|
পাতা 9 মোট 20
(৮)
ইসলামের কয়েকটি মৌলিক বিষয়
১. দীন ও শরীয়ত
এ যাবত আমরা ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করেছি।
ঈমান ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূলনীতিসমূহকে বলা হয় দীন। সকল নবীর দীন ছিলো একই।
দীনের বিধি বিধান, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের পন্থা, ইবাদত-বন্দেগির পদ্ধতি, পারিবারিক ও সামাজিক রীতিনীতি, রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন, পারস্পারিক
লেনদেন ও আদান প্রদানের নিয়ম-কানুন, হালাল হারামের সীমা ইত্যাদিকে বলা হয় শরীয়ত। যেমন :
আল্লাহকে জানা, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি ও হুকুম পালন করা হলো- দীন।
অন্যদিকে আল্লাহর হুকুম পালন ও ইবাদত বন্দেগি করার নিয়ম-কানুন, পন্থা-পদ্ধতি ও সীমারেখার নাম হলো- শরীয়ত।
দীন বলে : মানুষ হত্যা করা, ব্যভিচার করা, অপবাদ দেয়া, চুরি করা, ছিনতাই করা ইত্যাদি জঘন্য অপরাধ ও পাপের কাজ।
শরীয়ত বলে : সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার
করে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দাও, ব্যাভিচারীকে
একশত বেত্রাঘাত করো, অপবাদদানকারীকে
আশিটি বেত্রাঘাত করো, চোরের হাত কেটে
দাও,
ছিনতাইকারীর এক হাত এক পা কেটে দাও।
দীন বলে : এক আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি করো।
শরীয়ত বলে : দৈনিক পাঁচবার নামায পড়ো, পূর্বদিকে সাদা রেখা দেখা দেয়ার পর সূর্য উদয়ের পূর্ব
পর্যন্ত ফজর নামাযের ওয়াক্ত। ফজর নামায দুই রাকাত। নামায পড়ার নিয়ম এই এই। এই এই
কাজ দ্বারা নামায নষ্ট হয়ে যায়।
সকল নবীর দীন একই ছিলো। তবে তাঁদেরকে যে শরীয়ত
দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য
ছিলো।
২. দীন ও শরীয়তের উৎস
আল্লাহর দেয়া দীন ও শরীয়ত সম্পর্কে জানার উপায়
কী?
এর উৎস কী?
আল্লাহর দেয়া দীন ও শরীয়ত তথা ইসলাম সম্পর্কে
জানার উৎস ও উপায় হলো- আল্লাহর কিতাব আল কুরআন এবং মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা.-এর
সুন্নাহ। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে
গেলাম। এ দুটো আঁকড়ে ধরলে কখনো তোমরা বিপথগামী হবে না। একটি হলো আল্লাহর কিতাব (আল
কুরআন) আর অপরটি হলো আল্লাহর রসূলের সুন্নাহ।’ -মুসনাদে আহমদ। বিদায় হজ্জের ভাষণ।
৩. হালাল ও হারাম
আল্লাহ তায়ালা মানুষের স্রষ্টা, প্রভু ও প্রতিপালক। তিনি মানুষের কল্যাণ চান। কিসে মানুষের
কল্যাণ আর কিসে মানুষের অকল্যাণ, স্রষ্টা হিসেবে
তিনিই তা ভালো জানেন।
মানুষের কল্যাণার্থে তিনি মানুষের জন্যে কিছু
কাজ-কর্ম,
কিছু আচার-আচরণ কিছু আহার-বিহার হারাম করে দিয়েছেন।
হারাম মানে- অবৈধ ও নিষিদ্ধ। মহান স্রষ্টা
আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্যে হারাম করে দিয়েছেন:
তাঁর সাথে শিরক করা, তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকেও সাজদা করা, মানুষের কাছে প্রার্থনা করা, মুনাফেকী করা, মনগড়া বা
মানুষের তৈরি আইন কানুন অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা, মিথ্যা বলা, ওয়াদা খেলাপ করা, আমানতের খিয়ানত
করা,
মানুষের ক্ষতি করা, পিতা-মাতার সাথে খারাপ ব্যবহার করা, চুরি করা, ডাকাতি করা, প্রতারণা করা, গীবত করা, পরনিন্দা করা, ব্যভিচার করা, মানুষ হত্যা করা, কারো অধিকার
নষ্ট করা,
যুলম করা, সুদ খাওয়া, জুয়া খেলা, মদ খাওয়া, রক্তপান করা, মৃত প্রাণী ভক্ষণ করা, শুয়োরের গোস্ত
খাওয়া ইত্যাদি। আল্লাহ তায়ালা এগুলো এবং এ রকম আরো অনেক কিছু হারাম করে দিয়েছেন।
তাই শরীয়তে এগুলো নিষিদ্ধ।
কোনো একটি নিষিদ্ধ কাজ করাটা কবীরা গুণাহ এবং
ফাসেকী। তওবা না করলে ফাসিকদের জন্যে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্যে যেসব জিনিস হারাম
বা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন, সেগুলো সম্পর্কে
বিস্তারিত জানা যাবে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে। আল্লাহ পাক মানুষের জন্যে যে জিনিসগুলো
হারাম করে দিয়েছেন, সেগুলো ছাড়া
বাকি সবই হালাল। হালাম মানে- বৈধ ও করণীয়।
৪. জায়েয ও না-জায়েয
শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয মানে- বৈধ বা অনুমতি
আছে এমন কাজ। আর না-জায়েয মানে- অবৈধ বা অনমুতি নেই এমন কাজ।
৫. হারাম ও না-জায়েযের প্রকারভেদ
ইসলামি শরীয়া বিশেষজ্ঞগণ হারাম ও না-জায়েয
বিষয়সমূহকে গুরুত্বের দিক থেকে ভাগ করেছেন। তাঁরা কুরআন সুন্নাহ বিশ্লেষণ করে
হারাম ও না-জায়েয বিষয়গুলোকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হলো:
১. হারাম। ২. মাকরূহ।
ইসলামি শরীয়ার পরিভাষা অনুযায়ী কুরআন ও
সুন্নাহর ভিত্তিতে যেসব বিষয় অকাট্যভাবে নিষিদ্ধ বলে প্রমাণিত সেগুলোই হারাম।
যেমন:
মানুষ হত্যা, ব্যাভিচার, সুদ, মদ, জুয়া, আস্তানায় কুরবানী, ভাগ্য গণনা, শুয়োরের গোশত খাওয়া, মৃত প্রাণীর গোশত খাওয়া, রক্তপান করা ইত্যাদি।
আর যেসব জিনিস হারাম না হলেও হারামের কাছাকাছি, কিংবা যেগুলোতে হারামের স্পীরিট বিদ্যমান অথবা যেগুলোতে
হারামের কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, অথবা প্রমাণিত
হারামের সদৃশ, কিংবা অন্তত নিন্দনীয় বা অপছন্দীয়
বলে প্রমাণিত, সেগুলোই মাকরূহ।
৬. পালনীয় নির্দেশের প্রকারভেদ
কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে গুরুত্ব অনুযায়ী
শরীয়তের পালনীয় নির্দেশসমূহ দুই প্রকার। সেগুলো হলো :
১. ফরয ও ২. নফল।
ফরয: ফরয মানে- আল্লাহর অলংঘনীয় নির্দেশ, যা পালন করা অবশ্য কর্তব্য। শরীয়তের যেসব হুকুম-আহকাম পালন
করা অবশ্য কর্তব্য এবং কিছুতেই যেগুলো লংঘন করা যায় না, লংঘন করলে আল্লাহ তায়ালা কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন, সেগুলোই ফরয হুকুম। যেমন: দৈনিক পাঁচবার নামায পড়া, রমযান মাসে রোযা রাখা, সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, ওয়াদা পূরণ করা, পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করা, যাকাত দেয়া, হজ্জ করা, উত্তরাধিকার বন্টন করা, সঠিক মাপ ও ওজন দেয়া, মানুষকে আল্লাহর
পথে ডাকা,
ভালো কাজের আদেশ দেয়া, মন্দ কাজে বাধা দেয়া, নামাযের জন্যে
পবিত্র হওয়া, অযু করা, ইসলামের জ্ঞানার্জন করা, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে চেষ্টা সংগ্রাম করা, ন্যায় বিচার করা, প্রাপ্য অধিকার
প্রদান করা ইত্যাদি।
কোনো ফরয কাজ অমান্য করা ফাসেকী এবং কবীরা
গুনাহ।
নফল : ফকীহ্গণ গুরুত্ব অনুযায়ী নফল আহকাম
কয়েকভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হলো: ক. ওয়াজিব খ. সুন্নাত গ. মুস্তাহাব।
ওয়াজিব : ওয়াজিব মানে- করণীয় বা কর্তব্য।
ওয়াজিব হলো সেইসব কাজ যেগুলো ফরয নয়, তবে রসূল সা. সেগুলোর ব্যাপারে বিশেষভাবে তাকিদ করেছেন। যেমন: বিতর নামায পড়া, দুই ঈদের নামায পড়া, কুরবানী করা, মযলুমের সাহায্য
করা,
জামাতে নামায পড়া, সালামের জবাব দেয়া, সাদাকাতু ফিতর
আদায় করা,
দাওয়াত কবুল করা ইত্যাদি।
সুন্নত : সুন্নত হলো সেইসব কাজ, সেইসব আচার-আচরণ ও ইবাদত বন্দেগি যেগুলো পালন করাকে রসুল
সা. তাঁর নিয়মে পরিণত করেছিলেন এবং যেগুলো মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য
কল্যাণকর। যেমন: ফরয নামাযে আগে-পরে ১২ রাকাত নামায পড়া। দান-সাদকা করা। আশুরার
দিন রোযা রাখা। উমরা করা। সহজ সরল আচরণ করা। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা। মৃতের
দাফন-কাফন করা। রোগীর সেবা করা। মেহমানদারি করা। বিয়ে শাদী করা। মসজিদ নির্মাণ
করা। মানুষের সেবা ও উপকার করা। সুন্দর ও সুশৃংখল জীবন যাপন করা। দাড়ি রাখা। সালাম
দেয়া। হাসিমুখে কথা বলা। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। ভালো কাজ আল্লাহর নামে আরম্ভ করা।
বিপদে সাহায্য করা। অপরের কল্যাণ কামনা করা। দুঃখ -মুসিবতে আল্লাহর উপর ভরসা করা।
ধার কর্জ দেয়া ইত্যাদি।
মুস্তাহাব বা নফল : নফল ও মুস্তাহাব হলো সেইসব
আমল,
আচরণ ও ইবাদত বন্দেগি, রসূল সা. যেগুলোকে নিয়মে পরিণত করেননি। তবে কখনো কখনো করেছেন। নিয়মিত না করলেও
পছন্দ করেছেন। যেমন: সুযোগ পেলেই নামায পড়া, মাঝে মাঝে রোযা রাখা, দান করা, উমরা করা ইত্যাদি।
৭. গুনাহ বা পাপ
গুনাহ মানে- পাপ, গুনাহ মানে অপরাধ। শরীয়তের বিধান অমান্য করাই গুনাহ। গুনাহ
দুই প্রকার :
ক. কবিরা গুনাহ ও খ. সগিরা গুনাহ
কবিরা গুনাহ মানে- বড় পাপ। সগিরা গুনাহ মানে-
ছোট পাপ।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্যে যে কাজ হারাম করে
দিয়েছেন,
সে কাজ করা কবিরা গুনাহ।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্যে যে কাজ ফরয করে
দিয়েছেন,
সে কাজ না করা কবীরা গুনাহ।
এই হলো কয়েকটি কবীরা গুনাহ :
আল্লাহর সাথে শিকর করা। রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন
করা। পিতা-মাতার সাথে অসদ্ব্যবহার করা। যিনা ব্যভিচার করা। অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা
করা। সুদ খাওয়া। ওয়াদা অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। মদ খাওয়া। আমানতের খিয়ানত করা। ফরয নামায
না পড়া। যাকাত না দেয়া। রমযান মাসের রোযা না রাখা। যুলম করা। প্রতারণা করা। কারো
অধিকার হরণ করা। গীবত করা। আল্লাহর যে কোনো হুকুম অমান্য করা ইত্যাদি।
কবিরা গুনাহ করলে মানুষ যালিম ও ফাসিক হয়ে
যায়। তওবা না করলে কবিরা গুনাহ মাফ হয় না। তাই গুনাহ হয়ে যাবার সাথে সাথে তওবা করা
সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
৮. তওবা
‘তওবা’ আরবি শব্দ। তওবা
মানে- অনুতপ্ত হয়ে এবং অনুশোচনা করে সঠিক পথে ফিরে আসা।
কেউ যখন কোনো হারাম কাজ করে ফেলে, কিংবা কোনো ফরয কাজ লঙ্ঘন করে, তখন এতে তার কবীরা গুনাহ হয়ে যায়। এ থেকে মুক্তির উপায় হলো
তওবা করা।
হারাম কাজ করে ফেললে কিংবা ফরয লংঘন করে ফেললে
এর জন্যে :
ক. বিনয়ের সাথে অনুতপ্ত হওয়া ও অনুশোচনা করা।
খ. আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করা।
গ. পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
ঘ. কিছু নফল রোযা রেখে, কিংবা কিছু নফল নামায পড়ে, কিংবা কিছু দান করে গুনাহের কাফফারা আদায় করা।
ঙ. এমন কাজ আর কখনো না করার প্রতিজ্ঞা করা।
চ. কারো অধিকার হরণ করে থাকলে তা ফেরত দেয়া
এবং
এ ছয়টি কাজের মাধ্যমেই তওবা করতে হয়। যে
ব্যক্তি এ রকম খালিসভাবে তওবা করেন, আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা তাকে মাফ করে দেবেন। আল্লাহ বড়ই দয়ালু, ক্ষমাশীল এবং মেহেরবান।
*
* *
|