আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান   
Monday, 25 November 2013
আর্টিকেল সূচি
আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব
১. আধুনিক বিশ্বে ইসলামী পুনর্জাগরণ
২. বর্তমান প্রেক্ষাপট
৩.দেশে দেশে জন আকাঙ্ক্ষাঃ ইসলামী বিপ্লব
৪. ইসলামী বিপ্লব কি?
৫. ইসলামী বিপ্লবের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
৬. বিপ্লব এনেছে জনতা
৭. জনতাই ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে
৮. ইসলামী বিপ্লবের দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্য
৯. ইসলামী বিপ্লবের ভিত্তি
১০. বিপ্লব রপ্তানি করা যায় না
১১. ইসলামী বিপ্লব সার্বজনীন
১২. ইসলামী বিপ্লব প্রসংগে মাওলানা মওদূদী
১৩. ইসলামী বিপ্লবের মডেল
১৪. ইসলামী আন্দোলনের চিত্র
১৫. ইসলামের মূল দাওয়াত
১৬. সংগঠন
১৭. ক্যাডার সিসটেম
১৮. নেতৃত্ব
১৯. গণতন্ত্রের শ্লোগান ও ইসলামী বিপ্লব
২০. রাজনৈতিক স্ট্যাটেজি
২১. ইসলামী আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতা
২২. সমস্যার মোকাবিলায় করণীয়
২৩. গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি
২৪. গণচেতনার স্তর
২৫. জনতার দাবী
২৬. ইসলামী বিপ্লবের শর্ত
২৭. বিপ্লবের প্রক্রিয়া

১. আধুনিক বিশ্বে ইসলামী পুনর্জাগরণ

বিশ্ব মানবতা আজ এক মহা সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব, দুর্বলের উপর সবলের আধিপত্য এবং জুলুম, পারমাণবিক রণসজ্জা এবং বিবেকহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশ্ববাসীকে অশান্তির অনলে নিক্ষেপ করেছে। বিপথগামী মানুষের মুক্তির জন্য যুগে যুগে এ বিশ্বজাহানের মহান স্রষ্টা ও প্রভু আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছেন নবী-রাসূল ও আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ)। তাঁরা মানব জাতির শান্তি ও মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। মানবতাকে ধ্বংস ও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ প্রেরিত ঐসব মহা মনীষীগণ দুনিয়াতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দুর্জয় সংগ্রাম চালিয়েছেন। মানব জাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
সর্বকালের, সর্বযুগের সকল মানুষের মুক্তিদূত, মানবতার মহান বন্ধু ও শিক্ষক রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐসব মহাপুরুষদের সর্বশেষ ব্যক্তিত্ব, আখেরী নবী। আইয়ামে জাহেলিয়াতের সমাজে আবির্ভূত হয়ে তিনি বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব সাধন করে প্রতিষ্ঠা করেন শান্তির সমাজ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার অনুকরণে গড়ে উঠে ‘খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত’ বা নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত ব্যবস্থা। বত্রিশ বছরকাল এই ইসলামী খেলাফত সঠিক পদ্ধতির উপর কায়েম ছিলো।
হযরত হুসাইন রা.- এর কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিক শাহাদাতের মধ্য দিয়েই সূচনা হয় ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের। পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যবস্থাকে সঠিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চলেছে এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। এজন্য প্রতি শতাব্দীতেই আবির্ভাব হয়েছে অসম সাহসী, স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বুদ্ধিদীপ্ত মুজাদ্দিদের। এই মুজাদ্দিদগণ নিজের পরিবেশ, সমসাময়িক জটিলতা, যুগের বিকৃত গতিধারা, ভ্রান্ত চিন্তার বিরুদ্ধে জেহাদ করার ক্ষমতা ও সাহস, নেতৃত্বের জন্মগত যোগ্যতা এবং ইজতিহাদ ও পুনর্গঠনের অসাধারণ ক্ষমতার বৈশিষ্ট্যে ছিলেন সমুজ্জ্বল। পরিবেশ-পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন, সংস্কারের পরিকল্পনা প্রণয়ন, চিন্তার রাজ্যে বিপ্লব সৃষ্টি, ইসলামী নেতৃত্বদানের মতো লোক তৈরী, দ্বীন ইসলামের গবেষণা-ইজতিহাদ, ইসলামের প্রসার ও বিকাশ তথা বিশ্বজনীন বিপ্লব সৃষ্টির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে তারা ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন।
ইসলামী পুনর্জাগরণের এ সংগ্রামে হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ র. (৬১-১০১ হিজরী), ইমাম আবু হানিফা র. (৮০-১৫০ হিজরী), ইমাম মালেক র. (৯৫-১৭৯ হিজরী), ইমাম শাফেয়ী র. (১৫০-২৪০ হিজরী), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র. (১৬৪-২৪১ হিজরী), ইমাম গাজ্জালী র. (৪৫০-৫০৫ হিজরী), ইমাম ইবনে তাইমিয়া র. (৬৬১-৭২৮ হিজরী), শায়খ আহমদ সরহিন্দ মুজাদ্দিদে আলফেসানী র. (৯৭৫-১০৩৪ হিজরী), শাহ ওয়ালিউল্লাহ র. (১১১৪-১১৭৬ হিজরী), সৈয়দ আহমদ শহীদ র. (১২০১-১২৪৬ হিজরী), এবং শাহ আবদুল আজিজ র. প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা যে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ত্যাগের আদর্শ স্থাপন করেছেন তা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইসলামী পুনর্জাগরণের এ ধারা ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় আজও অব্যাহত রয়েছে। সমস্যা সংক্ষুব্ধ আজকের পৃথিবীর দেশে দেশে চলছে এ পুনর্জাগরণ প্রচেষ্টা। পুঁজিবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট বিশ্ব মানবতা ছুটে চলেছে আজ শান্তির অন্বেষায়। সেদিন বেশী দূরে নয় যেদিন মানুষের তৈরী পুঁজিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটবে এবং অবসান ঘটবে বিশ্বময় জুলুম, শোষণ, নির্যাতন এবং নিপীড়নের। আবার দুনিয়ায় কায়েম হবে ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত’ অর্থাৎ নবুয়াতের পদ্ধতিতে খিলাফত। নবী করীম সা. এ সম্পর্কে হাদীসে সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এ প্রসঙ্গে শাহ ইসমাঈল শহীদ র. তাঁর ‘মানসাবে ইমামত’ গ্রন্থে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তাঁর উল্লেখ করা যেতে পারেঃ
(****************************)
‘‘তোমাদের দ্বীন এর আরম্ভ নবুয়াত ও রহমতের মাধ্যমে এবং তা তোমাদের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ চান। অতঃপর মহান আল্লাহ তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে যতদিন আল্লাহ চান। অতঃপর আল্লাহ তাও উঠিয়ে নেবেন।
তারপর শুরু হবে দুষ্ট রাজতন্ত্রের জামানা এবং যতদিন আল্লাহ চাইবেন তা প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তাও উঠিয়ে নেবেন।
অতঃপর জুলুমতন্ত্র শুরু হবে এবং আল্লাহ যতদিন চাইবেন, ততদিন থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তাও উঠিয়ে নেবেন।
অতঃপর আবার নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে। নবীর সুন্নাত অনুযায়ী তা মানুষের মধ্যে কাজ করে যাবে এবং ইসলাম পৃথিবীতে তার কদম শক্তিশালী করবে। সে সরকারের উপর আকাশবাসী ও পৃথিবীবাসী সবাই খুশী থাকবে। আকাশ মুক্ত হৃদয়ে তার বরকত বণ্টন করবে এবং পৃথিবী তার পেটের সমস্ত গুপ্ত সম্পদ উদ্গীরণ করে দেবে।’’ – (তিরমিযী)
এ হাদীসে ইতিহাসের পাঁচটি পর্যায়ের দিকে ইশারা করা হয়েছে। তার মধ্যে তিনটি পর্যায় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে এবং চতুর্থ পর্যায়টি বর্তমানে চলছে। শেষে যে পঞ্চম পর্যায়টি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে সমস্ত আলামত একথা ঘোষণা করছে যে, মানুষের ইতিহাস দ্রুত সেদিকে অগ্রসর হচ্ছে। মানুষের গড়া সকল মতবাদের পরীক্ষা হয়ে গেছে এবং তা ভীষণভাবে ব্যর্থও হয়েছে। বর্তমানে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মানুষের ইসলামের দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। [ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী, পৃষ্ঠা-২২] সাইয়েদ কুতুম শহীদ এ সম্পর্কে নিম্বরূপ মন্তব্য করেছেনঃ
এতদসত্ত্বেও এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, ভবিষ্যৎকাল এ ধর্মের জন্য নির্ধারিত। এ ধর্মীয় ব্যবস্থার সুউচ্চ ও মহান পরিকল্পনা এবং এমন একটা ব্যবস্থার জন্য মানবজাতির স্বাভাবিক প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, ইসলামই হচ্ছে আগামী সভ্যতার ধর্ম। এক নজিরবিহীন ভূমিকা পালনের জন্য সে আহুত হবে। কেননা ইসলামের শত্রুরা স্বীকার করুক আর নাই করুক এ ভূমিকা অপর কোন ধর্ম বা মতবাদ দ্বারা পালিত হতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করি, গোটা মানবজাতি আর অধিক কাল এ ধর্মকে এড়িয়ে থাকতে পারবে না। আত্মরক্ষার মহা তাগিদেই মানুষ একে গ্রহণ করবে।
আজকের মানুষের জন্য ইসলামের প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগের মানুষের জীবনে ইসলামের প্রয়োজনের মতোই তীব্র। আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস যে, এমনি এক পরিস্থিতিতে অতীতে যা ঘটেছে আজকে বা আগামীতেও তাই ঘটবে। বস্তুবাদী সভ্যতার প্রসার ও ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের উপর জুলুম-নির্যাতন চলা সত্ত্বেও আমাদের মনে যেন সংশয়বাদ সামান্যতম রেখাপাত না করতে পারে। ইসলামের বিরুদ্ধে জঘন্য অন্যায় ও অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এটা সত্য মহা্গ্রন্থ আল কোরআনের অবমাননা করা হচ্ছে। কিন্তু সত্যের শক্তি ইসলামের পক্ষে। সব প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার চড়াই উতরাই পেরিয়ে কালজয়ী হবার সামর্থ আছে ইসলামের।
আমরা একা নই। প্রকৃতি আমাদের পক্ষে। অস্তিত্বের প্রকৃতি এবং মানব প্রকৃতি মহাশক্তিধর এ শক্তি সভ্যতার অপরাপর শক্তির চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি ও সভ্যতার মধ্যে যখন সংঘর্ষ বাধে তথন সংঘর্ষকাল যত দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত হোক না কেন প্রকৃতি বিজয়লাভ করে। [অনাগত মানব সভ্যতা ও ইসলাম, সাইয়েদ কুতুব শহীদ, পৃষ্ঠাঃ ৭২-৭৪]



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 30 November 2013 )