আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন আবু সালীম মুহাম্মাদ আবদুল হাই   
Friday, 29 November 2013
আর্টিকেল সূচি
আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে
মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক
নিজেকে সবাই ভাল মনে করে
মনের ঝাল প্রকাশ করা
হাস্যোজ্জ্বল চেহারা
কথা বলার ধরন
গুণের সমাদর
জয়-পরাজয়ের ভাব
নিম্নের একটি দৃষ্টান্ত দেখুন
মানসিক প্রবণতার প্রতি সন্মান প্রদর্শন
যেসব ব্যাপারে মতের মিল রয়েছে
পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হোন

মনের ঝাল প্রকাশ করা

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার বহুবিধ কারণ থাকে। এর মধ্যে মানুষের প্রকৃতিগত উত্তেজনার একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যে কারনে এ সম্পর্ক একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অনেক বিষয় আছে, যা অপছন্দ হবার কারনে মানুষ তার বিরুদ্ধে ইচ্ছা পুরিয়ে নানা ভাবে মনের ঝাল মিটাতে চায়। এ উদ্দেশ্যে সে বহুতর উপায় অবলম্বন করে। ক্রোধ, কটু কথা, ত্রুটি অনুসন্ধান, কারো পেছনে দোষ বর্ণনা ইত্যাদি এমন অনেক উপায় আছে, যার উদ্দেশ্য মনের ঝাল প্রকাশ করা ছাড়া কিছুই নয়। মানুষের এ জাতীয় মানসিক অবস্থাই তাকে অপরের বিরুদ্ধে অপবাদ রটাতে এবং অপরের দোষত্রুটিকে ফলাও করে প্রকাশ করতে বাধ্য করে। মোটকথা, মানুষ তার এ মানসিক প্রবণতার দরুন নানবিধ নৈতিক দুর্বলতায় জড়িত হয়ে পড়ে। মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার খাতিরে এদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে যে, কদাচিৎ নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার জন্যে যেন এ প্রবণতার আশ্রয় না নেয়া হয়। এ মানসিক অবস্থার উদ্ভব হলে, তার দ্বারা এমন সব কাজ অনুষ্ঠিত হয় যার ফলে মানুষের মন তার প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যকার দূরত্বও বেড়ে যায়। এ মানসিক প্রবণতাকে সংযত রাখার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে সম্মুখে রাখা হলে ‘আদর্শ’ প্রচারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কামিয়াবির আশা করা যেতে পারে। 
কারোর প্রতি দোষারোপ করা অত্যন্ত সহজ । কোন ব্যাপারে কাউকে অভিযুক্ত করতে কোন বেগ পেতে হয় না, কিন্তু নিজেকে অভিযুক্তের পর্যায়ে ফেলে বিচার করাটা অত্যন্ত দুঃসাধ্য ব্যাপার। অপরের দোষত্রুটি অনুভব করার পর সুস্থ মস্তিষ্কে নিজেকে একবার তার স্থানে রেখে অবস্থা পর্যালোচনা করুন। অবশ্য এটি হবে বীরত্বের পরিচায়ক। এমতাবস্থায় আপনি দেখতে পাবেন শতকরা আশি ভাগ অভিযোগ- যা আপনি অন্যের অপর আরোপ করেছেন, তার প্রত্যেকটারই একটা যুক্তিসংগত কারন আপনি নিজেই বের করবেন। অপরের চরিত্রের ন্যায় নিজের নিজের চরিত্রকে ‘সমালোচনার দূরবীন’ দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে একদিকে যেমন নিজের সংশোধনের পথ সুগম হবে, তেমনি অন্যদিকে অপরের ছিদ্রান্বেষণ এবং তাকে অভিযুক্ত করার প্রবণতা থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে, যা পারস্পরিক সম্পর্ককে বিছিন্ন করে দেয়। 
তবে তার মানে এই নয় যে, সমাজ-সংশোধনের সকল প্রকার কাজ থেকে হাত গুটিয়ে বসে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আর এর অর্থ এও নয় যে, যে কোনো অপকর্মকে বরদাশত করার অভ্যাস করতে হবে। বরং নিজের চরিত্রকে এমনি তুলনামূলকভাবে যাচাই করাতে সার্থকতা হচ্ছে এই যে, যখন আপনি নিজের প্রতি লক্ষ্য রেখে অপরের দোষত্রুটি বিচার করবেন তখন আপনি তার সংশোধনের জন্যে এমন পন্থাই গ্রহণ করবেন যাতে করে মনে হয় যেন আপনি নিজের সংশোধনেই এগিয়ে আসতেন। এটা স্পষ্ট কথা যে এমনি ভাবে অপরের অবস্থা সংশোধনে যে দরদ এবং আন্তরিকতা আপনার নীতিতে স্থান পাবে তার গুরুত্ব নিশ্চয় অনেক বেশী এবং এর প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। এতে মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক সর্বদা মধুরতর থাকবে এবং সমাজ সংস্কারের সুসঙ্গত পন্থার উদ্ভব হবে। আপনার সম্মুখে রয়েছে একটা মহান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এ লক্ষ্য উপনীত হওয়ার জন্যে সর্বদাই আপনি মানুষের মনকে নিজের নিকটবর্তী করতে চান। তাই আপনি নিজের দোষত্রুটি নিজের যে কোন দুর্বলতার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারেন। সেগুলোর সংশোধনে এগিয়ে আসতে পারেন। কুপ্রবৃত্তি দমনে সক্ষম হতে পারেন এবং নিজের মানসিক প্রেরনাকে নিজেই পিষ্ট করতে পারেন। কিন্তু আপনার শ্রোতার অবস্থা তো আর তেমন নয়। তার সামনে নেই কোনো উন্নতর উদ্দেশ্য- লক্ষ্য। আপনার মতো তার ভেতরের মানুষটা এতোসব বাধ্যবাধকতা, নিয়ম-কানুন মেনে চলার কোনো কারন খুঁজে পায়না। কাজেই আপনার শ্রোতা থেকে থেকে এমন বহু কিছু প্রকাশ পায় যা আপনার মনঃপুত নয় এবং আপনার জন্য যথেষ্ট পীড়াদায়ক। মানুষ চায়, সে যদি কারোর সঙ্গে নম্র ও ভদ্র ব্যবহার করে, তাহলে প্রত্যুত্তরে তার সঙ্গেও সে অনুরুপ ব্যবহার করুক। সে যদি নিজের ক্রোধ ও আবেগকে সংযত রাখে, তাহলে অপরজনও যেন তার ক্রোধ-আবেগকে বে-লাগাম না করে। 
অনেক লোক আছে যারা অপরকে সংশোধন করতে গিয়ে নিরাশ হয়ে এ ধরনের মন্তব্য করে থাকে যে, আমরা সবকিছু করে ফেলতে চাইলে কি হবে শ্রোতাদেরও তো এ দিকে কিছু ঝোঁক থাকা চাই। এদ্বারা তারা বলতে চায় যে, আমাদের কে যে বিষয়ে পরামার্শ দেওয়া হচ্ছে আমরা তো সে অনুপাতে কাজ করে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ; তার সঙ্গে সঙ্গে এ শর্তও তারা আরোপ করেছে যে শ্রোতাকেও সে উপদেশ গ্রহণ করার জন্যে এগিয়ে আসতে হবে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই এ ধরনের উক্তির তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবেন।
আসল কথা হল, যাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক, তার মূলতঃ কেবল কল্পনাপ্রবণ মানুষ নয় এবং তাদের কর্মপ্রবণতাও আপনার ইচ্ছার অনুগত নয় যে আপনি যখন যা বলবেন তখন তাই হয়ে যাবে। বরং আপনাকে যা কিছু করতে হবে তা এমন সব লোকের মধ্যে করতে হবে যারা বিভিন্ন মেজাজ ও বিভিন্ন ভাবাবেগের অধিকারী। এমনও হতে পারে আপনার শ্রোতা মস্তবড় জ্ঞানী ও যুক্তিবাদী। আপনি তার কাছে অকাট্য যুক্তি পেশ করছেন না। যার ফলে আপনার শতকরা বাসনা পূর্ণ হচ্ছেনা। আপনি যেভাবে আপনার শ্রোতাকে নিজের বক্তব্য বুঝাতে চেষ্টা করেছেন সে কিছুতেই মানতে রাজী হচ্ছে না। কেননা আপনি যাদের সঙ্গে আপনি সম্পর্ক স্থাপন করেছেন তাদের মধ্যেও ভাবাবেগ আছে, গর্ব অহংকার, বিদ্বেষ ও হঠধর্মীতাও আছে। পূর্ব পুরুষদের রীতি-নীতির ওপর তারা অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করে বসে আছে। এমতাবস্থায় আপনার যদি এমন কোনো ভূমিকা প্রকাশ পেয়ে যায় যার ফলে তাদের মনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসে আঘাত লাগে, তাহলে মনে করতে হবে, আপনি নিজ হাতেই নিজের সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিয়েছেন। আপনাকে সর্বদা এ জন্যে সতর্ক থাকতে হবে যে, আপনার থেকে যাতে কোন কাজ না ঘটতে পারে যাতে অপরের অহমিকায় আঘাত লাগে এবং তার আত্নগৌরব, পক্ষপাতিত্ব, গোঁড়ামি ইত্যাদি পশু-বৃত্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, তার বিশ্বাসগুলো প্রত্যক্ষ আঘাতের মুখোমুখি হয়। 
আপনি হয়তো বর্ণিত উপদেশাবলীর ব্যবহারিক পদ্ধতি সম্পর্কে ইতস্তত করছেন যে তাহলে মানুষের মধ্যে উল্লেখিত থাকা অবস্থায় কিভাবে তার সংশোধন করা যাবে? তার অহংকার আত্নম্ভরিতার কি প্রশংসা করবো? কিংবা তার বিদ্বেষ, হঠধর্মীতা এবং যাবতীয় অন্ধ বিশ্বাসকে সঠিক বলে মেনে নেব? নিশ্চয় নয়। কেননা এটা একদিকে যেমন আদর্শ প্রচারকারীর মর্যাদার পরিপন্থী, অন্য দিকে তেমনি তার মূল লক্ষের জন্যও একান্ত ক্ষতিকর। বরং এখানে যে ব্যাপারে আপনাকে বিরত থাকার কথা বলা হচ্ছে তার মূল কথা হলঃ আপনি এমন কোন পরিস্থিতির উদ্ভব করবেননা, যাতে তাদের হীন প্রবণতা আহত হয়। মূল লক্ষে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে কি করা উচিত বা কি উচিত নয়- এর ফয়সালা আপনাকে প্রতি পদে পদে করতে হবে। কারণ এতে আপনার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এ ভুলের একাধিকবার পুনারবৃত্তিও ঘটতে পারে। কিন্তু প্রতি পদে পদে যদি আপনি আপনার কাজের প্রতিক্রিয়ায় প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে অগ্রসর হতে থাকেন, তাহলে আপনার একটা ভুল নিজের অভিজ্ঞতায় এক নতুন সংযোজনার সৃষ্টি করবে। অতঃপর আপনি যদি এসব ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা একত্রিত করেন তাহলে তা আপনার জন্যে একান্ত উপকারী ও বাস্তব পরামর্শে পরিণত হবে। এককথায় যারা অপরের চিন্তা ধারা, মতামত এবং ভাবাবেগের ওপর প্রভাব করতে ইচ্ছুক, তাদের কে অন্যের দৃষ্টিভংগী হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা উচিত। 
সমান ব্যবহার
আদর্শ প্রচার এবং সংস্কারমূলক কাজের প্রথম পরিসর হল প্রত্যেক ব্যক্তির নিকটতম পরিবেশ, যেখানে সে বসবাস করে চাকুরী করে অথবা অন্য কোনো ব্যাপারে অবস্থান করে। কিন্তু খুব কম সংখ্যক লোকই আদর্শের ব্যাপারে নিজেদের এ স্বাভাবিক পরিবেশে কৃতকার্য হতে পারে। এর একটা বিশেষ কারন রয়েছে। তা হলো এই যে প্রত্যেক ব্যক্তিরই এমন একটা গণ্ডি থাকে যেখানে সে একজন সরদার বা নেতার মর্যাদা পেয়ে থাকে, তার গৃহ স্ত্রী-পুত্র কর্মচারী, চাকর- চাকরাণী অনুসারী ভক্ত-অনুরক্ত ইত্যাদি বহু লোক তার কর্তৃত্বাধীনে থাকে। তাদের মধ্যে তার বিরাট প্রাধান্য এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। সে তাদের মধ্যে অর্থাৎ তার নেতৃত্বের প্রভাব দ্বারা কাজ করে নিতে চেষ্টা করে। প্রয়োজনবোধে জোরজবরদস্তি ও ভীতি প্রদর্শনের পথেও সে পা বাড়ায়। মোটকথা, নিজের ব্যক্তিত্ব বলে প্রতিষ্ঠিত প্রভাব প্রয়োগে সে এ ক্ষেত্রে কিছুতেই বিরত থাকতে চায় না। এরূপ ভূমিকার পরিণতি সুস্পষ্ট। কেননা মানুষের চিন্তা বিশুদ্ধিকরণ, মতের পরিবর্তন এবং কারোর ইচ্ছা শক্তিকে নিজের সপক্ষে আনা এতো সহজ ব্যাপার নয়, যে জোরজবরদস্তি বা ভীতি পরিদর্শনের মাধ্যমে করা যেতে পারে। 
প্রত্যেক ব্যক্তি তা সে আপনার অধিনস্তই হোক না কেন, তার একটা ব্যক্তিত্ব আছে। আপনার স্ত্রী-পুত্র চাকর, পরিচারিকা, কর্মচারী যারা একটা বিশেষ নিয়ম শৃঙ্খলার মাধ্যমে আপনার আনুগত্য করতে বাধ্য। তাদের ব্যক্তিগত মতামতকে নিজের মতের অধীন করার ব্যাপারে কিন্তু এ বাধ্যতা যথেষ্ট নয়। কেননা তাদেরও একটা নিজস্ব ব্যক্তিত্ববোধ রয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে তাদের মতামতেরও বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। তাদের মনের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেবার সময় বিনা যুক্তি-প্রমাণে তারা তা মানতে প্রস্তুত হয় না। তাদেরকে সন্তোষজনক যুক্তি প্রমাণ দ্বারা বুঝিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় বিনা যুক্তিতে কোন কিছু চাপিয়ে দিতে গেলে যে ফল দাঁড়ায় এখানেও সে পরিণতি দেখা দিতে বাধ্য। কারন তাদের মধ্যেও এমন সব প্রবণতা বিদ্যমান আছে বাইরের জগতে যা আপনি সচরাচর প্রত্যক্ষ করে থাকেন। আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে সত্যিই এটা একটা জটিল পর্যায়। কেননা এ স্থলে আপনার নিজের গুরুত্ব এবং ব্যক্তিত্ববোধ বর্তমান থাকে। আপনি এ ক্ষেত্রে নিজের জন্যে একটা আসন নির্ধারিত করে নিয়েছেন। সেখান থেকে নিচে অবতরণের কথা আপনি চিন্তাও করতে পারেন না। অথচ বুদ্ধি-বিবেচনার কথা হল এই যে, আপনাকে নিজের নিকটস্থ ব্যক্তিদের সংশোধনের জন্যে এমন পর্যায়ে নেমে আসতে হবে, যা এ কাজের জন্যে একান্ত আবশ্যক। এখানে এসে হয়তো আপনি এক সমস্যায় পড়ে যান। কারণ একদিকে আদর্শ প্রচারের কলা-কৌশল বজায় রাখা, অপরদিকে ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন। কিন্তু তবুও এ ক্ষেত্রে আপনার কাছে দ্বীনের দাবি হলো এই যে, আপনি এ জাতীয় পরিবেশে নিজেকে অন্যের সমপর্যায়ে নিয়ে আসবেন এবং সকলের সঙ্গে আন্তরিকতার সাথে কথাবার্তা বলবেন ও মেলামেশা করবেন। তাদেরকেও নিজেদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ দান করবেন যদিও উচ্চ মর্যাদাবোধ আপনাকে তা করার অনুমতি দেয় না। আদর্শ প্রচারের কৌশল এটাই চায় যে, আপনি যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে নিজের নিকটস্থ ব্যক্তিদের মনোভাব পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যাপারে যেহেতু আপনি এ ধরনের আচরণে অভ্যস্ত নন, সর্বদাই তাদের ওপর ইচ্ছায় অনিচ্ছায় আপনার মতামত চাপিয়ে আসছেন, তাই এখানেও আপনি চাইবেন যে, টু-শব্দটিও না করে নীরবে আপনার প্রাধান্যকে মেনে নিতে হবে। অথচ দ্বীনের বৃহত্তর স্বার্থের প্রশ্নে আপনার এ মনোভাব পরিহার করা অপরিহার্য। অপরের মতামত এবং ভাবাবেগের প্রতি লক্ষ্য রাখা একান্ত কর্তব্য। কিন্তু অনেকে এ কথা ভুলে গিয়ে অন্যান্য কাজকর্মের ন্যায় এ ক্ষেত্রেও এর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করতে প্রস্তুত থাকে না। 
এ কয়টা বিশেষ বিশেষ কারণেই নিজের নিকটতম পরিবেশেও প্রচারক নিজেকে ‘উপেক্ষিত আগন্তুকের’ পর্যায়ে ফেলে দেয়। এতে হয়তো আপনার মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে যদি উল্লেখিত উপদেশাবলী পালন করা হয় তাহলে অন্যান্য ব্যাপারে যথেষ্ট অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। কারণ গৃহকর্তা বা বড় অফিসার হিসেবে মানুষের সঙ্গে আচার-ব্যবহারে চলনে-বলনে আপনাকে এ বিশেষ একটা মেজাজ গ্রহণ করতে হবে। আবার আদর্শ তথা দ্বীনের প্রচারকল্পে আপনাকে গ্রহণ করতে হবে অন্য রকম ভংগী। এ রকম দু’মুখো নীতিকে আপনি আত্মস্থ করতে পারবেন না। সে সময় আপনার আদর্শ প্রচারের ধরন কৃত্রিমতা দোষে দুষ্ট হয়ে পড়বে। অথবা অধীনস্থ বা নিজ পরিবারের লোকদের ব্যাপারে আপনি সতর্কতা অবলম্বন করতে চাচ্ছেন তা হয়ে পড়বে অন্তঃসারশূণ্য। আপনার এ জটিলতাটি বাস্তবতাভিত্তিক তাতে সন্দেহ নেই। অবশ্য কোন ব্যক্তির জীবনে দু’মুখো নীতি কার্যকরী হতে পারে না এবং আপনিও সফলতা লাভ করতে পারবেন না, কিন্তু তবুও এখানে একটা বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করার আছে। তা হচ্ছে আপনি নিজের জীবনের যে পর্যায়ে এ ভয়ভীতি এবং বাধ্য-বাধকাতার নীতি অবলম্বন করে আছেন তা কি সত্যিই আপনার জন্যে জরুরী? এটা না হলেই কি নয়? আসলে এ ব্যাপারে আপনার পয়লা নম্বর ভুলটি হচ্ছে এখানেই। আপনি জীবনের এ অংশটিতে নিজের আসন এখানেই নির্দিষ্ট করেছেন। কিন্তু মূলতঃ আপনার এ ভূমিকা এ ক্ষেত্রেও সত্যিকার সফল বা প্রশংসনীয় কোন ভূমিকা নয়। কিন্তু এখানে অকৃতকার্যতা আপনি এ জন্যে উপলব্ধি করতে পারছেন না যে, যেহেতু যেসব লোক আপনার সংগে সংশ্লিষ্ট তারা নিজেদের বিভিন্ন প্রয়োজনের তাকিদে আপনার এ ভূমিকাকে বরদাশত করে নিতে বাধ্য হয়েছে। স্বেচ্ছায় কেউ তা করে না, বরং সব সময়ই তারা এ বাধ্যবাধকতা, এ মুরুব্বিয়ানা থেকে অব্যহতি পাওয়ার জন্যে সচেষ্ট থাকে। যখনই সুযোগ পায় তখনই এ বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়াকে নিজেদের সৌভাগ্য বলে মনে করে। লক্ষ্য করলে আপনিও তাদের এ অবস্থা অনুধাবন করতে পারবেন। কিন্তু যে পরিসরে আপনি মানুষকে সংশোধন করতে চাচ্ছেন এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনের আশা পোষণ করছেন, সেখানে তারা এ কাজে কিছুতেই আপনার কথা শুনতে বাধ্য নয়। আপনি তাদের দ্বারা জোরজবরদস্তি কিছু করাতে চাইলেও বড় জোর এতটুকু হতে পারে যে তারা দৃশ্যতঃ আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে কিন্তু অন্তর তাদের ‘ভেতরের মানুষটি’র কথাতেই অটল থাকবে। এ জন্যে তাদেরকে বাধ্য করার মতো কোন ক্ষমতাই আপনার নেই। সারকথা হলো, এ জাতীয় পরিবেশে কাজ করার জন্যেও আপনাকে সে সব পরামর্শকেই সম্মুখে রেখে অগ্রসর হতে হবে, যা অন্যের ক্ষেত্রে অনুসৃত হওয়ার জন্যে এ যাবত আলোচিত হয়েছে বা আরো হবে। এক কথায়, এ পরিবেশেও আপনাকে শ্রোতার মনের গতি-প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রেখেকাজ করতে হবে।

সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 30 November 2013 )