আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ঈমানের হাকীকত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Friday, 15 December 2006
আর্টিকেল সূচি
ঈমানের হাকীকত
মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য
ভাববার বিষয়
কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ
পাক কালেমা ও নাপাক কালেমা
কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্য

মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য

প্রত্যেক মুসলমান নিশ্চয়ই একথা জানে যে, মুসলমান ব্যক্তি মর্যাদা ও সম্মান কাফের ব্যক্তিদের অপেক্ষা অনেক উচ্চে। আল্লাহ তাআলা মুসলমানকে পছন্দ করেন এবং কাফেরকে অপছন্দ করেন। মুসলমানের গোনাহ ক্ষমা করা হবে কাফেরের অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। মুসলমান জান্নাতে যাবে এবং কাফের জাহান্নামে। কিন্তু মুসলমান এবং কাফেরের মধ্যে এতখানি পার্থক্য কেন হলো, সেই সম্বন্ধে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা আবশ্যক।

কাফের ব্যক্তিরা যেমন হযরত আদম আলাইহিস সালামের সন্তান, মুসলমানরাও তেমনি তাঁর সন্তান। মুসলমান যেমন মানুষ, কাফেররাও তেমনি মানুষ। মুসলমানদের মত তাদেরও হাত-পা, চোখ-কান সবই আছে। তারাও এ পৃথিবীর বায়ুতেই শ্বাস গ্রহণ করে, এ জমিনের উপর বাস করে এবং খাদ্য খায়। তাদের জন্ম এবং মৃত্যু মুসলমানদের মতোই হয়। যে আল্লাহ মুসলমানদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাদেরকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তাহলে মুসলমানদের স্থান উচ্চে এবং তাদের স্থান নীচে হবে কেন? মুসলামান কেন জান্নাতে যাবে আর তারা কেন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে? একথাটি বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখা আবশ্যক। মুসলমাদের এক একজনের নাম রাখা হয়েছে আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান বা তদনুরূপ অন্য কোনো নাম, অতএব তারা মুসলমান। আর কিছু লোকের নাম রাখা হয়েছে দীননাথ, তারা সিং, রবার্টসন প্রভৃতি, কাজেই তারা কাফের ; কিংবা মুসলমানগণ খাৎনা করায়, আর তারা তা করায় না, মুসলমান গরুর গোশত খায়, তারা তা খায় না-শুধু এটুকু কথার জন্যই মানুষে মানুষে এতবড় পার্থক্য হতে পারে না। আল্লাহ তাআলাই যখন সমস্ত মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সকলকেই তিনি লালন-পালন করেন –তিনি এতবড় অন্যায় কখনও করতে পারেন না। কাজেই তিনি এ রকম সামান্য বিষয়ের কারণে মানুষে মানুষে এতবড় পার্থক্য করবেন এবং তাঁরই সৃষ্টি এক শ্রেণীর মানুষকে অকারণে দোযখে নিক্ষেপ করবেন-তা কিছুতেই হতে পারে না।

বাস্তবিকই যদি তা না হয়, তবে উভয়ের মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায় তা চিন্তা করে দেখতে হবে। বস্তুত উভয়ের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য কেবল মাত্র কুফরি ও ইসলামের । ইসলামের অর্থ-আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা এবং কুফরীর অর্থ আল্লাহকে অস্বীকার করা অমান্য করা ও আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হওয়া। মুসলমান ও কাফের উভয়ই মানুষ, উভয়ই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি জীব, তাঁরই আজ্ঞাবহ দাস। কিন্তু তাদের একজন অন্যজন অপেক্ষা এজন্য শ্রেষ্ঠ যে, একজন নিজের প্রকৃত মনিবকে চিনতে পারে, তাঁর আদেশ পালন করে এবং তাঁর অবাধ্য হওয়ার দুঃখময় পরিণামকে ভয় করে। কিন্তু অন্যজন নিজ মনিবকে চিনে না এবং তাঁর অবাধ্য হওয়ার দুঃখময় পরিণামকে ভয় করে না এবং তাঁর আদেশ পালন করে না, এজন্যই সে অধপাতে চলে যায়। এ কারণেই মুসলমানদের প্রতি অসন্তুষ্ট, মুসলমানকে জান্নাতে দেয়ার ওয়াদা করেছেন এবং কাফেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার ভয় দেখিয়েছেন।

এর দ্বারা বুঝা গেল যে, মুসলমানকে কাফের হতে পৃথক করা যায় মাত্র দু’টি জিনিসের ভিত্তিতে: প্রথম, ইলম বা জ্ঞান; দ্বিতীয়, আমল বা কাজ। অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলমাকে প্রথমেই জানতে হবে যে, তার প্রকৃত মালিক কে? কিসে তিনি সন্তুষ্ট হন আর কিসে তিনি অসন্তুষ্ট হন-এসব বিস্তৃতভাবে জেনে নেয়ার পর নিজেকে প্রকৃত মালিকের একান্ত অনুগত বানিয়ে দেবে, তাঁর মর্জিমত চলবে, নিজের স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা ত্যাগ করবে। তার মন যদি “মালিকের” ইচ্ছার বিপরীত কোনো কামনা করে তবে সে নিজের মনের কথা না শুনে “মালিকের” কথা শুনবে। কোনো কাজ যদি নিজের কাছে ভালো মনে হয়, কিন্তু মালিক সে কাজটিকে ভালো না বলেন, তবে তাকে মন্দই মনে করবে। আবার কোনো কাজ যদি নিজের মনে খুব মন্দ বলে ধারণা হয়, কিন্তু “মালিক” তাকে ভালো মনে করেন এবং কোনো কাজ যদি নিজের পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে হয় অথচ “মালিক” যদি তা করার হুকুম দেন, তবে তার জান ও মালের যতই ক্ষতি হোক না কেন, তা সে অবশ্যই করবে। আবার কোনো কাজে যদি নিজের জন্য লাভজনক মনে করে, আর “মালিক” তা করতে নিষেধ করেন তবে তাতে দুনিয়ার সমস্ত ধন-সম্পত্তি লাভ করতে পারলেও তা সে কখনই করবে না। ঠিক এ ইলম ও এরূপ আমলের জন্যই মুসলমান আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাহ। তার উপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হয় এবং আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মান দান করেন। কিন্তু উল্লেখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে কাফের কিছুই জানে না এবং জ্ঞান না থাকার দরুনই তার কার্যকলাপও তদনুরূপ হয় না এ জন্য যে, সে আল্লাহ তাআলা সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ এবং তার অবাধ্য বান্দা । ফলত সে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হবে।

এ আলোচনার শেষকথা এই যে, যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়, অথচ কাফেরের মতোই জাহেল বা অজ্ঞ এবং আল্লাহ তাআলার অবাধ্য এমতাবস্থায় কেবল নাম, পোশাক ও খানা-পিনার পার্থক্যের কারণে সে কাফের অপেক্ষা কোনোভাবেই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না, আর কোনো কারণেই সে ইহকাল ও পরকালে আল্লাহ তাআলার রহমতের হকদার হবে পারে না।

ইসলাম কোনো জাতি, বংশ বা সম্প্রদায়ের নাম নয়। কাজেই বাপ হতে পুত্র এবং পুত্র হতে পৌত্র আপনা-আপনিই তা লাভ করতে পারে না। ব্রাহ্মণের পুত্র মূর্খ এবং চরিত্রহীন হলেও কেবলমাত্র ব্রাহ্মণের পুত্র বলেই সে ব্রাহ্মণের মর্যাদা পেয়ে থাকে এবং উচ্চ বংশ বলে পরিগণিত হয়। আর চামারের পুত্র জ্ঞানী ও গুণী হয়েও নীচ ও হীন থেকে যায়। কারণ সে চামারের মত নীচ জাতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে। কিন্তু ইসলামে এসব বংশ বা গোত্রীয় মর্যাদার বিন্দুমাত্র স্থান নেই। এখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন: “তোমাদের মধ্যে যে লোক আল্লাহ তাআলাকে বেশী ভয় করে এবং সকলের অধিক তাঁর আদেশ পালন করে চলে সে-ই তাঁর কাছে অধিক সম্মানিত।” হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম একজন মূর্তি-পূজারীর ঘরে জন্ম লাভ করেছিলেন; কিন্তু তিনি আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পেরে তাঁর আদেশ পালন করলেন; এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমস্ত জগতের নেতা বা ইমাম করে দিয়েছিল। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের পুত্র একজন নবীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিল; কিন্তু সে আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারল না বলে তার অবাধ্য হয়ে গেল। এজন্য তার বংশমর্যাদার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হলো না। উপরন্তু যে শাস্তি দেয়া হলো, সমস্ত দুনিয়া তা হতে শিক্ষা লাভ করতে পারে। অতএব বুঝে দেখুন, আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষে মানুষে যা কিছু পার্থক্য হয়ে থাকে, তা কেবল ইলম ও আমলের জন্য মাত্র। দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁর অনুগ্রহ কেবল তারাই পেতে পারে, যারা তাঁকে প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী চিনে এবং তার অনুসরণ করে।

কিন্তু যাদের মধ্যে এ গুণ নেই, তাদের নাম আবদুল্লাহই হোক, আর আবদুর রহমান হোক, দীননাথই হোক, আর তারাসিং-ই হোক, আল্লাহ তাআলার কাছে এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই-এরা কেউই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ পাবার অধিকার পেতে পারে না।

মুসলমানগণ নিজেদের মুসলমান বলে মনে করে এবং মুসলমানের উপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হয় বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু একটু চোখ খুলে চেয়ে দেখূন, আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ কি তাদের ওপর সত্যই নাযিল হচ্ছে? পরকালের কথা পরের জন্যই রইল, এই দুনিয়ায় মুসলমানদের যে দুরাবস্থা হচ্ছে তা-ই একবার খেয়াল করে দেখা আবশ্যক।

মুসলমান বাস্তবিকই যদি আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাহ হতো তাহলে আল্লাহর সেই প্রিয়জনেরা দুনিয়ায় নানাভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে কেন? আল্লাহ কি যালেম (নাউযুবিল্লাহ)? মুসলমান যদি আল্লাহ তাআলার “হক” জানতো, তার আদেশ পালন করতো, তাহলে তিনি তার অবাধ্য বান্দাদেরকে মুসলমানদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা করে দেবেন কেন? আর তাদেরকে তার আনুগত্যের বিনিময়ে শাস্তিইবা দেবেন কোন্ কারণে? আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই যালেম নন এবং তাঁর আনুগত্য করা বিনিময় অপমান ও শাস্তি নয়। একথা যদি একান্তভাবে বিশ্বাস করা হয় তবে স্বীকার করতেই হবে যে, মুসলমানদের মুসলমান হওয়ার দাবীতে কিছুটা গলদ আছে। তাদের নাম সরকারী দফতরে নিশ্চয়ই মুসলমান হিসেবে লিখিত আছে; কিন্তু সেই সরকারী দফতরের সার্টিফিকেট অনুসারে আল্লাহ তাআলার দরবারে বিচার হবে না। আল্লাহ তাআলার নিজস্ব দফতর রয়েছে এবং তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাজেই তাঁর দফতরে মুসলমানদের নাম তাঁর অনুগত লোকদের তালিকায় লিখিত আছে, না অবাধ্য লোকদের তালিকায় লিখিত হয়েছে তা খোঁজ করে দেখা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের কাছে কিতাব পাঠিয়েছেন, তা পড়ে মুসলমানগণ প্রকৃত “মালিক”-কে চিনতে পারে; কিন্তু ঐ কিতাবে যা লিখিত আছে, তা জানার জন্য মুসলমাগণ একটুও চেষ্টা করেছে কি? আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি নবী পাঠিয়েছেন, তিনি মুসলিম হওয়ার উপায় ও নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর নবী দুনিয়ায় এসে কি শিক্ষা দিয়েছেন, তা জনার জন্য তারা কখনও যত্নবান হয়েছে কি? আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে ইজ্জত লাভ করার পথের সন্ধান বলে দিয়েছেন, কিন্তু তারা সেই পথে চলছে কি? যেসব কাজ মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে, আল্লাহ তাআলা তা এক এক করে বলে দিয়েছেন, কিন্তু মুসলমান কি সেসব কাজ ত্যাগ করেছে? এ প্রশ্নগুলোর কি উত্তর হতে পারে? যদি স্বীকার করা হয় যে, আল্লাহ তাআলার কিতার হতে মুসলমানগণ যেমন কোনো জ্ঞান লাভ করতে চেষ্টা করেনি, তেমনি তাঁর প্রদর্শিত পথেও তারা একটুও চলেনি, তাহলে তারা মুসলমান হলো কিরূপে এবং তারা পুরষ্কারই বা কিরূপে চাচ্ছে। তারা যে ধরনের মুসলমানীর দাবী করছে, ফলও তেমনি পাচ্ছে, আর তেমনি পুরস্কার তারা পরকালেও পাবে।

আমি প্রথমেই বলেছি যে, মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে ইলম ও আমল-জ্ঞান ও কাজ ছাড়া আর কোনই প্রভেদ নেই। কারো ইলম ও আমল যদি কাফেরের ইলম ও আমলের মত হয়, আর তবুও যে নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দেয় তাহলে বুঝতে হবে যে, তার মতো মিথ্যাবাদী আর কেউই নয়। কাফের পবিত্র কুরআন পড়ে না এবং তাতে কি লিখিত আছে তা সে জান না। কিন্তু মুসলমানের অবস্থা যদি এ রকমই হয় তাহলে সে নিজেকে মুসলমান বলবে কোন অধিকারে? নবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার মানুষকে যে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন এবং আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করার জন্য যে সরল পথ দেখিয়েছেন, কাফেরগণ তা কিছুই জানে না। এখন মুসলমানও যদি সেই রকমই অজ্ঞ হয় তাহলে তাকে “মুসলমান” কেমন করে বলা যায়? কাফের আল্লাহর মর্জি মতো চলে না, চলে নিজ ইচ্ছামত; মুসলমানও যদি সেরূপ স্বেচ্ছাচারিতার বশবর্তী হয়, সেরূপই আল্লাহর প্রতি উদাসীন ও বেপরোয়া হয় এবং নিজের প্রবৃত্তির অনুগত দাস হয়, তবে তার নিজেকে “মুসলমান” অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ পালনকারী” বলার কি অধিকার আছে? কাফের হালাল-হারামের মধ্যে পার্থক্য করে না। যে কাজে সে লাভ ও আনন্দ দেখতে পায়- তা আল্লাহ তাআলার কাছে হালাল হোক কি হারাম হোক অসংকোচে সে তাই করে যায়। মুসলমানও যদি এ নীতি গ্রহণ করে তবে তার ও কাফের ব্যক্তির পার্থক্য রইল কোথায়? মোটকথা, কাফেরের ন্যায় মুসলমান ও যদি ইসলাম সম্বন্ধে অজ্ঞ হয় এবং কাফের ও মুসলমানের কাজ-কর্ম যদি একই রকম হয়, তাহলে দুনিয়ায় কাফেরের পরিবর্তে কেবল মুসলমানরাই সম্মান লাভ করবে কেন? কাফেরের ন্যায় মুসলমানরাও পরকালে শাস্তি ভোগ করবে না কিসের জন্য? এটা এমন একটি গুরুতর বিষয় যে, এ সম্বন্ধে আমাদের ধীরভাবে চিন্তা করা আবশ্যক।

একথা মনে করার কারণ নেই যে, আমি মুসলমানকে কাফেরের মধ্যে গণ্য করছি, কারণ তা কখনও উচিত নয়। আমি নিজেও এ সম্বন্ধে যারপর নাই চিন্তা করি এবং আমি চাই যে, আমারদের সমাজের প্রত্যেকেই এ সম্বন্ধে চিন্তা করুক। আমরা আল্লাহ তাআলার রহমত হতে বঞ্চিত হচ্ছি কেন, চারিদিক হতে আমাদের ওপর কেন এ বিপদরাশি এসে পড়ছে? যাদেরকে আমরা “কাফের” অর্থাৎ আল্লাহর অবাধ্য বান্দাহ মনে করি, তারা আমাদের ওপর সকল ক্ষেত্রে বিজয়ী কেন? আর আমরা যারা আল্লাহর আদেশ পালনকারী বলে দাবী করি, তারাই বা সব জায়গায় পরাজিত কেন? এর কারণ সম্বন্ধে আমি যতই চিন্তা করি, ততই আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, আমাদের ও কাফেরদের প্রতি বর্তমানে শুধু নামেই পার্থক্য রয়েছে গিয়েছে। কার্যত আমরা আল্লাহ তাআলার প্রতি অবহেলা, ভয়হীনতা এবং অবাধ্যতা দেখাতে কাফেরদের অপেক্ষা কিছুমাত্র পিছনে নেই। তাদের ও আমাদের মধ্যে সামান্য কিছু প্রভেদ অবশ্যই আছে, কিন্তু তার জন্য আমরা কোনোরূপ প্রতিদান বা পুরস্কারের আশা করতে পারি না, বরং সে জন্য আমরা অধিক শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। কেননা আমরা জানি যে, কুরআন আল্লাহ তাআলার কিতাব, অথচ আমরা এর সাথে কাফেরের ন্যায়ই ব্যবহার করছি। আমরা জানি, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত, শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী, অথচ তাঁর অনুসরণ করা আমরা কাফেরদের মতই ত্যাগ করেছি। আমরা জানি যে, মিথ্যাবাদীর প্রতি আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন এবং ঘুষখোরদের ও ঘুষদাতা উভয়ই নিশ্চিতরূপে দোযখে যাবে বলে ঘোষণা করেছেন, সুদখোর ও সুদদাতাকে জঘন্য পাপী বলে অভিহিত করেছেন।চোগলখুরী ও গীবতকারীকে আপন ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন, অশ্লীলতা ও লজ্জাহীনতার জন্য কঠিন শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু এ সমস্ত কথা জানার পরও আমরা কাফেরদের মতোই বেপরোয়াভাবে এসব কাজ করে যাচ্ছি। মনে হয়, যেন আমাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় মাত্রই নেই। এজন্য কাফেরদের তুলনায় আমরা কিছুটা “মুসলমান” হয়ে থাকলেও আমাদের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন আমরা পাচ্ছি না; বরং কেবল শাস্তি পাচ্ছি-নানাভাবে এবং নানাদিক দিয়ে। আমাদের ওপর কাফেরদের জয়লাভ এবং সর্বদা আমাদের পরাজয় এ অপরাধেরই শাস্তি। ইসলাম রূপ এক মহান নেয়ামত আমাদেরকে দেয়া হয়েছে, অথচ আমরা তার বিন্দুমাত্র কদর করিনি, এটা অপেক্ষা বড় অপরাধ আর কি হতে পারে?

ওপরে যা কিছু বলেছি, তা কাউকে ভৎসনা করার উদ্দেশ্যে বলিনি, ভৎসনা করার উদ্দেশ্যে কলমও ধরিনি। আসলে উদ্দেশ্য এই যে, আমরা যা কিছু হারিয়ে ফেলেছি, তা ফিরে পাবার জন্য চেষ্টা করা হোক। হারানো জিনিস পুণরায় পাওয়ার চিন্তা মানুষের ঠিক তখনই হয়, যখন সে নিশ্চিতরূপে জানতে ও বুঝতে পারে যে, তার কি জিনিস এবং কত মূল্যবান জিনিস হারিয়েছে। এজন্যই আমি মুসলমানদেরকে সতর্ক করার চেষ্টা করছি, যদি তাদের জ্ঞান ফিরে আসে এবং তারা যে প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলেছে তা যদি বুঝতে পারে, তবে তা পুণরায় পেতে চেষ্টা করবে।

আমি প্রথম প্রবন্ধে বলেছি যে, মুসলমানের প্রকৃত মুসলমান হবার জন্য সর্বপ্রথম একান্ত দরকার হচ্ছে খাঁটি ইসলামী শিক্ষা ও ইসলাম সম্বন্ধে প্রকৃত জ্ঞান। পবিত্র কুরআনের শিক্ষা কি? রাসুল পাকের প্রদর্শিত পথ কি? এসব কথা প্রত্যেক মুসলমানেরই সুস্পষ্টরূপে জেনে নেয়া আবশ্যক। এ জ্ঞান না থাকলে কোনো ব্যক্তিই মুসলমান হতে পারে না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা সেই ইলম অর্জন করতে কোনই চেষ্টা করে না। এটা হতে বুঝা যায় যে, তারা যে কত বড় নেয়ামত ও রহমত হতে বঞ্চিত, সে কথা এখন পর্যন্ত তারা বুঝতে পারেনি। শিশু কেঁদে না ওঠলে মা-ও তাকে দুধ দেয় না, পিপাসু ব্যক্তি পিপাসা বোধ করলেই নিজেই পানির তালাশ করে, আল্লাহ-ও তাকে পানি মিলিয়ে দেন। মুসলমানদের নিজেদেরই যদি পিপাসা না থাকে, তবে পানি ভরা কূপ তাদের মুখের কাছে আসলেও তাতে কোন লাভ নেই। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা কত বড় এবং কত ভীষণ ক্ষতি তা তাদের নিদেরই অনুধাবন করা উচিত। আল্লাহ তাআলার কিতাব তাদেরই কাছে মওজুদ আছে, অথচ নামাযে তারা আল্লাহ তাআলার কাছে কি প্রার্থনা করে, তা তারা জানে না, এটা অপেক্ষা দুর্ভাগ্যের কথা আর কি হতে পারে? যে ‘কালেমা’ পাঠ করে তারা ইসলামে প্রবেশ করে, এর অর্থ পর্যন্ত তারা জানে না। এ কালেমা পাঠ করার সাথে সাথে তাঁদের ওপর কি কি দায়িত্ব এসে পড়ে তাও জানে না। বস্তুত একজন মুসলমানের পক্ষে এতদপেক্ষা ক্ষতি ও দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। ক্ষেত-খামার নষ্ট হওয়ার পরিণাম যে কি, তা সকলেই জানে। ফসল নষ্ট হলে না খেয়ে মরতে হবে তাতে কারো সন্দেহ নেই। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার পরিণাম যে কত ভীষণ ও ভয়াবহ, সেই কথা তারা অনুভব করতে পারে না। কিন্তু এ ক্ষতির কথা যখন তার অনুভব করতে পারবে, তখন তারা নিজেরাই এ ভীষণ ক্ষতির কবল হতে বাঁচতে সচেষ্ট হবে, তখন ইনশাআল্লাহ তাদেরকে এ ক্ষতি হতে বাঁচাবার ব্যবস্থাও করা হবে।

 



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )