আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইসলাম পরিচিতি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী   
Monday, 10 December 2007
আর্টিকেল সূচি
ইসলাম পরিচিতি
ইসলাম শব্দটির অর্থ
ঈমানের পরিচয়
হযরত মুহাম্মাদ (সা) -এর নবুয়াত
খতমে নবুয়াতের প্রমাণ
মানব জীবনে তাওহীদ বিশ্বাসের প্রভাব
কালেমা তাইয়েবা
দ্বীন ও শরীয়াত
চতুর্বিদ অধিকার

কালেমা তাইয়েবা

ইসলামের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পূর্ব বর্ণিত এ পাঁচটি বিশ্বাসের উপর। এ পাঁচটি১ বিশ্বাসের সারবস্তু রয়েছে কেবলমাত্র এক কালেমারই মধ্যেঃ (.....................)

একজন মানুষ যখন ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে তখন সে সকল মিথ্যা উপাস্যকে বর্জন করে কেবল এক আল্লাহর দাসত্বের প্রতিশ্রুতি দান করে। আবার যখন ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বলে তখন সে এ কথাটির সত্যতা স্বীকার করে যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহরই রাসূল। রিসালাতের সত্যতা স্বীকারের সাথে সাথে অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে পড়ে যে, আল্লাহর সত্তা ও গুণরাজি, ফেরেশতামন্ডলী, আসমানী কিতাসমুহ, পয়গাম্বগণ ও আখেরাত সম্পর্কে যা কিছু ও যেমন কিছুরই শিক্ষা হযরত মুহাম্মাদ (সা) দিয়ে গেছেন, তার প্রতি ঈমান আনতে হবে এবং আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যের যে পথ তিনি নির্দেশ করেছেন তার অনুসরণ করতে হবে।

ইবাদাত

আগের অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) পাঁচটি জিনিসের উপর ঈমান আনার শিক্ষা দিয়েছেনঃ

একঃ এক লা-শরীক আল্লহর উপর ।

দুইঃ আল্লাহর ফেরেশতাদের উপর।

তিনঃ আল্লহর কিতাবসমূহের উপর, বিশেষ করে কুরআন মজীদের উপর।

চারঃ আল্লাহর রাসূলের উপর, বিশেষ করে তাঁর আখেরী রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর উপর।

পাঁচঃ আখেরাতের জীবনের উপর।

ইসলামের বুনিয়াদ হচ্ছে এই। একজন যখন এ পাঁচটি জিনিসের উপর ঈমান আনলো তখনই সে মুসলমানদের দলভুক্ত হল, কিন্তু এতেই সে পুরো মুসলিম হতে পারলো না। পুরো মুসলিম মানুষ তখনই হতে পারে যখন আল্লাহর তরফ থেকে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আনীত হুকুমসমূহের আনুগত্য সে করে, কেননা ঈমান আনার সাথে সাথেই আনুগত্য করা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে পড়ে এবং এ আনুগত্যের নামই হচ্ছে ইসলাম। চিন্তা করা যায়, একজন লোক স্বীকার করে নিয়েছে একমাত্র আল্লাহই তার ইলাহ। এর অর্থ হচ্ছে একমাত্র তিনিই তার মনিব, আর সে তাঁর গোলাম, একমাত্র তিনিই তাদের আদেশ দাতা, আর সে তাঁর আজ্ঞাবহ। এ মনিব ও আদেশ দাতাকে মেনে নেয়ার পর না-ফরমানী করলে সে নিজেই নিজের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অপরাধী হল। সে আরো স্বীকার করে নিয়েছে যে, কুরআন মজীদ আল্লাহর কিতাব। তার অর্থ হচ্ছে যা কিছু কুরআন মজীদে রয়েছে তাকে সে আল্লাহর ফরমান বলে স্বীকার করে নিয়েছে। এখন তার অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে এর প্রত্যেকটি কথাকে মেনে নেয়া এবং প্রত্যেকটি হুকুমের কাছে মাথা নত করা। সে এও স্বীকার করে নিয়েছে যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল। প্রকৃতপক্ষে এতে স্বীকার করা হয়েছে যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) যা কিছু করার হুকুম দিয়েছেন এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন তা আল্লাহর তরফ থেকেই করেছেন। এ স্বীকৃতির পর হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আনুগত্য করা তার জন্য ফরয হয়ে গেছে। সুতরাং যে পুরো ‘মুসলিম’ হবে তখন যখন তার কার্যকলাপ হবে তার ঈমানের অনুরূপ, তার ঈমান ও কার্যকলাপের মধ্যে যতটা তফাৎ থাকবে তার ঈমান ততটা অপূর্ণ থাকবে।

এবার বলবো, হযরত মুহাম্মাদ (সা) আমাদেরকে আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী জীবন যাপনের কি পদ্ধতি শিখিয়েছেন, কি কি কাজ করার হুকুম তিনি দিয়েছেন এবং কি কি নিষেধ করেছেন। এ প্রসংগে সবার আগে এমন সব ইবাদাতের কথা বলা যায় যা আমাদের উপর ফরয করা হয়েছে।

ইবাদতের তাৎপর্য

প্রকৃতপক্ষে ইবাদাতের অর্থ হচ্ছে বন্দেগী বা দাসত্ব। মানুষ হচ্ছে বান্দাহ (দাস)। আল্লাহ মানুষের মাবুদ (উপাস্য)। বান্দাহ তার মা’বুদের আনুগত্যের জন্য যা কিছু করে থাকে তাই-ই হচ্ছে ইবাদাত। আমরা লোকের সাথে কথা বলছি; কথা-বার্তায় আমরা মিথ্যা, পরনিন্দা, অশ্লীলতা থেকে সংযত থাকছি, কেননা আল্লাহ তা নিষেধ করেছেন; হামেশা সত্য, ন্যয়, সততা ও পবিত্রতার কথা বলছি; কেনানা আল্লাহ এসব জিনিস পছন্দ করে থাকেন। আমাদের এ কথাবর্তাগুলো যতই পার্থিব ব্যাপারের সাথে সংশ্লিষ্ট হোক না কেন তা হবে আমাদের ইবাদাত। আমরা মানুষের সাথে টাকা পয়সা লেনদেন করছি, বাজারে জিনিসপত্র কেনা বেচা করছি, নিজের ঘরে মা বাপ ভাইবোনের সাথে বাস করছি, নিজের বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনের সাথে মেলামেশা করছি। আমরা যদি জীবনের এসব কাজে আল্লাহর বিধি-নিষেধ ও আইন-কানুন মেনে চলি, এবং আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী যদি অপরের অধিকার রক্ষা করে চলি, এবং আল্লাহর নিষেধ হওয়ার কারণে যদি অপরের অধিকার হরণ থেকে বিরত থাকি, তাহলে আমাদের সারা- জীবনই আল্লাহর ইবাদাতে অতিবাহিত হল বলতে হবে। আমি গরীবদের সাহায্য করলাম, কোন ভুখা মানুষকে খেতে দিলাম, কোন রোগীর শুশ্রূষা করলাম এবং এসব কাজে ব্যক্তিগত স্বার্থ, সম্মান ও সুখ্যাতির পরিবর্তে আল্লাহর সন্তোষকেই দৃষ্টির সামনে রাখলাম। এ ক্ষেত্রে আমার এসব কাজই ইবাদাতের মধ্যে গণ্য হবে। ব্যবসায় শিল্পকারিতা অথবা কায়িক পরিশ্রম করছে মানুষ এবং তাতে আল্লাহর ভীতি পোষণ করে পূর্ণ বিশ্বস্ততা ও ঈমানদারী সহাকরে কাজ করছে, হালাল জীবিকা অর্জন করছে ও হারাম থেকে বেঁচে থাকছে, তার জীবিকা অর্জন ও আল্লাহর ইবাদাতের অর্ন্তভুক্ত হবে। যদিও সে নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, তথাপি তা ইবাদাতের মধ্যে গণ্য হবে, সোজা কথা হচ্ছে এই যে পার্থিব জীবনে প্রতি মুহুর্ত প্রত্যেক ব্যাপারে আল্লাহর ভীতি পোষণ করতে হবে, এবং তাঁর সন্তোষ বিধানকে লক্ষ্যে পরিণত করতে হবে, তার প্রদত্ত বিধান অনুসরণ করতে হবে, তাঁর না-ফরমানীর মাধ্যমে প্রাপ্য লাভ উপেক্ষা করতে হবে এবং তার আনুগত্যের ফলে ক্ষতি হলে অথবা হওয়ার আশংকা থাকলে তা স্বীকার করে নিতে হবে। এ হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত। এমনকি এ ধরনের জীবনে খাওয়া, পরা, চলা, ফেরা, শোয়া, জাগা, কথা-বার্তা--সবকিছুই ইবাদাতের অর্ন্তগত।

এ হচ্ছে ইবাদাতের আসল অর্থ। ইসলামের প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানকে এমনি ইবাদাতে অভ্যস্ত বান্দাহ হিসেবে তৈরী করা। এ উদ্দেশ্যে ইসলামে এমন কতকগুলো ইবাদাত ফরয করে দেয়া হয়েছে। যার ফলে মানুষ এ বৃহত্তম ইবাদাতের জন্য তৈরী হয়ে উঠবে। অবশ্যি এও জেনে রাখা দরকার যে বৃহত্তর ইবাদাতের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতির জন্য ট্রেনিং কোর্স হিসেবে এসব ইবাদাত নির্ধারিত হয়েছে। যে ব্যক্তি যত ভাল করে এ ট্রেনিং নেবে তত ভাল করে বুহ্ত্তর ও প্রকৃত ইবাদাত সম্পন্ন করতে পারবে। এ কারণেই এসব বিশেষ ইবাদাতকে ফরযে- আইন বলা হয়েছে এবং এগুলোকে আরকানে দ্বীন অর্থাৎ দ্বীনের স্তম্ভ স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি ইমারাত যেমন কতগুলো স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি করে ইসলামী জীবনের ইমারত ও এসব স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। এসব স্তম্ভ ভেঙ্গে দিলে ইসলামের ইমারতই ধ্বংস হয়ে যাবে।

সালাত

এসব ফরযের মধ্যে প্রথম ফরয হচ্ছে সালাত। সালাত কি যেসব জিনিসের উপর একজন মুসলিম ঈমান এনেছে, দিনে পাঁচবার কথায় ও কাজে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করাই হচ্ছে সালাত। মুসলিম ব্যক্তি প্রত্যষে উঠে আর সবকিছুর আগে পাক-সাফ হয়ে মহান প্রভুর সামনে হাযির হয় তার সামনে দাঁড়িয়ে, বসে, অবনত হয়ে, যমীনের উপর মাথা রেখে তার দাসত্ব স্বীকার করে, তার কাছে সাহায্য ভিক্ষা করে নতুন করে তার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে, বারবার তার সন্তোষ বিধানের ও তার গযব থেকে বাঁচবার আকাঙখার পুনরাবৃত্তি করে, তার কিতাবের শিক্ষা পুনরাবৃত্তি করে। তার রাসূলের সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দান করে, এবং তার আদালতে জবাবদিহির জন্য হাযির হওয়ার দিনের কথাও স্মরণ করে। এমনি করে, শুর হল তার দিন। কয়েক ঘন্টা সে তার কাজে লিপ্ত থাকল, আবার যোহরের সময়ে মুয়াযযিন তাকে স্মরণ করিয়ে দিল কয়েক মিনিটের জন্য সেই শিক্ষার পুনরাবৃত্তি করার কথা, যাতে সে কখনো তা ভুলে গিয়ে মহান প্রভুর সম্পর্কে অমনোযোগী না হয়। সে উঠে এসে তার ঈমানকে তাযা করে নিয়ে আবার ফিরে যায় দুনিয়া ও তার কাজ কারাবরের দিকে। কয়েক ঘন্টা পর আবার আসরের সময়ে তার ডাক পড়ে এবং সে আবার ঈমান তাযা করে নেয়। তারপর মাগরিব এল ও রাত শুরু হয়ে গেল। প্রত্যুষে উঠে যে ইবাদাতের মধ্য দিয়ে, যেন সেই শিক্ষাকে সে ভুলতে না পারে এবং কোনরূপ ভুল না করে বসে। কয়েক ঘন্টা পর আসে এশার সময় এবং তার সাথে সাথেই আসে নিদ্রায় সময়। এবার শেষবারের মত তাকে ঈমানের পুরো শিক্ষাটা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, কেননা এ হচ্ছে প্রশান্তির সময়। দিনের গোলযোগের মধ্যে যদি সে পূর্ণ মনোযোগ দেয়ার সুযোগ না পেয়ে থাকে তা হলে এ সময়ে সে নিশ্চিন্তে চিত্তে মনোযোগ দিতে পারবে।

এ জিনিসটি প্রতিদিন পাঁচ বার মুসলিম ব্যক্তির ইসলামের বুনিয়াদ মযবুত করে দেয়। যে বৃহত্তর ইবাদাতের তাৎপর্য আমি একটু আগে বিশ্লেষণ করেছি সালাত মুসলামানদেরকে তারই জন্য তৈরী করে। সালাত তাদের সবরকম বিশ্বাসকে তাযা করে দেয় এবং এরই উপর তাদের আত্মার পবিত্রতা, রূহের উন্নতি, স্বভাবের সুষ্ঠতা ও কর্মের সংশোধন নির্ভর করে। চিন্তা করলেই বুঝা যায় খোদ রাসূলুল্লাহ (সা) যা বলে গেছেন, অযুতে সেই পদ্ধতি কেন অনুসরণ করা হচ্ছে এবং তিনি যা শিক্ষা দিয়েছেন, সালাতে কেন তার সবকিছুই আমরা আদায় করছি? এর কারণ হচ্ছে, আমরা হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আনুগত্য করা ফরয মনে করছি। ইচ্ছা করে কুরআনে কেউই ভুল পড়ছে না কেন? তার কারণ প্রত্যেকেই তাকে আল্লাহর কালাম বলে প্রত্যয় পোষণ করেছে। সালাতে চুপি চুপি যা পড়া হচ্ছে তা যদি না পড়া হয় অথবা অপর কিছু পড়া হয় তাতে কি কাউকে ভয় করার প্রয়োজন আছে? কোন মানুষ তো তা শুনছে না। বুঝা যায় প্রত্যেক মুসল্লী নিজেই উপলব্ধি করেছে যে, চুপি চুপি যা কিছু পড়ছি আল্লাহ তাও শুনতে পান এবং আমার গোপন গতিবিধিও তাঁর কাছে অজানা নেই। যেখানে কেউ দেখার নেই সেখানে মুসলিমকে সালাতের জন্য কে তুলে দেয়? এর মূল রয়েছে এ বিশ্বাস যে আল্লাহ আমাকে দেখছেন। সালাতের সময় সবচেয়ে জরুরী কাজ ফেলে রেখে কোন জিনিসটি একজনকে সালাতের দিকে টেনে নিয়ে যায়? তা হচ্ছে তার মনের এ অনুভূতি যে, আল্লাহ তার উপর সালাত ফরয করে দিয়েছেন। শীতের দিনে ভোর বেলা, গ্রীষ্মের দুপুরে ও প্রতিদিন সন্ধ্যার আলাপ আলোচনা মধ্যে মাগরিবের সময় কোন্ জিনিসটি মুসলামনকে সালাত আদায় করতে বাধ্য করে? কর্তব্যবোধ ছাড়া আর কি হতে পারে? সালাত না আদায় করা অথবা সালাতকে জেনে শুনে ভুল করার ব্যাপারে কেন লোকে ভয় করে? তার কারণ, তার মনের মধ্যে আল্লাহর ভীতি রয়েছে এবং সে জানে যে, একদিন তাকে হাযির হতে হবে তাঁর আদালতে। এখন প্রশ্ন এই যে, সালাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোন ট্রেনিং হতে পারে যা পুরোপুরি সত্যিকার মুসলমান বানিয়ে দিতে পারে? মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে শিক্ষা আর কি হতে পারে যা প্রতিদিন কয়েকবার মানুষের মনে আল্লাহর স্মরণ, তাঁর ভীতি, তাঁর হাযির নাযির থাকার প্রত্যয় এবং তাঁর আদালতে হাযির হওয়ার বিশ্বাস জাগিয়ে দেয়, দৈনিক কয়েকবার বাধ্যতামূলকভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পথ অনুসরণ করতে প্ররোচিত করে এবং প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েক ঘন্টা পর পর তার দায়িত্ব পালনের মহড়া দেয়ার ব্যবস্থা করে। এহেন ব্যক্তি থেকে প্রত্যাশা করা যায় যে, সালাত শেষ করে সে যখন দুনিয়ার কাজ কারবারে লিপ্ত হবে, সেখানে সে আল্লাহকে ভয় করবে, তাঁর আইন মেনে চলবে এবং কোন গুনাহ করার সম্ভাবনা দেখা গেলে তার মনে পড়বে যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন। এমনি উচ্চ পর্যায়ের ট্রেনিং এর পর যদি কারুর মধ্যে আল্লাহর ভীতি না থাকে এবং তাঁর নির্দেশ অমান্য করে বিপরীত পথে চলা যদি সে না ছাড়ে, তবে তা সালাতের দোষ নয় বরং সেই ব্যক্তির নিজের দোষই তাতে প্রমাণিত হয়।

আরো বিবেচনার বিষয় হইল, আল্লাহ তা’য়ালা জামাতের সাথে সালাত আদায় করার তাকিদ দিয়েছেন এবং বিশেষ করে সপ্তাহে একবার জুময়ার সালাত জামায়াতের সাথে আদায় করা ফরয করে দিয়েছেন তার ফলে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হয়। তারা সবাই মিলে গড়ে তোলে একটি শক্তিশালী জোট। তারা সবাই মিলে যখন আল্লাহর ইবাদাত করে, এক সাথে ওঠাবসা করে, তখন আপনা থেকেই তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়, ভ্রাতৃত্বের অনুভুতি জেগে ওঠে, অতপর এটিই তাদের একই নেতার আনুগত্য করার মনোভাব সৃষ্টি করে তোলে এবং তাদেরকে নিয়ম ও শৃংখলার শিক্ষা দান করে। এর ফলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি, মমতাবোধ ও সমস্বার্থের অনুভূতি জাগ্রত হয়ে উঠে। আমীর-গরীব, বড় ছোট, উচ্চ পদস্থ কর্মচারী ও তার চাপরাশী একই সাথে দাঁড়িয়ে যায়, উচু জাত ও নীচ জাত বলে কিছু থাকেনা।

এ হচ্ছে সালাতের অসংখ্য কল্যাণের মধ্যে কয়েকটি। সালাতে আল্লাহর কোন লাভ নেই বরং তাতে মুসল্লীর কল্যাণ। মানুষের কল্যাণের জন্যই আল্লাহ তা’য়ালা সালাত ফরয করে দিয়েছেন। সালাত আদায় না করলে তাঁর অসন্তোষ এ জন্য নয় যে, তাতে তারা আল্লহর কোন ক্ষতি করছে, বরং এ জন্য যে, তারা তাতে নিজেদেরই ক্ষতি করছে। কত বিপুল শক্তি আল্লাহ তা’য়ালা সালাতের মাধ্যমে দিয়েছেন, আর মানুষ তা গ্রহণ করার পথ এড়িয়ে চলেছে। মুখে আল্লাহর কর্তৃত্ব, রাসূলের আনুগত্য ও আখেরাতের হিসেবে দেয়ার কথা স্বীকার করা হচ্ছে অথচ কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাঁর রাসূলের নির্ধারিত সর্বশ্রেষ্ঠ ফরযকে উপেক্ষা করা হচ্ছে, এটা কত বড় লজ্জার কথা। এরূপ কাজের পিছনে দু’টি কারণ থাকতে পারেঃ হয় সে সালাতকে ফরয বলে স্বীকার করে না, অথবা সে তাকে ফরয জেনেও তা এড়িয়ে চলছে। অবশ্য করনীয় ফরযকে যদি অস্বীকার করা হয়, তা হলে কার্যত কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা) উভয়ের উপর মিথ্যা আরোপ করা হয় এবং তাঁদের প্রতি ঈমান আনার মিথ্যা দাবী করা হয়। আর যদি তাকে ফরয বলে স্বীকার করেও এড়িয়ে যেতে চ্ষ্টো করা হয়, তাহলে সে নির্ভয়ের নিতান্ত অযোগ্য প্রমাণিত হবে এবং দুনিয়ার কোন ব্যাপারে তার নির্ভর করা যাবে না। যখন সে আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে অসাধুতার পরিচয় দিচ্ছে, তখন সে যে মানুষের প্রতি কর্তব্য পালনে অসাধুতার পরিচয় দেবেনা এরূপ প্রত্যাশা কি করা যায়?

সওম

দ্বিতীয় ফরয হচ্ছে। সওম কি? সালাত যে শিক্ষা প্রতিদিন পাঁচবার আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সওম বছরে একবার তা একমাস ধরে প্রতি মুহুর্তে স্মরণ করিয়ে দিতে থাকে। রমযান এলে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুসলমানের খানাপিনা বন্ধ থাকে। সেহেরীর সময়ে তারা খানাপিনা করছিল, আযান হওয়া মাত্র তাদের হাত সংযত করলো। তারপর যত লোভনীয খাদ্য তাদের সামনে আসুক, যতই ক্ষুধা তৃষ্ণা লাগুক, মন যতই প্রলুব্ধ হোক, সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা কিছুই খেতে পারে না। এমন নয় যে, তারা লোকের সামনেই খাচ্ছে না, এমন কি যে জন্য শূন্য স্থানে দেখার মত কেউ নেই, সেখানেও এক বিন্দু পানি অথবা এক দানা খাদ্য গলধঃকরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এ নিষেধ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকে। যখনই মাগরিবের আযান হল, অমনি তারা ইফতারের দিকে ফিরে এল। তারপর সারা রাত যখন যা খুশী তারা নির্ভয়ে নির্ঝঞ্ঝাটে খেতে পারে। ভেবে দেখা যাক, এটা কি জিনিস? এর ভেতরে রয়েছে আল্লাহর ভীতি, তাঁর হাযির নাযির থাকা সম্পর্কে মুসলমানদের প্রত্যয়, আখেরাতের জীবন ও আল্লাহর আদালতের উপর ঈমান; কুরআন ও রাসূল (সা) এর কঠোর আনুগত্য; অবশ্য করণীয় কার্য সম্পর্কে বলিষ্ট অনুভূতি। এতে রয়েছে ধৈর্য সহকারে কর্মপ্রচেষ্টা ও বিপদের মুকাবিলা করার শিক্ষা। আরো রয়েছে আল্লাহর সন্তোষ বিধানের জন্য স্বকীয় প্রবৃত্তিকে প্রতিরোধ ও দমিত করার মতা। প্রতি বছর রমযান আসে এবং পুরো ৩০দিন ধরে এ সওম মুসলমানকে শিক্ষা দান করে, তাদের ভেতর এসব গুণরাজি পয়দা করার চেষ্টা করে, যেন তারা পূর্ণরূপে ও সর্বোতভাবে মুসলমান হতে পারে; যা এক মুসলমানকে আপন জীবনে রূপায়িত করতে হবে।

আরো দেখার বিষয়, আল্লাহ তা’য়ালা সকল মুসলমানের জন্য একই মাসে সওম ফরয করে দিয়েছেন, যেন আলাদা আলাদা সওম না রেখে সবাই মিলে এক সংগে সওম রাখে। এর মধ্যে আরো অসংখ্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। সারা ইসলামী জনপদ এ একটি মাস পবিত্রতার মাস হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। সারা মুসলিম দুনিয়া তখন ঈমান, আল্লাহভীতি, তাঁর হুকুমের আনুগত্য, পাক পবিত্র আচরণ ও সৎকর্মে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এ সময়ে সর্বপ্রকার দুস্কৃতি দমিত হয়ে এবং সৎকর্মকে উৎসাহিত করা হয়। সৎলোকেরা সৎকর্ম করতে পরস্পরকে সহায়তা করে থাকেন। অসৎলোকেরা দুর্ষ্কম্য করতে লজ্জা বোধ করে। ধনীর মধ্যে দরিদ্রকে সাহায্য করার উৎসাহ সৃষ্টি হয়। আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা হয়। সকল মুসলমান একই অবস্থায় ফিরে আসে এবং একই অবস্থায় এসে তারা অনুভব করে যে মুসলমান সব এক জামায়াতের অর্ন্তভুক্ত। এ হচ্ছে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সমবেদনার ও আভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রতিষ্ঠার এক কার্যকরী পন্থা।

এ হচ্ছে আমাদেরই জন্য কল্যাণ। আমাদেরকে ক্ষুধিত রেখে আল্লারহ কোন লাভ নেই। আমাদেরই কল্যাণের জন্য তিনি আমাদের উপর সওম ফরয করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি কোন সংগত কারণ ব্যতীত এ ফরয পালনে বিরত থাকে, সে নিজেরই উপর যুলুম করে। রমযানের দিনে যারা প্রকাশ্য খানাপিনা করে, তারাই সবচেয়ে লজ্জাজনক পন্থা অনুসরণ করে চলে। তারা কার্যত প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, তারা মুসলিম জামায়াতের মধ্যে শামিল নয়, ইসলামের আদেশ নিষেধের জন্য তাদের কোন পরওয়া নেই, যাকে তারা আল্লাহ বলে মানে তার আনুগত্যের পথ থেকেও তারা প্রকাশ্যে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাহলে যেসব লোক নিজস্ব জামায়াত থেকে আলাদা হয়ে যায়, যারা তাদের স্রষ্টা ও অন্নদাতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করে না, যারা তাদের দ্বীনের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার নির্ধারিত আইনকে প্রকাশ্যে লংঘন করে, তাদের কাছে কোন ব্যক্তি নির্ভরযোগ্যতা, সদাচারণ, আমানতদারী, কর্তব্যনিষ্ঠা ও আইনানুগত্যের প্রত্যাশা করতে পারে কি?

যাকাত

তৃতীয় ফরয হচ্ছে যাকাত। আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক ধনশালী মুসলমানের উপর ফরয করে দিয়েছেন যে, তার কাছে কমপক্ষে চল্লিশ টাকা থাকলে এবং তা পুরো এক বছর জমা থাকলে সে তার ভেতর থেকে এক টাকা কোন গরীব আত্মীয়, কোন অভাব গ্রস্ত, মিসকীন, নও-মুসলিম, মুসাফির অথবা ঋনগ্রস্ত ব্যক্তিকে দান করবে।

এমনি করে আল্লাহ তা’য়ালা ধনশীল লোকদের সম্পদে গরীবদের জন্য অন্তত শতকরা আড়াই ভাগ অংশ নির্ধারন করে দিয়েছেন। এর চেয়ে যদি কেউ বেশী দান করেন তাহলে তা অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য আরো বেশী সওয়াব পাওয়া যাবে।

এ বাবদ যে অংশটা দেয়া হচ্ছে, তা আল্লাহর কাছে গিয়ে পৌঁছে না। তিনি আমাদের কোন জিনিসের মুখাপেক্ষী নন, বরং তিনি বলেনঃ তোমরা যদি খুশী মনে আমার খাতিরে তোমাদের কোন গরীব ভাইকে কিছু দান কর তাহলে যেন আমাকেই দান করলে। তার পক্ষে থেকে আমি তোমায় কয়েক গুণ বেশী প্রতিদান দেব। অবশ্যি শর্ত হচ্ছে তাকে দিয়ে তুমি কোন অনুগ্রহ প্রদর্শনের দাবী করবে না। তাকে গাল মন্দ বা ঘৃণা করবে না, তার কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করবে না লোক তোমার দানের আলোচনা করুক বা অমুক সাহেব মস্ত বড় দাতা বলে তোমার প্রশংসা করুক, এমন কোন চেষ্টা ও তুমি করবেনা। যদি তুমি এসব অপবিত্র ধারণা থেকে তোমার মন মুক্ত রাখতে পার, কেবল আমারই সন্তোষের জন্য যদি নিজের দৌলত থেকে গরীবকে অংশ দান কর, তাহলে আমার অনন্ত দৌলত থেকে আমি তোমায় এমন অংশ দেব যা কখনও শেষ হয়ে যাবে না।

আল্লাহ তা’য়ালা সালাত-সওম যেমন আমাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন, যাকাতকেও ঠিক তেমনি ফরয করে দিয়েছেন। যাকাত ইসলামের একটি বড় স্তম্ভ। একে স্তম্ভ এ কারণে বলা হয় যে, এ দ্বারা মুসলমানের মধ্যে কুরবানী ও আত্মত্যাগের শক্তি সৃষ্টি হয় এবং স্বার্থপরতা, কৃপণতা সংকীর্ণমনতা ও সম্পদ পূজার দোষসমূহ হয়ে যায়। লক্ষীর পূজারী ও অর্থের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত লোভী ও কৃপণ ব্যক্তি ইসলামের কোন কাজে আসেনা। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমে নিজের কায়িক পরিশ্রমে উপার্জিত সম্পদ কোন স্বার্থের তাকিদ ছাড়াই কুরবান করে দিতে পারে, সেই চলতে পারে ইলামের সহজ সরল পথে। যাকাত মুসলমানকে এ কুরবানী দিতে অভ্যস্ত করে তোলে এবং তাদের এমন যোগ্যতা দান করে যে, যখনই আল্লাহর পথে তার সম্পদ ব্যয় করার প্রয়োজন হয়, তখন সে আপন সম্পদকে বুকে আকঁড়ে বসে থাকে না, বরং অন্তর খুলে দিয়ে ব্যয় করে।

যাকাতের পার্থিব কল্যাণ হচ্ছে এইযে, এর মাধ্যমে মুসলমানগণ পরস্পরকে সাহায্য করে। কোন মুসলমান বস্ত্রহীন, অন্নহীন, অপমানিত ও উপেক্ষিত হয়ে থাকবে না। আমীর গরীবকে এমনভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যাতে তাকে ভিক্ষা করে ফিরতে না হয়। কোন ব্যক্তি কেবল নিজের আয়েশ আরাম নিজস্ব শান-শওকতের জন্য তার সম্পদ ব্যয় করে উড়িয়ে দেবে না, বরং সে স্মরণ রাখবে যে, তার কওমের ইয়াতীম, বিধবা ও অভাবগ্রস্তদের হক (অধিকার ) রয়েছে। এমন সব ছেলেমেয়েদেরও অধিকার আছে তাতে, যারা আল্লাহর কাছে থেকে মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে অথচ গরীব বলে শিক্ষা লাভ করতে পারছে না। তাদেরও অধিকার আছে যারা রুগ্ন–অকর্মন্য বলে কোন কাজ করতে পারছে না। এ অধিকার যারা মেনে নিতে রাজী হয় না, তারা যালেম। একজন লোক বস্তার পর বস্তা টাকায় বোঝাই করবে, দালান কোঠায় আরাম আয়েশ উপভোগ করবে, হাওয়া গাড়িতে চলে বিলাস ভ্রমণ করবে, তারই কওমের হাযার হাযার লোক দু’মুঠো ভাতের জন্য ভিক্ষা করে ফিরবে, হাযার হাযার কর্মময় লোক বেকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকবে, এর চেয়ে বড় যুলুম আর কি হতে পারে। ইসলাম এ ধরনের স্বার্থপরতার দুশমন। কাফেরদের সভ্যতা তাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, যা কিছু সম্পদ তাদের হাতে আসে, তা তারা জমিয়ে রাখবে এবং তা সুদের ভিত্তিতে কর্জ দিয়ে আশে পাশের লোকদের উপার্জিত অর্থও তারা টেনে আনবে আপন মুঠিতে। পাক্ষান্তরে মুসলমানদেরকে তাদের দ্বীন ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহ তা’য়ালা যদি তাদেরকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থসম্পদ দান করেন তবে তা জমিয়ে রাখবে না, বরং অন্যান্য ভাইকে তা দিয়ে সাহায্য করবে, যাতে তাদের প্রযোজনের চাহিদা মিটিয়ে নিজেদের মত তাদেরকেও উপার্জনক্ষম করে তোলা যায়।

হজ্জ

চতুর্থ ফরয হচ্ছে হ্জ্জ। মুসলমানদের জীবনে মাত্র একবার হজ্জ করা জরুরী। তাও কেবল এমন লোকের জন্য জরুরী, যে মক্কা মোয়ায্যমা পর্যন্ত যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে সক্ষম।

এখন যেখানে মক্কা মোয়ায্যমা অবস্থিত, কয়েক হাযার বছর আগে সেখানে হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহর ইবাদাতের জন্য তৈরী করেছিলেন একটি ছোট্ট ঘর। আল্লাহ তাঁর আন্তরিকতা ও প্রেমের স্বীকৃতি স্বরূপ সেই ঘরটিকে আপন ঘর বলে স্বীকার করে নিয়ে আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, ইবাদাত করতে গিয়ে আমরা যেন সেই ঘরের দিকে মুখ করি এবং আরো নির্দেশ দিলেন যে, দুনিয়ার যেখানকার বাসিন্দাই হোক, প্রত্যেক সামর্থবান মুসলমান যেন সারা জীবনে অন্তত একবার তেমনি প্রেমসহকারে এ ঘর যিয়ারতের জন্য আসে ও তাকে প্রদর্শণ করে, যেমনি করে তাঁর প্রিয় বান্দাহ ইবরাহীম (আ) এ ঘর প্রদক্ষিণ করতেন। তিনি আরো নির্দেশ দিলেন যে, যখন কেউ তাঁর ঘরের দিকে আসবে, তখন তার দিলকে পবিত্র করতে হবে, ব্যক্তিগত প্রবৃত্তিকে প্রতিরোধ করতে হবে, খুন খারাবী দুস্কৃতি ও অশ্লীল ভাষণ থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং প্রভুর দরবারে যেভাবে হাযির হওয়া প্রয়োজন তেমনি আদব, ভক্তি বিনয় সহকারে হাযির হতে হবে। মনে করতে হবে যে, তারা সেই বাদশাহের সামনে হাযির হতে যাচ্ছে, যিনি যমীন ও আসমানের নিয়ামক, যাঁর সামনে সকল মানুষই দুঃস্থ্, এমনি বিনয়ের সাথে যখন সেখানে হাযির হয়ে পরিশুদ্ধ অন্তরে ইবাদাত করা যাবে, তখন তিনি তাদেরকে আপন অনুগ্রহ সমৃদ্ধ করে দেবেন।

একটি বিশেষ দৃষ্টিভংগিতে দেখলে, হজ্জ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। মানুষের দিলের মধ্যে আল্লাহর প্রেম না থাকলে কি করে সে নিজস্ব কাজ কারবার ছেড়ে দিয়ে, প্রিয়জন ও বন্ধু-বান্ধবের সাহচার্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এত বড় দীর্ঘ সফরের কেশ স্বীকার করে নেবে? মানুষ এ সফরের পথ ধরলে তাকে সে সাধারণ সফর হিসেবে মনে করে না। এ সফরে তার মনোযাগ সবচেয়ে বেশী করে নিবদ্ধ থাকে আল্লাহর দিকে। তার অন্তরে কোন সন্দেহ ও দ্বিধার অবকাশ থাকেনা। কা’বার যত নিকটবর্তী হয় ততই তার অন্তরে বেশী করে জ্বলতে থাকে প্রেমের অগ্নিশিখা। দুস্কৃতি ও না-ফরমানীকে তার দিলে আপনা থেকেই ঘৃণা করতে থাকে। অতীত দুস্কৃতির জন্য তার মনে জাগ্রত হয় লজ্জার ভাব। ভবিষ্যতের জন্য সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে আনুগত্যের তাওফীক। ইবাদাতের ও আল্লাহর যিকরের আস্বাদ সে লাভ করে। আল্লাহর হুযুরে তার সিজদা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে এবং তার সামনে সিজদা থেকে মাথা তুলতেই চায় না তার মন। কুরআন পাঠে তার অন্তরে আসে নতুনতর আনন্দ এবং সওম পালনে তার মধ্যে আসে এক নতুনতর ভাবের অনুভূতি। যখন সে হেজাযের সরযমীনে পদক্ষেপ করে, তখন তার অন্তরের পর্দায় ভেসে উঠে ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাসের সকল দৃশ্য।

সর্বত্র সে দেখতে পায় আল্লাহর প্রেমিক ও তাঁরই উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগী মানুষেদের চিহ্ন। সেখানকার প্রতিটি বালুকণা ইসলামের গৌরব গরিমার সাক্ষ্য বহন করে এবং সেখানকার প্রতিটি কাঁকর ঘোষণা করে, এই দেশ যেখানে ইসলাম জন্মলাভ করেছিল এবং সেখান থেকে আল্লাহর বাণী ঘোষিত হয়েছিল। এমনি করেই মুসলমানের দিল পরিপূর্ণ আল্লাহর প্রেম ও ইসলামের প্রীতিতে এবং সেখান থেকে সে এমন এক গভীর প্রভাব নিয়ে ফিরে আসে, মৃত্যুকাল পর্যন্ত যা কখনো মুছে যায় না।

হজ্জের মধ্যে আল্লাহ তা’য়ালা দ্বীনের সাথে সাথে দুনিয়ার ও অসংখ্য কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। হজ্জকে উপলক্ষ করে মক্কাকে করে দেয়া হয়েছে তামাম দুনিয়ার মুসলমানের এক কেন্দ্রভূমি। দুনিয়ার প্রত্যেক কোণ থেকে আল্লাহর স্মরণকারীরা একই সময়ে সেখানে সমবেত হয়, এক অপরের সাথে মিলিত হয়। পরস্পরের মধ্যে ইসলামী সততা ও প্রীতি কায়েম হয় এবং সকলের দিলে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, মুসলমান যে দেশের বাসিন্দাই হোক, আর যে বংশেই জন্ম লাভ করুক-- পরস্পর ভাই ভাই ও একই কওমের অর্ন্তগত। এ কারণে হ্জ্জ একদিকে আল্লাহর ইবাদাত অপরদিকে তামাম দুনিয়ার মুসলমানদের এক সন্মেলন এবং মুসলমানদের মধ্যে এক শক্তিশালী ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে তোলার সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হচ্ছে এ হজ্জ।

ইসলামের সহায়তা

সর্বশেষ যে ফরয আমাদের জন্য আল্লাহ তরফ থেকে নির্ধারিত হয়েছে, তা হচ্ছে ইসলামের সহায়তা (হেমায়াতে ইসলাম) এ ফরযটি যদিও ইসলামের স্তম্ভসমূহের অর্ন্তগত নয়, তথাপি ইসলামী ফরযসমূহে মধ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফে এর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

ইসলামের সহায়তা কি এবং কেন তা ফরয করা হল, একটি দৃষ্টান্ত থেকে তা খুব সহজেই বুঝে নিতে পারা যায়। ধরা যাক, এক ব্যক্তির সাথে আমার বন্ধুত্ব রয়েছে অথচ প্রত্যেক ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আমার প্রতি তার কোন সমবেদনা নেই। সে আমার লাভ-ক্ষতির কোন পরওয়াই করেনা। যে কাজে আমার লাভ তাতে সে সাহায্য থেকে বিরত থাকে কেবল এ জন্য যে, তাতে তার নিজের কোন লাভ নেই। আমার কোন বিপদ এলে সে সাহায্য করে না, কোথাও আমার অনিষ্ট করা হচ্ছে দেখলে সে নিজেও অনিষ্টকারীদের সাথে শরীক হয়, অথবা অন্তত আমার ক্ষতির কথাটা সে চুপ করে শুনে যায়। আমার দুশমন আমার বিরুদ্ধে কোন কাজ করলে সে তাদের সাথে শরীক হয়, অথবা অন্তত তাদের দুস্কৃতি থেকে আমাকে বাঁচাবার জন্য বিন্দুমাত্র চেষ্টা সে করেনা। এমন লোকই কি সত্যিই আমি বন্ধু বলে মনে করব? সকলেই বলবেঃ কখনো না। কারণ এ হচ্ছে কেবল বন্ধুত্বের মৌখিক দাবী, প্রকৃতপক্ষে তার অন্তরে বন্ধুত্ব ভাব নেই। বন্ধুত্বের মানে হচ্ছে মানুষ যার বন্ধু হবে, তার শুভানুধ্যায়ী হবে। দুশমনদের মুকাবিলায় তাকে সাহায্য করবে, তার নিন্দা সে সহ্য করবে না। এসব বিশেষত্ব তার মধ্যে না থাকলে সে মুনাফিক। তাঁর বন্ধুত্বের দাবী মিথ্যা।

এ দৃষ্টান্ত অনুযায়ী মনে করা যায়, যখন কেউ মুসলমান হওয়ার দাবী করে, তখন তার উপর কি কি কর্তব্য নির্ধারিত হয়? মুসলমান হওয়ার অর্থ হচ্ছেঃ যে মুসলমান হচ্ছে তার মধ্যে ইসলামী উদ্দীপনা থাকবে, ঈমানী আত্মমর্যাদা বোধ থাকবে, ইসলামের প্রীতি ও মুসলমান ভাইদের জন্য সত্যিকার শুভ কামনা থাকবে। এমন কি, সে যখন দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকবে, তখনো হামেশা তার দৃষ্টি সম্মুখে থাকবে ইসলামের কল্যাণ ও মুসলমানদের হিতাকাংখা। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অথবা কোন ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে বাঁচবার জন্য এমন কোন কাজ সে করবে না, যা ইসলামের পক্ষে ক্ষতিকর ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণ বিরোধী হবে। মন প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে এমন প্রত্যেকটি কাজে সে অংশ নেবে, যা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে কল্যাণকর এবং এমন প্রত্যেকটি কাজ থেকে সে দূরে থাকবে, যা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে অনিষ্টকারী। নিজের দ্বীন ও দ্বীনি জামায়াতের সম্মান সে মনে করবে নিজের সম্মান। যেমন সে নিজের অবমাননা বরদাশত করতে পারে না। তেমনি ইসলাম ও ইসলামের বিশ্বাসীদের অবমাননা ও বরদাশত করবেনা। যেমন সে তার নিজের বিরুদ্ধে দুশমনদের ও সহায়তা করবে না। তেমনি ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমনের সহায়তা করবে না। যেমন করে সে নিজের ধন, প্রাণ ও সম্মান যার জন্য সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত, তেমনি ইসলাম ও মুসলিম জামায়াতের জন্য সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকবে। যে ব্যক্তি মুসলিম হওয়ার দাবী রাখে, তার মধ্যে এসব গুণের সমাবেশ হওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় সে মুনাফিকদের মধ্যেই গণ্য হবে। তার কার্যকলাপই তার মৌখিক দাবীকে মিথ্যা প্রমাণিত করবে।

এ ইসলামের সহায়তায় একটি বিভাগকে শরীয়াতের ভাষায় বলা হয় ‘জিহাদ’। জিহাদের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কোন কাজে নিজের শেষ শক্তি পর্যন্ত ব্যয় করে দেয়া। এ অর্থের দিক দিয়ে যে ব্যক্তি অর্থ দ্বারা, কথা দ্বারা, কলম দ্বারা, হাত-পা দ্বারা আল্লাহর কালামকে বুলন্দ করার চেষ্টা করতে থাকে, সেও জিহাদই করছে। ‘জিহাদ’ শব্দটি সেই যুদ্ধের বেলাই ব্যবহার করা হয়েছে, যা সকল প্রকার পার্থিব লক্ষ্য থেকে মুক্ত করে নিছক আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইসলামের দুশমনের বিরুদ্ধে চালিত হয়। শরীয়াতে এ জিহাদকে ফরযে কেফায়া বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ হচ্ছে এমন ফরয যা সকল মুসলমানের উপর নির্ধারিত হয় বটে; কিন্তু একটি জামায়াত এ কর্তব্য পালন করলে তাতে অবশিষ্ট লোকদের এ দায়িত্ব পালিত হয়ে যায়। অবশ্যি কোন ইসলামী দেশের উপর দুশনের হামলা হলে সেই পরিস্থিতিতে জিহাদ সেই দেশের সকল বাসিন্দার জন্যই সালাত সওমের মত ফরযে আইন বা অবশ্য করাণীয় হয়ে পড়ে। যদি তারা দুশমনের মুকাবিলা করার শক্তি না রাখে, তাহলে নিকটবর্তী দেশসমূহের প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয হয়ে পড়ে যে, সে তার জান-মাল দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করবে; আর যদি তাদের সাহায্য নিয়েও দুশমনের হামলা প্রতিরোধ করা না যায়, তাহলে তামাম দুনিয়ার মুসলমানের জন্য তাদের সহায়তা করা সালাত সওমের মতই অবশ্য পালনীয় ফরয হয়ে যায়। একটি লোকও এ অবশ্য কর্তব্য পালনে পশ্চাদপদ হলে গুনাহগার হয়ে থাকে। এরূপ পরিস্থিতিতে জিহাদের গুরুত্ব সালাত সওমের চেয়েও বেশী হয়ে থাকে। কারণ হচ্ছে ঈমানের পরীক্ষার সময়। যে ব্যক্তি বিপদের মুহুর্তে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ সমর্থন না করে, তার ঈমান সম্পর্কেই সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। সালাত কি কাজে লাগবে আর সওমে- ই বা কি লাভ? আর এ সময়ে যদি কোন হতভাগ্য ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে দুশমনের পক্ষ্যে সমর্থন করে, তবে সে হচ্ছে নিশ্চিতরূপে মুনাফিক; তার সালাত সওম, তার যাকাত, তার হজ্জ--সবকিছুই অর্থহীন।



সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )