আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামের হাকীকত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Saturday, 06 January 2007
আর্টিকেল সূচি
ইসলামের হাকীকত
ঈমানের পরীক্ষা
ইসলামের নির্ভুল মানদন্ড
আল্লাহর হুকুম পালন করা দরকার কেন?
দ্বীন ও শরীয়াত

দ্বীন ও শরীয়াত

ধর্ম সম্বন্ধে কথাবার্তা বলার সময় আপনারা দু’টি শব্দ প্রায়ই শুনে থাকবেন এবং আপনারা নিজেরাও প্রায়ই বলে থাকেন। সেই দু’টি শব্দের একটি হচ্ছে দ্বীন; দ্বিতীয়টি হচ্ছে শরীয়াত। কিন্তু অনেক কম লোকই এ শব্দ দু’টির অর্থ ও তাৎপর্য ভালো করে জানে। যারা লেখা-পড়া জানে না, তারা এর অর্থ না জানলে তা কোনো অপরাধের কথা নয় ; কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, ভালো ভালো শিক্ষিত লোকেরা-এমন কি বহু মৌলভী সাহেব পর্যন্ত শব্দ দু’টির সঠিক অর্থ এবং এ দুটির পারস্পরিক পার্থক্য সম্পর্কে আদৌ ওয়াকিবহাল নন। এ দু’টির অর্থ ভালো করে না জানায় অনেক সময় ‘দীন' কে শরীয়াতের সাথে এবং শরীয়াতকে দীনের সাথে একেবারে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দেয়া হয়। এতে অনেক প্রকার ভুল বুঝাবুঝি হয়ে থাকে। এ প্রবন্ধে আমি খুব সহজ কথায় এ শব্দ দু’টির অর্থ আপনাদের কাছে প্রকাশ করবো।

দীন (دين) শব্দের কয়েকটি অর্থ হতে পারে। প্রথমঃ শক্তি, কর্তৃত্ব, হুকুমাত, রাজত্ব-আধিপত্য এবং শাসন ক্ষমতা। দ্বিতীয় ঃ এর সম্পূর্ণ বিপরীত যথা-নীচতা, আনুগত্য, গোলামি, অধীনতা এবং দাসত্ব। তৃতীয়, হিসেব করা ফায়সালা করা ও যাবতীয় কাজের প্রতিফল দেয়া। কুরআন শরীফে ‘দ্বীন’ (دين) শব্দটি এ তিন প্রকারের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছেঃ

 

﴿إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ﴾ (ال عمران: ١٩)

অর্থাৎ আল্লাহর কাছে তাই হচ্ছে একমাত্র ‘দীন’ যাতে মানুষ শুধু আল্লাহ তাআলাকেই শক্তিমান মনে করে এবং তাকে ছাড়া আর কারো সামনে নিজেকে নত মনে করে না। কেবল আল্লাহকেই মনিব, মালিক, বাদশাহ ও রাজাধিরাজ বলে মানবে এবং তিনি ছাড়া আর কারো কাছে হিসেব দেয়ার পরোয়া করবে না ; অন্য কারো কাছে প্রতিফল পাবার আশা করবে না এবং কারো শাস্তির ভয় করবে না। এ ‘দীনের’ই নাম হচ্ছে ‘ইসলাম’। কোনো মানুষ যদি এ আকীদা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আসল শক্তিমান, আইন রচয়িতা, আসল বাদশাহ ও মালিক, প্রকৃত প্রতিফলদাতা মনে করে এবং তার সামনে বিনয়ের সাথে মাথা নত করে, যদি তাঁর বন্দেগী ও গোলামী করে, তাঁর আদেশ মতো কাজ করে এবং তার প্রতিফলের আশা ও তার শাস্তির ভয় করে, তাহলে তাকে মিথ্যা ‘দীন’ মনে করতে হবে। আল্লাহ এমন ‘দীন’ কখনও কবুল করবেন না। কারণ এটা প্রকৃত সত্যের সম্পূর্ণ খেলাপ। এ নিখিল পৃথিবীতে আসল শক্তিমান ও সম্মানিত সত্তা আল্লাহ ছাড়া কেউ নয়। এখানে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন আধিপত্য নেই, বাদশাহী নেই। আর মানুষকে আল্লাহ ছাড়া আর কারো বন্দেগী ও গোলামী করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। সেই আসল মালিক ছাড়া কাজের প্রতিফল দেয়ায় ক্ষমতা কারো নেই। একথাই অন্য এক আয়াতে এভাবে বলা হয়েছেঃ

﴿وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلاَمِ دِيناً فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ (ال عمران: ٨٥)

অর্থাৎ আল্লাহর আধিপত্য ও প্রভূত্ব ছেড়ে যে ব্যক্তি অন্য কাউকে নিজের মালিক এবং আইন রচয়িতা বলে স্বীকার করে, তার বন্দেগী ও গোলামী কবুল করে এবং তাকে কাজের প্রতিফলদাতা মনে করে, তার এ ‘দ্বীন’ কে আল্লাহ তাআলা কখনই কবুল করবেন না। কারণঃ 

﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء﴾ (البينه: ٥)

“মানুষকে আল্লাহ তাঁর নিজের বান্দাহ করে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কারো বন্দেগী করার আদেশ মানুষকে দেয়া হয়নি। তাদের একমাত্র অবশ্য কর্তব্য ফরয এই যে, সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধু আল্লাহর জান্যই নিজেই দ্বীন-অথাৎ আনুগত্য ও গোলামীকে নিযুক্ত করবে, একমুখী হয়ে তাঁরই বন্দেগী করবে এবং শুধু তাঁরই হিসেব করার ক্ষমতাকে ভয় করবে।” - সূরা আল বাইয়্যেনাঃ ৫

﴿أَفَغَيْرَ دِينِ اللّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ طَوْعاً وَكَرْهاً وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ﴾ (ال عمران: ٨٣)

“মানুষ কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো গোলামী ও হুকুম পালন করতে চায়? অথচ প্রকৃতপক্ষে আকাশ ও প্রথিবীর সমস্ত জিনিসই কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলারই একান্ত গোলাম ও হুকুম পালনকারী এবং এসব জিনিসকে তাদের নিজেদের হিসাব-কিতাবের জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে যেতে হবে না। তবুও মানুষ কি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত জিনিসের বিরুদ্ধে আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া আর অন্য কোনো পথ অবলম্বন করতে চায় ?” -সূরা আলে ইমরানঃ ৮৩

﴿هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ﴾ (الصف: ٩)

“আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে ইসলামী জীবনব্যবস্থা ও সত্যের আনুগত্যের ব্যবস্থা সহকারে এ জন্য পাঠিয়েছেন যে, তিনি সকল ‘মিথ্যা খোদার’ খোদায়ী ও প্রভুত্ব ধ্বংস করে দিবেন এবং মানুষকে এমন ভাবে আযাদ করবেন যে, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো বান্দাহ হবে না, কাফের আর মুশরিকগণ নিজেদের মূর্খতার দরুন যতই চীৎকার করুক না কেন এবং একে ঘৃণা করুন না কেন।” - সূরা আস সফঃ ৯

﴿وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لاَ تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلّه﴾ (الأنفال : 3٩)

“তোমরা যুদ্ধ কর যেন দুনিয়া হতে গায়রুল্লাহর প্রভুত্ব চিরতরে দুর হয় এবং দুনিয়ায় যেন শুধু আল্লাহরই আইন প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহর বাদশাহী যেন সকলেই স্বীকার করে এবং মানুষ যেন শুধু আল্লারই বন্দেগী করে।”-সূরা আল আনফালঃ ৩৯

ওপরের এ ব্যাখ্যা দ্বারা ‘দ্বীন’ শব্দের অর্থ পাঠকের কাছে সুস্পষ্ট হয়েছে আশা করি। সংক্ষেপে বলতে গেলে তা এই -আল্লাহকে মালিক, মনিব এবং আইন রচনাকারী স্বীকার করা-আল্লাহরই গোলামী, বন্দেগী ও তাবেদারী করা, আল্লাহর হিসাব গ্রহণের ও তাঁর শাস্তি বিধানের ভয় করা এবং একমাত্র তাঁরই কাছে প্রতিফল লাভের আশা করা।

তারপরও যেহেতু আল্লাহর হুকুম তাঁর কিতাব ও রাসূলের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌছিয়ে থাকে, এজন্য রাসূলকে আল্লাহর রাসূল এবং কিতাবকে আল্লাহর কিতাব বলে মান্য করা আর কার্যক্ষেত্রে তার অনুসরণ করাও “দ্বীন” এর মধ্যে গণ্য। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ

 

﴿يَا بَنِي آدَمَ إِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ فَلاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ﴾  (الاعراف: ٣٥)

“হে আদম সন্তান ! আমার নবী যখন তোমাদের কাছে বিধান নিয়ে আসবে তখন যারা সেই বিধানকে মেনে আদর্শবাদী জীবনযাপন করবে এবং সেই অনুসারে নিজেদের কাজ-কারবার সমাপন করবে, তাদের কোনো ভয়ের কারণ নেই।” - সূরা আল আরাফঃ ৩৫

এর দ্বারা জানা গেল যে, আল্লাহ সোজাসুজি প্রত্যেক মানুষের কাছে তাঁর বিধান পাঠান না, বরং তার নবীদের মাধ্যমেই পাঠিয়ে থাকেন। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহকে আইন রাচনাকারী বলে স্বীকার করবে সেই ব্যক্তি কেবল নবীদের হুকুম পালন করে এবং তাঁদের প্রচারিত বিধানের আনুগত্য করেই আল্লাহর হুকুম পালন করতে পারে একে বলা হয় ‘দ্বীন’।

অতপর শরীয়াতের সংজ্ঞা সম্পর্কে আলোচনা করবো। শরীয়াত শব্দের অর্থ ঃ পথ ও নিয়ম। একজন মানুষ যখন আল্লাহকে আইন রচনাকরী বলে তার বন্দেগী স্বীকার করে এবং একথাও স্বীকার করে নেয় যে, রাসূল আল্লাহর তরফ হতেই অনুমতি প্রাপ্ত আইনদাতা হিসেবে এসেছেন এবং কিতাব তাঁরই তরফ হতেই নাযিল হয়েছে, ঠিক তখনই সে দ্বীন-এর মধ্যে দাখিল হয়। এরপরে যে নিয়ম অনুযায়ী তাকে আল্লাহর বন্দেগী করতে হয় এবং তার আনুগত্য করার জন্য যে পথে চলতে হয় তারই নাম হচ্ছে শরীয়াত। এ পথ ও কর্মপদ্ধতি আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলের মারফতে পাঠিয়েছেন। মালিকের ইবাদাত কোন নিয়মে করতে হবে, পাক-পবিত্র হওয়ার নিয়ম কি, নেকী ও তাকওয়ার পথ কোনটি, অন্য মানুষের হক কিভাবে আদায় করতে হবে, কাজ-কারবার কিভাবে করতে হবে, জীবন কিভাবে যাপন করতে হবে, এসব কথা নবীই বলেছেন। দ্বীন ও শরীয়াতের মধ্যে পার্থক্য এই যে, দ্বীন চিরকালই এক-ছিল এক আছে এবং চিরকাল একই থাকে ; কিন্তু শরীয়াত দুনিয়ায় বহু এসেছে, বহু বদলিয়ে গেছে। অবশ্য শরীয়াতের এ পরিবর্তনের কারণে দ্বীনের কোনো দিনই পরিবর্তন হয়নি। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দ্বীন যা ছিল হযরত নূহ আলাইহিস সালামের দ্বীনও তাই ছিল, হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দ্বীনও তাই ছিল। হযরত শোয়াইব আলাইহিস সালাম, হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম এবং হযরত হুদ আলাইহিস সালামের দ্বীনও তাই ছিল এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনও ঠিক তাই। কিন্তু এ নবীগণের প্রত্যেকেরই শরীয়াতে কিছু না কিছু পার্থক্য বর্তমান ছিল। নামাজ এবং রোজার নিয়ম এক এক শরীয়াতে এক এক রকমের ছিল। হারাম ও হালালের হুকুম, পাক-পবিত্রতার নিয়ম, বিয়ে ও তালাক এবং সম্পত্তি বন্টনের আইন এক এক শরীয়াতের এক এক রকম ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা সকলেই মুসলমান ছিলেন। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও হযরত মুছা আলাইহিস সালামের উম্মতগণও মুসলমান ছিলেন, আর আমরাও মুসলমান কেননা সকলের দ্বীন এক। এর দ্বারা জানা গেল যে, শরীয়াতের হুকুম বিভিন্ন হলেও দ্বীন এক থাকে, তাতে কোনো পার্থক্য হয় না-দ্বীন অনুসারে কাজ করার নিয়ম-পন্থা যতই বিভিন্ন হোক না কেন।

এ পার্থক্য বুঝার জন্য একটা উদাহরণ দেয়া যাচ্ছে। মনে করুন, একজন মনিবের বহু সংখ্যক চাকর আছে। যে ব্যক্তি সেই মনিবকে মনিব বলে স্বীকার করে না এবং তার হুকুম মান্য করা দরকার বলে মনেই করে না, সে তো পরিষ্কার নাফরমান এবং সে চাকরের মধ্যে গণ্যই নয়। আর যারা তাকে মনিব বলে স্বীকার করে, তার হুকুম পালন করা কর্তব্য বলে বিশ্বাস করে এবং তার হুকুমের অবাধ্য হতে ভয় করে, তারা সকলেই চাকরের মধ্যে গণ্য। চাকুরী করা এবং খেদমত করার নিয়ম বিভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মূলত তারা সকলেই সমানভাবে সেই একই মনিবের চাকর, তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। মালিক বা মনিব যদি একজন চাকরকে চাকুরীর এক নিয়ম বলে দেয় আর অন্যজনকে বলে আর এক নিয়ম তবে এদের কেউই একথা বলতে পারে না যে, আমি মনিবের চাকর কিন্তু ঐ ব্যক্তি চাকর নয়। এভাবে মনিবের হুকুমের অর্থ ও উদ্দেশ্য যদি এক একজন চাকর এক এক রকম বুঝে থাকে অর্থ উভয়েই নিজের নিজের বুদ্ধিমত সেই হুকুম পালন করে, তবে চাকুরীর বেলায় উভয়ই সমান। অবশ্য হতে পারে যে, একজন চাকর মনিবের হুকুমের অর্থ ভুল বুঝেছে, আর অন্যজন এর অর্থ ঠিকমত বুঝেছে। কিন্তু হুকুম মত কাজ উভয়েই যখন করেছে, তখন একজন অন্যজনকে নাফরমান অথবা মনিবের চাকুরী হতে বিচ্যূত বলে অভিযুক্ত করতে পারে না।

এ উদাহরণ হতে আপনারা দ্বীন ও শরীয়াতের পারস্পরিক পার্থক্য খুব ভাল করে বুঝতে পারেন। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন নবীর মারফতে বিভিন্ন শরীয়াত পাঠিয়েছিলেন। এদের একজনকে চাকুরীর এক রকমের নিয়ম বলেছেন, আর অন্যজনকে বলেছেন অন্যবিধ নিয়ম। এ সমস্ত নিয়ম অনুসরণ করে আল্লাহর হুকুম মতো যারা কাজ করেছেন, তাঁরা সকলেই মুসলমান ছিলেন-যদিও তাদের চাকুরির নিয়ম ছিল বিভিন্ন রকমের। তারপর যখন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ায় তাশরীফ আনলেন, তখন সকলের মনিব আল্লাহ তাআলা হুকুম করলেন যে, এখন পূর্বের সমস্ত নিয়মকে আমি বাতিল করে দিলাম। ভবিষ্যতে যে আমার চাকুরি করতে চায় তাকে ঠিক সেই নিয়ম অনুসারেই কাজ করতে হবে, যে নিয়ম আমার শেষ নবীর মাধ্যমে আমি প্রচার করবো। এরপর পূর্বের কোনো নিয়মকে স্বীকার না করে এবং এখনও সেই পুরাতন নিয়ম মতো চলতে থাকে, তবে বলতে হবে যে, সে আসলে মনিবের হুকুম মানছে না, সে তার নিজের মনের কথাই মানছে। কাজেই এখন সে চাকুরি হতে বরখাস্ত হয়েছে। -অর্থাৎ ধর্মের পরিভাষায় সে কাফের হয়ে গেছে।

প্রাচীন নবীগণকে যারা এখনও মেনে চলতে চায় তাদের সম্বন্ধে একথাই প্রযোজ্য। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুগামী যারা তাদের সম্পর্কে উল্লেখিত উদাহরণের দ্বিতীয় অংশ বেশ খেটে যায়। আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে আমাদের কাছে যে শরীয়াত পাঠিয়েছেন, তাকে যারা আল্লাহর শরীয়াত বলে স্বীকার করে এবং তা পালন করা কর্তব্য বলে মনে করে, তারা সকলেই মুসলমান। এখন এই শরীয়াতকে একজন যদি একভাবে বুঝে থাকে আর এজন অন্যভাবে এবং উভয়ই নিজ নিজ বুদ্ধিমত সেই অনুসারে কাজ করে তবে তাদের কেউই চাকুরী হতে বিচ্যুত হবে না। কারণ এই যে, তাদের প্রত্যেকেই যে নিয়মে কাজ করছে সে একান্তভাবে মনে করে যে, তা আল্লাহর দেয়া নিয়ম এবং এটা বুঝেই সে সেই নিয়ম অনুসরণ করছে। কাজেই একজন চাকর কেমন করে বলতে পারে যে, আমিই খাঁটি চাকর আর অমুক খাঁটি চাকর নয়। সে বেশী কিছু বললেও শুধু এতটুকু বলতে পারে যে, আমি মনিবের হুকুমের ঠিক অর্থ বুঝেছি, আর অমুক লোক ঠিক অর্থ বুঝতে পারেনি। কিন্তু তাই বলে অন্য জনকে চাকরি হতে খারিজ করে দেয়ার বা খারিজ মনে করার তার কোনো অধিকার নেই ; তবুও যদি কেউ এতখানি দুঃসাহস করে তবে আসল মনিবের পদকে সে নিজের বিনা অধিকারে দখল করছে। তার কথার অর্থ এই হয় যে, তুমি তোমার মনিবের হুকুম মানতে যেরূপ বাধ্য, আমার হুকুম মানতেও তুমি অনুরূপভাবে বাধ্য। আমার হুকুম যদি তুমি না মন তাহলে আমি আমার ক্ষমতা দ্বারা মনিবের চাকুরি হতে তোমাকে খারিজ করে দিব। একটু ভেবে দেখুন, এটা কত বড় স্পর্ধার কথা। এ কারণেই নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে অকারণে কাফের বলবে, তাঁর কথা স্বয়ং তার নিজের ওপরই বর্তিবে। কারণ মুসলমানকে আল্লাহ তাআলা নিজের হুকুমের গোলাম বানিয়েছেন। কিন্তু ঐ ব্যক্তি বলে-না, তুমি আমার বুদ্ধি ও আমার মতের গোলামী কর। অর্থাৎ শুধু আল্লাহই তোমার ইলাহ নন, আমিও তোমার একজন ছোট ইলাহ এবং আমার হুকুম না মানলে আমার নিজের ক্ষমতার দ্বারা তোমাকে আল্লাহর বন্দেগী হতে খারিজ করে দেব-আল্লাহ তাআলা তাকে খারিজ করুন আর না-ই করুন। আর এ ধরনের কথা যারা বলে তাদের কথায় অন্য মুসলমান কাফের হোক বা না হোক কিন্তু সে নিজেকে কাফেরীর বিপদে জড়িয়ে ফেলে।

দ্বীন ও শরীয়াতের পার্থক্য আপনারা ভাল করে বুঝতে পেরেছেন আশা করি। সেই সাথে একথাও আপনারা জানতে পেরেছেন যে, বন্দেগীর বাহ্যিক নিয়মের পার্থক্য হলেও আসল দ্বীনে কোনো পার্থক্য হয় না। অবশ্য তার জন্য শর্ত এই যে, মানুষ যে পন্থায়ই কাজ করুক না কেন, নেক নিয়তের সাথে করা কর্তব্য এবং একথা মনে রেখে করতে হবে যে, যে নিয়মে সে কাজ করছে, তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলেরই নিয়ম।

এখন আমি বলবো যে, দ্বীন ও শরীয়াতের এ পার্থক্য না বুঝতে পেরে আমাদের মুসলমান জামায়াতের কতই না অনিষ্ট হচ্ছে। মুসলমানদের মধ্যে নামাজ পড়ার নানা রকম নিয়ম আছে। একদল বুকের ওপর হাত বেঁধে থাকে, অন্যদল নাভির ওপর হাত বাঁধে। একদল ইমামের পিছনে মোকতাদী হয়ে আলহামদু সূরা পড়ে, আর একদল তা পড়ে না; একদল শব্দ করে ‘আমীন’ বলে, আর একদল বলে মনে মনে। এদের প্রত্যেকেই যে নিয়মে চলছে একথা মনে করেই চলছে যে, এটা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরই নিয়ম। কাজেই নামাজের বাহ্যিক নিয়ম বিভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও এরা সকলেই সমভাবে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুগামী। কিন্তু যেসব যালেম লোক শরীয়াতের এসব খুটিনাটি মাসয়ালার বিভিন্নতাকে আসল দ্বীনের বিভিন্নতা বলে মনে করে নিয়েছে এজনই তারা নিজেদের আলাদা দল গঠন করে নিয়েছে, মসজিদ ভিন্ন করে তৈরি করেছে । একদল অন্যদলকে গালাগালি করে, মসজিদ হতে মেরে বের করে দেয়, মামলা-মোকদ্দমা দায়ের করে এবং এভাবে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মাতকে টুকরো টুকরো করে দেয়।

এতেও এ শয়তানদের দিল ঠান্ডা হয় না বলে ছোট ছোট ও সামান্য ব্যাপারে একজন অপরজনকে কাফের, ফাসেক ও গোমরাহ বলে আখ্যা দিতে থাকে। এক ব্যক্তি কুরআন ও হাদীস হতে নিজ নিজ বুদ্ধি মতো আল্লাহর হুকুম বের করে। এখন সে যা বুঝেছে সেই অনুসারে নিজের কাজ করাকেই সে যথেষ্ট বলে মনে করে না ; বরং সে নিজের এ মতকে অন্যের ওপরও যবরদস্তি করে চাপিয়ে দিতে চায়। আর অন্য লোক যদি তা মানতে রাজী না হয় তাহলে তাকে কাফের ও আল্লাহর দ্বীন হতে খারিজ মনে করতে শুরু করে।

মুসলমানদের মধ্যে আপনারা এই যে হানাফী, শাফেয়ী, আহলে হাদীস ইত্যাদি নানা দলের নাম শুনতে পান এরা সকলে পবিত্র কুরআন ও হাদীসকে সর্বশেষ কিতাব বলে বিশ্বাস করে এবং নিজের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী তা থেকে আইন ও বিধান জেনে নেয়। হতে পারে একজনের সিদ্ধান্ত ঠিক ও বিশুদ্ধ, আর অন্যজনের সিদ্ধান্ত ভুল। আমিও একটা নিয়ম অনুসরণ করে চলি এবং তাকে শুদ্ধ বলে মনে করি-আমি যাকে শুদ্ধ বলে বুঝেছি, তা তাদেরকে বুঝাতে চাই। কিন্তু কারো সিদ্ধান্ত ভুল মনে করি, তার দোষ-ত্রুটি তাদের বুঝাতে চাই। কিন্তু কারো সিদ্ধান্ত ভুল হওয়া এক কথা আর দ্বীন হতে খারিজ হয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। নিজ নিজ বিবেক অনুসারে শরীয়াতের কাজ করার অধিকার প্রত্যেক মুসলমানেরই আছে। দশজন মুসলমান যদি দশটি বিভিন্ন নিয়মে কাজ করে, তবু যতক্ষণ তাঁরা শরীয়াত মানবে ততক্ষণ তাঁরা সকলেই মুসলমান, একই উম্মাতের মধ্যে গণ্য ; তাদের ভিন্ন ভিন্ন দল-গোষ্ঠী গঠন করার কোনোই কারণ নেই। কিন্তু এ নিগূঢ় কথা যারা বুঝতে পারে না, তারা অতি ছোট ও সামান্য সামান্য কারণে দলাদলি করে। একদল অন্যদলের সাথে ঝগড়া বাঁধায়, নামাজ ও মসজিদ আলাদা করে, একদল অন্যদলের সাথে বিয়ে-শাদী, মিলা-মিশা এবং সম্পর্ক স্থাপন চিরতরে বন্ধ করে দেয় আর নিজ মতের লোকদেরকে নিয়ে একটা আলাদা দল গঠন করে। মনে হয় তারা আলাদা নবীর উম্মাত।

আপনারা ধারণা করতে পারেন যে, এরূপ দলাদলির ফলে মুসলমানের কি বিরাট ক্ষতি হয়েছে। কথায় বলা হয় যে, মুসলমান একদল-এক উম্মাত। এ উপমহাদেশে মুসলমানের সংখ্যা ৮ কোটি । এতবড় একটা দল যদি বাস্তবিকই সংঘবদ্ধ হতো এবং পরিপূর্ণ একতার সাথে আল্লাহর কালামকে বুলন্দ করার জন্য কাজ করতো, তাহলে দুনিয়ার কোনো শক্তিই তাদেরকে দুর্বল মনে করতে পারতো না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ দলাদলির কারণেই এ উম্মাতটি বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তাদের একজনের মন অন্যজনের প্রতি বিষাক্ত ও শ্রদ্ধাহীন। বড় বড় বিপদের সময়ও তারা একত্রিত হয়ে বিপদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। একদলের মুসলমান অন্যদলের মুসলমানকে ঠিক ততখানিই শত্রু বলে মনে করে, বরং তা থেকেও অধিক। এমনও দেখা গেছে যে, একদল মুসলমানকে পরাজিত করার জন্য আর একদল মুসলমান কাফেরদের সাথে যোগ দিয়ে ষড়যন্ত্র করে। এমতাবস্থায় দুনিয়ার মুসলমান যদি দুর্বল হয়ে থাকে, তবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এটা তাদের নিজেদেরই কর্মফল। তাদের ওপর সেই আযাবই নাযিল হয়েছে যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআন মজিদে বলেছেনঃ

﴿أَوْ يَلْبِسَكُمْ شِيَعاً وَيُذِيقَ بَعْضَكُم بَأْسَ بَعْضٍ﴾ (الانعام: ٦٥)

“মানুষের প্রতি আল্লাহর এমন আযাবও আসতে পারে, যার ফলে তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দেয়া হবে, তোমরা পরস্পর কাটাকাটি করে মরবে।” - সূরা আল আনআমঃ ৬৫

ওপরে যে আযাবের কথা বলা হলো, এতদাঞ্চলে তা খুব বেশী পরিমাণেই দেখা যায়। এখানে মুসলমানের নানা দল ; এমনকি আলেমদের দলেরও কোনো হিসেব নেই। এজন্যই এখানকার মুসলমান এবং আলেমদের কোনো শক্তি নেই। আপনারা যদি বাস্তবিকই মঙ্গল চান, তবে আপনাদের ও আলেমদের এ বিভিন্ন দল ভেংগে দিন। আপনারা পরস্পর পরস্পরের ভাই হিসেবে এক উম্মাতরূপে গঠিত হোন। ইসলামী শরীয়াতে এরূপ হানাফী, শাফেয়ী, আহলে হাদীস প্রভৃতি আলাদা আলাদা দল গঠন করার কোনো অবকাশ নেই। এরূপ দলাদলি মূর্খতার কারণেই হয়ে থাকে। নতুবা আল্লাহ তাআলা তো একটি মাত্র দল তৈরি করেছেন এবং সেই একটি মাত্র দলই হচ্ছে মুসলমান।

----------------------------------------- সমাপ্ত--------------------------------------------



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )