আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
মদীনার ফযীলত প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া   
Monday, 26 November 2007
আর্টিকেল সূচি
মদীনার ফযীলত
বরকমতময় মদীনা নগরীর কিছু ফযীলতঃ
মসজিদে নববীর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণঃ
মদীনায় বসবাসের আদবসমুহঃ
মদীনা যিয়ারতের আদবসমূহঃ
বিদ
শরীয়ত সমর্থিত যিয়ারতের উপকারিতা এবং বিদ

শরীয়ত সমর্থিত যিয়ারতের উপকারিতা এবং বিদ‘আতী পদ্ধতিতে যিয়ারতের অপকারিতা

শরীয়ত সমর্থিত যিয়ারত হলোঃ যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসারে হবে, যাতে জীবিত যিয়ারতকারী ও মৃত যিয়ারতকৃত কবরবাসী উভয়ই লাভবান হতে পারে।

শরীয়ত সমর্থিত পদ্ধতিতে যিয়ারত সম্পন্ন হলে যিয়ারতকারী সে যিয়ারতের মাধ্যমে তিনটি উপকার লাভ করেঃ

একঃ মৃত্যুকে স্মরণ করা; যার দ্বারা সে নেককাজের মাধ্যমে এর জন্য তৈরী হতে তৎপর হয়; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"زُوْرُوْا الْقُبُوْرَ؛ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُكُمُ الآخِرَةَ".

“তোমরা কবর যিয়ারত কর; কেননা তা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে”। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

দুইঃ যিয়ারত কার্যটি সম্পাদন করা, আর এটা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কতৃক প্রবর্তিত একটি সুন্নাত, যা করলে সওয়াবের অধিকারী হবে।

তিনঃ মৃত মুসলিমদের প্রতি দো‘আর মাধ্যমে তাদের প্রতি দয়া করা, তাদের প্রতি এ দয়া প্রদর্শনের কারণে সওয়াবের অধিকারী হবে।

আর মৃত যিয়ারতকৃত কবরবাসী, তারা শরীয়ত সমর্থিত কবর যিয়ারত দ্বারা তার জন্য কৃত দো‘আ, ও তার প্রতি দয়া দ্বারা লাভবান হয়; কেননা মৃতগণ জীবিতদের দো‘আ দ্বারা লাভবান হয়ে থাকে।

কবর যিয়ারতকারীর জন্য মুস্তাহাব হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে সমস্ত দো‘আ সাব্যস্ত হয়েছে সেগুলো দিয়ে দো‘আ করা, তম্মধ্যে আছেঃ বুরাইদা ইবনে হুসাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে যখন তারা কবরস্থানে যেতেন তখন শিক্ষা দিতেন, সুতরাং তাদের মধ্যকার একজন বলতেনঃ

"اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ، أَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ"

“আসসালামু আলাইকুম আহলাদদিয়ারে মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা, ওয়া ইন্না ইনশা’আল্লাহু বিকুম লালাহেকুন, আসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আফিয়াহ”।

‘হে এ গৃহসমূহে অবস্থানকারী মু‘মিন ও মুসলিম! তোমাদের উপর সালাম বর্ষিত হোক, আমরাও অচিরেই আল্লাহ চাহেত তোমাদের সাথে অবশ্য অবশ্য মিলিত হবো, আমি আমাদের জন্য ও তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি’। এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

কবর যিয়ারত করা শুধুমাত্র পুরুষদের ক্ষেত্রে মুস্তাহাব, মহিলাদের কবর যিয়ারত নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছেঃ একদল অনুমতি দিয়েছে, অন্য দল নিষেধ করেছে। সবচেয়ে বেশী প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলো নিষিদ্ধ হওয়া; কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

"لَعَنَ اللهُ زَوَّارَاتِ الْقُبُوْرَ"

“যিয়ারতকারী মহিলাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার লা‘নত বর্ষিত হোক”। হাদীসটি ইমাম তিরমিযী ও অন্যান্যগণ বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী বলেনঃ হাদীসটি হাসান সহীহ।

রাসূলের এ হাদীসে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা হলোঃ زَوَّارَات ‘যাওওয়ারাত’। যার সবচেয়ে স্পষ্ট অর্থ হলোঃ এটা যিয়ারত এর সাথে সম্পর্কিত, অর্থাৎ মহিলাদের দিকে যিয়ারতকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে, বা যিয়ারত ওয়ালী অর্থে ব্যবহার হবে যেমনিভাবে আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ

﴿وَمَا رَبُّكَ بِظَلاّمٍ لِلْعَبِيدِ﴾ -فصلت:৪৬

এ আয়াতে ‘যাল্লাম’ শব্দটি যদিও অতিরিক্ত বচনের জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে কিন্তু এখানে এর অর্থ হবে, তোমার প্রভূ অত্যাচারী নয়। অথবা তোমার প্রভূর দিকে অত্যাচারের সম্পর্ক নেই। তদ্রুপ এখানেও ‘যাওওয়ারাত’ শব্দটি যদিও অতিরিক্ত বচনের জন্য ব্যাবহার হয়ে থাকে কিন্তু এখানে যিয়ারত এর সম্পর্কিতা মহিলা, বা যিয়ারতকারিনী মহিলা এ অর্থ হবে, অধিকহারে যিয়ারতকারিনী এ অর্থ হবে না যেমনটি মহিলাদের জন্য যিয়ারত বৈধ বলে মত পোষণ কারী কোন কোন আলেম গ্রহণ করেছেন।

এর আরেকটি কারণ এই যে, মহিলাগণ দূর্বল, কান্নাকাটি চিল্লাচিল্লি করা থেকে খুব কমই ধৈর্য্য ধারণ করতে পারে।

অনুরূপভাবে মহিলাদের কবর যিয়ারত নিষেধ করাটা বেশী সাবধানতাপূর্ণ মত, কেননা মহিলা যদি কবর যিয়ারত ত্যাগ করে তবে সে শুধু একটা মুস্তাহাব কাজ ত্যাগ করল, কিন্তু যদি তার দ্বারা যিয়ারত হয় তখন সে লা‘নতের সম্মুখীন হলো।

অপরপক্ষে বিদআতী যিয়ারত হলোঃ ঐ যিয়ারত যা শরীয়ত গর্হিত, অনুমোদিত নয় সে পদ্ধতিতে করা হয়। যেমন কেউ কবরবাসীকে ডাকার জন্য, তাদের দ্বারা বিপদ হতে উদ্ধার পাবার আশায়, তাদের কাছে প্রয়োজন পূরণ হওয়া চাওয়া এ জাতীয় উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারতে বের হলো; তাহলে তার এ যিয়ারতের দ্বারা মৃত ব্যক্তি কোন প্রকার উপকৃত হবে না, জীবিত যিয়ারতকারী এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, জীবিত ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারণ সে এমন কাজ করেছে যা বৈধ নয়, কেননা তা আল্লাহর সাথে শির্ক। আর মৃত ব্যক্তি এর দ্বারা কোন উপকৃত হতে পারেনি কারণ তার জন্য দো‘আ করা হয়নি, বরং আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আহবান করা হয়েছে।

আমাদের শাইখ আবদুল আযীয ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) তার ‘মানসাক’ গ্রন্থে বলেনঃ “কবরের কাছে দো‘আ করার উদ্দেশ্যে বা কবরের কাছে এতেকাফ করার উদ্দেশ্যে অথবা কবরবাসীদের কাছে প্রয়োজন পূরনার্থে প্রার্থনার উদ্দেশ্যে অথবা কবরবাসীদের কাছে অসুস্থকে সুস্থতা দেয়ার জন্যে অথবা তাদের অসীলায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা অথবা তাদের মান-মর্যাদার দোহাই দিয়ে আল্লাহর কাছে চাওয়া আরও এ জাতীয় যত উদ্দেশ্যে যিয়ারত করা হয় সেগুলো বিদ‘আতী নিন্দনীয় যিয়ারত, যা আল্লাহ কক্ষনো অনুমোদন করেননি, তেমনিভাবে তাঁর রাসূলও প্রবর্তন করেননি, সালফে সালেহীন রাদিয়াল্লাহু আনহুমও এ কাজটি করেননি । বরং এটা খারাপ আজেবাজে কথার অন্তর্ভূক্ত, যার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন, তিনি বলেছেনঃ

"زُوْرُوْا الْقُبُوْرَ وَلاَ تَقُوْلُوْا هُجْراً"

“তোমরা কবর যিয়ারত কর, আজে বাজে খারাপ কথা বলো না”।

উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো বিদ‘আত হিসাবে একত্রে বুঝানো হলেও এগুলির মধ্যে বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে, তম্মধ্যে কিছু আছে বিদ‘আত তবে শির্ক নয়, যেমনঃ কবরের কাছে আল্লাহর কাছে চাওয়া, আল্লাহর কাছে মৃত ব্যক্তির হক্ব ও মান-মর্যাদার অসীলা দিয়ে কিছু চাওয়া ইত্যাদী, আবার এগুলোর মধ্যে কোন কোনটা বড় শির্কের অন্তর্ভূক্ত যেমনঃ মৃত ব্যক্তিকে ডাকা, তাদের সাহায্য চাওয়া ...ইত্যাদি।

***

এতটুকুই আমি উল্লেখ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম, আমি মহান আল্লাহর কাছে দো‘আ করি তিনি যেন আমাদেরকে, মদীনার অধিবাসীদেরকে, এর যিয়ারতকারীদের এবং সমস্ত মুসলিমকে এমন বস্তুর তাওফীক দেন যা দুনিয়া ও আখেরাতে পরিণতির দিক থেকে প্রশংসিত হয় এবং আমাদেরকে এ পবিত্র নগরীতে সুন্দরভাবে বসবাস করার ও ভালোভাবে এর আদবসমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখা নসীব করেন। আর আমাদের শেষ পরিণতি যেন সুন্দর করেন।

আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর বংশধর, এবং তার সমস্ত সাথীদের উপর সালাত ও সালাম পাঠ করুন।

****

ভাষান্তরঃ

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

এমএম (ঢাকা), লিসান্স, এমএ, এম-ফিল, পিএইচ ডি (মদীনা)

প্রভাষক, আল-ফিকহ বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

বাংলাদেশ



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )