আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
সত্যের সাক্ষ্য প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী   
Saturday, 06 January 2007
আর্টিকেল সূচি
সত্যের সাক্ষ্য
আমাদের দাওয়াত
সত্যের সাক্ষ্য
সাক্ষ্য দানের পদ্ধতি
সত্য গোপনের শাস্তি
মুসলমানদের সমস্যা ও তার সমাধান
মুসলমানদের সমস্যা ও তার সমাধান
আমাদের দাবী
অভিযোগ এবং তার জবাব
যাকাত আদায়ের অধিকার

মুসলমানদের সমস্যা ও তার সমাধান

এখন আমরা কি উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হয়েছি তাই আমি আপনাদের কাছে সংক্ষেপে ব্যক্ত করবো। যারা ইসলামকে নিজেদের দীন বলে স্বীকার করে থাকেন, তাদেরকে আমরা এই আহ্বান জানাচ্ছি যে, তাঁরা যেন এই দীনকে নিজেদের প্রকৃত জীবন বিধানে পরিণত করেন। একে যেন ব্যক্তিগতভাবে আহ্বান নিজেদের জীবনে ও সামগ্রিকভাবে নিজেদের গৃহে,খান্দানে,সমাজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায়, ব্যবসায়-বাণিজ্যে,অর্থনৈতিক কাজ কারবারে,সমিতি ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানে এবং সাধারণভাবে জাতীয় নীতি নির্ধারণে কার্যত প্রতিষ্ঠিত করেন। আমরা তাদেরকে আরো বলছি যে, মুসলমান হিসেবে দীন ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও সত্যের সাক্ষ্যদানই আপনাদের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই আপনাদের যাবতীয় চেষ্টা-সাধনা ও ক্রিয়া-কলাপ এই উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করেই সম্পাদিত হওয়া উচিত। যেসব কথা ও কাজে ইসলামের বিরোধিতা এবং ভুল প্রতিনিধিত্ব হওয়ার আশংকা রয়েছে, তা থেকে আপনাদের সর্বতোভাবে বিরত থাকা কর্তব্য। আপনাদের প্রতিটি কথা ও কাজকে ইসলামের মানদণ্ডে যাচাই করুন। দীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা, যথার্থরূপে তার সত্যতার সাক্ষ্য দান করা এবং চূড়ান্তরূপে সত্যকে প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ইসলামের প্রতি দুনিয়ার মানুষকে আহ্বান জানানোর জন্যে নিজেদের যাবতীয় চেষ্ঠা-সাধনাকে নিয়োজিত করুন।

আমাদের কর্মপদ্ধতি

জামায়াতে ইসলামী কায়েম করার এই হচ্ছে একমাত্র উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে যে পথ আমরা বাছাই করে নিয়েছি, তা হচ্ছে এই যে, আমরা প্রথমত মুসলমানদেরকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেই। ইসলাম জিনিসটা কি, তার দাবী ও চাহিদা কি, মুসলমান হওয়ার তাৎপর্য কি, মুসলমান হওয়ার দরূন তাদের উপর কোন্ কোন্ দায়িত্ব অর্পিত হয়, এসব কথা তাদেরকে পরিষ্কার বলে দেই। এ বিষয়টি যারা বুঝে নেন, তাদেরকে আমরা বলে দেই যে, ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ইসলামের সকল দাবী পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্যে সামগ্রিক ও সম্মিলিত চেষ্টার প্রয়োজন । ব্যক্তি জীবনের সাথে দীনের এক ক্ষুদ্রতম অংশেরই সম্পর্ক রয়েছে মাত্র। সেটুকু আপনারা কায়েম করে ফেললেও পূর্ণ দীন কায়েম হয়ে যাবেনা এবং এতে তার সত্যতার সাক্ষ্যও আদায় হবে না। বরং সমাজ জীবনের কুফরী ব্যবস্থার প্রাধান্য থাকলে ব্যক্তির জীবনেরও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ইসলামকে কায়েম করা সম্ভব হবে না। কুফরী সমাজ ব্যবস্থার প্রভাব দিন দিন ব্যক্তি জীবনে ইসলামকে সীমিত ও সংকুচিত করতে থাকবে। তাই দীনকে পূর্ণরূপে কায়েম করার এবং যথার্থরূপে তার সত্যতার সাক্ষ্য দান করার জন্যে সকল দায়িত্বসম্পন্ন মুসলমানের সংঘবদ্ধভাবে দীন-ইসলামকে কার্যত প্রতিষ্ঠিত ও তার দিকে দুনিয়ার মানুষকে আহ্বান জানানো এবং সেই সংগে দীনের প্রতিষ্ঠা ও তার প্রচারের পথ থেকে সকল বাধা বিপত্তিকে হটিয়ে দেয়া কর্তব্য।

সংগঠন প্রতিষ্ঠা

এ জন্যে দীন-ইসলামে ‘জামায়াত’ কে অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে এবং দীনের প্রতিষ্ঠা ও তার দাওয়াত প্রচারের জন্যে এই কর্মনীতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, প্রথমে একটি সুসংহত দল গঠন করতে হবে এবং তার পরেই আল্লাহর পথে চেষ্টা-সাধনা চালাতে হবে, আর এ কারণেই জামায়াতবিহীন যিন্দেগীকে জাহিলী যিন্দেগী এবং জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ারই শামিল বলে অভিহিত করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ

انا امركم بخمس الله امرنى بهن الجماعة والسمع والطاعة والهجرة والجهاد فى سبيل الله فانه من خرج من الجماعة قدر شبر فقد خلع ربقة الاسلام من عنقه الا ان يراجع ومن دعا بدعوى الجاهلية فهو من جثى جهنم، قالوا يا رسول الله وان صام وصلى؟ قال وان صام وصلى وزعم انه مسلم . (أحمد وحاكم)

“আল্লাহ আমাকে যে পাঁচটি বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন আমিও তোমাদেরকে তারই হুকুম দিচ্ছি। তা হলো-জামায়াত, নেতৃ-আদেশ শ্রবণ,আনুগত্য,হিজরত ও আল্লাহর পথে জিহাদ। যে ব্যক্তি ইসলামী জামায়াত ত্যাগ করে এক বিঘত পরিমাণও দূরে সরে গেছে, সে যেন নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলেছে। অবশ্য যদি সে জামায়াতের দিকে পুনঃ প্রত্যাবর্তন করে, তবে স্বতন্ত্র কথা। আর যে ব্যাক্তি জাহিলিয়াতের দিকে (অর্থাৎ অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার দিকে) আহবান জানাবে, সে হবে জাহান্নামী। (এতদশ্রবণে) সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসুল, নামায- রোযা আদায়করা সত্ত্বেও কি সে জাহান্নমী হবে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেনঃ (হাঁ) যদিও সে নাময-রোযা পালন করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করে (তাহলেও সে জাহান্নামী হবে )”। ------(আহমদ ও হাকেম)

এই হাদিস থেকে নিম্নোক্ত তিনটি কথা প্রমাণিতঃ

একঃ দীনী কাজের সঠিক নিয়ম হচ্ছে এই যে, সর্বাগ্রে একটি সুসংহত ও সুশৃঙ্খল জামায়াত গঠিত হবে এবং তার জন্যে এমন একটি সংগঠন গড়ে তুলতে হবে যার মাধ্যমে সবাই একজন নেতার আনুগত্য করে চলবে। অতঃপর পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা হিজরত করবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।

দুইঃ জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা প্রায় ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকারই নামান্তর। কারণ এর অর্থ হচ্ছে এই যে, মানুষ আরবের সেই জাহিলী যুগের দিকেই পুনঃ প্রত্যাবর্তন করছে, যে যুগে কেউ কারো প্রতি কর্ণপাত করতো না।

তিনঃ ইসলামের অধিকাংশ দাবী ও তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল জামায়াত এবং সম্মিলিত চেষ্টার মাধ্যমেই পূর্ণ হতে পারে। এ জন্যেই হযরত রাসূরুল্লাহ (সা.) নামায- রোযার পাবন্দী এবং মুসলিম হওয়ার দাবী করা সত্বেও জামায়াত ত্যাগী ব্যক্তিকে ইসলামত্যাগী বলে আখ্যা দিয়েছেন। হযরত উমর (রা.) এর নিম্মোক্ত বাণীও একথারই প্রতিধ্বনি করেছেঃ

لا اسلام الا بجماعة . (جامع بيان العلم لابن عبد البر)

জামায়াত বিহীন ইসলামের কোন অস্তিত্ব নেই।”

কাজের তিনটি পথ

যারা জামায়াতী নিয়ম শৃঙ্খলার পাবন্দী করতে পারবেন আমরা তাদেরকে বলে থাকি আপনাদের সামনে এখন মাত্র তিনটি পথই খোলা রয়েছে এবং তার যে কোন পথ বাছাই করে নেয়ার পূর্ণ স্বধীনতা আপনাদের রয়েছে।

প্রথমতঃ আপনাদের মন যদি সাক্ষ্য দেয় যে, আমাদের দাওয়াত, আকীদা- বিশ্বাস, মূল লক্ষ্য, জামায়াতী নিয়ম-শৃঙ্খলা, কর্মনীতি ইত্যাদি সব কিছুই খালিস ইসলাম সম্মত এবং কুরআন - হাদীসের দৃষ্টিতে মুসলিম জাতির যা কর্তব্য, আমরা তা-ই সম্পাদন করছি, তাহলে আমাদেও সাথে এই কাজে আপনারা শামিল হন।

দ্বিতীয়তঃ যদি কোন কারণবশত আমাদের কাজে আপনারা সন্তুষ্ট হতে না পারেন এবং অন্য কোন দলকে ইসলামী উদ্দেশ্যে খাটি ইসলামী পন্থায় কাজ করতে দেখেন, তাহলে তাতেই শামিল হয়ে যান। কেন না, মাত্র দেড়খানা ইট দ্বারা মসজিদ নির্মানের শখ আমাদের নেই।

তৃতীয়তঃ যদি আমাদের বা অন্য কোন দলের উপর আপনাদের আস্থা না থাকে, তাহলে ইসলামী দায়িত্ব পালন করা তথা দীন ইসলামকে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করা এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে তার সত্যতার সাক্ষ্য দান করার উদ্দেশ্যে আপনারা নিজেরাই অগ্রসর হয়ে খাটি ইসলামী পন্থায় একটি সুসংহত জামায়াত গঠন করুন।

এই তিনটি পথের যে কোন একটি বাছাই করে নিলে ইন্শাআল্লাহ আপনারা মধ্যপন্থী বলে ই গণ্য হবেন। কেবল আমাদের জামায়াতেই সত্যপন্থী এবং আমাদের জামায়াতের বহির্ভূত লোকেরা সবাই বাতিলপন্থী এরূপ দাবী আমরা কোন দিন করিনি আর সুস্থমস্তিষ্ক থাকা পর্যন্ত কোন দিনই তা করবো না। আমরা লোকদের কখনও আমাদের জামায়াতের দিকে আহবান জানাইনি। বরং মুসলমান হিসেবে যে দায়িত্বটি আমাদের সাথে মিলেই করুন বা অন্য কোন পন্থায় আপনাদের কাজ সত্যপন্থীর কাজই হবে। কিন্তু আপনারা নিজেরাও এ কাজে অগ্রসর হবেন না এবং দুনিয়ার সামনে তার সত্যতার সাক্ষদানের দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন কিংবা আল্লাহর দীনের পরিবর্তে অন্য কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেদের শক্তি -সামর্থ্যরে অপচয় করতে থাকবেন আর আপনাদের কথা ও কাজ ইসলামের বিপরীত বস্তুও স্বাক্ষ্যবহন করবে, এটা কোন প্রকারেই সংগত হতে পারে না। ব্যাপার যদি দুনিয়ার মানুষের সাথে হতো, তাহলে না হয় টালবাহানা করে কোন প্রকার কাজ হাসিল করা যেত । কিন্তু এ স্থানে তো ব্যাপার হচ্ছে এমন এক মহান প্রভুর সাথে, যিনি অন্তরের অন্তঃস্থলের খবরও রাখেন। কাজেই কোন চালবাজি দ্বারা তাঁকে প্রতারিত করা সম্ভব হবেনা।

বিভিন্ন দীনী সংগঠন

এ কথা নিঃসন্দেহ যে একই উদ্দেশ্য এবং একই কাজ করার জন্যে বিভিন্ন দল গঠিত হওয়ার ব্যাপারটা আপতদৃষ্টিতে ভুল মনে হতে পারে এবং এতে বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ার আশংকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যেহেতু ইসলামী জীবন ব্যবস্থাই ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে এবং এখন শুধু ইসলামী জীবন ব্যবস্থা পরিচালনার প্রশ্ন নয় বরং নতুন করে প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই দেখা দিয়েছে তাই এমনি পরিস্থিতিতে গোটা উম্মতের জন্যে আল- জামায়ত, (একটি মাত্র দল ) গঠন করা সম্ভ নয়, যাতে শামিল হওয়াকে জাহিলিয়াত কিংবা ইসলাম ত্যাগের সমতুল্য মনে করা যেতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে এই উদ্দেশ্যে ইসলামী পন্থায়ই কাজ করে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত এগুলো একত্রীভুত হয়ে যাবেই। কারণ সত্য পথের পথিকরা বেশীক্ষণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না, সত্যই তাদের একসূত্রে আবদ্ধ করে ফেলে। কেননা, সত্যের প্রকৃতি হচ্ছে ঐক্য, সংহতি ও একাত্মবোধের প্রেরণা দান করা। অনৈক্য ও বিভেদ কেবল তখনি দেখা দিতে পারে, যখন সত্যের সংগে কিছুটা অসত্যের সংমিশ্রণ ঘটে, অথবা উপরে সত্যের প্রদর্শনী থাকলেও ভিতরে অসত্যই কাজ করতে থাকে।

সর্বশেষ আপডেট ( Tuesday, 03 August 2010 )