আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
মদীনার ফযীলত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া   
Monday, 26 November 2007
আর্টিকেল সূচি
মদীনার ফযীলত
বরকমতময় মদীনা নগরীর কিছু ফযীলতঃ
মসজিদে নববীর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণঃ
মদীনায় বসবাসের আদবসমুহঃ
মদীনা যিয়ারতের আদবসমূহঃ
বিদ
শরীয়ত সমর্থিত যিয়ারতের উপকারিতা এবং বিদ

বরকমতময় মদীনা নগরীর কিছু ফযীলতঃ

 আল্লাহ তা‘আলা মক্কা নগরীকে যে ভাবে হারাম তথা সম্মানিত ও নিরাপদ করেছেন এ মদীনা নগরীকেও তেমনিভাবে হারাম ও নিরাপদ করেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এসেছে তিনি বলেছেনঃ

"إِنَّ إِبْرَاهِيْمَ حَرَّم مَكَّةَ، وإنّيْ حَرَّمْتُ الْمَدِيْنَةَ"

“নিশ্চয়ই ইবরাহীম মক্কাকে হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন, অবশ্যই আমি মদীনাকে হারাম ঘোষণা করলাম”। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

ইব্রাহীম আলাইহিসসালাম এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে হারামের সম্পর্ক করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ তারা এ দু নগরী হারাম তথা সম্মানিত করার কথা ঘোষণা করেছেন নতুবা এ হারাম করা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকেই, তিনিই এ মদীনাকে হারাম করেছেন যেমনিভাবে মক্কাকে (এর পূর্বে) হারাম করেছিলেন।

আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার সমস্ত নগরীসমূহ থেকে কেবলমাত্র এ দুই নগরীকেই এ হারাম তথা সম্মানিত করার গুণে গুনান্বিত করেছেন। মক্কা ও মদীনা ব্যতীত আর কোন কিছুকে অনুরূপ হারাম করার ঘোষণা গ্রহণযোগ্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। কোন কোন মানুষের মুখে মুখে যে প্রচার-প্রসার হয়ে পড়েছে যে, মাসজিদুল আকসা তথা বাইতুল মুকাদ্দাস তৃতীয় হারামাইন; এটা একটা বহুল প্রচলিত ভুল; কেননা হারামাইনের কোন তৃতীয় কিছু নেই, বরং বিশুদ্ধ কথা হলো এভাবে বলা যে, দুই মসজিদের পরে তৃতীয়টি, অর্থাৎ, সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ দুই মসজিদের পরে তৃতীয়টি হলো এ মসজিদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে এ তিনটি মসজিদের ফযীলত ও নামাযের জন্য এগুলোর দিকে সফর করার ব্যাপারে দলীল প্রমাণাদি এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"لا تُشَدُّ الرِّحَالُ إلا إلى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ: اَلْمَسْجِدِ الْحَرَام، وَمَسْجِدِيْ هذا، وَالْمَسْجِدِ الأَقْصَى".

“তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের দিকে (ইবাদতের জন্য) সফর করা যাবেনা; মসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ, আর মাসজিদুল আকসা (বাইতুল মুকাদ্দাস)”। হাদিসটি ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

মক্কা ও মদীনার হারাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ এ দু'য়ের যতটুকু সীমানা নির্ধারিত করা হয়েছে তার সবটুকুই হারাম। হারাম বলতে শুধু মসজিদে নববী বুঝার যে প্রবণতা মানুষের মাঝে প্রসার লাভ করেছে তা বহুল প্রচলিত ভুলের অর্ন্তভূক্ত; কেননা শুধু মসজিদে নববীই হারাম নয়, বরং মদীনার (দক্ষিন পূর্ব দিক অবস্থিত) ‘আইর’ নামক পাহাড় হতে (দক্ষিন পশ্চিমে অবস্থিত) ‘সাওর’ নামক পাহাড় পর্যন্ত, আর (মাঝখানে পূর্ব ও পশ্চিমে কোনাকোনি ভাবে) দুই হাররা বা কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকার মধ্যবর্তী সবটুকু স্থান হারামের অন্তর্ভূক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"اَلْمَدِيْنَةُ حَرَمٌ ما بَيْنَ عَيْرٍ إلى ثَوْرٍ"

“মদীনা ‘আইর’ হতে ‘সাওর’ পর্যন্ত মধ্যবর্তী স্থানটুকু হারাম”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেনঃ

"إني حرمتُ ما بينَ لابَتَيِ المدينةِ أن يُقْطَعَ عِضاهُها، أو يُقْتَل صَيْدُها".

“আমি মদীনার দু’ হাররা বা কালো পাথর বিশিষ্ট জমিনের মাঝখানের অংশটুকু হারাম তথা সম্মানিত ঘোষণা দিলাম, এর কোন গাছ কাটা যাবেনা, কোন শিকারী জন্তু হত্যা করা যাবেনা”। ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

মদীনা নগরী বর্তমানে বি¯তৃতি লাভ করার কারনে এর অংশবিশেষ হারাম ঘোষিত এলাকার বাইরে চলে গেছে, তাই মদীনা নগরীর যত বিল্ডিং আছে সবই হারাম এলাকার ভিতরে আছে এমনটি বলা যাবেনা, বরং যতটুকু হারাম ঘোষিত এলাকার ভিতরে পড়বে ততটুকুই হারাম, আর যে অংশ হারাম ঘোষিত এলাকার বাইরে আছে তাকে মদীনা নগরীর অংশ বলা হবে, হারামের অংশ বলা হবে না।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মদীনার হারামের সীমা নির্ধারনে বিভিন্ন হাদীস এসেছে, কোন কোন হাদীসে বলা হয়েছে দুই কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকার মাঝখানের অংশ হারাম, আবার কোথায়ও কোথায়ও বর্ণিত হয়েছে দু হাররার মাঝখানের অংশ হারাম, আবার কোন কোন বর্ণনায় এসেছে দু’পাহাড়ের মাঝখানের অংশ হারাম, অন্য বর্ণনায় এসেছে ‘আইর’ পাাহাড় থেকে ‘সাওর’ পাহাড়ের মাঝখানের অংশ হারাম। এ শব্দগুলোর মধ্যে কোন বৈপরীত্ব নেই; কেননা যে কোন জিনিসের ছোট অংশ তার বড় অংশের অন্তর্গত। সুতরাং দু কালো পাথর বিশিষ্ট অংশের মাঝখানের অংশ হারাম, দু র্হারার মাঝখানের অংশ হারাম, ‘আইর’ ও ‘সাওর’ পর্বতদ্বয়ের মাঝখানের অংশ হারাম। এক্ষেত্রে যদি কোন অংশ হারামের ভিতরে পড়ল কিনা তাতে সন্দেহ এসে যায় তখন সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলোঃ এ কথা বলা যে, এটা সন্দেহযুক্ত ব্যাপার সমূহের একটি, আর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘সন্দেহযুক্ত’ বিষয়ের ব্যাপারে যে নীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন সেক্ষেত্রে তা মেনে চলা উচিত, আর তা হলো, এ ব্যাপারে চরম সাবধানতা অবলম্বন করা। যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে প্রখ্যাত সাহাবী নু‘মান বিন বাশীর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বলেছেনঃ

"فمنِ اتَّقى الشُّبهات فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِيْنِهِ وعِرضِه، وَمَنْ وقَعَ في الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ".

“যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত ব্যাপার সমুহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে সে নিজের দ্বীন ও সম্মানকে দোষমুক্ত করতে পেরেছে, আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত ব্যাপার সমুহে নিপতিত হয়েছে সে হারামে পতিত হয়েছে”।

 এ বরকতময় মদীনার অপর যে সমস্ত ফযীলত আছে, তম্মধ্যেঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার নাম রেখেছেন ‘ত্বাইবাহ’ বা পবিত্র, আরেক নাম ‘ত্বাবাহ’ বা পছন্দনীয়। বরং সহীহ মুসলিমের হাদীসে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তা‘আলা এর নাম রেখেছেন ‘ত্বা-বা’, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"إن اللهَ سمََّى الْمَدِيْنَةَ طَابَةً"

“নিশ্চয়ই আল্লাহ মদীনাকে ‘ত্বা-বা নামে নামকরণ করেছেন”। ত্বা-বা ও ত্বাইবাহ এ দুটো শব্দই আরবী তাইয়্যব শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ ‘ভালো’ বা ‘উত্তম’। সুতরাং এ দু’টি শব্দ উত্তম জায়গার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

 এ মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, ঈমান এর দিকে ফিরে আসবে, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"إنَّ الإِيْمَانَ لَيَأْرِزُ إلى المَدِيْنَةِ كما تَأْرِزُ الحيَّةُ إلى جُحْرِها"

“নিশ্চয়ই ঈমান মদীনার দিকে ফিরে আসবে যেমনিভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে আসে”। হাদিসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

হাদীসের অর্থ হলোঃ ঈমান মদীনা অভিমুখী হবে, এবং মদীনাতে অবশিষ্ট থাকবে, আর মুসলমানগণ মদীনার উদ্দেশ্যে বের হবে এবং মদীনামুখী হবে, তাদেরকে তাদের ঈমান ও এ বরকতময় যমীনের প্রতি ভালোবাসা-যাকে মহান আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন-এ কাজে প্রবৃত্ত করবে।

 এ মদীনার ফযীলতের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আরো এসেছে, তিনি এ নগরী সম্পর্কে বলেছেন, এটা এমন একটা জনপদ যা যাবতীয় জনপদকে গ্রাস করে ফেলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

"أُمِرْتُ بِقَرْيَةٍ تَأْكُلُ القُرى" يقولون لها : يَثْرِب، وهي المدينةُ"

“আমাকে এমন জনপদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সমস্ত জনপদকে গ্রাস করে ফেলবে” অর্থাৎ, তাকে এ জনপদের দিকে হিজরতের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সমস্ত জনপদকে খেয়ে ফেলবে, “তারা তাকে ইয়াসরিব বলে ডাকে আসলে তা হলো মদীনা”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাঃ “সমস্ত জনপদ গ্রাস করে ফেলবে” এর এ অর্থ করা হয়েছে যে, এ জনপদ সমস্ত জনপদের উপর জয়ী হবে, এবং সমস্ত জনপদের উপর এর বিজয় অবশ্যম্ভাবী হবে। আবার এ অর্থও করা হয়েছে যে, এর দিকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের কারণে প্রাপ্ত গনীমতের মালসমুহ নিয়ে আসা হবে, এবং এর দিকে স্থানান্তর করা হবে। বস্তুত এ দু’টি অর্থই শুদ্ধ; কেননা দু’টি কাজই ঘটেছিল এবং অর্জিত হয়েছিল। অন্যান্য নগরীর উপর এ মদীনা নগরীর বিজয় এভাবে হয়েছিল যে, এখান থেকেই হিদায়াতের মশালবাহী সংস্কারকগণ, দিগ্বিজয়ী যোদ্ধাগণ বের হয়ে পড়েছিলেন এবং মানুষকে আল্লাহর নির্দেশে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে এনেছিলেন, ফলে মানুষ আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করেছে, দুনিয়ার বুকে যত কল্যাণ হয়েছে তার সবটুকুই এ মদীনা তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনা থেকেই অর্জিত হয়েছে। সুতরাং বুঝা গেল, “সমস্ত জনপদ গ্রাস করে ফেলবে” এ কথা দ্বারা যাবতীয় নগরীর উপর এ নগরীর বিজয় সাধিত হওয়া বুঝানো হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের প্রথম সারির সময়ে, অনুরূপভাবে খোলাফায়ে রাশেদীন রাদিয়াল্লাহু আনহুম ওয়া আরদাহুমের খিলাফত কালে এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল। অনুরূপভাবে যদি “সমস্ত জনপদ খেয়ে ফেলবে” দ্বারা গণীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) অর্জিত হওয়া ও মদীনায় আনা উদ্দেশ্য হয় তবে তাও ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাসিল হয়েছিল; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুর্বাহ্নে সুসংবাদ জানিয়েছিলেন যে, রোম সম্রাট সীজার, আর পারস্য সম্রাট খসরূর যাবতীয় পুঞ্জিভুত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় মুসলমানগণ ব্যয় করবে। আর সে ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল; এ সমস্ত সম্পদ এ বরকতময় মদীনায় নিয়ে আসা হয়েছিল, আর আমীরুল মুমেনীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আরদাহুর সময় তার হাতে তা বন্টন করা হয়েছিল।

 মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, এর মধ্যে অবস্থানের কারণে যে ব্যক্তি কষ্ট ও দৈন্যে পতিত হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধৈর্য্য ধারণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন, তিনি বলেনঃ

"المَدِيْنَةُ خَيْرٌ لَّهُمْ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ"

“নিশ্চয়ই মদীনা তাদের জন্য উত্তম যদি তারা তা জানত”। তিনি এ কথা ঐ সমস্ত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যারা ভাল জীবিকা, প্রাচুর্য্য ও ধন-সম্পদের আশায় মদীনা ছেড়ে চলে যাবার চিন্তা-ভাবনা করছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ

"اَلْمَدِيْنَةُ خيرٌ لهم لو كانوا يَعْلَمُون، لا يَدَعُها أحدٌ رغبةً عنها إلا أبدَلَ الله فيها مَنْ هو خيرٌ منه، ولا يثبُتُ أحدٌ على لأْوائها وجَهْدِها إلا كنتُ لهُ شَفيعاً أو شهيداً يومَ القيامةِ"

“মদীনা তাদের জন্য উত্তম যদি তারা তা জানত । এ মদীনা থেকে বিমুখ হয়ে যদি কেউ অন্য কোন দিকে চলে যায় আল্লাহ মদীনাতে তার থেকে ভালো বিকল্প লোকের ব্যবস্থা করে দিবেন, আর যদি কেউ এর যাবতীয় বালা-মুসীবত ও কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করে তার জন্য আমি কিয়ামতের দিনে সুপারিশকারী বা সাক্ষী হব”। ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।

এ হাদীস দ্বারা আমরা মদীনার বিশেষ ফযীলতের প্রমাণ পাই, যেমনিভাবে এ মদীনাতে যদি কেউ কষ্ট, বালা-মুসীবত, আর্থিক দৈন্যতা, বিপদাপদে পতিত হয়ে ধৈর্য ধারণ করে তবে তার কি ফযীলত তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সুতরাং বালা-মুসিবত, বা আর্থিক দৈন্যতার কারণে উন্নত জীবিকা, আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য যেন কেউ এ মদীনা নগরী ছেড়ে অন্য কোন দিকে যাওয়ার মনস্থ না করে, বরং সে মদীনাতে সামান্য যা পায় তার উপর ধৈর্য্য ধারণ করবে, এর বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য মহা প্রতিদান, বিরাট সওয়াবের ওয়াদা করা হয়েছে।

 মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরূত্বপূর্ণ, তাহলো এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মদীনার বিশেষ মর্যাদা বর্ণনা করেছেন আর মদীনাকে হারাম ঘোষণার প্রাক্কালে এর মধ্যে কোন বিদ‘আত বা অন্যায় ঘটনা ঘটানোর ভয়াবহতা সম্পর্কে সাবধান করেছেন, তিনি বলেছেনঃ

"المَدِينَةُ حرمٌ ما بينَ عَيْرٍ إلى ثَوْرٍ، مَنْ أَحْدَثَ فيها حدَثاً أو آوَى مُحدِثاً فعليهِ لعْنَةُ الله والملائكةِ والناسِ أجمعينَ، لا يقبلُ الله منهُ صَرْفاً ولا عدْلاً"

“মদীনা ‘আ’ইর’ থেকে ‘সাওর’ পর্যন্ত হারাম, যে ব্যক্তি মদীনায় কোন অন্যায় কাজ করে অথবা কোন অন্যায়কারীকে আশ্রয় প্রদান করবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশ্তাগণ এবং সমস্ত মানুষের লা‘নত পড়বে। তার কাছ থেকে আল্লাহ কোন ফরয ও নফল কিছুই কবুল করবেন না”। হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

 মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য বরকতের দো’আ করেছেন, তম্মধ্যে আছে তার বাণীঃ

اَللَّهمِّ بارِك لنا في ثَمَرِنا، وبارِكْ لنا في مَدِيْنَتِنَا، وبارِك لنا في صاعِنا، وبارِكْ لنا في مُدِّنا.

“হে আল্লাহ! তুমি আমাদের ফল-ফলাদিতে বরকত দাও। আমাদের এ মদীনায় বরকত দাও। আমাদের ছা’ পরিমাণ বস্তুতেও বরকত দাও, আমাদের মুদ পরিমাণ জিনিসেও বরকত দাও”।

 মদীনার ফযীলতের মধ্যে আরো আছে যে, এর মধ্যে মহামারী এবং দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবেনা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

"على أَنْقابِ المدينةِ ملائكةٌ، لا يَدْخُلُهَا الطَّاعُونُ ولا الدَّجَّالُ.

“মদীনার প্রবেশ দ্বার সমূহে ফেরেশ্তা প্রহরী নিযুক্ত আছে, এতে মহামারী ও দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবেনা”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

মদীনার ফযীলতের উপর অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এখানে যা উল্লেখ করেছি তার সব কয়টিই সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম থেকে অথবা তার যে কোন একটি থেকে উল্লেখ করেছি।

মদীনার ফযীলত বর্ণনায় সবচেয়ে ভালো কিতাবগুলোর মধ্যে শাইখ ডঃ সালেহ ইবনে হামেদ আর রিফা’য়ী কতৃক উপস্থাপিত কিতাব। তিনি মদীনাস্থ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য এ কিতাবটি লিখেছিলেন, যার শিরোনাম ছিলঃ

"الأحاديث الواردة في فضائل المدينة جمعاً ودراسةً"

“মদীনার ফযীলত বর্ণনায় যে সমস্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সংকলণ ও পর্যালোচনা”। আর তাই আমি ছাত্রদেরকে আলোচ্য বইটির প্রতি দৃষ্টিদান ও তার থেকে ফায়েদা হাসিলের উপদেশ দিচ্ছি।

এ মদীনা যে বিশেষ বিশেষ বস্তু সম্বলিত, তম্মধ্যে রয়েছে মহান দু’টি মসজিদ;

 রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদ।

 মসজিদে কুবা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদের ফযীলত বর্ণনায় অনেক হাদীস এসেছে, তম্মধ্যে আছে রাসূলের বাণীঃ

"لا تُشَدُّ الرِّحَالُ إلا إلى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ: اَلْمَسْجِدِ الْحَرَام، وَمَسْجِدِيْ هذا، وَالْمَسْجِدِ الأَقْصَى".

“তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথায়ও (সওয়াব/ ইবাদতের আশায়) সফর করা জায়েয নেইঃ মাসজিদুল হারাম, আমার এ মসজিদ, আর মাসজিদুল আক্সা”। হাদিসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

সুতরাং নবীরা যে সমস্ত মসজিদ বানিয়েছে এবং যেগুলির দিকেই (সওয়াবের উদ্দেশ্যে) কেবলমাত্র সফর করা যায় এ মদীনাতে তার একটি বিদ্যমান। এ মসজিদে সালাত আদায় করার যে ফযীলত রয়েছে সে সম্পর্কেও হাদীসে এসেছে যে, এক হাজার সালাতের চেয়েও উত্তম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"صَلاَةٌ في مَسْجِدِيْ هذا أفْضَلُ مِنْ ألفِ صلاةٍ فيما سواه إلا المسجِدِ الْحَرَامِ".

“আমার এ মসজিদে এক সালাত আদায় করা মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্যান্য মসজিদে এক হাজার সালাত আদায় করার চেয়েও উত্তম”। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

সুতরাং এ এক বিরাট ফযীলত, আখেরাতের মাওসুমের একটি মাওসুম, যেখানে বহুগুণ বর্ধিত হারে লাভবান হওয়া যায়, দশগুণ বা শতগুণ হিসাবে নয় বরং এর সওয়াব হাজার গুণের বেশি।

জানা কথা, দুনিয়ার ব্যবসায়ীরা যখন জানতে পারে যে, তাদের কোন কোন পণ্য নির্দিষ্ট কোন স্থানে, নির্দিষ্ট কোন সময়ে খুব ভালো চলবে, তখন তারা সে মওসুম ধরার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতিসহ আগ থেকেই তৈরী হয়ে থাকে, যদিও সেখানে তাদের লাভের ভাগ আধাআধি বা দ্বিগুণ হয়ে থাকে, এ যদি হয় দুনিয়ার ব্যবসায় আমাদের অবস্থা তাহলে আমাদের কি রকম প্রস্তুতি থাকা দরকার যেখানে আখেরাতের লাভের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, আর লাভের মাত্রা দশগুণ বা একশ’গুণ বা পাঁচশ’গুণ বা ছয়শ’গুণ নয় বরং হাজার গুণেরও বেশী!!



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )