|
পাতা 18 মোট 20
(১৭)
চরিত্র ও আচার ব্যবহার
১. চরিত্র কী?
কোনো ব্যক্তির জীবন-যাপনের পদ্ধতি, পারস্পরিক সম্পর্কের ধরণ এবং তার আচার আচরণই তার চরিত্র।
মানুষের কথা-বার্তা, লেনদেন, চাল-চলন ও
আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে তার চরিত্র প্রকাশ পায়। চরিত্র দুই প্রকার : ১. উত্তম বা সৎ
চরিত্র এবং ২. মন্দ বা অসৎ চরিত্র।
উত্তম চরিত্রের অধিকারীকে বলা হয় চরিত্রবান ও
নীতিবান। আর মন্দ চরিত্রের ব্যক্তিকে বলা হয়- চরিত্রহীন ও নীতিহীন। মন্দ চরিত্রের
মানুষ পশুর তুল্য।
২. মন্দ চরিত্র কী?
বাবুল মেম্বারকে সবাই জানে। সে মানুষের সাথে
মিথ্যা কথা বলে, ওয়াদা খেলাফ করে, ঘুষ খায়, মানুষকে ধোকা
দেয়,
প্রতারণা করে, অন্যায়ের পক্ষ নেয়, স্বজন-প্রীতি
দেখায়,
যুলুম করে, মানুষকে
গালি-গালাজ করে, অশ্লীল কাজ করে। এই বাবুল মেম্বার
একজন চরিত্রহীন মানুষ। মানুষ তাকে অসৎ ও মন্দ লোক বলেই জানে।
কালু বেপারী একজন ব্যবসায়ী। সে ভালো মালের
সাথে ভেজাল মিশায়, মাপে কম দেয়, গেরস্তের নিকট থেকে কিনে নেবার সময় মাপে বেশি নেয়, লেনদেনে হেরফের করে, ধোকা দেয়, প্রতারণা করে, খারাপ জিনিসকে ভালো জিনিস বলে চালায়, মিথ্যা কসম খায়, সুদী কারবার করে। কালু বেপারী একজন অসৎ ও চরিত্রহীন লোক।
বেল্টু শেখ সামাজিক নেতা। সে সবার কাছেই মন্দ
ও অসৎ চরিত্রের লোক বলে পরিচিত। কারণ সবাই জানে, সে মিথ্যা কথা বলে। চুরি, ডাকাতি, হাইজ্যাক সবই করে। বদমায়েশি করে। গালি-গালাজ করে, পরনিন্দা করে। মানুষের ক্ষতি করে, ষড়যন্ত্র করে, ধোকা দেয়। আইল ঠেলে, মানুষের সম্পদ
আত্মসাৎ করে। বাকি কিনে দাম দেয়না। জালিয়াতি করে। মুখে এক রকম বলে কাজে আরেক রকম
করে। মদ খায়, তাড়ি খায়, ফেন্সিডিল খায়, অশ্লীল কাজ করে, লাজ-লজ্জার ধার
ধারেনা।
বড়দের সম্মান করেনা, ছোটদের স্নেহ করেনা, বাবা-মার সাথে দুর্ব্যবহার করে, শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবি করে। ভালো লোকদের বিদ্রূপ করে, খারাপ লোকদের সাথে চলাফেরা করে, আড্ডা দেয়, আত্মসাৎ করে।
হ্যাঁ এই বেল্টু শেখ চরম চরিত্রহীন লোক।
মালতী বেগম একজন গৃহবধূ। তার ব্যবহারে মানুষ
অতিষ্ঠ। সে সুযোগ পেলেই পরের জিনিসে হাত দেয়। কথায় কথায় গালি-গালাজ করে।
প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়া-ঝাটি করে। শাশুড়ীর সাথেও বিবাদ করে, স্বামীর অবাধ্য হয়ে চলে। লাজ-লজ্জার ধার ধারেনা। মানুষকে
খোটা দেয়,
পরনিন্দা করে। কারো ভালো দেখতে পারেনা, হিংসা করে। কথায়-কাজে আত্মীয় স্বজনকে কষ্ট দেয়। প্রতিবেশীর
ছেলেমেয়েকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। তার মন্দ কথা এবং মন্দ আচরণ থেকে কেউই রক্ষা
পায়না। এই মালতী বেগম একজন চরিত্রহীন নারী।
বাবুল মেম্বার, কালু বেপারী, বেল্টু শেখ এবং
মালতী বেগম এরা সবাই মন্দ চরিত্রের লোক। এদের আচার-ব্যবহার খারাপ।
এদের মধ্যে যেসব মন্দ অভ্যাস ও আচার ব্যবহার
রয়েছে,
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেগুলোকে খুবই অপছন্দ করেন, ঘৃণা করেন। সকল বিবেকবান মানুষের কাছেই এগুলো নিন্দনীয়।
আল্লাহর,
আল্লাহর রসূলের আর সকল মানুষের অভিশাপ এদের প্রতি বর্ষিত
হয়।
তাই এ ধরণের কথা-বার্তা, চাল-চলন ও আচার ব্যবহার পরিত্যাগ করা প্রত্যেক বিবেকবান
মানুষেরই কর্তব্য।
৩. উত্তম চরিত্র কী?
খাদিজা একজন গৃহবধূ। তিনি একজন বিবেকবান
মহিলা। তিনি আল্লাহকে ভয় করে জীবন যাপন করেন। তিনি সব সময় সত্য কথা বলেন। সকল ভালো
কাজে স্বামীর আনুগত্য করেন। স্বামীর সেবা করেন। শশুর-শাশুড়ীর প্রতি সম্মান
প্রদর্শন করেন। স্বামীর আত্মীয় স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করেন। পাড়া প্রতিবেশীর
সাথে উত্তম আচরণ করেন, তাদের
সাহায্য-সহযোগিতা করেন। তাদের বিপদে দুঃখিত হন, তাদের খুশিতে আনন্দিত হন। বিপদে-আপদে ধার-কর্জ দেন। সবার সাথে সুন্দরভাবে কথা
বলেন। স্বামীর আমানত রক্ষা করেন। মন্দ কাজ ঘৃণা করেন। মানুষকে সৎ পরামর্শ ও উপদেশ
দেন। এই খাদিজা একজন উত্তম চরিত্রের সতী সাধ্বী মহিয়সী মহিলা। আল্লাহ তাকে
ভালোবাসেন, মানুষও তাকে ভালোবাসে। সবাই তার
জন্যে দু’আ করে।
উসমান বেপারী একজন ব্যবসায়ী। তিনি কখনো
মাপ-জোপে হেরফের করেন না। মন্দ জিনিসকে ভালো বলে প্রতারণা করেন না। ভেজাল মিশিয়ে
ধোকা দেননা। সঠিক মাপ দেন, সত্য কথা বলেন।
আমানতের খিয়ানত করেন না। লেনদেনে গড়িমসি করেন না। লোকসান হলেও সততা বজায় রাখেন।
তিনি একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি। তিনি একজন সৎ ও চরিত্রবান ব্যবসায়ী। মানুষ তাকে
বিশ্বাসী মনে করে।
সালমান একজন ছাত্র। সে পড়ালেখায় খুবই মনোযোগী।
সে সবার সাথে সুন্দরভাবে কথা বলে, সত্য কথা বলে, ওয়াদা রক্ষা করে। রীতিমতো নামায-রোযা করে। কারো প্রতি
অন্যায় আচরণ করে না। মন্দ ছেলেদের সাথে চলে না। কখনো মন্দ কথা বলে না, মিথ্যা কথা বলে না, কাউকেও গালি দেয় না। সে কোনো নিষিদ্ধ কাজ করে না, ওয়াদা খেলাফ করে না। কারো নিন্দা করে না, কারো হক নষ্ট করে না, কারো জিনিসে হাত দেয় না। মানুষের সেবা করে, উপকার করে। ন্যায় কাজে সহযোগিতা করে, অন্যায় কাজে বাধা দেয়। বড়দের সম্মান করে। ছোটদের স্নেহ করে। এই সালমান একজন
চরিত্রবান ছেলে। সবাই তাকে ভালোবাসে।
৪. উত্তম চরিত্র ও ভালো ব্যবহারের গুরুত্ব
উত্তম চরিত্র ও ভালো ব্যবহার মানব জীবনের এক
অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদ দ্বারা মানুষ দুনিয়াকে জয় করতে পারে। এর দ্বারা সে
আখিরাতেও অর্জন করবে সাফল্য। আল্লাহ এবং তাঁর রসূল সা. উত্তম চরিত্র ও ভালো
ব্যবহারের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
১. ‘তোমরা মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো।’
২. ‘তোমরা সহজ-সরলভাবে কথা বলো।’
৩. ‘মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো।’
৪. ‘আল্লাহ সত্যবাদীদের ভালোবাসেন।’
৫. ‘আল্লাহ সুবিচারকদের ভালোবাসেন।’
৬. ‘আল্লাহ উপকারীদের ভালোবাসেন।’
রসূল সা. বলেছেন :
১. ‘মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ উত্তম চরিত্র।’
২. ‘বাবা-মা সন্তানকে উত্তম চরিত্রের চাইতে ভালো কিছু দান করতে পারে না।’
৩. ‘আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধন করার জন্য প্রেরিত হয়েছি।’
যারা সত্যিকার মুসলিম তাদের চরিত্র হতে হয়
ভালো। যার চরিত্র ভালো তাকে বলা হয় চরিত্রবান। যারা মন্দ লোক তাদের চরিত্র হয়
খারাপ। তাদেরকে বলা হয় চরিত্রহীন। কথা, কাজ ও ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের ভালো ও মন্দ চরিত্র প্রকাশ পায়।
যে নিজের কথা, কাজ ও ব্যবহারকে ভালো বানাতে পারে, সেই চরিত্রবান। একজন মুসলমানকে অবশ্যি উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে এবং
মন্দ কথা,
কাজ ও ব্যবহার বাদ দিতে হবে।
উত্তম চরিত্র মন্দ চরিত্র
১. সত্য কথা বলা ১. মিথ্যা কথা বলা
২. ন্যায় কথা বলা ২. অন্যায় কথা বলা
৩. ওয়াদা রক্ষা করা ৩. ওয়াদা খেলাপ করা
৪. ভালো কথা বলা ৪. মন্দ কথা বলা
৫. বড়দের সম্মান করা ৫. বড়দের অসম্মান করা
৬. স্নেহ, মমতা, দয়া ৬. নির্দয় ও নিষ্ঠুরতা
৭. আমানত রক্ষা করা ৭. আমানতের খিয়ানত করা
৮. মানুষের উপকার করা ৮. মানুষের ক্ষতি করা
৯. মানবিকতা ৯. অমানবিকতা
১০. শালীনতা, শিষ্টতা ১০. অশালীনতা, অশিষ্টতা
১১. লজ্জাশীলতা ১১. নির্লজ্জতা
১২. ভালো ব্যবহার করা ১২. খারাপ ব্যবহার করা
১৩. নীতি ঠিক রাখা ১৩. নীতি বিসর্জন দেয়া
১৪. মানুষের কল্যাণ কামনা করা ১৪.
মানুষের মন্দ কামনা করা
১৫. পবিত্র জীবন যাপন ১৫. নোংরা ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়া
১৬. সৎ জীবন যাপন করা ১৬.
অসৎ জীবন যাপন করা
১৭. ন্যায়, বৈধ ও সৎ উপায়ে উপার্জন করা ১৭.
চুরি,
ডাকাতি ও ধোকা প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জন করা
১৮. ভদ্র আচরণ করা ১৮.
অভদ্র আচরণ করা
১৯. উদারতা ১৯. হিংসা-বিদ্বেষ
২০. কৃতজ্ঞতা ২০. অকৃতজ্ঞতা
২১. নিঃস্বার্থপরতা ২১.
স্বার্থপরতা
২২. সুশৃংখল জীবন যাপন ২২.
উশৃংখল জীবন যাপন
৫. উপার্জন
বেঁচে থাকা এবং সুন্দরভাবে জীবন যাপনের জন্যে
প্রত্যেক ব্যক্তিরই উপার্জন করতে হয়। তবে মুমিনদেরকে অবশ্যি হালাল উপার্জন করতে
হবে।
হালাল উপার্জন মানে- বৈধ ও ন্যায্য উপায়ে অর্থ
সম্পদ আয় করা।
একজন মুসলমানের জন্যে হালাল উপার্জন করা ফরয।
মুসলমানের জন্যে সুদের উপার্জন হারাম, ঘুষের উপার্জন হারাম। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদির মাধ্যমে উপার্জন করা হারাম। ঠকবাজি ও ধোকা
প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জন করা হারাম। জুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে উপার্জন করা
হারাম। পরের হক আত্মসাতের কামাই হারাম। এভাবে সকল প্রকার অন্যায়, অবৈধ ও যুলুমের উপার্জন হারাম। এমনকি সক্ষম লোকের জন্য
ভিক্ষাবৃত্তির উপার্জনও হারাম।
মুসলমানের জন্যে হালাল উপার্জনের পথ হলো:
১. বৈধ উপায়ে হালাল ব্যবসা করা।
২.শ্রমদানের মাধ্যমে উপার্জন করা।
৩.চাকুরি করার মাধ্যমে উপার্জন করা।
হারাম উপার্জনকারী দুনিয়ায় অসৎ এবং আখিরাতে
ক্ষতিগ্রস্ত। হালাল উপার্জনকারী দুুনিয়ায় সৎ মানুষ এবং আখিরাতে সফল ও সৌভাগ্যবান।
৬. খরচ
একজন মুসলিম যে অর্থ সম্পদ উপার্জন করেন, তা হালাল পথে খরচ করা অবশ্য কর্তব্য। হারাম পথে খরচ করলে সে
জন্যে পরকালে কঠিন শাস্তি হবে। হালাল পথের খরচ হলো :
১. নিজের প্রয়োজনে খরচ করা।
২. সন্তানের জন্যে খরচ করা।
৩. স্ত্রীর জন্যে খরচ করা।
৪. পিতামাতার জন্যে খরচ করা।
৫. আত্মীয় স্বজনের জন্যে খরচ করা।
৬. আল্লাহর পথে খরচ করা।
৭. গরীব দুঃখীর জন্যে খরচ করা এবং
৮. অন্যান্য বৈধ কাজে খরচ করা।
হালাল পথে উপার্জন করা এবং হালাল পথে খরচ করা
দুটোই নেকীর কাজ। আর খরচের ক্ষেত্রে নিষেধ হলো :
১. হারাম কাজে খরচ করা।
২. খরচের ক্ষেত্রে সীমালংঘন করা।
৩. অপচয় করা, অপব্যয় করা।
৪. কৃপণতা করা। প্রয়োজনে খরচ না করা।
৫. লোক দেখানোর জন্যে, কিংবা প্রশংসা পাওয়ার জন্যে দান করা।
হারাম পথে উপার্জন করা এবং হারাম পথে খরচ করা
দুটোই গুনাহের কাজ।
একটি হাদিসে প্রিয় রসূল সা. বলেন :
“কিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবার আগ পর্যন্ত মানব
সন্তানের পা এক কদমও নড়বে না। সেগুলো হলো :
১. সে নিজের জীবন কোন্ পথে পরিচালিত করেছে?
২ যৌবনের শক্তি সামর্থ কী কাজে লাগিয়েছে?
৩. অর্থ-সম্পদ কোন্ পথে উপার্জন করেছে?
৪. অর্থ-সম্পদ কোন্ পথে খরচ করেছে?
৫. যতোটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সে অনুযায়ী
কতোটুকু চলেছে? -সূত্র: তিরমিযি:
বর্ণনা-আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.।
ফলে সম্পদ উপার্জন এবং খরচ করার ক্ষেত্রে
প্রত্যেক মুমিনকেই সতর্ক হওয়া উচিত। প্রত্যেকেরই উপার্জন ও খরচের ক্ষেত্রে হালাল
পথ অবলম্বন এবং হারাম পথ ত্যাগ করা উচিত।
*
* *
|