আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামী আইন না মানার বিধানঃ কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ডঃ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া   
Wednesday, 18 April 2007

ভূমিকা

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلّهِ "আইন একমাত্র আল্লাহরই"( সূরা ইউসুফঃ ৪০, ৬৭)। তিনি আরো বলেনঃ أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللّهِ حُكْماً لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ. "তারা কি জাহেলিয়াতের আইন চায়? বিশ্বাসীগণের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম হুকুম দাতা আর কে হতে পারে?" ( সূরা আল মায়েদাহঃ ৫০) আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ "আল্লাহই হলেন আইনদাতা, আর তাঁর নিকট থেকেই আইন নিতে হবে"(আবু দাউদ হাদীস নং(৪৯৫৫), নাসায়ী, (৮/২২৬), বায়হাকী (১০/১৪৫) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত)।

কুরআন ও হাদীসের এত সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকার পরও অধিকাংশ মুসলমান ব্যাপারটির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন না, শয়তান তাদেরকে বিভিন্নভাবে তা উপলব্ধি করতে দেয় না। কারণ সে মানুষকে দু'ভাবে প্রতারিত করে হক্ক পথ থেকে দুরে সরিয়ে রাখেঃ

১) কুপ্রবৃত্তিতে নিপতিত করার মাধ্যমে।

২) সন্দেহে নিপতিত করার মাধ্যমে।

তন্মধ্যে প্রথমোক্ত শয়তানী চালের বিপরীতে যা মানুষকে রক্ষা করতে পারে তা হলো, এতদসংক্রান্ত শরীয়তের হুকুম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেয়া এবং আল্লাহর নাফরমানীর শাস্তির ভয় দেখানো।

আর দ্বিতীয় যে অস্ত্রটি শয়তান ব্যবহার করে তার একমাত্র রক্ষাকবচ হলো, সে সমস্ত সন্দেহের অপনোদন যা তাকে হক্ক পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। আল্লাহর আইন অনুসারে চলা ও তদানুযায়ী বিচার পরিচালনা করা তাঁর উপর ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত। যা বিশ্বাসের দিক থেকে আল্লাহর রবুবিয়্যাতে (প্রভুত্বে) একত্ববাদ, আর আমল করার দিক থেকে আল্লাহর উলুহিয়্যাতে (ইবাদাতে) একত্ববাদ। যার অনুপস্থিতিতে কারো ঈমানই গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের দাবী রাখলেও দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলা ভাষাভাষী অনেকেই এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। তাদেরকে আল্লাহর আইন সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্যই আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। আল্লাহ আমার এ প্রয়াসকে কবুল করার মাধ্যমে যদি আমার জাতিকে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের তাওফীক প্রদান করেন, তবেই আমার প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

-আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আমরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে থাকি, অথচ যখনই ইসলামী আইন-কানুন বাস্তবায়নের কথা আসে তখনই আমাদের মত ও পথ বিভিন্ন হয়ে যায়। এর কারণ হিসাবে আমি বেশ কয়েকটি দিক চিহ্নিত করতে পারি।

১. ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম কি তা না জানা।

২. ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম কি তা জানা সত্ত্বেও কতিপয় সন্দেহ আমাদের মনে দানা বেঁধে থাকে; যা আমাদেরকে তা বাস্তবায়নের পথে বাধা দেয়।

প্রথমতঃ

যারা ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম জানেনা, তারা দু'ভাগে বিভক্তঃ

ক) তাদের অনেকেই ইসলাম যে একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, সে সম্পর্কেই অজ্ঞ। তাদের অনেকেই জানেনা ইসলামে যাবতীয় বিষয়ের সমাধান আছে। মনে করে ইসলাম শুধুমাত্র কলেমার মৌখিক উচ্চারণ, নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কালেমার অর্থই তারা জানেনা, জানতে চেষ্টা করেনা। কেননা কালেমার অর্থই হলোঃ আল্লাহ্ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, হক্ক কোন মা'বুদ নেই। আর মা'বুদ শব্দের অর্থ হলোঃ নির্দ্বিধায় যার ইবাদাত করা হয়, যার কথা মানা হয়, যার আইন বাস্তবায়িত হয়, যার কথা ও নির্দেশ অন্য সব কিছুর উপর প্রাধান্য পায়।

এ সমস্ত লোকদের জন্য প্রয়োজন দ্বীন সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা লাভ করা, প্রচুর পরিমাণে দ্বীনি বইপত্র পাঠ করা। কুরআন অধ্যয়ন করা, হাদীস অধ্যয়ন করা, সীরাতে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু 'ধালাইহি ওয়াসাল্লাম) চর্চা করা, সাহাবায়ে কেরামের জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। আর তখনই তারা জানতে পারবে যে, যাঁকে তারা রব বা পালনকর্তা হিসাবে মানে তাঁর রবুবিয়্যাতের শর্ত হলো, তিনি তাঁর 'মারবুব' বা যাদেরকে পালন করবেন তাদেরকে শুধু সৃষ্টি করার দ্বারাই রবুবিয়্যাতের দায়িত্ব শেষ করে দেননি, বরং দুনিয়ার বুকে তাদেরকে লালনপালনের পাশাপাশি দুনিয়াতে তারা কিভাবে নিজেদের মধ্যকার যাবতীয় কাজ তাঁর সন্তুষ্টি বিধানে পরিচালিত হবে, কিভাবে তাদের মধ্যকার সৃষ্ট অপরাধ সমূহের প্রতিকার হবে তারও সুবন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং রবুবিয়্যাত বা পালনকর্তা হিসাবে তাঁর কাজ হলো বান্দাকে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নীতি অনুসারে চলতে দেয়া এবং সে অনুযায়ী আইন ও বিধানাবলী দেয়া। তাই সে আইনের বিরোধিতা করে চললে আল্লাহকে রব মানার ক্ষেত্রে ছেদ পড়ে। তাঁকে রব বা পালনকর্তা হিসাবে মানা হয় না। আল্লাহ তা'আলা তাই বলেনঃ إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلّهِ "আইন দানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর"(সূরা ইউসুফঃ ৪০, ৬৭)।

কেননা, তিনিইতো রব, সুতরাং আইনও দিবেন সেই রবই, অন্য কাউকে যদি আইন প্রদানের মালিক মনে করা হয় তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেই রব মানা হয়; যা প্রকাশ্য বড় শির্ক। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আইন মানবে তাদের সম্পর্কে বলেছেনঃ

أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللّهِ حُكْماً لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ.

"তারা কি জাহেলিয়াতের আইন চায়? বিশ্বাসীগণের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম হুকুম দাতা আর কে হতে পারে?"( সূরা আল মায়েদাহঃ ৫০)

এখানে জাহেলিয়্যাতের আইন বলতে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রণিত আইন ছাড়া যাবতীয় আইনকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক প্রণিত আইনের বাইরে যত প্রকার মানব রচিত আইন রয়েছে, তার সবই জাহেলী আইন, যেমন ইংরেজদের রেখে যাওয়া আইন, রোমান আইন ইত্যাদি।

খ) আরেক ধরনের লোক আছে যারা জানে যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, কিন্তু তারা জানেনা যে, ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম কি? তাদের অনেকেই মনে করে যে, ইসলামী আইন গতানুগতিক আইনের মত। এর বাস্তবায়নের বিরোধিতা করলে তাদের ঈমানের কোন ক্ষতি হবেনা। তারা ইসলামকে নিছক কিছু কর্মকান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করে থাকে।

এ সমস্ত লোকদের জন্য যা প্রয়োজন তা হলো, ইসলামী আইনের বাস্তবায়নের হুকুম সম্পর্কে অবগত হওয়া। কেননা, তাদের অনেকেই জানেনা যে, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন না করা কুফরী, যা ঈমান নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللّهُ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ.

"আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য সম্পাদন করেনা, তারা কাফের"(সূরা আল মায়েদাহঃ ৪৪)। তিনি আরো বলেনঃ

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أنزَلَ اللّهُ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ.

"আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য সম্পাদন করেনা , তারা ফাসেক"(সূরা আল মায়েদাহঃ ৪৫)। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেনঃ

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللّهُ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ.

"আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য সম্পাদন করেনা, তারা যালেম"(সূরা আল মায়েদাহঃ ৪৭)।

মূলতঃ আল্লাহর আইন অনুসারে না চলার কয়েকটি পর্যায় হতে পারেঃ

১) আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোন আইনে বিচার-ফয়সালা পরিচালনা জায়েয মনে করা।

২) আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য কোন আইন দ্বারা শাসন কার্য পরিচালনা উত্তম মনে করা।

৩) আল্লাহর আইন ও অন্য কোন আইন শাসনকার্য ও বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের মনে করা।

৪) আল্লাহর আইন পরিবর্তন করে তদস্থলে অন্য কোন আইন প্রতিষ্ঠা করা।

উপরোক্ত যে কোন একটি কেউ বিশ্বাস করলে সে সর্বসম্মতভাবে কাফের হয়ে যাবে(এর জন্য দেখুনঃ শাইখ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলে শাইখ প্রণিত গ্রন্থঃ 'তাহকীমুল কাওয়ানীন')।

দ্বিতীয়তঃ

আল্লাহর আইনের বিরোধী দ্বিতীয় দলটি ইসলামী আইনের জ্ঞান রাখে, তারা জানে যে, ইসলামী আইন অনুসারে না চললে কুফরী হবে, কিন্তু তাদের মধ্যে দু'টি ধারা কাজ করছেঃ

ক. তাদের এক শ্রেণী মনে করে ইসলামী আইন বর্তমান যুগের সাথে অসামঞ্জস্যশীল এবং অচল। তাদের অন্তরে রয়েছে ইসলামী আইনের কার্যকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ। তাদের সন্দেহের মধ্যে যা যা তারা বলে থাকে তন্মধ্যে নিম্নোক্তগুলো প্রধানঃ

১) ইসলাম এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান; উভয়টিকে পরস্পর বিরোধী মনে করা।

২) কেউ কেউ মনে করে যে, বর্তমানে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হওয়া সম্ভব নয়, জাতীয়তা ভিত্তিক রাষ্ট্র হওয়াই জরুরী। অথচ আল্লাহর আইন অনুসারে চলতে গেলে কিভাবে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হতে পারে? কেননা, জাতি হিসাবে প্রত্যেক জাতির ভিন্ন ভিন্ন কৃষ্টি কালচার রয়েছে।

৩) কেউ কেউ বলেনঃ ইসলামী আইন আধুনিক যুগের উদ্ভুত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অপারগ।

৪) কেউ কেউ বলেনঃ ইসলামী আইন মানেই একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।

৫) কেউ কেউ বলেনঃ ইসলামী আইন মানুষের বাক স্বাধীনতা দেয়না। তেমনিভাবে চিন্তার স্বাধীনতায় বাধ সাধে। আর তা প্রগতির অন্তরায়।

৬) আবার কেউ কেউ বলেনঃ ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, কারণ, একই রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের, দলের ও মতের লোক থাকে। সবাইকে একই আইনে কিভাবে পরিচালনা করা সম্ভব?

৭) আবার কেউ কেউ বলেনঃ ইসলামী আইনে রয়েছে কঠোরতা, সমাজের মধ্যে ক্লীব, বিকলাঙ্গের জন্ম দেয়, তদুপরি নির্যাতন-নিষ্পেষন ও মানুষ হত্যার মত জঘন্যতম কাজের বিস্তৃতি। উপরোক্ত সন্দেহগুলোর অপনোদন সংক্ষেপে ও বিস্তারিত দু'ভাবে করা যেতে পারে; নিম্নে তা দেয়া হলোঃ

সংক্ষিপ্ত উত্তরঃ

এ সব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলোঃ কেউ যদি আল্লাহকে একমাত্র রব হিসাবে মানে তাহলে অবশ্যই একথা তাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দার জন্য কোনটি উপযোগী আর কোনটি অনুপযোগী সেটা ভাল করেই জানেন। আর জানেন বলেই তিনি এমনভাবে এ সমস্ত আইন প্রণয়ন করেছেন যাতে বান্দার জন্য এগুলো কোন রকমের সমস্যা সৃষ্টি না করে। সুতরাং এ সমস্ত সমস্যাবলীর উত্থাপন করার অর্থই হলো, আল্লাহর প্রভুত্বের উপর সংশয়/সন্দেহ পোষণ করা।

অনুরূপভাবে কেউ যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ রাসূল ও শরীয়ত প্রবর্তক, আইনের সঠিক ব্যাখ্যাদাতা, পূর্ববর্তী সমস্ত শরীয়তের রহিতকারী এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তাকে পরিপূর্ণ মনে করে থাকেন, তবে তার মধ্যে এ ধরণের প্রশ্নের সৃষ্টিই হতে পারেনা। তাই এ ধরণের প্রশ্ন সৃষ্টির মানেই হলো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ রাসূল, তাঁর প্রবর্তিত আইনকে সর্বশেষ জীবন বিধান এবং তাঁর শরীয়ত সম্পূর্ণ; ইত্যাদি মৌলিক বিষয়কে অস্বীকার করার শামিল।

আর যে ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করবে, সে সত্যিকার অর্থেই ঈমানের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। আর এটাও জানতে হবে যে, এসব আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে পৃথিবীর কোন ভূখন্ডে অশান্তি, অরাজকতা ও উপরোল্লেখিত সমস্যা সমূহ দেখা দেয়নি; বরং এটা ধ্রুবসত্য যে, পৃথিবীর যেখানেই কিছু শান্তি রয়েছে বা ছিল তা ইসলামী আইন বাস্তবায়নের বিনিময়েই ছিল। কেননা এ আইন দিয়েছেন মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলা, যেহেতু তিনি মানুষদেরকে সৃষ্টি করেছেন সেহেতু তাদের চলার জন্য প্রকৃত জীবন ব্যবস্থা তারই পক্ষ হতে হওয়া উচিত। আর এটাই যুক্তিপূর্ণ, কেননা মানুষ নিজের কল্যাণ ও পরিণতি সম্পর্কে ব্যহ্যিক দৃষ্টিতে সম্যক জ্ঞান রাখেনা।

{mospagebreak title=

উপরোক্ত সন্দেহ সমূহের বিস্তারিত উত্তর নিম্নরূপঃ

}

প্রথম সন্দেহঃ

এ দাবী যে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দ্বীন পরস্পর বিরোধী। তাদের এ দাবী খন্ডনে বলা যায় যে, দ্বীন বা ধর্ম বলতে যদি আল্লাহ তা'আলা প্রবর্তিত দ্বীন না বুঝিয়ে জাগতিক কোন দ্বীন বুঝিয়ে থাকে তবে সন্দেহ ঠিক হতে পারে। কেননা সেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি। কিন্তু যদি দ্বীন/ধর্ম বলতে প্রধান তিনটি আসমানী দ্বীন/ধর্ম, যথা- ইয়াহূদী, খৃষ্টান ও ইসলাম ধর্ম বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে তা ব্যাখ্যার দাবী রাখে। কারণ, ইসলাম ছাড়া বাকী দু'টি ধর্মাবলম্বীদের (ইহুদী ও খৃষ্টান) কেউই তাদের বর্তমান আইন কানুনসমূহকে আল্লাহ প্রদত্ত এবং তাদের রাসূল প্রদর্শিত বলে প্রমাণ করতে পারবেনা। তাদের ধর্মে হয়েছে বিভিন্ন প্রকার বিকৃতি, ধর্মের নামে কুসংস্কারের ব্যাপক প্রসার। সর্বোপরি তাদের পাদ্রীগণ শাসকগোষ্ঠির সাথে একজোট হয়ে ধর্মকে মানুষের উপর অত্যাচারের হাতিয়ার বানিয়েছে। জ্ঞানীদের করেছে লাঞ্ছিত, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, খৃষ্টান পাদ্রীগণ যখনই কোন বিজ্ঞানীকে কোন কিছু আবিস্কার করতে শুনতেন, তখনই তাদেরকে ধর্মদ্রোহীতার দোষে দোষী করে কঠোর শাস্তি দিতেন, এমনকি মৃতু্যদণ্ড দানেও পিছপা হতেন না। আবার কোন কোন এলাকার মানুষ ছিল গীর্জার প্রজা স্বরূপ। তাদের নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কিছু ছিলনা, সুতরাং কেউ যদি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে বিরোধিতা বলতে এ সমস্ত বিকৃত ধর্মসমুহকে বুঝিয়ে থাকেন তাহলে আমাদের বলার কিছু থাকেনা, কেননা এ সব বিকৃত ধর্ম মানবতার জন্য জীবন ব্যবস্থা হতে পারেনা। কিন্তু ইসলাম এমন একটি দ্বীন যা এ অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কারণ-

প্রথমতঃ ইসলামী আইনের প্রধান দু'টি উৎসঃ কুরআন ও সুন্নাহ

আজো অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। কুরআনের কথাই ধরা যাক, আল্লাহ তা'আলা এর হেফাযতের ভার নিয়েছেন, তাই আজ পর্যন্ত এর মধ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন প্রমাণ করে কেউ দেখাতে পারেনি। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের ক্ষেত্রেও কথাটি বলা যায়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসগুলোকে হেফাযত করেছেন, ফলে মিথ্যা ও জাল হাদীসের প্রবর্তনকারীদের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোন মিথ্যা হাদীসকে কেউ সঠিক হাদীস বলে মেনে নেয়নি; বরং মিথ্যা হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা এমন কিছু মুহাদ্দিস প্রেরণ করেছেন যারা সঠিক হাদীসকে জাল/মিথ্যা হাদীস থেকে পৃথক করে গেছেন। আর তা হওয়ার কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ.

"অবশ্যই আমি এ যিক্র অবতীর্ণ করেছি, আর আমিই এর হেফাযত করবো"(সূরা আল হিজরঃ ৯)। এখানে যিক্র দ্বারা কুরআন ও সহীহ হাদীস বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী কোন উম্মতের গ্রন্থ ও তাদের নবীর বাণী সম্পর্কে এ রকম ঘোষণা দেননি।

ইসলামী আইনের তৃতীয় ও চতুর্থ উৎস হলোঃ

ইজমা ও ক্বিয়াস। ইজমা হলোঃ এ উম্মতের দ্বীনি জ্ঞান সম্পন্ন মুজতাহিদদের ঐক্যমত পোষণ। আর এর ভিত্তি হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীস- "আমার উম্মত কখনও ভ্রষ্ট পথে একমত হবেনা"( দেখুনঃ মুস্তাদরাকে হাকিমঃ ১/২০০, ২০১, হাদীস নং ৩৯৪, ৩৯৬, ৩৯৭, ৩৯৯, ৪০০, আরো দেখুনঃ আবুদাউদ ৪/৯৮, হাদীস নং ৪২৫৩, তিরমিজি ৪/৪৬৬, হাদীস নং ২১৬৭, ইবনে মাজা ২/১৩০৩, হাদীস নং ৩৯৫০।)। সুতরাং উম্মতের সবাই যদি কোন ব্যাপারে একমত হয়, তাহলে তাও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুমতিক্রমেই হবে। আর তা হবে গ্রহণযোগ্য। পূর্ববর্তী কোন দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের নবীর মুখ থেকে এরকম কোন অভয়বাণী শোনানো হয়নি। ফলে তাদের সবাই একমত হলেই সে মতটি সঠিক হওয়ার গ্যারান্টি নেই।

ইসলামী শরীয়তের (আইনের) চতুর্থ উৎস হলো ক্বিয়াসঃ

যা নির্ভর করে পূর্ববর্তী তিনটি উৎসের উপর। সুতরাং এটাও মনগড়া কিছু নয়।

অতএব আমরা বুঝতে পারছি যে, ইসলাম এমন একটি দ্বীনের নাম, যা সম্পূর্ণভাবে অবিকৃত রয়েছে। আর তার আইন সমূহ প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাইরের কোন প্রভাব সেখানে পড়েনি। যেহেতু আল্লাহ তা'আলাই এ আইন দিয়েছেন, আর জ্ঞান-বিজ্ঞানও তাঁর পক্ষ থেকেই দেয়া নেয়ামত বিশেষ, সেহেতু এ দু'টি কখনও পরস্পর বিরোধী হতে পারেনা। বাস্তবেও তা ঘটেনি। আল্লাহর কুরআনের কোন আয়াত, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন সহীহ হাদীস বিজ্ঞানে পরীক্ষিত কোন ধ্রুবসত্যের সাথে স্ববিরোধী হয়েছে এমন কোন প্রমাণ আজও কেউ দিতে পারেনি। যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের কোন কোন থিওরী প্রাথমিকভাবে আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের সাথে বিরোধী হয়েছে এমন মনে হয়ে থাকে, তথাপি সেখানে আল্লাহর কুরআন ও সহীহ হাদীসই মুলতঃ গ্রহণযোগ্য হবে, কারণ এ সমস্ত প্রাথমিক থিওরী (যা পরীক্ষিত সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি তা) পরিবর্তনশীল। আল্লাহর কুরআনের কোন আয়াত, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন সহীহ হাদীস পরিবর্তনশীল নয়। হাঁ, কোন কোন ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে অনেকেই সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে পারেননা। সে ক্ষেত্রে দরকার প্রকৃত জ্ঞানীর কাছে ফিরে যাওয়া।

আর ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞানকে উৎসাহিত করেছে, জ্ঞান অর্জনকে ফরজ করেছে। অন্যান্য ধর্মের মত নিরুৎসাহিত করেনি। ইসলামে বিজ্ঞানীদের কদর আছে, অন্যান্য ধর্মের সাথে এর কোন তুলনাই চলতে পারেনা। সুতরাং দ্বীন (ইসলাম) এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান পরস্পর বিরোধী বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আর তাই ইসলামী আইন বাস্তবায়নে এ সন্দেহের অবতারণা করা বাতুলতা মাত্র।

দ্বিতীয় সন্দেহঃ

বর্তমান যুগ জাতীয়তাবাদের যুগ, প্রত্যেক জাতির নির্দিষ্ট ধ্যান-ধারনা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত। ইসলামী আইন চললে তা জাতীয়তাবাদের রীতিনীতি বিরোধী হতে বাধ্য।

এ প্রশ্নের উত্তর আমরা দু'ভাবে দিতে পারিঃ

এক) একজন ঈমানদার কখনও এ রকম অযৌক্তিক কথা বলতে পারেনা, কারণ সে জানে যে, ইসলাম গ্রহণের পর তার পরিচয় হলো সে একজন মুসলিম। তার জাতীয়তাবাদ হবে ইসলামী জাতীয়তাবাদ। শুধুমাত্র পরিচয়ের জন্য কোন্ দেশের অধিবাসী তা উল্লেখ করতে পারে। বিশ্বাস ও নিয়মনীতি, চাল-চলন ইত্যাদিতে সে ইসলাম বিরোধী যাবতীয় রীতিনীতি পরিত্যাগ করতে বাধ্য।

দুই) মুলতঃ জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে ইসলামী আইন থেকে দূরে সরে থাকা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। কারণ, আমরা জানি প্রত্যেক রাষ্ট্রেই কতগুলো জাতি থাকে, প্রত্যেক জাতির জন্য আলাদা আইন কেউই রচনা করেনা। রাষ্ট্র একটি হলে তার আইন এক রকমই হয়ে থাকে। উদাহরণ স্বরূপঃ পাকিস্তানে বেলুচি, সিন্ধি, পাঞ্জাবী প্রভৃতি জাতি রয়েছে, ভারতেও রয়েছে তদনুরূপ বহু জাতি; প্রত্যেকের জন্য আইন একটাই, ভিন্ন ভিন্ন আইন তৈরী হয়নি। তাই আল্লাহর আইন চললে সেখানে জাতিভিত্তিক কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পরন্তু তাতে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে একই নিয়মে পরিচালনা করা সম্ভব; যা রাষ্ট্রিয় ঐক্য ও শক্তিকে আরো সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে উপকারী।

অতএব, আল্লাহর আইন মূলতঃ কোন জাতির জন্য বিশেষভাবে প্রণয়ন করা হয়নি যাতে এ ধরণের সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। মূলতঃ গোটা মানব সমাজের জন্য আল্লাহর আইনই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা, তাই জাতীয়তাবাদের মত সংকীর্ণ দৃষ্টি ভঙ্গি কখনো ইসলামী আইনের বিকল্প হতে পারে না; বরং যেহেতু একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতির অবস্থান সেহেতু সেখানে গোটা মানবতার জন্য প্রণীত জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করা দরকার, যাতে জাতি, বর্ণ, গোত্র নির্বেশেষে গোটা মানবগোষ্ঠী আইনের সুবিধা লাভ করতে পারে।

তৃতীয় সন্দেহঃ

'ইসলামী আইন আধুনিক যুগের উদ্ভুত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অপারাগ'। মুলতঃ এটি একটি মিথ্যা অপবাদ ছাড়া আর কিছুই না। কারণ, কেউই এমন কোন সমস্যা দেখাতে পারবেনা যার জন্য ইসলাম কোন হুকুম নির্ধারন করে দেয়নি। হাঁ, অনেক সময় অনেকের কাছে তা স্পষ্ট থাকেনা, আর সে জন্য ইসলামী আইনের প্রতি দোষারূপ না করে এমন লোকদের সাহায্য নেয়া উচিত যারা যে কোন উদ্ভুত সমস্যার সমাধান কল্পে সঠিক সমাধান বের করে দিতে পারেন। এ রকম অস্পষ্টতা শুধু ইসলামী আইনের বেলায় নয়, অন্যান্য আইনেও রয়েছে; বরং অন্যান্য আইনে অসংখ্য অস্পষ্টতা বিদ্যমান। যদি অন্যান্য আইন শিখানোর জন্য, আইনগত পরামর্শ নেয়ার জন্য, আইনের ব্যাখ্যা দানের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি থাকতে পারে, তাহলে ইসলামী আইনের ক্ষেত্রেও এরকম শিক্ষা প্রদান, পরামর্শ প্রদান ও ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি নির্ধারণ করলেই সে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বস্তুতঃ ইসলামী আইনের সাথে অন্যান্য আইনের অস্পষ্টতার কোন তুলনাই চলেনা।

এর একমাত্র কারণ হলোঃ ইসলামী আইন প্রথমে যে কাজটি করেছে তা হলো- একজন মানুষের জীবনে কি কি সমস্যা হতে পারে তা নির্ধারণ করেছে, তারপর সে গুলোকে কিভাবে সমাধান করা যায় তার বর্ণনা দিয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষের মৌলিক সমস্যা পাঁচটিঃ

(১) জীবন নাশের আশংকা।

(২) সম্পদ হারানোর আশংকা।

(৩) মানসম্মান বা ইজ্জত নষ্টের আশংকা।

(৪) আকল বা বুদ্ধি বিবেক হারানোর ভয়।

(৫) দ্বীন বা ধর্ম বিনষ্টের আশংকা।

এ সবগুলোকে "অতীব প্রয়োজনীয় পাঁচটি বস্তু" নামে ইসলাম অভিহিত করেছে। এ পাঁচটি বস্তুরই সমাধান ইসলামী আইনে রয়েছে। ভাল করে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, আধুনিক যুগেও এ পাঁচটি মৌলিক সমস্যার বাইরে আর মৌলিক কোন সমস্যার উৎপত্তি হয়নি। ফলে, যে সন্দেহ তোলা হয়েছে তার কোন ভিত্তি নেই।

এ সন্দেহ যে সম্পূর্ণভাবে অমুলক, তার প্রমাণ হিসাবে আমরা বর্তমান সৌদী আরবের আইনের কথা উল্লেখ করতে পারি, সেখানে আল্লাহর আইন বাস্তবায়িত রয়েছে, সে দেশে এখনো আইনি কোন সমস্যা দেখা দেয়নি। তাদের কাছে এমন কোন মুকাদ্দমা এখনো পেশ হয়নি যার জন্য তারা ইসলামী আইনে সমাধান পায়নি। বরং সে দেশ যাবতীয় সমস্যার সমাধান ইসলামী আইনে করে থাকে বলে এখনো সেখানে যারা থাকে তারা শান্তিতে বসবাস করে যাচ্ছে।

চতুর্থ সন্দেহঃ

'ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আছে'। এ সন্দেহটি মুলতঃ ইসলামী আইন সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানের অভাবেই সৃষ্ট। কেননা, ইসলামের সোনালী যুগে ইসলামী আইন পরিপূর্ণভাবেই বাস্তবায়িত ছিল, অথচ সেখানে একনায়কতন্ত্রের নমুনা দৃষ্ট হয়নি; বরং তার বিপরীতটি দেখা গেছে। আবু বকর, উমার, উসমান এবং আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমের সময়ে খলিফাদেরও জবাবদিহী করতে হত। তাদেরও "শূরা" (পরামর্শ) বোর্ড ছিল। তাদের অধিকাংশ কর্মকাণ্ডই পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হত। যদিও পরামর্শ দান ও গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান্য ছিল কুরআন ও সুন্নাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া না হওয়া, সংখ্যা গরিষ্ঠতা নয়।

তবে হাঁ, ইসলামে এমন কিছু কর্মকাণ্ড আছে, যা স্থায়ী, যেখানে কোনরূপ পরামর্শ বা সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এর বাইরে অনেক বিষয় আছে যা যুগের চাহিদা অনুসারে পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। আর ঐ নির্দিষ্টসমূহ-যেগুলোতে কোন প্রকার হেরফের করা যায়না-তা আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন কর্তৃক নির্ধারিত। তাই সেখানে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার সম্ভাবনা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়।

পঞ্চম সন্দেহঃ

এটি মূলতঃ তিনটি সন্দেহের সমষ্টি।

এক) প্রথমেই বাকস্বাধীনতা না দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ এ কথা ভালভাবেই প্রত্যেক ঈমানদারের জানা উচিৎ যে, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কোন আইন থাকলে সেখানে বাকস্বাধীনতা দিয়ে কোন লাভ নেই, কারণ বাকস্বাধীনতা সাধারণতঃ মানব রচিত আইনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। কেননা, মানব রচিত আইনের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি, ফাঁকি, যুলুম, অত্যাচারের সম্ভাবনাসমূহ বিদ্যমান। সেখানে বাকস্বাধীনতা ব্যবহারের মাধ্যমে সংশোধনের পথ সুগম করা যায়। পক্ষান্তরে, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের আইনের ক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতা দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহকে অপরিপক্ক, অপরিণামদর্শী, যালেম, মূর্খ ইত্যাদি কুফরী করা ছাড়া আর কিছু করা সম্ভব নয়। কেননা, তিনি জেনেবুঝেই বান্দার জন্য এগুলো প্রবর্তন করেছেন।

দুই) চিন্তার স্বাধীনতা না দেয়া। মুলতঃ এটা একটা অপবাদ; বরং ইসলামই মানুষকে চিন্তা করার, গবেষণা করার ও ভাবার জন্য উৎসাহিত করেছে। কিন্তু যেহেতু মানব চিন্তা বহুমুখী এবং শতধা বিভক্ত হতে বাধ্য, তাই ইসলাম সে ব্যাপারে একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এমন চিন্তা করতে বলেছে, যাতে সুফল আশা করা যায়, নিষ্ফল চিন্তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। ইসলাম মানুষকে সৃষ্টি জগতের বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা করতে নির্দেশও দিয়েছে। কিন্তু স্রষ্টার ব্যাপারে চিন্তা করতে নিষেধ করেছে, কারণ তারা এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে সক্ষম হবেনা। স্রষ্টা সম্পর্কে তাদের চিন্তার ফসল তাদের জন্য কোন সুফল বয়ে আনবেনা, কারণ তাদেরকে এ ব্যাপারে যতটুকু জ্ঞান দেয়া হয়েছে এর বাইরে তারা শত চেষ্টা করেও কোন কিছু উদ্ধার করতে পারবেনা; বরং বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হতে বাধ্য।

আল্লাহর আইন যেহেতু তার একান্ত নিজের পক্ষ থেকে প্রবর্তিত বিধান, সেখানে চিন্তা করার কিছু নেই। সেখানে চিন্তা করলে শুধু প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্র সম্পর্কে করা যায়। মানা না মানার ক্ষেত্রে নয়।

মুলতঃ যারা বলে 'ইসলামী আইন স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্রে বাধা' তারা আসলে তাদের নিজেদের চিন্তাধারাকে আইন বলে চালাতে চেষ্টা করে, সবার চিন্তাধারাকে তারা গ্রহণ করেনা, তাদের চিন্তাধারার সঠিকতা নিরূপণের একটা মাপকাঠি দরকার। আজ পর্যন্ত মানব রচিত আইনের এমন কোন ধারা নেই যার মধ্যে দেশ কাল ভেদে, চিন্তাধারার পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয়নি। এতেই এর অসারতা প্রমাণিত হয়।

তিন) ইসলামী আইন প্রগতির অন্তরায়। এ সন্দেহটি অলীক ও ভুল চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। কেননা, প্রগতি শব্দের অর্থ যদি উন্নতি হয় তাহলে ঈমানদার মাত্রই বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন যা বান্দার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাতেই রয়েছে উন্নতি, সেটার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নই হলো প্রগতি। ইসলামের কোন আইন আধুনিক আবিস্কৃত কোন কিছুর বিরোধিতা করেনি; বরং এগুলোর যত ভালো দিক আছে তা গ্রহণ করা জরুরী মনে করেছে, কিন্তু যদি প্রগতি বলতে বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা, অশ্লীলতা, নগ্নতা ইত্যাদি বুঝানো হয়, তাহলে প্রত্যেক বিবেকবানকেই জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, এগুলো কি উন্নতি না অবনতি? যদি এগুলো উন্নতির সোপান হতো তাহলে এ ব্যাপারে বিবেকবানদের মধ্যে দ্বিমত দেখা যেতনা, অথচ সুস্থ বিবেকবান মাত্রই নিজ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে এগুলোকে দূরীভুত করা গর্বের বিষয় মনে করে থাকে। সুতরাং ইসলাম প্রগতির অন্তরায় এ রকম অপবাদ বিকৃত মস্তিস্কের ফসল মাত্র।

ষষ্ট সন্দেহঃ

'ইসলামী আইন কিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব অথচ একই রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের লোক বিদ্যমান'?

এ সন্দেহটিও অন্যান্য সন্দেহের ন্যায় অমুলক, ইসলামী আইনের প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্ট করা আছে। যদি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমগণ থাকেন এবং তাদের মাঝে কোন প্রকার সমস্যার সৃষ্টি হয় তখন প্রত্যেক নাগরিকই তার বিশ্বাসকৃত জীবন ব্যবস্থা অনুসারে চলতে পারবে, কারো ব্যাপারে জোর করা হবে না। তাদের মধ্যকার সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে তাদের যদি নির্দিষ্ট আইন থাকে, তবে সে অনুসারে ফয়সালা করা হবে। তবে যেখানে মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে সমস্যা দেখা দিবে সেখানে ইসলামী আইন প্রাধান্য পাবে। সুতরাং একই রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের লোক থাকলেও ইসলামী আইন প্রবর্তনে কোন বাধা নেই।

সপ্তম সন্দেহঃ

'ইসলামী আইনে কঠোরতা আছে বলে দাবী করা'।

এ সন্দেহটিও মুলতঃ ইসলামী আইন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকার উপর প্রমাণবহ। কেননা, ইসলামী আইনের যে অংশের প্রতি তাদের এ সন্দেহ নির্ভরশীল তা হলো, দণ্ডবিধি অংশ। ইসলামী আইনের দণ্ডবিধি অংশের উদ্দেশ্য হলোঃ "প্রতিরোধ করা"। সমাজ থেকে অন্যায়ের মূলোৎপাটন করা, বিকলাঙ্গ মানুষ তৈরী এর উদ্দেশ্য নয়। এক চোরের হাত কাটলেই আপনি দেখতে পাবেন সেখানে চুরি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। তদুপরি বিচারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে চুরি প্রমান করা। শুধুমাত্র অনুমান বা দাবীর মুখে এ বিধান কার্যকর করা হয় না, তার উপরে আছে চুরিকৃত সম্পদের পরিমাণ কত হবে তা নিরূপণ করা, নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত চুরি করলেই শুধু হাত কাটা যাবে তার আগে নয়। আবার দেখা হবে কোত্থেকে চুরি করেছে, সে কি এমন স্থান থেকে চুরি করেছে যা কারো সংরক্ষিত বলে বিবেচিত, আবার এটাও দেখার বিষয় হবে যে, সে চোর নিতান্ত পেটের দায়ে চুরি করেছে কিনা, দুর্ভিক্ষে মানুষ দিশেহারা কিনা, মানুষের নূন্যতম খাবারের ব্যবস্থা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে করা হয়েছে কি না? এ সব বিবেচনায় রাখার পর যদি চুরি প্রমাণিত হয়, তবে তার ডান হাতের কব্জি পর্যন্ত কাটার হুকুম ইসলামী আইন দিয়েছে। যে কেহ এ রকম হাত কাটা লোক দেখবে তার চুরির সাধ মিটে যাবে, ইসলামী আইনের বাস্তবায়ন হয়েছে শুনতে পেয়েই সেখানে চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ কেউই চুরির কারণে নিজের মুল্যবান হাতটি যেমনি খোয়াতে চায়না, তেমনি আবার খোয়াতে চায়না নিজের সম্মান, কারণ তার হাত কাটা অবস্থা তার জন্য যেমনি শিক্ষা অপরের জন্যও তা শিক্ষা হিসাবে দেখা দিবে।

ইসলামের সোনালী যুগে থেকে শুরু করে বর্তমান সৌদী আরব-যেখানে ইসলামী আইনের দন্ডবিধি অংশ বাস্তবায়িত আছে-সেখানে যদি ভালোভাবে দেখা হয়, তাহলে হাত কাটা লোকদের সংখ্যা নিতান্তই কম দেখা যাবে। হয়ত কয়েক লক্ষ লোকের মাঝে দু'একজন দেখা যাবে। এ দু'একজনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন ব্যবস্থা রাখা কঠিন কিছু নয়। এর বিপরীতে যে অনাবিল শান্তি বিরাজ করছে, যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষ পাচ্ছে, তার তুলনা আজ সারা বিশ্বে নেই। অন্য কোন প্রকার আইন বাস্তবায়ন করে এরূপ শান্তি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেনি এবং পারবেওনা।

আমি শুধুমাত্র চুরির ব্যাপারে ইসলামী দণ্ডবিধি আইনের যৌক্তিকতা পেশ করছি; বরং অন্যান্য সকল আইনের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। এখানে কোন প্রকার যুলুমের সম্ভাবনাই নেই, আর কিভাবেই বা যুলুমের সম্ভাবনা থাকতে পারে এ আইনে; যে আইনটি এমন এক সত্তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যিনি বান্দাহর প্রতিটি শিরা-উপশিরা, চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিফহাল। কোথায় কিভাবে কোন্ আইন দিলে বান্দার জন্য তা হিতকর হবে, তা তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। কারণ তিনিইতো তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন সুতরাং তাদের ব্যাপারে তাঁর চেয়ে বেশী আর কে জানতে পারে?

খ. ইসলামী আইনের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে যারা ইসলামী আইনের সঠিক জ্ঞান রাখার পরও এর বিরোধিতা করে থাকে, তাদের মনে ইসলামী আইনের বাস্তবতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু তারা নিজেদের স্বার্থেই এর বাস্তবায়ন চায়না।

ধরুন, তাদের মধ্যে কেউ সরকারী চাকুরীজীবি, সে ঘুষ খায়, সরকারী সম্পত্তি আত্মসাৎ করে; সে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন হোক এটা চাইতেই পারেনা। কারণ ইসলাম ঘুষ গ্রহিতাকে অপসারণ করতে বলেছে, সরকারী সম্পত্তির আত্মসাৎকারীকে চোর হিসাবে সাব্যস্ত করেছে, সে চোরের শাস্তি পাবে। তাই বড় বড় আমলারা যারা ঘুষের মাধ্যমে, অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে বড় লোক হতে চায়; তারা কিভাবে ইসলামী আইনের বাস্তবায়ন চাইতে পারে?

আবার ধরুন, কেউ ডাকাতির মাধ্যমে বড়লোক হতে চায়, ইসলামী আইনে তার শাস্তি হলো এক হাত, এক পা কেটে দেয়া। এ শাস্তি কোন ডাকাতের জন্য সুখকর নয়, তাই ডাকাতদল কোন দিন চাইবেনা ইসলামী আইন বাস্তবায়িত হোক। ইসলামী আইনে অঙ্গহানির শাস্তি হলো তেমনিভাবে অঙ্গহানি করা, তাই যারা সমাজে অঙ্গহানি করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চায়, তারা কোন দিন চাইবেনা ইসলামী আইন এ দেশে বাস্তবায়িত হোক।

ইসলামী আইনে হত্যার শাস্তি হত্যা, তাই যে হত্যার মাধ্যমে শত্রুমুক্ত হতে চায়, (চাই তার স্ত্রী, প্রতিবেশী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ; যে-ই হোক না কেন) সে চাইবেনা ইসলামী আইন বাস্তবায়িত হোক, কারণ তার শাস্তিও অনুরূপ হবে, কোন প্রকার ব্যতিক্রম হবেনা। সুতরাং কেউই নিজের জীবনের বিনিময়ে এমন কিছু অর্জন করতে চায়না।

অনুরূপভাবে সমাজে এক শ্রেনীর লোক রয়েছে, যারা অন্যায়, অনাচার করে বেড়ায়। ইসলামী আইন থাকলে তাদের বিচার হবে সুষ্ঠুভাবে, তারা অন্যায় করতে পারবেনা, সুতরাং তারা চায়না ইসলামী আইন বাস্তবায়িত হোক।

সুতরাং আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সার্বিক শান্তির গ্যারান্টি যদি কেউ পেতে চায় তার পক্ষে ইসলামী আইনের বিকল্প আর কিছুই নেই।

আসুন ! আমরা আবার আমাদের এ প্রিয় যমীনের বুকে ইসলামের আইন বাস্তবায়ন করে দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি লাভে সমর্থ হই। আল্লাহ আমার এ প্রচেষ্টা কবুল করুন। আমীন।।

সমাপ্ত

প্রণেতাঃ

আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া মজুমদার

এম এম, লিসান্স, এম এ, এম ফিল, পি এইচ, ডি, (মদীনা)

সহকারী অধ্যাপক, আল-ফিকহ বিভাগ

আইন ও শরীয়াহ অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া প্রচারেঃ

ইবনে তাইমিয়া ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

প্রাপ্তিস্থানঃ

সিদ্দিকিয়া পাঠাগার, ধনুসাড়া, পোঃ ঘোলপাশা, থানাঃ চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা, বাংলাদেশ ।

প্রকাশকালঃ রজব ১৪২৩ হিঃ, সেপ্টেম্বরঃ ২০০২ ইং

লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য ভিজিট করুন:

http://aburazin.wetpaint.com/account/aburazin

সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )