আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান   
Monday, 25 November 2013
আর্টিকেল সূচি
আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব
১. আধুনিক বিশ্বে ইসলামী পুনর্জাগরণ
২. বর্তমান প্রেক্ষাপট
৩.দেশে দেশে জন আকাঙ্ক্ষাঃ ইসলামী বিপ্লব
৪. ইসলামী বিপ্লব কি?
৫. ইসলামী বিপ্লবের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
৬. বিপ্লব এনেছে জনতা
৭. জনতাই ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে
৮. ইসলামী বিপ্লবের দুটো প্রধান বৈশিষ্ট্য
৯. ইসলামী বিপ্লবের ভিত্তি
১০. বিপ্লব রপ্তানি করা যায় না
১১. ইসলামী বিপ্লব সার্বজনীন
১২. ইসলামী বিপ্লব প্রসংগে মাওলানা মওদূদী
১৩. ইসলামী বিপ্লবের মডেল
১৪. ইসলামী আন্দোলনের চিত্র
১৫. ইসলামের মূল দাওয়াত
১৬. সংগঠন
১৭. ক্যাডার সিসটেম
১৮. নেতৃত্ব
১৯. গণতন্ত্রের শ্লোগান ও ইসলামী বিপ্লব
২০. রাজনৈতিক স্ট্যাটেজি
২১. ইসলামী আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতা
২২. সমস্যার মোকাবিলায় করণীয়
২৩. গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি
২৪. গণচেতনার স্তর
২৫. জনতার দাবী
২৬. ইসলামী বিপ্লবের শর্ত
২৭. বিপ্লবের প্রক্রিয়া

২৩. গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি
এক. রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব সৃষ্টিঃ মূল নেতৃত্ব আন্দোলনের যে মহাপরিকল্পনা রচনা করবেন তাতে সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য বিষয় নেতৃত্ব। তৃতীয় বিশ্বের বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি যেহেতু অনাগ্রহ বা অনাস্থা রয়েছে সেহেতু সমান্তরালভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক নেতৃত্ব অনেক বেশি কার্যকর এবং শক্তিশালী। জনগণের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং জনমত সৃষ্টিকারী শক্তিসমূহের নিকট গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সামনে আনতে না পারলে নিছক আদর্শের সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। বিভিন্ন শ্রেণীর এলিট পর্যায়ভুক্ত জনমণ্ডলী নেতৃত্বকে মেনে নিতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। জাতির নেতৃত্ব তারা গ্রহণ করতে পারেন এ আস্থা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের সাফল্যা আশা করা অসম্ভব।
দুই. গণ সংগঠনঃ সাংগঠনিক আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূরীকরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা একটি মজবুত সংগঠনই পারে আন্দোলনের বাহন হিসেবে ভূমিকা পালন করতে। সংগঠনের সদ্য পর্যায়ভুক্ত না হয়েও যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক সংগঠনটিকে সামগ্রিকভাবে নিজের মনে করবেন এবং দেশের সর্বত্র গণ সংগঠন ও নেটওয়ার্ক সক্রিয়ভাবে সংগঠনের বাণী সর্বত্র পৌঁছে দিতে পারবে কেবলমাত্র তখনই আন্দোলন জোরদার করার পদক্ষেপ নিবে।
তিন. দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কঃ দ্বীন ইসলাম যেহেতু ইসলাম আন্দোলনের প্রণশক্তি তাই দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসমূহের সাথে আন্দোলনের গভীরতা বৃদ্ধি করার আগে গণআন্দোলন সৃষ্টির চেষ্টা অবাস্তব। দেশের মানুষ যেসব প্রতিষ্ঠানকে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান মনে করে যেসব প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার-ভাবেই অর্থাৎ নামে ও কাজেও দ্বীনি প্রতিষ্ঠান হতে হবে। ইসলামের বিপ্লবী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোও যাতে কাংখিত ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
চার. নারী সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবেঃ মহিলা ও নারী সমাজ সামাজিক পরিবর্তনে বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম। অন্য কথায় তাদের সহযোগিতা ছাড়া কোন সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন সফল হতে পারে না। আজকের দুনিয়ায় শিক্ষিত মহিলারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তেমনি পালন করছে যেমনটি আগেও ছিল। আদিকাল থেকেই রাজনীতি ও সমাজ নিয়ন্ত্রণে মহিলাদের একটি শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। কোন আন্দোলনের জন্য সে আন্দোলনকে গণআন্দোলনের রূপ দেয়া অতি জরুরী। আর গণআন্দোলনের রূপ দিতে চাইলে মহিলাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ অনিবার্য। অনেক মনে করতে পারেন যে, এটা বাস্তব নয়। কিন্তু আসলেই বাস্তব। মহিলাদেরকে তাদের অবস্থান থেকেই এ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাই নারী সমাজ ও ছাত্রীদেরকে ইসলামী আন্দোলনের পথে উদ্বুদ্ধ করতে হবে ব্যাপকভাবে। ইসলামের সঠিক শিক্ষার অভাবে মহিলা ও ছাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়েছে বা হচ্ছে। বিভ্রান্তির জাল ছিন্ন করে ইসলামের মহত্ব ও সৌন্দর্যের মানে তাদেরকে পরিচিত করতে হবে। জাতীয় জীবনে তাদের অবদান রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা যা ইসলাম অনুমোদন করে তা নিশ্চিত করতে হবে।
পাঁচ. মেহনতি মানুষের ভূমিকাঃ শিল্পকারখানায় খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের সমাবেশ ঘটে থাকে। সভ্যতার কারিগর হিসেবে ইসলামী আন্দোলনেও শ্রমিক সমাজ অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া ইসলাম ও মানবতার দুশমনরা দুনিয়া ব্যাপী যে শ্রেণীটিকে সবচাইতে বেশী ধোঁকা দিচ্ছে তারা হলো শ্রমিকশ্রেণী। মুসলিম দেশগুলোতেও শ্রমিকদেরকে বিদেশী তন্ত্রমন্ত্রের নামে চরম বিভ্রান্তির শিকারে পরিণত করা হয়েছে। ইসলামে শ্রমিকদের মর্যাদা এবং অধিকার যা নির্ধারিত রয়েছে অন্য কোন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তা নেই। দুঃখজনক হলো সরল প্রাণ শ্রমিকদের উল্টো ইসলামের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছে ইসলামের দুশমনরা। গণআন্দোলনের সূচনালগ্নেই শিল্প-কারখানা ও শ্রম অংগনে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।
ছয়. ছাত্র সমাজকে গঠনমূলক কাজে লাগাতে হবেঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই সবচাইতে পবিত্র ও নিঃস্বার্থ মানুষের আঙিনা। ছাত্র ও তরুণদের দেশের প্রতি ভালোবাসা, আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা ও আবেগ এক অতুলনীয় শক্তি। সবচাইতে নিঃস্বার্থভাবে যারা কোন আন্দোলন বা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তারা হলো ছাত্র সমাজ। আমাদের দেশেরই শুধু নয়, বরং পৃথিবীর দেশে দেশে ছাত্রদের সংগ্রামী ভূমিকা সংশ্লিষ্ট দেশের ইতিহাসের গতি বদলে দিয়েছে। মানচিত্র পরিবর্তন করেছে এবং আদর্শের উত্থান ও পতনেও শিক্ষাঙ্গনের অসাধারণ শক্তিশালী ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছাত্র সমাজের সম্মিলিত শক্তির সামনে সামরিক বাহিনীর কামানবন্দুক পর্যন্ত অকেজো হয়ে পড়েছে। গণআন্দোলন সৃষ্টি নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হচ্ছে ছাত্র সমাজ। এখান থেকে অংকুরিত হয়েই বিভিন্ন সময়ে বড় বড় আন্দোলন দানা বেধে উঠেছে। তবে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়েই কেবলমাত্র ছাত্রদের অংশগ্রহণ যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে অনেক দেশেই তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোন কোন দেশে তো এমনও অনেক হতে দেখা গেছে যে, ছাত্রদের কেবলমাত্র আন্দোলনের উপকরণ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে। কোন অবস্থাতেই ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে শিক্ষাঙ্গনের আন্দোলনকে ব্যবহার করা যায় না। ছাত্রদেরকে রাজনৈতিক আন্দোলনে খুব সহজলভ্য মনে করে এবং দ্রুত ফলাফল লাভের আশায় যারা ছাত্রদের ব্যবহার করার কৌশল অবলম্বন করেছে তারা জাতিকে তেমন কিছুই দিতে পারেনি। ছাত্র সমাজকে গঠনমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
সাত. আলেম সমাজের অগ্রণী ভূমিকাঃ দেশের আলেমগণ মুসলিম সমাজে এক বিরাট প্রভাব রাখেন। দেশের জনগণের আস্থা তাদের প্রতি এখনও অটুট। কিন্তু যে সময় থেকে আলেম সমাজ নেতৃত্ব থেকে সটকে পড়েছেন তখন থেকেই মুসলিম সমাজের বড় ধরণের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশ চালানো বা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বর্তমান আলেম সমাজ আমাদের কতটুকু নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এ প্রশ্নটি ছোট কোন প্রশ্ন নয়। আলেম সমাজের মধ্যে যারা বিপ্লবী এবং যাদের জ্ঞান, চরিত্র, আয়ের উৎস এবং তাকওয়া পরহেজগারী সম্পর্কে জনগণের আস্থা রয়েছে; তারা অবশ্যই একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবেন। ইসলামী বিপ্লবের কাজে আলেম সমাজকে অগ্রণী ভূমিকায় সম্পৃক্ত করতে না পারলে ইসলামী আন্দোলনের ব্যাপক গণসমর্থন অর্জন করা কঠিন। আলেম সমাজকে উচ্চতর ইসলামী গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।
আট. ব্যাপক দাওয়াতী কার্যক্রমঃ মূল দাওয়াত মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে হবে। অনেক দফা ও অনেক কথার ভীড়ে মূল কথা অনেক সময় হারিয়ে যায়। ইসলামী আন্দোলন যে মূল দাওয়াতের দিকে দেশবাসীকে আহ্বান জানাতে চায় তা জনগণকে অবহিত করার জন্য এবং জনগণের দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের সচেতন করার জন্য নিম্নরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। মানুষের ঘরে ঘরে দাওয়াত পৌঁছানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাপক দাওয়াতী তৎপরতা গণভিত্তি রচনার প্রধান কাজ।
১. ইসলামের তৌহিদের বিপ্লবী বাণী মৌখিকভাবে ব্যাপক প্রচার। ইসলাম চর্চা, প্রচার ও অনুশীলনের এক ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি।
ক. যার যার সামর্থ অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে আলাপ আলোচনা এবং প্রয়োজনে ঘরে ঘরে গিয়ে পৌঁছান।
খ. সব ধরণের সভা, সমাবেশ, সেমিনার, ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য পেশ। মানুষের মধ্যে খিলাফত ও বন্দেগীর অনুভূতি সৃষ্টি।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশের মত নিরক্ষরতার হার যেসব দেশে বেশী সেসব দেশে মুখে মুখে ইসলাম প্রচার অর্থাৎ মৌখিক প্রচার পদ্ধতি নিঃসন্দেহে সবচাইতে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। মৌখিকভাবে আন্দোলনের দাওয়াত পৌঁছানোর একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া আছে যা সংগঠন ব্যবস্থায় করে থাকে। আবার স্বল্পকালীন অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। সপ্তাহ বা পক্ষ পালন করে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় প্রতিটি ঘরে দাওয়াত পৌঁছানে যেতে পারে। বড় বড় মাহফিল বা সমাবেশ আয়োজন করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে বক্তব্য দেয়া যেতে পারে। নিরক্ষর বা অল্প শিক্ষিত লোকদের মধ্যে দাওয়াতী তৎপরতা কার্যকরী করার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাপক পদক্ষেপ নিতে হবে। মসজিদগুলোকে দ্বীনি দাওয়াতের প্রাণ কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।
২. প্রচারপত্রঃ প্রচারপত্র সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের বুঝার উপযোগী করে দুঃশাসন এবং অনৈসলামী সমাজ ব্যবস্থার হাত থেকে জনগণের মুক্তি ও আখেরাতের নাজাতের পথ নির্দেশ করে আন্দোলনের মূল কথা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানের ব্যবস্থা। নানা রকম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রচারপত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. পোষ্টারিং ও দেয়াল লিখনঃ আন্দোলনের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রচারপত্রের পাশাপাশি পোষ্টারিং ও দেয়াল লিখনের মাধ্যমে আন্দোলনের মূল বক্তব্যের সাথে জনগণকে পরিচিত করা এবং জনপ্রিয় করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ খুবই কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে। নির্দিষ্ট ও আকর্ষণী কতিপয় শ্লোগানের ভাষাকে জনপ্রিয় করে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. বই পুস্তক প্রকাশ ও প্রচারঃ মানুষের হৃদয়ে আন্দোলন সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি এবং মানসিক প্রস্তুতির জন্য তথা ইসলামী বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি গড়ে তোলার জন্য পুস্তক খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। জনগণের মধ্যে ব্যাপক বই পুস্তক পড়ানো ও পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলার দিকেও নজর দিতে হবে।
৫. কোরআনের তাফসীর ও হাদীসের বাণীঃ সংশ্লিষ্ট ভাষায় ব্যাপকভাবে পবিত্র কোরআনের তাফসীর ও হাদীসের ব্যাপক চর্চা ও প্রচারের অব্যাহত অভিযান পরিচালনা। মনে রাখতে হবে কোরআন-হাদীসের শিক্ষার ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমেই কেবল মাত্র ইসলামী জাগরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যেতে পারে। আরবী ভাষায় যেহেতু অন্যান্য ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর পক্ষে সরাসরি বুঝা ও হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন তাই সহীভাষায় তাফসীর এবং হাদীসের ব্যাপক চর্চা সমাজে ছড়িয়ে দেয়া। এভাবেই নীরবে ইসলামী বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি সৃষ্টি করা সহজ হতে পারে।
৬. ক্যাসেট ও ভিডিওঃ আন্দোলনের নেতৃত্বের বাণী ও বক্তব্য আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া ও উদ্দীপনা সৃষ্টিতে ক্যাসেট ও ভিডিও সিডি শক্তিশালী ভূমিকা পালনে সক্ষম। কোন কোন পর্যায়ে এ মাধ্যম ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। নেতৃবৃন্দের বক্তৃতার সিডি ভিডিও ক্যাসেট ব্যাপকভাবে ছড়াতে হবে।
৭. সংবাদপত্র ও সাময়িকীঃ আধুনিক বিশ্বে সংবাদপত্রের অসাধারণ ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। জনগণের দাবী দাওয়া আদায়ের আন্দোলন থেকে শুরু করে পার্শ্ব ইস্যু কিংবা সমাজ কাঠামোর বা মানচিত্রের পরিবর্তন আনয়নে সংবাদপত্রের ভূমিকা খুবই কার্যকর ও শক্তিশালী। স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিপ্লবের পটভূমি সৃষ্টি পর্যন্ত সংবাদপত্রের ভূমিকা অনবদ্য।
জনমত গঠন ছাড়া সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন কল্পনা করা যায় না। আর জনমত গঠনের জন্য সংবাদপত্র সবচাইতে শক্তিশালী আধুনিক হাতিয়ার। এমনকি ইলেট্রনিক মিডিয়া রেডিও টেলিভিশনের ব্যাপক প্রভাব সত্ত্বেও সংবাদপত্রের গুরুত্ব কমেনি মোটেই। দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি এবং অনেক ক্ষেত্রে তার চাইতেও বেশী গুরুত্বের দাবীদার সাপ্তাহিক পত্রিকার। সাপ্তাহিক পত্রিকা, সংবাদ নিবন্ধ, সংবাদ পর্যালোচনা, সংবাদ বিশ্লেষণ, সংবাদ-পটভূমিকা এবং খবরের পিছনের খবর নিয়ে আলোচনা করে জনতাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করতে পারে। পত্রিকার শক্তি এতটা বেশী যে ছাপার অক্ষরে পত্রিকাগুলো দেশ জয় করতে পারে। তাছাড়া মানুষের কাছে এখনও ছাপার অক্ষরের গুরুত্ব অনেক বেশী।
প্রচার কৌশলের উপর সমাজতন্ত্রীরা অনেক বেশী গুরুত্ব দিয়েছিল। ফলে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তারা একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান করে নিয়েছে। যে কারণে সমাজতন্ত্রের মত অবাস্তব একটি মতবাদ পৌনে এক শতাব্দীকাল মানুষকে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছে। সংবাদ মাধ্যম ও শক্তিশালী প্রচারণাই মূলতঃ এ অন্তঃসারশূণ্য ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। ইহুদীরাও পাশ্চাত্যের সংবাদপত্রের পিছনে জোঁকের মত লেগে আছে। অর্থনীতিকে হাত করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি বরং সংবাদপত্রে তাদের হাত শক্তিশালী রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত যন্তশীল।
মুসলমানরা সাধারণভাবে শক্তিশালী এ হাতিয়ারটির ব্যাপারে অসচেতন। ইসলাম প্রতিষ্ঠাকামীগণও এ ব্যাপারে খুব একটা সাফল্যের পরিচয় দিতে পারেননি। হয় তারা এ গুরুত্বকে হালকা করে দেখেছেন অথবা এক্ষেত্রে অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। মক্তব-মাদ্রাসা-ইয়াতিমখানা প্রতিষ্ঠার যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সংবাদপত্র গড়ে তোলার জন্য সে প্রচেষ্টাটুকুও চালানো হয়নি।
সফল গণআন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকা যেমন শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে তেমনি আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে আন্দোলনকে অনেক পিছিয়ে দিতে পারে অথবা আন্দোলনের অগ্রগতিতে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। প্রচার মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অনেক দেশেই বহু ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে প্রচার মাধ্যমের ইসলামী আন্দোলন বিরোধী ভূমিকা অনেকেই প্রত্যক্ষ করছেন। ভিত্তিহীন মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ইসলামী আন্দোলন ও নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ সৃষ্টির হেন প্রচেষ্টা নেই যা প্রচার মাধ্যম করেনি।
প্রচার মাধ্যমের ক্রমাগত অসহযোগিতা ও বিরোধিতার কারণে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে আদর্শ, দেশ ও জনগণের সেবায় সর্বস্ব ত্যাগ করার পরও যতটা সুফল পাওয়া উচিত ও জনসমর্থন পাওয়া দরকার তা পায় না। এমনকি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জীবন দেবার পরও শাহাদাত লাভের পরও সংবাদপত্রের বিভ্রান্তিকর ভূমিকার জন্য দেশবাসীর সমবেদনা লাভ করতে সক্ষম হয় না। বৈরী সংবাদপত্র শুধু যে, কোন ঘটনা ঘটলে বিরূপ ও মিথ্যা খবর পরিবেশন করেই ক্ষান্ত হয় তা নয়। ইতিবাচক যেসব সংবাদ প্রচারিত হওয়া অতি প্রয়োজনীয় তার পরিবর্তে শুধুমাত্র নেতিবাচক খবর প্রচার করে মানুষের মনে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সঞ্চার করে। মিথ্যা ঘটনা, বিকৃত উক্তি প্রচার করে আন্দোলনের বিরুদ্ধে সংবাদপত্র মানুষকে ক্ষেপিয়েও তুলতে পারে।
শক্তিশীল সংগঠন পর্যন্ত বৈরী সংবাদপত্রের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। শক্তিশালী সংবাদপত্র গড়ে তোলা ছাড়া গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যে বাধা আছে তা দূর করা সম্ভব নয়। সারা দুনিয়ায় অন্যান্য ক্ষেত্রের মত সংবাদপত্রের নেতৃত্বও দিচ্ছে হয় ইসলাম বিরোধীরা না হয় ইসলামকে পছন্দ করে না এমন শক্তিগুলো। প্রতিটি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ভারসাম্য সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমান অবস্থাটা একতরফা। ইসলামী আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক, উগ্রবাদী ও ফ্যাসিষ্ট শক্তি হিসাবে চিত্রিত করা হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলনের জনসমর্থন লাভের ক্ষেত্রে যে সমস্ত বাধা আছে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম তার মধ্যে অন্যতম। বিষয়টি সঠিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে সফল ও শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম সৃষ্টির কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বৈরী সংবাদ মাধ্যমের এভাবেই মুকাবিলা সম্ভব।
৮. গণসংযোগ অভিযান ও সফর ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের জন্য নেতৃত্বের সাথে জনগণের একটি সফল সেতৃবন্ধ রচনা করা দরকার। জনগণের সাথে নেতৃত্বের যোগসূত্র যদিওবা সংগঠন কিংবা সাংগঠনিক প্রচারপত্র, বই পুস্তক তথাপি নেতৃত্বকে জনগণের খুব নিকটে পৌঁছতে হবে। মহানবী সা. যেমন মানুষের ঘরে গিয়ে হাজির হতেন ঠিক তেমনি গণসংযোগ অভিযান ইসলামী আন্দোলনের বর্তমান নেতৃত্বকেও পরিচালনা করতে হবে। সফর এমন হবে যাতে এলাকাবাসী বুঝতে পারেন যে অমুক ব্যক্তি আজ এখানে এসেছেন এবং তার বক্তব্য এই। কে কোথায় গেলেন, কি বললেন মানুষ জানতে পারলো না এমন সফর অর্থহীন। সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হবে মানুষের কাছে যুগ সমস্যা ও যুগের দাবী সামনে রেখে মানুষের সামনে দাওয়াত তুলে ধরা। দাওয়াত জনগণের মধ্যে পৌঁছাতে সাফল্য লাভ করার উপরই নির্ভর করছে আন্দোলনের সাফল্য। মনে রাখতে হবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের মনে দ্বীনের আলো জ্বালিয়ে দিতে হবে, ঈমানী চেতনা জাগ্রত করতে হবে।
৯. বাস্তব কাজের মাধ্যমে সামাজিক শক্তি অর্জনঃ শুধু বক্তৃতা ভাষণ নয়, বরং কাজের মাধ্যমে সমাজে স্থান করে নিতে হবে ইসলামী নেতৃত্বকে। মানুষ তার পরিচয় পাবে কাজের মাধ্যমে এবং বাস্তব তৎপরতার মাধ্যমে জনগণের কল্যাণের জন্য এবং মানুষের বিপদে আপদে তাদের পাশে দাঁড়াতে না পারলে বা জনগণের উৎপাত সহ্য করার মত ধৈর্য ও সহনশীলতা না থাকলে সেই নেতৃত্ব ইসলামী আন্দোলনে তেমন কোন অবদান রাখতে পারবেন না। মানুষ হৃদয় দিয়ে ভালোবাসলেই কেবলমাত্র তাদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়া সম্ভব।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 30 November 2013 )