আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইকামতে দ্বীন প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন অধ্যাপক গোলাম আযম   
Saturday, 12 January 2008
আর্টিকেল সূচি
ইকামতে দ্বীন
ওলামায়ে কেরাম সবাই
ওলামায়ে কেরাম সবাই
দ্বীনের মাপকাঠি একমাত্র রাসূল
উপমহাদেশের বড় বড় ওলামা ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন করেন নি কেন?
জামাতবদ্ধ প্রচেষ্টার গুরুত্ব
ইকামাতে দ্বীনের উদ্দেশ্যে গঠিত জামায়াতের বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশে এ জাতীয় জামায়াত আছে কি?
জামায়াতে ইসলামী ও মাওলানা মওদুদী (রঃ)
জামায়াত বিরোধী ফতোয়া
মাওলানা মওদূদী (রঃ)বিবোধী ফতোয়া
ওলামা ও মাশায়েখে কেরামের খেদমতে

মাওলানা মওদূদী (রঃ)বিবোধী ফতোয়া

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (রঃ) কুরআন পাকের তাফসীর ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবনী সহ ইসলাম সম্পর্কে ছোট বড় শতাধিক বই লিখেছেন।তার অগনিত পাঠক-পাঠিকা দেশে বিদেশে ছড়িয়ে আছে। যিনি এতকিছু লিখেছেন তার লেখায় কোন ভুল ত্রুটি থাকা অস্বাভাবিক নয়।যারা জ্ঞান চর্চায় নিযুক্ত তারা যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে তার লেখার সমালোচনা করলে দ্বীনের অবশ্যই উপকার ও খেদমত হবে।এ বিষয়ে উপমহাদেশের কয়েকজনের লেখা পড়ে আমিও অনেক উপকৃত হয়েছি।

কিন্তু কিছু সংখ্যক ব্যক্তি তার বিভিন্ন লেখা থেকে উদ্বৃত্ত নিয়ে এমন বিকৃত ব্যাক্ষা করেছেন যে,কোন পাঠক মূল বই ও সমালোচকদের লেখা পড়লে স্বিকার করতে বাদ্ধ হবেন যে,লেখকের মূল বক্তব্যের সাথে সমালোচনার কোন মিল নেই।কতক সমালোচকদের ভাষা থেকে তাদের বিদ্বেষই প্রকাশ পায়।

যারা অন্ধবিরোধী ও বিদ্বেষী তারা সংশোধনের উপযোগী ভাষা ব্যবহার না করে ফতোয়ার হাতিয়ার ব্যবহার করেন ---এমনকি কারো কারো বক্তব্য হীন গালি গালাজের পর্যায়ে পড়ে।যারা সত্য তালাশ করেন তারা যদি মূল বই পড়ার চেষ্টা করেন তাহলেই শুধু বিচার করতে পারবেন।মূল বই যারা পড়েননি তারা কোন সমালোচকের লেখা পড়েই যদি সিদ্ধান্ত নেন তাহলে অবশ্যই তার প্রতি অবিচার করা হবে।আসামীর জবানবন্দি না নিয়ে শুধু ফরিয়াদির নালিশ শুনেই যে বিচারক রায় দিয়ে বসে তাকে কখন ন্যয় বিচারক বলা চলে না।

মাওলানা মওদূদী লিখেছেন বলেই কোন কথা সঠিক বলে আমি গ্রহন করি না। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলীল সহকারে যেসব কথা তিনি পেশ করেছেন তা আমার বিবেক বুদ্ধি দ্বারা যাচাই করেই গ্রহন করি।তাই যারা দলীল ও যুক্তির ভিত্তিতে তাঁর সমালোচনা করেন তাদের কথা গ্রহন করতে আমি দ্বিধা করি না।কারন মাওলানা মওদূদী (রঃ)-কে আমি নির্ভুল মনে করি না।কিন্তু যারা ফতোয়ার ভাষায় কথা বলেন,তারা মাওলানার ভুল সংশোধনের চেয়ে মানুষেকে বিভ্রান্ত করাই তাদের উদ্দেশ্য বলে তাদের কথা আমি বিবেচনা যোগ্যই মনে করি না।

মাওলানা মওদূদী (রঃ)-এর “খেলাফাত ও মুলুকিয়াত” নামক বই সম্পর্কে বাংলাদেশের কয়েকজন আলেম জোরদার আপত্তি তুলেছেন।এর মধ্যে হযরত মাওলানা শমসুল হক ফরিদপুরী (রঃ)-এর লেখা “ভুল সংশোধন” নমক পুস্তিকাটিকে অবশ্যই আমি পড়ার যোগ্য বলে আমি মনে করি।মাওলানা ফরিদপুরী (রঃ) মাওলানা মওদূদী (রঃ)-কে অত্যন্ত মহব্বত করতেন এবং আমাকেও খুব স্নেহ করতেন।তাঁর সাথে ঘনিষ্টভাবে মিশবার দরুন আমি জানতাম যে “ খেলাফত ও মুলুকিয়াত” সম্পর্কে তার যথেস্ট আপত্তি আছে।তিনি মাওলানা মওদূদী (রঃ)এর নিয়তের উপর হামলা করতেন না।এবং তাকে সাহাবায়ে কেরামের বিরোধী বলেও মনে করতেন না। “খেলাফত ও মুলুকিয়াত” লিখতে গিয়ে মাওলানা মওদূদী (রঃ) যেসব ঐতিহাসিকের হাওয়ালা দিয়েছেন তাদের কয়েক জনকে মাওলানা ফরিদপুরী শিয়া বলে মনে করতেন এবং শিয়া ঐতিহাসিকের মতামত গ্রহন করার ফলেই লেখক ভুল সিদ্ধান্তে পৌছেছেন বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।

মাওলানা ফরিদপুরী (রঃ) “খেলাফাত ও মুলুকিয়াত” বইটির সমালোচলায় যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তাতে বুঝা যায় যে,তার অন্তরে বিদ্বেষ নেই এবং পূর্ন ইখলাসের ভিত্তিতে তিনি লিখেছেন।একথা “ভুল সংশোধন “ নামকরন থেকে স্পষ্ট।তিনি জনগনকে বিভ্রন্ত করার উদ্দেশ্যে লেখেননি। মাওলানা মওদূদীর লেখায় যেখানে তিনি ভুল মনে করেছেন সেখানেই সংশোধনের চেষ্টা করেছেন।অবশ্য বইটির কোথাও কোথাও এমন কিছু কথা আছে যা মাওলানা ফরিদপুরী (রঃ)-এর স্বভাবসুলব শালীন ভাষার সাথে মিল খায় না।সেসব কথা অন্যের সংযোজন কিনা তা আল্লাহ পাকই জানেন।বইটির প্রকাশক শুরুতেই কয়েকজন আলেমের অত্যন্ত অশালীন বক্তব্য যোগ করে দিয়েছেন।তাতে সন্দেহ হয় যে ,বইটির সকল বক্তব্য মাওলানা পরিদপুরীর নয়।

যারা সুবিচারক ও সত্য তালশ করতে ইচ্ছুক তাদেরকে অনুরোধ করছি তারা যেন , “খেলফত ও মুলুকিয়াত” বইখানার সাথে মাওলানা ফরিদপুরী (রঃ)-এর লেখা “ভুল সংশোধন” মিলিয়ে পড়ে দেখেন।যে সব আন্দোলন “ভুল সংশোধনে” তোলা হয়েছে এর জবাবও মূল বই-এর শেষ ভাগে দেয়া হয়েছে।বইটি পড়ে যেখানে যেখানে মাওলনা মওদূদী (রঃ) ভুল করেছে বলে পাঠকের ধারনা হয় সেসব কথা না গ্রহন করলেই হলো। কোন লেখকের সব কথাই সঠিক হওয়া যরুরী নয়।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, “খেলাফত ও মুলূকিয়াত” বইতে হযরত মুয়াবিয়া (রঃ) সম্পর্কে যেসব কথা আলোচনা হয়েছে তাকে ভিত্তি করে কোন কোন সমালোচক মাওলানা ফরিদপুরী (রঃ)-কে সাহাবায়ে কেরামের নিন্দাকারী ও অপমানকারী বলে প্রমান করতে চেষ্টা করেছেন। তাদের লেখার বিদ্বেষপূর্ন ভাষা থেকে মনে হয় যে, মাওলানা ফরিদপুরী (রঃ)যেন সাহাবাদের প্রতি ঘৃনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যই বইটি লিখেছেন অথচ তাফহিমুল কুরআন নামক মাওলানার তাফসীর ও অন্যান্য বইতে সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আহলে সুন্নাত আল জামায়াতের আকিদা মোতাবেক সেসব উচ্ছসিত ও আবেগপূর্ন প্রশংসা করা হয়েছে সে সব কথা তারা পড়েছে কিনা জানি না।“খেলাফত ও মুলুকিয়াত” বইটিতে যে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে তা ইসলামের ইতিহাসের এমন কতক দুঃখজনক কতক ঘটনার সাথে জড়িত যে,যারাই এ বিষয়ে কলম ধরবে তাদের পক্ষে একই সাথে হয়রত আলী (রঃ) ও হযরত মুয়াবিয়া (রঃ)কে সঠিক নীতির উপর কেমন ছিলেন বলে প্রমান করা অসম্ভব। আহলে সুন্নাত আল জামায়াতের আকিদা অনুযায়ী হযরত আলী (রঃ)খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তভুক্ত।হযরত মুয়াবিয়া (রঃ) হযরত আলী (রঃ)-এর খেলাফতকে মেনে নেননি।এ অবস্থায় উভয়ই কি করে একই মর্যাদার অধিকারী হতে পারেন?

মাওলানা ফরিদপুরী (রঃ) হযরত মুয়াবিয়াকে (রঃ) হযরত আলী (রাঃ) চেয়েও অনেক যোগ্য খলিফা হিসেবে প্রমান করার চেষ্টা করেছেন। হযরত মুয়াবিয়া (রঃ)-এর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ রয়েছে সবই সম্পূর্ন মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।এ সত্বেও উম্মতে মুসলিমা হযরত মুয়াবিয়া (রঃ)-কে কেন খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তর্ভূক্ত বলে মনে করেন না তা এক বিরাট প্রশ্ন।

হযরত মুয়াবিয়া (রঃ)সাহাবী হওয়া সত্বেও আহলে সুন্নাত আল জামায়াতে তাঁকে খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্তর্ভূক্ত মনে করে না।তাঁকে খলীফা না বলে আমীর মুয়াবিয়া (রঃ)বলা হয়।এর নিশ্চই কোন কারন রয়েছে। হযরত মুয়াবিয়া (রঃ)ইসলামের বিরাট খেদমত করেছেন বলে স্বীকার করেও ইসলামী খেলাফতের নীতি ও আদর্শের দিক দিয়ে ঐতিহাসিকগণ তাঁর নীতিকে সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন।যারাই হযরত মুয়াবিয়া (রঃ)-এর পক্ষে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেছেন তারা খোলীফায়ে রাশেদ হযরত আলী (রঃ)-কে দোষী সাব্যস্ত করতে বাধ্য হয়েছেন।সুতরাং এ ইতিহাস এমন সমস্যাপূর্ন যে,এ দু’জনকে একই মর্যাদার অধিকারী মনে করা এক প্রকার অসম্ভব।

তাই ইতিহাসের অনিবার্য প্রয়োজনে যারা এ বিষয়ে আলোচনা করেন তাদের কথা নিয়ে সর্বসাধারনের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় চর্চা করা উচিত নয়।যারা ঐতিহাসিক নয় তারা এ নিয়ে বিতর্ক করতে গেলে ফেতনা সৃষ্টি হবার আশঙ্কা রয়েছে।

ইসলামী শাসনতন্ত্রের মূলনীতি আলোচনা করতে গিয়ে মাওলানা মাওদূদী (রঃ)কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমা-কে আইনের উৎস বলে উল্লেখ করেছেন।ইজমা মানে সর্বসম্মত রায়।উম্মাতে মুহাম্মাদীর ওলামায়ে কেরাম কোন বিষয়ে একমত হলে সেটাকেই যিনি শরীয়াতের হুজ্জাত বা দলিল বলে স্বীকার করেন তিনিই যে সাহাবায়ে কেরামের ইজমাকে আরও উচ্চমানের মুজ্জাত মনে করেন তাতে সন্দেহ করার কোন যুক্তি নেই।

১৯৫০ সালে আল্লামা সাইয়েদ সুলায়মান নাদভী (রঃ)-এর সভাপতিত্বে করাচীতে অনুষ্ঠিত সর্ব শ্রেনীর ৩১ জন বড় বড় আলেমের যে সম্মেলন ইসলামী শাসন তন্ত্রের ২২ দফা মূলনীতি ঘোষনা করা হয় সেখানে মাওলানা মওদূদী (রঃ) যোগ্য ভূমিকা পালন করে ছিলেন।তদানিন্তন পাকিস্তানের ৩১ জন শ্রেষ্ট মাওলানার মধ্যে মাওলানা মওদূদী (রঃ)বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী।এমন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যারা ফতোয়া দেন তারা নিজেদের মর্যাদাই নষ্ট করেন।যুক্তির মাধ্যমে মাওলানা মওদূদী (রঃ)-এর বক্তব্য খন্ডন করা অবশ্যই দ্বিনী দায়িত্ব।কিন্তু ফতোয়া প্রচার করা দ্বারা দ্বীনের কোন উপকার হচ্ছে কিনা তা বিবেচনা করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করছি।

আরও একটা কথা এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলে মনে হয়। মাওলানা মওদূদী (রঃ)-এর বিরুদ্ধে পাক-ভারত ও বাংলাদেশের কয়েকজন আলেম অবশ্যই বিরূপ মন্তব্য করেছেন।কিন্তু দুনিয়ার বড় বড় ওলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মওদূদী (রঃ)-কে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ট আলেম ও ইসলামের মহান বিশেষজ্ঞ বলে স্বীকার করেন।তাঁর লেখা তাফসীর ও অন্যান্য বই দুনিয়ার ৪০টি ভাষায় তরজমা হয়ে লক্ষ লক্ষ লোকের নিকট ইসলামের আলো পৌছাচ্ছে। সুতারাং এ দেশের কিছু সংখ্যক লোক ফতোয়া দিয়ে বা আলোকে চাপা দিয়ে রাখতে পারবেন না। আমার বিশ্বাস যে তারা যদি মওলানা মওদূদী (রঃ)-এর বইপত্র মন দিয় পড়তেন তাহলে পছন্দই করতেন।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )