষ্ট পরিভাষা বলা যেতে পারে।

'ইলকা' (নিক্ষেপ করা বা ঢুকিয়ে দেয়া) শব্দটি গুপ্ত ওহির জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং এ শব্দটি কুরআনে বহু জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনের যতো জায়গায় এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা আপনি দেখুন। সমগ্র কুরআনে কোথাও এ শব্দটি 'অপঠিত ওহি' অর্থে দেখতে পাবেন না। বরঞ্চ এ শব্দটির ব্যবহার হয়েছে রসূল সা.-কে কুরআন দেয়া হয়েছে এই অর্থে। ২৭/৬নং আয়াতে দেখুন :
                           ----------------------------------------
"এক সুবিজ্ঞ মহাবিজ্ঞানী সত্তার পক্ষ থেকে আপনার উপর কুরআন নিক্ষেপ করা হয়।"

রসূল সা.-এর ব্যক্তিগত তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা ও অন্তদৃষ্টির নাগালের বাইরে যা কিছু ছিলো এবং যা নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব পরিচালনার জন্য জ্ঞানগত পর্যায়ে আবশ্যক ছিলো, তার সবই তাঁকে কুরআনের মাধ্যমেই সরবরাহ করা হয়েছে। কুরআনেই তাঁর জন্য যথেষ্ট। এ ছাড়া তাঁর কোনো কিছুরই প্রয়োজন ছিলনা- গোপন ওহিরও নয়।

জবাব : আপনি যে আকিদা বিশ্বাসকে খণ্ডন করতে সচেষ্ট, আমি স্বয়ং সেই আকিদার প্রবক্তা। এ আকিদার সত্যতা কোনো একটি আয়াতের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং আরো বহুসংখ্যক আয়াত ও হাদিস দ্বারা এটি আমার কাছে প্রমাণিত। নবীদের উপর কুরআন ও অন্যান্য আসমানী গ্রন্থ ছাড়াও ওহি নাযিল হয়েছে এবং সেই সব ওহিও নবুয়তের ওহিরই প্রকার বিশেষ। এসব ওহিকে কোনো পারিভাষিক নামে আখ্যায়িত করা হোক বা না হোক, তাতে কিছু আসে যায়না। এসব ওহি সব সময় শব্দ ব্যতিরেকেই কিংবা ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়াই আসতো এমন কথাও নয়।  সেগুলো শব্দ সহকারেও নাযিল হয়ে থাকতে পারে। বিশেষত, যখন কোনো ফেরেশতা তা বহন করে আনতেন, তখন তা তিনি শব্দের মাধ্যমেই পৌঁছাতেন বলে ধরে নেয়া যায়। এমন কথাও নয় যে, এ ধরণের ওহি সব সময় নবীদের ব্যক্তিগত পথনির্দেশনা দেয়ার জন্যই আসতো। অনেক সময় নবী বা তাঁর অনুসারীদের জন্য সুসংবাদ, সতর্কবাণী, সান্ত্বনা ও প্রেরণার উপাদানও এর অন্তর্ভুক্ত থাকতো। কখনো কখনো এতে নবীগণ ও তাঁদের অনুসারীদের জন্য পথনির্দেশ এবং আদেশ নিষেধও থাকতো। তাছাড়া এই ওহি স্বপ্নের আকারেও আসতো। কুরআন ও হাদিসের একাধিক জায়গায় এ ধরণের স্বপ্নের প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত ইবরাহীম আ. কে পুত্র কুরবানীর আদেশ স্বপ্নযোগে দেয়া হয়েছিল। কার্যত, সে আদেশ মানা বাধ্যতামূলক ছিলো। পিতাপুত্র উভয়ে তাকে সত্যিকার আদেশ হিসেবেই বিশ্বাস করেছিলেন। নবী ছাড়া আর কারো স্বপ্ন ধর্মীয় ও শরিয়তসম্মত মর্যাদা ও গুরুত্ব বহন করেনা যে, তার ভিত্তিতে কোনো পিতা পুত্রকে জবাই করতে এবং পুত্র জবাই হতে বাধ্য ও প্রস্তুত হয়ে যাবে। বুখারি, মুসলিম ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে হযরত আয়েশা ও অন্যান্য সাহাবি থেকে একাধিক হাদিস এই মর্মে বর্ণিত আছে যে, রসূল সা.-এর নিকট ওহি আগমনের সূচনা সত্য স্বপ্নের আকারেই হয়েছিল, যা রাতের শেষে ভোরের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার মতো সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দিতো। একশ্রেণীর লোকের মতো আপনি যদি বলতে চান যে, হাদিস ও সুন্নাহর আকারে যে দ্বিতীয় প্রকারের ওহি আমাদের কাছে বিদ্যমান, তা  কেবল পুরোনো কিস্‌সা কাহিনী ও উপাখ্যান  এবং তাতে আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় কিছু নেই, তাহলে আপনার সাথে আমার কোনো সংশ্রব নেই। আপনি যা ইচ্ছে লিখতে থাকুন। কিন্তু আপনার বিশ্বাস যদি সে রকম না হয়ে থাকে, তাহলে আপনি অনর্থক এই বৃথা আলোচনায় নিজেকে ও অন্যদেরকে কেন জড়াতে চান? আমার বিশ্বাস এটাই যে, নবীদের কাছে আগত ওহি লিখিত হয়। অলিখিতও হয়। যে কোনো মুসলমানের জন্য এই উভয় প্রকারের ওহি অকাট্য প্রমাণ এবং অবশ্য পালনীয়।

সূরা শূরায় উল্লেখিত আয়াতটির যে অনুবাদ মাওলানা মওদূদী করেছেন, আমার মতে সেটাই সঠিক এবং অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। অধিকাংশ আলেম ও মুফাসসির আয়াতটির মর্ম এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও কেউ কেউ ---------- দ্বারা মানবীয় নবী রসূলও বুঝিয়েছেন। কিন্তু আমার মতে এখানে ফেরেশতাই বুঝানো হয়েছে। পবিত্র কুরআনে একাধিক জায়গায় ফেরেশতাদের জন্য ------------ শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। বস্তুত এই কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ফেরেশতার জন্যও যখন রসূল শব্দ ব্যবহৃত হবে এবং তিনি বার্তাবাহক বা দূত হয়ে আসবেন, তখন তার ব্যাপার ---------- বা 'প্রেরণ' ক্রিয়ার প্রয়োগ সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও সঙ্গত হবে। কাজেই ---------------- এর অর্থ হবে বার্তাবাহক বা দূত প্রেরণ। এতে আপত্তির কি আছে তা আমার বুঝে আসেনা। ফেরেশতা যদি দূত বা বার্তাবাহক হয়ে আসে তবে কোন্‌ কারণে তার ক্ষেত্রে 'প্রেরণ' ক্রিয়া ব্যবহৃত হতে পারবেনা?

আপনার সুদীর্ঘ আলোচনায় একটি বিষয় আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি। সেটি হলো, আপনার অনেক যুক্তি ও বদ্ধমূল ধারণাকে আপনি এমন মূলনীতির আকারে বর্ণনা করেছেন যে, তাতে যেনো আদৌ কোনো ব্যতিক্রম নেই। অথচ বাস্তব ঠিক তার বিপরীত। উদাহরণস্বরূপ, আপনি বলেছেন যে, সমগ্র কুরআনে কোথাও ------------ বা ----------- শব্দের ব্যবহার অপঠিত ওহির জন্য (অর্থাৎ কুরআন ব্যতীত অন্য কোনো ওহির জন্য) হয়নি। অথচ এ শব্দটি সব ধরণের --------------- এর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আল্লাহর পক্ষ থেকে, মানুষের পক্ষ থেকে, এমনকি শয়তানের পক্ষ থেকেও যে -------------- হয়ে থাকে, তা কুরআনে লক্ষণীয়। হযরত আদম আ. বেহেশতে বসবাস করেছিলেন, তখনও তিনি  নবুয়ত লাভ করেননি। অথচ সেই সময়েও তাঁর আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণী লাভকে ------- শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে।

--------------- (সূরা আল বাকারা আয়াত ৩৭) অনুরূপভাবে সূরা নূরের ১৫ আয়াতে হযরত আয়েশা সংক্রান্ত অপবাদ এক দল মুসলমানের মুখে মুখে রটনা করাকে ----------- শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে ------------- একইভাবে সূরা ক্বাফের ১৭ আয়াতে বলা হয়েছে ---------------- সুতরাং আপনার এ ধারণা ঠিক নয় যে, ফেরেশতাদের জন্য সব সময় ------- (অবতরণ) ক্রিয়াটাই ব্যবহৃত হতে পারে। ফেরেশতাদের বেলা ---------- শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে। আবার ----------  শব্দটির প্রয়োগও দেখা গেছে। কাজেই আপনার দাবি ভ্রান্ত এবং এর দ্বারা আপনি যে বক্তব্য প্রমাণ করতে চান তাও প্রমাণিত হয়না। কুরআন ও হাদিসের বহু স্পষ্টোক্তি আপনার বক্তব্যের বিপরীত।



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )