আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Monday, 28 February 2011
আর্টিকেল সূচি
রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড
গ্রন্থকার পরিচিতি
১। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন
২। আল্লাহ ও তাঁর রসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করা
৩। জীবজন্তুর উপর দয়া
৪। পাঁচ ওয়াক্ত ও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায
৫। হানাফি মাযহাবে কি কিছু কিছু মাদক দ্রব্য হালাল?
৬। আদালতের রায় কি শুধু জাহেরীভাবেই কার্যকর, নাকি বাতেনীভাবেও কার্যকর?
৭। সুন্নাহর আইনগত মর্যাদা
৮। সাহরির শেষ সময় কোনটি?
৯। একটি হাদিস থেকে সুদের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা
১০। মুসলিম উম্মাহর বহু গোষ্ঠিতে বিভক্তি এবং মুক্তি লাভকারি গোষ্ঠি
১১। কালো খেজাব লাগানো কি বৈধ?-১
১২। কালো খেজাব কি বৈধ?-২
১৩। তাকদীর প্রসঙ্গ
১৪। গোমরাহী ও হেদায়েত
১৫। সূরা আন নাজমের প্রাথমিক আয়াত কয়টির ব্যাখ্যা
১৬। যাকাতকে প্রচলিত করের সাথে যুক্ত করা যায় না
১৭। পিতামাতার অধিকার
১৮। লোহার আংটি পরা কি জায়েয?
১৯। উশর ও খারাজের কয়েকটি সমস্যা
২০। উশরযোগ্য ফল ফসল কি কি?
২১। মোজার উপর মসেহ করার বিধান
২২। কারো সম্মানে দাঁড়ানো কি জায়েয?
২৩। 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ দান করা' সংক্রান্ত কুরআনের আদেশের ব্যাখ্যা
২৪। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ভরণ পোষণ প্রসঙ্গে
২৫। কবর আযাব
২৬। কুরআন শিক্ষাদান ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজের পারিশ্রমিক নেয়া কি বৈধ?
২৭। ইসলামের ফৌজদারী দণ্ডবিধি সংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা
২৮। বেতের নামাযে দোয়া কুনূত
২৯। লাইসেন্স ক্রয় বিক্রয়
৩০। কিবলার দিক নির্ণয়ের শরিয়তসম্মত বনাম বিজ্ঞানসম্মত পন্থা
৩১। মৃত ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া দান, শোক ও কুরআন খতম
৩২। কয়েদি সৈন্যরা কি নামায কসর করবে
৩৩। পবিত্র কুরআন ও গুপ্ত ওহি
৩৪। ব্যভিচারের অপবাদ
৩৫। কোন কোন প্রাণী হালাল বা হারাম
৩৬। কুরবানীর চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৭। মৃত ব্যক্তির চামড়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান
৩৮। মৃত প্রাণীর চামড়া সম্পর্কে আরো আলোচনা
৩৯। জবাই হালাল হওয়ার জন্য কি বিস্
৪০। যাকাত সংক্রান্ত কিছু খোলামেলা কথা
৪১। নগদ পুঁজির যাকাত ও তার নিসাব
৪২। বাইয়ে সালাম
৪৩। হযরত আলী রা.-এর জন্য সূর্যকে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা কি সত্য?
৪৪। কুরাইশের ১২ জন খলিফা ও 'ফিতনায়ে আহলাস'
৪৫। আল্লাহ ও রসূলের কোনো উক্তি কি মানুষকে কর্মবিমুখ করতে পারে?
৪৬। আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও দৈন্যদশার কারণ কি?
৪৭। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-১
৪৮। হযরত আলী রা.-এর বর্ম চুরি-২
৪৯। ইসলামের দৃষ্টিতে গানবাজনা ও নারী পুরুষের মেলামেশা
৫০। আব্দুল্লাহ বিন উবাইর জানাযা
৫১। ইমাম ইবনে তাবারি কি শিয়া ছিলেন?
৫২। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আপোস নিষ্পত্তির অধিকার
৫৩। ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে অভিযোগ
৫৪। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াকফের সংজ্ঞা ও বিধান
৫৫। আত্মহননকারীর জানাযা নামায
৫৬। হারুত মারুত ফেরেশতাদ্বয় সম্পর্কে এক ভিত্তিহীন অলীক কাহিনী
৫৭। 'চাটান' সম্পাদকের নিকট দুটো চিঠি
৫৮। হাদিস অস্বীকার করা ও স্বীকার করা
৫৯। হাদিস বিরোধী গোষ্ঠির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা
৬০। একটি হাদিস সম্পর্কে আপত্তি ও তার জবাব
৬১। সন্তান পালনে নারীর অধিকার
৬২। স্তনের দুধ পানে বিয়ে হারাম হওয়া
৬৩। পারিবারিক আইন ও অর্পিত তালাক
৬৪। ফাসিদ বিয়ে ও বাতিল বিয়ে
৬৫। রসূল সা. কি হযরত সওদা রা. কে তালাক দিতে চেয়েছিলেন?
৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা
৬৭। কতোখানি দুধ পান করলে বিয়ে হারাম হয়?
৬৮। পিতামাতার আদেশে স্ত্রী তালাক দেয়া যায় কি?
৬৯। রসুল সা.-এর একাধিক বিয়ের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা
৭০। বেলুচিস্তানের বাগদান প্রথা
৭১। লটারি ও নির্বাচনী লটারি
৭২। সমবায় সমিতি

<h1>৬৬। উম্মুল মুমিনীন হযরত সওদার বিয়ে সম্পর্কে আরো আলোচনা</h1>
প্রশ্ন : তরমানুল কুরআনের আগষ্ট সংখ্যা এইমাত্র পড়লাম। হযরত সওদা সংক্রান্ত প্রশ্নের আপনি যে উত্তর দিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। ঘটনাবলীর বিশ্লেষণে লেখকরা সাধারণ ঘটনার শূন্য স্থানকে নিজস্ব চিন্তা ও কল্পনা দিয়ে পূরণ করতে অভ্যস্ত। মুসলিম মহাপুরুষের চরিত্রকে কাল্পনিক রং মিশিয়ে তুলে ধরার মাধ্যমে একদিকে নিজের ভক্তিশ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয় আর অন্যদিকে পাঠকের পূজার ভাবাবেগে উস্কে দেয়া হয়। স্বভাবতই এতে অনুকরণ ও অনুসরণের প্রেরণা স্তিমিত হয়ে যায়। আপনার জবাবেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়। কয়েকটি প্যারায় এ ধরনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে।

হযরত সওদার সাথে বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় রসূল সা.-এর সকল মেয়ে সাবালিকা ছিলেন বলে নির্ভরযোগ্য তথ্য সূত্রে জানা যায়। তারা হযরত সওদার দেখাশুনা ও তত্বাবধানের মুখাপেক্ষী ছিলেন না। হযরত সওদা ও তাঁর স্বামী প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কী জীবনে মুসলমানদের উপর যে দুর্যোগ ও নির্যাতন নেমে এসেছিল, এই দম্পত্তিও তাতে আক্রান্ত ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর পাঁচটি সন্তানের ভার এসে পড়েছিল হযরত সওদার উপর। রসূল সা. সেই পাঁচটি সন্তানের অভিভাবকত্ব গ্রহণ ও হযরত সওদার সান্ত্বনার খাতিরে তাঁকে বিয়ে করে থাকতে পারেন। এটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত অনুমান বলে মনে হয়। 'রসূল সা.-এর সহধর্মিনীদের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ছিলো।' আপনার এ বক্তব্য নিছক শ্রদ্ধাঞ্জলী ছাড়া  কিছু নয়। এটা ইতিহাস ও মনোবিজ্ঞানের  বিরোধী। সব সময় এই নীতিটা মেনে চলবেন  যে, সনদ সম্পর্কে কিছু বলতে চাইলে 'আসমাউর রিজাল' (হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনবৃত্তান্ত) শাস্ত্রের গ্রন্থাবলী দেখে নেবেন এবং উদ্ধৃতি দেয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করবেন।

আব্দুর রহমান  বিন আবু যুনাদ ওয়াকেদীর মতো পুরোপুরি বিতর্কিত নন। তাঁর সম্পর্কে রিজাল শাস্ত্রের গ্রন্থাবলীতে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, তিনি মদিনার অধিবাসী ছিলেন এবং জীবনের শেষভাগে বাগদাদে এসে বসবাস করতে থাকেন। মদিনায় থাকাকালে তিনি যেসব হাদিস বর্ণনা করেন তাতে কোনো খুঁত নেই এবং তা নির্ভরযোগ্য। আর বাগদাদে আসার পর যেসব হাদিস বর্ণনা করেন, সেগুলো বিতর্কিত।

মোটকথাম তাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে অসতর্কতা বাঞ্ছিত নয়। আপনার নিবন্ধে যে কমতি রয়েছে, সেটা এই অসতর্কতা থেকেই উদ্ভুত।

জবাব : আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, আপনি আমার লিখিত জবাবটি মনোনিবেশ সহকারে পড়ে দেখেছেন এবং যেসব বিষয় আপনার কাছে সমালোচনার যোগ্য মনে হয়েছে তা আমাকে অবহিত করেছেন। তবে ঘটনাবলীর বিশ্লেষণে শূণ্যস্থানকে লেখকের  নিজস্ব চিন্তা ও কল্পনা দিয়ে পূরণ করা এবং মুসলিম মহাপুরুষদের চরিত্রকে কাল্পনিক রং মিশিয়ে চিত্রিত করার মাধ্যমে নিজের ভক্তিশ্রদ্ধা প্রকাশ করার যে তীর্যক মন্তব্যটি আপনি করেছেন, তার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য আমি পুরোপুরি বুঝতে পারলামনা।

আমি আমার আগের প্রকাশিত জবাবে লিখেছিলাম, "হযরত সওদাকে বিয়ে করার আরো একটি কারণ ছিলো এই যে, হযরত খাদিজার ইন্তিকালের পর নবীগৃহে কয়েকজন ছোট ছোট মেয়ে ছিলো এবং রসূল সা. এরূপ ইচ্ছে পোষণ করছিলেন যে, তাদের দেখাশুনার জন্য একজন প্রবীণ মহিলা তাঁর গৃহিনী হয়ে আসুক।" এ বক্তব্যের বিরোধিতা করে আপনি বলেছেন, নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসারে সে সময় রসূল সা.-এর সকল কন্যা সাবালিকা ছিলেন  এবং হযরত সওদার দেখাশুনার মুখাপেক্ষী ছিলেননা। আমার বক্তব্যের মর্ম ছিলো এই যে, রসূল সা.-এর কন্যাদের কেউ কেউ তখন পর্যন্ত অবিবাহিতা ছিলেন। তাই নবীগৃহে  একজন প্রবীণ গৃহিনী থাকা কল্যাণকর ছিলো। এ কথা সত্য যে, রসূল সা.-এর কন্যাদের মধ্যে হযরত যায়নবের বিয়ে হযরত খাদিজা বেঁচে থাকতেই সম্পন্ন হয়েছিল। আর হযরত রুকাইয়ার বিয়েও হযরত সওদার বিয়ের আগেই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হযরত উম্মে কুলসুমের বিয়ে হযরত উসমানের সাথে এবং হযরত ফাতিমার বিয়ে হযরত আলীর সাথে তখনো হয়নি। এ দু'টো বিয়ে যে হযরত সওদার বিয়ে এবং হিজরতের পরে হয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

হযরত উম্মে কুলসুমের বিয়ে ৩য় হিজরীতে এবং হযরত ফাতিমার বিয়ে বদর যুদ্ধের পরে ওহুদ যুদ্ধের আগে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরীর মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। মেয়েরা সাবালিকা হয়ে গেলে আর দেখাশুনার মুখাপেক্ষী থাকেনা -এ ধারণা সঠিক  বলে মনে হয়না। আমার মনে হয়, বয়োপ্রাপ্তা মাতৃসূলভ স্নেহ তদারকি ও দিক নির্দেশনার প্রয়োজন আগের চেয়েও বেশি অনুভূত হয়। আমি এই বিষয়টির দিকেই ইঙ্গিত করেছিলাম।

এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে, রসূল সা. যখন হিজরত করেন, তখন তাঁর সাথে তার পরিবারের কেউ ছিলেননা। এক দুই বোন যতোদিন হিজরত করেননি এবং মক্কায় অবস্থান করেছিলেন, তখন হযরত সওদার তদারকি ও দেখাশুনা তাদের জন্য জরুরি ছিলো। সিরাত গ্রন্থাকারগণ এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে, হিজরতের কিছুদিন পর যখন রসূল সা. নিজ পরিবার পরিজনকে নিয়ে আসার জন্য হযরত যায়েদ বিন হারেসাকে মক্কায় পাঠান, তখন হযরত ফাতিমা ও হযরত উম্মে কুলসুম হযরত সওদার সাথেই মদিনায় আগমণ করেন। হযরত সওদাকে বিয়ে করার যে কারণটি আপনি উল্লেখ করেছেন এবং যা আপনার কাছে অধিকতর যুক্তিযুক্ত, সেটা আমিও অস্বীকার করিনা। আমি তো পূর্ববর্তী জবাবে এ কারণটিই প্রথমে উল্লেখ করেছি। তবে আমার ধারণা, দ্বিতীয় কারণটি একেবারে যুক্তি বহির্ভুত নয়।

আপনি আরো বলেছেন যে, 'রসূল সা.-এর স্ত্রীদের মধ্যে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো এরূপ ধারণা নেহাৎ ভক্তির আতিশষ্য থেকে উদ্ভুত এবং ইতিহাস ও মনোবিজ্ঞানীনের বিরোধী।' আমিও অস্বীকার করিনা যে, সাহাবিগণ -তা পুরুষই হোন বা মহিলা, মানবীয় বৈশিষ্ট্য ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত ছিলেননা। এ দুর্বলতার কারণে বাস্তবে যে ঘটনাবলী ঘটেছে, তা আমার অজানা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর সামগ্রিকভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, তাঁরা কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী যথার্থই 'পরস্পরের প্রতি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল' এবং 'পরস্পরে ভাই ভাইও' ছিলেন। বিরল ঘটনাবলী ধর্তব্য নয়। ধর্তব্য হলো সাধারণ অবস্থা। রসূল সহধর্মিনীদের জীবনী আমি যতোদূর অধ্যয়ন করেছি, তা থেকে আমি এই সিদ্ধাতেই উপনীত হয়েছি যে, তাঁদের মধ্যে কখনো যদি সাময়িক মনকষাকষি হয়ে থাকে, তবে তা  পারস্পরিক বিদ্বেষের কারণে হয়নি বা হৃদ্যত ও ভালোবাসার অভাবের কারণে হয়নি। বরং তার পেছনে কার্যকর ছিলো রসূল সা.-এর ব্যক্তিত্বের প্রতি অসাধারণ আকর্ষণ ও ভালোবাসা। কিন্তু রসূল সা.-এর উৎকৃষ্টতম প্রশিক্ষণ নীতি এই ঈর্ষাকাতর মনোভাবকেও অনেকাংশে দূর করে দিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, এ ঘটনাটি আপনি নিশ্চয় পড়ে থাকবেন যে, রসূল সা. যখন তার কোনো এক স্ত্রীর গৃহে অবস্থান করছিলেন, তখন অপর স্ত্রী তাঁর জন্য সেখানে খাবার পাঠান। যে স্ত্রীর গৃহে অবস্থান করছিলেন, তিনি উঠে গিয়ে খাবার নিয়ে আসা মেয়েটির হাত ধরে এমন জোরে টান দেন যে, খাবার পাত্রটি পড়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় এবং খাবার জিনিসটি মাটিতে মিশে যায়, তিনি মেয়েটিকে বললেন : "এই খাবার পাঠানোতে তোমার মার আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছে।" অত:পর যে স্ত্রীর গৃহে অবস্থান করছিলেন তাকে আদেশ দিলেন, "এর চেয়ে উৎকৃষ্ট খাদ্য সামগ্রি আরো ভালো পাত্রে করে অপর স্ত্রীর ঘরে পাঠিয়ে দাও।" তিনি তৎক্ষণাত এ আদেশ করলেন। এভাবে একটা অপ্রীতিকর ঘটনার শুভ সমাপ্তি ঘটলো। আমি যতোদূর উপলব্ধি করতে পেরেছি, এসব সাময়িক ও বিক্ষিপ্ত কলহের ঘটনা কেবল রসূল সা.-এর বেঁচে থাকাকালে সংঘটিত হতো এবং তার মীমাংসাও তিনি নিজেই করে দিতেন। কিন্তু যখন তিনি ইন্তিকাল করলেন, তখন এই সব রেষারেষী ও ঈর্ষার ভাবও চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে যায়। এরপর তাঁর সহধর্মিনীদের এমন অবস্থা হয় যে, তাঁরা এক জায়গায় সমবেত হয়ে একে অপরের হাত মেপে দেখতেন যে, কার হাত কতো লম্বা। কেননা রসূল সা. একবার বলেছিলেন, যে স্ত্রীর হাত বেশি লম্বা।১ সে সবার আগে আমার কাছে আসবে।

ইবনে সা'দের উদ্ধৃত একটি বর্ণনার সনদে ওয়াকেদী ও আবু যুনাদ দু'জনই রয়েছেন। অপর একটি মুরসাল (সাহাবির নাম বিহীন) বর্ণনা সাঈদ বিন মানসুর কর্তৃক আবু যুনাদ থেকে সংগৃহীত। কিন্তু সেখানে হযরত আয়েশার নামের উল্লেখ নেই। আলোচ্য বিতর্কিত বর্ণনাকারী হচ্ছেন আবু যুনাদ। আবু যুনাদের কিছু কিছু বর্ণনায় যে বিতর্ক রয়েছে, সে কথাতো আপনিও স্বীকার করেন। সেটা বাগদাদে অবস্থানকালের  বর্ণনাও হতে পারে। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে এটা তদন্ত করা কঠিন যে, এই বর্ণনাকারীর বর্ণিত যে হাদিসটিতে তালাকের উল্লেখ রয়েছে, সেটা তার বাগদাদের সময়কার, না মদিনার সময়কার। কিন্তু ইমাম যাকীউদ্দীন মুনযিরী যেহেতু তালাক সংক্রান্ত হাদিস প্রসঙ্গেই তাঁর বিতর্কিত হওয়ার উল্লেখ করেছেন, তাই এ হাদিস তার বাগদাদ আমলের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আপনার হয়তো এ কথাও জানা গেছে যে, হাদিস বিশেষজ্ঞদের একটি দল যখন কোনো বর্ণনাকারীকে বিশ্বাসযোগ্য এবং অপর দল বিতর্কিত আখ্যা দেয়, তখন তাকে বিতর্কিত ধরে নেয়াকেই অগ্রাধিকার দিতে হয় এবং তার বর্ণনা গ্রহণে বিরত থাকাই রীতিসিদ্ধ।

যাহোক, তালাক বা তালাকের ইচ্ছা সংক্রান্ত হাদিস মেনে নিতে আমার দ্বিধা শুধু একজন বা দু'জন বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা বা অবিশ্বতার কারণে নয় বরং এর বহু কারণ রয়েছে। একটি প্রধান কারণ আমি আগেই উল্লেখ করেছি। সেটি হলো, ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উভয়ে হযরত সওদা কর্তৃক নিজের পালা হযরত আয়েশাকে দেয়া সংক্রান্ত হাদিস গ্রহণ করেছেন, কিন্ত তালাকের বর্ণনা সম্বলিত হাদিস গ্রহণ করেননি। এই সাথে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে, প্রাচ্যবিদরা এই তালাকের বিষয়টির প্রতি গভীর আগ্রহ প্রদর্শন করেছে। তাদের সংকলিত 'ইনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলামে' হযরত সওদা সম্পর্কে যে নিবদ্ধ রয়েছে, তাতে বুখারি, মুসলিম, তিরমিযী ও আবু দাউদের হাদিসের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করা হয়নি। অথচ ইবনে সা'দের বরাত দিয়ে গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে যে, হযরত সওদাকে তালাক দেয়া হয়েছিল।

আপনার এ পরামর্শ অত্যন্ত মূল্যবান ও যুক্তিসঙ্গত যে, তাত্ত্বিক ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। আমি আগেও এই নীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছি এবং ভবিষ্যতে ইনশাল্লাহ আরো বেশি সতর্ক থাকবো। [তরজমানুল কুরআন, নভেম্বর, ডিসেম্বর ১৯৬৪]
__________________
১. আসলে এটা একটা রূপক শব্দ ছিলো এবং রসূল সা.-এর স্ত্রীগণ এর আভিধানিক অর্থ বুঝে নিয়েছিলেন। পরে যখন উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মা সবার আগে (রসূল সা.-এর ইন্তিকালের দুই মাস পর) ইন্তিকাল করলেন, তখন সবাই বুঝলেন হাত লম্বা হওয়ার অর্থ পরোপকার ও দানশীলতা। এ ব্যাপারে হযরত যয়নবই সবার চেয়ে অগ্রসর ছিলেন। দানশীলতার ও দুস্থ মানুষের সেবায় তার হাতই সবচেয়ে লম্বা ছিলো বিধায় তিনি 'উম্মুল মাসাকীন' (গরিবদের মা) নামে খ্যাত হন। তাই রসূল সা.-এর ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর ব্যাপারেই সত্য হয়ে দেখা দেয়। (গোলাম আলী)



সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 04 March 2011 )