আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
মনটাকে কাজ দিন প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন অধ্যাপক গোলাম আযম   
Saturday, 11 August 2007
আর্টিকেল সূচি
মনটাকে কাজ দিন
রাসূল (সা) এর শেখানো পথ
কুচিন্তা ও সুচিন্তা

রাসূল (সাঃ) এর শেখানো পথ

আল্লাহ পাক মানুষের মধ্যে এ যোগ্যতা দান করেছেন যে, সে জীবনের জন্য যখন কোন একটা লক্ষ্য স্থির করে নেয় তখন ঐ লক্ষ্য হাসিলের জন্য যত শ্রম, সাধনা ও ত্যাগ তিতিক্ষা প্রয়োজন তা সে হাসিমুখে বরণ করে নিতে পারে । এ যোগ্যতা না থাকলে মানুষ জীবন সংগ্রামের কোন স্তরই অতিক্রম করতে পারতো না।

স্বাধীনতার সংগ্রামে দীর্ঘ কারাযন্ত্রণা ভোগ করা, এমনকি মৃতু্যর পরওয়া পর্যন্ত না করা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও সাধনায় সকল আরামকে হারাম করে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করা, বড় ব্যবসায়ী হবার জন্য রাত দিন এক করে কঠোর পরিশ্রম করা ইত্যাদি এ কথাই প্রমাণ করে যে, লক্ষ্য স্থির করার সিদ্ধান্ত নিলে তা হাসিল করতে সবরকম কষ্ট বরণ করা সম্ভব।

আল্লাহর রাসূলগণ তাই প্রথমেই গোড়ায় হাত দিয়েছেন । মানুষকে তার জীবনের মূল লক্ষ্য স্থির করার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ডাক দিয়েই তাঁরা কাজ শুরু করেছেন। কুরআন পাকের কয়টি সূরা বিশেষ করে সূরা আল আ'রাফ ও সূরা হুদে বেশ কয়েকজন রাসূলের নাম উল্লেখ করে প্রমাণ করা হয়েছে যে, সকল রাসুল মানব সমাজকে একই কথা কবুল করার দাওয়াত দিয়েছেন। সে কথাটি হলোঃ 'হে আমার কাওম! একমাত্র আল্ল্লাহর হুকুম মেনে চল । কারণ তিনি ছাড়া আর কেউ হুকুমকর্তা হবার যোগ্য নেই।' এ দাওয়াতই হলো তাওহীদের দাওয়াত।

এ ডাকে তারাই সাড়া দিয়েছে যারা আল্লাহকে একমাত্র হুকুমকর্তা মেনে চলার জন্য প্রস্তুত হয়েছে এবং আল্ল্লাহর হুকুম বিরোধী কারো হুকুম না মানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা রাসূলগণের এ প্রথম দফা দাওয়াত কবুল করেছে তাদেরকে যে দ্বিতীয় দাওয়াত দেয়া হয়েছে, তা বিভিন্ন সূরায় উল্ল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে সূরা আশ-শুয়ারায় বিভিন্ন নবীর নাম উল্ল্লেখ করে দেখানো হয়েছে যে, সকল নবীই এ দাওয়াত দিয়েছেন । এ দ্বিতীয় দফা দাওয়াতের ভাষা হলোঃ 'আল্লাহকে ভয় কর, তিনি যা অপছন্দ করেন তা থেকে বেঁচে থাক এবং আমাকে মেনে চল।'

দ্বিতীয় দফা দাওয়াতের মাধ্যমে রাসূলের নেতৃত্ব মেনে নেয়ার জন্যে ঐসব লোককে নির্দেশ দেয়া হলো যারা তাওহীদকে কবুল করে নিয়েছে । এ দ্বিতীয় দাওয়াতটি হলো রিসালাতের দাওয়াত । যে রিসালাতকে কবুল করলো সে এ সিদ্ধান্তেই নিল যে, আমি আল্লাহর হুকুম একমাত্র রাসূল থেকেই জেনে নেব এবং তিনি যেভাবে ঐ হুকুম পালন করা শিক্ষা দেন একমাত্র ঐ তরীকাই মেনে চলব। আল্লাহর হুকুম পালন করার জন্য রাসূল ছাড়া আর কারো কাছ থেকে ভিন্ন কোন তরীকা গ্রহণ করব না।

যারা তাওহীদ ও রিসালাতকে কবুল করে নিল তাদেরকে সংগঠিত করে রাসূল (সা) এ দুটো দাওয়াত জনগণের মধ্যে প্রসারিত করতে লাগলেন। রাসূল (সা) নিজে এবং যারা তাঁর দাওয়াত কবুল করলেন তারা সবাই রাসূলের নেতৃত্বে তাওহীদ ও রিসালাতের দাওয়াতকে একটি আন্দোলনে রূপদান করেন। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলো সমাজে আল্লাহর প্রভুত্ব ও রাসুলের নেতৃত্ব কায়েম করা অর্থাৎ দেশ ও সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব এমন লোকদের হাতে আনা প্রয়োজন, যারা আল্লাহর মরযী মতো দেশকে চালাবে। যারা এভাবে রাসূলের নেতৃত্বে সংগঠিত হতে রাযী হলেন তাদেরকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়া হলো যে, এ পথে সংগ্রাম করা ও আসল উদ্দেশ্য হলো আখিরাতের সাফল্য। দুনিয়ার সাফল্য আসল টার্গেট নয় । আখিরাতের টার্গেটকে সামনে রেখে যারা এ পথে চলবে একমাত্র তাদের উপরই আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন এবং পরকালে তারাই বেহেশতের চিরস্থায়ী সুখ শান্তি লাভ করতে পারবে।

তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত হলো রাসূলগণের মূল দাওয়াত । মানব সমাজ এর ভিত্তিতে পরিচালিত হলেই মানুষ দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি লাভ করতে পারবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তর ও পর্যায়ে যারা আগে থেকেই নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দখল করে আছে তাদেরকে তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের দাওয়াত দেয়া হল। কারণ তারা এ দাওয়াত কবুল করলে বিনা বাধায় সমাজ রাসূলের দেখানো পথে চলতে পারবে। সব যুগেই নবীগণ নেতৃস্থানীয়দের এ উদ্দেশ্যেই বিশেষভাবে দাওয়াত দিয়েছেন।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, নেতৃত্বের অধিকারীরা এ দাওয়াত কবুল করতে রাযী হয়নি বলে তাদের সাথে নবীদের সর্বাত্মক সংঘর্ষ হয়েছে। নবী ও তাঁর সাথীদের উপর হাজারো রকমের নিযর্াতন চালানো হয়েছে। হক ও বাতিলের এ সংঘর্ষের মাধ্যমেই ইসলামী আন্দোলনে শরীক জনশক্তির মধ্যে প্রয়োজনীয় গুনাবলী সৃষ্টি হয়েছে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রকে আল্ল্লাহর বিধান অনুযায়ী গড়ে তুলবার জন্য প্রয়োজন।

একটু ভেবে দেখুন

নবী রাসূলগণের দাওয়াত কবুল করে ঐ পদ্ধতিতে যারা ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং বাতিল শক্তির মোকাবিলায় সদা সতর্ক থাকতে বাধ্য হয়, তাদের মন স্বাভাবিক কারণেই ভিন্ন চিন্তার জন্য কমই খালি থাকে। ইসলামী আন্দোলনের দেয়া পদ্ধতি অনুযায়ী তাদের ২৪ ঘন্টার রুটিন প্রণয়ন করতে হয়। নিজেদের জীবনকে এভাবেই আল্লাহর সৈনিক হিসাবে তারা গড়ে তুলবার চেষ্টা করেন। এর ফাঁকেই পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। পেশার ঝামেলা তো পোহাতে হয়ই। বাতিল শক্তির সৃষ্ট বাধা বিপত্তির প্রতিকারের উদেশ্যে আন্দোলন হঠাৎ করেই যেসব কর্মসূচী ঘোষণা করে তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাদের মনে বাজে চিন্তা ঢুকবার অবকাশ কোথায়? যে পথে চলার সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন তা তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

যারা আন্দোলনে শরীক নয়, তাদের পক্ষে আল্লাহর পথের এ মুজাহিদের দৈহিক ও মানসিক ব্যস্ততা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা কঠিন। তাদের মনে কুচিন্তা, বাজে খেয়াল, ভিন্ন ভাব ঢুকাবার জন্য ইবলিশের পক্ষে তেমন সুযোগ পাওয়ার কথা নয়।

তবু অনৈসলামী সমাজ ব্যবস্থার দরুণ তাদের ঈমান, আকীদা, রুচি ও পছন্দের বিরোধী পরিবেশে তাদের মনকে পবিত্র, রাখার জন্য সদা সতর্ক থাকতে হয়। পরিবারে, সামাজিক অনুষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, পথে-ঘাটে, যানবাহনে, হাটে-বাজারে তাদেরকে বিপরীত পরিবেশের সম্মুখীন হতে হয়। আর দশজনের মতোই রক্ত মাংসে গড়া দেহের দাবি তাদেরকেও তাড়া করা স্বাভাবিক। তাই এসব অবস্থায় মনকে পবিত্র রাখার জন্য বিশেষ যত্ম নিতে হয়। এখানে কবি রবীন্দ্রনাথের 'জুতা-আবিষ্কার' নামক কবিতাটি থেকে চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায়। এক রাজা তার রাজ্যের ধুলাবালি থেকে পা দুটোকে রক্ষা করার জন্য রাজ দরবারে পরামর্শ চাইলেন। চামড়া দিয়ে সব রাস্তাঘাট ঢেকে দেয়ার পরামর্শসহ বিভিন্ন রকম মতামত প্রকাশ করা হয়। এভাবেই জুতা আবিষ্কার করা হয় বলে ঐ কবিতায় একটা রূপক গল্পের অবতারনা করা হয়েছে।

সমাজের সর্বত্র যে অপবিত্রতা বিরাজ করছে, তা থেকে মনকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে পবিত্রতার চামড়া দিয়ে মনের জন্য মোড়ক তৈরি করাই একমাত্র উপায় । এ ব্যাপারে রাসূল (সা) নিম্নরূপ ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন যা সত্যিই অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক।

মনকে বশে আনার উপায়

১. পাঁচ ওয়াক্ত জামায়াতে নামায আদায় করা। দিন রাতে ২৪ ঘন্টার যাবতীয় কার্যক্রম নামাযকে কেন্দ্র করে রচনা করতে হবে। ফযরের নামায দিয়ে রুটিন শুরু । এর আগে আর কোন কাজ নয়। টয়লেট, অযু - গোসল তো নামাযেরই প্রস্তুতি।

কালেমা তাইয়্যেবার মাধ্যমে জীবনের যে পলিসি ঠিক করা হয়েছে তা হলো আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকা অনুযায়ী চলার সিদ্ধান্ত। নামায এ সিদ্ধান্ত অনুসারে চলারই ট্রেনিং । মন, মগয, অংগ-প্রত্যংগ দ্বারা নামাযে যা কিছু করা হয় তা সবই আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকা অনুযায়ী। এর অন্যথা হলে নামায বাতিল বলে গণ্য হয়।

নামাযের মাধ্যমে প্রধানতঃ তিনটি শিক্ষা দেয়া হয়ঃ

(ক) তুমি আল্লাহর গোলাম হিসাবে সকল সময় সব অবস্থায় জীবন যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছ। তাই নামাযে যেভাবে তোমার মন, মগয, দেহ আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরীকায় পরিচালনা করেছ নামাযের বাইরেও সেভাবে চলতে হবে।

(খ) তুমি যে আল্লাহর দাস সে কথা হামেশা মনে রাখার প্রয়োজনেই নামায আদায় করতে হয় 'আমার কথা স্মরণ রাখার জন্য নামায কায়েম কর'। ( সূরা তোয়াহা ১৪ আয়াত)

নামায শেষে হালাল রোজগারের জন্য যখন কর্মব্যস্ত হবে তখন আল্লাহকে ভুলে যাবে না। বরং 'আরও বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো'। (সূরা জুমআ : ১০আয়াত)

আল্লাহকে স্মরণ রাখার উদ্দেশ্যেই ২৪ ঘন্টার কার্যক্রমে প্রতিটি ফরয নামায জামায়াতে আদায় করতে হবে। এর জন্যই বাইরে কর্মব্যস্ত থাকা কালেও মনটাকে মসজিদেই ঝুলিয়ে রাখতে হবে। হাদীসে আছেঃ ৭ ব্যক্তি হাশরের ময়দানে আল্লাহর রহমতের ছায়ায় থাকবে । তাদের একজন হলো 'ঐ ব্যক্তি যার মন মসজিদে ঝুলন্ত।' অর্থাৎ শত কাজের ঝামেলার মধ্যেও মসজিদে জামায়াতে ফরয নামায আদায়ের ধান্দা তার লেগেই থাকতে হবে। এভাবে ৫ ওয়াক্ত জামায়াতে নামায তার মনে আল্লাহর যিকর তাজা রাখে। নামায তাকে আল্লাহকে ভুলতে দেয় না। নামাযে মনকে আটকে রাখার চেষ্টা করতে থাকাই আমাদের কর্তব্য। বারবার মনোযোগ ছুটে গেলেও নিরাশ হওয়া উচিত নয়। ইচ্ছা করে অন্য চিন্তা না করলে এবং মনোযোগকে ধরে রাখার সাধ্য মতো চেষ্টা করতে থাকলে আশা করা যায় যে, অনিচ্ছাকৃতভাবে মনোযোগ ছুটে গেলেও আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন। কারণ আল্লাহ পাক সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপান না।

(গ) নামাযের তৃতীয় বড় শিক্ষা হলো অশ্লীল ও হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার যোগ্যতা অর্জন করা।

'নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও হারাম কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে।' (সূরা আল আনকাবুত ৪৫ আয়াত)

নামাযীকে তাই সব সময় সচেতন থাকতে হয় যে, অশ্লীল ও হারাম কাজ যেন হয়ে না যায়, তাহলে তো আল্লাহ তার নামায কবুল করবেন না। ঐ নামাযই আল্লাহর নিকট কবুল হবার যোগ্য যে নামায অশ্লীল ও হারাম থেকে ফিরাতে পারে। উপরের আয়াতে এ কথাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

২. শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামায ''আসলে রাত জাগা নাফসকে দমন করার জন্য খুব বেশি ফলদায়ক এবং কুরআন ঠিকমতো পড়ার জন্য বেশি উপযোগী।" (সূরা আল মুজ্জাম্মিল ৬ আয়াত) তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে মহব্বতের যে ঘনিষ্ঠতা জন্মে এর কোন বিকল্প নেই। এ মহব্বতের হাতিয়ারই মনকে ইবলিশের হামলা থেকে রক্ষা করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন ঘুমের মজা ত্যাগ করে যে মনিবের দুয়ারে ধরণা দেয়, তার মনে আল্লাহর মহব্বত বৃদ্ধি পায়। রাসূল (সা) তাহাজ্জুদের নামায সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন 'এটা সালেহ লোকদের তরীকা, আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়, অতীত গুনাহর কাফফরা ও ভবিষ্যত গুনাহর নিরাপত্তা।'

তাহাজ্জুদের নামায আদায়ের ফাঁকে ফাঁকে বা শেষে নিজের গুনাহ মাফের জন্য তাওবা করলে চোখের পানির বৃষ্টিতে মনের আকাশে জমাট গুনাহর মেঘ কেটে যায় এবং ঈমানের সূর্য আগের চেয়েও উজ্জ্বল হয়। আল্লাহর দরবারে কাঁদতে পারার স্বাদই আলাদা। তাওবার পর মনিবের কাছে চাওয়ার পালা। দ্বীন ও দুনিয়া এবং আখিরাতের সবকিছুই চাইতে হবে।

বিশেষ করে মাবুদের নিকট গোলাম হিসাবে স্বীকৃতি দাবী করে কাঁদতে আরও মজা লাগে।

৩. রমযানের রোযা প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ এ তিন দিনের রোযা, শাওয়াল মাসে এ তিনটি ছাড়া আরও তিনটি রোযা, আশুরার দুটো এবং আরাফার দিনের রোযা সারা বছর রোযাদারকে নাফসের উপর নিয়ন্ত্রণের যোগ্য বানায়।

৪. সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ রাখাঃ এর জন্য রাসূল (সা) যে সহজ পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন তা হলো প্রত্যেক অবস্থায় এর উপযোগী দোয়া পড়া। রাসূল (সা) এর শেখান আরবী দোয়া অর্থসহ শিখতে পারলে তো কোন কথাই নেই। অন্ততঃ দোয়ার অর্থটুকু মনে জাগরুক রাখা দরকার। ঘুমাবার ও ঘুম থেকে জাগার সময়, টয়লেটে যাবার ও ফিরে আসার সময়, অযুর শুরু ও শেষে, খাওয়ার শুরু ও শেষে, বাড়ি থেকে বের হবার ও বাড়িতে ফিরে আসার সময়, বাজারে চলার সময়, যানবাহনে উঠার ও নামার সময় ইত্যাদি সব অবস্থায়ই রাসূল (সা) দোয়া পড়তেন।

৫. রাসূল (সা) মনকে সব সময় আল্লাহর যিকর (স্মরণ ) মশগুল রাখার উপায় হিসাবে জিহ্বাকেও যিকরে ব্যস্ত রাখার উপদেশ দিয়েছেন। যখনি ইতিবাচক চিন্তা -ভাবনা থেকে মনটা খালি হয়ে যায় তখনি তিন তসবীহ, কালেমা তাইয়্যেবা, দরূদ ইত্যাদি মুখে জারী রাখার সাথে সাথে মনে ও সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এভাবে মনকে সব অবস্থায়ই কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখতে হবে। শয়তান থেকে মনকে বাঁচাবার জন্য এর কোন বিকল্প নেই।

মুখ ও মনকে একসাথে কাজ দিতে হবে

এ তিক্ত অভিজ্ঞতা সবারই আছে যে নামায পড়া, তসবীহ জপা এবং যিকর করার সময় মুখে ঠিকই উচ্চারণ করা হচ্ছে, কিন্তু মনে অন্য কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। দেহ জায়নামাযে দাঁড়িয়ে সূরা পড়ছে আর মন কোথায় ছুটাছুটি করছে। মুখে তসবীহ উচ্চারণ করা হচ্ছে এবং হাতের আঙ্গুলও তসবীহ দানা টেনে নিচ্ছে বটে কিন্তু মন অন্য বিষয় ভেবে চলেছে।

অথচ বক্তৃতা করার সময় মুখ যা বলছে মনও তাই বলছে। বই পড়ার সময় মুখ ও মন একসাথেই চলে। কারো কারো বক্তৃতা বা কথা শুনবার সময় মন দিয়েই শুনা হয়। এই যে এখন আমি লিখছি মন দিয়েই লিখছি। মন যা লিখতে বলছে তাই লিখছি। এ সব ব্যাপারে মনোযোগ ঠিকই থাকে। কিন্তু নামায, তসবীহ, যিকরের বেলায় মন বিয়োগ হয়ে যায় কেন?

এটা আমাদের শিক্ষার ত্রুটি। নামাযে যা যা মুখে পড়তে হয় তা শেখাবার সময় মনে কী ভাবতে হবে সে কথা শেখান হয় না। মুখে যা পড়া হয় এর অর্থ জানা থাকা সত্ত্বেও মনোযোগের অভাব হতে পারে ঐ শিক্ষার ত্রুটির কারণে। তেমনি তসবীহ ও যিকরের ব্যাপার। মুখ ও মনকে একই সাথে চলতে হবে। মুখে যা উচ্চারণ করা হচ্ছে মনে এর ভাব জাগরুক থাকতে হবে। নইলে নামায, তসবীহ, ও যিকর প্রাণহীন হয়ে থাকবে। মৃত নামায দ্বারা উপরে বর্ণিত শিক্ষা লাভ হতে পারে না।

মুখে যা উচ্চারণ করা হয় তা মনকে দিয়েও বলাবার পদ্ধতি সম্পর্কে একটু আলোচনা প্রয়োজন। মুখে যা পড়া হয় এর অর্থের দিকে খেয়াল রাখলে মনে অন্য ভাব জাগবার পথ পায়না। কিন্তু এ খেয়াল স্থায়ী রাখা কঠিন। এর জন্য মনের আবেগ যোগ হওয়া বিশেষ জরুরি। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতের সময় ইহসান এর যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাই আবেগের ভিত্তি। তিনি ইহসানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, এমনভাবে ইবাদত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। যদি এমনটা নাও পার তাহলে অন্ততঃ খেয়াল কর যে, তিনি তো তোমাকে অবশ্যই দেখছেন। এ আবেগ সৃষ্টির প্রয়োজনেই নামাযের শুরুতে তাওয়াজ্জুহ (ইনি্ন অজ্জাহাতু… মুশরিকীন ) পড়া হয়। পড়ার সময় মনে এ ভাব জাগ্রত করতে হবে যে, আমার মাবুদ আমার সামনেই হাযির আছেন। সিজদায় মুখে যখন বলা হয় 'সুবহানা রাবি্বয়াল আলা' তখন এর অর্থের দিকে খেয়াল করলে আবেগ সৃষ্টি হবে যে, আমি তো আমার মহান রবের কোলেই আশ্রয় পেলাম। এভাবে নামাযের প্রতিটি অংশে আবেগ যুক্ত হলে মন নামাযের বাইরে ছুটাছুটি করার ফুরসৎই পাবে না।

এমন নামাযই জীবন্ত । জীবন্ত নামাযই মুমিনের জীবনকে গড়বার যোগ্যতা রাখে। শুধু অনুষ্ঠান হিসাবে নামায আদায় করা হলে তা দ্বারা নামাযের কোন উপকারই পাওয়া সম্ভব নয় । অনেকের জীবনে এ কারণেই নামাযের উদ্দেশ্য সফল হতে দেখা যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহপাক প্রত্যেক নেক আমলের কমপক্ষে ১০গুণ এবং বেশির পক্ষে ৭০০ গুণ বদলা দেবেন। একই জামায়াতে নামায আদায় করেও কেউ ১০, কেউ ৫০, কেউ ১০০, কেউ ৭০০ পাওয়ার কারণ কী? একই কাজের মজুরী এত বেশ কম করে কেন দেয়া হবে? নামাযে কে কতটা মনকে হাযির রাখতে সক্ষম হলো, কার জযবা ও আবেগ কী পরিমাণ ছিল , কে কতটা মহব্বতের সাথে মনিবের নিকট নিজেকে সমর্পণ করল ইত্যাদির বেশ কমের ভিত্তিতে পুরস্কারের পরিমাণও কম বেশি হবে।

নামায, তসবীহ ও যিকরের ব্যাপারে কমপক্ষে এতটুকু চেষ্টা করতে হবে যে, মুখে যখন উচ্চারণ করা হয়, তখন যেন তা মনের অগোচরে না হয়। মনের দিকে খেয়াল রেখেই মুখে পড়তে হবে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যে, বুকের বাম পাশে যেখানে হার্ট বা হৃদপিন্ড থাকে সেদিকে খেয়াল রেখে ধীরে ধীরে মুখে পড়তে থাকলে মনকে নামাযের মধ্যেই আটক রাখা সহজ হয়। এ দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে মনকে নামাযের বাইরে যেতে দেব না। আমার এ অভিজ্ঞার ভিত্তি হলো সুফী সাধকদের 'কালবী যিকর' সম্পর্কে ধারণা । তাঁরা কালবের অবস্থান বুকের বামদিকেই নির্ধারণ করেন । মুখে যেমন আল্লাহ উচ্চারণ করা হয় তেমনি তারা কালবেও তা উচ্চারণ করা অনুশীলন করেন। এমনকি সেখান থেকে এ উচ্চারণের আওয়াজও বের হয়। এটা তো দীর্ঘ অনুশীলনের বিষয়। রাসূল (সা) সাহাবায়ে কেরামকে এ অনুশীলনের শিক্ষা দিয়েছেন বলে আমি এখনও জানতে পারিনি। কিন্তু কালবে উচ্চারণ না করেও কালবের দিকে খেয়াল রেখে মুখে উচ্চারণ করলে যে একাগ্রতা সৃষ্টি হয় এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ খেয়াল যত গভীর হয় মনোযোগ ততই মযবুত হয়। গভীর মনোযোগকেই সুফীগণ মোরাকাবাহ বলেন।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )