আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামী সমাজে মসজিদের ভুমিকা প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন আবু তালিব মোহাম্মদ মোনাওয়ার   
Thursday, 02 February 2012
আর্টিকেল সূচি
ইসলামী সমাজে মসজিদের ভুমিকা
একটি প্রাণবন্ত মসজিদের অবকাঠামো

২-একটি প্রাণবন্ত মসজিদের অবকাঠামো

মসজিদের অবকাঠামোর গুরুত্ব:


মুসলিম সমাজে মসজিদের অবকাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি মসজিদের অবকাঠামোর উপর নির্ভর করে এর দাওয়াতী কার্যক্রম। মসজিদের অবকাঠামো যত পরিকল্পিত হবে দাওয়াতে দ্বীনের কাজ ততই তরান্বিত হবে। মসজিদের অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দিক গুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো:

 

যোগ্য খতীব নির্বাচন:

একজন যোগ্য খতীব একটি প্রাণবন্ত মসজিদের মুকুট সরূপ। তাঁর  পক্ষেই সম্ভব একটি মসজিদকে প্রাণবন্ত করে তোলা। তিনি পারেন মসজিদকে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে। তাঁর যোগ্যতা বলেই একটি মসজিদ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন করতে পারে। যে মসজিদে যোগ্য খতীব নেই সে মসজিদ মুসল্লিতে ভরপুর হলেও মৃত প্রায়। তাই এলাকায় যোগ্য খতীব পাওয়া না গেলেও দূরবর্তী এলাকা থেকে উপযুক্ত সম্মানী প্রদানের মাধ্যমে যোগ্য খতীব নিয়োগের ব্যবস্থা করা একটি প্রাণবন্ত মসজিদের বৈশিষ্ট্য।

 

মসজিদের পরিধি:

মসজিদের অবকাঠামোর মধ্যে এর পরিধি সর্বপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মসজিদ মুসলিম সমাজের একটি সম্মেলন কেন্দ্র। এর বাস্তবতা কালক্রমে মুসলমানদের থেকে হারিয়ে গেলেও অমুসলিম গবেষকরা এই বাস্তবতাকে অনুধাবন করে এর স্বীকৃতি দিয়েছে। মসজিদের পরিধি এমন আয়তনের হওয়া উচিৎ যাতে এলাকার সকল মুসলিম একই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মিলিত হতে পারে। আর জুমআর মসজিদ এমন হওয়া উচিত যাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য নির্মিত ছোট অনেক গুলো মসজিদের মুসল্লী এক সাথে জুমআর খুৎবা শুনতে এবং নামাজ আদায় করতে পারে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে সোনালী যুগ পর্যন্ত মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে মুসলমানদের কৌশলই ছিল বড় মসজিদ নির্মাণ করা।

রাসূল (সা:) মদীনাতে গিয়ে সর্বপ্রথম মসজিদই নির্মাণ করেন। আর এর পরিধি এমন প্রসস্থ ছিল যে,এতে মদীনার সকল অধিবাসীর সংকুলান হত। অতপর: যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল তখন খোলাফায়ে রাশেদা এর আয়তন বৃদ্ধি করেন। সাহাবী আমর ইবনুল আস যখন মিশরে প্রবেশ করেন তখন তিনি পুরানা মিশরের আল-ফুসত্বাত শহরে এর সকল অধিবাসীকে সংকুলান করবে এমন প্রসস্থ মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি বতমানে মসজিদে আমর ইবনুল আস হিসেবে পরিচিত। এর পববর্তী যুগে আহমাদ বিন তুলুন আল-কাত্বায়েড় নগরীতে একটি বিরাট জামে মসজিদ নির্মাণ করেন যাতে ঐ এলাকার সকল মুসলমান একসাথে মসজিদে মিলিত হয়ে জুমআর খুৎবা শ্রবণ ও সালাত আদায় করতে পারে। এর পরবর্তী কালে জাওহার আস-সাক্বলী কায়রো নগরীতে জামেউল আযহার নির্মাণ করেন যাতে তৎকালীন কায়রোর সকল মুসলিম একসাথে সালাত আদায় করতে পারতো। এটি বর্তমানে আল আযহার মসজিদ হিসেবে পরিচিত। এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই এবং এই মসজিদ ভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায়ই বিশ্ব বিখ্যাত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু, আজকের মুসলিম সমাজে মসজিদ নির্মাণের স্ট্রেটেজি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। খুব ছোট ছোট মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে আমাদের সমাজে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে- কোন কোন এলাকা কিংবা গ্রামে কয়েকটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। ছোট ছোট মসজিদ নির্মাণের পিছনে মুসলিমদের ঐক্যের সেতুবন্ধনে ফাটল ধরানোর ষড়যন্ত্র নিহিত রয়েছে। বর্তমান সমাজপতিরা বড় মসজিদ নির্মান হোক তা কামনা করেনা। যাতে মসজিদ কেন্দ্রিক মুসলিম সমাজে ঐক্য গড়ে না উঠে। এজন্যই তারা ছোট ছোট মসজিদ নির্মাণে উৎসাহ প্রদান করে এবং এর জন্য অনুদান বরাদ্ধ করতেও দ্বিধা করেনা।

মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন টার্গেট হওয়া উচিৎ যাতে এর সংখ্যা কম হয় এবং প্রসস্ততা বেশী হয়। কৌশল যদি এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে তাহলে এর জন্য ভাল ও যোগ্য খতীব পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে মসজিদের আয়তন কমে এর সংখ্যা যদি বাড়তেই থাকে তাহলে অধিক সংখ্যক মসজিদের জন্য অধিক সংখ্যক যোগ্য খতীব পাওয়া যাবেনা। ফলে খতীব হওয়ার যোগ্য নয় এমন লোককেও মসজিদের খতীব নির্বাচন করতে হবে। আর এমন খতীব মানুষকে সঠিক কথা বলার পরিবর্তে ভুল ও অশুদ্ধ কথা বলে সমাজের মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াবে। আমাদের সমাজের সিংহভাগ খতীবের অবস্থাই অনুরূপ।

অথচ মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে- মসজিদ খুবই প্রসস্থ হবে। এ জন্যই ফকীহগণ বলেন: (নবনির্মিত) কোন মসজিদে জুমআর নামাজ পড়া জায়েয নেই,কেবল মাত্র তখনই জায়েয যখন (পূর্বনির্মিত) মসজিদটি মুসল্লীতে পূর্ণ হয়ে যায়। একান্ত প্রয়োজন ব্যতিরেকে মসজিদের সংখ্যা বৃদ্ধি বৈধ নয়।

বর্তমানে প্রত্যেকটি মসজিদই মুসল্লীতে ভরপুর হয়ে যায় কিন্তু,এই অজুহাতে আরো এমন মসজিদ নির্মাণ করা জায়েয হবেনা;কেননা এখনকার সবগুলো মসজিদই আয়তনে খুব ছোট। আজকাল গ্রাম-গঞ্জের অলিতে গলিতে, রাস্তা-ঘাটে যত্রতত্র মসজিদ নির্মিত হচ্ছে এবং মুসলমানরা এসব মসজিদে  নামাজ পড়ছে কিন্তু,জামেউল আযহার,জামে ইবনে তুলুন ও জামে আমর ইবনে আ’স এর ন্যয় প্রসস্থ মসজিদ আমাদের দেশে পাওয়া যায়না। আমাদের দেশের কিছু মানুষ কিঞ্চিত সচেতনার পরিচয় দিয়ে অভিযোগ করে থাকেন যে,মসজিদের খতীব তাঁর দায়িত্বে যোগ্য নয়। আজকাল যোগ্য খতীব আর নেই। তাদের এই মন্তব্য অল্প সচেতনার কারণেই। তারা এর কারণ খুজতে চেষ্টা করেননা। এর মূল কারণ হচ্ছে- দেশে মসজিদের সংখ্যা খুব বৃদ্ধি পেয়েছে। মসজিদগুলো আয়তনে খুব ছোট। স্বাভাবিকভাবে যে কোন দেশে বা এলাকায় যোগ্য আলেম ও খতীবের সংখ্যা কমই থাকে। কিন্তু মসজিদের সংখ্যা অধিক হওয়ায় সব মসজিদে যোগ্য খতীব পাওয়া যায়না। পক্ষান্তরে,ছোট ছোট মসজিদে কম শিক্ষিত ও অযোগ্য ইমাম খতীবদের থেকে মুসল্লিরা সঠিক কথা শুনার পরিবর্তে অনেকাংশে বিভ্রান্তই হচ্ছে। একটি মসজিদের প্রাণবন্ত করে তুলতে হলে এর পরিধিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া উচিত।

 

মসজিদের অবকাঠামো:

মসজিদের যাবতীয় লক্ষ্য,কর্মসূচী ও প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করতে হলে এর অবকাঠামোর মধ্যে বৈচিত্র থাকতে হবে। বর্তমানে আরব দেশসহ কিছু মুসলিম দেশে এখনও বিচিত্র অবকাঠামোর মসজিদ নির্মিত হতে দেখা যায়। আরবদেশ সমূহের মধ্যে বিশেষতঃ মিশরে বিচিত্র অবকাঠামোর অনেক মসজিদ রয়েছে যেগুলো সমাজে নানা ভুমিকা পালন করছে। উল্লেখ্য যে,ইদানিং অমুসলিমদেশ সমুহের বিশেষতঃ ইউরোপ,আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়াতে এ ধরণের কিছু মসজিদ নির্মিত হয়েছে। নিম্নে একটি প্রাণবন্ত মসজিদের সঠিক  অবকাঠামোর প্রস্তাব করা হলো:

সেমিনার হল: মসজিদের সাথে নির্মিত হবে এই সেমিনার হল। এখানে আমন্ত্রিত বিশেষ আলেম ও মেহমানের বক্তব্য,সামাজিক দক্ষতা তৈরী করে এমন প্রশিক্ষণ কোর্স এবং মহিলাদের জন্য বিশেষ আলোচনার আয়োজন করা যাবে।

কমিউনিটি হল: এখানে বিবাহ অনুষ্ঠান ও শরীয়ত সম্মত বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে।

মকতব: মসজিদের তত্ত্বাবধানেই মকতব পরিচালনা করা।

হিফয খানা: মসজিদের সাথে ভিন্ন রুমে হিফয খানা প্রতিষ্ঠা করা।

লাইব্রেরী: এলাকার মুসল্লিদের জ্ঞান চর্চার জন্য মসজিদের সাথে একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা।

মহিলাদের নামাজের স্থান: মসজিদের অভ্যন্তরে কিংবা পাশের বারান্দায় মহিলাদের নামাজের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা।

ই’তিকাফের স্থান: রমযানে ই’তিকাফকারীদের জন্য মসজিদের অভ্যন্তরে কিংবা একপাশে আলাদা স্থানের ব্যবস্থা করা।

শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা: অভিভাবকবৃন্দ তাদের সন্তানদেরকে মসজিদ কতৃক নির্মিত শিশুদের বিনোদন কেন্দ্রে আমোদ-প্রমোদের জন্য নিয়ে আসবেন। বেলাশেষে নামাজের আযান হলে তাদেরকে নিয়ে মসজিদে সালাত আদায় করতে প্রবেশ করবেন। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশু বেলাতেই আনন্দের মধ্যে দিয়েই তাদের সাথে মসজিদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

অফিস কক্ষ: মসজিদের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি অফিস থাকা প্রয়োজন।

 (সমাপ্ত)

--------------------------------------------------------------------------------------------------------

v  ইসলামী সমাজে মসজিদের ভুমিকা

Ø  ভুমিকা

Ø  ইসলামের প্রাথমিক যুগে মসজিদের ভুমিকা

Ø  ইসলামী সমাজে মসজিদের ভুমিকা

§      তা’লীম ও তারবিয়াত

·         তা’লীমুল কুরআন প্রোগ্রাম

·         কুরআন তা’লীমের গুরুত্ব

·         প্রস্তাবিত প্রকল্প সমুহ

ü  তাহফিজুল কুরআন প্রকল্প

ü  বিষয় ভিত্তিক দারসের আসর

ü  ফিকহী আহকাম ও প্রশ্নোত্তরের সাপ্তাহিক আসর

ü  মাসিক ওয়াজ মাহফিল

ü  সাপ্তাহিক জুমআর খুৎবাহ

§      দাওয়াতী কার্যক্রম

·         প্রতিযোগিতার আয়োজন

§      সামাজিক খেদমত

·         গরীব ও এতিমদের বিবাহ প্রকল্প

·         যাকাত ফান্ড গঠন

·         প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রান বিতরণ প্রকল্প

·         চিকিৎসা সেবা

v  একটি প্রাণবন্ত মসজিদের অবকাঠামো

Ø  মসজিদের অবকাঠামোর গুরুত্ব

Ø  যোগ্য খতীব নির্বাচন

Ø  মসজিদের পরিধি

Ø  মসজিদের অবকাঠামো

§      সেমিনার হল

§      কমিউনিটি হল

§      মকতব

§      হিফয খানা

§      লাইব্রেরী

§      মহিলাদের নামাজের স্থান

§      ই’তিকাফের স্থান

§      শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা

§      অফিস কক্ষ


 

লেখক:

আবু তালিব মোহাম্মদ মোনাওয়ার

অনার্স: আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়

মাস্টার্স: আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালেয়শিয়া



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 04 February 2012 )