আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী   
Tuesday, 27 November 2007
আর্টিকেল সূচি
ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি
সম্মেলনের উদ্দেশ্য
আমাদের দাওয়াত
মুনাফিকীর মূলকথা
কমীর্য় বৈশাদৃশ্যের তত্ত্বকথা
নেতৃত্বে মৌলিক পরিবতর্নের আবশ্যকতা
নেতৃত্বের পরিবতর্ন কিরূপে হইবে
বিরুদ্ধতা ও উহার কারণ
আমাদের কর্মনীতি
আলিম ও পীর সাহেবদের দোহাই
জামায়াতের কর্মীদের প্রতি উপদেশ

আলিম ও পীর সাহেবদের দোহাই

একটি পুরাতন প্রশ্ন নতুন করিয়া উত্থাপন করা হইতেছে। তাহা এই যে, দেশের বড় বড় আলিম ও পীর সাহেবান কি দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নহেন? উহার যে রূপ আজ জামায়াতে ইসলামী মারফতে ফুটিয়াছে, তাহারা কি আগেই তাহা বুঝিতে পারেন নাই? উপরন্তু যেমন বলা হইয়াছে, তাহাদেরকে বারবার বলা সত্ত্বেও তাহারা উহা গ্রহণ করেন না। শুধু তাহাই নহে, ইহার সহযোগিতা পর্যন্ত করিতে প্রস্তুত নহেন, ইহারই বা কারণ কি? ইহা দ্বারা কি এই কথা প্রমাণিত হয় যে, তাহারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে জামায়াতের পক্ষ হইতে যাহা কিছু প্রচার করা হয়, তাহাই মূলত দ্বীন ইসলামের বহির্ভূত জিনিস?

এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর এই যে, দ্বীন ইসলামকে বর্তমান কি অতীতের ব্যক্তিদের নিকট হইতে বুঝিতে চেষ্টা না করিয়া সব সময়ই কুরআন ও নবী করীম (সা.) -এর সুন্নাহ হইতে বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছি। এই জন্য খোদার দ্বীন আমার নিকট এবং অন্যান্য ঈমানদার ব্যক্তিদের নিকট কি দাবী করে, তাহা জানিবার জন্য কোন বুযুর্গ ব্যক্তি কি করেন আর কি বলেন, সেই দিকে আদৌ ভ্রুক্ষেপ করি নাই। ইহার পরিবর্তে আমি সবসময়ই কুরআন এবং রাসূলের কর্মনীতি বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছি। অতএব জ্ঞান লাভের এই পন্হার দিকে আমি আপনাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করিব। আমি যেদিকে আপনাদেরকে আহবান জানাইতেছি এবং এজন্য গৃহীত কর্মনীতি কুরআন পাকের নির্দেশসমূহ ও নবীদের কার্যকলাপ হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় কি না, আপনারা অনাবিল ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে শুধু তাহার বিচার করুন। কুরআন ও সুন্নাহ হইতে ইহা প্রমাণিত হইলে- আপনারা কুরআন ও সুন্নাহ হইতে জ্ঞান লাভ করিতে যদি প্রস্তুত থাকেন, তবে আপনারা আমার দাওয়াত গ্রহণ করুন, আমার সঙ্গে আপনারাও মিলিত হউন । আমাদের দাওয়াত ও কর্মনীতিতে কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত কিছু থাকিলে অসংকোচে তাহা প্রমাণ করুন। আমরা কোথাও কুরআন সুন্নাহ হইতে একবিন্দু দূরে সরিয়া গিয়াছি এই কথা যদি বাস্তিকই প্রমাণিত হয়, তবে প্রকৃত সত্য গ্রহণে আমরা এক মুহূর্তও বিলম্ব করিব না। কিন্তু হক ও বাতিল প্রমাণ করার জন্য আপনারা যদি কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতীত ব্যক্তি বিশেষের উপর নির্ভর করেন তবে তাহা আপনাদের ইচ্ছাধীন। আপনারা আজ নিজেদের ভবিষ্যত ব্যক্তিদেরই হাতে সমর্পন করুন, খোদার নিকটও তাহাই বলিবেন যে, আপনার দ্বীনকে কুরআন ও সুন্নাহর পরিবর্তে ব্যক্তিদের উপর ছাড়িয়া দিয়াছিলেন- এইরূপ উত্তর যদি আপনাদের খোদার নিকট রক্ষা করিতে পারে বলিয়া মনে করেন, তবে পৃথিবীর মানুষ আমাদের কথায় দৃষ্টিপাত করিলে তাহাদেরই কল্যাণ হইবে, না করিলে তাহাদেরই ক্ষতি হইবে- তাহাতে আমাদের কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি হইবে না।

তারপর দরবেশ ও দুনিয়াত্যাগী একটি দল গঠন করার কথা বলিয়া যে বিদ্রুপ করা হইয়াছে, তাহার উত্তরে আমাদের কথা এই যে, এই সম্পর্কে কোন প্রকার ভুল ধারণা বা ভুল ব্যাখ্যাদানের অবকাশ থাকা উচিত নহে। বস্তুত আমরা এমন একটি দল গঠন করিতে চাই , যাহার প্রত্যেকটি লোক একদিকে তাকওয়া -পরহেযগারীর ক্ষত্রে সমাজের সাধারণ পরহেযগার মুত্তাকীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর হইবে, আর অপরদিকে বিশ্ব পরিচালনার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার দিক দিয়াও সাধারণ দুনিয়াদার লোকের অপেক্ষা অনেক অগ্রসর হইবে। আমাদের মতে বিশ্বের সকল ভাঙ্গন ও বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ এই যে, সততা ও নেকী সম্পর্কে সঠিক ধারনা না থাকার দরুন ঘরের কোণায় গিয়া বসা এবং বাস্তব জগতের কাজ - কর্মের সহিত সকল সম্পর্ক ছিন্ন করাকেই পরহেযগারী মনে করা হয়। ইহার ফলে সমগ্র বিশ্বের পরিচালন-ভার সর্বাপেক্ষা অসৎ লোকদের হাতে আসিয়া পড়ে। এই অসৎ লোকদের মুখে নেকীর নাম উচ্চারিত হইলেও তাহা শুধু জনগণকে তাহাদের কোন সম্পর্ক থাকে না। এই বিপর্যয়ের সংশোধন হইতে পারে একটিমাত্র উপায়ে এবং তাহা এই যে খোদার নেক বান্দাহদের একটি সুসংবদ্ধ জামায়াত গঠন করিতে হইবে, এই দলের প্রত্যেকটি লোক খোদাভীরু হইবে, ন্যায়পন্হী ও বিশ্বাসভাজন হইবে, খোদার মোনোনীত চরিত্র ও গুণাবলীতে ভূষিত হইবে এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব পরিচালনার যোগ্যতাও সর্বাধীক হইবে, যেন বর্তমান দুনিয়ার লোকদের এই দুনিয়াদারীর ব্যাপারেই তাহারা পরাজিত করিতে পারে। আমাদের দৃষ্টিতে এতদপেক্ষা বড় রাজনীতি আর কিছুই হইতে পারে না। উপরন্তু ন্যায়পন্হীদের সুসংবদ্ধ করিয়া তুলিবার চাইতে বেশী কালোপযোগী ও সফল রাজনৈতিক আন্দোলন আর কিছুই হইতে পারে না। বস্তুত এমন একটি দল যতদিন গড়িয়া না উঠিতেছে, ততদিন পর্যন্ত বর্তমান নৈতিক চরিত্রহীন ও আদর্শহীন নেতৃবৃন্দ দুনিয়ার চারণভূমিতে চরিয়া বেড়াইবার অবসর পাইবে। কিন্তু যখন এই দল গঠিত হইবে তখন আপনারা বিশ্বাস করুন-কেবল এই দেশেরই নহে, সমগ্র পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, বিচার-ইনসাফ সব কিছুরই কর্তৃত্ব এই নতুন আদর্শবাদী দলেরই হস্তে অর্পিত হইবে। তখন এখানে ফাসিক ও কাফিরদের প্রদীপ আদৌ জ্বলিতে পারিবে না। এই বিপ্লব কিভাবে সম্পন্ন হইবে, তাহা আমি বলিতে পারি না। কিন্তু ইহা যে অনুষ্ঠিত হইবে তাহাতে আমার আগামীকালের সূর্যদয়ের ন্যায় সন্দেহাতীত বিশ্বাস রহিয়াছে। কিন্তু সেই জন্য শর্ত এই যে, সৎ লোকদের একটি দল সুসংবদ্ধ করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে।



সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 08 November 2009 )