আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
أركان الإيمان বা ঈমানের স্তম্ভসমূহ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা মুনাওরার   
Sunday, 15 October 2006
আর্টিকেল সূচি
أركان الإيمان বা ঈমানের স্তম্ভসমূহ
প্রথম স্তম্ভ
দ্বিতীয় স্তম্ভ
তৃতীয় স্তম্ভ
চতুর্থ স্তম্ভ
পঞ্চম স্তম্ভ
ষষ্ট স্তম্ভ

الركن السادس: الإيمان بالقدر

ষষ্ঠ রুকনঃ ভাগ্যের প্রতি ঈমান।

(১) কদরের (ভাগ্যের) সংজ্ঞা ও তার প্রতি ঈমান আনার গুরুত্বঃ

কদর বা (ভাগ্য) হলঃ আল্লাহর অনন্ত জ্ঞান ও হিকমাত অনুযায়ী সৃষ্টি কূলের জন্য ভাগ্য নির্ধারণ। আর ইহা আল্লাহর কুদরতের উপর নির্ভলশীল,আর তিনি সর্ব বিষয় ক্ষমতাশীল তিনি যা ইচ্ছা তাহাই করেন। আর ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনা আল্লাহ্ তা'আলার রুবুবীয়াতের (প্রভুত্তের) প্রতি ঈমান আনার অন্তভুর্ক্ত। আর ইহা ঈমানের ছয়টি রুক্নের অন্যতম একটি রুকন, এর প্রতি ঈমান আনা ছাড়া এই ছয়টি রুক্নের প্রতি ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে না।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ

[سورة القمر، الآية:49]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আমি প্রত্যেক বসত্তকে পরিমিত রুপে সৃষ্টি করেছি।)) [সূরা আল-ক্বামার, আয়াত-৪৯]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

كل شيء بقدر حتى العجز والكيس، أوالكيس والعجز

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((প্রত্যেক জিনিসই পরিমিত, এমনকি অপারগতা ও অলসতা অথবা অলসতা ও অপারগতাও।)) [মুসলিম]

(২) ভাগ্যের স্তরঃ

চারটি স্তর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে-

প্রথমতঃ আল্লাহর অনন্ত জ্ঞানের প্রতি ঈমান আনা, যা সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاء وَالْأَرْضِ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ

[سورة الحج، الآية:70]

অর্থঃ ((তুমি কি জাননা যে,নিশ্চয় আল্লাহ্ অবগত যা কিছু আসমান ও জমিনে রয়েছে,নিশ্চয় ইহা কিতাবে লিখিত আছে আর নিশ্চয় ইহা আল্লাহর নিকট সহজ।)) [সূরা আল-হাজ্ব, আয়াত-৭০]

দ্বিতীয়তঃ লাউহে মাহ্ফুজে আল্লাহর জানা মোতাবেক ভাগ্য সমূহ লিখে রাখার প্রতি ঈমান আনা।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

مَّا فَرَّطْنَا فِي الكِتَابِ مِن شَيْءٍ

[سورة الأنعام، الآية:38]

অর্থঃ ((আমি কোন কিছু লিখতে ছাড়িনি।)) [সূরা আন'আম, আয়াত-৩৮]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

كتب الله مقادير الخلائق قبل أن يخلق السموات والأرض بخمسين ألف سنة

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০(পঞ্চাশ) হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলা সৃষ্টজীবের ভাগ্য সমূহ লিখে রেখেছেন।)) [মুসলিম]

তৃতীয়তঃ আল্লাহর কার্যকরী ইচ্ছা ও তাঁর ব্যাপক শক্তির প্রতি ঈমান আনা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

[سورة التكوير، الآية:29]

অর্থঃ ((জগত সমূহের প্রভু আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে অন্য কিছুই ইচ্ছা করতে পার না।)) [সূরা আত্-তাকভীর, আয়াত-২৯]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে বলেনঃ যে ব্যক্তি তাঁকে সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম লক্ষ করে বলেছিলেনঃ

ما شاء الله وشئت

"আল্লাহ এবং আপনি যাহা চেয়েছেন (ওয়াও দ্বারা আত্বফ করে)।"

أجعلتني لله نداً بل ما شاء الله وحده

[رواه أحمد]

অর্থঃ ((তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিলে ? বরং তিনি একাই চেয়েছেন।)) [আহমাদ]

চতুর্থতঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ সকল বস্তুর সৃষ্টি কর্তা ইহার প্রতি ঈমান আনা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ

[سورة الزمر، الآية:62]

অর্থঃ ((আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর অভিবাবক।)) [সূরা-আয্-যুমার, আয়াত-৬২]

তিনি আরো বলেনঃ

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ

[سورة الصافات، الآية:96]

অর্থঃ ((আল্লাহ তোমাদের ও তোমাদের কর্মকে সৃষ্টি করেছেন।)) [সুরা আস্-সাফফাত, আয়াত-৯৬]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

إن الله يصنع كل صانع وصنعته

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আল্লাহ্ সকল আবিস্কারক ও তার আবিস্কারকে সৃষ্টি করেন।)) [বুখারী]

(৩) ভাগ্যের প্রকারঃ

১) সকল সৃষ্টজীবের সাধারণ ভাগ্য লিপিবদ্ধ করণ। আর ইহাই আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বৎসর আগে লাউহে মাহ্ফুজে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

২) সারা জীবনের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করণ। আর তা হল বান্দার মাঝে রুহ্ বা আত্মা ফুঁকে দেওয়ার সময় হতে তার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত যা কিছু সংঘটিত হবে নির্ধারণ করা।

৩) বাৎসরিক ভাগ্য নির্ধারণ করা। ইহা হল, প্রত্যেক বৎসর যা কিছু সংঘটিত হবে তা নির্ধারণ করা। আর ইহা প্রত্যেক বৎসরের মহিমান্বিত রজনীতে হতে থাকে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ

[سورة الدخان، الآية:4]

অর্থঃ ((এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।)) [সূরা আদ্-দুখান, আয়াত-৪]

৪) দৈনন্দিন ভাগ্য নির্ধারণ করণ, আর তা হল সম্মান, অপমান, (কিছু) দেয়া না দেওয়া জীবিত করা, মৃত্যু দান ইত্যাদি যা দৈনন্দিন সংঘটিত হবে, তা নির্ধারণ করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

يَسْأَلُهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ

[سورة الرحمن، الآية:29]

অর্থঃ ((আসমান ও যমিনে বিচরণশীল সকলেই তাঁর কাছে প্রার্থী, প্রত্যেকদিন (সময়) কোন না কোন কর্মেরত রয়েছেন।)) [সূরা আর-রাহমান, আয়াত-২৯]

(৪) ভাগ্যের ব্যাপারে সালাফদের আকিদাহ বা বিশ্বাস হলঃ

নিশ্চয় আল্লাহ সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা প্রভু তার মালিক বা অধিকারী। নিশ্চয় আল্লাহ সকল সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টির পূর্বে তাদের ভাগ্য সমূহ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তাদের বয়স, রুযী, কর্ম সমূহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। আরো লিখে রেখেছেন যে, সুখ অথবা দুঃখের দিকে তারা ধাবিত হবে।

প্রত্যেক জিনিসই স্পষ্ট কিতাবে হিসাব করে রেখেছেন। অতঃপর আল্লাহ্ যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয় না। আর যা হয়েছে ও হবে তা সবই জানেন। আর যা হয় নাই যদি তা হতো কি ভাবে হতো তাও জানেন। আর তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাশীল। যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন,আর যাকে ইচ্ছা তাকে পথভ্রষ্ট করেন। আর নিশ্চয় বান্দার ইচ্ছা ও শক্তি রয়েছে, যা দ্বারা তাদেরকে যে সকল কাজের সমর্থবান করেছেন তা সম্পাদন করে এই বিশ্বাস রেখে যে আল্লাহ্ যা চান শুধু মাত্র তাই হয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

[سورة العنكبوت، الآية:69]

অর্থঃ ((যারা আমার পথে সংগ্রাম করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করবো।)) [সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত-৬৯]

আর নিশ্চয় আল্লাহ্ বান্দার ও তার কর্মের সৃষ্টি কর্তা আর তারাই এই কর্ম গুলো প্রকৃত পক্ষে সম্পাদন কারী। ওয়াজেব ছাড়াতে ও হারাম কাজ করাতে আল্লাহর বিরুদ্ধে কারো কোন হুজ্জাত বা দলীল দাঁড় করানোর সুযোগ নেই, বরং বান্দাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পূর্ণ দলীল রয়েছে। বিপদ-আপদে ভাগ্যকে কারণ হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ হলেও নিন্দনীয় ও পাপের কাজে ভাগ্যের অজুহাত দেয়া বৈধ নয়। যেমন-নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদম ও মূসা (আলাইহিমাস সালাম) এর পরস্পর বিতর্কের ব্যাপারে বলেনঃ

تحاج آدم وموسى، فقال موسى: أنت آدم الذي أخرجتك خطيئتك من الجنة، فقال له آدم: أنت موسى الذي اصتفاك الله برسالاته وبكلامه ثم تلومني على أمر قد قدّر عليّ قبل أن أخلق فحج آدم موسى.

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আদম ও মূসা (আলাইহিমাস সালাম) বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন, অতঃপর মূসা (আলাইহিস্ সালাম) বললেনঃ হে আদম (আলাইহিস্ সালাম) তোমাকেই তো তোমার পাপ জান্নাত হতে বহিস্কার করেছিল। তার পর আদম (আলাইহিস্ সালাম) তাঁকে বললেনঃ হে মূসা ! (আলাইহিস্ সালাম) তোমাকেই তো আল্লাহ্ তাঁর রিসালাত ও কথোপকথনের জন্য নির্বাচন করে নিয়েছিলেন? তারপরও তুমি আমাকে এমন বিষয়ের উপর দোষারোপ করছ যা আল্লাহ্ আমার সৃষ্টির পূর্বেই আমার উপর নির্বাচন করে রেখেছেন। অতঃপর আদম (আলাইহিস্ সালাম) মূসা (আলাইহিস্ সালাম) এর উপর জয়ী হলেন। [মুসলিম শরীফ]

(৫) বান্দাদের কর্ম সমূহঃ

যে সকল কাজ আল্লাহ তা'আলা এই নিখিল বিশ্ব্যে সৃষ্টি করেছেন তা দু' ভাগে বিভক্ত-

প্রথমঃ আল্লাহ্ তা'আলার কর্ম সমূহের মধ্যে যে সকল কর্ম তাঁর সৃষ্টজীবের মাঝে পরিচালনা করেন, তাতে কাহারো কোন প্রকার ইচ্ছা ও ইখ্তিয়ার নেই। বস্তুর সকল ইচ্ছা আল্লাহর জন্য। যেমন জীবিত করা মৃতু্য দান করা সুস্থ্য ও অসুস্থ্য করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ

[سورة الصافات، الآية:96]

অর্থঃ ((আর আল্লাহই তোমাদের ও তোমাদের কর্মকে সৃষ্টি করেছেন।)) [সূরা আস্-সাফফাত, আয়াত-৯৬]

তিনি আরো বলেনঃ

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً

[سورة الملك، الآية:2]

অর্থঃ ((যিনি মরণ ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমাদেরকে পরিক্ষা করেন- কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ট?)) [সুরা আল-মুলক্, আয়াত-২]

দ্বিতীয়ঃ আর যে সকল কর্ম সৃষ্টিজীব সম্পাদন করে থাকে, তা সবই ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত। আর ইহা সম্পাদন কারীর ইখ্তিয়ার ও ইচ্ছায় সংঘঠিত হয়, কারণ ইহা আল্লাহ্ তাদের উপর অর্পণ করেছেন।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

لِمَن شَاء مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ

[سورة التكوير، الآية:28]

অর্থঃ ((যে তোমাদের মধ্যে সোজা পথে চলতে চায়।)) [সূরা আত্-তাকভীর, আয়াত-২৫]

তিনি আরো বলেনঃ

. . . فَمَن شَاء فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاء فَلْيَكْفُرْ . . .

[سورة الكهف، الآية:29]

অর্থঃ ((অতএব যার ইচ্ছা হয় ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফুরী করুক।)) [সূরা আল-ক্বাহাফ, আয়াত-২৯]

ভাল কাজ সম্পাদনের জন্য তারা প্রশংসার হক্বদার ,আর খারাপ কাজ করার জন্য তারা অপমানের হক্বদার। আল্লাহ্ শুধু মাত্র ঐ কাজ করার জন্য শাস্তি দিবেন, যাতে বান্দার পূর্ণ ইখতিয়ার রয়েছে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَمَا أَنَا بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ

[سورة ق، الآية:29]

অর্থঃ ((আর আমি বান্দাদের উপর জুলুমকারী নই।)) [সূরা ক্বাফ, আয়াত-২৯]

আর মানুষ ইচ্ছা ও নিরুপায়ের পার্থক্য জানে। যেরূপ কেহ ছাদ হতে সিঁড়ি বেয়ে নিজ ইচ্ছায় অবতরণ করেন, আর কখনো কেহ্ তাকে ছাদ হতে ফেলে দিতে পারে। প্রথম উদাহরণ হল ইচ্ছার, আর দ্বিতীয় উদাহরণ হল নিরুপায়ের।

(৬) আল্লাহর সৃষ্টি ও বান্দার কর্মের মাঝে সমঝতাঃ

আল্লাহ্ বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন ও তার (বান্দার) কর্ম সমূহকে সৃষ্টি করেছেন। ও তাকে ইচ্ছা ও শক্তি দিয়েছেন। তাই বান্দাই প্রকৃত পক্ষে তার কর্মের সম্পাদন কারী। সারাসরি তা আদায় কারী,কারণ তার ইচ্ছা ও শক্তি রয়েছে। অতঃপর সে যদি ঈমান আনে তবে সে তার ইচ্ছায় ও ইরাদায় ঈমান আনলো। আর সে যদি কুফুরী করে তবে সে তার ইচ্ছায় ও পূর্ণ ইরাদায় কাফের হল। যেমন আমরা বলে থাকি যে, এই ফল এই গাছের আর এই ফসল এই ক্ষেতের। অর্থ হলঃ নিশ্চয় ইহা হতে উৎপন্ন হয়েছে। আর আল্লাহর দিক হতে, এর অর্থ হবেঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ ইহাকে ইহা হতে সৃষ্টি করেছেন। এই দুইয়ের মাঝে কোন প্রকারের বিরোধ নেই। আর এর দ্বারা (শারউল্লাহ) আল্লাহর প্রনয়ণ ও তাঁর নির্ধারণ এক বলে বিবেচিত হয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ

[سورة الصافات، الآية:96]

অর্থঃ ((অথচ আল্লাহ্ তোমাদেরকে এবং তোমাদের কর্ম সমূহকে সৃষ্টি করেছেন।)) [সূরা আস্-সফফাত, আয়াত-৯৬]

তিনি আরো বলেনঃ

فَأَمَّا مَن أَعْطَى وَاتَّقَى - وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى - َسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى - وَأَمَّا مَن بَخِلَ وَاسْتَغْنَى - وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى - فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى

[سورة الليل، الآيات:5-10]

অর্থঃ ((অতএব যে দান করে এবং আল্লাহ্ ভীরু হয়, এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে,আমি তাকে সুখের বিষয়ের জন্যে সহজ পথ দান করব,আর যে কৃপণতা করে ও বেপরওয়া হয়, এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে,আমি তাকে কষ্টের জন্যে সহজ পথ দান করব।)) [সূরা আল-লাইল, আয়াত ৫-১০]

(৭) ভাগ্যের ব্যাপারে বান্দার করণীয়ঃ

ভাগ্যের ব্যাপারে বান্দার করণীয় কাজ হল দু'টি-

প্রথমঃ সাম্ভব্য কাজ সম্পাদনের ও সতর্কিত কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। তাঁর কাছে (আল্লাহর কাছে) আরো চাইবে যেন তাকে সহজ সাধ্য কাজ সহজ করেদেন, আর কঠিন সাধ্য কাজ হতে তাকে বিরত রাখেন।আর তাঁর উপর ভরসা করবে ও তাঁর কাছে আশ্রয় চাইবে। অতঃপর কল্যাণ অর্জনের জন্য ও অকল্যাণ বর্জনের জন্য তাঁর নিকটেই মুখাপেক্ষী হবে।

আর তাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

احرص على ما ينفك واستعن بالله ولا تعجز وإن أصابك شيء فلا تقل لو أني فعلت كذا لكان كذا ولكن قل قدر الله وما شاء فعل، فإن لو تفتح عمل الشيطان

অর্থঃ ((তোমার কল্যাণকর কাজের প্রতি আগ্রহবান হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর, আর অপারগতা প্রকাশ করিওনা। আর তুমি যদি কোন কষ্টের সম্মখীন হও তবে এই রুপ বলিওনা যে আমি যদি এই কাজ করতাম তাহলে এই হত। বরং বল যে, আল্লাহ্ যা নির্ধারণ করেছেন ও চেয়েছেন তাই করেছেন, কারণ যদি কথাটি শায়তানের কর্ম খুলে দেয়।))

দ্বিতীয়ঃ বান্দা তার জন্য নির্ধারিত বিষয়ের উপর ধৈর্য ধারণ করবে, ঘাবড়াবেনা। অতঃপর জানবে যে, নিশ্চয় ইহা আল্লাহর পক্ষ হতে, সুতরাং সন্তোষ্ট চিত্তে মেনে নিবে। আরো জ্ঞাত হবে-যে বিপদ তাকে আক্রমন করেছে তা ভূল করে আসেনি। আর যে বিপদ তোমাকে আক্রমন করেনি তা তার জন্য আসার ছিলনা।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

وأعلم أن ما أصابك لم يكن ليخطئك وأن ما أخطأك لم يكن ليصيبك

অর্থঃ ((আরো জ্ঞাত হবে-যে বিপদ তোমাকে আক্রমন করেছে তা তোমাকে ভুল করে আসেনি। আর যে বিপদ তোমাকে আক্রমন করেনি তা তোমার জন্য আসার ছিলনা।))

(৮) ভাগ্য ও ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকাঃ

ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অপরিহার্য। কেননা ইহা আল্লাহর প্রভুত্ত্বের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অন্তর্ভুক্ত। তাই সকল মু'মিনের পক্ষে আল্লাহর ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা অপরিহার্য। কারণ আল্লাহর কর্ম ও ফায়সালা সকলই ভাল (ন্যায় পরায়ণ) ইনসাফ ভিক্তিক হিকমত পূর্ণ। সুতরাং যার আস্থা থাকবে যে, নিশ্চয় যা (সুখ-দুঃখ) তাকে পৌঁছিয়াছে তা তাকে ভূল করার ছিলনা আর যা তাকে ভূল করেছে তা তাকে পৌঁছার ছিলনা সে প্রেশানী ও সন্দেহ্ হতে বেঁচে থাকবে। আর তার জীবন হতে ব্যাকুলতা ও দোদুল্যমানতা দূর হবে। চলে বা হারিয়ে যাওয়া বস্তুর উপর চিন্তিত হবে না। আর তার ভবিষ্যৎ কে ভয় পাবেনা। আর এর মাধ্যমে সে সব চাইতে সৌভাগ্য পূর্ণ হবে, আত্মার দিক দিয়ে সব চাইতে পবিত্র হবে, আর সব চাইতে শান্ত হবে।

আর যে জানতে পারবে যে, তার বয়স সীমিত, রুযী পরিমিত, সে নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারবে যে, কাপুরুষত্বা বয়স বাড়াতে পারে না। কার্পন্নতা রুয বাড়াতে পারে না। তাহলে সবই লিখিত রয়েছে। বিপদের উপর ধৈর্য ধারণ করবে, পাপ ও ক্রটি পূর্ণ কর্ম সম্পাদন করার কারনে ক্ষমা চাইবে। আর আল্লাহ্ যা (তার জন্য) নির্ধারণ করেছেন তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। তবেই আদেশের আনুগত্য আর বিপদের উপর ধৈর্য ধারণের মাঝে সম্বন্নয় গড়তে সক্ষম হবে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

[سورة التغابن، الآية:11]

অর্থঃ ((আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন প্রকার বিপদ আসে না,এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, আল্লাহ্ তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।)) [সূরা আত্-তাগাবুন, আয়াত-১১]

তিনি আরো বলেনঃ

فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ

[سورة غافر، الآية:55]

অর্থঃ ((অতএব আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রতি সত্য। আপনি আপনার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।)) [সূরা গাফের, আয়াত-৫৫]

(৯) হেদায়াত দু'প্রকারঃ (হেদায়াতের দু'টি অর্থ)

প্রথমঃ হেদায়াত অর্থ- সত্যের সন্ধান দেওয়া,সৎপথ প্রর্দশন করা। আর সকল সৃষ্টজীবই এর মালিক। আর সকল রাসূল ও তাঁদের অনুসারীগণ এরই মালিক।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

[سورة الشورى، الآية:52]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।)) [সূরা আশ্শুরা, আয়াত-৫২]

দ্বিতীয়ঃ হেদায়াত এর অর্থ আল্লাহ কর্তৃক বান্দাদেরকে (ভাল কাজের) তাওফীক প্রদান করা ও সঠিক পথে প্রতিষ্ঠা বা অটল রাখা, (আর ইহা) তাঁর মুত্তাকীন বান্দাদের জন্য দয়া ও অনুগ্রহ স্বরূপ। আর এই হেদায়াতের একমাত্র মালিক হলেন আল্লাহ।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ

[سورة القصص، الآية:56]

অর্থঃ ((আপনি যাকে ভালবাসেন,তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ্ তা'আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন।)) [সূরা আল-ক্বসাস, আয়াত-৫৬]

(১০) (আল্লাহর) কুরআনে বর্ণিত ইরাদা দু' প্রকারঃ

প্রথমঃ ইরাদা কাউনিয়া ক্বাদারিয়া, তা হল সকল সৃষ্টিকূলের তরে নির্ধারিত ঘটনীয় ইচ্ছা, সুতরাং আল্লাহ্ যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয় না। আর ইহা (ইরাদা কাউনিয়া ক্বাদারিয়া) অবশ্যই পতিত হবে। কিন্তু ইরাদা শারয়ীয়া এর সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত (ইহাকে) ভালবাসা ও এর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া জরুরী নয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

فَمَن يُرِدِ اللّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلإِسْلاَمِ

[سورة الأنعام، الآية:125]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ যাকে হেদায়াত করার ইচ্ছা করেন,তার বক্ষকে ইসলামের জন্য খুলে দেন।)) [সূরা আনআম, আয়াত-১২৫]

দ্বিতীয়ঃ ইরাদা দ্বীনিয়া শারয়ীয়া, তা হল দ্বীনী নির্দেশ বা উদ্দেশ্য ও তার আহল অনুসারী কে ভালবাসা ও তাদের প্রতি সন্তষ্ট থাকা। ইরাদা দ্বীনিয়া শারয়ীয়া বাস্তবায়িত হবে না,যতক্ষণ পর্যন্ত এর সাথে ইরাদা কাউনিয়া সংযুক্ত না হবে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

يُرِيدُ اللّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلاَ يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

[سورة البقرة، الآية:185]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ চান, তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-১৮৫]

আর ইরাদা কাউনিয়া অধিক ব্যাপক, কারণ সকল শারয়ী উদ্দেশ্য যা বাস্তবায়িত হয় তা সৃষ্টিগত দিক হতেও বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য উদ্দেশ্যিত। আর পতিত সকল কাওনী উদ্দেশ্য বা ঘটমান ইচ্ছা শরীয়াতে তা উদ্দেশ্যিত নয়। যেমন আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর ঈমানের মাঝে উভয় প্রকার ইরাদা বা ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়েছিল। আর আবু জাহল এর কুফুরীতে শুধুমাত্র ইরাদা কাওনিয়া বা ঘটমান ইচ্ছা ছিল। আর যাতে ইরাদা কাউনিয়া পাওয়া যাবে না, যদিও তা শারীয়াতের দিক থেকে প্রত্যাশিত, যেমন আবু জাহেলের ঈমান। সুতরাং যদি ও আল্লাহ্ নাফারমানী পূর্ণ ইচ্ছা করেন ঘটবার দিক থেকে, এবং সৃষ্টিগত দিক থেকে তা চান কিন্তু তা দ্বীন হিসাবে পছন্দ করেন না, ভাল বাসেন না, ও তার প্রতি নির্দেশ ও দেন না। বরং তার প্রতি বিদ্বেষ রাখেন, অপছন্দ করেন, তা হতে নিষেধ (বান্দাদেরকে) করেন ও তা সম্পাদন কারীকে সাবধান করেন।

আর এসব তাঁরই নির্ধারণ তবে আনুগত্য পূর্ণ কর্ম ও ঈমান আনা নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা ইহাকে ভাল বাসেন,এবং এর নির্দেশ দেন, এবং এর সম্পাদন কারীকে নেকী ও সুন্দর প্রতি দানের ওয়াদা (প্রতিশ্রতি) দিয়েছেন, তাঁর ইরাদা ছাড়া তাঁর নাফারমানী করা যায় না। আর আল্লাহ্ তা'আলা যা চান শুধু তাই পতিত হয়।

আল্লাহ্ তা'আল বলেনঃ

وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ

[سورة الزمر، الآية:7]

অর্থঃ (( (আল্লাহ্) তাঁর বান্দাদের জন্য কুফুরী পছন্দ করেন না।)) [সূরা আয্-যুমার, আয়াত-৬]

তিনি আরো বলেনঃ

وَاللّهُ لاَ يُحِبُّ الفَسَادَ

[سورة البقرة، الآية:205]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ ফাসাদ (অশান্তি) পছন্দ করেন না।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২০৫]

(১১) ঐ সকল আস্বাব বা কারণ সমূহ যা ভাগ্য পরিবর্তন করেঃ

আল্লাহ্ এই ভাগ্যের জন্য কিছু কারণ তৈরী করে রেখেছেন যা ইহাকে পরিবর্তন ও প্রতিরোধ করে। যেমন-দোআ, সাদাকাহ্ ঔষধ, সতর্কতা অবলম্বন, (নিজের) কর্ম দক্ষতা ব্যাবহার করা,কারণ সবই আল্লাহর ফায়সালা ও তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ, এমনকি অপারগতা- অক্ষমতা ও বিজ্ঞতা-বুদ্ধিমত্তা।

(১২) ভাগ্যের মাস্আলা বা বিষয়টি আল্লাহর সৃষ্টজীবের মাঝে তাঁর একটি রহস্যময় বিষয়ঃ

ভাগ্য নির্ধারণ আল্লাহর গোপন রহস্য, তাঁর সৃষ্টজীবের মাঝে এ কথাটি শুধু মাত্র ভাগ্যের গোপন দিকের জন্য প্রয়োজয্য। কারণ সকল জিনিসের হাকীকাত শুধুমাত্র আল্লাহ্ জানেন। মানুষ তা অবগত হতে পারে না। যেমন আল্লাহ্ পথ ভ্রষ্ট করেন,হেদায়াত করেন, মৃতু্য দান করেন, জীবিত করেন, নিষেধ করেন,ও কিছু প্রদান করেন।

যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

إذا ذكر القدر فأمسكوا [رواه مسلم].

অর্থঃ ((যখন ভাগ্যের কথা স্বরণ হবে তখন তোমরা তা নিয়ে তর্ক বির্তকে লিপ্ত না হয়ে চুপ থাকবে।)) [মুসলিম]

তবে ভাগ্যের অন্যান্য দিক ও তাঁর মহা হিকমত স্তর, মর্যাদা ও তাঁর প্রভাব মানুষের নিকট বর্নণা করাও তা তাদেরকে জানানো বৈধ রয়েছে। কারণ ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের রুকন সমূহের একটি অন্যতম রুকন,যা শিক্ষা করাও জানা একান্ত কর্তব্য।

যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জিব্রীল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট ঈমানের রুকন সমূহ উল্লেখ করেন তখন বলেনঃ

هذا جبريل أتاكم يعلمكم دينكم [رواه مسلم].

অর্থঃ ((উনি হলেন জিব্রীল তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য আগমণ করেছেন।))

(১৩) ভাগ্যের দ্বারা দলীল দেওয়াঃ

ভবিষ্যতে কি হবে বা না হবে এই সম্পর্কে আল্লাহর পূর্ব জ্ঞান, (ইহা) অদৃশ্য ইহা তিনি ব্যতীত কেহ জানেনা। (ইহা) মানুষ ও জি্বনদের অজানা। এতে কোন ব্যক্তিরই স্বীয় পক্ষ গ্রহণের দলীল নেই। আর যে বিষয় ফায়সালা হয়েগেছে তার উপর ভরসা করে কর্ম ত্যাগ করা ঠিক নয়। সুতরাং ভাগ্য আল্লাহর বিরুদ্ধে ও তাঁর সৃষ্টির কাহারো জন্য দলীল বা হুজ্জাত নয়। যদি খারাপ কাজ করার উপর ভাগ্যের দ্বারা দলীল দেওয়া বৈধ হতো,তাহলে অত্যাচারী শাস্তি প্রাপ্ত হতনা, মুশরিক ব্যক্তি হত্যা হতো না, হদ্ বা বিধান প্রতিষ্ঠিত হতনা, আর কেহ্ অত্যাচার করা হতে বিরত থাকতো না। আর ইহা দ্বীন ও দুনিয়াতে অশান্তি সৃষ্টি করার মাধ্যম হত, যার ভয়াবহতা সকলের জানা।

আর যারা ভাগ্য দ্বারা দলীল দেয়, তাদেরকে আমরা বলবো তুমি জান্নাতী না জাহান্নামী এ ব্যাপারে তোমার নিকট নিশ্চিত জ্ঞান নেই। আর যদি তোমার নিকট এই ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান থাকত অবশ্যই আমরা তোমাকে সৎকাজের আদেশ দিতাম না ও অন্যায় থেকে নিষেধও করতাম না। বরং তুমি কর্ম সম্পাদন কর নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাকে তাওফীক প্রদান করবেন, আর তুমি জান্নাত বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিছু কিছু সাহাবা যখন ভাগ্যের হাদীস সমূহ শুনতেন তখন বলতেনঃ এখন তুমি আমার চাইতে বেশী প্রচেষ্টাকারী নও। (অর্থাৎ, আমি বেশী প্রচেষ্টাকারী)।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আত্ম পক্ষ সমর্থনে ভাগ্যের দ্বারা দলীল দেওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেনঃ

اعملوا فكل ميسر لما خلق له فمن كان من أهل السعادة فسييسر لعمل أهل السعادة، ومن كان من أهل الشقاوة فسييسر لعمل أهل الشقاوة،

অর্থঃ ((তোমরা কর্ম সম্পাদন করতে থাকো যাকে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা তার জন্য সহজ সাধ্য হবে, সুতরাং যারা সৌভাগ্যবান হবে তাদেরকে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের যে কাজ সেই কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। আর যারা দুর্ভাগা হবে, তাদেরকে তাদের দুর্ভাগা ব্যক্তিদের যে কাজ সেই কাজ সহজ করে দেওয়া হবে। অতঃপর নিম্নের আয়াত পাঠ করলেনঃ

فَأَمَّا مَن أَعْطَى وَاتَّقَى - وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى - َسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى - وَأَمَّا مَن بَخِلَ وَاسْتَغْنَى - وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى - فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى

[سورة الليل، الآيات:5-10]

অর্থঃ ((অতএব, যে দান করে এবং আল্লাহভীরু হয়, এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে, আমি তাকে সুখের বিষয়ের জন্য সহজ পথ দান করব। আর যে কৃপণতা করে ও বেপরওয়া হয়, এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে, আমি তাকে কষ্টের বিষয়ের জন্য সহজ পথ দান করব।)) [সূরা আল্-লাইল, আয়াত ৫-১০]))

(১৪) আসবাব বা (মাধ্যম সমূহ) গ্রহণ করাঃ

বান্দার নিকট দু' প্রকার কাজ উপস্থিত হয়-

(১) এমন কর্ম যাতে বাহানা বা অজুহাত রয়েছে তা সম্পাদনে সে অপারগ নয়।

(২) এমন কর্ম যাতে বাহানা ও অজুহাতের অবকাশ নেই, তা পালনে সে ধৈর্য ধারণ করে না। আল্লাহ্ তা'আলা বিপদ পতিত হওয়ার পূর্বেই বিপদ সম্পর্কে জানেন।

তাঁর (আল্লাহর) বিপদ সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে এর অর্থ এই নয় যে, তিনিই বিপদ গ্রস্ত ব্যক্তিকে বিপদে পতিত করেছেন, বরং এই বিপদ পতিত হয়েছে এর নির্ধারিত কারণ সমূহের দ্বারাই। যদি বিপদ হতে রক্ষাকারী মাধ্যম যা ব্যবহার ও গ্রহণ করার জন্য ইসলামী শরীয়াত অনুমতি দিয়েছেন পরিত্যাগ করার কারণে পতিত হয়, তবে সে নিজেকে হেফাযত না করার কারণে ও তাঁকে বিপদ হতে রক্ষাকারী মাধ্যম গ্রহণ না করার কারণে দোষী হবে। আর যদি এই বিপদ প্রতিরোধ করার তার ক্ষমতা না থাকে তবে সে মা'জুর হবে। সুতরাং মাধ্যম গ্রহণ করা ভাগ্য ও ভরসার পরিপন্থী নয় বরং ইহা (মাধ্যম গ্রহণ করা) এরই (ভাগ্য ও ভরসারই) অন্তভর্ুক্ত। আর যখন ভাগ্য পতিত হয়ে যায় তখন তার প্রতি সন্তষ্ট থাকা ও তা মেনে নেয়া ওয়াজিব হয়ে যায় ও নিম্নের কথার দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ করবে।

قدّر الله وما شاء فعل

অর্থঃ আল্লাহ্ যা নির্ধারণ করেছেন ও চেয়েছেন তাই করেছেন। তবে ভাগ্য পতিত হওয়ার পূর্বে মানুষের দায়িত্ব হল বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করা ও ভাগ্যের দ্বারা ভাগ্যের প্রতিরোধ করা। নবীগণ নিজেদেরকে নিজেদের শত্রু থেকে হেফাযতকারী পদ্ধতি ও মাধ্যম গ্রহণ করেছিলেন, অথচ তাঁরা আল্লাহর ওয়াহীও নিরাপত্তা দ্বারা সাহায্য প্রাপ্ত ছিলেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল ভরসা কারীদের নেতা ছিলেন, তা সত্বে ও তিনি মাধ্যম গ্রহণ করতেন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা থাকার পরও।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِّبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدْوَّ اللّهِ وَعَدُوَّكُمْ

[سورة الأنفال، الآية:60]

অর্থঃ ((আর প্রসত্তত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর।)) [সূরা আল-আনফাল, আয়াত-৬০]

তিনি আরো বলেনঃ

هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولاً فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِّزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

[سورة الملك، الآية:15]

অর্থঃ ((তিনি তোমার জন্য যমিনকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তার কাঁধে বিচরণ কর এবং তাঁর দেয়া রিযিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।)) [সূরা আল-মূলক, আয়াত-১৫]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

المؤمن القوي خير وأحب إلى الله من المؤمن الضعيف وفي كل خير، احرص على ما ينفعك واستعن بالله ولا تعجز وإن أصابك شيء فلا تقل لو أني فعلت كذا لكان كذا وكذا، ولكن قل قدر الله ما شاء فعل فإن لو تفتح عمل الشيطان. [رواه مسلم].

অর্থঃ ((দুর্বল মু'মিন অপেক্ষা, সবল মু'মিন আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও প্রিয়, তবে উভয়ের মাঝে কল্যাণ নিহত রয়েছে। যা তোমাকে উপকার করবে তা আদায়ে তুমি অগ্রশীল হও। আর আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর অপারগতা প্রকাশ করিওনা। তোমাকে কোন বিপদ স্পর্শ করলে তুমি বলিওনা যে নিশ্চয় আমি এই কাজ করলে এই এই হতো বরং তুমি বলঃ আল্লাহ্ যা নির্ধারণ করেছেন ও চেয়েছেন তাই করেছেন। কারণ (لو) লাও বর্ণটি শয়তানের কর্মকে খুলে দেয়।)) [মুসলিম]

(১৫) ভাগ্যকে অস্বীকার কারীর বিধানঃ

যে ব্যক্তি ভাগ্যকে অস্বীকার করল সে ইসলামী শরীয়াতের মূলনীতি সমূহের একটি অন্যতম মূলনীতিকে অস্বীকার করলো। আর এর মাধ্যমে সে কুফুরী করলো। কিছু কিছু সালাফ সালেহ্ বলেনঃ

ناظروا القدرية بالعلم، فإن جحدوه كفروا، وإن أقروابه خصموا.

অর্থঃ তোমরা কাদরীয়াহ সমপ্রদায়ের সাথে জ্ঞান দ্বারা মুনাযারা কর তারা যদি অস্বীকার করে তাহলে তারা কুফুরী করলো আর যদি তারা স্বীকার করে তাহলে তারা (তোমাদের সাথে) ঝগড়া করলো।

(১৬) ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনার ফলাফলঃ ফায়সালা ও ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনার অনেক শুভ-পরিনাম সুন্দর প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব রয়েছে যা জাতীয় ও ব্যক্তি জীবনে কল্যাণ নিয়ে আসে।

(ক) নিশ্চয় ইহা (ভাগ্যের প্রতি ঈমান) বিভিন্ন প্রকার নেক আমল ও ভাল গুণ অর্জন করার সুযোগ জন্ম দেয়। যেমন আল্লাহর ইখলাস বা এক নিষ্ঠতা, তাঁর উপর ভরসা করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর কাছে কিছু পাওয়ার আশা করা, তাঁর প্রতি ভাল ধারণা রাখা ধৈর্য ধারণ করা, প্রখর সহনশীলতা, নৈরাশ্যতা দূর করা, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, একমাত্র আল্লাহর শুকরিয়া করা, তাঁর অনুগ্রহ দয়া পেয়ে খুশী হওয়া। একমাত্র আল্লাহর জন্য বিনয় নম্রতা প্রকাশ করা, উদাসিনতা ও অহংকার ত্যাগ করা। আল্লাহর প্রতি ভরসা করতঃ ভাল পথে ব্যায় করার মন মানুষিকতা ও সৃষ্টি করে। বীরত্ব সৃষ্টি করে, ভাল কাজ করার দিকে অগ্রসর করে, অল্পে তুষ্ট থাকার গুন তৈরী করে, আত্ম সম্মানী করে, উচ্চাভিলাশী করে, কর্ম দক্ষতা সৃষ্টি করে, কর্ম সম্পাদনের প্রচেষ্টা তৈরী করে সুখে-দুখে মধ্য পথ অবলম্বন কারী তৈরী করে, হিংসা ও প্রতিবাদ করা থেকে নিরাপদে রাখে। বাজে গাল- গল্প বাতিল কাজ হতে বিবেককে মূক্ত রাখে। আত্মার প্রশান্তি ও তৃপ্তির ব্যবস্থা করে।

(খ) ভাগ্যের প্রতি ঈমান ওয়ালা ব্যক্তি তার জীবনে সঠিক ও সরল পথে পরিচালিত হয়। অধিক নি'য়ামত তাকে পথ ভ্রষ্ট করতে পারে না,আর বিপদে নৈরাশ হয় না। আর সে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে যে,তাকে যে বিপদ সর্্পশ করেছে তা (তার জন্য) আল্লাহর নির্ধারণ মাত্র, তার পরিক্ষা স্বরুপ। ঘাবড়ায় না বিচলিত হয় না। বরং ধৈর্য ধারণ করে ও নেকীর আশা রাখে।

(গ) নিশ্চয় ইহা পথ ভ্রষ্টের কারণ সমূহ ও জীবনের অশুভ সমাপনী হতে হেফাজত করে। ইহা তার জন্য (মু'মিনের জন্য) সঠিক পথে প্রতিষ্ঠা থাকার স্থায়ী প্রচেষ্টা, নেক কাজ বেশী বেশী করার সুযোগ, নাফারমানী পূর্ণ ও ধ্বংসাক্ত কাজ থেকে বিরত থাকার সুযোগ করে দেয়।

(ঘ) নিশ্চয় ইহা মু'মিনদের জন্য সুদৃঢ় অন্তর ও পূর্ণ বিশ্বাসের দ্বারা ভয়ানক ও কঠিন কর্মকে প্রতিহত করার মনভাব তৈরী করে দেয়, মাধ্যম বা উপকরণ গ্রহণ করার সাথে।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

عجبا لأمر المؤمن إن أمره كله له خير وليس ذلك إلا للمؤمن، إن أصابته سراء شكر فكان خيرا له، وإن أصابته ضراء صبر فكان خيرا له.

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((কি আর্শ্চয্য ! নিশ্চয় মু'মিনের সকল কর্মই ভাল, আর ইহা শুধু মু'মিনদের জন্য খাস, যদি তাকে কোন আনন্দ স্পর্শ করে সে প্রশংসা করে, ফলে তা তাঁর জন্য কল্যাণ হয়। আর যদি তাকে কোন বিপদ স্পর্শ করে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণ হয়।)) [মুসলিম]

সমাপ্ত।

Source: www.islamhouse.com/library ((সম্পূর্ণ অবানিজ্যিক ভিত্তিতে শুধুমাত্র দ্বীন প্রচারের লক্ষ্যে কেউ এই বইয়ের লিংক ব্যবহার ও ছাপাতে পারেন নিম্নোক্ত শর্ত সাপেক্ষে-

১. লেখক ও অনুবাদকের নাম পরিবর্তন না করে এবং উল্লেখ করে।

২. বইয়ের মূল বিষয় ও লেখালেখিতে কোনরূপ পরিবর্তন না এনে।

৩. উত্তম হয় যদি সোর্স-এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

আল্লাহ আপনাদের সকলকে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন।))



সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 14 June 2009 )