আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী   
Tuesday, 27 November 2007
আর্টিকেল সূচি
ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি
সম্মেলনের উদ্দেশ্য
আমাদের দাওয়াত
মুনাফিকীর মূলকথা
কমীর্য় বৈশাদৃশ্যের তত্ত্বকথা
নেতৃত্বে মৌলিক পরিবতর্নের আবশ্যকতা
নেতৃত্বের পরিবতর্ন কিরূপে হইবে
বিরুদ্ধতা ও উহার কারণ
আমাদের কর্মনীতি
আলিম ও পীর সাহেবদের দোহাই
জামায়াতের কর্মীদের প্রতি উপদেশ

আমাদের কর্মনীতি

অতঃপর আমাদের এই আন্দোলনের জন্য গৃহীত কর্মনীতি সংক্ষেপে পেশ করিতে চেষ্টা করিব। আমাদের মূল দাওয়াতের ন্যায় আমাদের কর্মনীতিও কুরআন এবং নবীদের কর্মনীতি তইতে গৃহীত হইয়াছে। আমাদের দাওয়াত যাহারা গ্রহণ করে, আমরা তাহাদেরকে সর্বপ্রথম কার্যত খোদার দাসত্ব অনুযায়ী জীবন গড়িয়া তুলিতে এবং এই কাজে নিজেদের ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও একাগ্রতার প্রমাণ উপস্হিতি করিতে বলিয়া থাকি। ঈমানের বিপরীত সকল কাজ হইতেই তাহাদের নিজেদের জীবনকে পবিত্র করিতেও বলি। বস্তুত এখান হইতেই তাহাদের চরিত্র শুদ্ধি, স্বভাব-প্রকৃতি গঠন এবং উহার যাচাই শুরু হইয়া যায়। যাহারা বড় ও উচ্চ লক্ষ্য সম্মুখে রাখিয়া উচ্চশিক্ষা লাভ করিয়াছেন, তাহাদেরকে নিজেদের রচিত গগনচুম্বী স্বপ্ন-প্রাসাদ নিজেদের হাতেই ধূলিসাৎ করিয়া দিতে হয় এবং এমন এক জীবন ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করিতে হয়, যাহাতে মান-সম্মান, পদমর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের সম্ভাবনা তাহাদের নিজেদের জীবনেই শুধু নহে, পরবর্তী কয়েক পুরুষ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় না। আর যাহাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা, লুণ্ঠিত সম্পদ, অংশীদারীদের অপহৃত অংশ এবং উত্তরাধিকারীদের হক নষ্ট করা সম্পত্তি জমি-জায়গার উপর স্হাপিত, এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ফলে তাহাদেরকে ইহার সবকিছু ত্যাগ করিয়া সর্বহারা সাজিতে হয়। তাহাদের একমাত্র কারণ এই যে, তাহারা যে খোদাকে নিজেদের মালিক ও মনিব হিসিবে স্বীকার করিয়াছে, সেই খোদাই কাহারো সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা মোটেই পছন্দ করেন না। যাহাদের জীবিকা নির্বাহের উপায় শরীয়ত বিরোধী কিংবা বাতিল রাষ্ট্র ব্যবস্হার সহিত সংশ্লিষ্ট ছিল, উন্নতির স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, বর্তমান উপায়ে অর্জিত খাদ্যের একমুঠি গলাধকরণ করাও তাহাদের পক্ষে দুঃসহ হইয়া পড়ে। ফলে তাহা বর্তমান জীবিকার উপায় পরিত্যাগ করিয়া অন্য একটি পবিত্র পন্হা- তাহা যতই নিকৃষ্ট হোক না কেন- গ্রহণ করিতে প্রাণপ্রণে চেষ্টা করে। এতদ্ভিন্ন উপরে যেমন বলিয়াছি কার্যত এই আদর্শ গ্রহণ করিলেই প্রত্যেকটি লোকের সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী লোকজন তাহার দুশমন হইয়া পড়ে। তাহার পিতা-মাতা, ভাই-বন্ধু, স্ত্রী-সন্তান এবং নিকটাত্মীয় লোকই সর্বপ্রথম তাহার ঈমানের সহিত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এই আদেশ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষেরই শান্তিপূর্ণ ও স্নেহময় নীড় বোলতার বাসায় পরিণত হয়। বস্তুত ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ইহাই হইতেছে সর্বপ্রথম ট্রেনিংকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের মারফতের আমরা সৎ, নিষ্ঠাবান ও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র এবং দৃঢ় স্বভাব-প্রকৃতির কর্মী লাভ করিয়া থাকি। ইহা ইসলামী আন্দোলনের অনূকুলে খোদার তরফ হইতে এক স্বাভাবিক অবস্থা। এই প্রাথমিক অগ্নিপরীক্ষায় যাহারা ব্যর্থ হয়, তাহারা এই আন্দোলন ও সংগঠন হইতে স্বতঃই ঝরিয়া পড়ে, আমাদের সেই জন্য বিশেষ কোন কষ্ট স্বীকার করিতে হয় না। আর যাহারা ইহাতে সাফল্য লাভ করে, তাহারা নিজেদের প্রাথমিক নিষ্ঠা, একাগ্রতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, দৃড়সংকল্প, সত্যের প্রতি প্রেম এবং সুদৃঢ় স্বভাব-প্রকৃতির অস্তিত্ব প্রমান করে যাহা খোদার পথে অন্তত প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং পরীক্ষার প্রথম অধ্যায় অতিক্রম করার জন্য একান্তই অপরিহার্য। এই অধ্যায়ের সফলতা প্রাপ্ত লোকদের আমরা আমরা অপেক্ষাকৃত অধিক বিশ্বাসযোগ্য মনে করিয়া দ্বিতীয় অধ্যায়ের দিকে অগ্রসর করিতে পারি। কারণ এই অধ্যায়ে পূর্বাপেক্ষাও অধিক কঠিন পরীক্ষা দেখা যায়। সেই পরীক্ষা আর একটি অগ্নিকুন্ডের সৃষ্টি করে, তাহাও পূর্বানুরূপ ‘জাল মুদ্রাগুলিকে’ বাছাই করিয়া দূরে নিক্ষেপ করে এবং খাঁটি ও অকৃত্রিম মুদ্রাগুলি আমাদের কাছে রাখিয়া দেয়। আমাদের জ্ঞানমতে আমরা দৃঢ়তার সহিত বলিতে পারি যে, মানবীয় খনি হইতে অকৃত্রিম ও কার্যকরী অংশগুলি ছাটাই করিবার এবং উহাদের অধিকতর কর্মপযোগী করিয়া তুলিবার জন্য ইহাই চিরন্তন ও শাশ্বত পন্থা। এই অগ্নিকুন্ডে যে ‘তাকওয়া’ গড়িয়া ওঠে, তাহা ফিকাহ শাস্ত্রের পরিমাপে উত্তীর্ণ না হইলেও এবং পীরের ‘ খানকার’ মানদন্ডে অসম্পূর্ণ হইলেও মূলত এই ধরনের তাকওয়া’ই বিশ্ব পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করিবার এবং এই বিরাট আমানতের দুর্বহ ভার বহন করিবার যোগ্য হইয়া থাকে। ‘খানকায়’ যে তাকওয়ার সৃষ্টি হয়, তাহা ইহার একশত ভাগের একভাগও বহন করিবার যোগ্য হইতে পারে না ।

দ্বিতীয়ত, জামায়াতের সদস্যদের উপর আদর্শ প্রচারেরও দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। যে সত্যের আলো তাহারা লাভ করিয়াছে, উহাকে নিজেদের নিকটবর্তী পরিবেশের সকল লোকের মধ্যে বিকীর্ণ করিও তাহাদের অন্যতম ও প্রধান কর্তব্য। এইসব ক্ষেত্রে হইতেও যাহাতে কিছু না কিছু লোক এই সত্যকে গ্রহণ করে, সেই জন্য চেষ্টা করা তাহাদের দায়িত্ব হিসাবে গণ্য হয়। এখানে আবার নতুন পরীক্ষা শুরু হইয়া যায়। সর্বপ্রথম এই প্রচারমূলক কাজের চাপে প্রচারকের নিজের জিবনই নির্ভুল হইতে শুরু করে। কারণ এই কাজ আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য দূরবীক্ষণ ও সন্ধানী আলো (SEARCH-LIGHT) তাহার জীবন ও চরিত্রের দিকে উত্তোলিত হয়। ফলে প্রচারকের নিজের জীবনে ঈমান বিরোধী সামান্য কিছু থাকিলেও এই বিনা পয়সার সংশোধনী প্রচেষ্টার সাহায্যে তাহার নিজের নিকট উহা স্পষ্ট হইয়া ধরা পড়ে এবং নিরন্তর চাবুক লাগাইয়া তাহার জিবনকে নিখুঁত ও নিমর্ল করিয়া তোলে। প্রচারকই প্রকৃতই যদি এই দাওয়াতের প্রতি ঐকান্তিক নিষ্ঠার সহিত ঈমান আনিয়া থাকে, তবে এই সমালোচনায় সে মোটেই ক্ষিপ্ত ও ক্ষুদ্ধ হইবে না এবং গোঁজামিল দিয়া নিজের কাজের ভুল গোপন করিতে কখনও চেষ্টা করিবে না। বরং লোকদের এই সমালোচনার আলোকে তাহা নিছক পরিশুদ্ধতার উদ্দেশ্যে হইলেও বিনা পরিশ্রম ও বিনা ব্যয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করিয়া লইবার অবকাশ পাইবে। যে পাত্রকে শত শত হাত মাজিয়া-ঘষিয়া সাফ করিতে চেষ্টা করিবে, উহার ময়লা যতই পুঞ্জীভূত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাহা যে নির্মল ও স্বচ্ছ হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই।

শুধু তাহাই নহে, এই ধরনের প্রচার-প্রক্রিয়ার ফলে আমাদের কর্মীদের মধ্যে এমন অনেক গুণ বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষ হয়, যাহা পরবর্তী কর্মক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে বৃহত্তর কাজে ব্যবহার করা যায়। প্রচারক যখন নানাবিধ প্রতিকূল ও হতাশাব্যঞ্জক অবস্হার মধ্য দিয়া অগ্রসর হইতে থাকে, কোথাও তাহার উপর বিদ্রুপবান বর্ষিত হয়, কোথাও অপমানকর উক্তি শুনিতে হয়, অসংখ্য প্রকার ভৎসনা এবং নানাবিধ মূর্খতামূলক কার্য দ্বারা তাহাকে অভ্যর্থনা করা হয়, কোথাও তাহার উপর নানা প্রকার দোষারোপ ও অভিযোগ উত্থাপন করিয়া তাহার জীবনকে ভারাক্রান্ত করিয়া তোলা হয়, কোথাও তাহাকে নানা প্রকার ফেতনা ও ঝগরা-বিতর্কে জড়াইবার জন্য অভিনব উপায় অবলম্বন করা হয়, কোথাও তাহাকে ঘর হইতে বিতাড়িত করা হয়, উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত করা হয়, বন্ধুতা এবং আত্মীয়তা ছিন্ন করা হয় এবং তাহার নিজ পরিবেশে তাহার জীবন দুর্বিষহ করিয়া দেওয়া হয়। এইরূপ অবস্হায়ও আমাদের যে কর্মী সাহস হারায় না, সত্যের এই আন্দোলন হইতে বিরত থাকে না, বাতিলপন্হীদের সম্মুখে আত্মসমর্পন করিতে প্রস্তুত হয় না, বিক্ষুব্ধ হইয়া নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার ভারসাম্য হারায় না, বরং ইহার বিপরীত বৈজ্ঞানিক কর্মপন্হা, গভীর বুদ্ধিমত্তা, নমনীয় দৃঢ়তা, স্হিরতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পরহেযগারী ও ঐকান্তিক একনিষ্ঠ মন লইয়া নিজ আদর্শের অনুকূল করিয়া তুলিবার জন্য অবিশ্রান্তভাবে চেষ্টা করে, তাহার মধ্যে যে উচ্চতর মহান গুণাবলীর পূর্ণবিকাশ ও উৎকর্ষ সাধিত হইবে, তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকিতে পারে না। আর ব্স্তুত এই ধরনের গুণ-বৈশিষ্ট্যই ইসলামী আন্দোলনের পরবর্তী অধ্যায়সমূহে একান্ত অপরিহার্য।

আদর্শ প্রচারের জন্য আমরা আমাদের কর্মীদের কুরআনে উপস্হাপিত কর্মনীতিই শিক্ষা দিতে চেষ্টা করিয়াছি। অর্থাৎ যুক্তি, জ্ঞান, বুদ্ধি এবং মহৎ উপদেশের সাহায্যে লোকদেরকে খোদার পথে আহবান জানানো, ক্রমশ এবং অত্যন্ত স্বভাবিক ক্রমিক নীতি অনুসারে লোকদের সম্মুখে দ্বীন ইসলামের প্রথমিক ও বুনিয়াদী মূলনিতিসমূহের ভিত্তিতে বাস্তব জীবন গড়িয়া তুলিতে চেষ্টা করা। কাহাকেও সাধ্যাতীত খোরাক দান, মূলনীতির পূর্বে খুঁটিনাটি বিষয় পেশ করা, মৌলিক দোষ-ত্রুটি দূর করিতে চেষ্টা করার পরিবর্তে বাহ্যিক দোষক্রটি দূর করিতে চেষ্টা করিয়া সময় নষ্ট করার মত অবৈজ্ঞানিক কাজ করিতে কর্মীদেরকে বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়। অবসাদ এবং বিশ্বাস ও কর্মগত ভ্রান্তিতে জড়িত লোকদের সহিত ঘৃণা ও অবজ্ঞা মিশ্রিত ব্যবহার না করিয়া একজন সুদক্ষ চিকিৎসকের ন্যায় সহানুভূতি ও কল্যাণ কামনার সহিত মানুষের প্রকৃত রোগের চিকিৎসা করিতে চেষ্টা করাই আমাদের কাজ। ভৎসনা এবং পাথর নিক্ষেপের উত্তরে কল্যাণকর কাজ করিতে শেখা, অত্যাচার ও নিপীড়ন হইলে ধৈর্য ধারণ করা , অজ্ঞ-মূর্খ লোকদের সহিত কু-তর্কে এবং স্বার্থসংকুল বিসম্বাদে লিপ্ত না হওয়া, অর্থহীন কথাবার্তার উন্নত ও মহান আত্মার ন্যায় উপেক্ষা করাই আমাদের কর্মীদের বৈশিষ্ট্য। সত্যের আদর্শ হইতে যাহারা দূরে থাকিতে চেষ্টা করে, তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করার পরিবর্তে সত্যানুসন্ধিৎসু লোকদের দিকেই অধিকতর দৃষ্টি দেওয়া কর্তব্য-বৈষয়িক পদমর্যাদার দিক দিয়া তাহারা যতই হীন হোকনা কেন। এই চেষ্টা সাধনার ব্যাপারে রিয়াকারী ও প্রদর্শনীমূলক কাজকর্ম হইতে দূরে থাকা, নিজেদের কীর্তিকলাপ গণিয়া গৌরবের সহিত লোকদের সম্মুখে পেশ করিয়া তাহাদের দৃষ্টি আকর্ষন করিতে চেষ্টা না করা, সকল কাজ একমাত্র খোদার উদ্দেশ্যে করা এবং উহার ফল খোদার নিকট হইতেই পাইবার আশা করা আমাদের কর্মীদের কর্তব্য। তাহাদের মনে এ ভাব থাকা দরকার যে, আল্লাহ তাহাদের সকল কাজ দেখিতেছেন এবং তিনি তাহাদের সকল কাজের মূল নিশ্চয়ই দিবেন। দুনিয়ার মানুষ উহার মূল্য বুঝুক আর না বুঝুক, মানুষ কোন সুফল দিক আর শাস্তিই দিক তাহাতে কিছু আসে যায় না । বস্তুত এইরূপ কর্মনীতিতে অনন্যসাধারণ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং অবিশ্রান্ত চেষ্টা সাধনার প্রয়োজন। দীর্ঘকাল পর্যন্ত ক্রমাগত কাজ করার পরও হয়ত কোনরূপ সুফল লাভ হইবে না-কৃত্রিম প্রদর্শনমূলক কর্মনীতিতে যদিও অল্প সময়ের কাজের দ্বারাই বিরাট লোভনীয় ফল লাভ করা যায়, কিন্তু আমাদের কর্মীগণ তাহা আদৌ গ্রহণ করিবে না। ইহার ফলে আমাদের কর্মীদের মধ্যে গভীর অন্তর্দৃষ্টি, গাম্ভীর্য, বুদ্ধিমত্তা, কর্মদক্ষতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সৃষ্টি হয়। এই আন্দোলনের অত্যধিক সংকটপূর্ণ এ শ্রমসাধ্য অধ্যায়সমূহে এই গুণাবলীর সর্বাধিক গুরুত্ব রহিয়াছে। ইহার ফলে আন্দোলন কিছুটা মন্হর গতিতে অগ্রসর হইতে থাকিলেও উহার প্রতিটি পদক্ষেপ সুদৃঢ় ও গভীর ভিত্তিতে স্হাপিত হয় একমাত্র এই ধরনের কর্মনীতির সাহায্যেই সমাজের সর্বোত্তম অংশকে আন্দোলনে টানিয়া আনা সম্ভব। স্হূল দৃষ্টিসম্পন্ন অপদার্থ লোকদের বিরাট ভীড় সৃষ্টি করার পরিবর্তে উল্লিখিত রূপ কর্মনীতির দ্বারাই সমাজের সর্বাধিক সৎলোকদেরকে আন্দোলনের কর্মী হিসাবে পাওয়া যাইতে পারে। এই ধরনের একজন কর্মী সহস্র অকর্মণ্য অপদার্থ লোকের অপেক্ষা যে সমধিক মূল্যবান ও শক্তিপ্রদ তাহাতেও কোন সন্দেহ থাকিতে পারে না। আমাদের কর্মনীতির একটি বিরাট অংশ এই যে, আমরা নিজেদেরকে বাতিল শাসন ব্যবস্হার আইন-আদালতের সাহায্যে সুযোগ হইতে বঞ্চিত করিয়াছি। আমরা নিজেদের মানবীয় অধিকার, নিজেদের জান-মাল, সম্মান-সম্ভ্রম কোন জিনিসেরই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাতিল রাষ্ট্র ব্যবস্হার কোন সাহায্যই গ্রহণ করিব না- যদিও ইহা আমাদের সকল সদস্যের উপর কর্তব্য হিসাবে চাপাইয়া দেওয়া হয় নাই, বরং ইহাকে একটি উচ্চমান হিসাবে সকলের সম্মুখে পেশ করা হইয়াছে এবং সকলকে ইহা গ্রহণ সম্পর্কে স্বাধীনতা দেওয়া হইয়াছে। তাহারা ইচ্ছা করিলে এই উচ্চতর মান পর্যন্ত পৌছিতে পারে, অন্যথায় প্রতিকূল অবস্হায় ঘাত-প্রতিঘাতে পরাজিত হইয়া অধোগতি লাভ করিবে। অবশ্য নিম্ন গতিরও এখানে একটা সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সেই শেষ সীমাও যাহারা লঙ্ঘন করিবে, যাহারা তাহাও নীচে পড়িয়া যাইবে, তাহাদেরকে আর জামায়াতের মধ্যে থাকিবার সুযোগ দেওয়া হইবে না। যে মিথ্যা মোকদ্দমা করে, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, কিংবা কোন যুক্তিসংগত কারণ ব্যতীত মোকদ্দমায় জড়াইয়া পড়ে- নিছক স্বার্থপরতা, লালসাবৃত্তি চরিতার্থতা কিংবা কোন বন্ধুতা বা আত্মীয়তার অমূলক সম্ভ্রম রক্ষার জন্য কোন মোকদ্দমায় লিপ্ত হয় জামায়াতে ইসলামীতে তাহার কোন স্হান হইতে পারে না।

আইন ও আদালত সম্পর্কে অনুসৃত আমাদের এই নীতির যৌক্তিকতা আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই অনুধাবন করিতে সমর্থ হয় না, এই জন্য নানা প্রকার অমূলক প্রশ্ন উত্থাপন করে। কিন্তু একটু চিন্তা করিলেই ইহার অন্তর্নিহিত বিপুল সার্থকতা উপলব্ধি করা যায়। প্রথমত, ইহা দ্বারা আমরা আমাদেরকে একটি আদর্শবাদী জামায়াত হওয়ার কথা বাস্তব কাজের সাহায্যে প্রমাণিত করিতে পারি। মনে রাখা দরকের যে ইহা একটি তামাশা ও স্ফূর্তির ব্যাপার নহে; এই জন্য অত্যন্ত তিক্ত ও কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় নিজেকে সমর্পণ করিতে হয়। আমরা যখন বলি, মানব জীবনের জন্য আইন রচনার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কাহারো নাই। যখন দাবী করি , প্র্রভুত্ব (SOVEREIGNTY) একমাত্র আল্লাহর এবং খোদার আনুগত্য না করিয়া ও তাহার আইন না মানিয়া পৃথিবীতে হুকুম বা শাসন চালাইবার অধিকার কেহ পাইতে পারে না। আমাদের বিশ্বাসই যখন এই যে, খোদায়ী আইন ব্যতীত মানুষের ব্যাপারসমূহের বিচার-ফায়সালা যে করিবে, সে কাফির, ফাসিক এবং জালিম, তখন আমাদের বিশ্বাস ও দাবী অনুযায়ী ও খোদার আইনের ভিত্তিতে আমাদের অধিকার স্হাপিত হওয়া কোন মতেই উচিত নহে। বাতিল রাষ্ট্র ক্ষমতার উপর আমরা হক ও বাতিলের বিচার ভার স্বভাবতই ন্যস্ত করিতে ক্ষতি এবং বিপদকালেও যথাযথভাবে পূরণ করিয়া দেখাইতে পারি, তবে ইহা আমাদের সততা, আমাদের স্বভাব, দৃঢ়তা, আদর্শবাদতা এবং আমাদের বিশ্বাস ও বাস্তব কাজে গভীর সামঞ্জস্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ হইবে। পক্ষান্তরে কোন স্বার্থ, আশা, লোভ, কোন বিপদাশঙ্কা, কোন যুলুম- নিপীড়নের আঘাত যদি আমাদের ঈমানের বিরুদ্ধে কাজ করিতে আমাদের বাধ্য করে, তবে ইহাতে আমাদের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও আমাদের স্বভাব- প্রকৃতির অন্তসারশূন্যতা প্রকট হইয়া উঠিবে এবং অতঃপর সেই জন্য প্রমাণেরই আবশ্যক হয় না। দ্বিতীয়ত, আমাদের সদস্যদের বিশ্বস্ততা প্রমাণ করিবার জন্য ইহা আমাদের নিকট এক সন্দেহাতীত মানদন্ড বিশেষ। আমাদের মধ্যে কোন সব লোক আস্হাভাজন, সুদৃঢ় এবং কোন ধরনের পরীক্ষায় তাহারা উত্তীর্ণ হইতে পারিবে বলিয়া আশা করা যায়, তাহা ইহারই মারফতে সঠিকভাবে জানিতে পারা যায়।

ইহার তৃতীয় এবং বিরাট সার্থকতা এই হইবে যে, আমাদের সদস্যগণ এই নীতি গ্রহণ করিবার পর সমাজের সহিত নিজেদের সম্পর্কে ও সম্বন্ধ আইনের পরিবর্তে ন্যায়নীতি ও নৈতিকতার ভত্তিতে স্হাপন করিতে স্বতঃই বাধ্য হইবে। তাহাদিগকে নিজেদের নৈতিক চরিত্র এত উচ্চমান পর্যন্ত পৌঁছাইতে হইবে- পরিবেশের মধ্যে নিজেকে এতদূর সত্যাদর্শ, দ্বীনপন্হী, খোদাভীরু এবং মঙ্গলময় কাজের বাস্তব প্রতীক হইতে হইবে যে, সমাজের লোকগণ স্বতঃই তাহাদের অধিকার, মান-সম্মান এবং জানমাল রক্ষা করিতে বাধ্য হইবে। কারণ এই নৈতিক সংরক্ষণ ব্যতীত আত্মরক্ষার আর কোন উপায় এই দুনিয়ায় তাহাদের নাই। এমতাবস্তায় নৈতিক নিরাপত্তা লাভ করিতে না পারিলে নিবিড় অরণ্যের শৃগাল পালের মধ্যে একটি ছাগল ছানার মতই তাহার অবস্হা হইবে, তাহাতে সন্দেহ নাই।

চতুর্থত, আমরা এইভাবে নিজেদেরকে ও নিজেদের সকল স্বার্থ ও অধিকারকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করিয়া বর্তমান সমাজের নৈতিক অবস্হাকে একবারে উলঙ্গ করিয়া তুলিতে চাই। আমরা পুলিশ, আদালতের সাহচর্য গ্রহণ করি না জানিতে পারিয়া চারিদিক হইতে আমাদের অধিকারের উপর যখন দস্যুবৃত্তির আঘাত হানা হইবে, তখন আমাদের দেশের ও সমাজের নৈতিক অবস্তা বিশ্বের সম্মুখে প্রকাশিত হইয়া উঠিবে । তখন বুঝিতে পারা যাইবে যে, আমাদের মধ্যে কত লোক শুধু আইন, শাসন ও পুলিশের ভয়েই ‘ভদ্র’ সাজিয়াছে, আর কতলোক ধর্ম, নৈতিকতার ও মানবতার মিথ্যা আবরণে আত্মগোপন করিয়া আছে এবং ধরপাকড়ের ভয় না পাইলে প্রকাশ্যভাবে দস্যুবৃত্তির যথার্থতা দেখাইতে পারে। ইহা দ্বারা আরও প্রমাণিত হইবে যে, সময় ও সুযোগ পাইলে এইসব ‘ভদ্র’ ধর্মচারী লোক নিকৃষ্টতম চরিত্রহীনতা, ধর্মহীনতা এবং পাশবিকতার বাস্তব প্রমাণ পেশ করিতে পারে। বস্তুত ইহা আমাদের জাতীয় নৈতিক চরিত্রের মধ্যে একটি গৃণ্যের ন্যায় ইহাকে ধ্বংসের দিকে লইয়া যাইতেছে। আমাদের এই কর্মনীতির ফলে এই ভিতরকার রোগ লোকসমক্ষে প্রকট হইয়া উঠিবে। তাহা দেখিয়া আমাদের সমাজের চক্ষু যেন উম্মীলিত হয় এবং যে মারাত্মক রোগকে আজ পর্যন্ত উপেক্ষা করা হইয়াছে উহার ভয়াভহতা সম্পর্কে যেন সঠিক ধারণা জন্মে। (আইন-আদালতের আশ্রয় গ্রহণ না করা নীতি ব্রিটিশ আমলে বর্তমান ছিল। পাকিস্তান আমলে এ নীতি পরিত্যক্ত হইয়াছে। বাংলাদেশ আমলে এ নীতিই চালু রহিয়াছে। ব্রিটিশ আমলের এই কঠিন নীতি কেউ মানিয়া চলিতে পারিলে খুবই ভাল। অবশ্য এ নীতি চাপাইয়া দেওয়ার বিষয় নয়-পালন করিবার ব্যাপার।)-অনুবাদক

আমাদের এই দাওয়াত ও কর্মনীতি আপনারা গভীর দৃষ্টিতে যাচাই কেরিয়া দেখুন, তীব্র সমালোচনার দৃষ্টিতে ইহা পরীক্ষা করুন, আমরা মানুষকে কোনক দিকে ডাকিতেছি এবং সেই জন্য যে কর্মনীতি আমরা গ্রহণ করিয়াছি তাহা অনুধাবন করুন- তাহা কতখানি সত্য। আল্লাহ এবং তাহার রাসূলের বিধানের সহিত ইহার সামঞ্জস্য আছে কি না, বর্তমান সমাজে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত রোগের ইহা কতখানি প্রতিষেধক হইতে পারে, তাহা গভীরভাবে যাচাই করিয়া দেখুন। আল্লাহর দ্বীনকে সর্বজয়ী এবং বাতিল মতবাদকে নির্মূল করার যে মহান উদ্দেশ্যে আমরা এই আন্দোলন চালাইতেছি, তাহা কতখানি কার্যকরি হইতে পারে তাহাও ভাবিয়া দেখুন।

অতঃপর কতগুলি সন্দেহ ও সংশয় সম্পর্কে আমি আলোচনা করিব এবং সেই সম্পর্কে আমার জবাব পেশ করিব।



সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 08 November 2009 )