আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান   
Monday, 25 November 2013
আর্টিকেল সূচি
আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব
১. আধুনিক বিশ্বে ইসলামী পুনর্জাগরণ
২. বর্তমান প্রেক্ষাপট
৩.দেশে দেশে জন আকাঙ্ক্ষাঃ ইসলামী বিপ্লব
৪. ইসলামী বিপ্লব কি?
৫. ইসলামী বিপ্লবের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
৬. বিপ্লব এনেছে জনতা
৭. জনতাই ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে
৮. ইসলামী বিপ্লবের দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্য
৯. ইসলামী বিপ্লবের ভিত্তি
১০. বিপ্লব রপ্তানি করা যায় না
১১. ইসলামী বিপ্লব সার্বজনীন
১২. ইসলামী বিপ্লব প্রসংগে মাওলানা মওদূদী
১৩. ইসলামী বিপ্লবের মডেল
১৪. ইসলামী আন্দোলনের চিত্র
১৫. ইসলামের মূল দাওয়াত
১৬. সংগঠন
১৭. ক্যাডার সিসটেম
১৮. নেতৃত্ব
১৯. গণতন্ত্রের শ্লোগান ও ইসলামী বিপ্লব
২০. রাজনৈতিক স্ট্যাটেজি
২১. ইসলামী আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতা
২২. সমস্যার মোকাবিলায় করণীয়
২৩. গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি
২৪. গণচেতনার স্তর
২৫. জনতার দাবী
২৬. ইসলামী বিপ্লবের শর্ত
২৭. বিপ্লবের প্রক্রিয়া

১৮. নেতৃত্ব
একটি কাঙ্ক্ষিত বিপ্লবের জন্য নেতৃত্বের ভূমিকা এবং অবদান অনস্বীকার্য। প্রচলিত ক্ষমতা দখলের রাজনীতির নেতৃত্ব থেকে বিপ্লবী নেতৃত্বের পার্থক্য অনেক। প্রচলিত রাজনীতিতে মোটামুটিভাবে কিছু কলাকৌশল অবলম্বন বা ঝোপ বুঝে কোপ দিতে পারলে সাফল্য লাভ সহজ হয়ে যায়। কিন্তু বিপ্লব এর চাইতেও অনেক বড় ব্যাপার এবং অনেক কঠিন ব্যাপার। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন হয় ক্ষেত প্রস্তুতের এবং প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপায়-উপকরণ সংগ্রহের। প্রচলিত সমাজ কাঠামো ভেংগে যারা নতুন সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সাহসিকতা পোষণ করেন কেবলমাত্র তারাই বিপ্লবী নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
একটি নির্দিষ্ট জনপদে বা ভূখণ্ডে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাংক অনুসরণ করে একটি বিপ্লব সৃষ্টির জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন নেতৃত্ব হচ্ছে তার মধ্যে পয়লা নম্বরের উপাদান। নেতৃত্বের উদ্যোগ এবং অগ্রগামী ভূমিকা ব্যতীত কোন বিপ্লব প্রত্যাশা অর্থহীন। ইসলাম প্রতিষ্ঠাকামীদের মধ্য থেকেই কেউ না কেউ সহজাতভাবেই এ দায়িত্বে এগিয়ে আসবেন। নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে আল্লাহর দান। সব মানুষকে আল্লাহ তায়ালা এক ধরণের যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেন না। নেতৃত্বের গুণাবলী নিয়ে অনেকে আসেন। বিকাশ লাভের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর নেতৃত্ব গড়ে উঠা নির্ভর করে। পরিস্থিতিগত কারণে নেতৃত্বের বিকাশ বা আবির্ভাব ঘটে থাকে। ঘটনা পরস্পর নেতৃত্বের ভূমিকায় যিনি দায়িত্ব পালন করেন অনেক সময় তিনি বুঝেও উঠতে পারেন না, তিনি কত বড় দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন।
ইসলামী বিপ্লবের যিনি বা যারা নেতৃত্ব দেবেন তাদের অবশ্যই সার্বিক ইসলামী গুণে গুণান্বিত হতে হবে। ইসলামের তাত্ত্বিক বা একাডেমিক দিকের পড়াশুনা, জ্ঞান (ইলম) অবশ্যই এতটুকু হতে হবে যে, কোরআন হাদীস থেকে ইসলামকে সরাসরি বুঝতে পারেন। কোরআন হাদীসের সরাসরি জ্ঞান ছাড়া এতবড় দায়িত্ব পালনের কথা চিন্তা করা যায় না। মুসলিম জাহানে পাশ্চাত্য প্রভাবিত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলনের প্রচেষ্টায় এমন অনেক লোক তৈরী হচ্ছেন যারা সরাসরি কোরআন হাদীস থেকে ইসলামের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। তাছাড়া সমসাময়িক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি ক্ষেত্রের উন্নতি এবং সমাজ বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস সম্পর্কেও নেতৃত্বকে ভালোভাবে অবহিত হতে হবে।
আমানতদারী, খোদাভীতি, দৃঢ়তা, সাহসিকতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ছাড়াও নেতৃত্বের জন্য তীক্ষ্ণ ইতিহাস-জ্ঞান ও রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি অপরিহার্য। সংগ্রাম সংঘাত এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই জনগণের মধ্য থেকে এ নেতৃত্ব বিকশিত হবে। একথা মনে করার কারণ নেই যে, গণবিচ্ছিন্নভাবে কোন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটবে।
অনেকে জননন্দিত শক্তিধর ব্যক্তিত্বকে বিপ্লবের একমাত্র উপাদান মনে করেন। পৃথিবীতে অনেক প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে থাকে। কিন্তু তারা সবাই বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেন না। এ ধরনের ব্যক্তিত্ব হঠাৎ করে জ্বলে উঠে নিভে যেতে পারে, একটি সময়ের জন্য ক্যরিজমা বা চমক সৃষ্টিও করতে পারে। স্বাভাবিক গতিতে গড়ে উঠা একটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যদি কোন নেতৃত্ব গড়ে উঠে কেবলমাত্র সেই নেতৃত্বের পক্ষেই গোটা পরিস্থিতি মুকাবিলা করা সহজ। কোন সহজ বা কৃত্রিমভাবে নেতৃত্ব বিকাশ লাভ করতে পারে না। আন্দোলনকে যেমন অনেক চড়াই উৎরাই অতিক্রম করতে হয় তেমনি নেতৃত্বকে অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে আসতে হয়। ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বকে মানুষ হিসেবে একজন অত্যন্ত উঁচুদরের মানুষ হতে হয়। মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অকৃত্রিম সহানুভুতি না থাকলে কেউই ইসলামী আন্দোলনের বড় নেতা হতে পারে না।  সাময়িকভাবে কেউ হয়তো বা খ্যাতির শীর্ষেও আরোহণ করতে পারেন এমনকি সাফল্যও লাভ করতে পারেন। কিন্তু তাই বলে মানুষের হৃদয় জয় করতে একটি আদর্শিক বিপ্লব সাধন করার মত মহৎ কাজ তাঁর দ্বারা সম্পাদিত নাও হতে পারে। একজন মানুষ হিসেবেই তিনি মানুষের আস্থা লাভ করবেন এবং তিনি যে জনপদের অধিবাস সেখানকার জনগণের আস্থা অর্জন করবেন। আদর্শিক দুশমন ও তার চরিত্র সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলবেন। আল্লাহর নবী সা.-কে মক্কার কাফের মুশরিকরা আদর্শের কারণে বরদাশত করতে পারেনি কিন্তু সেই সমাজই তাকে আল আমিন, আস-সাদিক খেতাব দিয়েছিল। তার উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সকলেই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। তাদের দৃষ্টিতে মুহাম্মদ সা.- এর প্রধান ত্রুটিই ছিল বাপ-দাদার ধর্ম ও রসম-রেওয়াজ বাদ দিয়ে এক অভিনব নতুন ধর্মের কথা বলছিলেন। তারা ভালো করেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, নবী মুহাম্মদ সা.-এর বক্তব্য মেনে নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্ব খতম হয়ে যাবে। এ কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তিই সর্বশক্তি দিয়ে নবীজির সা. নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু নবীজীর উন্নত নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে সকলেই অবহিত ছিলেন। নবীদের নিষ্পাপ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও কোন সাধারণ মানুষের অর্জন করার প্রশ্নই উঠে না। তবে একথা ঠিক যে, সমাজ ভালো মানুষকে ভালো মানুষ হিসেবে যে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বকে তা লাভ করতে হবে; ততটুকু গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে।
ইসলামী নেতৃত্ব বিভিন্ন ধরণের মানুষ, জনশক্তি ও বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষার অবশ্যই সাফল্যের পরিচয় দিবেন। এ পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরণের যোগ্যতা, গুণাবলী সম্পন্ন মানুষের সমাবেশ। নানা ধরণের লোককে বিভিন্নভাবে কাজে লাগানোই নেতৃত্বের দক্ষতা। নেতৃত্ব অবশ্যই পক্ষপাতদুষ্ট হবেন না, একাদর্শি হবেন না। নিকটবর্তী স্তাবকদের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। প্রশংসায় বিগলিত হবেন না, যত্রতত্র বা ত্বরিত মন্তব্য করবেন না, উত্তেজিত এবং অসংযত হবে না।
সংগী সাথীদের ব্যাপারে খুবই যত্নবান হবেন। যে নেতৃত্ব তার সংগী সাথীদের মধ্য থেকে আরও অধিকতর যোগ্যতা ও প্রতিভাসম্পন্ন নেতৃত্ব বিকাশে ব্যর্থ হন তারা আসলেই ব্যর্থ। যে নেতৃত্ব বড় বট গাছের মত তার ছায়ায় আর কিছুই বাড়তে দেন না সে নেতৃত্ব ব্যর্থ। যে নেতৃত্ব যোগ্যতা সম্পন্ন উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন না ইতিহাস তাদেরকেও ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করবে।
আধুনিক সমাজে ইসলামী নেতৃত্বকে শুধুমাত্র সমমনা ইসলামী জনশক্তির আস্থা অর্জন করলেই চলবে না বরং বিভিন্ন সামাজিক শক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে এবং সফল সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঐক্যের যোগসূত্র রচনা করতে হবে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতৃত্বকে অগ্রগামী এবং পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিস্থিতির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা ছাড়া এবং বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি ছাড়াও যা বেশি প্রয়োজন তাহলো গভীর অন্তর্দৃষ্টি, আদর্শিক এবং নৈতিক দৃঢ়তা। বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান নেতাকে দার্শনিক পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে হবে। জ্ঞান চর্চা ও সাধনায় তাকে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য সময় দিতে হবে। তাকে খুবই সক্রিয়, সচল এবং উদ্যোক্তা হতে হবে। উদ্ভূত যে কোন কঠিন পরিস্থিতিতে আবেগমুক্ত এবং শান্তভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা নেতার মধ্যে থাকতে হবে। অসাধারণ সাহসিকতা ছাড়া অসাধারণ নেতৃত্ব হয় না এবং অসাধারণ নেতৃত্ব ছাড়া বিপ্লব আসতে পারে না। আর বিপ্লব তো নিজেই অসাধারণ।
দেশময় একটি নেতৃত্বের নেটওয়ার্ক বা কাঠামো নির্বাচন ছাড়া বিপ্লবের চিন্তা করা যায় না-নেতৃত্বের সবচাইতে বড় কাজ সম্ভবতঃ এটাই। নেতার একটি বহুমুখী যোগ্যতাসম্পন্ন টিম থাকাই যথেষ্ট নয়। বিপ্লব ধরে রাখার মত প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বেশি কিছু লোকের সমাবেশ আন্দোলনের হাই কমান্ডে সমবেত হলেই রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপ্লব সফল করে বিপ্লব পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে বলে মনে করার কোন যুক্তিপূর্ণ কারণ নেই। জনগণ এবং নেতৃত্বের মাঝে যোগসূত্র রচনাকারী নেতৃত্বের প্রয়োজন অনেক বেশী। নেতৃত্ব তখনই শক্তি অর্জন করতে পারে যখন জনগণের সাথে যোগসূত্র রক্ষাকারী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লিংকম্যান তৈরী হয়। আন্দোলনের বাণী গ্রামে গঞ্জে মানুষের কাছে বহন করে নিয়ে যায় এ লিংকম্যান লিডারশীপ। ইসলামী আন্দোলনের এ লিংকম্যানরা যতবেশী দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন হবেন ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব তত মজবুত হবে।
মানুষের সাথে ব্যবহার, আচার-আচরণ, চাল-চলন, লেন-দেন, উঠা-বসা, সৌজন্যতা-ভদ্রতা, আতিথেয়তা, দয়া-দানশীলতা, দরদ-ভালোবাসা, নিয়মানুবর্তিতা, অল্পে তুষ্টি, পরিশ্রমপ্রিয়তা সহনশীলতা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বকে অবশ্যই উন্নততর হওয়া উচিত।
কোন্ কাজটির তিনি অগ্রাধিকার দিবেন, কোন্ কাজে কতটা সময় ও শক্তি ব্যয় করবেন এ বিষয়ে নেতা নিজে সতর্ক হবেন তবে নিকটবর্তী লোকদেরও এ ব্যাপারে দায়দায়িত্ব আছে। মনে রাখতে হবে যে, কৃত্রিমভাবে কাউকে নেতৃত্বে সমাসীন করা যাবে না। বক্তৃতা-ভাষণ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জনতাকে আকৃষ্ট করার জন্য এটা ভালো। জনতাকে আকৃষ্ট করার মত ব্যক্তিত্ব হলেই যে কেউ নেতা হয়ে যেতে পারবেন এমন আশা সুদূরপরাহত। উপরের আলোচিত বৈশিষ্ট্যসমূহের যদি সমন্বয় ঘটে তা হলে ভালো ধরণের একটি নেতৃত্ব বের হয়ে আসতে পারে।
নেতৃত্বের নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক শক্তি আন্দোলনের সাফল্যের জন্য এক বড় ধরণের উপাদান। জনগণের মধ্যে ইসলামী নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার বড় কারণ নেতৃত্বের আধ্যাত্মিক শক্তি। আধ্যাত্মিক শক্তি বলতে এখানে প্রাকৃতিক কোন কিছুকে বুঝানো হয়নি। ইসলাম যে তাকওয়া, পরহেজগারী এবং চরিত্র দাবী করেছে, তাই, প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূর সা.-এর পছন্দ অপছন্দের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি, আদল, ইনসাফ, এহসানের অধিকারী হওয়াই বড় আধ্যাত্মিকতা। জীবনাচার এবং বাস্তব কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই তা প্রকাশিত হবে। যেকোনে ধরণের স্বার্থচিন্তা এবং দুনিয়াদারীর ঊর্ধে হবেন এ নেতৃত্ব। আল্লাহর স্মরণ বা যিকির এবং আখেরাতের চিন্তায় অবশ্যই অগ্রসর কাতারের অন্তর্ভুক্ত হবেন। মানবীয় গুণাবলীর উন্নততর বিকাশ তার মধ্যে যেমনি ঘটবে তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দোষত্রুটি থেকেও তিনি মুক্ত থাকতে প্রয়াসী হবেন।
মুসলিম দেশগুলোতে যে রাষ্ট্রীয় এবং সমাজ কাঠামো গড়ে উঠেছে তাতে সত্যিকার ইসলামী আদর্শের অনুসারীরা অনেক পেছনে পড়ে গিয়েছে। সর্বত্র যে স্বার্থপর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছে সে নেতৃত্ব কায়েমী স্বার্থের প্রতীক। ‘‘ইসলামকে পুনরায় মানব জাতির নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে মুসলিম উম্মাহকে তার আসল রূপ পুনরুদ্ধার করতে হবে। মুসলিম উম্মাহ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানব রচিত রীতিনীতির আবর্জনায় চাপা পড়ে রয়েছে। ইসলামী শিক্ষার সাথে সেসব ভ্রান্ত আইন কানুন আচার আচরণের দূরতম সম্পর্কও নেই, যেগুলোর গুরুভারে আজ মুসলিম উম্মাহ নিষ্পিষ্ট।--- এবং মানব গোষ্ঠীর নেতৃত্ব অনেক আগেই অন্যান্য আদর্শ, অনৈসলামিক ধ্যান-ধারণা, ভিন্ন ধরণের জীবন বিধান ও অমুসলিম জাতিগুলোর করায়ত্ব হয়ে রয়েছে।’’ [Mile Stone, সাইয়েদ কুতুব শহীদ]
মুসলিম দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের অবস্থাও ঠিক অনুরূপ। ইসলামী আদর্শের বিজয় এবং পুনরুজ্জীবনের সাথে জাতীয় নেতৃত্ব এবং বিশ্ব নেতৃত্ব গ্রহণের প্রশ্নটিও জড়িত। ইসলামী ইনকিলাবের জন্য এটি অনিবার্য।
একথা ঠিক যে, আজকে বিশ্ব নয়া নেতৃত্বের প্রত্যাশীঃ
‘‘It is essential for mankind to have a new leadership!
The leadership of mankind by Western man is now on the decline, not because Western culture has become poor materially or because its economic and military power has become weak. The period of the Western system has come to an end primarily because it is deprived of those life-giving value which enbled it to be the leader of mankind.
It is necessary for rhe new leadership to preserve and develop the material fruits of the creative genius of Europe, and also to provide mankind with such high ideals and values as have so far remined undiscovered by mankind, and which will also acquaint humanity with a way of life which is harmonious with human nature, which is positive and contructive, and which is practicable.
Islam is the only system which possesses those values and this way of life.’’ [Mile Stone, সাইয়েদ কুতুব শহীদ]
অনুবাদঃ ‘‘মানব জাতির জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে একটি নতুন নেতৃত্বের। পাশ্চাত্য এখন মানব জাতির নেতৃত্ব দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এটা এজন্য নয় যে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আসলে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে বা তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে পাশ্চাত্য ব্যবস্থা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে এজন্য যে, যে মূল্যবোধ ও জীবনীশক্তি সঞ্চারকারী গুণাবলী তাদের মানবতার নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দিল সেসব গুণাবলী আজ আর তাদের মধ্যে নেই।
অনাগত দিনের নতুন নেতৃত্বকে ইউরোপের সৃজনশীল প্রতিভার অবদানগুলোকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানব জাতির সামনে এমন মহান আদর্শ ও মূল্যবোধ পেশ করতে হবে যা আজ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃতই রয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যত নেতৃত্বকে মানব জাতির সামনে একটি ইতিবাচক গঠনমূলক ও বাস্তব জীবন বিধান পেশ করতে হবে যা মানব স্বভাবের সঙ্গে সুসামঞ্জস্যশীল।
একমাত্র ইসলামী ব্যবস্থাই উল্লেখিত মূল্যবোধ ও জীবন বিধান দান করতে সক্ষম।’’
বিশ্ব আজ যে নয়া নেতৃত্বের প্রত্যাশী সে নেতৃত্বকে জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে কাজ করতে হবে। এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিশ্ব নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের জন্য কাঙ্ক্ষিত গুণাবলী অর্জন করতে হবে। আজকে বিশ্ব নেতৃত্বে যারা অধিষ্ঠিত তাদের বিজ্ঞান, কারিগরি ও বস্তুতান্ত্রিক অগ্রগতিকে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা চ্যালেঞ্জ করতে পারবো না। তাই আমাদের এমন সব গুণাবলী অর্জন করতে হবে যা আধুনিক সভ্যতায় বিরল।
‘‘To attain the leadership of mankind, we must have something to offer beside material progress, and this other quality can only be a faith and a way of life which on the one hand conserves the benefits of modern science and technology, and on the other, fulfils the basic human needs on the same level of excellence as technology has fullfilled them in the sphere of material comfort.’’ [Mile Stone, সাইয়েদ কুতুব শহীদ]
অনুবাদঃ মানব জাতির নেতৃত্বদানের জন্য আমাদের বৈষয়িক উন্নতি ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু পেশ করতে হবে। আর তা হচ্ছে মানব জীবনকে মৌলিক বিশ্বাস (ঈমান) এবং ঐ বিশ্বাসের ভিত্তিতে রচিত একটি জীবন বিধান। এ বিধান বিস্ময়কর বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কারিগরী বিদ্যায় সকল অবদান সংরক্ষণ করবে। সাথে সাথে মানব জাতির মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষের কল্যাণের যেসব চমকপ্রদ উদ্যোগ আয়োজন করেছে, তার মান বজায় রাখতে সক্ষম হবে। আর এ বিশ্বাস (ঈমান) ও জীবন বিধান মানব সমাজে তথা মুসলিম সমাজে বাস্তব রূপ ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করবে।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 30 November 2013 )