আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলী প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী   
Friday, 01 June 2007
আর্টিকেল সূচি
ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলী
ব্যক্তিগত গুণাবলী
দলীয় গুণাবলী
পূর্ণতাদানকারী গুণাবলী
মৌলিক ও অসৎ গুনাবলী
মানবিক দুর্বলতা

মানবিক দুর্বলতা

এরপর এমন কতগুলো দোষত্রুটি আছে যেগুলো ভিত্তিমূলকে ধ্বসিয়ে না দিলেও নিজের প্রভাবের দিক দিয়ে কাজকে বিকৃত করে থাকে এবং গাফলতির দরুণ এগুলো লালিত হতে থাকলে ধ্বংসকর প্রমাণিত হয়। এ সমস্ত অস্ত্র সজ্জিত হয়ে শয়তান সৎকাজের পথ রোধ করে, মানবিক প্রচেষ্টাকে ভালোর থেকে খারাপের দিকে নিয়ে যায় এবং সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। সমাজ দেহের সুস্থতার জন্যে সর্ববস্থায় এ দোষগুলোর পথ রুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সমাজ সংশোধন ও সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠার মহান উদ্দেশ্য সম্পাদনে ব্রতী ব্যক্তি ও দলের এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা উচিৎ।

এ দোষগুলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে জানা যায় যে, এগুলোর উৎসমূল মানুষের এমন কতিপয় দুর্বলতা যার প্রত্যেকটিই অসংখ্য দোষের জন্ম দেয়। বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে হলে এক একটি দুর্বলতা সম্পর্কে আলোচনা করে তার তাৎপর্য বুঝতে হবে। অতঃপর তা কিভাবে পর্যায়ক্রমে অসৎকাজের জন্ম দেয় এবং তার বিকাশ ও পরিপুষ্টি সাধন করে কোন কোন দোষত্রুটির সৃষ্টি করে, তা অনুধাবন করতে হবে। এভাবে প্রত্যেক দোষের উৎস আমরা জানতে পারবো এবং তার সংশোধনের জন্যে কোথায় কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তাও নির্ণয় করতে সক্ষম হবো।

আত্মপূজাঃ


মানুষের সকল দুর্বলতার মধ্যে সবচাইতে বড় ও মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী দুর্বলতা হচ্ছে ‘স্বার্থপূজা’। এর মূলে আছে আত্মপ্রীতির স্বাভাবিক প্রেরণা। এ প্রেরণা যথার্থ পর্যায়ে দোষণীয় নয় বরং নিজের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে অপরিহার্য এবং উপকারীও। আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রকৃতির মধ্যে তার ভালোর জন্যে এ প্রেরণা উজ্জীবিত রেখেছেন। এর ফলে সে নিজের সংরক্ষণ, কল্যাণ ও উন্নতির জন্যে প্রচেষ্টা চালাতে পারে। কিন্তু শয়তানের উষ্কানীতে যখন এ প্রেরণা আত্মপূজা ও আত্মকেন্দ্রীকতায় রুপান্তরিত হয় তখন তা ভালোর পরিবর্তে মন্দের উৎসে পরিণত হয়। তারপর এর অগ্রগতির প্রতিটি পর্যায়ে নতুন নতুন দোষের জন্ম হতে থাকে।

আত্মপ্রীতিঃ


মানুষ যখন নিজেকে ত্রুটিহীন ও সমস্ত গুণাবলীর আঁধার মনে করে নিজের দোষ ও দুর্বলতার অনুভূতিকে ঢাকা দেয় এবং নিজের প্রতিটি দোষত্রুটির ব্যাখ্যা করে নিজেকে সবদিক দিয়ে ভালো মনে করে নিশ্চিন্ততা লাভ করে, তখন এ আত্মপ্রীতির প্রেরণা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং সর্পিল গতিতে অগ্রসর হতে থাকে। এ আত্মপ্রীতি প্রথম পদক্ষেপই তার সংশোধন ও উন্নতির দ্বার স্বহস্তে বন্ধ করে দেয়।

অতঃপর যখন ‘আমি কত ভালো’ এ অনুভূতি নিয়ে মানুষ সামাজ জীবনে প্রবেশ করে তখন সে নিজেকে যা মনে করে রেখেছে অন্যরাও তাকে তাই মনে করুক এ আকাঙ্খা তার মনে জাগে। সে কেবল প্রশংসা শুনতে চায়। সমালোচনা তার নিকট পছন্দ হয় না। তার নিজের কল্যাণার্থে যেকোন উপদেশবাণীও তার অহমকে পীড়িত করে। এভাবে এ ব্যক্তি নিজের সংশোধনের আভ্যন্তরীণ উপায়-উপকরণের সাথে সাথে বাইরের উপায়-উপকরণেরও পথ রোধ করে।

কিন্তু সমাজ জীবনে সকল দিক দিয়ে নিজের আশা-আকাঙ্খা অনুযায়ী পছন্দসই অবস্থা লাভ করা দুনিয়ার কোন ব্যক্তির জন্যে সম্ভবপর হয় না। বিশেষ করে আত্মপ্রেমিক ও আত্মপূজারী তো এখানে সর্বত্র ধাক্কা খায়। কারণ তার অহম নিজের মধ্যে এমন সব কার্যকারণ উপস্থিত করে, যা সমাজের অসংখ্য গুণাবলীর সাথে তার সংঘর্ষকে অনিবার্য করে তোলে। অন্যদিকে সমাজের সামগ্রিক অবস্থাও তার আশা-আকাঙ্খার সাথে সংঘর্ষশীল হয়। এ অবস্থা ঐ ব্যক্তিকে কেবল নিজের সংশোধনের আভ্যন্তরীন ও বাইরের উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত করে না বরং এই সঙ্গে অন্যের সাথে সংঘর্ষ ও আশা-আকাঙ্খার পরাজয়ের দুঃখ তার আহত ও বিক্ষুদ্ধ অহমকে একের পর এক মারাত্মক অসৎ কাজের মধ্যে নিক্ষেপ করতে থাকে। সে জীবনে অনেক লোককে নিজের চাইতে ভালো দেখে। অনেক লোকের ব্যাপারে সে মনে করে, সমাজ তাদেরকে তার চাইতে বেশী দাম দেয়। সে নিজে যে মর্যাদার প্রত্যাশী অনেক লোক তাকে তা দেয় না। সে নিজেকে যে সব মর্যাদার হকদার মনে করে সে পর্যন্ত পৌঁছার পথে অনেক লোক তার জন্যে বাঁধার সৃষ্টি করে। অনেক লোক তার সমালোচনা করে এবং তার মর্যাদাহানী করে। এ ধরণের বিচিত্র অবস্থা তার মনে বিভিন্ন মানুষের বিরুদ্ধে হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সে অন্যের অবস্থা অনুসন্ধান করে, অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়, গীবত করে, গীবত শুনে তার স্বাদ গ্রহণ করে, চোগলখুরী করে, কানাকানী করে এবং ষড়যন্ত্র করে বেড়ায়। আর যদি তার নৈতিকতার বাঁধন ঢিলে হয়ে থাকে অথবা অনবরত ঐ সমস্ত কাজে লিপ্ত থাকার কারণে ঢিলে হয়ে যায়, তাহলে আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে মিথ্যা দোষারোপ, অপপ্রচার প্রভৃতি মারাত্মক ধরণের অপরাধ করে বসে। এ সমস্ত অসৎ কাজ করতে করতে সে নৈতিকতার সর্বনিন্ম স্তরে পৌঁছে যায়। তবে যদি কোন পর্যায়ে পৌঁছে সে নিজের এ প্রারম্ভিক ভ্রান্তি অনুভব করতে পারে, যা তাকে এ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। তাহলে সে এ পতন থেকে বাঁচতে পারে।

কোন এক ব্যক্তি এ অবস্থার সম্মুখীন হলে কোন প্রকার সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয় না। এর প্রভাব বড় জোর কয়েক ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছে থেমে যায়। তবে যদি সমাজে বহু আত্মপূজার রোগীর অস্তিত্ব থাকে, তাহলে তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে সমগ্র সমাজ জীবন বিপর্যস্ত হয়। বলাবাহুল্য, যেখানে পরস্পরের মধ্যে কু-ধারণা, গোয়েন্দা মনেবৃত্তি, পরদোষ অনুসন্ধান, গীবত ও চোগলখুরীর দীর্ঘ সিল্সিলা চলতে থাকে, সেখানে অনেক লোক মনের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে অসৎবৃত্তি লালণ করে এবং হিংসা ও পরস্পরকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। যেখানে অনেক আহত অহং প্রতিরোধ স্পৃহায় ভরপুর থাকে, সেখানে কোন বস্তু গ্রুপ সৃষ্টির পথ রোধ করতে পারে না। সেখানে কোন প্রকার গঠনমূলক সহযোগীতা দূরের কথা মধুর সম্পর্কের সম্ভবনাই থাকে না। এহেন পরিবেশে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ আত্মপূজার রোগীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং ধীরে ধীরে ভালো ভালো সৎলোকেরাও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কারণ সৎ ব্যক্তি তার মুখের ওপর যথার্থ সমালোচনাই নয় অযথার্থ সমালোচনাও বরদাশ্ত করতে পারে কিন্তু গীবত তার মনে ক্ষোভ সৃষ্টি না করে থাকতে পারে না। এর কমপক্ষে এতোটুকু প্রভাব পড়ে যে, গীবতকারীর ওপর আস্থা স্থাপন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এভাবে কোন সৎ ব্যক্তি হিংসা বিদ্বেষের ভিত্তিতে তার প্রতি যে সমস্ত বাড়াবাড়ি করা হয় সেগুলো মাফ করতে পারে। সে গালিগালাজ, দোষারোপ, মিথ্যা প্রপাগান্ডা ও এর চাইতে অধিক কষ্টদায়ক জুলুম উপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু যেসব লোকেরা এহেন অসৎ গুণের সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হয়েছে তাদের সাথে নিশ্চিত হয়ে কোন কারবার করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এ থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে যে, এ অসৎ গুণাবলী যে সামাজিক পরিবেশে বিকাশ লাভ করে তা কিভাবে শয়তানের প্রিয় বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এমনকি এ ব্যাপারে অত্যন্ত সৎব্যক্তিত্ব সংঘর্ষ মুক্ত থাকলেও দ্বন্দ্বমুক্ত থাকতে পারে না।

অতঃপর যারা সমাজ সংশোধন ও পরিগঠনের জন্যে সমষ্টিগতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে চায় তাদের দলের যে এহেন অসৎ ব্যক্তিদের থেকে সম্পূর্ণরুপে মুক্ত হওয়া অপরিহার্য এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আসলে আত্মপূজা এ ধরণের দলের জন্যে কলেরা ও বসন্তের জীবাণুর চাইতেও অনেক বেশী ক্ষতিকর। এর উপস্থিতিতে কোন প্রকার সৎকাজ ও সংশোধনের চিন্তাই করা যায় না।

বাঁচার উপায়ঃ


তওবা ও এস্তেগফারঃ
ইসলামী শরিয়ত এ রোগটি শুরু হবার সাথে সাথেই এর চিকিৎসা শুরু করে দেয়। অতঃপর প্রতিটি পর্যায়ে এর পথ রোধ করার জন্যে নির্দেশ দান করতে থাকে। কুরআন ও হাদীসের স্থানে স্থানে ঈমানদারদেরকে তওবা ও এস্তেগফার করার জন্যে উপদেশ দান করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, মু’মিন যেন কোন সময় আত্মপূজা ও আত্মপ্রীতির রোগে আক্রান্ত না হয়, কখনো আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত না হয়, নিজের দুর্বলতা ও দোষ-ত্রুটি অনুভব এবং ভুল-ভ্রান্তি স্বীকার করতে থাকে ও কোন বিরাট কাজ করার পরও অহংকারে বুক ফুলাবার পরিবর্তে দীনতার সাথে নিজের খোদার সম্মুখে এই মর্মে আর্জি পেশ করে যে, তার খেদমতের মধ্যে যে গলদ রয়ে গেছে সেগুলো যেন মাফ করে দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহর (সঃ) চাইতে বড় পূর্ণতার অধিকারী আর কে হতে পারে? কোন ব্যক্তি দুনিয়ায় তার চাইতে বড় কাজ সম্পাদন করেছে? কিন্তু ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ও মহত্তম কাজ সম্পাদন করার পর আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে যে নির্দেশ দেয়া হলো তা হচ্ছেঃ-
اذا جاء نصر الله والفتح- ورايت الناس يدخلون فى دين الله افواجا- فسبِّح بحمد ربك واستغفره انه كان تواباً -
“যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে যায় আর তুমি মানুষকে দলে দলে খোদার দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখছো তখন নিজের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং তাঁর নিকট মাগফেরাত চাও অবশ্য তিনি তওবা কবুলকারী।”

অর্থাৎ যে মহান কাজ তুমি সম্পাদন করেছো সে সম্পর্কে জেনে রেখো, তাঁর জন্যে তোমার নয় তোমার প্রতিপালকের প্রশংসা প্রাপ্য। কারণ তাঁরই অনুগ্রহে তুমি এ মহান কাজ সম্পাদনে সফলকাম হয়েছো এবং নিজের সম্পর্কে তোমার এ অনুভূতি থাকা উচিৎ যে, যে কাজ তুমি সম্পাদন করেছো তা যথাযথ ও পূর্ণতার সাথে সম্পাদিত হয়নি। তাই পুরস্কার চাওয়ার পরিবর্তে কাজের মধ্যে যা কিছু অপূর্ণতা ও গলদ রয়ে গেছে তা মাফ করার জন্যে নিজের প্রতিপালকের নিকট দোয়া করো। বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ-
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يكثر ان يقول قبل موته سبحان الله وبحمده استغفرو الله واتوب اليه -
“রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে প্রায় বলতেন, আমি খোদার প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, আমি খোদার কাছে মাগফেরাত চাচ্ছি এবং তাঁর কাছে তওবা করছি।”

এমনিতেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) হামেশা তওবা ও এস্তেগফার করতেন। বুখারী শরীফে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছেনঃ-
والله انى استغفروالله واتوب اليه فى اليوم اكثر من سبعين مرَّةً -
“খোদার কসম আমি প্রতিদিন সত্তর বারেরও বেশী আল্লাহর নিকট এস্তেগফার ও তওবা করি।”

এ শিক্ষার প্রাণবস্তুকে আত্মস্থ করার পর কোন ব্যক্তির মনে আত্মপূজার বীজ অংকুরিত হতে পারবে না এবং তা বিষবৃক্ষে পরিণত হয়ে বিপর্যয় সৃষ্টিতেও সম হবে না।

সত্যের প্রকাশঃ
এরপরও যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে এ ত্রুটি দেখা দেয়, তাহলে ইসলামী শরীয়ত চরিত্র ও কর্মের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতি পদে পদে এর বিকাশ ও প্রকাশের পথ রোধ করে এবং এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দেয়। যেমন এর প্রথম প্রকাশ এভাবে হয়ে থাকে যে, মানুষ নিজেকে সমালোচনার উর্দ্ধে মনে করে এবং নিজের কথা ও মতামতের স্বীকৃতি আদায় করার চেষ্টা করে। অন্য কোন ব্যক্তি তার ভুলের সমালোচনা করবে, এটা সে বরদাশত করে না। বিপরীত পক্ষে ইসলামী শরীয়ত সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকাকে সকল ঈমানদারদের জন্যে অপরিহার্য করে দিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাশীন জালেমদের সম্মুখে সত্যের প্রকাশকে সর্বত্তোম জিহাদ হিসেবে গণ্য করেছে। এভাবে মুসলিম সমাজে অসৎকাজ বিরত রাখার ও সৎকাজের নির্দেশ দেবার উপযোগী এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যেখানে আত্মপূজা স্থান লাভ করতে পারে না।

হিংসা ও বিদ্বেষঃ


আত্মপূজার দ্বিতীয় প্রকাশ হয় হিংসা ও বিদ্বেষের রুপে। আত্মপূজার আত্মপ্রীতিতে যে ব্যক্তি আঘাত হানে তার বিরুদ্ধেই মানুষ এ হিংসা ও বিদ্বেষ পোষন করতে থাকে। অতঃপর তার সাথে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। ইসলামী শরীয়ত একে গোনাহ্ গণ্য করে এ গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তির জন্যে কঠোর শাস্তির ঘোষনা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাবধান! হিংসা করো না। কারণ হিংসা মানুষের সৎকাজগুলোকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন শুকনো কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।”

হাদীসে বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ কঠোর নির্দেশ উদ্ধৃত হয়েছেঃ “তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করো না, পরস্পরকে হিংসা করো না, পরস্পরের সাথে কথা বলা বন্ধ করো না, কোন মুসলমানের জন্যে তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশী সম্পর্ক ছিন্ন অবস্থায় থাকা বৈধ নয়।”

কু-ধারণাঃ


আত্মপূজার তৃতীয় প্রকাশ হয় কু-ধারণার মাধ্যমে। কু-ধারণা সৃষ্টি হবার পর মানুষ গোয়েন্দা মনোবৃত্তি নিয়ে অন্যের দোষ খুজে বেড়াতে থাকে। কু-ধারণার তাৎপর্য হচ্ছে, মানুষ নিজের ছাড়া অন্য সবার সম্পর্কে এ প্রাথমিক ধারণা রাখে যে, তারা সবাই খারাপ এবং বাহ্যতঃ তাদের যে সমস্ত বিষয় আপত্তিকর দেখা যায় সেগুলোর কোন ভালো ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে হামেশা খারাপ ব্যাখ্যা করে থাকে। এ ব্যাপারে সে কোন প্রকার অনুসন্ধানেরও প্রয়োজন বোধ করে না। গোয়েন্দাগীরি এ কু-ধারণারই একটি ফসল। মানুষ অন্যের সম্পর্কে প্রথমে একটি খারাপ ধারণা করে। অতঃপর তার পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহের জন্যে ঐ ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে খবর নিতে থাকে। কুরআন এ দু’টি বস্তুকেই গোনাহ্ গণ্য করেছে। সূরায়ে হুজরাতে আল্লাহ বলেছেনঃ-
اجتنبوا كثيرا من الظنِّ اِنَّ بعض الظنَِ اثمٌ ولا تجسَّسوا -
“অনেক বেশী ধারণা করা থেকে দূরে থাকো, কারণ কোন কোন ধারণা গোনাহের পর্যায়ভূক্ত, আর গোয়েন্দাগীরি করো না।”

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সাবধান! কু-ধারণা করো না, কারণ কু-ধারণা মারাত্মক মিথ্যা”। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেনঃ “আমাদেরকে গোয়েন্দাগীরি করতে ও অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে আমাদের সামনে কোন কথা প্রকাশ হয়ে গেলে আমরা পাকড়াও করবো।” হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা মুসলমানদের গোপন অবস্থার ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে থাকলে তাদেরকে বিগড়িয়ে দেবে।”

গীবতঃ

এ সকল পর্যায়ের পর শুরু হয় গীবতের পর্যায়। কু-ধারণা বা যথার্থ সত্য যার উপরই এর ভিত প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সর্বাবস্থায় কোন ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত ও হেয় প্রতিপন্ন করা এবং লাঞ্ছনা দেখে মনে আনন্দ অনুভব করা বা তা থেকে নিজে লাভবান হবার জন্যে তার অসাক্ষাতে তার দূর্নাম করার নাম গীবত। হাদীসে এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “তোমার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার কথা এমনভাবে বলা, যা সে জানতে পারলে অপছন্দ করতো। রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করা হলোঃ “যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে ঐ দোষ থেকে থাকে তাহলেও কি তা গীবতের পর্যায়ভুক্ত হবে? জবাব দিলেন, যদি তার মধ্যে ঐ দোষ থেকে থাকে এবং তুমি তা বর্ণনা করে থাক, তাহলে তুমি গীবত করলে। আর যদি তার মধ্যে ঐ দোষ না থেকে থাকে তাহলে তুমি গীবত থেকে আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে তার ওপর মিথ্যা দোষারোপ করলে।” কুরআন একে হারাম গণ্য করেছে। সূরায়ে হুজরাতে বলা হয়েছেঃ-
ولا يغتب بَّعضكم بعضاً يحب احدكم ان يّاكل لحم اخيه ميتاً فكرهتموهُ-
“আর তোমাদের কেউ কারোর গীবত করবে না। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খাওয়া পছন্দ করবে? নিশ্চয় তোমরা তা ঘৃণা করবে।”

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “প্রত্যেক মুসলমানের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু অন্য মুসলমানের জন্যে হারাম।” এ ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে, যখন কারোর দুর্নাম করার নিয়ত শামিল না থাকে। যেমন কোন মজলুম যদি নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। কুরআনে এর অনুমতি দেয়া হয়েছে ঃ-
لا يحب الله الجهر بالسوء من القول الا مَنْ ظُلِمَ -
“আল্লাহ অসৎ কাজ সম্পর্কে কথা বলা পছন্দ করেন না, তবে যদি কারোর ওপর জুলুম হয়ে থাকে।”

অথবা দৃষ্টান্তস্বরুপ মনে করুন, যখন কোন ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে চায় বা তার সাথে কোন কারবার করতে চায় এবং এক প কোন পরিচিত জনের নিকট পরামর্শ চাইলে ঐ ব্যক্তির মধ্যে সত্যিকার কোন দোষ যদি তার জানা থাকে তাহলে কল্যাণ কামনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তা বর্ণনা করা কেবল বৈধই নয় বরং অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজেও এসব ক্ষেত্রে দোষত্রুটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে, “দুই ব্যক্তি ফাতেমা বিনতে কায়েসের নিকট বিয়ের পয়গাম পাঠালে তিনি সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে পরামর্শ করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে এই মর্মে হুশিয়ার করে দেন যে, তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে অভাবী এবং দ্বিতীয়জন স্ত্রীকে প্রহার করতে অভ্যস্ত।” অনুরুপভাবে শরীয়তে অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনা থেকে সংরক্ষিত রাখার জন্যে তাদের দোষসমূহ বর্ণনা করাকে আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ বর্ণনা করেছেন এবং হাদীস শাস্ত্রের ইমামগণ কার্যতঃ এ দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন। কারণ দ্বীনের জন্যে এর প্রয়োজন ছিল। যারা মানুষের ওপর প্রকাশ্যে জুলুম করে, অনৈতিক ও ফাসেকী কাজ কর্মের প্রসার ঘটায় এবং প্রকাশ্যে অসৎ কাজ করে বেড়ায় তাদের গীবত করাও বৈধ। রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিজের কাছ থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এইভাবে কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বাবস্থাই গীবত করা হারাম এবং তা শুনাও গোনাহ্ শ্রোতার অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, গীবতকারীকে বাঁধা দেয়া, অন্যথায় যার গীবত করা হচ্ছে তাকে বাঁচানো, আর নয় তো সর্বশেষ পর্যায়ে যে মাহ্ফিলে তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খাওয়া হচ্ছে সেখান থেকে উঠে যাওয়া।

চোগলখোরীঃ


গীবত যে আগুন জ্বালায় চোগলখোরী তাকে বিস্তৃত করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়। স্বার্থবাদীতার প্রেরণাই হয় এর মধ্যে আসল কার্যকর শক্তি। চোগলখোর ব্যক্তি কারুর কল্যাণকামী হতে পারে না। নিন্দিত দু’জনের কারুর কল্যাণ তার অভিপ্সীত হয় না। সে দুজনেরই বন্ধু সাজে কিন্তু অমঙ্গল চায়। তাই সে মনোযোগ দিয়ে দু’জনের কথা শুনে, কারুর প্রতিবাদ করে না। তারপর বন্ধুর নিকট এ খবর পৌঁছিয়ে দেয়। এভাবে যে আগুন এক জায়গায় লেগেছিল তাকে অন্য জায়গায় লাগাতেও সাহায্য করে। ইসলামী শরীয়ত এ কাজকে হারাম গণ্য করেছে। কারণ এর বিপর্যয়কারী ক্ষমতা গীবতের চাইতেও বেশী। কুরআনে চোগলখোরীকে মানুষের জঘণ্যতম দোষরুপে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
لا يدخل الجنة نمَّامٌ -
“কোন চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”

তিনি আরো বলেছেনঃ “তোমাদের সেই ব্যক্তি হচ্ছে সবচাইতে খারাপ যার দু’টি মুখ। সে এক দলের নিকট একটি মুখ নিয়ে আসে আর অন্য দলের নিকট আসে অন্য মুখটি নিয়ে।” এ ব্যাপারে যথার্থ ইসলামী পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, কোথাও কারুর গীবত শুনলে সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ করতে হবে অথবা উভয় পরে উপস্থিতিতে বিষয়টির অবতারণা করে এমনভাবে এর নিষ্পত্তি করতে হবে যাতে করে এক পক্ষ এমন কোন ধারণা করার সুযোগ না পায় যে, তার অনুপস্থিতিতে অন্য পক্ষ তার নিন্দা করেছিল। আর যদি ঐ ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান কোন দোষের জন্যে গীবত করা হয়ে থাকে তাহলে একদিকে গীবতকারীকে তার গোনাহ্ সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে এবং অন্যদিকে তার দোষ সংশোধনের পরামর্শ দিতে হবে।

কানাকানি ও ফিসফিসানীঃ


এ ব্যাপারে সবচাইতে মারাত্মক হচ্ছে ফিস্ফিস্ করে কানে কানে কথা ও গোপনে সলা-পরামর্শ করা। যার ফলে ব্যাপক ষড়যন্ত্র ও দলাদলি পর্যন্ত পৌঁছে এবং পরস্পর বিরোধী সংঘর্ষশীল গ্রুপ অস্তিত্ব লাভ করে। শরীয়ত এর বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে। কুরআনে একে শয়তানী কাজ রুপে চিহ্নিত করা হয়েছেঃ
انَّما النَّجواى من الِشَّيطان-
অর্থাৎ “কানাকানি করা হচ্ছে শয়তানের কাজ।”

এ ব্যাপারে নীতিগত পথনির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছেঃ
اذا تنجيتم فلا تتناجوا بالاثم والعدوان ومعصيت الرسول وتناجوا بالبرِّ والتَّقواى -
“যখন তোমরা নিজেদের মধ্যে কানাকানি করো তখন গোনাহ্ ও সীমালংঘনের ব্যাপারে এবং রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করার জন্যে কানাকানি করো না বরং নেকী ও তাকওয়ার ব্যাপারে কানাকানি করো।”

অর্থাৎ দুই বা কতিপয় ব্যক্তি যদি সদুদ্দেশ্য এবং তাকওয়ার সীমানার মধ্যে অবস্থান করে কানে কানে আলাপ করে তাহলে তা কানাকানির আওতাভুক্ত হয় না। তবে দলের দৃষ্টি এড়িয়ে গোপনে গোপনে কানে অসৎ কাজের পরিকল্পনা তৈরীর উদ্দেশ্যে বা অন্য কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্যে অথবা রাসূলুল্লাহর (সঃ) নির্দেশ ও বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করার সংকল্প নিয়ে গোপনে আলাপ-আলোচনা করা অবশ্য এর আওতাভুক্ত। ঈমানদারী ও আন্তরিকতা সহকারে যে মতবিরোধ করা হয় তা কোনদিন কানাকানিকে উদ্বুদ্ধ করে না। এ প্রাসঙ্গিক যাবতীয় আলোচনা প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিৎ এবং দলের সামনে হওয়া উচিৎ। যুক্তি সহকারে প্রতিপক্ষের স্বীকৃতি আদায়ের জন্যে হওয়া উচিৎ। আলোচনার পর মতবিরোধ থেকে গেলেও তা কখনো বিপর্যয়ের কারণ হয় না। দল থেকে সরে গিয়ে একমাত্র সে সকল মতবিরোধের ক্ষেত্রে গোপন কানাকানির প্রয়োজন দেখা দেয় যেগুলো স্বার্থপরতাপূর্ণ না হলেও কমপে স্বার্থপরতার মিশ্রণযুক্ত। এ ধরণের কানাকানির ফল কখনো শুভ হয় না। এগুলো শুরুতে যতই নিষ্কলংক হোক না কেন ধীরে ধীরে সমগ্র দল এর ফলে কু-ধারণা, দলাদলি ও হানাহানির শিকারে পরিণত হয়্। আপোষে গোপন আলোচনা চালিয়ে যখন কতিপয় ব্যক্তি একটি গ্রুপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তখন তাদের দেখাদেখি এভাবে গোপন সলাপরামর্শ করে গ্রুপ বানানোর প্রবণতা দেখা দেয়। এর ফলে এমন বিকৃতির সূচনা হয়, যা সর্বোত্তম সৎ ব্যক্তির দলকেও ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেয় এবং তাদেরকে পরস্পরের মধ্যে দলাদলিতে লিপ্ত করে। কারো সর্বশেষ পর্যায়ে এ বিকৃতির কার্যতঃ আত্মপ্রকাশ ঘটে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ ব্যাপারে মুসলমানদেরকে বারবার সতর্ক করেছেন, ভীতি প্রদান করেছেন এবং এ থেকে বাঁচার জন্যে জোর প্রচেষ্টা চালাবার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ

“আরবে যারা নামাজ শুরু করেছে তারা পুনর্বার শয়তানের ইবাদত শুরু করবে, এ ব্যাপারে শয়তান নিরাশ হয়ে পড়েছে। তাই এখন তাদের মধ্যে বিকৃতি সৃষ্টি করার ও তাদের পরস্পরকে সংঘর্ষশীল করার সাথে তার সমস্ত আশা-আকাঙ্খা জড়িত।”

এমনকি তিনি এ কথাও বলেছেন যে, “আমার পর তোমরা কাফের হয়ে যেয়ো না এবং পরস্পরকে হত্যা করার কাজে লিপ্ত হয়ো না। এ ধরণের পরিস্থিতি দেখা দিলে ঈমানদারদের যে পদ্ধতি অবলম্বন করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছেঃ
প্রথমতঃ তারা নিজেরা ফিতনায় অংশ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ

“তারা সৌভাগ্যবান যারা ফিতনা থেকে দূরে থাকে এবং যে ব্যক্তি যতো বেশী দূরে থাকে সে ততো বেশী ভালো।” এ অবস্থায় নিদ্রিত ব্যক্তি জাগ্রত ব্যক্তির চাইতে ভালো এবং জাগ্রত ব্যক্তি দন্ডায়মান ব্যক্তির চাইতে ভালো। আর দন্ডায়মান ব্যক্তি চলন্ত ব্যক্তির চাইতে ভালো। অন্যদিকে যদি তারা ফিতনায় অংশ গ্রহণ করে তাহলে একটি দল হিসেবে নয় বরং সাচ্চা দীলে সংশোধন প্রয়াসী হিসেবে অংশ গ্রহণ করতে পারে। এ সম্পর্কে সূরা হুজরাতের প্রথম রুকুতে দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

স্বার্থবাদীতার এ তাৎপর্য এবং তার প্রকাশ ও বিকাশের এ সকল পর্যায় সম্পর্কিত শরীয়তের এ বিধান সমূহ হৃদয়ঙ্গম করা তাদের জন্যে একান্ত জরুরী যারা সৎবৃত্তি ও সততার বিকাশ সাধনের জন্যে একত্রিত হয়। তাদের নিজেদেরকে আত্মপ্রীতি ও আত্মম্ভরিতার রোগ থেকে বাঁচাবার জন্যে পূর্ণ প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং এ রোগে আক্রান্ত হবার পর যে সকল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তি দেখা দেয় সেগুলো উপলব্ধি করতে হবে। তাদের দলকেও দলগতভাবে সজাগ থাকতে হবে যেন তার মধ্যে স্বার্থবাদীতার জীবাণু অনুপ্রবেশ করে বংশ বিস্তার করার সুযোগ না পায়। নিজেদের পরিসীমার মধ্যে তাদের এমন কোন ব্যক্তিকে উৎসাহিত না করা উচিৎ যে নিজের সমালোচনা শুনে ক্ষিপ্ত হয় এবং নিজের ভুল স্বীকার না করে দাম্ভিকতা দেখায়। যার কথা থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার গন্ধ আসে অথবা যার কর্মপদ্ধতি প্রকাশ করে যে, সে কারো সাথে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ পোষন করে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে দাবিয়ে দিতে হবে। যারা অন্যের ব্যাপারে কু-ধারণা পোষন করে অথবা অন্যের অবস্থা সম্পর্কে গোয়েন্দাগীরি করে তার দোষ তালাশ করার চেষ্টা করে তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। তাদের নিজেদের সমাজের মধ্যে গীবত ও চোগলখোরীর পথ রুদ্ধ করা উচিৎ এবং ফিতনা যেখানেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সেখানেই সঙ্গে সঙ্গে উপরে বর্ণিত মতে সরল-সোজা ইসলামী নীতি ও পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিৎ। তাদের বিশেষ করে কানাকানির বিপদ থেকে সতর্ক থাকা উচিৎ। কারণ এর ফলে দলের মধ্যে বিভেদের সূচনা হয়। কোন ব্যক্তি কোন বিরোধমূলক বিষয়ে গোপন কানাকানি করে কোন আন্তরিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিজের সমর্থক বানাবার চেষ্টা করবে, এতে তার কখনো সম্মত হওয়া উচিৎ নয়। কিছু লোক দলের মধ্যে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করছে এমন কোন আভাস যখনই পাওয়া যাবে তখনই দলকে তাদের সংশোধন বা মুলোচ্ছেদে ব্রতী হতে হবে। এ সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যদি দলের মধ্যে কোন প্রকার গ্রুপিং এর ফিতনা দেখা দিয়েই থাকে তাহলে আন্তরিকতাসম্পন্ন লোকেরাও এক কোণে বসে গোপন কানাকানি শুরু করে দেবে এবং একটা গ্র“প বানাবার জন্যে ষড়যন্ত্র চালাবে। দলের মধ্যে এ ধরণের কাজের অনুমতি কোন ক্রমেই দেয়া যেতে পারে না। বরং তাদের নিজেদের এ ফিতনা থেকে দূরে থেকে এর গতি রোধের জন্যে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা চালানো উচিৎ এবং তাতে ব্যর্থ হলে দলের সম্মুখে প্রকাশ্যে বিষয়টি উপস্থাপিত করা উচিত। যে দলে আন্তরিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সংখ্যাধিক্য হবে সে দল এ ধরণের ফিতনা সম্পর্কে অবগত হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রতিরোধ করবে আর যে দলে ফিতনা বা নিশ্চিত নিরুদ্বেগ লোকদের সংখ্যাধিক্য হবে সে ফিতনায় শিকার হয়ে পর্যুদস্ত হবে।

মেজাজের ভারসাম্যহীনতাঃ


দ্বিতীয় পর্যায়ের অনিষ্টকারিতাগুলোকে এক কথায় মেজাজের ভারসাম্যহীনতা বলা যায়। আপাতদৃষ্টিতে স্বার্থবাদীতার মোকাবেলায় এটিকে একটি সামান্য দুর্বলতা বলে মনে হয়। কারণ এর মধ্যে কোন প্রকার অসৎ সংকল্প, অসাধূ প্রেরণা ও অপবিত্র ইচ্ছার রেশ দেখা যায় না। কিন্তু অনিষ্টকারিতা সৃষ্টির যোগ্যতার দিক দিয়ে বিচার করলে স্বার্থবাদীতার পরই এর স্থান দেখা যায় এবং অনেক সময় এর প্রভাব ও ফলাফলের অনিষ্টকারী ক্ষমতা স্বার্থবাদীতার সমপর্যায়ে এসে পৌঁছে।

চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্ম ও প্রচেষ্টার ভারসাম্যহীনতার ফলশ্রুতি। জীবনের বহু সত্যের সাথে হয় এর প্রতক্ষ্য সংঘর্ষ। মানুষের জীবন অসংখ্য বিপরীতধর্মী উপাদানের আপোষ ও বহু বিচিত্র কার্যকারণের সামষ্টিক কর্মের সমন্বয়ে গঠিত। যে দুনিয়ায় মানুষ বাস করে তার অবস্থাও সমপর্যায়ভুক্ত। মানুষকে এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং মানুষের একত্রিত হবার পর যে সমস্ত কাঠামোর উদ্ভব হয় তার অবস্থাও এমনটিই হয়ে থাকে। এ দুনিয়ায় কাজ করার জন্যে চিন্তা দৃষ্টিভঙ্গির এমন ভারসাম্য এবং কর্ম ও প্রচেষ্টার এমন সমতা প্রয়োজন, যা বিশ্ব প্রকৃতির সমতা ও ভারসাম্যের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যশীল। অবস্থার প্রতিটি গতিধারার প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে, কাজের প্রত্যেকটি দিক অবলোকন করতে হবে, জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় প্রত্যেক বিভাগকে তার অধিকার দিতে হবে, প্রকৃতির প্রত্যেকটি দাবীর প্রতি নজর রাখতে হবে এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ মনের ভারসাম্য অর্জিত না হলেও বলাবাহুল্য, এখানে সাফল্যের জন্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য অপরিহার্য। তা যতোটা নির্ধারিত মানের নিকটবর্তী হবে ততোটা লাভজনক হবে এবং তা থেকে যতোটা দূরবর্তী হবে ঠিক ততোটাই জীবন সত্যের সাথে সংঘর্ষশীল হয়ে অনিষ্টের কারণ হয়ে পড়বে। দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, তার সবগুলো কারণ হচ্ছে এই যে, ভারসাম্যহীন চিন্তার অধিকারীরা মানুষের সমস্যাবলী দেখা ও উপলব্ধি করার ব্যাপারে একচোখা নীতি অবলম্বন করছে। ওগুলো সমাধানের জন্যে ভারসাম্যহীন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এবং তা কার্যকরী করার জন্যে অসম পদ্ধতি অবলম্বন করছে। এই হচ্ছে বিকৃতির আসল কারণ। কাজেই চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভারসাম্য এবং কর্মপদ্ধতির সমতা গড়ার মাধ্যমেই গড়ার কাজ সম্ভবপর।

ইসলাম আমাদেরকে সমাজ গঠণ ও সংশোধনের যে পরিকল্পনা দিয়েছে তা কার্যকর করার জন্যে এ গুণটির বিশেষ প্রয়োজন। কারণ এ পরিকল্পনাটি আগাগোড়া ভারসাম্য ও সমতারই একটি বাস্তব নমুনা। একে পুঁথির পাতা থেকে বাস্তব জগতে স্থানান্তর করার জন্যে বিশেষ করে সেই সব কর্মী উপযোগী হতে পারে যাদের দৃষ্টি ইসলামের গঠন পরিকল্পনার ন্যায় ভারসাম্যপূর্ণ এবং যাদের স্বভাব প্রকৃতি ইসলামের সংশোধন প্রকৃতির ন্যায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রান্তিকতার রোগে আক্রান্ত চরমপন্থী লোকেরা এ কাজকে বিকৃত করতে পারে, যথাযথরুপে সম্পাদন করতে পারে না।

ভারসাম্যহীনতা সাধারণতঃ ব্যর্থতারুপে আত্মপ্রকাশ করে। সংশোধন ও পরিবর্তনের যে কোন পরিকল্পনা কার্যকরী করার জন্যে কেবলমাত্র নিজে তার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যথেষ্ট নয় বরং এই সঙ্গে সমাজের সাধারণ মানুষকে সত্যতা এর যথার্থতা, উপকারীতা ও কার্যকরী হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত করতে হবে এবং নিজের আন্দোলনকে এমন পর্যায়ে আনতে হবে ও এমন পদ্ধতিতে চালাতে হবে যার ফলে মানুষের আশা-আকাঙ্খা আগ্রহ তার সাথে সংযুক্ত হয়ে যেতে থাকবে। যে আন্দোলন চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতিতে ভারসাম্যের অধিকারী একমাত্র সে আন্দোলনই এ সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারে। একটি চরমপন্থী পরিকল্পনাকে কার্যকরী করার জন্যে চরম পন্থা অবলম্বন করা হয়, তা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট ও আশান্বিত করার পরিবর্তে সংশায়িত করে। তার এ দুর্বলতা তার প্রচার ও ক্ষমতা ও অনুপ্রবেশ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তার পরিচালনার জন্যে কিছু চরমপন্থী লোক একত্রিত হয়ে গেলেও সমগ্র সমাজকে তাদের নিজেদের মতো চরমপন্থী বানিয়ে নেয়া এবং সারা দুনিয়ার চোখে ধুলো দেয়া সহজ নয়। যে দল সমাজ গঠন ও সংশোধনের কোন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয় এ বস্তুটি তার জন্যে বিষবৎ।

একগুয়েমীঃ


মেজাজের ভারসাম্যহীনতার প্রধানতম প্রকাশ হচ্ছে মানুষের এগুয়েমী। এ রোগে আক্রান্ত হবার পর মানুষ সাধারণতঃ প্রত্যেক বস্তুর একদিক দেখে, অপরদিক দেখে না। প্রত্যেক বিষয়ের এক দিককে গুরুত্ব দেয়, অন্যদিককে গুরুত্ব দেয় না। যেদিকে তার মন একবার পাড়ি জমায়, সেই এক দিকেই অগ্রসর হতে থাকে, অন্য দিকে নজর দিতে প্রস্তুত হয় না। বিভিন্ন বিষয় উপলব্ধি করার ব্যাপারে সে ক্রমাগত ভারসাম্যহীনতার শিকার হতে থাকে। মত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সে একদিকে ঝুঁকতে থাকে। যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাকেই আঁকড়ে ধরে বসে থাকে। একই পর্যায়ের এমনকি তার চাইতেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তার নিকট গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। যে বস্তুকে খারাপ মনে করে তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। কিন্তু একই পর্যায়ে অন্যান্য খারাপ বস্তু বরং তার চাইতেও বেশী খারাপ বস্তুর বিরুদ্ধে ভুলেও কোন কথা বলে না। নীতিবাদীতা অবলম্বন করার পর সে এ ব্যাপারে স্থবিরত্বের প্রত্যন্ত সীমায় পৌঁছে যায়, কাজেই বাস্তব চাহিদাগুলোর কোন পরোয়াই করে না। অন্যদিকে কার্যেক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর নীতিহীন হয়ে পড়ে এবং সাফল্যকে আসল উদ্দেশ্য বানিয়ে ন্যায়-অন্যায় সব রকম উপায় অবলম্বন করতে উদ্যত হয়।

একদেশদর্শীতাঃ

এ অবস্থা এখানে পৌঁছে থেমে না গেলে তা সামনে অগ্রসর হয়ে চরম একদেশদর্শীতার রূপ অবলম্বন করে। অতঃপর মানুষ নিজের মতের উপর প্রয়োজনের অধিক জোর দিতে থাকে। মতবিরোধের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করে। অন্যের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে ন্যায়ের দৃষ্টিতে দেখে না এবং বুঝতে চেষ্টা করে না। বরং প্রত্যেকটি বিরোধী মতের নিকৃষ্টতম অর্থ করে তা হেয় প্রতিপন্ন করতে ও দূরে নিক্ষেপ করতে চায়। এর ফলে দিনের পর দিন সে অন্যের জন্যে এবং অন্যেরা তার জন্যে অসহনীয় হয়ে যেতে থাকে।

সামষ্টিক ভারসাম্যহীনতাঃ


এক ব্যক্তি এ নীতি অবলম্বন করলে বড়জোর সে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং যে উদ্দেশ্যে সে দলের সাথে সংযুক্ত হয়েছিল তা সম্পাদন করা থেকে বঞ্চিত হবে, এর ফলে কোন সামষ্টিক ক্ষতি হবে না। কিন্তু কোন সমাজ সংস্থায় অনেকগুলো ভারসাম্যহীন মন ও মেজাজ একত্রিত হয়ে গেলে প্রত্যেক ধরণের ভারসাম্যহীনতা এক একটি গ্রুপের জন্ম দেয়। এক চরম পন্থার জবাবে আর এক চরমপন্থা জন্ম নেয়। মতবিরোধ কঠোর থেকে কঠোরতর হতে থাকে। সংস্থায় ভাঙ্গন ধরে। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যে কাজ সম্পাদনের জন্যে সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে কিছু লোক একত্রিত হয়েছিল। এই দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের আবর্তে পড়ে তা বিনষ্ট হয়ে যায়।

সত্যি বলতে কি, যে কাজ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় করা যায় না বরং যার ধরণই হয় সামষ্টিক তা সম্পাদন করার জন্যে অনেক লোককে এক সাথে কাজ করার প্রয়োজন হয়। প্রত্যেকের নিজের কথা বুঝাতে ও অন্যের কথা বুঝতে হয়। মেজাজের পার্থক্য, যোগ্যতার পার্থক্য, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য সত্ত্বেও তাদের পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্যের সৃষ্টি করতে হয়, যার অবর্তমানে কোন প্রকার সহযোগিতা সম্ভবপর হয় না। এ সামঞ্জস্যের জন্যে দীনতা অপরিহার্য। আর এ দীনতা কেবলমাত্র ভারসাম্যপূর্ণ মেজাজের অধিকারী লোকদের মধ্যে থাকতে পারে, যাদের চিন্তা ও মেজাজ উভয়ের মধ্যে সমতা রয়েছে। ভারসাম্যহীন লোকেরা একত্রিত হয়ে গেলেও তাদের ঐক্য বেশীক্ষণ টিকে না। তাদের দল ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং এক এক ধরণের ভারসাম্যহীনতার রোগী আলাদা আলাদা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে আবার ভাঙ্গন দেখা দেয়। এমনকি শেষ পর্যন্ত মুক্তাদি ছাড়া কেবল ইমামদেরকেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

যারা ইসলামের জন্যে কাজ করেন এবং ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে জীবন ব্যবস্থার সংশোধন ও পূর্ণগঠনের প্রেরণা ও ইচ্ছা যাদেরকে একত্রিত করে তাদের আত্মপর্যালোচনা করে এই ভারসাম্যহীনতা উদ্ভুত যাবতীয় সমস্যা থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে হবে এবং তাদের দলের সীমানার মধ্যে যাতে করে এ রোগ মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠতে পারে এজন্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে চরমপন্থা অবলম্বনের ঘোর বিরোধী কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশাবলী তাদের সামনে থাকা উচিৎ। কুরআন দ্বীনের ব্যাপারে অধিক বাড়াবাড়ি করাকে আহলে কিতাবদের মৌলিক ভ্রান্তি গণ্য করেছে (ইয়া আহলাল কিতাবী লা তাগলু ফী দ্বীনিকুম)। এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের অনুসারীদেরকে এ থেকে রেহাই দেয়ার জন্যে নিন্মেক্ত ভাষায় তাকীদ করেছেনঃ- اِيَّاكم والغلوَّ فانَّما هلك من كان قبلكم بالغلوِّ فى الدين-
“সাবধান! তোমরা একদেশদর্শীতা ও চরম পন্থা অবলম্বন করো না। কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীরা চরমপন্থা অবলম্বন করেই ধ্বংস হয়েছে।”
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এক বক্তৃতায় তিনবার বলেনঃ হালাকাল মুতানাত্তিয়ুন- অর্থাৎ, কঠোরতা অবলম্বনকারীরা ও বাড়াবাড়ির পথ আশ্রয়কারীরা ধ্বংস হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দাওয়াতের বৈশিষ্ট বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেনঃ “বুয়িসতু বিল হানীফিয়্যাতিস সামাহাহ্” - অর্থাৎ তিনি পূর্ববর্তী উম্মতদের প্রান্তিকতার মধ্যে এমন ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা এনেছেন যার মধ্যে ব্যাপকতা ও জীবন ধারার প্রত্যেকটি দিকের প্রতি নজর দেয়া হয়েছে। এ দাওয়াত দানকারীদের যে পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে এর প্রথম আহবায়ক তা নিন্মোক্তভাবে শিখিয়েছেনঃ- يسِّروا ولا تعسِّروا وبشِّروا ولا تنفروا-
“সহজ করো, কঠিন করো না, সুসংবাদ দাও, ঘৃণা সৃষ্টি করো না।”

انَّما بعثت ميسِّرين ولم تبعثوا معسِّرين -
“তোমাকে সহজ করার জন্যে পাঠনো হয়েছে, কঠিন করার জন্যে নয়।”

ما خيِّر رسول الله صلى الله عليه وسلم بين امرين قطٌّ الا اخذ اَيْسرَهما مالم يكن اثماً -
“কখনো এমন হয়নি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে দু’টি বিষয়ের মধ্যে একটি অবলম্বন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং তিনি তার মধ্য থেকে সবচাইতে সহজটাকে গ্রহণ করেননি, তবে যদি তা গোনাহের নামান্তর না হয়ে থাকে।” (বুখারী ও মুসলিম)

ان الله رفيق يحب الرفق فى الامر كلِّه –
“আল্লাহ কোমল ব্যবহার করেন, তাই তিনি সকল ব্যাপারে কোমল ব্যবহার পছন্দ করেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
من يحرم الرفق يحرم الخير كلِّه -
“যে ব্যক্তি কোমল ব্যবহার থেকে বঞ্চিত সে কল্যাণ থেকেও সম্পূর্ণরুপে বঞ্চিত ।” (মুসলিম)

ان الله رفيق يحب الرفيق فى ويعطى على الرفق مالا يعطى على العنف ومالا يعطى على ما سواه -
“আল্লাহ কোমল ব্যবহার করেন এবং তিনি কোমল ব্যবহারকারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন। তিনি কোমলতার ফলে এমন কিছু দান করেন যা কঠোরতা ও অন্য কোন ব্যবহারের ফলে দান করেন না।” (মুসলিম)

এ ব্যাপক নির্দেশাবলী সামনে রেখে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লিপ্ত ব্যক্তিরা যদি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নিজেদের মন মাফিক বিষয়গুলো বাছাই করার পরিবর্তে নিজেদের স্বভাব-চরিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি ঐ অনুযায়ী ঢালাই করার অভ্যাস করেন তাহলে তাদের মধ্যে দুনিয়ার অবস্থা ও সমস্যাবলীকে কুরআন ও সুন্নাহ প্রদত্ত নীতিতে সমাধান করার জন্যে যে ভারসাম্য ও সমতাপূর্ণ চারিত্রিক গুণাবলীর প্রয়োজন তা স্বতঃস্ফুর্তভাবে সৃষ্টি হয়ে যাবে।

সংকীর্ণমনতাঃ


ভারসাম্যহীন মেজাজের সাথে সামঞ্জস্যশীল আর একটি দুর্বলতাও মানুষের মধ্যে দেখা যায়। একে সংকীর্ণমনতা বলা যায়। কুরআনে একে ‘শুহহে নাফ্স’ বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে কুরআন বলে, “যে ব্যক্তি এর হাত থেকে রেহাই পেয়েছে সে-ই সাফল্য লাভ করেছে” (ওয়া মাই ইউকা শুহহা নাফসিহি ফাউলা-ইকা হুমুল মুফলিহুন) এবং কুরআন একে তাকওয়া ও ইহসানের পরিবর্তে একটি ভ্রান্ত ঝোঁক প্রবণতা রূপে গণ্য করেছে (ওয়া উহ্দিরাতিল আনফুসুশ্ শূহ্হা ওয়া ইন তুহসিনু ওয়া তাত্তাকু ফাইন্নাল্লহা কাানা বিমা তা’মালুনা খবীরা)। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের জীবন পরিবেশে অন্যের জন্যে খুব কমই স্থান রাখতে চান। সে নিজে যতই বিস্তৃত হোক না কেন নিজের স্থান থেকে তার নিকট তা অত্যন্ত সংকীর্ণই দৃষ্টিগোচর হয়। আর অন্য লোক তার জন্যে নিজেকে যতই সংকুচিত করুক না কেন সে অনুভব করে যেন তারা অনেক ছড়িয়ে আছে। নিজের জন্যে সে সব রকমের সুযোগ-সুবিধা চায় কিন্তু অন্যের জন্যে কোন প্রকার সুযোগ-সুবিধা দিতে চায় না। নিজের সৎকাজগুলো নিছক ঘটনাক্রমে সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করে। নিজের দোষ তার দৃষ্টিতে ক্ষমাযোগ্য হয়ে থাকে কিন্তু অন্যের কোন দোষই সে ক্ষমা করতে পারে না। নিজের অসুবিধাগুলোকে সে অসুবিধা মনে করে কিন্তু অন্যের অসুবিধাগুলো তার দৃষ্টিতে নিছক বাহানাবাজী মনে হয়। নিজের দুর্বলতার কারণে সে যে সুবিধা ভোগ চায় অন্যকে সে তা দিতে প্রস্তুত হয় না। অন্যের অক্ষমতার পরোয়া না করে সে তাদের নিকট চরম দাবী পেশ করে কিন্তু নিজের অমতার ক্ষেত্রে এসব দাবী পূরণ করতে সে রাজী থাকে না। নিজের পছন্দ-অপছন্দের মাফকাঠি ও রুচি সে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করে কিন্তু অন্যের রুচি ও পছন্দ-অপছন্দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্যে সে একটুও চেষ্টা করে না। এ অসৎ গুণটি বাড়তে বাড়তে চোগলখোরী ও অন্যের দোষখুঁজে বেড়ানোর এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে সে অন্যের সামান্য দোষের সমালোচনা করে কিন্তু নিজের দোষের সমালোচনায় লাফিয়ে ওঠে। এ সংকীর্ণমনতার আর একরূপ হচ্ছে দ্রুত ক্রোধান্বিত হওয়া, অহংকার করা ও পরস্পরকে বরদাশ্ত না করা। সমাজ জীবনে এহেন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ঐ ব্যক্তির সাথে চলাফেরাকারী প্রত্যেকটি লোকের জন্যে বিপদ স্বরূপ।

কোন দলের মধ্যে এ রোগের অনুপ্রবেশ মূলতঃ একটি বিপদের আলামত। দলবদ্ধ প্রচেষ্টা-সাধনা, পারস্পারিক ভালোবাসা ও সহযোগিতা দাবী করে। এ ছাড়া চার ব্যক্তিও একত্রে মিলেমিশে কাজ করতে পারে না। কিন্তু সংকীর্ণমনতা ভালোবাসা ও সহযোগিতা সৃষ্টির সম্ভাবনা হ্রাস করে এবং অনেক সময় ওগুলোকে খতম করে দেয়। এর অনিবার্য ফলশ্রুতি হয় সম্পর্কের তিক্ততা ও পারস্পারিক ঘৃণা। এটি মানুষের মন ভেঙ্গে দেয় এবং সহযোগিদেরকে পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত করে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোন মহান উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে তো দূরের কথা সাধারণ সমাজ জীবনের জন্যে উপযোগী হতে পারে না। বিশেষ করে এ গুণটি ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উপযোগী গুণাবলীর সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। যেখানে সংকীর্ণমনতার পরিবর্তে উদারতা, কৃপণতার পরিবর্তে দানশীলতা, শাস্তির পরিবর্তে ক্ষমা এবং কঠোরতার পরিবর্তে কোমলতার প্রয়োজন। এজন্যে ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু লোকের প্রয়োজন। এ দায়িত্ব একমাত্র তারাই পালন করতে পারে যারা উদার হৃদয়ের অধিকারী, যারা নিজেদের ব্যাপারে কঠোর ও অন্যের ব্যাপারে কোমল, যারা নিজেদের জন্যে সর্বনিন্ম সুবিধা চায় এবং অন্যের জন্যে চায় সর্বোচ্চ সুবিধা, যারা নিজেদের দোষ দেখে কিন্দু অন্যের গুণ দেখে, যারা কষ্ট দেবার পরিবর্তে কষ্ট বরদাশ্ত করতে অভ্যস্ত বেশী এবং চলন্ত ব্যক্তিদেরকে ঠেলে ফেলে দেবার পরিবর্তে যারা পড়ে যাচ্ছে তাদের হাত ধরে টেনে তোলার ক্ষমতা রাখে। এ ধরণের লোকদের সমন্বয়ে গঠিত দল কেবল নিজেদের বিভিন্ন অংশকে মজবুতভাবে সংযুক্ত রাখবে না বরং তার চারপাশের সমাজের বিক্ষিপ্ত অংশকেও বিন্যস্ত করতে ও নিজের সাথে সংযুক্ত করতে থাকবে। বিপরীতপে সংকীর্ণমনা লোকদের দল নিজেরাতো বিক্ষিপ্ত হবেই উপরন্তু বাইরের যে সমস্ত লোকও তাদের সংস্পর্শে আসবে তাদের মনে ঘৃণার সঞ্চার করে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।

দুর্বল সংকল্পঃ


এ রোগটি মানুষের মধ্যে খুব বেশী দেখা যায়। এর তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, কোন আন্দোলনের ডাকে মানুষ অন্তর ধেকে সাড়া দেয়, প্রথম প্রথম বেশ কিছুটা জোশও দেখায় কিন্তু সময় অতিবাহিত হবার সাথে সাথে তার জোশে ভাটা পড়ে। এমনকি যে উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে সে অগ্রসর হয়েছিল তার সাথে তার কোন সত্যিকার সংযোগ থাকে না। এবং গভীর আগ্রহ সহকারে যে দলে শামিল হয়েছিল তার সাথেও কোন বাস্তব সম্পর্ক থাকে না। যে সমস্ত যুক্তির ভিত্তিতে সে এ আন্দোলনকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিল সেগুলোর উপর সে তখনো নিশ্চিত থাকে। সে মুখে তখনো তাকে সত্য ঘোষনা করতে থাকে এবং তার মন স্যা দিতে থাকে যে, কাজটি করতে হবে এবং অবশ্যই করা উচিৎ। কিন্তু তার আবেগ ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে ও কর্মশক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ অসদুদ্দেশ্য স্থান পায় না। উদ্দেশ্য থেকে সে সরেও যায় না, আদর্শও পরিবর্তন করে না। এজন্যে সে দল ত্যাগ করার চিন্তাও করে না কিন্তু প্রাথমিক আবেগ ও জোশ প্রবণতা ঠান্ডা হয়ে যাবার পর এই সংকল্পের দুর্বলতাই বিভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে।

সংকল্পের দুর্বলতার কারণে মানুষ প্রথম দিকে কাজে ফাঁকি দিতে থাকে। দায়িত্ব গ্রহণ করতে ইতস্ততঃ করে। উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে পিছপা হয়। যে কাজকে সে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য গণ্য করে এগিয়ে এসেছিল দুনিয়ার প্রত্যেকটি কাজকে তার ওপর অগ্রাধিকার দিতে থাকে। তার সময়, শ্রম ও সম্পদের মধ্যে তার ঐ তথাকথিত জীবনোদ্দেশ্যের অংশ হ্রাস পেতে থাকে এবং যে দলকে সত্য মনে করে তার সাথে সংযুক্ত হয়েছিল তার সাথেও সে নিছক যান্ত্রিক ও নিয়মানুগ সম্পর্ক কায়েম রাখে। ঐ দলের ভালমন্দের সাথে তার কোন সম্পর্ক থাকে না এবং তার বিভিন্ন বিষয়ে কোন প্রকার আগ্রহ প্রকাশ করে না।

যৌবনের পরে বার্ধক্য আসার ন্যায় এ অবস্থা ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হয়। নিজের এ অবস্থা সম্পর্কে মানুষ নিজে সচেতন না হলে এবং অন্য কেউ তাকে সচেতন না করলে কোন সময়ও সে একথা চিন্তা করার প্রয়োজন অনুভব করে না যে, যে বস্তুকে সে নিজের জীবনোদ্দেশ্য গণ্য করে তার জন্যে নিজের ধন-প্রাণ উৎসর্গ করার সংকল্প করেছিল তার সাথে এখন সে কি ব্যবহার করছে। এভাবে নিছক গাফলতি ও অজ্ঞানতার কারণে মানুষের আগ্রহ ও সম্পর্ক নিস্প্রাণ হয়ে পড়ে, এমনকি এভাবে অবশেষে একদিন নিজের অজান্তে তার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে।

দলীয় জীবনে যদি প্রথমেই মানুষের মধ্যে এ অবস্থার প্রকাশ সম্পর্কে সতর্ক না হওয়া যায় এবং এর বিকাশের পথরোধ করার চিন্তা না করা হয় তাহলে যাদের সংকল্পের মধ্যে সবেমাত্র সামান্য দুর্বলতার অনুপ্রবেশ ঘটছে তারা ঐ দুর্বলচিত্ত ব্যক্তির ছোঁয়াচ পেয়ে যাবে এবং এভাবে ভালো কর্মতৎপর ব্যক্তিও অন্যকে নিষ্ক্রিয় দেখে নিজেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। তাদের একজনও এ কথা চিন্তা করবে না যে, সে অন্যের জন্যে নয়, বরং নিজের জীবনোদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে এসেছিল এবং অন্যরা তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হলেও সে কেন তা থেকে বিচ্যুত হবে? তাদেরকে এমন একদল লোকের সাথে তুলনা করা যেতে পারে যারা অন্য সাথীদের দেখাদেখি জান্নাতের পথ পরিহার করে। অর্থাৎ জান্নাত যেন তার নিজের মঞ্জিলে মকসুদ ছিল না। অথবা অন্য সাথীদের জান্নাতে যাবার শর্তেই যেন সে জান্নাতে যেতে চাচ্ছিল। আর সম্ভবতঃ অন্য সাথীদের জাহান্নামের দিকে যেতে দেখে সে তাদের সাথে জাহান্নামে যাবারও সংকল্প করবে। কারণ তার নিজের কোন উদ্দেশ্য নেই, অন্যের উদ্দেশ্য তার উদ্দেশ্য। এ ধরণের মানসিক অবস্থার মধ্যে যারা বিচরণ করে তারা হামেশা নিষ্ক্রিয় লোকদেরকে দৃষ্টান্ত স্বরুপ গ্রহণ করে। সক্রিয় লোকদের মধ্যে তারা অনুসরণযোগ্য কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পায় না।

তবুও সোজাসুজি কোন ব্যক্তির সংকল্পের দুর্বলতার কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া অনেক ভালো। কিন্তু মানুষ যখন একবার দুর্বলতার শিকারে পরিণত হয় তখন আরো বহু দুর্বলতাও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে থাকে এবং খুব কম লোকই একটি দুর্বলতার সাহায্যে অন্যান্য দুর্বলতাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পথ রোধ করার মতা রাখে। সাধারণতঃ মানুষ নিজেকে দুর্বল হিসেবে প্রকাশ করতে লজ্জা অনুভব করে। মানুষ তাকে দুর্বল মনে করবে এটা সে বরদাশ্ত করতে প্রস্তুত হয় না। সংকল্পের দুর্বলতা তাকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে, একথা সে সরাসরি স্বীকার করে না। একে ঢাকা দেবার জন্যে সে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে এবং তার প্রত্যেকটি পন্থাই একটি অন্যটির চাইতে নিকৃষ্টতম হয়।

যেমন, সে কাজ না করার জন্যে নানান টাল বাহানা করে এবং প্রতিদিন কোন না কোন ভুয়া ওজর দেখিয়ে সাথীদেরকে ধোকা দেয়ার চেষ্টা করে। সে বোঝাতে চায় যে, উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্ক ও সে ব্যাপারে আগ্রহের স্বল্পতা নিষ্ক্রিয়তার আসল কারণ নয় বরং তার পথে যথার্থই বহু বাঁধা-বিপত্তি রয়েছে। এভাবে যেন নিষ্ক্রিয়তাকে সাহায্য করার জন্যে মিথ্যাকে আহবান জানানো হলো। যে ব্যক্তি প্রথম দিকে কেবল উন্নতির উচ্চমার্গে পৌঁছানো পরিহার করেছিল এখান থেকেই তার নৈতিক পতন শুরু হলো।

এ বাহানা যখন পুরাতন হয়ে গিয়ে নিরর্থক প্রমাণিত হয় এবং এবার আসল দুর্বলতার রহস্য ভেদ হয়ে যাবার আশংকা দেখা দেয় তখন মানুষ এ কথা প্রকাশ করার চেষ্টা করে যে, সে আসলে নিজের দুর্বলতার কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েনি বরং দলের কিছু দোষ-ত্রুটি তাকে মানসিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হতে সাহায্য করেছে। অর্থাৎ সে নিজে অনেক কিছু করতে চাচ্ছিল কিন্তু সাথীদের বিকৃতি ও ভ্রান্তি তার মন ভেঙ্গে দিয়েছে। এভাবে পতনোম্মুখ ব্যক্তি যখন একটুও দাঁড়াতে পারে না তখন নীচে নেমে আসে এবং নিজের দুর্বলতা ঢাকবার জন্যে যে কাজ আঞ্জাম দিতে সে সক্ষম হয়নি তাকে নষ্ট করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়।

প্রথামবস্থায় এ মানসিক পাঘাতটি চাপা ও অস্পষ্ট থাকে। এ ব্যক্তির এ মানসিক রোগের কোন পাত্তাই পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র দোষের বিরুদ্ধে অস্পষ্ট-চাপা অভিযোগ উত্থিত হয়। কিন্তু এর কোন বিস্তারিত বিবরণ জানা যায় না। সাথীরা যদি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে আসল রোগটি অনুধাবন করে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, তাহলে এ পতোনোম্মুখ ব্যক্তিটির পতন সম্ভবতঃ রোধ হতে পারে এবং তাকে ওপরেও ওঠানো যেতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ নাদান বন্ধু অত্যাধিক জোশ ও বিষ্ময়ের কারণে ব্যাপারটি অনুসন্ধানে লিপ্ত হয় এবং তাকে বিস্তারিত বলতে বাধ্য করে। অতঃপর সে নিজের মানসিক রুষ্টতাকে যথার্থ প্রমাণ করার জন্যে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করে। বিভিন্ন ব্যক্তিগত দুর্বলতাগুলো বাছাই করে করে একত্রিত করে। জামায়াতের ব্যবস্থা ও তার কাজের মধ্যে খুঁত আবিষ্কার করে। এবং এ সবের একটি তালিকা তৈরী করে একত্রিত করে সামনে রেখে দেয়। সে বলতে চায় এসব গলদ দেখেই তার মন বিরূপ হয়ে ওঠেছে। অর্থাৎ তার যুক্তি হয় এই যে, তার মত মর্দে কামেল যে সকল প্রকার দূর্বলতামুক্ত ছিল, সে,কেমন করে এসব দুর্বল সাথী ও গলদে পরিপূর্ণ দলের সাথে চলতে পারে? এ যুক্তি গ্রহণ করার সময় শয়তান তাকে এ কথা ভুলিয়ে দেয় যে, এ কথা যদি সত্যি হতো তাহলে তার নিষ্ক্রিয় হবার পরিবর্তে আরো বেশী কর্মতৎপর হবার প্রয়োজন ছিল। যে কাজকে নিজের জীবনোদ্দেশ্য মনে করে তা সম্পাদন করার জন্যে সে অগ্রসর হয়েছিল, অন্যেরা নিজেদের গলদকারিতার কারণে যদি তাকে বিকৃত করার কাজে লিপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অত্যাধিক উৎসাহ-আবেগের সাথে ঐ কাজ সম্পাদন করার জন্যে আত্মনিয়োগ করা এবং নিজের গুণাবলীর সাহায্যে অন্যের দোষের ক্ষতিপূরণ করা উচিৎ ছিল। আপনার ঘরে আগুন লাগলে ঘরের অন্যান্য লোকেরা যদি তা নিভাবার ব্যাপারে গাফলতি করে তাহলে আপনি মন খারাপ করে বসে পড়বেন, না জ্বলন্ত ঘরকে রক্ষা করার জন্যে গাফেলদের চাইতে বেশী তৎপর হবেন?

এ বিষয়ের সব চাইতে দুঃখজনক দিক হচ্ছে এই যে, মানুষ নিজের ভুল ঢাকবার ও নিজেকে সত্যানুসারী প্রমাণ করার জন্যে নিজের আমলনামার সমস্ত হিসাব অন্যের আমলনামায় বসিয়ে দেয়। এ কাজ করার সময় সে ভুলে যায় যে, আমলনামায় এমন একটি হিসাবও রয়েছে যেখানে কোন প্রকার কৌশল ও প্রতারণার মাধ্যমে একটি আরও বাড়ানো যাবে না। সে অন্যের আমলনামায় অনেক দুর্বলতা দেখিয়ে দেয় অথচ সেগুলোর মধ্যে সে নিজে লিপ্ত থাকে। সে দলের কাজের মধ্যে এমন অনেক ত্রুটি নির্দেশ করে যেগুলো সৃষ্টি করার ব্যাপারে তার নিজের ভূমিকা অন্যের চাইতে কম নয়, বরং অনেক বেশী। সে নিজে যেসব কাজ করেছে সেগুলোরই বিরুদ্ধে সে একটি দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা তৈরী করে এবং যখন সে বলে, এসব দেখে শুনে তার মন ভেঙ্গে গেছে তখন তার পরিস্কার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, এসব অভিযোগ থেকে সে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।

মানুষের কোন দল দুর্বলতাশুন্য হয় না। মানুষের কোন কাজ ত্রুটিমুক্ত হয় না। মানুষের সমাজের সংশোধন ও পূনর্গঠনের জন্যে ফেরেশতার সমাবেশ হবে এবং পরিপূর্ণ মান অনুযায়ী সমস্ত কাজ অনুষ্ঠিত হবে, দুনিয়ায় কখনো এমনটি দেখা যায়নি এবং দেখা যেতেও পারে না। দুর্বলতার অনুসন্ধান করলে কোথায় তার অস্তিত্ব নেই বলে দাবী করা যেতে পারে? ত্রুটি খুঁজে বেড়ালে তা পাওয়া যাবে না এমন কোন জায়গাটি আছে? মানুষের কাজ দুর্বলতা ও ত্রুটি সহকারেই অনুষ্ঠিত হয় এবং পরিপূর্ণ মানে পৌঁছার যাবতীয় কোশেশ সত্ত্বেও কমপক্ষে এ দুনিয়ার এমন কোন অবস্থায় পৌঁছার তার কোন সম্ভবনাই নেই যেখানে মানুষ ও তার কাজ সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও নিষ্কলঙ্ক হয়ে যায়।

এ অবস্থায় দুর্বলতা ও দোষ-ত্রুটিগুলো দূর করা বা পূর্ণতার মানে পৌঁছাবার জন্যে আরো প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালাবার উদ্দেশ্যে যদি এগুলোকে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে এর চাইতে ভালো কাজ আর নেই। এ পথেই মানুষের কাজের মধ্যে যাবতীয় সংশোধন ও উন্নতি সম্ভবপর। এ ব্যাপারে গাফলতি দেখানো ধ্বংসের নামান্তর। কিন্তু যদি কাজ না করার ও মন খারাপ করে বসে যাবার জন্যে বাহানা বানাবার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত দুর্বলতা ও সামষ্টিক দোষ-ত্রুটি তালাশ করা হয়, তাহলে তাকে একটি নির্ভেজাল শয়তানী ওয়াস-ওয়াসা ও নফসের কূটকৌশল বলে অভিহিত করা যায়। টালবাহানাকারী ব্যক্তি যে কোন সম্ভবনাময় অবস্থায় এ বাহানার আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে ফেরেশ্তাদের কোন দল এসে মানুষের স্থলাভিষিক্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বাহানাবাজীর অবসান হবে না। যে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা ও দোষত্রুটি মুক্ত হবার প্রমাণ পেশ না করে এ বাহানার আশ্রয় গ্রহণ করে তার পক্ষে এটা মোটেই শোভা পায় না। এসব কার্যকলাপের দ্বারা কখনো কোন দুর্বলতা বা ত্রুটি দূর হয় না বরং দুর্বলতা ও ত্রুটি বাড়াবারই পথ প্রশস্ত করে। ফলে দেখা যায়, এ পথ অবলম্বন করে মানুষ তার চারপাশের অন্যান্য দুর্বলমনা লোকদের নিকট একটি খারাপ দৃষ্টান্ত পেশ করে। সে সবাইকে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে সমাজে উপহাসের পাত্র না হবার এবং নিজের মনকেও ধোঁকা দিয়ে নিশ্চিন্ত করার পথ দেখিয়ে দেয়। প্রত্যেকটি নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি তার পথ অনুসরন করে মানসিক পীড়ার ভান করতে শুরু করে এবং দুঃখ-কষ্টকে যথার্থ প্রমাণ করার জন্যে সাথীদের দুর্বলতা ও দলের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করে একটি ফিরিস্তি তৈরী করে। অতঃপর এখান থেকে অসৎ কাজের সিলসিলা শুরু হয়। একদিকে দলের মধ্যে দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান এবং দোষারোপ ও পাল্টা দোষারোপের ব্যাধি সংক্রামিত হয়। এটি তার নৈতিক চরিত্র বিনষ্ট করে। অন্যদিকে ভালো ভালো সক্রিয় ও আন্তরিকতা সম্পন্ন কর্মী, যাদের মধ্যে কোন দিন সংকল্পের দুর্বলতা ঠাঁই পায়নি, তারাও এ দুর্বলতা ও দোষ-ত্রুটির চর্চার ফলে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানসিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে যেতে থাকে। তারপর এ রোগের চিকিৎসার জন্যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বিরুপমনা ব্যক্তিদের একটি ব্লক গড়ে উঠতে থাকে। মানসিক রুষ্টতা একটি পদ্ধতি ও আন্দোলনের রূপ লাভ করে। রুষ্ট করা ও রুষ্টতার স্বপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করা দস্তুরমত একটি কাজে পরিণত হয়। যারা আসল উদ্দেশ্য সম্পাদনের ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে তারা এ কাজে বেশ সক্রিয়তা দেখাতে থাকে। এভাবে তাদের মৃত আগ্রহ জীবন্ত হয়ে ওঠে কিন্তু এমনভাবে এ জীবন লাভ হয় যে, মৃত্যুর চাইতে তার জীবন লাভ হয় অনেক বেশী শোকাবহ।

সমাজ সংশোধন ও পুর্নগঠনের জন্যে সংগ্রাম চালাবার উদ্দেশ্যে গঠিত প্রত্যেকটি দলের এ বিপদটি সম্পর্কে সাবধান থাকা দরকার। এ দলের কর্মী ও পরিচালকবৃন্দের সংকল্পের দুর্বলতা উদ্ভুত ক্ষতি, তার একক ও মিশ্রিত রূপের মধ্যকার পার্থক্য, তাদের প্রত্যেকের প্রভাব ও ফলাফল সম্পর্কে ভালভাবে অবগত হওয়া এবং তার প্রারম্ভিক চিহ্ন প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই তার সংশোধনের প্রয়োজন।

সংকল্পের দুর্বলতার মৌলিক রুপ হচ্ছে এই যে, দলের কোন ব্যক্তি তার কাজকে সত্য এবং তা সম্পাদনের দায়িত্ব বহনকারী দলকে যথার্থ মেনে নিয়ে কার্যতঃ নিষ্ক্রিয়তা ও অনীহা দেখাতে থাকে। এ অবস্থা সৃষ্টির সাথে সাথেই প্রতিকার মূলক কয়েকটি কাজ করা উচিৎ।

এক।। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা অনুসন্ধান করে জানতে হবে তার নিষ্ক্রিয়তার আসল কারণ কি এবং সংকল্পের আসল দুর্বলতাই তাকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে অথবা কোন সত্যিকার অসুবিধা তাকে নিষ্ক্রিয় হবার পথে রসদ যোগাচ্ছে? যদি সত্যিকার অসুবিধার সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে দলকে সে সম্পর্কে অবগত করা উচিৎ। এ অবস্থায় তা দূর করার জন্য সাথীকে সাহায্য করতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা তার নিষ্ক্রিয়তার ভুল অর্থ গ্রহণ করবে না এবং তা অন্যের জন্য একটি দৃষ্টান্তরুপেও প্রতিভাত হবে না। আর যদি সংকল্পের দুর্বলতাই আসল কারণ রূপে প্রতিভাত হয়, তাহলে আজে-বাজে পথে অগ্রসর না হয়ে যারা সত্যিকার অসুবিধার কারণে কর্মতৎপর হতে পারছে না তাদের থেকে এহেন ব্যক্তির বিষয়টি বুদ্ধিমত্তার সাথে দলের সম্মুখে তুলে ধরতে হবে।

দুই।। সংকল্পের দুর্বলতার কারণে যে ব্যক্তি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে তার অবস্থা যখনই দলের সম্মুখে উপস্থিত হয় তখনই আলোচনা ও উপদেশের মাধ্যমে তার দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা করা উচিৎ। বিশেষ করে দলের ভালো ভালো লোকদের তার প্রতি নজর দেয়া উচিৎ। তার মৃতপ্রায় প্রেরণাকে উদ্দীপ্ত ও কার্যত: তাকে নিজেদের সাথে রেখে সক্রিয় করার চেষ্টা করতে হবে।

তিন।। এহেন ব্যক্তির সমালোচনা করতে থাকা উচিৎ। দলের মধ্যে তার এ নিষ্ক্রিয়তা ও গাফলতি যেন একটি মামুলী বিষয়ে পরিণত না হয়। অন্যেরা যেন পরস্পরের কাঁধে ভর করে বসে যেতেই না থকে। দলের লোকেরা নিজেদের সময়, শ্রম ও সম্পদের কত অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করতে পারে এবং প্রকৃত পে কতটা ব্যয় করছে এবং নিজেদের যোগ্যতার তুলনায় তাদের কর্মতৎপরতার হার কি, এ সম্পর্কে দলের মধ্যে মাঝে মাঝে সমালোচনা পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। তাহলেই সমালোচনার তুলাদন্ডে যে ব্যক্তি হালকা প্রতীয়মান হয় তার পক্ষে লজ্জিত হওয়াই স্বাভাবিক। আর এ লজ্জা অন্যদেরকে নিষ্ক্রিয়তা থেকে বাঁচাবে। কিন্তু এ সমালোচনা যেন এমনভাবে না হয় যার ফলে একক দুর্বল সংকল্পের অধিকারী ব্যক্তি মিশ্রিত সংকল্পের দুর্বলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কোন ব্যক্তির মধ্যে যে দুর্বলতা জন্ম নেয় তাকে দূর করতে না পারলেও কমপক্ষে বাড়াতে না দেয়াই হচ্ছে বুদ্ধিভিত্তিক পথ। অজ্ঞতার সাথে প্রয়োজনাতিরিক্ত জোশ দেখাবার ফলে অসৎ কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে আরো বৃহত্তম অসত্যের দিকে এগিয়ে দেবার পথ প্রশস্ত হয়। সংকল্পের দুর্বলতার মিশ্রত রূপ হচ্ছে এই যে, মানুষ নিজের দুর্বলতার উপর মিথ্যা ও প্রতারণার প্রলেপ লাগাবার চেষ্টা করে এবং অগ্রসর হতে হতে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, তার মধ্যে কোন ত্রুটি নেই, যেটি আছে দলের মধ্যে। এটি নিছক একটি দুর্বলতাই নয় বরং অসৎ চরিত্রের একটি প্রকাশও বটে। সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে যে দল দুনিয়ায় সংশোধন করতে চায় তার মধ্যে এ জাতীয় কোন প্রবণতার বিকাশ ও লালনের সুযোগ না দেয়া উচিৎ।

এর প্রথম পর্যায়ে মানুষ কাজ না করার জন্যে মিথ্যা ওজর ও ভিত্তিহীন বাহানা পেশ করে। এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করা ঐ ব্যক্তির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার নামান্তর, যার মধ্যে এ নৈতিক দোষ প্রকাশিত হতে দেখা যায় এবং ঐ জামায়াতের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা রূপে প্রতীয়মান হয়, যার সাথে সংযুক্ত হয়ে বহু লোক একটি মহান উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্যে জান-মাল কোরবানী করতে ওয়াদাবদ্ধ হয়। এহেন দলে অংশ গ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে কমপক্ষে এতটুকু নৈতিক সাহস ও সক্রিয় বিবেক থাকতে হবে যার ফলে নিজের প্রেরণার দুর্বলতার কারণে কাজ না করলেও যেন সে নিজের দুর্বলতার দ্ব্যর্থহীন স্বীকৃতি দেয়। একবার এ দুর্বলতা ঢাকবার জন্যে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করার চাইতে ভুলের স্বীকৃতি দিয়ে কোন ব্যক্তির সারা জীবন এ দুর্বলতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকা অনেক বেশী ভালো। এ ভুল প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই তার সমালোচনা হওয়া উচিৎ এবং কখনো একে উৎসাহিত করা উচিৎ নয়। নিরিবিলিতে সমালোচনা করার পর যদি সে এ পথ পরিহার না করে তাহলে প্রকাশ্যে দলের মধ্যে তার সমালোচনা করতে হবে এবং যে সব ওজরকে সে যুক্তি হিসেবে পেশ করেছে সেগুলোর চেহারা উম্মুক্ত করে দিতে হবে। এ ব্যাপারে কোন প্রকার দুর্বলতা ও গাফলতি দেখানোর অর্থ হচ্ছে যে সমস্ত ত্রুটির বিষয় ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে দলের মধ্যে সেগুলোর অনুপ্রবেশের দূয়ার উম্মুক্ত করা।

এর দ্বিতীয় পর্যায়ে গাফেল ও নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি নিজের অবস্থার জন্যে দলের লোকদের দুর্বলতা এবং দলের কাজ ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটিসমূহকে দায়ী করে সেগুলোকেই নিজের বিরূপতার কারণ গণ্য করে। আসলে এটি হচ্ছে বিপদের সিগন্যাল। এ থেকে ঐ ব্যক্তি যে ফিতনা সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হচ্ছে তার সন্ধান পাওয়া যায়। এ অবস্থায় তাকে ঐ বিরূপতার বিস্তারিত কারণ জিজ্ঞেস করা ভুল। তাকে এ প্রশ্ন করার ফল দাঁড়াবে যে, যে ফিতনার পথের মাথায় সে পৌঁছে গেছে তার ওপর তাকে পরিচালিত করতে সাহায্য করা হবে। এখানে তাকে দোষারোপ করার ব্যাপক অনুমতি দেবার পরিবর্তে তার বন্ধুদের উচিৎ তাকে খোদার ভয় দেখানো এবং তাকে এই মর্মে লজ্জা দেয়া যে, তার নিজের ত্রুটিপূর্ণ কর্ম ও চরিত্র নিয়ে সে কেমন করে অন্যের সমালোচনা করার সাহস করে। পরিশ্রমকারী, সক্রিয় ও তৎপর ব্যক্তিরা এবং যারা অর্থ ও সময়ের বিপুল কোরবানী করেছে তারা যদি তার কর্মহীনতাকে নিজেদের বিরূপতার কারণ রূপে গণ্য করে তাহলে তা যুক্তিসংগত হবে। কিন্তু যেখানে বিরূপকারীর দোষগুলো সৃষ্টির ব্যাপারে তার নিজের অংশ অন্যের চাইতে বেশী এবং কাজ নষ্ট করার ব্যাপারে তার নিজের কাজ অন্যের জন্যে দৃষ্টান্তে পরিণত হচ্ছে, সেখানে সে কেমন করে বিরূপ হয়? সন্দেহ নেই নিজের সমস্ত দোষত্র“টি ও দুর্বলতা সম্পর্কে অবশ্যি দলকে অবহিত থাকতে হবে এবং দলকে কখনো এগুলো জানার ব্যাপারে গড়িমসি করা এবং এগুলো সংশোধনের প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকা উচিৎ নয়। কিন্তু দলের যে সব কর্মী দলের কাজের ব্যাপারে সবচাইতে বেশী তৎপর এবং যারা জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করে এগুলো বিবৃত করা তাদের কাজ। উপরন্তু তারা ঈমানদারীর সাথে সমালোচনাও করতে পারে। যেসব লোক কাজে ফাঁকি দেয়, ঢিলেমি দেখায় ও ত্রুটিপূর্ণ কাজ করে তারা অগ্রসর হয়ে দলের দলের ত্রুটি ও দুর্বলতা বর্ণনা করবে, কোন নৈতিক আন্দোলনে তারা কেবল নিজেদের লজ্জা ও ত্রুটি স্বীকার করে যাবে, সমালোচনা ও সংস্কার করার যোগ্যতা তাদের নেই। এ যোগ্যতায় তারা নিজেরাই যদি অধিষ্ঠিত হয় তাহলে এটি মারাত্মক নৈতিক দোষের আলামতরূপে গণ্য হবে। আর যদি দলের মধ্যে যোগ্যতা স্বীকৃত হয়, তাহলে এর অর্থ এই দাঁড়াবে যে, দল নৈতিক দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে একটা নীতিগত কথা মনে রাখা প্রয়োজন। তা হচ্ছে এই যে, একটি গতিশীল দলের সুস্থ অংগসমূহের অনুভূতি ও অসুস্থ অংগসমূহের অনুভূতির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিরাজমান। তার সুস্থ অংগসমূহ হামেশা নিজেদের কাজের মধ্যে মগ্ন থাকে। এ কাজকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্যে নিজেদের ধন, মন, প্রাণ সবকিছু নিয়োজিত করে। তাদের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায় যে, তারা কার্য সম্পাদনের জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে এবং এ ব্যাপারে কোন প্রকার দুর্বলতা ও গাফলতি দেখায়নি। আর অসুস্থ অংগসমূহ কখনো নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী কাজ করে না অথবা কিছুকাল তৎপর থাকার পর নিষ্ক্রিয়তার শিকার হয়। তাদের কার্যবিবরণী তাদের গাফলতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করে। এ দু’ধরণের অনুভূতির পার্থক্য সুস্থ চোখ ও অসুস্থ চোখের দৃষ্টিশক্তির মধ্যকার পার্থক্যের সমান। দল কেবলমাত্র নিজের সুস্থ অংগসমূহের অনুভূতির মাধ্যমেই নিজের দুর্বলতা ও ত্রুটিসমূহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারে। যে অংগ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে এবং কাজ থেকে দুরে থাকার জন্যে নিজের বিরূপ মনোভাবের কথা প্রকাশ করছে সে কখনো তার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে না। তার অনুভূতি শতকরা একশ’ ভাগ না হলেও আশি-নব্বই ভাগ বিভ্রান্তিকর হবে। যে দল আত্মহত্যা করতে চায় না সে কোন ক্রমেই এধরণের অনুভুতির উপর নিজের ফলাফলের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে না। ত্রটি ও দুর্বলতা যা কিছু উপস্থিত করা হবে তা শুনে অমনি সঙ্গে সঙ্গেই কান্না জড়িত কন্ঠে তওবা ও এস্তেগফার করা উচিৎ। অত:পর তার উপর আমাদের কাজের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি স্থাপন করা উটিৎ, এ ধরণের কথা হয়তো কোন নেকীর কাজ হতে পারে, কিন্তু তা কোন বুদ্ধিমানের নেকী নয়, বোকার নেকী। এ জাতীয় নেক লোকেরা দুনিয়ায় অতীতে কিছুই করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। নিজের মতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষন করা যত বড় অজ্ঞতা, যে কোন ব্যক্তির মন্তব্যের ভিত্তিতে নিজের ত্রুটি ও কর্মক্ষমতার আন্দাজ করে নেয়া এবং মন্তব্যকারী পরিস্থিতি সম্পর্কে কতদূর যথার্থ জ্ঞান রাখে এবং সে সম্পর্কে সঠিক মন্তব্য করার যোগ্যতা তার কতটুকু এ বিষয়টি যাচাই না করাও তার চাইতে কম অজ্ঞতা নয়।

এ পর্যায়ে আর একটি কথাও ভালোভাবে অনুধাবন করা উচিৎ। যদি কোন দল একটি আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে চায় তবে তার সামনে কাজের যোগ্যতা ও নৈতিকতার দু’টি ভিন্ন মান থাকে। একটি হচ্ছে অভীষ্ট মান অর্থাৎ যে সর্বোচ্চ মানে উন্নীত হবার জন্যে অনবরত প্রচেষ্টা ও সাধনা চালাতে হবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে কার্যোপযোগী হবার সর্বনিম্ন মান, যার ভিত্তিতে কাজ চালানো যেতে পারে এবং যার থেকে নীচে নেমে যাওয়া অসহনীয়। এ দু’ধরণের মান সম্পর্কে বিভিন্ন মানসিকতা সম্পন্ন লোক বিভিন্ন কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করে। এক ধরণের মানসিকতা সম্পন্ন লোক আসল উদ্দেশ্যের জন্যে কাজ করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না। কাজের সাথে সম্পৃক্ত থেকেও এমনভাবে এর মধ্যে শামিল হতে পারে যার ফলে তার ধন, সময়, শক্তি বিন্দুমাত্র ক্ষয়িত হয় না। এ মানসিকতা অনেক সময় চিন্তার বিলাসিতা ও পলায়নী প্রচেষ্টার জন্যে প্রবঞ্চনামূলক ওজর হিসেবে নৈতিকতার আকাশে বিচরণ করে এবং অভীষ্ট মানের চাইতে কমের ওপর কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারে না। যা কিছু সে এর চাইতে কম দেখে তারই উপর নিজের বিপুল অস্থিরতা ও বিরূপতা প্রকাশ করে। কিন্তু কাজে অধিকতর উদ্বুদ্ধ হবার জন্যে নয় বরং সচেতন বা অবচেতন যে কোন ভাবেই হোক কাজ থেকে পলায়ন করার জন্যই এ অস্থিরতা ও বিরূপতার প্রকাশ ঘটায়।

দ্বিতীয় ধরণের মানসিকতা সম্পন্ন লোক যদিও উদ্দেশ্যের জন্যে কাজ করাকে অত্যাধিক বরং পূর্ণ গুরুত্ব দেয় কিন্তু ভাববাদীতার শিকার হবার কারণে অভীষ্ট মান ও কার্যোপযোগী হবার সর্বনিম্ন মানের মধ্যকার যথাযথ পার্থক্য অনুধাবন করে না। এ ব্যক্তি নিজেই বারবার দোটানায় পড়ে যায়। উপরন্তু প্রথম ধরণের মানসিকতার ছোঁয়াচও সহজেই লেগে যায়। এভাবে সে নিজেই নিজেকে পেরেশান করে এবং যারা কাজ করে তাদের জন্যেও যথেষ্ট পেরেশানীর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তৃতীয় ধরণের মানসিকতা সম্পন্ন লোক যথার্থই উদ্দেশ্যের জন্য কাজ করে। তারা নিজেদের উপর এ কাজের সাফল্য ও ব্যর্থতার পূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, এ অনুভূতি রাখে। তাদের এ অবস্থা ও দায়িত্ব বোধের কারণে তার বাধ্য হয়ে সব সময় দু’ধরণের মানের মধ্যে যথাযথ পার্থক্য বজায় রেখে কাজ করে এবং কোন যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রগতি যেন প্রভাবিত হতে না পারে সে দিকে দৃষ্টি রাখে। তারা কখনো অভীষ্ট মান বিস্মৃত হয় না। সে পর্যন্ত পৌঁছবার চিন্তা থেকে এক মূহুর্তও গাফেল হয় না। তা থেকে নিন্ম মানের প্রতিটি বস্তু সম্পর্কে গভীর উৎকন্ঠা প্রকাশ করে। কিন্তু কর্মোপযোগী সর্বনিম্ন মানের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে এবং এ মান থেকেও লোকদের নীচে নেমে যাবার কারণে নিজেদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করার বদলে তাদেরকে সরিয়ে দূরে নিক্ষেপ করাকে অধিক বেহ্তর মনে করে। তাদের জন্যে নিজেদের শক্তির যথাযথ জরীপ ও সে অনুযায়ী কর্যবিস্তার করা ও তার গতিবেগের মধ্যে কমবেশী করা অবশ্যি অপরিহার্য। এ ব্যাপারে ভুল করলে তারা নিজেদের উদ্দেশ্যের ক্ষতি সাধন করে। কিন্তু যে ব্যক্তি এ জরীপ করার জন্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ধরণের মানসিকতার মাধ্যমে পথ নির্দেশ লাভ করবে সে মারাত্মক অজ্ঞতার প্রমাণ দেবে। একমাত্র এই তৃতীয় ধরণের মানসিকতাই তার সহায়ক ও সাহায্যকারী হতে পারে এবং এ মানসিকতাই গড়ে তুলতে হবে।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )