আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Saturday, 07 October 2006
আর্টিকেল সূচি
ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি
পাতা 2
পাতা 3
পাতা 4
পাতা 5
পাতা 6

মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও ইসলামী নৈতিক শক্তির তারতম্য

জাগতিক জড়শক্তি এবং নৈতিক শক্তির তারতম্য সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের গভীরতর অধ্যয়নের পর আল্লাহর এই সুন্নাত বা রীতি আমি বুঝতে পেরেছি যে, সেখানে নৈতিক শক্তি বলতে কেবল মাত্র মৌলিক মানবীয় চরিত্রই হবে, সেখানে জাগতিক উপায়-উপাদন ও জড়শক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। এমনকি, একটি বৈষয়িক জড়শক্তি যদি বিপুল পরিমাণে বর্তমান থাকে তবে সামান্য নৈতিক শক্তির সাহায্যেই সে সারাটি দুনিয়া গ্রাস করতে পারে। আর অপর দল নৈতিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠতর হয়েও কেবলমাত্র বৈষয়িক শক্তির অভাব হেতু সে পশ্চাৎপদ হয়ে থাকবে। কিন্তু যেখানে নৈতিক শক্তি বলতে ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় চরিত্র উভয়ের প্রবল শক্তির সমন্বয় হবে, সেখানে বৈষয়িক জড়শক্তির সাংঘাতিক পরিমাণ অভাব হলেও নৈতিক শক্তিই জয়লাভ করবে এবং নিছক মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও বৈষয়িক জড়শক্তির ভিত্তিতে যে শক্তিসমূহ মস্তক উত্তোলন করবে তা নিশ্চিতরূপেই পরাজিত হবে। সুস্পষ্টরূপে বুঝার জন্য একটি হিসেবের অবতারণা করা যেতে পারে। মৌলিক মানবীয় চরিত্রের সাথে যদি একশত ভাগ বৈষয়িক জড়শক্তি অপরিহার্য হয় তবে ইসলামী নৈতিকতা ও মৌলিক মানবীয় চরিত্রের পূর্ণ সমন্বয় হওয়ার পর মাত্র ২৫ ভাগ বৈষয়িক জড়শক্তি উদ্দেশ্য লাভের জন্য যথেষ্ট হবে। অবশিষ্ট ৭৫ ভাগ জড়শক্তির অভাব কেবল ইসলামী নৈতিকতাই পূরণ করে দেবে। উপরন্তু নবী করীমের (সা) জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা হতে জানা যায় যে, রসূলে করীম (সা) এবং তার আসহাবদের সমপরিমাণ ইসলামী নৈতিকতা হতে মাত্র শতকরা পাঁচ ভাগ জড়শক্তিই উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যথেষ্ট হতে পারে। এই নিগূঢ় তত্ত্ব ও সত্য বলা হয়েছে কুরআন মজীদের নিম্নলিখিত আয়াতেঃ

ان يكن منكم عشرون صابرون يغلبوا مائتين

“তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন পরম ধৈর্যশীল লোক হয় তবে তারা দু’শ জনের উপর জয়ী হতে পারবে।”

এই শেষোক্ত কথাটিকে নিছক ‘অন্ধভক্তি ভিত্তিক ধারণা’ মনে করা ভুল হবে। আর আমি যে কোনো মো’জেযা বা কেরামতির কথা বলছি, তাও মনে করবেন না। বস্তুত এটা এক বাস্তব এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কথা সন্দেহ নেই। এই সত্য তত্ত্ব কার্যকারণ পরম্পরা অনুযায়ী এই দুনিয়াতেই পরিস্ফুট হয় সকল সময় এটা পরিস্ফূট হতে পারে। এর কারণ যদি বর্তমান থাকে, তবে তা নিশ্চয়ই বাস্তবে রূপায়িত হবে।

কিন্তু ইসলামী নৈতিকতা যার মধ্যে মৌলিক মানবীয় চরিত্রও ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত রয়েছে বৈষয়িক জড়শক্তির শতকরা ৭৫ ভাগ বরং ৫০ ভাগ অভাব কিরূপে পূরণ করে ; তা একটি নিগূঢ় রহস্য বটে। কাজেই সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে এর বিশ্লেষণ হওয়া একান্ত আবশ্যক।

এই রহস্য হৃদয়ংগম করার জন্য সমসাময়িককালের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করাই যথেষ্ট। বিগত মহাযুদ্ধের সর্বাত্মক বিপর্যয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে জাপান ও জার্মানীর পরাজয় ঘটে। মৌলিক মানবীয় চরিত্রের দিক দিয়ে এই বিপর্যয়ের সংশ্লিষ্ট উভয় দলই প্রায় সমান। বরং সত্য কথা এই যে, কোনো দিক দিয়ে জার্মান ও জাপান মিত্র পক্ষের মোকাবিলায় অধিকতর মৌলিক মানবীয় চরিত্রের প্রমাণও উপস্থিত করেছে। জড়বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং এর বাস্তব প্রয়োজনের ব্যাপারেও উভয় পক্ষই সমান ছিলো। বরং সত্য কথা এই যে, এই ক্ষেত্রে জার্মানীর শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজন বিদিত। কিন্তু এতদসত্বেও কেবল একটি ব্যাপারেই এক পক্ষ অপর পক্ষ হতে অনেকটা অগ্রসর আর তা হচ্ছে বৈষয়িক কার্যকারণের আনুকুল্য। এই জনশক্তির অপরাপর সকল পক্ষ অপেক্ষাই অনেকগুণ বেশি। বৈষয়িক জড় উপায়-উপাদান তারা সর্বাপেক্ষা অধিক রয়েছে। এর ভৌগলিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ঐতিহাসিক কার্যকারণ অপরাপর পক্ষের তুলনায় বহুগুণ বেশি অনুকূল পরিস্থিতির উদ্‌ভব করে নিয়েছিল। ঠিক এজন্য মিত্রপক্ষ বিজয় মাল্যে ভূষিত হয়। আর এজন্যই যে জাতির জনসংখ্যা অপর্যাপ্ত, বৈষয়িক জড় উপায়-উপাদান যার নিকট কম, তার পক্ষে অধিক জনসংখ্যা সমন্বিত ও বিপুল জাগতিক উপায়-উপাদান বিশিষ্ট জাতির মোকাবিলায় মস্তকোত্তলন করে দণ্ডায়মান হওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও জড়বিজ্ঞান ব্যবহারের দিক দিয়ে খুব বেশি অগ্রসর হলেও এর ব্যতিক্রম হতে পারে না। কারণ মৌলিক মানবীয় চরিত্র প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে উত্থিত জাতি হয় জাতীয়তাবাদী হবে এবং পৃথিবীর অন্যান্য অংশও অধিকার করতে প্রয়াসী হবে, নতুবা তা এক সার্বজনীন আদর্শ ও নিয়ম বিধানের সমর্থক হবে এবং তা গ্রহণ করার জন্য দুনিয়ার অন্যান্য জাতিসমূহকেও আহবান জানাবে। সে জাতির এ দু’টির যে কোনো এক অবস্থা নিশ্চয়ই হবে। প্রথম অবস্থা হলো বৈষয়িক জড়শক্তি ও জাগতিক উপায়-উপাদানের দিক দিয়ে অন্যান্য জাতি অপেক্ষা তার শ্রেষ্ঠ ও অগ্রসর হওয়া ভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করার দ্বিতীয় কোনো পন্থা আদৌ থাকতে পারে না। এর কারণ এই যে, যেসব জাতিকে সে প্রভুত্ব ও ক্ষমতা লিপ্সার অগ্নিযজ্ঞে আত্মাহুতি দিতে কৃত সংকল্প হয়েছে তারা অত্যন্ত তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে তার প্রতিরোধ করবে এবং তার পথরোধ করতে নিজেদের সমগ্র শক্তি নিয়োজিত করবে। কাজেই তখন আক্রমণকারী জাতির পরাজয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু উক্ত জাতির যদি দ্বিতীয় অবস্থা হয় যদি উহা কোনো সার্বজনীন আদর্শের নিশান বরদার হয়, ও মস্তিষ্ক প্রভাবান্বিত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তখন জাতিকে প্রতিবন্ধকতার পথ হতে অপসৃত করতে খুব বেশি শক্তি প্রয়োগ করার আবশ্যক হবে না। কিন্তু এখানে ভুললে চলবে না যে, মুষ্টিমেয় কয়েকটি মানোমুগ্ধকর নীতি-আদর্শই কখনো মানুষের মন ও মস্তিষ্ক প্রভাবান্বিত করতে পারে না। সে জন্য সত্যিকার সদিচ্ছা, সহানুভূতি, হিতাকাঙ্খা, সততা, সত্যবাদিতা, নিঃস্বার্থতা, উদারতা, বদান্যতা, সৌজন্য ও ভদ্রতা এবং নিরপেক্ষ সুবিচার নীতি একান্ত অপরিহার্য। শুধু তাই নয়, এই মহৎ গুণগুলোকে যুদ্ধ-সন্ধি, জয়-পরাজয়, বন্ধুতা-শত্রুতা এই সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই কঠিন পরীক্ষায় অত্যন্ত খাঁটি অকৃত্রিম ও নিষ্কলুষ প্রমাণিত হতে হবে। কিন্তু এরূপ ভাবধারার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে উন্নত চরিত্রের উচ্চতম ধাপের সাথে এবং তার স্থান মৌলিক মানবীয় চরিত্রের অনেক ঊর্ধে। ঠিক এ কারণেই নিছক মৌলিক মানবীয় চরিত্র ও বৈষয়িক শক্তির ভিত্তিতে উত্থিত জাতি প্রকাশ্যভাবে জাতীয়তাবাদীই হোক কি গোপন জাতীয়তাবাদের সাথে কিছুটা সার্বজনীন আদর্শের প্রচার ও সমর্থন করার ছদ্মবেশই ধারণ করুক- একান্ত ব্যক্তিগত কিংবা শ্রেণীগত অথবা জাতীয় স্বার্থ লাভ করাই হয় তার যাবতীয় চেষ্টা-সাধনা ও দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। বর্তমান সময় আমেরিকা, বৃটেন, রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে ঠিক এই ভাবধারাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ধরনের যুদ্ধ-সংগ্রামের ক্ষেত্রে অতি স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেকটি জাতি প্রতিপক্ষের সামনে এক দুর্জয় দুর্গের ন্যায় হয়ে দাঁড়ায় এবং তার প্রতিরোধে স্বীয় সমগ্র নৈতিক ও বৈষয়িক শক্তি প্রয়োগ করে। তখন আক্রমণকারী জাতির শ্রেষ্ঠতর জড়শক্তির আক্রমণে শত্রু পক্ষকে সে নিজ দেশের চতুর্সীমার মধ্যে কিছুতেই প্রবেশ করতে দিবে না।

কিন্তু এই সময় এরূপ পরিবেশের মধ্যে এমন একটা মানবগোষ্ঠী যদি বর্তমান থাকে প্রথমত তা একটি জাতির লোকদের সমন্বয়ে গঠিত হয়ে থাকলেও কোনো দোষ নেই যদি তা একই জাতি হিসেবে না উঠে একটি আদর্শবাদী জামায়াত হিসেবে দণ্ডায়মান হয়, যা সকল প্রকার ব্যক্তিগত, শ্রেণীগত ও জাতীয় স্বার্থপরতার বহু উর্ধে থেকে বিশ্বমানবতাকে আমন্ত্রণ জানাবে যার সমগ্র চেষ্টা-সাধনার চরম লক্ষ্য হবে নির্দিষ্ট কতোকগুলো আদর্শের অনুসরণের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানবতার মুক্তিসাধন এবং সেই আদর্শ ও নীতিসমূহের ভিত্তিতে মানব জীবনের গোটা ব্যবস্থার পুনপ্রতিষ্ঠা সাধন। ঐসব নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে এই দল যে জাতি গঠন করবে, তাতে জাতীয়, ভৌগলিক, শ্রেণীগত ও বংশীয় বা গোত্রীয় বৈষম্যের নামগন্ধও থাকবে না। সকল মানুষই তাতে সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে এবং সকলেই সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারবে। এই নবপ্রতিষ্ঠিত জাতির মধ্যে নেতৃত্ব পথ নির্দেশকারী মর্যাদা কেবল সেই ব্যক্তি বা সেই মানব সমষ্টিই লাভ করতে পারবে, যারা সেই আদর্শ ও নীতির অনুসরণ করে চলার দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা অগ্রসর ও শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হবে। তখন তার বংশ মর্যাদা বা আঞ্চলিক জাতীয়তার কোনো তারতম্য বিচার হবে না এমনকি, এই নতুন সমাজে এতোদুরও হতে পারে যে, বিজিত জাতির লোক ঈমান এনে নিজেকে অন্যান্যের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আদর্শানুসরণে এবং যোগ্যতার প্রমাণ করতে পারলে বিজয়ী তার সকল চেষ্টা ও যুদ্ধ সংগ্রাম লব্ধ যাবতীয় ‘ফল’ তার পদতলে এনে ঢেলে দিবে এবং তাকে ‘নেতা’ রূপে স্বীকার করে নিজে ‘অনুসারী’ হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত হবে।

এমন একটি আদর্শবাদী দল যখন নিজেদের আদর্শ প্রচার করতে শুরু করে, তখন এই আদর্শের বিরোধী লোকগণ তাদের প্রতিরোধ করতে উদ্যত হয়। ফলে উভয় দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের তীব্রতা যতোই বৃদ্ধি পায় আদর্শবাদী দল বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলায় ততোই উন্নত চরিত্র ও মহান মানবিক গুণ মহাত্মের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে থাকে। সে তার কর্মনীতি দ্বারা প্রমাণ করে যে, মানব সমষ্টি তথা গোটা সৃষ্টিজগতের কল্যাণ সাধন ভিন্ন তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। বিরুদ্ধবাদীদের ব্যক্তি সত্ত্বা কিংবা তাদের জাতীয়তার সাথে এর কোনো শত্রুতা নেই। শত্রুতা আছে শুধু তাদের গৃহীত জীবনধারা ও চিন্তা মতবাদের সাথে। তা পরিত্যাগ করলেই তার রক্ত পিপাসু শত্রুকেও প্রাণভরা ভালবাসা দান করতে পারে বুকের সঙ্গে মিলাতে পারে। পরন্তু সে আরও প্রমাণ করবে যে, বিরুদ্ধ পক্ষের ধন-দৌলত কিংবা তাদের ব্যবসায় ও শিল্পপণ্যের প্রতিও তার কোনো লালসা নেই, তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ সাধনই তার একমাত্র কাম্য। তা লাভ হলেই যথেষ্ট। তাদের ধন-দৌলত তাদেরই সৌভাগ্যের কারণ হবে। কঠিন কঠোরতম পরীক্ষার সময়ও এই দল কোনোরূপ মিথ্যা, প্রতারণা ও শঠতার আশ্রয় নেবে না। কুটিলতা ষড়যন্ত্রের প্রত্যুত্তরে তারা সহজ-সরল কর্মনীতিই অনুসরণ করবে। প্রতিশোধ গ্রহণের তীব্র উত্তেজনার সময়ও অত্যাচার-অবিচার, উৎপীড়নের নির্মমতায় মেতে উঠবে না। যুদ্ধের প্রবল সংঘর্ষের কঠিন মুহুর্তেও তারা নিজেদের নীতি আদর্শ পরিত্যাগ করবে না। কারণ সেই আদর্শের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যই তো তার জন্ম। এজন্য সততা, সত্যবাদিতা, প্রতিশ্রুতি পূরণ, নির্মল আচার-ব্যবহার ও নিঃশ্বার্থ কর্মনীতির উপর তারা দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকে। নিরপেক্ষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রথমত আদর্শ হিসেবে সততা ও ন্যায়বাদের যে মানদণ্ড বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করেছিল, নিজেকে এর কষ্টিপাথরে যাচাই করে সত্য এবং খাঁাটি বলে প্রমাণ করে দেয়। শত্রু পক্ষের ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, জুয়াড়ী, নিষ্ঠুর ও নির্দয় সৈন্যদের সাথে এই দলের আল্লাহভীরু, পবিত্র চরিত্র, মহান আত্মা-দয়ার্দ্র হৃদয় ও উদার উন্নত মনোবৃত্তি সম্পন্ন মুজাহিদদের প্রবল মোকাবিলা হয়, তখন এই দলের প্রত্যেক ব্যক্তিরই ব্যক্তিগত মানবিক ও গুণ-গরিমা প্রতিপক্ষের পাশবিক ও বর্বরতার উপর উজ্জ্বল উদ্‌ভাসিত হয়ে লোকচক্ষুর সামনে প্রকটিত হতে থাকে। শত্রু পক্ষের লোক আহত বা বন্দী হয়ে আসলে চতুর্দিকে ভদ্রতা, সৌজন্য, পবিত্রতা ও নির্মল মানসিক চরিত্রের রাজত্ব বিরাজমান দেখতে পায় এবং তা দেখে তাদের কলুষিত আত্মাও পবিত্র ভাবধারার সংস্পর্শে কলুষমুত্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে এই দলের লোক যদি বন্দী হয়ে শত্রু পক্ষে শিবিরে চলে যায়, সেখানকার অন্ধকারাচ্ছন্ন পূতিগন্ধময় পরিবেশে এদের মনুষ্যত্বের মহিমা আরো উজ্জল ও চাকচিক্যপূর্ণ হয়ে উঠে। এরা কোনো দেশ জয় করলে বিজিত জনগণ প্রতিশোধের নির্মম আঘাতের পরিবর্তে ক্ষমা করুণা পায়, কঠোরতা নির্মমতার পরিবর্তে সহানুভূতি ; গর্ব অহংকার ও ঘৃণার পরিবর্তে পায় সহিষ্ণুতা ও বিনয় ; ভৎসনার পরিবর্তে পায় সাদর সম্ভাষণ এবং মিথ্যা প্রচারণার পরিবর্তে সত্যের মূলনীতিসমূহের বৈজ্ঞানিক প্রচার। আর এসব দেখে খুশিতে তাদের হৃদয় মন ভরে উঠে। তারা দেখতে পায় যে, বিজয়ী সৈনিকরা তাদের নিকট নারীদেহের দাবি করে না, গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে ধন-সম্পত্তি খোঁজ করে বেড়ায় না, তাদের শৈল্পিক গোপন রহস্যের সন্ধান করার জন্যও এরা উদগ্রীব নয়, তাদের অর্থনৈতিক শক্তি সম্পদকে ধ্বংস করার চিন্তাও এদের নেই। তাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও সম্মান মর্যাদার উপরও এরা হস্তক্ষেপ করে না। বিজিত জনতা শুধু দেখতে পায়, এরা এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন এই জন্য যে বিজিত দেশের একটি মানুষেরও সম্মান বা সতীত্ব যেনো নষ্ট না হয়, কারো ধনমাল যেনো ধ্বংস না হয়, কেউ যেনো সংগত অধিকার হতে বঞ্চিত না থেকে যায়, কোনোরূপ অসচ্চরিত্রতা তাদের মধ্যে যেনো ফুটে না উঠে এবং সামগ্রিক জুলুম-পীড়ন যেনো কোনোরূপেই অনুষ্ঠিত হতে না পারে।

পক্ষান্তরে শত্রু পক্ষ যখন কোনো দেশে প্রবেশ করে, তখন সে দেশের সমগ্র অদিবাসী তাদের অত্যাচার, নির্মমতা ও অমানুষিক ধ্বংসলীলায় আর্তনাদ করে উঠে একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যায়, এই ধরনের আদর্শবাদী জিহাদের সাথে জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ সংগ্রামের কতো আকাশ স্পর্শী পার্থক্য হয়ে থকে। এই ধরনের লড়াইয়ে উচ্চতর মানবিকতা নগণ্য বৈষয়িক শক্তি সামর্থ সহকারে ও শত্রুপক্ষের লৌহবর্ম রক্ষিত পাশবিকতাকে যে অতি সহজেই প্রথম আক্রমণেই পরাজিত করবে তাতে আর সন্দেহ কি? বস্তুত উন্নত নির্মল নৈতিকতার হাতিয়ার বন্দুক-কামানের গোলাগুলি অপেক্ষাও দূর পাল্লায় গিয়ে লক্ষ্যভেদ করবে। প্রচন্ড লড়াইয়ে কঠিন মুহূর্তেও শত্রুরা বন্ধুতে পরিণত হবে। দেশের পূর্বে মানুষের হৃদয়-মন বিজিত হবে, দেশের পর দেশ-জনপদের পর জনপদ বিনাযুদ্ধেই পরাজয় স্বীকার করে মুক্তির চিরন্তন স্বাদ গ্রহণ করবে। ওদিকে এই সত্যনিষ্ঠ আদর্শবাদী দল যখন নিজেদের মুষ্টিমেয় জনসংখ্যা অত্যল্প উপায়-উপাদান সহকারে গঠনমূলক কাজ শুরু করবে, তখন সেনাপতি, সৈনিক, যোদ্ধা, বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী, অস্ত্রশস্ত্র, রসদ এবং যুদ্ধের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম সবকিছুই ধীরে ধীরে বিরোধী শিবির হতে পাওয়া যাবে, তাতে সন্দেহ নেই।

আবার এই উক্তি নিছক কল্পনা-ধারণা এবং আন্দাজ অনুমানের উপরই ভিত্তিশীল নয়, নবী করীম (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সোনালী যুগের ঐতিহাসিক উদাহরণসমূহ হতে একথা প্রমাণিত হয় যে, ইতিপূর্বেও এরূপ ঘটনা ঘটেছে এবং আজও এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। অবশ্য সেজন্য শর্ত এই যে, এরূপ অভিজ্ঞতালাভের জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি ও সৎ সহাস নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

আমি আশা করি, আমার উপরোক্ত বিস্তারিত আলোচনা হতে আমার একথা সুষ্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রকৃতপক্ষে নৈতিক শক্তিই হচ্ছে শক্তির আসল উৎস। কাজেই দুনিয়ার কোনো মানব সমষ্টি যদি মৌলিক মানবীয় চরিত্রের সঙ্গে ইসলামী নৈতিকতারও আধার হয় তখন তার বর্তমানে অন্য কোনো দলের পক্ষে দুনিয়ার নেতৃত্ব এবং কতৃêত্বের অধিকারী হয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কঠিন এবং স্বভাবতই তা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত মুসলমানদের বর্তমান অধপতনের মূলীভূত কারণ কি উপরের আলোচনা হতে তাও আশা করি সুষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যারা না বৈষয়িক উপায়-উপাদান প্রয়োগ করবে, না মৌলিক মানবীয় চরিত্রে ভুষিত হবে, আর না সমষ্টিগতভাবে ইসলামী নৈতিকতার অস্তিত্বই তাদের মধ্যে থাকবে, তারা যে দুনিয়ার নেতৃত্বের আসনে কিছুতেই অধিষ্ঠিত থাকতে পারে না, এটা সর্বজন বিদিত সত্য। এমতাবস্থায় এমনসব কাফের লোকদেরই কর্তৃত্ব দান করা আল্লাহর স্থায়ী রীতি, যাদের ইসলামী নৈতিকতা না থাকলেও মৌলিক মানবীয় চরিত্র তো রয়েছে, আর জাগতিক জড় উপায়-উপাদান ব্যবহার এবং শাসন শৃংখলা রক্ষার দিক দিয়ে নিজেদেরকে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করেছে। এই ক্ষেত্রে মুসলমানদের কোনো অভিযোগ করার থাকলে তা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই হতে পারে, এ ব্যাপারে আল্লাহর স্থায়ী নিয়ম-বিধানের আদৌ কোনো ত্রুটি নেই। আর নিজেদের বিরুদ্ধে যদি বাস্তবিকই কোনো অভিযোগ জাগে, তাদের অনিবার্য ফলে নিজেদের যাবতীয় দোষ-ত্রুটি সংশোধন করার জন্য যত্নবান হওয়া এবং যে কারণে মুসলমান নেতৃত্বের আসন হতে বিচ্যুত হয়ে অনুগত হতে বাধ্য হয়েছে সেই কারণ দূর করতে বদ্ধপরিকর হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়।

অতপর সুষ্পষ্ট ভাষায় ইসলামী নৈতিকতার মূল ভিত্তিসমূহের পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করা একান্ত আবশ্যক। কারণ, আমি জানি এ ব্যাপারে মুসলমানদের ধারণা নিতান্ত অবাঞ্ছিতভাবে অস্পষ্ট এবং বিশিষ্ট হয়ে রয়েছে। এই অস্পষ্টতা ও অসংঘবদ্ধতার কারণেই ইসলামী নৈতিকতা আসলে যে কি জিনিস এবং এদিক দিয়ে মানুষের চরিত্র গঠন ও পূর্ণতা সাধনের জন্য কোন্‌ জিনিস কোন্‌ শ্রেণী পরম্পরা ও ক্রমিক ধারা অনুযায়ী তার মধ্যে লালিত-পালিত করা অপরিহার্য তা খুব কম লোকই জানতে পেরেছে।



সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 08 November 2009 )