আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলাম পরিচিতি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী   
Monday, 10 December 2007
আর্টিকেল সূচি
ইসলাম পরিচিতি
ইসলাম শব্দটির অর্থ
ঈমানের পরিচয়
হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর নবুয়াত
খতমে নবুয়াতের প্রমাণ
মানব জীবনে তাওহীদ বিশ্বাসের প্রভাব
কালেমা তাইয়েবা
দ্বীন ও শরীয়াত
চতুর্বিদ অধিকার

খতমে নবুয়াতের প্রমাণ

পয়গাম্বরীর তাৎপর্য আগেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই কথাগুলো বুঝে নিলে এবং তা নিয়ে চিন্তা করলে সহজেই জানা যাবে যে, পয়গাম্বর রোজ পয়দা হয় না, প্রত্যেক কওমের মধ্যে সবসময় পয়গাম্বরের আবির্ভাব হওয়ার প্রয়োজন নেই। পয়গাম্বরের জীবই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াতের জীবন। যতক্ষণ তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত জীবন্ত থাকে ততক্ষণ তিনি জীবিত থাকেন। পূর্ববর্তী পয়গাম্বরদের মৃত্যু ঘটেছে, কারণ যে শিক্ষা তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন দুনিয়ার মানুষ তা বিকৃত করে ফেলেছে। যেসব গ্রন্থ তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন তার কোনটিই আজ অবিকৃত অবস্থায় নেই। তাঁদের অনুগামীরাই আজ দাবী করতে পারছেনা যে, তাদের পয়গাম্বরের দেয়া আসল কিতাব তাদের কাছে মওজুদ রয়েছে, তারাই ভুলিয়ে দিয়েছে তাদের পয়গাম্বরের দেখানো পথ!পূর্ববর্তী পয়গাম্বরদের মধ্যে একজনের ও নির্ভুল নির্ভরযোগ্য বিবরণ আজ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রত্যয় সহকারে আজ বলা যায় না কোন জামানায় তিনি পয়দা হয়েছিলেন? কি কাজ তিনি করে গেছেন? কিভাবে তিনি জীবন যাপন করেছিলেন? কি কি কাজের শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন এবং কি কি কাজ থেকে মানুষকে বিরত করতে চেয়েছিলেন? এমনি করেই হয়েছে তাঁদের সত্যিকার মৃত্যু।

পক্ষান্তরে, হযরত মুহাম্মাদ (সা) আজো রয়েছেন জীবিত, কারণ তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত আজো জীবন্ত হয়ে রয়েছে। যে কুরআন তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজো তার তার মূল শব্দ-সম্ভার সহ অবিকৃত অবস্থায় মওজুদ রয়েছে তার একটি হরফ, একটি নোকতা, একটি যের যবরের পার্থক্য ও হয়নি কোথাও। তাঁর জীবন-কাহিনী তাঁর উক্তি সমূহ ও কার্যকলাপ সব কিছুই সুরতি হয়ে আছে। তেরশ বছরের ব্যবধানে আজো ইতিহাসে তাঁর বর্ণনা এমন সুস্পষ্টভাবে আমরা দেখতে পাই, যেন তাঁকে আমরা দেখেছি প্রত্যক্ষভাবে। হযরত (সা) এর ব্যক্তির জীবন-কাহিনী যেমন সুরতি হয়ে রয়েছে, দুনিয়ার ইতিহাসে আর কোন ব্যক্তির জীবন-কাহিনী তেমন অবিকৃতভাবে সুরক্ষিত হয়নি। আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজে, প্রতি মুহুর্তে হযরত (সা) এর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। তাতেই প্রমাণিত হয় যে হযরত (সা) এর পর আর কোন পয়গাম্বরের প্রয়োজন নেই।

এক পয়গাম্বরের পর অপর কোন পয়গাম্বরের আবির্ভাবের কেবল মাত্র তিনটি কারণ থাকতে পারেঃ

একঃ যখন পূর্ববর্তী পয়গাম্বরের শিক্ষা হেদায়াত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং পুনরায় তা পেশ করার প্রয়োজন হয়, দুইঃ যখন পূর্ববর্তী পয়গাম্বরের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে এবং তাতে সংশোধন ও সংযোজনের প্রয়োজন হয়, তিনঃ পূর্ববর্তী পয়গাম্বরের শিক্ষা যখন কোন বিশেষ জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং অপর জাতি বা জাতিসমূহের জন্য অপর কোন পয়গাম্বরের প্রয়োজন হয়।

উপরিউক্ত তিনটি কারণের কোনটিই বর্তমানে প্রযুক্ত হতে পারে না, কারণঃ

একঃ হযরত মুহাম্মাদ(সা)এর শিক্ষা ও হেদায়াত আজো জীবন্ত রয়েছে এবং সেসব মাধ্যম এখন পুরোপুরি সংরক্ষিত রয়েছে, যা থেকে প্রতি মুহুর্তে জানা যায়, হযরতের দ্বীন কি ছিল, কোন জীবন পদ্ধতির তিনি প্রচলন করেছিলেন এবং কোন কোন পদ্ধতি মিটিয়ে দেবার ও প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। যখন তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত আজো মিটে যায়নি, তখন আবার তা নতুন করে পেশ করার জন্য কোন নবী আসার প্রয়োজন নেই।

দুইঃ হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর মাধ্যমে দুনিয়াকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দেয়া হয়ে গেছে। এখন তার মধ্যে যেমন কিছু কম-বেশী করার প্রয়োজন নেই, তেমনি তার মধ্যে এমন কোন ঘাটতি নেই, যা পূরণ করার জন্য আর কোন নবী আসার প্রয়োজন হবে। সুতরাং দ্বিতীয় কারণটির কোন অস্তিত্ব নেই।

তিনঃ হযরত মুহাম্মাদ (সা) কোন বিশেষ কওমের জন্য পেরিত না হয়ে তামাম দুনিয়ার জন্য নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য তাঁর শিক্ষা যথেষ্ট। সুতরাং এখন কোন বিশেষ কওমের জন্য স্বতন্ত্র নবী আসার প্রয়োজন নেই। তাই তৃতীয় কারণটিও এ ক্ষেত্রে অচল।

এসব কারণে হযরত মুহাম্মাদ (সা)কে বলা হয়েছে ‘খাতামুন্নাবীয়্যিন’ অর্থাৎ যাঁর ভিতরে নবুয়াতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এখন আর দুনিয়ায় নতুন কোন নবীর আবির্ভাবের প্রয়োজন নেই; প্রয়েজন কেবল এমন মানুষের-যারা হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর পথে নিজেরা চলবেন ও অপরকে চালাবেন; যাঁরা তাঁর শিক্ষাধারাকে উপলব্ধি করবেন, তদনুযায়ী আমল করবেন এবং দুনিয়ায় যে আইন ও বিধান নিয়ে হযরত মুহাম্মাদ (সা) তশরিফ এনেছিলেন, সেই আইন ও বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করবেন।

ঈমানের বিবরণ

আগের অধ্যায়সমূহে যা বলা হয়েছে আরো সম্মুখে অগ্রসর হবার আগে একবার খতিয়ে দেখা প্রয়োজনঃ

একঃ ইসলাম বলতে যদিও বুঝায় আল্লাহর আনুগত্য ও তার আদেশের অনুবর্তিতা, তথাপি আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী তার ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন যাপনের পদ্ধতি এবং আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান কেবল মাত্র আল্লাহর পয়গাম্বরের মাধ্যমেই লাভ করা যেতে পারে। তাই ইসলামের নির্ভুল সংজ্ঞা অনুসারে পয়গাম্বরের শিক্ষার উপর ঈমান আনা এবং তাঁর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করাই হচ্ছে ইসলাম। যে ব্যক্তি পয়গাম্বরের পথ বর্জন করে সোজা-সোজি আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর হুকুমের অনুবর্তিতা করার দাবী করে, সে মুসলিম নয়।

দুইঃ পূর্বে আলাদা আলাদা কওমের জন্য আলাদা আলাদা পয়গাম্বর এবং একই কওমের মধ্যে ক্রমাগত একের পর এক পয়গাম্বরের আবির্ভাব হয়েছে। তখনকার দিনে প্রত্যেক কওমের জন্য, “ইসলাম” বলতে বুঝাত সেই র্ধম যা বিশেষ করে সেই কওমের পয়গাম্বর বা পয়গাম্বরগণ শিক্ষা দিয়েছিলেন। যদিও ইসলামের প্রকৃতি প্রত্যেক দেশে প্রত্যেক যুগে একই ছিল তথাপি শরীয়াত অর্থাৎ আইন ও ইবাদাতের পদ্ধতি ছিল বিভিন্ন। এ কারণে এক কওমের জন্য অপর কোন কওমের পয়গাম্বরের অনুসরণ অপরিহার্য ছিল না, যদিও সকল পয়গাম্বরের প্রতি ঈমান পোষণ ছিল অপরিহার্য।

তিনঃ হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা) যখন দুনিয়ায় পয়গাম্বর হিসেবে প্রেরিত হলেন, তখন তার মাধ্যমে ইসলামের শিক্ষা সুস্পন্ন করে দেয়া হল এবং তামাম দুনিয়ার জন্য একই শরীয়াত প্রেরণ করা, তার আনীত শরীয়াত সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য হল। হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আবির্ভাবের পূর্ববর্তী সকল পয়গাম্বরের প্রবর্তিত শরীয়াত প্রত্যাহৃত হল এবং এরপর কিয়ামত পর্যন্ত যেমন কোন নবী আসবে না, তেমনি আসবে না কোন নতুন শরীয়াত আল্লাহ তা’য়ালার তরফ থেকে। সুতরাং বর্তমানে একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আনুগত্যের নামই হচ্ছে ইসলাম। তাঁর নবুয়াতের স্বীকৃতি, তাঁর প্রতি প্রত্যয়ের ভিত্তিতে তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা মেনে চলা এবং তার সকল হুকুমকে আল্লাহর হুকুম মনে করে তার আনুগত্য করাই হচ্ছে ইসলাম। আর এমন কোন ব্যক্তি আল্লাহর তরফ থেকে আসবেন না যাঁকে মেনে চলা মুসলমান হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত থাকবে এবং যাকে না মানলে মানুষ কাফের হয়ে যাবে।

হযরত মুহাম্মাদ (সা) কোন কোন জিনিসের উপর ঈমান পোষণ করার শিক্ষা দিয়েছেন এবং তা মেনে নিলে মানুষ কিরূপ উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারে;তা-ই আমি এখন বলব।

আল্লাহর প্রতি ঈমান

হযরত মুহাম্মাদ (সা-এর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছেঃ

(আরবী) “আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই।”

এ কালেমা-ই হচ্ছে ইসলামের বুনিয়াদ-যা দিয়ে এক কাফের এক মুশরিক ও এক নাস্তিক থেকে মুসলিমের পার্থক্য নির্ধারিত হয়। এ কালেমার স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি দ্বারা এক মানুষ ও অপর মানুষের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রচিত হয়। এ কালেমার অনুসারীরা পরিণত হয় এক জাতিতে এবং অমান্যকারীরা হয় তাদের থেকে স্বতন্ত্র জাতি। এর অনুসারীরা দুনিয়া থেকে শুরু করে আখেরাতে পর্যন্ত উন্নতি, সাফল্য ও সম্মানের অধিকারী হয় এবং অমান্যকারীদের পরিণাম হচ্ছে ব্যর্থতা অপমান ও পতন।

এ ছোটখাট কথাটি কেবল মুখে উচ্চারণ করার ফলেই মানুষে মানুষে এ বিপুল পার্থক্য রচিত হতে পারে না; মুখে দশ লক্ষ্য বার ‘কুইনিন’ ‘কুইনিন’ বললে এবং তা সেবন না করলে যেমন ম্যালেরিয়া কখনো ছাড়তে পারেনা, তেমনি মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উচ্চরণ করলে, অথচ কি তার অর্থ, এ ক’টি শব্দ উচ্চরণ করে কত বড় জিনিসের স্বীকৃতি দান করা হল এবং এ স্বীকৃতির ফলে নিজের উপর কত বড় দায়িত্ব গ্রহণ করা হল তা যদি বুঝতে না পারা যায় তা হলে না বুঝে এমনি উচ্চারণ করার ফলে কারো কোন কল্যাণই সাধিত হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে প্রার্থক্য কেবল তখনই আসতে পারে, যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র তাৎপর্য অন্তরে প্রতিভাত হবে, তার অর্থের উপর পূর্ণ প্রত্যয় জন্মাবে এবং তাঁর বিরোধী যত রকম বিশ্বাস আছে, তা থেকে মন সম্পূর্ণরূপে মুক্তি লাভ করবে এবং আগুনের দাহিকা শক্তি ও বিষের মুত্যু ঘটাবার মতার প্রতি বিশ্বাস যতটুকু প্রভাব বিস্তার করে এ কালেমার প্রতি বিশ্বাস ও মন-মস্তিষ্কের উপর কমপক্ষে ততটা প্রভাব বিস্তার করবে। যেমন করে আগুনের প্রকৃতি সম্পর্কে ঈমান মানুষকে আগুনের স্পর্শ থেকে দূরে রাখে এবং বিষের প্রকৃতির উপর ঈমান বিষ পান থেকে তাকে বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি করে বিশ্বাস ও কর্মের সকল ক্ষেত্রে এ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমার উপর ঈমান শিরক, কুফর, নাস্তিকতা প্রভৃতি দুষ্কুতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রূপ থেকে মানুষ কে বিরত করে রাখবে।

‘লা -ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- র অর্থ

‘ইলাহ’ বলতে কি বুঝায়, সবার আগে তা-ই বুঝে নিতে হবে। আরবী ভাষায় ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ইবাদাতের যোগ্যঃ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব, গৌরব ও মহত্বের যে সত্তা উপাসনার যোগ্য এবং বন্দেগী ইবাদাতে যাঁর সামনে মস্তক অবনিমত করা যায়। ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থে এ তাৎপর্য ও শামিল রয়েছে যে, তিনি হবেন অনন্ত শক্তির অধিকারী যে শক্তির উপলব্ধি মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সীমানা অতিক্রম করে যায়। ‘ইলাহ’ শব্দের তাৎপর্যের মধ্যে এও রয়েছে যে, তিনি নিজে কারুর মুখাপেক্ষী হবেন না, অথচ আর সবাই জীবনের সকল ব্যাপারে তাঁর মুখাপেক্ষী হবে এবং তাঁর কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে বাধ্য হবে। ‘ইলাহ’ শব্দের মধ্যে রহস্যময়তার অর্থও নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ ‘ইলাহ’ তাকেই বলা যায়, যাঁর শক্তির উপর থাকবে রহস্যের আবরণ। ফারসী ভাষায় ‘খোদা’, হিন্দী ভাষায়, দেবতা, ইংরেজী ভাষায় ‘গড’ শব্দও এর কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার হয় এবং দুনিয়ার অন্যান্য ভাষায় একই অর্থে বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

‘আল্লাহ’ শব্দটি হচ্ছে একক -লা শরীক আল্লাহর ‘ইসমে জাত’ বা মৌলিক নাম, মূল সত্তার পরিচায়ক নাম। ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কথাটির শব্দগত তরজমা হচ্ছে কোন ইলাহ নেই সেই বিশেষ সত্তা ব্যতীত যাঁর নাম আল্লাহ। এর তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, সমগ্র সৃষ্টিতে আল্লাহ ব্যতীত এমন আর কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই, যে উপাসনা পাওয়ার যোগ্য হতে পারে। তিনি ব্যতীত এমন যোগ্যতাসম্পন্ন আর কেউ নেই, ইবাদাত বন্দেগী ও আনুগত্যে যার সামনে মস্তক অবনমিত করা হয়। তিনিই একমাত্র সত্তা, যিনি তামাম জাহানের মালিক ও বিধানকর্তা, সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী, সবাই একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই সাহায্য কামনা করতে বাধ্য। তিনি মানুষের উপলব্ধির বাইরে লুক্কায়িত এবং তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করতে গিয়ে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।

‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত তাৎপর্য

উপরে তা কেবল ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কথাটির শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করা গেল। এখন তার সঠিক তাৎপর্য পর্যালোচনা করব।

মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম যুগের যেসব তথ্য আমাদের হাতে এসেছে এবং প্রাচীনতম জাতিসমূহের যে সব ধ্বংসাবশেষ সন্ধান আমরা পেয়েছি, তা থেকে বুঝা যায়, প্রত্যেক যুগের মানুষ কোন না কোন খোদাকে মেনে নিয়েছে এবং কোন না কোন ধরনের ইবাদাত করেছে। আজো দুনিয়ার যত জাতি রয়েছে-তারা নিতান্ত আদিম প্রকৃতির হোক অথবা সুসভ্য হোক, তাদের সবারই মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই যে, তারা কোন বিশেষ সত্তাকে খোদা বলে মানছে, তার ইবাদাত করেছে। এ থেকে বুঝা যায় যে, খোদার ধারণা মানুষের প্রকৃতির শামিল হয়ে আছে। তার ভিতরে এমন কোন জিনিস রয়েছে যা তাকে বাধ্য করেছে কাউকে খোদা মানতে ও তার ইবাদাত করতে।

এরপর প্রশ্ন ওঠে মানুষের মধ্যে সেই বিশেষ জিনিসটি কি? প্রত্যেকটি লোক তার নিজের অস্তিত্বের প্রতি ও সকল মানুষের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আপনা থেকেই এর জবাব উপলব্ধি করতে পারবে।

প্রকৃতপক্ষে, মানুষ বান্দা হয়েই পয়দা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সে পরমুখাপেক্ষী, দুর্বল ও দুঃস্থ। তার অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য যে অসংখ্য জিনিসের প্রয়োজন, তা তার শক্তির আধিপত্যের অধীন নয়। কখনো আপনা থেকেই তা তার হাতে আসে, আবার কখনো বা সে তা থেকে বঞ্চিত হয়।

এমন অনেক জিনিসই তো রয়েছে, যা তার পক্ষে কল্যাণকর। সে তা অর্জন করতে চায়;কিন্তু সেই সব জিনিস কখনো তার হাতে আসে, কখনো বা আসেনা; কারণ সেই সব জিনিস অর্জন করার স্বাধীন ক্ষমতা আদৌ তার নেই।

আবার এমন অনেক জিনিস আছে, যা তার অনিষ্ট সাধন করে, তার সারা জীবনের পরিশ্রম মুহুর্তে বিনষ্ট করে দেয়, তার সকল আশা-আকাংখাকে ধূলি-লুন্ঠিত করে দেয় তাকে ব্যাধী ও মৃত্যুর কবলগ্রস্ত করে দেয়। সে চায় সেই সব অনিষ্টকর জিনিসকে ধ্বংস করে দিতে;কখনো তা ধ্বংস হয়, কখনো হয়না। তার ফলে সে উপলব্ধি করে যে, সেই সব জিনিসের আসা না আসা, দূর হওয়া না হওয়ার উপর তার কোন কর্তৃত্ব নেই।

এমন অনেক কিছুই রয়েছে, যার শান-শওকত ও বৃহত্ব দেখে মানুষ ভীত হয়ে পড়ে। পাহাড়, নদী ও ভয়াবহ হিংস্র জানোয়ারের রূপ তার চোখের সামনে আসে। ঝড়ঝঞ্জা, প্লাবন ও ভুমিকম্পের নগ্নরূপ সে দেখতে পায়। মেঘের গর্জন, অন্ধকার ঘনঘটা, বজ্রের হুংকার বিজলীর চমক ও মুষলধারা-বৃষ্টির দৃশ্য একের পর এক তার চোখের সামনে আসতে থাকে। সে দেখে যে, এসব জিনিস কত বড়, কত শক্তিশালী, কত মহিমাময় আর তার তুলনায় সে নিজে কত দুর্বল কত নগণ্য।

এসব বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য ও তার নিজের দীনতার বিভিন্ন প্রমাণ চোখের সামনে দেখে মানুষের অন্তরে স্বতঃই নিজের দাসত্ব (বন্দেগী), পরমুখাপেক্ষিতা ও দুর্বলতার অনুভুতি জাগ্রত হয় এবং সেই অনুভূতির সাথে সাথেই জন্মে আল্লাহর ধারণা। যে হাতের ইংগিত চালিত হয় এসব মহাশক্তি, তাঁর ধারণা তার মনে জাগ্রত হয়। তাঁর শক্তির অনুভূতি মানুষকে বিনয়-নম্র করে, তারই কাছে সাহায্য ভিক্ষা করতে বাধ্য করে। তাঁর কল্যাণদায়ক শক্তির অনুভূতি মানুষকে বাধ্য করে বিপদ মুক্তির জন্য তাঁরই সামনে হস্ত প্রসরিত করতে। তার অনিষ্টকর শক্তির অনুভূতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে তাঁর ভীতি অন্তরে পোষণ করতে এবং তাঁর গযব থেকে বাঁচার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে।

অজ্ঞতার সর্বনিম্ন স্তর তাকেই বলা যায়, যখন মানুষে এসব ঐশ্বর্য ও শক্তিতে প্রত্যক্ষ ও তাদের কল্যাণকর বা অনিষ্টকর রূপ দেখে মনে করে যে, এরাই খোদা, তারা পূজা করতে থাকে জানোয়ার, পাহাড় ও নদীকে। তারা পূজা করে যমীন, আগুন, বৃষ্টি, হাওয়া, চন্দ্র, সূর্য ও আরো কত শক্তির।

যখন এ অজ্ঞতার মাত্রা কিছুটা কম থাকে এবং জ্ঞানের আলোক কিছুটা পাওয়া যায়, তখন বুঝা যায় যে, এসব জিনিস মানুষেরই মত পরমুখাপেক্ষী কত বড় জানোয়ার তুচ্ছ মশা-মাছির মত মরে যায়;প্রকান্ড প্রকান্ড নদীর পানি ওঠে, নামে, শুকিয়ে যায়, মানুষ নিজেই কেটে ফেলে পাহাড়। যমীনের ফলে-ফুলে সমৃদ্ধ হওয়া তার নিজর ইচ্ছাধীন নয়, পানি যখন তাকে সাহায্য করেনা, তখনই যমীন হয় শুষ্ক অনুর্বর। পানিও নিজের খুশী মত চলতে পারে না, তাকেও হতে হয় হাওয়ার মুখাপেক্ষি। হাওয়াও নিজের ক্ষমতার অধীন নয়, তার কল্যাণ অকল্যাণ নির্ভর করে অন্যবিধ কল্যাণের উপর। চন্দ্র, সূর্য, তারকার কোন বিশেষ বিধানের আনুগত্য করে চলে। এ বিধানের বাইরে তারা কখনো তাদের গতির বিন্দুমাত্র রদবদল করতে পারে না। এসব দেখে শুনে মানুষের মন কোন অদৃশ্য রহস্যাবৃত মুক্তির দিকে ফিরে যায় তখন সে ভাবতে থাকে যে, এসব দৃশ্যমান বস্তুসমূহের অন্তরালে রয়েছে এমন রহস্যাবৃত শক্তিপুঞ্জ, যারা পরিচালিত করছে তাদেরকে এবং সবকিছুই হচ্ছে এ শক্তিপুঞ্জের অধীন। এখান থেকেই বহু খোদা ও বহু দেবতার ধারণার উদ্ভব হয়েছে। এ অবস্থাতেই মানুষ মেনে নিয়েছে আলো, হাওয়া, পানি ব্যাধি, স্বাস্থ্য ও আরো বহু জিনিসের আলাদা আলাদা খোদার অস্তিত্ব। তাদের কাল্পনিক মূর্তি তৈরী করে তারা করে চলেছে তাদের পূজা।

এরপর যখন আরো বেশী করে জ্ঞানের আলো আসতে থাকে, তখন মানুষ দেখতে পায় যে, দুনিয়ার ব্যস্থাপনা চলছে এক শক্তিশালী আইন ও এক বড় রকমের বিধানের অনুসরণ করে। হাওয়ার গতি, বৃষ্টির আগমন, গ্রহ উপগ্রহের আবর্তন, ঋতুসমূহের পরিবর্তনের মধ্যে কি নিয়ম শৃঙখলা বিরাজমান; কিভাবে অগণিত শক্তি মিলে- মিশে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বজগতের এ সামঞ্জস্য লক্ষ্য করে একজন মুশরিককেও মেনে নিতে হচ্ছে যে, সব ছোট ছোট খোদার উপর রয়েছে সবার বড় এক খোদার সার্বভৌম আধিপত্য; নইলে এসব ভিন্ন ভিন্ন খোদা অনন্য নির্ভশীল ও স্বতন্ত্র হলে এবং সর্বত্র তাদের স্বেচ্ছাতন্ত্র চালিযে গেলে বিশ্বের এ বিপুল বিরাট কারখানা বির্পযস্ত হয়ে যেত এই বড় খোদার নাম দিয়েছে সে ‘আল্লাহ’ ‘পরমেশ্বর’ ‘খোদায়ে খোদাগান’ -আরো কত কিছু। উপাসনার ক্ষেত্রে ছোট খোদাকেও শরীক করেন তাঁর সাথে। তার ধারণা আল্লাহর কর্তৃত্ব চলছে পার্থিব রাজা-বাদশাহর রাজত্বেরই মত। যেমন দুনিয়ার এক বাদশাহ রাজত্ব করেন তাঁর থাকে বহু মন্ত্রী, বিশ্বস্ত অনুচর, শাসনকর্তা ও দায়িত্বশীল কর্মচারী, তেমনি করে এ সৃষ্টির উপর রয়েছেন এক বড় খোদা; আর বহু ছোট ছোট খোদা রয়েছে তাঁর অধীনে। যতক্ষণ না এসব ছোট ছোট খোদা কে খুশী করা যাবে, ততক্ষণ বড় খোদার কাছে যাওয়া যাবে না। সুতরাং তাদেরও উপাসনা কর তাদের কাছে হাত পাত, তাদের অসন্তোষের ভয় কর, তাদেরকে বড় খোদার কাছে পৌঁছাবার মাধ্যমে পরিণত কর এবং নযর- নিয়ায দিয়ে তাদেরকে খুশী রাখ।

আবার যখন জ্ঞানের ক্ষেত্রে আরো উন্নত হতে থাকে খোদার সংখ্যা তখন আরো কমতে থাকে। অজ্ঞ মানুষেরা যত খোদা তৈরী করে রেখেছে, তার মধ্যে এক একটির চিন্তা করলে মানুষ বুঝতে পারে যে, সে খোদা-ই নয়। সে আমাদেরই মত এক বান্দাহ, এবং আমাদের চেয়েও বেশী অসহায় সে। এমনি করে একে একে এসব কাল্পনিক খোদা পরিত্যক্ত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত কেবল এক খোদাই অবশিষ্ট থাকেন। কিন্তু এ এক খোদা সম্পর্কে ও মানুষের ধারণার অনেকখানি অজ্ঞাতার পরিচয় পাওয়া যায়। কেউ ধারণা করে যে, খোদা আমাদের মত রক্ত মাংসের দেহের অধিকারী এবং তিনি এক নির্দিষ্ট স্থানে বসে তাঁর খোদায়ী চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ মনে করে খোদা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে মানুষের মত বাস করেন এবং মানুষের মত তাঁর সন্তান-সন্তুতির ধারা চলে আসছে। কেউ আবার অনুমান করে যে খোদা দুনিয়ার মানুষের আকৃতি ধারণ করে অবতরণ করে দুনিয়ায়। কেউ বলে খোদা এ দুনিয়ার কারখানা চালু করে দিয়ে নির্বিকভাবে বসে আছেন এবং কোথাও আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন। কারুর ধারণা, খোদার কাছে বুযর্গ লোকদের আত্মা সমূহের সুপারিশ অপরিহার্য এবং তাদের মাধ্যমে ব্যতীত সেখানে কোন কাজ চলতে পারে না। কেউ তার ধারণায় আল্লাহর এক বিশেষ রূপ পরিকল্পনা করে নেয় এবং উপাসনার জন্য সেইরূপ সম্মুখে স্থাপন করার অপরিহার্য প্রয়োজন অনুভব করে। তাওহীদ বিশ্বাস পোষণ করা সত্ত্বেও এ ধরনের বহুবিধ ভুল ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে থাকে, যার ফলে মানুষ শিরক অথবা কুফরে নিমজ্জিত হয়। এর সব কিছুই হচ্ছে অজ্ঞতার পরিণতি।

সবার উপরে রয়েছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কথাটির স্থান। এ হচ্ছে সেই জ্ঞান যা খোদ আল্লাহ তা’য়ালাই প্রত্যেক যুগে তার নবীদের মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রেরণ করেছেন। এ জ্ঞান সবার আগে তিনি হযরত আদম (আ) কে দিয়ে তাঁকে দুনিয়ায় অবতীর্ণ করেছিলেন। আদম (আ) এর পরে এ জ্ঞান লাভ করেছিলেন হযরত নূহ (আ), হযরত ইবরাহীম (আ), হযরত মূসা (আ) ও অন্যান্য সকল পয়গাম্বর। আবার এ জ্ঞান নিয়েই সবার শেষে দুনিয়ায় তাশরীফ এনেছিলেন হযরত মুহম্মাদ (সা)। এ নির্ভুল জ্ঞানের মধ্যে কোন অজ্ঞতার স্পর্শ নেই। উপরে শির্ক বুতপরস্তি ও কুফরের যত রূপ আমি বর্ণনা করেছি, মানুষ পয়গাম্বরদের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজস্ব উপলব্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভর করেছে বলেই তাতে জড়িত হয়েছে। এবার এ ছোট খাট কথাটির অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করব।

একঃ সবার আগে বিবেচ্য প্রশ্ন হচ্ছে আল্লাহর ধারণা। এই সীমাহীন বিশ্ব-প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে এর আদি ব্যবস্তাপনা ও অন্ত সর্ম্পকে ভাবতে গিয়ে আমাদের মন বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এক অজানা যুগ থেকে শুরু হয়েছে এর গতি এবং অজানা যুগের দিকে চলছে এগিয়ে। এর ভিতরে পয়দা হয়েছে সীমাসংখ্যাহীন অনন্ত সৃষ্টি এবং আরো পয়দা হয়ে চলছে। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এমন বিস্ময়কর যে, তা উপলব্ধি করতে গিয়ে মনুষ্য জ্ঞান বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়েছে। এ বিপুল সৃষ্টির খোদায়ী কেবল তাঁরই পক্ষে সম্ভব, যিনি নিজে সীমাবন্ধনহীন, অনন্তকাল ধরে যিনি জীবন্ত, যিনি কারুর মুখাপেক্ষি নন, যিনি স্বাধীন, সর্বশক্তিমান, সার্বভৌম শক্তির অধিকারী ও সর্বজ্ঞ, সকল বস্তুর জ্ঞান যিনি রাখেন, কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন থাকতে পারেনা। সবার উপর যিনি বিজয়ী এবং যাঁর হুকুম অমান্য করতে কেউ পারে না, যিনি অনন্ত শক্তির মালিক এবং আপনা থেকে যাঁর কাছ থেকে সৃষ্টির সকল জীবের কাছে পৌঁছে জীবন ও জীবিকার সামগ্রী, যিনি সকল অভাব ত্রুটি ও দুর্বলতা দোষ থেকে মুক্তি এবং যাঁর কার্যে অপর কারুর হস্তক্ষেপ চলতে পারে না।

দুইঃ আল্লাহর কর্তৃত্বের এসব গুণ কেবল একটি মাত্র সত্তার ভিতরে সীমাবদ্ধ হওয়াই অপরিহার্য। একাধিক সত্তার মধ্যে এ সবগুণের অস্তিত্ব সমভাবে থাকা অসম্ভব, কারণ সবার উপর বিজয়ী ও সার্বভৌম শক্তির অধিকারী মাত্র একজনই হতে পারেন। এসব গুণরাজী ভাগাভাগী করে বহু খোদার মধ্যে বন্টন করে নেয়া ও তেমনি অসম্ভব। কেননা এক খোদা যদি হন সার্বভৌম শক্তির অধিকারী, অপর এক খোদা সর্বজ্ঞ, অপর একজন হন জীবন দানকারী তা হলে প্রত্যেক খোদাকে হতে হয় অপরের মুখাপেক্ষী এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা না থাকলে মুহুর্তে এ সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। এও সম্ভব হতে পারে না যে, এসব গুনরাজী এক থেকে অপরের কাছে ন্যস্ত হবে অর্থাৎ এর কোন গুণ কখনো থাকবে এক খোদার মধ্যে; আবার কখনো থাকবে অপর খোদার মধ্যে; কেননা যে খোদা নিজেকে জীবন্ত রাখার মতো ক্ষমতার অধিকারী নয়, সারা সৃষ্টিকে জীবন দান করা তার পক্ষে অসম্ভব এবং যে খোদা নিজের খোদায়ী সংরক্ষণ করতে পারে না, এত বড় বিরাট সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ব চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়; সুতরাং যত বেশী করে জ্ঞানের দীপ্তি লাভ করা যাবে মনে তত বেশী প্রত্যয় জন্মাবে যে, কেবলমাত্র একই সত্তার মধ্যে আল্লাহর গুণরাজীর সমাবেশ হওয়া অপরিহার্য।

তিনঃ আল্লাহর কর্তৃত্বের পরিপূর্ণ ও নির্ভুল ধারণাকে দৃষ্টির সামনে রেখে সকল সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা যেতে পারে। যতসব জিনিস দৃষ্টি পথে আসে, যা কিছু জ্ঞানের পরিধির মধ্যে আসে, তার কোন কিছুর মধ্যেই এসব গুণের সমাবেশ দেখতে পাওয়া যাবে না। বিশ্ব-প্রকৃতির সবকিছু অপরের মুখাপেক্ষী ও অপর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত; তারা জন্মে, পরিবর্তিত হয়, মরে ও বাঁচে। কোনকিছুই অপরিবর্তিত অবস্থায় স্থায়ী হয়ে থাকতে পারে না। কারুরই নিজের খেয়াল খুশী অনুযায়ী কিছু করার মতা নেই। সর্বোপরি যে আইন বলবৎ রয়েছে তার চুল পরিমাণ অতিক্রম করার ক্ষমতা কারুর নেই। তাদের মধ্যে আল্লাহর সামান্যতম দ্যুতিও দেখা যায় না। আল্লাহর কার্যকলাপের মধ্যে তাদের কারুর বিন্দুমাত্র দখল নেই। লা-ইলাহা-র মানে হচ্ছে এই।

চারঃ বিশ্ব-জগতের সকল পদার্থের আল্লাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করার পর একথা অংগীকার করতেই হবে যে সর্বোপরি রয়েছেন আর এক স্বতন্ত্র সত্তা। একমাত্র তিনিই হচ্ছেন সকল কর্তৃত্বের গুণরাজীর অধিকারী এবং তিনি ব্যতীত আর কোন আল্লাহ নেই। ইল্লাল্লাহ-র মানে হচ্ছে এই।

সকল জ্ঞানের সেরা জ্ঞান হচ্ছে এই। যতই অনুসন্ধান ও গবেষণা চালানো যাবে, ততই বুঝতে পারা যাবে যে, জ্ঞানের শুরু এখানেই এবং শেষ সীমানাও এতেই সীমাবদ্ধ। পদার্থবিদ্যা, রসায়, জ্যোতিষ, ভূতত্ব, জীবতত্ত্ব, মানবীয় তত্ত্ব-এক কথায় বিশ্ব জগতের রহস্য অনুসন্ধানের যে কোন পথই অবলম্বন করা হবে, সেখানে গবেষণা চালিয়ে অগ্রসর হতে হতে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ-র সত্যতা ক্রমাগত উদঘাটিত হতে থাকবে এবং তার প্রতি প্রত্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতি পদে অনুভূত হবে যে, সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এ সত্যকে অস্বীকার করার পর সৃষ্টির যে কোন জিনিস নিরর্থক হয়ে যায়।



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )