কুরআন থেকে
যিনি পৃথিবী ও আকাশের রাজত্বের মালিক, যিনি কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি, যাঁর সাথে রাজত্বে কেউ শরীক নেই,...

হাদিস থেকে
যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়।
হজ্জ ও উমরাহ্ পালনকারীদের প্রতি কিছু খোলা চিঠি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ড. ইয়াহ্ইয়া ইবন ইব্রাহীম আল-ইয়াহ্ইয়া   
Wednesday, 13 December 2006
আর্টিকেল সূচি
হজ্জ ও উমরাহ্ পালনকারীদের প্রতি কিছু খোলা চিঠি
প্রথম চিঠি
দ্বিতীয় চিঠি
তৃতীয় চিঠি
চতুর্থ চিঠি
পঞ্চম চিঠি

তৃতীয় চিঠি

প্রিয় দ্বীনি ভাই,

আল্লাহ্ আপনাকে যাবতীয় গোনাহ্ থেকে হেফাজত করুন। জেনে রাখুন শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য বদ্ধপরিকর। আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের অনেক জায়গায় শয়তানের সে সকল ঔদ্যত্বপূর্ণ বাণী উদ্ধৃত করেছেন। যেমন,

) وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيباً مَفْرُوضاً)(النساء: من الآية118)

"সে বলল আমি অবশ্যই তোমার বান্দাদের এক নির্দিষ্ট অংশকে আমার অনুসারী করে নিব।" [সূরা আন্-নিসাঃ ১১৮] অন্য জায়গায় এসেছে,

)قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ) (لأعراف:16) )ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ) (لأعراف:17)

"সে বলল, 'তুমি আমাকে শাস্তিদান করলে, এইজন্য আমিও তোমার সরল পথে মানুষের জন্য নিশ্চয় ওঁত পেতে থাকব। অতঃপর আমি তাদের নিকট আসব তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, দক্ষিণ ও বাম দিক থেকে এবং তুমি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবে না।" [সূরা আল-আ'রাফঃ ১৬, ১৭]

শয়তান এক পা দুই পা করে মানুষকে ভ্রান্ত পথে নিয়ে যায়। যা মানুষ টেরও করতে পারেনা। এজন্য শয়তানের পদাংক অনুসরণ থেকে হুশিয়ার করতে গিয়ে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

)يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَداً وَلَكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ) (النور:21)

"হে মু'মিনগণ তোমরা শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। কেউ শয়তানের অনুসরণ করলে শয়তান তো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউ কখনো পবিত্র হতে পারবে না, তবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করে থাকেন এবং আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" [সূরা আন্-নূরঃ ২১]

শয়তান মানুষকে যে সব ফাঁদে ফেলতে চায় তার মধ্যে সব চেয়ে ভয়াবহ ফাঁদ হচ্ছে শির্ক। কারণ সে জানে আল্লাহ্ তা'আলা শিরকের গোনাহ্ কখনোই মাফ করবেন না। তিনি ইরশাদ করেছেন,

)إِنَّ اللَّهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْماً عَظِيماً) (النساء:48)

"নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন; এবং যে কেউ আল্লাহর শরীক করে সে এক মহাপাপ করে।" [সূরা আন্-নিসাঃ ৪৮]

শ্রদ্ধাস্পদ মুসলিম ভাই,

জেনে রাখুন শয়তান সরাসরি কোন শির্ক করার আদেশ দেয় না। বরং শির্কের পথ সুগমকারী কিছু কিছু আমলকে সুন্দর মোড়কে উত্থাপন করে মাত্র। শির্কের সূচনা হয় নূহ নবীর উম্মতের মাঝে। তাদের মধ্যে কিছু নেক্কার, পরহেজগার বান্দাহ্ ছিলেন। তাদের মৃতু্যর পর শয়তান এসে প্রস্তাব করল- তোমরা তো এ সকল পূণ্যবানদের কিছু ছবি আঁকতে পার। যেগুলো দেখলে তোমাদের মাঝে ইল্ম ও আমলের স্পৃহা জাগ্রত হবে। তোমরা নব উদ্যমে আমলে লেগে যাবে। তাদের অনর্্তধানের পর নতুন প্রজন্ম এল। শয়তান এসে তাদেরকে বললঃ 'তোমাদের বাপ-দাদারা বিপদ-আপদে সাহায্য চাওয়ার জন্য এসব ছবি গুলো বানিয়েছিল।' এভাবে শয়তান তাদেরকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সত্তার ইবাদাতের দিকে নিয়ে যায়।

সাধারণ লোকদের মধ্যে অনেকে এমন কিছু বিষয়ে লিপ্ত হন যা তাদেরকে শির্কের শেষ সীমানায় পৌঁছে দেন; কিন্তু তারা বেখবর। যেমন, এ ধরণের কথা বলা - "হে আমার পীর হোসাইন", বা "হে আমার রুহানী মা যয়নব", অথবা "ও বাবা শাহজালাল", কিংবা "ও বাবা বায়েজিদ বোস্তামী", নতুবা "হে আমার অমুক পীরসাহেব" আমাকে সাহায্য করুন, আমাকে বাঁচান, আমি আপনার আশ্রয় চাই, আমার রোগ নিরাময় করুন, আমাকে একটা সন্তান দিন, আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দিন, আমার শত্রুকে পরাস্ত করার ক্ষমতা দিন, জালেমকে প্রতিহত করার তাওফিক দিন। তদ্রূপ কবরে সিজদা দেয়া, কবরের কাছে নামাজ পড়াকে পূণ্যের কাজ মনে করা, কেবলা বাদ দিয়ে কবরের দিকে ফিরে নামাজ পড়াকে উত্তম জ্ঞান করা, কবরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করাকে কাবা-তাওয়াফের চেয়ে বেশী সওয়াবের কাজ বিবেচনা করা। উল্লেখিত সবগুলো আমল শির্ক। অথচ এগুলোকে পূর্ণের কাজ মনে করা হয়।

কিভাবে একজন বিবেকবান মানুষ মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাইতে পারে, আশ্রয় চাইতে পারে?! যদি সে ব্যক্তি নিজের জন্য কিছু করতে পারতেন তবে তো নিজে মরতেন না। এই ওলি বা নেককার লোকটা কি রাসূলের চেয়েও বড় মর্যাদার অধিকারী যাঁর চেয়ে উত্তম মানুষ এই পৃথিবীতে আসে নাই। তাঁকে আল্লাহ্ পাক নির্দেশ দিচ্ছেন,

)قُلْ لا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعاً وَلا ضَرّاً إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ) (لأعراف:188)

"বলুন, 'আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভাল-মন্দের উপরও আমার কোন অধিকার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম তবে তো আমি প্রভূত কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো শুধু মুমিন সমপ্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা বৈ আর কিছু নই।" [সূরা আল-আ'রাফঃ ১৮৮]

আল্লাহ্ তা'আলা অন্যস্থানে বলেছেন,

)قُلْ إِنِّي لا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرّاً وَلا رَشَداً) (الجـن:21) )قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُونِهِ مُلْتَحَداً) (الجـن:22)

"বলুন, 'আমি তোমাদের ইষ্ট-অনিষ্টের মালিক নই।' বলুন, 'আল্লাহর শাস্তি হতে কেউ আমাকে রক্ষা করতে পারবে না এবং আল্লাহ্ ব্যতীত আমি কোন আশ্রয়ও পাব না।" [সূরা জিনঃ ২১, ২২] রাসূলই যদি নিজের কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক না হন, আল্লাহর শাস্তি হতে কেউ তাকে রক্ষা করতে না পারে তবে আর এমন কে আছে যে অন্যের ইষ্ট-অনিষ্টের অধিকার রাখে। সাবধান! এটা কোন মুসলমানের বিশ্বাস হতে পারে না। বরং এ তো মূর্তিপূজারী মুশরিকদের বিশ্বাস। যাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

)وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لا يَضُرُّهُمْ وَلا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ) (يونس:18)

"ওরা আল্লাহ্ ব্যতীত যার ইবাদাত করে তা ওদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। ওরা বলে, 'এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী।' বল, 'তোমরা কি আল্লাহ্কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিবে যা তিনি জানেন না?" [সূরা ইউনুসঃ ১৮]

এরপরও কি কোন মুসলমানের উচিত মুশরিকদের অনুকরণে ওলি-আউলিয়া, পীর-দরবেশের কাছে শাফায়াত চাওয়া?!!

আল্লাহ্ পাক মুশরিকদের প্রসঙ্গে বলেন যে, তারা এই দাবীতে ওলি-আউলিয়া বা প্রতিমাগুলোর পূজা করত যে এরা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী ব্যক্তিতে পরিণত করবে।

) وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ)(الزمر: من الآية3)

"যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের পূজা এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সানি্নধ্যে এনে দিবে।' ওরা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করেছে আল্লাহ্ তার ফয়সালা করে দিবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফের, আল্লাহ্ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" [সূরা আয্-যুমারঃ ৩]

এটা কি কল্পনা করা যায় যে আল্লাহর কালামের উপর বিশ্বাসস্থাপনকারী কোন মুসলিম আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে ওলি-আউলিয়া বা নেককার-পরহেজগারদের উপাসনা করবে, আর মুশরিকদের মত বলবে যে আমরা তো আল্লাহ্কে পাওয়ার জন্য এদেরকে ডাকি?

আল্লাহ্ পাক স্পষ্ট ভাষায় এ সকল বাতিল উপাস্যদের দূর্বলতা ও অক্ষমতা বর্ণনা করে বলেন,

)وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ لا يَسْتَطِيعُونَ نَصْرَكُمْ وَلا أَنْفُسَهُمْ يَنْصُرُونَ) (لأعراف:197)

"আল্লাহ্ ব্যতীত তোমরা যাদেরকে আহ্বান কর তারা তো তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে না এবং তাদের নিজেদেরকে পারে না।" [সূরা আল-আ'রাফঃ ১৯৭] আল্লাহ্ পাক নিজে যেখানে ঘোষণা দিচ্ছেন যে, তারা তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে না, বরঞ্চ তারা নিজের জন্যও কিছু করতে পারে না সেখানে কোন বিবেকবান মুসলিম কি এ বিশ্বাস করতে পারে যে তারা তাদেরকে সাহায্য করতে পারে? এরপরও যে বলবেঃ হঁ্যা এরা সাহায্য করতে পারে তবে সে আল্লাহ্কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। আর যে আল্লাহ্কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে সে কাফের। হোক না সে পাক্কা মুসলি্ল, সাচ্চা রোযাদার এবং নিজেকে মুসলিম দাবীদার।

নবীকূল শিরোমনি, রাসূলদের সর্দার, গোটা বনী আদমের যিনি নেতা, যার সুপারিশে কিয়ামতের দিন মহা সংকট থেকে নিস্তার মিলবে, যার উচ্চ মর্যাদার কারণে নবী-রাসূল সবাই তাঁর পতাকা তলে সমবেত হবেন; তিনি যদি তাঁর নিকটাত্মীয়দের জন্য কিছু করতে না পারেন তবে আর কার সাধ্য আছে অন্যের জন্য কিছু করার? একদিন সাফা পাহাড়ে উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বক্তব্য দিয়েছিলেন তা কি আপনি জানেন না? ইমাম বোখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে ইবনু আব্বাস ও আবু হোরায়রা থেকে বর্ণনা করেন তারা বলেন, যখন আল্লাহ্ তা'আলার বাণী ঃ

)وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ) (الشعراء:214)

"তোমার নিকট-আত্মীয়বর্গকে সতর্ক কর।" (সূরা আশ্-শু'আরাঃ ২১৪]

নাযিল হল তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে বললেন, 'ও কুরাইশেরা (অথবা কোন সমীপশব্দ) নিজেদের জান নিজেরা খরিদ করে নাও। আল্লাহর শাস্তি থেকে আমি তোমাদেরকে বাঁচাতে পারব না। ও আবদে মানাফের বংশধরেরা, আল্লাহর আযাব থেকে আমি তোমাদেরকে বাঁচাতে পারব না। ও আব্বাস বিন আব্দুল মোত্তালিব, আমি আপনাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচাতে পারব না। ও সাফিয়্যা (রাসূলের ফুফু), আমি আপনাকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে পারব না। ও ফাতেমা (রাসূলের মেয়ে) তুমি আমার কাছে সম্পদ দাবী করতে পার, কিন্তু তোমাকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচানোর জন্য আমি কিছু করতে পারব না।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তাঁর আপন চাচা, আপন ফুফুর জন্য কিছু করতে না পারে; এমনকি তাঁর ঔরশজাত মেয়ের জন্যও কিছু করতে না পারে তবে অন্যের জন্য কিভাবে পারবেন?! সুতরাং সাবধান হোন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর চাচা আবু তালেবের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার মনস্থ করলেন -যে চাচা তাঁকে সবসময় সাহায্য করছেন, বিপদে আশ্রয় দিয়েছেন- আল্লাহ্ স্পষ্ট ভাষায় তাঁকে নিষেধ করে দেন।

)مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ) (التوبة:113)

"আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী এবং মু'মিনদের জন্য সংগত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, নিশ্চিত ওরা জাহান্নামী।" [সূরা আত্-তাওবাঃ ১১৩] আল্লাহ্ তা'আলা যখন লক্ষ্য করলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচার হেদায়েতের জন্য তীব্র আগ্রহী তখন ইরশাদ করলেনঃ

)إِنَّكَ لا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ) (القصص:56)

"তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভাল জানেন সৎপথ অনুসারীদেরকে।" (সূরা আল-কাসাসঃ ৫৬]

প্রিয় মুসলিম ভাই,

যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সত্তার কাছে দো'আ করে, সেসব অজ্ঞ-মূর্খ লোকদের কর্মকাণ্ডে বিভ্রান্ত হবেন না।

)وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لا يَمُوتُ وَسَبِّحْ بِحَمْدِهِ وَكَفَى بِهِ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيراً) (الفرقان:58)

"তুমি নির্ভর কর তাঁর উপর যিনি চিরঞ্জীব, যিনি মরবেন না এবং তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর, তিনি তাঁর বান্দাদের পাপ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত।" [সূরা ফুরকানঃ ৫৮]

অতএব একমাত্র আল্লাহর দরবারে ধর্ণা দিন। তাঁর কাছে দো'আ করুন। তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। অনুনয়-বিনয় একমাত্র তাঁর কাছে পেশ করুন। একমাত্র তাঁর কাছে সাহায্য চান। জেনে রাখুন, আল্লাহ্ পাক আপনার অতি নিকটে। তিনি বলেছেন,

)وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ) (البقرة:186)

"আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আহ্বান করে আমি তার আহ্বানে সাড়া দেই।" [সূরা আল-বাকারাঃ ১৮৬]

প্রিয় দ্বীনি ভাই,

আল্লাহ্ আপনাকে হেফাযতে রাখুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আপন চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন 'যদি কিছু চাও তবে একমাত্র আল্লাহর কাছে চাও, সাহায্যের মুখাপেক্ষী হলেও একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। জেনে রাখ, সমস্ত মানুষ যদি তোমার হিতকামনায় ঐক্যবদ্ধ হয় তবুও তারা আল্লাহর লিপির বাইরে তোমার এক বিন্দুও উপকার করতে পারবে না। আর সমস্ত মানুষ যদি তোমার দুশমনি করার জন্য ঐকমত্যে পেঁৗছে, তবুও তারা আল্লাহর লিপির বাইরে তোমার এক চুলও ক্ষতি করতে পারবে না। কলম তুলে রাখা হয়েছে। লিখিত-লিপি শুকিয়ে গেছে।" এরপরও কি আর কোন যুক্তি-প্রমাণ থাকতে পারে? আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসূলের কথার উপরে কি আর কোন কথা থাকতে পারে?

আত্মার আত্মীয় দ্বীনি ভাই,

এমন কিছু দো'আ আছে যেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবাদের শিক্ষা দিতেন। যেগুলো ব্যাপক অর্থবহ এবং অধিক কল্যাণবাহী। এ দো'আগুলো সকলেরই মুখস্থ থাকা উচিত এবং এর চাহিদা মাফিক আমল করা উচিত। নিম্নে এ ধরণের কিছু দো'আ উল্লেখ করার প্রয়াস পাব।

اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ ِمنْ جَهْدِ الْبَلَاِء، وَدَرَكِ الشَّقَاءِ، وَسُوْءِ الْقَضَاءِ، وَشَمَاتَةِ الْأَعْدَاءِ.

"হে আল্লাহ্, আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যাবতীয় বিপদআপদ থেকে , অশুভ পরিণতি থেকে, মন্দভাগ্য থেকে, এবং শত্রুর ঠাট্টা-বিদ্রূপ থেকে।

اللهم أصلح لي ديني الذي هو عصمة أمري، وأصلح لي دنياي التي فيها معاشي، وأصلح لي آخرتي التي فيها معادي، واجعل الحياة زيادة لي في كل خير، واجعل الموت راحة لي من كل شر.

"হে আল্লাহ্, আমার দ্বীনদারীকে পরিশুদ্ধ করে দিন। যার উপর নির্ভর করে আমার সবকিছুর শুদ্ধতা। দুনিয়াকে আমার জন্য উপযোগী করে দিন। যেখানে রয়েছে আমার জীবিকার উপকরণ। আখেরাতকে আমার জন্য শুভময় করুন। যেখানে আমাকে ফিরে যেতেই হবে। আমার হায়াতকে নেক কাজে লাগাবার তাওফিক দিন। আর মৃতু্যকে যাবতীয় কষ্ট-ক্লেশ থেকে নাজাতের ওসিলা করে দিন।"

اللهم إني أسألك من الخير كله: عاجله وآجله ما علمتُ منه وما لم أَعْلَمْ، وأعوذ بك من الشر كله: عاجله وآجله ما علمتُ منه ومَا لَمْ أَعْلَمْ، اللهم إني أسألك من خير ما سألك منه عبدك ونبيك صلى الله عليه وسلم، وأعوذ بك من شر ما استعاذ منه عبدك ونبيك -صلى الله عليه وسلم- .اللهم إني أسألك الجنة وما قرب إليها من قول أو عمل، وأعوذ بك من النار وما قرب إليها من قول أو عمل، وأسألك أن تجعل كل قضاء قضيته لي خيرا.

"হে আল্লাহ্, আমি আপনার কাছে সমুদয় কল্যাণ চাই। তা নিকটে হোক অথবা দূর ভবিষতে হোক, তা আমার জ্ঞান-সীমায় থাকুক অথবা না থাকুক। এবং আমি সমুদয় অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাই। তা নিকটে হোক অথবা দূর ভবিষতে হোক, আমার জ্ঞান-সীমায় থাকুক অথবা না থাকুক। আপনার বান্দাহ, আপনার নবী আপনার কাছে যে কল্যাণ প্রার্থনা করেছেন আমিও আপনার কাছে সে কল্যান প্রার্থনা করি। আপনার বান্দাহ্, আপনার নবী যে অনিষ্ট থেকে পানাহ্ চেয়েছেন আমিও তা থেকে পানাহ্ চাই। হে আল্লাহ্, আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জান্নাতের পথ সুগমকারী কথা ও কাজ করার তাওফিক চাই। আর জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই এবং জাহান্নামের পথে ধাবিতকারী কথা ও কাজ থেকে মুক্তি চাই। আমি আপনার কাছে আরো আবদার করছি আমার জন্য যা কিছু নির্ধারণ করেছেন সবই যেন কল্যাণকর হয়।

اللهم احفظني بالإسلام قائما، وبالإسلام قاعدا، واحفظني بالإسلام راقدا، ولاتشمت بي عدوا ولاحاسدا، اللهم إني أسألك كل خير خزائنه بيدك، وأعوذ بك من كل شر خزائنه بيدك.

"হে আল্লাহ্, দাঁড়ানো, বসা, শোয়া সর্বাবস্থায় ইসলামের দ্বারা আমাকে হেফাযত করুন। আমাকে শাস্তি দিয়ে শত্রু বা নিন্দুকের হাসির খোরাক বানাবেন না। হে আল্লাহ্, আমি আপনার কাছে সমুদয় কল্যাণ কামনা করি; যার ভাণ্ডার আপনার হাতেই রয়েছে এবং যাবতীয় অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থণা করি; যার ভাণ্ডারও আপনার হাতে রয়েছে।"

اللهم إني أسألك يا ألله بأنك الواحد الأحد، الصمد الذي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ أن تغفر لي ذنوبي إنك أنت الغفور الرحيم.

"হে আল্লাহ্! আপনি এক ও অদ্বিতীয়। আপনি অমুখাপেক্ষী। আপনি কাউকে জন্ম দেননি, কারো ঔরশজাতও নন। আপনার সমতুল্য কেউ নেই। আমি আপনার কাছেই প্রার্থনা করছি। আমার যাবতীয় গোনাহ্ মাফ করে দিন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।"

اللهم إني أسألك بأن لك الحمد لا إله إلا أنت وحدك لا شريك لك، المنان، يا بديع السماوات والأرض يا ذا الجلال والإكرام، يا حي يا قيوم أسألك الجنة وأعوذ بك من النار.

"হে আল্লাহ্, সকল প্রশংসা আপনারই জন্য। আপনি ছাড়া ইবাদাতের উপযুক্ত কোন উপাস্য নেই। আপনি এক, আপনার কোন শরীক নেই, আপনি অনুকম্পাকারী। হে আকাশ ও জমিনের স্রষ্টা, হে মহিমাময় ও মহানুভব, হে চিরঞ্জীব ও সর্বসত্তার ধারক, আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই, জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই।"

اللهم إني أعوذ بك من زوال نعمتك وتحول عافيتك، وفجاءة نقمتك، وجميع سخطك.

"হে আল্লাহ্, আমি আপনার নেয়ামতের অনর্্তধান থেকে ও ক্ষমার নামঞ্জুরি থেকে আশ্রয় চাই। এবং আকস্মিক শাস্তি থেকে ও যাবতীয় অসন্তুষ্টি থেকে পানাহ্ চাই।"

যদি আপনি কোন দুঃশ্চিন্তায় পড়েন বা বিপদগ্রস্ত হন তবে নিম্নোক্ত দো'আটি পড়তে পারেন।

لا إله إلا الله العظيم الحليم، لا إله إلا الله رب العرش العظيم، لا إله إلا الله رب السماوات ورب الأرض ورب العرش الكريم.

"আল্লাহ্ ছাড়া সত্য কোন মা'বুদ নেই। তিনি অতি মহান; সহনশীল। আল্লাহ্ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য কোন মা'বুদ নেই। তিনি মহান আরশের মালিক। আল্লাহ্ ছাড়া ইবাদাতের উপযুক্ত কোন মা'বুদ নেই। তিনি আকাশ-জমিন ও মহান আরশের প্রতিপালক।"

يا حي يا قيوم برحمتك أستغيث فأصلح لي شأني كله ولا تكلني إلى نفسي طرفة عين.

"হে চিরঞ্জীব, হে সর্বসত্তার ধারক, আপনার রহমতের ওসিলা দিয়ে আমি সকাতর নিবেদন করছি- আমার অবস্থা পরিবর্তন করে দিন। এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের উপর ছেড়ে দিবেন না।"

) لا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ)(الانبياء: من الآية87)

"তুমি ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই; তুমি পবিত্র, মহান! আমি তো সীমালংঘনকারী।" [সূরা আম্বিয়াঃ ৮৭]

اللهم إني عبدك، وابن عبدك، وابن أمتك، ناصيتي بيدك، ماض في حكمك، عدل في قضاؤك، أسألك بكل اسم هو لك، سميت به نفسك، أو أنزلته في كتابك، أو علمته أحدًا من خلقك، أو استأثرت به في علم الغيب عندك: أن تجعل القرآن ربيع قلبي، ونور صدري ، وجلاء حزني، وذهاب همي.

"হে আল্লাহ্, আমি আপনার বান্দা এবং আপনারই বান্দা-বান্দীর পুত্র। আমার ভাগ্য আপনার হস্তে, আমার উপর আপনার নির্দেশ কার্যকর, আমার ব্যাপারে আপনার ফয়সালাই ইনসাফপূর্ণ। আপনার যতগুলো নাম আছে আমি সবগুলো নামের ওসিলা দিয়ে আপনার কাছে দো'আ করছি- যে নামগুলো আপনি নিজের জন্য পছন্দ করেছেন, অথবা কিতাবে নাযিল করেছেন, অথবা আপনার সৃষ্টিজীবের কেউ একজনকে শিক্ষা দিয়েছেন অথবা স্বীয় ইলমের ভাণ্ডারে নিজের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন- কুরআন দ্বারা আমার হৃদয়কে প্রশান্ত করে দিন, বক্ষকে জ্যোর্তিময় করে দিন। কুরআনের মাধ্যমে আমার দুঃখ-বেদনা দূর করুন, আমাকে দুশ্চিন্তা-মুক্ত করুন।

اللهم إني أسألك العافية في الدنيا والآخرة، اللهم إني أسألك العفو والعافية في ديني ودنياي وأهلي ومالي، اللهم استر عوراتي وآمن روعاتي، اللهم احفظني من بين يدي ومن خلفي وعن يميني وعن شمالي ومن فوقي، وأعوذ بعظمتك أن أغتال من تحتي.

"হে আল্লাহ্, আমি আপনার নিকট ইহকাল ও পরকালের নিরাপত্তা কামনা করি। হে আল্লাহ্, আমাকে দ্বীন ও দুনিয়ার নিরাপত্তা দিন। হে আল্লাহ্, আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি মার্জনার আর কামনা করছি আমার দ্বীন-দুনিয়া, আমার পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির নিরাপত্তা। হে আল্লাহ্, আমার দোষগুলোকে ঢেকে রাখুন, চিন্তা ও উদ্বিগ্নতাকে শান্তি ও নিরাপত্তায় রূপান্তরিত করে দিন। হে আল্লাহ্, অগ্র-পশ্চাত, ডান-বাম, উর্ধ এসব দিক থেকে আমাকে আপনার হেফাজতে রাখুন এবং পায়ের দিক থেকে গুপ্ত হত্যার শিকার হওয়া থেকেও আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই।"



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )