আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সা. প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন নঈম সিদ্দিকী   
Wednesday, 04 December 2013
আর্টিকেল সূচি
মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সা.
আগমনের উদ্দেশ্য আহ্বান এবং ঐতিহাসিক অবস্থান
এক নজরে ব্যক্তিত্ব
মক্কীযুগে মানবতার বন্ধু সা.
মাদানী অধ্যায়ে মানবতার বন্ধু সা.

মক্কীযুগে মানবতার বন্ধু সা.

 

তীব্র বিরোধীতার মুখোমুখী

এ হচ্ছে একটি শাশ্বত কথা।

এ কথাটি গ্রহন করে তোমরা

আমার সাথি হয়ে যাও। দেখবে,

এর শক্তিতে গোটা আরব তোমাদের।

মুষ্টিবদ্ধ হবে এবং এর প্রভাবে

গোটা বিশ্ব তোমাদের অধীন হবে।

-মানবতার বন্ধু সা.

এবার আসুন, ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতটা পর্যালোচনা করা যাক। উষর মরুতে বিকশিত সেই ফুলের গাছটার উত্থান পর্যবেক্ষন করি,যার চারদিকে কাটা বিছিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল।

 

এই সেই যুবক

আরবের এক বিশিষ্ট,সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে, নির্মল স্বভাব বিশিষ্ট এক ভাগ্যবান দম্পতির গৃহে এক ব্যতিক্রমী শিশু পিতৃহীন অবস্থায় জন্ম গ্রহন করে। সে জনৈকা দরিদ্র ও সুশীলা ধাত্রীর দুধ খেয়ে গ্রামের সুস্থ ও অকৃত্রিম পরিবেশে প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত হয় ও বেড়ে ওঠে। সে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে মরুভুমিতে ছুটাছুটি করতে করতে জীবনের কর্মক্ষেত্রে চরম বিপদ মুসিবত ও দুঃখ কষ্ট মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং ছাগল ভেড়া চরিয়ে চরিয়ে এক বিশ্বজোড়া জাতির নেতৃত্ব করার প্রশিক্ষন গ্রহন করে। শৈশবের পুরো সময়টা অতিবাহিত করার আগেই এই ব্যতিক্রমী শিশু মায়ের স্নেহময় ছায়া থেকে ও বঞ্চিত হয়। দাদার ব্যক্তিত্ব পিতামাতার এই শুন্যতা খানিকটা পুরন করতে পারলে ও কিছুদিন যেতে না যেতেই এই আশ্রয় ও তার হাতছাড়া হয়ে যায়। অবশেষে চাচা হন অভিভাবক। এ যেন কোন পার্থিব আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী না হয়ে একমাত্র আসল মনিবের আশ্রয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি পর্ব।

যৌবনে পদার্পন করা পর্যন্ত এ ব্যতিক্রমী কিশোরকে অন্যান্য ছেলেদের মত দুষ্ট ও বখাটে হয়ে নয়, বরং প্রবীনদের মত ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে দেখা যায়। যখন সে যৌবনে পদার্পন করে, তখন চরম নোংরা পরিবেশে লালিত পালিত হওয়া সত্ত্বে ও নিজের যৌবনকে নিষ্কলংক রাখতে সক্ষম হয়। যে সমাজে প্রেম,কু-দৃষ্টি বিনিময় ও ব্যভিচার যুবকদের জন্য গর্বের ব্যাপার, সেই সমাজে এই অসাধারন যুবক নিজের দৃষ্টিকে পর্যন্ত কলুষিত হতে দেয়না। যে সমাজে প্রত্যেক অলিতে গলিতে মদ তৈরীর কারখানা এবং ঘরে ঘরে পানশালা, যে সমাজে প্রত্যেক মজলিশে পরনারীর প্রতি প্রকাশ্য প্রেম নিবেদন ও মদ্যপানের বিষয়ে কবিতা পাঠের জমজমাট আসর বসে, সেখানে এই নবীন যুবক এক ফোঁটা মদ ও মুখে নেয়না। যেখানে জুয়া জাতীয় অনুষ্ঠানের রূপ পরিগ্রহ করেছিল, সেখানে আপাদমস্তক পবিত্রতায়মন্ডিত এই যুবক জুয়ার স্পর্শ পর্যন্ত করেনা। রূপকথার গল্প বলা ও গান বাজনা যেখানে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে ভিন্ন এক জগতের এই অধিবাসী এইসব অপসংস্কৃতির ধারে কাছেও ঘেষেনা। দু’একবার যদি ও এধরনের বিনোদনমুলক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ তার হয়েছিল,কিন্তু যাওয়া মাত্রই তার এমন ঘুম পায় যে, সেখানকার কোন অনুষ্ঠানই তার আর দেখা্ ও শোনার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। যে সমাজে দেবমূর্তির সামনে সিজদা করা ধর্মীয় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে হযরত ইবরাহিমের বংশধর এই পবিত্র মেজাজধারী তরুণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা ও নোয়ায়না এবং কোন মোশরেক সুলভ ধ্যান ধারণা ও পোষন করেনা। এমনকি একবার যখন তাকে দেবমূর্তির সামনে বলি দেয়া জন্তুর রান্না করা গোশত খেতে দেয়া হয়,তখন সে তা খেতে অস্বীকার করে। যেখানে কুরায়েশরা হজ্জের মৌসুমে আরাফাত ময়দানে না গিয়েই হজ্জ সম্পন্ন করতো, সেখানে এই অসাধারন কুরায়েশী যুবক এই মনগড়া নিয়মকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। হযরত ইবরাহীমের বংশধরেরা যেখানে ইবরাহীমী আদর্শকে বিকৃত করে অন্য বহু অনাচার ছাড়াও দিগম্বর সেজে কা’বা শরীফ তওয়াফ করার জঘন্য বেদায়াত চালু করে,সেখানে এই লাজুক যুবক এক মুহুর্তের জন্যেও এই বেদায়াতকে গ্রহন করেনা। যে দেশে যুদ্ধ একটা খেলা এবং রক্তপাত, একটা তামাশায় পরিনত হয়েছিল সেখানে মানবতার সম্মানের পতাকাবাহী এই যুবক এক ফোটা ও রক্তপাত করেনি। তারুণ্যে এই যুবক ‘হারবুল ফুজ্জার’ নামক বিরাট যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে হয়েছিল। কোরায়েশ গোত্রের এই যুদ্ধে অংশ গ্রহন ন্যায় সংগত ছিল বলে সে এই যুদ্ধে যোগদান করলে ও মানুষকে নিজে কোন আঘাত করেনি।

শুধু কি তাই? এই সতচরিত্র ও সত্যাশ্রয়ী যুবকের শখ কেমন তা ও দেখুন। যে বয়সে ছেলেরা সাধারনত বিপথগামী হয়ে থাকে, ঠিক সেই বয়সেই সে গরীব ও নিপিড়িত মানুষের সহায়তা এবং অত্যাচারীদের যুলুম উচ্ছেদের লক্ষে ‘হালফুল ফুজুল’ নামে একটা সংস্কারকামী সমিতিতে যোগদান করে। এতে যোগদানকারীরা তাদের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নের অঙ্গিকার করে।

নবুয়ত লাভের পর রসূল সা.ঐ সমিতির স্মৃতি চারন করতে গিয়ে বলতেনঃ’

ঐ অঙ্গিকারের পরিবর্তে কেউ যদি আমাকে লাল রং এর উটও দিত, তবু ও আমি তা থেকে ফিরে আসতামনা। আজও কেউ যদি আমাকে ঐ রকমের কোন চুক্তি সম্পাদন করতে ডাকে, তবে আমি সেজন্য প্রস্তুত।’

এই যুবকের গুনাবলী ও যোগ্যতা কতখানি, তা এ ঘটনা থেকেই বুঝা যায় যে, কা’বা শরীফ সংস্কারের সময় হাজরে আসওয়াদ পুনস্থাপন নিয়ে কোরায়েশদের মধ্যে তীব্র অন্তর্দন্দ্ব দেখা দেয়। এটা এতদুর গড়ায় যে, তলোয়ার পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে এবং সাজসাজ রব পড়ে যায়। কিন্ত ভাগ্রক্রমে এই গোলযোগ মিটমাট করার সুযোগটা এই যুবকই লাভ করে। চরম উত্তেজনার মধ্যে শান্তির পতাকাবাহী এই বিচারক একটা চাদর বিছিয়ে দেয় এবং চাদরের উপর রেখে দেয় হাজরে আসওয়াদ নামক সেই পাথর। তারপর সে কোরায়েশ গোত্রের সকল শাখার প্রতিনিধিদেরকে চাদর উত্তোলনের আহবান জানায়।

পাথর সমেত চাদর উত্তোলিত হয়ে যখন যথাস্থানে উপনীত হলো, তখন এই যুবক পাথরটা তুলে যথাস্থানে স্থাপন করলো। গোলযোগ থেমে গেল এবং সকলের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল ও উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।

এই যুবক যখন অর্থোপার্জনের ময়দানে পদার্পন করলো, তখন বাণিজ্যের ন্যায় পবিত্র ও সম্মানজনক পেশা বেছে নিল। দেশের বড় বড় পুঁজিপতি এই যুবককে তাদের পুঁজিগ্রহণ ও বাণিজ্য করার জন্য মনোনীত করে। এ যুবকের মধ্যে এমন গুণ নিশ্চয়ই ছিল যে জন্য তারা তাকেই মনোনীত করেছিল। সায়েব, কায়েস বিন সায়েব, হযরত খাদীজা এবং আরো কয়েক ব্যক্তি একে একে এই যুবকের অনুপম সততার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং তারা সবাই তাদে এক বাক্যে ‘তাজের আমিন’ বা ‘সৎ ব্যবসায়ী’ উপাধিতে ভূষিত করে। আব্দুল্লাহ বিন আবিল হামসার সাক্ষ্য আজও সংরক্ষিত রয়েছে যে, নবুয়তের পূর্বে একবার এই তরুণ সৎ ব্যবসায়ীর সাথে তাঁর কথা হয় যে, আপনি এখানে দাড়ান, আমি আসছি। কিন্তু পরে সে ভুলে যায়। তিন দিন পর ঘটনাক্রমে আব্দুল্লাহ ঐ জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পায়, ঐ সৎ ব্যবসায়ী আপন প্রতিশ্রুতির শেকলে আবদ্ধ হয়ে সেই জায়গায়ই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সে আব্দুল্লাহকে বললো, ‘তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ। আমি তিন দিন ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি।’- আবু দাউদ

তারপর দেখুন, এ যুবক জীবন সংগিনী নির্বাচন করার সময় মক্কার উঠতি যৌবনা চপলা চঞ্চলা মেয়েদের দিকে ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত না করে এমন এক মহিলাকে বিয়ে করে, যার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য এইযে, তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সতী সাধ্বী ও সচ্চরিত্র মহিলা। তার এ নির্বাচন তাঁর মানসিকতা ও স্বভাব চরিত্রের গভীরতাকেই ফুটিয়ে তোলে। বিয়ের প্রস্তাব হযরত খাদীজাই পাঠান, যিনি এই যুবকের অতুলনীয় সততা ও নির্মল চরিত্র দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। আর যুবকও এ প্রস্তাব সর্বান্তকরণে গ্রহণ করে।

এছাড়া কোন ব্যক্তির চরিত্র ও মানসিকতাকে যদি তাঁর বন্ধুবান্ধব ও সহচরদেরকে দেখে যাচাই করতে হয়, তাহলে আসুন দেখা যাক কেমন লোকেরা এ যুবকের বন্ধু ছিল?

সম্ভবত হযরত আবু বকরের সাথেই ছিল তাঁর সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব ও সবচেয়ে অকৃত্রিম সম্পর্ক। একে তো সমবয়সী, তদুপরি সমমনা। তার অপর এক বন্ধু ছিল হযরত খাদীজার চাচাতো ভাই হাকীম বিন হিযাম। এই ব্যক্তি হারাম শরীফের একজন খাদেম ছিলেন। [অষ্টম হিজরী পর্যন্তও তিনি ঈমান আনেননি। কিন্তু তবুও রসূল (সাঃ) এর সাথে গভীর বন্ধুত্ব ও প্রীতি বজায় রাখতেন। এই বন্ধুত্বের কারনেই একবার পঞ্চাশ আশরাফী দিয়ে একটা মূল্যবান পোশাক কিনে মদীনায় এসে রসূল (সাঃ) কে উপহার দেন। কিন্তু রসুল (সাঃ) অনেক পীড়াপীড়ী করে তাকে ঐ পোশাকের মূল্য দিয়ে দেন।] দেমাদ বিন সা’লাবা আযদী নামক একজন চিকিৎসকও ছিল তাঁর অন্যতম বন্ধু। কই, এ যুবকের বন্ধু মহলে একজনও তো নীচ, হীন, বদ অভ্যাস, যুলুমবাজ ও পাপাচারী লোক দেখা যায়না!

এই যুবক সাংসারিক, ব্যবসায়িক ও অন্যান্য দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে যখনই কিছু সময় অবসর পেয়েছে, তখন তা আমোদ ফূর্তি ও বিনোদনে কাটায়নি। যত্রতত্র ঘোরাঘোরি করে, আড্ডা দিয়ে, অথবা অলসভাবে ঘুমিয়ে কাটায়নি। বরং সমস্ত হৈ হাঙ্গামা থেকে দূরে সরে ও সমস্ত কর্মব্যস্ততা পরিহার করে নিজের নির্মল ও নিষ্কলুষ সহজাত চেতনা ও বিবেকের নির্দেশক্রমে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করতো হেরা গুহার নিভৃত প্রকোষ্ঠে গিয়ে। বিশ্বজগতের প্রচ্ছন্ন মহাসত্যকে হৃদয়ংগম করা ও মানব জীবনের অদৃশ্য রহস্যগুলোকে জানার জন্য আপন সত্তায় ও বিশ্ব প্রকৃতির অতলান্তে চিন্তা গবেষণা চালাতো। সে ভাবতো, কিভাবে আপন দেশবাসী ও গোটা মানবজাতিকে নৈতিকহীনতা ও নীচতা থেকে টেনে তুলে ফেরেশতার পর্যায়ে উন্নীত করা যায়। যে যুবকের যৌবনের অবসর সময় ব্যয় হলো এরূপ একান্ত চিন্তা গবেষণা কার্যে, তাঁর উঁচু ও পবিত্র স্বভাব সম্পর্কে মানবীয় বিবেক বুদ্ধি ও অন্তর্দৃষ্টি-কি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা?

দৈনন্দিন জীবনের এ জাতীয় ঘটনাবলী নিয়ে ভবিষ্যতের বিশ্বনবী কোরায়েশদের চোখের সামনেই মক্কী সমাজের কোলে লালিত পালিত হতে থাকে, ক্রমে যৌবনে পদার্পন করে এবং পরিপক্কতা লাভ করে। জীবনের এই চিত্র কি বলে দিচ্ছিলনা যে, এ যুবক এক অসাধারণ মহামানব? এভাবে বেড়ে ওঠা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কি কোনভাবে এম ধারণা পোষোণ করা চলে যে, ইনি কোন মিথ্যাচারী ও ধাপ্পাবাজ মানুষ হতে পারে? কিংবা হতে পারেন কোন পদলোভী, স্বার্থপর কিংবা ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসায় ফেঁদে বসা কোন ধর্মব্যবসায়ী? কক্ষনো নয়। খোদ কোরায়েশরাই তাঁকে সাদেক(সত্যবাদী) আমীন (বিশ্বাসী ও সৎ) জ্ঞানীগুণি, পবিত্রাত্না, ও মহৎ চরিত্রধারী মানুষ বলে স্বীকার করেছে এবং বারংবার করেছে। তার শত্রুরাও তাঁর মণীষা ও নৈতিকতার শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দিয়েছে এবং কঠিনতম দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যেও দিয়েছে। সত্যের এই মহান আহবায়কের জীবন চিত্রকে কুরআন নিজেও সাক্ষী হিসেবে পেশ করে তাঁকে বলতে বলেছেঃ [আরবীঃ ************]

‘আমি তো এর আগেও তোমাদের মাঝেই জীবনের একটা অংশ অতিবাহিত করেছি, তবুও কি তোমাদের বুঝে আসেনা?’ (ইউনুস, ১৬০)

কিন্তু জাতির এই উজ্জ্বল রত্নটি যখন নবুয়তের পদে অধিষ্ঠিত হয়ে সত্যের বাণী পেশ করলো, তখন তাদের মনোভাব সহসাই পালটে গেল। তার সততা, সত্যবাদিতা, ভদ্রতা, মহত্ব ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব সব কিছুরই মূল্য কমে গেল।কাল পর্যন্ত যে ব্যক্তি জাতির চোখের মনি ছিল, আজ সে দুশমন, বিদ্রোহী ও জাতির কলংক খেতাব পেল। কাল পর্যন্ত যাকে প্রতিটি শিশু পর্যন্ত সম্মান করতো, আজ সে সকলের ক্রোধভাজন। দীর্ঘ চল্লিশোর্ধ বছর ধরে যে ব্যক্তি নিজেকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করেছেন, তিনি আজ আল্লাহর একত্ববাদ, সত্য ও ন্যায়ের বাণী শোনানো মাত্রই কোরায়েশদের চোখে খারাপ হয়ে গেলেন! আসলে তিনি খারাপ ছিলেন না। বরং কোরায়েশের মূল্যায়নকারীদের চোখেই ছিল বক্রতা এবং তাদের মানদন্ডই ছিল ভ্রান্ত।

কিন্তু সত্যই কি কোরায়েশদের চোখ এত অন্ধ ছিল যে, ঘোর তমসাচ্ছন্ন পরিবেশে এমন আলোকময় একটা চাঁদকে তারা দেখতে পায়নি? চরিত্রহীনদের সমাবেশে সৎ চরিত্রবান একজন নেতাকে দেখে কি তারা চিনতে পারেনি? আস্তাকুড়ে পড়ে থাকা মুক্তার একটা মালা কি তাদের নজর কাড়তে পারেনি? অসভ্য ইতর মানুষদের সমাজে এই আপাদমস্তক ভদ্রতা ও শিষ্টাচারে মন্ডিত ব্যক্তি কি নিজের যথোচিত আদর ও কদর আদায় করতে পারেন নি? না, তা নয়। কোরায়েশরা ভালোভাবেই জানতো মুহাম্মদ কেমন মানুষ। কিন্তু জেনে শুনেও তারা চোখে ঠুলি পরেছিল। স্বার্থপরতা ও বিদ্বেষ তাদেরকে চোখ থাকতে অন্ধ বানিয়ে দিয়েছিল। যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ ‘তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখতে পায়না।' চোখ থাকতে যারা অন্ধ হয় তাদের দ্বারা হেন বিপদ নেই যা ঘটতে পারেনা এবং হেন বিপর্যয় নেই যা দেখা দিতে পারেনা।

 

কোরায়েশদের বিরোধিতার কারণ

আজ যদি আমরা কোনভাবে মক্কার কোরায়েশদের সাথে কথা বলতে পারতাম তাহলে অবশ্যই জিজ্ঞেস করতাম, তোমাদের গোত্রের এই নয়নমনি যে দাওয়াতটা দিয়েছিল, তাতে সে মূলত কোন্ খারাপ কাজটার প্ররোচনা দিয়েছিল? সে কি তোমাদের চুরি ডাকাতি করার আহবান জানিয়েছিল? সে কি তোমাদের হত্যা ও লুটতরাজ করতে ডেকেছিল? সে কি এতীম, বিধবা ও দুর্বলদের যুলুম নির্যাতন ও শোষণ চালানোর কোন পরিকল্পনা পেশ করেছিল? সে কি তোমাদের পারস্পরিক লড়াই চালাতে ও গোত্রে গোত্রে কোন্দল বাধাতে উস্কানি দিয়েছিল? সে কি কোন বিত্তবৈভব গড়া ও ভূ-সম্পত্তি বানানোর জন্য কোন সমিতি গঠন করতে চেয়েছিল? তোমরা তার ডাকে কী অসুবিধা দেখেছিলে? তার কর্মসূচীতে কোন্ বিপর্যয় অনুভব করেছিলে? কী কারণে তোমরা তার বিরুদ্ধে আদাপানি খেয়ে লেগেছিলে?

যে জিনিসটি জাহেলিয়াতের ভ্রান্ত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে এবং পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কোরায়েশদের উন্মত্ত করে তুলেছিল, সেটা রসূল সাঃ এর চিন্তা ও চরিত্রের কোন ত্রুটি এবং তাঁর দাওয়াতের কোন মারাত্নক ক্ষতিকর ছিলনা। এর কারন এও ছিলনা যে, তাঁর আন্দোলন তৎকালীন জাহেলী সমাজকে পশ্চাদপদতার দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল। বরং সে জিনিসটি ছিল শুধুমাত্র কোরায়েশদের স্বার্থপরতা। শত শত বছর ধরে গঠিত আরবীয় সমাজ কাঠামোতে কোরায়েশরা নিজেদের জন্য একটা উচ্চ নেতৃত্বের আসন দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। সমস্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পদ তাদের কুক্ষিগত ছিল। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে তাদের আধিপত্য ছিল অদম্য। এক কথায় গোটা আরব জাতির তারাই ছিল হর্তাকর্তা ও কর্ণধার। তাদের এই অবিসংবাদিত নেতৃত্ব ও আধিপত্য শুধু সেই ধর্মীয়,সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামোতেই চলতে সক্ষম ছিল, যা জাহেলী যুগ থেকে চলে আসছিল। তারা যদি সচেতন ও অবচেতনভাবে নিজেদের এই সর্বময় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখতে বাধ্য থেকে থাকে, তবে তারা তাদের জাহেলী সমাজ ব্যবস্থাকেও সব রকমের আক্রমণ ও অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে বাধ্য ছিল।

কোরায়েশ গোত্র যেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে আরবদের নেতা ও পরিচালক ছিল, সেখানে তারা আরবদের পৌত্তলিক ধর্মের পুরোহিত, ধর্মীয় তীর্থস্থানগুলোর রক্ষক ও সেবক এবং যাবতীয় ধর্মীয় তৎপরতার একচ্ছত্র ব্যবস্থাপকও ছিল। এই ধর্মীয় একচ্ছত্র ব্যবস্থাপনা ও সর্বময় কর্তৃত্ব তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্তৃত্বেরও পৃষ্ঠপোষক ছিল এবং এটা স্বতন্ত্রভাবে একটা বড় রকমের ব্যবস্থাও ছিল। এর কারণে আরব উপদ্বীপের প্রতিটি অঞ্চল থেকে তাদের কাছে নযর নিয়ায তথা উপঢৌকনাদি আসতো। এর কারণে তারা প্রগাঢ় ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র ছিল। লোকেরা তাদের কদমবুছি করতো। ধর্ম যখন কোন শ্রেণী বা গোষ্ঠীর ব্যবসায়ে পরিণত হয় তখন তার আসল প্রেরণা, চেতনা ও প্রাণশক্তি লোপ পায় এবং রকমারি আনুষ্ঠানিকতায় পরিপূর্ণ একটা নিরেট প্রদর্শনীমূলক তামাশার রূপ ধারণ করে। ধর্মের নীতিগত দাবী কি, তা আর কেউ মনে রাখেনা। তখন মনগড়া ঐতিহ্য ও অনুষ্ঠানাদি মৌলিক গুরুত্বের অধিকারী হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহর দেয়া ওহী ভিত্তিক জ্ঞান ও আইন কানুন তখন উধাও হয়ে যায় এবং ধর্মব্যবসায়ীদের তৈরী করা এক অভিনব শরীয়ত বিকাশ লাভ করে। যৌক্তিকতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। অন্ধ বিশ্বাস ও অলীক ধ্যানধারণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সাক্ষ্য প্রমাণ সহকারে বক্তব্য দেয়ার রীতি উধাও হয়ে যায়। আবেগ উত্তেজনা বিবেকবুদ্ধির কন্ঠরোধ করে। ধর্মের গণমুখী ও গণতান্ত্রিক মেযাজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং ধর্মব্যবসায়ীদের একনায়কত্ব সমাজের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে পড়ে। প্রকৃত জ্ঞান অবলুপ্ত হয়ে যায় এবং ভিত্তিহীন কথাবার্তা জনপ্রিয়তা লাভ করে। সহজ সরল আকীদা বিশ্বাস ও বিধিমালার পরিবর্তে কথায় কথায় জটিল ও পেঁচালো বিধিনিষেধ জারী করা হয়। দ্বিমত পোষণের অধিকার সম্পূর্ণরূপে হরণ করা হয় এবং একটা গোষ্ঠীর স্বৈরাচারী কর্তৃত্ব অবাধে চালু হয়ে যায়। সত্য, সততা, সৌজন্য ও খোদাভীতির নাম নিশানাও অবশিষ্ট থাকেনা এবং ধর্ম একটা প্রতারণাময় বহুরূপী কারবারের রূপ ধারণ করে। যখনই কোন ধর্মের বিকৃতি ঘটেছে, তখন এই প্রক্রিয়াতেই তা ঘটেছে। আরবের জাহেলী সমাজে এই বিকৃতি নিকৃষ্টতম পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। এই বিকৃতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল কোরায়েশ গোত্রের ধর্মীয় পৌরহিত্যের গদি। এই বিরাট লাভজনক ক্ষমতার গদিকে টিকিয়ে রাখার জন্য ঐ বিকৃত ধর্মীয় আবহ ও অবকাঠামোকে বহাল রাখা আবশ্যক ছিল। তার বিরুদ্ধে কোন বাদ প্রতিবাদ ও ভিন্নমতের আওয়ায তোলা এবং কোন ধরনের সংস্কার ও সংশোধনের আহবান জানানো যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য ছিল। সুতরাং কোরায়েশ গোত্র যে ইসলামের দাওয়াতে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে সেটা ছিল সম্পূর্ন স্বাভাবিক।

তা ছাড়া, কোরায়েশদের সংস্কৃতি ছিল চরম পাপাচারী সংস্কৃতি। মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়া, সুদখোরী, নারী নির্যাতন, মেয়ে শিশুকে জ্যান্ত মাটিতে পুতে ফেলা, স্বাধীন মানুষকে গোলাম বানানো এবং দুর্বলদের ওপর যুলুম করা এসবই ছিল কোরায়শ সংস্কৃতির বৈশিষ্ট। শত শত বছরব্যাপী পুঞ্জীভূত বদভ্যাস ও গৌরবময় জাতীয় ঐতিহ্যের রূপ ধারণকারী কদর্য সমাজপ্রথার সমন্বয়েই গঠিত ছিল এ সংস্কৃতি। নিজেদের হাতে গড়া এই সাংস্কৃতিক লৌহ খাঁচা ভেঙ্গে একটা নতুন পরিবেশে বিচরণ করতে প্রস্তুত হওয়া কোরায়েশদের জন্য সহজ ছিলনা। তারা সংগে সংগেই বুঝতে পেরেছিল যে, মুহাম্মদ সাঃ এর দাওয়াত তাদের চিরাচরিত রীতি-প্রথা, আদত অভ্যাস, কামনা-বাসনা, ললিতকলা তথা তাদের প্রিয় সংস্কৃতির শত্রু। তাই তারা প্রচন্ড আবেগে উদ্বেলিত হয়ে ঐ দাওয়াতের বিরোধিতা করতে বদ্ধপরিকর হয়ে যায়।

আসলে এ সব কারণেই প্রতিষ্ঠিত বিকৃত সমাজব্যবস্থার কর্ণধাররা, ধর্মীয় ঠিকাদাররা এবং প্রবৃত্তির পূজারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চিরকাল সত্যের দাওয়াতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।

 

ঘোর অন্ধকারে কয়েকটা আগুনের ফুলকি

রসূল সাঃ এর নবুয়ত লাভের আগে আরবের কিছু প্রতিভাধর ব্যক্তির মনে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। মহাবিশ্বে বিরাজমান প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলীতে প্রতিফলিত খোদায়ী আভাস ইংগিতের ভিত্তিতে চলমান সমাজ, পরিবেশ ও পৌত্তলিক ধর্মের প্রতি তাদের সৃষ্টি হ্য় অনাস্থা ও বিরাগ। এ অবস্থা তাদের মনকে অশান্ত ও স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদে সোচ্চার করে তুলেছিল। একটু আগেই আমরা যে ক’জন সংবেদনশীল ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছি, তাদের অন্তরাত্না থেকেও পরিবর্তনের অস্পষ্ট আকুতি ফুটে উঠেছিল।

একদিন কোরায়েশ জনতা একটা প্রতিমার চারপাশে সমবেত হয়ে একটা উৎসব উদযাপন করছিল। তারা ঐ পাথুরে দেবমূর্তির ভজন গাইছিল। ভক্তি নিবেদন করছিল, তার ওপর নিভিন্ন নজর নেয়ায চড়াচ্ছিল, এবং তওয়াফ করছিল। ঠিক এই সময় চার ব্যক্তি ওয়ারাকা ইবনে নওফেল, আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসমান ইবনুল হুয়াইরিছ এবং যায়েদ বিন আমর এই অর্থহীন উৎসবের প্রতি বিরক্ত হয়ে দূরে একটা আলাদা জায়গায় বসে গোপন বৈঠক করছিল। তারা পরস্পরের বক্তব্যের গোপনীয়তা রক্ষার শপথ গ্রহণের পর আলাপ আলোচনা চালায়। তাদের সর্বসম্মত অভিমত ছিল এরুপঃ ‘আমাদের জনগণ একেবারেই ভিত্তিহীন একটা মতাদর্শের ওপর চলছে। নিজেদের দাদা ইবরাহীমের ধর্মকে তারা বর্জন করেছে। যে পাথর নির্মিত মুর্তির উপাসনা করা হচ্ছে, তা দেখেও না, শোনেওনা, কারো উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারেনা। সাথীরা, তোমরা নিজ নিজ বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস কর, তাহলে আল্লাহর কসম, তোমরা বুঝতে পারবে যে, তোমাদের কোন ভিত্তি নেই। দুনিয়ার দেশে দেশে সফর কর এবং খোঁজ নাও, ইবরাহীমের ধর্মের সত্যিকার অনুসারী কেউ কোথাও আছে কিনা। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪২] পরে তাদের মধ্য থেকে ওয়ারাকা ইবনে নওফেল খৃষ্টান হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ প্রথমে অস্থিরতার বশে মুসলমান হয়ে যায় এবং পরে আবার অস্থিরতার বশেই খৃষ্টান হয়ে যায়। উসমান রোম সম্রাটের কাছে গিয়ে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। আর যায়েদ ইহুদী বা খৃষ্টান কোনটাই হলোনা, আবার পৌত্তলিকতাও পরিত্যাগ করলো। সে মৃত প্রাণির গোশত, রক্ত, এবং বেদীতে বলি দেয়া পশুর গোশত খাওয়া ছেড়ে দিল এবং মেয়ে শিশু হত্যা করতে লোকজনকে নিষেধ করতে লাগলো। সে বলতোঃ ‘আমি ইবরাহীমের প্রভুর ইবাদত করি’। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪২] হযরত আবু বকরের মেয়ে আসমা বলেন, ‘আমি বুড়ো গোত্রপতি যায়েদকে কা’বা শরীফের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখেছি। সে বলছিল, ‘হে কুরাইশ জনতা, আল্লাহর শপথ, আমি ছাড়া তোমাদের কেউ ইবরাহীমের ধর্ম অনুসরণ করছেনা।’ তারপর সে বললো, ‘হে আল্লাহ, আমি যদি জানতাম কোন্ নিয়ম তোমার পছন্দ, তা হলে সেই নিয়মেই তোমার ইবাদত করতাম। কিন্তু আমি জানিনা। তারপর সে হাতের তালু মাটিতে রেখে সিজদা করতো। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪২] তার সাথে কেউ সাক্ষাত করতে গেলে সে প্রায়ই এই কবিতাটা পড়ে শোনাতো, যার অর্থ হলোঃ “রব কি একজন হওয়া উচিত’ না হাজার হাজার? জীবনের সমস্যাগুলো যখন একাধিক রবের মধ্যে বন্টিত হয়ে যায়, তখন আমি কোন রবের আনুগত্য করবো”।

‘আমি লাত ও উযযা সবাইকে ত্যাগ করেছি। দৃঢ়চেতা ও ধৈর্যশীল লোকেরা এমনটিই করে থাকে।’

‘তবে হাঁ, আমি আমার দয়াময় রহমানের ইবাদত অবশ্যই করতে থাকবো, যাতে সেই ক্ষমাশীল প্রভু মাফ করে দেন আমার গুনাহগুলো।’

‘সুতরাং তোমরা একমাত্র আল্লাহকে ভয় করার নীতি অব্যাহত রাখ, যতক্ষণ এটা অব্যাহত রাখবে, তোমরা ধ্বংস হবে না ততক্ষণ।’

বেচারা যায়েদের স্ত্রী সফিয়া বিনতুল হাযরামী অনবরত তার পেছনে লেগে থাকতো। কখনো কখনো যায়েদ প্রকৃত ইবরাহীমি ধর্মের অন্বেষণে মক্কা ছেড়ে বেরুতে চাইত। কিন্তু তার স্ত্রী এটা খাত্তাব বিন নুফাইলকে আগে ভাগে জানিয়ে দিত। আর খাত্তাব পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করার জন্য তাকে তীব্র ভর্ৎসনা করতো। যায়েদ নিজের মতের প্রতি এত উৎসর্গীত ছিল যে, কা’বা শরীফের চত্তরে প্রবেশ করা মাত্রই বলে উঠতো।

‘হে সত্য প্রভু! আমি তোমার কাছে আন্তরিকতার সাথে ও দাসত্বের মনোভাব নিয়ে ইবাদত করার জন্য হাজির হয়েছি।’ তারপর আরো বলতো, ‘আমি কা’বার দিকে মুখ ক’রে সেই সত্তার কাছে আশ্রয় চাই, যার কাছে হযরত ইবরাহীম আশ্রয় চাইতেন।’ [সীরাত ইবনে হিশাম পৃঃ ২৪৮]

খাত্তাব বিন নুফাইল যায়েদকে কষ্ট দিত। এক পর্যায়ে সে তাকে মক্কার বাইরে নির্বাসিত করে। যায়েদ মক্কার উপকন্ঠে হেরার কাছে অবস্থান করতে থাকে। এরপর খাত্তাব কুরাইশ গোত্রের কিছু যুবক ও দুশ্চরিত্র লোককে তার প্রহরী নিযুক্ত করে এবং তাকে মক্কায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার নির্দেশ দেয়। যায়েদ কখনো লুকিয়ে মক্কায় আসতো। খাত্তাব ও তার সাথীরা টের পেলে তাকে আবার বিতাড়িত করতো। তারা তাকে ধর্ম বিকৃত করার দায়ে খুবই ঘৃণার সাথে নির্যাতন করতো। অবশেষে বিরক্ত হয়ে সে দেশ ছেড়ে চলে যায় এবং মোসেল, সিরিয়া প্রভৃতি স্থানে হযরত ইবরাহীমের ধর্মের অন্বেষণে ঘুরে বেড়াতে থাকে। অবশেষে সে দামেস্কের রোলকা এলাকায় জনৈক বিদ্বান দরবেশের সন্ধান পেল এবং তার কাছে গিয়ে হযরত ইবরাহীমের ধর্মের সন্ধান জানতে চাইল। দরবেশ বললো, ‘আজ আর তুমি এই ধর্মের অনুসারী একজন মানুষও পাবে না। তবে এই ধর্মের পতাকাবাহী একজন নবী শীঘ্রই আবির্ভূত হবেন এবং তুমি যে জায়গা থেকে এসেছ, সেখানেই আবির্ভূত হবেন। যাও, তার সাথে সাক্ষাত কর।` যায়েদ ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম ভালো করেই পরখ করে দেখেছিল। ঐ দুই ধর্ম তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। সে দরবেশের উপদেশ অনুসারে মক্কার দিকে ছুটে চললো। কিন্তু পথিমধ্যে ‘বিলাদ লাখাম’ নামক স্থানে লোকেরা তাকে হত্যা করে। [সীরাত ইবনে হিশাম, (প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪৯,২৫০)]

এই যায়েদের পুত্র সাঈদ ও হযরত ওমর ইসলামের আবির্ভাবের পর রসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, আমরা যায়েদের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে পারি কিনা? রসূল সা. বলেনঃ ‘হা, কারণ সে কেয়ামতের দিন একটা স্বতন্ত্র উম্মত হিসাবে ওঠবে।` অর্থাৎ কোন ব্যক্তির তার নির্মল স্বভাবের কাছ থেকে যতটুকু পথ নির্দেশ পাওয়া সম্ভব, তা পেয়েই যায়েদ পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে তা গ্রহণ করেছে, অতঃপর সে ওহীর হেদায়াত লাভের জন্য অনেক ছুটাছুটি করেছে। সর্বশেষে সে রসূল সা. এর কাছে রওনা হয়েছিল, কিন্তু এই সত্য সন্ধানের পথেই সে শহীদ হলো।

এই দীর্ঘ বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, ইতিহাস একটা নতুন মোড় নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল এবং মানবীয় বিবেক অশান্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রকৃতির অস্পষ্ট আভাস ছাড়া কোন আলোর দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছিলনা। বিকৃত ধর্মচর্চা ও অযৌক্তিক আনুষ্ঠানিকতার পরিবেশ মানুষের স্বকীয়তার টুটি চেপে ধরেছিল। মানুষ ছিল স্থবিরতার চার দেয়ালে বন্দী। সংবেদনশীল লোকেরা হয় খৃস্টধর্মের মনযিলে এসে থেমে গিয়েছিল। কেননা পরিবেশ এর অনুকুল ছিল। নচেত তারা দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু চলমান ভ্রষ্টতার বিরুদ্ধে জেহাদ করা খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। উল্লেখিত চার ব্যক্তির মধ্যে বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেবল যায়েদ এতটা সাহস দেখিয়েছে যে, হারাম শরীফে বসে এক আল্লাহকে ডেকেছে এবং কুরাইশদের সামনে পৌত্তিলিকতাকে ধিক্কার দিয়েছে। কিন্তু সেও অস্থিরতা প্রকাশ ও প্রতিবাদ করার চেয়ে বেশী কিছু করতে পারে নি। কেননা তার সামনে কোন এমন সুস্পষ্ট ও পূর্ণাংগ আদর্শ ছিলনা, যাকে সে দাওয়া ও আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তবুও মক্কা তার অস্তিত্ব বরদাশত করতে অস্বীকার করেছে।

জাহেলী সমাজে কবিদের বিশেষ মর্যাদা ছিল। তারা মানুষের মনস্তাত্মিক নেতৃত্বও দিত। তাদের কবিতা ছিল তৎকালীন সমাজের মানসিকতা ও চিন্তাধারার দর্শন। সমাজের বিবেকের অস্থিরতার ছাপ রসূল সা. এর অব্যবহিত-পূর্ববর্তী যুগের জাহেলী কবিদের কবিতায় প্রতিফলিত হতো। এ সব কবিতায় অনেক সময় মানবীয় বিবেক মৌলিক সত্য নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠতো।

এ সব কবির মধ্যে একজন হচ্ছেন তায়েফের বিশিষ্ট সরদার উমাইয়া বিন আবিস্ সাল্ত। ইনি তাওহীদ, কেয়ামত ও কর্মফল সম্পর্কে ভালো ধ্যান-ধারণা পেশ করেছেন। তাছাড়া বেশ কিছু নৈতিক উপদেশও তার কবিতায় রয়েছে। ইনিও পৌত্তলিক চিন্তাধারার প্রতি বিদ্রোহী ছিলেন। কিন্তু রসূল সা. এর দাওয়াতকে গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেননি। রসূল সা. তার কবিতাকে পছন্দ করতেন এবং বলতেন, এই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।

এ ধরনের সচেতন ব্যক্তিবর্গের মানসিক আলোড়ন পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, পরিবেশ একটা নতুন প্রাণোচ্ছল বাণী লাভের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল।

ইতিহাস যে বিপ্লবী শক্তির প্রতীক্ষায় ছিল, তা উপযুক্ত সময়েই মুহাম্মদ সা. এর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তিনি শুধু নেতিবাচক প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে এবং নিজের ব্যক্তিগত মনমানস ও মহৎ চরিত্র নিয়েই উপস্থিত হননি, বরং একটা সর্বব্যাপী ইতিবাচক মতবাদ ও মতাদর্শ নিয়ে সমগ্র জাতি ও সমগ্র পরিবেশের আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। আরবের তৎকালীন পরাক্রান্ত বাতিল শক্তির পক্ষে এই অপরাধকে (?) বরদাশত করা কিভাবে সম্ভব ছিল?

 

দাওয়াতের প্রথম যুগঃ গোপন প্রচার

নবুয়তের সূচনা যুগের প্রাক্কালে প্রস্তুতি স্বরূপ নিভৃত ধ্যানে মগ্ন থাকার সময় রসূল সা. কে বিভিন্ন সত্য স্বপ্ন দেখানো হতো। কখনো বা গায়েবী আওয়ায শুনতে পেতেন। কখনো ফেরেশতা দেখতে পেতেন। অবশেষে আল্লাহর আরশ থেকে প্রথম বাণী এলো। জিবরীল এসে সম্বোধন করলেনঃ (আরবী********)

এটা ছিল তাঁর ওহী লাভের প্রথম অভিজ্ঞতা। তিনি অনুভব করলেন যেন তার ঘাড়ের ওপর এক ভীতিময় ও বিরাট বোঝা চেপে বসেছে। বাড়ীতে ফিরে এসে নিজের জীবন সংগীনিকে ঘটনা অবহিত করলেন। তিনি সান্ত্বনা দিলেন যে, আপনার খোদা কখনো আপনাকে ছেড়ে দেবন না। ওয়ারাকা ইবনে নওফেল বললেন, এতো আল্লাহর সেই দূত, যিনি মূসা আ. ওপর অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি আরো বললেন, দেশের লোকেরা আপনাকে মিথ্যুক বলবে, উত্যক্ত করবে, দেশ থেকে বিতাড়িত করবে এবং আপনার সাথে যুদ্ধ করবে। আমি যদি সেদিন বেঁচে থাকি, তাহলে আমি আল্লাহর কাজে আপনাকে সমর্থন করবো। এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আল্লাহ পক্ষ থেকে সত্যের দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত হলেন। তাঁর ওপর এক বিরাট দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলো। এ দাওয়াতা সর্বপ্রথম হযরত খাদীজার সামনে উপস্থাপিত হলো এবং তিনিই লাভ করলেন এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী প্রথম ব্যক্তির মর্যাদা। এরপর ধীর গতিতে গোপনে চলতে লাগলো এ কাজ। হযরত আবু বকর সিদ্দীক ছিলেন তাঁর বাল্যবন্ধু। দু’জনেরই মন মেযাজ ও রুচি ছিল একই রকম। তিনি যখন সত্যের দাওয়াত পেলেন, তৎক্ষণাত এমনভাবে তা গ্রহণ করলেন যেন তাঁর অন্তরাত্মা এরই জন্য আগে থেকে অপেক্ষমান ছিল। রসূল (সা) এর পালিত পুত্র যায়েদও তাঁর সাথী হলো। সে তাঁর জীবন ও চরিত্র দ্বারা আগে থেকেই প্রভাবিত ছিল।

এই ঘনিষ্ঠতম লোকদের তাঁর ওপর ঈমান আনা তার নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সত্যবাদিতার একটা প্রমাণ। এই ব্যক্তিবর্গ কয়েক বছর ধরে তাঁর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন এবং তাঁর ভেতর ও বাহির সম্পর্কে পুরোপুরিভাবে অবহিত ছিলেন। রসূল সা. এর জীবন চরিত্র, চিন্তাভাবনা ও মানসিকতা সম্পর্কে এদের চেয়ে বেশী জানা কারো পক্ষে সম্ভব ছিলনা। এই ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গ একেবারে সূচনাতেই তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে দিলেন যে, আহ্বায়কের সত্যবাদিতা ও আন্তরিকতা সন্দেহাতীত।

হযরত আবু বকর রা. রসূল সা. এর আন্দোলনের সৈনিক হওয়া মাত্রই নিজের প্রভাবাধীন লোকদের মধ্যে জোরে শোরে কাজ শুরু করে দিলেন। তিনি হযরত ওমর, ওসমান, যুবায়ের, আব্দুর রহমান বিন আওফ, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস, তালহা রা. প্রমুখসহ বেশ কিছু সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে এ বিপ্লবী আন্দোলনের সদস্য বানিয়ে ফেললেন। অত্যন্ত সতর্কতা, গোপনীয়তা ও নীরবতার মধ্য দিয়ে তারা এ কাজের প্রসার ঘটাতে লাগলেন। ইসলামী আন্দোলনের এই গোপনীয় ও প্রাথমিক যুগে অন্যান্য যারা প্রথম কাতারের মুসলমানদের দলভুক্ত হন তাদের মধ্যে হযরত আম্মার, খাব্বাব, আরকাম, সাঈদ বিন যায়েদ, (ইতিপূর্বে আলোচিত যায়েদ বিন আমরের পুত্র, যিনি পিতার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন) আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, উসমান বিন মাযঊন, আবু উবাইদা, সুহায়েব রূমী প্রমুখ অন্যতম।

নামাযের সময় হলে রসূল সা. কোন পাহাড়ের ওপর চলে যেতেন এবং নিজের সাথীদের নিয়ে গোপনে নামায পড়ে আসতেন। শুধু চাশতের নামায কা’বার চত্তরে পড়তেন। কেননা ও নামায কুরাইশদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। একবার রসুল সা. হযরত আলীকে সাথে নিয়ে কোন এক গিরিপথে নামায পড়েছিলেন। এ সময় তাঁর চাচা আবু তালেব তা দেখে ফেলেন। এই নতুন ধরনের নামায দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান এবং গভীর মনোযোগের সাথে তা দেখতে থাকেন। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা এটা কোন ধর্ম অবলম্বন করলে? রসূল সা. বললেন, ’আমাদের দাদা ইবরাহীমের ধর্ম এটাই ছিল।’

একথা শুনে আবু তালেব বললেন, ’আমার পক্ষে তো এ ধর্ম গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি। কেউ তোমাদের বাধা দিতে পারবেনা। [সীরাতুন্নবী, শিবলী নুমানী, (প্রথম খন্ড, পৃঃ ১৯২)।]

হযরত আবু যরও ইসলামী আন্দোলনের এই গোপনীয়তার যুগে ঈমান এনেছিলেন। আল্লামা শিবলী নুমানীর মতে তাঁর ক্রমিক নম্বর ৬ষ্ঠ বা ৭ম। ইনিও সেই সব ব্যক্তির অন্যতম, যারা অস্থিরতায় ভুগছিলেন এবং মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়ে নিছক আপন নির্মল স্বভাব ও বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর যিকির ও ইবাদত করতেন। কোন না কোন উপায়ে তিনি রসূল সা. এর দাওয়াতের খবর পেয়ে গেলেন। অতঃপর নিজের ভাইকে সঠিক তথ্য জানার জন্য পাঠালেন। তাঁর ভাই রসূল সা. সাথে সাক্ষাত করলেন, তাঁর কুরআন তেলাওয়াত শুনলেন এবং ফিরে গিয়ে ভাইকে বললেন, ’আমি এই দাওয়াত দাতাকে দেখে এসেছি। লোকেরা তাকে ধর্মত্যাগী [বিকৃত সমাজ ব্যবস্হার বিচিত্র রূপ দেখুন। যে ব্যক্তি সারা দুনিয়ার মানুষকে ঈমানের শিক্ষা দিতে এসেছিলেন, তিনিই নাকি ধর্মচ্যুত! সকল যুগের ধর্ম ব্যবসায়ীরাই এ ধরনের ফতোয়া দিয়ে থাকে] বলে থাকে। কিন্তু তিনি মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী শিক্ষা দেন এবং এমন এক বিস্ময়ের বাণী শোনান, যা মানবীয় কবিতা থেকে একেবারেই অন্য রকম। তাঁর চালচলন তোমার চালচলনের মত। এরপর তিনি নিজে এলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।

এ ঘটনা থেকে প্রমানিত হয়, গোপনীয়তা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সত্যের সুবাস বাতাসের ওপর ভর করেই দিক থেকে দিগন্তে ছুটে যাচ্ছিল। এ সময়ে রসূল সা. কে নানা রকমের কু-খেতাব দেওয়াও শুরু হয়ে গিয়েছিল। তথাপি পরিবেশ মোটামুটি শান্ত ও স্বাভাবিক ছিল। কেননা তখনো কুরাইশ নেতারা আসন্ন বিপদের গুরুত্ব অনুমান করতে পারেনি।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন, ইসলামী আন্দোলনের এই প্রথম সারির নেতৃবৃন্দের মধ্যে একজনও এমন ছিলেন না, যিনি উচ্চতর জাতীয় ও ধর্মীয় পদে আসীন ছিলেন। এর ফলে তাঁরা সকল স্বার্থপরতার বন্ধন থেকে মুক্ত ছিলেন। ইতিহাসে এ ধরনের স্বাধীনচেতা যুবকরাই বড় বড় পরিবর্তন সূচিত করার জন্য সম্মুখের কাতারে অবস্থান গ্রহণ করে থাকে। নেতা ও পদস্থ ব্যক্তিরা কেউ এ কাজে অবদান রাখেনি।

গোপনীয় স্তরের এই ইসলামী আন্দোলনকে কুরাইশ নেতারা আদৌ গুরুত্ব দেয়ার যোগ্য মনে করেনি। তারা ভেবেছিল, এ-তো কতিপয় যুবকের পাগলামি। ওরা উল্টো পাল্টা কথাবার্তা বলে থাকে। কয়েকদিন পর আপনা থেকেই মাথা ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মত বুকের পাটা কার আছে? এভাবে ক্ষমতার মসনদে আসীন লোকগুলো নিজেদের ক্ষমতার গর্বে এতই দিশেহারা ছিল যে, ঐ মসনদের ছায়ার নীচে তাদের অজান্তেই সত্যের চারাগুলো ক্রমে ক্রমে বেড়ে ওঠে ইতিহাসের মহীরূহে পরিণত হলো। কুরাইশদের এটাও ধারণা ছিল যে, লাত মানাত ও উযযার মত দেবতাদের আমরা যখন এত ভক্তি ও পূজা করি, তখন তারাই মান সম্মান ও পৌত্তলিক ধর্মের হেফাজত করবে। তাদের আধ্যাত্মিক অভিশাপ এই গুটিকয় তওহীদপন্থীর দেবদ্রোহিতাকে খতম করে দেবে।

 

প্রকাশ্য দাওয়াত

এভাবে তিন বছর কেটে গেল। কিন্তু একটা পরিস্থিতিকে চিরদিন একইভাবে থাকতে দেয়া আল্লাহর রীতি নয়। তাঁর চিরাচরিত রীতি হলো, তিনি বাতিলের প্রতিরোধের জন্য সত্যকে সামনে নিয়ে আসেন এবং উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বাধান। যেমন আল্লাহ বলেনঃ আমি বরং সত্যকে বাতিলের ওপর নিক্ষেপ করি, অতপর সত্য বাতিলকে আঘাত করে। এর ফলে বাতিল উৎখাত হয়ে যায়।’ -সূরা আল আম্বিয়া

আল্লাহর এই চিরাচরিত রীতি অনুসারে আদেশ জারী হলোঃ ‘তোমাকে যা নির্দেশ দেয়া হচ্ছে তা প্রকাশ করে দাও।’

রসূল সা. সমস্ত হিম্মত ও সাহস সঞ্চয় করে, নতুন সম্ভাব্য সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে একদিন সাফা পর্বতের ওপর এসে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি আরবের বিশেষ রীতি অনুযায়ী কুরাইশ জনতাকে ডাক দিলেন। কোন বিপদের মুহূর্তে জনগণকে সাহায্যের জন্য একটা বিশেষ সাংকেতিক ধ্বনি দিয়ে ডাকার রেওয়াজ ছিল। তিনি সেই পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। লোকেরা ছুটে এল। বিরাট জন সমাগম হলো। সবাই রুদ্ধশ্বাসে কান পেতে রইল কী হয়েছে জানার জন্য।

রসূল সা. প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘আমি যদি তোমাদের বলি, এই পাহাড়ের অপর পাশে হানাদার বাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণ চালাতে ছুটে আসছে, তাহলে তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?’

সবাই সমবেত স্বরে বলে উঠলোঃ হাঁ, কেন করবোনা? আমরা তোমাকে সব সময় সত্য কথাই বলতে দেখেছি।’

- তাহলে ওহে আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর, ওহে আবদ মানাফের বংশধর, ওহে যাহরার বংশধর, ওহে তামীমের সন্তানেরা, ওহে মাখযুমের সন্তানেরা, ওহে আসাদের বংশধর, শোনো, আমি বলছি, তোমরা এক আল্লাহকে প্রভু ও উপাস্য মেনে নাও, নচেত তোমাদের ওপর কঠিন আযাব নেমে আসবে। এই বলে তিনি অতি সংক্ষেপে প্রথমবারের মত উন্মুক্ত দাওয়াত পেশ করলেন।

তাঁর চাচা আবু লাহাব কথাটা শোনা মাত্রই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো, ‘ওরে হতভাগা, তুই আজকের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যা। এই কথা বলার জন্যই কি আমাদের এখানে ডেকেছিলি?’ আবু লাহাব ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় লোকেরা খুবই ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেল।

লক্ষণীয় যে, আবু লাহাবের পক্ষ থেকে, রসূলের দাওয়াতকে নিছক গুরুত্বহীন ও আমল দেয়ার অযোগ্য বলে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। এছাড়া অন্য কোন প্রতিক্রিয়া তখনো দেখা দেয়নি। অভিযোগটা শুধু এই ছিল যে, তুমি আমাদের অকারণেই কষ্ট দিয়েছ এবং আমাদের সময় নষ্ট করেছ।

প্রকাশ্য দাওয়াতের দ্বিতীয় পদক্ষেপটা নেয়া হলো এই যে, রসূল সা. আব্দুল মুত্তালিব পরিবারের লোকদের জন্য একটা ভোজের আয়োজন করলেন। এই ভোজে তাঁর চাচা হামযা, আবু তালিব ও আব্বাসের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গও যোগদান করেন। আহারের পর তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি যে বিধান নিয়ে এসেছি তা ইহকাল ও পরকাল উভয়ের জন্যই কল্যাণের। এ কাজে আমার সাথী হবার জন্য কে কে প্রস্তুত? একথা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি দাওয়াতের সূচনালগ্নেই এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে, তিনি দুনিয়ার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ধর্ম নয় বরং দুনিয়াকে কল্যাণময় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে পারে এমন ধর্ম নিয়েই এসেছেন।

তাঁর আবেদনে সমবেত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে নীরবতা বিরাজ করতে লাগলো। সহসা তেরো বছরের এক কিশোর নীরবতা ভংগ করে উঠে দাঁড়ালো। সে বললো, ‘যদিও আমি চোখের অসুখে আক্রান্ত, আমার পা দুর্বল, এবং আমি একজন কিশোর মাত্র, তবুও আমি আপনার সংগী হব।’ ইনি ছিলেন হযরত আলী রা.। পরবর্তীতে তিনি এ আন্দোলনের অন্যতম স্তম্ভ প্রমাণিত হন।

একটা কিশোর ছাড়া আর কেউ সাড়া দিল না- এই দৃশ্য দেখে সমবেত জনতা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। আব্দুল মুত্তালিবের বংশধররা এই অট্টহাসির মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে এ কথাই বললো যে, এই দাওয়াত, এই দাওয়াতদাতা এবং সাড়াদানকারী বালক মিলিত হয়ে কোন মহাবিপ্লব সাধন করবে? এ সব একটা তামাশা এবং একটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। এ আহবানে সাড়া দেয়ার জন্য একটা বিদ্রুপাত্মক অট্টহাসিই যথেষ্ট।

এই দ্বিতীয় ঘটনায়ও পরিবেশের শান্তভাব কাটেনি। কিন্তু এরপর যখন তৃতীয় পদক্ষেপ নেয়া হল, তখন সমাজে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়ে তা ক্রমশ তীব্রতর হতে লাগলো।

এই তৃতীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনা করার আগে আরো একটা ঘটনার বর্ণনা জরুরী মনে হচ্ছে। আগেই বলেছি যে, প্রতিকূল পরিবেশের কারণে নামায গোপনে পড়া হতো, রসূল সা. ও তাঁর সাথীরা শহরের বাইরে পাহাড়ের উঁচু নীচু স্থানে বা সমতলে যেয়ে যেয়ে নামায পড়ে আসতেন। একদিন এক পার্বত্য ঘাঁটিতে হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস অন্যান্য সাহাবীকে সাথে নিয়ে নামায পড়ার সময় মোশরেকরা দেখে ফেলে। নামায পড়ার সময়ই মোশরেকরা অশালীন কথাবার্তা বলতে শুরু করে দিল এবং নামাযের প্রতিটা কাজের ব্যংগ বিদ্রুপ করতে লাগলো। ওদিক থেকে যখন কোনই জবাব দেয়া হলো না, তখন তারা বিরক্ত হয়ে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে দিল। এই সংঘর্ষে জনৈক মোশরেকের তলোয়ারের আঘাতে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. আহত হলেন। মক্কার মাটিতে এটাই ছিল আল্লাহর পথের প্রথম রক্তপাতের ঘটনা। এটা ছিল জাহেলী সমাজের প্রথম উন্মত্ত হিংস্র প্রতিক্রিয়া। এ প্রতিক্রিয়া থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছিল যে, বিরোধিতা এখন হিংস্রতার পথে পা বাড়াতে শুরু করেছে।

 

উস্কানী ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি

ইসলামী আন্দোলনে ক্রমান্বয়ে চল্লিশ জন সহযোগী জুটে গেল। এভাবে ইসলামী সংগঠন একটা বাস্তব শক্তিতে পরিণত হলো। প্রকাশ্যে সত্যের কালেমা উচ্চারণের নির্দেশ ইতোমধ্যে দেয়াই হয়। এ নির্দেশ পালন করার জন্য রসূল সা. একদিন কা’বার চত্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু ধর্মীয় চেতনা যখন বিকৃত হয়ে যায়, তখন ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো ভূলুণ্ঠিত হয়ে থাকে। তাই যে পবিত্র ঘর একদিন তাওহীদের বাণী প্রচারের কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার চত্বরে আল্লাহর একত্বের কথা বলা ঐ কেন্দ্রের অবমাননার কারণ হিসাবে চিহ্নিত হলো। বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, অতগুলো মূর্তি স্থাপনে কা’বা শরীফের অবমাননা হয় না, মূর্তির সামনে কপাল ঘষলেও তার অবমাননা হয় না, উলংগ হয়ে তাওয়াফ করলে, উলু ধ্বনি দিলে এবং তালি বাজলেও তার পবিত্রতাহানি হয় না। দেবদেবীর নামে জানোয়ার বলি দিলে এবং পুরোহিতগিরি ও খাদেমগিরির কর আদায় করলেও কা’বার অপমান হয় না। অপমান হয় শুধু ঐ ঘরের আসল মালিকের নাম নিলেই।

আওয়াজ উঠলোঃ ‘কা’বার অবমাননা করা হয়েছে, হারাম শরীফের সম্মানহানি করা হয়েছে।’ কী সাংঘাতিক ব্যাপার! মাথায় রক্ত চড়িয়ে দেয়ার মত উস্কানিদায়ক কাজ! প্রচণ্ড উত্তেজনায় বেসামাল ও আবেগে দিশেহারা মোশরেকরা তাওহীদের কালেমা শুনে চারদিক থেকে ধেয়ে এল। গোলযোগের সূত্রপাত হলো। রসূল সা. ঘেরাও হয়ে গেলেন। হারেস বিন উবাই হৈ চৈ শুনে রসূল সা. কে রক্ষা করতে ছুটে এলেন। কিন্তু তরবারীর আঘাতে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। আরবে ইসলাম ও জাহেলিয়াতের সংঘাতে এটাই ছিল ইসলাম রক্ষার লক্ষ্যে সংঘটিত প্রথম শাহাদাত।

অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ উপায়ে ও যুক্তিসংগত পন্থায় যে দাওয়াত দেয়া হলো, তা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া এবং যুক্তির জবাব যুক্তির মাধ্যমে দেয়ার পরিবর্তে অন্ধ আবেগ ও উন্মত্ত হিংস্রতা দিয়ে তার জবাব দেয়া হলো। রসূল সা. তরবারীর জোরে সত্যের কালেমা গ্রহণে বাধ্য করেননি। কিন্তু বিরোধী শক্তি তলোয়ার হাতে নিয়ে রুখে এল। একটা বাতিল ব্যবস্থার স্বার্থপর হোতাদের এটাই প্রধান বৈশিষ্ট্য যে, তারা যুক্তির জবাবে উস্কানি ও উত্তেজনা এবং প্রমাণের জবাবে হিংস্রতা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করে থাকে। বিরোধীদের মধ্যে এতটুকু সহিষ্ণুতাও ছিল না যে, অন্ততপক্ষে কয়েক সপ্তাহ, কয়েক দিন বা কয়েক মিনিট সময় কা’বার চত্বরে প্রদত্ত ঘোষণাটা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করবে। তারা এ কথাটা স্বীকার করতে পারতো যে, তাদের মত মুহাম্মদ সা. -এরও অধিকার রয়েছে কোন না কোন ধর্ম, মতবাদ, দর্শন, বা আকীদা বিশ্বাস পোষণ করার, তদনুসারে বলার এবং অন্য কারো ধর্ম, মত বা আকীদা বিশ্বাসের বিরোধিতা করার। তারা অন্তত এতটুকু সম্ভাবনার কথা স্বীকার করতে পারতো যে, আমাদের ভেতরে কিছু ভুল ত্রুটি থাকতে পারে এবং মুহাম্মদের সা. প্রচারিত মতাদর্শে সে ত্রুটি শুধরাবার ব্যবস্থাও থাকতে পারে। আসলে কোন বাতিল ব্যবস্থার নেতাদের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা একেবারেই শেষ হয়ে যায় এবং তাদের চিন্তাভাবনা ও বিচার বিবেচনার যোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়।

একটু ভাবতে চেষ্টা করুন তো সেই পরিবেশটা কেমন ছিল, যেখানে আমাদের সকলের ইহ-পরকালের কল্যাণের জন্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে একেবারেই নিরস্ত্র ও নিঃসম্বল অবস্থায় আপন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা.।

 

অপপ্রচার

হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. এর পবিত্র আবেগ উদ্দীপনা ও আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হারাম শরীফের অভ্যন্তরে মক্কাবাসী কর্তৃক একজন নিরপরাধ মানুষের এই হত্যাকাণ্ড থেকে অনাগত ভবিষ্যতের একটা ধারণা পাওয়া গেলেও এর মধ্য দিয়ে আসল হিংস্রতার যুগের সূচনা হয়নি।

বিরোধিতার প্রথম স্তর সব সময়ই ঠাট্টা বিদ্রুপ, উপহাস ও কূটতর্কের মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা সন্ত্রাস- গুণ্ডামীর রূপ ধারণ করে।

রসূল সা. এর দাওয়াতের গুরুত্ব কমানোর উদ্দেশ্যে গালিগালাজের ঘৃণ্য ইতরামির পাশাপাশি রকমারি উপাধি প্রণয়নের কাজও শুরু করে দিল অপপ্রচারের দক্ষ কুশলীরা।

যেমন কেউ বললো, এই ব্যক্তির কথাবার্তা তোমরা শোনো না। কারণ ওতো ‘ধর্মত্যাগী’। আমাদের পূর্বপুরুষদের চিরাচরিত ধর্মকে পরিত্যাগ করে সে নিজে এক মনগড়া উদ্ভট ধর্ম তৈরি করেছে। তারা কোন যুক্তির ধার ধারতো না। যার ইচ্ছা হতো, কুফরি ফতোয়া জারি করে দিত। কখনো বা বলা হতো, সে ‘সাবী’ (নক্ষত্র পূজারী বা প্রকৃতিপূজারী) হয়ে গেছে। যেহেতু তৎকালীন মোশরেক সমাজে সাবী হওয়া ছিল একটা অবাঞ্ছিত ও কলংকজনক ব্যাপার, তাই কাউকে সাবী আখ্যা দেয়া আজকের যুগে কোন মুসলমানকে ইহুদী, খারেজী বা নাস্তিক বলার মতই গালি বলে বিবেচিত হতো। সত্যের বিরুদ্ধে যুক্তিপ্রমাণ সহকারে বক্তব্য দিতে অক্ষম লোকদের একমাত্র সম্বল হয়ে থাকে নেতিবাচক প্রচারণা। আর এই নেতিবাচক প্রচারণার একটা হাতিয়ার হলো খারাপ নাম ও খারাপ উপাধি দেয়া। প্রত্যেক অলিতে গলিতে এবং প্রত্যেক সভা সমিতিতে মক্কার প্রচারণাবিদেরা এই বলে ঢেঁড়া পিটাতো যে, ওরা সাবী হয়ে গেছে, ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে, বাপদাদার ধর্ম ত্যাগ করেছে, নতুন নতুন আকীদা তৈরি করে শোনাচ্ছে; ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ধরনের প্রচারণার ঝড় যখন উঠতো তখন সাধারণ মানুষের জন্য পরিবেশ যে কত ভারী ও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠতো এবং সঠিক পথের সন্ধান করা যে কত দুরূহ হয়ে উঠতো, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। আর এরূপ পরিবেশে সত্যের সেই ক্ষুদ্র কাফেলা যে কী সংকটের সম্মুখীন ছিল, তা কল্পনা করাও বোধ হয় সহজসাধ্য নয়। কিন্তু পরিস্থিতি ও পরিবেশ যতই বিপদসংকুল হোক, তা দৃঢ়চেতা ও কৃতসংকল্প লোকদের পথ আগলে রাখতে পারে না। আল্লাহ বলেনঃ

‘আল্লাহ মানুষের জন্য যে অনুগ্রহ উন্মুক্ত করেন, তা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না।’ (সূরা ফাতের)

যুক্তিপ্রমাণের মোকাবিলায় যখন গালি বর্ষণ করা হতে থাকে, তখন চিরদিনই এরূপ হয়ে থাকে যে, যুক্তিপ্রমাণ তো যথাস্থানে বহালই থাকে, কিন্তু যে গালি দেয়া হয়, তা আবেগের ওপর ভর করে, দু'চারদিন টিকে থাকলেও অচিরেই নিস্প্রভ ও ম্লান হয়ে যায় এবং মানুষের মন তার প্রতি বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ হয়ে যায়। তাই এ কাজে যারা অভিজ্ঞ, তাদের মূলনীতি হলো নিত্যনতুন গালি আবিষ্কার করে যেতে হবে।

এই মূলনীতি অনুসারে রসূল সা. এর জন্য আর একটা নতুন গালি উদ্ভাবন করা হয়। তা হলো ‘ইবনে আবি কাবশা’। ‘আবি কাবশা’ আরবের একজন কুখ্যাত ব্যক্তির নাম। সে সারা আরবের ধর্মীয় ভাবধারার বিরুদ্ধে ‘শা’রা’ নামক নক্ষত্রের পূজা করতো। সেই আবি কাবশার নাম থেকেই ‘ইবনে আবি কাবশা’ উপাধির উদ্ভব। এর অর্থ আবি কাবশার ছেলে বা অনুসারী। নাউযুবিল্লাহ। মনের আক্রোশ মেটাতে মক্কার আবেগগ্রস্ত লোকেরা কত কিইনা আবিষ্কার করেছে!

কোন দাওয়াত বা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ও প্রধান ব্যক্তিত্বকে যখন এ ধরনের হীন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়, তখন শুধু ঐ ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়াই আসল লক্ষ্য হয় না, বরং আসল লক্ষ্য হয়ে থাকে ঐ মতবাদ ও মতাদর্শকে এবং ঐ আন্দোলনকে হেয় করা ও তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যার ক্রমবর্ধমান প্রসারে বিরোধীরা আতংকিত থাকে। কিন্তু প্রচণ্ড বেগবান একটা স্রোতধারাকে বালির বাঁধ দিয়ে ঠেকানো কেমন করে সম্ভব? মক্কার বিদ্রুপকারীরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল যে, তারা নোংরা আবর্জনা দিয়ে যত বাঁধই বাঁধছিল, তা এই দাওয়াতের তোড়ে খড়কুটোর মত ভেসে যাচ্ছে এবং প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় তা ক্রমশ কিছু না কিছু সামনেই অগ্রসর হচ্ছে। তাই তারা অপপ্রচারের একটা নতুন কৌশল অবলম্বন করলো। তারা রসূল সা. এর নামে একটা নতুন উপাধি উদ্ভাবন করে বলতে লাগলো, এই ব্যক্তি আসলে পাগল হয়ে গেছে। নাউযুবিল্লাহ। দেবতাদের অভিশাপে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সে যে সব কথাবার্তা বলে, তা কোন সচেতন মানুষের উপযোগী কথাবার্তাও নয় এবং কোন সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিজনিত ও চিন্তাসুলভ কথাও নয়। সে এক ধরনের মানসিক ব্যাধি বা হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত মানুষ। এই ব্যাধির তীব্রতা বাড়লে কখনো সে ফেরেশতা দেখে। কখনো বেহেশত ও দোজখের স্বপ্ন দেখে, কখনো তার মনে হয় যেন অদৃশ্য জগত থেকে কোন ওহী বা কোন অদ্ভুত কথা ভেসে আসছে। সে আসলে একজন মস্তিষ্কবিকৃত মানুষ। তার কথাবার্তায় মনোযোগ দেয়া উচিত নয়। সবার নিজ নিজ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের প্রতি আস্থা অবিচল রাখা উচিত। এভাবে সত্যের আহবায়কদের যুক্তির ধার ভোঁতা করার জন্য তাদের পাগল ও উন্মাদ বলা কিংবা নির্বোধ ও বোকা বলা বাতিলপন্থীদের একটা চিরাচরিত রীতি। দুনিয়ার সুখ সমৃদ্ধি বাড়ানো এবং নিজেদের লোভ-লালসা ও কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়া যাদের স্বভাব, তাদেরকেই বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোক মনে করা হয়। পক্ষান্তরে সমাজের সংস্কার ও সংশোধনের কর্মসূচি গ্রহণ করে যারা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করে, তাদেরকে নির্বোধ ও উন্মাদ বলা ছাড়া দুনিয়াপূজারীদের অভিধানে আর কোন উপযুক্ত শব্দ থাকে না।

এই সব গালি শুধু যে অসাক্ষাতেই বলা হতো তা নয়, বরং সামনাসামনিও বলা হতোঃ

يا ايها الذى نزل عليه الذكر انك لمجنون

“ওহে ওহীপ্রাপ্ত হওয়ার দাবীদার, তুমি তো একটা পাগল ছাড়া আর কিছু নও।’ (সূরা আল-হিজর, ৬)

আসলে মুখের ওপর গালি না দিতে পারলে গালির প্রকৃত মজাই পাওয়া যায় না।

কিন্তু ভেবে দেখার মত বিষয় হলো, কোন পাগলের নেতৃত্বে কখনো সমাজের লোকেরা আন্দোলন করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছে, এমন কোন দৃষ্টান্ত আছে কি? সুস্থ মস্তিষ্ক, সৎ স্বভাব ও সচেতন তরুণ সমাজ কি কখনো নির্বোধ লোকদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে? মাথা বিগড়ে যাওয়া কোন উন্মাদ লোকের আহবানে সুস্থ ও বুদ্ধিমান লোকেরা কি কখনো সাড়া দিয়েছে? এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য মক্কার মোশরেকরা আরো একটা বাহানা প্রস্তুত করে। [ধর্মভীরু লোকদের জন্য পাশ্চাত্যবাসী Fanatics বা ধর্মান্ধ পরিভাষা এই অর্থেই উদ্ভাবন করেছে যে, তারা মস্তিষ্কের ভারসাম্যহারা আবেগপ্রবণ মানুষ। আমাদের সমাজের অধার্মিক ধরনের লোকেরা যখন ইসলামপ্রিয় লোকদের ‘মোল্লা’ বলে আখ্যায়িত করে তখন এই অর্থেই করে যে, তারা অবুঝ, যুগের চাহিদা সম্বন্ধে অজ্ঞ, এবং অতীতের ধ্যানধারণার অন্ধ ভক্ত। এর চেয়েও একধাপ নিচে নেমে ধার্মিক লোকদেরকে বিরোধীরা রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ও নির্বোধ বলে অভিহিত করে থাকে।] তারা বলে, নবুয়তের দাবীদার এই ব্যক্তি জাদুবিদ্যায়ও পারদর্শী। তার সাথে কেউ সাক্ষাত করতে এলেই সে দু’চারটে কথা বলে তাকে সম্মোহিত করে ফেলে এবং মায়াবী দক্ষতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখায়। এ কারণে ভালো ভালো বুদ্ধিমান লোকেরা পর্যন্ত ক্রমশ তাঁর ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এ ব্যাপারে প্রশ্ন না জেগে পারে না যে, আজ পর্যন্ত কোন জাদুকর কি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনা করেছে? কোন জাদুকর বা জ্যোতিষী কি কখনো আল্লাহর ইবাদত, তাওহীদ, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার শিক্ষা দেয়ার জন্য জাদুবিদ্যাকে ব্যবহার করেছে? ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত কি আছে যে, জাদুকরের ন্যায় মানসিকতার অধিকারী কোন ব্যক্তি কখনো চলমান সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাল্টানোর জন্য নিজের জাদুশক্তি বলে একটা বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলেছে? জাদুর শক্তি দিয়ে মন মগজ, চরিত্র ও অন্তরাত্মাকে বদলে দেয়ার কোন দৃষ্টান্ত কোথাও আছে কি? আর ইনি ছিলেনই বা কেমন জাদুকর যে, জাদুর ভেলকি দেখিয়ে, দু’পয়সা উপার্জন করার পরিবর্তে সারা দেশের মানুষের যুলুম নিপীড়ন ভোগ করে সমাজের সর্বোত্তম লোকগুলোকে বাছাই করছিলেন এবং একটা বিরাট সামষ্টিক অভিযান পরিচালনা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন? এটা কি কোন ভেলকিবাজি ছিল? আসলে এটা ছিল একটা গৎবাঁধা অভিযোগ। প্রত্যেক যুগে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে নিয়োজিত লোকদের ওপর এ অভিযোগ আরোপ করা হয়েছে। এ দ্বারা জনগনকে এরূপ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, এ দাওয়াতের সাথে সত্যের কোন যোগাযোগ নেই এবং এ কারণে তার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ জন্মে এমন কোন উপাদানও নেই। দাওয়াতদাতার যুক্তিতে এমন কোন ধার নেই যে, তা দ্বারা সে মানুষের মন জয় করতে পারবে, বরং গোটা ব্যাপারটাই জালিয়াতি ও জাদুর. কারসাজির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এ জন্যই ভালো ভালো বুদ্ধিমান লোকেরা পর্যন্ত দাওয়াত দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে এবং ভারসাম্য হারাচ্ছে।

কিছু কিছু লোক হয়তো বা কোরায়েশ নেতাদের সামনে রসূল সা. এর ওহী যোগে প্রাপ্ত বাণী বিশেষত কোরআনের আয়াতগুলো পেশ করে থাকবে যে, এতে উচ্চাংগের অলংকারমণ্ডিত ভাষা রয়েছে। সেই ভাষা নিয়ে সেকালের সাহিত্যবিশারদদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাগবেষণাও হয়ে থাকতে পারে এবং তারা অনুভব করতে পারে যে, ওহীর এই বাণীই এক অলৌকিক ও অসাধারণ প্রভাবশালী বাণী। তাই এই বাণীর অলৌকিকত্বের ধারণাটা খণ্ডন করার জন্য তারা বলতে লাগলো, “এমন অলৌকিকত্বের কী আছে এতে? এতো কেবল এক ধরনের কবিতা, ভাষার শৈল্পিক চর্চা এবং সাহিত্যিক ওজস্বিতা। মুহাম্মাদ স. একজন উচ্চাংগের বাগ্মী। তাঁর বাগ্মিতার জোরে অপরিপক্ব মনের অধিকারী কিছু তরুণ বিপথগামী হচ্ছে।”

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কবি তো পৃথিবীতে কতই এসেছে। মুহাম্মাদ স. ও তাঁর সংগীরা যে চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, এমন নজিরবিহীন ও নিষ্কলংক চরিত্রের অধিকারী কোন কবি কি কখনো পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছে? কোরায়েশদের চোখের সামনে যে ধরনের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, নিছক কবিতার আসর গরমকারীরা কি কখনো তা করতে পেরেছে!

এ প্রশ্ন কোরায়েশদেরকেও বিব্রত করেছিল। এর জবাবে তারা রসূল সা. এর বিরুদ্ধে রটনা করেছিল জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার আর এক অপবাদ। জ্যোতিষীরা কিছু ধর্মীয় ভাবভংগী অনুসরণ করতো। তারা একট রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করতো। চল্লিশ দিন ব্যাপী ধ্যান, নির্জনবাস, জপতপ ও মন্ত্রতন্ত্রের মধ্য দিয়েই তাদের জীবন কাটতো। তারা নানা ধরনের অস্বাভাবিক পন্থায় বিচিত্র তথ্যাবলী সংগ্রহ করে তা রহস্যময় কৌশলগত ভাষার মাধ্যমে ব্যক্ত করতো। সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা বিচরণ করতো অসাধারণ মানুষ হিসেবে। কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ ধরনের এসব লোককে ‘কাহেন’ নামে আখ্যায়িত করা হতো। সেই নামে রসূল সা. কে আখ্যায়িত করে তারা বুঝাতে চেয়েছিল যে, উনিও একই ধাপ্পাবাজির ব্যবসা খুলেছেন, যাতে লোকেরা এসে মুরীদ হয়, এবং তাঁর জীবিকার সমস্যারও সমাধান হয়ে যায়। (নাউযুবিল্লাহ)

কিন্তু কোরআন এই সব অপপ্রচারের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছে এই বলে যেঃ

(আরবী*********)

“সে কবি নয়। কিন্তু তোমাদের বিশ্বাস ও ঈমানের দ্বার তোমরাই রুদ্ধ করে রেখেছ। সে কোন জ্যোতিষী নয়। কিন্তু তোমরা তো চিন্তভাবনাই কর না।” (সূরা আল-হাক্কা)

তাদের এই উচ্ছৃংখলতার তাণ্ডব সম্পর্কে কোরআন খুবই সংক্ষেপে যে পর্যালোচনা করেছে তা হলোঃ

(আরবী********)

“দেখ, এ লোকগুলো তোমার সম্পর্কে কি কি ধরনের প্রবাদ, উদাহরণ, পরিভাষা ও উপাধি প্রয়োগ করে।” এত সব কিছু করার পর তারা সহসা কিভাবে বিপথে ধাবিত হয়, সে সম্পর্কে কোরআন বলেঃ (আরবী*****) “নিজেরাই নিজেদেরকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে।”

এবার লক্ষ্য করুন, আরো একটা বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা। হযরত ইবরাহীমের ধর্মের অনুসারী হবার দাবীদাররা বলে যে, মুহাম্মাদের স. কাছে একটা জ্বিন এসে অদ্ভুত অদ্ভুত কথাবার্তা শিখিয়ে দিয়ে যায়। কখনো কখনো মক্কার জনৈক রোমক খৃস্টান ক্রীতদাস (জাবের, জাবরা বা জারব) এর নামোল্লেখ করে বলা হয় যে, ঐ ক্রীতদাসটা গোপনে গিয়ে মুহাম্মাদকে এ সব ভাষণ লিখে দিয়ে আসে। অথচ সে কেবল মাঝে মাঝে রসূলের স. কথাবার্তা শোনার জন্য যেত। একবার কোরায়েশ নেতাদের একটা দল রসূল স. কে বললোঃ ‘আমরা শুনেছি, ইয়ামামার রহমান নামক এক ব্যক্তি তোমাকে এই সব জিনিস শেখায়। আল্লাহর কসম, আমরা কখনো ঐ রহমানের ওপর ঈমান আনবো না।’[সীরাতে ইবনে হিশাম, (আরবী) প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৩১৭] এই সব ভিত্তিহীন অপপ্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে এরূপ ধারণা দেয়া যে, এসব কোন বিদেশী অপশক্তি কিংবা ব্যক্তির কারসাজি। মুহাম্মাদ স. ঐসব অপশক্তির ক্রীড়নক হয়ে তাদের সাথে যোগসাজশ করে আমাদের ধর্ম ও সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চক্রান্ত এঁটেছে। অপরদিকে এ ধারণা দেয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে যে, এই মনোমুগ্ধকর অলংকারসমৃদ্ধ বাণীগুলো মুহাম্মাদেরও স. প্রতিভার সাক্ষর নয়, আল্লাহর দানও নয়। বরঞ্চ এগুলোর মধ্য দিয়ে তৃতীয় কোন বহির্শক্তি তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। উপরন্তু এ দ্বারা রসূল সা. কে আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। এসব দুরভিসন্ধি ব্যর্থ করে দিয়ে কোরআন অনেক বিস্তারিত জবাব দিয়েছে। তবে তার যে চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে অকাট্য ও অব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে তা হলো, ‘তোমরা জ্বিন ও মানুষের সম্মিলিত চেষ্টা দ্বারাও যদি পার তবে কোরআনের মত কোন সূরা বা কয়েকটি আয়াত রচনা করে নিয়ে এস।’

আনুষংগিকভাবে এর মধ্য দিয়ে এ কথাও বলা হলো যে, মুহাম্মাদ স. কোন নতুন কথা বলছে না বা কোন বিরল কৃতিত্বও দেখায়নি। আসলে সে কিছু পুরানো কিসসা কাহিনীর বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে তা জোরদার ভাষায় নতুন করে পেশ করছে। এ হচ্ছে এক ধরনের গল্প বলার শিল্প। গল্পকাররা যেমন গল্প বলে বলে আসর জমায় তেমনি মুহাম্মদ মজার মজার গল্প শুনিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করছে। ইসলামের দাওয়াতকে প্রাচীন কিসসা কাহিনী বলে গালি দেয়ার এরূপ একটা তীর্যক ইংগিত রয়েছে যে, ঐসব সেকেলে কিসসা কাহিনী দিয়ে এ যুগের সমস্যাবলীর সমাধান কেমন করে হবে? সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রাচীন রূপকথায় তখনকার মানুষের কোন উপকারিতা নেই।

মজার ব্যাপার হলো, একদিকে বাপদাদার ধর্মের সম্পূর্ণ বিরোধী নতুন ধর্ম প্রচারের দায়ে রসূল স.কে অভিযুক্ত করা হচ্ছিল। অপরদিকে সেই রসূলের স. পেশ করা বাণীকেই প্রাচীন কিসসা কাহিনী বলে নিন্দা করা হচ্ছিল। মতলববাজ কুচক্রীদের এটা চিরাচরিত স্বভাব যে, আগপাছ চিন্তাভাবনা না করে কখনো একদিক থেকে একটা খুঁত ধরে, আবার কখনো অন্যদিক থেকে আক্রমণ করে ঠিক তার বিপরীত আপত্তি তোলে। অথচ তারা ভেবেও দেখে না যে, এভাবে তারা স্ববিরোধী আচরণই করছে।

এই পর্যায়ে একটা ফ্রন্ট খোলা হয় কবিদের দিয়ে। রসূল স. এর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দাসূচক কবিতা রচনা ও প্রচার করার দায়িত্বে নিযুক্ত হয় আবু সুফিয়ান বিন হারেস, আমর বিন আস, এবং আব্দুল্লাহ বিন যাবারী। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, আরবের জাহেলী সমাজে কবিদের প্রচণ্ড প্রভাব ছিল। তারা বলতে গেলে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষক ও দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করতো। তাদের মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ মানুষের অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করতো এবং তা মুখস্থ করে করে প্রচার করা হতো। ধরে নেয়া যেতে পারে যে, সেকালে কবিরা অনেকাংশে এ যুগের সাংবাদিকদের ন্যায় অবস্থানে ছিল। আজ যেমন একজন দক্ষ সাংবাদিক নিজের লেখনী ও পত্রিকার শক্তি নিয়ে কারো পেছনে লাগলে তার অনেক ক্ষতিসাধন করতে পারে, নিজের কুটিল ও তীর্যক মন্তব্য, অশালীন ব্যংগবিদ্রুপ, অশোভন চিঠিপত্র, সংবাদ না ছাপানো কিংবা বিকৃতভাবে ছাপানো, এবং বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে যেমন কোন দাওয়াত, আন্দোলন বা সংগঠনের জন্য সমস্যার পাহাড় সৃষ্টি করতে পারে, ঠিক তেমনি ভূমিকা পালন করতো আরবের কবিরা। সেখানে প্রতিটি অলিগলিতে মুহাম্মদ স. ও তার আন্দোলনের দুর্নাম ও কুৎসা রটিয়ে বেড়ানো এবং ছন্দবদ্ধ গালি ও নিন্দাসূচক শ্লোগান দিয়ে পরিবেশকে বিষাক্ত করার কাজে একাধিক কবি নিয়োজিত ছিল। একজন ভদ্র পথচারীর পেছনে কুকুর লেলিয়ে দিলে যে দৃশ্যের অবতারণা হয়, মুহাম্মাদ স. কে ঘিরে ঠিক সেই ধরনের দৃশ্যের সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু মানবতার বন্ধু নবী মুহাম্মাদ স. এর বাণী ও চরিত্র কবিদের অপপ্রচারের মায়াবী প্রভাবকে একবারেই নিস্প্রভ ও পণ্ড করে দিচ্ছিল।

উল্লেখ্য যে, অপপ্রচারের এই গোটা অভিযান কোন ভুল বুঝাবুঝির কারণে নয়, বরং একটা সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত চক্রান্তের আওতায়ই পরিচালিত হচ্ছিল। তারা সর্বসম্মতভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যেঃ (আরবী*******)

‘এই কোরআন তোমরা শুনো না, বরং কোরআন পাঠের সময় হৈ চৈ কর, হয়তো এভাবেই তোমরা জয়ী হতে পারবে।’ (হা-মীম আস-সাজদা, আয়াত ২৬)

অর্থাৎ দাওয়াতদাতার কথায় কর্ণপাতই করো না, ওটা বুঝবার চেষ্টাই করো না। তাহলে চিন্তাধারায় পরিবর্তন এসে যেতে পারে এবং বিদ্যমান আকীদাবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। হৈ চৈ করে এর প্রচারে বাধার সৃষ্টি কর এবং একে হাসি ঠাট্টার বিষয়ে পরিণত কর। এতে করে কোরআনের শক্তি চূর্ণ হয়ে যাবে, এবং শেষ বিজয় তোমাদেরই হবে। এ আয়াত থেকেই অনুমান করা যায়, ইসলাম বিরোধী শক্তির মনস্তত্ত্বটা কেমন। তারা কথা শুনতে ও বুঝতে চায় না এবং অন্যদেরকেও শুনতে ও বুঝতে দিতে চায় না। এ জন্য হাংগামা সৃষ্টি করে তারা বাধা আরোপ করতে চায়। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতার পালা পড়েছিল ঠিক এমনি লোকদের সাথে!

আ’স বিন ওয়ায়েল আস-সাহামী রসূল স. এর দাওয়াত ও আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় যেভাবে বিষোদগার করছিল তা হলো, ‘মুহাম্মাদ যা করছে, করতে দাও। সে তো নির্বংশ। তার কোন পুত্রসন্তান নেই। সে মারা গেলে তার কথা কেউ স্মরণও করবে না এবং তোমরা তার কবল থেকে চিরতরে অব্যাহতি পাবে।’ রসূল স. এর পুত্রসন্তান জীবিত না থাকায় এই কুটিল মন্তব্য করা হয়। আরবে এ মন্তব্য নিরর্থকও ছিল না। কিন্তু আগের মত লোকেরা এ কথা বুঝতে সমর্থ হয় না যে, নবীদের ন্যায় ইতিহাসস্রষ্টা ব্যক্তিগণের আসল সন্তান হয়ে থাকে তাদের অসাধারণ ও ঐতিহাসিক কীর্তি। তাদের মস্তিষ্ক থেকে নতুন নতুন সভ্যতার অভ্যুদয় ঘটে। তাদের দাওয়াত ও শিক্ষার উত্তরাধিকার ধারণ করা ও তাদের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তাদের সাথী ও অনুসারীরা দলে দলে অগ্রসর হয়। এভাবে যে বিপুল কল্যাণের সমাগম ঘটে, তার শক্তি ও মূল্যমান ঝাঁক ঝাঁক পুত্রসন্তানের চেয়েও অনেক বেশি। এই তীর্যক মন্তব্যের জবাবেই সূরা কাওসার নাজিল হয়। ঐ সূরায় আ’স ও তার সতীর্থদের বলা হয় যে, আমি আমার নবীকে কাওসার দান করেছি, এই কাওসারকে তার জন্য বিপুল কল্যাণের উৎস বানিয়েছি, কোরআনের ন্যায় শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত তাকে দিয়েছি, আল্লাহ ও রসূলের অনুগত এবং ইসলামের বাস্তবায়ন ও প্রচারকারী মুমিনদের একটা বিরাট দল তাকে দিয়েছি, আর আখিরাতে তার জন্য কাওসার নামক পুষ্করিণী উপহার দেয়ার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি। সেই পুষ্করিণী থেকে কেউ একবার পানি পান করার অনুমতি পেলে অনন্তকাল পর্যন্ত তার আর পিপাসা লাগবে না। তারপর আল্লাহ বলেছেন, হে নবী, আসলে নির্বংশ তো তোমার শত্রুরাই। তাদের প্রকৃতপক্ষে কোনই স্মরণকারী থাকবে না। তাদের কথা কেউ ভুলেও মনে করবে না যে অমুক কে ছিল। ইতিহাসে তাদের কোন স্থানই থাকবে না।

ব্যংগবিদ্রুপে মক্কার যে নরাধমরা সবচেয়ে অপ্রগামী ছিল, এখানে তাদের একটা তালিকা দেয়া বোধ হয় অপ্রাসংগিক হবে না। তারা ছিল বনু আসাদ গোত্রের আসওয়াদ ইবনুল মুত্তালিব, বনু যুহরা গোত্রের আসওয়াদ বিন আব্দু ইয়াগুস, বনু মাখযূমের ওলীদ ইবনুল মুগীরা, বনু সাহমের আস বিন ওয়ায়েল এবং বনু খুযায়া গোত্রের হারিস বিন তালাতিলা।

 

কূটতর্ক

ব্যংগবিদ্রুপ, ঠাট্টা উপহাস, গালিগালাজ ও অশালীন উপাধি প্রদানের সাথে সাথে কূটতর্কের পালাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। যারা একটা চাক্ষুষ সত্যকে মানতে চায়নি, তারা নিজেদের ও দাওয়াতদাতার মাঝে নানা রকমের কূটতর্ক বাধিয়ে অন্তরায় সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাতো। এই অপচেষ্টার একটা ব্যর্থ হলে নব উদ্যমে আরেকটা শুরু করা হতো। এ ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত লোকদের গোটাজীবনই এতে নষ্ট হয়ে যায়, অথচ তারা না পারে নিজেদের কোন উপকার করতে, আর না পারে অন্যদের কোন গঠনমূলক সেবা করতে। আন্তরিকতার সাথে যে প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয়, তার ধরন হয় এক, আর চক্রান্তমূলকভাবে দাওয়াতদাতার পথ আটকানোর জন্য যে প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয় তার ধরন হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই শেষোক্ত শ্রেণীর প্রশ্ন ও আপত্তি তোলাকে বলা হয় কূটতর্ক। কূটতর্ক সব সময় বেঈমানী, দুরভিসন্ধি ও ষড়যন্ত্রের প্রতীক হয়ে থাকে। কূটতার্কিকদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা দাওয়াত থেকে কিছুই শিখতে চায় না, বরং তাতে কৃত্রিমভাবে কোন না কোন বক্রতা অন্বেষণ করে। কোরআনে এ অবস্থাটা বলা হয়েছেঃ “তারা বক্রতা অন্বেষণ করে।” (সূরা হুদঃ ১৯)

বাপদাদার ধর্মের এই সব উগ্র ও কট্টর সমর্থক একদিকে তো রসূল স. কে বারবার জিজ্ঞাসা করতো যে, তুমি যদি নবী হয়ে থাক তবে তোমার নবী হওয়ার এমন কোন অকাট্য আলামত ও প্রমাণ তোমার সাথে কেন থাকলো না যা দেখে কারো পক্ষে নবুয়ত স্বীকার না করে উপায়ই থাকবে না?

আবার কখনো কখনো তারা নিতান্ত সরলতার ভান করে বলতোঃ ‘আমাদের ওপর সরাসরি কোন নির্দশন নাযিল হলো না কেন, কিংবা এমন হলো না কেন যে, আমরা আমাদের মনিবকে সরাসরি দেখে নিতাম?’ (সূরা ফুরকান, আয়াত ৩১)

অর্থাৎ দীর্ঘ আলোচনা বা তর্কের কী দরকার? সোজাসুজিভাবে আকাশ থেকে দলে দলে ফেরেশতা নেমে এসে আমাদের সামনে বিচরণ করলেই পারতো। আর আল্লাহ তোমার মাধ্যমে আমাদের কাছে খবরাখবর পাঠিয়ে নিজের খোদায়ী চালু করার বদলে তিনি স্বয়ং আমাদের সামনে হাজির হলেই পারেন। আমরা দেখে নিতে পারি যে, এই তো আমাদের আল্লাহ। তাহলে তো আর ঝগড়া থাকে না।

তারা সময় সময় এও বলতো যে, তুমি যা যা বল, তা যদি সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে থাক, তাহলে তো একখানা লিখিত কিতাব আমাদের চোখের সামনেই আমাদের কাছে চলে আসলে ভালো হতো। বরঞ্চ তুমি নিজেই একটা সিঁড়ি দিয়ে আকাশ থেকে কিতাবখানা হাতে নিয়ে নেমে আসলে আরো ভালো হতো। আমরা তা হলে অবনত মস্তকে মেনে নিতাম যে, তুমি সত্যিই নবী। এ প্রশ্নও তোলা হয় যে, কোরআন এভাবে এক এক অংশ করে নাযিল হয় কেন? পুরো কিতাবখানা একবারেই নাযিল হয় না কেন? কিন্তু তাদের এ জাতীয় প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব কোরআনে বারবার দেয়া হয়েছে। এই জবাব দেয়ার কারণেই তারা ক্ষুব্ধ ছিল। কেননা এতে করে তাদের ষড়যন্ত্রের মুখোশ খুলে যেত এবং তা ব্যর্থ হয়ে যেত।

তাদের আরো একটা কূটতর্ক ছিল এই যে, তুমি তো আমাদেরই মত রক্ত মাংসের তৈরী মানুষ। তোমারও ক্ষুধা লাগে, আয়রোজগার করতে বাধ্য হও, বাজারে যাও, কষ্টে জীবন যাপন কর, তোমার ওপর কত যুলুম হয়, অথচ তোমার কোন সাহায্য করা হয় না। এমতাবস্থায় একথা কিভাবে বিশ্বাস করি যে, তুমি আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা এবং তোমাকে বিশ্ববাসীর সংস্কার ও সংশোধনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে? তুমি যদি এমন একজন বিশিষ্ট ও অসাধারণ লোক হতে, তাহলে তোমার আগে আগে একদল ফেরেশতা প্রহরী হিসাবে চলতো এবং পথ থেকে লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য হাঁকাহাকি করতো। কেউ তোমার ওপর যুলুম তো দূরের কথা, সামান্য বেআদবী করলেই ঐ ফেরেশতারা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিত। এ রকম হলে সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিত যে, তুমি আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নবী। তোমার জন্য আকাশ থেকে ধনরত্ন নাযিল হওয়া উচিত ছিল। রাজকীয় শান শওকতে তোমার জীবন যাপন করা উচিত ছিল, তোমার বসবাসের জন্য একটা স্বর্ণনির্মিত প্রাসাদ হওয়া উচিত ছিল, তোমার জন্য বিশেষভাবে একটা খাল তৈরী হওয়া উচিত ছিল, তোমার একটা বড় রকমের ফলের বাগান থাকা উচিত ছিল, এবং সেই বাগান থেকে তোমার সচ্ছন্দে জীবন যাপনের উপযুক্ত অর্থ উপার্জিত হওয়া দরকার ছিল। এ ধরনের শান শওকত ও জাঁকজমক নিয়ে যদি তুমি নবুয়তের দাবী করতে, তাহলে আমরা তা অবশ্যই মেনে নিতাম। অথচ আমরা ধনে, জনে, তোমার চেয়ে কত বড়। আর তুমি ও তোমার সাথীরা সমাজের সবচেয়ে গরীব ও নিম্ন শ্রেণীর লোক। আমাদের তুলনায় তোমাদের কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাহলে হে মুহাম্মাদ, তুমিই বল, কোন্ যুক্তিতে আমরা তোমাকে নবী মেনে নেব?

এ জন্য যখনই রসূল সা. কোন রাস্তা দিয়ে যেতেন, অমনি লোকজন বলে উঠতো, ‘ইনি নাকি সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ রসূল সা. করে পাঠিয়েছেন? আংগুল নাচিয়ে নাচিয়ে, ইংগিত করে করে মক্কার গুন্ডাপান্ডা ও সন্ত্রাসী লোকেরা বলতো, ‘দেখ, আল্লাহ নবী ও রসূল বানানোর জন্য এই চালচুলোহীন লোক ছাড়া আর কাউকে পেলেন না। কী চমৎকার নির্বাচন! অনুরূপভাবে ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের দেখিয়ে বলা হতো, এই নাকি সেই সব বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যাদেরকে আল্লাহ আমাদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে বাছাই করেছেন।

এ কথাও বলা হতো, যে আযাবের ভয় দেখিয়ে তুমি নেতা হতে চাইছ, তা নিযে আস না কেন? আমাদের মত কাফেরদের ওপর তুমি আকাশের একাংশ ভেংগে ফেলতো দেখি! খোদ আল্লাহর কাছেও দোয়া করতো যে, এই দাওয়াত সত্য হলে হে আল্লাহ আমাদেরকে আযাব দিয়ে খতম করে দাও।’

বাপদাদার ধর্মের এই একচেটিয়া অধিকারের দাবীদাররা কখনো কখনো এ কথাও বলতো যে, ‘হে মুহাম্মদ! তুমি যখন বল, আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তখন তিনি নিজের শক্তি প্রয়োগ করে আমাদেরকে ইসলামের পথে চালান না কেন? তিনি যদি আমাদেরকে তাওহীদপন্থী ও সৎ লোক দেখতে চান, তাহলে তিনি আমাদের তাওহীদপন্থী ও সৎ লোক বানিয়ে দেন না কেন? তিনি তো আমাদেরকে মূর্তিপূজা করতে বাধা দিতে পারেন। তিনি আমাদেরকে ভুল আকীদা পোষণ করা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেন। তা যখন তিনি করেন না, তখন নিশ্চয়ই আমাদের বর্তমান চালচলন তাঁর পসন্দ। এমতাবস্থায় তুমি কেন আমাদের চালচলন ও রীতিনীতির নিন্দা সমালোচনা কর? তুমি কোথাকার কে?

তারা কেয়ামত নিয়েও উপহাস করতো। খুব নাটকীয় ভংগিতে জিজ্ঞেস করতো, এই ঘটনাটা কবে ঘটবে বলুন তো। কেয়ামতের কোন দিন তারিখ কি নির্ধারিত নেই?

কোরআন, হাদীস ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলী থেকে এই উদাহরণগুলো সংগৃহীত। এগুলো দ্বারা অনুমান করা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনুগ্রাহক এবং মানবতার সবচেয়ে বড় হিতাকাংখী মানুষটিকে কেমন হীন পরিবেশের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অত্যন্ত নিকৃষ্ট রুচির অধিকারী লোকেরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে নিন্দা ও কুৎসা গেয়ে চলেছে। বিতর্কের সুরে নানা ধরণের প্রশ্ন বানিয়ে বানিয়ে তুলে ধরছে। আর রসূল সা. অত্যন্ত ঠান্ডা ও শান্তমনে এবং অত্যন্ত ভদ্র ও শালীন মেজাজে নিজের দাওয়াতের পক্ষে যুক্তি পেশ করছেন। জবাবে কোন নিন্দা ও তিরস্কার করছেন না। বিতর্কের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। রেগে যাচ্ছেন না। কিন্তু দাওয়াত ও তার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছু হটছেন না।

ব্যংগবিদ্রুপ ও কুটতর্কের এই তান্ডবের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হবার সময় রসূল সা.যে মানসিক নির্যাতন ও কষ্ট ভোগ করেছেন, তার পুরো প্রতিচ্ছবি কোরআনে পাওয়া যায়।

আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং রসূল সা. কে প্রবোধ ও সান্তনা দিয়েছেন এবং এই স্তরটা ধৈর্যের সাথে পেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেনঃ ‘ক্ষমার নীতি অবলম্বন কর, সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অজ্ঞ লোকদের এড়িয়ে চল।’ (সূরা আরাফ-১৯৯)

অর্থাৎ সেই যুলুম নির্যাতনের যুগে রসূল সা. কে তিনটে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়ঃ অপপ্রচার ও গালমন্দের তোয়াক্কা না করা, সর্বাবস্থায় হক কথা বলতে থাকা এবং দুশ্চরিত্র ও মুর্খ লোকদের পেছনে না পড়া।

কোরআন ও ইতিহাস উভয়ই সাক্ষ্য দেয় যে, রসূল সা. যুলুম নির্যাতনের সমগ্র যুগটা ঐ তিনটে নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে পার করে দিয়েছেন। চরম মর্মযাতনা ভোগ করা সত্ত্বেও নিজের ভাষায়ও কোন পরিবর্তন ঘটতে দেননি, দাওয়াতদাতা হিসেবে নিজের উন্নত চরিত্রের পার্থক্য সৃষ্টি হতে দেননি, এবং যুক্তির প্রখরতাকেও কিছুমাত্র ম্লান হতে দেননি।

আল্লাহ তাঁর পবিত্র আত্মা ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর রহমত ও বরকত নাযিল করুন। এমনকি ঐ কুটতার্কিকরা যখনই কিছু ধারালো যুক্তি উপস্থাপন করেছে, অমনি ওহীর নির্দেশে তাকেও সর্বতোভাবে খন্ড করেছেন, তা সে যতই নিম্নস্তরের হোক না কেন।

 

যুক্তি

ব্যংগ বিদ্রুপ, কুৎসা রটনা ও কুটতর্কে কখনো কখনো কোরায়েশ নেতারা দু’একটা ধারালো যুক্তিও উপস্থাপন করেছে, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। এর কয়েকটা উদাহরণ দেয়া যাচ্ছেঃ

এ ধরণের একটা যুক্তি তারা মাঝে মাঝে এভাবে পেশ করতো যে, আমরা তো দেবমূর্তিগুলোকে আল্লাহর চেয়ে বড় কখনো মনে করিনা। আমরা শুধু বলি, এই মূর্তিগুলো যেসব মহান ব্যক্তির আত্মার প্রতীক, তারা আল্লাহর দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারে। এসব মূর্তির সামনে সিজদা করে ও বলি দিয়ে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি।

তারা আরো বলতো, আমাদের মতে দুনিয়ার জীবনই একমাত্র জীবন এ ছাড়া আর কোন জীবন আমাদের হবেনা এবং আমাদের মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিতও হতে হবেনা। সুতরাং আমরা এমন একটা ধর্মকে কিভাবে মেনে নেব, যা অন্য একটা জগতের ধারণা দিয়ে আমাদেরকে এ দুনিয়ার জীবনের স্বার্থ ও সুখশান্তি থেকে বঞ্ছিত করতে চায়?

তারা এ যুক্তিও দিত যে, আমরা যদি মুহাম্মদের সা. দাওয়াত মেনে নেই, বর্তমান ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত হতে দেই এবং এর ওপর আমাদের প্রধান্যকে খর্ব হতে দেই, তাহলে দেশ থেকে আমাদের উৎখাত হয়ে যেতে হবে।

এই দু’তিনটে উদাহরণ থেকে বুঝা গেল যে, কূটতর্ক ও ধড়িবাজির মাঝে তারা কিছু কিছু যুক্তিও দিত। তবে কোরআন সে সব যুক্তির দাঁতাভাঙ্গা জবাবও দিত।

 

সন্ত্রাস ও গুন্ডামী

ব্যংগ বিদ্রুপ, গালিগালাজ ও অপপ্রচারাভিযানের সাথে সাথে কোরায়েশদের উন্মত্ত বিরোধিতা ক্রমশ গুন্ডামী, সন্ত্রাস ও সহিংসতার রূপ নিত। নেতিবাচক ষড়যন্ত্রের হোতারা যখন তাদের ব্যংগ বিদ্রুপ ও কুৎসা রটনাকে ব্যর্থ হতে দেখে, তখন গুন্ডামী ও সন্ত্রাসই হয়ে থাকে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ। মক্কাবাসী রসূল সা. কে উত্যক্ত করার জন্য এমন হীন আচরণ করেছে যে, তিনি ছাড়া আর কোন প্রচারক হলে সে যতই সাহসী ও উদ্যমী হোক না কেন, তার উৎসাহ উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে যেত এবং হতাশ হয়ে বসে পড়তো। কিন্তু রসূল সা. এর ভদ্রতা ও গাম্ভীর্য সকল সহিংসতা ও গুন্ডামীকে উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল।

যে আচরণটা একেবারেই নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল, সেটা হলো, তাঁর মহল্লার অধিবাসী বড় বড় মোড়ল ও গোত্রপতি তাঁর পথে নিয়মিতভাবে কাঁটা বিছাতো, তাঁর নামায পড়ার সময় ঠাট্টা ও হৈ চৈ করতো, সিজদার সময় তাঁর পিঠের ওপর জবাই করা পশুর নাড়িভূড়ি নিক্ষেপ করতো, চাদর পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিত, মহল্লার বালক বালিকাদেরকে হাতে তালি দেয়া ও হৈ হল্লা করে বেড়ানোর জন্য লেলিয়ে দিত এবং কোরআন পড়ার সময় তাঁকে, কোরআনকে এবং আল্লাহকে গালি দিত।

এ অপকর্মে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ছিল আবু লাহাব ও তার স্ত্রী। এ মহিলা এক নাগাড়ে কয়েক বছর পর্যন্ত তাঁর পথে ময়লা আবর্জনা ও কাঁটা ফেলতো। রসূল সা. প্রতিদিন অতি কষ্টে পথ পরিষ্কার করতেন। এই হতভাগী তাঁকে এত উত্যক্ত করেছিল যে, তাঁর সান্ত্বনার জন্য আল্লাহ তায়ালা আলাদাভাবে সূরা লাহাব নাযিল করেন এবং তাকে ঐ দুর্বত্ত দম্পতির ঠিকানা যে দোজখে, তা জানিয়ে দেন।

একবার পবিত্র ক’বার চত্বরে রসূল সা. নামায পড়ছিলেন। এ সময়ে উকবা ইবনে আবু মুয়ীত রসূলের গলায় চাদর পেঁচিয়ে এমনভাবে ফাঁস দেয় যে, তিনি বেহুশ হয়ে পড়ে যান। এই দুর্বৃত্তই একবার নামাযের সময় তাঁর পিঠের ওপর নাড়িভূড়ি নিক্ষেপ করেছিল।

একবার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক দুরাচার তাঁর মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে। তিনি ঐ অবস্থাতেই নীরবে বাড়ী চলে যান। শিশু ফাতেমা রা. তাঁর মাথা ধুয়ে দেয়ার সময় দুঃখে ও ক্ষোভে কাঁদতে থাকেন। তিনি শিশু মেয়েকে এই বলে সান্ত্বনা দেন, মাগো, তুমি কেঁদনা। আল্লাহ তোমার আব্বুকে রক্ষা করবেন।

আর একবার যখন তিনি হারাম শরীফে নামায পড়ছিলেন, তখন আবু জাহল ও অপর কয়েকজন কোরায়েশ সরদার তা লক্ষ্য করলো। তখন আবু জাহলের নির্দেশে উকবা ইবনে আবু মুয়ীত গিয়ে নাড়িভূড়ি নিয়ে এল এবং রসূল সা. এর গায়ে নিক্ষেপ করে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। সেদিনও শিশু মেয়ে ফাতেদমা তাঁর গা ধুয়ে পরিস্কার করে দেন এবং উকবাকে অভিশাপ দেন।

‘এক আল্লাহর আনুগত্য কর, সততা ও ইনসাফের অনুসারী হও এবং এতীম ও পথিককে সাহায্য কর’, এই সদুপদেশের প্রতিরোধ এভাবে নেয়া হয়েছিল যে, কাঁটা বিছিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হলো। ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করে তাওহীদ ও সদাচারের পবিত্র দাওয়াতকে সমুলে উৎখাতে অপচেষ্টা চালানো হলো। রসূল সা. এর পিঠে নাড়িভূড়ির বোঝা চাপিয়ে ধারণা করা হলো যে, এখন আর সত্য মাথা তুলতে পারবেনা। রসূলের সা. গলায় ফাঁস লাগিয়ে জ্ঞানপাপীরা ভেবেছিল এবার ওহীর আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে যাবে। যাঁকে কাঁটা বিছিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হলো, তিনি সব সময় ফুল বর্ষণ করতে লাগলেন। যাঁর গায়ে ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করা হলো, তিনি জাতিকে ক্রমাগত আতর গোলাপ বিতরণ করতে লাগলেন। যার ঘাড়ে নাড়িভূড়ির বোঝা চাপানো হলো, তিনি মানবজাতির ঘাড়ের ওপর থেকে বাতিলের ভূত নামিয়ে গেলেন। যার গলায় ফাঁস দেয়া হলো, তিনি সভ্যতার গলা থেকে বাতিল রসম রেওয়াজের শেকল খুলে ফেললেন। গুন্ডামী এক মুহূর্তের জন্যও ভদ্রতার পথ আটকাতে পারেনি। ভদ্রতা ও শালীনতার পতাকাবাহীরা যদি যথার্থই কৃত সংকল্প হয়, তবে মানবেতিহাসের শাশ্বত নিয়মের পরিপন্থী সন্ত্রাস ও গুন্ডামীকে এভাবেই চরম শাস্তি দিয়ে চিরতরে নির্মূল করতে হবে।

 

ইসলামী আন্দোলনকে সহায়হীন করার অপচেষ্টা

ইসলামী দাওয়াতের বিরোধীরা যখন পানি মাথার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখে, তখন বেশামাল হয়ে আন্দোলনকে বা তার নেতা ও কর্মীদেরকে সমাজের সব ধরণের কার্যকর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্ছিত করার চেষ্টা চালায়। প্রত্যক্ষভাবে পারা না গেলেও পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করে বিপ্লবের সৈনিকদের নিস্ক্রিয় করে দিতে চায়।

মক্কাবাসী রসূল সা. কে একেবারেই খতম করে দিতে চাইত। কিন্তু ভয় পেত যে, গোত্রীয় জিঘাংসা ও প্রতিশোধ পরায়ণতার আগুন এমনভাবে জ্বলে উঠবে যখন রক্তপাতের ধারাবাহিকতা বন্ধ করার সাধ্য আর কারো থাকবেনা। নিকট অতীতে এক সর্বনাশা যুদ্ধ তাদেরকে এত ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছিল যে, এক্ষণি অনুরূপ আর একটা যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে তারা মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। এছাড়া আরো একটা জটিলতাও ছিল। বনু হাশেম ও বনু উমাইয়ার মধ্যে ছিল পুরানো কোন্দল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বনু উমাইয়ার নেতারা বিশেষত আবু লাহাব কিছুতেই বরদাশত করতে পারছিলনা যে, বনু হাশের গোত্রের কোন পরিবারে কেউ নবী হোক এবং সেই সুবাদে ঐ পরিবার সমাজের স্বীকৃতি লাভ করুক। বনু হাশেম দু’একবার এই মর্মে মন স্থিরও করে ফেলেছিল যে, ‘মুহাম্মদকে খোলাখুলিভাবে সমর্থন করলে ক্ষতি কী? সে তো আমাদেরই লোক। সে যদি বড় হয় এবং তার ধর্ম যদি বিস্তার লাভ করে, তবে তা তো আমাদেরই কল্যাণ ও সমৃদ্ধি এনে দেবে।’ কিন্তু বনু উমাইয়ার নেতারা তাদেরকে ঐ সিদ্ধান্ত কখনো কার্যকরী করতে দেয়নি। বনু হাশেম কার্যকরভাবে কিছু করতে পারেনি বটে, তবে তাদের একজন সদস্যের গায়ে হাত তোলা সহজ ব্যাপার ছিলনা, যতক্ষণ না তারা তাকে গোত্র থেকে বহিষ্কার করেছে। এদিকে রসূল সা. ছিলেন তাঁর চাচা আবু তালেবের অভিভাবকত্বে। এ অভিভাবকত্ব যতক্ষণ বহাল ছিল, ততক্ষণ বলতে গেলে গোটা বনু হাশেম গোত্র তাঁর রক্ষক ছিল। তাঁর শত্রুরা তাই সর্বশক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা চালালো যাতে রসূল সা. কে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত করা যায়। এ জন্য আবু তালেবের ওপর চাপ প্রয়োগ অনেকদিন ধরে অব্যাহত ছিল, কিন্তু তারা প্রতিবারই তাতে ব্যর্থ হয়।

একবার রবীয়ার দু’ছেলে উতবা ও শায়বা, আবু সুফিয়ান বিন হারব, আবুল বুখতারী, আসওয়াদ বিন আব্দুল মুত্তালিব, আবু জাহল, ওলীদ ইবনুল মুগীরা, হাজ্জাজ বিন আমেরের দু’ছেলে নাবাইহ ও মুনাব্বিহ এবং আস বিন ওয়ায়েলের মতো শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের এক শক্তিশালী প্রতিনিধি দল আবু তালেবের কাছে উপস্থিত হয়ে বললোঃ

‘হে আবু তালেব আপনার ভাতিজা আমাদের দেবতা ও ঠাকুরদের গালি দেয়, আমাদের ধর্মের খুঁত ধরে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের বোকা ঠাওরায় ও বিপথগামী আখ্যায়িত করে। এখন আপনার কাছে আমাদের অনুরোধ, হয় আপনি ওকে আমাদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করা থেকে নিবৃত্ত করুন, নচেত আামাদের হাতে সোপর্দ করুন। কেননা আকীদা বিশ্বাসের দিক দিয়ে আপনিও আমাদেরই দলভুক্ত এবং ওর বিরোধী। আপনি যদি ওকে সামলাতে না পারেন তবে আমরা অবশ্যিই পারবো।’

আবু তালেব সমস্ত কথাবার্তা শান্তভাবে শুনলেন এবং প্রতিনিধি দলকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিদায় করলেন। রসূল সা. নিজের কাজ যথারীতি অব্যাহত রাখলেন এবং কোরায়েশরা তেলে বেগুনে জ্বলতে লাগলো। প্রতিনিধি দলের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। দেখবেন, এতে কত গভীর আবেগ সক্রিয় রয়েছে। এত অত্যন্ত জোরদার আবেদন জানানো হয়েছে। এ বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, ইসলামের দুশমনরা জনগণকে উত্তেজিত করার বিশেষ আয়োজন করে রেখে এসেছিল। এমন সব স্লোগান ও অভিযোগ তুলেছিল, যা শোনা মাত্রই জনতা ক্রোধে ফেটে পড়বে এবং রসূল সা. এর বিরুদ্ধে ভয়ংকরভাবে ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হবে। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংগঠিত করা হয়েছে, তখন জনগণকে উস্কানি দেয়ার লক্ষ্যে কিছু না কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য অবশ্যই পরিবেশন করা হয়েছে।

এ ধরণের বিভ্রান্তিকর তথ্যের মধ্যে একটি ছিল এই যে, তোমাদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হচ্ছে এবং তোমাদের দেবদেবীকে গালি দেয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয়টি এই ছিল যে, চিরাচরিত ও পৈত্রিক ধর্মের খুঁত ধরা হচ্ছে।

তৃতীয়টি হলো, পূর্ব পুরুষদের অবমাননা করা হচ্ছে।

মক্কার মোশরেকরা উত্তেজনাকর এসব উপকরণ সংগ্রহ করে ফেলেছিল। যদিও রসূল সা. এর কাছে নাযিল হওয়া ওহীতে কোরায়েশদের দেবদেবীকে গালি দেয়া হয়নি। রবং গালি দিতে মুসলমানদের নিষেধ করা হয়েছে। তবুও এই সব দেবদেবীর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত যুক্তি প্রমাণকে গালি আখ্যায়িত করে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি ওদের পূর্ব পুরুষদের অবমাননা করেননি, কেবল এ কথাই বলেছেন যে, কোন জিনিস শুধু পুরুষানুক্রমিকভাবে চলে আসছে এই অজুহাতে ধারণ করে রাখা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু এ কথাটাকেও পূর্ব পুরুষদের অবমাননা বলে ধরে নেয়া হয়েছে। অনুরুপভাবে রসূল সা. তাওহীদের যৌক্তিকতা ও শেরকের অযৌক্তিকতার প্রমাণ করার জন্য যা কিছু বলেছেন এবং মোশরেকদেরই প্রশ্নের জবাবে প্রচলিত ধর্মমতের যে পর্যালোচনা করেছেন, তাকে গতানুগতিক ধর্মের দোষ অন্বেষণের পর্যায়ে ফেলা হয়েছে।

আরেকবার এলো অন্য এক প্রতিনিধি দল। তারাও একই কাসুন্দি ঘেঁটে বললোঃ

‘হে আবু তালেব আপনি আমাদের মধ্যে বয়সেও প্রবীণ, মান মর্যাদায়ও শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। আমরা দাবী করেছিলাম যে, আপনার ভাতিজার অত্যাচার থেকে আমাদের বাঁচান। কিন্তু আপনি কিছুই করলেন না। আল্লাহর কসম, আমাদের বাপদাদাকে যেভাবে গালি দেয়া হচ্ছে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের যেভাবে বেকুফ ঠাওরানো হচ্ছে এবং আমাদের দেবদেবীর যেভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে, তা আমাদের কাছে অসহ্য। আপনি যদি ওকে না ঠেকান, তবে আমরা ওকেও দেখে নেব, আপনাকেও দেখে নেব। হয় আমরা বেঁচে থাকবো,না হয় মুহাম্মদ ও তার সমর্থকরা বেঁচে থাকবে। [সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ১০৮]

আবু তালেব এবার রসূলকে সা. ডাকলেন এবং সমস্ত কথাবার্তা তাঁকে জানালেন। তারপর খুবই অনুনয় করে বললেনঃ ‘ভাতিজা, আমার ওপর এমন বোঝা চাপিওনা, যা বহন করতে পারিনা।’ এ পর্যায়ে তিনি এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন যে, তাঁর একমাত্র আশ্রয়স্থলও যেন টলটলায়মান হয়ে পড়লো। বাহ্যত ইসলামী আন্দোলনের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত এসে পড়েছিল। কিন্তু লক্ষ্য করুন, কী গভীর আন্তরিকতা ও অবিচল সংকল্পে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি বললেনঃ

‘চাচাজান, আল্লাহর কসম, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদ উপহার দিয়েও এই কাজ পরিত্যাগ করতে বলে, তবুও আমি তা পরিত্যাগ করতে পারবোনা। আমার এ কাজ সেই দিন বন্ধ হবে, যেদিন হয় আল্লাহ আমাকে এ কাজে বিজয়ী করবেন, নচেত আমি এই চেষ্টা সাধনা করতে করতে খতম হয়ে যাবো।’

রসূল সা. এর এ উক্তির মধ্য দিয়ে আমরা সেই আসল শক্তির সোচ্চার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি, যে শক্তি ইতিহাসকে ওলট পালট করে দেয় এবং সকল প্রতিরোধ ও ষড়যন্ত্রকে চূর্ণ করে আপন লক্ষ্যে উপনীত হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, কোরায়েশ এই শক্তির উপস্থিতি টের পায়নি। আবু তালেব এই শক্তির মায়াবী প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে বললঃ ‘যাও ভাতিজা, তোমার যা ভালো লাগে তার দাওয়াত দাও গে। আমি কোন অবস্থায় তোমাকে অসহায় ছেড়ে দেবনা।’

কিছুদিন পর আরেক প্রতিনিধি দল এলো আম্মারা ইবনে ওলীদকে সাথে নিয়ে। এবার তারা এল এক ব্যতিক্রমধর্মী পরিকল্পনা নিয়ে। তারা আবু তালেবকে বললোঃ ‘এই দেখুন, এ হচ্ছে কোরায়েশ বংশের সবচেয়ে সুঠাম ও সুদর্শন যুবক। একে নিয়ে নিন। এর বুদ্ধি ও শক্তি আপনার অনেক কাজে লাগবে। একে নিজের ছেলে বানিয়ে নিন এবং তার বিনিময়ে মুহাম্মদকে আমাদের হাতে অর্পণ করুন। কেননা সে আপনার ও আপনার চৌদ্দ পুরুষের ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, আপনার দেশের জনগনের মধ্যে বিভেদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছে এবং তাদের পূর্ব পুরুষকে বেকুফ গণ্য করেছে। ওকে আমরা হত্যা করতে চাই। আপনাকে একজন মানুষের পরিবর্তে আর একজন মানুষ দিচ্ছি। [ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৭৯]

লোকগুলোর চিন্তার ধরণটা দেখুন। মুহাম্মদ সা. এর ন্যায় সুমহান ব্যক্তিত্ব যেন একটা বাণিজ্যিক পণ্য। আর আবু তালেব যেন তার চাচা নয়, বরং একজন ব্যবসায়ী! প্রতিনিধিদের কথা শুনে আবু তালেবের ভাবাবেগে প্রচন্ড আঘাত লাগলো। তিনি বললেনঃ ‘তোমরা চাও যেন তোমাদের সন্তানকে তো আমি আদরযত্নের সাথে লালন পালন করতে থাকি, কিন্তু আমার ভাতিজাকে নিয়ে তোমরা যবাই করে দাও। এমনটি কস্মিনকালেও হতে পারেনা।’ শেষ পর্যন্ত উত্তেজিত বাক্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ঘটনার সমাপ্তি ঘটলো। খোদ প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিমতের সৃষ্টি হলো।

এবার কোরায়েশরা রসূল সা. এর সাথীদের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য যে সমস্ত গোত্রে কোন মুসলমান ছিল, সেই সব গোত্রকে উস্কে দিতে লাগলো। তাদেরকে ইসলাম থেকে ফেরানোর জন্য কঠোর নির্যাতন চালানো শুরু হলো। কেবল রসূল সা. কে আল্লাহ আবু তালেবের পৃষ্ঠপোষকতায় রক্ষা করলেন। আবু তালেব কুরায়েশদের হাবভাব দেখে অস্থির হয়ে উঠলেন এবং বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্তালেবের কাছে রসূল সা. এর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানালেন। লোকেরা সমবেত হলো এবং মুহাম্মদ সা. কে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। কিন্তু আবু লাহাবের প্রবল বিরোধিতায় কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেলনা।

পরবর্তী সময় যখন শত্রুদের মধ্য থেকে হামযা ও ওমরের ন্যায় দু’জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ইসলামী আন্দোলনে যোগদান করলো, তখন শত্রু মহলে আবারো প্রচন্ড গাত্রদাহের সৃষ্টি হলো। স্পষ্ট বুঝা গেল যে, মুহাম্মদের সা. এর পরিচালিত আন্দোলন তখন ঘরে ঘরে ঢুকতে আরম্ভ করেছে। সুতরাং একটা কিছু করা চাই। আবু তালেব তখন রোগ শয্যায়। তারা তাঁর কাছে হাজির হলো। এবার তাদের পরিকল্পনা এই ছিল যে, রসূল সা. এর সাথে তাদের এই মর্মে চুক্তি হয়ে যাক যে, সেও আমাদের ব্যাপারে নাক গলাবেনা, আর আমরাও তার ব্যাপারে নাক গলাবোনা। সে আমাদের ধর্মের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবেনা, আর আমরাও তার ধর্মের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবোনা। রসূল সা. কে ডাকা হলো। তিনি কোরায়েশদের দাবী দাওয়া শোনার পর বললেনঃ

(আরবীঃ *********)

‘‘ওহে কোরায়েশ নেতৃবৃন্দ, তোমরা আমার এই একটা মাত্র কথাকে মেনে নাও, দেখবে আরব ও অনারব নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতি তোমাদের অনুগত হয়ে গেছে।’’

একটু কল্পনা করুন তো, কী প্রাণঘাতি পরিবেশ। ষড়যন্ত্র ও বিরোধিতার বিষে জর্জরিত কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। তা সত্ত্বেও রসূল সা. এর মনে স্বীয় দাওয়াতের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে কত গভীর ও অবিচল আস্থা। যেন রাতের প্রগাঢ় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে বলছেন, এক্ষুণি সূর্য উঠবে। শুধু তাই নয়, এও লক্ষ্য করুন যে, নিজের আদর্শের শুধু ধর্মীয় দিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকও তাঁর সামনে কি রকম উজ্জ্বল ছিল।

আবু জেহেল ঝনাত্ করে বলে উঠলোঃ ‘হ্যাঁ, তোর বাপের কসম, একটা কেন, দশটা কথা চলবে।’

অন্য একজন বললোঃ ‘আল্লাহর কসম, এ লোকটা তোমাদের পছন্দ মাফিক কোন কথাই মেনে নেবে বলে মনে হচ্ছেনা।’

এরপর তারা হতাশ হয়ে চলে গেল। তবে প্রতিনিধি দলটির কথাবার্তা থেকে কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রথমত, ইসলামী আন্দোলনকে তারা এমন একটা শক্তি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, যাকে উৎখাত করার বৃথা চেষ্টার চেয়ে আপোষ ও সহাবস্থানের কোন উপায় খুঁজে বের করা অনেক ভালো। দ্বিতীয়ত, কোরায়েশগণ তাদের সমস্ত নির্যাতন নিষ্পেষণ ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও নিজেদের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।

এ ছিল স্বয়ং রসূল সা. এর অবস্থা। পক্ষান্তরে তাঁর সংগীদের মধ্যেও যারা কারো না কারো অভিভাবকত্বের আওতায় জীবন যাপন করছিল, তাদেরকেও অভিভাবকত্বহীন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল।

উদাহরণ স্বরূপ, হযরত আবু সালমাও আবু তালেবের নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলেন। তাঁর গোত্র বনু মাখযুমের লোকেরা এল। তারা বললো, আবু তালেব, আপনি আপনার ভাতিজাকে তো আমাদের হাতে সোপর্দ করলেন না। কিন্তু আমাদের গোত্রের লোককে ঠেকানোর কী অধিকার আছে আপনার? আবু তালেব বললেন, ‘সে আমার ভাগ্নে এবং আমার কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। তোমরা ওর ওপর যুলুম চালাচ্ছিলে। আল্লাহর কসম, হয় তোমরা যুলুম থেকে বিরত হবে, নচেত আমি ওর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যা করা দরকার করবো।’

অনুরূপভাবে, আবিসিনিয়ায় হিজরত শুরুর পর একবার হযরত আবু বকর মক্কার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কা ত্যাগ করে চললেন। কিছু দূর গেলে ইবনুদ দুগুন্না নামক এক ব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। সে যখন জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলো, উনিও হিজরত করছেন, তখন সে বললো, আপনার মত লোকদের এভাবে মাতৃভূমি ত্যাগ করা উচিত নয়। আপনি বিপদাপদে আত্মীয় স্বজনকে সাহায্য করেন, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেন, এবং নগ্ন লোককে কাপড় দেন। নিজে সৎকাজ করেন এবং অন্যদেরকেও সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। ইবনুদ দুগুন্না এভাবে হযরত আবু বকরকে নিজ দায়িত্বে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়ে ফিরিয়ে আনলো এবং কোরায়েশদের সামনে ঘোষণা করে দিল যে, আবু বকর তাঁর নিরাপত্তা হেফাজতে আছেন। বাড়িতে তিনি নিজের নামায পড়ার জায়গায় বসে সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়তেন। সেই সাথে তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। ফলে যে-ই তার তেলাওয়াত শুনতো, সে প্রভাবিত হতো। ক্রমে ক্রমে ব্যাপারটা কোরায়েশদের কানে গেল। তারা ইবনুদ দুগুন্নার কাছে এসে বললো, তুমি আবু বকরকে আশ্রয় দিয়ে তো আমাদের সর্বনাশ করেছ। তিনি সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়েন, আর তা শুনে আমাদের মহিলারা ও শিশুরা প্রভাবিত হচ্ছে, তোমার আশ্রয় দেয়ার প্রয়োজন নেই। আবু বকরকে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। সেখানে বসে সে যা ইচ্ছে করুক। আমরা নাক গলাতে যাব না। ইবনুদ দুগুন্না অগত্যা আবু বকর রা. কে তাঁর বাড়ীতে পাঠিয়ে দিল। (ইবনে হিশাম)

 

নেতিবাচক ফ্রন্ট

শ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মদ সা. মানবজাতির যে বৃহত্তম সেবায় নিয়োজিত ছিলেন, তাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য ইসলামের শত্রুরা হরেক রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। কিন্তু সে সব সত্ত্বেও তাঁর দাওয়াতী কাজ অব্যাহত ছিল এবং তার সুফলও কিছুনা-কিছু পাওয়া যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় বিরুদ্ধবাদী প্রচারণার একটা সক্রিয় সেল গঠন করা হলো। এই সেলের আওতায় মক্কার কতিপয় শীর্ষস্থানীয় নেতা রসূল সা. এর কাছাকাছি অবস্থান করতে লাগলো। তাদের প্রধান সমস্যা ছিল এই যে, মক্কা ছিল সমগ্র আরবের কেন্দ্রস্থল। এখান দিয়ে সব জায়গা থেকে কাফেলা যাতায়াত করতো এবং সত্যের দাওয়াতের নিত্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতো। মক্কার সরদারদের যে ধাপ্পাবাজী খোদ মক্কাবাসীর ওপর চলতো, সেটা বহিরাগতদের ওপর চলতোনা। তাছাড়া নবাগতদের মধ্যে অনেক মেধাবী ও নির্মল বিবেকধারী লোকও থাকতো। তারা কোন দাওয়াতকে নিছক যুক্তির বিচারে এবং দাওয়াত দাতাকে শুধু তার আচার ব্যবহার ও স্বভাব চরিত্রের আলোকে যাচাই করে কোন বিদ্বেষ বা কোন ঐতিহাসিক ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। মুহাম্মদ সা. এর দাওয়াত ও আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে কোন হিংসা বিদ্বেষ ছিলনা এবং থাকার কোন কারণও ঘটেনি। এ পরিস্থিতিতে শুধু মক্কাকে মুহাম্মদদের সা. দাওয়াতের প্রভাব থেকে রক্ষা করায় কোন লাভ হতোনা, যদি মক্কার বাইরের আরবীয় সমাজ ঐ দাওয়াত দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। কোরআনে বিষয়টির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে এভাবেঃ

(আরবী*******)

‘তারা কি দেখতে পায়না, তাদের প্রভাবাধীন এলাকাকে আমি চারদিক থেকে সংকুচিত করে আনছি?’ এ দিক দিয়ে তাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক সময় ছিল হজ্জের মওসুম। আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা দলে দলে তাদের সরদারদের নেতৃত্বে মক্কায় সমবেত হতো। এ সময় রসূল সা. ঐ সব দলের সদস্য ও নেতাদের সাথে তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে সাক্ষাত করতেন এবং দাওয়াত দিতেন। প্রতিক্রিয়াশীল নেতিবাচক আন্দোলনের নেতারা তা দেখে তেলেবেগুনে জ্বলতো। একবার হজ্জের মওসুম সমাগত হলে কোরায়েশ নেতারা ওলীদ ইবনুল মুগীরার বাড়ীতে জমায়েত হলো এবং গভীরভাবে ভাবতে লাগলো। ওলীদ সমস্যাটা এভাবে তুলে ধরলোঃ

‘হে কোরায়েশ জনতা, হজ্জের মওসুম সমাগত। সমগ্র আরব থেকে তোমাদের এখানে দলে দলে লোক আসবে। তারা সবাই আমাদের এই লোকের (মুহাম্মাদের) ব্যাপারটা জেনে গেছে। তাই তারা বিষয়টা ভালো করে জানার কৌতুহল নিয়েই আসবে। কাজেই তোমরা এখন এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও। পরস্পর কোন মতভেদে লিপ্ত হয়োনা। একজনের কথা আরেকজন মিথ্যা সাব্যস্ত করতে থাকবে ও খন্ডন করতে থাকবে এমন যেন না হয়।’

উপস্থিত জনতা বললোঃ ‘আপনিই বলুন। একটা কর্মসূচী আপনিই ঠিক করে দিন। আমরা সেই মোতাবেক কাজ করবো।’

কিন্তু ওলীদ জোর দিয়ে বললোঃ ‘তোমরাই আলোচনা কর, আমি শুনি।’

অগত্যা আলোচনা শুরু হয়ে গেল।

একদল বললোঃ আমরা তো মনে করি, মুহাম্মদ একজন জ্যোতিষী। এই কথাই হজ্জে আগত লোকদের বলে বুঝাতে হবে।

ওলীদঃ না, আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ জ্যোতিষী নয়। আমরা বহু জ্যোতিষী দেখেছি। জ্যোতিষীদের মত ছন্দবদ্ধ ও মিত্রাক্ষর পয়ারে মুহাম্মদ কথা বলেনা।

লোকেরা বললোঃ তাহলে আমরা বলবো, ওকে ভূতে ধরেছে।

ওলীদঃ না, সে ভূতেধরাও নয়। ভূতে ধরা মানুষের যেমন গলা ধরে যায়, অংগপ্রত্যংগ কাঁপে, এবং চিন্তাধারা এলোমেলো থাকে, মুহাম্মাদের মধ্যে সে সব লক্ষণ নেই।

জনতাঃ তাহলে আমরা বলবো, ও একজন কবি।

ওলীদঃ না, ও কবি বলেও তো আমার মনে হয়না। আমরা হরেক রকম ছন্দের কবিতা চিনি। সে অনুসারে সে কবিও নয়।’

জনতাঃ তাহলে আমরা বলবো সে একজন যাদুকর।

ওলীদঃ না, সে যাদুকরও নয়। আমরা অনেক যাদুকর ও তাদের জাদু দেখেছি। জাদুতে ফুঁক ও মাদুলী দেয়ার যে রীতি আছে, মুহাম্মাদের সা. কাছে তা তো নেই।

জনতাঃ তাহলে ওহে আবু আবদুশ্শামস, আপনিই বলুন, মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালানোর জন্য আমরা কী বলবো?

ওলীদঃ আল্লাহর কসম। ওর কথাবার্তা বড়ই মধুর। তার কথার শেকড় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং তার শাখা প্রশাখায় অনেক ফল ধরে। এ দাওয়াত বিজয়ী হবেই। একে পরাভূত করা যাবে না। এ দাওয়াত অন্য সব কিছুকে পর্যদুস্ত করে দেবে। তোমরা যেটাই বলবে, নিরর্থক ও বৃথা হয়ে যাবে। তবে তোমরা যা যা বলেছ, তার মধ্যে শেষের কথাটাই কিছুটা মানানসই হয়েছে। তোমরা এটাই বলবে যে, সে একজন জাদুকর। তার কথায় জাদু রয়েছে। সে কথা দিয়ে বাপ-বেটায়, স্বামী-স্ত্রীতে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, ব্যক্তি ও গোত্রে এবং গোত্রে-গোত্রে বিভেদ ও বিচ্ছেদ ঘটায়। (ইসলামের দাওয়াতের দিকে ইংগিত করে এ কথা বলা হয়েছে। কেননা এই দাওয়াতের ভিত্তিতে সমাজে দুটো দল সৃষ্টি হয়ে গেছে। অথচ এর আসল কারণ হলো, ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র।) তোমরা বলবে যে, তার জাদুর কারণেই লোকেরা তাকে বয়কট করে রেখেছে। (সীরাতে ইবনে হিশাম ও সীরাতুল মুস্তাফা, ইদ্রীস কান্দুলভী)

লক্ষ্য করুন, কিভাবে একজন মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালানোর জন্য ষড়যন্ত্র করা হয়। যে কথা বিবেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়না, সে কথাই জোর করে চালু করার চক্রান্ত করা হয়। ঐ মজলিসেই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, মক্কা অভিমুখী এক এক রাস্তার মুখে এক একটা দল বসে থাকবে। তারা প্রত্যেক প্রতিনিধি দলকে মুহাম্মাদ সা. ও তার দাওয়াত সম্পর্কে সতর্ক করে দেবে। এই পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করা হলো। কিন্তু এর ফল হলো উল্টো। রসূল সা. সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য আরবের কোণে কোণে পৌঁছে গেল। যারা এ সম্পর্কে কিছুই জানতোনা, তারাও জেনে গেল যে, আরবে একটা নতুন ধর্মের দাওয়াত চালু হয়েছে এবং মুহাম্মদই সা. তার পতাকাবাহী।

এবার আসুন, ইতিহাসের পর্দায় ইসলামের আহ্বায়ক ও তার বিরুদ্ধে কর্মরত নেতিবাচক আন্দোলনকারীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা যাক।

রবীয়া বিন উবাদা বর্ণনা করেন, আমি তখন একজন তরুণ। মীনায় বাবার সাথে থাকতাম। দেখতাম যে, রসূল সা. আরবের বিভিন্ন গোত্রের তাঁবুতে তাঁবুতে যেয়ে বলছেন, হে অমুক গোত্রের জনমন্ডলী, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসূল। তোমাদের কাছে আমার দাওয়াত, তোমরা শুধু আল্লাহর এবাদত কর, তাঁর সাথে আর কাউকে শরীক করোনা। যে সমস্ত দেবমূর্তির তোমরা পূজা করে থাক, তা বর্জন কর। আমার ওপর ঈমান আনো। আমাকে সমর্থন কর ও আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত কর। তাহলে আল্লাহ যে সমস্ত কথা বলার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন, তা বিস্তারিতভাবে বলবো।’

ঘটনার প্রতিবেদক বলেন, এক ব্যক্তি এতেনীয় পোশাক পরে রসূল সা. এর পেছনে পেছনে চলছিল। রসূল সা. যখনই তার কথা বলা শেষ করতেন, অমনি ঐ লোকটা চিৎকার করে বলতোঃ ‘ওহে অমুক গোত্রের অতিথিবৃন্দ, এই লোকটা তোমাদেরকে লাত ও উয্যা থেকে দূরে সরিয়ে নতুন ধর্ম ও ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। ওর কথা তোমরা শুনোনা এবং মান্য করোনা।

ঐ তরুণ এ দৃশ্য দেখে নিজের বাবাকে জিজ্ঞেস করে, দাওয়াতদাতার পেছনে পেছনে যে লোকটা ছুটে চলেছে সে কে? সে তো ওর প্রত্যেকটা কথা খন্ডন করছে।’

বাবা জবাব দেন, ‘সে ঐ ব্যক্তির চাচা আবু লাহাব।’

হজ্জের ন্যায় বিভিন্ন মেলায়ও রসূল সা. হাজির হতেন, যাতে সামাজিক সমাবেশগুলো দ্বারা কিছু না কিছু উপকৃত হওয়া যায়। একবার যুল মাজায নামক মেলায় হাজির হয়ে জনতাকে কলেমায়ে তাইয়েবার দাওয়াত দিলেন। আবু জাহেল তাঁর পিছু লেগে ছিল। সে এমন ইতরামির পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল যে, হাতে ধুলোবালি নিয়ে রসূল সা. এর মুখে নিক্ষেপ করছিল এবং বলছিল, তোমরা ওর কথা শুনোনা। ও লাত ও উয্যার পূজা বন্ধ করতে চায়। (সীরাতুন্নবী, শিবলী নুমানী)

বিরুদ্ধবাদী প্রচারণার এই জোরদার অভিযানের খবরাদি শুনে আবু তালেব শংকিত হন যে, আরবের জনগন সংঘবদ্ধভাবে বিরোধিতা শুরু করে না দেয়। এ জন্য তিনি একটা দীর্ঘ কবিতা লিখে কা’বার দুয়ারে ঝুলিয়ে রাখেন। এতে তিনি একদিকে সাফাই দেন যে, আমি নিজে মুহাম্মাদের দাওয়াত গ্রহণ করিনি। অপর দিকে তিনি এ কথাও ঘোষণা করেন যে, আমি কোন অবস্থাতেই মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করতে পারবোনা। প্রয়োজন হলে তার জন্য আমি নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেব। আবু তালেবের নামে সংকলিত এ জাতীয় কবিতার বেশির ভাগই ঐতিহাসিকভাবে দূর্বল। তবে এর বেশ কিছু অংশ যে সঠিক, সে ব্যাপারেও সন্দেহের অবকাশ নেই। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

 

বিরূপ প্রতিক্রিয়া

যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মক্কায় আসতো, অমনি ইসলামের শত্রুরা তাকে ঘিরে ধরতো এবং রসূল সা. এর প্রভাব থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু অধিকাংশ সময় উল্টো ফল ফলতো। এ ধরণের কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করা জরুরী মনে হচ্ছে।

তোফায়েল বিন আমর দাওসী একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও নামকরা কবি ছিলেন। একবার তিনি মক্কায় বেড়াতে এলে কোরায়েশদের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে গেল। তারা গিয়ে বললোঃ ‘তোফায়েল সাহেব, আপনি আমাদের শহরে আগমন করেছেন, এতে আমরা আনন্দিত। তবে এখানে যে ক’টা দিন থাকবেন একটু সাবধানে থাকবেন। এখানে মুহাম্মাদের সা. কার্যকলাপ আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ লোকটা আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করে দিয়েছে এবং আমাদের স্বার্থ ধ্বংস করে দিয়েছে। ওর কথাবার্তা জাদুর মত। সে পিতাপুত্রে, ভাইয়ে ভাইয়ে এবং স্বামী স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছে। আপনার ও আপনার গোত্রকে নিয়ে আমরা শংকিত, পাছে আপনারা ওর ধাপ্পার শিকার হয়ে যান। তাই মুহাম্মাদের সা. সাথে আপনার একেবারেই কোন কথা না বলা ও তার কোন কথা না শোনা সবচেয়ে উত্তম।’

তোফায়েল বলেনঃ আমি মুহাম্মাদের সাথে কোন কথা বলবোনা এবং তাঁর কোন কথা শুনবোনা-এই মর্মে ওয়াদা না করায় তারা আমার পিছু ছাড়েনি। তাই মসজিদুল হারামে যাওয়ার সময় কানে তুলো দিয়ে যেতাম। এই সময় হঠাৎ একদিন দেখলাম, রসূল সা. কা’বার কাছে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন। আমিও তাঁর খুব কাঁছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি তাঁর আবৃত্তি করা খুবই মধুর বাণী শুনলাম। মনে মনে বললামঃ আমি কি মায়ের দুধ খাওয়া শিশু? আল্লাহর কসম, আমি তো একজন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। আমি একজন কবি। ভালোমন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা আমার আছে। তাহলে মুহাম্মাদের কথা শুনতে আমাকে কে বাধা দিতে পারে? তিনি যে দাওয়াত দেন তা যদি ভালো হয় তাহলে গ্রহণ করবো। আর খারাপ হলে প্রত্যাখ্যান করবো।’

এই চিন্তা-ভাবনায় খানিকটা সময় কেটে গেল। নামায শেষে রসূল সা. বাড়ীর দিকে রওনা হলেন। তোফায়েল তাঁর সাথে সাথে চললেন। পথে তাঁকে সব কথা জানালেন যে, তাঁর কাছে তাঁর সম্পর্কে কিরূপ অপপ্রচার করা হয়েছে এবং কিভাবে তাকে রসূল সা. এর কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। বাড়ীতে পৌঁছে তিনি রসূল সা. এর দাওয়াত কি, সবিস্তারে জানতে চাইলেন। রসূল সা. তাঁকে ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে এবং কোরআন পড়ে শোনালেন। তোফায়েল বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম, এত সুন্দর বাণীও আমি কখনো শুনিনি, এমন নির্ভুল ও সত্য দাওয়াতও আমি কখনো পাইনি। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। অতঃপর তিনি নিজ গোত্রের কাছে গিয়ে ইসলাম প্রচার করলেন। এতে তাঁর সমগ্র গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে।

তোফায়েল এমন আবেগোদ্দীপ্ত প্রচারকে পরিণত হন যে, বাড়ীতে গিয়ে বৃদ্ধ পিতার সাথে দেখা হওয়া মাত্রই বলেনঃ ‘আপনিও আমার কেউ নন, আমিও আপনার কেউ নই।’ পিতা বললেনঃ ‘সে কী? তোমার কী হয়েছে বাবা!’ তোফায়েল বললেনঃ ‘আমি এখন মুহাম্মদ সা. এর ধর্ম গ্রহণ করেছি এবং তাঁর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করেছি।’ পিতা বললেনঃ ‘বাবা, তোমার ধর্ম যা, আমার ধর্মও তাই হবে।’ তিনি তৎক্ষণাত গোসল করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তোফায়েল একই পন্থায় নিজের স্ত্রীকেও দাওয়াত দিলেন। সেও ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর গোত্রের সবার মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। পরে তিনি রসূল সা. এর কাছে এসে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর গোত্রের বিভিন্ন চারিত্রিক দোষের উল্লেখ করে তাদের জন্য আযাবের দোয়া করতে রসূল সা. কে অনুরোধ করেন। কিন্তু রসূল সা. হেদায়াতের ও সংশোধনের দোয়া করেন এবং তোফায়েলকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেন, যেন, ধৈর্যের সাথে নিজের গোত্রের সংশোধনের জন্য কাজ করে যেতে থাকে এবং তাদের সাথে নম্র আচরণ করে। (ইসলাম প্রচারে তার জবরদস্তির প্রবণতা ইসলামী কর্মনীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিলনা।) [সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খন্ডঃ ৪০৭-৯ পৃষ্ঠা]

আরো একটা ঘটনা লক্ষ্য করুন। আ’শা ইবনে কায়েসও একজন বিশিষ্ট কবি ছিলেন। তিনি রসূল সা. সম্পর্কে অনেক কিছু শুনে ইসলাম গ্রহণ করার মানসে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি রসূল সা. এর প্রশংসাসূচক একটা কবিতাও রচনা করেছিলেন। আ’শা মক্কার সীমার ভেতরে পৌঁছা মাত্রই জনৈক কোরায়েশী মোশরেক (ইবনে হিশামের মতে, সে ছিল আবু জাহল) এসে তাকে ঘিরে ধরলো এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। আ’শা বললেন, আমি মুহাম্মদ সা. এর কাছে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে চাই। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বেশ কথাবার্তা হলো। কূচক্রী মোশরেকটি আ’শার মনোভাব যাচাই করার জন্য বললো, দেখ, মুহাম্মদ তো ব্যভিচার নিষিদ্ধ করে।’ এতেও যখন আ’শা দমলেন না, তখন সে বললো, মুহাম্মদ সা. মদ খেতেও নিষেধ করে। এভাবে এটা ওটা বলতে বলতে সে আ’শার সংকল্পটাকে দুর্বল করে দিল। শেষ পর্যন্ত তাকে এই মর্মে রাজী করালো যে, এবারকার মত তুমি চলে যাও। আগামী বছর এসে ইসলাম গ্রহণ করো। আ’শা ফিরে গেল। কিন্তু পরের বছর মক্কায় ফিরে আসার আগেই হতভাগার মৃত্যু হয়ে গেল।

সবচেয়ে মজার ঘটনা ছিল মুরদ আরাশীর। বেচারা একটা উট নিয়ে মক্কায় এসেছিল। আবু জাহলের সাথে উট বিক্রির বিষয়ে তার কথাবার্তা পাকা হয়। কিন্তু আবু জহল দাম দিতে গড়িমসি করতে থাকে। বাধ্য হয়ে সে কোরায়েশদের বিভিন্ন নেতার কাছে গিয়ে উটের দাম আদায় করিয়ে দেয়ার জন্য কাকুতি মিনতি করতে থাকে। পবিত্র কা’বার চত্তরে কোরায়েশদের একটা বৈঠক চলছিল। আরাশী ঐ বৈঠকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের কাছে আবেদন জানালো যে, আপনাদের কেউ আবু জাহলের কাছে থেকে আমার পাওনাটা আদায় করে দিন। আমি একজন বিদেশী। আমার ওপর যুলুম করা হচ্ছে। বৈঠকের লোকদের মধ্যে এমন কেউ ছিলনা, যে আবু জাহলের কাছে গিয়ে বিদেশীর হক আদায় করে দেয়ার দুঃসাহস দেখায়। এ জন্য তারা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললো, ঐ যে একটা লোক (মুহাম্মদ সা.) বসে আছে, ওর কাছে যাও। সে আদায় করে দেবে। আসলে এটা ছিল একটা পরিহাস মাত্র। কেননা সবাই জানতো মুহাম্মাদের সা. সাথে আবু জাহলের কি সাংঘাতিক শত্রুতা। আরাশী রসূল সা. এর কাছে এসে তার সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। রসূল সা. তৎক্ষণাত উঠলেন এবং বললেন, আমার সাথে এস। সবাই অপেক্ষা করতে লাগলো কী ঘটে তা দেখার জন্য। রসূল সা. হারাম শরীফ থেকে বেরিয়ে সোজা আবু জাহলের বাড়ীতে গেলেন এবং দরজায় করাঘাত করলেন। ভেতর থেকে আওয়ায এলো, কে? তিনি বললেনঃ আমি মুহাম্মদ। বাইরে এস। আমার জরুরী কথা আছে।

আবু জাহল বেরিয়ে এল। মুখ তার ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। তিনি বললেন, এ লোকটার যা পাওনা আছে, দিয়ে দাও। আবু জাহল বিনা বাক্যব্যয়ে পাওনা পরিশোধ করে দিল। আরাশী সানন্দে হারাম শরীফের বৈঠকরত লোকগুলোর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা জানালো।

মুহাম্মদ সা. এর নির্মল চরিত্রের প্রভাবেই ঘটেছিল এ ঘটনা। আবু জাহল নিজেও এর স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং বৈঠকরত কোরায়েশ নেতাদের কাছে তা ব্যক্তও করেছিল। সে বললো, মুহাম্মদ এসে দরজায় করাঘাত করলো। আমি তার আওয়ায শুনতেই কেন যেন ভয় পেয়ে গেলাম। (ইবনে হিশাম)

স্বয়ং আরাশী এবং মক্কাবাসীর ওপর এ ঘটনার কেমন প্রভাব পড়ে থাকতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

যে সব নওমুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তাদের কল্যাণে ঐ এলাকায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিল। সেখান থেকে ২০ জন খৃস্টান মক্কায় এল। তারা হারাম শরীফে রসূল সা. এর সাথে সাক্ষাত করে। রসূল সা. তাদের সাথে কথা বলেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন, কোরআন শোনান এবং ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তাদের চোখে পানি এসে যায় এবং তারা নির্দ্বিধায় ঈমান আনে। তারা যখন উঠে বেরুলো, তখন মসজিদের বাইরে কোরায়েশরা জটলা পাকাচ্ছিল। আবু জাহল আবিসিনিয়ার প্রতিনিধি দলকে বললো, তোমরা কেমন নির্বোধ! নিজেদের ধর্মকে পরিত্যাগ করলে! প্রতিনিধি দল বললো, ‘আপনাদেরকে আমরা ছালাম জানাচ্ছি। আমরা আপনাদের সাথে কোন বিবাদ বিসম্বাদে যেতে চাইনে। আমাদের পথ ভিন্ন এবং আপনাদের পথও ভিন্ন। আমরা একটা কল্যাণ থেকে বঞ্ছিত হতে চাইনে।’

মক্কার কুচক্রীরা প্রচন্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এই আশংকায় আকাবার দ্বিতীয় বায়আতের পুরো ঘটনাটা রাতের গভীর অন্ধকারে কঠোর গোপনীয়তার সাথে সম্পন্ন করা হয়। মদীনা থেকে আগত প্রতিনিধি দল যখন বায়আত সম্পন্ন করে নিজেদের অবস্থান স্থলে পৌঁছলো, তখন কোরায়েশ নেতারা সেখানে গিয়েই তাদের সাথে সাক্ষাত করলো। কোরায়েশদের গোয়েন্দাগিরির ব্যবস্থা এত মজবুত ছিল যে, তারা বায়আতের পুরো ঘটনা জানিয়ে তাদেরকে বললো, তোমরা মুহাম্মদ সা. কে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাও এবং তার হাতে হাত দিয়ে তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করার শপথ নিয়েছ। ভালো করে শুনে নাও, তোমরা যদি আমাদের সাথে আরবদের লড়াই বাধিয়ে দাও, তাহলে আমাদের চোখে তোমাদের চেয়ে ঘৃণ্য মানুষ আর কেউ থাকবে না। আনসারগণ ব্যাপারটা গোপন করার চেষ্টা করলেন। তাই তখনকার মত ব্যাপারটা আর সামনে গড়ালোনা এবং আনসারগণ মদীনায় রওনা হয়ে গেল। কিন্তু কোরায়েশগণ এরপরও গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে যায় এবং সমস্ত তথ্য জেনে ফেলে। তারা আনসারী কাফেলার পিছু ধাওয়া করে এবং সা’দ বিন উবাদা ও মুনযির বিন আমরকে পাকড়াও করে নিয়ে আসে। তারা উভয়ে নিজ নিজ গোত্রে ইসলাম প্রচারের অংগীকার করেছিলেন। কোরায়েশগণ তাদের উভয়কে পিছমোড়া দিয়ে বেধে ভীষণ মারধর করে।

সা’দ বিন উবাদা বর্ণনা করেছেন, আমাদের এই করুণ অবস্থায় কোরায়েশদের এক দীর্ঘাঙ্গী ও সুদর্শন ব্যক্তি এল। আমি মনে মনে বললাম, এই গোত্রটির মধ্যে যদি কোন ভালো লোক থেকে থাকে, তবে সে বোধহয় এই ব্যক্তি এবং এর কাছ থেকে হয়তো কিছুটা সদ্ব্যবহার পাওয়ার আশা করা যায়। কিন্তু সে কাছে এসেই আমাকে প্রচন্ড একটা থাপপড় মারলো। এবার আমি বুঝে নিলাম, এদের কাছ থেকে কোন সদ্ব্যবহার আশা করা যায় না। অবশেষে তাদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, কোরায়েশদের মধ্যে কি এমন কেউ নেই, যার সাথে তোমাদের কোন পূর্বপরিচয়, সৌহার্দ বা চুক্তি আছে? আমি জুবাইর ইবনে মুতায়াম ও হারেস বিন হারবের নামোল্লেখ করলাম। সে আমাকে ঐ দু’জনের নাম ধরে ধরে ডাকার পরামর্শ দিল। আমি তাই করলাম। তখন তারা উভয়ে এসে আমাদের মুক্ত করলো।

এই ঘটনাগুলো থেকে বুঝা যায়, ইসলামী দাওয়াতের বিরোধীরা কত সক্রিয় ছিল।

 

সাহিত্য ও গান বাজনার ফ্রন্ট

নযর বিন হারেস ছিল ইসলাম বিরোধী অভিযানের আর এক হোতা। সে নিজের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ঘন ঘন পারস্য যেত। সেখান থেকে সে অনারব রাজা বাদশাদের ঐতিহাসিক সাহিত্যিক কিচ্ছা কাহিনী সংগ্রহ করে আনতো। তারপর মক্কায় কোরআনের বৈপ্লবিক সাহিত্যের মোকাবিলায় অনারব বিশ্ব থেকে আমদানী করা বিনোদন মূলক সাহিত্যের আসর গড়ে তুলত। এসব আসরে সে জনগণকে এ বলে দাওয়াত দিতে থাকে যে, আরে মুহাম্মদের সা. কাছ থেকে আ’দ সামূদের পঁচাবাসি কিচ্ছা শুনে কি করবে, আমার কাছে এস, আমি তোমাদের রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের দেশের মজার মজার কাহিনী শোনাবো। নযর বিন হারেসকে একটা স্বতন্ত্র মানবীয় চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করে কোরআন বলেছেঃ

‘এক শ্রেণীর লোক এমনও আছে যারা বিভ্রান্তিকর চিত্তবিনোদনমূলক কিচ্ছা-কাহিনী কিনে আনে, যাতে করে তা দ্বারা না জেনে বুঝে মানুষকে বিপথগামী করতে পারে এবং তাদেরকে উপহাস করতে পারে।’ (সূরা লুকমানঃ ৬)

এই নযর বিন হারেস একবার এক মজলিসে আবু জাহলের সামনে রসূল সা. এর দাওয়াত ও আন্দোলন সম্পর্কে নিম্নরূপ ভাষণ দিয়েছিলঃ

‘হে কোরায়েশ জনমন্ডলী, আজ তোমরা এমন একটা জিনিসের সম্মুখীন, যার মোকাবিলায় ভবিষ্যতে তোমাদের কোন কৌশল সফল হবে না। মুহাম্মদ সা. এক সময় তোমাদের সবার প্রাণপ্রিয় এক কিশোর ছিল। তোমাদের সবার চাইতে সত্যবাদী এবং সবার চাইতে আমানতদার ও বিশ্বাসী ছিল। পরে যখনই সে প্রৌঢ় বয়সে পদার্পন করলো এবং নিজের দাওয়াত পেশ করলো, অমনি তোমরা বলতে আরম্ভ করলে, সে যাদুকর......, বলতে আরম্ভ করলে, সে জ্যোতিষী, বলতে আরম্ভ করলে সে উন্মাদ।..... আসলে এর কোনটাই ঠিক নয়। হে কোরায়েশ জনমন্ডলী, তোমরা তোমাদের নীতি সম্পর্কে আরো একটু চিন্তাভাবনা কর। কেননা আল্লাহর কসম তোমাদের সামনে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উপস্থিত।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম)

নযর বিন হারেসের এ ভাষণ থেকে বুঝা যায়, রসূলের সা. দাওয়াতকে সে একটা অসাধারণ ব্যাপার মনে করতো এবং তাঁর চারিত্রিক মাহাত্ম সম্পর্কেও সচেতন ছিল। কিন্তু সে নিজের সচেতন বিবেককে পদদলিত করে রসূলের দাওয়াতের বিরোধীতা করার জন্য কুটিল শয়তানী চক্রান্ত আঁটতো। সে ভালো করেই বুঝতো যে, একটা ইতিবাচক ও মহৎ উদ্দেশ্যমূলক আন্দোলনের আন্তরিকতাপূর্ণ আহ্বানের মোকাবিলায় সাধারণ লোকদের জন্য বিনোদনমূলক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অধিকতর আকর্ষণীয় উপাদান থাকতে পারে। এ জন্য সে বিনোদনমূলক ও নান্দনিক সাহিত্যের একটা আসর গড়ে তুলতো। নযর বিন হারেস বলতো, ‘আমি মুহাম্মাদের চেয়েও চিত্তাকর্ষক ও মজাদার কিচ্ছাকাহিনী শোনাতে পারি।’ এরপর যখন সে বিদেশী কিচ্ছাকাহিনী বলতো, তখন বলতো, মুহাম্মাদের সা. কিচ্ছাকাহিনী আমার কিচ্ছাকহিনীর চেয়ে কোন্ দিক দিয়ে ভালো? পক্ষান্তরে কোরআনের কিচ্ছাকাহিনীকে সে পূরাকালের কিচ্ছাকহিনী বলে ব্যংগ করতো।

শুধু এখানেই শেষ নয়, সে গানবাজনায় পারদর্শিনী একটা দাসীও কিনে এনেছিল। সে লোকজনকে দাওয়াত করে খাওয়াত এবং খাওয়ার পর ওই দাসীর গানবাজনা শোনাতো। যে যুবক সম্পর্কেই সে খবর পেতো যে, সে ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, তার কাছে সে ওই গায়িকাকে নিয়ে যেত এবং দাসীকে নির্দেশ দিত, 'এ যুবককে খাইয়ে দাইয়ে অ গানবাজনা শুনিয়ে পরিতৃপ্ত কর।' শিল্প ও সংস্কৃতির এরূপ প্রদর্শনীর আয়োজন করার পর সে সগর্বে বলতো 'মুহাম্মদ সাঃ যে দাওয়াত দেয়, সেটা বেশি আনন্দদায়ক, না আমি যেটার আয়োজন করছি সেটা বেশি আনন্দদায়ক?' (সিরাতুল মুসতাফা, মাওলানা ইদ্রীস কান্দালভী, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ১৮৮)

প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মূল প্রাণশক্তি হল আল্লাহর আনুগত্য ও নৈতিকতা। নরনারীর অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীলতার পরিবেশে ওই প্রাণশক্তির মৃত্যু ঘটে। যে পরিবেশে খাওয়া দাওয়া, গান বাজনা, বিনোদন, ললিত কলা ও যৌনতার প্রতি সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়, সে পরিবেশ ইসলামী দাওয়াতের উপযোগী হতে পারেনা। এ কারণেই নযর বিন হারেস একদিকে বিনোদনমূলক কিচ্ছাকাহিনী পরিবেশন করা শুরু করে অপরদিকে গান বাজনা, নারী পুরুষের সম্মিলন ও অশ্লীলতার সমাবেশ ঘটায়।

কিন্তু একটা গঠনমূলক দাওয়াত ও সদুদ্দেশ্যমুলক আন্দোলনের প্রতিরোধে বিনোদনমূলক সাহিত্য সফল হয়না এবং ললিত কলা তথা গান বাজনা ইত্যাদিও কোন কাজে লাগেনা। দু'চারদিন একটু হৈ চৈ হলো। তারপর সব স্তব্ধ হয়ে গেল।

নযর বিন হারেসের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর সে কোরায়েশ নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে মদীনায় ইহুদী ধর্মযাজকদের কাছে গেল। তাদের কাছে সে জিজ্ঞাসা করল তোমরা তো জ্ঞানীগুণী মানুষ আর আমরা অশিক্ষিত মূর্খ, ইসলামী আন্দোলনকে আমরা কিভাবে ঠেকাই এবং কিভাবে মুহাম্মাদ সাঃ কে প্রতিরোধ করি, তা বলে দাও। ইহুদী আলেমরা তাদের শেখালো যে, তোমরা মুহাম্মদ সাঃ এর কাছে যুলকারনাইন ও আসহাবে কাহফের ঘটনা জিজ্ঞেস কর এবং আত্মা কি জিনিশ জানতে চাও। তারা ঐ তিনটে প্রশ্ন যথা সময়ে রসূল সাঃ এর কাছে তুললো এবং ওহীর সাহায্যে তিনি তার সন্তোষজনক জবাব ও দিলেন। কিন্তু কাফেরদের হঠকারিতার প্রতিরোধ কিভাবে সম্ভব? (সীরাতে ইবনে হিশাম)

 

আপোষের চেষ্টা

গোপনীয়তার প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করার পর যখন ইসলামী আন্দোলন দ্রুতগতিতে ছড়াতে লাগলো এবং পরবর্তীতে যখন অপপ্রচার ও হিংস্রতার বিভিন্ন আয়োজন ব্যর্থ ও নিষ্ফল হয়ে গেল, তখন বিরোধীরা অনুভব করতে আরম্ভ করলো যে, ইসলামী আন্দোলন একটি অজেয় শক্তি এবং তা অচিরেই দেশে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়ে ছাড়বে। তাই আপোষ মীমাংসা ও সমঝোতার একটা পথ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা এবং দু'পক্ষের মাঝে লেনদেনের ভিত্তিতে এ দ্বন্দ্ব সংঘাতের অবসান ঘটানো যায় কিনা, সে জন্য পুনরায় উদ্যোগ আয়োজন ও চেষ্টা তৎপরতা শুরু হলো। কিন্তু আদর্শবাদী আন্দোলনে এতো বেশি শৈথিল্যের অবকাশ থাকেইনা যে, লেনদেন ও গোঁজামিলের মাধ্যমে একটা মধ্যবর্তী পথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তবু ফোরামের নেতারা এ কৌশলটাও সর্বতভাবে পরীক্ষা করে দেখল যে, হয়তোবা কোনদিক দিয়ে কিছু সুযোগ সুবিধা আদায় করা যেতে পারে।

উদাহরণ স্বরূপ, তাদের একটা আপোষ প্রস্তাব এই ছিল যে, রসূল সাঃ তাদের দেবদেবী ও দেবমূর্তিগুলোর নিন্দা সমালোচনা করবেন না এবং তাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করবেননা। এছাড়া আর যত ইচ্ছা ওয়াজ নছিহত ও নৈতিক উপদেশ দিতে চান, দেবেন, তাতে কোন আপত্তি করা হবে না। অর্থাৎ তিনি মূল দাওয়াতী কলেমা থেকে বাতিলকে প্রত্যাখ্যানজনিত বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন। অন্য কথায় এর অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহর নাম নেওয়ার অবকাশ থাকবে কিন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই (লাইলাহ ইল্লাল্লাহ) এ কথা বলা যাবে না। যে বাতিল ধ্যানধারণার উপর প্রচলিত সভ্যতা দাড়িয়ে আছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। সমাজে খারাপ পরিবেশ ও খারাপ উপাদান যেটুকু যেভাবে আছে, তাকে ওইভাবেই বহাল থাকতে দিতে হবে। সত্য ও ন্যায়কে এমন আকারে পেশ করতে হবে, যেন তা বিপ্লবের পথকে উন্মুক্ত না করে এবং তা থেকে বৈপ্লবিক প্রেরণা নির্মূল করে দিতে হবে। ইসলামের রাজনৈতিক সংলাপ নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে। সমাজ ব্যবস্থাকে যথারীতি বহাল রেখে তার অধীনে আধ্যাত্মিক সমাজ সংস্কারের কাজ করে যেতে হবে। ভাবখানা এই যে, কোরায়েশদের শ্রেণীগত শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও কৌলীন্য, কায়েমী স্বার্থ এবং অর্জিত পদমর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা সবই বহাল রাখতে হবে। এরপর তুমি যা করতে চাও কর। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন যদি এ শর্ত মেনে নিত, তবে তা আপনা থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যেত।

তাদের পক্ষ থেকে এই শর্তও আরোপ করা হয় যে, এই কোরআন বাদ দিয়ে তদস্থলে অন্য কোন কোরআন আনতে হবে অথবা তাতে এমন রদবদল করতে হবে, যাতে আমাদের দাবী দাওয়াও পূর্ণ হয়।

ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَٰذَا أَوْ

'এই কোরআন বাদ দিয়ে অন্য কোরআন নিয়ে এস, অথবা এতে রদবদল ঘটাও।' (সূরা ইউনুসঃ ১৫)

এর যে জবাব ওহীর ভাষায় রসূল সাঃ এর পক্ষ থেকে দেয়া হয়, তা হলোঃ 'আমি আমার নিজের খেয়াল খুশী মোতাবেক এ কোরআনকে বদলে ফেলবো, এ অধিকার আমার নেই। আমার কাছে যে ওহী আসে, তা ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরন আমি করতে পারিনা। আমি যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তাহলে আমাকে কেয়ামতের ভয়াবহ দিনের আযাব ভোগ করতে হতে পারে। যে ব্যক্তি নিজের মনগড়া কথাকে আল্লাহর বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তার চেয়ে বড় জালেম আর কে আছে?'

আপোষ মীমাংসার পথ বের করার জন্য ইসলামী আন্দোলনের বিরোধীদের পক্ষ থেকে এ দাবীও করা হয় যে, তুমি তোমার আশপাশ থেকে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকগুলোকে বের করে দাও। যারা কাল পর্যন্ত আমাদেরই গোলাম ছিল তাদেরকে যদি বের করে দাও, তাহলে আমরা তোমার কাছে এসে বসতে পারি, তোমার উপদেশ শুনতে পারি। নচেৎ বর্তমান অবস্থায় আমরা তোমার কাছে আসতে পারিনা এবং তোমার কথাবার্তা শুনতে পারিনা। নিম্ন স্তরের লোকেরা আমাদের পথ বন্ধ করে রেখেছে। অথচ তোমার ওখানে তারাই বড় বড় নেতা হয়ে জেঁকে বসে আছে। এই লোকদের সম্পর্কেই তারা বিদ্রূপ করে বলতো, এরাই নাকি রোম ও পারশ্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে ! মোশরেকদের মন যে ইসলামী আন্দোলনের খিদমতের জন্য অস্থির হয়ে গিয়েছিল, তা নয়। বরং তাদের উদ্দেশ্য এই ছিল যে, যে সব তাজা প্রাণ তরুণ সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডা তুলে পাগলের মত ছুটে বেড়াচ্ছিল, যারা নিজেদের যাবতীয় স্বার্থ কুরবানী করে সব রকমের বিপদ মুসিবত হাসিমুখে বরণ করে নিচ্ছিল এবং যাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস এই পবিত্র লক্ষ্য অর্জনের কাজে নিবেদিত ছিল, তাদের উৎসাহ যেন ভেঙ্গে যায় এবং ইসলামী আন্দোলন যেন তাদের একনিষ্ঠ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।

রসূল সাঃ এর মনে এই প্রতারণাপূর্ণ আপোষ প্রস্তাবের কোন প্রভাব পড়ার আগেই কোরআন তাকে সতর্ক করে দেয় যে, এটা ইসলামের শত্রুদের চিরচারিত একটা ধাপ্পাবাজী। পূর্ববর্তী সকল নবীর সাথেই এই ধাপ্পাবাজির আশ্রয় নেয়া হয়েছিল। সূরা হুদের ২৭নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত নূহ আঃ এর কাছেও অবিকল এই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সূরা আনআমের ৫২নং আয়াতে রসূল সাঃ কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তুমি ইসলামের শত্রুদেরকে খুশি করার জন্য সকাল বিকাল আল্লাহর নাম জপধারী একনিষ্ঠ সাথীদের নিজের সান্নিধ্য থেকে দুরে সরিয়ে দিও না। সূরা শুয়ারার ২১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে তোমার এইসব নিষ্ঠাবান অনুসারীদেরকে স্নেহের সাথে লালন করতে থাক। এমনকি সূরা আবাসের প্রথম দশ আয়াতে রসূল সাঃ কে শুধু এজন্য ভৎর্সনা করা হয়েছে যে, তিনি একজন প্রভাবশালী কাফেরের সাথে কথা বলার সময় নিজের একজন অন্ধ সাহাবীর প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করেছিলেন।

একবার কট্টরপন্থী কোরায়েশ নেতৃবৃন্দের বৈঠকে এ প্রসঙ্গে চিন্তাভাবনা হচ্ছিল। সে সময় অপরপ্রান্তে রসূল সাঃ একাকী বসে ছিলেন। উতবা ইবনে রবীয়া বৈঠকে উপস্থিত কোরায়েশ নেতৃবৃন্দকে বললো, 'তোমরা যদি সম্মতি দাও তবে আমি মুহাম্মাদের সাথে গিয়ে কথাবার্তা বলি। আমি তার কাছে কয়েকটা বিকল্প ফরমুলা তুলে ধরবো, যার মধ্যে থেকে কোন একটা হয়তো সে গ্রহণ করবে। আমরা সেটা মেনে নিলে সে হয়তো আমাদের সাথে আর দ্বন্দ্ব-সংঘাত করতে চাইবেনা।' এটা স্পষ্টতই একটা আপোষের উদ্যোগ ছিল। কোরায়েশদের এ পর্যন্ত আসা সম্ভবত হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণ এবং ইসলামী আন্দোলনের দ্রুত বিস্তৃতির কারণেই সম্ভব হয়েছিল। উপস্থিত সকলের সম্মতিক্রমে উতবা গিয়ে রসূল সাঃ এর সাথে নিম্নরূপ কথা বলেঃ

'হে ভাতিজা, আমরা তোমাকে কতখানি মর্যাদা দিয়ে থাকই, তা তো তুমি জানই। সমগ্র গোত্রের মধ্যে তুমি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। বংশগতভাবেও তুমি বিশিষ্টতার দাবীদার।' এভাবে কিছুক্ষণ তোষামোদিতে পরিপূর্ণ কিন্তু বাস্তব ভূমিকা দেওয়ার পর উতবা একটু অনুযোগের সুরে বলল, 'তুমি জাতিকে খুবই উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছ। তাদের ঐক্যকে খণ্ড বিখন্ড করে দিয়েছ। তাদের নেতৃবৃন্দকে বেকুব ও নির্বোধ বলে আখ্যায়িত করছ। তাদের ধর্মের ও তাদের দেবদেবীদের খুঁত ধরেছ। তাদের অতীত পূর্বপুরুষদের বিধর্মী আখ্যায়িত করেছ। এবার আমার কথা শোনো। আমি যে কয়টা প্রস্তাব দিচ্ছি, তা নিয়ে তুমি চিন্তাভাবনা কর। হয়তো তার কোন একটা তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। রসুল সাঃ বললেন, ঠিক আছে। আপনি বলুন। আমি শুনবো। উতবা নিম্নোক্ত বিকল্প প্রস্তাবগুলো একে একে তুলে ধরলোঃ

'তোমার উদ্দেশ্য যদি ধনসম্পদ অর্জন করা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা তোমার জন্য এত ধনসম্পদ সংগ্রহ করে দেব, যাতে তুমি আমাদের সবার চেয়ে ধনবান হয়ে যাবে।

আর যদি তুমি এর দ্বারা নেতৃত্ব ও ক্ষমতা পেতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা ও সরদার নিযুক্ত করতে প্রস্তুত আছি। আমরা কোন ব্যাপারেই তোমার মতামত না নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব না।

তুমি যদি দেশে রাজা হতে চাও, আমরা তোমাকে রাজা বানাতেও প্রস্তুত।

আর যদি এর কারণ এই হয়ে থাকে যে, তোমার উপর কোন জিন ইত্যাদির প্রভাব রয়েছে, এবং সেইসব অশিরীরী জীব তোমার উপর প্রবল হয়ে পড়েছে, তাহলে আমরা চাঁদা তুলে তোমার চিকিৎসার ব্যাবস্থা করবো। এরপর তুমি সুস্থ হয়ে উঠলে ভালো কথা, নচেৎ আমাদের অক্ষমতা প্রমাণিত হবে।'

এই আপোষমূলক প্রস্তাবগুলোতে বিভিন্ন ধরনের মনভাব ও ধ্যাণধারণার প্রতিফলন ঘটেছে। ইসলামী আন্দোলনের বিরোধীরা সাধারণত এসব ধ্যানধারনা পোষণ করতো। এই প্রস্তাবগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, তাদের দৃষ্টিতে দুটো সম্ভাবনাই ছিল। প্রথমত রসূল সাঃ হয়তো জাহেলী সমাজ ব্যাবস্থার সাথে এত বড় সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার উদ্যোগ সজ্ঞানে ও সচেতনভাবে নিচ্ছেন না, বরং কোন ভূত প্রেতের প্রভাবে কিংবা অচেতন অবস্থায় নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, যদি তিনি সজ্ঞানে ও সচেতন অবস্থায় এ সব উদ্যোগ নিয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই রাজত্ব বা ক্ষমতা লাভই তার উদ্দেশ্য। যাহোক সব ক'টা প্রস্রাব শোনার পর রসূল সাঃ বললেন, 'ওহে অলীদের বাবা, আপনার কথা শেষ হয়েছে?' সে বলল, হাঁ। রসূল সাঃ বললেন এবার আমার বক্তব্য শুনুন। উতবা বলল, 'আচ্ছা বল, শুনি।' রসূল সাঃ সবক'টা প্রস্তাব একদিকে রেখে সূরা হা-মীম সিজদার শুরু থেকে পরতে শুরু করলেনঃ

'হা-মীম। এ হচ্ছে পরম দয়ালু ও করুণাময়ের প্রেরিত বাণী। এ হচ্ছে একটা সুলিখিত গ্রন্থ, যার প্রতিটি আয়াত সুস্পষ্ট। এ হচ্ছে আরবী ভাষায় রচিত কোরআন – বুদ্ধিমান লোকদের জন্য। এ গ্রন্থ বিশ্বাসীদের সুসংবাদদাতা এবং অবিশ্বাসীদের দুঃসংবাদদাতা। কিন্তু ওদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তারা কর্ণপাত ই করেনা। তারা বলে যে, আমাদের মন এ সব তত্ত্বের বিরোধী, যার দিকে তুমি আমাদের ডাকছ। আর আমাদের কানে রয়েছে ভারী ঢাকনা এবং আমাদের ও তোমাদের মধ্যে রয়েছে একটা আড়াল। সুতরাং, তুমি নিজের কাজ করে যাও, আমরাও আমাদের কাজ করে যাব। (আয়াত ১-৫)

রসূল সাঃ যতক্ষণ শোনাতে লাগলেন, ততক্ষণ উতবা দুহাত পেছনে নিয়ে তার উপর হেলান দিয়ে নীরবে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলো। সিজদার আয়াত এলে তিনি পড়া বন্ধ করে সিজদা করলেন। তারপর বললেন, 'ওলীদের বাবা, শুনলেন তো? এখন যা ভালো বোঝেন করুন।'

এরপর উতবা উঠল এবং তার সঙ্গীদের কাছে চলে গেল। তারা উতবার চেহারা দেখেই বলল, উতবার চেহারা বদলে গেছে। যাওয়ার সময় ওর চেহারা যেমন ছিল, এখন তেমন নেই। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তারা জিজ্ঞাসা করলো, 'ব্যাপার কি?'

উতবা বললঃ

'ব্যাপার হলো, আমি এমন বানী শুনে এলাম, যা জীবনে আর কখন শুনিনি। আল্লাহর কসম, ওটা কবিতাও নয়, যাদুও নয়, জ্যোতিষীর কথাও নয়। হে কোরেশ জনমণ্ডলী, আমার কথা শোন। আমি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই বলছি, মুহাম্মদকে তার বর্তমান অবস্থায় ছেড়ে দাও এবং তার পেছনে লেগনা। আল্লাহর কসম, আমি যে বানী শুনেছি, তার দ্বারা নিশ্চয়ই বড় রকমের ফল ফলবে। আরবরা যদি মুহাম্মাদকে হত্যা করে, তবে অন্যদের দ্বারা তোমরা ওর কবল থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। আর যদি সে আরবের রাজা হয়ে যায়, তাহলে তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব এবং তার শক্তি তোমাদেরই শক্তি হবে। তখন তারই কল্যাণে তোমরা সবচেয়ে সৌভাগ্যশীল জাতিতে পরিণত হবে। (সীরাতে ইবানে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৩১৩-৩১৪)

উতবার এই বক্তব্য থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যায়। প্রথমত, সেকালের আরবের বড় বড় বাগ্মী ও কবি সাহিত্যিকগণ কোরআনের ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব ও চমৎকারিত্বের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হত। দ্বিতীয়ত যতক্ষণ বিরোধীরা ইসলামের মূল দাওয়াতকে সরাসরি দাওয়াতদাতার মুখ থেকে না শুনতো, ততক্ষণই তারা নানা রকম বিষাক্ত অপপ্রচারে প্রভাবিত হতো এবং বিরোধীতার উপর অবিচল থাকতো। কিন্তু যখনই কেউ আসল দাওয়াতের কিছু অংশ সরাসরিভাবে শোনার সুযোগ পেয়েছে, অমনি তার মন তাকে গ্রহণ করেছে। তৃতীয়ত ওহীর বাণী সম্পর্কে মোশরেক সমাজের প্রত্যেক মেধাবী মানুষের ধারনা এই ছিল যে, এই বাণীর ভিত্তিতে বড় কোন বিপ্লব সংগঠিত হবেই। তারা এর অন্তরালে একটা পূর্নাঙ্গ বিপ্লবের দৃশ্য দেখতে পেত এবং অনুমান করতো যে, এই কলেমার ভিত্তিতে একটা সাম্রাজ্য এবং একটা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবেই।

কিন্তু উতবার কথা শুনে কোরায়েশদের মজলিশে ঠাট্টাবিদ্রূপ শুরু হয়ে গেল এবং অনেকেই বলল, 'ওলীদের বাবা, মুহাম্মাদ তো আপনাকেও যাদু করে দিয়েছে দেখছি।' উতবা বলল, 'ওর সম্পর্কে আমার যা অভিমত, তাতো বললামই। এখন তোমরা যা ভালো মনে কর, কর।'

এর কিছুদিন পর এ ব্যাপারে আরও একটি চেষ্টা করা হলো। একদিন সূর্যাস্তের পর কোরায়েশদের সকল বড় বড় সরদার কাবা শরীফের চত্বরে জমায়েত হলো। উতবা ইবনে রবীয়া, শায়বা ইবনে রবীয়া, আবু সুফিয়ান বিন হারব, নযর বিন হারিস, কানদা, আবুল বুখতারী, আসওয়াদ বিন মুত্তালিব, যাময়া বিন আসওয়াদ, ওলীদ বিন মুগীরা, আবু জাহল বিন হিশাম, আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়া, আ'শ বিন ওয়ায়েন, নবীহ ও মুনাবিবহ বিন হুজ্জাজ, (বনুসাহম) এবং উমাইয়া বিন খালফ এরা সবাই এদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা রসূল সা. কে ডেকে পাঠালো। রসূল সা. একটা নতুন আশায় বুক বেধেঁ তাদের কাছে এলেন। কিন্তু তারা নতুন কিছু বললেন না। ইতিপূবে উতবা ইবনে রবীয়ার মাধ্যমে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি করলো। শুনে রসূল সা. নিম্নরূপ জবাব দিলেন‍ঃ ‘তোমরা যা বলছ, আমার ব্যাপারটা তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি যে দাওয়াত তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি, তার উদ্দেশ্য ধনসম্পদ অর্জন, নেতৃত্ব ও সরদারী লাভ কিংবা রাজত্ব কায়েম করা নয়। আমাকে তো আল্লাহ তোমাদের কাছে নবী ও রসূল করে পাঠিয়েছেন। তিনি আমার কাছে কিতাব নাযিল করেছেন এবং আমাকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা হবার আদেশ দিয়েছেন। সে অনুসারে আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর নিদের্শাবলী পৌছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদের হিতাকাংখীর দায়িত্ব পালন করেছি। আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি, তা যদি তোমরা গ্রহণ কর, ‍তাহলে সেটা তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। আর যদি প্রত্যাখ্যান কর, তাহলে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় ধৈর্যের পরিচয় দেব, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে নিজের ফয়সালা জারী করেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ 315)

এ জবাব শুনে তারা যখন দেখলো সামনে অগ্রসর হবার পথ পাওয়া যাচ্ছে না, তখন নানা রকমের কূটতর্ক শুরু করলো। উদাহরণ স্বরূপ, তারা বললো‍: তুমি তো জান, আমাদের দেশটা বড়ই সংকীণ। এখানে পানি খুব কম এবং জীবন যাপন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তুমি আল্লাহকে বল তিনি যেন ঐ পাহাড়গুলো সরিয়ে দেন, আমাদের ভূখন্ডকে প্রশস্ত করে দেন এর উপর ইরাক ও সিরিয়ার মত নদনদী সৃষ্টি করেন। তাঁকে বল, তিনি যেন আমাদের বাপদাদাদের জীবিত করে দেন, বিশেষত কুসাই বিন কিলাবকে যেন অবশ্যই জীবিত করেন। কেননা তিনি খুব সত্যবাদী ছিলেন এবং তাকে আমরা জিজ্ঞেস করবো তোমার দাওয়াত সত্য না মিথ্যা। এভাবে যদি আমাদের পূবপুরুষরা একে একে জীবিত হয়ে তোমার দাওয়াতকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেয় এবং আমরা যা যা দাবি করছি, তা তুমি করে দেখাও, তাহলে আমরা মেনে নিব যে, তুমি আল্লাহর রসূল। আর ‍যদি তা না কর, তাহলে ‍আমাদের উপর তুমি আযাবই নামিয়ে আনো’। রসূল সা. এইসব অসম্ভব দাবী-দাওয়ার জবাবে এই কথাই বারংবার বলেছেন যে, ’আমি এসবের জন্য প্রেরিত হইনি’। অবশেষে রসূল সা. যখন বাড়ীর দিকে ফিরে চললেন, তখন তাঁর ফুফাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইও তাঁর সাথে সাথে চললো। সে বললো তোমার গোত্রের লোকেরা তোমাকে কতকগুলো সুযোগ সুবিধা দিতে চাইল। কিন্তু তুমি তার একটি ও গ্রহণ করলেনা। এখন তো আল্লাহর কসম, আমি তোমার উপর আর ঈমান আনছিনে, এমনকি তোমাকে আকাশের উপর সিঁড়ি লাগিয়ে সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠিয়ে যেতে দেখলে ও নয়। আবার তোমাকে ‍যদি আকাশ থেকে নেমে আসতে স্বচোক্ষে দেখি এবং তোমার সাথে চার চারজন ফেরেশতা এসে ও যদি তোমার সত্যতার স্বপক্ষে স্বাক্ষ্য দেয়, তবুও নয়। আল্লাহর কসম, আমি যদি ঈমান আনিও, তবুও আমার আদৌ মনে হয়না যে, আমি সত্যিই তোমার সমথকে পরিণত হয়ে যাবো। (সীরাত ইবনে হিশাম)

এরপর রসূল সা. খুবই মর্মাহত হয়ে বাড়ী ফিরে এলেন।

এ ধরণের আরো একটি ঘটনা ঘটে তায়েফ সফরের পর। রসূল সা. এই সময় মক্কা থেকে বেরিয়ে পার্শ্ববতী বনুকান্দা, বনু হানিফা ও অন্যান্য গোত্রে দাওয়াত ও প্রচারের কাজ শুরু করেন। বনু আমের গোত্রে যখন দাওয়াত দিতে গেলেন, তখন ঐ গোত্রের সদার বুখায়রা বিন ফিরাসের সাথে দেখা করলেন। বুখায়রা রসূল সা. এর দাওয়াত শুনলেন। তারপর নিজের সমর্থকদের বললেন‍ঃ ’আল্লাহর কসম কোরায়শ গোত্রের এই যুবককে আমি যদি পেতাম, তাহলে আমি তার মাধ্যমে গোটা আরব জয় করে ফেলতাম।’ তারপর সে রসূল সা. কে জিজ্ঞেস করলো, আমরা যদি এই দাওয়াত গ্রহণ করি, এবং তুমি যদি তোমার বিরোধীদের উপর জয়যুক্ত হও, তাহলে তোমার পরে ইসলামের যাবতীয় কতৃত্ব কি আমার হাতে চলে আসবে?

ভেবে দেখার বিষয় হলো, প্রাথমিক সংক্ষিপ্ত ‍দাওয়াত পাওয়া মাত্রই ঐ ব্যক্তির মনে ধারণা জন্মে গিয়েছিল যে, এ দাওয়াত এক বিপ্লব সৃষ্টিকারী দাওয়াত। এর বিজয় হওয়ার সম্ভাবনা ও রয়েছে এবং বিজয়ী হলে তা তাদের স্বাথোদ্ধারেরও সহায়ক হবে। এ সব ধারণার কারণেই বুখায়রার মনে ব্যবসায়ী সুলভ মনোভাব ‍সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু রসুল সা. তো স্রেফ দাওয়াতদাতা ছিলেন। তিনিতো আর রাজনৈতিক ব্যবসা খুলে বসেননি। তাই তিনি জবাব দিলেনঃ

‘এটাতো আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আমার পরে তিনি যাকে চাইবেন নিযুক্ত করবেন।‘

বুখায়রা বললোঃ

’বেশ তো! আজ আমরা সমগ্র আরববাসীর সাথে লড়াই করবো। তারপর যেই তোমার স্বাথ উদ্ধার হয়ে যাবে, তখন অন্যেরা সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নেবে। তুমি যাও। আমাদের এ ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই।’ (রহমাতুল্লিল আলামীন, প্রথম খন্ড, পৃঃ-89)

রসূল সা. যদি কোন অরাজনৈতিক বক্তা হতেন অথবা সুফীবাদী বা পীরীমুরিদী কায়দায় সমাজের নৈতিক পরিশুদ্ধির কাজে আত্মনিয়োগ করতেন, তাহলে সিদেসাধাভাবে জবাব দিতেন যে, ’আরে মিয়া, তুমি এ সব কি স্বপ্ন দেখছ? এতো আল্লাহ ওয়ালাদের সংস্কারমূলক কাজ। এতে স্বাথ ও সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে? কিভাবেই বা কথা ওঠে স্থলাভিষিক্ত হবার বা নেতৃত্ব ও সরদারী লাভের? রসূল সা. নিজেও যেমন জানতেন তাঁর আন্দোলন কত সুদূর প্রসারী এবং তাঁর রাজনৈতিক সম্ভাবনাই বা কতখানি। তেমনি যার সাথে তিনি কথা বলতেন সেও টের পেয়ে যেত এ দাওয়াতের শেষ গন্তব্য কোথায়।

এই সব রকমারী আপোষ-প্রচেষ্টা থেকে বিরোধী শক্তি যে সুবিধাটা বাগাতে চেয়েছিল তা হলো, রসূল সা. যদি আন্দোলনে নিরাপদে অগ্রসর হওয়ার পথ বের করা বা নির্যাতন থেকে সংগীদের বাচাঁনোর জন্য আপোষ করতে রাজী হয়ে যান, তাহলে আদশবাদী আন্দোলন হিসেবে তাঁর দাওয়াতের শক্তি চূর্ণ হয়ে যাবে। আর যদি তিনি আপোষহীনতার পরিচয় দেন, তাহলে প্রচারণা চালানো যাবে যে, দেশবাসী দেখে নাও, আমরা দ্বন্দ্ব কলহ মেটানোর জন্য কত সুযোগ সুবিধা দিতে চাইলাম এবং কত উপায় বের করলাম, কিন্তু এই ব্যক্তি এমন হঠকারী যে, কোন সমাধানকেই সে গ্রহণ করলো না। বাস্তবিকই রসূল সা. এর অবস্থানটা ছিল খুবই স্পশকাতর। তাই কোরআন এই সব আপোষ ফর্মূলার মোকাবিলায়

রসূল সা. কে দৃঢ়তা প্রদর্শনের জন্য ক্রমাগত সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে থাকে। এমনকি এক জায়গায় তো অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিরোধীদের এই ধোকা থেকে আত্মরক্ষা করার নিদেশ দেয়া হয় এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংরক্ষণের আশ্বাসও দেয়া হয়।

সূরা বানী ঈসরাঈলের ৭৪ ও৭৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন‍ঃ

’আমি যদি তোমাকে দৃঢ়তা দান না করতাম, তাহলে বিচিত্র নয় যে, তুমি তাদের প্রতি খানিকটা নমনীয় হয়ে যেতে। তা যদি হতে, তাহলে আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখেরাতে দ্বিগুণ শাস্তির মজা ভোগ করিয়ে দিতাম। তখন তুমি আমার মোকাবেলায় কাউকে সাহায্যকারী পেতেনা। ‘

মোটকথা, অত্যধিক বিচক্ষণতা, কুশলতা ও ধৈয্য-সহিঞ্চুতা দ্বারা রসূল সা. আন্দোলনকে এসব সওদাবাজী থেকে রক্ষা করেছেন।

 

সহিংসতার চরম রূপ

ইসলামের শত্রুরা চিরকালই উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে অসৎ এবং যুক্তির দিক দিয়ে ‍অসার ও দেউলে হয়ে থাকে। তাদের আসল সমস্য হয়ে থাকে স্বার্থপরতা ও গদির নেশা। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে কেউ ময়দানে নামলেই তারা সর্বশক্তি নিয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং যুক্তি-প্রমাণের জবাব দেয় সহিংসতা সন্ত্রাস ও গুন্ডামী দিয়ে। ইসলামী আন্দোলন মানবীয় বিবেক বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির বলে কাজ করে। কিন্তু ইসলাম বিরোধীরা ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আবেগ উত্তেজনা দিয়ে এর গতি রোধে সচেষ্ট হয়। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরিবর্তনের জন্য কোন শক্তি যদি সামান্যতম তৎপরতাও চালায়, তবে তাকে সমাজ ব্যবস্থার ধারক ও বাহকদের হাতে মার খেতে হয়। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত যে সুদূরপ্রসারী ও সর্বাত্মক পরিবতনের আহবান জানায়, তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজের কর্ণধাররা এক ধরণের তীব্র উম্মত্ততায় ভোগে। মক্কায় এই অবস্থাটাই দেখা দিয়েছিল। যদিও প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনার সাথে সাথেই সহিংসতা ও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক্রমান্বয়ে জাহেলিয়াতের হিংস্রতা ও মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। পাচঁ ছয় বছরের মধ্যে মক্কা ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য একটা জ্বলন্ত চুলোয় পরিণত হলো। হযরত খাদীজা ও জনাব আবু তালেবেরে ইন্তেকালের পর এই চুলোর দহনশক্তি আরো তীব্র ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। কম হোক, বেশী হোক, এই চুলোয় দগ্ধ হওয়া থেকে কেউই রেহাই পায়নি। এই চুলোয় দগ্ধ হয়ে ও তপ্ত হয়ে ও গলে গলে তাঁরা খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। এই চুলোর আঁচের সবচেয়ে বড় অংশ আন্দোলনের নেতা যদিও মুহাম্মদ সা. নিজেই ভোগ করেন, কিন্তু তাঁর সহচররা ও কম ভোগ করেননি। সাহাবায়ে কেরামের উপর পরিচালিত এই ভয়ংকর নিযাতনের কথা ইতিহাস থেকে আমরা খুব কমই জানতে পারি। তথাপি ইতিহাস থেকে যেটুকু জানা যায়, তাও লোমহষক। এখানে আমি ইসলামের দুশমনদের পরিচালিত এই নিযাতনের কিছু সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিচ্ছি।

সরাসরি রসূল সা. এর ওপর তো প্রতি মুহুর্তেই রকমারি যুলুম চালানো হতো। কিন্তু তাঁর সহচরবৃন্দকে যে যন্ত্রণা দেয়া হতো, তাও পরোক্ষভাবে রসূল সা. এর সংবেদনশীল মনকে ও ফোঁড় ও ফোঁড় করে দিত। এবার লক্ষ্য করুন কার ওপর কেমন নিযাতন চলেছে।

খাব্বাব ইবনুল আরত তামীমীকে জাহেলিয়তের যুগে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। উম্মে নুমার নাম্নী এক মহিলা তাকে খরিদ করে নেয়। হযরত আরকামের বাড়ী যখন ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এবং সেখান থেকেই রসূল সা. সমস্ত সাংগঠনিক কাযক্রম পরিচালনা করতেন, তখনই হযরত খাব্বার ইসলাম গ্রহণ করেন। কোরায়েশরা জ্বলন্ত অঙ্গার বিছিয়ে তাকে সেই আগুনের বিছানায় শুইয়ে দিত। সংগে সংগে একজন মানুষ ও বুকের উপর দাড়িয়ে যেত, যাতে খাব্বার পাশ ফিরে শুতে না পারে। শেষ পযন্ত পিঠের নিচেই অংগারগুলো নিভে যেত। পরবতীকালে খাব্বার রা. হযরত ওমর রা. কে একবার নিজের পিঠ দেখালে তিনি কুষ্ঠের ন্যায় সাদা সাদা দাগ দেখতে পান। পেশায় তিনি একজন কামার ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি যখন বিভিন্ন লোকের কাছে নিজের পাওনা চান, তখন তারা জবাব দেয়, যতক্ষণ পযন্ত মুহাম্মদ সা. এর সাথে সম্পক ছিন্ন না করবে, ততক্ষণ এক পয়সা ও পাবে না। এভাবে তার উপর অথনৈতিক নিষ্পেষণ চালানো হচ্ছিল। কিন্তু এই সত্যের সৈনিক জবাব দিলেন, এটা আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়।

কৃষ্ণাংগ হযরত বিলাল ছিলেন উমাইয়া বিন খালাফের ক্রীতদাস। সূয ঠিক মাথার উপর এলে আরবের উত্তপ্ত মরুভূমির বালুর উপর তাকে শুইয়ে দেয়া হতো এবং বুকের উপর ভারী পাথর দিয়ে রাখা হতো, যাতে তিনি পাশ ফিরে শুতে না পারেন। উমাইয়া তাকে বলতো, ইসলাম থেকে ফিরে আস, নচেত এভাবেই খতম হয়ে যাবে। হযরত বিলাল রা. এর জবাবে চিৎকার করে শুধু ’আহাদ’ ’আহাদ’ (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক) বলতেন। এতে উমাইয়ার রাগ আরো বেড়ে যেত। সে তাঁর গলায় দড়ি বেঁধে শহরের উচ্ছৃংখল ছেলেদেরকে তার পেছনে লেলিয়ে দিত। তারা তাকে গলিতে গলিতে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতো। কিন্তু এই নিবেদিত প্রাণ আল্লাহ প্রেমিক সেই অবস্থায়ও উচ্চস্বরে ‘আহাদ আহাদ’ ঘোষণা করে যাচ্ছিলেন। কখনো তাকে গরুর চামড়ায় জড়িয়ে আবার কখনো লোহার বর্ম পরিয়ে প্রখর রৌদ্রে বসিয়ে দেয়া হতো। হযরত আবু বকর রা. অন্য একটা ক্রীতদাসের বিনিময়ে তাকে খরিদ করে মুক্ত করে দেন।

আম্মার বিন ইয়াসার ছিলেন কাহতান বংশোদ্ভুত। তাঁর পিতা ইয়াসার ইয়ামান থেকে নিজের দু‘ভাইকে সাথে নিয়ে হেজাজে এসেছিলেন তাদের অপর এক হারানো ভাইকে খুঁজতে। দু‘ভাই পরে ইয়ামানে ফিরে যান। কিন্তু ইয়াসার আবু হুযাইফা মাখযুমীর সাথে মৈত্রী স্থাপন পূবক মক্কায়ই থেকে যান এবং এখানেই বিয়ে করেন। ইয়াসার সহ তার পুরো পরিবার পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় আম্মার বিন ইয়াসারের কোন স্বপক্ষীয় না থাকায় তার ওপর ভীষণ অত্যাচার চালানো হতো। ইসলাম গ্রহেণের শাস্তি স্বরূপ তাকেও তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে দেয়া হতো। কোরায়েশরা তাকে মারতে মারতে বেহুঁশ করে ফেলতো। তার ‍পিতামাতার উপর ও একই রকম শারীরিক নিযাতন চালানো হতো। তাকে পানিতে ডুবানো হতো। জ্বলন্ত অংগারের ওপরও শোয়ানো হতো। রসূল সা. তাঁর মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দোয়া করতেন এবং বেহেশতের সুসংবাদ শোনাতেন। হযরত ‍আলীর রা. বণনা মোতাবেক রসূল সা. বলতেন, আম্মারের মাথা থেকে পা পযন্ত ঈমানে পরিপূণ। হযরত আম্মারের মা হযরত সুমাইয়া রা. কে ইসলাম গ্রহণের অপরাধে হত্যা করা হয়।

আবু জাহল স্বয়ং বর্শার আঘাতে অত্যন্ত পাশবিক পন্থায় তাকে হত্যা করে। ইসলামের এটাই প্রথম শাহাদাতের ঘটনা। হযরত আম্মারের বাবা হযরত ইয়াসার ও নির্যাতনের চোটে শহীদ হয়ে যান।

সুহায়েব ও আম্মারের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাকে এত নিমমভাবে প্রহার করা হতো যে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেন। হিজরতের সময় কোরায়শরা তার সমস্ত সহায় সম্বল তাদেরকে দিয়ে যেতে হবে এই শর্তে তাঁকে হিজরত করার অনুমতি দেয়। সুহায়েব রা. এই শর্ত সানন্দে মেনে নেন এবং খালি হাতে মদীনায় চলে যান।

আবু ফুকইহা সুহালী ছিলেন সাফওয়ান বিন উমাইয়ার ক্রীতদাস। তিনি ইসলাম গ্রহণে হযরত বিলালের সমসাময়িক ছিলেন। একবার তার বুকের উপর এত ভারী পাথর চাপা দেয়া হয় যে, তার জিভ বেরিয়ে পড়ে। কখনো তাকে লোহার বেড়ি পরিয়ে তপ্ত বালুর ওপর উপুড় করে শুইয়ে দেয়া হতো। হযরত আবু বকর রা. তাকে ও কিনে স্বাধীন করে দেন।

হযরত ওমরের রা. ইসলাম গ্রহণের পূবে তাঁর পরিবারে লুবাইনা নাম্নী এক দাসী ছিল। ওমর রা. তাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন। তারপর বলতেন, তোকে দয়া করে নয়, বরং ক্লান্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছি।

হযরত ওমরের পরিবারের আর এক দাসী ছিল যুনাইরা। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে তাকে ও হযরত ওমর রা. অত্যন্ত নিমমভাবে প্রহার করতেন। আবু জাহল একবার তাকে পেটাতে পেটাতে চোখ নষ্ট করে দেয়। তবে একটি বণনা থেকে জানা যায় যে, ঈমানের বরকতে আল্লাহ তায়ালা অচিরেই তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক তাকে ও কিনে স্বাধীন করে দেন।

নাহদিয়া ও উম্মে উবাইস নামক দুটো দাসী ও ইসলাম গ্রহণের কারণে কঠোর নির্যাতন সহ্য করে।

হযরত ওসমানের বয়সের দিক দিয়ে ও সম্মানাহ ছিলেন এবং প্রচুর ধনসম্পদ ও পদমযাদার অধিকারী ছিলেন। তবুও তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর আপন চাচা তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে মারে।

হযরত আবু যর ইসলাম গ্রহণ করা মাত্রই কা‘বা শরীফে এসে ঘোষণা দেন। সংগে সংগে কোরায়েশ সন্ত্রাসীরা তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মারতে মারতে ধরাশায়ী করে দেয়।

হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়ামকে তাঁর চাচা ইসলাম গ্রহণের শাস্তি স্বরূপ চাটাইতে জড়িয়ে নাকে ধূঁয়া দিতেন। কিন্তু তিনি পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে বলতেন, ’কোন অবস্থায়ই আমি কুফরির দিকে ফিরে আসবো না।’

আপন চাচাতো ভাই সাঈদ বিন যায়েদ ইসলাম গ্রহণ করলে হযরত ওমর রা. তাকে রশী দিয়ে বেঁধে রাখেন।

সাইদ বিন ওয়াক্কাসও অসহনীয় নির্যাতন ভোগ করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ইসলাম গ্রহণের পর সবপ্রথম কা’বা শরীফের চত্তরে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে কোরআন তেলাওয়াত করেন। সূরা রহমান তেলাওয়াত শুরু করতেই কাফেররা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখের ওপর উপর্যুপরি ঘুষি মারতে থাকে। কিন্তু তারপরও তিনি তেলাওয়াত অব্যাহত রাখেন এবং আহত মুখমণ্ডল নিয়ে বাড়ী ফিরে আসেন।

উসমান ইবনে মাযঊন প্রথমত ওলীদ বিন মুগীরার আশ্রয়ে থাকার কারণে নিরাপদে ছিলেন। কিন্তু রসূলের সা. সাহাবীদের ওপর ভয়ংকর যুলুম নির্যাতন হতে দেখে তিনি অনুভব করেন যে, আমার সাথীরা যখন এত নির্যাতন ভোগ করছে, তখন আমি একজন মোশরেকের আশ্রয়ে থেকে নিরাপদ জীবন যাপন করবো কেন? তিনি ওলীদ বিন মুগীরাকে বললেন, আমি আপনার আশ্রয় ফিরিয়ে দিচ্ছি। ওলীদ তাকে বুঝালো যে, ‘ভাতিজা, আমার আশংকা হয়, কেউ তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে।’ তিনি বললেন, ‘না, আমি তো আল্লাহর আশ্রয়ে থাকবো। তাঁর ছাড়া আর কারো আশ্রয় আমার পছন্দ নয়।’ কা’বা শরীফে গিয়ে তিনি ওলীদ বিন মুগীরার আশ্রয় ফেরত দেয়ার ঘোষণা দিলেন। তারপর কোরায়েশদের মজলিসে গিয়ে বসলেন। সেখানে কবি লবীদ স্বরচিত কবিতা পড়ছিল। সে যখন পড়লোঃ ‘‘আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুই বাতিল’’ তখন উসমান বললেন, তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু লবীদ যখন এর পরবর্তী চরণ পড়লো, ‘‘সমস্ত নিয়ামত ধ্বংসশীল’’ তখন উসমান বললেন, এ কথাটা তুমি ভুল বলেছ। বেহেশতের নিয়ামত কখনো ধ্বংস হবে না।’ লবীদের মাথায় খুন চড়ে গেল। সে চারদিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো, কে তার ভুল ধরার ধৃষ্টতা দেখালো। লবীদ বললো, ‘ওহে কোরায়েশ জনমন্ডলী, তোমাদের সহযোগী কবির সাথে এমন বেআদবী কে করলো? একজন বললোঃ ‘এ হচ্ছে ধর্মচ্যুত জনৈক বেকুফ। ওর কথা গায় মাখিও না।’ উসমান চুপ থাকতে পারলো না। তিনি তার কথার যুৎসই জবাব দিলেন। এতে ঐ লোকটি উঠে উসমানকে এমন জোরে থাপ্পড় দিল যে, তার চোখ নষ্ট হয়ে গেল।’ এ দৃশ্য দেখে ওলীদ বিন মুগিরা বললো, তুমি আমার আশ্রয়ে থাকলে আজ এভাবে চোখ খোয়াতে না। উসমান বললেন, আমার যে চোখটা অক্ষত আছে, তাও হারাতে রাযী আছি। আমি যার আশ্রয়ে আছি, তিনি তোমার চেয়েও প্রতাপশালী ও শক্তিশালী।

হযরত আবু যর গিফারী ইসলাম গ্রহণের পর বিপ্লবী প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে সরাসরি হারাম শরীফে উপনীত হলেন এবং সেখানে উচ্চস্বর নিজের নতুন আকীদা-বিশ্বাস ঘোষণা করলেন। কোরায়েশরা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো, এই ধর্মত্যাগীকে পেটাও। অমনি মারপিট শুরু হয়ে গেল। তাকে মেরে ফেলাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু রসূলের সা. চাচা আব্বাস ঘটনাক্রমে ওখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, আরে এ তো গিফার গোত্রের লোক। তোমাদের বাণিজ্যোপলক্ষে ওদের এলাকা দিয়েই যেতে হয়। একটু সাবধানে কাজ কর।’ অগত্যা কোরায়েশরা সংযত হলো। পরের দিন তিনি আবারো নিজের ইসলামী আকীদা বিশ্বাস ঘোষণা করলেন এবং আবারো গণপিটুনি খেলেন।

হযরত উম্মে শুরাইক ইসলাম গ্রহণ করলে তার আত্মীয় স্বজন তাকে প্রখর রোদে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এ সময় তাকে খাবার জন্য রুটির সাথে মধু দিত এবং পানি খেতে দিতনা, যাতে গরম বেশি অনুভূত হয় এবং দ্বিগুণ শাস্তি ভোগ করে। এ অবস্থায় এক নাগাড়ে তিন দিন কেটে গেল। চরম কষ্টের ভেতরে যখন তাকে বলা হলো, ইসলাম ত্যাগ কর, তখন তার বোধশক্তি অবশ হয়ে গিয়েছিল। তিনি বুঝতেই পারলেননা তাকে কি করতে বলা হচ্ছে। অবশেষে যুলুমবাজরা আকাশের দিকে ইংগিত দিয়ে বললো, আল্লাহর একত্ব অস্বীকার কর। এবার তিনি তাদের দাবী বুঝতে পেরে বললেন, আমি আমার আকীদা বিশ্বাসে অবিচল আছি এবং থাকবো।

খালেদ ইবনুল আ’স ইসলাম গ্রহণ করার পর তার বাবা তাকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়। উপরন্তু তাকে ক্ষুধার শাস্তিও দেয়া হয়।

মোটকথা, এমন কেউ ছিলনা যাকে কঠিন অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়নি। হযরত উসমানের ন্যায় হযরত আবু বকর ও তালহাকেও রশী দিয়ে বেধে রাখা হয়। ওলীদ ইবনে ওলীদ, আইয়াশ বিন আবি রবীয়া এবং সালমা বিন হিশামকে কঠোর নির্যাতন করা হয় এবং তাদেরকে হিজরত করতেও বাধা দেয়া হয়। হযরত ওমর নিজের বোন ও ভগ্নিপতির ওপর যে নির্যাতন চালান তাও ছিল অমানুষিক। এর বিস্তারিত বিররণ পরে দেয়া হবে।

একদিকে এই ভয়াবহ নির্যাতন আর অপরদিকে ইসলামী আন্দোলনের পতাকাবাহীদের দৃঢ়তা লক্ষ্য করুন। নারী-পুরুষ, দাস-দাসী, যে-ই একবার এই দাওয়াতকে গ্রহণ করেছেন, সে আর পিছু হটেনি। যুলুম-নির্যাতন কোন এক ব্যক্তিকেও ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি। আমরা দেখতে পাই, সার্থক অর্থে একটা বিপ্লবী প্রেরণা তাদের অস্থিমজ্জায় সঞ্চালিত হয়েছিল। তাদের অতুলনীয় ধৈর্য কোরায়েশদের নিপীড়নমূলক স্বৈরাচারকে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। ইসলামের আহ্বানে যে-ই একবার সাড়া দিত, তার ভেতরে সম্পূর্ণ নতুন একটা মানুষ জন্ম নিত এবং তার বুকে নতুন শক্তি সঞ্চারিত হতো।

 

আবিসিনিয়ায় হিজরত

প্রতিটি বিপদ মুসিবতেরই একটা সহ্য সীমা থাকে। ইসলামী আন্দোলনের নিশানবাহীরা কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছিল, এবং তাতে তারা ধৈর্যের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তা অবশ্যই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু যুলুম নির্যাতনের বিরতির কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিলনা। বরং ক্রমেই তা জোরদার হচ্ছিল। রসূল সা. তাঁর সংগীদের দুরবস্থা দেখে মর্মাহত হতেন। কিন্তু তাঁর কিছুই করার ক্ষমতা ছিলনা। তাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল আল্লাহর প্রতি আস্থা, আখেরাতে অবিচল ঈমান, সত্যের চূড়ান্ত বিজয়ের দৃঢ় আশা এবং আবেগভরা দোয়া। রসূল সা. তাঁর সাথীদের এই বলে প্রবোধ দিতেন যে, আল্লাহ কোন না কোন পথ অবশ্যই বের করবেন। বাহ্যত মক্কার পরিবেশ হতাশাব্যঞ্জক হয়ে উঠছিল এবং এমন কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না যে, ঐ অনুর্বর ভূমিতে ইসলামী আন্দোলনের পবিত্র বৃক্ষে কোন ফল জন্মাবে। পরিস্থিতি দেখে স্পষ্টতই মনে হচ্ছিল, মক্কায় ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনের সম্ভাবনা নেই, এ সৌভাগ্য হয়তো অন্য কোন ভূখন্ডের কপালে লেখা রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে আগেও হিজরাতের অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই অনুমিত হচ্ছিল যে, রসূল সা. ও তার সাহাবীদেরকেও হয়তো মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে হবে। একটা সর্বাত্মক মানব কল্যাণমূলক মতাদর্শের সূচনা যদিও একটা বিশেষ দেশ ও বিশেষ জাতির মধ্যেই হয়ে থাকে, কিন্তু তা জাতীয়তাবাদ বা আঞ্চলিকাতাবাদের সংকীর্ণতার উর্দ্ধে অবস্থান করে এবং তা কোন দেশ ও জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। কোন বিশেষ এলাকার মানুষ যদি অযোগ্য প্রমাণিত হয়, তবে তা অন্য কোন জনপদকে এই লক্ষ্যে মনোনীত করে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অনুমতি বা নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত দাওয়াতের কেন্দ্রীয় ভূমিকে পরিত্যাগ করা নবীদের নীতি নয়। তা সত্ত্বেও রসূল সা.যুলুম ও ধৈর্যের সংঘাতকে এমন এক পর্যায়ের দিকে ধাবমান হতে দেখছিলেন, যেখানে সহনশীলতার মানবীয় ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। মুসলমানগণ ব্যাকুল ভাবে অপেক্ষা করছিলেন আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে। এরূপ পরিস্থিতিতে তিনি সাহাবীদের পরামর্শ দিলেন, ‘‘তোমরা দুনিয়ার কোন দেশে চলে যাও। আল্লাহ অচিরেই তোমাদের কোথাও একত্রিত করবেন।’’ তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, কোন্ দেশে যাবো? রসূল সা. আবিসিনিয়ার দিকে ইংগিত করলেন। ঐ দেশটার রাজা অপেক্ষাকৃত ন্যায়পরায়ণ এবং হযরত ঈসার আ. আদর্শের অনুসারী বলে রসূল সা. জানতেন। তাঁর ধারণা ছিল যে, ঐ দেশটাই হিজরতের উপযোগী। তিনি আবিসিনিয়া সম্পর্কে বললেন, ‘ওটা সততা ও ন্যায়পরায়ণতার দেশ’। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

নবুয়তের পঞ্চম বছর রসূল সা. এর বিপ্লবী দলের এগারো জন পুরুষ ও চারজন মহিলার কাফেলা হযরত উসমান ইবনে আফফানের নেতৃত্বে রাতের অন্ধকারে আবিসিনিয়া অভিমুখে রওনা হলো। হযরত উসমানের তাঁর মহীয়সী স্ত্রী অর্থাৎ রসূল সা. এর কন্যা রুকাইয়াও হিজরতের এই প্রথম সফরে সংগিনী হন। রসূল সা. এই মহান দম্পতি সম্পর্কে মন্তব্য করেনঃ হযরত লুত ও হযরত ইবরাহীমের পর এটাই আল্লাহর পথে মাতৃভূমি ত্যাগকারী প্রথম দম্পতি। (আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, রহমাতুল্লিল আলামীন)

এই কাফেলার গৃহত্যাগের খবর যখন কোরায়েরশরা জানতে পারলো, তৎক্ষণাত তারা তাদের পিছু ধাওয়া করতে লোক পাঠালো। কিন্তু জেদ্দা বন্দরে পৌঁছে জানতে পারলো, তাৎক্ষণিকভাবে নৌকা পেয়ে যাওয়ায় তারা এখন নাগালের বাইরে। এই মোহাজেররা খুব অল্প দিন (রজব থেকে শাওয়াল পর্যন্ত) আবিসিনিয়ায় থাকেন। তারা একটা গুজব শুনতে পান যে, কোরায়েশরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু মক্কার কাছাকছি পৌঁছেই জানতে পারেন, ঐ গুজব ছিল ভুল। এবারে দেখা দিল কঠিন সমস্যা। কেউ লুকিয়ে এবং কেউ বিভিন্ন ব্যক্তির সহায়তায় শহরে প্রবেশ করলো। এভাবে ফিরে আসার অনিবার্য পরিণাম স্বরূপ আগের চেয়েও প্রবলভাবে নির্যাতন হতে লাগলো।

এরপর আরেকটা বড় কাফেলা আবিসিনিয়ায় হিজরত করলো। এ কাফেলায় ৮৫ জন পুরুষ ও ১৭ জন মহিলা ছিল। আবিসিনিয়ায় তারা নিরাপদ পরিবেশ পেলেন এবং নিশ্চিন্তে ইসলামী জীবন যাপন করতে লাগলেন।

এবার লক্ষ্য করুন, ইসলামের শত্রুদের আক্রোশ কত সুদূরপ্রসারী হয়ে থাকে। তারা একটা বৈঠকে মিলিত হয়ে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ আলোচনা চালালো। তারা স্থির করলো, আব্দুল্লাহ ইবনে রবীয়া ও আমর ইবনুল আ’সকে আবিসিনিয়ার রাজার কাছে দূত করে পাঠাবে। দূতদ্বয় রাজার সাথে আলোচনা করে মোহাজেরদের ফিরিয়ে আনবে। এ উদ্দেশ্যে নাজ্জাশী ও তার সভাসদদের জন্য মূল্যবান উপঢৌকন প্রস্তুত করা হলো এবং বিপুল জাঁকজমকের সাথে দূতত্বয় রওনা হলো। আবিসিনিয়া পৌঁছে তারা সভাসদ ও পাদ্রীদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো এবং তাদের ঘুষ দিল। তারা তাদেরকে বুঝালো যে, আমাদের দেশে কয়েকজন বেয়াড়া লোক একটা ধর্মীয় গোলযোগ সৃষ্টি করেছে। ওরা আমাদের পৈতৃক ধর্মের জন্য যতটা বিপজ্জনক, ঠিক ততটা বিপজ্জনক আপনাদের ধর্মের জন্যও। আমরা ওদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার পর ওরা আপনাদের এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ওদেরকে এখানে থাকতে দেয়া উচিত নয়। এ উদ্দেশ্যে আপনারা আমাদের সহযোগিতা কররুন। তারা চেষ্টা চালিয়েছিল যাতে দরবারে পুরো ঘটনা নিয়ে আলোচনাই না হতে পারে, মোহাজেররা আদৌ কথা বলারই সুযোগ না পায় এবং রাজা কোরায়েশ দূত দ্বয়ের একতরফা কথা শুনেই মোহাজেরদেরকে তাদের হাতে সমর্পণ করেন। এ উদ্দেশ্যে ঘুষ ও গোপন যোগসাজশের পথ অবলম্বন করা হয়। সভাসদদের নেপথ্যে বশীকরণের পর তারা উপঢৌকনাদি নিয়ে নাজ্জাশীর সামনে উপস্থিত হয়। তারা নিজেদের আগমণের উদ্দেশ্যে এভাবে ব্যাখ্যা করে, মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ আমাদেরকে আপনার দরবারে এই আবেদন পেশ করার জন্য পাঠিয়েছেন যে, আপনি আমাদের লোকগুলোকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। সভাসদ ও পাদ্রীরা তাদের আবেদনকে সংগে সংগেই সমর্থন করলো। কিন্তু নাজ্জাশী একতরফা দাবীর ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন, মোহাজেরদের বক্তব্য না শুনে আমি তাদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পন করতে পারি না।

পরদিন দরবারে উভয় পক্ষকে ডাকা হলো। মুসলমানদের কাছে যখন নাজ্জাশীর আহ্বান পৌঁছলো, তখন তারা পরামর্শে বসলেন। তারা আলোচনা করলেন, রাজা তো খৃষ্টান, আর আমরা আকীদা বিশ্বাসে ও রীতিনীতিতে তার সাথে ভিন্ন মত পোষণ করি। এমতাবস্থায় তার কাছে আমরা কি বলবো? আলাপ আলোচনার পর তাঁরা স্থির করলেন যে, রসূল সা. আমাদের যা যা শিখিয়েছেন, আমরা হুবহু তাই বলবো, তা থেকে চুল পরিমাণও ভিন্ন কিছু বলবো না। এতে পরিণাম যা হয় হোক। ভেবে দেখুন, তাঁদের ঈমান কত মজবুত ছিল। কঠিন অবস্থায়ও সত্য ও সততার ওপর অবিচল থাকাই আল্লাহর বিধান। এরপর যখন মোহাজেররা দরবারে পৌঁছলেন, তখন প্রচলিত রীতি অনুসারে নাজ্জাশীকে সিজদা করলেন না। সভাসদরা এতে আপত্তি তুলে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা সিজদা করলে না কেন? মোহাজেরদের মুখমাত্র হযরত জাফর জবাব দিলেন, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করিনা। এমনকি স্বয়ং রসূল সা. কেও আমরা সাদাসিদাভাবে শুধু সালামই করি। লক্ষ্য করুন যে, কী নাজুক পরিস্থতিতে প্রকৃত তাওহীদের এই দুঃসাহসিক অভিব্যক্তি ঘটানো হচ্ছিল। যে শক্তির সামনে প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রেখে চাতুর্যের আশ্রয় নিচ্ছিল, সেই শক্তির সামনেই তারা অকুতোভয়ে আদর্শবাদী একনিষ্ঠতার পরিচয় দিলেন।

এবার মক্কার দূতদ্বয় তাদের দাবী পেশ করলো যে, এই মোহাজেররা আমাদের দেশের পলাতক আসামী। তারা একটা নতুন ধর্ম উদ্ভাবন করেছে এবং তার ভিত্তিতে একটা সর্বনাশা তান্ডবের সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই ওদেরকে আমাদের হাতেই সোপর্দ করা হোক। নাজ্জাশী মুসলমানদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ব্যাপার কী? তোমরা কি খৃষ্টবাদ ও পৌত্তলিকতা ছাড়া তৃতীয় কোন ধর্মকে গ্রহণ করেছ?

মুসলমানদের মুখপাত্র হিসাবে হযরত জাফর উঠে দাঁড়ালেন এবং নাজ্জাশীর কাছে এই মর্মে আবেদন জানালেন যে, তিনি প্রথমে মক্কার দূতদ্বয়ের কাছে কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চান। তাকে এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করার অনুমতি দেয়া হোক। নাজ্জাশীর অনুমতি লাভের পর তিনি নিম্নরূপ জিজ্ঞাসাবাদ করলেনঃ

হযরত জা’ফরঃ আমরা কি মক্কায় কারো ক্রীতদাস ছিলাম যে, আমরা আমাদের মনিবের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে তো আমাদের অবশ্যই ফেরত পাঠানো উচিত।

আমর ইবনুল আসঃ না, তোমরা ক্রীতদান নও, স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত।

হযরত জা’ফরঃ আমরা কি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে এসেছি? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী বা অভিভাবকদের কাছে ফেরত পাঠানো উচিত।

আমর ইবনুল আ’সঃ না, তোমরা এক ফোঁটা রক্তও প্রবাহিত করনি।

হযরত জা’ফরঃ আমরা কি কারো ধনসম্পদ চুরি করে এসেছি? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেই পাওনা পরিশোধ করতে প্রস্তুত।

আমর ইবনুল আ’সঃ না তোমাদের কাছে কারো এক পয়সাও পাওনা নেই।

এই জেরার মাধ্যমে যখন মুসলমানদের নৈতিক অবস্থা ও মান সুস্পষ্ট হয়ে গেল, তখন হযরত জা’ফর নিম্নরূপ ভাষণ দিলেনঃ

‘‘হে রাজা, আমরা একটা মূর্খ ও অজ্ঞ জাতি ছিলাম। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মরা জন্তুর গোশত খেতাম, ব্যভিচার করতাম, প্রতিবেশিকে কষ্ট দিতাম, ভাইয়ে ভাইয়ে যুলুম অত্যাচার করতাম, এবং আমাদের সবলেরা দুর্বলদের শোষণ ও নিপীড়ন করতো। এমতাবস্থায় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি জন্ম নিল যার সততা ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা ও ভদ্রতা সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আমাদেরকে পাথর পূজা পরিত্যাগ করা, সত্য কথা বলা, রক্তপাত বন্ধ করা, এতীমদের সম্পদ আত্মসাত না করা, প্রতিবেশীর সেবা ও উপকার করা, সতী নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা না করা, নামায পড়া, রোযা রাখা ও দানসদকা করার শিক্ষা দিলেন। আমরা তাঁর ওপর ঈমান আনলাম, পৌত্তলিকতা ছেড়ে দিলাম, এবং সমস্ত খারাপ কাজ বর্জন করলাম। এই অপরাধে আমাদের গোটা জাতি আমাদের শত্রু হয়ে গেল। তারা আমাদেরকে আগের সেই গোমরাহীতে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করে। এই পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের ঈমান ও জান বাঁচানোর জন্য আপনার রাজ্যে পালিয়ে এসেছি। আমাদের জাতি যদি আমাদেরকে মাতৃভূমিতে থাকতে দিত, তাহলে আমরা আসতাম না। এই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত অবস্থা।’’

কথা যদি সত্য হয় এবং বক্তা যদি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা সহকারে তা বলে, তবে শ্রোতার মনে তা প্রভাব বিস্তার না করে পারে না। নাজ্জাশীর মত খোদাভীরু রাজার মন গলে গেল। তিনি বললেন, তোমাদের ওপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে, তার কিছু অংশ আমাকে শোনাও তো দেখি। হযরত জা’ফর সূরা মরিয়মের প্রথম থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনালেন। আল্লাহর এই আয়াতগুলো শুনে রাজার মন আরো নরম হলো এবং তাঁর চোখে পানি এসে গেলো। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর কসম, এই বাণী এবং ইনজিল একই উৎস থেকে এসেছে।” তিনি আরো বললেন “মুহাম্মাদ (সাঃ) তো সেই রসূলই, যার ভবিষ্যদ্বাণী হযরত ঈসা (আঃ) করেছিলেন। আল্লাহর শোকর যে, আমি সেই রসূল (সাঃ) এর যুগটা পেয়ে গেলাম।” সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই রায়ও দিলেন যে, মোহাজেরদের ফেরত দেয়া সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত দরবারের কার্যক্রম শেষ হলো এবং দূতদ্বয় ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। পরে তারা উভয়ে স্থির করলো যে, আর একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। নাজ্জাশী একজন খৃষ্টান। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদা বিশ্বাস দরবারে তুলে ধরলে বিচিত্র নয় যে, রাজার মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষের আগুন জ্বলে উঠবে।

পরদিন আমর ইবনুল আ’স পুনরায় দরবারে হাজির হলো। নাজ্জাশীকে উস্কে দেয়ার জন্য এই অপবাদ আরোপ করলো যে, এই মোহাজেররা হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে খুবই খারাপ ধারনা পোষণ করে। নাজ্জাশী পুনরায় মুসলমানদের ডাকলেন। তারা যখন পরিস্থিতি জানলেন তখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) “আল্লাহর পুত্র”- এই কথা অস্বীকার করলে নাজ্জাশীর কি প্রতিক্রিয়া হয় কে জানে?

কিন্তু ঈমানদারদের দৃঢ়তা এবারও তাদেরকে নির্দেশ দিলো, যা সত্য তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দাও। হযরত জা’ফর তাঁর ভাষনে বললেনঃ

“আমাদের নবী বলেছেনঃ হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর দাস, আল্লাহর নিদর্শন ও আল্লাহর রসূল”।

একথা শুনে নাজ্জাশী মাটি থেকে একটা ঘাসের টুকরো হাতে নিয়ে বললেন, ‘তুমি যা বলেছ, হযরত ঈসা (আ:) তা থেকে এই ঘাসের টুকরো পরিমাণও বেশি কিছু নন’। ষড়যন্ত্রের শিকার এবং ঘুষ ও উপঢৌকন দ্বারা বশীভূত পাদ্রীরা মনে মনে অনেক ছটফট করলো। এক পর্যায়ে তাদের নাক দিয়ে অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু নাজ্জাশী তার কোন তোয়াক্কা করলেন না। পরিষ্কার নির্দেশ দিলেন যে, সব উপঢৌকন ফেরত দেয়া হোক। মক্কার প্রতিনিধিদ্বয় একেবারেই ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলো।

 

হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহন

সহিংসতার এই অধ্যায়ের একটি কাহিনী সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল, হযরত ওমরের ক্রোধোন্মত্ততার কাহিনী। রসূল (সাঃ) যখন নবুয়ত লাভ করেন, তখন হযরত ওমরের (রা) বয়স ছিল সাতাশ বছর। ইসলাম খুবই দ্রুত গতিতে তাঁর পরিবারে ছড়িয়ে পরে। তাঁর ভগ্নিপতি সাঈদ প্রথমেই ইসলাম গ্রহন করেন। তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর বোন ফাতেমাও মুসলমান হয়ে যান। ওমর (রা) এর পরিবারে আরো এক প্রভাবশালি ব্যক্তি নঈম বিন আবদুল্লাহও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। প্রথম প্রথম তিনি জানতেই পারেননি যে, তাঁর পরিবারে এইভাবে ইসলামের বিস্তার ঘটছে। যখনই জানতে পারলেন, ক্রোধে অধীর এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। তাঁর পরিবারের এক দাসী লুবাইনাকে ইসলাম গ্রহন করার কারনে তিনি পেটাতে পেটাতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন। বিশ্রাম নিয়ে নতুন উদ্যোগে আবার পেটাতেন।

শেষ পর্যন্ত একদিন সবচেয়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্তটাই নিয়ে ফেললেন। সেটি হলো, এই আন্দোলনের মূল আহ্বায়ককেই খতম করে ফেলতে হবে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই সময় আবু জাহল রসুল (সাঃ) কে যে হত্যা করতে পারবে তাকে দু’শো উট পুরষ্কার দেয়ার কথা ঘোষনা করে রেখেছিল এবং সেই পুরষ্কার পাওয়াই ছিল এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু হযরত ওমরের (রা) মেজাজের সাথে এই ধরনের লোভের শিকার হওয়াটা বেমানান। মনে হয়, তিনি এ কাজটাকে একটা পৈত্রিক ধর্মের সেবা মনে করেই করতে চেয়েছিলেন। যাই হোক, তিনি তলোয়ার নিয়ে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে নঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে সাক্ষাত হওয়ায় বাধা পেলেন। নঈম বললেন, ‘আগে নিজের বোন ভগ্নিপতির খোঁজ নাও, তারপর আর যেখানে যেতে চাও যেও।’ ওমর রাঃ তৎক্ষণাৎ ফিরলেন এবং বোনের বাড়ী অভিমুখে চললেন। সেখানে যখন পৌঁছলেন, তখন বোন ফাতেমা কোরআন পড়ছিলেন। পায়ের শব্দ কানে আসা মাত্রই চুপ করে গেলেন এবং কোরআনের পাতা গুলো লুকিয়ে ফেললেন। হযরত ওমর (রাঃ) ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি পড়ছিলে? বোন নিরুত্তর রইলেন। ওমর (রাঃ) বললেন আমি জেনে ফেলেছি, তোমরা উভয়ই ধর্মত্যাগী হয়েছ। তবে দেখাচ্ছি মজা। এই বলে ভগ্নিপতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বোন স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাকেও পিটালেন। বোনের দেহ রক্তাক্ত হয়ে গেল। কিন্তু অশ্রুভরা চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দৃপ্ত কন্ঠে ফাতেমা বললেন,

‘ওমর! যা ইচ্ছে করতে পার। কিন্তু আমাদের পক্ষে ইসলাম ত্যাগ করা সম্ভব নয়।’

ক্ষতবিক্ষত দেহ, রক্তাক্ত পোশাক পরিচ্ছদ, চোখ ভরা অশ্রু ও আবেগভরা মন নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। শুধু নারী নয়-সহোদরা বোন। আর তার মুখে এমন তেজোদীপ্ত কথা! ভেবে দেখুন, অবলা নারীর মধ্যেও ইসলাম কেমন নতুন প্রেরনা সঞ্চারিত করেছিল। এহেন মর্মস্পর্শী দৃশ্যের সামনে ওমরের দুর্ধর্ষ শক্তিও হার মানলো। তার ইস্পাত কঠিন সংকল্পের বজ্র আঁটুনি মাঝপথেই ফস্কা গিরোয় পরিনত হলো। বললেন, ‘আচ্ছা তোমরা যা পড়ছিলে, আমাকে একটু শোনাও তো।’ ফাতেমা গিয়ে কোরআনের লুকিয়ে রাখা পাতাগুলো নিয়ে এলেন। পড়তে পড়তে যখন এ কথাটা সামনে এলো, “************” অমনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন ‘আশহাদু আল-লাইলাহা ইলাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।’ ঈমান আনার পর ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্র হযরত আরকামের বাড়ী অভিমুখে রওনা হলেন। সেখানে গিয়ে রসূল সাঃ এর হাতে বায়য়াত করলেন। এই ঘটনায় সেখানে উপস্থিত মুসলমানগণ আনন্দের আতিশয্যে এমন জোরে “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিলেন যে, মক্কার গোটা পরিবেশ গুঞ্জরিত হয়ে উঠলো। ইসলামী আন্দোলনের পতাকাবাহীরা সেখান থেকে বেরুলেন এবং সমগ্র মক্কা নগরীতে ছড়িয়ে পড়লেন। তারা অনুভব করলেন যে তাদের শক্তি বেড়ে গেছে। হযরত ওমরের (রাঃ) ঈমান আনার অব্যবহিত পর থেকেই কাবা শরীফে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে জামায়াতে নামাজ পড়া শুরু হলো।

হযরত ওমর (রাঃ) মক্কার যুবকদের মধ্যে স্বীয় মেধা ও আবেগ উদ্দীপনার জন্য বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর আচার ব্যবহার ছিল আন্তরিকতা ও নিষ্ঠায় পরিপূর্ণ। জাহেলিয়াতের যুগে তিনি ইসলামের সাথে যে শত্রুতা পোষণ করতেন, তাও কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা তাড়িত হয়ে নয় বরং ওটাকে ন্যায়সঙ্গত মনে করে আন্তরিকতার সাথেই করতেন। তারপর যখন প্রকৃত সত্য তাঁর কাছে উদঘাটিত হলো এবং বিবেকের উপর থেকে পর্দা সরে গেলো, তখন পূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে ইসলামের পতাকা উঁচু করে তুলে ধরলেন। বিরোধিতা করার সময় তার ধরন যদিও অতিমাত্রায় উগ্র ও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, কিন্তু তাঁর প্রখর মেধা ও নির্মল বিবেক সবসময়ই একটু একটু করে সত্যের আলো গ্রহন করেছে। মক্কার পরিবেশে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনা তাঁর অন্তরাত্মাকে প্রভাবিত, আলোড়িত ও ইসলাম গ্রহনের জন্য প্রস্তুত করতে থাকে। একদিকে ইসলামের দাওয়াতের খবরাখবর প্রতিনিয়ত তাঁর কর্ণগোচর হতে থাকে। অপরদিকে এর বিরোধীদের হীন ও কদর্য মানসিকতাও তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। তারপর একদিকে তিনি রসূল (সাঃ) ও তাঁর সাথীদের নির্মল ও সৎ চরিত্র এবং অন্যদিকে ইসলাম বিরোধীদের চরিত্রের কলুষিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকগুলো প্রত্যক্ষ করতে থাকেন। প্রতিনিয়ত এই তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ মক্কার সচেতন ও জাগ্রত বিবেকের অধিকারী এই যুবককে ক্রমাগত প্রভাবিত ও আলোড়িত করতে থাকে। তবে পরিস্থিতির এই দুটো পরস্পর বিরোধী সাধারন দৃশ্য ছাড়াও কয়েকটা বিশেষ ঘটনাও তাঁর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

উদাহরন স্বরূপ, উম্মে আবদুল্লাহ বিনতে আবি হাশমা আবিসিনিয়ায় হিজরত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসময় একদিন হযরত ওমর তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘উম্মে আবদুল্লাহ, মনে হচ্ছে মক্কা ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন’। উম্মে আবদুল্লাহ বললেন, ‘হা, তাই যাচ্ছি। তোমরা আমাদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছ এবং আমাদের উপর অনেক নির্যাতন চালিয়েছ। এখন আল্লাহ আমাদেরকে বাঁচার জন্য একটা পথ খুলে দিয়েছেন’। ওমর বললেনঃ ‘আল্লাহ আপনাদের সাথী হোন।’ উম্মে আবদুল্লাহ বলেন, ঐ সময় ওমর কে যেরূপ দুঃখভারাক্রান্ত দেখাচ্ছিল, তেমন আমি আর কখনো দেখিনি। আমাদের দেশান্তরী হওয়ার প্রস্তুতি দেখে তিনি গভীর মর্মবেদনা অনুভব করেন। উম্মে আবদুল্লাহ তাঁর স্বামী আমের বিন রবীয়াকে যখন ওমরের এই মর্মবেদনার কথা জানালেন, তখন আমের জিজ্ঞেস করলেন, ওমরের এই ভাবান্তর দেখে কি তুমি তাঁর ইসলাম গ্রহনের আশা পোষণ করছ? উম্মে আবদুল্লাহ বললেন, হাঁ। আমের বললেন, তুমি যাকে দেখেছ, সে যখন ইসলাম গ্রহন করবে, তখন খাত্তাবের গাধাও ইসলাম গ্রহন করবে (খাত্তাব হযরত ওমরের পিতার নাম)। উম্মে আব্দুল্লাহ বলেন, ইসলামের ব্যাপারে ওমরের নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার কারনে এ ধরনের হতাশা জন্মে গিয়েছিল। (সিরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড)

কিন্তু এই ঘটনা যে হযরত ওমরের বিবেকে এক জোরালো কষাঘাত হেনে থাকবেনা, তা কে বলতে পারে? অনুরূপভাবে অন্য একটা বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রসূল (সাঃ) এর কোরআন পাঠ শুনে তাঁর মন প্রভাবিত হয়েছিল। এ সম্পর্কে তাঁর নিজের বক্তব্য নিম্নরুপঃ

‘আমি ইসলাম থেকে অনেক দূরে ছিলাম। জাহেলিয়াতের যুগে মদে আসক্ত ছিলাম এবং খুব বেশী পরিমাণে মদ খেতাম। হাযওয়ারাতে [তৎকালে এটা মক্কার একটা বাজার ছিল। বর্তমানে এই যমিনটুকু মসজিদুল হারেমের অন্তর্ভুক্ত] আমাদের মদের আসর বসতো এবং সেখানে কুরায়শী বন্ধুরা জমায়েত হতো। এক রাতে আমি নিজের সতীর্থদের আকর্ষনে ঐ আসরে উপস্থিত হই। সতীর্থদের সেখানে অনেক খোঁজাখুঁজি করি। কিন্তু কাউকে পাইনি। পরে এক মদ বিক্রেতার কথা মনে পড়লো এবং ভাবলাম ওখানে গিয়ে মদ খাবো। কিন্তু তাকেও পেলাম না। তারপর ভাবলাম কা’বা শরীফে চলে যাই এবং ওখানে ষাট সত্তর বার তাওয়াফ করে নেই। সেখানে গিয়ে দেখলাম, রসূল সাঃ নামায পড়ছেন। তিনি রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মাঝখানে (বাইতুল মাকদাস অভিমূখে) দাঁড়িয়েছিলেন। সহসা মনে ইচ্ছা জাগলো, এই লোকটা কি পড়ে আজ একটু শোনাই যাকনা। কা’বার গেলাফের ভেতরে ঢুকে আস্তে আস্তে একেবারে কাছে গিয়ে শুনতে লাগলাম। আমার ও রসূল (সাঃ) এর মাঝে কেবল কা’বার গিলাফ ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। আমি যখন কোরআন শুনলাম, তখন আমার মনটা গলে গেলো। চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। ঠিক সেই মূহুর্তেই আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করলো। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, ৩৬৮-৩৬৯ পৃ]

এই বর্ননার অবশিষ্টাংশে বলা হয়েছে, ওমর রাঃ তখনই রসূল (সাঃ) এর সাথে চলে যান এবং ইসলাম গ্রহন করেন। তবে প্রকৃত পক্ষে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে পূর্বোক্ত বর্ণনাই সঠিক। তাঁর বোনের ঈমান, ধৈর্য ও দৃঢ়তা দেখেই তাঁর মনমগজ ইসলাম গ্রহণের দিকে চূড়ান্তভাবে ধাবিত হয়। ওমরের (রাঃ) নিজের বর্ননার এই অংশটা খুবই গুরুত্ববহ যে তিনি রসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে কোরআন শ্রবণ করতে গিয়েছেন। এবং নিজ কানে শোনা কোরআনের আয়াত তাঁর অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করেছে। এক নাগাড়ে বছরের পর বছর ধরে চলা থাকা দ্বন্দ্ব সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এরূপ ঘটনা ঘটা খুবই স্বাভাবিক। ওমরের মত ব্যক্তিত্ব ইসলামের দাওয়াত নিজ কানে না শুনে সিদ্ধান্ত নেবেন এটা হয়ইবা কেমন করে?

কোরআনের বিরোধিতায় লিপ্ত আর অনেকে, এমনকি বড় বড় নেতারাও পর্যন্ত কৌতুহলের বশে গোপনে ছুটে আসতো আকাশ থেকে নেমে আসা এই সুমধুর তান শুনতে। অথচ প্রকাশ্য মজলিসে তারাই আবার বলতো, ‘আমাদের কান বধির’। একবার গভীর রাতে রসূল সাঃ যখন নিজ ঘরে বসে কোরআন পড়ছিলেন, তখন আবু সুফিয়ান, আবু জাহল ও অখনাস বিন শুরাইক লুকিয়ে লুকিয়ে রসূল সাঃ এর ঘরের আশে পাশে সমবেত হয়ে শুনছিল। পরে বাড়ী ফেরার সময় ঘটনাক্রমে তারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। তখন একে অপরকে এই বলে ভর্ৎসনা করতে থাকে যে, এ রকম করা উচিৎ নয়। নচেত স্বল্পবুদ্ধির সাধারণ লোকেরা যদি দেখে ফেলে, তাহলে তাদের মনে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ কথা বলে তারা চলে গেল। পরেরদিন তারা আবারো আসলো এবং আবারো আগের মতন ভর্ৎসনা ও উপদেশ বিনিময় হলো। তৃতীয় রাতে আবারো এই ঘটনা ঘটলো এবং শেষ পর্যন্ত খুবই জোরদার প্রতিজ্ঞা করা হলো যে, ভবিষ্যতে এমন কাজ আর কিছুতেই হবেনা। তবে প্রাসঙ্গিক ভাবে পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ হলো যে, মুহাম্মাদ সাঃ এর কাছ থেকে শোনা বাণী সম্পর্কে কার কি মত? প্রত্যেকেই কিছু না কিছু বললো। সবার শেষে আবু জাহল উত্তেজিত কন্ঠে বললো, বনু আবদ মানাফের সাথে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময়ই ছিল। তারা আতিথেয়তা করলে আমরাও করতাম, তারা রক্তপণ দিলে আমরাও দিতাম, তারা দানশীলতা করলে আমরাও করতাম। এভাবে আমরা তাদের সমকক্ষ হয়ে গিয়েছিলাম। কোন ব্যাপারেই পেছনে পড়িনি। হঠাৎ এখন তারা বলতে আরম্ভ করেছে যে, তাদের গোত্রে নবী এসেছে। এটা আমরা কেমন করে মেনে নেই? এই ক্ষেত্রে তো আমরা তাদের সমকক্ষতা দাবি করতে পারছিনা। কাজেই আল্লাহর কসম, আমরা তাঁর উপর ঈমানও আনতে পারিনা, তাঁকে সমর্থনও করতে পারিনা। [সীরাত ইবনে হিশাম,প্রথম খন্ড পৃ-৩৩৭-৩৩৮]

ঐ সময় ইসলাম সম্পর্কে সর্ব সাধারণের মনে ব্যাপক কৌতুহল ও অনুসন্ধিৎসা জেগেছিল এবং যা হযরত ওমরকেও কখনো কখনো রসূল সাঃ এর কাছে নিজ কানে আল্লাহর বাণী শোনার জন্য টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তা অনুধাবন করার জন্যই এই ঘটনাটা প্রাসঙ্গিক ভাবে উল্লেখ করলাম।

 

আর এক ধাপ অগ্রগতি

মোটকথা, হযরত ওমরের রাঃ ইসলাম গ্রহণ ছিল একটা বিরাট ঘটনা। এ ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কার্যকারণ সক্রিয় ছিল। এ ঘটনার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার আরো একটা কারন হলো, ইসলাম বিরোধী একতরফা সহিংসতা যখন চরম আকার ধারন করেছে, ঠিক তখনই এই সত্যসন্ধানি মানুষটি এগিয়ে আসেন। বিরোধী শক্তি জনগণকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্যই নির্যাতন চালাচ্ছিল। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এই নির্যাতন জনগনের মনকে গলিয়ে দিচ্ছিল এবং নির্যাতনের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল। ইসলাম যে সত্য তার একটা অন্যতম অকাট্য প্রমান এটাই যে, সহিংস ও আগ্রাসী প্রতিরোধ যতই বেড়েছে, ততই উৎকৃষ্টতম মনমগজের অধিকারী লোকেরা ইসলামে দীক্ষিত হতে থেকেছে। আবিসিনিয়ায় হিজরতের পরের সময়টায় মক্কার মূল্যবান রত্নগুলো ইসলামে জড়ো হতে থাকে।

একদিকে ওমরের রাঃ মত ব্যক্তিত্ব ইসলাম গ্রহন করবে, আর নতুন কোন আলোড়ন সৃষ্টি হবে না, এটাই বা কেমন করে সম্ভব? তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে, একবার গোটা সমাজকে চ্যালেঞ্জ করবেনই। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তখনও বালক মাত্র। তিনি বলেন, ‘আমার পিতা ওমর রাঃ ঈমান আনার পর খোঁজ নিলেন যে কোরায়েশ গোত্রের কোন ব্যক্তি কথা ছড়াবার উস্তাদ? তিনি জামীল বিন মুয়াম্মার জামহী নামক এক ব্যক্তির সন্ধান পেলেন। তিনি খুব ভোরে তার কাছে চলে গেলেন। ওখানে গিয়ে তিনি কি করেন তা দেখার জন্য আমিও তাঁর সাথে গেলাম। তিনি যেয়ে তাকে বললেন, ‘ওহে জামিল, তুমি কি জান, আমি ইসলাম গ্রহন করেছি এবং মুহাম্মাদ সাঃ এর দলে অন্তর্ভূক্ত হয়ে গিয়েছি’? জামীল একটি কথাও না বলে নিজের চাদরটা ঘাড়ে করে সোজা মসজিদুল হারামের দরজায় দিয়ে পৌছালো। তারপর গগনবিদারী কন্ঠে ঘোষণা করতে শুরু করলো যেঃ 'ওহে কোরায়েশ জনতা শোনো। খাত্তাবের ছেলে ওমর রাঃ সাবী (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছে।’ হযরত ওমরও তার পিছু পিছু এসে পৌঁছলেন এবং চিৎকার করে বললেনঃ 'জামীল ভুল বলছে। আমি সাবী নয়, মুসলমান হয়েছি। আমি ঘোষণা করেছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মা'বুদ নেই, এবং মুহাম্মাদ সা. তার বান্দা ও রসূল।' কোরায়েশরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। এমনকি নিজের বাবার সাথেও তিনি তুমুল লড়াই করলেন। ধস্তাধস্তি করতে করতে সূর্য মাথার ওপর চলে আসলো। এই সময় জনৈক প্রবীণ কোরায়েশ নেতা হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, ব্যাপার কি? অতঃপর পুরো ঘটনা শুনে সে বললো, এই ব্যক্তি নিজের জন্য একটা মত ও পথ বাছাই করে নিয়েছে। এখন তোমরা কী করতে চাও! ভেবে দেখ, বনু আদী (হযরত ওমরের গোত্রের নাম) কি তাদের লোককে এভাবে তোমাদের হাতে অসহায় ছেড়ে দেবে? ওকে ছেড়ে দাও।’ এই সরদারের নাম ছিল আস বিন ওয়ায়েল সাহমী। সে হযরত ওমরকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে নিল। (সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, ৩৭০-৩৭১ পৃঃ)

এই সাথে হযরত ওমর নিজের ঈমানী উৎসাহ উদ্দীপনা প্রকাশের আরো একটা পথ খুঁজে পেয়ে গেলেন। তিনি ঈমান আনার পর প্রথম রাতেই চিন্তা করলেন, রাসূল সাঃ এর সবচেয়ে কট্টর ও উগ্র বিরোধী কে? তিনি বুঝলেন, আবু জাহলের চেয়ে কট্টর ও উগ্র বিরোধী আর কেউ নেই। প্রত্যুষে উঠেই আবু জাহলের বাড়ীতে গিয়ে পৌছলেন। দরজার কড়া নাড়তেই আবু জাহল বেরিয়ে এলো। সে স্বাগত জানিয়ে আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইল। ওমর রা. বললেন, আমি আপনাকে জানাতে এসেছি যে, আমি মুহাম্মদ সা. -এর ওপর ঈমান এনেছি এবং তিনি যা বলেন তা সত্য বলে স্বীকার করেছি। আবু জাহল 'তোর ওপর এবং তোর এই খবরের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত' এই কথাটা বলেই ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিল।

অপর দিকে ওমর রা. ইসলামী আন্দোলনকে এক ধাপ সামনে এগিয়ে দিলেন। মার খেয়েও কা'বার চত্তরে প্রকাশ্যে নামায পড়ার সূচনা করে দিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, 'আমরা হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের আগে কা’বা শরীফের সামনে প্রকাশ্যে নামায পড়তে পারতামনা। ওমর রাঃ ইসলাম গ্রহণ করলে তিনি কোরায়েশদের সাথে লড়াই করে কা’বায় নামায পড়লেন এবং আমরাও তার সাথে নামায পড়লাম।’

এভাবেই তীব্র সহিংসতার ভেতর দিয়েও শত্রুদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গ ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে।

 

হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণ

হযরত হামযার ঘটনাও প্রায় একই ধরনের। মক্কার এ যুবক একাধারে মেধাবী সাহসী ও প্রভাবশালী ছিলেন। রসূল সা. এর চাচাদের মধ্যে আবু তালেবের পর ইনিই একমাত্র চাচা ছিলেন, যিনি দ্বিমত পোষণ করা সত্ত্বেও রসূল সা. কে ভালোবাসতেন। বয়সেও ছিলেন মাত্র দু’তিন বছরের বড়। সমবয়সী হওয়ার কারণে শৈশবে চাচা ভাতিজা গলাগলি ভাব ছিল।

ঘটনা। সাফা পাহাড়ের কাছে আবু জাহল রসূল সা. কে লাঞ্চিত করে এবং অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করে। রসূল সা. ধৈর্য ধারণ করলেন এবং এই লাঞ্চনার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। ঘটনাক্রমে জনৈক দাসী এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। হযরত হামযা তখন শিকারে গিয়েছিলেন। ধনুক হাতে করে ফিরে আসতেই দাসীটা তাকে ঘটনাটা শুনালো এবং বললো, ‘হায়, তুমি যদি নিজ চোখে দেখতে পেতে যে তোমার ভাতিজার কী অবস্থা হয়েছিল।’ ঘটনার বিবরণ শুনে হামযার তীব্র আত্ন-সম্ভ্রমবোধ জেগে উঠলো। তিনি সোজা কোরায়েশদের মজলিসে আবু জাহলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আবু জাহলের মাথায় ধনুক দিয়ে আঘাত করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি মুহাম্মাদকে গালি দিয়েছ? যদি দিয়ে থাক তাহলে জেনে রেখ, আমিও তার ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি এবং সে যা কিছু বলে, আমিও তা বলি। সাহস থাকলে আমার মোকাবিলা করতে এস।’ আবু জাহলের সমর্থনে বনু মাখযুমের এক ব্যক্তি উঠে দাড়ালো। কিন্তু আবু জাহল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘বাদ দাও, আমি হামযার ভাতিজাকে খুব অশ্রাব্য গালি দিয়েছি।’ এরপর হযরত হামযা ইসলামের ওপর অটল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। কোরায়েশরা বুঝতে পারলো যে, রসূলের শক্তি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড)

 

বয়কট ও আটকাবস্থা

ইসলামের শত্রুরা তাদের সকল ফন্দি ফিকিরের ব্যর্থতা, ইসলামের অগ্রগতির ও বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণের দৃশ্য দেখে দিশাহারা হয়ে উঠে। নবুয়তের সপ্তম বছরের মহাররম মাসে মক্কার সব গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে বনু হাশেম গোত্রকে বয়কট করার চুক্তি সম্পাদন করলো। চুক্তিতে স্থির করা হলো যে, বনু হাশেম যতক্ষণ মুহাম্মদ সা. কে আমাদের হাতে সমর্পন না করবে এবং তাকে হত্যা করার অধিকার না দেবে, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে কোন আত্নীয়তা রাখবেনা, বিয়ে শাদীর সম্পর্ক পাতাবেনা, লেনদেন ও মেলা মেশা করবেনা এবং কোন খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাদের কাছে পৌছাতে দেবেনা। আবু তালেবের সাথে একাধিকবার কথাবার্তার পরও আবু তালেব রসূল সা. কে নিজের অভিভাবকত্ব থেকে বের করতে প্রস্তুত হননি। আর তার কারণে বনু হাশেমও তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারেনি। এই কারণে হতাশ হয়ে তারা ঐ চুক্তি সম্পাদন করে। গোত্রীয় ব্যবস্থায় এ সিদ্ধান্তটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র অসহায় অবস্থায় ‘শিয়াবে আবু তালেব’ নামক উপত্যকায় আটক হয়ে গেল। এই আটকাবস্থার মেয়াদ প্রায় তিন বছর দীর্ঘ হয়। এই সময় তাদের যে দুর্দশার মধ্য দিয়ে কাটে তার বিবরণ পড়লে পাষাণও গলে যায়। বনু হাশেমের লোকেরা গাছের পাতা পর্যন্ত চিবিয়ে এবং শুকনো চামড়া সিদ্ধ করে ও আগুনে ভেজে খেতে থাকে। অবস্থা এত দূর গড়ায় যে, বনু হাশেম গোত্রের নিষ্পাপ শিশু যখন ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাঁদতো, তখন বহু দূর পর্যন্ত তার মর্মভেদী শব্দ শোনা যেত। কোরায়েশরা এ সব কান্নার শব্দ শুনে আনন্দে আত্নহারা হয়ে যেত। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র একমাত্র ইসলামী আন্দোলনের নেতার কারণে এহেন বন্দীদশায় নিক্ষিপ্ত হলো। বয়কট এমন জোরদার ছিল যে, একবার হযরত খাদীজার ভাতিজা হাকীম বিন হিযাম তার ভৃত্যকে দিয়ে কিছু গম পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন। পথি মধ্যে আবু জাহল তা দেখে গম ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। ঠিক এ সময় আবুল বুখতারীও এসে গেল এবং তার মধ্যে একটু মানবিক সহানুভুতি জেগে উঠলো। সে আবু জাহলকে বললো, আরে ছেড়ে দাওনা। এছাড়া হিশাম বিন আমরও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু গম পাঠাতো।

এই হিশাম বিন আমরই এই নিপীড়নমূলক চুক্তি বাতিলের প্রথম উদ্যোক্তায় পরিণত হলো। সে যুহাইর বিন উমাইয়ার কাছে গেল। তাকে বললো, ‘তুমি কি এতে আনন্দ পাও যে, তুমি খাবে দাবে, কাপড় পরবে, বিয়ে শাদী করবে, আর তোমার মামাদের এমন অবস্থা হবে যে, তারা কেনাবেচাও করতে পারবেনা এবং বিয়ে শাদীও করতে পারবেনা? ব্যাপারটা যদি আবুল হাকাম বিন হিশামের (আবু জাহল) মামা নানাদের হতো এবং তুমি তাকে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদনের আহবান জানাতে, তাহলে সে কখনো সে আহবানে সাড়া দিতনা।’ এ কথা শুনে যুহাইর বললো, ‘আমি কী করবো? আমি তো একা মানুষ। আল্লাহর কসম আমার সাথে যদি আর কেউ থাকতো, তাহলে আমি এই চুক্তি বাতিল করানোর উদ্যোগ নিতাম এবং বাতিল না করিয়ে ছাড়তামনা।’ হিশাম বললো, ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি তো তুমি পেয়েই গেছ।’ যুহাইর বললো, ‘সে কে?’ হিশাম বললো, আমি স্বয়ং। এরপর হিশাম গেল মুতয়াম বিন আদীর কাছে এবং একইভাবে তাকে বুঝালো। সেও যুহাইরের ন্যায় জবাব দিল যে, আমি একাকী কী করবো। হিশাম তাকেও বললো, ‘আমি আছি তোমার সাথে।’ মুতয়াম বললো, ‘তাহলে তৃতীয় একজনকে খুজে বের কর।’ হিশাম বললো, তৃতীয় ব্যক্তি তো আমি পেয়েই গেছি। সে বললো, কে সে? হিশাম বললো, ‘যুহাইর বিন আবি উমাইয়া।’ মুতয়াম বললো, এবার চতুর্থ একজন বের করা দরকার। অতপর আবুল বুখতারী ও যামরা বিন আসওয়াদের কাছে পৌছে হিশাম কথা বললো।

এভাবে বয়কট চুক্তি বাতিলের আন্দোলন যখন ভেতরে ভেতরে কার্যকরভাবে অগ্রসর হলো, তখন তারা সবাই একত্রে বসে পরবর্তী কর্মসূচী স্থির করলো। পরিকল্পনা করা হলো যে, হিশামই প্রকাশ্যে কথাটা তুলবে। সে অনুসারে হিশাম কা’বা শরীফের সাতবার তওয়াফ করলো। তারপর জনতার কাছে এসে বললো, ‘ওহে মক্কাবাসী, এটা কি সমীচীন যে, আমরা খাবার খাবো, পোশাক পরবো, আর বনু হাশেম ক্ষুধায় ছটফট করতে থাকবে এবং কোন কিছু কিনতেও পারবেনা?’ তারপর সে নিজের ইচ্ছেটা এভাবে জানিয়ে দিলঃ

‘আল্লাহর কসম, সম্পর্ক ছিন্নকারী এই নিপীড়নমূলক চুক্তি টুকরো টুকরো করে না ফেলে আমি বিশ্রাম নেবনা।’

আবু জাহল চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি কখনো এটা ছিড়তে পারবেনা।’

যাময়া ইবনুল আসওয়াদ আবু জাহলকে জবাব দিল, ‘আল্লাহর কসম, তুমিই সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। এই চুক্তি যেভাবে লেখা হয়েছে, আমরা তা পছন্দ করিনা।’ আবুল বুখতারীও বলে উঠলো, ‘যাময়া ঠিকই বলেছে। এই চুক্তি আমাদের পছন্দ নয় এবং আমরা তা মানিও না।’ মুতয়ামও সমর্থন করে বললো, ‘তোমরা দু’জনে ঠিকই বলেছ। এর বিপরীত যে বলে সে ভুল বলে।’ এভাবে অধিকাংশ লোক বলতে থাকায় আবু জাহল মুখ কাচুমাচু করে বসে রইল এবং চুক্তি ছিড়ে ফেলা হলো। লোকেরা যখন চুক্তিটাকে কা’বার প্রাচীর থেকে নামালো তখন অবাক হয়ে দেখলো যে, সমগ্র চুক্তিটাকে উই পোকায় খেয়ে ফেলেছে। কেবল ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ কথাটা বাকী আছে। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

 

দূঃখের বছর

বন্দীদশা কেটে যাওয়ায় রসূল সা. আর একবার সপরিবারে মুক্ত পরিবেশে উপনীত হলেন। কিন্তু এবার তার চেয়েও কঠিন যুগের সূচনা হলো। তখন চলছিল নবুয়তের দশম বছর। এ বছর সর্বপ্রথম যে বিয়োগান্ত ঘটনাটা ঘটলো, তা এই যে, হযরত আলীর পিতা আবু তালেব মারা গেলেন। যে শেষ আশ্রয়টি এ যাবত পরম স্নেহে রসূল সা. কে শত্রুদের কবল থেকে রক্ষা করে আসছিল এবং কোন চাপ ও উস্কানীর কাছে নতি স্বীকার না করে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সকল চক্রান্ত প্রতিহত করে আসছিল, সেই আশ্রয়টি এভাবে হারিয়ে গেল।

এই বছরই রসূল সা. দ্বিতীয় যে আঘাতটা পেলেন তা হলো হযরত খাদীজার রা. ইন্তিকাল। হযরত খাদীজা রা. শুধু রসূলের স্থী-ই ছিলেন না, বরং প্রথম ঈমান আনয়নকারী ভাগ্যবান গোষ্ঠীটির অন্যতম ছিলেন। নবুয়ত লাভের আগেও তিনি তার প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মীতা দেখাতে মোটেই কসুর করেননি। প্রথম ওহি নাযিল হওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি সত্যের পথে রসূলের সা. যথার্থ জীবন সংগিনীর ভূমিকা পালন করে গেছেন। ইসলামী আন্দোলনের সমর্থনে তিনি প্রচুর অর্থও ব্যয় করেছেন। পদে পদে পরামর্শও দিয়েছেন এবং আন্তরিকতা সহকারে সহযোগিতাও করেছেন। এ জন্য তার সম্পর্কে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে, তিনি রসূল সা. এর মন্ত্রী ছিলেন। বস্তুত এ বন্তব্য যথার্থ ও সংগত।

একদিকে পরপর এই দুটো আঘাত রসূল সা. কে সইতে হলো। অপরদিকে এই বাহ্যিক সহায় দুটো হারিয়ে যাওয়ার কারণে বিরোধিতা আরো প্রচন্ড আকার ধারণ করলো। এবার বিরোধিতা ও নির্যাতন নিপীড়ন অতীতের সমস্ত রেকর্ড যেন ছাড়িয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা সম্ভবত এই ছিল যে, ইসলাম নিজের হেফাযত নিজেই করুক, নিজের চলার পথ নিজেই তৈরী করুক এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুক। দুনিয়াবী সহায়গুলো এভাবে হটিয়ে না দিলে হয়তো সত্যের প্রাণশক্তি পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে পারতোনা। এই দুঃখজনক ও দুঃসহ পরিস্থিতির উদ্ভবের কারণেই এ বছরটা দুঃখের বছর নামে আখ্যায়িত হয়।

এখন কোরায়েশরা চরম অসভ্য আচরণ শুরু করে দিল। বখাটে ছেলেদেরকে তার পেছনে লেলিয়ে দিতে লাগলো। তারা হৈ চৈ করতো। রসূল সা. যখন নামায পড়তেন, তখন হাতে তালি দিত। পথে চলার সময় রসূল সা. এর ওপর নোংরা বর্জ্য নিক্ষেপ করা হতো। দরজার সামনে কাঁটা বিছানো হতো। কখনো তাঁর গলায় ফাঁস লাগানী হতো। কখনো তাঁর গায়ে পর্যন্ত হাত দেয়া হতো, প্রকাশ্যে গাল দেয়া হতো। তাঁর মুখের ওপর মাটি নিক্ষেপ করা হতো। এমনকি কোন কোন নরপশু এমন জঘন্যতম বেয়াদবীও পর্যন্ত করেছে যে, তার জ্যোতির্ময় মুখমন্ডলে থুথু নিক্ষেপ করেছে। একবার আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল একটা পাথর নিয়ে রসূল সা. কে খুঁজতে খুঁজতে হারাম শরীফ পর্যন্ত এসেছিল। তার ইচ্ছা ছিল এক আঘাতেই তাঁকে খতম করে দেয়া। রসূল সা. হারাম শরীফে তার সামনেই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাকে এমনভাবে তার চোখের আড়ালে রেখে দিলেন যে, সে তাঁকে দেখতেই পেলনা। অগত্যা সে হযরত আবু বকরের সামনে ক্রোধ উদগীরণ করে ফিরে এল এবং নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করলো “আমরা নিন্দিত ব্যক্তির আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করেছি, তার আদেশ অমান্য করেছি এবং তার ধর্মের প্রতি শত্রুতা পোষণ করেছি।” বস্তুত নাম বিকৃত করা এবং খারাপ শব্দ প্রয়োগ করা নৈতিক নীচতা ও অধোপতনের লক্ষণ। শত্রু যখন ইতরামির সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়, তখন এই সব নোংরা অস্ত্র প্রয়োগ করে থাকে।

এসব কথা শুনে রসূল সা. বলতেন, আল্লাহ তাদের নিন্দাবাদ থেকে আমাকে বাঁচিয়েছেন। ওরা মুযাম্মামকে (নিন্দিত ব্যক্তি) গালি দেয়। কিন্ত আমি তো মুহাম্মাদ। কাজেই ওদের গালি আমাকে স্পর্শ করেনা।

অনুরূপভাবে একবার আবু জাহল পাথর দিয়ে আঘাত করে রসূল সা. কে হত্যা করার মতলবে তার কাছে পৌছে যায়। কিন্তু আল্লাহ আবু জাহলকে সহসাই এমন ভীত ও সন্ত্রস্থ করে দেন যে, সে কিছুই করতে পারেনি।

একবার শত্রুরা সদলবলে রসূল সা. এর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপট ছিল এ রকমঃ ইসলামের শত্রুরা তাদের এক আড্ডায় বসে বলাবলি করছিল যে, ‘এই লোকটার (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি আমরা বড্ড বেশী সহনশীলতা দেখিয়ে এসেছি। এতটা সহনশীলতার কোন নজীর নেই।’ ঘটনাক্রমে ঠিক এ সময়ই রসূল সা. সেখানে এসে পড়েন। শত্রুরা জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি এ সব কথা বলে থাক? রসূল সা. পরিপূর্ণ নৈতিক দৃঢ়তা নিয়ে বললেন, ‘হ্যা, আমিই তো এ সব কথা বলে থাকি।’ ব্যাস, আর যায় কোথায়। চার দিক থেকে আক্রমণ চালানো হলো। আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আ’স বর্ণনা করেন যে, রসূল সা. এর ওপর কোরায়েশদের পক্ষ থেকে এমন বাড়াবাড়ি আর কখনো দেখিনি।

আক্রমণকারীরা কিছুক্ষণ পর থামলে রসূল সাঃ পুণরায় সেই অতি মানবীয় সাহসিকতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করলেনঃ ‘আমি তোমাদের কাছে এমন বার্তা নিয়ে এসেছি যে, তোমরা যবাই হয়ে যাবে।’ অর্থাৎ যে যুলুম নির্যাতনের ছুরি তোমরা আমার গলায় চালাচ্ছো, ইতিহাসের শাশ্বত বিধান আল্লাহর আইন শেষ পর্যন্ত ঐ ছুরি দিয়েই তোমাদের যবাই করবে। তোমাদের এই যুলুমের রাজত্ব একেবারেই খতম হয়ে যাবে।

এই সব ঘটনার সঠিক সময়কাল বলা কঠিন। তবে অনুমান হয় যে, যে সময় সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছিল, তখনই এ ঘটনাগুলো ঘটে থাকবে। আবু তালেবের মৃত্যুর পরেই যে এ সব ঘটনা ঘটেছে, তা সুনিশ্চিত।

হযরত উসমান বিন আফফান বর্ণনা করেন, একবার রসূল সা. পবিত্র কা’বার তাওয়াফ করছিলেন। কোরায়েশ সরদার উকবা ইবনে আবু মুয়াইত, আবু জাহল ও উমাইয়া ইবনে খালফ এ সময় হাতীমে কা’বায় বসা ছিল। রাসূল (সা) যখনই তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা তাঁকে লক্ষ্য করে অশ্রাব্য গালাগাল বর্ষণ করছিল। এভাবে তিনবার হলো। শেষ বাস রাসূল (সা) পরিবর্তিত চেহারা নিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আল্লাহর আযাব অবিলম্বে তোমাদের ওপর না নামলে তোমরা কিছুতেই ক্ষান্ত হবে না।’ হযরত উসমান বলেন, এ কথাটা বলার সাথে সাথেই তাদের মধ্যে এমন আতংক উপস্থিত হয় যে, প্রত্যেকে ভয়ে কাঁপতে থাকে। এ কথাটা বলার পর রাসূল (সা) বাড়ী অভিমুখে রওনা হলেন। তাঁর সাথে হযরত উসমান এবং অন্যান্যরাও রওনা হন। এই সময় রাসূল (সা) নিজ সাথীদের সম্বোধন করে বলেনঃ

‘তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, আল্লাহ অবশ্যই তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী, তাঁর বাণীকে পূর্ণাঙ্গ এবং তাঁর দ্বীনের সাহায্য করবেন। আর এই লোকগুলোকে অচিরেই আল্লাহ তোমাদের হাত দিয়ে যবাই করাবেন।’

লক্ষ্য করুন, দৃশ্যত নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতিতে এ সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। অথচ কত দ্রুত কেমন জাঁকজমকের সাথে তা সত্য প্রমাণিত হলো। ইসলামী আন্দোলন যেন একটা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললো।

 

তায়েফে ইসলামের দাওয়াত

এ ঘটনাটা ঠিক কোন সময়ে ঘটেছিল, নিশ্চিতভাবে তা বলা কঠিন। কেউ কেউ এটিকে সুরা মুদাসসিরের নাযিল হবার প্রেক্ষাপট হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এ কথা মেনে নিলে ঘটনাটিকে প্রাথমিক যুগে স্থান দিতে হয়। কিন্তু ঘটনার ধরন দেখে মনে হয়, এটা মক্কী যুগের শেষের দিককার ব্যাপার।

একদিন রাসূল (সা) প্রত্যুষে বাড়ী থেকে বেরুলেন। মক্কার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু পুরো দিনটা অতিবাহিত করেও তিনি সেদিন একজন লোকও পেলেন না, যে তাঁর বক্তব্যে কর্ণপাত করে। সে সময় ইসলামবিরোধীরা যে নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করেছিল তা হলো রাসূল (সা) কে আসতে দেখলেই সবাই সটকে পড়তো। কারণ তাঁর কথা শুনলেই জটিলতা দেখা দেয়। বিরোধিতা করলে বা তর্কবিতর্ক করলে তার আরো বিস্তার ঘটে। এই কর্মপন্থা বেশ সফল হলো। দু’ একজনের সাক্ষাত পেলেও তারা উপহাস অথবা গুন্ডামির মাধ্যমে জবাব দিল। পুরো দিনটা বিফলে যাওয়ায় তিনি বুকভরা হতাশা ও বিমর্ষতা নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। কেউ যখন কোন ব্যক্তির উপকার করতে ও শুভ কামনা করতে এগিয়ে যায়, আর সেই ব্যক্তি ঐ উপকারী ও শুভাকাংখী ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন উপকারী ব্যক্তিটির মন যেমন দুর্বিষহ বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে, রসূল (সা) এর মনের অবস্থাটাও ছিল অবিকল তদ্রুপ।

ঐ বিশেষ দিনটার অভিজ্ঞতা থেকে রসূল (সা) এর মনে এই ধারণা দানা বাঁধে যে, মক্কার মাটি এখন ইসলামের দাওয়াতের জন্য অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে এবং এখানে যা কিছু ফসল ফলার সম্ভাবনা ছিল, তা ইতিমধ্যেই ফলেছে। পরবর্তী সময় পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটতে থাকায় তাঁর এ ধারণা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। সম্ভাবনাময় সর্বশেষ মানুষগুলো তখন রসূল (সা) এর চার পাশে সমবেত হয়ে গেছে। সম্ভবত ঐ দিন থেকেই তাঁর মনে এই ভাবনা প্রবলতর হতে থাকে যে, এখন মক্কার বাইরে গিয়ে কাজ করা উচিত। আসলে একজন বিচক্ষণ ও প্রাজ্ঞ দাওয়াতদাতার এ রকম ভাবাটাই স্বাভাবিক। সে যখন নিজের প্রাথমিক কেন্দ্রে এতটা দাওয়াতী কাজ সম্পন্ন করে ফেলে, যার ফলে সেখানকার কার্যোপযোগী সব লোক দাওয়াত গ্রহণ করে এবং একগুয়ে হটকারী লোকেরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না, তখন সে আর ঐ জায়গায় পড়ে থেকে শক্তির অপচয় করেনা, বরং নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান করে এবং পরিবেশ পরিবর্তন করে নতুন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েই রসূল (সা) মক্কার আশপাশে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তায়েফকে দাওয়াতের নতুন ক্ষেত্র হিসাবে বেছে নেন। যায়েদ বিন হারেসাকে সাথে নেন। তিনি তায়েফকে দাওয়াতের নতুন ক্ষেত্র হিসাবে বেছে নেন। যায়েদ বিন হারেসাকে সাথে নিয়ে একদিন মক্কা থেকে পায়ে হেটে রওনা হন। পথিমধ্যে যে সব গোত্রের বসতবাড়ী দেখতে পান তাদের সবার কাছে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেন। আসা যাওয়ায় তাঁর প্রায় এক মাস সময় অতিবাহিত হয়ে যায়।

তায়েফ ছিল ছাড়া সুনিবীড়, সুজলা-সুফলা, শস্যশ্যামলা, বাগবাগিচা ও ক্ষেতখামারে পরিপূর্ণ অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা আবহাওয়াযুক্ত একটা স্থান। অধিবাসীরা ছিল খুবই স্বচ্ছল, সুখী এবং অত্যধিক ভোগবিলাস ও আরাম আয়েশে মত্ত। আর্থিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের অধিকারী হলে সাধারণত আল্লাহকে ভুলে যায় এবং প্রবৃত্তির লালসা চরিতার্থ করার কাজে নিয়োজিত হয়। তায়েফবাসীর অবস্থা ছিল এ রকমই। মক্কাবাসীর মধ্যে তো তবু ধর্মীয় পৌরহিত্য ও দেশ শাসনের দায়িত্বের কারণে কিছুটা নৈতিক রাখঢাক থাকা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তায়েফবাসী ছিল একেবারেই বেপরোয়া ধরনের। উপরন্তু সুদখোরীর কারণে তাদের মানবতাবোধ সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এহেন জায়গায় সফরে যাওয়ার অর্থ হলো, রসূল (সা) মক্কার চেয়েও খারাপ জায়াগায় যাচ্ছিলেন।

বিশ্বমানবের পরম সুহৃদ মুহাম্মদ (সা) তায়েফ পৌঁছে সর্বপ্রথম সাকীফ গোত্রের সরদারদের সাথে সাক্ষাত করলেন। তারা ছিল তিন ভাই আবদ ইয়ালীল, মাসউদ ও হাবীব। এদের প্রত্যেকের ঘরে কোরায়েশ বংশোদ্ভ’ত বনু জামাহ গোত্রের এক একজন স্ত্রী ছিল। সে হিসাবে তিনি আশা করেছিলেন যে, তারা কিছুটা সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করতে পারে। রসূল (সা) তাদের কাছে গিয়ে বসলেন, তাদেরকে সর্বোত্তম ভাষায় আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন দাওয়াতের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে আলোচনা করলেন এবং আল্লাহর সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠায় তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করলেন। কিন্তু এই তিন ব্যক্তি কেমন জবাব দিল দেখুনঃ

এক ভাই বললোঃ সত্যি যদি আল্লাহই তোমাকে পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে তিনি কা’বা ঘরের গেলাফের অবমাননা করতে চান।

দ্বিতীয় ভাইঃ কি আশ্চর্য ! আল্লাহ তাঁর রসূল বানানোর জন্য তোমাকে ছাড়া আর কোন উপযুক্ত লোক পেলেন না !

তৃতীয় ভাইঃ আল্লাহর কসম, আমি তোমার সাথে কথাই বলবো না। কেননা তুমি যদি তোমার দাবী মোতাবেক সত্যি সত্যিই আল্লাহর রসূল হয়ে থাক, তাহলে তোমার মত লোককে জবাব দেয়া ভীষণ বেআদবী হবে। আর যদি তুমি আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে থাক, তাহলে তোমার সাথে কথা বলা যায় এমন যোগ্যতাই তোমার নেই।’

এর প্রতিটি কথা রসূল (সা) এর বুকে বিষমাখা তীরের মত বিদ্ধ হতে লাগলো। তিনি পরম ধৈর্য সহকারে মর্মঘাতী কথাগুলো শুনলেন এবং তাদের কাছে সর্বক্ষেত্রে অনুরোধ রাখলেন যে, তোমরা তোমাদের এ কথাগুলোকে নিজেদের মধ্যেই সীমিত রাখ এবং জনসাধারণকে এসব কথা বলে উস্কে দিওনা।

কিন্তু তারা ঠিক এর উল্টোটাই করলো। তারা তাদের শহরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট বখাটে তরুণদেরকে, চাকর নফর ও গোলামদেরকে রসূলের পেছনে লেলিয়ে দিল এবং বলে দিল যে, যাও, এই লোকটাকে লোকালয় থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এসো। বখাটে যুবকদের এক বিরাট দল আগে পিছে গালি দিতে দিতে, হৈ চৈ করতে করে ও পাথর ছুঁড়ে মারতে মারতে চলতে লাগলো। তারা তাঁর হাঁটু লক্ষ্য করে করে পাথর মারতে লাগলো, যাতে তিনি বেশী ব্যথ্যা পান। পাথরের আঘাতে আঘাতে এক একবার তিনি অচল হয়ে বসে পড়ছিলেন। কিন্তু তায়েফের গু-ারা তার বাহু টেনে ধরে দাঁড় করাচ্ছিল এবং পুনরায় হাঁটুতে পাথর মেরে তাতে তালি দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। ক্ষতস্থানগুলো থেকে অঝোরা ধারায় রক্ত ঝরছিল। এভাবে জুতোর ভেতর ও বাহির রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। আর এই অপূর্ব তামাশা দেখার জন্য জনতার ভীড় জমে গেল। গু-ারা এভাবে তাকে শহর থেকে বের করে এক আঙ্গুরের বাগানের কাছে নিয়ে এল। বাগানটা ছিল রবিয়ার ছেলে উতবা ও শায়বার। রসূল (সা) একেবারে অবসন্ন হয়ে একটা আংগুর গাছে সাথে হেলান দিয়ে বসলেন। বাগারে মালিক তাঁকে দেখছিল এবং ইতিপূর্বে তাঁর ওপর যে অত্যাচার হচ্ছিল, তাও কিছুটা প্রত্যক্ষ করেছিল।

এখানে দু’রাকাত নামায পড়ে তিনি নিম্নের মর্মস্পর্শী দোয়াটা করলেনঃ

’হে আল্লাহ! আমি আমার দুর্বলতা, সম্বলহীনতা ও জনগণের সামনে অসহায়ত্ব সম্পর্কে কেবল তোমারই কাছে ফরিয়াদ জানাই। দরিদ্র ও অক্ষমদের প্রতিপালক তুমিই। তুমিই আমার মালিক। তুমি আমাকে কার কাছে সঁপে দিতে চাইছ? আমার প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে, নাকি শত্রুর কাছে? তবে তুমি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না থাক, তাহলে আমি কোন কিছুর পরোয়া করি নে। কিন্তু তোমার পক্ষ থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা পেলে সেটাই আমার জন্য অধিকতার প্রশস্ত। আমি তোমার কোপানলে অথবা আযাবে পতিত হওয়ার আশংকা থেকে তোমার সেই জ্যোতি ও সৌন্দর্যের আশ্রয় কামনা করি, যার কল্যাণে সকল অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তোমার সন্তোষ ছাড়া আমি আর কিছু কামনা করিনা। তোমার কাছ থেকে ছাড়া আর কোথাও থেকে কোন শক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।”

ইতিমধ্যে বাগানের মালিক এসে পড়লো। তার অন্তর সমবেদনায় ভরে উঠেছিল। সে তাঁর খৃস্টান গোলাম আদ্দাসকে ডাকলো এবং তাকে দিয়ে একটি পিরিসে করে আঙ্গুর পাঠিয়ে দিল। আদ্দাস আঙ্গুর দিয়ে রসূল (সা) এর সামনে বসে পড়লো। রসূল (সা) ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আঙ্গুরের দিকে হাত বাড়াতেই আদ্দাস বললো, ‘আল্লাহর কসম, এ ধরনের কথা তো এ শহরের লোকেরা কখনো বলেনা। রসূল (সা) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কোন শহরের অধিবাসী এবং তোমার ধর্ম কী? সে বললো, আমি খৃস্টান এবং নিনোভার অধিবাসী। রসূল (সা) বললেন, ‘তুমি তো দেখছি আল্লাহর সৎ বান্দা ইউনুস বিন মিত্তার শহরের লোক।’ আদ্দাস অবাক হয়ে বললো, ‘আপনি কিভাবে ইউনুস বিন মিত্তাকে চিনেন? রসূল (সা) বলেলেন, ‘উনি আমার ভাই। তিনিও নবী ছিলেন আর আমিও নবী।’ এ কথা শোনা মাত্রই আদ্দাস রসূল (সা) এর হাতে ও পায়ে চুমু খেতে লাগলো। রবীয়ার এক ছেলে চুমু খাওয়া দৃশ্য দেখে মনে মনে চটে গেল। আদ্দাস ফিরে গেলে তাকে সে ভর্ৎসনা করলে লাগলো যে, তুমি ও কী করছিলে? তুমি তো নিজের ধর্ম নষ্ট করে ফেলছিলে। আদ্দাস গভীর আবেগের সাথে বললো, “হে আমার মনিব, পৃথিবীতে এর চেয়ে উত্তম কোন জিনিস নেই। ঐ ব্যক্তি আমাকে এমন একটা কথা বলেছে যা নবী ছাড়া আর কারা জানা সম্ভব নয়।”

আসলে চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর পর রসূল (সা) মক্কায় বাহ্যত একেবারে সহায়হীন ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর শত্রুদের শক্তি ও প্রতাপ বহুল পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। তাই ভেবেছিলেন তায়েফে হয়তো আল্লাহর কিছু বান্দাকে সাথী হিসেবে পাওয়া যাবে। অথচ সেখানেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হ’লো। সেখানে থেকে তিনি নাখলায় এসে অবস্থান করলেন। অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে হেরা গুহায় উপনীত হলেন। এখান থেকে মুতয়াম বিন আদীকে (বয়কট চুক্তি বাতিলের উদ্যোক্তাদের অন্যতম) বার্তা পাঠালেন যে, “আপনি কি আমাকে নিরাপত্তামূলক আশ্রয় দিতে পারেন?” আরবের জাতীয় চরিত্রের একটা ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, কেউ নিরাপত্তামূলক আশ্রয় চাইলে তা তাকে দেয়া হতো চাই সে শত্রুই হোক না কেন। মুতয়াম রসূল (সা) এর অনুরোধ গ্রহণ করলো। সে তার ছেলেদেরকে নির্দেশ দিল, সশস্ত্র অবস্থায় কা’বার চত্তরে ঘোরাফিরা করবে এবং মুহাম্মাদের (সা) নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সে নিজে গিয়ে রসূল (সা) কে সাথে করে মক্কায় নিয়ে এল এবং উটের ওপর বসে ঘোষণা করলো, আমি মুহাম্মাদকে (সা) আশ্রয় দিয়েছি। মুতয়ামের ছেলেরা খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে পাহারা দিয়ে রসূল (সা) কে হারাম শরীফে নিয়ে এল এবং তারপর তাঁর বাড়ীতে পৌঁছালো।

তায়েফে রসূল (সা) এর যে দুরবস্থা হয়েছিল, ইতিহাসের ভাষা আমাদেরকে তার পূর্ণাংগ বিবরণ দিতে পারেনি। একবার হযরত আয়েশা (রা) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হে রসূলুল্লাহ, আপনি কি ওহুদের চেয়েও কঠিন দিনের সম্মুখীন কখনো হয়েছেন?” তিনি জবাব দিলেনঃ “তোমার জাতি আমাকে আর যত কষ্টই দিয়ে থাকুক, আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টকর দিন ছিল তায়েফে যেদিন আমি আব্দ ইয়ালীলের কাছে দাওয়াত দিলাম। সে তা প্রত্যাখ্যান করলো এবং এত কষ্ট দিল যে, অতি কষ্টে কারনুস সায়ালেব নামক জায়াগায় পৌঁছে কোন রকমে রক্ষা পেলাম।” (আল মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া, প্রথম খন্ড, ৫৬ পৃঃ)

নির্যাতনের চোটে অবসন্ন ও সংজ্ঞাহীন হয়ে যাওয়ার পর যিনি রসূল (সা) কে ঘাড়ে করে শহরের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন, সেই যায়েদ বিন হারেসা ব্যথিত হৃদয়ে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদোয়া করুন। রাসুল সাঃ বললেন, “আমি ওদের বিরুদ্ধে কেন বদদোয়া করবো? ওরা যদি আল্লাহর ওপর ঈমান নাও আনে, তবে আশা করা যায়, তাদের পরবর্তী বংশধর অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর এবাদত করবে।”

এই সফরকালেই জিবরীল এসে বলেন, পাহাড় সমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতারা আপনার কাছে উপস্থিত। আপনি ঈংগিত করলেই তারা ঐ পাহাড় দুটোকে একসাথে যুক্ত করে দেবে, যার মাঝখানে মক্কা ও তায়েফ অবস্থিত। এতে উভয় শহর পিষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু মানবতার বন্ধু মহান নবী এতে সম্মত হননি।

এহেন নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতেই জ্বিনেরা এসে রসূল (সা) এর কোরআন তেলাওয়াত শোনে এবং তাঁর সামনে ঈমান আনে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা রসূল (সা) কে জানিয়ে দিলেন যে, দুনিয়ার সকল মানুষও যদি ইসলামের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে আমার সৃষ্ট জগতে এমন বহু জীব আছে, যারা আপনার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

 

শুভ দিনে পূর্বাভাস

তায়েফের অভিজ্ঞতা এতই মর্মান্তিক ছিল যে, তা অতিক্রম করতে গিয়ে রসূল (সা) দুঃখবেদনার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এই সীমায় পৌঁছার পরই আল্লাহ মানুষের সাফল্যের দ্বার উদঘাটন করেন। সমকালীন সমাজ ব্যবস্থা দৃশ্যত রসূল (সা) কে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দিয়েছিল। আর এর অনিবার্য ফল স্বরূপ তাঁর মর্যাদা আল্লাহর দরবারে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছিল।

আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীদেরকে পাঠিয়ে যখনই হক ও বাতিলের সংঘাত লাগিয়েছেন, তখন সে সংঘাতকে একটা সুনির্দিষ্ট বিধির আওতাধীন করে দিয়েছেন। বিধিটি ছিল এই যে, বাতিল যখন সত্যের সৈনিকদের ওপর যুলুম নির্যাতন ও বলপ্রয়োগের শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, নির্যাতিত মোজাহেদরা যুলুম নিপীড়নের সব ক’টা স্তর একে একে চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে পার হয়ে যায় এবং সর্বশেষ প্রাণান্তকর সময়টাও অতিক্রম করে, কেবল তখনই আল্লাহর গায়েবী সাহায্যের সময় সমাগত হয়। জান্নাতমুখী পথগুলো কাঁটায় পরিপূর্ণ। এই পথে যারা চলে, তাদের সাফল্যের সুসংবাদ কখন আসে, সে কথা কোরআনে এভাবে বলা হয়েছেঃ

“তারেদ ওপর বিপদ মুসিবত ও দুর্যোগাদি এলো এবং তারা একেবারেই দিশেহারা হয়ে পড়লো। এমনকি রসূল এবং তাঁর সহচর মুমিনরা বলে উঠলো, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? (এ পর্যায়ে পৌঁছার পর তাদের সুসংবাদ দেয়া হয় যে) শুনে নাও, আল্লাহর সাহায্য নিকটে।” (বাকারাঃ ২১৪)

তায়েফের অভিজ্ঞতার পর রসূল (সা) যেন এই সর্বশেষ পরীক্ষা অতিক্রম করলেন। আল্লাহর বিধান অনুসারেই এখন নতুন যুগের সূচনা অবধাতির ছিল এবং এ সম্পর্কে সুসংবাদ দেয়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছিল। এই সুসংবাদ দেয়ার উদ্দেশ্যেই রসূল (সা) কে মে’রাজ দ্বারা সম্মানিত করা হয়।

আসলে মে’রাজের তাৎপর্য হলো, রসূল (সা) কে মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্যের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করা হয়। যে বিশ্ব সম্রাটের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে রসূল (সা) বেশ কয়েকটা বছর নানা রকমের দুঃখকষ্ট ও বিপদ মুসিবত ভোগ করলেন এবং বিভিন্ন অপশক্তির সাথে আদর্শিক ও চিন্তাগত যুদ্ধ করে কাটিয়ে দিলেন, সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর দূতকে নিজের সর্বোত্তম উপাধিতে ভূষিত করার জন্য আপন দরবারে ডেকে পাঠান। যে বীর সেনানী জীবন ও জগত সংক্রান্ত মৌলিক সত্যগুলোকে মেনে নিতে স্বজাতিকে উদ্বুদ্ধ করার সংগ্রামে নেমে চারদিক থেকে ক্রমাগত আঘাতের পর আঘাত সহ্য করেছেন, মে’রাজের মাধ্যমে তাকে সুযোগ দেয়া হয় যেন, ঐ সত্যগুলোকে নিকট থেকে দেখে আসতে পারেন। বিশ্ব মানবতার সার্বিক কল্যাণ সাধনের সর্বাত্মক চেষ্টায় নিয়োজিত শেষ নবীকে এক বিরল সৌভাগ্যে ভূষিত করা হয় যেন, তিনি এই আন্দোলনের এক বিরাট ও সুপ্রাচীন কেন্দ্রে (বাইতুল মাকদাস) উপস্থিত হয়ে অতঃপর সেখান থেকে উর্ধ জগতে উড্ডয়ন করে এই আন্দোলনের সাবেক নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হতে পারেন।

পূর্বতন নবীগণকে অদৃশ্য সত্যগুলোকে দর্শন ও আল্লাহর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে উপনীত হবার মাধ্যমে বিশেষ অনুগ্রহ লাভের সুযোগ দেয়া হতো। কোরআনে একদিকে যেমন হযরত ইবরাহীম আ. সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাঁকে…… আকাশ ও পৃথিবীর সাম্রাজ্য পরিদর্শন করানো হয়েছিল। অপরদিকে তেমনি হযরত মূসা আ. কে তূর পর্বতে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ তা’য়ালা একটা আলোকময় গাছের আড়াল থেকে… ‘আমি আল্লাহ’ বলে ঘোষনা দিয়ে তাঁর সাথে কথোপকথন করেন। অন্য এক সময় এরূপ ঘনিষ্ঠ পরিবেশেই তাকে শরীয়তের বিধান প্রদান করা হয়। মোটকথা সকল বড় বড় নবী কোন না কোন পন্থায় মে’রাজের সুযোগ লাভ করেছিলেন। তবে রসূল সা. এর মে’রাজ ছিল পূর্ণাংগ।

তয়েফ ও হিজরতের ঘটনার মাঝখানে মে’রাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৈশিষ্টমন্ডিত আর কোন ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনার খবর যখন তিনি জানালেন তখন মক্কায় হৈ চৈ পড়ে গেল। তিনি ঐ রাতে কোথায় কোথায় কী কী দেখেছেন সব খোলাখুলি বর্ণনা করলেন। বাইতুল মাকদাসের আকৃতির পুরো ছবি তুলে ধরলেন। পথিমধ্যকার এমন সব সুনিশ্চিত আলামতও বর্ণনা করলেন যা পরে নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়।

ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে অবস্থানের এই সৌভাগ্যময় মহূর্তে যে বিশেষ ওহী নাযিল করা হলো, সেটাই সূরা বনী ইসরাইলের আকারে আমাদের কাছে বিদ্যমান। ঐ সূরা শুরুই হয়েছে মে’রাজের ঘটনা দিয়ে। আর গোটা সূরাই মে’রাজের প্রেরণায় সিক্ত। ঐ সূরার নিন্মোক্ত বক্তব্যগুলো বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়ঃ

১- বনী ইসরাইলের শিক্ষাপ্রদ ইতিবৃত্ত সামনে রেখে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর আইন বড় বড় শক্তিধর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে পর্যন্ত জবাদিহীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায় এবং তারা্ বিপথগামী হলে তাদেরকে অন্য কোন অনুগত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দিয়ে পিটিয়ে দেয়া হয়। অপর দিকে এ কথাও শেখানো হয়েছে যে, বিজয় ও সফলতার যুগে পৌছে তারাও যেন বনী ইসরাইলের মত আচরণ শুরু করে না দেয়।

২- চরম প্রতিকূল পরিবেশে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলা হয়, সত্য সমাগত, বাতিল পরাভূত (আয়াত-৮৯) অর্থাৎ অন্ধকার তখন দূরীভূত হবে এবং প্রভাতের আবির্ভাব ঘটবে।

৩- আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে এ কথাও জানিয়ে দেন যে, মক্কাবাসী এবার আপনাকে মক্কা থেকে তাড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু আপনাকে বহিষ্কার করার পর বেশী দিন শান্তিতে থাকতে পারবেনা।(আয়াত-৭৬) হিজরতের যে দোয়া আল্লাহ শেখালেন তার ভাষা ছিল এ রকমঃ “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সত্যের দরজা দিয়ে প্রবেশ করান এবং সত্যের দরজা দিয়েই(বর্তমান পরিবেশ থেকে) বের করুন, আর আমাকে আপনার পক্ষ থেকে সাহায্য হিসাবে শাসন ক্ষমতা দান করুন।”-(আয়াত-৮০) এ দোয়ায় শাসন ক্ষমতার প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে প্রকারন্তরে সুসংবাদ দেয়া হলো যে, হিজরতের পরবর্তী সময়টা আধিপত্য ও শাসনের যুগ হবে।

৪- ২২ থেকে ২৯ নং আয়াতে একাধারে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রাথমিক মূলনীতি সমূহ বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে করে ঐ মূলনীতি সমূহের ভিত্তিতে নতুন সমাজ ও নতুন সভ্যতা গড়ে তোলা হয়।

মে’রাজের প্রাক্কালীন ওহীর এই বক্তব্য সমূহ বক্ষে ধারণ করে যখন রসূল সা. ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করতেন, তখন সম্ভবতঃ আকাশ থেকে আলোর এক বিরাট স্রোতধারা নেমে আসতে দেখতেন। মক্কার এই ভীতিময় পরিবেশে যদি তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন বস্তুবাদী নেতা থাকতো, তাহলে সে হয়তো হতাশ হয়ে নিজের সমস্ত কর্মসূচী ও তৎপরতা বন্ধ করে দিত। কিন্তু রসূল সা. চরম প্রতিকূল ও হতাশঅব্যঞ্জক পরিবেশের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়েও নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতেন যে, প্রভাত আসছে। এই প্রভাত সমীরণের একটা ঝাপটা এসে যেন রসূলের সা. কানে কানে এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নতুনপ্রভাতের সূর্যদয় আর কোথাও নয় মদিনায়ই ঘটবে। কেননা ওখানকার তরুণরা পরম পরিতৃপ্তি ও আন্তরিকতার সাথে ইসলামী আন্দোলনে দীক্ষিত হতে আরম্ভ করেছিল।

মক্কী জীবনের অবসান কালে রসূল সা. তায়েফকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিলেন যে, তুমি কি সত্যের মশাল বহন করতে পারবে? তায়েফ জবাব দিল, আমি তো এ কাজে মক্কার চেয়েও অযোগ্য। এই হতাশাব্যঞ্জক জবাব শুনে রসূল সা. যখন পরবর্তী কর্মসূচী স্থির করার চিন্তায় মগ্ন, তখন ইয়াসরিব বললো, ‘আমি মদিনাতুন নবী (নবীর শহর) হতে প্রস্তুত। আমি সত্যের মশাল উঁচু করবো এবং সারা দুনিয়াকে আলোকিত করবো। আমার বুকের ওপর সত্য ও ন্যায়ের বিধান লালিত হবে। আমার কোলে এক নতুন ইতিহাস বিকাশ লাভ করবে।’ তায়েফ নিকটে থেকেও দূরে সরে গেল। ইয়াসরিব দূরে থেকেও নিকটে এসে গেল।

নবুয়তের একাদশ বছর ইয়াসরিব থেকে আগত ৬ জন বিপ্লবী যেদিন রসূল সা. এর সাথে অংগীকারে আবদ্ধ হলো, সেদিন ইয়াসরিব আরো নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল। বিস্তারিত আলাপ আলোচনার পর তারা ইসলামের তাওহীদ ও নৈতিক বিধিবিধান মেনে চলার যে শপথ করেন, তাকেই বলা হয় আকাবার প্রথম বায়াত। এরপর হজ্জের সময় আরো একটা বড় দল মদিনা থেকে আসে। তারাও রাতের অন্ধকারে এক গোপন বৈঠকে আকাবার দ্বিতীয় বায়য়াত সম্পন্ন করেন। এটি ছিলো পুরোপুরি রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত চুক্তি। এতে রসূল সা. এর হিজরত করে মদিনায় চলে যাওয়া স্থির হয় এবং এমন সর্বাত্মক ত্যাগের মনোভাব প্রতিফলিত হয় যে, মদিনার আনসারগণ রসূল সা. জন্য সমগ্র দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকার কথা ঘোষণা করেন।

তায়েফ সফর ও হিজরতের মধ্যবর্তী সময়টাতেই সম্ভবত সূরা ইউসুফ নাযিল হয়েছিল। এ সূরায় অন্য একজন নবী হযরত ইউসুফের জীবন কাহিনী বর্ণনা করে রসূল সা. কে সুসংবাদ দেয়া হয় এবং তাঁর শত্রুদেরকে তাদের অমানুষিক নির্যাতনমূলক কর্মকান্ড সম্পর্কে সাবধান করে তাদের শোচনীয় পরিণতি জানিয়ে দেয়া হয়।

 

বিদায় হে মক্কা!

অস্থিতিশীল নিমজ্জমান সমাজ ব্যবস্থার শেষ অস্ত্র হয়ে থাকে সহিংসতা, সন্ত্রাস ও নির্যাতন নিপীড়ন। এতেও যদি প্রতিপক্ষকে দমন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সংস্কার বিরোধীরা বিপ্লবী আন্দোলনের মূল নায়ককে হত্যা করতে কৃত সংকল্প হয়। মক্কাবাসীতো আগে থেকেই আক্রোশে অধীর ছিল এবং তাঁকে খতম করে দিতেই উৎসুক ছিল। কিন্তু পেরে ওঠেনি। এবার চরম মহুর্ত উপস্থিত। দ্বন্দ্ব সংঘাত একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল। একটা হেস্তনেস্ত হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ছাঁটাই বাছাই হয়ে পরস্পর থেকে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে। আকীদা বিশ্বাস ও মনমানসিকতার দিক দিয়ে একটা সুস্পষ্ট সীমারেখা চিহ্নিত হয়ে গেছে। এক পক্ষ এই সীমারেখার ওপারে রয়ে গেছে, আর এক পক্ষ এপারে। কোন পক্ষেরই আর ঐ সীমারেখা অতিক্রম করার সুযোগ নেই। ইসলামী আন্দোলন এখন একটা সুসংগঠিত ও সংঘবদ্ধ শক্তি। এর দলীয় শৃংখলা অটুট এবং চারিত্রিক মান অত্যন্ত উন্নত। এর যুক্তি খুবই ধারালো এবং আবেদন অসাধারণ রকমের চিত্তাকর্ষক। এর নেতা ও কর্মীদের ওপর পরিচালিত যুলুম নিপীড়ন জনগণের হৃদয় জয় করার ক্ষমতা রাখে। সত্যের ক্ষুদ্র চারাগাছটা পরিণত হয়েছে বিশাল মহীরূহে। জাহেলী সমাজের কর্ণধারদের কাছে কালও যে আশংকা ছিল নিছক আনুমানিক, আজ তা বাস্তব। উদ্ভুত উপস্থিতি তাদের কাছে দাবী জানাচ্ছিল যে, এই আশংকাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা যদি তোমাদের থেকে থাকে, তবে প্রতিহত কর। অন্যথায়, নবাগত যুগের যে আলোর সয়লাব আসছে, তাতে তোমাদের ধর্ম, পদ পদবী, জাহেলী ঐতিহ্য-সব কিছুই ভেসে যাবে। তারপর তোমাদের উদ্ধত মস্তককে নোয়াতে হবে মুহাম্মদ ও তাঁর আদর্শের সামনে। জাহেলিয়াতের নেতারা ইতিহাসের এ চ্যালেঞ্জ শুনতে পাচ্ছিলো এবং ক্রমাগত উৎকন্ঠিত হচ্ছিলো। তাই এই পর্যায়ে উপনীত হয়ে রসূল সা. এর রক্তপিপাসু দুশমনেরা তাঁর বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর চক্রান্তের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়।

ইসলামী আন্দোলনের সাথীদের জন্য যে মক্কা জ্বলন্ত চুলোর রূপ ধারণ করেছিল তা এমনিতেও উত্তাপের সর্বোচ্চ মাত্রায় উপনীত হয়েছিল। নির্যাতন ও নিপীড়ন অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কোরায়েশ নরপশুরা তাদের যুলুমের ষ্টীম রোলার চালিয়ে সত্যের নিশানাবাহীদের জীবন দুর্বিষহ করে এবং তাদের ধৈর্যর বাঁধ ভেংগে গিয়েছিল। এর স্পষ্ট অর্থ ছিল এই যে, এ পরিস্থিতিতে কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসন্ন, কোন মুক্তির পথ বেরিয়ে আসা অবধারিত এবং ইতিহাসের কোন নতুন অধ্যায় সংযোজন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কোরায়েশ তাদের জন্য এক বিরাট সৌভাগ্যের দরজা বন্ধ করে রেখেছিল। তারা নিজেদেরকে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হবার অযোগ্য প্রমাণ করেছিল। এহেন মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশে মে’রাজের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যখন রসূল সা. উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুসংবাদ দিলেন, আভাসে ইংগিতে হিজরতের পথ উন্মুক্ত হওয়ার ও তারপর ক্ষমতার যুগ শুরু হওয়ার আশ্বাস দিলেন, তখন মুসলমানদের মধ্যে নতুন আশা উদ্দীপনা সঞ্চারিত হলো। যারা সহিংসতার স্বীকার হয়েছিল, তারা সান্ত্বনা পেল এবং তাদের উৎসাহ বৃদ্ধি পেল। তারপর যখন রসূল সা. সেই প্রতিশ্রুত মহুর্তটি ঘনিয়ে আসতে দেখলেন তখন তার আবেগ ও অনুভূতি তুংগে উঠলো। তিনি গায়েবী সূত্র থেকে বুঝতে পারলেন যে, ভবিষ্যতের সেই হিজরতের স্থান হবে মদিনা। একদিকে পরিস্থিতির সুস্পষ্ট সাক্ষ্য, বিশেষতঃ আকাবার বায়য়াতের দুটো ঘটনা, অপর দিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত তথ্য থেকে এটা জানা যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে রসূল সা. তাঁর সাথীদের মদিনা চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন এবং সাহাবীগণ একের পর এক চলে যেতে লাগলেন। ক্রমান্বয়ে অনেকেই চলে গেল। মহল্লার পর মহল্লা খালি হয়ে গেল। একবার আবু জাহল অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কোরায়েশ নেতা বনু জাহশ গোত্রের শূন্য বাড়ীঘর দেখে মন্তব্য করলোঃ

‘এটা আমাদের ভাতিজার(মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কীর্তি। সে আমাদের ঐক্য ভেঙ্গে দিয়েছে। আমাদের সমাজকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। আমাদের পরস্পরের মধ্যে ভাংগন লাগিয়ে দিয়েছে।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃঃ ১১৪) সাথীদেরকে মদিনা পাঠানো সত্ত্বেও রসূল সা. নিজ দাওয়াতের কেন্দ্রভূমি ত্যাগ করেননি। তিনি আল্লাহর অনুমতির অপেক্ষায় ছিলেন। কোরায়শরা আটক করে রেখেছিলেন কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে যেতে বাধা দিয়েছিল, এমন স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তি ছাড়া কোন মুসলমানই আর মক্কায় অবশিষ্ট ছিল না। তবে ঘনিষ্ঠ সাথীদের মধ্যে যখন হযরত আবু বকর ও হযরত আলী তখনো মক্কায় ছিলেন। এহেন পরিস্থিতিতে যখন কোরায়েশরা বুঝতে পারলো যে, মুসলমানরা যখন একটা ঠিকানা পেয়ে গেছে এবং এক এক করে সবাই চলে গেছে, তখন মুহাম্মদ সা. অচিরেই আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। এরপর আমাদের আওতার বাইরে গিয়ে শক্তি অর্জন করবে এবং অতীতের সব কিছুর প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। তখন তারা সবাই মক্কার গণ মিলনস্থল ‘দারুননাদওয়া’তে সমবেত হলো এবং সলাপরামর্শ করতে লাগলো, মুহাম্মদের বিরদ্ধে এখন কী পদক্ষেপ নেয়া যায়। একটা প্রস্তাব এল, তাঁকে কোন লোহার তৈরী হাজতখানায় আটক করা হোক এবং দরজা বন্ধ করে রাখা হোক। এতে আপত্তি তোলা হলো যে, সে এমন এক ব্যক্তি, যার কথা বদ্ধ লোহার ঘর থেকেও বাইরে চলে যাবে। অন্য কোন উপায় খুঁজতে হবে। মজলিসের জনৈক সদস্য প্রস্তাব দিল, তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হোক। তারপর তার কী পরিণতি হয় তা দিয়ে আমাদের কী কাজ। কিন্তু এ প্রস্তাবেও আপত্তি উঠল। অনেকে বললো, তোমরা কি তার চিত্তাকর্ষক কথাবার্তা খবর রাখ না? সে কেমন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, তা কি তোমরা জাননা? এ সব জিনিসই তো তার জনমনে এত ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতারকারণ। এ পদক্ষেপ নিলে তার কবল থেকে তোমরা রেহাই পাবানা। সে আরবদের ওপর সর্বাত্মক প্রভাব বিস্তার করবে এবং নিজের বাগ্মীতার জোরে তাদেরকে স্বমতে দীক্ষিত করে ফেলবে। তারপর সমগ্র আরব জনগণকে সাথে নিয়ে তোমাদের ওপর হামলা চালাবে, ক্ষমতার বাগডোর তোমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে এবং তারপর তোমাদের সাথে যেমন খুশী আচরণ করবে। এবার ধুরন্ধর আবু জাহল এক সুচতুর কৌশল উদ্ভাবন করলো। সে বললো, মক্কার প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন শক্তিশালী ও প্রতাপশালী যুবককে বেছে নিয়ে তাদের সবাইকে তলোয়ার দিতে হবে এবং তারা সবাই একযোগে আক্রমন চালিয়ে মুহাম্মদকে সা. হত্যা করবে। এভাবেই আমরা তার খপ্পর থেকে মুক্তি পেতে পারি। এতে মুহাম্মদের খুনের দায়দায়িত্ব ও রক্তপণ সকল গোত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। বনু হাশেম গোত্র একাকী এত সব গোত্রের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারবে না এবং সে সাহস ও করবেনা। ব্যাস, এই কৌশলটাই সবার মনোপুত হয়ে গেল এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে এই ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক সমাপ্ত হলো। এই বৈঠকের সম্পর্কে কোরআন নিম্নরূপ পর্যালোচনা করেছেঃ

“আর সেই সময়টার কথা স্মরণ কর, যখন কাফেররা তোমাকে বন্দী করা, হত্যা করা বহিষ্কার করার ফান্দি আঁটছিল। তারা তাদের পছন্দমত চক্রান্ত আটে, আর আল্লাহ পাল্টা পরিকল্পনা করেন। আল্লাহ সবার চেয়ে দক্ষ পরিকল্পনাকারী।” (সূরা আনফাল-৩০)

রহস্যঘেরা সেই কালো রাত সামনে। দুপুর বেলা রসূল সা. তাঁর প্রিয়তম ও ঘনিষ্ঠতম সহচর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর বাড়ীতে গেলেন। গিয়ে গোপনে জানালেন, হিজরতের অনুমতি পেয়ে গেছি। হযরত আবু বকর রা. তার সহযাত্রী হবার অনুমতি চাইলেন। এ অনুমতি তিনি চাওয়ার আগেই পেয়েছিলেন। এ সৌভাগ্য লাভের জন্য আনন্দের আতিশয্যে হযরত আবু বকরের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। তিনি হিজরতের জন্য আগে থেকেই দুটো উটনীকে ভালোভাবে খাইয়ে দাইয়ে মোটাতাজা করে রেখেছিলেন। ঐ উটনী দুটো দেখিয়ে তিনি রসূল সা. কে বললেন, এই দুটোর যেটা আপনার ভালো লাগে হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করুন। কিন্তু রসূল সা অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ‘জায়দা’ নামক উটনীটাকে মূল্য দিয়ে কিনে নিলেন। রাত হলে রসূল সা. আল্লাহর ইংগিতক্রমে নিজের ঘরে ঘুমালেন না। তাঁর অপর প্রিয়তম সাথী হযরত আলীকে আপন বিছানায় নির্ভয়ে ঘুমানোর নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে লোকজনের রক্ষিত আমানতগুলো তাঁর কাছে অর্পণ করলেন এবং সকাল বেলা সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে ফেরত দিতে বললেন। এত উঁচু মানের নৈতিকতার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর কটাই বা আছে যে, এক পক্ষ যাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে, সে স্বয়ং হত্যাকারীদের আমানত ফেরত দেয়ার চিন্তায় বিভোর? এর পর রসূল সা. হযরত আবু বকর সিদ্দীকের বাড়ীতে চলে গেলেন। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর দ্রুত নিজের কোমরের বেল্ট কেটে দুটো বানালেন এবং একটি দিয়ে খাবারের পুটুলি ও অপরটা দিয়ে পানির মসকের মুখ বাঁধলেন। সত্যের পথের এই দুই অভিযাত্রী রাতের আধারে রওয়ানা হয়ে গেলেন।

আজ বিশ্বমানবতার সবচেয়ে বড় উপকারী ও শুভাকাংখী বন্ধুর সা. একেবারেই বিনা অপরাধে আপন ঘরবাড়ী থেকে বিতাড়িত হবার দিন। আজ তিনি সেই সব অলিগলিকে বিদায় জানাতে জানাতে যাত্রা করেছেন, যেখানে চলাফেরা করে তিনি বড় হয়েছেন, যার ওপর দিয়ে তিনি সত্যের বাণী সমুন্নত করতে হাজার হাজার বার দাওয়াতী সফর করেছেন, যেখানে তিনি অসংখ্য গালাগাল খেয়েছেন এবং নির্যাতন সয়েছেন। আজ তাঁর হারাম শরীফের পবিত্র আধ্যাত্মিক কেন্দ্র থেকে বিদায় নেয়ার পালা, যেখানে তিনি বহুবার সিজদা করেছেন, বহুবার আপন জাতির কল্যাণ ও সুখশান্তির জন্য দোয়া করেছেন, বহুবার কোরআন পড়েছেন, বহুবার এই চত্তরে ও নিরাপত্তার গ্যারান্টিযুক্ত এই একমাত্র আশ্রয়স্থলেও বিরোধীদের হাতে নিপীড়িত হয়েছেন এবং মর্মঘাতী বোলচাল শুনেছেন। যে শহরে হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ. এর পবিত্র স্মৃতি ও কীর্তি রক্ষিত এবং যে শহরের আকাশ বাতাস আজও তাঁর দোয়ায় মুখরিত, সেই শহরকে আজ তাঁর শেষ সালাম নিবেদন করতে যাচ্ছেন।

এটা করতে গিয়ে তাঁর হৃদয় যে বিদীর্ণ হয়ে গেছে, কলিজা যে কেটে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে, চোখে যে অশ্রুর বান ডেকেছে, সেতো সম্পুর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও জীবনের লক্ষ্য অর্জনে যেহেতু এ কুরবানীর প্রয়োজন ছিল, তাই শ্রেষ্ঠ মানব এ কুরবানীও দিতে দ্বিধা করলেন না।

আজ মক্কার দেহ থেকে যেন তাঁর প্রাণ বেরিয়ে গেছে। মক্কার বাগানের ফুল থেকে যেন সুগন্ধি হারিয়ে গেছে। এর ঝর্ণা যেন শুকিয়ে গেছে। কারণ তার সমাজের ভেতর থেকে নীতিবান ও চরিত্রবান লোকগুলো বেরিয়ে গেছে।

সত্যের দাওয়াতের চারা গাছটি মক্কার মাটিতেই জন্মেছিল। কিন্তু তার ফল আহরণ করার সৌভাগ্য মক্কাবাসীর কপালে জোটেনি। এ সৌভাগ্য অর্জন করল মদিনাবাসী এবং সারা দুনিয়ার অধিবাসীরা। মক্কাবাসীকে আজ ধাক্কা দিয়ে পিছনে হটিয়ে দেয়া হলো এবং মদিনাবাসীর জন্য সামনের কাতারে জায়গা বানানো হলো। যারা নিজেদেরকে বড় মনে করত, অভিজাত ও কুলীন মনে করত, তাদেরকে নিম্নতর স্তরে নামিয়ে দেয়া হলো। আর যাদেরকে অপেক্ষাকৃত নীচ মনে করা হতো, তাদের জন্যই আজকের দিনে বরাদ্দ হলো উচ্চতর ও শ্রেষ্ঠতর স্থান।

রসুল সা. শেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মক্কাকে বললেনঃ

“আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর সবোর্ত্তম ভূখণ্ড এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে সবার্পেক্ষা প্রিয় ভূখণ্ড। আমাকে এখান থেকে জোরপূবর্ক তাড়িয়ে দেয়া না হলে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” (তিরমিযী)

কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সূর পবর্ত গুহায় উপনীত হলেন।

কোন্‌ পথ ধরে যেতে হবে, সেটা স্বয়ং রাসুল সা. নির্ধারণ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ বিন আরিকতকে নির্দিষ্ট মজুরীর ভিত্তিতে পথ প্রদর্শক নিয়োগও তিনিই করলেন। তিনি তিন দিন গুহায় কাটালেন। হযরত আবু বকরের ছেলে আব্দুল্লাহ রাতে মক্কার সমস্ত খবর পৌছাতেন। আমের বিন ফুহাইরা (হযরত আবু বকরের ক্রীতদাস) মেষপাল নিয়ে সারাদিন গুহার আশপাশ দিয়ে চরিয়ে বেড়াতো, আর অন্ধকার হলে গুহার কাছে নিয়ে যেত, যাতে হযরত আবু বকর ও রসূল সা. প্রয়োজনীয় দুধ নিতে পারেন।

এদিকে কোরায়েশরা সারা রাত রসূল সা. এর বাড়ী ঘেরাও করে রাখলো। তাছাড়া পুরো শহরের চতুঃসীমানাও বন্ধ করে রাখা হলো। কিন্তু সহসা যখন তারা জানতে পারলো যে, সেই ইপ্সিত ব্যক্তিটাই হাতছাড়া হয়ে গেছে, তখন তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। রসূল সা. এর বিছানায় আলীকে দেখে তারা গভীর হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল এবং তাঁকে অনেক বকাবকি করে গায়ের ঝাল মিটিয়ে চলে গেল। চারদিকে তালাশ করতে লোক পাঠানো হলো। কিন্তু কোন হদিসই মিললোনা। একটা দল অনেক দৌড়ঝাপ করে সূর পবর্তগুহার ঠিক মুখের উপর এসে পড়লো। ভেতর থেকে তাঁদের পা পর্‍যন্ত দেখা যেতে লাগল। কী সাংঘাতিক নাজুক মূহুর্ত ছিল সেটি, তা ভাষায় বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। হযরত আবু বকর এই ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন যে, এই লোকগুলো গুহায় ঢুকে পড়লে গোটা ইসলামী আন্দোলন হুমকীর সম্মুখীন হবে। এরূপ মূহুর্তে সাধক মানবীয় স্বভাবপ্রকৃতির অধিকারী কোন মানুষের ভেতর যে ধরণের অনুভূতি সৃষ্টি হওয়ার কথা, হযরত আবু বকরের মধ্যে সে ধরণেরই অনুভূতি জন্মেছিল। কিন্তু যেহেতু রসূল সা. কে আল্লাহর কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল, এবং তাঁর পক্ষ থেকে সাহায্য ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, তাই তিনি নিশ্চিতভাবে জানতেন যে, আল্লাহ আমাদেরকে নিরাপদে রাখবেন। তথাপি হযরত মূসার কাছে যেমন ওহি যোগে ‘ভয় পেয়োনা’- এই আশ্বাসবাণীটা এসেছিল,তেমনি রসূল সা. এর কাছেও এল। তিনি সাথী আবু বকরকে বললেন “তুমি চিন্তা করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” তাই দেখা গেল, যারা গর্তের মুখের কাছে এসেছিল, তারা এখান থেকেই ফিরে গেল।

তিন দিন গুহার মধ্যে অবস্থান করার পর রসূল সা. হযরত আবু বকর ও পথ প্রদর্শক আমের বিন ফুহাইরাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। কোরায়েশের গোয়েন্দারা যাতে তাদের পিছু নিতে না পারে, সে জন্য সাধারণ চলাচলের পথ বাদ দিয়ে সমুদ্রোপকূলের দীর্ঘ পথ অবলম্বন করা হয়। এদিকে মক্কায় ঘোষণা করা হয় যে, মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর- এই দু’জনের যে কোন একজনকেও কেউ যদি হত্যা অথবা গ্রেফতার করতে পারে, তবে তাকে শত শত উট পুরস্কার দেয়া হবে। অনেকেই খোঁজাখুঁজিতে ব্যাপৃত হয়ে পড়ে। সুরাকা বিন জা’সাম খবর পেল যে, এ ধরণের দু’জনকে উপকূলীয় সড়কে দেখা গেছে। সে একটা বর্শা হাতে ঘোড়া হাঁকিয়ে রওনা হয়ে গেল। কাছাকাছি এসেই সুরাকা যখন ত্বরিত গতিতে ধাওয়া করলো, অমনি তার ঘোড়ার সামনের দু’পা মাটিতে দেবে গেল। সুরাকা দু’তিনবার ব্যর্থ চেষ্টা চালানোর পর ক্ষমা চাইল এবং একটা লিখিত নিরাপত্তানামাও চাইল। এর অর্থ দাঁড়ায়, সে উপলব্ধি করল যে, এই ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে একটা নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। নিরাপত্তানামা লিখে দেয়া হলো। সেই নিরাপত্তানামা মক্কা বিজয়ের দিন কাজে লাগলো। এই সময় রসূল সা. সুরাকাকে এই বলে সুসংবাদও দিলেন যে, ‘হে সুরাকা, তুমি যেদিন ইরানের সম্রাটের কংকন পরবে, সেদিন তোমার কেমন মর্‍যাদা হবে দেখ।’ হযরত ওমরের খেলাফত যুগে ইরান জয়ের সময় এ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছিল। এই সময় হযরত যোবায়ের ব্যবসায়ী কাফেলার সাথে সিরিয়া থেকে আসছিলেন। পথিমধ্যে তিনি রসূল সা. ও আবু বকরের সাথে মিলিত হন এবং উভয়কে সাদা পোশাক হাদিয়া দেন।

এই সফর কালে বারীদা আসলামীও ৭০ জন সাথী সমেত তাঁদের সাথে সাক্ষাত করেন। মূলত তাঁরা পুরস্কারের লোভে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সামনে আসামাত্রই বারীদার মধ্যে পরিবর্তন এল। পরিচয় গ্রহণের সময়ই যখন রসূল সা. তাকে সুসংবাদ দিলেন যে, “তোমার অংশ নির্ধারিত হয়ে গেছে” (অর্থাৎ তুমিও ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে অবদান রাখবে এটা নির্ধারিত হয়ে গেছে)। তখন বারীদা তাঁর সত্তর জন সাথীসহ ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর বারীদা বললো, ‘রসূল সা. মদিনায় প্রবেশকালে তাঁর সামনে একটা পতাকা থাকা উচিত।’ রসূল সা. সম্মতি দিলেন এবং নিজের পাগড়ি বর্শার মাথায় বেঁধে বারীদার হাতে সমর্পণ করলেন। এই পতাকা উড়িয়ে এই কাফেলা মদিনায় প্রবেশ করলো।

*******

“অবশ্য অবশ্য তোমাদেরকে প্রাণ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করা হবে। আর আহলে কিতাব ও মোশরেক- উভয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে তোমাদের অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে হবে। এ সব পরীক্ষায় তোমরা অবিচল থাকতে পারলে এবং (নোংরামি থেকে) সংযত থাকলে নিঃসন্দেহে সেটা হবে সাহসিকতাপূর্ণ কীর্তি।” (আল ইমরান, ১৮৬)

*******

‘কোন নবীর প্রতি তাঁর আত্মীয় স্বজনের যতটা অসদাচারী হওয়া সম্ভব, তোমরা ততটাই অসদাচারী ছিলে। তোমরা আমাকে অবিশ্বাস করলে আর অন্যরা আমার সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিল। তোমরা আমাকে মাতৃভূমি থেকে বহিষ্কার করলে, আর অন্যরা আমাকে নিজেদের কাছে ঠাই দিল। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে। আর অন্যরা আমার সহযোগিতা করলো।’

- বদরের ময়দানে মোশরেকদের লাশকে সম্বোধন করে দেয়া রসূল সা. এর ভাষণ।


সর্বশেষ আপডেট ( Friday, 20 December 2013 )