আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন আবু সালীম মুহাম্মাদ আবদুল হাই   
Friday, 29 November 2013
আর্টিকেল সূচি
আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে
মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক
নিজেকে সবাই ভাল মনে করে
মনের ঝাল প্রকাশ করা
হাস্যোজ্জ্বল চেহারা
কথা বলার ধরন
গুণের সমাদর
জয়-পরাজয়ের ভাব
নিম্নের একটি দৃষ্টান্ত দেখুন
মানসিক প্রবণতার প্রতি সন্মান প্রদর্শন
যেসব ব্যাপারে মতের মিল রয়েছে
পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হোন

গুণের সমাদর

একটা মহৎ লক্ষ্যে উপনীত হওয়া আপনার উদ্দেশ্য। আপনি চান সমাজের মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন সাধন করতে। আপনি চান, মানুষের মন-মগজ থেকে তাদের বহুদিনের সযত্নে লালিত বহু চিন্তাধারাকে বহিষ্কার করতে, তাদের আদরের প্রবৃত্তিসমূহ থেকে তাদেরকে সরিয়ে আনতে। নিঃসন্দেহে এটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে যেহেতু দুনিয়ার অপরাপর জটিল থেকে জটিলতর বিষয় যেমন সুষ্ঠু কর্মনীতির ফলে সহজ হয়ে দাঁড়ায়, এ কাজেও অনুরূপ পন্থায় জটিলতা দূরীকরণ তেমন অসম্ভব কিছু নয়। বরং সুষ্ঠু ও যথোচিত মার্জিত পন্থায় করতে পারলে এ কাজও মনোমুগ্ধকর হতে পারে। 
এই উদ্দেশ্যে কয়েকটি পরামর্শ পেশ করছি। যেমন ধরুন, আপনি এক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত করতে চাচ্ছেন, যিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং প্রতিভাশালী। সামান্য মনোযোগেই আপনার কথা সম্পূর্ণরূপে হৃদযঙ্গম করতে সক্ষম। কিন্তু তিনি বিরাট কারবারে সদা ব্যস্ত থাকায় তার এতটুকু ফুরসৎও নেই যে, একান্তে বসে আপনার দুটো কথা শুনতে পারে। এছাড়াও বড় বড় শহরে তো প্রায় সকলের একই অবস্থা। ওখানে কোন ‘বেকুব’কেই পাওয়া যেতে পারে যার কোন কাজ নেই, নয়তো যার দিকেই লক্ষ্য করবেন দেখবেন সকলেই মেশিনের পার্টের মত সর্বদা কাজ করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। এ ক্ষেত্রে আপনার প্রতি মানুষের মনোযোগ কিভাবে আকৃষ্ট করবেন? কিভাবে আপনি তাদের মধ্যে এ ইচ্ছা এবং প্রেরণা জাগাবেন, যাতে তারা আপনার প্রতি লক্ষ্য দেয়া এবং আপনার সংগে কথা বলতে প্রস্তুত হয়? এ জন্যে নিম্নোক্ত উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন : 
ধরুন, জনৈক ব্যক্তি ব্যাংকে যাচ্ছে। সেখানে ভীষণ ভীড়। যে অফিসারের সংগে তার প্রয়োজন, কাজের চাপে সে মাথাই ওঠাতে পারছে না। এমতাবস্থায় তার সংগে কথা বলা সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে মাথা তুললেও তাকে শুধু ঐ ব্যক্তির সংগে কথা বললেই তো চলবে না, আরো এমন বহু লোক দাঁড়িয়ে আছে,তারা নিজ নিজ প্রয়োজনে উক্ত ব্যক্তির সংগে আলাপের অপেক্ষায় আছে। এমতাবস্থায় কথা বললে সকলের সংগে বলতে হবে। 
ধরুন, সে ব্যক্তি কোনো প্রকারে আলাপ করার সুযোগ করেই নিয়েছে। সে মনে করেছে আমি সাহেবের এমন একটা বিষয়ে প্রশংসা করবো যাতে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে যান। এটা মনে করে সে সাহেবের ‘টাই’-এর প্রতি লক্ষ্য করলো, এবং একটু সামনের দিকে এগিয়ে বললো, কাজের চাপে আপনার দেখছি কথা বলার একটুও অবসর নেই, নয়তো আপনার এ চমৎকার ‘টাই’টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম, এটা কোত্থেকে কিনেছেন? সাহেব মাথা তুললেন এবং মুচকি হেসে বললেন, সত্যি এটা কি আপনারও ভাল লাগছে? “লাগবে না কেন, ভালো জিনিসকে সবাই ভালো মনে করবে এবং প্রশংসার করতে বাধ্য” লোকটি জবাব দিলো। সাহেব তার টাই-এর মাথায় হাত রেখে বললেন, হাঁ তাইতো, এ যাবত আরো কয়েকজনও এটার বেশ প্রশংসা করেছেন। 
ব্যাস, এই সামান্য আলাপই সাহেবকে সে ব্যক্তির দিকে আকৃষ্ট করলো। লক্ষ্য করুন, এ সাধারণ কয়েকটা কথায়ই সাহেব অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন, সে আনন্দও মামুলি ধরনের নয়। এ জন্যে কয়েক ঘন্টা যাবত হয়তো তাকে বেশ প্রফুল্ল বলে মনে হচ্ছিল। লক্ষ্য করার বিষয়, বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে দু’চার কথাতেই কি করে একটা মানুষের সংগে স্বল্পকালীন সময়ে হৃদ্যতা গড়ে তোলা সহজ। এমনিভাবে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের মূল্য যে কি, তা ‘আদর্শ’ প্রচারকের জন্যে একবার পরীক্ষা করে দেখা দরকার। 
জনৈক ব্যক্তির প্রতিবেশী একজন জ্ঞানবান শিক্ষিত যুবক। টেলিফোন অফিসে তিনি কাজ করেন। তাকে প্রায়ই কর্মব্যস্ত দেখা যায়। তার সঙ্গে কথা বলার কোনো সময়ই পাওয়া যায় না। হয়তো ডিউটিতে থাকেন, নয়তো বেড়াতে বা বাজার করতে চলে যান। এমতাবস্থায় তার সঙ্গে কথা বলার সময়ই বা কোথায়? ঘটনাক্রমে ঐ প্রতিবেশীটি একদিন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে গিয়েছে। ঐ সময় কিন্তু উক্ত ভদ্রলোকেরই ডিউটি। দুই কানে তার যন্ত্র লাগানো। একের পর এক দিক তিনি অনর্গল নাম্বার বলেই যাচ্ছেন আর ওদিকে এক থেকে অপর দিকে নম্বর মিলিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কাজের অতো চাপের পরও তার মধ্যে বিরক্তির লেশমাত্রও দেখা যাচ্ছে না। নরম এবং মিষ্টিস্বরে নম্বর বলে যাচ্ছেন। ভাষায় কোনরূপ কর্কশ এবং রুক্ষতার নাম গন্ধও নেই ভদ্রলোকের। উক্ত ব্যক্তি দীর্ঘক্ষণ যাবত তা প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছে। যখনই একটু ফাঁক পেল তখন এ মুহুর্তকে সে উপযুক্ত সময় মনে করে আন্তরিকতার সঙ্গে ভদ্রলোকের স্মৃতিশক্তি এবং তার মিষ্টি ও মোলায়েম জবাবের কিঞ্চিৎ প্রশংসা করলো। এ কিঞ্চিৎ সমাদর দেখে অপরেটর সাহেবের চেহারা আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি সোৎসাহে বলে উঠলেন, আপনি এ কি দেখছেন, সে সব সময়তো আপনি দেখেনইনি, এর চেয়েও আরো বহুগুণ ঝামেলা যখন বেড়ে যায়। ঐ সময় মাথা চুলকানো নয়, বরং বলতে হবে নিঃশ্বাস ফেলারও সময় থাকে না। অতঃপর অপারেটর সাহেব বললেন, সামান্য অপেক্ষা করুন। আমার ডিউটি প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আর সামান্য কাজ বাকী। এক সঙ্গেই বাসায় ফিরবো। 
এরপর উভয়ে একসঙ্গে বাসায় চললো এবং পথে পরস্পরের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলো। ফলে এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, যে অপারেটরের সঙ্গে সামান্য আলাপ করার জন্যে ৫টি মিনিটও সময় পাওয়া যেত না, এখন ঘন্টার পর ঘন্টা বসেও সে পুস্তক পাঠ শুনছে এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। এক কথায় এখন তার জীবনের গতিধারাই ভিন্নখাতে প্রবাহিত হচ্ছে। 
কোন ব্যক্তি জনৈক প্রফেসারের সাথে আলাপ করার সুযোগ খুঁজছিল, কিন্তু ভদ্রলোক নিজেকে এতই সামলিয়ে চলেন যে, কারও সালামের জওয়াব দানের পর তার সঙ্গে অধিক কথা বলার সুযোগই তিনি কাউকে দিতেন না। হঠাৎ একদিন জানা গেলো, প্রফেসার সাহেব অসুস্থ। আজকে কলেজেও যেতে পারেননি। সে ব্যক্তি সংবাদ পেয়ে তাকে দেখতে গেলেন। বাসায় সংবাদ পাঠিয়ে জানতে পারলেন, প্রফেসার সাহেব তার পড়ার ঘরে আরাম করছেন এবং তাকে সেখানে যেতে বলেছেন। অত্যন্ত নিপুণভাবে বই-পুস্তক পড়ার টেবিল এবং অন্যান্য জিনিস-পত্র তার কক্ষে সজ্জিত ছিল। সুযোগ পেয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে শারীরিক অবস্থা জিজ্ঞাসাবাদের পর সে ব্যক্তি প্রফেসার সাহেবকে বললো : 
আপনার কামরায় সুবিন্যস্তভাবে রক্ষিত জিনিসপত্র সত্যিই আপনার মার্জিত রুচির পরিচায়ক। বড়ো চমৎকার! বেশ সুন্দরভাবেই আপনি কামরাটিকে বই-পুস্তক ইত্যাদি দিয়ে সজ্জিত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়াশুনার জন্যে এমন স্থানই উত্তম। এখানে পড়ার ইচ্ছে না থাকলেও পড়তে পড়তে ইচ্ছে হয়। এমন প্রশংসা শোনার পর প্রফেসার সাহেব ঐদিন কেবল কামরার আসবাবপত্র সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন আলমিরায় ও শেলফে রক্ষিত পুস্তক-গ্রন্থাবলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংক্ষিপ্ত পরিচয় করিয়ে দিলেন। ফলে দেখা গেলো,তারপর থেকে তার মধ্যে এখন আর সে অবজ্ঞার ভাবটুকু নেই, যা ইতিমধ্যে ছিল। এখন তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা বসেও উক্ত ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে থাকেন। সে তাকে যে কোন পুস্তক পড়তে দেন তা তিনি পড়তে থাকেন আর ক্রমে ক্রমে বইয়ের বিষয়বস্তু তার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।

উপরোক্ত কথাগুলো যদিও দৃষ্টান্তচ্ছলে বলা হলো, কিন্তু এর বুনিয়াদ মানুষের ব্যবহারিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে আজকাল বিবেচিত হচ্ছে। এটা কোন আকস্মিক ব্যাপার নয় যে, এ ধরনের ঘটনাবলীর দরুন মানুষ একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। বরং এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদ রয়েছে। তা হচ্ছে প্রত্যেক মানুষেরই বাসনা থাকে, ‘মানুষ আমাকে সম্মানের চোখে দেখুক, আমাকে ভালো বিবেচনা করুক।’  আপনি এবং আর সবার মনের একান্ত ইচ্ছে এই যে, মানুষ আপনার সৌন্দর্য, গুণাবলী এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি দিক, আপনাকে সম্মান করুক। অবশ্য এখানে সত্যিকার সৌন্দর্য এবং যোগ্যতা বলতে যা বুঝায় তারই কথা বলা হচ্ছে। মুখ দেখে কথা বলার মিথ্যা বা অবাস্তব কিছু প্রশংসা করা কিংবা কৃত্রিম তোষামোদের কথা এখানে বলা হচ্ছে না, যে জন্যে শ্রোতার মনে অহংকারের ভাব সৃষ্টি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে কি কি যথার্থ গুনাবলী এবং যোগ্যতা রয়েছে তা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। আপনার প্রতিটি কথা এবং কাজের মাধ্যমে এটা প্রকাশ হওয়া চাই। আপনি তার যোগ্যতাকে সঠিক মর্যাদা দিচ্ছেন। দুনিয়ায় এমন কোন মানুষ নেই যার মধ্যে অল্পবিস্তর কিছু গুণাবলীর সূত্র ধরে তাদের অসংখ্য দোষ-ত্রুটি সংশোধনের পথ বের করা যায় না। মানুষের ছিদ্রান্বেষণ করাটা সহজ কাজ। এটা অন্যের জন্য ছেড়ে দিন। মানুষের সদগুণাবলীর প্রতি লক্ষ্য করতে নিজেকে অভ্যস্থ করে তুলুন। তারপর দেখতে পাবেন কিভাবে মানুষ আপনার ডাকে সাড়া দেয় এবং আপনার প্রতি তাদের আকর্ষণ বেড়ে যায়। 

সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 30 November 2013 )