আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?</h1>
প্রশ্ন : আমি ইসলামি জ্ঞানান্বেষী ও দীনি প্রেরণাসম্পন্ন একজন মুসলমান। কিন্তু কিছু দিন যাবত একটা অদ্ভূত সমস্যায় পড়েছি, যার সমাধান এখনো হয়নি। কয়েকজন আলেমের কাছেও গিয়েছি, কিন্তু সন্তোষজনক জবাব পাইনি। প্রশ্ন হলো, কুরআন ও হাদিস গ্রন্থসমূহে কি এমন আয়াত ও হাদিস আছে, যা দ্বারা নামায, রোযা ও অন্যান্য সৎকর্মের গুরুত্ব কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ সহীহ মুসলিম তিরমিযি প্রভৃতি গ্রন্থে আছে যে, আশূরার রোযা বিগত বছরের গুনাহর কাফফারাস্বরূপ। জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিনের রোযা সম্পর্কে হাদিসে আছে, প্রতি দিনের রোযা পুরো এক বছরের রোযার সমান। হযরত আবু কাতাদা বর্ণনা করেন যে, এতে দু'বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আরাফার দিনে রোযার সওয়াবও তদ্রুপ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার যদি তাই হয়, তাহলে এর দ্বারা কি গুনাহের অবাধ স্বাধীনতা প্রমাণিত হয়না? এরপর আর বেশি নামায, রোযা করা ও গুনাহের অবাধ স্বাধীনতা প্রমাণিত হয়না? এরপর আর বেশি নামায, রোযা করা ও গুনাহর কাজ থেকে বেঁচে থাকার দরকার কি? হযরত আবু যর থেকে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' উচ্চারণ করেছে, সে বেহেশত প্রবেশ করেছে। মিশকাতে সালাতুত তাসবীহর ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর দ্বারা সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমদে বলা হয়েছে, চাশত নামায দ্বারা সকল জীবনের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। মিশকাতে বলা হয়েছে, 'এরপর গুনাহ থেকে কে আত্মরক্ষা করবে, আর কেইবা কষ্ট করে নেক কাজ করতে পারে?' সূরা আর রহমানে বলা হয়েছে :
                          --------------------------------------
"আর যে তার প্রভুর সামনে দাঁড়াতে হবে বলে ভয় করে, তার জন্যে রয়েছে দু'টি জান্নাত।"

প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে কিন্তু কোনো ভালো কাজ করেনা সে কি দু'টো বেহেশত লাভ করবে? সূরা হা-মীম সিজদায় বলা হয়েছে: "যারা বলবে যে, আমাদের রব আল্লাহ অতপর তার উপর অবিচল থাকবে ফেরেশতারা তাদেরকে বেহেশতের সুসংবাদ দেন।" এ ধরনের বহু আয়াত ও হাদিস রয়েছে, যা আপনার নিকট সুবিদিত। এসব দ্বারা যে ভুল বুঝাবুঝি ও শৈথিল্য জন্ম নেয়ার আশংকা রয়েছে, তা কিভাবে রোধ করা সম্ভব? এ ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন ও আপত্তি উঠে তার কি জবাব দেয়া যাবে?

জবাব : আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে বেশ দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। আপাতত সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়া হচ্ছে। আল্লাহ যেনো এতেই আপনাকে তৃপ্তি দান করেন। আপনি কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করতে গিয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন, তাতে  একটা মৌলিক ত্রুটি রয়েছে। আপনি শুধু একটা দিকের উপরই দৃষ্টি রেখেছেন এবং যেসব আয়াত ও হাদিস কোনো কোনো নেক আমলের সুফল বর্ণনা করা হয়েছে, কেবল সেগুলোর প্রতিই মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন। আর যেসব আয়াত ও হাদিস খারাপ কাজের অশুভ পরিণাম বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেননা। একজন মুমিনের প্রকৃত অবস্থান হলো আশা ও ভীতির মাঝখানে। আল্লাহ ও রসূল সা.-এর এই দুই ধরণের বক্তব্যের মধ্য থেকে মাত্র একটির উপরই যে ব্যক্তি দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে সে অনিবার্যভাবে হয় অত্যাধিক আশাবাদী হয়ে উঠবে নচেত হতাশার শিকার হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি এই দুই ধরনের বক্তব্যের মধ্যে বিরোধ ও বৈপরিত্য খুঁজতে চেষ্টা করবে তার কপালে গোমরাহী ও হতবুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু জুটবেনা।

উপরন্তু এ ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রসূল সা.-এর বক্তব্যের সঠিক মর্ম ও উপলিব্ধি করা ও প্রকৃত নিগুঢ় সত্য উদঘাটনের জন্য সেইসব  স্বীকৃত প্রাথমিক মূলনীতিগুলোও নজরে রাখা প্রয়োজন, যা কুরআন ও হাদিসের বর্ণিত বা কুরআন হাদিস থেকেই সংগৃহীত এবং যা প্রাচীন আলেমগণের নিকট সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত ও সমাদৃত। যেমন ফরয কাজগুলোর প্রতিদান ও সওয়াব সর্বাবস্থাই নফলের চেয়ে বেশি। নফল কাজ কখনো ফরযের স্থলাভিষিক্ত বা তার ক্ষতিপূরণে সক্ষম নয় এবং ফরয কাজ বাদ দিলে নফল কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়না। যে ব্যক্তি যাকাত ও উশর দেয়না, তার নফল দান সদকার কোনো স্বার্থকতা নেই। যে ব্যক্তি ফরয রোযা রাখার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাখেনা, তার আশূরা, জিলহজ্জ বা আরাফার দিনের রোযা সারা বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়া দূরে থাক, তা নিজেই বৃথা ও নিস্ফল হয়ে হাওয়ায় উড়ে যাবে। ফরয নামায আদায়ের সৌভাগ্য যার হয়না, তার সালাতুত তাসবীহ অন্যান্য সগীরা ও কবীরা গুনাহ থেকেও রেহাই দিতে পারবেনা। নামায ও যাকাত ত্যাগ করার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে যে মারাত্মক পরিমাণের কথা জানানো হয়েছে তা কারো অজানা নয়। রসূল সা.  ফরয তরককারীগণের বাড়িঘর পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেয়ার  ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করে তাদের জন্য কুরআন ও হাদিসে জাহান্নামের আযাবের কঠোর হুশিয়ারি ঘোষণা করা হয়েছে এবং দুনিয়াতে সাহাবায়ে কিরাম তাদের বিরুদ্ধে ইসলাম পরিত্যাগকারীদের ন্যায় সশস্ত্র জিহাদ করেছেন। এরপরও কি এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট থাকে যে, ফরয তরককারীদের জন্য নফল ইবাদত কাফফারা হয়না এবং নফল কাজের জন্য যে সুসংবাদ এসেছে, তা কেবল যারা ফরয যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাদেরই জন্য? নফল কাজের ফযীলত সম্পর্কে এসব উক্তির উদ্দেশ্য এটা ছিলনা যে, লোকেরা ফরযের ব্যাপারে গড়িমসি করুক, শৈথিল্য প্রদর্শন করুক এবং নিষিদ্ধ ও অন্যায় কাজ করার ব্যাপারে দু:সাহসী হয়ে উঠুক। যে সাহাবিদের উদ্দেশ্য এসব বক্তব্য প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল, তাদের মধ্যে আমরা  এমন একটি দৃষ্টান্ত পাইনা যে, তারা এসব সুসংবাদ শুনে তার উপর নির্ভর করে থাকার ভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং শরিয়তের আদেশ নিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে তাদের মধ্যে ঢিলেমি ও শৈথিল্য দেখা দিয়েছিল।

কুরআন ও হাদিসে মানুষের কর্মফল সম্পর্কে আরো মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। সেটি এই যে, আল্লাহর কাছে সকল ভালো কাজ ও মন্দ কাজের হিসেব ও পরিমাণ সামগ্রিকভাবে করা হবে। ভালো কাজের পাল্লা যার ভারি হবে সে বেহেশতের অধিকারী হবে। আর যে মুসলমানের ভালো  কাজের পাল্লা হাল্‌কা হবে সে দোযখের অধিবাসী হবে। এভাবে হিসেব-নিকেশ  ও পরিমাপের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর হালকা পাল্লার অধিকারী মুসলমানকে আল্লাহ ইচ্ছে করলে মাফ করে দেবেন, আর ইচ্ছে করলে মাফ করার আগে তাকে সাজা ভোগ করার জন্য দোযখে পাঠিয়ে দেবেন। সেখানে কৃতকর্মের বাহ্যিক আকার ও আয়তন দেখা হবেনা। বরং দেখা হবে তার অন্তর্নিহিত মনোবৃত্তি, নিয়ত বা উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়। সহীহ হাদিসে বলা হয়েছে, কিছু কিছু নামাযী ও রোযাদার কেবলমাত্র রাত জাগরণ ও উপবাস ছাড়া আর কিছুই অর্জন করেনা। ফরয ও নফল নির্বিশেষে সকল ইবাদতের ক্ষেত্রেই একথা বলা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, কোনো কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে নফল তো দূরের কথা ফরয নামায রোযাও প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। ফরয কাজ করার দরকার হবেনা এবং কবীরা গুনাহ অবাধে করা জায়েয, এই মনোভাব এ উদ্দেশ্য নিয়ে যদি কেউ নফল ইবাদত ও সদকায় তৎপর হয়, তা হলে এ ধরণের নেক আমল শুধু যে অগ্রাহ্য হবে তা নয়, বরং এ ধরণের অন্যায় ধারণা পোষণহেতু আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

এছাড়া কুরআন ও হাদিসে এমন বহু পুন্যবিনাশী কাজের ফিরিস্তি দেয়া হয়েছ। যা অন্যান্য বহু সৎ কাজকে বিনষ্ট ও পণ্ড করে দেয়। রিয়াকারী বা লোক দেখানোর ইচ্ছে ছোট শিরক নামে আখ্যায়িত হয়েছে এবং এর দ্বারা আর্থিক দান সদকা, আল্লাহর পথে লড়াই এবং অন্যান্য  সৎ কাজ নিস্ফল ও বৃথা হয়ে যায়। খিয়ানত ও আত্মসাৎ দ্বারা জিহাদ ও শাহাদাতের প্রতিদান বিনষ্ট হয় এবং এসব কাজ যারা করে, তারা বরঞ্চ দোযখে যায়। এক হাদিসে আছে যে, "কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তি বহু সৎ কাজ সাথে নিয়ে আসবে, কিন্তু তার পাশাপাশি সে অনেক বান্দাহর হক নষ্ট করে আসবে। কারো সম্পদ ছিনতাই, কাউকে গালাগাল বর্ষণ, কিংবা অন্য কোনোভাবে আল্লাহর সৃষ্টির উপর জুলুম নির্যাতন চালানোর দায়ে দোষী হয়ে আসবে। এই ব্যক্তির কৃত যাবতীয় নেক কাজ ঐসব মজলুমের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে এবং মজলুমদের কৃত পাপগুলো ঐ জালেমের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাকে জাহান্নামে ঠেলে দেয়া হবে।"

এ ধরনের অসংখ্য দু:সংবাদ আপনার চোখে পড়লোনা তার কারণ কি? রসূল সা. যদি বলে না থাকেন যে, আমার শাফায়াত কবীরা গুনাহর আসামীদের জন্য নির্দিষ্ট থাকবে, তবে তা দ্বারা এ কথা কিভাবে বুঝা যায় যে, প্রত্যেক কবীরা গুনাহকারী অবশ্যই শাফায়াত লাভ করবে এবং বিনা হিসেবে ক্ষমা পেয়ে যাবে? শাফায়েত তো কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুমোদিত ব্যক্তিই পাবে। অনেক ঈমানদার ব্যক্তিও একবার দোযখে যাবে- এ কথা সহীহ হাদিসে ঘোষিত হয়েছে। তারা হয় শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হবে, নচেত শাস্তি ভোগ করার পর তা পাবে স্বয়ং রসূল সা. বলেছেন যে, মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা আমার শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হবে। কোনো কোনো অপরাধী সম্পর্কে তিনি বলেছেন, আমি তাদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদী হয়ে অভিযোগ দায়ের করবো। এটা ভেবে দেখার মতো এবং শিক্ষা গ্রহণ করার মতো বিষয় যে, প্রিয় নবী সা.-এর যেখানে হাশরের মাঠে শাফায়াতকারী হওয়ার কথা, সেখানে তিনি যার বিরুদ্ধে ফরিয়াদী হয়ে আসবেন, তার জনৌ আর কে হতে পারে শাফায়াতকারী এবং সে কিভাবে শাস্তি থেকে নিস্তার পাবে।

সর্বশেষ আমি একটা সহজবোধ্য উদাহরণ দিয়ে জবাব শেষ করছি। মনে করুন, একজন দক্ষ চিকিৎসক তার একটা ব্যবস্থাপত্রে শরীরের জন্য কয়েকটি শক্তিবর্ধক ওষুধের নাম লিখে দিলেন। পরে কোনা একটি বৈঠকে কতিপয় খাদ্যদ্রব্যের উপকারিতা ও স্বাস্থ্যরক্ষার কিছু মূলনীতি বর্ণনা করলেন। আবার অন্য একটি বৈঠকে কতিপয় ক্ষতিকর ও বিষাক্ত জিনিসের নাম জানিয়ে দিলেন এবং তা খেলে মানুষ রোগ ও মৃত্যুর কবলে পড়তে পারে বলে সাবধান করে দিলেন। এই সমস্ত কথা যথাস্থানে সঠিক ও সঙ্গত ছিলো। কিন্তু কোনো বেকুফ যদি শক্তিবর্ধক ওষুধের সাথে সাথে বিষাক্ত খাদ্যগুলো খায় এবং এরপর সুস্থ সবল না হয়ে মরনব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তাহলে কি এ কথা বলা যাবে যে, চিকিৎসক দক্ষ ছিলনা, কিংবা তার কিছু কথা ঠিক এবং কিছু  কথা ভ্রান্ত ছিলো। এ প্রসঙ্গে মাওলানা মওদূদী লিখিত তাফহীমাত প্রথম খণ্ডে। [বাংলায় নির্বাচিত রচনাবলী-১' নামে প্রকাশিত] 'মুক্তির জন্য কি শুধু কালেমায়ে তাইয়েবা যথেষ্ট' শীর্ষক লেখাটি অধ্যয়ন করলে ভালো হয়।

আল্লাহ ও রসূর সা.-এর প্রতিটি কথা যথাস্থানে অকাট্য ও নির্ভুল। কিন্তু সমস্যা হলো, আজকাল মুসলমানরো শুধু সহজ ও সুবিধাজনক পন্থা খুঁজে বেড়ায় এবং সস্তা মুক্তি লাভের অভিলাষ পোষণ করে। ইহুদী ও খৃষ্টানরা যেমন বলে যে, ------------- 'আমাদের গুনাহ মাফ করা হবে' তেমনি মুসলমানরাও ভেবে বসে আছে যে, কোনো সৎ কাজ না করলেও, এমনকি সব রকমের পাপ ও অসৎ কাজ করেও তারা বিনা হিসেবে সরাসরি বেহেশতে চলে যাবে। শরিয়তের আদেশ লংঘন ও নাফরমানী করার জন্য কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ও জবাদদিহির সম্মুখীন হওয়ার প্রশ্নই উঠেনা। কিন্তু এটা একটা সর্বনাশা ভুল ধারণা, বরঞ্চ ধ্বংসাত্মক ভ্রষ্টতা। এ ভ্রষ্টতার জন্য তাদের নিজস্ব ভ্রান্ত আচরণ ও বাঁকা বুদ্ধিই দায়ি। আল্লাহ ও তাঁর রসূল সা. এ জন্য দায়ি নন। দুনিয়ার যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিদার, আমরা তো তাকে অবশ্যই মুসলমান বলবো। কেননা এখানে বাহ্যিক হাবভাব ও চালচলনের উপরই শরিয়তের যাবতীয় বিধি প্রযুক্ত হয়। কিন্তু আল্লাহ মানুষের ভেতর ও বাহির উভয়ের সঠিক অবস্থা অবগত আছেন এবং তার কাছে যে কোনো মৌখিক দাবি গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। তা যদি হতো তাহলে তিনি একথা কেন বলবেন যে :
              ----------------------------------------------------------------
"এমন অনেক লোক রয়েছে যারা বলে যে, আমরা আল্লাহ ও আখেরাতের ঈমান এনেছি। অথচ তারা মুমিন নয়।"  (সূরা আল বাকারা, আয়াত : ০৮)
আল্লাহ প্রত্যেক মুসলমানকে কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিটি বাণী শ্রবণ ও তার সর্বোত্তম অনুসরণের তাওফিক দিন। আমীন। [তরজমানুল কুরআন, মে ১৯৭৪]



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )