আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইকামতে দ্বীন প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন অধ্যাপক গোলাম আযম   
Saturday, 12 January 2008
আর্টিকেল সূচি
ইকামতে দ্বীন
ওলামায়ে কেরাম সবাই
ওলামায়ে কেরাম সবাই
দ্বীনের মাপকাঠি একমাত্র রাসূল
উপমহাদেশের বড় বড় ওলামা ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন করেন নি কেন?
জামাতবদ্ধ প্রচেষ্টার গুরুত্ব
ইকামাতে দ্বীনের উদ্দেশ্যে গঠিত জামায়াতের বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশে এ জাতীয় জামায়াত আছে কি?
জামায়াতে ইসলামী ও মাওলানা মওদুদী (রঃ)
জামায়াত বিরোধী ফতোয়া
মাওলানা মওদূদী (রঃ)বিবোধী ফতোয়া
ওলামা ও মাশায়েখে কেরামের খেদমতে

ওলামায়ে কেরাম সবাই “ইকামাতে দ্বীনে” সক্রিয় নন কেন?

একথা সত্য যে,বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ ওলামায়ে কেরাম আছেন। তারা বিভিন্ন প্রকার দ্বীনি খেদমতে নিযুক্ত রয়েছেন। ইকামাতে দ্বীনের দাবী অনুযায়ী তারা ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় হচ্ছেন না কেন-এ প্রশ্ন অবান্তর নয়। দীর্ঘ্যকাল আলেম সমাজের গভীর সংস্পর্শে থেকে আমি এ প্রশ্নের জবাব তালাশ করেছি। আল্লাহপাকই সঠিক কারণ জানেন। কিন্তু এ প্রশ্ন এত প্রসঙ্গিক যে,এর উত্তর না পেলে মুসলিম জনগনের পক্ষে ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্ব সঠিক ভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না।আমার সামান্য পর্যবেক্ষনের ফলাফল এখানে প্রকাশ করতে চাই।

একঃ আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলো জনগনের চাঁদায় চলে। যেসব মাদ্রাসা সরকারী সাহায্য পায় তাও অতি সামান্য।মাদ্রাসার গরিব শিক্ষকগণকে মাদ্রাসার আর্থিক সমস্যা সমাধানেও সময় ও শ্রম দিতে হয়।যারা মাদ্রাসায় পড়তে আসে তারা প্রায় সবাই গরীবের সন্তান । বিনা খরচে বা সামান্য খরচে স্কুল কলেজে পড়ান সম্ভব নয় বলে গরীবদের জন্য মাদ্রাসাই একমাত্র সম্বল। ছাত্রদের বই-কিতাব মাদ্রাসাই জোগাড় করে। এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছাত্রদের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা মাদ্রাসার পক্ষথেকেই করতে হয়।

মুসলিম শাসনআমলে শিক্ষার খরচ রাষ্ট্রই বহন করতো।বর্তমানেও সাধারন শিক্ষার (স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের )ব্যয় ভারের প্রধান অংশ সরকারই বহন করে।কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা এর ব্যতিক্রম। জনগনের চাঁদার ভিত্তিতে মাদ্রাসাগুলো যে বেঁচে আছে সেটাই আল্লার বড় মেহেরবানী।এ অবস্থায় কুরআন হাদীসের যেটুকু হেফাজত মাদ্রাসা দ্বারা হচ্ছে এর শুকরিয়া আদায় করাও অসম্ভব। তাই মাদ্রাসায় শিক্ষার মান এমন উন্নত হওয়া সম্ভব নয় যেমন হওয়া উচিত। ফলে উন্নত মানের আলেম কমই হচ্ছে।

দুইঃ মাদ্রাসা শিক্ষা দ্বারা দুনিয়ার উন্নতির কোন আশা নেই বলে ধনী লোকেরা তো মাদ্রাসায় ছেলেদেরকে পাঠায়ই না।গরীবদেরও মেধাবী ছেলেদেরকে বেশির ভাগ স্কুলে পাঠায়। ফলে তুলনামূলকভাবে ভালো ছাত্র মাদ্রাসায় কমই আসে।যারা আসে তারাও মাদ্রাসা পাস করে বা শেষ না করেই দুনিয়ার চাপে কলেজমুখি হয়ে পড়ে।

তিনঃ বর্তমান পরিবেশে যারাই মাদ্রাসায় পড়ে তারা ইসলামের মহাব্বতেই পড়ে। দুনিয়ায় তারা যে বড় কিছু করার সুযোগ পাবে না সে কথা তারা জানে। মসজিদের ইমাম,মাদ্রাসার শিক্ষক,বড়জোর স্কুলের আরবী ও দ্বীনিয়াত শিক্ষক,কি নিকাহ-র কাযী ইত্যাদি সূযোগ ছাড়া বড় কিছু করা তাদের ভাগ্যে জুটবেনা বলে তারা ধরেই নেয়।

এ মানসিক অবস্থা নিয়ে যারা মাদ্রাসায় পড়তে বাধ্য হয় তারা শুধু আখেরাতের আশাই করে।মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার মুদাররিস হিসেবে দ্বীনের খেদমত করার সৌভাগ্য তারা যথেষ্ঠ মনে করতে বাধ্য হয়।তা ছাড়া মাদ্রাসার পরিবেশ ও জীবনের ভবিষ্যত সম্ভাবনা ছাত্রদের মধ্যে দেশ ও জাতির জন্য বড় কিছু করার সংকল্প সৃষ্টি করে না।

মাদ্রাসা পাস করার পর গরিব আলেমদের রুযী-রোযগার সমস্যা বড় হয়ে দেখা দেয়।খুব কম আলেমই এমন আছেন যারা নিজ নিজ দ্বীন পেশার (ইমামতি বা শিক্ষকতা) দায়িত্ব পালন করে ইসলামী আন্দোলনের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারেন এবং সংগঠনের বড় দায়িত্ব নিতে পারেন।

চারঃ আর একটা বড় কারন রয়েছে যার ফলে ইসলামী আন্দোলন অনেক আলেমের নিকট সঠিক গুরুত্ব পাচ্ছে না। মাদ্রাসা শিক্ষায় ইসলামকে একটি বিপ্লবী আন্দোলন হিসেবে শেখাবার ব্যবস্থা নেই।শুধু ধর্মীয় শিক্ষা হিসেবেই ইসলামকে শেখান হয়।রাসূলুল্লাহ (সাঃ)মানব সমাজকে কিভাবে পরিবর্তন করলেন,কুরআন কিভাবে ২৩ বছর রাসূল (সাঃ)-এর আন্দোলনকে পরিচালিত করেছে,সেই কুরআন ও রাসূলের জীবন(হাদিস) থেকে বর্তমান যুগের ইসলামকে কায়েম করার জন্য কি করা দরকার,এসব দৃষ্টিভঙ্গীতে মাদ্রাসায় এখন পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষা চালু হয়নি।ফলে তারা ইসলামকে একটা ধর্ম হিসাবেই জানতে পারছে মাত্র।মাদ্রা শিক্ষার মারফতে ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে ধারনা সৃষ্টি হচ্ছে না। ইকামাতে দ্বীনের দ্বায়ীত্ববোধও সে কারনে সৃষ্টি হচ্ছে না।

মাদ্রাসার উস্তাদগন ইসলামের যে পরিমান শিক্ষা দিচ্ছেন তার চেয়ে বেশি ছাত্ররা কি করে শিখবে? কিন্তু মাদ্রাসার যে মেধাবী ছাত্ররা দেশের ইসলামী আন্দোলনকে বুঝতে পারছে তা মাদ্রাসার বাইরের শিক্ষা। অবশ্য মাদ্রাসার ছাত্ররা যেহেতু আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গি পেলে তারা আধুনিক শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক দ্রুত আন্দোলনমুখী হয়ে পড়ে।ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা হিসেবে মাদ্রাসায় যদি শিক্ষা দেয়া হতো তাহলে আলেম সমাজ জাতীয় ব্যাপারে সর্বস্তরে ইসলামী নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতেন।

পাঁচঃ সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারন রাসূল (সঃ)-কে স্রেষ্টতম আদর্শ মানা সম্পর্কে সঠিক ধরনার অভাব।ইকামাতে দ্বীনকে তো প্রকৃতপক্ষে আলেম সমাজের জীবনের আসল কর্মসূচী মনে করা উচিত। কিন্তু কেন এটা হয় নি? আমার ধারনায় এর মূল কারন আল্লাহর রাসূল (সঃ)-কে উসওয়াতুন হাসনা হিসাবে মানার অভাব।এ অভাবেরও কারন আছে। মুসলিম সমাজে একটা বড় রোগ দেখা দিয়েছে। যাকে কোন দিক দিয়ে দ্বীনের বড় খেদমত হিসাবে শ্রদ্ধা করা হয় তাকেই প্রায় উসওয়তুন হাসানা বা শ্রেষ্ট আদর্শের মর্যাদা দেয়া হয়। বুযুর্গ বলে মানলেই যেন তিনি রাসূলের স্থলাভিষিক্ত বা অন্তত কাছাকাছি বলে মনে করা হয়।তাই ইসলামর আদর্শ হিসেবে কোন আলেম বা পীরকে শ্রদ্ধা করতে গেলেই তাকে রাসূলের স্থলাভিষিক্ত মনে করতে শুরু করে।

একটি উদাহরন দিলেই কথাটা সহজ ভাবে বুঝা যাবে। উপমহাদেশের একটি কঠিন সময় হযরত মাওলানা কাশেম (রা) দেওবন্দে ইসলামী শিক্ষার আন্দোলন করেন,তখনাকার তাঁর এই খেদমত নিশ্চই খুব মূল্যবন । তার প্রতি গোটা মুসলিম জাতি কৃতজ্ঞ।তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষন করাও স্বাভাবিক।কিন্তু কেউ যদি মনে করে যে, তিনি যে খেদমত করেছেন তার চেয়ে বড় দ্বীনি খেদমত আর হতে পারে না।সুতারাং তারই অনুকরনে একটি মাদ্রাসা কায়েম করাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য-তাহলে এ ব্যক্তি হযরত নানতুভী (রঃ)-কে উসোয়াতুন হাসানার মর্যাদা দিল বলে বুঝা যায়।আল্লার রাসূল কি একটি মাদ্রাসা কায়েমের জন্য দুনিয়ায় এসেছিলেন? তিনি যে আল্লার পূর্ন দ্বীনকে সমাজে বিজয়ী করার কাজ করে গেলেন সে কাজটাকে কেন জীবনের উদ্দেশ্য মনে করা হয় না? যদি রাসূল (সঃ)-কে জীবনের সব ব্যপারে শ্রেষ্টতম আদর্শ মনে করা হতো তাহলে দ্বীনের আর সব খদেমগনের খেদমতকে রাসূলের ব্যাপক খেদমতের একটা অংশ মাত্র মনে করা হতো।

রাসূলুল্লাহ (সঃ)সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-কে নিয়ে দ্বীনের জন্য যা কিছু করে গেছেন তার সবটুকু আমাদের অবশ্য করনীয় কর্তব্য বলে মনে হয় না কেন? হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা) যতটুকু করেছেন সেটা রাসূলের কাজের সবটুকু নয়।তাকে যদি আদর্শের মাপকাঠি মনে করা হয় তাহলে রাসূল আর মাপকাঠি থাকল কি করে? আদর্শের যে মান রাসূল (সঃ) দেখিয়ে গেছেন সেটাই একমাত্র ষ্টান্ডার্ড বা মান।যে সে মানের যতটুকুতে পৌছতে পারে তাকে সে মানেই শ্রদ্ধা করতে হবে।কিন্তু রাসূলের মানে যে কেউ পৌছাতে পারে না আর কউকে সে রাসূলের সমান মানে শ্রদ্ধার আসন দেয়া যাবে না সে কথা সবার মনে পরিষ্কার থাকতে হবে।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )