আমাদের টাইপ করা বইগুলোতে বানান ভুল রয়ে গিয়েছে প্রচুর। আমরা ভুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছি ক্রমাগত। ভুল শুধরানো এবং টাইপ সেটিং জড়িত কাজে সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে।
ইকামতে দ্বীন প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন অধ্যাপক গোলাম আযম   
Saturday, 12 January 2008
আর্টিকেল সূচি
ইকামতে দ্বীন
ওলামায়ে কেরাম সবাই
ওলামায়ে কেরাম সবাই
দ্বীনের মাপকাঠি একমাত্র রাসূল
উপমহাদেশের বড় বড় ওলামা ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলন করেন নি কেন?
জামাতবদ্ধ প্রচেষ্টার গুরুত্ব
ইকামাতে দ্বীনের উদ্দেশ্যে গঠিত জামায়াতের বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশে এ জাতীয় জামায়াত আছে কি?
জামায়াতে ইসলামী ও মাওলানা মওদুদী (রঃ)
জামায়াত বিরোধী ফতোয়া
মাওলানা মওদূদী (রঃ)বিবোধী ফতোয়া
ওলামা ও মাশায়েখে কেরামের খেদমতে

দ্বীনের মাপকাঠি একমাত্র রাসূল

আল্লাহ পাক একমাত্র রাসূল (সঃ)-কে উসওয়াতুন হাসানা বা দ্বীনের মাপকাঠি বানিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম রাসূলের সবচেয়ে বেশী অনুসরন করেছেন বলেই রাসূলের আনুগত্যের ()ব্যাপারে তারা শ্রেষ্ট আদর্শ।কিন্তু রাসূল যেমন নিজেই আদর্শ সাহাবায়ে কেরাম সে হিসেবে রাসূলের সমান মর্যাদার অধিকিরী নন। এমন কি সব সাহাবী এক মানের নন। চার খলিফার সবাইও এক মানের নন।তাই দ্বীনের একমাত্র মাপকাঠি ()রাসূল এবং সবাইকে একমাত্র রাসূলকেই অনুসরন করার চেষ্টা করতে হবে।

আমরা সাহাবায়ে কেরামকে কী জন্য মানি? তাঁদেরকে মানার জন্য নয় বরং -রাসূল (সঃ)-কে মানার উদ্দেশ্যেই তাদেরকে মানি। রাসূল (সঃ) কে অনুসরন করার ব্যাপারে তারাই আদর্শ স্থাপন করেছেন। তাই রাসূলকে মানার জন্যই তাদেরকে মানতে হবে।কারন ()বা রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরনের দিক দিয়ে সাহাবায়ে কেরামই শ্রেষ্ট আদর্শ।কিন্তু রাসূল (সঃ)যে অর্থে আদর্শ বা উসওয়া সে অর্থে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা এক হতে পারে না-কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।

রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তুলনা করার জন্য একটা সহজ উদাহরন দেয়া যেতে পারে।স্বর্ণকে খাঁটি কি অখাঁটি এবং অখাঁটি হলে কি পরিমান অখাঁটি তা বুঝবার জন্য একপ্রকার পাথর ঘষে জানা যায়।ঐ পাথরকে কষ্টি পাথর বলে।কষ্টি পাথর হলো মানদন্ড বা মাপকাঠি যাকে আরবীতে বলে () কষ্টি পাথর ঘষে যদি স্বর্নের কোন টুকরাকে একেবারে খাটি সোনা বলেও জানা যায় তবুও ঐ টুকরকে কষ্টি পাথর বলা যাবে না।স্বর্ণ কষ্টি পাথর হতে পারে না।ঠিক তেমনিই আল্লার রাসূলই একমাত্র কষ্টি পাথর।সে কষ্টি পাথরে যাচাই করেই সাহাবাগনকে খাঁটি স্বর্ণ বলে জনা যায়,কিন্তু তাই বলে তারা নিজেরা কষ্টি পাথর নন।

সাহাবায়ে কেরামের জামাতকে সামগ্রিক ভাবে খাঁটি হওয়া সত্বেও ব্যক্তি হিসেবে সবাই আবার সমান মর্যাদার নন।খোলাফায়ে রাশেদার মর্যাদা আর সব সাহাবা থেকে বেশী।মর্যাদার এ কম বেশের হিসেব কিভাবে করা হয়েছে? একথা সবাইকে স্বিকার করতে হবে ,এ হিসাবের মাপকাঠি একমাত্র রাসূল (সঃ)।হযরত উমর (রা)-এর চেয়ে হযরত আবু বকর (রা)-কে শ্রেষ্ট বলে স্বীকার করার মানদন্ড বা মাপকাঠি একমাত্র রাসূল। রাসূলের কষ্টি পাথরে যাচাই করেই এ হিসেব বের করা হয়েছে।

আর একটি তুলনা দ্বারা এ পার্থক্যটা আরও পরিষ্কার হয়। হযরত মুয়াবিয়া (রা)সাহাবী হাওয়া সত্বেও তাঁকে খোলাফায়ে রাশেদার মধ্যে গন্য করা হয় না কেন? হযরত উমার বিন আব্দুল আযিয (রা)-কে দ্বিতীয় উমর আক্ষা দিয়ে খোলাফায়ে রাশেদার নিকটতম মর্যাদা দেয়া হয় কিভাবে? অথচ তিনি সাহাবী ছিলেন না। কোন মাপাকাঠিতে বিচার করে এ দুজনের ব্যপারে এ তারতম্য করা হলো? নিসন্দেহে বলা যায় যে,রাসূলের মাপকাঠিতে বিচার করেই উম্মাত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

এসব যুক্তি একথা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাবে প্রমান করে যে,আল্লার রাসূল (সঃ)-একমাত্র আদর্শ মাপকাঠি এবং একমাত্র কষ্টি পাথর।এ কষ্টি পাথরে বিচার করেই মানুষের মধ্যে কে কতটুকু মর্যাদা পেতে পারে তা নির্নয় করা হয়। যদি রাসূল ছাড়াও আর মানুষকে কষ্টি পাথর মনে করা হয় এবং মাপকাঠি বলে ধারনা করা হয় তাহলে সে ব্যক্তি নিশ্চই রাসূলের চেয়ে নিন্ম মানের হবে।আল্লাপাক রাসূল ছাড়া আর কোন নিন্ম মানের লোককে উসওয়া বা আদর্শ মেনে নিতে বলেননি।

দুর্ভাগ্যের বিষয় যে,রাসূল (সঃ)-কে আল্লাহপাক যে উসওয়ায়ে হাসানা হিসেবে একক মর্যাদা দিয়েছেন সে মর্যাদা অন্য কারো নীতিগতভাবে স্বিকার না করলেও বাস্তবে দ্বীনি বড় ব্যক্তিত্বকে এমন মর্যাদা দিয়ে ফেলা হয় যা একমাত্র রাসূলেরই প্রাপ্য।

রাসূলকে ওহী দ্বারা পরিচালিত করা হয় বলে তিনি যেমন নির্ভূল,অন্য কোন ব্যক্তি এমন নির্ভূল হতে পারে না। রাসূলকে যেমন অন্ধ ভাবে মেনে নিতে হয় তেমনভাবেও আর কাউকে মানা চলে না। যুক্তি বুঝে আসুক বা না আসুক রাসূলের নির্দেশ মেনে নেয়া যেমন ঈমানের দাবী,আর কার নির্দেশের সে মর্যাদা হতে পারেনা। রাসূল (সঃ) যেমন সমালোচনার ঊর্ধে আর কেউ তেমন নয়।বিনাযুক্তিতে রাসূলকে মানার জন্য আল্লাহ যেমন নির্দেশ দিয়েছেন অন্য কারও বেলায় তেমন কোন নির্দেশ দেননি।

কোন দ্বীনি ব্যক্তিত্ব যত বিরাট হোক, যদি তাকে নির্ভূল বলে বিশ্বাস করা হয়,তাকে অন্ধ ভাবে মানা হয়,তাঁকে সমালোচনার ঊর্ধে মনে করা হয়,তাহলে প্রকৃতপক্ষে রাসূলের সমান মর্যাদা দেয়া হলো।অথচ মর্য়াদার দিক দিয়ে কেউ রাসূলের সমান হতে পারে না।

দ্বীন ইসলামের মূল ভিত্তিই হলো তাওহিদ ও রিসালাত ।আল্লাহর যাত ও সিফাতের দিক দিয়ে আর কেউ আল্লার সাথে তুলনীয় নয়। তেমনি ওহী দ্বারা পরিচালিত হওয়ার দরুন রসূল যেমন নির্ভূল তেমন আরকেউ হতে পারে না।এজন্যই রাসূলকে যেমন অন্ধভাবে মানতে হয় তেমন আর কাউকে মানা চলে না।অর্থাৎ উসওয়াতুন হাসনা হিসেবে রাসূল একক। আর কেউ এ পজিশন পেতে পারে না।কালেমা তাইয়েবার মাধ্যমে এই অর্থেই তৌহিদ ও রিসালাতের স্বিকৃতি দিয়ে থাকি।

যদি রাসূলকে একমাত্র আদর্শ মনে করা হতো এবং রাসূলের জীবনকে পূর্ণরূপে অনুসরন করাকে ইসলামী জীবনের লক্ষ মনে করা হতো তাহলে ইকামাতে দ্বীনের সংগ্রাম বা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ-কে অবশ্যই কর্তব্য মনে করা হতো।ইসলামী আইন চালু করার চেষ্টা বা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের আন্দোলন না করলে রাসূলকে যে সত্যিকারভাবে অনুসরন করা হয় না এ কথা বুঝতে অসুবিধা হতো না।

রাসূল (সঃ)ছাড়া বড় আলেম ,পীর বা বুজর্গকে আদর্শ মনে করার কারনেই কেউ মাদ্রাসার মাধ্যমে দ্বীনের খেদমত করাকেই যথেষ্ট মনে করেন,কেউ ওয়াজ করেই দ্বীনের দায়িত্ব পালন হলো বলে ধারনা করেন,কেউ ইমামতিতেই সন্তুষ্ট আছেন।যদি রসূল (সঃ) কে একমাত্র আদর্শ মনে করতেন তাহলে এটুকু খেদমত করার পরও দ্বীন কে বিজয়ী করার জন্য পেরেশান হতেন। তাবলীগ জামাতের দ্বায়ীত্বশীল মুরব্বিগন যদি রাসূল (সঃ)এর ইকামাতে দ্বীনের আন্দোলনকে আসল আদর্শ মনে করেন তাহলে এ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রঃ)-এর রচিত ছয় উসূলের কর্মসূচীকে প্রাথমিক খেদমত বলে ধারনা করবেন। তাহলে তাবলিগের বর্তমান কর্মসূচিকেই হূবহু রাসূলের পরিচালিত আন্দোলন বলে কেউ মনে করবেন না। কিন্তু রাসূল (সঃ)যদি শ্রেষ্ট আদর্শ হিসেবে সামনে না থাকে তাহলে হযরত মাউলানা ইলিয়াস (রঃ)-কেই আদর্শ মনে করে তার রচিত কর্মসূচীকেই ইসলামের চুরান্ত কর্মসূচী বলে মনে করতে পারে।

“উসওয়াতুন হাসানা” হিসাবে রাসূল (সঃ)-এর মর্যাদাকে সঠিক ভাবে বুঝবার জন্য আর একটা উদাহরন বিশেষ সহায়ক হতে পারে।কলেজ ইউনিভার্সিটি ও মাদ্রাসার ছাত্রদের পাঠ্যসূচী সম্পর্কে যে সিলেবাস বা নেসাব রচনা করা হয় সেখান থেকেই ফাইনাল পরিক্ষার প্রশ্ন তৈরী করা হয়।যদি ছাত্ররা ঐ সিলেবাস সম্বন্ধে খুব সজাগ না থাকে এবং শক্ষকেরা সিলেবাস যাতে সবটুকু পড়ান সে দিকে যদি ছাত্ররা লক্ষ না রাখে এবং সিলেবস যদি সবটুকু পড়া না হয় তাহলে পরীক্ষায় পাস হবার আশা কিছুতেই করা যায় না।ছাত্ররা শিক্ষকের প্রতি যতই শ্রদ্ধা দেখাক,সিলেবাস পড়া বাকি থাকলে পরীক্ষায় ভাল ফল কখনও হবে না।কোন শিক্ষক যদি সিলেবাসের শুধু সহজ অংশটুকু পড়ায় এবং কঠিন অংশ বাদ দেয় তাহলে ছাত্র যতই ভাল হোক পরীক্ষায় ভাল ফল আশা করা যায় না।

আল্লাহ পাক আখেরাতের পরীক্ষায় কামিয়াবীর জন্য রাসূল (সঃ)-এর গোটা জীবনকে সিলেবাস হিসেবে দিয়েছেন। মৃত্যুর পর কবর থেকেই ঐ সিলেবাস অনুযায়ী প্রশ্ন করা হবে।কোন লোককে এ প্রশ্ন করা হবে না যে,হযরত আবু বকর (রঃ) বা ইমাম আবু হনীফা (রঃ) বা হয়রত আব্দুল কাদের জিলনী (রঃ)-কে অনুকরন বা অনুসরন করা হয়েছে কিনা।

রাসূলকে সিলেবাসের সাথে তুলনা করলে সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে সব দ্বীনি ব্যক্তিকে শিক্ষক বা উস্তাদের সাথে তুলনা করা চলে।আমরা সাহাবায়ে কেরাম থেকে রাসূলের জীবন সম্পর্কেই শিক্ষা নেই।রাসূলের সিলেবাস শেখার জন্যই সাহবাদেরকে শ্রেষ্ঠ উস্তাদ মনে করতে হবে।রাসূলকে জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে মেনে চলার প্রয়োজনেই ফেকার ইমামগনকে মানতে হবে। দুনিয়ার সব বিষয় যেমন উস্তাদ থেকেই শিখতে হয়,দ্বীনি জিন্দেগী শিখতে চইলেও উস্তাদ দরকার।সে উস্তাদকে যে নামেই ডাকা হোক-কাউকে দ্বীনি জামায়াতের আমীর এবং কাউকে শায়েখ বা পীর বলা হোক-প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সবাই উস্তাদ।তাঁদের কাছ থেকে রসূলের গোটা জীবনের সিলেবাস শেখার চেষ্টা করতে হবে। একই উস্তাদের কাছে গোটা সিলেবাস শেখা সম্ভব নাও হতে পারে।যদি আমরা রসূলকে সিলেবাস মনে করি তাহলে সে উস্তাদের কাছে যেটুকু সিলেবাস শেখা যায় সেটুকু শেখার পরও বাকি সিলেবাস শেখার জন্য উস্তাদ তালাশ করতে হবে। কোন এক উস্তাদকেই সিলেবাস মনে করলে,তিনি যেটুকু শেখান সেটুকুকেই যথেষ্ট মনে করলে আখেরাতের ফাইনাল পরীক্ষায় বিপদে পড়তে হবে।

দেশে এত আলেম,পীর ও খাদেমে দ্বীন থাকা সত্বেও ইকামাতে দ্বীনের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ার আসল কারন এটাই। রাসূলকে সিলেবাস হিসেবে গ্রহন না করে উস্তাদের অনুসরন করাই যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে।এ মহা ভূল যদি ভাংগে তাহলে ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব সবাই বোধ করতে সক্ষম হবেন।



সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )