খোশ আমদেদ মাহে রমাদ্বান প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন খুররম মুরাদ   
Tuesday, 31 July 2012
খোশ আমদেদ
মাহে রমাদ্বান

WELCOME
THE MONTH OF RAMADAAN


মূলঃ খুররম মুরাদ

অনুবাদঃ শেখ জেবুল আমিন দুলাল

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আরেকবার আমাদের উপর রহমতের ছায়া বিস্তার করার জন্য রমাদ্বানের মোবারক মাস এগিয়ে আসছে। আল্লাহ্ তা‘আলার বরকত ও করুণাধারায় আমাদের জীবনগুলোকে সিক্ত করতে পবিত্র মাহে রমাদ্বান ফিরে আসছে পুনরায়। যেখানে স্বয়ং নবী করীম (সাঃ) এ মাসটিকে ‘শাহরুন আজীম’ এবং ‘শাহরুম মোবারাকাহ্’ নামে আখ্যায়িত করেছেন, সেই পবিত্র মাসের মহত্ব এবং বরকত সম্পর্কে আমাদের আর কি ই বা বলার থাকতেপারে? অর্থাৎ এ মাসটি হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মহান মাস, বরকতের মাস। আমাদের বিবরণ এ মাসের মহত্বকে ছুঁতেও পারবেনা, আমাদের ভাষা এর বরকত বর্ণনা করে শেষও করতে পারবেনা।

এই মাসটি কেন এতো মহান?
 মাসেরই আঁচলে এমন একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও মহামুল্যবান রাত্রি লুকায়িত আছে, হাজার মাসে যাকিছু দেয়া হয় সেই একটি রাতে তার চেয়েও বেশী বরকত ও কল্যাণের ভান্ডার লুটিয়ে দেয়া হয়ে থাকে। সেই মোবারক মাসেই আমাদের মহান প্রতিপালক আমাদের জন্য তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত আমাদের উপর নাযিল করেছেন।
এরশাদ হচ্ছেঃ إِنَّاأَنزَلْنَاهُفِيلَيْلَةٍمُّبَارَكَةٍإِنَّاكُنَّامُنذِرِينَ  অর্থাৎ ‘আমরা সুস্পষ্ট ঐ কিতাবকে বরকতের রাতে নাযিল করেছি’ (সূরা দোখানঃ৪৪:৩)। এই কিতাবটা হচ্ছে رَحْمَةًمِّنرَّبِّكَ‘তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে রহমত’ (সূরা দোখানঃ৪৪:৬)। প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে এমাসের প্রতিটি দিবস পবিত্র, প্রতিটি রাত বরকতপূর্ণ। এর প্রতিটি দিনে সুর্যোদয়ের সাথে সাথে অগণিত বান্দাহ্ প্রভূর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা এবং বৈধ আকাঙ্খা পরিত্যাগ করে স্বাক্ষ্য দেয় যে, শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলাই তাদের প্রভূ এবং একমাত্র তিনিই তাদের চাওয়া-পাওয়ার মূল লক্ষ্যবস্তু। জীবনের প্রকৃত ক্ষুধা ও পিপাসা হচ্ছে তাঁর আনুগত্য এবং ইবাদাত করা, একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি আর শিরা-উপশিরার প্রবাহ। আর যখন রাতের অন্ধকার নেমে আসে, তখন অসংখ্য বান্দাহ্ আল্লাহ্ তা‘আলার সামনে ক্কিয়াম, তাঁর সাথে কথা বলা এবং তাঁর যিকিরের স্বাদ ও বরকত সংগ্রহ করে করে ধন্য হতে থাকে, আর এভাবে তাদের অন্তরগুলো উজ্জল প্রদীপের ন্যায় রাতের আকাশে তারার মতো চমকাতে থাকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা‘আলা কথাটা এভাবে বলছেনঃ
اللَّـهُ نُورُ‌ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْ‌ضِ ۚ مَثَلُ نُورِ‌هِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّ‌يٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَ‌ةٍ مُّبَارَ‌كَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْ‌قِيَّةٍ وَلَا غَرْ‌بِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ‌ ۚ نُّورٌ‌ عَلَىٰ نُورٍ‌ ۗ يَهْدِي اللَّـهُ لِنُورِ‌هِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِ‌بُ اللَّـهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّـهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴿٣٥﴾ فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّـهُ أَن تُرْ‌فَعَ وَيُذْكَرَ‌ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ ﴿٣٦﴾رِ‌جَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَ‌ةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ‌ اللَّـهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ۙ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ﴿٣٧﴾
  অর্থাৎ ‘আল্লাহ্ আকাশমন্ডল ও যমীনের নুর, তাঁর নুর-এর দৃষ্টন্ত হচ্ছে এরূপ, যেমন একটি তাকের উপর প্রদীপ রাখা হয়েছে, প্রদীপ রয়েছে একটি ফানুসের মধ্যে। ফানুসের অবস্থা হচ্ছে মোতির মতো ঝকমক করা তারকা। আর সেই প্রদীপ যাইতুনের এমন এক বরকতপূর্ণ গাছের তেল দ্বারা উজ্জল করা হয়, তা পূর্বের ও নয়, পশ্চিমের ও নয়। যে তেল আপনা আপনিই উথলে পড়ে, আগুন যদি না ও লাগে। (এইভাবে) আলোর উপর আলো (বৃদ্ধি পাওয়ার সব উপাদান একত্রিত)। আল্লাহ্ তাঁর নুরের দিকে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। তিনি লোকদেরকে উদাহরণ দিয়ে কথা বুঝিয়ে থাকেন। তিনি সর্ব বিষয়ে ভালোভাবে ওয়াকিফহাল। (তাঁর নুরের দিকে হেদায়েতপ্রাপ্ত লোক) সে সব ঘরে পাওয়া যায় যেগুলোকে উচ্চ-উন্নত করার এবং যার মধ্যে আল্লাহকে স্মরণ করার তিনি অনুমতি দিয়েছেন। তাতে এ সব লোক সকাল-সন্ধ্যা তাঁর তসবীহ্ করে, যাদের ব্যবসা ও কেনা-বেচা আল্লাহর স্মরণ, সালাত কায়েম ও যাকাত আদায় করা থেকে গাফিল করে দেয়না, তারা সেই দিনকে ভয় করতে থাকে যেদিন দিল উল্টে যাওয়ার এবং চক্ষুদ্বয় পাথর হয়ে যাওয়ার অবস্থা দেখা দিবে। (সূরা আন্ নুরঃ ২৪৩৫-৩৭)।’
এই মাসের প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে এতো বেশী বরকত লুকায়িত আছে যে, এ মাসে করা নফল কাজগুলো ফরজ কাজের মর্যাদা পায়, আর ফরজ কাজগুলো সত্তর গুণ অধিক মর্যাদা পায় (বায়হাকীঃ সালমান ফারসী রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। ‘রমাদ্বানের মোবারক মাস এলে আকাশের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, সৎ পথে চলা সকলের জন্য সহজ এবং উম্মুক্ত হয়ে যায়, শয়তানকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়। অন্যায় ও অসৎ তৎপরতা বিস্তারের সুযোগ অপেক্ষাকৃত কমতে থাকে’ (বুখারী, মুসলিমঃ আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। ‘অতঃএব যে ব্যক্তি রমাদ্বানের সম্পূর্ণ রোযা রাখবে, তার সকল গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হবে। ‘লাইলাতুল ক্কদর’-এ যে ব্যক্তিগণ ক্কিয়াম করে রাত কাটিয়ে দিবে, তাদেরকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে শুধুমাত্র এই শর্তে যে, আল্লাহ্ তা‘আলার সকল বাণী আর ওয়াদাকে তারা সত্য মনে করবে, বান্দাহ্ হিসেবে নিজের সকল দায়িত্ব বিশ্বস্ততার সাথে পালন করবে এবং সর্বদা সতর্কতার সাথে আত্মসমালোচনার কথাও মনে রাখবে’ (মুসলিম: আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।

আপনার অংশ
এ মাস নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আত্মমর্যাদা ও বরকতের মাস। গতানুগতিকতার স্বাভাবিক প্রবাহে যারা এ মাসটিকে পেয়েছে, এর মর্যাদা ও বরকত তাদের জন্য নয়। বৃষ্টি নামলে বিভিন্ন নদী, পুকুর, ডোবা, নিজ নিজ প্রশস্ততা ও গভীরতা অনুযায়ী বৃষ্টির পানি ধারণ করে। ভূখন্ডের বিভিন্ন অংশ নিজের ঊর্বরতা অনুসারে ফসল উৎপাদন করে, অথচ বৃষ্টির পানি ভূখন্ডের সকল অংশে সমানভাবে বর্ষিত হয়। একটি বড় প্রশস্ত পুকুর যে পরিমান পানি ধারণ করতে পারবে, একটি ছোট কলসীতে সে পরিমান পানি ধারণ করানো সম্ভব নয়। এমনিভাবে যদি বিস্তীর্ণ মরুভূমি বা অনুর্বর জমিতে বৃষ্টির পানি পড়ে, তা তো শুধু প্রবাহিত হয়েই চলে যায়, ভূমি তা থেকে উপকৃত হতে পারেনা। কিন্তু ঊর্বর জমিতে বৃষ্টির পানি পড়লেই ফসল জীবন্ত হয়ে উঠে। ঠিক একই অবস্থা মানুষেরও। রমাদ্বানুল মোবারকের ঐ অফুরন্ত সম্পদ থেকে আপনি কি কিছু পেতে চান? ঊর্বর ভূমির মতো আপনার মনটাকে নরম করুন, নিজের অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করুন, নিজের যোগ্যতা ও ধারণ ক্ষমতা থাকলে বীজ অঙ্কুরিত হবে, সম্পূর্ণ বৃক্ষ হবে, আর বৃক্ষ সৎ কাজের পত্ররাজী, ফুল ও ফলে সুশোভিত হয়ে উঠবে। অতঃপর আপনারা সাফল্যের ফসল কেটে ঘরে উঠাবেন। কৃষকের মত আপনি শ্রম দেবেন, কাজ করবেন, প্রতিদানে জান্নাতের পুরষ্কারসমূহের ফসল আপনার জন্য প্রস্তুত হতে থাকবে। যত বেশী শ্রম দেবেন, তত বেশী ফসল পাবেন। পক্ষান্তরে যদি আপনাদের মন পাথরের মতো শক্ত হয় এবং আপনারা অসতর্ক কৃষকের মতো শুয়ে-বসে দিন কাটান, তাহলে রোযা, তারাওয়ী, ক্কিয়াম ও তিলাওয়াতের বিনিময়ে পাওয়া রহমত ও বরকতের সমস্ত পানি বয়ে চলে যাবে অথচ আপনার তহবিলে কিছুই আসবেনা।
প্রকৃত অর্থে আল্লাহর দেয়া সুযোগ ছাড়া সত্যিই কিছু পাওয়া যায়না, আর যারা চেষ্টা-সাধনা এবং পরিশ্রম করে, এই ‘আল্লাহর দেয়া সুযোগ’ শুধু তাদেরই হস্তগত হয়। দেখুন, এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেন? ‘আপনি তাঁর দিকে এক হাত অগ্রসর হলে আল্লাহ্ আপনার দিকে দু’হাত অগ্রসর হবেন। আপনি তাঁর দিকে হেঁটে অগ্রসর হলে আল্লাহ্ আপনার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হবেন’ (মুসলিম: আবু জর্দ রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। কিন্তু পিছন দিকে ফিরে, অসচেতন বা বেপরওয়াভাবে আপনি যদি দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে বলুন, কিভাবে আপনাকে আল্লাহ্ সুযোগ সৃষ্টি করে দিবেন?
পুরো রমাদ্বান মাস অতিক্রান্ত হয়ে যাবে, আর আপনার তহবিল শূন্যই থেকে যাবে, এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি কেউ সৃষ্টি করবেননা। কিছু করার জন্য ও নিজের ভাগের রহমত লুটে নেয়ার জন্য কোমর কষে নিন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই সতর্কবাণীটিকে ভালোভাবে স্মরণ রাখুন; ‘অনেক রোযাদার এমন আছে, যারা নিজেদের রোযা থেকে ক্ষুৎ-পিপাসার কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পায়না, অনেকে রাতের নামাজ আদায় করে থাকে, কিন্তু তাদের এ নামাজ রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনা’ (দারামীঃ আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদ্বানের আগমনের পূর্বে নিজের সাথীদেরকে উদ্দেশ্য করে এই মাসের মহত্ব ও বরকত সম্পর্কে আলোচনা করতেন এবং এই মাসের বরকতের ভান্ডার থেকে নিজেদের হিসসা (অংশ) পুরোপুরি সংগ্রহ করার জন্য ব্যাপক পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার তাগিদ করতেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে আজকে আমিও একই বিষয়বস্তুর উপর আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। অর্থাৎ, রমাদ্বান মাসের মহত্ব ও বরকতের গূঢ় রহস্য কি? এ মাস থেকে পরিপূর্ণ কল্যাণ লাভের জন্য কি পরিমাণ সতর্কতা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন, কোন্ কাজগুলোর প্রতি অগ্রাধিকার দিতে হবে, লক্ষ্যপানে পৌঁছানোর জন্য কোন্ পথে চলতে হবে এবং ভ্রান্ত পথ কোনটা তা চিহ্নিত করতে হবে।

বরকত ও মহত্বের রহস্য
সর্বপ্রথম এটা জানা দরকার যে, রমাদ্বান মাসের মহত্ব ও বরকতের রহস্য কোন্ জিনিসটির মধ্যে লুকায়িত আছে? কারণ না জেনে সেই ভান্ডার থেকে ইচ্ছেমত নিজের আঁচল ভরে নেয়া সম্ভব নয়। এই বরকত ও মহত্বের রহস্য শুধুমাত্র একটি জিনিসের মধ্যেই লুকায়িত আছে, আর তা হচ্ছেঃ এ মাসে পবিত্র কুরআন নাযিল করা হয়েছে, অথবা নাযিল করা শুরু হয়েছে, অথবা সম্পূর্ণ কুরআন মজিদ লৌহে মাহ্ফুজ থেকে নাযিল করে জিবরাঈল ‘আলাইহিস্ সালামের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে, অথবা এ মাসে পবিত্র কুরআন নাযিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আসলে এ মাসে মহান দয়াবান পরম করুণাময় প্রভূ তাঁর অসীম অনুগ্রহে মানবতাকে ধন্য করেছেন, মনুষ্য জাতিকে পথ-প্রদর্শনের সম্পূর্ণ সামগ্রী (Package) দান করেছেন। তাঁর অভূতপূর্ব এবং অপ্রতিদ্বন্ধি হেকমত মানুষের চিন্তা ও কর্মের সঠিক পথ আলোকিত করেছে। কোনটা সঠিক আর কোনটা ভ্রান্ত তা পরখ করার জন্য ভ্রান্তি-বক্রতা-বিকৃতি মুক্ত এক কষ্টি পাথর তিনি আমাদের দান করেছেন। এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে অর্থাৎ রমাদ্বান মাসের এক ভোরে, সূর্যোদয়ের পূর্বে, মহা প্রভূর মহান বাণীর প্রথম কিরণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরাত্মাকে আলোকোদ্ভাসিত করেছে। এর মানে হচ্ছে, রোযা রাখা হয় এবং কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, এজন্য রমাদ্বান মাসের শ্রেষ্ঠত্ব বৃদ্ধি পায়নি; বরং পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হবার তুলনাহীন ও মহান ঘটনার কারণে এ মাস মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান অর্জন করেছে, আর এ কারণেই রোযা রাখা ও অধিক হারে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য এ মাসটিকে নির্ধারিত করা হয়েছে। কুরআন নাযিলের এই মহান ঘটনার কারণেই এই রমাদ্বান মাসের দিনকে রোযা রাখা এবং রাতকে ক্কিয়াম ও তিলাওয়াতের জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা এই কথটি সূরা আল বাকারার ১৮৫ আয়াতে এভাবে এরশাদ করেছেনঃ
شَهْرُ‌ رَ‌مَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْ‌آنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْ‌قَانِ ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ‌ فَلْيَصُمْهُ ۖ [سورة البقرة: 185]
‘রমাদ্বান সেই মাস, যে মাসে মানব জাতির পথ প্রদর্শন এবং পথ প্রদর্শনের উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী কুরআন নাযিল করা হয়েছে, অতঃএব যে ব্যক্তি এ মাসের সাক্ষাৎ পেল, সে যেন অবশ্যই রোযা রাখে’ (সূরা আল বাকারাঃ ২:১৮৫)।

কুরআনের নে‘আমত
পবিত্র কুরআন মজিদ আল্লাহর দেয়া নে‘আমত সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তুলনাহীন নে‘আমত। তাঁর রহমত সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় রহমত। এর নাযিলের ঘটনা মানবতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ঘটনা। এটা হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলার অসীম সাগরে দুনিয়াতে প্রকাশপ্রাপ্ত সবচেয়ে বড় জলোচ্ছাস। এ কারণেই আল্লাহ্ তা‘আলা ঘোষণা করেছেনঃ تَنزِيلٌ مِّنَ الرَّ‌حْمَـٰنِ الرَّ‌حِيمِ ‘এটা নাযিল করা হয়েছে পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু সত্ত্বার পক্ষ থেকে’ (সূরা হাম মীম সাজদাহ্ঃ ৪১:২)। অন্যত্র আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেনঃ رَ‌حْمَةً مِّن رَّ‌بِّكَ ‘তোমার প্রভূর পক্ষ থেকে রহমত’ (সূরা কাসাসঃ ২৮:৮৬)। অপর এক স্থানে তিনি বলেছেনঃ ﴿﴾ الرَّ‌حْمَـٰنُ ﴿﴾ عَلَّمَ الْقُرْ‌آنَ ‘অসীম দয়াবান আল্লাহ্ কুরআন শিখিয়েছেন’ (সূরা রাহমানঃ ৫৫:১-২)। মানুষের জন্য ন্যায় ও ইনসাফের কোন পাল্লা যদি থেকে থাকে, তাহলে একমাত্র সেটাই আছে।
এমনিতেই তো আমাদের উপর আল্লাহ্ তা‘আলার অসংখ্য নে‘আমত রয়েছে। প্রতি মুহূর্তে সেই নে‘আমত থেকে আমরা দু’হাতে লুটে-পুটে নিচ্ছি, কিন্তু এই পৃথিবী এবং পৃথিবীর প্রতিটি নে‘আমত শুধু ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের জন্য নির্ধারিত, যতক্ষণ পর্যন্ত শ্বাস-প্রশ্বাস আসা যাওয়া করে। শেষ নিঃশ্বাস বের হয়ে যাবার সাথে সাথে জীবনের সকল স্পন্দন শেষ, দুনিয়ার সকল নে‘আমতও আমাদের জন্য শেষ। যে জিনিসটি স্পন্দনহীন জীবনকে সীমাহীন স্পন্দিত জীবনে রূপান্তরিত করবে, এই অশান্ত জীবনের দিনগুলোকে শান্তিময় করে তুলবে, সেই শেষ হয়ে যাওয়া নে‘আমত সমূহকে চিরস্থায়ী নে‘আমতে রূপান্তরিত করবে, তা হচ্ছে এই পবিত্র আল্ কুরআন। এটা দুনিয়ার সকল ভান্ডারের চেয়ে মূল্যবান ভান্ডার। এ কারণেই কুরআন অবতরণের রাতকে মোবারক রাত্রি এবং ‘লাইলাতুল ক্কাদর’ বলা হয়েছে। এ ছাড়া পবিত্র কুরআনে যেখানে যেখানে এর নাযিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে ঘটনাকে আল্লাহ্ তা‘আলা নিজের রহমত, পুণঃ পুণঃ বিতরনকৃত রহমত, নিজের সীমাহীন হেকমত এবং নিজের অসীম শক্তির সাথে সংযুক্ত করেছেন। আরো আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে রমাদ্বানের শেষে ঈদ উৎসব পালনের আহবান জানানো হয়েছে, কেননা এ মাসকে কুরআন নাযিলের বর্ষপূর্তির মাস বলা হয়।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّ‌بِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِّمَا فِي الصُّدُورِ‌ وَهُدًى وَرَ‌حْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ ﴿﴾ قُلْ بِفَضْلِ اللَّـهِ وَبِرَ‌حْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَ‌حُوا هُوَ خَيْرٌ‌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ ﴿﴾ [سورة يونس: 57-58]
‘হে মানব জাতি! তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভূর পক্ষ থেকে পথ-প্রদর্শন এসে গেছে, এটা সেই জিনিস যা অন্তরের অসুস্থ্যতা নিরাময় করে, এটা মুমিনদের জন্য পথ-প্রদর্শক এবং রহমত হিসেবে কাজ করবে। হে নবী! আপনি বলে দিন যে, আল্লাহ্ অত্যন্ত করুণা ও মেহেরবানী করে এই মুল্যবান জিনিসটি পাঠিয়েছেন, এ কারণেই লোকদের উৎসব করা উচিৎ। মানুষ যা কিছু সংগ্রহ করার কাজে ব্যস্ত, সে সব কিছুর চেয়ে এটা শ্রেষ্ঠ’ (সূরা ইউনুসঃ ১০:৫৭-৫৮)।
আল্লাহর সৃষ্ট সকল মাস-দিবস সমান, এগুলোর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, কিন্তু কিছু কিছু সময় এমন আছে যার সাথে সমগ্র মানবতা এবং সমগ্র সৃষ্টি জগতের ভবিষ্যৎ জড়িত হয়ে আছে। কুরআন নাযিলের মুহূর্ত এমনি এক মুহূর্ত যখন মহান প্রভূর পক্ষ থেকে দান করা হেদায়েতের সর্বশেষ আলোর কিরণ হেরা পর্বতের গুহায় প্রবেশ করেছে, আর এর ধারক ও বাহক হলেন মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এই মহান মুহূর্তটি পবিত্র রমাদ্বান মাসের মধ্যে রয়েছে, আর এটাই হচ্ছে রমাদ্বান মাসের মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের গুঢ় রহস্য। কুরআন নাযিলের বর্ষপূর্তির এ মাসে প্রতি দিন রোযা রাখতে এবং প্রতি রাতে কয়েক ঘন্টা দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে কেন জোর দেয়া হলো? যদি আপনারা কুরআন মজিদের অন্তর্নিহিত নে‘আমতের মর্ম বুঝতে পারেন এবং যদি একটু মনযোগ সহকারে ভেবে দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে, কুরআন মজিদের ধারক ও বাহক হলে কি কি দায়িত্ব বর্তায়!

কুরআনের মহান আমানত ও এর মিশন
নে‘আমত যত বেশী মূল্যবান, তার হক্ক আদায় করার দায়িত্ব ততই ভারী। আল্লাহর কিতাব ও তাঁর বাণী সবচেয়ে বড় রহমত ও বরকতের জিনিস। এ কারণেই কুরআন মজিদ নিজের আঁচলে দায়িত্বের একটা আস্ত পৃথিবী বহন করে নিয়ে এসেছে। যেহেতু এই কিতাব জীবনের আসল উদ্যেশ্য, জীবনের সাফল্য লাভ ও লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সঠিক পথ প্রদর্শন করে, সেহেতু এর বাহকের প্রতিও সেসব দায়িত্বই বর্তায়। এ কিতাব মানুষের সকল গোপন-প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ব্যাধির ব্যবস্থাপত্র। এ কিতাব গভীর অন্ধকারে হাবুডুবু খাওয়া লোকদের জন্য আলোর মশাল। এদিক থেকে দেখলে বুঝতে পারবেন যে, আল্লাহর দেয়া হেদায়েতের এই মহা মূল্যবান উপহার সাথে করে দু’টি অনেক বড় দায়িত্ব নিয়ে এসেছে।
এক) বাহক নিজে এর প্রদর্শিত পথে চলবে, এর ব্যবস্থাপত্রকে নিজের ব্যাধির চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করবে। নিজের মন, চিন্তা, কর্ম, চরিত্র ও তৎপরতাকে এর ছাঁচে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টায় লেগে যাবে।
দুই) যে হেদায়েত শুধুমাত্র নিজের ব্যক্তি জীবনের জন্য নয়; বরং هُدًى لِّلنَّاسِ সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়েত, এই হেদায়েতকে সকল মানুষের নিকট পৌঁছানো, তাদের সামনে এই হেদায়েতকে উম্মুক্ত করা, এর প্রদর্শিত পথে চলার জন্য আহ্বান করা, অন্ধকার পথসমূহকে আলোকিত করা এবং রোগীদের হাতে ঔষধ পৌঁছে দেয়া।
এবার একটু ভাবুন! দ্বিতীয় দায়িত্বসমূহ প্রথমোক্ত দায়িত্বসমূহেরই অনিবার্য দাবী। আর দ্বিতীয় দফার কাজগুলো ছাড়া প্রথম দফার কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে সমাধা হবেনা। একদিকে একথা জানতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে, পবিত্র কুরআন মজিদ هُدًى لِّلنَّاسِ সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়েত, তার দাবী হচ্ছে তাকে অপরের নিকট পৌঁছাতে হবে। বিভ্রান্ত পথিকদেরকে পথ দেখানোর দায়িত্ব হচ্ছে সঠিক পথের অনুসারীদের। ঠিক এমনিভাবে যাদের নিকট ঔষুধ আছে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে রোগীদের হাতে ঔষুধ পৌঁছে দেয়া।
অপরদিকের অবস্থা হচ্ছে; যতক্ষণ পর্যন্ত একজন লোক অপরকে কুরআনের পথে চালানোর জন্য চেষ্টা-সাধনা ও পরিশ্রম না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের সঠিকভাবে কুরআনের পথে চলা অপূর্ণাঙ্গ এবং অসমাপ্ত থেকে যাবে। অতঃএব অপরকে দ্বীনের দাওয়াত না দিলে স্বয়ং নিজের মনজিলে মকসুদে পৌঁছাটাও ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। কেননা দাওয়াত ও জিহাদ কুরআনী কর্মসূচীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণে আপনাদের জীবন অন্য মানুষের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত ও সংযুক্ত হয়ে রয়েছে, অন্যেরা এ পথে না চললে আপনাদের একা চলা কঠিন হয়ে পড়বে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে চলা কঠিনতর হবে।
দেখুন! নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর প্রথমে যে অহী নাযিল হয় তাতে اقْرَأْ‘ইক্করা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, অর্থাৎ পাঠ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পড়ার মধ্যে অন্যকে শুনানোর কাজটা নিহীত রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীবারের অহীর মধ্যে একথা একেবারে পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে। একটি সংক্ষিপ্ত বিরতির পর এরশাদ হলো, قُمْ فَأَنذِرْ‌ ﴿﴾ وَرَ‌بَّكَ فَكَبِّرْ‌ ﴿﴾ ‘উঠে দাঁড়াও এবং সতর্ক করে দাও এবং (সমগ্র মানব জাতির সামনে) তোমার প্রভূর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব ঘোষণা কর এবং তাদের উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব প্রতিষ্ঠা কর।’ (সূরা মুদ্দাসি্সরঃ ৭৪:২-৩) তিনিই সর্বাপেক্ষা মহান, এছাড়া সকল মহত্ব তাঁরই সম্মুখে অবনত হবে। এমনকি পৃথিবীতে কেউ আল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হয়ে রাজত্ব করতে পারবেনা, কেউ নিজেকে, নিজের মতামতকে অপরাপর মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে পারবেনা, মানুষের মাথা শুধুমাত্র নিজের মালিক ও শ্রষ্ঠার সম্মুখেই অবনত হবে, অন্য কারোর সামনে নয়।
একটু দৃষ্টি দিন! মুসলিম উম্মতের সৃষ্টি শুধু একারণেই হয়েছে। নতুবা এটা কোন গোপন কথা নয় যে, যে যুগে কুরআন নাযিল শুরু হয়েছে সে সময় আল্লাহর এমন এমন বান্দাহ্ পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন যাঁরা একত্ববাদে বিশ্বাস করতেন, রিসালাতের ধারাবাহিকতা এবং কিতাবের উপর ঈমান রাখতেন, ইবাদাতের স্থানসমূহে রাতভর দাঁড়িয়ে আল্লাহ্ তা‘আলার ইবাদাত করতেন এবং দিনভর রোযা রাখতেন, আল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্ক এবং তাদের সুন্দর চরিত্রের বর্ণনা স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা নিজেই পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। এরপরও একটি নতুন রিসালাত, একটি নতুন উম্মত কেন প্রয়োজন হলো? এর একটা প্রয়োজন এই ছিল যে, ঈমান ও আমলের সকল পথ মানুষের সৃষ্ট সমস্ত বিভ্রান্তি থেকে পবিত্র হয়ে সুস্পষ্টভাবে আলোকিত হয়ে থাকে।
কিন্তু এর অপর প্রয়োজনটি ছিল, এমন একটি উম্মাত জন্মলাভ করুক, যারা মানুষের নিকট নিজের প্রভূ এবং তাঁর দ্বীনের সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়াবে, যাতে করে মানুষ ন্যায়-ইনসাফের ভূমির উপর নিজেকে স্থাপিত করতে পারে।
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ [سورة البقرة: 143]
‘এবং এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে করে তোমরা মানুষের সামনে সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়াতে পার’ (সূরা আল বাকারাঃ ২:১৪৩)। এটা কুরআনের মিশন, এটা সেই মিশন যা কুরআন পাওয়ার এবং সেই আমানতের বাহক হবার ফলশ্রুতিতে আমার, আপনার এবং কুরআনের উপর ঈমানের দাবীদার সমগ্র উম্মতের মিশন হিসেবে স্বীকৃত। এ দায়িত্ব কত বড় এবং কত ভারী, তার চিত্র তুলে ধরাও অত্যন্ত কঠিন কাজ।
প্রকৃতপক্ষে সমগ্র মানবতাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এক সীমাহীন মহান কাজ। এই অনুভুতির কারণেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মহান দাওয়াতের প্রথম বাণী প্রাপ্ত হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় হেরা গুহা থেকে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে পৌঁছান। স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের এই আমানেতকে ‘অত্যান্ত ভারী বক্তব্য’ বা قَوْلًا ثَقِيلًا বলেছেন এবং ‘কোমর ভাঙ্গা বোঝা’ আখ্যায়িত করেছেন। এটা কোন সহজ কাজ নয়, আবার এমন কঠিনও নয় যা বহন করা অসম্ভব। যদি তাই হতো পরম দয়ালু, করুণাময়, ন্যায় বিচারক, মহা জ্ঞানী আল্লাহ্ তা‘আলা এ বোঝা মানুষের উপর চাপিয়ে দিতেন না।
অতঃএব, এ বোঝা বহন করার জন্য আমার-আপনার মধ্যে এমন একজন মানুষ তৈরী করতে হবে, যে মানুষটি শুধুমাত্র আল্লাহর গোলাম হবে এবং আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবেনা। এ নতুন মানুষটি তৈরী করার জন্য এবং নিজের চতুর্দিকে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টির জন্য, যেখানে শুধুমাত্র আল্লাহরই হুকুম চলবে, মাথা নত হবে শুধুমাত্র তাঁরই সামনে, এসবের জন্য কুরআনের উপর ঈমান রাখতে হবে, কুরআনের জ্ঞান অর্জন করতে হবে, ছবর ও দৃঢ়তা সৃষ্টি করতে হবে, একই সাথে নিয়মিত আন্দোলন এবং কুরবানীও করতে হবে। কুরআনের মিশন অনেক উন্নতমানের চরিত্র দাবী করে। এই মিশন আশা করে যে, মানুষ কুরআনের পতাকা উত্তোলনের সাথে সাথে নিজের চিন্তা এবং কর্মতৎপরতাকেও উন্নত করবে, এর জন্য শক্তি ও যোগ্যতা উভয়েরই প্রয়োজন।

কোরআনঃ তাক্কওয়াঃ রোযা
এই শক্তি, যোগ্যতা এবং উন্নত চরিত্রের মানদন্ড হচ্ছে তাক্কওয়া, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর কিতাবের প্রথমেই ঘোষণা করে দিয়েছেনঃ
هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ অর্থাৎ ‘তাক্কওয়া অর্জনকারীদের জন্য পথ-প্রদর্শন’ (সূরা বাকারাঃ২:২)। এর মানে হচ্ছে; যারা তাক্কওয়া অর্জন করতে পারবে, এই কিতাব থেকে কেবলমাত্র তারাই হেদায়েত বা সঠিক পথে চলার নির্দেশনা পাবে। অপরদিকে রোযা রাখার উদ্দেশ্য বা রোযা রাখার ফল সম্পর্কে বলা হয়েছে لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ অর্থাৎ ‘যাতে করে তোমাদের মধ্যে তাক্কওয়া সৃষ্টি হতে পারে’ (সূরা বাকারাঃ ২:১৮৩)। এ দু’টি আয়াতকে মিলিয়ে পড়ুন এবং এ ব্যাপারে গভীর মনযোগ দিন, সাথে সাথে আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে, রোযার সাথে পবিত্র কুরআনের এতো সম্পর্ক কেন? আর এও বুঝতে পারবেন যে, কুরআন নাযিলের বর্ষপূর্তির মাসকে রোযা রাখার জন্য কেন সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে? রোযা রাখার মাধ্যমে তাক্কওয়ার সে গুণ সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে যার ফলে কুরআনের নির্দেশিত পথে চলা সহজ হয়ে যায় এবং কুরআনের আমানতের বোঝা বহন করা সম্ভব হয়। এ কাজের জন্য এই মাসের বরকতপূর্ণ সময়ের চেয়ে আর কোন্ সময়টি অধিক উপযুক্ত হতে পারে?

তাক্কওয়া কি?
তাক্কওয়া অত্যান্ত উঁচু দরের এবং অনেক মুল্যবান একটি গুণ, পক্ষান্তরে সকল কাঙ্খিত গুণাবলীর সমষ্টিও বটে। যার মধ্যে তাক্কওয়ার গুণ রয়েছে, কুরআন মজিদের বর্ণনায় আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত কল্যাণের আমানত দান করেছেন। তাক্কওয়া এমন একটি জিনিস, যার মাধ্যমে সকল সমস্যা মোকাবিলা করার পথ পাওয়া যায়। তাক্কওয়ার মাধ্যমে রিযিকের দরজা এমনভাবে উম্মুক্ত হয় যা কল্পনাও করা যায়না। তাক্কওয়ার কারণে দ্বীন ও দুনিয়ার সকল কাজ সহজ হয়ে যায়। আল্লাহ্ তা‘আলা অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেন এবং মহান পুরষ্কার দান করেন। মুত্তাকীদের জন্য এমন জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, যার প্রশস্ততার মধ্যে সমস্ত পৃথিবী ঢুকে যাবে। জান্নাত তাদের উত্তরাধিকার, দুনিয়ায় আসমান ও জমিনের সকল বরকতের দুয়ার খুলে দেয়ার ওয়াদা তাদের সাথে করা হয়েছে, যারা ঈমান ও তাক্কওয়ার গুণে গুণান্বিত।
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَ‌ىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَ‌كَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْ‌ضِ [سورة الأعراف: 96]
‘লোকালয়ের অধিবাসীরা যদি ঈমান ও তাক্কওয়া অবলম্বন করে, তাহলে আমরা তাদের জন্য আসমান ও জমিনের সকল বরকতের দুয়ার খুলে দেব’ (সূরা আরাফঃ ৭:৯৬)।
তাক্কওয়া কি? গুছিয়ে যদি বলা যায় তাহলে বলতে হয়, অন্তর ও রুহ্, জ্ঞান ও সচেতনতা, আগ্রহ ও ইচ্ছা, সংগঠন ও ব্যাবস্থাপনা, আমল ও কর্মতৎপরতার সেই শক্তি এবং যোগ্যতার নাম, যার প্রভাব বলে আমরা সে কাজ থেকে বিরত হয়ে যাই যাকে আমরা ভুল মনে করি ও ভুল সাব্যস্ত করি এবং নিজের জন্য ক্ষতিকর মনে করি। পক্ষান্তরে আমরা সে কাজের উপর দৃঢ় হয়ে যাই যাকে আমরা সঠিক মনে করি ও সঠিক সাব্যস্ত করি। তাক্ক্ওয়ার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘নিরাপদে থাকা’, আমি আপনাদের সামনে যা আলোচনা করলাম তাতে উল্লেখিত অর্থসমূহের মধ্যে ‘তাক্ক্ওয়া’ শব্দটির একেবারে মৌলিক ও প্রাথমিক অর্থ প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।
কোন কোন ধরনের ক্ষতি বা আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার শক্তি আমাদের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবেই আছে। লাভের প্রতি লোভ মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম, লাভের পথে চলতে থাকার আগ্রহ না থাকলে মানুষের বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ না হলে মানুষের উন্নতিও সম্ভব নয়।
জ্বলন্ত আগুনে আমরা হাত দেইনা, বরঞ্চ আমাদের হাত জ্বলন্ত আগুনের কাছ থেকে দ্রুত ফেরৎ চলে আসে। আমাদের শিশু অজ্ঞতাবশতঃ আগুনের কাছে গেলেই তাকে উদ্ধার করে জড়িয়ে ধরার জন্য আমরা অস্থির হয়ে পড়ি, কিন্তু কেন? কেননা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, আগুনে আমাদের হাত পুড়ে যাবে, আগুনের নিকটবর্তী হলে আমাদের শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। এটা পার্থিব আগুন সম্পর্কে আমাদের তাক্ক্ওয়া, এই আগুনের ক্ষতি সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, এটা আমাদের চোখের সামনেরই ঘটনা।
এ ছাড়া আরেক প্রকারের আগুন রয়েছে, সেই আগুন ঈমান, আমল, চিন্তা ও চরিত্রের বিপর্যয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। কুফুরী, একগুঁয়েমী, যুলুম, মিথ্যা, হারাম মাল, হক্ক অস্বীকার করা, এই সব কিছুই আগুন। সেই আগুনে ঝাঁপ দেয়া এবং নিজেকে জ্বালিয়ে দেয়া কি সম্ভব? কোন্ পথে চললে এই পার্থিব আগুন এবং পরকালের আগুন থেকে বাঁচা যাবে, সে কথাই কুরআন মজিদে বলা হয়েছে, কুরআন সতর্ক করছেঃ ঐ পথগুলোর কাছেও যেওনা, ঐ আগুন থেকে আত্মরক্ষা কর। হক্ককে অস্বীকার, একগুঁয়েমী, যুলুম, মিথ্যা, হারাম সম্পদ; এ সবই আগুন।
এই আগুন আমরা চোখে দেখতে পারিনা, এ ব্যাপারে আমাদের বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা নেই। এই আগুনে হাত দিয়ে আমরা পুড়ে যাওয়ার কষ্ট সাথে সাথেই উপলব্ধি করতে পারিনা। পার্থিব আগুন আমরা দেখতে পাই বলে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টাও করি, এর মধ্যে পুড়ে গেলে সাথে সাথেই এবং এক্ষুণি জ্বালা অনুভব করি, এর ক্ষতি সম্পর্কে পুরোপুরি দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।
যদি ঠিক এমনিভাবে এ কথার উপর আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যায় যে, মিথ্যা বলার কারণে জিহ্বা অবশ্যই আগুনে পুড়বে, হারাম মাল খেলে পেট অবশ্যই আগুনের অঙ্গারে পূর্ণ হতে থাকবে, অথবা কুফরী ও একগুঁয়েমির পথে চললে আগুনের বিছানা এবং আগুনের খাওয়া-দাওয়া তৈরী হতে থাকবে, তাহলে অবশ্যই আমাদের দেহ-মন-জীবনে সেই শক্তি, যোগ্যতা সৃষ্টি হবে যা আমাদেরকে উল্লেখিত কাজগুলো থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হবে। এটা আল্লাহ্ এবং তাঁর আগুন সম্পর্কে তাক্ক্ওয়া, এই তাক্ক্ওয়ার প্রথম দিকটি হচ্ছেالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ  ‘অদৃশ্যে বিশ্বাস’ (সূরা বাকারাঃ ২:৩)। পবিত্র কুরআন মজিদ থেকে হেদায়েত পাওয়ার জন্য যোগ্য মুত্তাক্কীগণ গায়েবের প্রতি অর্থাৎ অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস রাখে।
আজকের ঈমানের ত্রুটি এবং খারাপ কাজ আগামী কালের আগুন, যদিও আজকে আমরা তা দেখতে পাইনা, এই অদৃশ্য কথার উপর দৃঢ় বিশ্বাসই তাক্ক্ওয়া সৃষ্টি করে। এই দৃঢ় বিশ্বাস সেই শক্তির জন্ম দেয়, কুরআনের পথে চলার জন্য যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী, এর মাধ্যমে চলার পথের সবচেয়ে দরকারী সম্বল ‘তাক্ক্ওয়া’ সংগৃহীত হয়। তাক্ক্ওয়ার উল্লেখিত হাকীকত সামনে রেখে একটু চিন্তা করুন, আপনারা সাথে সাথেই বুঝতে পারবেন যে তাক্ক্ওয়ার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন চারিত্রিক সৌন্দর্য্য, কাজের মধ্যে ভুল-শুদ্ধ, হক্ক-বাতিলের স্থায়ী বিধান ও মানদন্ড নির্ণয় করা এবং পাশাপাশি এর অনুসরণ করা। যারা বলে আক্কিদা ও চরিত্রের মধ্যে ভুল-শুদ্ধের কোন সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব, বিধান বা মানদন্ড নেই, এগুলো অপ্রয়োজনীয় বিষয়, এটাতো যুগ ও অবস্থার প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত হয়, অথবা ব্যক্তি ঈমানদার হোক বা বেঈমান হোক এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, তাদের জন্য তাক্ক্ওয়ার প্রশ্নই উত্থাপিত হতে পারেনা।
আমরা আল্লাহ্ তা‘আলাকে আমাদের প্রভূ হিসেবে স্বীকার করি, এর অর্থ হচ্ছে ন্যায় ও সঠিক শুধু সেটাই যার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়, যা কিছু করার জ্ঞান তিনি দিয়েছেন, যা কিছু তাঁর নির্দেশ, নিরবচ্ছিন্নভাবে সে সব কিছুই করে যেতে হবে। আল্লাহ্ তা‘আলার অসস্তুষ্টি সৃষ্টি করে এমন প্রতিটি জিনিস, তাঁর গজবে ইন্দন যোগায় এমন প্রতিটি কাজ, যে কাজ করলে তাঁর আদেশ লঙ্ঘিত হয়, সে সব কিছুই ভুল এবং পরিত্যায্য, সেটা ক্ষতিকর এবং লোকসানের পথ, এ সব থেকে আত্মরক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। আল্লাহ্ তা‘আলাকে প্রভূ হিসেবে স্বীকার করার অর্থ এও হয়ে যায় যে, প্রকৃতিতে কিছু বস্তু এমনও আছে যা বাস্তবের চৌহদ্দীর বাইরে। যার দেহ বা জীবন নেই, যা ক্ষুধা ও পিপাসা থেকে মুক্ত, যা উপস্থিত কামনা পুরনের স্বাদের চেয়েও অধিক মূল্যবান।
ভুল ও শুদ্ধের জ্ঞান শুধু তিনিই দিতে পারেন এবং ঐ বাস্তবতার জ্ঞানও শুধু তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া যেতে পারে, যাঁর নিকট দৃশ্য-অদৃশ্য উভয় জ্ঞানই রয়েছে এবং যাঁর ইচ্ছাই শুদ্ধ-অশুদ্ধের কষ্টিপাথর। মুত্তাক্কী তারা হতে পারেন যারা এই অদৃশ্য নির্দেশাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেন, এই কথাগুলো মেনে নেন, তাদের জন্য একটিই পথ আছে, অর্থাৎ তারা নিজেদের তন-মন-ধন সব কিছু পরিপূর্ণভাবে নিজেদের প্রভূর নিকট সমর্পন করবেন। তাদের উঠা-বসা, চলা-ফেরা, বলা-শোয়া, সব কিছু আল্লাহর বান্দেগীর জন্য ওয়াকফ্ হয়ে যায়। যা কিছু তিনি দিয়েছেন; সেটা সম্পদ হোক বা সময়, বস্তু হোক বা আত্মিক কিছু, তাঁরই পথে লাগিয়ে দিবে এবং তাঁর প্রয়োজনেই খরচ করে দিবে, পুরো জীবনটাই এই চিন্তায় অতিবহিত করবে যে, আগামী কাল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হবে, আর সে সময়ের সাফল্যই আসল সাফল্য।
এটাই তাক্ক্ওয়ার সেই সূত্র যা আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআন মজিদের শুরুতেই সূরা বাকারায় বলে দিয়েছেন। সূত্রটি হচ্ছেঃ
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَ‌زَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ﴿﴾ وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَ‌ةِ هُمْ يُوقِنُونَ ﴿﴾
‘অদৃশ্যে বিশ্বাস, নামাজের মাধ্যমে দেহ-মনের ইবাদাত, তাঁর দেয়া সম্পদ থেকে তাঁরই পথে ব্যয় করা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যের জন্য ওহীকে কষ্টিপাথর হিসেবে বিশ্বাস করা এবং আখেরাতের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা’ (সূরা বাকারাঃ ২:৩-৪)।
যারা আল্লাহ্ তা‘আলাকে নিজেদের প্রভূ বলে স্বীকার করে, অথচ নিজেদের দেহ-মনের শক্তিকে, নিজেদের সময় ও সম্পদকে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজে লাগায় এবং যে কাজে আল্লাহর অসন্তুষ্টির আগুন জ্বলে উঠে সে কাজ থেকে বিরত হয়না, তারা ‘তাক্ক্ওয়া’ থেকে বঞ্চিত। ‘তাক্ক্ওয়া’ শুধু প্রকাশ্য কাজের অনুসরনের নাম নয়, এটা মনের গভীরে রক্ষিত শক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাসের নাম। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন নিজের পবিত্র ক্কলবের দিকে তিন তিনবার ইঙ্গিত করে বললেন, ‘তাক্ক্ওয়া তো এখানে থাকে’ (মুসলিম: আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।

তাক্ক্ওয়া ও রোযা
তাক্ক্ওয়ার উল্লেখিত তাৎপর্য মনে রাখলে এ কথা বুঝা কঠিন হবেনা যে, তাক্কওয়া সৃষ্টি করার জন্য রোযা, ক্কিয়ামুল লাইল এবং কুরআন মাজিদের তিলাওয়াতের চেয়ে অধিক কার্যকর কর্মসূচী তৈরী করা অসম্ভব, আর এই কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য পবিত্র রমাদ্বান মাসই সবচেয়ে মোক্ষম সময়। দিনে রোযা রাখা এবং রাতে দাঁড়িয়ে কুরআনের তিলাওয়াত শোনা, উভয় কাজকে রমাদ্বান মাসে একত্রিত করে আল্লাহ্ তা‘আলা প্রকৃতপক্ষে এই তাক্কওয়া অর্জনের পথ আমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন।
আমরা রোযা রাখলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় দিনের বেলা ক্ষুধা-পিপাসাসহ শরীরের অপরাপর বৈধ চাহিদা থেকে বিরত থাকি। তাঁর কাছ থেকে বিনিময় ও পুরষ্কার পাবার জন্য নিজেদের বৈধ চাহিদাগুলোকে কুরবান করে দেই, রাত এলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর কালাম শ্রবণ করি,আর সারা মাসে কমপক্ষে একবার পুরো কিতাবের তিলাওয়াত শুনে নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ভাষা না জানার কারণে এবং পরিশ্রম না করার কারণে আমাদের পাল্লায় কিছুই পড়েনা, কেননা আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে কি বললেন আর আমরা কি শুনলাম, কিছুই বুঝা গেলনা। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলার উদ্দেশ্য একেবারেই সুস্পষ্ট, তিনি চান এমাসের মধ্যে পুরো হেদায়েত গ্রন্থ থেকে আমরা যেন আলোকিত হই, যা তিনি পবিত্র কুরআন মজিদের মাধ্যমে আমাদেরকে দান করেছেন। যার উপর আমল করা এবং যার দিকে অন্যদেরকে আহ্বান করা আমাদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য। পবিত্র কুরআন মজিদের তিলাওয়াতের মাধ্যমে জ্ঞান ও ঈমান লাভ হয় এবং রোযার মাধ্যমে আমলের শক্তি আর্জিত হয়।
রোযার মধ্যে আল্লাহ্ তা‘আলার হুকুম হলে আমরা খাই, তাঁর হুকুমে আমরা খাওয়া থেকে বিরত হয়ে যাই। অথচ খাওয়াও হরাম নয়, পান করাও হারাম নয়, কিন্তু রোযার মধ্যে আমরা এই মৌলিক প্রয়োজনগুলোকেও আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্যের কারণে আমাদের উপর হারাম বানিয়ে নেই, যা অন্য সময় পুরন করা শুধু বৈধই নয়, বরং অবশ্য কর্তব্যও বটে। এর মাধ্যমে আমরা এমন শক্তি অর্জন করি, যে শক্তির ফলে আমরা প্রয়োজন যতই কঠিন হোক না কেন এবং তা যতই সঠিক ও বৈধ মনে হোক না কেন, আল্লাহ্ তা‘আলা নিষেধ করেছেন, তাই আমরা সে সব কাজ থেতে বিরত হয়ে যাই।
আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সমস্ত গুঢ় সত্যের সন্ধান দিয়েছেন, রোযার মাধ্যমে সেগুলোর প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হয়। সে সত্যগুলো বস্তু নয়, সেগুলো ধরা-ছোঁয়াও যায়না। ক্ষুৎ-পিপাসা এবং জৈবিক চাহিদার মতো অতি প্রয়োজনীয় বাস্তবতার চেয়েও সেই সত্যগুলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা শুধুমাত্র খাবার জন্য বেঁচে থাকিনা। উন্নত নৈতিকতা জীবনের জন্য অপরিহার্য্য। এক্ষুণি যে চাহিদা পুরণ করা দরাকার, যার স্বাদ আজই উপভোগ করা যায়, এমন পার্থিব বাসনাসমূহকে কুরবানী করার মাধ্যমে রোযা আমাদের উন্নততর আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক শক্তি সৃষ্টি করে।
রোযা একথা আরো সুদৃঢ় করে বলে দেয় যে, মূল বিষয় হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য। কোন বিষয়ের সঠিক হওয়া বা ভুল হওয়ার শেষ সনদ হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ। নেকী ও সওয়াব খাওয়া-দাওয়া বা উপবাস করার মধ্যে নিহিত নয়, জেগে থাকার মধ্যেও নয়, ঘুমিয়ে থাকার মধ্যেও নয়, শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্য আর নির্দেশ মানার মধ্যেই নিহিত রয়েছে নেকী ও সওয়াব। রাত্রিতে দাঁড়ানোর মাধ্যমেও একই ধরণের শক্তি অর্জিত হয়। এই শক্তিসমূহ যখন এবং যতটুকু সৃষ্টি হয়, তখন ঠিক ততটুকুই ব্যক্তিগতভাবে আমরা এবং সমষ্টিগতভাবে জাতি কুরআন মজিদের আমানতের বোঝা বহন করার যোগ্য হতে পারি। কেননা বস্তুগত, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও উপভোগ্য সামগ্রীর চাহিদাকে পদদলিত করার মাধ্যমে নিজেদের জীবনোদ্দেশ্য এবং পবিত্র কুরআন মজিদের দায়িত্ব ও মিশনের পূর্ণতাকে অগ্রধিকার দেয়ার যোগ্যতা সৃষ্টি হতে পারে, এই যোগ্যতারই অপর নাম ‘তাক্কওয়া’।  
বিষয়টিকে অপর একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখুন! দৃশ্যতঃ রোযার কোন চেহারা বা অবয়ব নেই। নফস্ বা পেটের গভীরে উত্থিত ক্ষুধা, পিপাসা এবং মনের গভীরে উত্থিত যৌন চাহিদাকে অন্য কেউ দেখতে পারেনা এমনকি অনুভবও করতে পারেনা, আর কেউ সেই অনুভূতিতে অংশীদারও হতে পারেনা। এই চাহিদাগুলোকে কুরবান করারও দৃশ্যতঃ কোন কাঠামো নেই। অতঃএব, এই চাহিদা গুলোকে ত্যাগ করার বিষয়টি কোন সুনির্দিষ্ট মানদন্ড দিয়ে মাপা যাবেনা। রোযা তো শুধু প্রভুর উপস্থিতির সুদৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তা এটাকেই মজবুত করে, এটাই এর জীবন।
আল্লাহ্ তা‘আলা সব সময় সাথে আছেন, আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, তিনি সর্বত্র উপস্থিত থাকেন। দু’ব্যক্তি এক স্থানে থাকলে সেখানে তৃতীয়জন থাকেন আল্লাহ্ তা‘আলা। কেউ একা থাকলে সেখানে দ্বিতীয়জন থাকেন তিনি। তিনি আমাদের শাহ্ রগের চেয়েও বেশী নিকটে অবস্থান করেন। এটা সেই ঈমান, প্রতিটি মুহূর্তে নিজের প্রভুর সম্মুখে উপস্থিত থাকার ঈমান, যা রোযার প্রকৃত ফল। এ জন্য এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে যে, ‘রোযা শুধু আমার জন্য, তাই একমাত্র আমি নিজেরই হাতে এর বিনিময় দেব’ (বুখারী, মুসলিম: আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। ‘তাক্কওয়া’ ঈমানের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ঈমান থেকেই ‘তাক্কওয়া’ খাদ্য গ্রহণ করে, এর উপরই দৃঢ়তা লাভ করে, আর এই পরিবেশেই ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়।
শেষে এবার আপনাদেরকে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। বেহিসাব লাভবান হবার জন্য আল্লাহ্ প্রদত্ত ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার থেকে বিরত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শয়তান নতুন প্রচেষ্টা শুরু করে। যাতে করে অন্ততঃপক্ষে সীমাহীন লাভটাকে কমিয়ে সীমিত করে দেয়া যায়। যেন আমরা মহা সাগরের মধ্য থেকে মাত্র কয়েক ফোঁটা পানি সংগ্রহ করেই সন্তুষ্ট হয়ে যাই।
রোযা আর কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে সেই তাক্কওয়া অর্জিত হতে পারে যা আপনারা দেখেছেন এবং এর দ্বারা এমন তাক্কওয়াও অর্জিত হতে পারে, যার মাধ্যমে কিছু কিছু ছোট নেকীর কাজ করে আমাদেরকে সন্তুষ্ট করে দিতে পারে। এতে মোস্তাহাবের চিন্তা নফলের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে করা হয়, নফলের চিন্তা সুন্নতের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে করা হয়, সুন্নতের চিন্তা ফরজের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে করা হয়। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র রমাদ্বান মাসে রোযা ফরজ করে যে তাক্কওয়া অর্জন করার শিক্ষা দিয়েছেন তা অনেক বড় বস্তু। এটা সেই তাক্কওয়া যার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগতভাবে এই রমাদ্বান মাসে নাযিল হওয়া কুরআন মজিদের মিশনকে পূর্ণ করার অধিকারী এবং এর হক্ক্ আদায়কারী হতে পারি। এ কথা এ জন্য জানা দরকার যে, রোযাদার রোযা রাখতে থাকে, রাত্রি জাগরণকারী রাত জেগে থাকে, কিন্তু সেই পথে এক কদমও অগ্রসর হয়না যে পথে রমাদ্বানের রোযা এবং তিলাওয়াতে কুরআন মজিদ তাদেরকে নিয়ে যেতে চায়। অথচ ভালো কাজের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, ফরজের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফরজ এবং লাভের দিক থেকে সবচেয়ে অধিক লাভ বহনকারী কাজ তো এটাই যে, আমরা কুরআন মজিদের হক্ক আদায় করার জন্য এবং আল্লাহ্ তা‘আলার অপরাপর বান্দাহদেরকে কুরআনের প্রদর্শিত পথে পরিচালিত করার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করবো, সাথে সাথে বাস্তবে কিছূ না কিছু কাজ অবশ্যই করবো।
এই ফরজকে আদায় করার চিন্তা তখন করতে পারি, যখন কুরআন মজীদ, রমাদ্বানের রোযা এবং তাক্কওয়ার পারষ্পরিক সম্পর্ককে ভালোভাবে বুঝতে পারবো। এই পর্যন্তকার আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য এটাই ছিল। আমাদেরকে এটা ভালোভাবে মনে রাখতে হবে যে, রমাদ্বান মাসে শুধুমাত্র আল্লাহর কালাম নাযিল হবার কারণেই এ মাসে রোযা ফরজ করা হয়েছে। এ মাসের সমস্ত বরকত এবং মহত্ব শুধুমাত্র  এ কারণে যে, এ মাসে আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাহদেরকে পথনির্দেশনার ইচ্ছা পোষণ করেছেন এবং নিজের মহৎ করুণায় তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া পথনির্দেশনার সর্বশেষ কিস্তি নিজের মনোনীত শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর নিকট হস্তান্তর করেছেন। এই মাসে রোযা ফরজ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমরা যেন নিজেদের মধ্যে সেই তাক্কওয়া সৃষ্টি করি যার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে আল্লাহ্ তা‘আলার দেয়া পথনির্দেশক কিতাবের হক্ক আদায় করার শক্তি ও যোগ্যতা অর্জিত হয়।

আপনারা কি করবেন?
পবিত্র রমাদ্বান থেকে অধিকতর লাভবান হওয়ার জন্য আপনারা কি করবেন? এ মাসের রোযা থেকে, তারাওয়ী থেকে, কুরআন মজিদের তিলাওয়াত থেকে, ইবাদাত থেকে, দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে, এ মাসের রাত্রিসমূহ থেকে, এ মাসের দিবসগুলো থেকে এই শক্তি এবং যোগ্যতা কিভাবে অর্জন করা যাবে? এবার আমি আপনাদের এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো।

১) নিয়্যত ও ইচ্ছা
এ ব্যাপারে প্রথম কাজ হচ্ছে বিশুদ্ধ নিয়্যত ও সুদৃঢ় ইচ্ছা। চেতনা ও অনুভূতি সৃষ্টি এবং একে কার্যকর করার কাজ করে ‘নিয়্যত’। চেতনা সৃষ্টি হলে ইচ্ছা জাগে, আর ইচ্ছা সৃষ্টি করে চেষ্টা-সাধনার যোগ্যতা। কোন কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক চেতনা এবং সাফল্যের জন্য দৃঢ় ইচ্ছা শরীরের জন্য প্রাণ সমতুল্য। এই অর্থে নামাজ, রোযা এবং অন্যান্য ইবাদাতের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়্যতের তাগিদ করা হয়েছে। কোন কোন আলেমের দৃষ্টিতে মুখে নিয়্যত উচ্চারণ ব্যতীত আমল শুদ্ধ হয়না। আবার কারো কারো দৃষ্টিতে অন্তরের সিদ্ধান্ত এবং মনের ইচ্ছাই যথেষ্ট। শুধুমাত্র নিয়্যতের উচ্চারণ আওড়ানো অথবা মনের মধ্যে কোন ফরজ কাজ আদায় করার ইচ্ছা পোষণ করার মাধ্যমে ফেকাহ্ ও আইনের শর্ত তো অবশ্যই পুরণ করা যায়, কিন্তু দেখুন, নিয়্যত কিভাবে আমলে প্রাণের সঞ্চার করে। নিয়্যত মানুষের চেতনায় কাজের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য অন্তরে দৃঢ় ইচ্ছা জাগ্রত করে, এরই মাধ্যমে আমল বাস্তবে সমাধা হয়।
জীবন্ত ও সদ্য মৃত দেহের মধ্যে দেখতে খুব একটা পার্থক্য নেই। জীবন্ত দেহ শক্তি প্রয়োগ, নড়া-চড়া ও কাজের যোগ্যতা রাখে। পক্ষান্তরে মৃত দেহ শক্তি প্রয়োগ, নড়া-চড়া ও কাজের যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত। আমল সমূহেরও একই অবস্থা। যদি আমলের মধ্যে শুদ্ধ নিয়্যতের প্রাণ থাকে তা হলে তা অত্যন্ত ভালো এবং ফলোদায়ক। এ কথাটিকেই রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বলেছেন, “ইন্নামাল আ‘মা-লু বিন্নিয়্যা-ত” ‘কাজের ভালো-মন্দ এবং গুরুত্বের মাত্রা নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল’ (বুখারীঃ উমর রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। মোটকথা মানুষের প্রতিটি কাজের ফলাফল সে পাবে তার নিয়্যত অনুযায়ী।
নিয়্যত বিশুদ্ধ এবং আন্তরিক হতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং শুধুমাত্র তাঁর কাছ থেকেই বিনিময় পাওয়ার জন্য করতে হবে। যদি আপনার নিয়্যত বিশুদ্ধ এবং আন্তরিক না হয়, আর আপনার কাজটি যদি শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য না করেন, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবেনা এবং আপনাদের পরিশ্রমের ফলাফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
নিয়্যত হচ্ছে আশা-আকাঙ্খা ও চাওয়ার প্রকাশ, নিয়্যত হচ্ছে আশা-আকাঙ্খা ও চাওয়ার স্রষ্টা, আশা-আকাঙ্খা ও চাওয়া থাকলে দৃঢ় ইচ্ছা ও সাহস সৃষ্টি হয়, দৃঢ় ইচ্ছা ও সাহসই সেই শক্তি যার মাধ্যমে আমাদের শরীর সচল থাকে। এটা সেই মৌলিক গুণ, যা ব্যতীত কোন পথই অতিক্রম সম্ভব নয়। এমনকি এ ছাড়া পবিত্র রমাদ্বান মাসের সফরও আপনাদেরকে লক্ষপানে পৌঁছে দিতে পারবেনা। পবিত্র রমাদ্বান মাসকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে আপনাদেরকে এর অবস্থান, এর বাণী, এর উদ্দেশ্য, এর মহত্ব ও এর বরকতের চেতনাকে জাগ্রত করতে হবে। সাথে সাথে এই নিয়্যত করতে হবে যে, এই মাসে আপনারা যে কর্মতৎপরতা ও ইবাদাতের প্রতি গুরুত্ব দিবেন, সেগুলোর মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সেই তাক্কওয়া অর্জন করার চেষ্টা করতে হবে, যা কিনা আপনাদেরকে আল্লাহর দ্বীনের চাহিদা পূরণ করার যোগ্য করে তুলবে। এছাড়া এমাসের পরিপূর্ণ কল্যাণ অর্জন করার জন্য কঠিন পরিশ্রম ও দৃঢ়তার সাথে ফরজ, সুন্নত ও নফল কাজগুলো সুন্দরভাবে আদায় করার চেষ্টা করতে হবে।
পবিত্র রমাদ্বান মাস আগমনের পূর্ববর্তী শা‘বান মাসের শেষ দিন অথবা পবিত্র রমাদ্বান মাসের প্রথম রাতেই এ মাসটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে লাভজনক করার উদ্দেশ্যে রাতে কিছুক্ষণ সময় নিরিবিলি বসুন। আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে নিজেকে উপস্থিত মনে করুন, তাঁর প্রশংসা করুন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করুন, নিজের গোনাহ্ সমূহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, এরপর আগত মাসে যে সমস্ত কাজ করার কথা আমি বলেছি, সে ব্যপারে চিন্তা করুন (অথবা এই লোখাটি পুনরায় পাঠ করুন), অতঃপর পুরো মাসের জন্য চেষ্টা-সাধনা এবং পরিশ্রম করার নিয়্যত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন, আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করুন এবং প্রার্থনা করুন যেন তিনি নিজে আপনাদের হাত ধরে তাঁর পথে আপনাদেরকে পরিচালিত করেন।

২) কুরআন মজিদের সাথে সম্পর্ক
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে কুরআন মজিদের তিলাওয়াত, শ্রবণ এবং এর জ্ঞান অর্জন ও উপলব্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা। পবিত্র রমাদ্বান মাসের বিশেষ ইবাদাতগুলো অর্থাৎ রোযা, রাতে দাঁড়ানো, কোন না কোনভাবে ব্যক্তিকে কুরআন মজিদ কেন্দ্রিক করে রাখে। কুরআন শিক্ষা করা এবং তা বাস্তবায়ন করার যোগ্যতা সৃষ্টি করাই হচ্ছে এমাসের প্রকৃত পাওয়া। এজন্য এমাসের অধিকাংশ সময় পবিত্র কুরআন মজিদের সাথে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টির কাজে ব্যয়ের ব্যাবস্থা করা সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। এই সময়গুলো এমনভাবে কাজে লাগাবেন যেন একদিকে আপনাদের মধ্যে এই উপলব্ধি সৃষ্টি হয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাকে কি বলেছেন তা আপনি অনুধাবন করতে পারছেন, অপরদিকে যেন কুরআন মজিদ আপনাদের মন ও চিন্তাকে সারাক্ষণ বেষ্টন করে রাখে এবং সে অনুযায়ী আমল করার আগ্রহ যেন নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি হয়।
নিয়মিত তারাওয়ীর নামাজ আদায় করলে কমপক্ষে এতটুকু তো অর্জিত হয় যে, সম্পূর্ণ কুরআন মজিদ একবার শ্রবণ করে নেয়া হলো। আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্ তা‘আলার কালাম শ্রবণের আত্মিক লাভ, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরবী ভাষা জানা না থাকার কারণে কুরআনের আহ্বান আর রমাদ্বানের তাৎপর্য্য সঠিকভাবে বুঝতে না পেরে আমরা এই ইবাদাত থেকে পূর্ণ ফায়দা অর্জন করতে পারিনা। তাই এ উদ্দেশ্য হাসিলের তাগিদে কিছু বেশী পরিশ্রম করা দরকার, তারাওয়ীতে যে সময় নিয়োজিত করেন তার চেয়ে কিছু অধিক সময় অধিক সময় কুরআন মজিদের জন্য নির্ধারিত করুন, অর্থাৎ প্রতিদিন কুরআন মজিদের কিছু অংশ অর্থসহ বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন।
প্রতিদিন কুরআন মজিদের কতটুক অংশ বুঝে পড়বেন? তারাওয়ীতে কুরআন মজিদ পড়ার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারিত রয়েছে, অর্থাৎ প্রতিদিন এই পরিমাণ পড়তে হবে, যাতে করে পুরো মাসে সম্পূর্ণ কুরআন মজিদ একবার পড়ে শেষ করা যায়। হাদীসের মাধ্যমে জনা যায় যে, এ মাসে জিব্রাঈল ‘আলাইহিস্ সালাম নিজে এসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার সম্পূর্ণ কুরআন মজিদ পড়ে শোনাতেন। (বুখারী, মুসলিম ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। অতঃএব যেখানে তারাওয়ীর সময় প্রতি রাতে এক পারা কুরআন শুনানো হয়, সেখানে আপনারা প্রতিদিন অর্থসহ এক পারা পড়ে নিন। অবশ্য এটা খুব কঠিন কাজ, খুব কম সংখ্যক লোক এটা সম্পন্ন করতে পারবেন।
যারা দুর্বল, দুর্বলতা, অসুস্থ্যতা বা জীবিকা সন্ধানের কারণেই হোক, অথবা আল্লাহর পথে কাজ করার কারণেই হোক, এ ব্যাপারে স্বয়ং কুরআন মজিদ বিষয়টি তাদের জন্য সহজ করে দিয়েছে। বলা হয়েছেঃ فَاقْرَ‌ءُوا مَا تَيَسَّرَ‌ مِنَ الْقُرْ‌آنِ ۚ  ‘সহজ-স্বভাবিকভাবে যতটুকু সম্ভব, কুরআন থেকে ততটুকু পড়’ (সূরা মুজ্জাম্মিলঃ ৭৩:২০)। সুতরাং দ্বিতীয় অবস্থা এটা হতে পারে যে, সমাগত রমাদ্বান মাসের প্রথম তারিখ থেকে আপনারা এই মনোবল নিয়ে অর্থসহ কুরআন পড়ার কাজ শুরু করে দিন, যেন কমপক্ষে আগামী রমাদ্বান মাস আসা পর্যন্ত আপনার সম্পূর্ণ কুরআন মজিদ অর্থসহ এক বার পড়ে শেষ করতে পারেন। এই উদ্দেশ্যে প্রতিদিন এক/দেড় রুকূর বেশী পড়ার প্রয়োজন হবেনা। এতটুকু সময় বের করা না রমাদ্বান মাসে অসম্ভব, আর না অন্য কোন মাসে।
যদি আপনারা এই পরিমাণ কুরআন পড়াকে কষ্টসাধ্য মনে করেন, তাহলে চলতি রমাদ্বান মাস থেকে অর্থসহ কমপক্ষে তিন আয়াত পাঠ করা শুরু করে দিন। এইভাবে এ বছরে না হোক পাঁচ/ছয় বছরে আপনারা সম্পূর্ণ কুরআন মজিদ অর্থসহ একবার পড়ে শেষ করতে পারবেন। এই কাজটি পবিত্র রমাদ্বান মাসে শুরু করলে আপনাদের সে কাজের সাথে আল্লাহ্ তা‘আলার বরকত যোগ হবে।
বুঝে কুরআন পড়ার সাথে সাথে অত্যন্ত জরুরী বিষয় হচ্ছে, কুরআনকে নিজেদের মধ্যে আত্মীকরণ করুন, কুরআনের সাথে মন ও রূহের সম্পর্ক গভীর করুন এবং লক্ষপানে এগিয়ে চলুন। কুরআন মজিদ নিজেই নিজের পাঠক ও শ্রোতাদের যে বিশেষন বর্ণনা করেছে তা শুধু বুদ্ধি দিয়ে বুঝে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এভাবে তো অনেক অমুসলিমও পড়ে; বরং কাঙ্খিত পড়া হচ্ছে রূহ্, মন ও শরীরের পুরো অংশগ্রহণের সাথে পড়া। কুরআন নিজে বর্ণনা করছে যে, وَإِذَا قُرِ‌ئَ الْقُرْ‌آنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْ‌حَمُونَ ‘যখন কুরআনের তিলাওয়াত হয়, নিরবচ্ছিন্নভাবে তা শ্রবণ করলে তোমাদের উপর রহমত বর্ষিত হবে’ (সূরা আল্ আ’রাফঃ ৭:২০৪)।
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ‌ اللَّـهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَ‌بِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ‘মুমিনদের সামনে আল্লাহর কুরআনের উল্লেখ হলে তাদের অন্তর কেঁপে উঠে, যখন তাদের সামনে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত হয়, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি নির্ভরশীল হয়’ (সূরা আল্ আনফালঃ ৮:২)।
إِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّ‌حْمَـٰنِ خَرُّ‌وا سُجَّدًا وَبُكِيًّا  ‘যখন করুণাময়ের আয়াত তাদেরকে শুনানো হতো তখন কান্নারত অবস্থায় সেজদায় লুটিয়ে পড়তো’ (সূরা মারইয়ামঃ ১৯:৫৮)। ‘তোমরা কুরআন মজিদ পড়ার সময় কাঁদবে, কান্না না এলে কাঁদার চেষ্টা করবে, কেননা কুরআন মজিদ অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে নাযিল হয়েছে।’??
হয়ত আপনি কুরআন মজিদের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ পড়ছেন, যেমন ধরুন; সূরা‘আল্ ক্কারিয়াহ্’ সূরা থেকে যেখানে কঠিন বিপদ সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে, অথবা সূরা‘যিলযাল’ থেকে যেখানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভালো-মন্দ কাজের বিবরণ উপস্থাপন করা হবে বলে সংবাদ দেয়া হয়েছে, গভীর মনোনিবেশে ডুবে থেকে এভাবে কুরআন মজিদ পড়ুন যেন আল্লাহ্ তা‘আলার সামনে উপস্থিত রয়েছেন, তিনি আপনাদের সাথে কথা বলছেন ও দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন যে, আপনাদের কি করতে হবে এবং কি করা থেকে বিরত থাকতে হবে, তিনি বলে দিচ্ছেন সম্মুখে কি পরিস্থিতি আসছে এবং ভবিষ্যতে কি পাওয়া যেতে পারে। আপনাদের মন-মানসিকতা আর দেহ, সবকিছুকে এই তিলাওয়াতের কাজে অংশীদার করতে হবে।

২) আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্যহীনতা থেকে আত্মরক্ষা
তৃতীয় বিষয় হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্যহীনতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য বিশেষ ভাবে চেষ্টা করতে হবে। রোযার উদ্দেশ্য খোদাভীতি সৃষ্টি করা, আর পবিত্র রমাদ্বান মাস হচ্ছে খোদাভীতির মান উন্নয়নে বসন্ত মৌসুম। এ কারণে এ মাসে আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্যহীনতাথেকে আত্মরক্ষার জন্য বিশেষ ভাবে প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন। এর অর্থ এই নয় যে, রমাদ্বান মাস ছাড়া অন্যান্য মাসের দিন ও রাত্রিতে আল্লাহ্ তা‘আলার আনুগত্যহীনতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য বিশেষ ভাবে প্রচেষ্টা চালানোর প্রয়োজন নেই। এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে পবিত্র রমাদ্বান মাসে কুরআন মজিদের সাথে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন। এ মাসে আল্লাহ্ তা‘আলার নির্দেশ পালনের জন্য সারাদিন ক্ষুধার্ত এবং পিপাসার্ত থাকা, রাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা এবং এর মাধ্যমে তাঁর কালাম শ্রবণ করার কারণে একটা বিশেষ পরিবেশ ও বিশেষ পরিস্থিতির ফলে নিজের মধ্যে আল্লাহ্ তা‘আলা অসন্তুষ্ট হতে পারেন এমন প্রতিটি কাজ থেকে বিরত থাকার আগ্রহকে গভীর ও শক্তিশালী করতে পারে।
এমনিতে তো এই প্রচেষ্টা জীবনের প্রতিটি কাজে অব্যহত রাখতে হবে, কিন্তু অন্য একজন মানুষের সাথে সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন এবং সমষ্টিগত চারিত্রিক সম্পর্কের প্রতি বিশেষভাব দৃষ্টি দিতে হবে। যে খুব যত্ন সহকারে রোযা রাখে, নামাজ আদায় করে, ছাদক্বা দেয়, কুরআন পড়ে, অথচ কেয়ামতের দিন মানুষের অসংখ্য দাবীর এক বিরাট বোঝা ঘাড়ে করে হাজির হয়, সেই ব্যক্তি অত্যন্ত দুর্ভাগা। কাউকে মেরেছে, কাউকে গাল-মন্দ করেছে, কারুর মনে আঘাত দিয়েছে, অবৈধভাবে কারোর সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এমন ব্যক্তির নেকী দাবীদারদেরকে দিয়ে দেয়া হবে, তারপরও দাবী শেষ হবেনা। এরপর দাবীদারদের গুনাহসমূহ তার মাথায় তুলে দেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তাকে নিমিষে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে (মুসলিমঃ আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।
আপনারা কুরআন মজিদের সে অংশটুকু দেখুন, যে অংশে রোযা ফরজ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সাথে সাথে বুঝতে পারবেন যে এটাই সেই মৌলিক উদ্দেশ্য, রোযার মাধ্যমে যা অর্জন করা উচিৎ। প্রথমে মানুষের জীবনের মর্যাদা ও ক্কাসাসের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারপর রোযা ও রমাদ্বানের বর্ণনা করা হয়েছে, পরক্ষণেই উপদেশ দেয়া হয়েছে যে, তোমরা একে অপরের সম্পদ অবৈধ এবং অন্যায়ভাবে ভোগ-দখল করবেনা। এরপর এই সূত্রটি বলা হয়েছে যে, বিশুদ্ধতা এবং নেকীর কাজ বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশের বিষয় নয়, মূল চাহিদা হচ্ছে ‘তাক্কওয়া’। এরপর আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, যারা বাড়াবাড়ি করে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে পছন্দ করেননা, তাই যুদ্ধের মধ্যেও বাড়াবাড়ি চলবেনা।
নির্দেশের এই গ্রথিত মালার মধ্যে রোযাকে যে স্থানে স্থাপন করা হয়েছে, তাতে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রোযা রাখার পর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আপনারা অপর কোন মানুষের জীবন, সম্পদ, অধিকার এবং ইজ্জতের উপর হস্তক্ষেপ করবেন না। এই কথাটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বর্ণনা করেছেন, “গোনাহ্ থেকে বাঁচার জন্য রোযা ঢালের মতো কাজ করে” তাই এটাকে সত্যিকার অর্থে ঢাল বানান। রোযাদার না কোন খারাপ কথা বলবে, আর না চিৎকার করে কথা বলবে, যদি কেউ তাকে খারাপ কথা বলে বা তার সাথে বিবাদ করতে আসে, তাহলে সে বলবে, ‘আমি রোযাদার, তুমি দূর হও, এসব খারাপ কাজে লিপ্ত হওয়া আমার জন্য সমীচীন নয়’ (বুখারী, মুসলিম আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।
এ বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করুন যে, রোযা শুধু পেটের রোযাই নয়, চোখের রোযা, মুখের রোযা, হাত-পায়ের রোযা, অঙ্গ-প্রতঙ্গের রোযা। এই রোযার অর্থ হচ্ছে চোখ সেসব কিছু দেখবেনা, কান সেসব কিছু শুনবেনা, মুখ সেসব কিছু বলবেনা, অঙ্গ-প্রতঙ্গ সেসব কাজ করবেনা, যে সব আল্লাহ্ তা‘আলা অপছন্দ করেন এবং যা কিছু করতে তিনি নিষেধ করেছেন।
নিজের খারাপ কাজগুলোর মধ্যে এক একটি করে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে অনেক কাজ হয়ে যাবে। যেমন ধরুন, আগত রমাদ্বান মাসের ব্যপারে আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিন যে, আপনারা এমাসে চিৎকার করে কথা বলবেন না, ঝগড়া করবেন না এবং সম্মুখে বা পশ্চাতে কারোর ব্যপারে খারাপ কথা বলবেন না, আর যদি বলেন যেন ভালো কথা বলেন, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা থেকে বাঁচার কাজ জিহ্বা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শুরু করতে হবে। এটা অবশ্যই কঠিন কাজ, তবে এটা মেনে চলতে পারার সম্ভাবনা বেশী। প্রতি রাতে এ দু’টি বিষয়ে পর্যালোচনা করুন, কোন ত্রুটি ধরা পড়লে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

৪) নেক কাজের অনুসন্ধান
চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, বিশেষভাবে সব ধরনের নেক কাজের অনুসন্ধান করা। প্রতিটি মুহূর্তে সব ধরনের নেক কাজ খুঁজে বেড়ানো এবং এর অনুসন্ধান করা তো মুমিনের স্বভাবের অংশ হওয়া উচিৎ। তাই পবিত্র রমাদ্বান মাসে এ ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি এবং অধিক সাধনা প্রয়োজন। কেননা এটা সেই মাস, যে মাসে যে কোন নেক কাজের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা‘আলার নৈকট্য অনুসন্ধান করুন না কেন, তার সওয়াব ফরজ কাজের সমান হয়ে যাবে। (বায়হাকীঃ সালমান ফারসী রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। এর চেয়ে বড় লোভনীয় আর কি হতে পারে?
এই অনুসন্ধান নিয়মিত ইবাদাত সমূহের মধ্যেও করুন, যেমন তাকবীর-তাহরিমার আবশ্যকতা, নফল নামাজ সমূহের যত্ন। এই অনুসন্ধান মানবিক সম্পর্কের চৌহদ্দির মধ্যেও হতে পারে। নিজের ভাইয়ের সাথে মুচকি হেসে সাক্ষাৎ করাও সাদাকা, তাকে দুঃখ না দেয়াও সাদাকা, তার পাত্রে পানি ঢেলে দেয়াও সাদাকা।
যখন বান্দাহ্ ফরজসমূহ আদায় করার সাথে সাথে নফল ইবাদাতের যত্ন করে, স্বাভাবিক কারণেই ধরে নেয়া যায় যে এটা নিজের শখ ও আগ্রহ নিয়েই করে। যখন বান্দাহ্ নিজের শখ ও আগ্রহসহকারে দৌড়ে দৌড়ে নিজের প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করে, তাদের জন্য ঐ হাদীসে ক্কুদসীটি সত্য প্রমাণিত হয়, যেখানে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেন, “আমি তাকে ভালবাসতে শুরু করি, আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, আমি তার চক্ষু হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে এবং আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে” (বুখারীঃ আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। এই পরিপ্রেক্ষিতে আপনি পবিত্র রমাদ্বান মাসের জন্য বিশেষ তিনটি নেকীর কাজ নির্বাচিত করে নিন।

৫) ক্কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিতে দাঁড়ানো
রাত্রিতে দাঁড়িয়ে থেকে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা, আত্মসমালোচনা করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা তাক্কওয়া অর্জনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং প্রভাবশালী চিকিৎসাপত্র। এটা মুত্তাকীদের বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ্ বলেছেন,
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ﴿﴾ وَبِالْأَسْحَارِ‌ هُمْ يَسْتَغْفِرُ‌ونَ ﴿﴾
‘মুত্তাকী তারা, যারা রাতের কম অংশ ঘুমায় এবং অন্তর থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করে’ (আয্ যারিয়াত: ৫১:১৭-১৮)। রমাদ্বানের মোবারক মাসে রাত্রিতে দাঁড়িয়ে থাকার একটা বিশেষ পদ্ধতি হচ্ছে তারাওয়ীর নামাজ। আপনারা রাতের প্রথম অংশে তারাওয়ীর বিশ রাকাত নামাজে দাঁড়িয়ে কুরআন মজিদ শ্রবণ করেন, এটা ক্কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিতে দাঁড়িয়ে থাকা। ক্কিয়ামুল লাইলের দ্বিতীয় সময় হচ্ছে মধ্যরাতের পর বা রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। এই সময়টা সেহরী খাওয়ার সময়ের সাথে সংযুক্ত। আর এই সেহরীর সময়ই ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য কুরআন মজিদে তাকিদ করা হয়েছে। রমাদ্বানের মোবারক মাসে সামান্য প্রচেষ্টা থাকলে আপনারা রাতের এই শেষাংশে ক্কিয়ামুল লাইলের বরকত অর্জন করতে পারেন। ‘এবং রাতের শেষ ভাগে আল্লাহর কাছে গোনাহ্ মাফের জন্য দো‘আ করে’ وَالْمُسْتَغْفِرِ‌ينَ بِالْأَسْحَارِ‌  (সূরা আলে ইমরান: ৩:১৭) এভাবে -এই দলের মধ্যে আপনাদের নামও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই পদ্ধতিটা খুবই সহজ, সেহরী খাওয়ার জন্য তো আপনারা উঠবেনই, ১৫/২০ মিনিট আগে উঠে ওদ্বূ করে দু’রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে নিন।

এটা রাতের সেই অংশ, যার ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এসময় আল্লাহ্ তা‘আলা বিশ্ববাসীর খুব নিকটে আসেন এবং ডেকে বলেন, কে আছে এমন যে আমার কাছে যা চাইবে তাকে তাই দেব, কে আছে এমন যে আমার কাছে নিজের গোনাহ্ মাফ চাইবে আর আমি তাকে মাফ করে দেব” (বুখারী, মুসলিম: আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। অপর এক রাওয়ায়েতে তো প্রাণ-উচ্ছাস করা এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে যে, ‘রাতের এই গভীর অংশে আল্লাহ্ তা‘আলা নিজের হাত সম্প্রসারিত করে বলেন, কে আছে এমন সেই সত্তাকে ঋণ দেবে যে সত্তা ফকীরও নন, জালিমও নন। ভোর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ্ তা‘আলা এভাবেই বলতে থাকেন’ (মুসলিমঃ আবু হোরায়রা রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।
যেখানে আল্লাহ্ তা‘আলা এভাবে নিজের রহমতের হাত সম্প্রসারিত করে রেখেছেন, আর আপনারা সেহরী খাওয়ার জন্য তো উঠছেনই, তা হলে কয়েক মিনিট অতিরিক্ত ব্যয় করে নিজেদের গোনাহসমূহ মাফ করিয়ে নিবেন আর যা কিছু চাইবেন তাই পেয়ে যাবেন, এর চেয়ে অধিক সহজ ও সৌভাগ্যের পথ আর কি হতে পারে? যদি দু’রাকাত নামাজ পড়াও কষ্টকর হয়, তা হলে কমপক্ষে নিজের প্রভূর দরবারে সেজদায় অবনত হয়ে নিজের কপাল মাটিতে রেখে তাঁর কাছে কান্নাকাটি করুন, নিজের গোনাহ্ মাফের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, কল্যাণ ও বরকত প্রার্থনা করুন এবং হক্কের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তৌফিক কামনা করুন। ৫/১০ মিনিটের মধ্যে অন্ততঃ এ কাজটি সহজভাবে করা যেতে পারে। যদি একবার আপনারা এমনিভাবে শেষ রাতে ইবাদাতের স্বাদ পেয়ে যান, তাহলে আপনারা সময়ের পরিমাণও বৃদ্ধি করতে চাইবেন এবং রমাদ্বান মাসের পরও এই স্বাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন।

৬) যিকির ও দো‘আ
ষষ্ট বিষয় হচ্ছে যিকির ও দো‘আর ব্যপারে যত্ন নেয়া। সারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যিকির ও দো‘আর যত্ন নেয়া প্রয়োজন। তাই যিকির কি? তা আমাদের জানতে হবে। মুখে, অন্তরে বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে কৃত আল্লাহ প্রিয় সকল কাজই যিকির। এই অর্থে রোযাও যিকির, ক্ষুধা-তৃষ্ণাও যিকির। এর মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত শুধু যিকিরই নয়, অতি উঁচুস্তরের যিকির। পবিত্র রমাদ্বান মাসে দো‘আ এবং মুখের যিকিরও অত্যন্ত ফলোদায়ক। এসব নফল কাজের সওয়াবও এ মাসে ফরজের সওয়াবের সমান হয়ে যায়, এর মাধ্যমে আলস্য দূরীভূত হয় এবং রমাদ্বানের কল্যাণ ও বরকত অর্জন করার জন্য মনোযোগ এক কেন্দ্রিক রাখা সহজ হয়। পবিত্র এ মাসে ‘সুবহা-নাল্লা-হ্’ ‘আল্ হামদু লিল্লা-হ’ ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ্’ আল্লা-হু আকবার’ ‘সুবহা-নাল্লা-হি ওয়া বি হামদিহি-, সুবহা-নাল্লা-হিল ‘আযী-ম’ ‘লা-হাওলা ওয়ালা-ক্কু-ওয়াতা ইল্লা-বিল্লা-হ্’ ‘আস্তাগফিরুল্লা-হি ওয়াআতু-বু ইলাইহি’ ইত্যাদি শব্দসমূহের যিকির বেশী বেশী করুন, এতে করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাথে সাথে জিহবাও সিক্ত থাকবে।
দো‘আও এক ধরনের যিকির। সব কিছু আল্লাহর নিকট থেকেই পাওয়া যেতে পারে, সমস্ত ক্ষমতা এবং ভান্ডারের মালিক শুধুমাত্র তিনি, দো‘আ হচ্ছে এ কথাগুলোরই স্বীকৃতি, দো‘আ আমাদের আপাদমস্তক মুখাপেক্ষী বা ফকীর হবার স্বীকারোক্তি। ফকিরী ও মুখাপেক্ষীতা শুধু আল্লাহর নিকটই হওয়া উচিৎ। এটাই গোলামীর মূল জীবনী শক্তি। কেননা মাহে রমাদ্বানুল মোবারকের প্রতিটি মুহূর্ত বিরাট কল্যাণ ও বরকতের বাহক। এ কারণেই নিজের প্রভূর সামনে বারে বারে হাত সম্প্রসারিত করা উচিৎ। রমাদ্বান মাসের সাধারণ সময় ছাড়াও দো‘আ কবূলের বিশেষ সময় রয়েছে। ইফতারের সময় এমনি এক বিশেষ সময়, এই সময় আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হতে থাকে।
এই সূচী অনুযায়ী চেষ্টা করুন এবং রমাদ্বানের প্রথম দশ দিন অধিকহারে রহমতের অনুসন্ধান করুন। দ্বিতীয় দশ দিনে ক্ষমা এবং তৃতীয় দশ দিনে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সাধনা করুন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদ্বান মাসের এই তিনটি অংশের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য উপরোল্লেখিত ভাবে বর্ণনা করেছেন (বায়হাকীঃ সালমান ফারসী রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। যিকিরের যে কোন নির্দিষ্ট সূচী অনুসরণ করে তার প্রতি যত্নবান হউন। বিভিন্ন সময়, কাজ ও অবস্থার দো‘আসমূহ এবং বিখ্যাত সঙ্কলনের দো‘আগুলোর মধ্য থেকে প্রতি রমাদ্বানে কিছু কিছু দো‘আ মুখস্ত করে নিন।

৭) শবে ক্কদর বা লাইলাতুল ক্কদর এবং ই‘তেক্কাফ
সপ্তম বিষয় হচ্ছে ‘শবে ক্কদর'’ সম্পর্কে যত্নবান হওয়া। এটা সেই বরকতপূর্ণ রাত্রি, যে রাতে কুরআন মজিদ নাযিল হয়েছে। এই রাত মর্যাদা ও মূল্যের দিক থেকে, এই রাতে সংঘটিত ঘটনাবলীর দিক থেকে, এই রাতে বন্টনকৃত এবং সংগৃহীত ভান্ডারের দিক থেকে হাজার মাস তথা হাজার বছরের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি এই রাতে ক্কিয়াম করবে, তার সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেয়ার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। অন্যান্য রাতের মত এ রাতেও দো‘আ কবুল করে নেয়ার সেই নির্দিষ্ট সময়টি রয়েছে, ‘এ রাতে ইহকাল ও পরকালের যে কোন কল্যাণ প্রার্থনা করা হবে তা প্রদান করা হয়।’ (মুসলিমঃ জাবের রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। ‘যদি আপনারা এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাহলে এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কিছুই হতে পারেনা।’ (ইবনে মাজাহ: আনাস ইবনে মালেক রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। এটা মাসের কত তম রাত তা সুস্পস্টভাবে আমাদেরকে বলা হয়নি। হাদীসসমূহে বলা হয়েছে, শেষ দশ দিনের কোন একটি বেজোড় রাত, অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭, অথবা ২৯ তারিখ রাত। কোন কোন হাদীসে বলা হয়েছে, শেষ দশ দিনের কোন একটি রাত অথবা রমাদ্বান মাসের কোন একটি রাত।
সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয়, ‘শবে ক্কদর’ বা ‘লাইলাতুল ক্কদর’ রমাদ্বান মাসের ২৭তম রাতে। যদি তা সঠিক হয় তাহলে শুধু এই রাতে ক্কিয়াম ও ইবাদাতের ব্যপারে যত্নবান হওয়া যায়, সেটাই যথেষ্ঠ। এ কথা ঠিক যে কোন কোন সাহাবী এবং উম্মতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ‘শবে ক্কদর' ২৭তম রাতে হওয়ার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয় এই রাতকে সুনির্দিষ্ট না করার পশ্চাতে কোন গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যদি এ কথা ধরে নেয়া যায় যে, এই সুনির্দিষ্ট তারিখ আমাদের জন্য আছে এবং তা ২৭তম রাত, তাহলে এর তাৎপর্য ক্ষুন্ন হয়ে যায়, এই তারিখটি গোপন রাখার অর্থ হচ্ছে আমাদেরকে এর অনুসন্ধান ও খোঁজ করার জন্য ব্যস্ত থাকতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে, নিজেদের আগ্রহের আগুন প্রজ্জ্বলিত রাখতে হবে। শেষ দশ দিনের প্রতিটি বেজোড় রাতে অনুসন্ধান করুন, আগ্রহ আরো বেশী হলে শেষ দশ দিনের প্রতিটি রাতে ‘শবে ক্কদর'’ অনুসন্ধান করুন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, তাঁর রহমত ও পুরষ্কার পাওয়ার জন্য বান্দাহ্ সর্বক্ষণ ব্যতিব্যাস্ত এবং অনুসন্ধিৎসু থাকবে, বিরামহীন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে, এটা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত প্রিয়। ধরুন, যদি এই রাতের সুনির্দিষ্ট তারিখ আমাদের জানা হয়ে যায়, তাহলে অনুসন্ধানের আগ্রহ, ব্যস্ততা এবং সাধনার যে অবস্থাটা কাম্য ছিল তাও হাতছাড়া হয়ে যায়।
অন্য যে কোন রাতে ক্কিয়াম করার মাধ্যমে যে কল্যাণ ও বরকত অর্জিত হবে, এই রাতের ক্কিয়ামে তা তো অর্জিত হবেই, ‘শবে ক্কদর’-এর কারণে তা কয়েক হাজার গুণ বর্ধিত হবে। পক্ষান্তরে অধিক কল্যাণ ও বরকতের দ্বার উম্মুক্ত করে দেয়া হবে। পুরো পবিত্র রমাদ্বান মাসটা আমাদের উম্মতের জন্য আল্লাহ্ তা‘আলার সেই বিশেষ রহমতের প্রকাশ যে, তিনি আমাদের জন্য কত কম সময়ে এবং সংক্ষিপ্ত কাজে সেই প্রতিদান বা সওয়াব রেখেছেন যা কিনা অন্য উম্মতদের জন্য দীর্ঘ সময়ে অনেক বেশী কাজ করার বিনিময়ে দেয়া হতো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা অনুযায়ী এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে যে, উম্মতে মুসলিমা আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত পরিশ্রম করলে ইয়াহুদীদের ফজর থেকে জোহর পর্যন্তকার পরিশ্রম এবং ইসায়ীদের জোহর থেকে মাগরীব পর্যন্তকার পরিশ্রমের প্রতিদানের চেয়েও অধিক প্রতিদান দেয়া হবে (বুখারীঃ ইবনে ওমর রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)। ‘শবে ক্কদর’ আমাদের দয়াময় প্রভূর বিশেষ রহমতের সব চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।
সুতরাং আপনারা কোমর বেঁধে চেষ্টা শুরু করুন, তৈরী হয়ে যান। কমপক্ষে শেষ দশ দিনের প্রতিটি বেজোড় রাতে আল্লাহর সামনে ক্কিয়াম, নামাজ, তিলাওয়াত, যিকির, দো‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যে কাটিয়ে দিন,  পুরো রাত সম্ভব না হলে মধ্যরাতের পর সেহরী পর্যন্ত ২/৩ ঘন্টা অতিবাহিত করুন, হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে যান, সেজদায় কপাল মাটিতে লুটিয়ে দিন, কান্নাকাটি করুন, অনুনয়-বিনয় প্রকাশ করুন, নিজের গোনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করুন। দো‘আ কবুলের বিশেষ মুহূর্তটি তো প্রতি রাতেই আসে, কিন্তু ‘শবে ক্কদর'’-এ সেই বিশেষ মুহূর্তটির রং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। সেই বিশেষ মুহূর্তটির জন্য, সেই বিশেষ রাতটির জন্য আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ্গণ অস্থির হয়ে অধির আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন, না জানি সেই বিশেষ রাতটি/মুহূর্তটি কবে আসবে! এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাদ্বিআল্লাহু আনহাকে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক ও তাৎপর্যপূর্ণ দো‘আ শিখিয়ে দিয়েছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এই রাতে অধিকহারে এই দো‘আ করতেন, দো‘আটি হচ্ছেঃ ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নাকা ‘আফুওউন, তুহিব্বুল আ’ফওয়া, ফা‘আফুয়ান্না’ অর্থাৎ ‘হে আমার আল্লাহ্! তুমি মহান, ক্ষমাশীল, ক্ষমা করে দেয়া তোমার অত্যন্ত প্রিয় কাজ, অতঃএব আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও’ (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিজিঃ আয়েশা রাদ্বিআল্লাহু আনহা)। অর্থাৎ ‘হে আমার আল্লাহ্! তুমি মহান, ক্ষমাশীল, ক্ষমা করা তোমার খুব প্রিয় কাজ, অতঃএব আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও।’
যদি সাহস ও মনের দৃঢ়তা থাকে তাহলে আপনারা শেষ দশ দিন অবশ্যই ই‘তেকাফ করুন, রূহ্ ও অন্তর, মন-মানসিকতা, চিন্তা ও কর্মকে আল্লাহর রঙে রঙিন করতে এবং তাঁর প্রভুত্বের ছাঁচে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে ই‘তেকাফ পরশমণির ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে ‘শবে ক্কদর'’কে অনুসন্ধানের প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকে। প্রতিটি ব্যক্তির পক্ষে ই‘তেকাফ করা তো সম্ভব নয়, কিন্তু এ কাজকে ফরজে কেফায়া করার ফলে এর গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত ই‘তেকাফ করতেন এবং এর জন্য সকলকে তাকিদ দিতেন। আয়েশা রাদ্বিআল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, ‘রমাদ্বানের শেষ দশ দিন নিকবর্তী হলেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমর কষতে আরম্ভ করতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন, ঘরের লোকদেরকে জাগাতেন এবং এত বেশী পরিশ্রম করতেন যা প্রথম ও দ্বিতীয় দশ দিন করতেন না (বুখারী, মুসলিম)। ই‘তেকাফের প্রকৃত রূহ্ হচ্ছে এই যে, আপনারা কিছু সময়ের জন্য পার্থিব সকল কাজ, ব্যস্ততা এবং আকর্ষণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদেরকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ওয়াকফ্ করে দিবেন। স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজন এবং ঘর-বাড়ী ছেড়ে আল্লাহর ঘরে নিমগ্ন হয়ে যাবেন, পুরো সময়টা তাঁর স্মরণে ব্যয় করবেন। আর ই‘তেকাফের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্যক্তির পুরো জীবনটাই যেন এই ছাঁচে গড়ে উঠে যাতে আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দেগী মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে। আমি এ কথা বলছি না যে, আপনারা সকলে ই‘তেকাফে চলে যান, পক্ষান্তরে আপনারা এমন একটি কাজ অতি সহজে করতে পারেন যার মাধ্যমে নিজেদের সকল সীমাবদ্ধতা সত্বেও ই‘তেকাফের রূহ্ বেশী বেশী করে অর্জন করতে পারেন। আর সে কাজটি হচ্ছে, আপনারা যখনই মসজিদে যাবেন, ই‘তেকাফের নিয়্যত করে নিন, অর্থাৎ যে সময়টুকু আপনি মসজিদে অতিবাহিত করবেন, তা পুরোপুরি আল্লাহর  জন্য ওয়াকফ্ করে দিন।

৮) আল্লাহর পথে ব্যয়
অষ্টম বিষয় হচ্ছে আল্লাহর পথে মন খুলে খরচ করা, নামাজের পর সবচেয়ে বড় ইবাদাত হচ্ছে আল্লাহর পথে খরচ করা। আল্লাহ্ তা‘আলা যা কিছু দান করেছেন সেখান থেকে খরচ করা, এমনকি নিজেদের সময় এবং দেহ-মনের শক্তিটুকুও আল্লাহর পথে খরচ করা। এক্ষেত্রে অর্থ-সম্পদ খরচ করাকে ক্রমিক অনুযায়ী প্রথমে রাখা হয়েছে। কেননা অর্থ-সম্পদই হচ্ছে দুনিয়াপ্রীতি ও দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করার সকল উৎসের বড় উৎস। মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রশস্ত হৃদয় ও সর্বাপেক্ষা দানশীল ব্যক্তি ছিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এরপরও পবিত্র রমাদ্বান মাস এলে এবং এমাস উপলক্ষে জিবরাঈল ‘আলাইহিস্ সালামের সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁর দান-খয়রাতের সীমা-পরিসীমা থাকতোনা। তিনি নিজের ভুবনে মুশুলধারে বর্ষণধারী ঝড়োহাওয়ার মত হয়ে যেতেন। বন্দিদের মুক্ত করে দিতেন এবং প্রতিটি সাহায্য প্রার্থনাকারীকে দান করতেন (মুসলিম, বুখারীঃ ইবনে আব্বাস রাদ্বিআল্লাহু ‘আনহু)।
আল্লাহর পথে ব্যয়কৃত এক একটি দানা আর একটি পয়সার জন্য কমপক্ষে সাতশ’ গুণ বিনিময় প্রদান করার ওয়াদা আল্লাহ্ তা‘আলা করেছেন, এ ছাড়া এটাও ঘোষণা করেছেন যে, তিনি যাকে ইচ্ছা এর চেয়েও অনেক বেশী দান করবেন। এই ওয়াদা সেই মহাগ্রন্থ আল কুরআনে করা হয়েছে যার সত্যতার ব্যাপারে ধূলিকণা পরিমানও সন্দেহ করার অবকাশ নেই। পুঁজি বৃদ্ধির জন্য এই সীমাহীন লাভের ওয়াদা সম্বলিত প্রসপেক্টাস কোথায় পাবেন? আর এই পুঁজি বৃদ্ধির জন্য পবিত্র রমাদ্বান মাসের চেয়ে উত্তম সময় আর কোনটি হতে পারে, যে মাসে নফলের নেকী ফরজের সমান হয়ে যায়, আর ফরজের নেকী স্বাভাবিক ভাবেই সত্তর গুণ বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর পথে ব্যয় করা মুত্তাকীদের অবশ্য করণীয় বৈশিষ্ট্য। আল কুরআন থেকে হেদায়েত পাওয়ার মৌলিক শর্ত হচ্ছে তাক্কওয়া, আর আল্লাহর পথে ব্যয় করা তাক্কওয়া অর্জনের জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য।
পবিত্র রমাদ্বান মাসে আল্লাহর পথে ব্যয় করার কাজটি তাক্কওয়া অর্জনের ক্ষেত্রে আপনাদের সাধনাকে কয়েকগুণ বেশী কার্যকর এবং ফলপ্রসু করে তুলবে। তাই রমাদ্বান মাসে আপনারা নিজেদের দৃষ্টি খুলে দিন, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য, আত্মীয়-স্বজনদের জন্য, এতিম-মিসকিনদের জন্য এবং যথাসম্ভব বেশী বেশী করে আল্লাহর পথে ব্যয় করুন। ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার সাথে সাথে কিছুটা পকেটের চাপও অনুভব করুন। তবে যা কিছু দিবেন শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য দিন। ا نُرِ‌يدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورً‌ا (সূরা আল্ ইনসানঃ ৭৬:৯) অর্থাৎ, কারো কাছে বিনিময় বা কৃতজ্ঞতা পাওয়ার আশা মনে আনবেননা। এমন কাজ করে কি লাভ যে, আপনি সম্পদ ব্যয় করবেন, পুঁজি সংগ্রহ করবেন, আর নিজের হাতেই লাভ ও পুঁজি সবই নষ্ট করে দিবেন? বিস্তারিত হিসাব করে আপনারা নিজেদের যাকাত এমাসেই শোধ করে দিন, তাহলে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে আপনার যাকাত আদায় হয়ে যাবে, আবার কাজটা পবিত্র রমাদ্বান মাসে হওয়ার কারণে সওয়াব পাবেন সত্তর গুণ বা তার চেয়েও বেশী।

৯) সহযোগিতা ও সহমর্মিতা
নবম বিষয় হচ্ছে মানুষের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। পবিত্র রমাদ্বান মাসকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাস বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটা নিজের পরিবার, নিজের আত্মীয়-স্বজন, নিজের বন্ধু-বান্ধব, নিজের পাড়া-প্রতিবেশী, সর্বোপরি সকল মানুষের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতা এবং তাদের দুঃখে দুঃখিত হওয়ার মাস। বিশেষ করে স্বাভাবিক আয়-উপার্জন এবং রিযিকের সীমাবদ্ধ গন্ডির মধ্যে থেকেও একে অপরের অভাব, অস্থিরতা, বঞ্ছনা আর দুঃখের অংশিদার হওয়া এবং প্রয়োজনে সাহায্য ও খেদমত করার মাস। রোযার দিনে ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে তাক্কওয়া, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আল্লাহ্ তা‘আলার নির্দেশের আনুগত্য এবং ধৈর্য্যের গুণ সৃষ্টি করে, পাশাপশি রমাদ্বান মাস অপরের ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণা এবং দুঃখ-বেদনায় সৃষ্ট অস্থিরতার স্বাদ কিঞ্চিৎ হলেও অনুভব করার সুযোগ করে দেয়। সরাসরি ক্ষুধা-তৃষ্ণার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির ফলে আপনার মধ্যে সহানুভূতি এবং সহমর্মিতার শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত প্রেরণা সৃষ্টি হতে পারে।
নেকী, কল্যাণ ও তাক্কওয়ার গন্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত, এর শাখা-প্রশাখা অগণিত। ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো, রোগীর চিকিৎসা ও সেবা করা, ইয়াতীম ও অসহায়দের খোঁজ-খবর নেয়া, মুখাপেক্ষী ও প্রার্থনাকারীদের দান করা, নিকটাত্মীয়দের প্রতি স্বহৃদয় হওয়া ইত্যাদি; এ সব কিছুই সেই বিরাট গন্ডির অংশবিশেষ। আপনার পরিবার, আপনার আত্মীয়-স্বজন, আপনার বন্ধু-বান্ধব, আপনার দ্বীনি ভাই, আপনার পাড়া-প্রতিবেশী, সাধারণ মুসলমান, সর্বোপরি সব মানুষ এর হক্কদার। সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এই মহৎ প্রচেষ্টার প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং তা মানুষের মনে স্থায়ী করার উদ্দেশ্যে রোযাদারকে অত্যন্ত যত্নসহকারে ইফতার করানোর জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনুসারীদের উৎসাহিত করেছেন। সালমান ফারসী রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোযাদারকে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও যত্নসহকারে ইফতার করাবে, তার গুনাহ্ মোচন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি অবধারিত। রোযাদার যে পরিমাণ সওয়াব পাবে সেও সেই পরিমাণ সওয়াব পাবে। এ কারণে রোযাদারের সওয়াবে কোন ঘাটতি হবেনা।’ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সকলের নিকট তো একজন রোযাদারকে ইফতার করানোর মতো সমপরিমাণ খাদ্য নেই, ‘তিনি বলেন, ‘আল্লাহ্ তা‘আলা তাকেও সেই পরিমাণ সওয়াব দান করবেন যে এক ঢোক দুধ, একটি খেজুর বা এক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করাবে’ নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর বলেন, যে রোযাদারকে পেট পুরে খাওয়াবে, আল্লাহ্ তাকে আমার হাউস থেকে এমনভাবে সিক্ত করাবেন, জান্নাতে যাওয়ার আগে কখনো তার আর তৃষ্ণা পাবেনা’ (বায়হাকী)।
এ কারণে এ মাসে অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে আপনি আপনার ভাই-বোনদের খেদমত করার চেষ্টা করুন, ক্ষুধার্তকে খাবার দিন, মুখাপেক্ষিদের প্রয়োজন পুরন করুন, নিজের সম্পদ থেকে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদেরকে তাদের হক্ক দিয়ে দিন। এ কথা ভালোভাবে মনে রাখুন যে, গুনাহসমূহের ক্ষমা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি, হাউজে কাউসার থেকে সিক্ত হওয়া এবং জন্নাতে প্রবেশ করার মত সীমাহীন এবং মহৎ পুরষ্কারসমূহ শুধুমাত্র আল্লাহর সৃষ্টি জীবের খেদমতের মাধ্যমে পাওয়া যায় এবং এদের দুঃখ দেয়ার মাধ্যমে নামাজ-রোযা-সাদাকার নেকীর বড় বড় স্তুপ নিমিষে মিলিয়ে যায়। খেদমত ছোট বা বড় -এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
আপনার ক্ষমতার মধ্যে যা আছে তা দান করে দিন, যা আপনি করতে পারবেন তা করে ফেলুন, কোন ক্ষুদ্র বিষয়কে ক্ষুদ্র মনে করবেন না। এক বেলার খাবারই হোক অথবা এক গ্লস দুধ বা এক গ্লাস পানিই হোক, একটি টাকা হোক বা একটি ভালো কথা হোক, অথবা কারুর জন্য একটি সুপারিশই হোক, এমনকি একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরের তৃষ্ণা নিবারণই হোক, এসব কাজ আপনাকে জান্নাতে পৌঁছে দিতে প্রচন্ডভাবে সাহায্য করবে।

১০) কুরআনের দিকে আহ্বান
দশম বিষয় হচ্ছে মানবতাকে কুরআন ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করা। আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন যে, আল্লাহর অসন্তুষ্টি, আক্রোশ ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা, দোজখে যাওয়ার কাজ ও দোজখে যাওয়ার পথ থেকে উদ্ধার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজ ও পথে লাগিয়ে দেয়া একজন মানুষের জন্য অনেক অনেক বড় খেদমত, এর চেয়ে বড় সহমর্মিতা আর কি হতে পারে? পার্থিব ক্ষুৎ-পিপাসা পার্থিব জীবনাবসানের সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আখেরাতের ক্ষুৎ-পিপাসা কখনো শেষ হবেনা। সেখানকার দুঃখ-বেদনা থেকে কখনো মুক্তি পাওয়া যাবেনা, সেখানকার কাঁটার দংশন, রক্ত, পুঁজ আর ফুটন্ত পানির ঢোক্ স্থায়ী হয়ে থাকবে। এ জন্য যে খেদমতের মাধ্যমে সেখানকার ক্ষুৎ-পিপাসা নিবারণের ব্যবস্থা করা যায়, সেখানকার দুঃখ-বেদনা থেকে আত্মরক্ষা করা যায়, সেই খেদমতই তার জন্য সবচেয়ে বড় খেদমত। রোযাদারকে ইফতার করালে তার রোযার সমপরিমাণ সওয়াব আপনি পাবেন, ঠিক এমনিভাবে কাউকে নেকী ও কল্যাণের কাজে লাগিয়ে দিলে তার নেকী ও কল্যাণের কাজের সমপরিমাণ পূর্ণ সওয়াব আপনিও পাবেন। আপনি চিন্তা করে দেখুন এটা সওয়াব পাওয়ার বিরামহীন এক বিশেষ মহান পদ্ধতি।
কুরআনের কারণেই রমাদ্বান মাস সন্মান ও মর্যাদা পেয়েছে। মানুষের নিকট কুরআনের বাণী পৌঁছানোর জন্য কুরআন নাযিলের এই মাসের চেয়ে মোক্ষম সময় আর কি হতে পারে? মানুষের নিকট কুরআনের শিক্ষাসমূহ তুলে ধরুন, তাদেরকে কুরআনের মিশনের দিকে আহ্বান করুন, তাদেরকে কুরআনের দাবী পূরন করার জন্য তৈরী করুন। পবিত্র রমাদ্বান মাসে আপনার নিজস্ব কিছু কর্মসূচী থাকতে পারে। নিজের আত্মশুদ্ধি, কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ এবং নিজের জন্য অধিকতর নেকী সংগ্রহের দিকে আপনার মনযোগ থাকবে। তবে মনে রাখবেন, এই মনযোগের কারণে সবচেয়ে বড় নেকী, নেকী সংগ্রহের সর্ববৃহৎ পথ-যা কখনো শেষ হবার নয়-তা যেন আপনার দৃষ্টির বাইরে চলে না যায়। আল্লাহর দিকে আহ্বান আর কুরআনের দিকে আহ্বানের কাজে সবচেয়ে বেশী নেকী অর্জিত হয়, আর এটা শুধু নেকীর পুঁজি গঠনের সর্বাধিক লাভজনক পথই নয়, নিজের আত্মশুদ্ধি ও প্রশিক্ষণের সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী পদ্ধতিও বটে।
পবিত্র রমাদ্বান মাসে সাধারণতঃ মুসলমানদের মন আল্লাহর দিকে, নেকী ও কল্যাণের দিকে ঝুঁকে থাকে। এ কারণে তারা আগ্রহ নিয়ে আপনার কথা মনযোগ সহকারে শুনবে বলে আশা করা যায়, আপনার কথাগুলো তাদের অন্তরে স্থান করে নেবে, তাদের মন তা অতি সহজে গ্রহণ করে নিবে, কুরআনের মিশন বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে, আর এই উদ্দেশ্যেইতো আল্লাহ্ তা‘আলা নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং কুরআন মজিদ নাযিল করেছেন। এই কাজের দু’টি পদ্ধতি হতে পারে।
প্রথমটি হচ্ছে যে, আপনি রমাদ্বান উপলক্ষে নিজের জন্য নির্ধারিত কর্মসূচীর সাথে দাওয়াতে দ্বীনের কাজকেও শামিল করে নিবেন। কাউকে ইফতারের জন্য দাওয়াত করলে দাওয়াতে দ্বীনের কথা বলার জন্য কিছু সময় বের করে নিন। যাদের সাথে একই স্থানে কাজ করেন, তাদের  স্বাক্ষাৎ পেলে বা তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ হলে এই উদ্দেশ্য সামনে রাখুন, কথা শুরু করবেন রমাদ্বান মাস সম্পর্কে, আর সে কথা কুরআনের বাস্তবায়নে কিছু কাজ করার প্রয়োজনীয়তা পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে, বিশেষ এক ব্যক্তি বা একাধিক ব্যক্তিকে নিজের টার্গেট বানিয়ে নিন, এ মাসে তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে কুরআনের নির্দেশিত কাজ করার দিকে তাদের অগ্রসর করুন।

শেষ কথা
এই দশটি বিষয়ে আমি আপনাদের নিকট পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করেছি, কিন্তু আপনারা যদি গভীর মনযোগ সহকারে লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন, এ সব কিছুই একটি মাত্র উদ্দেশ্যের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ এবং পরস্পরের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আর এই আত্মীয়তা হচ্ছে যে, আমরা রমাদ্বান মাস থেকে সেই তাক্কওয়া, শক্তি এবং যোগ্যতা অর্জন করতে চাই, যার মাধ্যমে আমরা কুরআনের আমানতের হক্ক আদায় করার অধিকারী হতে পারি। এই উদ্দেশ্য একটি কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে সাফল্য শুধুমাত্র কুরআনের উপরই নির্ভরশীল। অপরদিকে আমাদের ভাগ্যে পার্থিব সম্মান ও মর্যাদা শুধুমাত্র কুরআনের কারণেই বৃদ্ধি হতে পারে। আমাদের পারলৌকিক মুক্তি ও কল্যাণ নির্ভর করবে কুরআনের সাথে আমাদের আচরণের উপর। কুরআন নির্দেশিত পথে আমরা কতটুকু চলছি, আর কুরআনের বাহকের আনুগত্য আমরা কতটুকু করছি তা বিবেচনা করা হবে।
পবিত্র রমাদ্বান মাস প্রতি বছর আসে, একের পর এক রমাদ্বান মাস আসে, আর শতাব্দী ধরে আসছে, আসতে থাকবে, একের পর এক কুরআন খতম করা হচ্ছে, হতে থাকবে, প্রতি রমাদ্বানে কুরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছে, হতে থাকবে, রোযা রাখা হচ্ছে, হতে থাকবে, নামাজ আদায় করা হচ্ছে, হতে থাকবে, যিকির ও দো‘আ করে রাত কাটিয়ে দেয়া হচ্ছে, হতে থাকবে, কিন্তু আমরা রমাদ্বান মাসের পূর্বে যেখানে ছিলাম, রমাদ্বান অতিবহিত হয়ে যাবার পরও সেই তিমিরেই পড়ে থাকি। রমাদ্বান বিহীন সময়ের মত রমাদ্বানের মধ্যেও আমরা তাক্কওয়া থেকে বঞ্চিত থেকে যাই, না আমাদের ব্যক্তিগত অবস্থায় কোন পরিবর্তন আসে আর না আমাদের সামষ্টিক চরিত্রে কোন সংশোধন আসে। না আমাদের জাতীয় জীবনে কোন পরিবর্তন দেখা যায়, আর না আমাদের উপর থেকে অপমান, অসম্মান, গোলামী ও পরাধীনতার মেঘ কেটে যায়।
এমনটি কেন হয়? প্রথম কারণ হচ্ছে পরামর্শ ভিত্তিক প্রচেষ্টা ছাড়া আমরা রমাদ্বানের সেই সীমাহীন কল্যাণ অর্জন করতে পারবোনা যার কোষাগার লুটিয়ে দেয়ার জন্য প্রতিবছর রমাদ্বান আমাদের উপর ছায়া বিস্তার করে। এই সতর্ক প্রচেষ্টা আর যত্নের অভাবে আমরা বঞ্চিত হই, অথচ এ ব্যাপারে আমরা একেবারেই অসচেতন। এটাই যদি আমাদের অবস্থা হয়, তাহলে তো আমরা তাদের অবস্থার বেশী নিকটবর্তী যাদের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা পরিত্যাগ না করে, সে ব্যক্তির পনাহার পরিত্যাগ করা আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই’ (বুখারী, আবু দাউদ)।
আল্লাহকে নিজেদের রব বলা, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর রাসূল মানা, কুরআনকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে স্বীকার করা, এরপর এটা না জানার ভান করা যে উপরোক্ত বিষয়গুলো আমাদের নিকট কি দাবী করে এবং সে সবের উপর আমল না করার অর্থ এসবকিছু মিথ্যা, আর মিথ্যার উপর আমল না করাইতো উচিৎ! নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মুনাফিকরা এসে বলতো, ‘আপনি আল্লাহর রাসূল’ এব্যপারে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেন, ‘এরা কথাতো বলে সত্যি, তথাপি এরা মিথ্যুক, মুখে সত্য কথা বললেও মানুষ মিথ্যুক হতে পারে, যদি সে সত্য কথার দাবী পুরণ না করে এবং সে অনুযায়ী কাজ না করে।
দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আমাদের ইবাদাত, আমাদের নামাজ, আমাদের রোযা, আমাদের আমল, আমাদের কর্মতৎপরতা, সব কিছুরই সম্পর্ক সেই উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যা কুরআন নিয়ে এসেছিল এবং যে কারণে রমাদ্বানের রোযা ফরজ করা হয়েছিল, সবকিছু এ জন্যই ছিল যেন আমরা কুরআনকে তাঁর বান্দাদের নিকট পৌঁছে দেই এবং সেই পথে ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালাই এবং ত্যাগ করতে থাকি।
পবিত্র রমাদ্বান মাস একবার আবার এ আহ্বান নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে এবং আমাদেরকে ডেকে বলছে, ‘এসো এবং জেনে নাও আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআন মজীদে তোমাদের জন্য কি বলেছেন, এসো আল্লাহ্ তা‘আলার নিষেধ করা সকল কাজ থেকে বিরত থাকো, তোমাদের নিকট তা যত প্রিয় ও আকর্ষণীয় বস্তুই হোক না কেন। যদি তা না কর, এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তোমাদের জন্য আর কি হতে পারে যে, তোমাদের নিকট রমাদ্বান মাস এলো, তোমরা রোযাও রাখলে, ক্ষুধা-তৃষ্ণাও সহ্য করলে, রাতের ঘুম ত্যাগ করলে, তারাওয়ীও আদায় করলে, এতসব কিছুর পরও ক্ষুধা-তৃষ্ণা আর অস্থিরতা ব্যতীত আর কিছুই তোমরা পেলেনা; বরং তাওরাতের বাহকদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা‘আলা যে উদাহরণ দিয়েছেন, আল্লাহ্ না করুন তোমাদের উপর যেন সেই দৃষ্টান্ত সত্যে পরিণত না হয়, সে ব্যাপারে আল্লাহ্ তা‘আলা সূরা আল জুম‘আ’র ৬২:৫ নং আয়াতে বলেছেন,
مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَ‌اةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ‌ يَحْمِلُ أَسْفَارً‌ا ۚ بِئْسَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِ اللَّـهِ ۚ وَاللَّـهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِي .
অর্থাৎ, ‘যাদের উপর তাওরাতের আমানতের বোঝা অর্পিত হলো, আর তারা সে আমানতের দাবী পুরণ করলোনা, তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধার মত যে নিজের পিঠে শুধু কিতাবের বোঝা বহন করে চলেছে’। অথবা আমাদের অবস্থা এমনটি যেন না হয় যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদ্বান আর কুরআনের ব্যাপারে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন,
 وَقَالَ الرَّ‌سُولُ يَا رَ‌بِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَـٰذَا الْقُرْ‌آنَ مَهْجُورً‌ا
অর্থাৎ ‘রাসূল বলবেন, হে আমার প্রভূ! আমার জাতি কুরআনকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে’ (সূরা ফোরকানঃ ২৫:৩০)।
সবশেষে আমি দো‘আ করছি যে, আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সকলকে পবিত্র রমাদ্বান মাসে সেই তাক্কওয়া অর্জন করার তৌফিক দান করুন, যার মাধ্যমে আমরা কুরআনের হেদায়াত গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করবো, কুরআনের জ্ঞান অর্জন করবো, তার উপর আমল করবো, আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে কুরআনের দাবী নিয়ে দাঁড়ানোর এবং তাকে প্রতিষ্ঠিত করার সাহস, উদ্দম, দৃঢ়তা এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা দান করুন! আমীন!
সর্বশেষ আপডেট ( Monday, 13 August 2012 )